RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) -
Erotic Lovers - 09-24-2026
১১
প্রশ্নটা করেই আমি বুঝলাম, কাজটা ঠিক হলো না। একজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের ড্রয়িংরুমে বসে, তার দামি সোফায় হেলান দিয়ে, তার বৈবাহিক জীবনের সবচেয়ে সেনসিটিভ একটা বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করাটা স্রেফ অভদ্রতা নয়, রীতিমতো গণ্ডমূর্খের কাজ। আমি একজন অনুবাদক হতে পারি, কিন্তু তাই বলে অন্যের জীবনের এমন একটা প্রাইভেট চ্যাপ্টার নিজের ভাষায় অনুবাদ করার অধিকার আমার নেই। আনিকার মুখের ওপর নেমে আসা সেই বিব্রতকর ছায়াটা দেখে আমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। আমি যে খুব সুকৌশলে উনার মনে আমার সম্পর্কে একটা ‘ম্যাচিউর’ আর ‘ইন্টেলেকচুয়াল’ ইমেজ দাঁড় করিয়েছিলাম, একটা মাত্র বোকা প্রশ্নে সেটা এখন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার উপক্রম।
আমি আর এক সেকেন্ডও দেরি করলাম না। দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য গলার স্বর খাদে নামিয়ে বললাম, "আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি আনিকা। আমার আসলে এই প্রশ্নটা করা উচিত হয়নি। প্লিজ, ইগনোর দা কোয়েশ্চেন।" আনিকা উনার চায়ের খালি মগটা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আবার আমার চোখের দিকে তাকালেন। উনার মুখের পেশিগুলো একটু রিল্যাক্সড হলো। উনি একটা হালকা, ক্যাজুয়াল হাসি দিয়ে বললেন, "আরে না না, ইটস ওকে রাশেদ। এত অ্যাপোলজাইটিক হওয়ার কিছু নেই। জানতে চাইতেই পারেন। এটা তো আর কোনো স্টেট সিক্রেট না।"
উনি সোফায় নিজের বসার ভঙ্গিটা একটু পরিবর্তন করলেন। পা মুড়ে বসার কারণে উনার ঢিলেঢালা প্লাজোটা হাঁটুর ওপর থেকে আরেকটু সরে গেল। ফর্সা, মোলায়েম ঊরুর একটা সামান্য অংশ আলোয় আমার চোখের সামনে উঁকি দিল। আমি অনেক কষ্টে দৃষ্টিটা ওখান থেকে সরিয়ে উনার মুখের ওপর স্থির রাখলাম। "আসলে কী জানেন," আনিকা খুব শান্ত গলায় বলতে শুরু করলেন, "আমাদের সমাজের একটা কমন পারসেপশন হলো, বিয়ে হলেই বছর দুয়েকের মধ্যে একটা বাচ্চা নিতে হবে। কিন্তু লন্ডন বা ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড কান্ট্রিগুলোর রিয়েলিটি একটু ভিন্ন। আমি আর বেলাল— আমরা দুজনেই আমাদের ক্যারিয়ার নিয়ে প্রচণ্ড ব্যস্ত। বেলাল ওর ইউনিভার্সিটির টেনিউর ট্র্যাক, রিসার্চ, পাবলিকেশন— এসব নিয়ে দৌড়াচ্ছে। আর আমি আমার আইটি ফার্মটা মাত্র দাঁড় করালাম। এর পাশাপাশি আমার লেখালেখি আছে।"
আমি খুব বাধ্য ছাত্রের মতো মাথা নাড়লাম। "বুঝতে পারছি।"
"বাচ্চা নেওয়াটা তো শুধু বায়োলজিক্যাল একটা প্রসেস না রাশেদ," আনিকা একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "ইটস আ হিউজ প্রজেক্ট। বাচ্চা হলে তাকে সামলানো, তার রেসপনসিবিলিটি নেওয়া, প্রপার প্যারেন্টিং— এগুলো খুব টাফ জব। আমরা মনে করি, একটা শিশুকে পৃথিবীতে আনার আগে নিজেদের মানসিক, আর্থিক এবং পারিপার্শ্বিক প্রস্তুতি শতভাগ থাকা উচিত। আমরা দুজনেই এখন যে ফেজে আছি, একটা বাচ্চা আমাদের দুজনের ক্যারিয়ারকেই চরমভাবে হ্যাম্পার করবে। তাছাড়া, প্যারেন্টিংয়ের জন্য যে সময়টা দেওয়া দরকার, সেটা আমরা এখন দিতে পারব না।"
আমি বললাম, "তা ঠিক। এখনকার দিনের প্যারেন্টিং আর আমাদের বাবা-চাচাদের আমলের প্যারেন্টিং এক না। আমাদের বাবা-মায়েরা দশটা বাচ্চা জন্ম দিয়ে মাঠে ছেড়ে দিতেন, বাচ্চারা প্রকৃতির নিয়মে বড় হয়ে যেত। এখন একটা বাচ্চার পেছনে যে পরিমাণ ইনভেস্টমেন্ট আর অ্যাটেনশন লাগে, সেটা একটা স্টার্টআপ কোম্পানি দাঁড় করানোর চেয়ে কোনো অংশে কম না।" আমার কথা শুনে আনিকা খিলখিল করে হেসে উঠলেন। উনার হাসির শব্দটা এই বিশাল ফ্ল্যাটের নিস্তব্ধতায় একটা মধুর সিম্ফনির মতো শোনাল। "এক্সাক্টলি!" আনিকা হাসতে হাসতেই বললেন। "স্টার্টআপ কোম্পানির সাথে খুব সুন্দর তুলনা দিয়েছেন। তো আমাদের প্ল্যান হলো, ক্যারিয়ারটা যখন একটা একদম সলিড, স্টেবল জায়গায় পৌঁছাবে, তখন আমরা এই ‘প্রজেক্টে’ হাত দেব। আপাতত আমাদের প্ল্যান হলো, চল্লিশের কোঠায় পৌঁছালে তারপর একটা বাচ্চা নেওয়ার ট্রাই করা। তখন আমাদের হাতে সময় থাকবে, ম্যাচুরিটি থাকবে।"
আমি মাথা নাড়লাম। লজিকটা খুব আধুনিক, খুব ক্যালকুলেটেড এবং আপার-মিডল ক্লাস ক্যাপিটালিস্ট সমাজের সাথে একদম মানানসই। সবকিছু এক্সেল শিটে ফেলে হিসাব করা। কখন প্রেম, কখন বিয়ে, কখন বাচ্চা, কখন রিটায়ারমেন্ট। কিন্তু আমার মাথার ভেতরে সেই বন্য, আদিম পুরুষটা তখনো ফিসফিস করে যাচ্ছিল। সে বলছিল— "রাশেদ, এই নারী একটা পারফেক্ট উর্বরতার প্রতীক। এর শরীরটা সৃষ্টি হয়েছে একটা নতুন প্রাণ ধারণ করার জন্য। আর তুই বসে বসে উনার সাথে প্যারেন্টিং প্রজেক্ট নিয়ে কথা বলছিস!" আমি আমার আদিম সত্তাকে ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে রাখলাম।
"আচ্ছা রাশেদ, একটা কথা বলুন তো।" আনিকা হঠাৎ উনার সোফা থেকে একটু আমার দিকে ঝুঁকে এলেন। উনার ঢিলেঢালা টি-শার্টের গলার কাছে যে শূন্যতা তৈরি হলো, আমি সচেতনভাবে সেদিকে তাকালাম না। আমি আমার অনুবাদক মস্তিষ্কের পুরোটা ফোকাস উনার প্রশ্নের দিকে দিলাম।
"কী কথা?"
"মানুষ আসলে কেন বাচ্চা চায়? হোয়াই ডু উই ওয়ান্ট টু রিপ্রোডিউস? আমি অনেককে দেখেছি, নিজে খেতে পারছে না, থাকার জায়গা নেই, কিন্তু ঠিকই বছর বছর বাচ্চা জন্ম দিয়ে যাচ্ছে। আবার অনেক বড় বড় ধনী মানুষ, যাদের সব আছে, তারাও পাগল হয়ে থাকে একটা সন্তানের জন্য। মানুষ কেন তার নিজের একটা প্রজন্ম পৃথিবীতে রেখে যেতে চায়?" প্রশ্নটা দারুণ। একটা আড্ডা যখন ব্যক্তিগত স্তর থেকে দার্শনিক স্তরে উন্নীত হয়, তখন সেই আড্ডার গভীরতা অন্য রকম হয়ে যায়। আনিকা নাওহার শুধু রূপবতীই নন, উনার মস্তিষ্কটাও খুব শার্প। আমি সোফায় একটু সোজা হয়ে বসলাম। গলাটা পরিষ্কার করে নিলাম। "এটা নিয়ে তো প্রচুর থিওরি আছে আনিকা। আপনি যদি রিচার্ড ডকিন্সের কথা ধরেন, তাহলে উত্তর খুব সহজ— আমাদের জিনগুলো অত্যন্ত স্বার্থপর। 'দ্য সেলফিশ জিন'। তারা শুধু চায় বেঁচে থাকতে এবং নিজেদের রেপ্লিকেট করতে। আমরা মানুষরা হলাম সেই জিনগুলোকে বহন করার একটা গাড়ি মাত্র। জিনের কমান্ডেই আমরা রিপ্রোডিউস করি।"
আনিকা মনোযোগ দিয়ে শুনছেন। উনার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে।
আমি বলতে থাকলাম, "কিন্তু আপনি যদি ফিলোসফিক্যাল অ্যাঙ্গেল থেকে দেখেন, তাহলে ব্যাপারটা অন্যরকম। মানুষ আসলে মৃত্যুভয়ে ভীত। আমরা সবাই জানি, আমরা একদিন মরে যাব। আমাদের এই অস্তিত্ব, এই নাম, এই পরিচয়— সব একদিন মাটির নিচে পচে যাবে। মানুষ অবচেতনভাবে এই মৃত্যুকে অস্বীকার করতে চায়। তারা চায় অমরত্ব বা ইমমর্টালিটি।"
"ইমমর্টালিটি?" আনিকা একটু ভ্রু কুঁচকালেন।
"হ্যাঁ। মানুষ যখন নিজের একটা সন্তান পৃথিবীতে রেখে যায়, তখন সে সাবকনশাসলি ভাবে যে— 'আমি মরে গেলেও আমার রক্তের একটা অংশ, আমার ডিএনএ-র একটা অংশ এই পৃথিবীতে হেঁটে বেড়াবে। আমি আমার সন্তানের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকব।' এটা মানুষের এক ধরনের অমরত্ব প্রজেক্ট। সাইকোলজিস্ট আর্নেস্ট বেকার তার 'দ্য ডিনায়াল অফ ডেথ' বইয়ে বলেছেন, মানুষের সমস্ত কর্মকাণ্ডের মূলে হলো এই মৃত্যুভয়। আমরা পিরামিড বানাই, বই লিখি, সাম্রাজ্য দখল করি, অথবা সন্তান জন্ম দিই— শুধু একটাই কারণে, মৃত্যুর পর যেন আমরা একেবারে মুছে না যাই।" আনিকা মুগ্ধ হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
আমি মনে মনে হাসলাম। ঢাকা শহরের মেসে থাকা ব্যাচেলরদের দুটো জিনিস খুব স্ট্রং থাকে— এক, গ্যাস্ট্রিক; আর দুই, ফিলোসফি। মাস শেষে পকেটে যখন টাকা থাকে না, তখন দার্শনিক হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায়ও থাকে না। "আমার কিন্তু আরেকটা থিওরি মনে হয়," আনিকা বললেন। উনার গলার স্বরে এখন গভীর চিন্তার ছাপ।
"কী থিওরি?"
"আমার মনে হয়, সন্তান জন্ম দেওয়াটা মানুষের চরম স্বার্থপরতার একটা রূপ। একটু আগে আপনি নিজেই বলছিলেন না, বাবা-মায়েরা চায় শেষ বয়সে সন্তান তাদের দেখভাল করুক? মানুষ আসলে এমন একজনকে পৃথিবীতে আনতে চায়, যে তাকে নিঃশর্তভাবে ভালোবাসবে, যে তাকে 'মা' বা 'বাবা' বলে ডাকবে, যাকে নিজের মতো করে ছাঁচে ফেলে গড়া যাবে। আমরা আসলে একটা নতুন প্রাণকে পৃথিবীতে ডাকি আমাদের নিজেদের শূন্যতা পূরণের জন্য। এটা কি খুব সেলফিশ একটা কাজ না?" আমি আনিকার দিকে তাকিয়ে রইলাম। উনার কথাগুলোতে একটা অদ্ভুত শূন্যতা আছে, যেটা উনার কবিতায় পাওয়া যায়। এই নারী উনার উপন্যাসের ভাষা নিয়ে যতটা না চিন্তিত, তার চেয়েও বেশি চিন্তিত মানুষের অস্তিত্ব নিয়ে। "আপনি ঠিকই বলেছেন আনিকা," আমি মৃদু স্বরে বললাম। "স্বার্থপরতা তো বটেই। পৃথিবীতে নিঃস্বার্থ বলে আসলে কিছু নেই। আপনি যে সন্তানকে জন্ম দিয়ে তাকে নিজের মতো গড়তে চাইছেন, সেখানেও আপনি আপনার ইগোকে স্যাটিসফাই করছেন।"
এভাবেই আমাদের আড্ডা চলতে লাগল।
বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে। আমরা সন্তান জন্ম দেওয়ার দর্শন থেকে শুরু করে লাতিন আমেরিকার সাহিত্য, স্প্যানিশ ভাষার অনুবাদ, ঢাকা শহরের ট্রাফিক জ্যাম, লন্ডনের বৃষ্টি, এবং মানুষের একাকিত্ব— সব কিছু নিয়ে কথা বলতে লাগলাম। আমি অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, এই নারীর সাথে কথা বলার সময় আমার কোনো মেকি আবরণ পরতে হচ্ছে না। আমি যেমন, আমি ঠিক সেভাবেই কথা বলছি। উনার উপস্থিতিতে আমার ভেতরের সেই আদিম, ক্ষুধার্ত পুরুষটা এখন একটা শান্ত, সমঝদার শ্রোতার রূপ নিয়েছে। উনার ঢিলেঢালা টি-শার্টের নিচে উনার শারীরিক আকর্ষণ আমাকে তখনো চুম্বকের মতো টানছে ঠিকই, কিন্তু উনার মাথার ভেতরের সৌন্দর্যটা আমাকে যেন আরও বেশি মোহগ্রস্ত করে ফেলল।
সময় কীভাবে কেটে যাচ্ছিল, আমি টেরই পাইনি।
আনিকার ফ্ল্যাটের সেন্ট্রাল এসি, নিস্তব্ধ পরিবেশ, ড্রয়িংরুমের এই মায়াবী স্পটলাইটের আলো আর উনার এই রিফ্রেশিং উপস্থিতি— সবকিছু মিলিয়ে আমি যেন একটা টাইম মেশিনের ভেতরে ঢুকে গিয়েছিলাম, যেখানে ঘড়ির কাঁটা কাজ করে না। হঠাৎ আনিকা কথা বলতে বলতে উনার হাতের আইফোনটার স্ক্রিন অন করে সময় দেখলেন। আমারও হঠাৎ হুঁশ হলো। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকালাম।
রাত প্রায় বারোটা বাজে!
বারোটা!
আমার চোখের সামনে থেকে নিমেষেই দর্শন, সাহিত্য, ইমমর্টালিটি প্রজেক্ট এবং আনিকা নাওহারের মোহনীয় মুখমণ্ডল মুছে গিয়ে সেখানে ভেসে উঠল মিরপুর দশ নাম্বারের সেই চারতলা মেস বাড়ির লোহায় জং ধরা বিশাল গেটটা। এবং সেই গেটের পাশে ডিউটি করা মফিজ দারোয়ানের পান খাওয়া মুখটা। আমি যেন কারেন্ট শট খেয়েছি, এমনভাবে সোফা থেকে ছিটকে উঠে দাঁড়ালাম।
"সর্বনাশ!" আমার মুখ দিয়ে অজান্তেই শব্দটা বেরিয়ে এল। আনিকা আমার এই হঠাৎ লাফিয়ে ওঠায় চমকে গেলেন। উনিও সোজা হয়ে বসে বললেন, "কী হলো রাশেদ? এনিথিং রং?"
আমি আমার প্যান্টের পকেট হাতড়ে ফোনটা বের করতে করতে বললাম, "প্রচুর রং! রাত বারোটা বেজে গেছে আনিকা! আড্ডা দিতে দিতে আমি তো সময়ের খেয়ালই করিনি। আমাকে এক্ষুনি বের হতে হবে। এক্ষুনি!" আনিকা অবাক হয়ে বললেন, "বারোটা বেজেছে তো কী হয়েছে? আপনি তো ছেলে মানুষ। আপনার তো আর ঢাকা শহরে কোনো কার্ফ্যু নেই। যাবেন রিকশা বা সিএনজি নিয়ে।"
"আপনি বুঝবেন না আনিকা," আমি হতাশ গলায় বললাম। "আমার কার্ফ্যু নেই, কিন্তু আমার মেসের কার্ফ্যু আছে। আমাদের মেসের গেট রাত সাড়ে এগারোটায় বন্ধ হয়ে যায়। আমি যদি এখন না যাই, আমি আজ রাতে আর মেসে ঢুকতে পারব না।" আনিকা হেসে উঠলেন। "আরে, গেট বন্ধ হয়ে গেলে কী হয়েছে? দারোয়ান নেই? দারোয়ানকে নক করবেন, খুলে দেবে।"
"আমাদের দারোয়ানের নাম মফিজ। সে কানে কম শোনে, আর একবার ঘুমালে কেয়ামতের শিঙা ফুঁকলেও সে ওঠে না। তাকে ডেকে তোলা আর মরা মানুষকে কবর থেকে তোলা একই কথা।"
"তাহলে আপনার রুমমেটদের ফোন দেবেন। ওরা তো নামতে পারে।" আনিকা খুব লজিক্যাল সমাধান দিলেন। আমি অসহায় ভঙ্গিতে আনিকার দিকে তাকালাম। "আনিকা, আপনি ব্যাচেলর মেসের সাইকোলজি জানেন না। আমার মেসে তিনজন থাকে। রাজু, যে বিসিএস পরীক্ষার্থী। সে রাত জেগে পড়ে আর দিনে ঘুমায়। এখন যদি আমি তাকে ফোন দিই, সে হয়তো আফগানিস্তানের রাজধানীর নাম মুখস্থ করছে, সে ফোন ধরবে না। আরেকজন তুহিন, যে আইইএলটিএস দেয়। সে হয়তো কানে হেডফোন লাগিয়ে ব্রিটিশ এক্সেন্ট শুনছে। আর তিন নম্বর জন তো রাত দশটায় ঘুমিয়ে যায়। এই রাত বারোটার সময় চারতলা থেকে নেমে এসে, তালা খুলে আমাকে উদ্ধার করবে— এমন মানবদরদী একটাও নেই আমার মেসে। গতবার একবার বারোটায় ফিরেছিলাম, আমাকে রাস্তার ধারের টং দোকানে বসে রাত পার করতে হয়েছিল।"
আমার এই করুণ এবং অতি বাস্তব বর্ণনা শুনে আনিকা এবার শব্দ করে হেসে উঠলেন। উনার হাসি থামছেই না। "ওহ গড! রাশেদ, আপনাদের মেসের অবস্থা তো খুব ভয়াবহ! এটা তো রীতিমতো জেলখানা!" আমি চিবিয়ে চিবিয়ে বললাম, "জেলখানার চেয়েও খারাপ। জেলখানায় অন্তত সকালের নাশতাটা ফ্রি দেয়, আমাদের সেটাও দেয় না। আমাকে বের হতে হবে আনিকা। আমি নিচে গিয়ে দেখি যদি কোনো উবার বা সিএনজি পাই। মফিজকে যদি দুই-তিনশ টাকা ঘুষের অফার দিই জানলার ফাঁক দিয়ে, হয়তো খুলতে পারে।"
আমি দরজার দিকে পা বাড়ালাম। আমার মাথার ভেতর তখন টেনশন। এই ধানমন্ডি থেকে মিরপুর দশ নাম্বার যেতে অন্তত চল্লিশ মিনিট লাগবে। রাত পৌনে একটায় গেট ধাক্কাধাক্কি করলে মেস মালিক কাল সকালেই আমাকে নোটিশ ধরিয়ে দেবে। আমি যখন ফ্ল্যাটের মেন দরজার হাতল ধরতে যাব, ঠিক তখন আনিকার কণ্ঠস্বর আমাকে থামিয়ে দিল। উনার গলাটা এখন আর হাসিখুশি নেই। খুব শান্ত, খুব ধীর, কিন্তু অত্যন্ত স্পষ্ট।
"রাশেদ, দাঁড়ান।"
আমি দরজার হাতল ধরে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম। আনিকা সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছেন। উনার সেই ঢিলেঢালা টি-শার্ট আর প্লাজো পরা শরীরটা নিয়ে উনি খুব ধীর পায়ে আমার দিকে এগিয়ে এলেন। উনার খালি পায়ের পাতাগুলো কাঠের ফ্লোরে কোনো শব্দ করছে না। উনি আমার থেকে মাত্র দুই হাত দূরে এসে দাঁড়ালেন। উনার সেই রিফ্রেশিং, ব্যক্তিগত সুবাসটা আমার নাকে এসে ধাক্কা দিল। উনার চোখের দৃষ্টিতে এখন আর কোনো সাহিত্য বা দর্শন নেই। সেখানে এক অদ্ভুত, স্থির, এবং অবর্ণনীয় কিছু একটা লেখা আছে। আমি উনার দিকে তাকিয়ে আক্ষরিক অর্থেই পাথর হয়ে গেলাম। আনিকা উনার ডান হাতটা আলতো করে তুললেন। উনার আঙুলগুলো আমার শার্টের কলারে একবার ছুঁয়ে গেল। তারপর উনি আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে, কোনো ধরনের জড়তা বা ভণিতা ছাড়াই, খুব সহজ এবং ক্যাজুয়াল গলায় বললেন—
"আজকে থেকে যান। এই ফ্ল্যাটে রুমের তো অভাব নেই।"
এই একটা বাক্য।
মাত্র কয়েকটা শব্দ।
কিন্তু এই শব্দগুলো আমার কানের পর্দা ভেদ করে আমার মস্তিষ্কে এমন একটা প্রলয়ঙ্করী বিস্ফোরণ ঘটাল যে, আমার মনে হলো ধানমন্ডির এই ১৬ তলা বিল্ডিংটা একটা প্রচণ্ড ভূমিকম্পে কাঁপতে শুরু করেছে। রাত বারোটা বাজে। আমি একটা বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছি। আর আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আমার স্বপ্নের, আমার ফ্যান্টাসির, আমার অবদমিত কামনার সেই অপরূপা নারী। এবং সে আমাকে রাতটা তার ফ্ল্যাটে থেকে যাওয়ার অফার দিচ্ছে। আমার পুরো নার্ভাস সিস্টেম, আমার এক্সেল শিট, আমার জীবনের সমস্ত লজিক— নিমেষের মধ্যে শাটডাউন হয়ে গেল।
সাহস আর পাগলামির মধ্যে আসলে পার্থক্য কী? খুব সূক্ষ্ম একটা পার্থক্য আছে। ধরুন, আপনি সিদ্ধান্ত নিলেন আপনি এভারেস্ট জয় করবেন। আপনি বছরের পর বছর ধরে প্রস্তুতি নিলেন, অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনলেন, শেরপা ভাড়া করলেন, আবহাওয়া দপ্তর থেকে রিপোর্ট নিলেন, তারপর একদিন পাহাড়ের চূড়ায় উঠে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দিলেন। পৃথিবীর মানুষ আপনাকে বলবে— ‘কী অসীম সাহসী একজন মানুষ!’
এবার ধরুন, আপনি একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে, পরনের লুঙ্গিটা একটু শক্ত করে গিঁট দিয়ে, খালি পায়ে হাঁটা শুরু করলেন। আপনার পকেটে কোনো টাকা নেই, সাথে কোনো অক্সিজেন নেই, এমনকি একটা সোয়েটারও নেই। আপনি বললেন, ‘আমি খালি পায়ে হিমালয় জয় করব।’ আপনি হয়তো হিমালয়ের বেসক্যাম্প পর্যন্তও যেতে পারবেন না, তার আগেই ঠান্ডায় জমে আপনার ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে যাবে। পৃথিবীর মানুষ তখন আপনার মৃতদেহ দেখে বলবে— ‘কী পাগল একটা লোক! আস্ত একটা আহাম্মক!’ লজিকটা খুব পরিষ্কার। আপনি যখন কোনো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করবেন, তার পেছনে যদি একটা শক্ত যুক্তি থাকে এবং কাজটা যদি সফল হয়, তাহলে সেটা ‘সাহসিকতা’। আর কাজটা যদি সম্পূর্ণ যুক্তির বাইরে হয় এবং তার ফলাফল যদি হয় নিশ্চিত ধ্বংস, তাহলে সেটা ‘পাগলামি’। আমি, রাশেদ আহমেদ, বর্তমানে এই সাহস এবং পাগলামির ঠিক মাঝখানের একটা সীমারেখায় শুয়ে আছি।
সময় রাত দুইটা বেজে পনেরো মিনিট।
আমি একটা বিশাল, নরম, স্প্রিংয়ের ম্যাট্রেস দেওয়া কিং-সাইজ বিছানায় শুয়ে আছি। ঘরের তাপমাত্রা বাইশ ডিগ্রিতে সেট করা। এসির একটা খুব মৃদু, ঘুমপাড়ানি শব্দ হচ্ছে। আমার গায়ের ওপর একটা দামি কমফোর্টার টানা। কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত এবং পরাবাস্তব ব্যাপারটা হলো আমার পরনের পোশাক। আমার গায়ে এখন একটা সিল্কের স্লিপিং গাউন। গাউনটা গাঢ় নীল রঙের। এর ফেব্রিকটা এতই মোলায়েম যে গায়ের চামড়ার সাথে লাগলে মনে হয় পানির ওপর দিয়ে হাত বুলিয়ে নিচ্ছি। এই স্লিপিং গাউনটা আমার নয়। এটা আনিকা নাওহারের স্বামী, লন্ডনপ্রবাসী ইঞ্জিনিয়ার বেলাল সাহেবের।
লন্ডনে বসে বেলাল সাহেব হয়তো এখন তার কোনো পিএইচডি থিসিস বা আইটি ফার্মের ব্যালেন্স শিট নিয়ে ব্যস্ত। আর এদিকে ঢাকা শহরের ধানমন্ডির ষোলো তলা বিল্ডিংয়ের এক বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে, তার কেনা দামি বিছানায় শুয়ে, তারই ব্যবহৃত স্লিপিং গাউন পরে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে মিরপুরের মেস নিবাসী পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের এক সাধারণ অনুবাদক। পরিস্থিতিটা এতই অবাস্তব আর হাস্যকর যে, আমার নিজেরই একবার জোরে হেসে উঠতে ইচ্ছে করল। কিন্তু আমি হাসলাম না। আমার মাথার ভেতর এখন জট পাকানো অনেকগুলো চিন্তা।
ঠিক দেড় ঘণ্টা আগের কথা।
আমি ফ্ল্যাটের মেন দরজার হাতল ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমার মাথার ভেতর মেসের কার্ফ্যু, দারোয়ান মফিজের ঘুম এবং ঢাকা শহরের রাতের জ্যাম নিয়ে একটা বিশাল টেনশন চলছিল। আর ঠিক তখনই আনিকা নাওহার আমাকে বললেন— ‘আজকে থেকে যান। রুমের তো অভাব নেই।’ অফারটা শোনার পর প্রথম কয়েক সেকেন্ড আমি আক্ষরিক অর্থেই পাথর হয়ে গিয়েছিলাম। একজন বিবাহিতা, রূপবতী নারী রাত বারোটার সময় আমাকে তার ফ্ল্যাটে থেকে যাওয়ার অফার দিচ্ছেন! আমার ভেতরের আদিম পুরুষটা তখন আনন্দে ব্রেক ড্যান্স দেওয়া শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু আমার সামাজিক, ভদ্র এবং ‘ভালো ছেলে’ সত্তাটা সাথে সাথে অ্যাকটিভ হয়ে গেল।
আমি খুব নার্ভাস গলায় বলেছিলাম, "আরে না না আনিকা! এটা কী বলছেন! আমি এখানে থেকে যাব মানে? এটা কোনো কথা হলো? আমি ম্যানেজ করে চলে যেতে পারব।" আনিকা সোফা থেকে উঠে আমার দিকে আরেকটু এগিয়ে এসেছিলেন। উনার চোখেমুখে কোনো সংকোচ বা দ্বিধা ছিল না। উনি খুব স্বাভাবিক, প্র্যাকটিক্যাল গলায় বললেন, "রাশেদ, বাচ্চাদের মতো করবেন না তো। রাত বারোটা বাজে। আপনি নিজে একটু আগে বললেন আপনার মেসের দারোয়ান কানে শোনে না, আপনার রুমমেটরা দরজা খুলবে না। আপনি কি আজ রাতে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবেন? নাকি কোনো থানার বেঞ্চে বসে রাত পার করবেন? আমার এখানে চারটা বেডরুম। তিনটা একদম খালি পড়ে আছে। একটা রুমে আপনি চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়বেন, সকালে উঠে যে যার কাজে চলে যাব। এতে এত প্যানিক করার কী আছে?"
