গল্প:কে ছিলো সে (০১)

সালটা ১৯৯৬৷
চৈত্রের প্রখর রোদে মাঠাঘাট ফেটে চৌচির। প্রচন্ড গরমে অস্থির জনজীবন। একটুখানি মেঘের আশায় সবাই যেনো চেয়ে আছে আকাশের দিকে। দুপুর ঘনিয়ে বিকেল৷ গরমে সকলেরই হাঁসফাঁস অবস্থা। গোধূলীর পূর্বক্ষণ থেকে উত্তর পশ্চিম কোণে মেঘ জমতে লাগলো। চারদিকের পরিবেশ নিস্তব্ধ হয়ে রইলো, গাছের পাতাটাও নড়ছে না। নির্বাক প্রাণীগুলোর অন্তরটা যেনো প্রহর গুণছে কোনো এক ভয়াল সময়ের। সন্ধ্যার কিছূ পূর্বে ঘনঘন বিদ্যুৎ চমকাতে চমকাতে চোখ রাঙালো কাল বৈশাখী। গ্রামের সবাই দৌড়ালো মাঠে, কেউ গরু গুলোকে ঘরে তুলতে আবার কেউ সোনার ফসল রোদে শুকাতে দিয়েছিলো সেগুলো ঘরে তুলতে। কেউ কেউ কাপড় শুকাতে দিয়েছিলো রোদে, মেঘের আভাস পেয়ে সেগুলো গুছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। সন্ধ্যার কিছু পূর্বেই শুরু হলো প্রচন্ড ঝড় আর বৃষ্টিপাত। কয়েকদিনের ভ্যাপসা গরম এক মূহূর্তেই যেনো কেটে গেছে। মিনিট পাঁচেকের তান্ডবের পর শুরু হলো তীব্র বৃষ্টি। ইতিমধ্যে ঝড়ের তান্ডবে বিদ্যুৎ চলে গেছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সাথে অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে যেনো উজানতরী গ্রাম। গ্রামের শেষ প্রান্তে আঁধাপাকা ঘরটি হাতেম আলীর। পরিবার বলতে ষাটোর্ধ হাতেম আলী, তার তেইশ বছরের মেয়ে রুবিনা আর আটাশ বছরের ছেলে জসীম উদ্দীন। হাতেম আলীর স্ত্রী মারা গেছেন দুইমাস আগে। রাতের বেলা কী দেখে যেনো বড্ড ভয় পেয়েছিলেন তিনি তারপর সেই যে জ্বর উঠলো আর সারলো না। একেবারে কবর পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেলো। স্ত্রীকে বড্ড ভালোবাসতেন হাতেম আলী। সে কারণে দ্বিতীয় বিয়ে করবেন না বলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
বুড়ো হাতেম আলী আঁটসাঁট হয়ে শুয়ে কাঁথার নিচে গা ঢেকে শুয়ে আছে বিছানায়৷ বয়স প্রায় পঁচাত্তর। রুগ্ন শরীর। ঝড়ো হাওয়ার শীতল বাতাসে তার কাঁশি বেড়ে গিয়েছে। শুয়ে শুয়ে অবিরত তিনি খকখক করে কাঁশছেন। তার বিছানার পাশেই একটা ছোট্ট টেবিল। তারউপর একটা কেরোসিনের কূপি টিমটিম করে জ্বলছে৷ বাতাসের আঘাতে কখনো সেটা নিভুনিভু করছে পরক্ষণে দপ করে জ্বলে উঠছে। আগুনের সেই প্রজ্বলিত শিখার দিকে একদৃষ্টি তাকিয়ে আছেন হাতেম আলী। হঠাৎ দমকা বাতাসে নিভে গেলো কূপিটি। অন্ধকারে ছেয়ে গেলো পুরো ঘর। বিছানায় উঠে বসলো হাতেম আলী। খক্ খক্ করে কাশতে কাশতে বলল___”” রুবিনা, ওই রুবিনা, কই যাইয়া মরলি, হুনতাছস?””
