
লেখিকা: জান্নাত রাহমান হৃদি
পর্বঃ০১
( যারা লং ডিসটেন্স রিলেশনশিপ পছন্দ করেন, তারা পড়ে দেখতে পারেন। কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। 🚫)
সদ্য কোচিং শেষ করে বেড়িয়েছে শুভ্রতা । হাত ঘড়িতে সময় দেখল,সাতটা বেঁজেছে। ক্লান্তিতে শরীরটা ভারী হয়ে আসছে ওর। বন্ধুদের সাইড দিয়ে বাসার দিকে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিলো সে। ওমনি একটি গুরুগম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো,
“এই তুই কই যাচ্ছিস, শুভ্রা?”
চোখেমুখে বিরক্তি ঢেলে শুভ্রতা উত্তর দিলো, “বাসায় যাচ্ছি।”
শুভ্রতা কথাটা বলার সাথে সাথেই উক্ত কন্ঠের ব্যক্তি বলল, “বাসায় পরে যাবি! আগে চল, ঘাটে গিয়ে বসি। মামার দোকানের চা খাবো।”
শুভ্রতা না বললেও তার বাকি সাত বন্ধু মানল না তা। টানাটানি শুরু করল তারা।অগত্যা সবার সাথে পায়ে পা মিলিয়ে হাঁটা ধরল। দশ মিনিটের মধ্যেই নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে গেলো। টং দোকানের লোকটাকে আট কাপ চা দিতে বলে সবাই দুটো বেঞ্চে বসে পড়ল। শুভ্রতা বেঞ্চিতে বসে চুলের কাঠিটা টেনে খুলে ফেলল। সাথে সাথে লম্বা চুলগুলো কোমড় অব্দি ঝুলে পরল তার। এরই মধ্যে দোকানদার চায়ের কাপ এগিয়ে দিলো ওদের দিকে। শুভ্রতা কলেজ ব্যাগটা কোলের উপর রেখে হাত বাড়িয়ে কাপটা নিলো। চায়ের কাপে চুমুক দিতেই একটুখানি তৃপ্তির অনুভূতি ছড়িয়ে পড়লো।
চায়ের গরম ঝাঁজ শরীরে এক অদ্ভুত স্বস্তি এনে দিলো। শীতের মাঝেও কাপে এক টুকরো উষ্ণতা। সে চোখ বন্ধ করে কিছুটা সময় চায়ের স্বাদে মগ্ন হয়ে গেলো।
.
শুভ্রতাদের একটা ফেক আইডি আছে। যেটা তারা আট বন্ধু মিলেই চালায়। যত আকাম কুকাম আছে সব এই আইডি টা দিয়ে করে তারা। শুভ্রতার ফোন দিয়ে মালিহা ফেসবুক স্ক্রল করছিল! হঠাৎ একটা পোষ্ট দেখে মালিহা থমকায়। কোনো এক মেয়ে গার্লস গ্রুপে পোষ্ট করেছে, আমার মামার সাথে কেউ প্রেম করবেন? সে নিষঙ্গতায় ভুগছে। মালিহা পোষ্ট টা পরে এক দফা হাসল, এরপর বন্ধুদেরকেও শোনাল। আরেকদফা হাসির রোল পরল তাদের মাঝে। ওদের মধ্যে সব থেকে দুষ্ট ছেলে হলো আশিক। সে মালিহাকে সাথে সাথে বলল, তুই ইনবক্স কর। বল যে, আমি প্রেম করতে আগ্রহী, কারণ আমিও আপনার মামার মতো নিষঙ্গঃতায় ভুগি। মালিহা আশিকের কথা মতো মেয়েটাকে ইনবক্স করল ঝটপট। ইনবক্স করার মিনিট দুয়েক বাদেই মেয়েটি কতগুলো পিকচার পাঠাল। নিচে লিখল কাকে পছন্দ হয়েছে বলুন।
শুভ্রতা ফোনের স্ক্রিনেই তাকিয়ে ছিলো। মেয়েটার এমন কান্ড দেখে ভ্র ভাজ করল সে। মুখ ভেঙচিয়ে বলল,
“ মামা মেয়েটা তো একজনের কথা বলছিলো, পিকচার দিয়েছে পাঁচ জনের। কি আজব মেয়েরে বাপ।”
এইবার মৌ চেঁচিয়ে উঠে বলল, “তাইলে তুই পছন্দ কর শুভ্রতা।”
শুভ্রতা ফোনটা নিয়ে মনযোগ সহকারে দেখল, একটা ছেলের দিকে গিয়েই দৃষ্টি আটকাল ওর। ভীষন ইনোসেন্ট লাগছে ছেলেটাকে। সেফোন গুড়িয়ে সবাইকে দেখাল ছবিটা। মালিহা সেই মেয়েটাকে ঐ ছবি টা পাঠিয়ে বলল,এই ছেলেটাকে পছন্দ হয়েছে। মেয়েটা সাথে সাথেই বলল, তোমার একটা ছবি দেও। মালিহা শুভ্রতার ছবি পাঠিয়ে দিলো। শুভ্রতার ছবি পাঠানোতে ওর রাগ লাগল। মুখটাকে তেতো করে বলল, তোরা সবজায়গায় আমাকে ফাসাস কেনো?