উনার যুক্তিগুলো এতই অকাট্য ছিল যে, আমি আর কোনো কথা খুঁজে পেলাম না। আসলেই তো! আমি তো কোনো অবিবাহিত তরুণীর মেসে বা হোস্টেলে থাকছি না। এটা একটা বিশাল ফ্ল্যাট। আমি একটা গেস্টরুমে ঘুমাব। এতে তো মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাওয়ার কিছু নেই। ইউরোপ-আমেরিকায় এটা ডালভাত। একজন বন্ধু আরেকজন বন্ধুর বাসায় কাউচে বা গেস্টরুমে রাত কাটাতেই পারে।
আমি যখন আমার এই ‘ভদ্র’ লজিকগুলো দিয়ে নিজেকে বোঝাচ্ছিলাম, আমার অবচেতন মন তখন মিটিমিটি হাসছিল। সে জানত, আমি আসলে মেসের ভয়ে এখানে থাকছি না। আমি থাকছি এই নারীর কাছাকাছি, একই ছাদের নিচে একটা রাত কাটানোর তীব্র লোভ থেকে।
আমি একটা দুর্বল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলাম, "ঠিক আছে। কিন্তু আপনাকে আমি মিছামিছি একটা ঝামেলার মধ্যে ফেলে দিলাম।"
"কোনো ঝামেলা না," আনিকা হাসিমুখে বললেন। "আপনি আসুন। আমি আপনাকে রুম দেখিয়ে দিচ্ছি।"
আমি উনার পিছু পিছু করিডোর দিয়ে ভেতরে গেলাম। উনি আমাকে একটা বিশাল বেডরুমে নিয়ে গেলেন। অ্যাটাচড বাথ, বিশাল জানালা, দামি পর্দা। "আপনি ফ্রেশ হয়ে নিন। তোয়ালে বাথরুমে দেওয়াই আছে," আনিকা বললেন। তারপর হঠাৎ কী যেন একটা মনে করে উনি থামলেন। আমার দিকে আপাদমস্তক একবার তাকিয়ে বললেন, "রাশেদ, আপনি তো সারাদিন অফিস করে এসেছেন। এই ফরমাল শার্ট আর প্যান্ট পরে তো ঘুমাতে পারবেন না। খুব অস্বস্তি হবে।" আমি একটু কাঁচুমাচু হয়ে বললাম, "অসুবিধা নেই। আমি এভাবেই ম্যানেজ করে নেব। একদিনের তো ব্যাপার।"
"আরে না, পাগল নাকি!" আনিকা খুব অধিকার খাটানোর সুরে বললেন। "এভাবে কেউ ঘুমাতে পারে? আপনি দাঁড়ান, আমি আসছি।"
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) -
Erotic Lovers - 09-24-2026
১২
আনিকা মাস্টার বেডরুমের দিকে চলে গেলেন। আমি গেস্টরুমের বিছানায় বোকার মতো বসে রইলাম। একটু পর আনিকা ফিরে এলেন। উনার হাতে গাঢ় নীল রঙের একটা ফোল্ড করা কাপড়। উনি সেটা আমার বিছানায় রেখে বললেন, "এটা বেলালের স্লিপিং গাউন। ধোয়াই আছে। সাইজে আপনার চেয়ে একটু বড় হতে পারে, বেলাল তো বেশ লম্বা আর চওড়া। তবে রাতে ঘুমানোর সময় গায়ে জড়িয়ে নিলে আরাম পাবেন। আপনি শার্ট-প্যান্ট খুলে এটা পরে নিন।"
আমি গাউনটার দিকে তাকিয়ে একটা ঢোঁক গিললাম। আনিকা নাওহারের স্বামীর ব্যবহৃত স্লিপিং গাউন! আমি কি এটা পরব? এটা পরা কি ঠিক হবে? একটা অদ্ভুত মানসিক বাধা কাজ করছিল। "কী হলো? নিন," আনিকা তাড়া দিলেন। "ফ্রেশ হয়ে আসুন। আমি ডাইনিংয়ে ওয়েট করছি। আমার খুব ক্ষুধা পেয়েছে।"
আনিকা চলে যাওয়ার পর আমি বাথরুমে ঢুকলাম। চোখেমুখে পানি দিয়ে, শার্ট আর প্যান্ট খুলে সেই গাঢ় নীল সিল্কের গাউনটা গায়ে জড়ালাম। আনিকা ঠিকই বলেছিলেন, বেলাল সাহেব মানুষ হিসেবে আমার চেয়ে বেশ স্বাস্থ্যবান। গাউনটা আমার গায়ে একটু ঢলঢল করছে। কিন্তু সিল্কের কাপড়টা গায়ের সাথে লাগতেই একটা দারুণ আরামদায়ক অনুভূতি হলো। কাপড়ে কোনো লন্ড্রির ডিটারজেন্ট বা দামি ফেব্রিক সফটনারের একটা খুব অভিজাত ঘ্রাণ লেগে আছে। আমি গাউনের বেল্টটা কোমরে বেঁধে ডাইনিং স্পেসে এলাম।
আনিকা ততক্ষণে ডাইনিং টেবিলের একটা চেয়ারে বসে উনার আইফোন টিপছেন। উনাকে এই বিশাল ডাইনিং টেবিলে খুব ছোট দেখাচ্ছিল। "ক্ষুধা পেয়েছে বলছিলেন," আমি উনার সামনের চেয়ারটায় বসতে বসতে বললাম। "আমি তো ভাবলাম আপনি এত রাতে রান্নাঘরে গিয়ে খুটখাট করে কিছু একটা বানাবেন।"
আনিকা ফোন থেকে চোখ না তুলেই হেসে উঠলেন। "রাশেদ, আমি আর যাই করি, রান্নাবান্না একদমই করি না। আমার দ্বারা এসব হয় না। আমি ডিম ভাজতে গেলেও পুড়িয়ে ফেলি। লন্ডনেও আমি রান্না করি না, বেলাল মাঝে মাঝে উইকেন্ডে কিছু একটা বানায়, বাকি সময় আমরা বাইরে খাই বা অর্ডার করি।" আমি একটু অবাক হলাম। আমাদের দেশের মেয়েদের, সে যত বড় আইটি ফার্মেরই মালিক হোক না কেন, রান্নাঘরে তাদের একটা আলাদা অস্তিত্ব থাকে। কিন্তু আনিকা সেই ছাঁচের একদম বাইরে।
"তাহলে এখানে কীভাবে ম্যানেজ করেন? এই যে এত বড় ফ্ল্যাট ক্লিন রাখা, খাওয়া দাওয়া?" আমি কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। "ওহ, দ্যাটস ইজি," আনিকা ফোনটা টেবিলে রেখে বললেন। "নিচে পাঁচ তলায় এক ভাবি থাকেন, উনার একজন কাজের মেয়ে আছে। আমি যখন দেশে আসি, ওই মেয়েটার সাথে এক মাসের জন্য একটা চুক্তি করে নিই। ও সকালে এসে পুরো বাসা ক্লিন করে, ফার্নিচার মুছে, কাপড় ধোয়ার থাকলে ওয়াশিং মেশিনে দিয়ে চলে যায়। ব্যাস, আমার তো এর চেয়ে বেশি কিছু লাগে না। আর খাওয়ার ব্যাপারটা তো ফুডপান্ডা আছেই। আমি জাস্ট অর্ডার করে দিই।"
উনার এই প্র্যাকটিক্যাল, ইমোশনহীন এবং হাই-ক্লাস জীবনযাপন দেখে আমি মনে মনে একটু দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। আমাদের দেশের সাধারণ মায়েরা তাদের মেয়েদের রান্না শেখানোর জন্য কত বকাঝকা করে, আর এখানে একজন নারী রান্না না জানাটাকে কত সাবলীলভাবে তার লাইফস্টাইলের অংশ বানিয়ে নিয়েছেন! "তাহলে এখন কী খাবেন?" আমি জিজ্ঞেস করলাম। "আমি অলরেডি অর্ডার করে দিয়েছি। মাটন বিরিয়ানি। এই ধানমন্ডিতেই একটা ভালো রেস্টুরেন্ট আছে, ওদের মাটনটা খুব সফট হয়। অর্ডার করলাম।“
বিশ মিনিটের মধ্যেই কলিংবেল বাজল। ফুডপান্ডার ডেলিভারি বয়।
আমি উঠে গিয়ে দরজা খুলে খাবারটা নিলাম। আনিকা বিল পেমেন্ট করে দিয়েছিলেন অনলাইনেই। আমি খাবারটা নিয়ে ডাইনিং টেবিলে এলাম। আনিকা কিচেন থেকে দুটো দামি সিরামিকের প্লেট, চামচ আর কাঁটাচামচ নিয়ে এলেন। বিরিয়ানির প্যাকেট খুলতেই একটা দারুণ সুবাস ছড়াল। গরম ধোঁয়া উঠছে।
আনিকা খুব পরিপাটি করে প্লেটে বিরিয়ানি বাড়লেন। তারপর চামচ আর কাঁটাচামচ দিয়ে খুব সাবধানে, শব্দ না করে খেতে শুরু করলেন। উনার খাওয়ার ভঙ্গিটাও উনার শাড়ি পরার স্টাইলের মতোই অভিজাত। আমি প্রথমে চামচ দিয়ে খাওয়ার কথা ভাবলাম। কিন্তু মাটন বিরিয়ানি চামচ দিয়ে খাওয়াটা আমার কাছে সবসময় শিল্পের অবমাননা বলে মনে হয়। বিরিয়ানির আসল স্বাদ তো হাতের আঙুলে। আমি চামচটা একপাশে সরিয়ে রেখে ডান হাত দিয়ে বিরিয়ানি মাখাতে শুরু করলাম। আনিকা আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। "আপনি হাত দিয়েই খাচ্ছেন?"
আমি মাংসের একটা টুকরো ছিঁড়তে ছিঁড়তে বললাম, "বাঙালি হিসেবে বিরিয়ানি চামচ দিয়ে খাওয়াটা আমার কাছে একটা কালচারাল ক্রাইম মনে হয়। বিরিয়ানির মাংস হাত দিয়ে না ছিঁড়লে কি তার আত্মা শান্তি পায়?"
আনিকা খিলখিল করে হেসে উঠলেন। "ইউ আর সো ফানি রাশেদ! বাট ইউ আর রাইট। লন্ডনে থাকতে থাকতে আমার হাত দিয়ে খাওয়ার অভ্যাসটা প্রায় চলেই গেছে। ওখানে তো সবকিছুই ফর্ক আর নাইফ দিয়ে খেতে হয়। মাঝে মাঝে দেশের খাবারের জন্য খুব ক্রেভিং হয়।"
"বিদেশে যারা থাকে, তাদের এই একটা বড় সমস্যা," আমি এক লোকমা বিরিয়ানি মুখে দিয়ে বললাম। "তারা বিদেশে বসে শেক্সপিয়র পড়ে, মোজার্ট শোনে, কিন্তু রাতে ঘুমানোর সময় স্বপ্নে ঠিকই কাচ্চি বিরিয়ানি আর সরিষা ইলিশ দেখে।"
আমার কথায় আনিকা এত জোরে হাসলেন যে উনার চোখ দিয়ে প্রায় পানি চলে এল। হাসার সময় উনার ঢিলেঢালা টি-শার্টের ভেতর দিয়ে উনার শারীরিক মুভমেন্টগুলো খুব স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। আমি খুব দ্রুত আমার চোখ প্লেটের দিকে নামিয়ে নিলাম।
খাবার খেতে খেতে আমাদের আরও অনেক বিষয় নিয়ে কথা হলো। খাবার, সংস্কৃতি, দেশ এবং বিদেশ। আনিকা খুব চমৎকার কথা বলেন। উনার কথার ভেতর কোনো অহংকার নেই, কিন্তু একটা আভিজাত্য আছে, যা উনার বংশ এবং বেড়ে ওঠার পরিবেশকে প্রমাণ করে।
খাবার শেষ করে আমরা বেসিনে হাত ধুয়ে আবার ডাইনিংয়ে এসে দাঁড়ালাম।
রাত তখন একটা বেজে পনেরো মিনিট।
পুরো ফ্ল্যাটটা একদম নিস্তব্ধ। ঢাকা শহরের সব কোলাহল যেন এই ১৬ তলা বিল্ডিংয়ের নিচে এসে থেমে গেছে। "তাহলে রাশেদ, আপনি এখন রেস্ট নিন। অনেক রাত হয়েছে," আনিকা উনার ভেজা হাতটা একটা ছোট তোয়ালেতে মুছতে মুছতে বললেন। "হ্যাঁ, আপনারও তো ঘুমানো দরকার। কাল তো আবার মেলায় যাবেন," আমি বললাম।
আনিকা আমার চোখের দিকে তাকালেন। উনার সেই বাদামি চোখের স্থির দৃষ্টি।
"গুড নাইট রাশেদ।"
"গুড নাইট আনিকা।"
উনি ঘুরে উনার মাস্টার বেডরুমের দিকে চলে গেলেন। আমি দেখলাম উনার ঘরের দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। কোনো লক করার শব্দ পেলাম না, শুধু দরজাটা ভেজিয়ে দেওয়ার একটা নরম শব্দ হলো।
আমি আমার গেস্টরুমে এসে দরজাটা ভেজিয়ে দিলাম। লাইট অফ করে শুধু বেডসাইড ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে রাখলাম। তারপর এই বিশাল বিছানায় এসে শুয়ে পড়লাম। এবং তারপর থেকেই শুরু হলো আমার মাথার ভেতরকার এই দার্শনিক এবং মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ।
আমি বিছানায় এপাশ-ওপাশ করছি। আমার পরনের সিল্কের গাউনটা আমার শরীরের সাথে ঘষা খাচ্ছে। এসি চলছে, কিন্তু আমার শরীরের ভেতর একটা প্রচণ্ড উত্তাপ তৈরি হচ্ছে। আনিকা কি দরজাটা লক করেছেন? আমি যখন উনার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ছিলাম, তখন তো কোনো ‘ক্লিক’ শব্দ শুনিনি। তার মানে দরজাটা শুধু ভেজানো আছে।
কেন ভেজানো আছে? একজন নারী একা একটা ফ্ল্যাটে আছেন, উনার পাশের রুমে একজন পুরুষ কলিগ বা পরিচিত কেউ রাত কাটাচ্ছে। একজন স্বাভাবিক নারীর কি ঘুমানোর সময় নিজের বেডরুমের দরজা ভেতর থেকে লক করে দেওয়ার কথা না? নাকি উনি ইচ্ছে করেই দরজাটা খোলা রেখেছেন?
আমার মাথার ভেতরকার সেই ‘পর্নোগ্রাফিক লজিক’ বা যৌন নেশাগ্রস্ত সত্তাটা আমাকে ক্রমাগত উসকানি দিচ্ছে।"রাশেদ, তুই এত বোকা কেন? একজন সুন্দরী, বিবাহিতা নারী তোকে রাত বারোটার সময় তার ফ্ল্যাটে থেকে যাওয়ার অফার দিল। তোকে তার স্বামীর গাউন পরতে দিল। তারপর সে নিজের বেডরুমের দরজা লক না করেই শুতে গেল। এর মানে তুই বুঝিস না? এর মানে হলো গ্রিন সিগন্যাল! সে চাইছে তুই উদ্যোগ নে।"
আমি বালিশে মাথা চেপে ধরলাম। নারীদের সাইকোলজি বড়ই অদ্ভুত। সমাজ তাদের শিখিয়েছে, কোনো সেক্সুয়াল ইনিশিয়েটিভ নারী নিজে থেকে নিতে পারবে না। নিলে তাকে ‘খারাপ নারী’ বলা হবে। তাই তারা সব সময় ‘পরিস্থিতি’ তৈরি করে। তারা পরিবেশটাকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে পুরুষকে মনে করতে হয় যে সে-ই সব করছে।
আনিকা কি চাইছেন আমি একটু সাহসী হয়ে আজ রাতে উনাকে সঙ্গমের আমন্ত্রণ জানাই? উনি কি চাইছেন আমি এখন চুপিসারে, খালি পায়ে উনার বেডরুমের দরজা ঠেলে ভেতরে যাই? উনার বিছানায় গিয়ে উনার পাশে বসি? উনি হয়তো প্রথমে একটু চমকে ওঠার ভান করবেন। বলবেন, "রাশেদ! আপনি এখানে? কী করছেন?" তারপর আমি যখন উনার ঠোঁটে ঠোঁট রাখব, উনি হয়তো খুব দুর্বলভাবে একটু বাধা দেওয়ার চেষ্টা করবেন, এবং পরক্ষণেই উনার সমস্ত সত্তা নিয়ে আমার কাছে সারেন্ডার করবেন।
সতী সেজে থাকার, বা অপরাধবোধ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার এর চেয়ে চমৎকার উপায় আর কী হতে পারে? পরদিন সকালে উনি নিজের বিবেকের কাছে বলতে পারবেন— "আমি তো কিছু করিনি। রাশেদই তো জোর করে আমার রুমে ঢুকে এল। পুরুষ মানুষ, পশুর মতো আচরণ করল। আমি তো পরিস্থিতির শিকার মাত্র!" পুরুষ করবে পাপ, আর নারী হবে পরিস্থিতির শিকার!
আমার বুকের স্পন্দন ড্রামের মতো বাজছে। আমার সুখের দণ্ডটি এই সিল্কের গাউনের নিচে চরম উত্তেজনায় পাথরের মতো কঠিন হয়ে আছে। আমার শুধু একবার উঠে দাঁড়িয়ে করিডোর পার হয়ে উনার দরজার হাতলটা ঘোরাতে হবে। ব্যাস! তারপর আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ রাতটা আমি পেয়ে যাব। সেই রূপ, সেই আভিজাত্য— সব কিছু আজ রাতে আমার হবে। আমি বিছানা থেকে ওঠার জন্য এক পা মেঝেতে নামালাম।
এবং ঠিক তখনই আমার ভেতরের ‘রাশেদ আহমেদ’— সেই পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের অনুবাদক— আমাকে টেনে ধরল। "দাঁড়া! পাগল হয়েছিস তুই?" আমার লজিক আমাকে ধমক দিল। "তুই কি শিওর যে আনিকা তোর জন্য অপেক্ষা করছে? তুই কি শিওর যে এটা কোনো গ্রিন সিগন্যাল? এমন তো হতে পারে যে উনি নিতান্তই একজন আধুনিক, ব্রডমাইন্ডেড নারী। উনার কাছে একজন কলিগকে বাসায় থাকতে দেওয়াটা কোনো ট্যাবু না। উনি তোকে জাস্ট একজন বন্ধু ভেবেছেন, একজন নিরাপদ মানুষ ভেবেছেন। আর তুই তোর ওই নোংরা, সস্তা এবং যৌন-বিকারগ্রস্ত মস্তিষ্ক দিয়ে উনার বন্ধুত্বের একটা বিকৃত অর্থ তৈরি করছিস!"
আমি থমকে গেলাম।
হ্যাঁ, এমন তো হতেই পারে! আমি যদি এখন উনার রুমে যাই, আর উনি যদি সত্যিই চমকে গিয়ে চিৎকার করে ওঠেন? উনি যদি পুলিশ কল করেন? উনি যদি বলেন, "হাউ ডেয়ার ইউ! আমি আপনাকে বিশ্বাস করে বাসায় জায়গা দিলাম, আর আপনি আমার সাথে এই জঘন্য কাজ করতে এলেন?"
আমার পুরো জীবন ধ্বংস হয়ে যাবে। আমার চাকরি যাবে, জেলে পচতে হবে, বাবা-মায়ের সম্মান ধুলোয় মিশে যাবে। আমি কি সাহস দেখাব, নাকি এটা হবে আমার জীবনের চরম পাগলামি?
খালি পায়ে পাহাড়ে চড়াটা যদি পাগলামি হয়, তবে আনিকা নাওহারের ওই ভেজানো দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকাটাও কি একই রকম পাগলামি নয়? আমি কি এভারেস্ট জয় করার আশায় খালি পায়ে বরফের ওপর পা রাখছি?
আমার মস্তিষ্ক আর কাজ করছে না। সাহস আর পাগলামির এই সূক্ষ্ম সুতোর ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমি চরম ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। আমার শরীরের উত্তেজনাটা আস্তে আস্তে একটা হতাশায় রূপ নিচ্ছে।
আমি বুঝতে পারছি, আমি আসলে কোনো সাহসী পুরুষ নই। আমি একটা কাপুরুষ। আমি শুধু দূর থেকে কল্পনা করতে পারি, বাথরুমের দরজা বন্ধ করে মাস্টারবেট করতে পারি, কিন্তু বাস্তবের একটা সম্ভাবনা যখন আমার নাকের ডগায় এসে হাজির হয়েছে, তখন আমি পরিণতির ভয়ে কাঁপছি।
আমি পা-টা আবার বিছানায় তুলে নিলাম। কমফোর্টারটা গলা পর্যন্ত টেনে দিলাম। রাত তিনটার কাছাকাছি বাজে। ফ্ল্যাটের ভেতরটা শ্মশানের মতো নিস্তব্ধ। আমি জানি, ওপাশের বেডরুমে আনিকা নাওহার হয়তো ঘুমাচ্ছেন, অথবা উনার বেডসাইড ল্যাম্প জ্বেলে কোনো বই পড়ছেন। হয়তো উনিও অপেক্ষা করছেন আমার একটা সাহসী পদক্ষেপের। অথবা হয়তো উনি নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছেন এই ভেবে যে, রাশেদ একটা খুব ভালো ছেলে।
এই চরম অনিশ্চয়তা, এই অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব আর সারাদিনের শারীরিক ক্লান্তির ভারে আমার চোখের পাতা ভারী হয়ে আসতে লাগল। আমি চোখ বন্ধ করলাম।
সাহস আর পাগলামির এই খেলায় আজ রাতে আমি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারলাম না। আমার অবচেতন মন আমাকে ঘুমের অতল গহ্বরে টেনে নিয়ে গেল।
ঘুম ঠিক কী কারণে ভাঙল, জানি না। মানুষের শরীরের ভেতরে একটা অদৃশ্য অ্যালার্ম ঘড়ি বসানো থাকে, যেটাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘বায়োলজিক্যাল ক্লক’ বা জৈবিক ঘড়ি। আপনি যদি প্রতিদিন সকাল আটটায় ঘুম থেকে ওঠেন, তবে কোনো একদিন ছুটির দিনে আপনি যতই চান না কেন দশটা পর্যন্ত ঘুমাবেন— আপনার ওই বদমাশ ঘড়িটা ঠিক সকাল আটটাতেই আপনাকে জাগিয়ে দেবে। আপনার মস্তিষ্ক আপনাকে সিগন্যাল দেবে, "ওঠো ব্যাটা!!"
আমি চোখ মেলে তাকালাম। চারপাশটা অচেনা। মিরপুরের মেসের সেই ড্যাম্প ধরা ছাদ, রাজুর পড়ার আওয়াজ, কিংবা জানালার বাইরে থেকে আসা সিএনজির হর্ন— কিছুই নেই। ঘরের ভেতরটা ভীষণ শান্ত। সেন্ট্রাল এসির একটা খুব মোলায়েম গুঞ্জন ছাড়া পৃথিবীতে যেন আর কোনো শব্দ নেই।
বালিশের পাশ থেকে আমার পুরোনো শাওমি ফোনটা হাতে নিলাম। স্ক্রিন অন করতেই দেখলাম, সকাল ঠিক আটটা বাজে। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। আমার শরীর হয়তো জানে না যে আজ আমি মিরপুরের মেসে নেই, আজ আমি ধানমন্ডির এক রাজকীয় ফ্ল্যাটের নরম তুলতুলে বিছানায় শুয়ে আছি। আমার উচিত ছিল আজ অন্তত দুপুর বারোটা পর্যন্ত রাজকীয় একটা ঘুম দেওয়া। কিন্তু ওই যে, অভ্যাসের দাস!
আমি বিছানায় এপাশ-ওপাশ করলাম। রেশমি চাদরের স্পর্শটা গায়ের চামড়ায় একটা অদ্ভুত আরাম দিচ্ছে। মিনিট পাঁচেক চোখ বন্ধ করে আবার ঘুমানোর বৃথা চেষ্টা করলাম। লাভ হলো না। ঘুম একবার ভেঙে গেলে তাকে জোর করে ফিরিয়ে আনা আর চলে যাওয়া প্রেমিকাকে জোর করে ফিরিয়ে আনা— দুটোই সমান অসম্ভব কাজ। আমি উঠে পড়লাম।
বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হলাম। বেসিনের বড় আয়নায় নিজের মুখটা দেখলাম। চোখেমুখে একটা অদ্ভুত ক্লান্তি, আবার একই সাথে একটা প্রচ্ছন্ন উত্তেজনা। গত রাতের সেই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, সেই 'যাব কি যাব না' দোটানা আমাকে ভেতরে ভেতরে বেশ ক্লান্ত করে দিয়েছে। আমি বেলাল সাহেবের সেই দামি সিল্কের স্লিপিং গাউনটা শরীর থেকে খুলে ফেললাম। গাউনটা হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রেখে আমি আবার আমার নিজের শার্ট আর প্যান্ট পরে নিলাম। শার্টের বোতাম লাগানোর সময় আমার মনে হলো, আমি যেন আবার আমার সেই পুরোনো, সাধারণ, 'রাশেদ আহমেদ' সত্তায় ফিরে যাচ্ছি। এই প্যান্ট-শার্টই আমার আসল পরিচয়। স্লিপিং গাউনটা ছিল একটা ফ্যান্টাসি মাত্র।
আমি পা টিপে টিপে গেস্টরুম থেকে বেরিয়ে করিডোরে এসে দাঁড়ালাম। পুরো ফ্ল্যাটটা একদম নিস্তব্ধ। আনিকার কোনো সাড়াশব্দ নেই। তার মানে উনি এখনো ঘুমাচ্ছেন। করিডোর ধরে আনিকার মাস্টার বেডরুমের দিকে তাকালাম। উনার ঘরের দরজাটা গত রাতে যেমন ভেজানো ছিল, ঠিক তেমনই আছে। এক ইঞ্চিও এদিক-ওদিক হয়নি।
আমার পায়ের পেশিগুলো হঠাৎ করেই যেন একটা নিজস্ব ইচ্ছাশক্তি পেয়ে গেল। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো আনিকার দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমার বুকের স্পন্দন আবার বাড়তে শুরু করেছে। আমি দরজার নবটার ওপর হাত রাখলাম। খুব সাবধানে, নিঃশব্দে নবটা একটু ঘোরাতেই বুঝলাম— না, দরজা লক করা নেই।
আমার মাথার ভেতরের সেই আদিম, সুযোগসন্ধানী পুরুষটা আবার ফিসফিস করে উঠল, "রাশেদ, দরজা খোলা! জাস্ট একটু ধাক্কা দে। তুই শুধু দেখবি। একজন ঘুমন্ত নারীর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য পৃথিবীতে আর কী হতে পারে? উনি তো আর জানতে পারছেন না।"
আমি আমার শ্বাস আটকে রেখে দরজাটা খুব সামান্য, হয়তো দুই-তিন ইঞ্চি পরিমাণ ফাঁক করলাম। ঘরের ভেতরটা অন্ধকার। ভারী, দামি পর্দা টেনে দেওয়া থাকায় সকালের আলো ভেতরে ঢুকতে পারেনি। শুধু নাইট ল্যাম্পের একটা খুব মায়াবী, আবছা আলো ঘরের ভেতর ছড়িয়ে আছে। আমার চোখ গিয়ে পড়ল বিশাল কিং-সাইজ বিছানাটার ওপর।
আনিকা ঘুমাচ্ছেন।
উনার শোয়ার ভঙ্গিটা এতটাই এলোমেলো এবং স্বাভাবিক যে, আমার দম আটকে এল। উনার গায়ের কমফোর্টারটা বুকের নিচ পর্যন্ত নামানো। উনার এক পা কমফোর্টারের বাইরে বেরিয়ে আছে। গাউনটা হাঁটুর ওপরে উঠার উপক্রম। উনার সেই নিখুঁত, জ্যামিতিক শরীরের প্রতিটি ভাঁজ, প্রতিটি বাঁক এই আবছা আলোতে এক অভূতপূর্ব, বন্য এবং ঐশ্বরিক সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছে। ঘুমন্ত অবস্থায় মানুষের মুখের পেশিগুলো সবচেয়ে রিল্যাক্সড থাকে। উনার মুখটা এখন একদম শিশুর মতো শান্ত দেখাচ্ছে, কিন্তু উনার শরীরের আবেদনটা তার চেয়েও হাজার গুণ বেশি আদিম এবং তীব্র।
আমার প্রচণ্ড, আক্ষরিক অর্থেই প্রচণ্ড ইচ্ছে করল, আমি দরজাটা খুলে ভেতরে যাই। ওই বিছানার পাশে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসি। উনার ওই এলোমেলো, ঘুমন্ত শরীরটার দিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে থাকি। উনার উন্মুক্ত কাঁধে আমার ঠোঁটটা খুব আলতো করে ছুঁইয়ে দিই। কিন্তু পারলাম না।
আমার ভেতরের সেই 'ভদ্রলোক' বা 'কাপুরুষ' (যে নামেই ডাকা হোক না কেন) আমাকে প্রবল বেগে পেছনের দিকে টেনে ধরল। একজন ঘুমন্ত, অসহায় নারীর ব্যক্তিগত পরিসরে এভাবে উঁকি দেওয়াটা চরম একটা অপরাধ। উনি আমাকে বিশ্বাস করে নিজের ফ্ল্যাটে থাকতে দিয়েছেন, আর আমি উনার সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে একটা সস্তা, চোর-টাইপ পারভার্টের মতো উঁকিঝুঁকি মারছি!
আমার নিজের ওপরই প্রচণ্ড রাগ হলো। আমি খুব সাবধানে, কোনো রকম শব্দ না করে দরজাটা আবার আগের মতো ভেজিয়ে দিয়ে করিডোর থেকে ড্রয়িংরুমে চলে এলাম। ড্রয়িংরুমের বিশাল সোফায় এসে বসে রইলাম।
কী করব বুঝতে পারছি না। এই ফ্ল্যাটের কোনো কিছুই আমার পরিচিত না। আমি চাইলেই এখন কিচেনে গিয়ে নিজের জন্য এক কাপ চা বানাতে পারি না, কারণ আমি জানি না চা-পাতা কোথায় রাখা, আর চিনিই বা কোথায়। আমি চাইলেই টিভি অন করে ভলিউম বাড়িয়ে দেখতে পারি না। অন্যের বাড়িতে মেহমান হয়ে থাকার চেয়ে অস্বস্তিকর আর বোরিং কাজ পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। আপনি না পারবেন জোরে কাশতে, না পারবেন নিজের মতো করে হাই তুলতে।
প্রায় বিশ মিনিট আমি ওই সোফায় একটা বোকার মতো বসে থেকে বিরক্ত হলাম। তারপর উঠে গিয়ে ফ্ল্যাটের মেইন দরজাটা খুললাম। দরজার ঠিক বাইরে, পাপোশের ওপর আজকের খবরের কাগজটা পড়ে আছে। আমি যেন হাতে চাঁদ পেলাম। অন্তত সময় কাটানোর একটা চমৎকার উপায় পাওয়া গেছে। আমি পত্রিকাটা তুলে নিয়ে আবার সোফায় এসে বসলাম।
আমার কাজই হলো সারাদিন ল্যাপটপে আন্তর্জাতিক খবর পড়া আর অনুবাদ করা। কিন্তু নিজের দেশের ছাপানো পত্রিকা পড়ার মধ্যে একটা আলাদা গন্ধ আছে, একটা আলাদা মজা আছে। আমি হেডলাইনগুলোতে চোখ বোলাতে লাগলাম।
‘রাজনৈতিক অস্থিরতা: বিরোধী দলের কঠোর হুশিয়ারি’।
‘শেয়ারবাজারে আবার ধস, নিঃস্ব হাজারো বিনিয়োগকারী’।
‘ফরিদপুরে জমি নিয়ে বিরোধে ছোট ভাইয়ের হাতে বড় ভাই খুন’।
আমি পত্রিকাটা নিয়ে পাতার পর পাতা উল্টাতে লাগলাম। আমাদের দেশের পত্রিকাগুলো আসলে এক একটা বিশাল ট্র্যাজেডির সংকলন। এখানে হত্যা, ;.,, দুর্নীতি আর দুর্ঘটনা ছাড়া আর কিছু ছাপা হয় না। আমি খুব মনোযোগ দিয়ে ভেতরের পাতার একটা অদ্ভুত খবর পড়লাম— "ঝিনাইদহে ছাগলে গাছ খাওয়াকে কেন্দ্র করে দুই গ্রামবাসীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, আহত ২০।"
আমি মনে মনে হাসলাম। বিদেশে বসে মানুষ রকেট বানিয়ে মঙ্গল গ্রহে যাওয়ার চিন্তা করছে, আর আমাদের দেশে মানুষ ছাগলে গাছ খাওয়া নিয়ে বর্শা আর রামদা নিয়ে যুদ্ধ করছে! এই হলো আমার দেশ।
এভাবে পত্রিকা পড়ে, ক্রসওয়ার্ড পাজলটা অর্ধেক সমাধান করে, আর সোফায় বসে হাই তুলতে তুলতে যখন আমি দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালাম, তখন দেখি সকাল ৯টা ১৫ বাজে। আমার বুকটা ধক করে উঠল। ৯টা ১৫! দশটায় আমার অফিস!
