গল্প:রূপকথা (০৫)

লেখক:নাদিয়া ফেরদৌসী

পর্বঃ০৫

ফুরফুরে ভোর। আজ আকাশের মেঘের দেখা নেই।একটু পরেই ঝলমলিয়ে রোদ উঁকি দিবে ধরণীতে। মেঘ জগিং এ বের হয়েছে। মেঘ হাত কাটা কালো ট্রি শার্ট পরেছে সাথে কালো টাওজার। সকালের স্নিগ্ধ, সতেজ বাতাস নাসিকা দিয়ে প্রবেশ করে মনকে শীতলতায় আবেশীত করছে। সকাল যত সুন্দর আর আকর্ষণীয় হউক আজ মেঘের তা দেখার ধ্যান নেই। মাথা জ্যাম ধরে যাচ্ছে তার ভীনদেশী উলুক্কটার কথা ভাবতে ভাবতে। তানিশার সাথে তার যে একটা মাখোমাখো সম্পর্ক তা সে অনুভব করতে পেরেছে। আর এটাই তার মগজে কাটার মতো বিঁধে আছে। সে কিছুতেই এটা মেনে নিতে পারছে না।সমবয়সী, একই ক্লাসে পড়ছে মানা যায়। বন্ধু হতেই পারে। ভীনদেশে একা একা তো আর চলতে পারতো না। বন্ধুবান্ধব লাগবেই। কিন্তু এই শালাকে কেন বন্ধু বানাতে হবে? ‎ ‎মেঘ মাথা দুদিকে ঝাঁকিয়ে বিষয়টা ঝেরে ফেললো।দৌড়ানোতেই মনোযোগ দিলো।ওই উল্লুকটা বাংলাদেশে থাকা অবস্থায়ই বুঝিয়ে দিতে হবে। তার দেশি গার্লের দিকে হাত বাড়ালে হাত কেটে দিবে সে। মেঘ বিষয়টা ভেবে দুঠোঁট গোল করে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো।কিন্তু নিয়তি হয়ত তাকে স্থবির থাকতে দিবেই না। মেঘ চোখ তুলে রাস্তায় ধ্যান দিতেই দেখতে পেলো নাহিদ মর্তুজার সঙ্গে জোহানও জগিং করতে বের হয়েছে। নাহিদ সাহেবের সাথে যে জোহান বেশ ভাব জমিয়েছে তা বুঝা যাচ্ছে দুজনের হাসোজ্জল মুখের পানে তাকিয়ে। যেন দুজন পূর্বপরিচিত মানুষের পুনরায় দেখা হয়েছে। মেঘের এই সক্কাল সক্কাল এমন দৃশ্য দেখে মুখ তেতো হয়ে উঠলো।মেঘ দৌড়ানো থামিয়ে খানিকক্ষন দাঁড়িয়ে মানুষ দুটোকে দেখে গেল। চালাক শিয়াল! আগেই মুরগির বাপকে পটাচ্ছে।মেঘ জিব্হা দিয়ে গালে ঠেস দিয়ে কি যেন ভাবলো। তারপর নাহিদ মর্তুজা পনে এগিয়ে গেল।

‎-” গুড মর্নিং আংকেল। “

‎-” গুড মর্নিং মেঘ।কেমন আছো বাবা? “

‎মেঘ সৌজন্যে বাচক হেসে বলল -” জ্বি ভালো আছি আংকেল ।আপনি কেমন আছেন। “

-“ভালো। তাই তো জাহানকে নিয়ে একটু বের হলাম।”

‎জোহানও পাশ থেকে বলে উঠলো -” গুড মর্নিং ক্লাউড। “

‎মেঘ ক্ষোভ গিলে হেসে বলল -” শুভ সকাল । ডা.জোহান তুমি কি আশপাশটা ঘুরে দেখেছো? তুমি চাইলে আমি তোমাকে ঘুরিয়ে দেখাতে পারি। “

