-” হেই প্রিন্সেস! লুক এট।”
জোহান কথাটা বলে অতি উৎসাহ নিয়ে পাশের সিটে বসে থাকা মেয়েটার পানে তাকাল। ওর বিড়ালের দুষ্টুমি দেখাবে মেয়েটাকে। তাকিয়ে হতাশ হলো।মেয়েটা একমনে প্লেনের ছোট্ট জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে।প্লেনটা এখন মেঘের দেশে অবস্থানরত। জানালা দিয়ে পাঁজা পাঁজা তুলোর মতো মেঘগুলো দৃশ্যমান। সূর্যের কিরণে ঝলমলিয়ে উঠছে যেন।তানিশা একমনে সেই দিকে চেয়ে আছে। এই যে জোহান ওকে ডাকলো সেই ধ্যানেও সে নেই।জোহান এগিয়ে গিয়ে তানিশার থুতনি ধরে নিজের দিকে ফেরাল।তানিশা ঘাড় ঘুরিয়ে ভীনদেশী চমৎকার ব্যাক্তিত্বের সাথে অসম্ভব সুদর্শন পুরুষটি পানে দৃষ্টি দিলো। দেখলো সে চোখ ছোট ছোট করে একটা ভ্রু উচিয়ে রেখেছে। তানিশা অস্বস্তি লুকাতে মুচকি হাসলো। জোহানও তাকে হাসি ফেরত দিলো। পরে অভিমানি কন্ঠে ইংরেজিতে শুধালো -” প্রিন্সেস, ইউ আর নট ডুয়িং দ্য রাইট থিং উইথ মি।
-“এই যে তুমি বার বার বাইরে তাকিয়ে বসে থাকো। অথচ আমি তোমার সাথে তোমার দেশে যাবো বলে কত উৎসাহ নিয়ে তোমার সঙ্গে এলাম।তুমি তো আমার দিকে খেয়াল করছো না।”
তানিশা কপাল কুঁচকে শুধালো -” আমি বলেছি আসতে?”
জোহান তার একহাত কপালে ঠেকিয়ে অবাক স্বরে বলল -” ওহহ গড! প্রিন্সেস তুমি নিজেই তোমার বোনের বিয়ের ইনভাইটেশন দিয়েছো।”
তানিশা দুষ্টু হেঁসে বললো -” কই না তো? “
জোহান কিছু বলার জন্য হা করে হতাশ হয়ে আবার মুখটা বন্ধ করে দিলো। মেকি অভিমান দেখিয়ে নিজের সিটে গা এলালো। ফোনটা রেখে দিলো।তানিশা থম মে*রে কিছুক্ষণ জোহানের দিকে দৃষ্টি রেখে হেসে ফেললো। জোহান তানিশার হাসি দেখে বিরক্তি মুখে বলল – “স্টপ স্মাইলিং”
তানিশা খানিকটা এগিয়ে গিয়ে জোহানের কানে কানে ফিসফিস করে বলল -” দেখো জোহান, বা পাশের সিটে বসে থাকা মেয়েটা তোমার দিকে কেমন করে তাকাচ্ছে। “
জোহান ত্যাছড়া চোখে সেদিকে একবার তাকিয়ে আবার তানিশার হাসিমুখের পানে তাকাল। ত্যাছড়া স্বরে শুধালো -” কেন? তুমি কি জেলাস?”