ধানমন্ডি থেকে কারওয়ান বাজার যেতে অন্তত পয়তাল্লিশ মিনিট লাগবে। আমি যদি এখনই বের না হই, আমার লেট হওয়া নিশ্চিত। কিন্তু আমি আনিকাকে না বলে কীভাবে বের হব? উনি ঘুমাচ্ছেন। উনাকে ডেকে তুলে বলা— "আমি অফিসে যাচ্ছি"— এটা খুব অভদ্রতা হবে। আবার না বলে চলে যাওয়াটা হবে আরও বড় অভদ্রতা। আমি পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলাম।
অফিসের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ঢুকলাম। এহসান ভাইয়ের ইনবক্সে গিয়ে একটা মেসেজ ড্রাফট করতে শুরু করলাম। "এহসান ভাই, আমার খুব ক্লোজ একজন রিলেটিভ হঠাৎ করে স্ট্রোক করে হাসপাতালে অ্যাডমিট হয়েছেন। আমাকে এখনই সেখানে ছুটতে হচ্ছে। আজকের দিনটা আমি কোনোভাবেই অফিসে আসতে পারব না। প্লিজ, আমার লিভটা একটু কনসিডার করবেন।"
মেসেজটা টাইপ করে আমি সেন্ড করে দিলাম।
মানুষ কতটা অবলীলায় মিথ্যা বলতে পারে! আর সেই মিথ্যার পেছনে যদি একজন সুন্দরীর সংস্পর্শ পাওয়ার সুযোগ থাকে, তাহলে তো কথাই নেই। আমার কোনো রিলেটিভ স্ট্রোক করেনি, কিন্তু আনিকা নাওহারের এই ফ্ল্যাটে বসে আমার নিজেরই স্ট্রোক করার মতো অবস্থা। আমি ফোনটা পকেটে রেখে দিয়ে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। যাক, আজকের দিনের জন্য কিম জং উন আর ভ্লাদিমির পুতিন থেকে মুক্তি!
সাড়ে নয়টার দিকে আনিকার বেডরুমের ভেতর থেকে একটা হালকা খটখট শব্দ এল। আমি সোজা হয়ে বসলাম। আমার ভেতরে একটা তীব্র স্বস্তি কাজ করতে লাগল। অবশেষে উনি উঠছেন! কিছুক্ষণ পর করিডোরে পায়ের শব্দ শোনা গেল।
আমি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম। এবং তাকিয়েই আমাকে আবার একটা জোরদার ধাক্কা খেতে হলো। আনিকা উনার বেডরুম থেকে বেরিয়ে ড্রয়িংরুমের দিকে আসছেন। উনার পরনে একটা সিল্কের স্লিপ গাউন। গাউনটা হাঁটু পর্যন্ত লম্বা, আর এর পুরোটাই এত পাতলা এবং মসৃণ যে, উনার শরীরের প্রতিটি বাঁক যেন সেই কাপড়ের ভেতর দিয়ে চিৎকার করে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
সকালের ঘুম-ভাঙা একজন নারী যে কতটা বন্য আর মোহনীয় হতে পারে, সেটা আনিকাকে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। উনার চুলগুলো পুরোপুরি এলোমেলো। মুখের পেশিগুলোতে একটা আলস্য জড়ানো। কিন্তু উনার শরীরের সেই আদিম জ্যামিতিটা স্লিপ গাউনের কাপড়ের সাথে এমনভাবে লেপ্টে আছে যে, উনার ভরাট বক্ষদেশ আর সরু কোমরের পার্থক্যটা একটা পাহাড় আর খাদের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। হাঁটার সময় গাউনটা উনার ফর্সা, সুডৌল ঊরুর সাথে ঘষা খাচ্ছে।
কী অদ্ভুতভাবে উনার শরীরটা নিজেকে ফুলে-ফেঁপে বের করে নিয়ে আসতে চাইছে! আমার চোখের পলক পড়ছে না। আনিকা আমাকে সোফায় বসে থাকতে দেখে একটু চমকে গেলেন। উনার ঘুম-ঘুম চোখে একটা হালকা বিস্ময়। "আরে রাশেদ! আপনি উঠে গেছেন? কখন উঠলেন?" উনি হাই তুলতে তুলতে জিজ্ঞেস করলেন। আমি আমার দৃষ্টিকে উনার চোখের ওপর ধরে রাখার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করতে করতে বললাম, "এই তো, বেশিক্ষণ হয়নি। আটটার দিকে।"
"ওহ মাই গড!" আনিকা কপালে হাত দিয়ে একটা অপরাধী ভঙ্গি করলেন। "আটটা থেকে উঠে বসে আছেন? আর আমাকে ডাকেননি কেন? আপনি তো সকাল থেকে খালি পেটে বসে আছেন! আই অ্যাম সো সরি রাশেদ। আমার আসলে রাতে খুব দেরিতে ঘুম এসেছিল, তাই সকালে উঠতে লেট হয়ে গেল।"
আমি হাসিমুখে বললাম, "আরে, সরি বলার কী আছে! আপনি ঘুমাচ্ছিলেন, আপনাকে ডিস্টার্ব করাটা কি ঠিক হতো? আর আমার তো সকাল সকাল ওঠার অভ্যাস। কোনো অসুবিধা হয়নি।"
"অসুবিধা হয়নি মানে? আপনি আমার বাসায় গেস্ট, আর আপনি না খেয়ে বসে আছেন! আপনি একটু বসুন, আমি এক্ষুনি চা বানাচ্ছি," আনিকা দ্রুত কিচেনের দিকে পা বাড়ালেন।
আমি সোফা থেকে উঠে উনার পিছু পিছু কিচেনের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালাম। "আনিকা, আপনি মাত্র ঘুম থেকে উঠেছেন। আপনি যান, চোখেমুখে পানি দিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসুন। চা-টা বরং আমি বানাই।"
আনিকা কিচেনের ক্যাবিনেট খুলতে খুলতে ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালেন। উনার ঠোঁটে একটা মিষ্টি হাসি। "আপনি বানাতে পারবেন? চিনি-চা-পাতা কোথায় রাখা আছে, খুঁজে পাবেন?"
"পাব না কেন? আমি একজন আন্তর্জাতিক মানের অনুবাদক। আমি কিম জং উনের মিসাইলের রেঞ্জ খুঁজে বের করতে পারি, আর আপনার কিচেনের চা-পাতা খুঁজে পাব না? আপনি যান, ফ্রেশ হয়ে নিন।"
আনিকা খিলখিল করে হেসে উঠলেন। "আচ্ছা বাবা, ঠিক আছে। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি। চা-পাতা ওই ডান দিকের ওপরের ক্যাবিনেটে। আর ফ্রিজে পাউরুটি আর মাখন আছে, বের করে নিন।"
আনিকা বাথরুমের দিকে চলে গেলেন। আমি কিচেনে ঢুকে চায়ের পানি বসালাম। এই যে আমি উনার কিচেনে দাঁড়িয়ে উনার জন্য চা বানাচ্ছি— এই অনুভূতিটা অদ্ভুত রকম সুন্দর। মনে হচ্ছে, আমি যেন উনার খুব কাছের কেউ, উনার সংসারেরই একজন। ব্যাচেলর মেসের গ্যাসের চুলায় নিজের জন্য চা বানানো আর ধানমন্ডির এই মডুলার কিচেনে আনিকা নাওহারের জন্য চা বানানোর মধ্যে একটা আকাশ-পাতাল পার্থক্য আছে।
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) -
Erotic Lovers - 09-24-2026
১৩।
আমি চা বানাতে শুরু করলাম। মিনিট দশের মধ্যেই আনিকা ফিরে এলেন। উনি কাপড় পাল্টেছেন। একটা নীল রঙের ডেনিম জিন্স আর একটা সাদা টপস পরেছেন। চুলগুলো খুব সুন্দর করে একটা ক্লিপ দিয়ে পেছনের দিকে আটকানো। মুখে হালকা একটু পাউডার আর ঠোঁটে একদম হালকা পিংক রঙের একটা লিপবাম দেওয়া।
উনাকে এখন এত সতেজ আর প্রাণবন্ত লাগছে যে, আমার মনে হলো এইমাত্র বুঝি একটা আস্ত সকাল আমার ড্রয়িংরুমে হেঁটে এল। আমি ততক্ষণে দুটো মগে চা ঢেলে ডাইনিং টেবিলে এনে রেখেছি। সাথে কয়েক পিস পাউরুটিতে মাখন লাগিয়ে প্লেটে সাজিয়ে দিয়েছি।
"ওয়াও! আপনি তো দেখি দারুণ গুছিয়ে কাজ করেন রাশেদ!" আনিকা চেয়ার টেনে বসতে বসতে বললেন। আমি উনার উল্টোদিকের চেয়ারে বসে চায়ের মগটা হাতে নিলাম। "ব্যাচেলরদের গুছিয়ে কাজ করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না আনিকা। আমাদের কেউ মাখন মাখিয়ে রুটি খাইয়ে দেয় না।" আনিকা চায়ে চুমুক দিয়ে চোখ বন্ধ করলেন। "উমমম... চা-টা কিন্তু দারুণ হয়েছে। কাল রাতে আমার বানানো চায়ের চেয়েও বেটার।"
হঠাৎ করে আনিকা দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালেন। উনার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল।
"রাশেদ! দশটা তো প্রায় বাজে! আপনার তো দশটায় অফিস! আপনি অফিসে যাবেন না?"
"এই তো চা খেয়েই বের হব। আপনাকে একটা দিন বেশ যন্ত্রণা দিয়ে দিলাম।" আমি যে অলরেডি ছুটি নিয়েছি এটা আর বললাম না। নয়তো মনে হবে, আমি আগে থেকেই আজ সারাদিন উনার সঙ্গে থাকার প্ল্যান করে ফেলছি।
আনিকা বেশ অধিকার নিয়ে বললেন, "এসব যন্ত্রণা-ফন্ত্রনা বলে এড়ানো যাবে না।" আমি বললাম, "কি করতে বলছেন?" আনিকা চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, "আজকের দিনটা ছুটি নেন। আমি দেশে আসার পর প্রতিদিন মেলায় যাওয়া ছাড়া সারাদিন এক প্রকার ঘরবন্দি। আজ আপনাকে নিয়ে ঘুরব।"
"ঘুরবেন! কই যাবেন?"
"প্রথমে একটা সিনেমা দেখব। তারপর টিএসসি। তারপর বিকেলে মেলায়।"
আমি তো এমন কিছুর অপেক্ষাতেই ছিলাম। বললাম, "তা করা যায়। আমার ছুটি অনেক জমে আছে। মেইল করে দিব ইমার্জেন্সির দোহাই দিয়ে।" আমার কথায় আনিকার মুখে একটা অদ্ভুত, নরম হাসি ফুটে উঠল। উনার সেই হাসিতে একটা স্পষ্ট প্রশ্রয়ের ছাপ ছিল। "পারফেক্ট।" আনিকা হঠাৎ করে খুব এক্সাইটেড গলায় বলে উঠলেন।
সকাল এগারোটার দিকে আমরা বাসা থেকে বের হলাম। আনিকা উনার সেই নীল জিন্স আর সাদা টপসের সাথে একটা হালকা কার্ডিগান চাপিয়ে নিলেন। চোখে একটা বড় সানগ্লাস। উনাকে দেখতে একদম কোনো হলিউড মুভির হিরোইনের মতো লাগছিল। আমরা লিফট দিয়ে নিচে নামলাম। আনিকা উবার অ্যাপ দিয়ে একটা উবার প্রিমিয়াম গাড়ি ডাকলেন। গাড়িটা আসার পর আমরা দুজনে পেছনের সিটে পাশাপাশি বসলাম। উবারের এসির ঠান্ডা বাতাস, গাড়ির এয়ার ফ্রেশনারের হালকা গন্ধ আর আনিকার গায়ের সেই চিরচেনা শ্যানেল পারফিউমের সুবাস— সবকিছু মিলে গাড়ির ভেতরটা একটা অদ্ভুত রোমান্টিক বুদবুদ তৈরি করল।
রাস্তায় প্রচণ্ড জ্যাম। ঢাকা শহরের সকাল এগারোটার জ্যাম মানেই একটা স্থির, স্থবির পৃথিবী। বাসের হর্ন, রিকশার টুংটাং, মানুষের চিৎকার— বাইরে এক ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা। কিন্তু এই কাঁচ-বন্ধ এসি গাড়ির ভেতর আমি আর আনিকা যেন সম্পূর্ণ একটা বিচ্ছিন্ন গ্রহে বসে আছি। আনিকা উনার সানগ্লাসটা মাথার ওপরে তুলে দিয়ে আমার দিকে ফিরে বসলেন। "আচ্ছা রাশেদ, আপনার কি কখনো মনে হয় না যে এই ঢাকা শহরটা একটা বিশাল পাগলাগারদ?" আনিকা বাইরের জ্যামের দিকে তাকিয়ে বললেন। "মনে হয় তো। কিন্তু এই পাগলাগারদেরও একটা নিজস্ব সিস্টেম আছে। আমরা সবাই এখানে পাগল, কিন্তু আমরা সবাই জানি আমাদের পাগলামির লিমিট কতটুকু।" আনিকা হাসলেন। উনার হাঁটুটা আমার হাঁটুর সাথে খুব হালকাভাবে লেগে আছে। গাড়ির ঝাঁকুনিতে মাঝে মাঝেই সেই স্পর্শটা একটু গাঢ় হচ্ছে। প্রতিটা স্পর্শে আমার শরীরে একটা বিদ্যুতের তরঙ্গ বয়ে যাচ্ছে।
আমরা বসুন্ধরা সিটিতে পৌঁছালাম প্রায় সোয়া বারোটার দিকে। স্টার সিনেপ্লেক্সের ফ্লোরে উঠে আমি বললাম, "আপনি দাঁড়ান, আমি টিকিট কেটে আনছি।" কাউন্টারে গিয়ে 'ইটারনিটি (২০২৫)' নামের একটা ইংলিশ মুভির দুটো টিকিট কেটে আনলাম। মুভিটা একটা সাই-ফাই রোমান্টিক ড্রামা। এরমধ্যে আনিকা বড় সাইজের পপকর্ন আর দুটো কোক নিয়ে ফেলেছেন।
আমরা যখন হলে ঢুকলাম, তখনো শো শুরু হয়নি। স্ক্রিনে অ্যাডভার্টাইজমেন্ট চলছে। হলের ভেতরটা প্রায় অন্ধকার। এই দুপুরবেলা, তাও আবার কর্মব্যস্ত দিনে সিনেমা হলে দর্শক নেই বললেই চলে। পুরো বিশাল হলটার ভেতর গুনে গুনে হয়তো ১৪-১৬ জন মানুষ হবে। তারা সবাই এদিক-ওদিক ছড়ানো-ছিটানো সিটে বসে আছে। আমাদের সিটটা একদম পেছনের দিকের কর্নারে। আমরা পাশাপাশি সিটে গিয়ে বসলাম। সিটের হাতলের ওপর রাখা আনিকার ফর্সা, নরম হাতটার দিকে আমার চোখ পড়ল। হলের আলো আস্তে আস্তে নিভে গেল। স্ক্রিনে মুভি শুরু হওয়ার কাউন্টডাউন শুরু হলো। চারপাশটা একটা ঘুটঘুটে, মায়াবী অন্ধকারে ঢেকে গেল। এই বিশাল অন্ধকার হলে, এই ১৪-১৬ জন মানুষের ভিড়ে, আনিকা নাওহার আমার ঠিক এত কাছে বসে আছেন যে, আমি উনার শ্বাস-প্রশ্বাসের ওঠানামার শব্দটাও শুনতে পাচ্ছি। আমার বুকের ভেতরকার সেই অবদমিত, আদিম নেকড়েটা অন্ধকারে যেন তার চোখ মেলে তাকাল।
ঢাকা শহরের আধুনিক সিনেমা হলগুলো আসলে কেবল সিনেমা দেখার জায়গা নয়। এগুলো হচ্ছে কংক্রিটের এই বিশাল জঙ্গলে মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত কিছু ফ্যান্টাসি, কিছু অবদমিত বাসনা আর লুকোচুরি খেলার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল। আপনি যদি একটা সাধারণ পার্কের বেঞ্চে বসে বিপরীত লিঙ্গের কারো হাত ধরেন, তাহলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে কোনো নীতিপুলিশ এসে আপনাকে সমাজ, ধর্ম আর কালচারের ক্লাস নেওয়া শুরু করবে। কিন্তু চারশ-পাঁচশো টাকা দিয়ে একটা মাল্টিপ্লেক্সের টিকিট কেটে আপনি যখন অন্ধকার হলের ভেতর ঢুকে যাবেন, তখন আপনি যেন একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন গ্রহে চলে গেলেন। সেখানে কোনো নীতিপুলিশ নেই, কোনো সিসি ক্যামেরা নেই (থাকলেও অন্ধকারে তা অন্ধ), আর সবচেয়ে বড় কথা— সেখানে কেউ কারো দিকে তাকানোর সময় পায় না। সবাই স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। অন্তত, তাত্ত্বিকভাবে সেটাই হওয়ার কথা। কিন্তু স্বভাবজাত পর্যবেক্ষক, স্ক্রিনের চেয়ে স্ক্রিনের বাইরের নাটক দেখতেই বেশি অভ্যস্ত।
এই যেমন টিকিট কাটার সময় আমার ঠিক সামনেই একটা ছেলে দাঁড়িয়ে ছিল। বয়স বাইশ বা তেইশ হবে। পরনে একটা স্টাইলিশ টি-শার্ট আর ডেনিম। ছেলেটার সঙ্গে একজন মহিলা। আমি অনুবাদক মানুষ, আমার চোখ খুব দ্রুত স্ক্যান করে। মহিলাটার বয়স চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশের মধ্যে হবে। পরনে একটা গাঢ় মেরুন রঙের সালোয়ার কামিজ। চোখেমুখে একটা দারুণ সাজগোজের আভা। সত্যি কথা বলতে কী, পুরো স্টার সিনেপ্লেক্সের লবিতে যদি সুন্দরীদের একটা র্যাংকিং করা হতো, তবে আনিকা নাওহার থাকতেন এক নাম্বারে, আর এই মহিলা থাকতেন ঠিক দুই নাম্বারে। উনার শারীরিক গড়নটা একটু ভারী, কিন্তু সেই ভারী গড়নের মধ্যে একটা অদ্ভুত, পরিপক্ব মাদকতা আছে।
আমি খেয়াল করলাম, ছেলেটা টিকিট কাটার সময় মহিলাটার খুব কাছে ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে। "এই তন্ময়, পপকর্ন নিবি না?" মহিলাটা খুব মোলায়েম গলায় ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করল। তন্ময় নামের ছেলেটা ঘাড় ঘুরিয়ে এমন একটা দৃষ্টিতে মহিলাটার দিকে তাকাল, যে দৃষ্টিতে আর যাই হোক, কোনো ভক্তি বা শ্রদ্ধা ছিল না। সে হাসিমুখে বলল, "হ্যাঁ আন্টি, নিচ্ছি। তুমি যাও, ভেতরে গিয়ে বসো।" 'আন্টি!' শব্দটা আমার কানের পর্দায় একটা অদ্ভুত ধাক্কা দিল। আমার সাংবাদিক আর অনুবাদক মস্তিষ্ক সাথে সাথে অ্যালার্ম বাজিয়ে উঠল। এটা কোনোভাবেই খালা-ভাগ্নে বা ফুফু-ভাতিজার সম্পর্ক হতে পারে না! খালা বা ফুফুর সাথে কোনো বাইশ বছরের তরুণ যখন সিনেমা দেখতে আসে, তখন তাদের মাঝখানে একটা স্বাভাবিক, অদৃশ্য দেয়াল থাকে। বডি ল্যাঙ্গুয়েজ হয় খুব ক্যাজুয়াল। কিন্তু এই তন্ময় আর তার 'আন্টি'র বডি ল্যাঙ্গুয়েজ একদম অন্যরকম। ছেলেটার হাত বারবার কথা বলার ছলে মহিলাটার কোমরের খুব কাছাকাছি গিয়ে স্পর্শ করছে। আর মহিলাটাও সেটা এড়িয়ে যাওয়ার বদলে এমনভাবে একটু হেসে গা এলিয়ে দিচ্ছেন, যেটা কোনো 'আন্টি' তার ভাতিজা বা ভাগ্নের সামনে করেন না।
আমি মনে মনে হাসলাম। ঢাকা শহর বড়ই বিচিত্র জায়গা! কে কার আন্টি, আর কে কার কী— সেটা বোঝার কোনো উপায় নেই। মানুষের সম্পর্কের মাঝেও কত রকম সাবটাইটেল লুকিয়ে থাকে! আমরা টিকিট কেটে, পপকর্ন আর কোক নিয়ে হলের ভেতর ঢুকলাম।
হলটা প্রায় অন্ধকার। মাত্র চৌদ্দ-ষোলো জন দর্শক। বিশাল একটা হলরুমে এত কম মানুষ থাকলে একটা ভূতুড়ে, অথচ দারুণ রোমান্টিক পরিবেশ তৈরি হয়। আমার ঠিক পাশেই আনিকা। উনার কার্ডিগানের হালকা উলের ছোঁয়া আমার খালি কনুইয়ে লাগছে। উনার পারফিউমের সেই রিফ্রেশিং গন্ধটা অন্ধকারের মধ্যে যেন আরও বেশি তীব্র হয়ে আমার স্নায়ুতে আঘাত করছে।
আমি পপকর্নের বক্সটা আমাদের দুজনের সিটের মাঝখানের হাতলটায় রাখলাম। স্ক্রিনে তখনো বিজ্ঞাপন চলছে। আমার চোখ অভ্যাসবশত হলের ভেতর একটা চক্কর দিল। এবং আমি দেখলাম, আমাদের থেকে দুই সারি সামনে, একটু কোনাকুনি ডান দিকের সিটগুলোতে সেই তন্ময় আর তার 'আন্টি' বসেছে।
মুভি শুরু হলো। কিন্তু মুভি শুরুর দশ মিনিট পর থেকেই আমি বুঝতে পারলাম, আমার ফোকাস স্ক্রিনের চেয়ে স্ক্রিনের বাইরের ড্রামার দিকে বেশি চলে যাচ্ছে। সিনেমা হলের অন্ধকার চোখ সয়ে আসার পর চারপাশের অনেক কিছুই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমি আড়চোখে দেখলাম, সামনের ওই সিটগুলোতে তন্ময় আর তার আন্টির বসার ভঙ্গিটা আর সাধারণ নেই।
মাঝখানের হাতলটা তারা তুলে দিয়েছে। তন্ময় প্রায় পুরোটা হেলে পড়েছে মহিলাটার দিকে। আমি ঢোঁক গিললাম। আমার চোখ বারবার স্ক্রিন থেকে সরে গিয়ে ওই দুই সারি সামনের সিটে আটকে যাচ্ছে। অন্ধকার হলেও, স্ক্রিনের আলো যখন হলের ওপর পড়ছে, তখন সিল্যুয়েটের মতো তাদের নড়াচড়াগুলো স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
তন্ময়ের একটা হাত মহিলাটার কাঁধ জড়িয়ে ধরে আছে, আর অন্য হাতটা খুব সাবধানে, সাপের মতো মহিলাটার কোলের ওপর দিয়ে উনার কোমরের কাছে ঘোরাঘুরি করছে। মহিলাটার মাথা তন্ময়ের কাঁধে রাখা। আমার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত ধুকপুকানি শুরু হলো। মানুষের ভয়েরিজম বা অন্যের গোপন মুহূর্ত দেখার যে একটা আদিম, নিষিদ্ধ আনন্দ আছে, সেটা আমাকে গ্রাস করতে শুরু করল।
আমি আড়চোখে আমার পাশে বসা আনিকার দিকে তাকালাম। আনিকা স্ক্রিনের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন। মুভির গল্পে উনি পুরোপুরি ডুবে গেছেন। উনি স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই, অন্ধকারের মধ্যে হাত বাড়িয়ে পপকর্নের বক্স থেকে পপকর্ন নিচ্ছেন। উনার আঙুলগুলো পপকর্ন নেওয়ার সময় মাঝে মাঝেই আমার আঙুলের সাথে ছুঁয়ে যাচ্ছে। প্রতিটা স্পর্শে আমি চমকে উঠছি, কিন্তু উনি এতটাই মগ্ন যে ওদিকে উনার কোনো খেয়ালই নেই। আমি আবার মুভিতে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করলাম।
স্ক্রিনে নায়ক তখন একটা ল্যাবরেটরির ভেতর দাঁড়িয়ে তার প্রেমিকাকে বলছে, "আমি যদি তোমাকে ভুলে যাই, তাহলে এই অনন্তকাল বেঁচে থেকে আমার লাভ কী? স্মৃতি ছাড়া মানুষের জীবন তো একটা পাথরের মতো।" ডায়লগটা বেশ ভারী। আমি মনে মনে ভাবলাম, কথাটা তো সত্যি। স্মৃতি ছাড়া মানুষ আর পাথর তো একই।
কিন্তু আমার এই দার্শনিক চিন্তাটা মাত্র এক মিনিট টিকল। আমার চোখ আবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডান দিকের ওই সিটগুলোর দিকে চলে গেল। এবার যা দেখলাম, তাতে আমার আক্ষরিক অর্থেই গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। তন্ময় আর তার আন্টি এখন আর শুধু কাঁধে মাথা রেখে বসে নেই। খেলা অনেক দূর গড়িয়েছে।
মহিলাটার একটা হাত তন্ময়ের কোলের ওপর। শুধু কোলের ওপর বললে ভুল হবে, হাতটা তন্ময়ের প্যান্টের ওপর দিয়ে তার পুরুষাঙ্গের ওপর রাখা। এবং হাতটা স্থির নেই। অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে হাতটা খুব ধীর, কিন্তু একটা নির্দিষ্ট ছন্দে ওঠানামা করছে। আর তন্ময়ের হাতটা এখন আর মহিলাটার কোমরে নেই, সেটা সালোয়ার কামিজের ওপর দিয়ে মহিলাটার বক্ষদেশের ওপর চেপে বসে আছে। আমার পুরো শরীরে যেন কেউ একশো ভোল্টের কারেন্ট সাপ্লাই দিয়ে দিল।
আমি নিজে একজন পুরুষ। একজন স্বাস্থ্যবান, উনত্রিশ বছর বয়সী পুরুষ। আমার ঠিক পাশে একজন অপ্সরী নারী বসে আছে, যার শরীরের ঘ্রাণ আমাকে পাগল করে দিচ্ছে। আর আমার চোখের সামনে আরেক জোড়া নারী-পুরুষ অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে চরম একটা আদিম খেলায় মত্ত হয়ে আছে।
এই দৃশ্য দেখার পর কোনো সুস্থ পুরুষের শরীর শান্ত থাকতে পারে না। আমার প্যান্টের ভেতর আমার অবদমিত পুরুষাঙ্গটি মুহূর্তের মধ্যে ফুঁসে উঠল। উত্তেজনায় সেটা পাথরের মতো কঠিন হয়ে, আক্ষরিক অর্থেই একটা 'কুতুব মিনার' হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। প্যান্টের কাপড়ের ভেতর সেই প্রচণ্ড চাপ আর অস্বস্তি আমি স্পষ্ট অনুভব করতে লাগলাম। আমার শ্বাস ভারী হয়ে এল।
আমি দুই পা ক্রস করে, একটু সামনের দিকে ঝুঁকে বসে আমার এই উত্তেজনাকে ঢাকার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলাম। আমার মাথার ভেতর তখন হাজারটা আফসোস আর আক্ষেপের সাইরেন বাজছে। শালা, জীবনটা আসলেই খুব আনফেয়ার! ওই বাইশ বছরের পিচ্চি ছেলে তন্ময়, সে তার চেয়ে দশ বছরের বড় একটা আন্টিকে নিয়ে সিনেমা হলে এসে অন্ধকারে রীতিমতো স্বর্গসুখ ভোগ করছে। মহিলাটাও কীভাবে অবলীলায় ছেলেটার প্যান্টের ওপর দিয়ে তাকে উত্তেজিত করে তুলছে!
আর আমার কপালে কী জুটল?
আমার পাশে বসে আছে আনিকা নাওহারের মতো একটা মাস্টারপিস নারী। যার শুধু একটা চোখের ইশারাতেই আমি হয়তো আমার সারা জীবনের অনুবাদকের চাকরি ছেড়ে দিয়ে বনবাসে যেতে রাজি আছি। আর সেই নারী আমার পাশে বসে, আমার আঙুলের সাথে আঙুল ছুঁইয়ে পপকর্ন খাচ্ছে, কিন্তু তার মাথার ভেতর চলছে একটা সাই-ফাই মুভির রোমান্টিক থিওরি!
"আফসোস! আমার কপালে এসব নেই!" আমি মনে মনে নিজের ভাগ্যকে গালি দিলাম।
আমি যদি একটু সাহসী হতাম! আমি যদি এখন অন্ধকারে আমার হাতটা আনিকার কোলের ওপর রাখতাম? উনি কি চমকে উঠতেন? উনি কি আমাকে চড় মারতেন? নাকি ওই আন্টির মতো উনিও আমাকে প্রশ্রয় দিতেন? এইসব ভাবতে ভাবতে আমার শরীরের উত্তাপ আরও বেড়ে গেল। আমার কুতুব মিনার তখনো স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে।
আমি চোখ নামিয়ে আবার মুভিতে ফোকাস করার চেষ্টা করলাম। পর্দায় নায়ক-নায়িকা এখন একটা সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে আছে। সমুদ্রের ঢেউ এসে তাদের পায়ে লাগছে। আমি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছি ঠিকই, কিন্তু আমার চোখের কোণ দিয়ে আমি তন্ময়দের সিটের দিকে নজর রাখছি। মানুষের চোখের পেরিফেরাল ভিশন খুব পাওয়ারফুল একটা জিনিস। আপনি সোজা তাকিয়ে থেকেও আশপাশের অনেক কিছু দেখতে পান।
কিছুক্ষণ পর আমার চোখ আবার পুরোপুরি সেদিকে ঘুরে গেল। এবার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। অন্ধকার হল। কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছে না। মুভির একটা খুব ইমোশনাল আর সাইলেন্ট সিন চলছে। আর সেই সুযোগে তন্ময় ছেলেটা তার হাতটা মহিলাটার কামিজের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। মহিলাটার মাথা পেছনের সিটে হেলানো। কী অদ্ভুত! ঢাকা শহরের মানুষ এত সাহসী হয় কীভাবে? এই পাবলিক প্লেসে, সিসি ক্যামেরা থাকতে পারে জেনেও, এরা কীভাবে এই মাত্রার একটা চরম ঝুঁকি নিচ্ছে? নাকি এই ঝুঁকির মধ্যেই আসল থ্রিল লুকিয়ে আছে?