‎নাহিদ মর্তুজা জোহানকে দিকে তাকিয়ে বললেন-” যাবে? মেঘের সাথে যেতে পারো। সে খুব ভালো একজন সঙ্গী হবে। “

‎-” অফ কোর্স, হোয়াই নট? আই’ম লাকি টু বি গোইং আউট উইথ ক্লাউড।”

‎জোহানকে এতো তেল মারতে দেখা মেঘ এক ভ্রু উঁচালো।এই বান্দার ধান্দা কি বুঝতে পারছে না।নাহিদ মর্তুজা বললেন -” ওকে। তাহলে তুমি মেঘের সাথে ঘুরে আসো। আমি যাই কেমন? “
‎জোহান মাথা ঝাঁকাল। নাহিদ মর্তুজা তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। জোহান নাহিদ মর্তুজার যাওয়ার পথ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে মেঘের দিকে তাকিয়ে ভরকে গেল।মেঘ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। -“হোয়াই আর ইউ লুকিং অ্যাট মি লাইক দ্যাট? “

‎মেঘ বাংলাতেই বললো -” একটা ভন্ড শকুন দেখি। ভন্ডরে কেমন করে সাইজ করবো ভাবছি। ভন্ডটাকে আবার এমন ভবে সাইজ করতে হবে যাতে সাপও মরে লাঠিও না ভাঙ্গে।”

‎জোহান কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল -” কি বলছো এসব। পরিষ্কার করে আমাকে বুঝিয়ে বলো। “

‎মেঘ জবাব দিলো না। নির্বিকার চিত্তে আবার দৌড়াতে শুরু করল। জোহান হতবাক নয়নে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মেঘের পিছনে দৌড়াতে শুরু করল। মেঘ তার গতি বাড়িয়ে দিলো। জোহান বাকা হেসে নিজেও গতি বাড়ালো। রাস্তার মানুষজন অবাক নয়নে দুই সুদর্শন যুবককে এভাবে দৌড়াতে দেখলো ঘাড় বাকিয়ে। মেঘ খানিকক্ষণ পরে গতি কমালো। বুঝতে পারলো বিপরীত পক্ষের খেলোয়াড়ও কম যায় না। জোহান নিজের গতি কমিয়ে বলল-” ক্লাউড, তুমি বললে আমাকে এলাকা ঘুরে দেখাবে।.. “

‎মেঘ ভ্রুক্ষেপহীন ভাবে জবাব দিলো -“আমি তোমাকে আমার এলাকাই নিয়ে দৌড়াছি।এখন তুমি চোখ মেলে না দেখলে আমার কি করার। “

‎-” সো রুড। “

‎-“কথাটা নতুন নয়। আমি এমনই। বিশেষ কারো প্রতি আমার ব্যবহার কোমল থাকে, না হলে আসল আমিটা এটাই। “

‎জোহান মৃদু হেসে বলল -” তবুও তুমি কিউট। “

‎একথা শুনে মেঘ কপাল কুঁচকে তীর্যক চাহনিতে দেখলো জোহানকে। জোহান ওর দিকে তাকিয়ে দুষ্টু হাসছে। মেঘের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। মেঘের চোখে কিছু ভাসতেই সে চোখ সরিয়ে নিলো। একে উচিৎ শিক্ষা দিবে। দৌঁড়ানোর গতি আবার বাড়ালো।তথাকথিত ভাবে জোহানও বাড়ালো তার দৌড়ানোর গতি। তা দেখে মেঘে বাঁকা হাসলো। কিছুটা পথ পাড়ি দেওয়ার পর মেঘ ঠোঁট গোল করে শিস বাজালো। জোহান মেঘের মুখের দিকে থাকাতে গিয়ে রাস্তার থেকে চোখ সরিয়ে নিলো।আর এই সুযোগটাই মেঘ কাজে লাগালো। মৃদু ভাবে জোহানের পায়ে উষ্টা দিলো। জোহান হুমড়ি খেয়ে পরলো পাশের ডুবায়।অসচেতন থাকার ফলে পচা ডোবার পানি নাক মুখ দিয়ে ভুরভুর করে ঢুকে গেল জোহানের। মেঘ জিব্হা দিয়ে গালে ঠেস দিয়ে তৃপ্তি নিয়ে তা দেখলো।জোহান হাঁপাতে হাঁপতে তার কাছে সাহায্য চাইল।মেঘ তাতে পৈশাচিক আন্দাজ অনুভব করলো। শিস বাজিয়ে এগিয়ে গিয়ে ডোবার পার থেকে জোহানকে ধরল।জোহানকে ধরে তুলতে তুলতে চিবিয়ে চিবিয়ে গুন গুন করে গাইল।

