
“মামা, টিএসসি যাবেন?”
“যাব, বিশ টাকা ভাড়া।”
রিকশাওয়ালা উদাস ভঙ্গিতে তাকিয়ে বলল।
“দশ টাকা না এখান থেকে?”
রিকশাওয়ালার মুখে এবার বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠল।
রূপন্তি পাশ থেকে ওকে কনুই দিয়ে গুঁতো মেরে বলল,
“বাদ দে তো, বিনীতা! ওঠ তাড়াতাড়ি।”
বিনীতা বিরস মুখে ব্যাগের ফিতে টেনে রিকশায় উঠে বসলো, “সবাই এত বেশি ভাড়া চায়! শহরটাই দিন দিন অসহ্য হয়ে যাচ্ছে!”
রূপন্তি হাসতে হাসতে বলল, “তোর এই দর কষাকষির স্বভাবটা আর গেল না, বিনু!”
বিনীতা চোখ ছোট করে তাকাল ওর দিকে, “স্বভাব যাবে কীভাবে? যেখানে যা খুশি দাম হাঁকে, একটু দরদাম না করলে চলে!”
বিনীতার গলায় অভিমান, যেন এই পুরো শহর শুধু ওকে ঠকাতে চায়!
কথা বলতে বলতে ওদের রিকশা বাংলা একাডেমির সামনের রাস্তাটা পার হয়ে টিএসসির দিকে চলছে। বাংলা একাডেমিতে একটা অনুষ্ঠান ছিল আজ; বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের। ঢাকার স্কুলগুলোতে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়া কর্মসূচির সেরা পাঠকদের পুরস্কার বিতরণের অনুষ্ঠান। বিনীতা-রূপন্তি ইউনিভার্সিটি ক্লাসের পাশাপাশি পার্টটাইম হিসেবে প্রতি সপ্তাহে দুটো স্কুলে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই দেয়া-নেয়ার কাজটা করে।
অনুষ্ঠান উপলক্ষে আজ ওরা দুজনেই শাড়ি পড়েছে। বিনীতা পড়েছে হালকা বেগুনি রঙের একটা জামদানি; রুপন্তি পড়েছে আসমানী রঙের। একই রকম ডিজাইনের সাদা ব্লাউজ দুজনের; হাতে সাদা কাঁচের চুড়ি। বিনীতার কপালে ছোট্ট টিপ, প্রায় কোমর ছুঁতে যাওয়া চুলগুলো বেনী করে রাখা আর রূপন্তি চুলগুলো বাঁধা খোঁপায়।
রিকশা থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে ওরা টং দোকানের দিকে এগোলো। দুটো মালাই চা অর্ডার করে কাঠের বেঞ্চিতে বসলো দুজন।
“আজকের প্রোগ্রামটা শেষ হতে একটু বেশি দেরি হয়ে গেছে, না?”
“হ্যাঁ! সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে…”
“চা চলে এসেছে— নে। তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে।”
শেষ-হেমন্তের বেলা তখন প্রায় শেষের পথে। গোধূলির আলো ছড়িয়ে পড়েছে টিএসসির ইটের দেয়ালে, শুকনো পাতায়, টং দোকানের বেঞ্চের পুরনো কাঠে। হালকা শীতের বাতাসে উড়ে বেড়াচ্ছে একটুকরো বিষাদমাখা সোনালি আলো। গোধূলির আলো-ছায়ায় বেগুনি রঙের শাড়ি পরিহিত কাজল চোখের খুবই সাধারণ মেয়েটি; তাকে মুগ্ধ চোখে দেখছে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা এক মানব, সেদিকে তার কোন খেয়ালই নেই। সে ব্যস্ত গরম চায়ে ফুঁ দিতে।
টিএসসির চায়ের দোকানে এমন সন্ধ্যা সে মানব কতবার দেখেছে! ঘন কালো চা, টং দোকানের কাঠের বেঞ্চ, পাশের টেবিলে বিকেল গড়িয়ে রাত নেমে আসলেও তর্কে ব্যস্ত দু-তিনজন, শীত শীত বাতাসের সাথে ভেসে আসা পুরনো গানের সুর— সবই তার বড্ড চেনা।
কিন্তু আজ সন্ধ্যাটার মাঝে যেন অদ্ভুত কিছু একটা আছে।
বেগুনি শাড়ি পরিহিত মেয়েটা দুই হাতে চায়ের কাপ ধরে আছে। ধোঁয়া উঠছে কাপ থেকে, সে বারবার ফুঁ দিয়ে সরিয়ে নিচ্ছে ধোঁয়াগুলো। চায়ের কাপে ফুঁ দিতে দিতেই বান্ধবীর সঙ্গে কী একটা নিয়ে হাসল, ঠোঁটের কোণে চঞ্চল একটা ভঙ্গি ফুটে উঠল, আবার মুহূর্তের মধ্যেই মিলিয়ে গেল তা।
কি সাধারণ একটা দৃশ্য; অথচ ঠিক যেন ততটাই অসাধারণ ঠেকলো সেই মানবের নিকট!
সন্ধ্যার আলো এসে মিশেছে মায়াবী মুখটায়, চুলগুলো বিনুনিতে বাঁধা, কপালে ছোট্ট একটা টিপ, চোখের কাজল সন্ধ্যার আলোয় আরও গাঢ় দেখাচ্ছে, আর ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা ওই মিষ্টি হাসিটা— কেন এত সাধারণ কিছুও হঠাৎ করে এত অসাধারণ লাগছে?