আমি রুদ্ধশ্বাসে দৃশ্যটা দেখার চেষ্টা করছিলাম। আমার ভেতরের ভয়েরিজম বা দর্শক-সত্তা তখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। ঠিক সেই মুহূর্তে আমার কানের খুব কাছে, একদম ঘাড়ের ওপর একটা উষ্ণ নিশ্বাসের স্পর্শ টের পেলাম। আমি চমকে ডান দিকে তাকালাম। আনিকা নাওহার আমার দিকে ঝুঁকে এসেছেন। উনার মুখটা আমার কানের মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে। অন্ধকারের মধ্যেও আমি উনার বাদামি চোখের মণি দুটো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। উনি খুব নিচু, ফিসফিস করা একটা গলায় বললেন, "রাশেদ, বারবার ওদিকে তাকাচ্ছেন কেন?" আমার বুকটা ধক করে উঠল। মনে হলো আমি যেন চুরি করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়েছি। আমার সমস্ত শরীরের রক্ত যেন এক মুহূর্তে মাথায় উঠে এল। আমি আমতা-আমতা করে বললাম, "ওহ... হ্যাঁ... মানে, না তো! আমি তো মুভিই দেখছি।"
"মিথ্যে বলবেন না," আনিকা আগের মতোই ফিসফিস করে বললেন। উনার গলার স্বরে কোনো রাগ নেই, বরং এক ধরনের অদ্ভুত, রহস্যময় গাম্ভীর্য আছে। "আমি খেয়াল করছি। আপনি মুভি শুরুর পর থেকে অন্তত দশবার ওই সামনের সিটের দিকে তাকিয়েছেন। অন্যের প্রাইভেট মোমেন্ট এভাবে দেখতে নেই রাশেদ। এটা আনসিভিলাইজড।"
আমার কান-মাথা লজ্জায় লাল হয়ে গেল। আনিকা আমাকে ধরে ফেলল আমি একটা চিপ পারভার্টের মতো অন্যের রোমান্স দেখছি! আমি দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য খুব অপরাধী গলায় ফিসফিস করে বললাম, "ওহ, হ্যাঁ। আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি আনিকা। আসলে... মানে, চোখটা বারবার ওইদিকে চলে যাচ্ছিল। আমি আর তাকাব না। সরি।" আনিকা সোজা হয়ে উনার সিটে বসলেন। তারপর উনি এমন একটা কথা বললেন, যেটা আমার বুকের ভেতর একটা বিশাল হাতুড়ির বাড়ি মারল।
উনি স্ক্রিনের দিকে দৃষ্টি রেখেই, খুব শান্ত, নির্লিপ্ত গলায় বললেন, "আপনার তো শুধু চোখই যায় রাশেদ। আর তো কিছু যায় না। আপনি সিনেমা দেখেন।"
কথাটা শোনার পর আমার মনে হলো, হলের এসিটা যেন হঠাৎ করে মাইনাস ফাইভ ডিগ্রিতে নেমে গেছে। কী বললেন উনি? "আপনার শুধু চোখই যায়!"
এই সাধারণ, নিরীহ শোনানো বাক্যটার ভেতরে যে কী পরিমাণ তাচ্ছিল্য, কী পরিমাণ উসকানি আর কী পরিমাণ চ্যালেঞ্জ লুকিয়ে আছে, সেটা বুঝতে আমার এক সেকেন্ডও সময় লাগল না। এর মানে কী? উনি কি বলতে চাইছেন যে আমি শুধু দূর থেকে অন্যের রোমান্স দেখার মতো একজন কাপুরুষ দর্শক? আমার নিজের কোনো উদ্যোগ নেওয়ার, বা নিজের কোনো মুভ নেওয়ার সাহস নেই? আমি কি শুধুই একজন 'ভয়েয়ার'?
উনি কি আমাকে চ্যালেঞ্জ করছেন? উনি কি চাইছেন যে আমি আমার চোখকে শাসন না করে, আমার হাতকে শাসন করি? আমার হাতটা কি উনার দিকে বাড়িয়ে দিই? আমার মাথার ভেতর জট পাকিয়ে গেল। আনিকা নাওহারের মতো একজন ক্লাসি, ইন্টেলেকচুয়াল নারী কি সত্যিই এত চিপ একটা ইঙ্গিত দিতে পারেন? নাকি আমি আমার এই বিকৃত, যৌন-নেশাগ্রস্ত মস্তিষ্ক দিয়ে উনার একটা সাধারণ কথার ভুল অর্থ বের করছি?
আমি পুরোপুরি আড়ষ্ট হয়ে সিটে বসে রইলাম। আমার প্যান্টের ভেতরের সেই কুতুব মিনার এখন আর শুধু ফিজিক্যাল উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে নেই, সেটা এখন সাইকোলজিক্যাল একটা প্রেশারে আরও শক্ত হয়ে গেছে।
আমি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। কিন্তু স্ক্রিনের নায়ক-নায়িকা কী বলছে, তার একটা শব্দও আমার কানে ঢুকছে না। আমার কানের ভেতর শুধু আনিকার সেই ফিসফিসানিটা ইকো হচ্ছে— "আপনার তো শুধু চোখই যায় রাশেদ..." আমি কি এখন একটা মুভ নেব? আমি কি এখন অন্ধকারে আমার ডান হাতটা খুব ধীরে ধীরে সরিয়ে নিয়ে আনিকার সিটের হাতলে রাখা উনার নরম, ফর্সা হাতের ওপর রাখব?
যদি উনি আমার হাতটা সরিয়ে দেন? যদি উনি বলেন, "রাশেদ! আপনি এটা কী করছেন?" কিন্তু উনি তো নিজেই আমাকে উসকে দিলেন! আমার মনের ভেতর সাহস আর পাগলামির সেই দোটানা আবার শুরু হয়ে গেল। আমার হাত ঘামছে। আমি আমার ডান হাতটা আমার কোলের ওপর থেকে সামান্য একটু তুললাম। আনিকার হাতটা আমার থেকে মাত্র দুই ইঞ্চি দূরে। এই দুই ইঞ্চি দূরত্ব পার হতে আমার মনে হচ্ছে যেন আমাকে দুই হাজার কিলোমিটার পার হতে হবে।
আমি একটা গভীর শ্বাস নিলাম। আমি আমার হাতটা আনিকার হাতের দিকে এগোতে শুরু করলাম। অন্ধকারে খুব ধীর গতিতে। আমার হার্টবিট তখন প্রতি মিনিটে একশো কুড়ি।
ঠিক সেই মুহূর্তে...
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) -
Erotic Lovers - 09-24-2026
১৪
ঠিক সেই মুহূর্তে এমন একটা ঘটনা ঘটল, যা আমার হৃৎপিণ্ডকে আক্ষরিক অর্থেই আমার গলার কাছে নিয়ে এল। আমি নিস্তব্ধ হয়ে গেলাম। পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত কত বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে। অসম্ভব সব বিষয় মানুষের জীবনে হঠাৎ করে এমনভাবে এসে হাজির হয় যে, মানুষ তার লজিক, বুদ্ধি এবং বিজ্ঞানের সমস্ত বইপত্র ছুড়ে ফেলে দিয়ে স্রেফ হাঁ করে তাকিয়ে থাকে।
এই ধরুন হল্যান্ডের এক সাহেবের কথা। আমস্টারডামের এক নামিদামি পাঁচতারকা হোটেলে তিনি রাতে খুব শান্তিতে ঘুমিয়েছিলেন। সকালে উঠে দেখলেন তিনি পিগমি বা বামন হয়ে গেছেন। তার হাতের সাইজ, পায়ের সাইজ সব ছোট হয়ে গেছে। বা ধরুন জন উইলিয়াম স্টীথ নামক এক একলা মানুষের কথা। নিজের তৈরি করা ছোট্ট লগহাউজে যার একাকী বসবাস। একদিন সারাদিন জঙ্গলে শিকার করে ক্লান্ত হয়ে ফিরে দরজা খুলে বাড়িতে ঢুকে সে হতভম্ব। সে দেখে কোথায় সে একলা! তার লগহাউজে বাস করছে তারই এক পরিবার। স্ত্রী, দুই সন্তান, সবাই ড্রয়িংরুমে বসে গল্প করছে।
বা ধরুন আপনার আমার চোখের সামনে সারাদিন ঘুরে বেড়ানো ওই ছোট্ট পিঁপড়ার কথা। এক ফোঁটা পানিতে যার ডুবে মরার কথা, সেই পিঁপড়া পানির নিচে দিব্যি দু’দিনও বেঁচে থাকতে পারে। বা ধরুন কলকাতার এক অজপাড়াগাঁ দেরদেড়ে গোবিন্দপুর গ্রামের এক সাদাসিধে, গোবেচারা মানুষ কুশল হাজরার কথা। সে হঠাৎ করে একদিন দাবি করে বসল সে আসলে এন্টনি ফিরিঙ্গি। তার পুনর্জন্ম হয়েছে। এবং প্রমাণ হিসেবে সে একে একে বলে যেতে থাকল এন্টনি ফিরিঙ্গির জীবনের অদ্ভুত সব সত্য ঘটনা, যা কোনো বইপত্রে লেখা ছিল না।
এমন কত বিস্ময়কর ব্যাপার, আপনার আমার আশেপাশে প্রতিনিয়ত ঘটে যাচ্ছে। আমরা হয়তো খবরের কাগজে পড়ি, অথবা ইন্টারনেটে দেখি। দৈনন্দিন জীবনেও তো কম বিস্ময় নেই। ঢাকা শহরে একটা লোক হয়তো সকালে উঠে চোখে চশমা পরেই সারা বাড়ি চশমা খুঁজে বেড়াচ্ছে। কিংবা চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে বিশাল এক ভাইভা বোর্ডের সামনে বসে ক্যান্ডিডেট হঠাৎ ভুলে গেল তার নিজের নাম কী! সম্পূর্ণ সুস্থ একজন মানুষ হয়তো আল্ট্রাসোনোগ্রাম করতে গিয়ে দেখল তার পেটে দুটো নয়, তিনটা কিডনি।
এইসব ঘটনার পর একটা মানুষ যেমন চমকায়, আমি ঠিক তেমন চমকালাম। বিস্ময় নামক মানবিক আবেগ কত ধরনের হতে পারে? কী কী কারণে আমরা বিস্মিত হই? আমরা অন্যের বোকামি দেখে বিস্মিত হই। আমরা অন্যের বুদ্ধিমত্তা দেখেও বিস্মিত হই। তবে এখানেও একটা সমস্যা আছে। যে মহাবোকা সে অন্যের বোকামি দেখে বিস্মিত হবে না। সে সেটাকেই পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক নিয়ম বলে ধরে নেবে।
আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, বিজ্ঞানীদের উচিত বিস্ময় ব্যাপারটা নিয়ে বিশদ গবেষণা করা। একটা ‘বিস্ময় মিটার’ জাতীয় যন্ত্র বের করে ফেলা। থার্মোমিটার যেমন শরীরের তাপমাত্রা মাপে, এই যন্ত্র মানুষের চোখের পলকে তার বিস্ময় মেপে ফেলবে। বিস্ময় মাপা হবে এক থেকে দশের মধ্যে। লগারিদমিক স্কেলে। রিখটার স্কেলে যেমন ভূমিকম্প মাপা হয়, ঠিক তেমন। দশ হবে বিস্ময়ের সর্বশেষ সীমা।
একজন সাধারণ মানুষের জীবনে মাত্র দুবার বিস্ময় মিটারের সর্বশেষ মাপ দশে উঠবে। প্রথমবার হবে যখন সে মায়ের অন্ধকার গর্ভ থেকে এই আলোকিত পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হবে। চারপাশের এত আলো, এত শব্দ, এত বিশাল পৃথিবী দেখে তার বিস্ময় হবে দশ। আর শেষবার আবারো বিস্ময় মিটারের মাপ দশ হবে যখন সে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াবে। যখন তার চারপাশের চেনা পৃথিবী অন্ধকার হয়ে আসতে শুরু করবে, সে হতভম্ব হয়ে ভাববে— কী হতে যাচ্ছে? একি, আমি কোথায় যাচ্ছি? মৃত্যুর ওপারে কী আছে?
যারা খুব ভাগ্যবান মানুষ, তাদের কেউ কেউ এক জীবনে বিস্ময় মিটারে আরো এক-দুবার হয়তো দশ স্কোর করবেন। নেইল আর্মস্ট্রং যখন অ্যাপোলো-১১ থেকে নেমে চাঁদের মাটিতে পা রাখলেন, তখন তিনি দশ স্কোর করলেন। টমাস আলভা এডিসন ফনোগ্রাফ আবিষ্কার করলেন। এমন এক যন্ত্র যা মানুষের মুখের কথা বন্দি করে ফেলতে পারে। আসলেই কি তা পারে? যন্ত্রটা আবিষ্কার করার পর তা পরীক্ষার জন্যে তিনি নিজেই যন্ত্রের সামনে বসে বিড়বিড় করে একটা নার্সারি রাইম বা ছড়া বললেন–
Mary had a little lamb
Its fleece was as white as snow
And every where that Mary went
That lamb was sure to go.
ছড়া শেষ করে তিনি উত্তেজনায় কপালের ঘাম মুছলেন। তার গলার শব্দ আসলেই কি এই টিন আর লোহার যন্ত্রটা বন্দি করতে পেরেছে? তিনি কাঁপা কাঁপা হাতে যন্ত্র চালু করতেই যন্ত্রের ভেতর থেকে যান্ত্রিক কিন্তু স্পষ্ট শব্দ আসতে লাগল–
Mary had a little lamb...
সেদিন যদি ল্যাবরেটরিতে বিস্ময় মিটার ফিট করে রাখা হতো, তাহলে টমাস আলভা এডিসনের বিস্ময় দশ বা দশের কাছাকাছি হতো। স্টার সিনেপ্লেক্সের অন্ধকার হলের পেছনের সারির কর্নারের সিটে বসে, আমার বিস্মিত হওয়াটাও ঠিক সেই দশে দশ লেভেলের। একটু আগে আমি কী ভাবছিলাম? আমি ভাবছিলাম আমার ডান হাতটা খুব সন্তর্পণে, আস্তে আস্তে এগিয়ে নিয়ে আনিকা নাওহারের নরম, ফর্সা হাতের ওপর রাখব। আমি সাহস আর পাগলামির একটা অদৃশ্য সুতোর ওপর দাঁড়িয়ে কাঁপছিলাম। কিন্তু আমার সেই হাত আনিকার হাত পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই, একটা ঘটনা ঘটে গেল।
আনিকার চোখ সিনেমার পর্দার দিকে স্থির। উনার মুখটা স্ক্রিনের আলোয় আলোকিত। সেখানে এক ধরনের গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক মনোযোগ। পর্দায় তখন নায়ক বলছে, "মানুষের স্মৃতি মুছে গেলে সে কি আর মানুষ থাকে?" আর ঠিক সেই মুহূর্তে, আমি অনুভব করলাম, আমার দুই উরুর ঠিক মাঝখানে, আমার প্যান্টের ওপর একটা খুব শীতল, নরম কিন্তু অত্যন্ত দৃঢ় হাতের স্পর্শ।
প্রথম সেকেন্ডে আমি ব্যাপারটা বুঝতেই পারলাম না। আমার মনে হলো, আমার স্নায়ু হয়তো আমাকে কোনো ভুল সিগন্যাল দিচ্ছে। হয়তো আনিকা পপকর্নের বক্স খুঁজতে গিয়ে ভুল করে উনার হাতটা আমার কোলের ওপর রেখে ফেলেছেন। আমি অপেক্ষা করলাম, উনি এক্ষুনি হয়তো "ওহ সরি" বলে হাতটা সরিয়ে নেবেন। কিন্তু হাতটা সরল না।
বরং সেই হাতটা খুব অদ্ভুত এবং সচেতনভাবে আমার প্যান্টের ওপর দিয়ে আমার সেই কুতুব মিনারের মতো উঁচু হয়ে থাকা, চরম উত্তেজিত পুরুষাঙ্গটাকে বা বাঁড়াটাকে শক্ত করে চেপে ধরল। আমার হৃৎপিণ্ডটা আক্ষরিক অর্থেই আমার গলার কাছে এসে একটা বিশাল লাফ দিল। আমার ফুসফুসে অক্সিজেন যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। আমার চোখের সামনে সিনেমার স্ক্রিনটা যেন এক মুহূর্তে অন্ধকার হয়ে গেল। কী হচ্ছে এসব? মাই গড!
আমি ঘাড় ঘুরিয়ে আনিকার দিকে তাকাতে চাইলাম, কিন্তু আমার ঘাড়ের পেশিগুলো প্যারালাইজড হয়ে গেছে। আমি আনিকার দিকে তাকাতে পারছি না। আমি সিনেমার দিকেও তাকাতে পারছি না। আমার দৃষ্টি সোজা সামনের দিকে, যেন অনন্তকাল দূরের কোনো নিহারিকার দিকে আমি তাকিয়ে আছি। আমার শরীরটা একটা কাঠের পুতুলের মতো শক্ত হয়ে গেছে। আনিকা নাওহারের চোখ এখনো সিনেমার পর্দায়। উনার মুখের ভাবে বিন্দুমাত্র কোনো পরিবর্তন নেই। উনি অত্যন্ত রিল্যাক্সড ভঙ্গিতে বসে আছেন। উনার বাম হাতটা পপকর্নের বক্সে গেল, সেখান থেকে কয়েকটা পপকর্ন তুলে উনি মুখে দিলেন। উনার চোয়াল নড়ছে।
আর উনার ডান হাত?
সেই হাতটা যেন উনার শরীরের কোনো অংশই নয়। সেটা যেন সম্পূর্ণ স্বাধীন, বুনো এবং নিজস্ব ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন একটা সত্তা। হাতটা আমার প্যান্টের ডেনিম কাপড়ের ওপর দিয়ে আমার সেই চরম উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে একটা অদ্ভুত, ছন্দময় এবং মায়াবী খেলা শুরু করে দিয়েছে। উনার নরম, ম্যানিকিউর করা আঙুলগুলো আমার ডেনিমের কাপড়ের ওপর দিয়েই আমার পুরুষাঙ্গের আকারটা মাপতে শুরু করল। উনার হাতের তালুর হালকা চাপে আমি অনুভব করলাম, আমার ভেতরের রক্ত চলাচলের গতি যেন এক হাজার গুণ বেড়ে গেছে। আমার কানের ভেতর ভোঁ ভোঁ শব্দ হচ্ছে।
হলের ভেতরে সিসি ক্যামেরা থাকতে পারে, সামনে হয়তো কেউ ঘাড় ঘুরিয়ে আমাদের দেখতে পারে, হঠাৎ করে হলের আলো জ্বলে উঠতে পারে— এই সমস্ত লজিক, সমস্ত ভয়, সমস্ত সামাজিক বোধ আমার মস্তিষ্ক থেকে এক সেকেন্ডে ডিলিট হয়ে গেল। আমি এখন আর রাশেদ আহমেদ নই, আমি এখন কেবল একটা অনুভূতি, একটা স্নায়ুপিণ্ড। আনিকার হাতটা এবার থামল। আমি ভাবলাম, হয়তো এবার উনি হাতটা সরিয়ে নেবেন। হয়তো উনার পাগলামি শেষ হয়েছে।
কিন্তু না। আনিকা থামেননি। উনি শুধু পজিশন বদলাচ্ছিলেন। অন্ধকার হলের ভেতর, সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরের প্রচণ্ড শব্দের মাঝখানে আমি একটা খুব ছোট্ট, মেটালিক শব্দ শুনতে পেলাম।
যিপ...
শব্দটা এতই আস্তে ছিল যে আমার পাশের সিট ছাড়া পৃথিবীর আর কারো কান পর্যন্ত সেটা পৌঁছানোর কথা নয়। কিন্তু আমার কানে শব্দটা একটা চেইন-শ বা করাত চলার শব্দের মতো শোনাল। আনিকা অত্যন্ত নিপুণ এবং অভাবনীয় কৌশলে এক হাতে আমার প্যান্টের জিপারটা নিচে নামিয়ে দিয়েছেন! শিট! এসব কী হচ্ছে! এই নারী কি রক্তমাংসের মানুষ, নাকি কোনো অভিজ্ঞ জাদুকর? উনার চোখ এখনো স্ক্রিনে। স্ক্রিনের আলোয় উনার চোখে পানি চিকচিক করছে, কারণ পর্দায় তখন একটা ইমোশনাল সিন চলছে। আর এদিকে, উনার ডান হাতটা জিপারের ফাঁক দিয়ে আমার আন্ডারওয়্যারের ভেতরে প্রবেশ করছে!
আমার পুরো শরীরটা ধনুকের মতো টানটান হয়ে গেল। আমি সিটের হাতল দুটো দুই হাত দিয়ে এমন শক্ত করে খামচে ধরলাম যে, আমার আঙুলের গাঁটগুলো সাদা হয়ে গেল। উনার শীতল, মসৃণ আঙুলগুলো আমার কাপড়ের সমস্ত বাধা অতিক্রম করে সরাসরি আমার সেই জ্বলন্ত, স্পন্দনশীল মাংসপেশিকে স্পর্শ করল। স্কিন-টু-স্কিন কন্টাক্ট। চামড়ায় চামড়ায় স্পর্শ।
আমার মুখ দিয়ে একটা অস্ফুট, চাপা গোঙানি বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো, আমি দাঁত দিয়ে আমার নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে সেটা আটকালাম। উনার আঙুলগুলো আমার সেই উত্তপ্ত, পাথরের মতো শক্ত হয়ে থাকা বাঁড়াটাকে আলতো করে মুঠোয় ধরল। আমি স্পষ্ট অনুভব করলাম উনার হাতের তালুর সেই রেশমি কোমলতা। উনার আঙুলগুলো যেন একটা নিখুঁত পিয়ানো বাজাচ্ছে।
প্রথমে খুব ধীরে। উনার বুড়ো আঙুলটা আমার পুরুষাঙ্গের একদম সংবেদনশীল শীর্ষদেশ বা টিপের ওপর দিয়ে বৃত্তাকারে ঘুরতে লাগল। আমার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা তীব্র বৈদ্যুতিক স্রোত ওপরের দিকে উঠতে শুরু করল। হলের এসির কনকনে ঠান্ডা বাতাসের মধ্যেও আমার কপাল ঘেমে উঠল। আনিকা উনার হাতের মুঠোটা একটু শক্ত করলেন। তারপর খুব ধীরে, কিন্তু একটা নির্দিষ্ট, পাগল করা ছন্দে উনি উনার হাতটা ওপর-নিচ করতে লাগলাম। আমি যেন শূন্যে ভাসছি। আমার শ্বাস-প্রশ্বাস সম্পূর্ণ এলোমেলো হয়ে গেছে। আমি নাক দিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছি।
উনার হাতের কারুকাজ এতই নিখুঁত এবং এক্সপার্ট যে, মনে হচ্ছিল উনি এই কাজে পিএইচডি করেছেন। উনার আঙুলগুলো কখনো খুব শক্তভাবে আমার গোড়া থেকে শীর্ষ পর্যন্ত স্লাইড করছে, আবার কখনো খুব হালকাভাবে শুধু টিপটার ওপরে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। আমার মনে হচ্ছিল, আমার শরীরের সমস্ত স্নায়ুকেন্দ্র এই একটা জায়গায় এসে জমা হয়েছে, আর আনিকা নাওহার সেই স্নায়ুকেন্দ্রগুলোর ওপর বসে বসে রাজত্ব করছেন। আমি আড়চোখে উনার দিকে তাকালাম।
অবিশ্বাস্য! উনার মুখে এখনো সেই একই নির্লিপ্ত, বুদ্ধিবৃত্তিক আভা। উনি বাম হাত দিয়ে কোকের গ্লাসটা তুলে নিলেন। স্ট্র দিয়ে একটু কোক খেলেন। গ্লাসটা আবার কাপ হোল্ডারে রাখলেন। আর উনার ডান হাত? সেই হাতটা আমার প্যান্টের ভেতর একটা ঝড় তুলে দিয়েছে। উনার হাতের ওঠানামার গতি এবার একটু বাড়ল। ঘর্ষণের ফলে একটা অদ্ভুত উষ্ণতা তৈরি হচ্ছে। আমার মনে হচ্ছে, আমি এখনই হয়তো বিস্ফোরণের পর্যায়ে পৌঁছে যাব। আমার তলপেটের নিচে একটা প্রচণ্ড চাপ তৈরি হচ্ছে। আমি দুই পা ফাঁক করে উনার হাতটাকে আরও বেশি জায়গা করে দিলাম। আমার অবচেতন মন উনার এই বুনো খেলায় সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে বসেছে।
স্ক্রিনে তখন একটা বিশাল স্পেসশিপ মহাকাশে উড়ছে। স্পেসশিপের ইঞ্জিন স্টার্ট হওয়ার একটা গম্ভীর 'হুমমম' শব্দ পুরো হলটাকে কাঁপাচ্ছে। আর সেই শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে আনিকার হাতের মুঠি আমার পুরুষাঙ্গের ওপর একটা জাদুকরী লয় তৈরি করেছে। আমি আমার মাথাটা পেছনের সিটে হেলিয়ে দিলাম। চোখ বন্ধ করে ফেললাম। আমার চোখের সামনে তখন কোনো সিনেমা নেই। আমার চোখের সামনে শুধু ভাসছে আনিকা নাওহারের সেই অফ-হোয়াইট শাড়ি, উনার সেই নিখুঁত কলারবোন, আর উনার সেই পারফিউমের গন্ধ।
উনি আমার বাঁড়াটাকে উনার হাতের তালুর ভেতর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এমনভাবে আদর করছেন, যেন এটা উনার খুব প্রিয় কোনো খেলনা। উনার আঙুলের ডগাগুলো মাঝে মাঝে আমার উরুর ভেতরের দিকের নরম চামড়ায় ছুঁয়ে যাচ্ছে। আমি উত্তেজনায় মাঝে মাঝেই একটু কেঁপে উঠছি।
আমি নিজের অজান্তেই আমার বাম হাতটা একটু সরিয়ে আনিকার ডান হাতের ওপর রাখলাম। আমি উনার হাতটাকে থামাতে চাইলাম না, আমি শুধু উনার হাতের ওপর আমার হাতটা রেখে সেই স্পর্শটাকে অনুভব করতে চাইলাম। আনিকা আমাকে বাধা দিলেন না। উনি উনার কাজ চালিয়ে গেলেন। আমার পুরুষাঙ্গ তখন উনার হাতের মুঠোয় রীতিমতো লাফাচ্ছে। আমি বুঝতে পারছি, আমি আর বেশিক্ষণ এই চূড়ান্ত উত্তেজনা ধরে রাখতে পারব না। আমার শরীরের প্রতিটি বিন্দু থেকে একটা গরম লাভার স্রোত যেন তলপেটের দিকে ধেয়ে আসছে। আমি চোখ খুলে আনিকার দিকে তাকালাম। উনি ঠিক এই মুহূর্তে ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালেন।
অন্ধকারের মধ্যে উনার সেই বাদামি চোখ জোড়ায় আমি চোখ রাখলাম। উনার চোখের দৃষ্টিতে এখন আর কোনো সিনেমা নেই, কোনো সাহিত্য নেই। সেখানে এখন একটা তীব্র, বন্য এবং আদিম নারীত্বের আগুন জ্বলছে। উনার ঠোঁটের কোণে একটা খুব সূক্ষ্ম, রহস্যময় এবং বিজয়ী হাসি। উনি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকেই উনার হাতের গতি আরও একটু বাড়িয়ে দিলেন। আমি একটা গভীর ঘোরের মধ্যে তলিয়ে যেতে লাগলাম। আমার পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের জীবন, আমার অনুবাদকের পরিচয়, পৃথিবীর সমস্ত লজিক এবং সমস্ত বিস্ময় মিটার— সবকিছু চুরমার হয়ে এই অন্ধকার সিনেমা হলের একটা সিটের নিচে এসে বিলীন হয়ে গেল।
আর আনিকা নাওহারের সেই জাদুকরী, বুনো হাতটা আমার প্যান্টের ভেতর তার একচ্ছত্র আধিপত্য চালিয়ে যেতে লাগল। সময় জিনিসটা যে কতটা আপেক্ষিক, সেটা আলবার্ট আইনস্টাইন অঙ্কের সমীকরণ দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন। তিনি বলেছিলেন, একজন সুন্দরীর পাশে বসে থাকলে এক ঘণ্টা সময়কে এক মিনিট মনে হয়, আর জ্বলন্ত চুলার ওপর বসে থাকলে এক মিনিটকে এক ঘণ্টা মনে হয়।
স্টার সিনেপ্লেক্সের অন্ধকার হলে, এসি চলা কনকনে শীতল পরিবেশে বসে আমার মনে হচ্ছিল, আইনস্টাইন সাহেব থিওরিটা একটু অসম্পূর্ণ রেখে গেছেন। থিওরিটা হওয়া উচিত ছিল এমন— "একজন অপরূপা নারী যখন অন্ধকার সিনেমা হলে আপনার প্যান্টের জিপার খুলে তার শীতল, জাদুকরী হাত দিয়ে আপনার চরম উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে খেলা করতে থাকেন, তখন সময় পুরোপুরি থেমে যায়। তখন এক সেকেন্ডকে মনে হয় অনন্তকাল, আর অনন্তকালকে মনে হয় এক সেকেন্ড।"
কতক্ষণ আনিকা নাওহার তার এই হাতের নিপুণ খেলা চালালেন, তার কোনো সঠিক আন্দাজ আমার নেই। আমার মনে হচ্ছিল, আমি যেন সময়ের বাইরে, পৃথিবীর বাইরে, লজিকের বাইরে কোনো এক শূন্যতায় ভাসছি। সিনেমার পর্দায় তখন স্পেসশিপের ভেতরে সাই-ফাই অ্যালার্ম বাজছে— 'বিপ... বিপ... বিপ... ডেনজার! ডেনজার!' আর এদিকে আমার প্যান্টের ভেতরে আনিকার আঙুলগুলো একটা বুনো, আদিম এবং অবিশ্বাস্য ছন্দে ওঠা-নামা করছে। উনার হাতের মুঠিটা কখনো খুব শক্ত হয়ে আমার পুরুষাঙ্গের গোড়া থেকে শীর্ষ পর্যন্ত স্লাইড করছে, আবার কখনো শুধু বুড়ো আঙুল আর তর্জনী দিয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল জায়গাগুলোতে এমনভাবে সুড়সুড়ি দিচ্ছে যে, আমার মেরুদণ্ড বেয়ে বারবার বিদ্যুতের শক উঠে আসছিল।
আমার দুই পায়ের মাঝখানে তখন আক্ষরিক অর্থেই একটা জীবন্ত আগ্নেয়গিরি ফুটছে। আনিকার আঙুলের ঘর্ষণে একটা অদ্ভুত উষ্ণতা তৈরি হয়েছে। উনার আঙুলের ডগাগুলো মাঝে মাঝে আমার উরুর ভেতরের নরম চামড়ায় ছুঁয়ে যাচ্ছিল, আর প্রতিটা ছোঁয়ায় আমার শরীর ধনুকের মতো বেঁকে যাচ্ছিল। আমার প্রচণ্ড, তীব্র ইচ্ছে করছিল— আমি আমার ডান হাতটা তুলে নিই। অন্ধকারে খুব সাবধানে হাতটা উনার দিকে বাড়িয়ে দিই। উনার ওই কালো স্লিভলেস ব্লাউজের ওপর দিয়ে উনার ভরাট, উদ্ধত স্তনদুটো খামচে ধরি। কিংবা আমার হাতটা উনার শাড়ির কুঁচির নিচ দিয়ে, উনার ফর্সা, মসৃণ উরু বেয়ে উনার শরীরের সেই গোপন, উষ্ণ নারীত্বের কেন্দ্রে নিয়ে যাই। উনি যেমন আমার শরীর নিয়ে খেলছেন, আমিও উনার শরীর নিয়ে খেলি।
কিন্তু মানুষের ভেতরের ‘ভদ্রলোক’ নামক যে জিনটা থাকে, সেটা খুব ভয়ংকর জিনিস। আমার হাত দুটো সিটের হাতল খামচে ধরে পাথরের মতো শক্ত হয়ে রইল। আমার সাহস হলো না। আমি যদি হাত দিই, আর উনি যদি হঠাৎ করে খেলা থামিয়ে দেন? যদি উনি বিরক্ত হন? আমি চাইছিলাম না এই ঐশ্বরিক মুহূর্তটা কোনোভাবেই নষ্ট হোক। আমি একজন স্বার্থপর, কাপুরুষ উপভোক্তার মতো চুপচাপ উনার হাতের ওই অবিশ্বাস্য আদরটা গ্রহণ করে গেলাম।
আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম। আমার শ্বাস-প্রশ্বাস তখন একটা হাঁপানির রোগীর মতো শোনাচ্ছে। আমি নাক দিয়ে জোরে জোরে বাতাস টানছি। আমার তলপেটের পেশিগুলো শক্ত হয়ে গেছে। আমি জানি, আমি খাদের একদম কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছি। আর কয়েকটা সেকেন্ড। আনিকার হাতের আর কয়েকটা দ্রুত ওঠানামা। তারপরই আমার শরীরের সমস্ত জমানো লাভা, সমস্ত ফ্যান্টাসি একটা প্রচণ্ড বিস্ফোরণের মাধ্যমে ছিটকে বেরিয়ে আসবে উনার হাতের তালুর ওপর। আমি নিজেকে সেই চরম স্খলনের জন্য প্রস্তুত করে ফেললাম।
কিন্তু... কিন্তু নারীদের সাইকোলজি আর প্রকৃতির নিয়ম— দুটোই বড় নিষ্ঠুর। ঠিক যখন আমি বিস্ফোরণের মিলি-সেকেন্ড দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছি, ঠিক যখন আমার শরীর থেকে চরম সুখের তরলটা বেরিয়ে আসার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে— আনিকা নাওহার হঠাৎ করে উনার হাতের মুঠিটা শিথিল করে দিলেন। উনি উনার হাতটা আমার জিপারের ভেতর থেকে খুব সাবধানে, নিঃশব্দে বের করে আনলেন।
আমার পুরো শরীরটা যেন একটা প্রচণ্ড ধাক্কা খেল। একশো মাইল বেগে চলা একটা গাড়িতে হঠাৎ করে কেউ ইমার্জেন্সি ব্রেক কষলে যাত্রীর যে অবস্থা হয়, আমার ঠিক সেই অবস্থা হলো। আমি চোখ খুলে উনার দিকে তাকালাম। অন্ধকারের মধ্যে আনিকা আমার দিকে সামান্য একটু ঝুঁকলেন। উনার চোখ তখনো সিনেমার পর্দার দিকে। উনি উনার ঠোঁট দুটো আমার কানের খুব কাছে নিয়ে এসে ফিসফিস করে বললেন, "আর না রাশেদ। এরপর আর কন্ট্রোল করতে পারবেন না, ফোয়ারা ছুটে যাবে। এখানে এসব ক্লিন করা খুব ঝামেলার।"
কথাটা বলেই উনি উনার হাতটা উনার নিজের কোলের ওপর রেখে দিলেন। তারপর খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে পপকর্নের বক্স থেকে দুটো পপকর্ন তুলে মুখে পুরলেন। আমি হতভম্ব, বোকা এবং চরম যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাওয়া একটা পশুর মতো উনার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার শরীরের অবস্থা তখন ভয়াবহ। আমার কুতুব মিনার তখনো আকাশের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তার ভেতরে এখন সুখের বদলে এক প্রচণ্ড, অসহ্য যন্ত্রণা। পুরুষদের শরীরে এই পরিস্থিতিটাকে ইংরেজিতে খুব সুন্দর একটা টার্ম দেওয়া হয়েছে— ‘ব্লু বলস’ (Blue balls)। চরম উত্তেজনার পর স্খলন না হলে তলপেটে এবং অণ্ডকোষে যে তীব্র, ভোঁতা একটা ব্যথা শুরু হয়, সেটা একমাত্র ভুক্তভোগীই জানে। আমি কোনোমতে আমার ভাঙা, শুকনো গলায় ফিসফিস করে বললাম, "প্লিজ..." একটা মাত্র শব্দ। 'প্লিজ'। এই শব্দের ভেতর আমার সমস্ত পুরুষালি অহংকার, আমার অনুবাদক সত্তা, আমার যাবতীয় ফিলোসফি ধুলোয় মিশে গেল। আমি আক্ষরিক অর্থেই উনার কাছে ভিক্ষা চাইলাম। জাস্ট আর কয়েকটা সেকেন্ডের ভিক্ষা।
কিন্তু আনিকা নাওহার যেন শুনতেই পেলেন না। উনার চোখ পর্দার দিকে স্থির। উনি কোকের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছেন। উনি আমাকে সম্পূর্ণ ইগনোর করলেন। আমি সিটে হেলান দিয়ে পড়লাম। আমার বুকের ভেতর রাগে, ক্ষোভে, হতাশায় আর শারীরিক যন্ত্রণায় একটা তোলপাড় শুরু হয়ে গেল। শরীর নামক যন্ত্রটার সাথে এর চেয়ে বড় বেইমানি আর কিছু হতে পারে না। আমি দুই পা চেপে ধরে, চোখ বন্ধ করে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগলাম।
আস্তে আস্তে, খুব ধীর গতিতে, চরম এক অস্বস্তির মধ্যে দিয়ে আমার সেই উত্তেজনার পারদ নিচে নামতে শুরু করল। আমার পুরুষাঙ্গটি তার মাথা নিচু করে আবার সাধারণ অবস্থায় ফিরে আসতে লাগল। কিন্তু রেখে গেল এক তীব্র, চিনচিনে ব্যথা আর একটা চরম মানসিক পরাজয়। প্রায় বিশ মিনিট পর মুভি শেষ হলো। হলের আলোগুলো দপ করে জ্বলে উঠল। চারপাশের অন্ধকার মুছে গিয়ে একটা কৃত্রিম, উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে পড়ল।
আনিকা খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উনার সিট থেকে উঠলেন। উনার কালো শাড়ির আঁচলটা একটু ঠিক করে নিলেন। উনার চোখেমুখে এমন একটা ফ্রেশ , স্নিগ্ধ ভাব, যেন উনি এইমাত্র কোনো মন্দির বা প্যাগোডা থেকে উপাসনা করে বের হলেন।"মুভিটা কিন্তু বেশ ভালো ছিল, তাই না রাশেদ? স্পেশালি শেষের মেসেজটা," আনিকা উনার ভ্যানিটি ব্যাগটা হাতে নিতে নিতে বললেন। আমি উনার দিকে তাকিয়ে একটা ঢোঁক গিললাম। এই নারী কি মানুষ? একটু আগে অন্ধকারে এই নারীই কি আমার প্যান্টের ভেতর হাত ঢুকিয়ে আমাকে পাগল করে দিচ্ছিল? আর এখন উনি মুভির মেসেজ নিয়ে কথা বলছেন!