সব সখিরে পার করিতে নেব আনা আনা
তোমার বেলায় নেব সখি তোমার কানের সোনা
সখি গো, আমি প্রেমের ঘাটের মাঝি
তোমার কাছে পয়সা নিব না

‎‎মেঘ জোহানকে টেনে পাড়ে এনে বসালো। জোহান আকস্মিক এমন ঘটনায় ভরকে গিয়ে সাতার ভুলে বসে পানি টানি খেয়ে একাকার অবস্থা করেছে। বসে বসে খানিকক্ষণ হাপালো। মেঘ মুখ দিয়ে আফসোস সূচক শব্দ করলো।চিন্তিত হওয়ার বদলে ভাবলেশহীন ভাবে শুধালো -” আর ইউ অলরাইট ? “

‎জোহান কিছুটা স্থির হয়েছে।ট্রমা থেকে বের এসেছে।মেঘের কথা শুনে মিষ্টি করে হাসলো। মেঘের কপাল কুঁচকে গেল তাতে।বিরবিরয়ে গালিও দিলো -” শালা হাদার হাদা। ” ‎ ‎জোহান হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো -” আমাকে তুলে ধরো। ” ‎ ‎মেঘ কি আর করবে মানবতার খাতিরে তুলতে হলো।জোহান নিজের প্যান্টের পকেট থেকে ভেজা ফোনটা বের করল। মেঘ তা দেখে তড়িঘড়ি করে বলল -” কাউকে কল দিয়ো না।আমি তোমায় পৌঁছে দিচ্ছি।” ‎ ‎জোহান নিজের ফোনটা উল্টেপাল্ট দেখে ভ্যাবলার মতো হেসে বলল -” আমি আমার ফোন চেক করছিলাম মি.ক্লাউড।” ‎ ‎মেঘ জোহানের হাসি দেখে ভিতরে ভিতরে রুষ্ট হলো। জোহানকে রেখেই মর্তুজা বাড়ি দিকে হানা দিলো। জোহান পিছন থেকে তা দেখে দৌড়ে মেঘের সঙ্গ নিলো।মেঘ ত্যাছড়া চোখে তা দেখে আর কিছু বললো না। ‎

