
পর্ব ৪
ডাইনিং টেবিলের চারপাশে যেন এক অদৃশ্য নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। চামচের ঠোকাঠুকির শব্দ, প্লেটের ঘষাঘষি—সবই আছে, কিন্তু তবুও কোথাও যেন অভিমান মেশা ঠান্ডা বাতাস ঘুরে বেড়াচ্ছে।
সকলের সামনে সাজানো খাবার; সবাই নিজের মতো খাচ্ছে।
কিন্তু একজনের মুখে কোনো স্বাদ নেই—
সে তানভীকা। তার সামনে ধোঁয়া ওঠা ভাত, ডাল, মুরগির টুকরো—সবই আছে। কিন্তু তার হাতের চামচ শুধু খাবার নেড়ে চলেছে; মুখে কিছুই তুলছে না। মনে হয় প্রতিটি দানা তার গলার কাছে গিয়ে থেমে যাচ্ছে।
মুখের ভেতর শুকনো স্বাদ, চোখে লুকানো অস্থিরতা, আর মনের ভিতর অঘোষিত ঝড়—সব মিলিয়ে তানভীকার ভেতরে আজ কিছু একটা ভীষণ অস্থির।
মাথা নিচু করে বসে থাকতে থাকতে সে যেন অন্য এক জগতে হারিয়ে গেছে।
কি ভাবছে সে?
অতীতের প্রতিধ্বনি? বর্তমানের চাপা যন্ত্রণা?
নাকি ভবিষ্যতের ভয়? বুঝতে পারা যায় না।
শুধু দেখা যায়—তার চোখে শূন্যতা।
হঠাৎ পাশের চেয়ারের আওয়াজে তানভীকা বাস্তবে ফিরে এলো।
চোখের পলক ঘন করে তুলে সে হালকা এক নিঃশ্বাস ফেলে।
—”কি হলো মা? কিছুই খাসনি তো!”
মালিহা শেখ উঠে এসে তানভীকার মাথায় হাত রাখলেন।
স্পর্শটা ছিল মমতায় ভরা, কিন্তু স্পর্শের ভেতর লুকানো দুশ্চিন্তাও যেন স্পষ্ট ফুটে উঠেছিল।
তানভীকা চমকে তাকাল। তারপর খুব স্বাভাবিক ভান করে মাথা নেড়ে বলল—
—”না মা, কিছু না। আজ ভার্সিটিতে ইম্পর্ট্যান্ট ক্লাস আছে। আমাকে একটু আগে বের হতে হবে আবার টিয়শনি আছে । তাই…
মালিহা শেখ বুঝতে পারলেন—মেয়েটা সত্যি তাড়াহুড়ো করছে না; পালাতে চাইছে।
কিছু অনুভূতি শুধু মা-ই বুঝতে পারেন, তা যতই লুকানো থাকুক।
—”মা, একটু খেয়ে যা না। খালি পেটে বের হবি?”
মালিহার কথায় মমতা ছিল, কিন্তু অস্থিরতাও ছিল।
তানভীকা অনিচ্ছায় প্লেট থেকে মাত্র দুই চামচ ভাত মুখে তুলল।
তারপর ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ধীরে ধীরে দরজার দিকে হাঁটতে লাগল। সে বাড়ি থেকে বের হয়ে আসতেই ঠান্ডা বাতাস তার মুখে এসে পড়ল।
কাছের একটা বেঞ্চে বসে তানভীকা দ্রুত ফোন বের করে তিয়াশার নাম্বার ডায়াল করল।
কণ্ঠে উদ্বেগ, গলায় চাপা কান্না—
—”তিয়াশা… তোকে কিছু বলার আছে। প্লিজ, রিসিভ কর ।”
ফোন বেজে উঠছে…
কিন্তু উত্তর নেই।
+++++
অন্যদিকে—
বাড়ির ভেতর আবার শুরু হয়েছে পুরোনো দোষারোপের গল্প। তানভীকা বের হতেই, যেন কারও গায়ের ওপর দোষ চাপানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল।
রিদওয়ানের মা তাহমিনা শেখ, ঠান্ডা স্বরে বলে উঠলেন—
—”দেখলা?
যেমন আদর দিয়ে এতো বড় করে কি হবে , তেমনই আস্তে আস্তে নিজের আসল রূপ দেখাচ্ছে।
এই মেয়ের জন্যই আমার ছেলের জীবনটা নষ্ট হলো।
যে ছেলে একটু চেঁচামেচি করত, একটু রাগ করত—আজ সে ছেলে এত দূরে চলে গেছে।
কার জন্য?
এই মেয়ের জন্যই!”
