গল্প: অপেক্ষার প্রহর (০২)

লেখিকা: ফাতেমা তুজ নৌশি

পর্ব:০২

—————————

শিমাতের সমস্ত শরীর জুড়ে ব্যথা। সে বিছানা থেকে উঠতে পারছে না। এদিকে বিলকিস রে গে রুদ্রমূর্তি হয়ে আছেন। হাজার খানেক য ন্ত্র ণা নিয়েই উঠে পড়ল মেয়েটি। ধীরে ধীরে কাজ করতে লাগল। বিনি ঘরে বসে ফোন চাপছে। কিছু দিন পূর্বে তাকে ফোন কিনে দেওয়া হয়েছে।

সব গুলো পর্বের লিঙ্ক

“ঘর পরিষ্কার করছি। পা টা সরা।”

পা সরাল বিনি। কল পাড় থেকে পানি এনে ঘর মুছতে লাগল শিমাত। জ্বরের শরীরে পানি যেন ন র ক য ন্ত্র ণা। গত দিন মা র খেয়ে জ্ঞান হারিয়েছিল। তারপর তাকে পানি দিয়ে জাগানো হয়েছে। বিলকিসের মনে হয়ত তখন একটু মায়া জেগেছিল। তাই সেদিন কোনো কাজ করতে হয় নি। অথচ আজ ই মুক্তি নেই। সে ধীর স্থির ভাবে জায়গাটা পরিষ্কার করে ফেলল। তবে পুনরায় বিনি বাদামের খোসা ফেলল। ভেজা মেঝেতে মিশে রইল তা। বিলকিস তখন রান্না শেষ করে ঘরে এসেছেন। শিমাত কাজ শেষ করে গোসল করতে গিয়েছিল।

“হা রা মজা দী কই গেছে?”

“গোসলে গেছে মা। নবাবজাদী না।”

বিলকিসের দু চোখে আগুন। শিমাত গোসল করে সবে বের হয়েছে। তার কান ধরে টেনে আনলেন বিলকিস।

“কি করতেছিস তুই? একটা কাজ ঠিক মতো করিস না।”

শিমাত কিছু বলল না। তার শরীরের উত্তাপ ধীরে ধীরে বাড়ছে। তাই ব্যথাটা বেশি অনুভব হয়।

“আম্মা লাগছে।”

“লাগার জন্যেই তো দিচ্ছি। ঘর পরিষ্কার করতে বলছিলাম না?”

“করেছি তো।”

“তাইলে মেঝে ভরা বাদামের খোসা কেন?”

“বিনি ফেলেছে,আমি তো পরিষ্কার করেই গিয়েছিলাম।”

বিনি রুম থেকে তেড়ে এল। তার দু চোখে আগুন।

“মিথ্যে বলতেছিস কেন? মা, মা, জানো ও ইচ্ছে করে এমন করেছে।”

“আমি?”

বিনি একটা ধমক দিয়ে বলল‍,”চুপ কর তুই। মা কে সত্যিটা বল‍তেই হবে। মা জানো, ও আমার রুমে গিয়ে দেখেছে আমি ফোন চাপছি। তখন থেকে কেমন করে তাকাচ্ছিল। তারপরই ফোনটা হাতে নিয়ে বলল এটা ওকে দিয়ে দিতে। আমি দিব না বলেছি তাই বলেছে আমার রুম পরিষ্কার করবে না।”

সবটা শুনে বিলকিস চোখ মুখ কুঁচকে ফেললেন। শিমাত হতভম্ব। সে নিজের হয়ে সাফাই গাইবে সেই উপায় ও নেই। বিলকিস ম রা কান্না জুড়ে দিলেন।

“এইটুকু সহ্য হয় নাই তোর? তোর বাপে ম র ছে পর থেকে কত কষ্ট করে সংসার চালাই। আর ওরে ফোন কিনে দিছি দেখে এই রকম করতেছস? এই জন্যেই বলে পরের মেয়ে পর ই হয়। পেটের মেয়ে হতে পারে না কখনো।”

আরো কিছু কথা বলে চলে গেলেন বিলকিস। শিমাত দুঃখ পেল। বিনি সব সময় মিথ্যে বলে। আর বিলকিস ও তা বিশ্বাস করেন।

রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে শিমাত ভাবছিল কি করে কলেজে যাবে। পরীক্ষা সামনে। অথচ তার কোনো বই কেনা হয় নি। ক্লাস তো দূরের কথা। সে একবার ভাবল কলেজের সিনিয়রদের পুরনো বই গুলো সংগ্রহ করবে। তবে সেটার জন্য তো কলেজ যেতে হবে। সারা রাত নির্ঘুম কাটাল সে। পড়াশোনার প্রতি ভালো লাগাটা বুঝি ভালো লাগাই থেকে যাবে। বিলকিস কি তাকে পড়তে দিবেন? জ্বর কমেছে বিধায় সকাল সকাল উঠে পড়ল শিমাত। তার দৈনিক কাজ গুলো সেরে ফেলল। যাতে বিলকিস তাকে কাজের বাহনা দিয়ে কলেজ যেতে নিষেধ না করতে পারেন। দশটার দিকে কলেজে পৌছাল সে। মেধাবী ছাত্রী হওয়ায় কলেজের সামান্য যে খরচ সেটাও দিতে হবে না তাকে। তবে বই তো কিনে দিবে না কেউ। সে ঘুরে ঘুরে সিনিয়রদের সাথে যোগাযোগ করল। একটা মেয়ে তাকে পুরনো বই দিবে বলে জানাল। শিমাতের চোখে জল চলে এল। সে মেয়েটির সঙ্গে চলছিল। ওমন সময় একটা গাড়ি পাশ দিয়ে চলে গেল। গতরাতে বৃষ্টি হয়েছিল। রাস্তা ঘাটে পানি জমে আছে। সেটা লাগল শিমাতের গায়ে। তার জামাটা নষ্ট হয়ে গেল। এখন খুব খারাপ লাগা কাজ করছে। কিছু সময় যেতেই একটি ছেলে বের হয়ে এল।

“সরি,আপনার জামাটা নষ্ট হলো।”

শিমাত কিছু বলল না। ছেলেটা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,”আপনার জামাটা পরিষ্কার করিয়ে নিবেন। এটা রাখুন।”

পাঁচশ টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে চলে গেল ছেলেটা। শিমাত অবাক হয়ে তাকিয়ে। সে কি টাকা চেয়েছে?

মেয়েটি তাকে পুরনো বই এনে দিল। তবে সমস্যা হচ্ছে এত বই নিয়ে যাওয়া সম্ভব না। হাতে তো টাকা নেই। তাই ভ্যান ও নিতে পারবে না। তখনই মনে পড়ল ছেলেটার দিয়ে যাওয়া পাঁচশ টাকার কথা। কিন্তু সে এই টাকাটা ফেরত দিবে ভেবেছিল। তারপরই মনে হলো এখন বই গুলো নিয়ে যাওয়া দরকার। টাকার কথা পরে ভাবা যাবে। এই ছেলের সাথে আর কখনো দেখা হবে এমন নিশ্চয়তা ও নেই। ভ্যান নিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করতেই বিনি ডেকে উঠল।

“মা, ও মা দেখে যাও কি হয়েছে।”

বিলকিস তড়িঘড়ি করে বের হলেন। ভ্যান সহ শিমাত দেখে ওনি অবাক হলেন। বই কেনার টাকা পেল কোথায়?
বই গুলো নামিয়ে দেওয়ার পর ভ্যান ভাড়া মিটিয়ে দিল শিমাত। পাঁচশ টাকার নোট দেখে আরো বেশি অবাক হলেন বিলকিস। তিনি ভাবলেন শিমাত বুঝি না বলে টাকা নিয়েছে। তাই রাগান্বিত হলেন।

“চুরি করছিস তুই?”

শিমাত কিছু বলবে তার পূর্বেই বিনি বলল,”এত বই কিনে এনেছে। চুরি না করলে টাকা পাবে কোথায়?”

বিলকিস এবার আরো রেগে গেলেন। চট করেই চ ড় বসিয়ে দিলেন। শিমাতের কান্না পেল। সে গালে হাত বুলিয়ে বলল,”চুরি করি নি আম্মা। এক আপুর পুরনো বই এগুলো।”

বিলকিস এবার ভালো করে তাকালেন। সত্যিই পুরনো বই। তবে বিনি ছাড়ল না।

“পাঁচশ টাকা পেলি কোথায় তুই? নিশ্চয়ই চুরি করেছিস।”

শিমাত এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারল না। বিলকিস টাকা পয়সা গুনে রাখেন না। তাই তিনি বিশ্বাস করলেন শিমাত টাকাটা চুরি করেছে। অথচ শিমাত বলছে সে নেয় নি। তবে কোথায় পেল সেটাও বলতে পারছে না। বিনি ওর খুচরো টাকাটা ছিনিয়ে নিয়ে গেল। শিমাতের দুঃখ হলো। এই দুনিয়ায় সৎ মা আর বোন এমন কেন হয়? এরা কেন আপন হয় না?