* ‎ সকালের স্নিগ্ধ পরিবেশে ফাইয়াজ ছেলেকে কোলে নিয়ে হাটতে বের হয়েছে। কাজের ব্যাস্ততায় ছেলেটাকে সময় দিতে পারছে না সে। গার্ডেনের এরিয়ায় গিয়ে দেখলো নুরুল মর্তুজা একাই একাই হাঁটছেন। ফাইয়াজ বাবার দিকে এগিয়ে গেল।নুরুল মর্তুজা ছেলে নাতিকে দেখে খুশি হলেন। আইয়াজকে দেখে আহ্লাদী হয়ে বললেন -” আরে আমার দাদুটা এতো সকাল উঠে গেল?দাদুর সাথে হাটবে তুমি? ” ‎ ‎আইয়াজ বাবার কোলে থেকে নাক মুখ কুঁচকে দাদার পানে তাকিয়ে আবার বাবার কাঁধে মাথাটা হেলিয়ে দিলো।ঘুমের জন্য দুই চোখ মেলে তাকাতে পারছে না সে। ফাইয়াজ বললো-” আমার বাবাটার এখন ঘুই ভাঙেনি আব্বু। ” ‎ ‎নুরুল মর্তুজা অসন্তোষ প্রকাশ করে বললেন -” তাহলে এতো সকাল তুলতে গেলে কেন? বাচ্চা মানুষ আরেকটু ঘুমাতো।” ‎ ‎-” ছেলেটাকে সময় দিতে পারছি না। তাই তুলে নিয়ে এসেছি। কাঁধেই ঘুমাক। ” ‎ ‎-“ওহহ।তুমি তো আবার আমার ছেলে হলেও আমার মতো হওনি। হয়েছো ওই নাজমুলের মতো। সব কাজ কাঁধে নিয়ে নাচো।” ‎ ‎ফাইয়াজ বাবার কথা শুনে মুচকি হাসলো। পরিবারে বয়োজ্যেষ্ঠ হিসেবে নুরুল মর্তুজা একটু হেলাফেলার মানুষ।নুরুল মর্তুজা বড় হলেও পরিবারে হাল শক্ত হাতে নাজমুল মর্তুজা ধরে রেখেছিলেন।বাড়ির সবাই নুরুল মর্তুজাকে ততটা ভয় পায় না যতটা নাজমুল মর্তুজা আর নাহিদ মর্তুজাকে পায়। নুরুল মর্তুজা সবসময়েরই নমনীয় চরিত্রের মানুষ । ‎ ‎

হঠাৎ দারোয়ানের হইচই শুনে ওরা দুজন গেইটের দিকে তাকাল।ছোট গেইট দিয়ে মেঘকে বাদশাহী ভঙ্গিতে ঢুকতে দেখা গেলো। তার কিঞ্চিৎ পরেই ভেজা গায়ে জুবুথুবু অবস্থায় জোহান প্রবেশ করলো বাড়িতে।ফাইয়াজ বললো -” জোহানের আবার কি হলো এই সক্কাল সক্কাল? ” ‎ ‎ নুরুল মর্তুজা হায় হায় করে এগিয়ে গেলেন। সাথে ফাইয়াজও ছেলেকে নিয়ে এগিয়ে গেলো।-” জোহান তুমি ভিজলে কিভাবে? ” ‎মেঘ শ্লেষ করে বললো -” তোমার ভীনদেশী আদরের অতিথি চোখ মাথায় নিয়ে হাঁটে না।

তাই পচা ডোবায় সাতার কেটে এসেছে। ” ‎নুরুল মর্তুজা জোহানকে নিয়ে তড়িঘড়ি করে বাড়িতে প্রবেশ করলেন।তানিশা মাত্র চায়ের কাপে চুমুক দিয়েছিলো বড়বাবার মুখে নিজের নামের চিৎকার শুনে কেঁপে উঠলো। চায়ের কাপ থেকে চা ছিটকে হাতে পরে গেল। তড়িঘড়ি করে চায়ের কাপটা ট্রি টেবিলে রেখে উঠে দরজার পানে তাকিয়ে তক্তা খেয়ে বসলো।