ফয়সাল ওর কথার বিপরীতে বলল, তোর এমনিও বয়ফ্রেন্ড নেই। প্রেমের ফিলিংস কেমন হয়, তা দেখতে হবে না তোর? তো তোমার প্রেম দিবসের শুভকামনা রইলো। বলেই উঠে দাঁড়ালো ফয়সাল। শুভ্রতাকে প্রেম গর্তে ফেলে দিয়ে ওরা সুরসুর করে যে যার বাড়ির দিকে হাঁটা ধরল। শুভ্রতাও পা বাড়াল বাসার পথে।
বাসায় ডুকতেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসল শুভ্রতার। বাাহিরে যতটা সময় থাকে ততক্ষন অব্দি ভালো থেকে ও। বাসায় আসলেই বিষন্নতা চারদিক জুড়ে ঘীরে ধরে। কলেজ ব্যাগটা ধপ করে টেবিলের উপর রেখে ওয়াশরুমে ডুকল। ফ্রেশ হয়ে বেড়িয়ে মায়ের রুমে উকি দিলো, মেহরীন আলফা টেবিলে বসে স্কুলের খাতা দেখছিলেন। দরজায় শব্দ হতেই মাথা উচু করে তাকালেন। পর পর বলে উঠলেন, ‘কোচিং শেষ হয় সাতটায়, বাসায় আসতে দশমিনিট লাগে! তুমি বাসায় এসেছো কয়টায়? ৮:৩০ বাজে এখন। এত রাত অব্দি বাহিরে ছিলে কেনো?
শুভ্রতা আমতা আমতা করে শুধাল “বন্ধুদের সাথে ছিলাম আম্মু।”
“ভদ্র মহিলা এবার আরও রেগে গেলেন, “ কতগুলো নষ্ট ছেলেপেলের সাথে হাটো। দিন দিন উচ্ছিন্নে যাচ্ছো। কান খুলে শুনে রাখো! আমার সাথে থাকতে হলে আমার কথা শুনে চলতে হবে। না হলে তোমার বাবার কাছে গিয়ে থাকো…”
শুভ্রতা চুপচাপ মাথা নাড়াল। দরজা টা চাপিয়ে দিয়ে নিজের রুমে চলে আসল। বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে ফোন করল, সাদমান রাহমানের কাছে। সাদমান রাহমান মেয়ের ফোন পেয়ে সাথে সাথেই রিসিভ করল। হেসে বলল, ‘কেমন আছো মা?’
‘ভালো বাবা, তুমি আসবে কবে?’
‘আসবো এক ফাঁকে। বাবা বিজি আছি মা, পরে কথা বলবানি। রাখছি হ্যা?”
“রাখো।
সাদমান রাহমান ফোন কেটে দিলেন। উনি ফোন কাটতেই শুভ্রতা ফেসবুকে ডুকল। দেখল, সেই মেয়েটা ছেলেটার আইডি লিংক দিয়ে রেখেছে। শুভ্রতা দ্রত ছেলেটার আইডিতে ডুকল। একটা ম্যাসেজ টাইপ করল, “ আসসালামু আলাইকুম।”
ওপাশ থেকে সাথে সাথেই রিপ্লাই আসল। শুভ্রতা টুকটাক কথা বলতে লাগলো। ছেলেটা নিজে থেকে কিছু বলছে না, শুধু ও যা বলছে তার রিপ্লাই দিচ্ছে। শুভ্রতা বিরক্ত হয়ে জিগ্যেস করল,
“ও হ্যালো! আমাকে পছন্দ হচ্ছে না?”
“হয়েছে।”
“শুভ্রতা রাগ দেখিয়ে বলল,
তো কথা বলছেন না কেনো?”
“ আমি একটু কথা কম বলি।”
“মুখ ভেঙচাল শুভ্রতা। জিগ্যেস করল, “তো প্রেম করবেন কিভাবে?”
ছেলেটার সোজাসাপ্টা উত্তর, “ হয়ে যাবে।”
“ তো এক্সসেপ্ট করছেন আমাকে?”
“ইয়াহ।”
এরপর আর কিছু বলল না শুভ্রতা। ইচ্ছে করছে না কথা বলতে। ফোনটা বিছানার এক সাইডে ছুড়ে মেরে, জানালটা খুলে দিল। দূর আকাশের চাঁদটার দিকে তাকিয়ে গুনগুন করে গান ধরল।
.