মালিহা শেখ হতভম্ব।
একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কিছু বলার ভাষা নেই তার। মেয়ের ওপর যতই রাগ হোক, অন্য কারো কাছ থেকে অভিযোগ শুনলে বুকটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে। তাহমিনার কথাগুলো ছিল ধারালো তীরের মতো।
প্রতিটি বাক্য মালিহার বুকে গিয়ে বিঁধছিল।
অসহ্য লাগতে শুরু করল। চোখ ভিজে এলো—
তিনি আশ্রয় খুঁজে নিজের রুমে চলে গেলেন।
তিনি চলে যেতেই তাহমিনা আরও জোরে বলল—
—”মালিহার তোমার সন্তান নেই! সে কি বুঝবে আমার কষ্ট?
মায়ের বুকের ব্যথা কি এমনেই কেউ বোঝে?”
এই কথাগুলো শুনে পাশ থেকে রিহান থেমে গেল।
তার ছোট চাচি—মালিহা—যার কোলে বসে সে বড় হয়েছে, যার রান্না খেয়ে সে স্কুলে যেত, যার মমতায় সে ভাই-বন্ধু সব পেয়েছে—
সেই মানুষটাকে কেউ কষ্ট দিচ্ছে…
এটা সে সহ্য করতে পারে না।
রিহানের হাত শক্ত হলো।
মনের ভেতর রাগ আর কষ্ট জমতে লাগল।
তাহমিনার অভিযোগ থামছিল না—
এবার সালমা শেখ যোগ দিলেন।
—”এই মেয়েটার জন্য এই বাড়ির বড় ছেলেবিদেশ চলে গিয়েছে। এখন আবার আমার ছেলেদের পেছনে লেগেছে!”
তাহমিনার মুখ বকিয়ে বললো —
—”ঠিকই বলেছো” এই মেয়েটা ধ্বংস করে দেবে সবাইকে।”
শব্দগুলো গায়ের ওপর বৃষ্টির মতো পড়ছিল।
কিন্তু বৃষ্টি নয়— এ যেন আগুন।
মালিহা শেখ সিঁড়ির ধাপ ধরে উপরে উঠছিলেন।
প্রতিটি শব্দ যেন তার হাঁটা থামিয়ে দিতে চাইছিল।
কিন্তু তিনি থামলেন না।
কারণ থামলে কান্না আরও বেড়ে যাবে।
তিনি শুধু বললেন—
—”আমি আর পারছি না…”
বাকি কথাগুলো গলায় আটকে গেল।
—
সবকিছু চুপচাপ শুনছিল রিহান।
তার মনে শুধু একটি কথা—
তানভীকার দোষ হোক বা না হোক—কেউ তাকে অপমান করলে সে চুপ থাকবে না।
রিহান চামচ নামিয়ে রাখল।
তাহমিনা বা সালমা—কেউকেই আর কিছু বলল না।
কারণ বিরোধ বড় করলে লাভ নেই;
যে মানুষ বুঝতে চায় না, তাকে বোঝানো যায় না।
রিহান ধীরে উঠে দাঁড়াল।
তার পায়ের শব্দে সবাই তাকাল।
কেউ কিছু বলার আগেই রিহান বলল—
—”আমি বের হচ্ছি।”
সাথে নিয়েই নিল বাইকের চাবি।
তার মাথায় এখন একটাই চিন্তা—
তানভীকা। এভাবে মন খারাপ করে, কারও ওপর কিছু না বলে মেয়েটা চলে গেল—
সে কি ঠিক আছে? নিরাপদ আছে তো?
মনে এক অদ্ভুত টান লাগল।
এটাকে কি উত্তরদায়িত্ব?
না কি অন্য কিছু?
সে বের হয়ে গেল তানভীকার পেছনে।
—
তানভীকা তখন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে।
ফোন হাতে, মুখে চিন্তা জমে আছে।
মাঝে মাঝে বাতাসে চুল এলোমেলো হচ্ছে, মেয়েটি হাত দিয়ে সেগুলো ঠিক করতে করতে খুঁজছে অজানা শান্তি।
হঠাৎ সে শুনল—
—”তাহি দোড়া… এভাবে চলে এলি কেনো?”
পেছনে তাকাতেই রিহানকে দেখে সে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল।
—”ভাইয়া? আপনি এখানে কেনো?”
রিহান হালকা বিরক্তি আর যত্ন মেশানো স্বরে বলল
—”তোর মুখটা কেমন দেখাচ্ছে দেখেছিস? কিছু না বলে বের হয়ে এলি? আস, আমি তোকে ড্রপ করে দিচ্ছি।”
তানভীকা তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে বলল—
—”না ভাইয়া, লাগবে না। আমি যেতে পারব।”
রিহান এবার কিছুটা গম্ভীর হয়ে বলল—
—”নাহ। একটা মেয়ে একা এভাবে মন খারাপ নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকবে—আর আমি চলে যাবো?