তানিশা চোখ উল্টে মুখ বাঁকালো।যেন এতো লেইম কথা সে আর কখনই শোনেনি।জোহান চোখ ছোট ছোট করে তানিশার পানে চেয়ে আছে। মুখে তার এক চিলতে হাসি লেপ্টে আছে। তানিশা মেকি রাগ দেখিয়ে বললো -” কি? এমনভাবে তাকিয়ে আছো কেন? “
জোহান ডান হাত দিয়ে তানিশার মাথা বুলিয়ে দিয়ে বলল -” রাগ করো না প্রিন্সেস। আমি একটু বেশি হ্যান্ডসাম মানছি। তাই বলে ওরা তোমার পানে তাকাবে না তা ঠিক না। ওদের কে আমি বকে দেবো। ” কথাটা বলে জোহান হা হা করে হাসতে লাগলো।
তানিশা রাগ দেখিয়ে পুনরায় জানালার পানে তাকাল। মেঘগুলো ছুয়ে দেওয়ার ইচ্ছে হচ্ছে তার ভীষণ। তানিশা পুনরায় জানালার বাইরে তাকাতে দেখে ওঠে গিয়ে জানালাটা বন্ধ করে দিলো জোহান । তানিশা অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে জোহানের পানে তাকাল। জোহান নিজের জায়গায় বসে বললো -” তোমার উচিৎ আমাকে দেখা। আমিও নেইচারের একটা অংশ।দেখো আমি কত সুন্দর? “
-” যেই না চেহারা? তার নাম আবার পেয়ারা।”
জোহান অতিষ্ট হয়ে বললো-” দেখো প্রিন্সেস, তুমি তোমার ভাষায় আবোল তাবোল বলতে পারো না আমাকে। “
-“একশবার বলবো।”
-” অ্যাগেন? “
তানিশা আর কোনো দ্বিরুক্তি করলো না। জানালার দিকে হাত বাড়াতেই জোহান আটকে দিলো। তানিশা বিরক্ত হয়ে বলল -” আবার কি হলো?”
-” ইউ নিড রেস্ট। “
তানিশা যেন আকাশ থেকে আবার আকাশে পরলো।বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল -” আমি কি রেস্ট করছি না? দেখো আমি তিন চার ঘন্টা ধরে বসেই আছি। “
-” আমি শারীরিক না মানসিক রেস্টের কথা বলছি। তুমি একটু ঘুমাও।”
-” আমার তো এখন ঘুম পাচ্ছে না ডা.জোহান। এখানে তুমি আমার সাথে বেড়াতে যাচ্ছো। তাই আমি যা চাই তাই হবে। তুমি এখানে একদম ডাক্তারগীরি ফলাবে না। তাই এখন আমি ঘুমাবো না। বুঝলে?”
জোহান তার মাথা সামান্য ঝুকিয়ে সায় দিলো -“ওকে,ইউর হাইনেস।দাও আমি তোমার সিটটা ডিলে করে দিচ্ছি। “
তানিশা চোখ দিয়ে শাঁসালো । জোহান তা কেয়ারই করল না। তানিশার সিটটা মৃদু হেলিয়ে দিল। তানিশা কপাল কুঁচকে বিরক্ত প্রকাশ করলো। জোহান তা দেখে চমৎকার ভাবে হেসে একটা স্লিপিং মাক্স বের তানিশার হাতে দিলো।তানিশা দাঁত কিড়মিড় করে বলল -” আমি কি বলেছি?”
জোহান জবাবে বলল-” তাহলে কি বলেছো?”
তানিশা কটমট করে চেয়ে জেদ ধরে চোখের উপর মাক্সটা পরে থম মে*রে শুয়ে রইলো। জোহানও গা এলিয়ে দিয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ সময় কাটালো। প্লেনের ভোতা একটা শব্দ শুনে পাওয়া যাচ্ছে। জোহান তানিশার দিকে ফিরলো। তানিশা হাত ছড়িয়ে দিয়েছে। জোহান বুঝতে পারলো তানিশা সত্যি সত্যি ঘুমিয়ে গেছে। জোহান একটা পাতলা কম্বল জড়িয়ে দিলো তানিশার গায়ে।
************
নীল আকাশ জুড়ে পাঁজা পাঁজা তুলোর মতো মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। মেঘের ফাঁকে ফাঁকে তীব্র রোদও উকি দিচ্ছে। তানিশার চোখে জল জমে গেছে আকাশের পানে চেয়ে থেকে। তবুও চোখ সরাচ্ছে না।তানিশা লম্বা একটা শ্বাস নিজের মধ্যে টেনে নিলো।দীর্ঘ আড়াই বছর পরে দেশের মাটির ঘ্রাণ নিতে পেরে ভেতরে ভেতরে কতটা উচ্ছ্বাস অনুভব করছে তা সে ভাষায় প্রকাশ করতে পারবে না । সে এখন এয়ারপোর্টের বাইরে এসে দাড়িয়েছে।হঠাৎ ভীনদেশী যুবককের কন্ঠ শুনে তানিশার ধ্যানচ্যুত হলো।জোহান সান গ্লাসটা চোখে চাপিয়ে আকাশের পানে তাকিয়ে বললো -” ওয়াও ওয়াও ওয়াও।”
তানিশা ত্যাছড়া চোখে জোহানের দিকে তাকিয়ে খ্যাক করে উঠলো -” কি হয়েছে তোমার?”