এগিয়ে গেল জোহানের পানে। রাগ মিশ্রিত সুরে শুধালো -” এসব কি জোহান? তুমি ভিজলে কিভাবে?” ‎ ‎নুরুল মর্তুজা তানিশাকে বিরক্তি স্বরে শুধালেন -” আহা! এখন কি এসব বলার সময়? ছেলেটাকে নিয়ে যা। পরিষ্কার হতে দেয়। ” ‎জোহান মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিলো -” হ্যা,প্রিন্সেস। ওনি সঠিক কথা বলছেন। ” ‎ ‎তানিশা কটমট করে তাকাল জোহানের পানে। জোহান তা দেখেও ক্ষীণ হাসলো। তানিশা বিরক্তির শ্বাস ফেললো। এই ছেলেটা কথায় কথায় তার সুন্দর হাসিটা হাসে। মাইশা আইরা সবাই এসে দাড়ালেন।জোহানের এই অবস্থা দেখে সবাই আফসোস করেও মাইশা ফাদিন হাসি আটকে রাখতে পারলো না।মাইশা ফাদিনের বাহু ধরে হা হা করে হাসলো। আসফিয়া নিজের মেয়ের এমন ব্যাক্কলপনা দেখে মেয়ের পিঠে একটা চড় দিলেন। মেঘও ততক্ষণে এসে দাড়াল তাদের পাশে। তানিশা জোহানের কাছে গিয়ে বললো-” চলো, এখানে সং সেজে দাঁড়াতে হবে না।” ‎ ‎মেঘ আঁতকে উঠল। তানিশার বাহু ধরে পিছনে সরিয়ে গোমড়া মুখে ফারহানকে বললো-” এই ফারহান তুমি একে নিয়ে যাও। তানিশাকে কেন মেহমানের সব কাজ করতে হবে? তোমরাও কিছু করো।

” ‎ ‎তানিশা মেঘকে পাশ কাটিয়ে আবার সামনে আসতে চাইলে মেঘ তার চওড়া কাঁধ দিয়ে তাকে ডেকে দিলো। তানিশা মেঘের পিঠের দিকে খানিকক্ষণ হতবাক হয়ে তাকিয়ে ডেকে উঠলো -” মেঘ ভইয়া,দেখি সরেন। ভাইয়া পারবে না। ” ‎ ‎মেঘ ঘাড় ঘুরিয়ে তানিশার পানে তাকিয়ে চোখ দিয়ে শাসিয়ে বললো -” তোমাকে বলেছে সে পারবে না? ” ‎ ফারহান এতো সব দেখে নিজেই এগিয়ে এসে জোহানকে নিয়ে গেলো।‎জোহান যেতেই সবাই আস্তে আস্তে নিজের কাজে গেলেন তানিশা মেঘের এমন রাগি মুখ দেখে ভ্রু উঁচিয়ে মিটিমিটি হাসলো।

মেঘ তা দেখে মৃদু ধমকের স্বরে বলল -” হাসসো কেন? আমি হাসার মতে কিছু বলেছি? ” ‎ ‎তানিশা মাথা ঝাঁকাল ডানে বামে। মেঘ জিজ্ঞেস করল -” তাহলে? ” ‎ ‎-” আপনাকে বাচ্চাদের মতো লাগছে মেঘ ভাইয়া। যার নাকে ঢগায় শুধু রাগ আর রাগ। ” ‎ ‎মেঘ নিভে গেল।

স্বাভাবিক হয়ে বললো -” তেমন লাগছে নাকি? ” ‎মেঘের এমন পরিবর্তন দেখে মাইশা চোখ উল্টালো।তার এই বন্ধু এতো ঘাউড়া মানুষের সামনে। কেউ কটু কথা বললে তুলে আছাড় দিতে দুইবার ভাবে না। আর মেয়েটার সামনে মিউ মিউ করে। তানিশা তাড়া দেখিয়ে বললো -” আচ্ছা আমি তাহলে যাই।দেখি জোহান কি করল। ” ‎ ‎তানিশাকে যেতে দেখে মেঘ পিছন ডাকলো -” তানিশা! ” ‎ ‎তানিশা তাড়াতাড়ি হেটে যেতে যেতে বললো -” পরে এসে শুনছি মেঘ ভাইয়া। ” ‎ ‎কথাটা বলে তানিশা সিড়ি বেয়ে আড়ালে মিলিয়ে গেল। মেঘের হাত মুঠোয় হয়ে গেলো। মাইশা বলল-” এসব দেখে কি বলবি তুই?” ‎ ‎মেঘ বলল -” আমি কিছু বলতে চাই না আপাতত। তবে মনে হচ্ছে ওকে না ফেলে নিজে পরে গেলে বোধহয় ভালো হতো। তানিশা আমাকে নিয়ে ব্যাস্ত হতো। ‎ ‎-” নাও তো হতে পারে। ” ‎ ‎কথাটা মেঘ শুনলো। তবে কিছু বললো না। ফিরতি পথ ধরল। আসফিয়া খাতুন মেঘকে ডেকে বললেন। -” এই মেঘ, কোথায় যাচ্ছিস। আয় নাস্তা করে যাবি। ” ‎ ‎মেঘ আসফিয়ার কথার জবাব না দিয়েই মর্তুজা বাড়ির চৌকাঠ মাড়িয়ে চলে গেল। ‎ ‎