তুই বস।”
তানভীকা আর কিছু বলতে পারল না।
চুপচাপ রিহানের বাইকের পেছনে বসে পড়ল।
বাতাসের ধাক্কায় তার ওড়না উড়ে যাচ্ছিল—
রিহান হাত বাড়িয়ে সেটা ঠিক করে দিল।
এক মুহূর্তের জন্য তানভীকার বুক ধক করে উঠল।
এই আচরণটা রোদেলা বিকেলের মতো উষ্ণ।
ভাইয়ের মতো, বন্ধুর মতো—
কিন্তু কোথাও যেন অদ্ভুত কোমলতা।
—
মালিহা শেখের ভেঙে পড়া
এদিকে বাড়িতে মালিহা একা রুমে বসে কান্না করছেন।
তার বুকটা ভেঙে আসছে—
যেমনভাবে একটি মা তার মেয়ের জন্য কাঁদে,
তেমনভাবেই একজন নারী আরেক নারীর অপমানেও কেঁদে উঠতে পারে।
—”আমি কি সত্যিই এতটাই অসহায়?” “তানভীকার জন্য আমি কেন কিছুই বলতে পারি না?” “মেয়েটা যতটুকু ভুলই করুক… সবাই এভাবে দোষ দিলে কি সহ্য হয়?”
নিজের ওপর, সংসারের ওপর, ভাগ্যের ওপর—
তার প্রচণ্ড অভিমান।
কিন্তু তিনি জানেন— কারও কাছে কিছু বললে লাভ নেই। যিনি কথা না বুঝে অভিযোগকে সত্যি মনে করেন, তিনি কখনও মমতা দেখবেন না।
মালিহা ঘরে বসে চোখ বন্ধ করতেই তানভীকার
হাসিমাখা শৈশব ভেসে উঠল—
ছোট্ট হাতে আঁকা ছবি, নতুন জামা পরে নাচানাচি, আর সন্ধ্যায় তার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়া…
এত স্মৃতি ভেসে উঠতেই চোখ আবার ভিজে গেল।
—
নীচে সালমা শেখ আবার বললেন—
—”এমন মেয়ে ঘরে থাকলে ছেলেরা বিপথে যায়।
সবাই সাবধানে থাকো।”
তাহমিনা মাথা নেড়ে সমর্থন দিল।
তাদের কথায় যেন ঘরময় ভারী বাতাস জমে গেল।
কিন্তু তারা খেয়াল করল না—
যে মেয়েটাকে এভাবে দোষ দেওয়া হচ্ছে, সে কি আসলে কিছু করেছে? সে কি কারও ক্ষতি করেছে?
না… সে কেবল নিজের দুঃখ ভুলতে চেয়েছে।
নিজেকে সামলে বাঁচার চেষ্টা করছে।
কিন্তু অভিযোগকারীরা এসব বোঝে না।
বোঝে শুধু—অন্যকে দোষ দিলে নিজেদের মনটা হালকা লাগে।
—
রিহানের বাইক ছাড়ার সাথে সাথে রাস্তার বাতাস তানভীকার মুখে লাগছিল।
সে চোখ বন্ধ করল।
মনে হলো— এভাবেই কিছুক্ষণ থাকলে কি মনটা একটু হালকা হবে?
রিহান হঠাৎ বলল—
—”তুই ঠিক আছিস তো?”
তানভীকা একটু চুপ করে থাকল।
পৃথিবীর সব শব্দ যেন তার কানে ম্লান হয়ে গেল।
সে খুব ধীরে বলল—
—”হুম… আছি…”
কিন্তু এই “হুম” শব্দের ভিতর লুকানো ছিল কষ্টের পাহাড়। রিহান শুনল।
বুঝলও। বুঝতে পারল—
মেয়েটা হাসছে, মুখোশ পরে আছে, কিন্তু ভেতরে ভেঙে পড়েছে।
******
দূরের শহরের আলো আকাশের সাথে মিলেমিশে ম্লান হয়ে গেছে। সন্ধ্যার মৃদু হাওয়া রিদওয়ানের মুখোমুখি এসে হালকা শীতলতা ছড়িয়ে দিচ্ছিল। গাড়ির ভেতর বসে সে চারপাশের সবকিছু নিখুঁত দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছিল। প্রতিটি গাছের ছায়া, রাস্তায় ছড়িয়ে থাকা ধুলো, দূরে অচেনা লোকজনের অচেতন হাঁটা—সবই যেন তার চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ ১৩ বছর পর সে সেই জায়গায় ফিরছে যেখানে তার প্রথম শৈশব কাটেছিল, যেখানে তার হাসি, কষ্ট, আনন্দ সবই প্রথম জন্ম নিয়েছিল।
