
পর্ব:০৩
সকাল ঠিক আটটা বাজতেই মালিহা শেখ হঠাৎ চমকে ঘুম ভাঙলেন। ঘুম ভাঙার মুহূর্তেই তিনি বুঝতে পারলেন—আজ তার মনটা অদ্ভুতভাবে ভারী।
ঘরের ভেতরের নরম আলো, পর্দার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া সূর্যের কিরণ, সবকিছুই যেন অস্বাভাবিক লাগছে আজ। চেহারার ফ্যাকাসে ভাবটা যেন আরও বেড়েছে; চোখের চারপাশে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।
মনে হচ্ছিল—রাতে ঠিকমতো ঘুমালেও তার বুকের ভেতরে জমে থাকা দুশ্চিন্তার পাহাড়টা যেন আরও ভারী হয়ে গেছে।
এমনকি বিছানা থেকে উঠে বসতেই মনে হলো—হৃদয়টা কেমন জানি ব্যথা করছে।
একটাই চিন্তা— তানভীকা… তার মেয়ে।
দীর্ঘ ১৩ বছর আগের ঘটনাগুলো আজও যেন তাকে তাড়া করে বেড়ায়।
একটা ভুল সিদ্ধান্ত… একটা অকারণ চাপ… আর সেই অযাচিত বিয়ের কারণে আজও মেয়েটা যেন নিজের জীবনের জন্য লড়ছে।
শ্বশুরের কথা রাখতে গিয়ে তানভীকার বিয়ে হয়েছিল রিদওয়ানের সাথে—
যে বিয়েতে ছিল না মেয়ের সম্মতি… ছিল না কোনো প্রস্তুতি… শুধু অদৃশ্য বাধ্যবাধকতা।
সেদিনের সেই সিদ্ধান্তই যেন আজও মেয়েটাকে পেছনের দিকে টেনে ধরে।
এই বিরাট বাড়িতে সবাই থাকলেও তানভীকা যেন একা। সবাই তাকে একটু দূরত্ব বজায় রেখে দেখে,
কারও কারও চোখে আবার সেই পুরোনো অভিযোগের ছায়া।
মালিহার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।
একটা অনিচ্ছুক বিয়ের জন্য সারাজীবন কি একটি মেয়েকে দায় নিতে হয়?
এটাই কি তার ভুল—না বলতে না পারা?
সমাজের চাপ মেনে নেওয়া?
ঠিক তখনই তার চিন্তার জগৎ ভেঙে যায় সামিউল শেখের গভীর কণ্ঠে।
— “কি হয়েছে তোমার মালিহা? এভাবে বসে আছো কেন? কিছু বলবে?”
মালিহা তাকালেন স্বামীর দিকে।
তার ঠোঁটের কোণে একটা ধীর, ক্লান্ত হাসি এল—
কিন্তু তা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি বললেন—
— “তানভীকাকে ছাড়া আর কিছুই মাথায় আসে না। মেয়েটা আমাদের কাছ থেকে এক পয়সাও নেয় না। নিজের মতো থাকে। অথচ এই বাড়িতে আমি, তুমি, বড় ভাইজান, ফাহিম আর রিহান ছাড়া কেউ ওকে সহ্যই করতে পারে না। বড় আপা তো দেখলেই মুখ ফিরিয়ে নেয়… যেন তানভীকা অপরাধী। অথচ ওর দোষ কি?”
বাকিটা বলতে গিয়েই তার গলা কেঁপে উঠল।
চোখের কোনায় জল টলমল করছিল।
সামিউল কিছুক্ষণ চুপচাপ শুনলেন।
তার মুখে ভাবলেশহীন কঠোরতা থাকলেও কণ্ঠটা ছিল নরম।
— “সব ঠিক হয়ে যাবে। রিদওয়ান দেশে ফিরলে।”
মালিহা মাথা তুললেন, উদ্বেগে চোখ বড় হলো।
সামিউল আবার বললেন—
— “সে আগেই বলে দিয়েছে তানভীকার দায়িত্ব সে নেবে না। তাই ও ফিরলেই ডিভোর্সটা করে দেবো। তারপর আর এত টানাটানি, দুশ্চিন্তা থাকবে না। মেয়েটা নিজের মতো নতুন করে শুরু করতে পারবে।”
মালিহা কিছু বলতে গেলেন, কিন্তু সামিউল কথা ঘুরিয়ে বললেন—
— “যাও, তানভীকাকে ডাকো তো। অন্য দিন তো অনেক সকালে উঠে পড়ে। আজ কোনো খোঁজই নেই, মনে হয় ঘুমাচ্ছে।”
মালিহা এবার হালকা হাসলেন।
— “কাল অনেক রাত করে ফিরেছে। তাই হয়তো ঘুমাচ্ছে। ডাকছি।”
ফ্রেশ হয়ে তিনি তানভীকার রুমের দিকে হাঁটলেন।
বাড়ির লম্বা করিডোরটা পেরোতে পেরোতেই চিন্তা ঘুরে ফিরে আবার মেয়ের কাছেই চলে আসে।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই তার চোখে পড়ল—
তানভীকা শান্তভাবে ঘুমিয়ে আছে। দুর্বল শরীর, মুখে অদ্ভুত সরলতা, চোখের নিচে হালকা ডার্ক সার্কেল— যেন অনেকদিনের ক্লান্তি লুকিয়ে আছে।
দেখলে মনে হয়—
এখনো সে যেনো বাচ্চা,মায়ের কোলে মাথা রেখে ঘুমায়। এই মেয়েটার ওপর এত বোঝা চাপানো কি ঠিক হয়েছিল?
মালিহা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
— “তানভীকা মা… ওঠো। অনেক দেরি হয়ে গেছে।”
তানভীকা চোখ মেলে তাকাতেই হঠাৎ উঠে বসল।
— “আম্মু?”
— “হ্যাঁ মা। ওঠো, ফ্রেশ হও। না হলে ভার্সিটিতে দেরি হবে। আমি নাস্তা করে দিচ্ছি।”
তানভীকা মাথা নেড়ে ওয়াশরুমে চলে গেল।
নিচে নেমে মালিহা দেখলেন—
সকালের ব্যস্ততা পুরো বাড়িতে ছড়িয়ে আছে।
তাহমিনা শেখ টেবিলে খাবার সাজাচ্ছেন,
বাড়ির মেটরা ছুটোছুটি করছে। ঠিক তখনই সালমা শেখ—মেজো বউ—এসে বসলেন।
আজও আধুনিক পোশাকে—শাড়ী পড়া চুল গুলা পনিটেইল করে বাঁধা। বাড়ির অন্য দুই বউ শাড়িতে থাকলেও তিনি সবসময় নিজের মতোই থাকেন।
নেতিবাচক হলেও তার একরকম সাহসী উপস্থিতি আছে। এক এক করে সবাই টেবিলে জড়ো হচ্ছে।
হঠাৎ সিঁড়ি বেয়ে নামল তানভীকা।
চুপচাপ, নিঃশব্দ, মাথা নিচু করে।
কিন্তু তাকে দেখেই তাহমিনা শেখ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন
এবং কোনো কথা না বলে নিজের রুমে চলে গেলেন।
তানভীকা মুহূর্তে বুঝে গেল—
এটা কাকতালীয় নয়। এটা নিয়মিতই ঘটে।
ওর উপস্থিতি মানেই কারও না কারও বিরক্তি।
সে শুধু একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপচাপ চেয়ার টেনে বসল।
নীরবতা… এই বাড়িতে এই নীরবতাই যেন তার সবচেয়ে পরিচিত সঙ্গী।
চলবে…….