‎মাহতিমা চৌধুরী ড্রাইনিং টেবিলে খাবার সাজাছিলেন। ছোট ছেলে হিমালয়কে ডেকে এসেছেন। মেঘালয় জগিং থেকে এলে খাবে। তবে মেঘালয় এতোক্ষণে এসে যাওয়ার কথা।আসেনি বলে তিনি বার বার দরজার দিকে তাকাছেন। আবার দরজার দিকে তাকাতেই দেখতে পেলেন মেঘ হন্তদন্ত হয়ে ঘরে আসছে। ড্রইংরুমে আসতেই রেগে ট্রি টেবিলে লাথি মেরে গেল।মাহতিমা চৌধুরীর বুঝতে দেরি হলো না। উনার বদমেজাজি ছেলেটার মেজাজের বারোটা বেজে গেছে। তিনি চিন্তিত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন -” মেঘ কি হয়েছে? কার সাথে লেগে এলি আবার? ” ‎ ‎মেঘ মায়ের কথার জবাব না দিয়েই সিড়ি বেয়ে উঠতে লাগলো।হিমালয় নিচেই নামছিলো। ভাইয়ের রাগি চেহারা দেখে জিজ্ঞেস করল -” কাউকে মেরে টেরে আসোনি তো আবার? ” ‎ ‎মেঘ যেতে যেতে ঘাড় ঘুরিয়ে হিমালয়ের পানে চোখ রাঙিয়ে তাকালো।হিমালয় তা দেখেও না দেখার ভান করে নিচে এসে ড্রাইনিং রুমের চেয়ার টেনে বসলো। মাকে বললো-” তোমার ছেলে আবার কার সাথে গন্ডগোল পাকিয়ে এলো। ” ‎ ‎-” জানি না। গতকাল থেকেই মাথা গরম উনার। ” ‎ ‎****

‎তানিশা কাবাড খুলে শাড়ীর ভাজ থেকে ক্যাসলটন সবুজ রঙের একটা ডাইরি বের করলো। বাসায় আপাতত তার রুমে আসার মতো কেউ ফ্রী নেই।মাইশা গেছে ব্যাংকে, ফাদিন জোহানকে সাথে করে নিয়ে বন্ধুদের সাথে দেখা করতে। নাহিদ মর্তুজা আবার নিজের কর্মস্থলে। ফাইয়াজকে তো গভীর রাত ছাড়া দেখাই যায় না।বাড়ির বড় ছেলে হিসেবে ফাইয়াজ নিজের দায়িত্ব ভুলে না।না বড় ভাই হিসেবে। তানিশার এ-ই দুপুরে তেমন কিছু করার নেই বলে তার একাকিত্বের সঙ্গী ডাইরিটাকে বের করলো।ডাইরিতে দেশে আসার পর থেকে একটা দাগও টানতে পারেনি। তানিশা ডাইরির মখমলি কাবারের উপর হাত বুলালো। ডাইরিটা কি তার সাথে রাগ করলো। তানিশা জানালার পাশের চেয়ারটা টেনে বসলো। ডাইরিটা টেবিলের উপর রেখে জানালার ফুরফুর করে উড়া পর্দার দিকে তাকাল। সকালে আকাশ পরিষ্কার থাকলেও এখন একটু একটু সাদা সাদা মেঘ জমাচ্ছে।বাগানের পুরনো সেই টগর ফুলের গাছটা মৃদু তালে দুলছে। সেই পানে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তানিশা হাতে কলম নিলো। প্রথম পৃষ্ঠা পাল্টাতেই ভেসে আসলো রাজকুমারীর রাজপরিবারের সবার ছোট্ট ছোট্ট ছবি আটা দিয়ে আটকানো। তানিশার জীবনে প্রতিটা গুরুত্বপূর্ণ মানুষের ছবি সেখানে আটকে আছে। তানিশা পাতা উল্টে পরিষ্কার পৃষ্ঠা কলম ছোঁয়ালো। দেশে আসার পর থেকে যা যা ঘটে গেল তা একটু একটু লিখে রাখলো। আইয়াজকে প্রথম কোলে নেবার অনুভূতি খুব সুনিপুণ ভাবে লিখে রাখলো।আজকে সকালের ঘটনা লেখে ঠোঁট ছড়িয়ে হাসলো একটু। তারপরেও ঘটনাও লেখলো-