গাড়ি থামার সাথে সাথে রিদওয়ানের মনটা হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল। মনে মনে সে বলল, “আজ থেকে ১৩ বছর আগের সেই দিনগুলো যেন সব মুছে গেছে, কিন্তু সেই স্মৃতিগুলো এখনও চোখের সামনে ভেসে আছে।” ধীরে ধীরে সে গাড়ি থেকে নেমে এল। বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে তার শরীরে নতুন একটা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল। অন্যদিকে, রিহান তার বাইক নিয়ে দূরে চলে গেছে। মনে হচ্ছে যেন সবাই এই পুনর্মিলনের জন্য এক ধরণের প্রস্তাবনা অপেক্ষা করছে।
শেখ বাড়ির মূল গেটের সামনে দাঁড়িয়ে রিদওয়ান চোখ বন্ধ করে দীর্ঘক্ষণ স্থির থাকল। গেটের লাল রঙ, পাথরের মেঝে, এবং বাতাসে ভেসে আসা ঘ্রাণ—সবকিছুই তাকে এক অদ্ভুত সমাহারে আবদ্ধ করে ফেলল। মনে হচ্ছিল, এখানে এসে তার মনের সব আবেগ নতুন করে জন্ম নিচ্ছে।
বাড়ির ভিতরে ঢোকার সাথে সাথেই রিদওয়ান লক্ষ্য করল, কাজের লোকেরা তাদের নিজস্ব কাজে ব্যস্ত। কেউ তার দিকে তাকাচ্ছে না। এই বিশাল নীরবতা যেন তাকে আরও গভীরভাবে নিজের স্মৃতির সাগরে নিয়ে গেল।
ঠিক তখনই, শারমিন খাতুন, যে দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে শেখ বাড়িতে কাজ করছেন, চোখের চশমা সামান্য নেড়ে বললেন,
—“রিদওয়ান বাবা… তুমি এসেছো… এত বছর পর এলে, অবশেষে।”
শারমিন খাতুনের মুখের হাসি এবং চোখে আনন্দের ঝলক রিদওয়ানের হৃদয়কে ছুঁয়ে গেল। তিনি ধীরে ধীরে শারমিন খাতুনের কাছে এগিয়ে গিয়ে সালাম দিলেন।
—“কেমন আছো খালা?” রিদওয়ানের মৃদু হাসি
ছিল এক ধরণের শান্তি এবং স্মৃতি মিশ্রিত।
শারমিন খাতুনও হালকা হাসি দিয়ে বললেন,
—“আমি ছোট থেকেই তোমাকে দেখছি বাবা। এই চোখ-মুখ আমার চেনা।”
রিদওয়ান কিছুক্ষণ থেমে বলল
— বাকিরা কোথায়?
শারমিন খাতুন বললেন,
—“তুমি একটু দাড়াও, আমি সবাইকে ডেকে নিয়ে আসছি।”
উপরে গিয়ে তিনি দ্রুত সবাইকে ডেকে আনলেন। তৎক্ষণাৎ তাহমিনা চৌধুরী, যে নিজের রুমে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, শারমিন খাতুনের দ্রুত কণ্ঠস্বর শুনে উঠে দাঁড়ালেন। চোখে অশ্রু ঝলমল করছে। তার মনে হাজারো স্মৃতি ভেসে উঠল—ছেলের সেই মিষ্টি কণ্ঠ, হাসি, এবং দীর্ঘ বছর ধরে তার সঙ্গে না থাকা অনুভূতি।
********
দৌড়ে নিচে নামার সঙ্গে সঙ্গে তার চোখ পড়ল ফর্মাল স্যুট পরিহিত ছেলেটির দিকে। সে আর কিছু না বলে শুধু ছেলেকে জড়িয়ে ধরল। হুহু করে কান্না এল। দীর্ঘ ১৩ বছরের তৃষ্ণা, অভিমান, অভাব—সব মিলিয়ে মুহূর্তে মেটে গেল।
রিদওয়ানের চোখেও হালকা পানি জমল। মা ও ছেলে একে অপরের সান্নিধ্যে অতীতের সব দুঃখ, শূন্যতা, এবং শিথিলতাকে মুহূর্তের মধ্যে ভুলে গেল।
এই কান্নার শব্দে মালিহা শেখও রুম থেকে বের হয়ে এলেন।
রুবিনা সিঁড়ি থেকে নেমে দেখল এক নতুন ছেলেটাকে। মনে মনে ভাবল—“ওয়াও… এতো সুন্দর! আমি তো ক্রাশ খেয়ে গেলাম। কিন্তু কে তিনি?”