রুবিনা হচ্ছে হাতেম আলীর মেয়ে। সে পাশের রুমেই ছিলো। টিনের চালে ঝমঝম বৃষ্টির শব্দে হাতেম আলীর ক্ষীণ আওয়াজ একেবারেই বিলিন হয়ে গেলো। হাতেম আলী বিছানা থেকে নেমে পাশের রুমে গেলো। রুবিনাকে ধমকের সুরে বলল__”” কানে কী ঠাডা পরছে তোর,, খক্ খক্, একটু কাঁশলো হাতেম আলী৷ তারপর আবার বলল__”” সেই কহন থাইকা ডাকতাছি, হুনতাছস না?””
রুবিনা তাকালো বাবার দিকে, বলল___”” টিনের চালে বৃষ্টি পড়তাছে, কেমন শব্দ দেখবার পারতেছো তো, শুনমু কেমনে? কী লাগবো কও?””
___”” আমার রুমে কূপিটা নিইব্বা গেছে, ওইডা একটু জ্বালাইয়া দে।””
রুবিনা বিছানা থেকে নেমে একটি টর্চ নিয়ে রান্নাঘর থেকে দিয়াশলাই এনে বাবার রুমে গিয়ে কূপিটা জ্বালিয়ে দিলো। হাতেম আলী আবারো বিছানা উঠে কাঁথার নিচে গাঁ ঢাকতে ঢাকতে বলল__”” উহু হু, এতো শীত, এই ঝড় বাদলের মধ্যে পোলাডা কই আছে কে জানে?
হাতেম আলীর একমাত্র ছেলে জসীম উদ্দীন। উজানতরী গ্রাম থেকে দশ কিলোমিটার দূরে সোনাইমুড়ি বাজারের কাছে একটি বেকারিতে ম্যানেজার পদে সে চাকুরী করে। উজানতরী গ্রামে মাগরিবের ঝড় শুরু হলেও সোনাইমুড়িতে তার আভাসমাত্র ছিলো না। রাত আটটার দিকে সোনাইমুড়ির আকাশ জানান দিলো কালবৈশাখি ঝড়ের। চারদিকে বিকট শব্দে একেরপর এক বজ্রপাত হতে লাগলো। জসীম তখন মাত্র অফিসের কাজ শেষ করে বের হয়েছে। ঝড়ের আভাস পেয়ে সে অফিসের পার্কিং স্পেসে বসে রইলো। দমকা বাতাসের পর শুরু হলো বৃষ্টি৷ আকাশ যখন পরিষ্কার হয়ে বৃষ্টি ছাড়লো তখন রাত দশটা। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, দূরে শোনা যাচ্ছে মেঘের গর্জন। জসীম রওয়ানা হলো বাড়ির দিকে। ঝড়ের কারণে রাস্তাঘাট একদম নিরব৷ জসীম রাস্তায় দাঁড়িয়ে না থেকে বাড়ির পথ ধরে হাঁটতে লাগলো। ঘণ্টাখানেক পর একটি সিএনজি এসে বলল__”” ভাইজান উজানতরী যাইবেন? গেলে ওঠেন।””
জসীম সিএনজি দেখতেই দ্রুত উঠে পড়লো সেটাতে। সিএনজি চালক গাড়ি চালাতে শুরু করলো। ঝিরঝিরে মৃদু সমীরণে জসীমের শরীর ঠান্ডায় কেঁপে কেঁপে উঠছে। সিএনজি চলছে আপন গতিতে।
.
রাত সাড়ে এগারোটা। বুড়ো হাতেম আলী শুয়ে আছে বিছানায়৷ দীর্ঘক্ষণ যাবৎ খক্ খক্ করে কাঁশতেছেন তিনি। দমকা বাতাসের আঘাতে দরজাটা হঠাৎ কেঁপে উঠলো। হাতেম আলী মেয়েকে ডাক দিলেন___”” রুবিনা, দেখতো মনে হয় জসীম আইছে।””
পাশের রুম থেকে রুবিনা জবাব দেয়___”” ভাইয়া এখনো আসে নাই। বাতাসের ধাক্কায় দরজা কাঁপতাছে। তুমি ঘুমাও, ভাই আইলে আমি দরজা খুইলা দিবো নে।””
চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকে হাতেম আলী। একমাত্র ছেলে তার৷ এই ঝড় বাদলের দিনে কোথায় আছে কী করছে সেটা ভেবে হাতেম আলীর ঘুম আসছে না

 

Leave a Comment