‎জোহানকে গোসলে ঢুকিয়ে আমি ছাঁদে গেলাম। চিলেকোঠার ঘরটায় সময়ের অভাবে যাওয়া হয়নি আমার। ফাহিম ভাই নাস্তার সময় বলেছিলেন আজ তিনি একটু দেরিতে হসপিটালে যাবেন। তাই একটু সময় পেয়ে একটু দেখতে গেলাম উনার ছোট সংসার। ফাহিম ভাই এখন পড়াশোনা শেষ করে মেডিসিন গবেষণায় মনোনিবেশ করেছেন একটা গবেষক দলের সঙ্গে। আমি যখন চিলকৌটায় পৌছালাম তখন ফাহিম ভাই আমাকে দেখে সেই কি খুশি। নাহ ওনি প্রকাশ করেননি তা। তবে রাজকুমারীর তার রাজ্যের সবার মনোভাব বুঝেতে পারার ক্ষমতা আছে।আমি ফাহিম ভাইয়ের রুমটা ঘুরে দেখলাম।একটাই থাকার রুম। তার সাথে লাগোয়া এটাচ ওয়াসরুম। রুমের দুইটা দেয়াল জুড়েই বইয়ের থাক থাক করে বই রাখা।আমি আমেরিকায় যাবার আগে তা শুধু ফাহিম ভাইয়ের বিছানার উপরে দেয়াল পর্যন্ত ছিল। সময়ের সাথে সাথে ছোট্ট লাইব্রেরির আয়তন বেড়েছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম -” এখানে কি শুধু মেডিকেলের বই ফাহিম ভাই? “

‎-“না। সব ধরনের আছে। উপরের দিকে তাকা। তুই পড়তে চাইলে নিতে পারিস। শুধু ওই চুন্নির হাত লাগাতে দিবি না। “

‎তানিশা মৃদু হাসলো। এই বয়সে এসেও মাইশা আপু ফাহিম ভাইয়ের দা কুমরা সম্পর্ক শেষ হলো না। ফাহিম ভাই যতটা শান্ত শিষ্ট মাইশা তত উচন্ড।তবে ফাহিম ভাই মাইশা আপুর সাথে ঝগড়ায় লাগলে ওনার আসল চরিত্র ভুলে বসেন। তখন ওনার বদরাগি চেহারা দেখতে পাওয়া যায়। আমি মাথা ঝাকিয়ে সায় দিলো।

‎-“এই ফাহিম ভাই তুমি কখন যাবে? “

-” একটু পরেই। তুই বস। আমি দেরিতেই গেলাম না হয়। “

আমি হেঁটে হেঁটে টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে টেবিল থেকে কয়েকটা পেইজ হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম -” এখন তোমরা কোন বিষয়ে কাজ করছো? “