আমি কোনোমতে আমার জিপারটা ঠিক করে নিয়ে বললাম, "হ্যাঁ। ভালো ছিল।" আমরা হল থেকে বেরিয়ে এলাম। বসুন্ধরা সিটির আলো ঝলমলে করিডোর দিয়ে হাঁটছি। আনিকা খুব স্বাভাবিক। উনি এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন, বিভিন্ন শোরুমের ডিসপ্লে দেখছেন। আর আমি উনার ঠিক এক কদম পেছনে একটা রোবটের মতো হাঁটছি। আমার হাঁটার ভঙ্গিটা একটু অস্বাভাবিক লাগছে, কারণ তলপেটের ওই চিনচিনে ব্যথাটা এখনো যায়নি।
আমার মাথার ভেতর তখন একটাই চিন্তা। একটা মাত্র ফোকাস। কখন? কখন আমরা ফ্ল্যাটে যাব? কখন এই বসুন্ধরা সিটি, এই মেলা, এই রাস্তাঘাট শেষ হবে? কখন আমি উনার ওই কালো শাড়িতে মোড়ানো শরীরটাকে ওই বিশাল বিছানায় ফেলে আমার এই অসমাপ্ত, যন্ত্রণাদায়ক কামনার প্রতিশোধ নেব? ইশ, কখন! আমি পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। আমার চোখ বারবার উনার নিতম্বের দুলুনির দিকে, উনার ফর্সা পিঠের দিকে আটকে যাচ্ছিল। আমি মনে মনে উনার শরীরের প্রতিটি ইঞ্চি নিজের দাঁত আর ঠোঁট দিয়ে ছিঁড়ে খাওয়ার প্ল্যান সাজিয়ে ফেলেছিলাম।
কিন্তু আনিকা! উনার কোনো বিকার নেই। আমরা বসুন্ধরা সিটি থেকে বের হলাম। "চলুন, টিএসসির দিকে যাই। আজ তো ঢাকা ইউনিভার্সিটির ওখানে বেশ জমজমাট থাকবে," আনিকা বললেন। আমি প্রতিবাদ করলাম না। উনি যেখানে বলবেন, আমি সেখানেই যাব। আমার গন্তব্য তো একটাই— উনার ফ্ল্যাট। তার আগে উনি আমাকে সারা ঢাকা শহর ঘোরালেও আমার কিছু যায় আসে না।
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) -
Erotic Lovers - 09-24-2026
১৫
আমরা একটা রিকশা নিলাম। রিকশাটা কারওয়ান বাজার হয়ে শাহবাগের দিকে এগোচ্ছে। রিকশায় আমরা পাশাপাশি বসেছি। আনিকার শরীরটা আবার আমার সাথে লেপ্টে আছে। উনার সেই শ্যানেল পারফিউমের গন্ধ।
রিকশায় বসে আমার প্রচণ্ড, বন্য ইচ্ছে হতে লাগল— আমি এখনই উনাকে জাপটে ধরি। এই রিকশার হুডের নিচেই উনার ওই লাল লিপস্টিক মাখা ঠোঁট, উনার গাল, চিবুক, গলা— সব জায়গায় আমার জিভের স্পর্শ বুলিয়ে দিই। উনি আমাকে একটু আগে যে যন্ত্রণাটা দিয়েছেন, তার শোধ আমি এখনই এই রিকশায় বসে তুলি।
কিন্তু হায় রে! না হলো সাহস, না হলো পাগলামি।
আমি রিকশায় একটা জড় পদার্থের মতো বসে রইলাম। আমার ভয় হতে লাগল, আমি যদি এখন উনার গায়ে হাত দিই, আর উনি যদি রিকশা থেকে লাফিয়ে নামেন? যদি উনি বলেন, "কী অসভ্য লোক আপনি!" তখন আমি কী করব? আমি আমার পশুকে আবার শিকল পরিয়ে রাখলাম। টিএসসিতে পৌঁছালাম। স্বপন মামার টং দোকানে দাঁড়িয়ে আমরা চা খেলাম।
আনিকা উনার পুরোনো স্মৃতির পাতা খুলে বসলেন। "জানেন রাশেদ, ওই যে ওই কোণায়, ওখানে বসে আমি আর বেলাল ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিতাম। বেলাল আমাকে প্রথম প্রপোজ করেছিল ওই হাকিম চত্বরের সামনে। তখন অবশ্য টিএসসি এত জমজমাট ছিল না..." উনি উনার স্বামীর সাথে উনার প্রেমের গল্প বলে যাচ্ছেন, আর আমি চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে ফুটন্ত তেলের মতো সেদ্ধ হচ্ছি।
মহিলাদের সাইকোলজি আসলে কোন বইয়ে লেখা থাকে? একটু আগে সিনেমা হলে যে নারী আমার পুরুষাঙ্গ ধরে নাড়াচাড়া করেছে, সে এখন টিএসসিতে দাঁড়িয়ে তার স্বামীর সাথে প্রেমের নস্টালজিক গল্প শোনাচ্ছে! এটা কি কোনো মানসিক বিকৃতি, নাকি এটা নারীদের একটা স্বাভাবিক পাওয়ার প্লে? আমি চুপচাপ শুনলাম। আমার ভেতরে বিরক্তি বাড়তে লাগল। তীব্র, তিতকুটে একটা বিরক্তি। টিএসসি থেকে আমরা আবার রিকশায় উঠলাম। এবার গন্তব্য আজিজ সুপার মার্কেট।
বিকেল প্রায় চারটা বাজে। আমাদের দুজনেরই পেটে ক্ষুধা। আজিজ সুপার মার্কেটের দোতলায় একটা খুব কাব্যিক টাইপের রেস্টুরেন্ট আছে। বাঁশের চাটাই দিয়ে ঘেরা, ভেতরে রবীন্দ্রসংগীত বাজে। আমরা সেখানে গিয়ে বসলাম। অর্ডার করলাম খাঁটি বাঙালি খাবার। সর্ষে ইলিশ, আলু ভর্তা, বেগুন ভর্তা আর ধোঁয়া ওঠা সাদা ভাত।
খাবার এল। আমরা খেতে শুরু করলাম। আনিকা খুব তৃপ্তি নিয়ে খাচ্ছেন। উনার খাওয়া দেখার মধ্যেও একটা আনন্দ আছে। কিন্তু আমার পেটে খাবার ঢুকছে না। আমার পেট ভরছে না, আর মন তো ভরছেই না। আমার মন, আমার শরীর, আমার প্রতিটি কোষ এখন একটাই জিনিস খেতে চাইছে— আনিকা নাওহারের শরীর। সাদা ভাতের বদলে আমি উনার ফর্সা পেট দেখতে চাইছি, ইলিশ মাছের বদলে আমি উনার ঠোঁটের স্বাদ চাইছি।
খাবার শেষ করে আমরা আজিজ মার্কেটের বইয়ের দোকানগুলো ঘুরতে লাগলাম। হাঁটতে হাঁটতে আমার মাথার ভেতর একটা খুব পরিষ্কার, কিন্তু চরম হতাশাজনক চিন্তা উঁকি দিতে শুরু করল। আমি আস্তে আস্তে বুঝতে পারলাম, আজ রাতে বা কোনো রাতেই আসলে আর কিচ্ছু হবে না।
আনিকা নাওহার আসলে আমাকে নিয়ে একটা খেলা খেলেছেন। জাস্ট একটা মজা নিয়েছেন। উনি দেখতে চেয়েছেন, আমার মতো একজন 'ভদ্র', 'বুদ্ধিজীবী' টাইপ মানুষের কন্ট্রোল উনি কতটা ভাঙতে পারেন। উনি সিনেমা হলে আমাকে ওই চরম পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন, শুধু উনার নিজের ক্ষমতাটা উপভোগ করার জন্য। উনি আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন— "রাশেদ, তুমি যতই ফিলোসফি ঝাড়ো না কেন, তোমার শরীরের নাটাই আমার হাতের মুঠোয়। আমি চাইলে তোমাকে স্বর্গে নিতে পারি, আবার চাইলে নরকে ফেলে রাখতে পারি।"
এটা একটা ক্লাসিক ক্যাট-অ্যান্ড-মাউস গেম। আমি হলাম সেই ইঁদুর, আর উনি হলেন বিড়াল। বিড়াল ইঁদুরকে ধরে সাথে সাথে খায় না। কিছুক্ষণ থাবা দিয়ে মারে, আবার ছেড়ে দেয়, ইঁদুরটা যখন ভাবে সে বেঁচে গেছে, বিড়াল আবার থাবা মারে। এই চরম সত্যটা বুঝতে পারার পর আমার ভেতরের সমস্ত আশা নিভে গেল। আমি বুঝতে পারলাম, এই নারী উনার ফ্ল্যাটের দরজা কোনোদিনই আমার জন্য খুলবেন না। উনি আমাকে ওই সিনেমা হল পর্যন্তই রাখবেন।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে আসছে। আমরা আজিজ মার্কেট থেকে বের হলাম।
"রাশেদ, চলুন এবার ফেরা যাক। বেশ টায়ার্ড লাগছে," আনিকা বললেন। আমরা রিকশায় চেপে বসলাম। এবার গন্তব্য ধানমন্ডি। তবে উনার বাসা নয়, উনি বললেন, "চলুন, রবীন্দ্র সরোবরের ওদিক দিয়ে একটু ঘুরে যাই। সন্ধ্যার বাতাসটা ভালো লাগবে।" রিকশা চলছে। ঢাকা শহরের আকাশ কালচে হয়ে এসেছে। রাস্তার সোডিয়াম বাতিগুলো জ্বলে উঠেছে। রবীন্দ্র সরোবরের দিকের রাস্তাটা একটু নিরিবিলি, দুই পাশে বড় বড় গাছ। অন্ধকারটা বেশ জমাট।
আমি রিকশার এক পাশে বসে আছি। আমার ভেতরের সেই পরাজয়, সেই হতাশা, আর সেই তীব্র কামনার অপূর্ণতা মিলে আমার মাথার ভেতর একটা রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু করে দিল। আমি ভাবলাম, আমি কি সারাজীবন এই 'ভদ্রলোক' হয়েই থাকব? আমি কি শুধু উনার হাতের খেলনা হয়েই থাকব? উনি আমাকে নিয়ে মজা নেবেন, আর আমি বোকার মতো উনার স্বামীর প্রেমের গল্প শুনব?
হঠাৎ করে আমার ভেতরের সেই শিকল পরা পশুটা শিকল ছিঁড়ে ফেলল। সাহস আর পাগলামির যে অদৃশ্য সুতোটা ছিল, আমি সেই সুতোটা এক ঝটকায় কেটে দিলাম। রিকশা তখন রবীন্দ্র সরোবরের একটা বেশ অন্ধকার জায়গা পার হচ্ছে। আমি আর এক সেকেন্ডও চিন্তা করলাম না। কোনো ফিলোসফি না, কোনো লজিক না, কোনো পরিণতি না।
আমি হঠাৎ করে আমার বাম হাতটা বাড়িয়ে আনিকা নাওহারের ব্লাউজের ওপর দিয়ে উনার ডান দিকের স্তনটা সজোরে খামচে ধরলাম। আনিকা কিছু বুঝে ওঠার বা চমকে ওঠার আগেই, আমি আমার ডান হাত দিয়ে উনার ঘাড়ের পেছনটা শক্ত করে ধরলাম এবং উনার মুখের ওপর ঝুঁকে গিয়ে আমার ঠোঁট দুটো উনার সেই লাল লিপস্টিক মাখা ঠোঁটের ওপর প্রবল আক্রোশে, বন্যভাবে চেপে ধরলাম। একটা সরাসরি, দমকা এবং আক্রমণাত্মক চুম্বন।
আমি উনার ঠোঁটটা আমার দাঁত আর জিভ দিয়ে যেন গিলে খেতে চাইলাম। উনার নরম ঠোঁটের স্বাদ, উনার পারফিউমের গন্ধ, আর আমার ভেতরের জমানো ক্ষোভ— সবকিছু আমি ওই একটা চুম্বনের ভেতর ঢেলে দিলাম। আমার বাম হাতের মুঠিটা উনার স্তনের ওপর আরও শক্ত হলো। কিন্তু এই বন্যতা, এই পাগলামি স্থায়ী হলো মাত্র তিন বা চার সেকেন্ড।
চুমুটা দেওয়ার সাথে সাথেই আমার মস্তিষ্কের 'ভয়' নামক অ্যালার্মটা প্রচণ্ড শব্দে বেজে উঠল। রিকশাওয়ালা কি রিকশার লুকিং গ্লাসে আমাদের দেখছে? রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া কেউ কি দেখে ফেলল? আনিকা কি এখন আমাকে সজোরে একটা চড় মারবেন? উনি কি রিকশা থেকে লাফ দিয়ে পড়ে চিৎকার শুরু করবেন— "বাঁচান! এই লোকটা আমাকে রেপ করার চেষ্টা করছে!"?
এই চরম সামাজিক ভয়ের কারণে আমি ঝটকা দিয়ে উনার ঠোঁট থেকে আমার ঠোঁট ছাড়িয়ে নিলাম। আমার হাত উনার শরীর থেকে সরিয়ে নিয়ে আমি একদম রিকশার এক কোণায় গিয়ে সিঁটিয়ে বসে পড়লাম। আমার বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। আমি শ্বাস নিতে পারছি না। আমি জানি, আমার জীবন আজ এখানেই শেষ। আনিকা এখন আমাকে পুলিশে দেবে, অথবা রিকশা থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দেবে। আমি চোখ বন্ধ করে আসন্ন প্রলয়ের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। কিন্তু...
কিন্তু আমার ধারণার সম্পূর্ণ বাইরে গিয়ে, আনিকা নাওহার রিকশা থেকে লাফ দিলেন না। উনি চিৎকার করলেন না। উনি আমাকে কোনো চড়ও মারলেন না। তার বদলে, রিকশার ওই অন্ধকার হুডের নিচে, আনিকা নাওহার হঠাৎ করে হাসতে শুরু করলেন। প্রথমে খুব মৃদু শব্দে। তারপর সেই হাসিটা বাড়তে লাগল। উনি উনার দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে হাসতে লাগলেন। উনার হাসির বেগ এতই তীব্র হতে লাগল যে, উনার পুরো শরীরটা কাঁপতে শুরু করল।
"হা হা হা... ওহ মাই গড! রাশেদ... হা হা হা..."
আনিকা হাসতে হাসতে রীতিমতো দম আটকে যাওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছে গেলেন। উনার চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে আসছে। উনি হাসির চোটে রিকশার সিটে আমার দিকে হেলে পড়লেন। আমি স্তব্ধ, হতবাক এবং একটা চরম গাধার মতো উনার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমি উনাকে জোর করে চুমু খেয়েছি, উনার শরীরে হাত দিয়েছি, আর উনি আমাকে চড় মারার বদলে এমনভাবে হাসছেন যেন আমি উনাকে পৃথিবীর সেরা কোনো জোকস শুনিয়েছি!
এই নারী আসলে কী? ইনি কি কোনো রক্তমাংসের মানুষ, নাকি কোনো ভিনগ্রহের সাইকোপ্যাথ? আজ চরমভাবে উপলব্ধি করলাম— পৃথিবীর সমস্ত ভাষার ডিকশনারি মুখস্থ করলেও, একজন নারীর মনস্তত্ত্ব অনুবাদ করার ক্ষমতা কোনো পুরুষের নেই। আনিকা তখনো হাসছেন। আর রিকশাটা অন্ধকার চিরে রবীন্দ্র সরোবরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। হাসি জিনিসটা বড়ই রহস্যময়।
মানুষ কেন হাসে, এই নিয়ে বড় বড় দার্শনিকরা অনেক তত্ত্ব দিয়ে গেছেন। কেউ হাসেন আনন্দে, কেউ হাসেন দুঃখে, কেউ হাসেন স্নায়বিক চাপে, আবার কেউ হাসেন স্রেফ অন্যকে চরমভাবে অপমান করার জন্য। কিন্তু রিকশার অন্ধকার হুডের নিচে বসে আনিকা নাওহার যেভাবে হাসছিলেন, সেই হাসির কোনো বৈজ্ঞানিক বা দার্শনিক ব্যাখ্যা আমার জানা নেই।
উনার হাসির বেগ কমছেই না। হাসতে হাসতে উনার চোখ দিয়ে রীতিমতো পানি চলে এসেছে। উনি এক হাত দিয়ে পেট চেপে ধরে আরেক হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে হাসছেন। মাঝে মাঝে শ্বাস নেওয়ার জন্য থামছেন, আর পরক্ষণেই আবার হাসিতে ফেটে পড়ছেন।
আর আমি? আমি স্বঘোষিত ইন্টেলেকচুয়াল, রিকশার এক কোণায় এমনভাবে সিঁটিয়ে বসে আছি যেন আমি এইমাত্র কারো পকেট মারতে গিয়ে ধরা পড়েছি। আমার মনে হচ্ছে, রিকশার ফ্লোরটা যদি একটু ফাঁক হতো, তাহলে আমি গলে নিচে পড়ে যেতাম। ঢাকা শহরের ম্যানহোলের ড্রেন দিয়ে সোজা বুড়িগঙ্গায় গিয়ে ভেসে উঠতাম।
আমার অবস্থা একদম লেজেগোবরে। অবশেষে আনিকার হাসির দমক একটু কমল। উনি ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটা টিস্যু বের করে চোখের পানি মুছলেন। তারপর কয়েকবার গভীর শ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করে আমার দিকে তাকালেন। উনার মুখে তখনো হাসির রেশ লেগে আছে। উনি খুব স্বাভাবিক, অত্যন্ত ক্যাজুয়াল গলায় বললেন, "রাশেদ, আপনি আসলেই খুব মজার লোক আছেন!"
মজার লোক!
শব্দ দুটো আমার কানের পর্দায় একটা অদ্ভুত ধাক্কা দিল। আমি উনাকে রেপ করার মতো একটা আক্রমণাত্মক মুভ নিলাম, আর উনি আমাকে বলছেন 'মজার লোক'! আমি কি সার্কাসের ক্লাউন যে আমাকে উনার মজার লোক মনে হলো? মহিলাদের সাইকোলজি বোঝার ক্ষমতা আল্লাহ পুরুষদের দেননি, এটা আমি আবারও প্রমাণ পেলাম।
আমি চুপচাপ রিকশায় বসে রইলাম। আমার মুখ দিয়ে একটা শব্দও বের হলো না। আমি এখন আর সেই ‘বন্য পুরুষ’ নেই, আমি এখন একটা ভেজা বিড়াল। রিকশা এসে রবীন্দ্র সরোবরের এক পাশে থামল। "চলুন, নামা যাক," আনিকা রিকশা ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে বললেন।
আমি একটা রোবটের মতো উনার পেছন পেছন নামলাম। রবীন্দ্র সরোবরে তখন বেশ ভিড়। চারদিকে মানুষের কোলাহল, ফুচকা-চটপটির দোকানের হাঁকডাক, আর লেকের দিক থেকে আসা একটা ঠান্ডা বাতাস। আমরা পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করলাম। "আপনি কি ভয় পেয়েছেন রাশেদ?" আনিকা হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন।
আমি কিছু বললাম না। আমার পকেটে এক প্যাকেট বেনসন আর একটা লাইটার ছিল। আমি পকেট থেকে সিগারেটটা বের করে ঠোঁটে গুঁজলাম। লাইটার জ্বালিয়ে একটা দীর্ঘ টান দিলাম। নিকোটিনের ধোঁয়াটা ফুসফুসে গিয়ে ধাক্কা মারতেই আমার অবশ হয়ে যাওয়া স্নায়ুগুলো যেন একটু একটু করে কাজ করতে শুরু করল।
সিগারেট জিনিসটা খুব অদ্ভুত। এটা শুধু তামাক আর কাগজ নয়, এটা পুরুষ মানুষের একটা সাইকোলজিক্যাল প্রপস। যখন আপনি প্রচণ্ড নার্ভাস, যখন আপনি জানেন না আপনার হাত দুটো কোথায় রাখবেন বা কী বলবেন, তখন একটা সিগারেট ধরিয়ে নিলে মনে হয় আপনি পরিস্থিতির ওপর একটু হলেও কন্ট্রোল ফিরে পাচ্ছেন।
ধোঁয়াটা বাতাসে ছাড়তে ছাড়তে আমি আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হতে শুরু করলাম। আমার ভেতরের সেই পরাজয়ের গ্লানিটা একটু কমে এল। "ভয় পাব কেন?" আমি খুব শান্ত গলায় বললাম। "ভয় পাওয়ার তো কিছু নেই।"
"তাহলে একদম চুপ হয়ে গেলেন যে? রিকশার ওই বীরপুরুষটা কোথায় গেল?" আনিকা মিটিমিটি হাসতে হাসতে বললেন। আমি উনার দিকে তাকালাম। উনার চোখের দৃষ্টিতে সেই একই খেলা, সেই একই রহস্য। আমি বুঝতে পারলাম, উনি আমার ওই হঠাৎ আক্রমণটাকে কোনো অফেন্স হিসেবে নেননি, বরং উনি ব্যাপারটাকে এনজয় করেছেন।
"বীরপুরুষের তো কাজ শেষ," আমি একটু তিক্ত গলায় বললাম। "এখন তো ক্লাউনের পালা। মজার লোকের পালা।" আনিকা আবার হেসে উঠলেন। "আহা, রাগ করছেন কেন? চলুন, আপনাকে ফুচকা খাওয়াই। মন ভালো হয়ে যাবে।"
আমরা রবীন্দ্র সরোবরের একটা পরিচিত ফুচকার দোকানে গিয়ে বসলাম। আনিকা অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে দুই প্লেট ফুচকা অর্ডার করলেন। টক জল আর ঝাল দিয়ে মাখানো ফুচকা। আমি উনার খাওয়া দেখছিলাম। একজন অভিজাত নারী, যিনি লন্ডনে বসে ফর্ক আর নাইফ দিয়ে খাবার খান, তিনি কীভাবে অবলীলায় রাস্তার পাশের টং দোকানে বসে হাত দিয়ে ফুচকা ভেঙে টক জলে চুবিয়ে মুখে দিচ্ছেন! উনার খাওয়ার ভঙ্গিটাও খুব আকর্ষণীয়। ফুচকা মুখে দেওয়ার সময় উনার ঠোঁটটা একটু গোল হচ্ছে, আর টকের কারণে চোখটা সামান্য কুঁচকে যাচ্ছে।
আমি ফুচকা খাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু আমার মুখে কোনো স্বাদ লাগছে না। আমার মাথার ভেতর তখনো হিসাব-নিকাশ চলছে।
ফুচকা খাওয়া শেষ হলো। আমরা আরও কিছুক্ষণ লেকের পাড় ধরে হাঁটলাম। টুকটাক কথা হলো। সাহিত্য, ঢাকা শহরের পরিবেশ, আর আনিকার নতুন উপন্যাসের প্লট নিয়ে। আমি খুব মেপে মেপে কথা বলছিলাম। হাঁটতে হাঁটতে খেয়াল করলাম, চারপাশটা বেশ অন্ধকার হয়ে এসেছে। আমি ঘড়ি দেখলাম। সন্ধ্যা সাতটার ওপরে বাজে।
আমি থমকে দাঁড়ালাম।
"আনিকা," আমি গলা পরিষ্কার করে বললাম। "অনেকক্ষণ তো হলো। আজ তো ধানমন্ডি পর্যন্ত চলেই এলাম। আপনি বরং এবার বাসায় যান। আমিও মেসের দিকে ফিরে যাই।"
আনিকা হাঁটা থামিয়ে আমার দিকে ঘুরলেন। উনার কপালের ঠিক মাঝখানে একটা সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল। "চলে যেতে চাচ্ছেন?" উনি একটু অবাক গলায় জিজ্ঞেস করলেন। আমি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললাম, "থেকেই বা কী হবে? রাত তো হচ্ছে।"
"থেকে কী হবে মানে?" আনিকা উনার ভ্রু জোড়া ওপরের দিকে তুলে বললেন। "ম্যাচটা শেষ করবেন না?"
