গল্প: অপেক্ষার প্রহর (০১)

লেখিকা :ফাতেমাতুজ নৌশি

পর্ব:০১

গরম খুন্তি হাতে চেপে ধরতেই চিৎকার করে উঠল শিমাত। হাতে একটা দাগ পড়ে গেছে। ব্যথায় শরীর কেঁপে উঠে। গায়ে জ্ব র থাকা তে আরো বাজে অবস্থা হয়। দু চোখ ফেঁটে অশ্রু গড়ায়। আহ বলে আ র্ত নাদ করে উঠে মেয়েটা। শিমাতের আ র্ত নাদে আরো বেশি রেগে গেলেন বিলকিস। শিমাতের চুল মুঠি করে ধরলেন,”বা ন্দী। সকাল বিকাল পড়ে পড়ে ঘুম। তোর ম রা মা সব কাজ করব?”

সব গুলো পর্বের লিঙ্ক

“ব্যথা পাচ্ছি আম্মা।”

“বা ন্দী তোর কোন কালের আম্মা আমি? উঠ, কাজ কর। বাপে ম রছে তো বহুদিন হলো তবু ও শোক পালন গেল না। উঠ বা ন্দী র বাচ্চা।”

প্রচন্ড ব্যথার শরীরে চুলের মুঠি ধরাতে ন র ক য ন্ত্র না অনুভব হয়। এদিকে হাতে খুন্তি ধরাতে ফো স্কা পড়ে গেছে। অসহ্য য ন্ত্র নায় আবারো আ র্ত নাদ করে উঠে শিমাত। বিলকিস নিজের সর্ব শক্তি দিয়ে ধা ক্কা দেয় শিমাত কে। মেঝে তে পড়ে গিয়ে হাতে ব্যথা পায় শিমাত। ফো স্কা পড়া স্থানে আ ঘা ত লাগায় আরো ব্যথা অনুভব হয়। মুখ দিয়ে অনিচ্ছায় আ র্ত নাদ বেরিয়ে আসে। সেই আ র্তনা দ বিলকিসের কানে আসতেই বলেন
“বা ন্দীর বাচ্চা, নাটক করছ। এই টুকু ফো স্কা পড়াতে রঙবাজি শুরু করছস। উঠ বা ন্দী।”

শিমাতের শরীরে লাথি মে রে চলে যায় বিলকিস। হাঁটু তে থেতলে গেছে। ব্যথায় শরীর নাড়াতে পারে না। ঢেবিলের পায়া ধরে উঠে দাঁড়ায় শিমাত। কোনো মতে চলে আসে বাইরে। এক পলক তাকিয়ে বিলকিস বলেন
“রান্না ঘরে বাসন আছে। খালপাড়ে নিয়া সব ধুয়ে নিবি আর শোন বাড়ির পেছনের উঠানে অনেক ময়লা জমছে সব পরিষ্কার করবি।”

“আচ্ছা,আম্মা।”

রান্না ঘর থেকে বাসন নিয়ে খালপাড়ে যায় শিমাত। পাশের বাড়ির নতুন বউ শিমাত কে দেখে আফসোস করে উঠে।

“আহা তোমার ভাগ্য অনেক খারাপ গো শিমাত। এমন
ন র কে পড়ে আছ কি করে আল্লাহ ই জানে।”

“কি করব ভাবি। এই বাড়ি ছাড়া তো আর কোনো যাওয়ার জায়গা নেই আমার।”

“কেন তোমার মামা বাড়ি নেই?”

“মামা বাড়ি আছে তবে বড়ো মামা আর ছোটো মামা আমাদের সাথে কোনো সম্পর্ক রাখে নি।”

“কেন?”