ফাহিম ভাই এসে টেবিলে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে বললেন -” ক্যান্সার।”

‎কথাটা বলতেই আম্মু ফাহিম ভাইয়ের রুমে আসলেন। আমাকে দেখে অবাক হয়ে বললেন -” তুই এখানে? আর সবাই তোকে খুঁজতে খুঁজতে হয়রান। জোহান তোকে খুঁজেছে। “

‎-” খুঁজোক। “

আমি ফাহিম ভাইয়ের বিছানায় বসল। ‎আম্মুও আমার পাশে এসে পায়ের উপর পা তুলে বসলেন। ফাহিম ভাইকে হুকুম দিলেন -” ফাহিম আমাদের মা বেটিকে তোমার হাতের কফি খাওয়াও তো। “
‎‎আমি মা বসে বসে ফাহিম ভাইয়ের কাজ দেখলাম। ওনার কফি মেইকারে কফি করলেন। টেবিল পরিষ্কার করে কাপ ধুয়ে এনে রাখলেন। -” আমার সব ভাইয়েরা ঘরের কাজ শিখে গেছে। “

‎ফাহিম ভাই তা শুনে লাজুক হাসলেন। আম্মু বললেন -” ভালো তো।এই বাড়ির বউমা গুলোর রাজ কপাল হবে। আমাদের ছেলেগুলো একেকটা রাজপুত্র। “

‎ফাহিম ভাই কাজ করতে করতে আম্মুর পানে তাকিয়ে বললেন -” ছোট মা রাজপুত্ররা কিন্তু রান্না করে না। “

‎-“আরে! আমি তে সেভাবে বলিনি। তোমরা সবাই সব দিক দিয়ে পার্ফেক্ট এটা মিন করেছি। “

তানিশার হঠাৎ কান খাড়া করে শুনলো কেউ এই রুমে আসছে। তানিশা তড়িৎ গতিতে ডাইরি আঁচলের নিচে লুকিয়ে ফেললো।মাইশা ধুপধাপ পা ফেলে এসে ওর বিছানায় ঠাস করে শুয়ে পরলো। তানিশার পানে তাকিয়ে বললো -” ওখানে বসে করছিস?”

তানিশা আমতা আমতা করে বললো -” কিছু না। এমনি বসে আছি। তুমি এতো সকাল এলে যে। “

মাইশা উৎসাহিত হয়ে উঠে বসলো। উৎফুল্ল কন্ঠে বললো-” রিজাইন দিয়ে দিয়েছি। “

তানিশা বিস্মিত হলো। -” কেন? এটা করলে কেন তুমি? “

-” আরে বা*লে চাকরি করি আমি। বিয়ের জন্য বিশ দিনের ছুটি নাকি টানাটানি করে দিয়েছে। এর থেকে বেশি দিতে পারবে না।আমিও কম যাই না কি? একবারে রিজাইন দিয়ে এসেছি। করবো না চাকরি। “

-” কিন্তু চাকরিটা তো তোমার শখের ছিলো।”

-” পরে অন্য জায়গায় নিয়ে নিবো।এতো প্যারা নিস না। এই আমি আজ ইয়াসিরের সাথে দেখা করবো বলেছিলাম।চল দেখা করে আসি। “

-” তো তুমি যাও।”

-” কানে কম শুনিস? বলেছি চল।মানে তোকে সাথে করে নিয়ে যাচ্ছি। “

তানিশা প্রস্তাব নাকচ করে বলল-” না বাবা না।কাবাবে হাড্ডি হবো না। “

-” চড় মেরে দাঁত ফেলে দিবো বেয়াদব।উঠ বলছি উঠ।”

মাইশা টেনেটুনে তানিশাকে তুললো। তানিশা মাইশার অজানতে কোনো রকম ডাইরিটা লুকিয়ে টেবিলের নিচে চিপকে রেখে দিলো।

চলবে……….

Leave a Comment