জোহান শ্লেষাত্মক স্বরে শুধালো -” আকাশের পানে তাকাও প্রিন্সেস। এবং তাকিয়েই থাকো।কত সুন্দর আকাশ? বাহ!”
তানিশা কটমট করে তাকাতেই জোহান নিজের কোমড়ের উপর
হাত রেখে বলল -” তোমার দেশের আকাশটা অনেক সুন্দর ভালো কথা। কিন্তু প্রিন্সেস পাক্কা বিশ মিনিট তুমি তা দেখে ফেলেছো।এখন কৃপা করে কি তুমি ক্যাব বুক করবে? “
-“তোমার এতো তাড়া থাকলে নিজে করো। “
জোহান ঘাড় চুলকে বললো -” তোমার কি মনে হয় আমি তা চেষ্টা করিনি? আরে ওরা তো আমার কথা বুঝতে পারে না। উল্টো আমার নিদারুণ চেহারা দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। “
তানিশা চোখ উল্টে বলল -” ইসস! আধিখ্যেতা। চলো আমার সাথে সাথে।”
তানিশা তার লাগেজ রেখে যাচ্ছে দেখে জোহান পিছন থেকে চেঁচিয়ে উঠলো -” তোমার লাগেজ কে নিবে?”
তানিশা পিছন ফিরে শুধালো -“ওয়াই? হোয়াট আর ইউ ডুয়িং? “
জোহান তানিশার অভিব্যক্তি দেখে বলল-” ওকে।আই’ল ব্রিং দ্য লাগেজ।”
*******************
পড়ন্ত বিকেল। সারি সারি মেঘের আগ্রাসী লাল দূতি লেগে লাল হয়েছে মেঘও। চমৎকার সেই দৃশ্যের পানে স্থীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ফাহিম মর্তুজা। এই সময়টা তার অত্যাধিক পছন্দ। ফাহিমের হঠাৎ ধ্যানচ্যুত হলো গাড়ি শব্দে। ছাঁদ থেকে নিচে গেইটের পানে দৃষ্টিপাত করলো সে। একটা ক্যাব এসে দাড়িয়েছে সেথায়। ফাহিমের কৌতুহলী চোখ চেয়ে থাকলো। গাড়ি থেকে প্রথমে একজন রমনী নেমে এলেন। পরনে তার নীল রাঙা শারী। চুল গুলো কাধ পর্যন্ত।বব কাট করা। রমনীর পিছন দিকটাই ফাহিমের কাছে দৃশ্যমান। মেয়েটা ঝুকে যখন ড্রাইভারে সাথে কথা বলছিল তখন গাড়ির ওপর পাশের দরজা খুলে একজন ভীনদেশী যুবককে নেমে আসতে দেখা গেলো।ফাহিম ভ্রু কুঞ্চিত করে ফেললো ভীনদেশী কারো আগমনে। ফাহিম খানিকটা ভাবনায় পরে গেলো মাইশার বিয়েতে ভীনদেশী কারো দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল কিনা।ভীনদেশী যুবকটা গাড়ি থেকে লাগেজ গুলো টেনে নামালো। মেয়েটা ড্রাইভারে সাথে কথা বলা শেষ করে যুবকটাকে সাহায্য করলো। লাগেজগুলো নামিয়ে যখন মেয়েটা ভীনদেশী যুবককে কিছু একটা বলে তাদের বাড়িটা দেখালো তখন, সেই মূহুর্তে ফাহিম মেয়েটার চেহারা দেখতে পেলো।ফাহিম স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ হয়ে গেল।স্থীর দৃষ্টিতে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল সেই দিকে। ফাহিমের বুকটা ডিপ ডিপ করে আন্দোলন তুললো। হঠাৎ সিড়ি ঘরের দরজা খুলার শব্দ তার ধ্যান ফিরল।ফাহিম পিছন ফিরে দৌড়াতে লাগল।ফারহান ফাহিমের সঙ্গে খানিকক্ষণ আড্ডা দেওয়ার জন্য ছাঁদেই যাচ্ছিল। আকস্মিক শান্তশিষ্ট ভাইটাকে এভাবে দৌড়াতে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল -” কি হয়েছে তোমার?”