****
শেখ বাড়ির ভিতরে এই প্রথমবারের মতো এত সময় পরে এমন এক অদ্ভুত আবহ বিরাজ করছে। রিদওয়ানের উপস্থিতি যেন সমস্ত বাতাস, আলো, শব্দ—সবকিছুকে তার চারপাশে জীবন্ত করে তুলেছে। মালিহা শেখ প্রথমে রিদওয়ানকে দেখে হঠাৎ আবাক হয়ে গেলেন। মনে হলো যেন তার স্মৃতির দরজা হঠাৎ খোলার শব্দ বাজলো। গত ১৩ বছর আগে সেই ভয়ংকর রাত্রি—যখন পরিবারটি ছিল এক অদ্ভুত উত্তেজনা ও অস্থিরতায়—মনে পড়তে লাগলো।
মালিহা শেখের মনে এসেছিল—কিন্তু তার গলা ও বুক হঠাৎ শুকিয়ে গেল। আবেগ ও চিন্তার মধ্যে তিনি নিজেকে সামলাতে পারছিলেন না। অবশ্যই, রিদওয়ানকে দেখে তার খুশি হয়েছিল। কিন্তু সেই খুশি যেন অস্থিরতার সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। তার মনে একটাই চিন্তা ঘুরছিল—তানভীকা এখন আর ছোট নয়। আর যদি রিদওয়ানের সঙ্গে তার মেয়ে দেখা করে? তানভীকা তো এই লোকটিকে দীর্ঘদিন ধরে ঘৃণা করে এসেছে।
তবে এই চিন্তা যতই তার মনে ঢেউ খেলাক না কেন, রিদওয়ান ধীরে ধীরে মালিহা শেখের দিকে এগিয়ে এলেন।
তার কণ্ঠে ছিল কোমলতার মিশ্রিত প্রশান্তি—
—“কেমন আছো ছোট আম্মু?”
মালিহা শেখ এক মুহূর্ত সব চিন্তা বাদ দিয়ে মিষ্টি হেসে বললেন—
—“আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। বাবা, তুমি কেমন আছো?”
রিদওয়ানের হাসি ছিল শান্ত ও স্নিগ্ধ, তবে চোখে লুকানো শক্তি ও আত্মবিশ্বাসও ছিল।
—“আলহামদুলিল্লাহ ভালো। এবার কিন্তু আমি এসে গেছি। তুমি আগে যেমন আমাকে পায়েস রান্না করে খাওয়াতেই, এখনও রান্না করতে হবে।”
মালিহা শেখ হেসে বললেন—
—“আচ্ছা, দিবো বাবা।”
রিদওয়ান একটু মুখ উঁচু করে প্রশ্ন করলেন—
—“বাকি সবাই কোথায়?”
তাহমিনা শেখ উত্তর দিলেন—
—“ওরা সবাই একটু আগে অফিসে গেছে বাবা। তুমি চিন্তা করো না। সবাই চলে আসবে একটু পরে।”
রিদওয়ান আর কিছু বলল না। সে তার সভাব মতোই চোপ করে রইল।।
—
*****
এদিকে তানভীকাকে ইউনিভার্সিটিতে নামিয়ে দিয়ে রিহান তার সাথে কথা বলছিল। সকালটা শান্ত, বাতাসে হালকা ঠান্ডা ভাব। রিহান হঠাৎ খেয়াল করল, তানভীকার চোখে কিছুটা অব্যক্ত বিরক্তি।
সে চুপচাপ হেসে বলল, “এরা কারা রে তানভি? অনেক দেখতে সুন্দর তো।”
তানভীকা হালকা গম্ভীর কণ্ঠে উত্তর দিল,
— “তুমি যাও ভাইয়া। তোমার না অফিস আছে? তো এখানে কি করছো?”
রিহান হেসে থেমে দাঁড়াল। সে জানতো, তানভীকার এই প্রতিক্রিয়া তার সাধারণ রসবোধেরই অংশ। তানভীকা সবসময় নিজের জায়গা ধরে রাখে, আর সে সেটা পছন্দ করতো। হেসে বলে বিদায় নিল।
******
সেদিনের সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের পাশের লম্বা গাছগুলো হাওয়ায় দুলছিল। তানভীকা কয়েকটি ধূসর পাতা পায়ে আঘাত করে হেঁটে যাচ্ছিল। নীলিমা আর তিয়াশা সামান্য দুরুদুরু চোখে তাকে দেখছিল। দুইজনই নতুন ছাত্রীর মতো নিজের মধ্যে লজ্জা অনুভব করছিল। তানভীকার চোখে একটা শক্তি ছিল, যা অন্যদের অনুপ্রাণিত করতো। এই সব কিছু দেখেই রিহানকে বিরক্তি হতো না; বরং সে তানভীকার মধ্যে নিজের পরিচিত অনুপ্রেরণা খুঁজে পেত।
সে ধীরে ধীরে পেছনে হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে ভেবেছিল, “তানভীকা বড় হয়েই যে কত দায়িত্বশীল, সেটা স্পষ্ট।”
তারপর সবাই ক্লাসে চলে গেল।
******
তাহমিনা চৌধুরী ফোন করে সবাইকে বাসায় আসতে বলেন। সামান্য সময়ের মধ্যেই সবাই বাসায় এসে পৌঁছায়।
রিদওয়ানকে দেখার পর সামিউল শেখের মুখে আনন্দের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ছোট থেকে সন্তান না থাকায় রিদওয়ান যেন তাদের জীবনের এক অতি মূল্যবান অংশ। ফাহিম, রিহান সবাই এসে তাকে শুভেচ্ছা জানায়। খুটিনাটি আলাপচারিতায় হাসি-ঠাট্টার মধ্যে সময় অতিবাহিত হয়।
হঠাৎ রফিউল উঠে দাঁড়ায়।
“দেশে যখন এসেছো, এবার কি থাকবা নাকি আবারও চলে যাবে?”