“আমার মামা বাড়ির অবস্থা স্বচ্ছল। বড়ো মামা আর ছোট মামার বেশ টাকা পয়সা থাকলে ও মেজো মামার তেমন টাকা পয়সা ছিল না। সে বছর ধানের আড়তে বিশাল লস হয়। মেজো মামার অবস্থা তখন ম রা র মতো। আমার মা তখন নিজের ভাগের সম্পত্তি মেজো মামা কে দিয়ে দেয়। মেজো মামা সব সম্পত্তি বিক্রি করে ব্যবসা শুরু করে। তখন আবারো লসের ভাগে পড়তে হয় মামা কে। আমার বাবার সাথে মেজো মামার দ্বন্দ্ব বেঁধে যায়। কারণ বাবার সাথে মায়ের কথা হয়েছিল মেজো মামার ব্যবসা দাঁড়ালেই মেজো মামা সব সম্পত্তি ফিরিয়ে এনে দিবে। কিন্তু তখন তো এমন টা সম্ভব হয় না। তখন বড়ো মামা আর ছোট মামা ও সবার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। মেজো মামা কে সম্পত্তি দেওয়াতে তারা খুব ক্ষো ভ প্রকাশ করে। সকলের সম্পর্ক ভে ঙে যায়। মেজো মামার সাথে কোনো সম্পর্ক রাখতে দেয় নি বাবা। তারপর পাশের গ্রামে ছোট্ট একটা সংসার গড়ে মেজো মামার। তার কিছু দিন পর ই মেজো মামার মেয়ে হয়। জুহির শরীর অসুস্থ থাকায় মেজো মামা সব বিক্রি করে যায় সদরে। তার পর আর কখনো ফিরে আসে নি। আর না আমাদের সাথে কোনো যোগাযোগ হয়েছে। তার বছর খানেক পর আমার মা মা রা যায়। তখন আমার বয়স আট বছর। মাস যেতেই বাবা বিয়ে করেন। আমার সৎ মা সাথে নিয়ে আসেন আমার বোন বিনি কে। বিনি আর আমি সমবয়সী। মোটামুটি ভালোই চলতে থাকে সব। মা কে ছাড়া কষ্ট হত তবে বাবা তখন খুব আদর করতে লাগল। আমার যখন ষোলো বছর তখন বাবা ও মা রা যায়।”

কথা গুলো বলার সময় চোখ থেকে পানি পড়ে যায় শিমাতের। একটু করে হাসে শিমাত। শিলা বলে
“চাচা থাকতে ও কি তোমার সৎ মা এমন করত?”

“করত তবে বাবা মা রা যাওয়ার পর অতিরিক্ত মা রে। আগে অনেক কাজ দিত আমি যদি না পারতাম তাহলে বকা দিত। আর বাবার কাছে মিথ্যে নালিশ দিত। বাবা সেসব পাত্তা দিত না। তবে একদিন বাবা আমাকে খুব মে রেছিল কারণ আম্মা বাবা কে বলেছিল আমি নাকি পাড়ার কোনো ছেলের সাথে নষ্টি ফষ্টি করে বেড়াই।”

“আহারে তোমার কপাল টা সত্যি ই খারাপ। খুব মায়া হয় গো তোমার জন্য। তবে কি করব বল।”

“দোয়া কোরো ভাবি।”

“হ্যাঁ করব। আচ্ছা তুমি এখন পড়াশোনা কর না?”

“কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম , তবে কলেজ যেতে দেয় না আম্মা। জানি না পড়াশোনা টা হবে কি না।”

শিলা কিছু বলবে তার আগেই ওর শাশুড়ির ডাক পড়ে। দ্রুত চলে যায় শিলা। দীর্ঘ শ্বাস ফেলে শিমাত। বাসন ধুয়ে নিয়ে যায় বাসাতে। বিলকিস আবারো চিৎকার করে উঠেন। গা লি গালাজ করতে থাকেন।
“কোন নাগরের সাথে কুকাম করতে গেছস ঘাটে? এত টাইম লাগে এই কয়টা বাসন পরিষ্কার করতে। হারামজাদী, বে শ্যা।”

“দুঃখিত আম্মা।”

“বান্দীর বাচ্চা আগে পেছনের উঠান পরিষ্কার কর। আর শোন বিনির মাথায় তেল দিয়া দিবি।”

“কিন্তু আম্মা বিনি তো তেল দিতে চায় না।”

“তোর এত ভাবা লাগব না। আমি যা বলছি তাই কর।”

“আচ্ছা।”

ক্লান্ত দেহ নিয়ে ঘরে যায় শিমাত। বাসন রেখে দিয়ে ঝাঁড়ু নিয়ে যায় পেছনের উঠানে। বিশাল বড়ো বাগান ওদের। নানান ফলের গাছ। বেশ মোটা টাকা আসে প্রতিবছর। তবে এর এক অংশ ও শিমাত কে দেয় না বিলকিস। অর্ধেক টাকা রেখে দেয় বিনির জন্য। আর অর্ধেক টাকা দিয়ে নিজেদের জন্য এটা ঐ টা কিনে আনে। কখনো শিমাত কে কিছু দেয় না। পুরনো নোংরা কাপড় জুটে শিমাতের কপালে। আগে অবশ্য এমন হত না। তবে পাঁচ বছর ধরে এমন হয়ে চলেছে। কারণ শিমাতের বাবা নাসিম আহমেদ সদরে কাজ করতেন তখন। তবে এক বছর আগেই কারখানায় ভয়াবহ আগুন লেগে মা রা যান তিনি। সেখান থেকে মাসিক ভাতা দেওয়া হয় যা দিয়ে সংসার চলে। তাছাড়া গ্রামের জমি আর দোকানের টাকা সম্পূর্ন জমা হয় বিনির জন্য।