আমি আনিকার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম। ম্যাচ! মেটাফোরটা খুব সুন্দর। কিন্তু আমি এখন আর কোনো মেটাফোরের মুডে নেই। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, "ম্যাচ দিয়ে কী হবে আনিকা? হাফ টাইমে প্রতিপক্ষ গোল দিয়ে বসে আছে। আমি এক গোলে পিছিয়ে। আর এদিকে সেকেন্ড হাফের শুরুতেই আমার মূল স্ট্রাইকার রেড কার্ড পেয়ে মাঠের বাইরে। খেলবে কে?" আমার এই নিখুঁত ফুটবল মেটাফোর শুনে আনিকার ঠোঁটের কোণে আবার সেই রহস্যময় হাসিটা ফিরে এল।
উনি আমার দিকে এক কদম এগিয়ে এলেন। "মূল স্ট্রাইকার রেড কার্ড পেয়েছে কে বলল আপনাকে? রেফারি তো এখনো বাঁশি বাজায়নি। সে হয়তো ফাউল করেছে, কিন্তু রেফারি তো তাকে শুধু একটা ওয়ার্নিং দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে।"
"লাভ নেই," আমি মাথা নেড়ে বললাম। "ওই স্ট্রাইকারের আর খেলার মতো মোরাল নেই। সে ডিমোরালাইজড হয়ে গেছে। মাঠের বাইরে বসে থাকাই তার জন্য সেফ।"
"কিন্তু বাকি প্লেয়াররা তো আছে," আনিকা নাছোড়বান্দা। "নব্বই মিনিটের খেলায় যেকোনো কিছু হয়ে যেতে পারে রাশেদ। ফুটবল তো আর অঙ্কের নিয়মে চলে না। একটা লাস্ট মিনিটের কর্নার কিক, একটা পেনাল্টি— পুরো ম্যাচের রেজাল্ট ঘুরিয়ে দিতে পারে। আপনি এত সহজে হাল ছেড়ে দিচ্ছেন কেন? এ গুড ম্যানেজার নেভার গিভস আপ।"
"আমি ম্যানেজার না আনিকা। আমি একজন সাধারণ দর্শক। গ্যালারিতে বসে খেলা দেখতে এসেছিলাম, ভুল করে মাঠে নেমে পড়েছি। এখন বুঝতে পারছি, এই মাঠ আমার জন্য না। এখানকার ঘাস খুব পিচ্ছিল। স্টাডওয়ালা বুট ছাড়া এখানে দৌড়াতে গেলে শুধু আছাড়ই খেতে হবে।"
আমরা দুজন লেকের পাড়ে দাঁড়িয়ে ফুটবল নিয়ে এই অদ্ভুত, ডাবল-মিনিংয়ের আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। আনিকা খুব এনজয় করছিলেন। উনার চোখে একটা ঝিলিক মারছিল। "হুম," আনিকা কিছুক্ষণ চুপ থেকে একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলার ভান করলেন। "ঠিক আছে। আপনি যখন মেনেই নিয়েছেন যে আপনি হেরে গেছেন, তাহলে যান। কী আর করার। হারু পার্টিদের তো আর জোর করে মাঠে নামানো যায় না।"
আমি একটু আহত হলাম। পুরুষ মানুষের ইগো বড় অদ্ভুত জিনিস। সে নিজে যখন হার স্বীকার করে, তখন তার গায়ে লাগে না; কিন্তু একজন নারী যখন তাকে 'হারু পার্টি' বলে, তখন তার বুকের ভেতর একটা সুপ্ত জেদ জেগে ওঠে।
আনিকা বললেন, আচ্ছা যেতে চান যান। আমি আর জোর করে কীভাবে আটকাব। আমাকে অন্তত বাসায় পৌঁছে দেন। এটুকু দাবি তো আমার আছে নাকি? আমি চুপচাপ রইলাম কিছুক্ষণ। তারপর বললাম, চলেন।
রাত সাড়ে নয়টা।
আমরা আনিকার ফ্ল্যাটের সামনে এসে দাঁড়ালাম। আনিকা উনার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে চাবি বের করে দরজা খুললেন। আমরা ভেতরে ঢুকলাম। ফ্ল্যাটের ভেতরটা গত রাতের মতোই নিস্তব্ধ। সেন্ট্রাল এসির ঠান্ডা বাতাস, স্পটলাইটের মায়াবী আলো, আর সেই বিশাল লেদার সোফা। আনিকা উনার কার্ডিগানটা খুলে সোফার একপাশে রাখলেন। উনার কালো ব্লাউজের উন্মুক্ত পিঠটা আবার আমার চোখে পড়ল। উনি আমার দিকে ঘুরলেন।
"কোনো নাটক করবেন না। আজ রাতে এখানেই থাকবেন। রাতে অনেক কথা আছে।" আনিকা খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন।
"থাকতেই হবে?" আমি একটু নার্ভাস গলায় জিজ্ঞেস করলাম।
"অফকোর্স। আপনি আপনার গেস্টরুমে গিয়ে চেঞ্জ করে আসুন। আমিও চেঞ্জ হই। তারপর আড্ডা হবে।"
"ওহ, বাই দ্য ওয়ে রাশেদ," আনিকা হঠাৎ পেছন থেকে ডাকলেন। আমি থমকে দাঁড়ালাম। ঘাড় ঘুরিয়ে উনার দিকে তাকালাম। আনিকা সোফায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। উনার দুই হাত বুকে ক্রস করা। উনার ঠোঁটে সেই রহস্যময়, আবেদনময়ী হাসি।
"আজকে রাতে আপনার জন্য সারপ্রাইজ আছে," আনিকা খুব ধীর লয়ে বললেন।
"কী সারপ্রাইজ?"
"আমি আসার সময় ইংল্যান্ডের কিছু স্পেশাল ড্রিংকস এনেছিলাম। আজকে আপনাকে খাওয়াব।"
কথাটা শোনার পর আমার মনে হলো, আমার মাথার ওপর একটা বাজ পড়ল। মদ খাব! মানে আমি সিগারেট টানি, সে ঠিক আছে, তাই বলে মদ খাব! আমি হতভম্ব ভাবটা কাটানোর জন্য একটু হাসার চেষ্টা করলাম। আনিকা হাসলেন না। উনার চোখের দৃষ্টি... আমি একটা ঘোরের মধ্যে গেস্টরুমের দিকে এগোতে লাগলাম।
মানুষের জীবনে কিছু কিছু মুহূর্ত আসে, যখন তার ভেতরের সমস্ত যুক্তিবাদ, সমস্ত দর্শন, এবং সমস্ত ভয়ভীতি একটা সুইচ অফ করার মতো বন্ধ হয়ে যায়। ঘড়ির পেন্ডুলাম থেমে যায়। পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ শক্তি যেন তার নিয়ম পাল্টে ফেলে।
আমি গেস্টরুমের বিছানায় একটা জড় পদার্থের মতো বসে আছি। আমার ডান হাতে এখনো সেই শপিং ব্যাগটা ধরা, যেটার ভেতর আনিকা নাওহারের কিনে দেওয়া 'জার্সি' রাখা আছে। আমার চোখ মেঝের দিকে স্থির। কিন্তু আমার কান দুটো খাড়া হয়ে আছে মাস্টার বেডরুমের দিকের করিডোরের দিকে।
পুরো ফ্ল্যাটটা শ্মশানের মতো নিস্তব্ধ। আর সেই নিস্তব্ধতার বুক চিরে খুব স্পষ্ট, খুব একটানা একটা শব্দ আমার কানে এসে আছড়ে পড়ছে।
ঝিরঝির... ঝমঝম...
পানির শব্দ। বাথরুমের শাওয়ার চলার শব্দ। সাধারণত বাথরুমের শাওয়ার চলার শব্দ পৃথিবীর সবচেয়ে ম্যাড়ম্যাড়ে এবং বিরক্তিকর একটা শব্দ। মেসে সকালে যখন আমি বাথরুমের বাইরে তোয়ালে কাঁধে দাঁড়িয়ে থাকি, আর ভেতর থেকে তুহিন বা রাজুর গোসলের পানির শব্দ আসে, তখন আমার মেজাজ চরমে ওঠে। মনে হয়, ব্যাটা ভেতরে কি পুকুর খুঁড়ছে নাকি!
কিন্তু আজ... এই ধানমন্ডির ষোলো তলা বিল্ডিংয়ের সাত তলার ফ্ল্যাটে, রাত দশটার দিকে, আনিকা নাওহারের বেডরুম থেকে ভেসে আসা এই শাওয়ারের শব্দটা আমার কাছে কোনো সাধারণ শব্দ মনে হচ্ছে না। এটা যেন গ্রিক পুরাণের সেই সাইরেনদের গান। যে গান শুনলে নাবিকরা দিকভ্রান্ত হয়ে জাহাজ নিয়ে পাথরে আছড়ে পড়ত।
আমার মাথার ভেতর একটা ক্যালকুলেটর খুব দ্রুত কিছু হিসাব মেলাতে শুরু করল। আনিকা আমাকে গেস্টরুমে পাঠালেন জার্সি চেঞ্জ করার জন্য। উনি নিজে গেলেন উনার মাস্টার বেডরুমে। এখন আমি উনার বাথরুমের শাওয়ার চলার শব্দ এত স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি কীভাবে?
লজিক খুব সোজা। সেন্ট্রাল এসি চলা এই বিশাল ফ্ল্যাটের দরজাগুলো বেশ ভারী কাঠের তৈরি। দরজা বন্ধ থাকলে শব্দ বাইরে আসার কথা না। তার মানে, আনিকা উনার বেডরুমের দরজা ভেজিয়ে রাখেননি, পুরোপুরি খোলাই রেখেছেন। শুধু বেডরুমের দরজাই নয়, উনার বেডরুমের ভেতরে যে অ্যাটাচড বাথরুম, সেটার দরজাও নিশ্চয়ই খোলা বা অর্ধেক ভেজানো। তা না হলে পানির পতন-শব্দ এত তীক্ষ্ণভাবে আমার কান পর্যন্ত পৌঁছাত না।
একজন নারী, যিনি একা থাকেন, তিনি বাথরুমে শাওয়ার নিচ্ছেন, অথচ তার বেডরুম এবং বাথরুমের দরজা লক করা তো দূরের কথা, খোলাই রেখে গেছেন— এর মানে কী? আমি সারাজীবন মানুষের খবর, মানুষের ভাষা অনুবাদ করে এসেছি। আজ কি আমি একজন নারীর এই নীরব ইশারার ভাষা অনুবাদ করতে পারব না?
কোনো ভুল নয়। কোনো অসতর্কতা নয়। সরাসরি, বন্য এবং আদিম আমন্ত্রণ।
আমার বুকের স্পন্দন ড্রামের মতো বাজতে শুরু করল। হাতের তালু ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। আমি শপিং ব্যাগটা বিছানার ওপর ফেলে দিলাম। আমি একটা গভীর শ্বাস নিলাম। অনেক হয়েছে! অনেক লজিক, অনেক ফিলোসফি, অনেক ভদ্রতার মুখোশ পরে থেকেছি। অনেক ফুটবল আর জার্সির মেটাফোর কপচেছি। আর না।
"যা আছে কপালে!" আমি বিড়বিড় করে উচ্চারণ করলাম।
আমাদের দেশের মানুষের এই একটা বাক্যের ভেতর যে কী পরিমাণ পারমাণবিক শক্তি লুকিয়ে আছে, সেটা বিজ্ঞানীরা এখনো আবিষ্কার করতে পারেননি। মানুষ যখন দেয়ালের পিঠ ঠেকে যায়, যখন সে সমস্ত ভয় আর যুক্তির সীমানা পার হয়ে যায়, তখন সে এই একটা বাক্য উচ্চারণ করে ঝাঁপ দেয়। "যা আছে কপালে!"
আমি বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালাম।
আমার পরনে এখনো সেই সারাদিন অফিস আর মেলায় ঘুরে বেড়ানো ধুলোমাখা প্যান্ট আর শার্ট। আমি কাপড় বদলানোর কোনো প্রয়োজন বোধ করলাম না। খুব ধীর পায়ে, নিঃশব্দে আমি গেস্টরুম থেকে বেরিয়ে করিডোরে এসে দাঁড়ালাম। সামনেই আনিকা নাওহারের মাস্টার বেডরুম। দরজাটা সত্যিই হাঁ করে খোলা।
আমি দরজার ফ্রেমে হাত রেখে উঁকি দিলাম। পুরো বেডরুমটা অন্ধকার। বেডরুমের কোনো লাইট জ্বালানো নেই। কিন্তু ঘরের ঠিক বাঁ কোণায় যে অ্যাটাচড বাথরুমটা, তার দরজাটা অর্ধেক খোলা। আর সেই বাথরুমের ভেতর থেকে একটা মায়াবী, ওয়ার্ম-হোয়াইট (Warm-white) আলো বেরিয়ে এসে অন্ধকার বেডরুমের মেঝেতে একটা সোনালি আলোর পথ তৈরি করেছে।
আমি একটা ঘোরের মধ্যে সেই আলোর পথ ধরে বেডরুমের ভেতর পা রাখলাম। আমার পায়ের নিচে নরম কার্পেট। কোনো শব্দ হচ্ছে না। আমি বাথরুমের দরজার ঠিক বাইরে এসে দাঁড়ালাম। অর্ধেক খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে তাকাতেই আমার শরীরটা যেন এক মুহূর্তের জন্য জমে পাথর হয়ে গেল। আমার চোখের সামনে তখন যে দৃশ্যটা উন্মোচিত হলো, সেটা স্বর্গের কোনো অপ্সরী বা স্বর্গের কোনো জলকেলির দৃশ্যের চেয়েও হাজার গুণ বেশি সুন্দর, বেশি আদিম এবং বেশি নেশাধরা।
বিশাল বাথরুম। একপাশে একটা গ্লাস-পার্টিশন দেওয়া শাওয়ার কিউবিকল। সেই গ্লাসের দরজাটা সামান্য খোলা। আর মাথার ওপরের বিশাল রেইন-শাওয়ার (Rain-shower) থেকে অঝোর ধারায় পানি ঝরছে। সেই পানির নিচে দাঁড়িয়ে আছেন আনিকা নাওহার। উনার শরীরে সুতোর লেশমাত্র নেই। উনি আমার দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
আমি মুগ্ধ, বাকরুদ্ধ এবং সম্মোহিত হয়ে উনার শরীরের সেই ঐশ্বরিক জ্যামিতি দেখতে লাগলাম। রেইন-শাওয়ারের পানি উনার মাথার ঘন, কালো চুলের ওপর আছড়ে পড়ছে। ভিজে যাওয়া চুলগুলো উনার ফর্সা, মসৃণ পিঠের ওপর সাপের মতো লেপ্টে আছে। পানির ফোঁটাগুলো উনার ঘাড় বেয়ে, পিঠের সেই নিখুঁত মেরুদণ্ডের খাঁজ ধরে আস্তে আস্তে নিচের দিকে নামছে।
উনার পিঠের দুপাশের পেশিগুলো সামান্য নড়াচড়া করছে। পানি গড়িয়ে নামছে উনার সরু কোমরে। এবং তারপর... পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে আকর্ষণীয় দৃশ্যটা আমার চোখের সামনে ধরা দিল। উনার সরু কোমর যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকেই শুরু হয়েছে উনার নিতম্বের সেই অবিশ্বাস্য, মোহনীয় বাঁক। যেন প্রকৃতির নিপুণ হাতে গড়া দুটো নিখুঁত, সুডৌল পাহাড়। পানির ধারা উনার কোমর থেকে গড়িয়ে সেই দুই পাহাড়ের ওপর আছড়ে পড়ছে। তারপর সেই পানি দুই পাহাড়ের মাঝখানের যে গভীর গিরিখাত, সেই গিরিখাত দিয়ে অত্যন্ত ধীর এবং কামনার্ত গতিতে গড়িয়ে নিচের দিকে নামছে।
গিরিখাত বেয়ে সেই পানি নেমে আসছে উনার ফর্সা, মসৃণ উরুর পেছন দিকে। তারপর উরুর মাংসপেশি বেয়ে, হাঁটুর পেছন হয়ে, পায়ের গোড়ালি ছুঁয়ে বাথরুমের ফ্লোরে এসে আছড়ে পড়ছে। আমি শ্বাস নিতে ভুলে গেছি। আমার মনে হচ্ছে, আমি যদি এখন মরেও যাই, আমার কোনো আক্ষেপ থাকবে না। একজন পুরুষ তার জীবনে এর চেয়ে বেশি সুন্দর, এর চেয়ে বেশি উত্তেজক দৃশ্য আর কী দেখতে পারে?
বাথরুমের ভেতর একটা দামি শাওয়ার জেলের সুগন্ধ আর হালকা গরম পানির বাষ্প মিলেমিশে একটা মাতাল করা পরিবেশ তৈরি করেছে। আমি আর নিজেকে আটকাতে পারলাম না। আমার ভেতরের সেই রাশেদ আহমেদ পুরোপুরি মরে গেছে। সেখানে এখন জন্ম নিয়েছে এক বন্য, তৃষ্ণার্ত আদিম মানব।
আমি আমার শার্ট-প্যান্ট পরা অবস্থাতেই, পায়ে জুতো নিয়েই বাথরুমের ফ্লোরে পা রাখলাম।
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) -
Erotic Lovers - 09-24-2026
১৬
গ্লাস-পার্টিশনের খোলা অংশ দিয়ে আমি শাওয়ার কিউবিকলের ভেতরে ঢুকে গেলাম। শাওয়ারের পানি ছিটকে এসে আমার শার্ট আর প্যান্ট ভিজিয়ে দিতে শুরু করল। কাপড়ের ওপর দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ার একটা অদ্ভুত অস্বস্তি আছে, কিন্তু এই মুহূর্তে আমার কাছে পৃথিবীর কোনো কিছুই আর অস্বস্তিকর মনে হচ্ছে না। আমি আনিকার ঠিক পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। উনার ভেজা শরীর থেকে বের হওয়া তাপ আমি আমার শরীরে অনুভব করতে পারছি। খুব ধীরে, আমার ডান হাতটা আমি উনার দিকে বাড়িয়ে দিলাম।
আমার ভেজা, কাঁপতে থাকা হাতটা গিয়ে পড়ল উনার সেই সুডৌল, মসৃণ নিতম্বের ডান দিকের পাহাড়টার ওপর। স্পর্শটা হওয়ামাত্রই আমি অনুভব করলাম, আনিকার পুরো শরীরটা একটা বিদ্যুতের শকের মতো কেঁপে উঠল। পিঠের পেশিগুলো মুহূর্তের জন্য ধনুকের মতো টানটান হয়ে গেল। কিন্তু কোনো চিৎকার করলেন না। চমকে পেছনে ঘুরে তাকালেন না। আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলেন না। উনি ঠিক আগের মতোই শাওয়ারের পানির নিচে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। শুধু উনার শ্বাস-প্রশ্বাসের গতিটা হঠাৎ করে অনেক বেড়ে গেল। আমি উনার পিঠের ওঠানামা দেখে সেটা স্পষ্ট বুঝতে পারলাম।
আমি আমার হাতের তালু দিয়ে উনার সেই ভেজা, নরম অথচ দৃঢ় নিতম্বটাকে খুব আলতো করে একটু চাপ দিলাম। আমার আঙুলের ফাঁক দিয়ে শাওয়ারের পানি গড়িয়ে পড়ছে। এই স্পর্শের খেলাটা যেন পৃথিবীর সবচেয়ে আদিম কবিতা। কিছুক্ষণ উনার সেই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর পাহাড়ে হাত রাখার পর, আমি আমার হাতটা খুব ধীর গতিতে ওপরের দিকে সরাতে লাগলাম। আমার আঙুলগুলো উনার সরু কোমর ছুঁয়ে, উনার ভেজা পিঠের ওপর দিয়ে স্লাইড করে ওপরে উঠতে লাগল। উনার মেরুদণ্ডের খাঁজ ধরে আমার হাতটা যখন উনার ঘাড়ের কাছে পৌঁছাল, তখন আমি আমার আঙুলগুলো উনার ভেজা চুলের ভেতর ঢুকিয়ে দিলাম। উনার ঘাড়ের কাছে হাত রেখে আমি খুব হালকা একটা টান দিয়ে উনাকে আমার দিকে ঘোরালাম।
আনিকা নাওহার একটা মন্ত্রমুগ্ধ পুতুলের মতো আমার হাতের ইশারায় খুব ধীরে ধীরে আমার দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন। উনার সামনের দিকটা উন্মোচিত হওয়ার সাথে সাথে আমার চোখের সামনে যেন আরেকটা স্বর্গ নেমে এল। উনার সেই ভরাট, উদ্ধত বক্ষদেশ, যার চূড়াগুলো পানির স্পর্শে এবং উত্তেজনায় কঠিন হয়ে আছে, তা আমার চোখের ঠিক সামনে। কিন্তু আমি সেদিকে না তাকিয়ে উনার মুখের দিকে তাকালাম। আনিকার চোখ দুটো বন্ধ। শাওয়ারের পানি উনার মুখের ওপর দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে বলে উনি চোখ বন্ধ করে আছেন, নাকি তীব্র লজ্জায়, কামনায় আর আত্মসমর্পণে উনার চোখের পাতা বুজে এসেছে— সেটা আমি বুঝতে পারলাম না। উনার মুখমণ্ডলে মেকআপের কোনো লেশমাত্র নেই। এই সিক্ত, অনাবৃত আনিকাকে দেখে মনে হচ্ছে উনি যেন কোনো সদ্য প্রস্ফুটিত পদ্মফুল।
উনার ভেজা ঠোঁট দুটো সামান্য ফাঁকা হয়ে আছে। সেখান দিয়ে উনার ঘন, ভারী শ্বাস-প্রশ্বাস বেরিয়ে আসছে। আমি আমার দুই হাত তুলে উনার মুখমণ্ডলটা আজলা করে ধরলাম। আমার ভেজা শার্টের হাতা উনার উন্মুক্ত কাঁধে ঘষা খাচ্ছে। উনার মুখটা আমি সামান্য ওপরের দিকে তুললাম। উনার বন্ধ চোখের পাতা একটু কেঁপে উঠল। আমি আর এক সেকেন্ডও দেরি করলাম না। আমি আমার মুখটা নিচে নামিয়ে নিয়ে আমার ঠোঁট দুটো উনার সেই ঈষৎ ফাঁকা, ভেজা ঠোঁটের ওপর প্রবল আক্রোশে এবং একই সাথে সীমাহীন আদরে চেপে ধরলাম।
একটা দীর্ঘ, আদিম এবং অবিশ্বাস্য চুম্বন।
চুমু জিনিসটাকে মানুষ কতভাবেই না বর্ণনা করেছে! কেউ বলেছে এটা আত্মার মিলন, কেউ বলেছে এটা ভালোবাসার স্বাক্ষর। কিন্তু এই শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে, ভেজা কাপড়ে একজন সম্পূর্ণ নগ্ন, অপরূপা নারীর ঠোঁটে ঠোঁট রাখার এই অনুভূতিটাকে কোনো সাহিত্যের পাতায় বন্দী করা সম্ভব নয়। আমার ঠোঁট যখন উনার ঠোঁটকে স্পর্শ করল, তখন মনে হলো দুটো ভিন্ন গ্যালাক্সির মধ্যে একটা প্রচণ্ড বিস্ফোরণ হলো। উনার ঠোঁটটা শাওয়ারের পানির কারণে ঠান্ডা ছিল, কিন্তু ভেতরটা ছিল আগ্নেয়গিরির মতো উত্তপ্ত। প্রথম কয়েক সেকেন্ড আনিকা একদম স্থির ছিলেন। তারপর হঠাৎ করেই উনার ভেতরের নারীত্ব যেন জেগে উঠল। উনি উনার দুই হাত তুলে আমার ভেজা শার্টের কলারটা খামচে ধরলেন।
এবং তারপর উনি নিজেই চুমুটাকে একটা অন্য মাত্রায়, আরও গভীর, আরও বন্য একটা জায়গায় নিয়ে গেলেন।
উনার ঠোঁট দুটো আমার ঠোঁটকে যেন গিলে খেতে চাইল। উনি উনার মুখটা আরও একটু হাঁ করে উনার উষ্ণ, ভেজা জিভটা আমার মুখের ভেতর চালান করে দিলেন। আমি শিহরিত হয়ে উঠলাম। আমার জিভ উনার জিভের সাথে জড়িয়ে গেল। একটা বন্য, ছন্দময় খেলা শুরু হলো আমাদের মুখের ভেতর। শাওয়ারের পানি আমাদের মুখের ওপর আছড়ে পড়ছে, আর সেই পানির স্বাদ, উনার মুখের ভেতরের মিষ্টতা এবং আমাদের দুজনের কামনার নোনতা স্বাদ মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। আমি উনার মুখটা দুই হাতে ধরে পাগলের মতো উনার ঠোঁট, উনার চিবুক, উনার গালের কোণায় চুমু খেতে লাগলাম। আনিকাও সমানে আমাকে রেসপন্স করে যাচ্ছেন। উনার শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দগুলো একটা অস্ফুট গোঙানির মতো আমার কানের কাছে বাজছে।
উনার হাত দুটো আমার কলার ছেড়ে দিয়ে এবার আমার পিঠের ওপর দিয়ে আমাকে জাপটে ধরল। উনার সেই অনাবৃত, ভেজা, নরম বক্ষদেশ আমার ভেজা শার্টের ওপর প্রচণ্ড শক্তিতে লেপ্টে গেল। আমি আমার বুকের ওপর উনার স্তনদুটোর সেই নরম, উত্তপ্ত চাপ অনুভব করতে পারলাম। আমি আমার এক হাত উনার কোমর জড়িয়ে ধরে উনাকে আমার শরীরের সাথে আরও শক্ত করে মিশিয়ে নিলাম। আর অন্য হাতটা উনার ভেজা চুলের ভেতর দিয়ে উনার ঘাড়ের কাছে স্থির রাখলাম। আমাদের চুমু চলতেই লাগল। সে এক অনন্তকালের চুমু। এই চুমুর কোনো শুরু নেই, কোনো শেষ নেই। পানি পড়ছে, বাথরুমের আয়নাগুলো বাষ্পে ঘোলাটে হয়ে গেছে। আর সেই বাষ্পাচ্ছন্ন, স্বপ্নিল পরিবেশে পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের রাশেদ আহমেদ এবং লন্ডনপ্রবাসী বিলিয়নিয়ার আনিকা নাওহার সমস্ত সামাজিক পরিচয়, সমস্ত মুখোশ আর সমস্ত লজিক দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে একে অপরের ঠোঁটের ভেতর নিজেদের আত্মাকে পান করে চলছেন। চুমু চলছে। চুমু চলতেই লাগল। অনন্তকাল ধরে যেন এই একটা দৃশ্যই পৃথিবীতে সত্য হয়ে রইল।
মানুষের মস্তিষ্ক বড়ই অদ্ভুত একটা যন্ত্র। বিজ্ঞান বলে, যখন মানুষ চরম উত্তেজনা বা বিপদের মুখোমুখি হয়, তখন তার মস্তিষ্ক 'ফ্লাইট অর ফাইট' (Flight or Fight)— অর্থাৎ 'পালাও অথবা লড়াই করো' মুডে চলে যায়। কিন্তু আমার মস্তিষ্ক এখন তৃতীয় একটা মুডে চলে গেছে, যার নাম দেওয়া যেতে পারে— 'সারেন্ডার অর ডেস্ট্রয়'। হয় আমি এই নারীর কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করব, নয়তো উনার শরীরের আগুনে নিজেকে পুড়িয়ে ছাই করে দেব। শাওয়ারের ঝমঝম শব্দের নিচে আমাদের সেই অন্তহীন চুম্বন যখন থামল, তখন আমরা দুজনেই হাঁপাচ্ছি। আমার শার্ট আর প্যান্ট পানিতে ভিজে জবজবে হয়ে শরীরের সাথে আঠার মতো সেঁটে আছে। ভেজা কাপড়ের একটা অদ্ভুত ওজন আছে। এই ভারী, স্যাঁতস্যাঁতে কাপড়ের ভেতর বন্দী থেকে আমার মনে হচ্ছিল, আমি যেন এখনো আমার সেই পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের অনুবাদক সত্তাটাকে বয়ে বেড়াচ্ছি। আর আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই অনাবৃত, অপ্সরী নারীটি হলো সম্পূর্ণ মুক্ত, স্বাধীন এক দেবী।
দেবীর সাথে পূজারীর মিলন হতে হলে পূজারীকেও তো জাগতিক আবরণ খুলতে হয়! আমি আনিকার ঠোঁট থেকে মুখ সরিয়ে উনার চোখের দিকে তাকালাম। বাথরুমের বাষ্পাচ্ছন্ন আলোয় উনার বাদামি চোখ দুটো এখন আর শান্ত নেই; সেখানে যেন কালবৈশাখীর মেঘ জমেছে। আমি আর কোনো কথা বললাম না। কোনো মেটাফোর না, কোনো ফিলোসফি না। আমি খুব দ্রুত আমার ভেজা শার্টের বোতামগুলো এক টানে খুলে ফেললাম। শার্টটা ফ্লোরে ছুঁড়ে ফেলার পর আমার ভেজা প্যান্ট আর আন্ডারওয়্যারটাও এক মুহূর্তে শরীর থেকে খসিয়ে দিলাম।
এখন আমরা দুজন সম্পূর্ণ সমান। কোনো ক্লাস ডিফারেন্স নেই, কোনো লন্ডন-মিরপুর ডিফারেন্স নেই। এখন এই বাথরুমের ভেতর শুধু আছে এক আদিম পুরুষ এবং এক আদিম নারী। আনিকা আমার এই অনাবৃত, পেশিবহুল শরীরের দিকে একবার তাকালেন। উনার চোখে কোনো সংকোচ বা লজ্জা নেই, বরং এক ধরনের বন্য প্রশংসা ছিল। উনি উনার দুই হাত বাড়িয়ে আমার ভেজা কাঁধ জড়িয়ে ধরলেন। আমি উনাকে দুই হাতে পাঁজাকোলা করে শূন্যে তুলে নিলাম। আনিকা একটা ছোট, অস্ফুট শব্দ করে উনার দুই পা দিয়ে আমার কোমর জড়িয়ে ধরলেন। উনার ভেজা, মসৃণ শরীরটা আমার গায়ের সাথে এমনভাবে লেপ্টে গেল যেন আমরা জন্ম-জন্মান্তর ধরে এভাবেই একে অপরের সাথে যুক্ত ছিলাম।
আমি উনাকে কোলে নিয়েই শাওয়ার কিউবিকল থেকে বেরিয়ে এলাম। বাথরুমের একপাশের দেয়ালটা দামি, ধূসর রঙের মার্বেল পাথরের তৈরি। আমি আনিকার পিঠটা সেই ঠান্ডা মার্বেল দেয়ালের সাথে চেপে ধরলাম। মার্বেল পাথরের কনকনে ঠান্ডা স্পর্শ আর আমার শরীরের ফুটন্ত উত্তাপ— এই দুয়ের মাঝখানে আনিকা যেন একটা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট পাখির মতো কেঁপে উঠলেন। "রাশেদ..." উনার গলা দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।