তার কণ্ঠে কড়া ভঙ্গি।
রিদওয়ান ও রফিউল শেখের সম্পর্ক বরাবরের মতোই উত্তেজনাপূর্ণ। প্রয়োজন ছাড়া তারা একে অপরের সঙ্গে কথা বলে না। গম্ভীর কণ্ঠে রিদওয়ান উত্তর দিল, “এসেছি যখন, হাতে কিছু ইম্পোরটেন্ট কাজ আছে না করে ফিরতে পারব না ।”
রফিউল শেখ আরও বলেন, “ঠিক আছে, তাহলে আমাদের ফ্যামিলি বিজনেসটা দেখো।”
রিদওয়ান কণ্ঠে দৃঢ়তা রেখে বলল,
“আমার নিজের বিজনেস আছে। আমি সেটাই দেখবো। আপনাদের ব্যবসা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই।”
রফিউল কিছু বলার চেষ্টা করলেও
তাহমিনা শেখ মাঝখানে হেসে বললেন,
“আচ্ছা, হয়েছে। অনেক—বাবা, তুই আয় তো খেয়ে নিবি। সেই কখন এসেছিস, এখনো কিছু খাসনি।”
রিদওয়ান হালকা মাথা নেড়ে বলল,
“না, আম্মু, আমি অনেক ক্লান্ত। একটু রেস্ট নিবো।”
সবাই ধীরে ধীরে যে যার রুমে চলে যায়।
রিদওয়ানও সিঁড়ি বেয়ে নিজ রুমের দিকে যাচ্ছিল। সিঁড়ির প্রতিটি ধাপ তাকে যেন অতীতের স্মৃতির মধ্যে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। তার মনটা অস্থির। চারপাশে থাকা সকলের হাসি, আলাপ, বন্ধুত্ব—সবকিছু যেন তার নিজের অনুভূতির সঙ্গে একাকার হচ্ছে না। ছোটবেলা থেকে পরিবারের আদর পেয়েও সে নিজেকে কখনও পূর্ণ স্বাধীন মনে করতে পারেনি।
মাঝে রিহান হঠাৎ বলে উঠলো,
“ছোট আম্মু, আমি তো তানভীকে নিয়ে আসি।”
তার কণ্ঠে এমন একটি আত্মবিশ্বাস ছিল যা শুনতে পেতেই মনে হচ্ছিল—সে ঠিক জানে, এখন যা করবে, তাতে কোনো বাধা নেই। রিদওয়ান হয়তো শুনতে পেয়েছে, হয়তো নয়—কিন্তু এই মুহূর্তে তা তার কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নয়।
রিদওয়ান হালকা ব্যাক হেসে বলল,
“দেশে তো চলে এসেছি। এবার যেটা হবে, সেটা আমার ইচ্ছে তেই হবে। অনেক জীবন নিয়ে খেলা হলো, এবার না হয় আমিও একটু খেলি।”
তার কণ্ঠে ছিল এক ধরনের শীতল রসালো অহংকার, যা শুনে যে কেউই কমফোর্টে থাকবে না। সে জানত, এই দেশে এসে অনেকগুলো পুরনো ফাঁদ, পুরনো মানুষ, পুরনো পরিস্থিতি তাকে আগের মতোই টানতে পারে। কিন্তু সে এক মুহূর্তের জন্যও ভয় পেল না।
রুমে ঢুকে সে জানলার কাছে গিয়ে বসে পড়ে। বাইরে বাগানের গাছগুলো হালকা বাতাসে দুলছে। পাখির ডাক শুনে মনে হচ্ছে জীবনের কিছু ক্ষণ মুহূর্তের মতো থেমে গেছে।
তার চোখ দিয়ে অজান্তে জল ঢলে আসে। ১৩ বছর ধরে যে ক্ষত আঘাত পেয়েছে, সে ধীরে ধীরে আবার স্মৃতির ভাঁজে ভেসে আসে।
সেই ভয়ংকর রাতে যা হয়েছিল, তার প্রতিটি স্মৃতি যেন চোখের সামনে রিফ্রেশ হচ্ছে।
তানভীকার কথা, তার ছোটবেলার বন্ধুরা, হারানো সময়—সব মিলিয়ে এক অদৃশ্য চিত্র।
পরদিন সকালে রিদওয়ান নিজেকে প্রস্তুত করে নিজের অফিসের দিকে যাত্রা শুরু করল। সে জানত ফ্যামিলি বিজনেসের প্রতি তার কোনো দায় নেই, কিন্তু নিজের বিজনেসের দায়িত্বে তার সময় আর ব্যাস্ততা।
কিছুক্ষণ অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকার পর, সে হঠাৎ নিজেকে আরও শক্তিশালী মনে করল। নিজের স্বপ্নের দিকে দৃষ্টিপাত করে সে বুঝতে পারল, পরিবারকে ভয়াবহভাবে উপেক্ষা করতে চাইছে না, কিন্তু নিজের পথে চলাটাই তার প্রথম কর্তব্য।