সেদিন খুব কান্না করল শিমাত। তার খুব খারাপ লাগছিল। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় হারিকেন জ্বালিয়ে আনল। সেই আলোতে ওর মুখটা কেমন শুকনো দেখায়। হলুদ আলোয় শুকনো মুখটা দেখা যাচ্ছে। আয়না থেকে নজর সরাল সে। তারপর বই নিয়ে বসল। শেষ রাতে খুব বৃষ্টি হলো। বৃষ্টিতে ভেসে গেল চারপাশ। এক রাতের বৃষ্টিতেই বড়ো রাস্তায় পানি জমে গেছে। শিমাত মাছ ধরতে ভালোবাসে। আর এই পানিতে মাছ ও পাওয়া যায় খুব। সে বিলকিস কে বলে মাছ ধরতে গেল। বড়ো রাস্তায় এসে দেখল কৃষ্ণচূড়া গাছ থেকে পানিতে ফুল পড়ে বিছিয়ে আছে। তার মন ভালো হয়ে গেল। সে ফুল কুড়িয়ে নিয়ে মাথায় দিল। তারপর পানিতে তাকাল। নিজেকে দেখতে আজ ভালো লাগছে। যখন সে মাছ ধরার জন্য ঝাঁকি জাল ঠেলবে তখনই দেখতে পেল সেদিনের সেই নীল গাড়িটা। রাস্তায় পানি উঠেছে দেখে গাড়িটা থেমে গেল। তারপর দুজন যুবক বেরিয়ে এল। এরা যে গ্রামের নয় তা বেশ বোঝা যাচ্ছে। শিমাত চোখ সরিয়ে নিল। টাকাটা ফেরত দিতে চেয়েছিল সে। লোকটার সাথে দেখাও হলো। তবে টাকা ফেরত দেওয়ার মতো টাকা তার নিকট নেই।

“এক্সকিউজ মি।”

শিমাত শুনেও না শোনার মতো করে রইল। ছেলেটা পুনরায় বলল,”মিস শুনছেন? আপনি এখানে কি করছেন?”

শিমাত না তাকিয়েই বলল,”মাছ ধরছি।”

ছেলেটা মুখ দিয়ে ওয়াও শব্দটি উচ্চারণ করল।

“একটু শুনবেন।”

শিমাত কথা বলল না। ছেলেটার সাথে থাকা অন্য ছেলেটা বলল,”রেহান, এখানে শুধু শুধু সময় নষ্ট হচ্ছে। সে কথা বলতে আগ্রহী নয়।”

রেহান হেসে বলল,”ব্রো ওয়েট। মিস একটু এদিকে আসবেন।”

শিমাত উঠল না। এবার ইয়াজ রাগান্বিত বোধ করছে।

“কথা তো বলছে না। দেখছিস না?”

“দাঁড়াও না।”

“থাক তুই। আমি যাচ্ছি।”

ইয়াজ চলে গেল। রেহান একটু এগিয়ে এসে বলল,”মিস একটু সাহায্য প্রয়োজন।”

শিমাত এবার বলল,”বলেন।”

“বড়ো মসজিদে যাওয়ার অন্য কোনো রাস্তা আছে?”

শিমাত রাস্তা বলে দিল। রেহান হেসে থ্যাংকস বলতে গিয়েই থেমে গেল। একটু মনে করে বলল,”আপনি কি সেদিনের মেয়েটা?”

শিমাতের হৃদয় ধক করে উঠল। রেহান আরেকটু এগিয়ে বলল,”আপনি ই তো সে।”

এবার খুব অপ্রস্তুত বোধ করছে শিমাত। রেহান হয়ত আরো কিছু বলত। তবে গাড়ির হর্ন বেজে উঠায় সে বলল,”যাই হোক, বলার জন্য থ্যাংকস।”

চলবে….

Leave a Comment