আমি আমার ঠোঁট উনার ঘাড়ে ডুবিয়ে দিলাম। উনার ফর্সা, মসৃণ গ্রীবা, কলারবোন হয়ে আমার ঠোঁট আর দাঁত নেমে এল উনার সেই উদ্ধত, ভরাট বক্ষদেশের ওপর। আমি আমার সমস্ত তৃষ্ণা, সমস্ত বন্যতা দিয়ে উনার শরীরটাকে পান করতে শুরু করলাম। উনার বক্ষচূড়ায় আমার উষ্ণ স্পর্শ লাগতেই আনিকা আমার মাথার চুলগুলো খামচে ধরলেন। উনার নখগুলো আমার মাথার ত্বকে একটা সুড়সুড়ির মতো আঁচড় কাটছিল। উনার মাথা পেছনের দেয়ালে হেলানো, চোখ বন্ধ, আর মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে অনর্গল চাপা গোঙানি।
আমি একজন অনুবাদক। আমি শব্দের পর শব্দ গেঁথে বাক্য তৈরি করি। কিন্তু আনিকা নাওহারের শরীরের এই ভাষা, এই প্রতিটা রোমকূপের শিহরণ অনুবাদ করার ক্ষমতা পৃথিবীর কোনো ডিকশনারিতে নেই। উনার শরীর থেকে উঠে আসা সেই শ্যানেল পারফিউমের সুবাস আর কামনার আদিম, নোনতা গন্ধ আমাকে পাগল করে দিচ্ছিল। আমি উনার পেটের নিখুঁত খাঁজ, উনার নাভির গভীরতা ছুঁয়ে আমার স্পর্শকে আরও নিচে নিয়ে গেলাম। উনার শরীরের সেই গোপন, উষ্ণতম উপত্যকায় আমার হাতের আঙুল এবং আমার উষ্ণ অধর যখন তার নিজস্ব খেলা শুরু করল, আনিকা যেন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না।
"আহহহ... রাশেদ... প্লিজ..." উনার গলা চিরে একটা বন্য চিৎকার বেরিয়ে আসতে চাইল, উনি নিজের হাতের উল্টোপিঠ কামড়ে ধরে সেই শব্দ আটকালেন। উনার শরীরের প্রতিটি মাংসপেশি ধনুকের মতো টানটান হয়ে কাঁপছে। আমার মনে হলো, আমি পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী পুরুষ। যে নারী আমাকে সিনেমা হলে বসে শুধু একটা আঙুলের ইশারায় পাগল করে দিয়েছিল, আজ সেই নারী আমার স্পর্শে দেয়ালের সাথে মিশে গিয়ে থরথর করে কাঁপছে। পুরুষের ইগো স্যাটিসফেকশনের এর চেয়ে বড় কোনো জায়গা হতে পারে না।
হঠাৎ আনিকা উনার হাত দিয়ে আমার কাঁধ ধরে আমাকে ওপরে টেনে তুললেন। উনার চোখ দুটো এখন জ্বলন্ত কয়লার মতো। উনি আর শুধু নিতে চাইছেন না, উনি এখন দিতে চাইছেন। উনার সেই জাদুকরী, মসৃণ দুই হাত নেমে গেল আমার শরীরের নিচের অংশে। আমার সেই কুতুব মিনারের মতো দণ্ডায়মান, চরম উত্তেজনায় পাথরের মতো শক্ত হয়ে থাকা পৌরুষকে উনি উনার হাতের মুঠোয় বন্দি করে নিলেন। উনার হাতের সেই পরিচিত, পাগল-করা ওঠানামা আবার শুরু হলো। কিন্তু এবার আর সিনেমা হলের অন্ধকারের কোনো আড়াল নেই। এবার সব কিছু স্পষ্ট, উন্মুক্ত। উনার হাতের উষ্ণতা আর নিপুণতা আমাকে যেন মহাশূন্যে ভাসিয়ে দিল।
"আনিকা..." আমি দাঁতে দাঁত চেপে গোঙালাম।
উনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বাথরুমের বিশাল বাথটাবের দিকে ইশারা করলেন। বাথটাবটা আগে থেকেই হালকা গরম পানিতে অর্ধেক ভর্তি ছিল। হয়তো উনি গোসলের আগে পানি ছেড়ে রেখেছিলেন। আমরা দুজনে সেই বাথটাবের গরম পানির ভেতর নেমে গেলাম। পানির উষ্ণতা আমাদের শরীরের আগুনকে যেন আরও উসকে দিল। আনিকা বাথটাবের এক প্রান্তে হেলান দিয়ে বসলেন। উনার শরীর অর্ধেক পানিতে ডোবানো, আর বক্ষদেশ পানির ওপরে ভাসছে। আমি উনার দুই পায়ের মাঝখানে, উনার ঠিক মুখোমুখি বসলাম।
পানির নিচে আমাদের শরীরের ঘর্ষণ এক নতুন মাত্রার উন্মাদনা তৈরি করল। আমি আনিকার কোমর ধরে উনাকে আমার আরও কাছে টেনে নিলাম। উনার দুই পা আমার কোমর পেঁচিয়ে ধরল। আমাদের দুই ভুবন এবার এক হওয়ার অপেক্ষায়। কোনো কথা হলো না। কোনো লজিক, কোনো ভবিষ্যৎ, কোনো নৈতিকতার প্রশ্ন এখানে আর প্রাসঙ্গিক নয়। আনিকার চোখ বুজে আছে, উনার ভেজা ঠোঁট দুটো কামনায় কাঁপছে। আমি আমার দুই হাত উনার নিতম্বের নিচে রেখে, উনার শরীরটাকে সামান্য তুলে ধরলাম। এবং তারপর, খুব ধীর কিন্তু এক চরম বন্য আক্রোশে আমি উনার শরীরের সেই উষ্ণতম, গভীরতম কেন্দ্রে প্রবেশ করলাম।
"আহহহহহ!" আনিকা একটা তীক্ষ্ণ, দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন।
আমার মনে হলো, আমি যেন অনন্তকালের একটা শূন্যতা পার হয়ে অবশেষে আমার সঠিক গন্তব্যে এসে পৌঁছেছি। পুরুষ আর নারীর এই যে আদিম সংযুক্তি, এর চেয়ে স্বর্গীয়, এর চেয়ে নেশাধরা অনুভূতি পৃথিবীতে আর কিছুই নেই। পানির ভেতর একটা ছন্দময় ঢেউ শুরু হলো। আমার প্রতিটা চলন, প্রতিটা ধাক্কায় বাথটাবের পানি ছলাৎ ছলাৎ করে উঠছে। আনিকা আমার পিঠে উনার নখ বসিয়ে দিয়েছেন। উনার মুখ থেকে বের হওয়া অস্ফুট শব্দগুলো বাথরুমের টাইলসে প্রতিধ্বনিত হয়ে এক অদ্ভুত আদিম সিম্ফনি তৈরি করছে।
"রাশেদ... ইয়েস... আরও... আরও জোরে..." আনিকার ফিসফিসানি আমাকে যেন একটা পাগলা ঘোড়ায় পরিণত করল।
আমার ভেতরের সমস্ত ক্ষোভ, সমস্ত না-পাওয়া, আমার পঁচিশ হাজার টাকার জীবনের সমস্ত গ্লানি— সবকিছু আমি উনার শরীরের ভেতর তীব্র বেগে আছড়ে ফেলতে লাগলাম। আমি উনার ঠোঁট, উনার ঘাড় কামড়ে ধরেছি। আমাদের শরীরের ঘর্ষণে বাথটাবের পানি রীতিমতো উত্তাল হয়ে উঠেছে। উনার শরীরটা আমার প্রতিটা ধাক্কার সাথে সাথে ছিটকে ছিটকে উঠছে। উনার ৩৬-২৮-৩৬ এর সেই নিখুঁত জ্যামিতি এখন আমার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। আমি যেন এক জাদুকর, যে তার জাদুদণ্ড দিয়ে এই নারীকে স্বর্গের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে নিয়ে যাচ্ছে।
পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, আমাদের ভারী শ্বাস-প্রশ্বাস আর কামনার গোঙানি ছাড়া বাথরুমে আর কোনো শব্দ নেই। সময় কতক্ষণ কেটেছে জানি না। দশ মিনিট? আধা ঘণ্টা? এক যুগ? আমার সমস্ত স্নায়ু টানটান হয়ে ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। আমি বুঝতে পারছি, আমার শরীরের ভেতরের লাভা এবার আগ্নেয়গিরির মুখ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসার জন্য প্রস্তুত।
আনিকার শরীরও হঠাৎ করে ধনুকের মতো বেঁকে গেল। উনার শরীরের ভেতরের পেশিগুলো আমাকে প্রচণ্ড শক্তিতে চেপে ধরল। উনি উনার মাথাটা পেছনের দিকে হেলিয়ে দিয়ে একটা দীর্ঘ, তীক্ষ্ণ গোঙানি দিয়ে উঠলেন। উনার চরম পরম মুহূর্তটা এসে গেছে। উনার সেই বন্য, আদিম কাঁপুনিটা আমার ভেতরের শেষ বাঁধটুকুও ভেঙে দিল।
আমি উনার কোমরটাকে দুই হাতে প্রাণপণ শক্তিতে খামচে ধরলাম। আমার মুখ দিয়ে একটা পশুর মতো হুঙ্কার বেরিয়ে এল। এবং সেই মুহূর্তেই, একটা প্রচণ্ড, মহাজাগতিক বিস্ফোরণের মতো আমার শরীরের সমস্ত জমানো উত্তেজনা, সমস্ত তৃষ্ণা, সমস্ত তরল আগুন উনার শরীরের একদম গভীরে প্রবল বেগে আছড়ে পড়ল। আমি যেন এক অনন্ত অন্ধকারের ভেতর শূন্যে ভাসতে ভাসতে নক্ষত্রের মতো বিস্ফোরিত হলাম। স্খলনের সেই চরম, তীব্র এবং অবর্ণনীয় সুখের মুহূর্তে আমার মস্তিষ্ক পুরোপুরি ব্ল্যাঙ্ক হয়ে গেল। কোনো ঢাকা শহর নেই, কোনো বইমেলা নেই, কোনো সমাজ নেই। শুধু আমি আর আনিকা।
আমি উনার বুকের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। আমার হৃৎপিণ্ডটা বুকের খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে। আমরা দুজনে বাথটাবের গরম পানির ভেতর একে অপরকে জড়িয়ে ধরে হাঁপাচ্ছি। বাথরুমের বাষ্পাচ্ছন্ন আয়না, স্থির স্পটলাইটের আলো আর পানির মৃদু শব্দ— সবকিছু মিলিয়ে একটা অদ্ভুত, পরাবাস্তব শান্তি নেমে এল। আমি রাশেদ আহমেদ। একজন অতি সাধারণ মানুষ। কিন্তু আজ রাতে, এই বাথটাবের পানিতে আমি যেন স্বয়ং ঈশ্বর হয়ে গিয়েছিলাম। আমাদের শরীরের উত্তাপ আস্তে আস্তে কমছে। আনিকার নরম, ফর্সা হাতটা আমার ভেজা চুলের ভেতর আলতো করে বিলি কাটছে। পরিপূর্ণতার পর যে নিস্তব্ধতা আসে, সেটা বড়ই মায়াবী। আমি চোখ বন্ধ করে সেই মায়াবী নিস্তব্ধতায় নিজেকে হারিয়ে যেতে দিলাম।
পৃথিবীর তিন ভাগ জল আর এক ভাগ স্থল। মানুষের শরীরেরও প্রায় সত্তর ভাগই পানি। বিজ্ঞানের এই নীরস তথ্যগুলো আগে কখনো আমার কাছে এত রোমান্টিক মনে হয়নি। কিন্তু ধানমন্ডির এই ষোলো তলা বিল্ডিংয়ের সাত তলার ফ্ল্যাটের বাথটাবের হালকা গরম পানির নিচে বসে আমার মনে হচ্ছে, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সৃষ্টি হলো জল। পানির যে একটা নিজস্ব ভাষা আছে, নিজস্ব একটা স্পর্শ আছে— সেটা এর আগে আমি কখনো এভাবে অনুভব করিনি। বাথটাবটা বেশ বড়। আমরা দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ খুব অনায়াসেই এর ভেতর মুখোমুখি বসে আছি।
এক প্রান্তে সম্পূর্ণ অনাবৃত আনিকা নাওহার। অন্য প্রান্তে আমি। দুজনের শরীরই পানির নিচে অর্ধেক ডোবানো। বাথরুমের স্পটলাইটের মায়াবী আলোটা পানির ওপর পড়ে একটা অদ্ভুত সোনালি আভা তৈরি করেছে। আনিকার ভেজা চুলগুলো উনার কাঁধ বেয়ে বুকের ওপর লেপ্টে আছে। উনার ফর্সা, মসৃণ ত্বক পানির নিচে কেমন যেন একটা পরাবাস্তব আভা ছড়াচ্ছে। আমাদের দুজনের চোখেমুখেই এক অদ্ভুত প্রেম, আর তার চেয়েও বড় এক অদ্ভুত নেশা। যে নেশা চরম তৃপ্তির পর আসে, আবার একই সাথে নতুন করে তৃষ্ণাও জাগিয়ে তোলে। পানির নিচে মানুষের শরীরের ওজন কমে যায়। আর্কিমিডিসের প্লবতার সূত্র। কিন্তু আর্কিমিডিস সাহেব যদি জানতেন যে পানির নিচে দুটো অনাবৃত নারী-পুরুষের শরীর একে অপরের সাথে স্পর্শ করলে প্লবতার চেয়েও বেশি কাজ করে আদিম আকর্ষণ, তাহলে হয়তো তিনি পদার্থবিজ্ঞানের পাশাপাশি রোমান্স নিয়েও দু-চারটে সূত্র দিয়ে যেতেন।
বাথটাবের সীমিত পরিসরে আমাদের শরীর বারবার একে অপরের সাথে ছুঁয়ে যাচ্ছে। আনিকা উনার পা দুটো আমার কোমরের দুই পাশে ছড়িয়ে রেখেছেন। পানির নিচ দিয়ে উনার পায়ের নরম পাতা আমার উরুর সাথে ঘষা খাচ্ছে। আমি আমার হাত বাড়িয়ে পানির নিচেই উনার সরু, মসৃণ কোমরটা ধরে রেখেছি। উনার শরীরের উত্তাপ আর বাথটাবের গরম পানি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। আমার আঙুলগুলো খুব ধীর ছন্দে উনার কোমরের খাঁজ থেকে শুরু করে উনার পিঠের দিকে উঠছে, আবার নিচে নামছে। এই আলতো স্পর্শ, এই জলের নিচের লুকোচুরি আমাদের ভালোবাসাকে যেন হাজার গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। আনিকা একদৃষ্টে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। উনার ঠোঁটের কোণে একটা খুব প্রশান্ত, তৃপ্ত এবং বিজয়ী হাসি। "রাশেদ," আনিকা হঠাৎ নীরবতা ভেঙে উনার সেই মোহনীয়, ফিসফিস করা গলায় বললেন, "শেষমেশ বেশ সাহস দেখালেন কিন্তু!" আমি উনার কোমরে হাতের চাপটা সামান্য বাড়িয়ে বললাম, "সাহস? আমি তো ভেবেছিলাম আমি একটা কাপুরুষ।"
"কাপুরুষ তো ছিলেনই!" আনিকা খিলখিল করে হেসে উঠলেন। হাসির কারণে উনার বক্ষদেশ পানির ওপর সামান্য কেঁপে উঠল। "এতদিন ধরে এত কিছু করেও আপনাকে সাহসী করতে পারছিলাম না। আমি তো প্রায় হাল ছেড়েই দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, এই লোকটাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। এ শুধু ফিলোসফি ঝাড়বে আর দূর থেকে দেখবে।" আমি আনিকার দিকে একটু ঝুঁকে গেলাম। পানির নিচে উনার মসৃণ উরুর সাথে আমার উরুর ঘর্ষণ লাগল। "আপনি মুখ ফুটে একবার শুধু বলতেন আনিকা। তাহলে তো আমাকে এত ফিলোসফি ঝাড়তে হতো না," আমি খুব নিরীহ গলায় বললাম।
আনিকা উনার ডান হাতটা পানির নিচ থেকে তুলে এনে আমার ভেজা চুলের ভেতর ঢুকিয়ে দিলেন। আমার কপালে লেপ্টে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে খুব মিষ্টি করে হেসে বললেন, "কই? আজকেও তো মুখ ফুটে বলিনি। তাহলে আজ সাহস করলেন কীভাবে?" আমি এবার হাসলাম। একজন পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের অনুবাদক যখন তার জীবনের সেরা বিজয়টা অর্জন করে ফেলে, তখন তার হাসিতে একটা আলাদা আত্মবিশ্বাস থাকে। আমি উনার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বললাম, "মুখ ফুটে বলেন নাই, তা ঠিক। কিন্তু হাত দিয়ে সিনেমা হলে আমার যা ফুটাইছেন... তাতে তো আর সাহস দেখাতে কোনো বাধা রইল না!"
কথাটা শোনার পর আনিকা কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বাথরুমের দেয়াল কাঁপিয়ে এমন জোরে হেসে উঠলেন যে, বাথটাবের পানি ছলাৎ করে উঠল। উনি হাসতে হাসতে উনার মাথাটা পেছনের দিকে হেলিয়ে দিলেন। উনার হাসির শব্দে কোনো কৃত্রিমতা নেই, আছে এক ধরনের বন্য, মুক্ত আনন্দ। "ওহ মাই গড! রাশেদ!" আনিকা হাসতে হাসতেই আমার বুকে একটা হালকা কিল মারলেন। "ইউ আর ইমপসিবল! আপনি এভাবে কথাটা বলতে পারলেন?"
"আমি তো অনুবাদক মানুষ আনিকা," আমি উনার ভেজা কাঁধে একটা আলতো চুমু খেয়ে বললাম। "আমি ভাষা অনুবাদ করি। সিনেমা হলে আপনি হাতের যে ভাষাটা ব্যবহার করেছিলেন, সেটা অনুবাদ করার পর কোনো সুস্থ পুরুষের পক্ষে আর কাপুরুষ থাকা সম্ভব না।" আনিকা এবার উনার দুই হাত দিয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরলেন। উনার পুরো শরীরটা পানির নিচে স্লাইড করে আমার শরীরের আরও কাছে চলে এল। আমাদের দুজনের বুক একে অপরের সাথে লেপ্টে গেল। পানির নিচে উনার শরীরের সেই নরম, স্পন্দনশীল নারীত্ব আমার পুরুষাঙ্গের সাথে ছুঁয়ে যাচ্ছে। একটু আগের সেই চরম স্খলনের পরও আমার শরীরের ভেতর আবার নতুন করে একটা উষ্ণ স্রোত তৈরি হতে শুরু করল।
"আপনি কি জানেন রাশেদ, আপনি খুব ভয়ংকর একজন মানুষ?" আনিকা আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললেন। উনার ভেজা ঠোঁটের স্পর্শ আমার কানের লতিতে শিহরণ জাগাল। "আমি ভয়ংকর? আমি তো নিরীহ একটা প্রাণী।"
"একদম নিরীহ না। আপনি বাইরে থেকে খুব শান্ত, খুব ফিলোসফিক্যাল একটা ভান করে থাকেন। কিন্তু আপনার ভেতরে যে এত বন্য একটা রূপ আছে, এত আদিম একটা ক্ষুধা আছে— সেটা আমি আজকেই প্রথম দেখলাম। আপনি যখন আমাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরলেন, আমার মনে হচ্ছিল আপনি আমাকে আক্ষরিক অর্থেই গিলে খাবেন।"
আমি আমার হাতটা পানির নিচ থেকে তুলে এনে উনার ভিজে যাওয়া গালে রাখলাম। বুড়ো আঙুল দিয়ে উনার নরম ঠোঁটটা আলতো করে ছুঁয়ে দিয়ে বললাম, "ক্ষুধা তো থাকবেই আনিকা। একজন সাধারণ মানুষ যখন হঠাৎ করে স্বর্গের নাগাল পেয়ে যায়, তখন সে কি আর শান্ত থাকতে পারে?" আমরা দুজন পানির ভেতর এভাবেই একে অপরের সাথে লেপ্টে বসে রইলাম। সময় যেন থমকে গেছে। বাথটাবের এই সীমিত পরিসরটা এখন আমাদের কাছে পুরো একটা পৃথিবী। আমাদের আড্ডা চলতে লাগল। এমন অদ্ভুত, অন্তরঙ্গ পরিবেশে মানুষ হয়তো সবচেয়ে সত্যি কথাগুলোই বলে। কোনো মুখোশ থাকে না, কোনো লুকোচুরি থাকে না।
"রাশেদ, আমাদের এই সম্পর্কটাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?" আনিকা আমার বুকের ভেতর মুখ গুঁজে খুব নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করলেন। উনার আঙুলগুলো পানির নিচে আমার বুকের লোমগুলো নিয়ে খেলছে। আমি উনার ভেজা চুলে নাক ডুবিয়ে উনার সেই শ্যানেল আর শ্যাম্পু মেশানো ঘ্রাণটা গভীরভাবে নিলাম।
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) -
Bad Boy - 09-27-2026
১৭
আমি আনিকার ভেজা চুলে নাক ডুবিয়ে উনার সেই শ্যানেল আর শ্যাম্পু মেশানো ঘ্রাণটা গভীরভাবে নিলাম। "আমি কোনো নাম দিতে চাই না আনিকা," আমি বললাম।
"আমাদের সমাজ তো সব কিছুকেই একটা বক্সের ভেতর ফেলতে চায়। এটা প্রেম, এটা পরকীয়া, এটা জাস্ট ক্যাজুয়াল সেক্স, এটা ফ্রেন্ডশিপ উইথ বেনিফিটস। আমি এসব ভারী ভারী শব্দ দিয়ে আমাদের এই মুহূর্তটাকে সংজ্ঞায়িত করতে চাই না।"
"কেন চান না?"
"কারণ, আমি যদি বলি এটা প্রেম, তাহলে আপনি কাল সকালেই অপরাধবোধে ভুগবেন। আপনার মনে হবে, আপনি আপনার হাসব্যান্ডের সাথে প্রতারণা করছেন। আর আমি যদি বলি এটা জাস্ট একটা শারীরিক আকর্ষণ, তাহলে আমি নিজের কাছে নিজে ছোট হয়ে যাব। কারণ আমি জানি, আমি শুধু আপনার শরীরের প্রেমে পড়িনি। আমি আপনার এই বুদ্ধিমত্তা, আপনার এই আভিজাত্য, আপনার এই অদ্ভুত রহস্যময়তার প্রেমে পড়েছি।"
আনিকা পানির নিচ থেকে মুখ তুলে আমার দিকে তাকালেন। উনার চোখে একটা গভীর মায়া। উনি আমার ঠোঁটে খুব আলতো করে একটা চুমু খেয়ে বললেন, "আপনি সত্যিই খুব সুন্দর করে কথা বলেন রাশেদ। আপনার কথার জাদুতে না ভুলে উপায় নেই।"
"আর আপনি? আপনি এই সম্পর্কটাকে কী ভাবছেন?" আমি উনার কোমরের নিচ দিয়ে হাত গলিয়ে উনার নিতম্বের কাছে খুব হালকাভাবে আদর করতে করতে জিজ্ঞেস করলাম।
পানির নিচে আমার হাতের স্পর্শে আনিকা একটু শিউরে উঠলেন। উনার শরীরটা আমার দিকে আরও একটু বেশি চেপে বসল। "আমি জানি না রাশেদ," আনিকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন। "লন্ডনে বেলালের সাথে আমার জীবনটা খুব পারফেক্ট। সেখানে কোনো অভাব নেই, কোনো ঝগড়া নেই। কিন্তু মাঝে মাঝে খুব ফাঁকা লাগে। মনে হয়, সবকিছু এত রুটিনমাফিক কেন? আমি তো কবিতা লিখি। আমার ভেতরে একটা বন্যতা আছে, একটা আনপ্রেডিক্টেবল কিছু খোঁজার প্রবণতা আছে। বেলাল আমাকে খুব ভালোবাসে, কিন্তু ও আমাকে চমকে দিতে পারে না।"
"আর আমি পারি?"
"আপনি আমাকে চমকে দিয়েছেন রাশেদ। যেদিন আপনি বইমেলায় আমার পাশে বসে প্রথম কথা বলেছিলেন, আমি সেদিনই বুঝতে পেরেছিলাম আপনার ভেতরে একটা অদ্ভুত ডেপথ আছে। আর আজ... আজ তো আপনি আমাকে পুরোপুরি তছনছ করে দিলেন।"
আমি হাসলাম। আমার হাতের আদরটা পানির নিচে ক্রমশ একটু গাঢ় হতে শুরু করল। আনিকার শরীরটা আমার হাতের স্পর্শে মাঝে মাঝেই একটু কেঁপে কেঁপে উঠছে। উনার একটা পা আমার কোমরের পাশ দিয়ে উঠে এসে আমার পিঠের ওপর আটকে আছে। "আমি আপনাকে তছনছ করিনি আনিকা, আপনি আমাকে তছনছ করেছেন। আমি ছিলাম একটা কূপমণ্ডূক। মিরপুরের মেস আর কারওয়ান বাজারের অফিস— এর বাইরে আমার কোনো পৃথিবী ছিল না। আপনি আমাকে সেই ফ্ল্যাট সার্কেল থেকে বের করে এনেছেন।"
আমরা বাথটাবের গরম পানিতে বসে এভাবেই জীবনের দর্শন, প্রেম, আর আমাদের এই অদ্ভুত সম্পর্কের রসায়ন নিয়ে কথা বলে যাচ্ছিলাম। আর এর পাশাপাশি পানির নিচে চলছিল আমাদের এক নীরব, জাদুকরী স্পর্শের খেলা। আমি উনার মসৃণ পিঠে, উনার ঘাড়ের কাছে সাবানের ফেনার মতো আমার আঙুলগুলো বুলিয়ে দিচ্ছিলাম। আনিকা মাঝে মাঝেই আমার বুকে উনার মুখটা ঘষে দিচ্ছিলেন। উনার ভেজা স্তনদুটো আমার বুকের সাথে ঘষা খেয়ে এক অদ্ভুত শারীরিক শিহরণ তৈরি করছিল। কিছুক্ষণ পর আনিকা বাথটাবের পাশ থেকে লিকুইড শাওয়ার জেলের বোতলটা হাতে নিলেন।
"চলুন, আপনাকে একটু পরিষ্কার করে দিই। আপনার গায়ে তো মেলা আর রাস্তার অর্ধেক ধুলাবালি মেখে ছিল," আনিকা খুব মিষ্টি করে হেসে বললেন। উনি উনার দুই হাতে শাওয়ার জেল নিয়ে সেটা ঘষে ফেনা তৈরি করলেন। তারপর সেই ফেনা মাখা নরম হাতদুটো দিয়ে আমার বুকে, আমার কাঁধে, আমার পিঠে খুব যত্ন করে সাবান মাখিয়ে দিতে শুরু করলেন। উনার স্পর্শে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো বন্যতা নেই। আছে একটা অদ্ভুত মায়া, একটা গভীর আদর। উনার আঙুলগুলো যখন আমার শরীরের ওপর দিয়ে পিছলে যাচ্ছিল, আমার মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি, সমস্ত হতাশা এই বাথটাবের পানিতে ধুয়ে মুছে যাচ্ছে।
"এবার আমার পালা," আমি উনার হাত থেকে শাওয়ার জেলের বোতলটা নিলাম। আমি আমার হাতে ফেনা তৈরি করে উনার ফর্সা, মসৃণ কাঁধের ওপর রাখলাম। আমার সাবান মাখা হাত যখন উনার শরীর বেয়ে নিচে নামছিল, আনিকা চোখ বন্ধ করে একটা আরামদায়ক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আমি উনার পিঠে, উনার সুডৌল বাহুতে, এবং উনার সেই নিখুঁত, ভরাট বক্ষদেশের ওপর খুব সাবধানে, পরম আদরে সাবান মাখিয়ে দিলাম। সাবানের ফেনা আর পানির মিশ্রণে উনার শরীরটা এত বেশি পিচ্ছিল আর মোলায়েম হয়ে উঠেছিল যে, মনে হচ্ছিল আমি যেন কোনো জীবন্ত মার্বেল পাথরের ভাস্কর্যকে স্নান করাচ্ছি।
একে অপরকে এভাবে সাবান দিয়ে স্নান করানোর ভেতরে যে একটা গভীর ইমোশনাল ইন্টিমেসি আছে, সেটা আমি আজই প্রথম বুঝলাম। এটা শুধু শরীর ধোয়া নয়, এটা যেন একে অপরের আত্মাকে ছুঁয়ে দেখা। স্নান শেষে আমরা বাথটাবের প্লাগটা খুলে দিলাম। গরম পানিটা ঘূর্ণি তৈরি করে ড্রেন দিয়ে বেরিয়ে যেতে লাগল। আমরা শাওয়ার কিউবিকলের বাইরে বেরিয়ে এলাম। বাথরুমের এক কোণায় রাখা দুটো বড়, ধবধবে সাদা তোয়ালে আনিকা টেনে নিলেন। একটা উনি নিজের শরীরের চারপাশে জড়িয়ে নিলেন, আরেকটা আমার দিকে এগিয়ে দিলেন।
আমি তোয়ালেটা আমার কোমরে পেঁচিয়ে নিলাম। আনিকা তোয়ালে জড়িয়ে ভেজা চুলে একটা ছোট তোয়ালে বেঁধে নিলেন। তোয়ালের ওপর দিয়েও উনার শরীরের সেই রাজকীয় আভিজাত্য একটুও কমেনি। আমরা বাথরুম থেকে বাইরে বেরিয়ে এলাম। মাস্টার বেডরুমের সেই বিশাল কিং-সাইজ বিছানাটা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। বেডসাইড ল্যাম্পের মায়াবী আলোয় ঘরটা একটা রোমান্টিক স্বর্গের মতো মনে হচ্ছে। এসি চলার কারণে ঘরের পরিবেশ বেশ ঠান্ডা, কিন্তু আমাদের দুজনের শরীরের ভেতর তখন এক অনাবিল উষ্ণতা। আমরা দুজনে এসে সেই বিশাল বিছানার এক প্রান্তে পাশাপাশি বসলাম।আমি ঘাড় ঘুরিয়ে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালাম। রাত এগারোটা বাজে।
বাইরে ঢাকা শহরটা হয়তো তার যানজট, তার কোলাহল নিয়ে এখনো জেগে আছে। মিরপুরের মেসে হয়তো তুহিন এখন আইইএলটিএস-এর স্পিকিং প্র্যাকটিস করছে। কিন্তু আমার এই বর্তমান পৃথিবীতে এসবের কোনো অস্তিত্ব নেই। আমার পাশে তোয়ালে জড়ানো অবস্থায় বসে আছেন আনিকা নাওহার। উনার ভেজা শরীর থেকে একটা অদ্ভুত সতেজ ঘ্রাণ আসছে। আমি উনার দিকে ফিরে উনার কাঁধের ওপর আমার হাতটা রাখলাম। উনি উনার মাথাটা খুব শান্তিতে আমার কাঁধের ওপর এলিয়ে দিলেন। রাত মাত্র এগারোটা। আমাদের সামনে এখনো পড়ে আছে একটা বিশাল, দীর্ঘ রাত। কিন্তু আপাতত, এই বিছানায় বসে থাকা শান্ত মুহূর্তটাই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর উপসংহার বলে মনে হচ্ছে।
স্বর্গ জিনিসটা আসলে কেমন?