রিদওয়ান সেই রাত্রির মধ্যে ভাবল, জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপের গুরুত্ব রয়েছে। সে জানত, ভালোবাসা, ক্রোধ, সাফল্য—সবকিছুই মিশে আছে এক অদৃশ্য সূত্রে।
সেদিনের ঘটনা তার জীবনে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।
তার চারপাশের মানুষরা কেবল তার অতীত নয়, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলছে। প্রতিটি সম্পর্কের জটিলতা, আনন্দ, দুঃখ—সবকিছু তাকে আরও শক্তিশালী করছে।
রিদওয়ান ফ্রেশ হয়ে নিজ রুমে ফিরে গেল। বেডে শুয়ে পড়ার পরও তার চোখ বন্ধ থাকলো না। মনে মনে সে বারবার সেই মুহূর্তগুলো মনে করছিল—কিভাবে তার দীর্ঘ ১৩ বছরের দূরত্ব, প্রস্থান, এবং বিচ্ছিন্নতার পরেও সবকিছু ঠিক তেমনই রয়ে গেছে। শহরের অন্ধকারে, গলির কোণে, হারানো স্মৃতিগুলো যেন আবার জেগে উঠছিল।
****
অন্যদিকে ভার্সটি ছুটি হয়ে গেছে। কলেজের চত্বরের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন নীলিমা এবং তিয়াশা। দুইজনেই এক ধরনের উত্তেজনা আর কৌতূহলের মিশ্রণে দোলা দিচ্ছিল। বাতাসে হালকা শীতলতা, কিন্তু দুজনের মনে কেমন অদ্ভুত উত্তেজনা।
হঠাৎ নীলিমা প্রশ্ন করে উঠলো,
“এই তানভী, তোর কালকে কি হয়েছছিল রে? তুই নাকি রাত দেরি করে বাসায় ফিরছিস?”
তানভীকা সামান্য নাড়ে, কিন্তু অবিলম্বে
উত্তর দেয়, “হ্যাঁ।”
তিয়াশা চেঁচিয়ে বলে উঠলো,
“খুলে বল তানভী। আমাদের তো জানতে ইচ্ছে করছে।”
তানভীকা গভীর নিশ্বাস নেয়। তার চোখে সামান্য ভয়, হালকা চাপ, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে একটি দৃঢ়তা। “ওই দিন,”
সে বলতে শুরু করে—
“টিউশন করে বাসায় ফিরতে ফিরতে দেরি হয়ে গেছিল। তখন কোনো গাড়ি পায়নি। আর তখন কিছু বখাটে ছেলে আমার পিছু করছিল। আমি প্রাণপণ চেষ্টা করছিলাম বাঁচার, তখন হঠাৎ করে একটা গাড়ির সামনে পড়ি। আর সেই সময়, একটা লোক আমার জন্য অনেক হেল্প করে। দোয়া করি, ওই লোকটার ভালো হয়।”
নীলিমা এবং তিয়াশা এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। তাদের চোখে ছিল বিস্ময়, কৌতূহ্য আর সহানুভূতির মিশ্রণ।
সেই মুহূর্তে রিহান চলে আসে। তানভীকা নীরব থাকে। তার চোখে এমন এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি—কিছুটা লজ্জা, কিছুটা নিরাপত্তার খোঁজ। কিন্তু সে কোনও কথাই বলে না, চুপচাপ বাইকে উঠে বসে যায়। রিহানের চোখে এক রকমের অব্যক্ত প্রতিশ্রুতি, কিছু বোঝার চেষ্টা এবং কিছুটা উদ্দীপনা।
এরপর রিহান আসে তারপর তানভীকা চলে যায়।
বাইকে বসে তানভীকা মনে মনে ভাবছিল—কিভাবে হঠাৎ সবকিছু যেন অতীতের মতো ফিরে এসেছে। সেই গলির ধুলো, বাতাসের গন্ধ, মানুষের ভিড়—সবকিছু যেন তার মনের ভিতর দিয়ে আবার ছুটে গেছে। তার বুকের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা, ভয় আর উত্তেজনা মিশে গেছে।
রিহান চালু করলো বাইক। চারপাশে পাতার ঝাপটানো, রাস্তায় হালকা আলো, দূর থেকে আসা হর্নের শব্দ—সবকিছু মিশে যেন একটি জীবন্ত সিনেমার দৃশ্য। তানভীকা চোখ বন্ধ করে বসে থাকে, মনে মনে প্রার্থনা করে—কেউ যেন তাকে আর কখনো বিপদে ফেলে না।