ফাহিম ব্যস্তভঙ্গিতে অস্পষ্ট ভাবে জবাব দিল -” তানু।”
তানু শব্দটা উচ্চারণ করে ফাহিম দুই তিন সিড়ি অল রেডি নিচে চলে গেছে। ফারহান ফাহিমের কথা বুঝতে না পেরে দুই সিড়ি বেয়ে নিচে এসে চেঁচিয়ে বলল- ” আরে! বুঝি নাই তো!”
ফাহিমের কন্ঠ ভেসে এলো নিচ থেকে -” বেকুব তানু এসেছে। “
ফাহিমের কথা শুনে ফারহানের বুক ধক করে উঠলো। তার কি যে হলো সে নিজেই অনুধাবন করতে পারলো না। ফাহিমের সাথে দৌড়াতে লাগল।একলাফে দুই তিন সিড়ি নিচে চলে গেলো। ঘরকোনো ফাহিমকে ছাড়িয়ে গেল। ড্রইং রুম পার হওয়ার সময় মানজুম আরাকে পাশ কে*টে গেলো।মানজুম আরা দুই পুত্রের এহেন দৌড় দেখে ভীষণ কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন -” কি রে? তোদের আবার কি হলো?”
ফারহান দৌড়াতে দৌড়াতেই উত্তর দিলো -” তানু! তানিশা এসেছে। “
মানজুম স্তব্ধ হয়ে রইলেন। তারপর ভাবলেন হয়তো ওরা মজা করছে ওনার সাথে তাই ধমকে বললেন-” তোদের ফাজলামো শেষ হবার নয়। তাই না? যা তা বকে যাস। তানিশা তো সাফ সাফ না করে দিয়েছে।সে আসতে পারবে না। “
ড্রইং রুমে একা দাঁড়িয়ে মানজুম আরাকে বক বক করতে দেখে সুলতানা হায়দার বলেন -” কি হয়েছে ছোট আপা? “
মানজুম আরা মাছি তাড়ানোর মতো করে বললেন -” আরে! ওই ছেলে গুলোর মসকারা শেষ হয় না। বল কিনা তানু…. “
-” তানু? কি হয়েছে আমার তানুর? কে বলেছে তানুর কথা? “
মানজুম আরা অবাক হলেন। ওনার কথা শেষ হবার আগেই সুলতানা হায়দারকে এতো ব্যাকুল হতে দেখে। মানজুম ভ্যাকাচেকা খাওয়া গলায় আমতা আমতা করে বললেন -” ফাহিম ব..।”
ফাহিমের দিকে ইশারা করে হাত তুলতেই সুলতানা সেদিকে তাকিয়ে দেখলেন ফাহিম মেইন দরজায় দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে কিছু দেখছে বাইরে। সুলতানা মানজুমকে কিছু বলতে না দিয়ে দ্রুত কদমে ফাহিমের কাছে গিয়ে কিছু বলার আগেই ফাহিম বলে উঠলো -” ছোট মা! সামনে তাকাও। “
সুলতানা হায়দার ঘাড় ঘুরিয়ে সামনে তাকিয়ে বাকরুদ্ধ হলেন। কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে আস্তে আস্তে ফাহিমের পানে ফিরলেন। মৃদু স্বরে ফাহিমকে শুধালেন -” তুমি কি তাই দেখছো ফাহিম, যা আমি দেখতেছি?”
ফাহিম সুলতানা হায়দারের মুখে তাকিয়ে চোখ বুজে সায় দিলো। ততক্ষণে মানজুর আরা সাথে আসফিয়া আইরাও এসে দাড়িয়েছেন দরজার সামনে। মানজুম আরা বাড়ির প্রবেশ পথে দৃষ্টি রেখে চিৎকার করে উঠলেন -” আমার মেয়ে!”