বাগানের এক পাশে কয়েকটা অপরাজিতা ফুলের গাছ লাগিয়েছে শিমাত। বহুদিন হলো যত্ন নেওয়া হয় না। অযত্নে বেড়ে উঠা গাছ গুলো বেশ সুন্দর ফুল ফুটিয়েছে। বেশ ভালো লাগে শিমাতের। গাছের ফুলে হাত বুলায়। ঝুঁকে ফুলের গন্ধ নেয়। উঠার সময় চোখে পড়ে আম গাছের আড়ালে বিনি কে। গ্রামের মাতাল ছেলে মনসুরে সাথে ঘনিষ্ঠ অবস্থায়। শিমাতের আত্মা কেঁপে উঠে। বিনি এ কি ভুল করে চলেছে! মেয়েটার কোনো বিপদ হবে না তো এই আশংকায় বুক কেঁপে উঠে ওর। এগিয়ে যায় সেদিকে। শিমাত কে দেখে ঝটকা খায় বিনি। মনসুরের থেকে কয়েক হাত দূরে সরে যায়। হঠাৎ শিমাত আসায় যেন হতবুদ্ধি হারিয়ে ফেলে। শিমাত কে উদ্দেশ্য করে বলে
“তুই এখানে?”

“কাজ করছিলাম। তুই এখানে কি করছিস। দেখ বিনি মনসুর ভাই মানুষ টা ঠিক ঠাক নয়। চলে আয়।”

“কি বলতে চাচ্ছিস তুই?”

“এই যে তুই মনসুর ভাইয়ের চালে পা দিয়েছিস এটা ভুল। চল বাসায় যাবি।”

বিনি বুঝতে পারে শিমাত সব টা দেখে নিয়েছে। বিলকিস জানলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। তৎক্ষনাৎ বুদ্ধি বের করে বিনি। চিৎকার করে বলে
“মা ও মা দেখে যাও এখানে কি হচ্ছে।”

“কি করছিস টা কি বিনি ? আম্মা এসব দেখলে বকবে তোকে।”

“চুপ কর তুই। পাড়ার ছেলেদের সাথে নষ্টামি করে বেড়ানো হচ্ছে। আজকে তোর খবর আছে।”

বিনির কথা তে অবাক হয় শিমাত। মিথ্যে বলছে বিনি! শিমাত বলে
“কি সব বলে যাচ্ছিস তুই?”

“এটাই যে মনুসর ভাইয়ের সাথে ঝোপের আড়ালে নষ্টামি করছিলি তুই। আর আমি স্বচক্ষে দেখেছি তা।”

“বিনি!”

“চুপ কর। মা ও মা দেখে যাও আদরের দুলালি কি করেছে।”

বিনির চিৎকারে চলে আসেন বিলকিস। শিমাত বলে
“বিনি মিথ্যে বলছিস কেন?”

“মা দেখ এই দুলালি মনসুর ভাইয়ের সাথে নষ্টামি করছিল। আমি দেখে ফেলাতেই বলে আম্মা কে কিছু বলবি না। আমি তোমাকে ডেকেছি তাই এখন বলছে আমি নাকি মনসুর ভাইয়ের সাথে নষ্টামি করছিলাম।”

“মিথ্যে বলছিস কেন বিনি?”

আশে পাশে চোখ বুলিয়ে ঝাড়ু দেখতে পায় বিলকিস। শিমাতের শরীরে ঝাড়ুর আ ঘা ত পড়তেই শিমাত চিৎকার করে উঠে। জ্বরের শরীর তার উপর একটু আগের ফো স্কা পড়া হাতের ব্যথা। সব মিলিয়ে অসহনীয় যন্ত্রণা হয়। বিলকিস নিজের সর্ব শক্তি দিয়ে মা রে শিমাত কে। মনসুর মদ খাওয়া শরীরে ঢুলে। বিনি ইশারা করে চলে যেতে বলে। মনসুর চলে যায়। বিনি ব্যঙ্গ হাসে। মায়ের সাথে সাথে সে নিজে ও শিমাত কে আ ঘা ত করে। শিমাত বুঝতে পারে এ জীবনে অপেক্ষার প্রহর শেষ হবার নয়। ম র ন বুঝি আজ ঘনিয়ে এল। শিমাত খুব করে চাচ্ছে আজ তার মৃ ত্যু হোক। এ য ন্ত্র না সে আর নিতে পারছে না। চোখ দুটো বন্ধ হয়ে আসে। মুহূর্তেই জ্ঞান হারিয়ে তলিয়ে যায় শিমাত।

চলবে….

Leave a Comment