পুরো নাম শুভ্রতা রাহমান। গ্রামের বাড়ি বরিশালে। তবে কখনো পা রাখা হয়নি সেথায়। ছোট বেলা থেকেই বেড়ে ওঠা-থেকে সবকিছু খুলনাতে। শুভ্রতার বাবা সাদমান রাহমান একজন পুলিশ কর্মকর্তা। তার সবকিছুই মেয়ে শুভ্রতাকে ঘিরে। শুভ্রতার মা মেহরিন আলফা একজন রাগী টাইপের মানুষ। কেজি স্কুলে চাকরি করেন তিনি। খুলনার স্হানীয় মেয়ে সে। সাদমান রাহমানের চাকরি হওয়ার পরেই প্রথম পোষ্টিং হয়েছিলো খুলনাতে, তখন পরিচয় হয় মেহরিনের বাবার সাথে। সাদমান রাহমানকে এক কথায় পছন্দ করে ফেলেন ভদ্রলোক। এক পর্যায়ে তিনি মেয়ের বিয়ে দেন সাদমান রাহমানের সাথে। মেহরিন আলফা বিয়েতে রাজি ছিলো না, তার বাবা একপ্রকার ব্লাকমেইল করে বিয়ে দিয়েছেলেন মেহরীনকে। তবে বিয়ের পরেও সম্পর্ক মানতে পারেন নি তিনি। বিয়ের পর থেকেই এক প্রকার তান্ডব চলছে তাদের জীবনে। তা এখনো পর্যন্ত বিদ্যমান। মাঝখানের যাতাকলে পিষে যাচ্ছে শুভ্রতা।
.
দ্বিপ্রহর। চোখ মেলে তাকায় শুভ্রতা। কখন ঘুমিয়ে পরেছিলো কে জানে? রাতের খাবার খাওয়া হয়নি বিধায়- ই হয়তো এখন ক্ষুধা লেগেছে। ফলে ঘুমটাই ছুটে গিয়েছে। সে চুল গুলো হাত খোপা করে লাইট জ্বালাল। পা ফেলে ডাইনিং রুমে এগিয়ে গেলো। পাতিলে উকি মেরে দেখল রুই মাছ রান্না করা। ধপ করে মাথাটা জ্বলে উঠল তার। বিরবির করে বলল,এ বাড়িতে সবকিছু ঘটবে আমার অপছন্দের জিনিস। না খেয়েই সে পুনরায় নিজের রুমে ফিরে গিয়ে শুয়ে পরল। ঘআজ আর ঘুম আসবেনা বোধহয়। তাই বেডের পাশের টি টেবিল টা থেকে ফোনটা তুলে নিয়ে ওয়াইফাই অন করতেই ম্যাসেন্জারে টুংটাং শব্দ হলো অর্নগল। শুভ্রতা প্রথম ফেইসবুক লাইটে ডুকল। দেখতে পেলো ছেলেটা এখনো একটিভ। শুভ্রতা মনে মনে বলল, রাত অব্দি একটিভ! স্ট্রেঞ্জ। কার সাথে ডেটিং মারছে কে জানে। শুভ্রতা নিজের সাথেই বিরবির করে বলল কথাটুক। ওসব নিয়ে আর না ঘেটে মেসেন্জারে ডুকল তৎক্ষনাৎ। সেখানে নিজের মেইন আইডি লগইন করা। আড্ডা গ্রুপে সবাই শুভ্রতাকে ম্যানশন করে জানতে চেয়েছিলো কতদূর এগিয়েছে সে। ম্যাসেজ গুলো পড়া শেষ করে আশিকের ইনবক্সে ডুকল শুভ্রতা। সেও ম্যাসেজ দিয়ে রেখেছে। “ মামা কি খবর?”
শুভ্রতা রিপ্লাই করল,
“ ছেলেটা অতিরিক্ত ভদ্র সাজছে মামা। ভাবখানা এমন যে, ভাজা মাছ উল্টে খেতে পারে না।’
আশিক তখন অনলাইনেই ছিলো। চটজলদি রিপ্লাই করল, “ উল্টে খেতে না পারলে তুই উল্টে দিবি, সমস্যা কি? তোকে তো দেওয়াই হয়েছে মাছ উল্টে খাওয়ানের জন্য।’
শুভ্রতা কতগুলো রাগের ইমোজি সেন্ড করল। এরপর লিখল,
আমাকে ফাঁসিয়ে দিয়ে খুব মজা নেওয়া হচ্ছে?
আশিক পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘ ঐআইডি টার পাস চেন্জ করছিস কেন?”
“তো চেন্জ করবো না? আমি আমার প্রেমিকের সাথে প্রেমালাপ করবো তা তোমরা দেখবে কেন?”
আশিক হো হো করে হেসে উঠল,
“ শুক্কুরে শুক্কুরে আটদিন হতে পারলো না এর মধ্যেই?”
“ইয়াহ মামা! শুভ্রতা ইস সো ফার্ষ্ট।”
” সামলে মামা! গর্তে পরে যেয়ো না আবার। যখনই দেখবে এক্সিডেন্ট করার চান্স আছে সামনে, তার আগেই নেমে পরবে। বুঝেছো তো আমার কথা। প্রেম জিনিস মারাত্নক খারাপ, অন্তত তোমার মতো জেদী মেয়ের জন্য।”
চলবে….