*********
তানিশা গাড়ি ভাড়াটা মিটিয়ে লাগেজ নামাতে জোহানের সাহায্য করলো। জোহান চমৎকার হাসি উপহার দিলো। জোহানের হাত থেকে নিজের লাগেজ নিয়ে নিলো তানিশা। দীর্ঘ শ্বাস ফেলে নিজের ছোট্ট প্রসাদতুল্য বাড়ির পানে তাকাল। মাইশার বিয়ের জন্য হয়তো নতুন রং দিয়েছেন। পুরো বাড়ি সাদা রং দেওয়ায় ঝলমলে দেখাচ্ছে। জোহান পাশ থেকে বলে উঠলো -” ফাইনালি, আই কুড সি মাই প্রিন্সেস’স প্যালেস ইন পার্সন।”
তানিম ক্ষীণ হাসলো। -” ভেতরে চলো। প্রিন্সেসের রূপকথার গল্পও জানবে তার প্রতিটা চরিত্রের সাথে দেখাও করবে। “
জোহান শাহী ভঙ্গিতে সামান্য ঝুকে বললো-” ইয়েস,ইউর হাইনেস। “
তানিশা মুখ কুঁচকে বললো-” এসব ঢং তুমি আমার ভাইয়ের সামবে করো। মে*রে তক্তা বানিয়ে দিবে। “
জোহান নিজের শার্টের কলার ধরে টান দিয়ে জবাব দিলো -” দেখো তোমার ভাইদের মন আমি কিভাবে জয় করি। “
-” হ্যা, হ্যা দেখা যাবে। এসেই তো গেছি।” বলে তানিশা লাগেজ টেনে বাড়ি সামনে বড় কালো গেইটায় ঠুকা দিলো। দাড়োয়ানের চেহারাটা তানিশার কাছে নতুন। দাড়োয়ান প্রথমে চেনেনি তাকে।পরে পরিচয় দিতে গেইট খুলে দিলো। তানিশা জোহানকে নিয়ে বাড়ির সামনের বড় আঙ্গিনায় মধ্যখানি আসতেই কেউ একজন উল্কার গতি এসে তানিশাকে জড়িয়ে ধরল। তানিশা হকচকিয়ে গেল এহেন আক্রমণে। ফারহান তানিশাকে শূন্য তুলে নিয়েছে। হঠাৎ এভাবে একটা ঘটনা সে তার আবেগ লুকিয়ে রাখতে পারছে না। জোহান ভ্রু কুঁচকে ভাই বোনদের কান্ড দেখছে।তানিশা হেসে ফেললো -” আরে আরে! নিচে নামা ভাইয়া। “
ফারহান তানিশাকে নিচে নামিয়ে দিলো।দৌড়ে আসার ফলে সে মৃদু হাঁপাচ্ছে। -” আসবি,, আসবি বললি না কেন? “
-” বললে কি আর সারপ্রাইজ দিতে পারতাম?”
ফারহান বিরক্তি প্রকাশ করে বললো -” আজব! সবাইকে দে, আমাকে দেওয়ার মানে কি? “
-“তুমি সবার থেকে আলাদা বুঝি?”
ফারহান জবাব দেওয়া আগেই পিছন থেকে মানজুম আরার চিৎকার শুনা গেলো। তানিশা দরজার পানে দৃষ্টিপাত করল। দরজার সামনে সবাই এসে দাড়িয়েছেন। তানিশা সুলতানা হায়দারের দিকে তাকাল। সুলতানা হায়দার স্থির দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছেন। চশমার কাঁচ ভেদ করে চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে। চোখদুটো কি একটু ছলছল? হয়ত! এমন স্ট্রং মহিলার এই সামান্য চোখ ছলছলই হয়ত আবেগি মানুষের হাউমাউ করে কান্নার সমান । মানজুম আরা তানিশাকে জড়িয়ে ধরেতেই তানিশা দৃষ্টি সরালো। মানজুম আরা তানিশার কপালে চুমু এঁটে দিয়ে মুখে মাথায় হাত বুলিয়ে সন্ধিহান কন্ঠ বললেন -” তুই নাকি? “
তানিশা মুচকি হাসি দিয়ে সায় দিলো -” হ্যা, আমিই মেজোমা।”
হঠাৎ ওনার মুখ ভঙ্গিতে চিন্তিত ভাব ফুটে উঠলো -” তোকে কেমন জানি লাগছে? ” কথাটা বলে মানজুম আরা সুরু চোখে তানিশাকে দেখে চেঁচিয়ে উঠলেন -” তোর চুল! তোর চুল কই? এই মেয়ে চুল কাটছোস কেন? এতো সুন্দর চুল। “