রাস্তায় বাইক এগোচ্ছে।
দূরে একটি ছোট পার্ক, যেখানে কিছু ছেলে মেয়ে খেলা করছে। বাতাসের সঙ্গে তানভীকার চুল লাফাচ্ছে, তার মাথায় ভেসে আসে সেই রাতে যা হয়েছে—কীভাবে অচেনা লোক তাকে সাহায্য করেছে, তার হাত ধরে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিয়েছে। সেই মুহূর্তের ঋণ, অনিশ্চয়তা এবং কৃতজ্ঞতা—সবই এখন তার চোখে জল আনে।
রিহান বুঝতে পারে, তানভীকার মন কেমন অস্থির। সে চুপচাপ বাইকের গতিতে এগোচ্ছে, কিন্তু মনে মনে পরিকল্পনা করছে—কিভাবে এই পরিস্থিতি তার সুবিধায় ব্যবহার করা যায়। রিহানের মনস্তত্ত্ব এখন একটু ভিন্ন। সে জানে, অতীতের ভুলগুলো তাকে আর বেশি সময় দেবে না। তার চোখে অদ্ভুত এক উদ্দীপনা।
বাইকের রোড জুড়ে বাতাসে হালকা শীতলতা, দূরে দূরে দোকানপাটের আলো, রাস্তায় হেঁটে যাওয়া মানুষ—সবকিছু যেন একটি বড় নাটকের অংশ। তানভীকা চোখ বন্ধ করে সেই অনুভূতি শোষণ করছে। মনে হচ্ছে, সে একা নয়, কিন্তু একই সঙ্গে নিজের ভয়ের সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে।
তানভীকার মাথায় মনে হচ্ছে—কীভাবে সেই অচেনা লোক তার জীবন বাঁচিয়েছিল। সে জানে না, সেই মানুষ কে ছিল, কিন্তু তার মন মনে মনে প্রার্থনা করছে—দেখা হবে আবার কি না, সেই মানুষটির সঙ্গে।
রিহান বাইক ধীরে চালাচ্ছে। সে জানে, তানভীকা এখন খুব সংবেদনশীল অবস্থায় আছে। সে কোনও কথা বলছে না, কিন্তু তার চোখ সবকিছু বলে দিচ্ছে। তানভীকার চোখে হতাশা, কৃতজ্ঞতা, ভয়, এবং কৌতূহলের মিশ্রণ।
রাস্তায় হঠাৎ একটি মোড়। রিহান বাইক মনিটর করে, ধীরে ধীরে মোড় নেয়। চারপাশে কোনও গাড়ি নেই, শুধু দূরে একটি হালকা আলো। তানভীকা চোখ খুলে দেখে, দূরে কিছু মানুষ হেঁটে যাচ্ছে। সে মনে মনে এক ধরনের নিরাপত্তা অনুভব করে, কিন্তু এখনও ভয় আছে।
রিহান হঠাৎ চুপচাপ বলে,
“তুই ভয় পাস না। আমি আছি।”
তার কণ্ঠে এমন একটি নিশ্চয়তা,
যা তানভীকার মনে এক অদ্ভুত শান্তি এনে দেয়।
তানভীকা হালকা নিঃশ্বাস নেয়। মনে মনে সে ভাবছে—কতটা অদ্ভুত জীবন। কীভাবে মানুষ কখনো বিপদে থাকে, কখনো নিরাপদ। কিন্তু এই মুহূর্তে সে শুধুই বাইকের রোড, বাতাসের ঝাপটানো, এবং রিহানের উপস্থিতিতে মন ভরে যায়।
রিহান বাইক চালিয়ে আনে এক শান্ত রাস্তায়, যেখানে দুজনেই থেমে দাঁড়ায়। তানভীকা এখনও নীরব। রিহান চুপচাপ বাইকের হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। বাতাসের সঙ্গে তাদের চুল হালকা উড়ছে, চোখে অদ্ভুত এক দৃঢ়তা।
তানভীকা হঠাৎ হেসে বলে,
“ধন্যবাদ…ভাইয়া।
” কিন্তু কণ্ঠে এখনও একটা ভয় আছে, যা পুরোপুরি মুছে যায়নি।
রিহান হালকা হেসে বলে,
“কেউ যদি তোর খারাপ কিছু করতে চায় আমি ফাহিম ভাই আছি না আমরা দেখবো।”
রিহান রিদওয়ানের দেশে আসার কথাটা সম্পূর্ণ এরিয়ে যায়।
এভাবেই বাইকের মধ্যে চুপচাপ দুজন, নিজেদের চিন্তায়, অতীতের স্মৃতিতে এবং ভয়ের সঙ্গে লড়াই করতে করতে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। বাতাসে হালকা ঠাণ্ডা, চারপাশে অন্ধকার, এবং দূরে দূরে হালকা আলো—সব মিলিয়ে একটি জীবন্ত ছবির মতো।
তানভীকা জানেনা সামনে কি হতে যাচ্ছে…….