এক জোড়া চোখ তাকিয়ে আছে নিবিষ্টভাবে। বুঝতে
পারছে— তাকিয়ে থাকাটা ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু দৃষ্টি সরিয়েও নিতে পারছে না। মেয়েটির কোনো হুঁশ নেই— সে তো গল্পে মশগুল বান্ধবীর সাথে।
“সাফিন, চল উঠি এবার।”
অর্ণব চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল। সন্ধ্যার আকাশ গাঢ় হয়ে আসছে, শীতের মৃদুমন্দ বাতাস বইতে শুরু করেছে চারপাশে।
“দোস্ত চল আরেক কাপ চা খাই।”
সাফিন অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বলল কথাটা, ওর চোখ তখন অন্য একদিকে আটকে আছে।
অর্ণব ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। ইতিমধ্যে দুজনে দু’কাপ করে চা শেষ করে ফেলেছে।
সাফিন অর্ণবের সন্দেহজনক দৃষ্টি দেখে ভড়কালো।ক্যাবলাকান্ত মার্কা হাসি দিয়ে বলল, “না থাক, চল যাই!”
অর্ণবের ভ্রু এবার আরো কুচকে গেল, “ব্যাপার কী তোর, বলতো? কোথাও গন্ডগোল আছে মনে হচ্ছে?”
“এহেম….! কই না তো।”
সাফিন গলা খাঁকারি দিল, কিন্তু ঠোঁটের কোণের হাসিটা ঠিক লুকাতে পারল না।
অর্ণব এবার দুহাত পকেটে ঢুকিয়ে, কপালে ভাঁজ ফেলে একটু ঝুঁকে তাকাল ওর দিকে, “বল বল। বলে ফেল। পরে তো সেই বলবিই।”
সাফিন আবার কাশি দিয়ে গলা পরিষ্কার করল, তারপর খুব ধীরে মাথাটা একটু কাত করল একদিকে।
“ওইদিকে দেখ, আকাশী রঙের শাড়ি পড়েছে যে মেয়েটা, মেয়েটাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন এক টুকরো আকাশ।”
অর্ণব চোখ সরিয়ে তাকাল সেদিকে, তারপর নিঃশব্দে মাথা ঝাঁকাল, “আচ্ছা, এই ব্যাপার! বুঝলাম…”
তারপর খুব স্বাভাবিকভাবে বলল, “তো কালকে যে একটা ভাইভা আছে, সে কথা মনে আছে তো?”
সাফিনের মুখ একেবারে ভোঁতা হয়ে গেল হঠাৎ করেই,
“কিসের মধ্যে কি রে ভাই! উফ্, আন-রোমান্টিক কোথাকার!”
অর্ণবের মুখে কোনো ভাবান্তর হলো না, হাতদুটো পকেটে গুঁজে ও তাকিয়ে রইল সাফিনের দিকে।
সাফিন এবার ধৈর্য হারিয়ে মুখটা কাঁদো কাঁদো করে বলল, “কোথায় তুই মেয়েটার সাথে কথা বলার একটা ব্যবস্থা করে দিবি, তা না, তুমি আছো তোমার ভাইভা নিয়ে। ধ্যাত!!”
অর্ণব হেসে ওর কাঁধে একটা চাপড় দিয়ে বলল, “আকাশ-বাতাসের সাথে কথা পরে বলিস। চল এখন। একগাদা পড়া বাকি।”
সাফিন অসহায় মুখে তার ভালোবাসার ‘এক টুকরো আকাশের’ দিকে শেষবারের মতো তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “এমন বন্ধু কে চায়! হাহ্!”
অর্ণব নির্লিপ্ত মুখে বিল মিটিয়ে হাঁটা ধরল সামনের দিকে।
চায়ের বিল মিটিয়ে অর্ণব আর সাফিন যখন বের হচ্ছে, বিনীতারাও তখন বের হচ্ছে। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। সন্ধ্যার আগে হলে ফিরতে হবে। কিন্তু আশেপাশে কোন রিকশাই দেখা যাচ্ছে না। দূরে একটা রিকশা দেখতে পেয়ে বিনীতা হাতের ইশারায় ডাকল; ঠিক তখনই অর্ণবও ওই একই রিকশাকে ডেকেছে। রিকশা কাছে আসতেই রিকশাওয়ালা বলল,
“দুজনেই তো ডাকলেন, এখন কে যাবেন বলেন?”
বিনীতারা দেখল ছেলেদুটোকে। ওদের থেকে কিছুটা দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে। কিছু না বলে ওরা সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করল। তখনই পেছন থেকে শুনতে পেল একটা রাশভারী কন্ঠস্বর,
“এই যে মিস, রিকশাটায় বরং আপনারাই চলে যান। এরপর আর রিকশা পাবেন না বোধহয়।”
তারপর রিক্সাওয়ালার উদ্দেশ্যে বললো,
“মামা, ওনাদেরই নিয়ে যান।”
বিনীতা পিছন ফিরে দেখল যে ছেলেটা রিকশা ডেকেছিল সেই ছেলেটাই বলছে। রিকশা ততক্ষণে ওদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
“সুফিয়া কামাল হল যাব।”
শাড়ি সামলে রিকশায় উঠে বসলো ওরা। রিকশা চলতে শুরু করল কবি সুফিয়া কামাল হলের উদ্দেশ্যে।
“অর্ণব, ওরা মনে হয় সুফিয়া কামাল হলে থাকে।” সাফিনের চোখে একটুখানি আশার আলো ফুটল যেন। তবে পরমুহূর্তেই ধুলিস্যাৎ হয়ে গেল তা!
অর্ণব ওর কথায় একটুও মনোযোগ না দিয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে বললো, “হবে হয়তো। চল যাই। অনেক পড়া বাকি।”
To be continu……
বি:দ্র: আমার লেখা প্রথম গল্প এটা। প্রথম পর্ব কেমন লেগেছে কমেন্টে জানানোর অনুরোধ রইল! 💜