পাশ থেকে আসফিয়া ধমক দিলেন মানজুম আরাকে -” কি শুরু করলে মানজুম? মেয়েটাকে ভালো মন্দ জিজ্ঞেস না করে এসব বলছো!এসব দেখার কি সময় পাবে না? “
তানিশা এগিয়ে গিয়ে আশফিয়া খানমকে জরিয়ে ধরল -” বড়মা! “
-” কেমন আছিস রে মা? আসতে অসুবিধা হয়নি তো? আমাদের আগে জানাবি না? যে তুই আসবি। “
-” কোনো অসুবিধা হয়নি। দেখো আমি সহিসালামত এসে গেছি।”
-“হেইইইই! এখানে কিসের এতো ভজঘট চলছে। “
কথাটা শুনে তানিশা হাপুস নয়নে উপরে তাকাল।দুই তালার বারান্দায় থেকে মাইশা কথাটা বলেছে। তানিশার সাথে মাইশার চোখাচোখি হলো। মাইশা কেমন থম মে*রে দাঁড়িয়ে থাকলো। হঠাৎ নিমিষেই বারান্দা থেকে ভ্যানিস হয়ে গেল।তানিশা ঘরের মেইন দরজার দিকে তাকিয়ে থাকল।খানিকক্ষণ পরেই একটা আলোতালো মেয়েকে আসতে দেখা গেল। মাইশার অবস্থা দেখে তানিশা হতাশ হলো। এই মেয়েটার কিছুদিন পরে নাকি বিয়ে। মাইশা “আআআআআআ”করে চিৎকার করতে করতে তানিশার উপর ঝাপিয়ে পরলো। মাইশার ভরে তানিশা পিছনে দিকে হেলে পরতে নিলে পিছন থেকে জোহান ধরল।
তানিশা নিজেকে সামলে নিয়ে বললো-” আরে! কি করছো ছোট আপি? পরে যাবো তো।”
মাইশা তানিশার দুই বহু ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল-” মিথ্যা বললি কেন আমাকে? বললি আমার বিয়েতে আসবি না। তোর হ্যানত্যান।হ্যা! কেন বললি? আমি কষ্ট পেয়েছি জানিস না? “
তানিশা ক্ষীণ হাসলো। -” সারপ্রাইজ দিবো বলে বলিনি। এখন দেখো তোমাকে কেমন চমকে দিলাম? “
মাইশার রেগে তানিশাকে আর কিছু বলবে তার আগে তার দৃষ্টি তানিশার পিছনে ভীনদেশী সুদর্শন যুবকের উপর পরলো। লম্বা চওড়া দেহের অসম্ভব সুন্দর একজন পুরুষ। ইন করা নেভি ব্লু শার্ট সাদা জিন্স প্যান্ট পরনে পুরুষ যেন দূর থেকেও মেয়েদের চোখ কাড়তে সক্ষম। জোহান এখন একহাত তানিশার পিছনে দিয়ে রেখেছে। বলা তো যায় না এই মেয়ে যে অবস্থা লাগিয়েছে আবার না তানিশাকে ফেলে দেয়। মাইশা কপাল কুঁচকে বলল -” এটা আবার কে? “
মানজুম আরা আর আসফিয়া খাতুন এতোক্ষণ উৎসুক দৃষ্টিতে জোহানের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।মানজুম আরা তো মনে মনে ছক কষেই ফেলেছেন। ভীনদেশী জামাই পেলেন বলে।
মাইশার কথায় তানিশা জোহানের দিকে ইশারা করে বললো -“ওহহ হ্যা। ও আমার বন্ধু জোহান। জোহান খ্রিস্টিয়ানো।”
জোহান হাত উচিয়ে সবাইকে হাই দিলো। মানজুম আরা বিস্মত হয়ে চোখ বড় বড় করে বললেন -” খ্রিস্টান? “
-“হ্যা।”
মানজুম আরা মুখ মিইয়ে গেল।মাইশা ভ্রু কুচকে বলল-” এ তোর বন্ধু? বয়স তো তোর থেকে বেশি। পড়াশোনা শেষ করে ফেলেছে দেখে লাগছে। “
-“হ্যা। ও একজন ডাক্তার। “
জোহান মাইশার দিকে তাকিয়ে তানিশাকে জিজ্ঞেস করল -” প্রিন্সেস,ইজ শি ইয়োর সিস্টার মাইশা?”
জোহানের কথা শুনে মাইশার বিস্ময় আকাশচুম্বী হলো। ছানাবড়া চোখ নিয়ে জিজ্ঞেস করল -“ওওও ও তোরে প্রিন্সেসও ডাকে?”
চলবে………….