ধানমন্ডির ষোলো তলা বিল্ডিংয়ের এই সাত তলার ফ্ল্যাটের মাস্টার বেডরুমে, বিশাল কিং-সাইজ বিছানার এক প্রান্তে তোয়ালে জড়িয়ে বসে আমি এই অতি জটিল এবং আধ্যাত্মিক বিষয়টা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করছিলাম। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি ধর্মগ্রন্থে স্বর্গের একটা খুব লোভনীয় এবং বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া আছে। আপনি যদি 'র ধর্মগ্রন্থগুলোর দিকে তাকান, সেখানে বেহেশত বা জান্নাতের বর্ণনা পড়ে যেকোনো সাধারণ মানুষের মাথা ঘুরে যাওয়ার কথা। সেখানে তলদেশ দিয়ে নদী বয়ে যায়— দুধের নদী, মধুর নদী, আর সুস্বাদু সুরার নদী। সেখানে প্রাসাদগুলো সোনা আর রুপার ইট দিয়ে গাঁথা। আর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো ‘হুর’। এমন সব সঙ্গিনী, যাদের চোখ প্রবালের মতো উজ্জ্বল, ত্বক এতই স্বচ্ছ যে ভেতরের হাড়ের মজ্জা পর্যন্ত দেখা যায়, এবং যারা চিরযৌবনা।
* ধর্মে যদি যান, সেখানে স্বর্গের ধারণাটা আরেকটু কালচারাল। দেবরাজ ইন্দ্রের সভা। সেখানে কোনো দুঃখ নেই, জরা নেই, মৃত্যু নেই। সেখানে অপ্সরা বা স্বর্গের নর্তকীরা থাকে। ঊর্বশী, মেনকা, রম্ভা, তিলোত্তমা। তারা দেবতাদের এবং পুণ্যবান মুনি-ঋষিদের মনোরঞ্জন করে। তাদের রূপে মুগ্ধ হয়ে বড় বড় তপস্বীদের হাজার বছরের ধ্যান নিমেষে ভেঙে যায়। খ্রিস্টান বা ইহুদি ধর্মেও ইডেন গার্ডেন বা স্বর্গের একটা খুব প্রশান্তিময় ধারণা আছে। সেখানে রাস্তায় সোনার পাথর বিছানো, ফেরেশতারা হার্প বাজাচ্ছে, কোনো পাপ নেই, কোনো নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার টেনশন নেই।
আমি একজন পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের অনুবাদক। আমার মতো মানুষের পুণ্য বা আমলনামার যা অবস্থা, তাতে মৃত্যুর পর এই দুধের নদী বা ঊর্বশীর দেখা পাওয়ার কোনো বৈজ্ঞানিক বা তাত্ত্বিক সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কিন্তু মানুষের জীবন বড়ই অদ্ভুত। মাঝে মাঝে মৃত্যুর আগেই কিছু মানুষের জীবনে স্বর্গ নেমে আসে। আমার মনে হচ্ছে, আমি এখন আক্ষরিক অর্থেই একটা স্বর্গে বসে আছি। বেডরুমের এসিটা বাইশ ডিগ্রিতে চলছে। ভেতরের পরিবেশটা একদম মোলায়েম, শান্ত। আর আমার চোখের ঠিক সামনে, ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে টুলে বসে আছে এই মর্ত্যের সবচেয়ে সেরা ঊর্বশী। আনিকা নাওহার।
উনার পরনে এখন আর কোনো শাড়ি বা প্লাজো নেই। স্নান শেষে বাথরুম থেকে বেরিয়ে উনি কেবল একটা ধবধবে সাদা, মোটা তোয়ালে উনার শরীরের চারপাশে জড়িয়ে নিয়েছেন। তোয়ালেটা উনার বুকের ওপরের অংশ থেকে শুরু হয়ে উরুর ঠিক মাঝামাঝি এসে শেষ হয়েছে। উনার হাতে একটা হেয়ার ড্রায়ার। ড্রায়ারের একটানা ‘ভোঁওওও’ শব্দে ঘরের নিস্তব্ধতা ভাঙছে। উনি ড্রায়ার দিয়ে উনার ভেজা, কালো চুলগুলো শুকাচ্ছেন। আমি বিছানায় বসে একদৃষ্টে, চোখের পলক না ফেলে এই দৃশ্যটা দেখছিলাম। একজন নারী যখন আয়নার সামনে বসে নিজের যত্ন নেয়, তখন তার চেয়ে মোহনীয় দৃশ্য পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি হতে পারে না।
হেয়ার ড্রায়ারের গরম বাতাসে উনার চুলগুলো উড়ে উড়ে উনার ফর্সা, মসৃণ পিঠ এবং কাঁধের ওপর আছড়ে পড়ছে। উনার ডান হাতটা ড্রায়ার ধরে আছে, আর বাঁ হাত দিয়ে উনি চুলগুলো বিলি কেটে ওপরে তুলছেন। এই হাত তোলার ভঙ্গিতে উনার তোয়ালেটা বক্ষদেশের কাছে একটু ঢিলা হয়ে যাচ্ছে। তোয়ালের ওপরের বর্ডার দিয়ে উনার সেই ভরাট, উদ্ধত স্তনযুগলের ওপরের দিকের যে নিখুঁত, গোলাকার স্ফীতিটা দেখা যাচ্ছে, তা যেকোনো তপস্বীর ধ্যান ভাঙার জন্য যথেষ্ট।
উনার ঘাড়ের কাছে, কলারবোনের খাঁজে তখনো কয়েক ফোঁটা পানির বিন্দু জমে আছে, যা স্পটলাইটের আলোয় মুক্তোর মতো জ্বলজ্বল করছে। ফর্সা, মেদহীন দুই কাঁধ এবং পিঠের উন্মুক্ত অংশটা এতই মসৃণ যে, মনে হচ্ছে কোনো মাস্টারপিস ভাস্কর অনেক বছর ধরে খুব যত্ন করে মার্বেল পাথর ঘষে ঘষে এই শরীরটা তৈরি করেছে। ড্রায়ারের বাতাসে উনার শ্যাম্পু করা চুলের যে একটা মাতাল করা সুবাস পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে, তা স্বর্গের যেকোনো অমৃতের চেয়ে বেশি নেশাধরা। আমি মুগ্ধ হয়ে উনার রূপের এই অবগাহন গিলছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল, সময় যদি এই জায়গায় চিরকালের জন্য আটকে যেত, তবে আমার আর কোনো আক্ষেপ থাকত না।
কিছুক্ষণ পর হেয়ার ড্রায়ারের শব্দটা হঠাৎ করে থেমে গেল।
আনিকা ড্রায়ারটা ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখলেন। তারপর চিরুনি দিয়ে চুলটা একটু আঁচড়ে নিয়ে টুলের ওপর বসেই ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালেন। উনার সেই বাদামি চোখ জোড়ায় এখন আর কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক দূরত্ব নেই , সেখানে এখন এক ধরনের অদ্ভুত, বন্য এবং তৃপ্ত অধিকারবোধ।"রাশেদ," আনিকা খুব শান্ত, কিন্তু স্পষ্ট গলায় ডাকলেন। "হুম?" আমি মোহগ্রস্তের মতো উত্তর দিলাম।
আনিকা উনার শরীরটা পুরোপুরি আমার দিকে ঘুরিয়ে বসলেন। তোয়ালেটা উনার উরুর ওপর আরেকটু উঠে গেল। "আমি দেশে আর ঠিক এক সপ্তাহ আছি। সর্বোচ্চ। সামনের সোমবার আমার লন্ডনের ফ্লাইট," আনিকা বললেন। উনার গলার স্বরে কোনো ইমোশন নেই, কিন্তু কথাটার ভেতরে একটা প্রবল নির্দেশ লুকিয়ে আছে। আমার বুকের ভেতর একটা চিনচিনে ব্যথা হলো। এক সপ্তাহ! মানে মাত্র সাত দিন। তারপর এই ঊর্বশী আবার তার নিজের জগতে, তার বিলিয়নিয়ার স্বামীর কাছে ফিরে যাবে। আর আমি আবার সেই বিকল্প বাসের হ্যান্ডেল ধরে ঝুলতে ঝুলতে কারওয়ান বাজারে যাব। "তারপর?" আমি খুব স্বাভাবিক থাকার ভান করে জিজ্ঞেস করলাম।
"তারপর আর কী!" আনিকা সোজা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, "এই একটা সপ্তাহে আমি এক মুহূর্তের জন্যও তোমাকে আমার আড়াল হতে দিতে চাই না। আমি যখন চাইব, তোমাকে আমার চোখের সামনে থাকতে হবে। আমার বিছানায় থাকতে হবে।" আমি একটু থমকে গেলাম। "এক সপ্তাহ আড়াল হতে দেবেন না মানে? আমার তো অফিস আছে। কাজ আছে। আমাকে তো দিনে বের হতেই হবে," আমি প্র্যাকটিক্যাল লজিক দেওয়ার চেষ্টা করলাম।
আনিকা উনার হাত দুটো বুকের ওপর ক্রস করে অত্যন্ত জেদি গলায় বললেন, "অফিস-টফিস আমি কিছু বুঝি না। যেমনে পারো ছুটি নাও। সিক লিভ নাও, এমার্জেন্সি লিভ নাও, যা খুশি করো। দরকার হলে ওই পঁচিশ হাজার টাকার ফালতু চাকরিটা ছেড়ে দাও! আমি তোমার এক বছরের স্যালারি অ্যাডভান্স দিয়ে দেব। বাট আই ওয়ান্ট ইউ উইথ মি। অল দ্য টাইম।" আমি একটু হেসে ফেললাম। আনিকা নাওহার এখন আর কোনো লেখিকা বা আইটি ফার্মের সিইও নন। উনি এখন পুরোপুরি একজন জেদি, তৃষ্ণার্ত এবং পজেসিভ নারী।
"এত তাড়াহুড়া কেন আনিকা?" আমি একটু মজা করার সুরেই বললাম। "এক সপ্তাহে এত কী হয়ে যাবে?"
আমার কথার জবাবে আনিকা যা বললেন, সেটা শোনার জন্য আমি বিন্দুমাত্র প্রস্তুত ছিলাম না। উনার মতো এত ক্লাসি, এত আভিজাত্যে মোড়ানো একজন নারীর মুখ থেকে এমন একটা ডায়ালগ বের হতে পারে, সেটা আমার কল্পনারও বাইরে ছিল। আনিকা উনার ঠোঁটটা একটু কামড়ে ধরে, অত্যন্ত নিচু কিন্তু বন্য গলায় বললেন, "তাড়াহুড়া হবে না? বাথটাবের ভেতর তুমি আমাকে যে আদর করেছ, যে চরম জায়গায় নিয়ে গিয়ে ছেড়েছ... এরপর আমি রাস্তার কুত্তি যে হয়ে যাইনি, এটাই আমার কপাল! তুমি দেখতে একটা গোবেচারা, ফিলোসফার টাইপ। কিন্তু বিছানায় তুমি তো একদম পাকা খেলোয়াড় রাশেদ! তুমি আমাকে পাগল করে দিয়েছ।"
কথাটা শোনার পর আমার কানের ভেতর দিয়ে যেন গরম সীসা ঢুকে গেল। 'রাস্তার কুত্তি হয়ে যাইনি!' 'পাকা খেলোয়াড়!' একজন নারীর মুখ থেকে, বিশেষ করে তার মতো একজন হাই-সোসাইটির নারীর মুখ থেকে নিজের পৌরুষের এমন আদিম এবং নগ্ন প্রশংসা শোনার পর কোনো পুরুষের পক্ষেই আর স্বাভাবিক থাকা সম্ভব না। আমার অহংকার, আমার পুরুষালি ইগো যেন এক লাফে এভারেস্টের চূড়ায় উঠে গেল। তবে এই কথার ডামাডোলের ভেতরেও আমার অনুবাদক মস্তিষ্ক একটা খুব সূক্ষ্ম পরিবর্তন খেয়াল করল। আনিকা আমাকে ‘তুমি’ করে বলা শুরু করেছেন।
গত এক সপ্তাহ ধরে আমাদের যত কথা হয়েছে, সাহিত্য নিয়ে, মেলায়, রিকশায়, এমনকি একটু আগে ড্রয়িংরুমে বসেও— উনি আমাকে ‘আপনি’ করেই বলছিলেন। কিন্তু বাথটাবের ওই চরম মুহূর্তগুলো পার হওয়ার পর, শারীরিক আড়ালটা যখন পুরোপুরি ঘুচে গেছে, তখন ভাষার আড়ালটাও উনি ছুঁড়ে ফেলেছেন। উনি আমাকে ‘তুমি’ বলছেন। এই ‘তুমি’র ভেতরে একটা অদ্ভুত অধিকারবোধ আছে, একটা মালিকানা আছে। যেন উনি বলতে চাইছেন, "তোমার শরীরটা এখন আমার চেনা, তুমি এখন আমার নিজস্ব প্রপার্টি।"
কিন্তু আমি রাশেদ আহমেদ। আমি জানি সাইকোলজিক্যাল পাওয়ার প্লে কীভাবে করতে হয়। আমি উনাকে ‘তুমি’ করে বললাম না। আমি আমার সেই ‘আপনি’ সম্বোধনটাই বজায় রেখে গেলাম। একজন নারী যখন অন্তরঙ্গতার চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে আপনাকে ‘তুমি’ বলছে, আর আপনি তাকে তার নগ্ন শরীরের ওপর হাত রেখেও ‘আপনি’ করে বলছেন— তখন এই ভাষার দূরত্বের কারণে এক অদ্ভুত মানসিক বৈপরীত্য তৈরি হয়। এই সম্মানসূচক ‘আপনি’ শব্দটার ভেতরে তখন আর কোনো সম্মান থাকে না, বরং এটা একটা সেক্সুয়াল টেনশন বা আদিম ফ্যান্টাসির ট্রিগার হিসেবে কাজ করে। এটা উনাকে অবচেতনভাবে বোঝাবে যে, আমি উনার কাছে পুরোপুরি ধরা দিইনি। আমি এখনো আমার জায়গায় স্থির।
"আপনার প্রশংসা শুনে আমি সত্যিই খুব ইমপ্রেসড আনিকা," আমি খুব শান্ত গলায়, ‘আপনি’ শব্দটায় একটু জোর দিয়ে বললাম। আনিকা আমার মুখের দিকে তাকালেন। উনার চোখে একটা কৌতূহলের ঝিলিক। উনি নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন যে আমি উনাকে এখনো ‘আপনি’ বলছি। কিন্তু উনি সেটা নিয়ে কিছু বললেন না। উনি ড্রেসিং টেবিলের টুল ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। উনার খোলা চুলগুলো পিঠের ওপর ছড়ানো। উনি আমার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছেন। উনার চোখেমুখে একটা অদ্ভুত, খেলাুড়ে এবং বিপজ্জনক আবেদন। খুব ধীর, নাটকীয় এবং কায়দা করে উনি উনার বুকের ওপর তোয়ালের যে গিঁটটা ছিল, সেখানে হাত রাখলেন। উনার চোখ আমার চোখের সাথে একদম লক করা।
তারপর একটা মাত্র হালকা টানে উনি তোয়ালের বাঁধনটা খুলে দিলেন। ধবধবে সাদা, ভারী তোয়ালেটা উনার শরীর থেকে খসে গিয়ে উনার পায়ের কাছে কার্পেটের ওপর লুটিয়ে পড়ল। এবং আনিকা নাওহার আবার সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন। বেডরুমের ল্যাম্পের হলুদ মায়াবী আলোয় উনার সেই নিখুঁত, ছত্রিশ বছর বয়সী, অথচ কুড়ির মতো সতেজ শরীরটা একটা জীবন্ত ভাস্কর্যের মতো আমার সামনে উন্মোচিত হলো। উনার ভরাট, গর্বিত স্তনযুগল, উনার সমতল পেট, উনার নাভির গভীরতা এবং দুই উরুর মাঝখানের সেই অন্ধকার, রহস্যময় ত্রিভুজ— সবকিছু মিলে আমার চোখের সামনে স্বর্গের দরজা আবার খুলে গেল।
আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো উনার শরীরের দিকে তাকিয়ে ঢোঁক গিললাম। আনিকা খুব স্বাভাবিক, কোনো রকম আড়ষ্টতা ছাড়া একটা পা সামান্য বাঁকিয়ে দাঁড়ালেন। উনার ঠোঁটের কোণে সেই বিজয়ী হাসি।
"আমার খুব খিদা লেগেছে," আনিকা হঠাৎ খুব ক্যাজুয়াল গলায় বললেন। আমি উনার শরীরের দিক থেকে চোখ সরিয়ে উনার মুখের দিকে তাকালাম। আমার বুকের ভেতর আবার সেই আগের মতো হাতুড়ি পিটানো শুরু হয়ে গেছে। "খিদা লেগেছে?" আমি খুব নিরীহ, গোবেচারা একটা ভান করে বললাম। "তা এখন কী খাবেন? আমি কি অনলাইনে ফুডপান্ডায় কিছু অর্ডার করব? পিজ্জা বা বার্গার?"
আমার এই অতি-ভদ্র, নির্বোধের মতো কথা শুনে আনিকা খিলখিল করে হেসে উঠলেন।
উনি আমার দিকে এক কদম এগিয়ে এলেন। উনার নগ্ন, মোলায়েম শরীরের উত্তাপ আমি কয়েক ফুট দূর থেকেই অনুভব করতে পারছি। "আমার মতো এমন একটা গরম খাবার তোমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে, তুমি ফুডপান্ডায় অন্য খাবার খুঁজছ রাশেদ?" আনিকা উনার ভ্রু নাচিয়ে, অত্যন্ত মাদকতাময় গলায় বললেন। উনার এই সরাসরি, নির্লজ্জ এবং উসকানিমূলক কথাটা শুনে আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। আমি শব্দ করে হেসে ফেললাম। ফুডপান্ডার আর দরকার নেই। পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু, সবচেয়ে দামি এবং সবচেয়ে গরম ডিশটা তো আমার চোখের সামনেই পরিবেশন করা আছে।
আমি আর এক মুহূর্তও নষ্ট করলাম না।
আমি বিছানা থেকে স্প্রিংয়ের মতো লাফিয়ে উঠলাম। আমার পরনে তখনো সেই তোয়ালেটা জড়ানো। আমি এক পা এগিয়ে গিয়ে উনাকে আমার দুই হাতের বেষ্টনীর ভেতর টেনে নিলাম। আনিকা কোনো বাধা দিলেন না, বরং উনি নিজেই উনার দুই হাত আমার গলা জড়িয়ে ধরে আমার শরীরের সাথে একেবারে মিশে গেলেন। উনার নগ্ন, নরম শরীরটা আমার তোয়ালে ঢাকা শরীরের সাথে লেপ্টে গেল। উনার স্তনদুটো আমার বুকের ওপর চেপে বসে একটা অদ্ভুত ঘর্ষণের সৃষ্টি করল। আমি আমার মাথাটা নিচে নামিয়ে উনার সেই লালচে, ঈষৎ ফাঁকা ঠোঁটের ওপর আমার ঠোঁটটা চেপে ধরলাম।
এবার আর কোনো ধীর বা আলতো চুম্বন নয়। এটা ছিল একটা ক্ষুধার্ত, দীর্ঘ এবং সর্বগ্রাসী চুমু। আমি উনার নিচের ঠোঁটটা আমার দাঁত দিয়ে হালকা কামড়ে ধরে উনার মুখের ভেতর আমার জিভটা প্রবেশ করিয়ে দিলাম। আনিকাও প্রচণ্ড আবেগে, বন্য একটা গোঙানি দিয়ে আমার জিভের সাথে উনার জিভের যুদ্ধ শুরু করে দিলেন। আমরা যেন একে অপরকে খেয়ে ফেলতে চাইছিলাম। উনার মুখের ভেতরের লালা, উনার শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ, আর উনার শরীরের সেই শ্যাম্পুর সুবাস— সবকিছু মিলে আমার মস্তিষ্ককে আবার একটা আদিম উন্মাদনার দিকে ঠেলে দিল।
এই দীর্ঘ, অন্তহীন চুমুর মাঝখানেই আনিকা উনার একটা হাত আমার গলা থেকে নামিয়ে আনলেন। উনার হাতটা আমার বুক, আমার পেট ছুঁয়ে সোজা নেমে গেল আমার কোমরে পেঁচানো তোয়ালের গিঁটটার ওপর। আমি উনার ঠোঁট পান করতে ব্যস্ত, আর উনি খুব নিপুণভাবে, এক টানে আমার তোয়ালের গিঁটটা খুলে দিলেন। তোয়ালেটা আমার শরীর থেকে খসে নিচে পড়ে গেল। এবার আমরা দুজনই সম্পূর্ণ নগ্ন। কোনো কাপড়ের বাধা নেই, কোনো আড়াল নেই। চামড়ায় চামড়ায় সরাসরি, আদিম সংঘর্ষ।
আমার সেই চরম উত্তেজনায় উন্মত্ত পুরুষাঙ্গটি এখন সরাসরি আনিকার নরম, মসৃণ পেটের সাথে ঘষা খাচ্ছে। আনিকা সেই স্পর্শ পেয়ে চুমুর মাঝখানেই একটা চাপা, তীক্ষ্ণ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। উনার শরীরটা আরও শক্তভাবে আমার সাথে সেঁটে গেল। আমি আমার দুই হাত উনার পিঠের ওপর দিয়ে নিচে নামিয়ে নিলাম। উনার সেই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর, গোলাকার এবং সুডৌল নিতম্বদুটোকে আমি আমার দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে খামচে ধরলাম। উনার নিতম্বের মাংসপেশিগুলো আমার আঙুলের চাপে আরও বেশি আবেদনময় হয়ে উঠল।
আমি উনার নিতম্ব চেপে ধরে উনার শরীরটাকে একটু ওপরে তুলে আমার দিকে আরও জোরে প্রেস করলাম, যাতে আমার শরীরের সেই শক্ত দণ্ডটি উনার দুই পায়ের মাঝখানের গোপন খাঁজের সাথে একেবারে নিখুঁতভাবে মিশে যায়। "উমমম... রাশেদ..." আনিকা আমার মুখের ভেতরই গোঙাতে লাগলেন। আমরা দুই নগ্ন মানব-মানবী, বেডরুমের কার্পেটের ওপর দাঁড়িয়ে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে পাগলের মতো কচলাকচলি শুরু করলাম। আমার হাত কখনো উনার নিতম্বে, কখনো উনার পিঠের মেরুদণ্ড বেয়ে ওপরে উঠছে, আবার কখনো উনার ঘাড়ের চুলগুলো খামচে ধরছে। আনিকাও উনার দুই হাত দিয়ে আমার পিঠ, আমার কোমর এবং আমার পেশিবহুল পিঠের ওপর নখ বসিয়ে একটা বন্য আদরের প্রলেপ বুলিয়ে দিচ্ছেন।
আমাদের শরীরের ঘর্ষণে, আমাদের ত্বকের উত্তাপে পুরো বেডরুমের পরিবেশটা যেন একটা বয়লারের মতো ফুটতে শুরু করেছে। উনার নরম বক্ষদেশ আমার শক্ত বুকের সাথে পিষ্ট হয়ে এক অদ্ভুত শারীরিক শিহরণ তৈরি করছে। লম্বা সময় ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই আদিম, ঘর্ষণময় আলিঙ্গন আর গভীর চুম্বনের পর, আমি অনুভব করলাম আনিকার শরীরটা উত্তেজনায় আর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। উনার পা দুটো কাঁপছে। আমি উনার ঠোঁট থেকে মুখটা সরালাম। উনার চোখ দুটো কামনায় বুজে আছে, শ্বাস ভারী।
আমি উনার নিতম্বের নিচে এক হাত এবং উনার পিঠের ওপর আরেক হাত দিয়ে উনাকে খুব সহজেই শূন্যে পাঁজাকোলা করে তুলে নিলাম। আনিকা উনার দুই হাত আমার গলায় পেঁচিয়ে ধরে উনার মাথাটা আমার কাঁধের ওপর এলিয়ে দিলেন। আমি উনাকে কোলে নিয়ে সেই বিশাল কিং-সাইজ বিছানার দিকে দুই কদম এগোলাম। তারপর খুব সন্তর্পণে, পরম আদরে এবং একই সাথে একটা বন্য অধিকারবোধ নিয়ে, আমি আনিকা নাওহারের সেই অনাবৃত, অপ্সরী শরীরটাকে বিছানার নরম ম্যাট্রেসের ওপর আলতো করে ফেলে দিলাম।
সাদা চাদরের ওপর উনার সেই ফর্সা, নিখুঁত, আবেদনময়ী শরীরটা একটা জীবন্ত ক্যানভাসের মতো বিছিয়ে রইল। আমি বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে, উনার সেই স্বর্গীয় রূপের দিকে তাকিয়ে একটা গভীর শ্বাস নিলাম। বিছানায় শুয়ে থাকা আনিকা নাওহার এখন আর কেবল একজন নারী নন, যেন একখণ্ড জীবন্ত কবিতা, যার প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি ছন্দ আমি আমার জিভ দিয়ে আজ নতুন করে অনুবাদ করতে যাচ্ছি। সাদা ধবধবে চাদরের ওপর উনার সেই ফর্সা, নিখুঁত শরীরটা যখন এলিয়ে আছে, তখন মনে হচ্ছে আমি এক বিশাল উপন্যাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায়টির সামনে দাঁড়িয়ে আছি।
আমি হাঁটু গেড়ে বিছানায় বসলাম। আমার চোখের সামনে তখন কেবল উনার শরীরের সেই ঐশ্বরিক জ্যামিতি। এসির কনকনে ঠান্ডার মাঝেও আমার শরীরের ভেতর তখন এক হাজার ওয়াটের উত্তাপ। আমি ঝুঁকে পড়লাম উনার মুখের ওপর। শুরু করলাম উনার গাল দিয়ে। উনার গাল দুটো এখন কামনার তাপে হালকা লালচে হয়ে আছে। আমি আমার জিভ দিয়ে উনার ডান গালের হাড়ের ওপর খুব ধীর লয়ে লেহন করতে শুরু করলাম। উনার ত্বকের স্বাদ নোনতা আর মিষ্টতার এক অদ্ভুত মিশ্রণ। আমার জিভের স্পর্শ পেতেই আনিকা একটা ছোট করে নিশ্বাস ছাড়লেন। উনার চোখের পাতা বন্ধ, কিন্তু আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি উনার ভেতরের স্নায়ুগুলো সজাগ হতে শুরু করেছে।
গাল থেকে আমি নেমে এলাম উনার কানের লতির কাছে। কানের লতি জিনিসটা যে একজন নারীর জন্য কতটা সংবেদনশীল জায়গা, তা আজ আমি প্রথম হাতে-কলমে (বা জিভে-মুখে) অনুভব করছি। আমি উনার কানের লতিটা আমার ঠোঁটের মাঝখানে নিয়ে হালকা করে চুষতে শুরু করলাম, আর আমার জিভ দিয়ে কানের পেছনে সুড়সুড়ি দিতে লাগলাম। আনিকা মুহূর্তের মধ্যে শিউরে উঠলেন। উনার শরীরটা বিছানার ওপর সামান্য কেঁপে উঠল। উনার গলা দিয়ে একটা অস্ফুট শব্দ বের হয়ে এল— 'উমমম...'। উনার এক হাত আমার পিঠের ওপর উঠে এল, উনার নখগুলো আমার চামড়ায় আলতো করে বসে যাচ্ছে। এই জায়গায় চাতার সময় উনার প্রতিক্রিয়ার মধ্যে এক ধরনের ছটফটানি ছিল, যেন উনি এই আরামটা সহ্য করতে পারছেন না, আবার ছেড়েও দিতে পারছেন না।
এরপর আমি নেমে এলাম উনার গলায়। উনার লম্বা, ফর্সা গ্রীবা। আমি আমার জিভ দিয়ে উনার গলার সেই নিখুঁত রেখা বরাবর ওপর থেকে নিচে চাটতে লাগলাম। আনিকা উনার মাথাটা পেছনের দিকে আরও একটু হেলিয়ে দিলেন, যাতে আমি উনার গলার প্রতিটি ইঞ্চি আমার জিভ দিয়ে দখল করতে পারি। উনার শ্বাস-প্রশ্বাস এখন আরও ঘন হয়ে এসেছে। কাঁধের ওপর যখন আমার জিভ গেল, তখন আনিকা উনার একটা হাত দিয়ে উনার মুখ ঢেকে ফেললেন। উনার সেই ফর্সা, মোলায়েম কাঁধের ওপর আমার জিভের প্রতিটা লেহন উনার শরীরের ভেতর এক বিদ্যুৎ প্রবাহ তৈরি করছিল। উনার কাঁধের পেশিগুলো মাঝে মাঝেই টানটান হয়ে যাচ্ছিল।
এবার আমার গন্তব্য উনার সেই ভরাট, উদ্ধত স্তনযুগল। আমি আমার মুখ নামিয়ে উনার ডান স্তনের চারপাশ দিয়ে বৃত্তাকারে জিভ বুলাতে শুরু করলাম। উনার স্তনদুটি উত্তেজনায় আর পানির স্পর্শে এখন রীতিমতো কাঁপছে। আমি যখন উনার সেই শক্ত হয়ে থাকা বক্ষচূড়ার ওপর আমার জিভ দিয়ে আঘাত করলাম, আনিকা একটা আর্তনাদ করে উঠলেন। উনি আমার মাথার চুলগুলো খামচে ধরলেন। উনার কোমর বিছানা থেকে সামান্য ওপরে উঠে এল। আমি একবার ডান দিকে, একবার বাম দিকে— উনার স্তনের সেই সুডৌল পাহাড়দুটোর ওপর আমার জিভের তান্ডব চালিয়ে যেতে লাগলাম। উনার প্রতিক্রিয়ায় এখন আর কোনো আভিজাত্য নেই, সেখানে কেবল আছে এক আদিম নারীর তীব্র আকাঙ্ক্ষা।
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) -
Bad Boy - 09-27-2026
১৮
আমি আনিকার দুই স্তনের মাঝখানের যে গভীর গিরিখাতেআমার নাক আর মুখ ঘষতে শুরু করলাম। শরীরের উত্তাপ তখন আমার মুখে লাগছে। বিভাজিকা বেয়ে আমার জিভ নেমে এল উনার সমতল পেটের ওপর। পেট চাতার সময় আনিকা হঠাৎ করে হাসতে শুরু করলেন, আবার পরক্ষণেই সেই হাসি উহু আহায় রূপ নিল। সুড়সুড়ি আর উত্তেজনার এক অদ্ভুত খেলা। আমি উনার পেটের পেশিগুলোর ওপর আমার জিভ দিয়ে নকশা আঁকতে লাগলাম। এরপর এলাম উনার নাভির কাছে। উনার নাভির সেই গভীর কুয়োর ভেতর আমি আমার জিভ ঢুকিয়ে দিয়ে ঘোরাতে লাগলাম।
"আহহহ... রাশেদ... কী করছ তুমি..." আনিকা বিছানায় মোচড়াতে মোচড়াতে বললেন। উনার দুই পা তখন এলোমেলোভাবে নড়ছে। উনার নাভি চাতার সময় উনার পুরো শরীরটা যেন একটা তরঙ্গের মতো আছড়ে পড়ছিল। আমি থামলাম না। আমি আরও নিচে নামলাম। উনার সেই ফর্সা, মসৃণ উরু। উরুর ভেতরের দিকের নরম চামড়ার ওপর যখন আমার জিভের স্পর্শ লাগল, আনিকা উনার দুই পা দিয়ে আমার মাথাটা চেপে ধরলেন উনার শরীরের সাথে। উনার উরুর পেশিগুলো থরথর করে কাঁপছে। আমি উনার হাঁটু, পায়ের নলি হয়ে সোজা নেমে গেলাম উনার পায়ের পাতায়।
আমি উনার পায়ের পাতা আর আঙুলগুলো আমার মুখের ভেতর নিয়ে চাটতে শুরু করলাম। অনেকে এটাকে বিকৃতি মনে করতে পারে, কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছিল আমি যেন কোনো দেবীর চরণে পূজা দিচ্ছি। আনিকা এই সময় পুরোপুরি নিস্তেজ হয়ে বিছানায় পড়ে রইলেন, কেবল উনার নিশ্বাস নেওয়ার শব্দটা শোনা যাচ্ছিল। উনার পায়ের আঙুলগুলো উত্তেজনায় কুঁকড়ে যাচ্ছিল। আমি উনার সারা শরীর আমার জিভ দিয়ে ভিজিয়ে দিলাম। উনার শরীরের প্রতিটি কোণ, প্রতিটি ভাঁজ আমার চেনা হয়ে গেল। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আমি সব জায়গায় মুখ দিলেও, উনার শরীরের সেই সবচেয়ে গোপন জায়গা— উনার যোনি বা মধুভান্ডারে একবারের জন্যও মুখ দিলাম না। আমি ইচ্ছে করেই ওই জায়গাটা এড়িয়ে যাচ্ছিলাম।
আমি আবার উনার বুকের ওপর উঠে এলাম, কিন্তু আমার মুখ রইল উনার নাভির কাছে। আনিকা এখন চরম উত্তেজনার এক চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন। উনার শরীর ঘামে ভিজে গেছে। উনার দুই হাত বিছানার চাদর খামচে ধরে আছে। উনার দুই পায়ের মাঝখানের সেই মধুভান্ডার এখন তৃষ্ণায় হাহাকার করছে। "রাশেদ... আর পারছি না আমি... আর পারছি না..." আনিকা খুব ভাঙা এবং কাতর গলায় বললেন। উনার চোখ দুটো এখন আধবোজা, কপালে ঘামের বিন্দু। আমি খুব নির্বোধ এবং বোকা সাজার ভান করে মুখ তুলে উনার দিকে তাকালাম। আমার মুখে একটা দুষ্টুমির হাসি।
"কেন? কী হয়েছে আনিকা? আর কী করব বলেন?" আমি খুব নিরীহ গলায় জিজ্ঞেস করলাম।
আনিকা উনার মাথাটা এদিক-ওদিক নাড়তে লাগলেন। উনার ভেতরের সমস্ত বাঁধ যেন ভেঙে গেছে। উনার মতো একজন অহংকারী এবং অভিজাত নারী এখন আমার সামনে পুরোপুরি অসহায়। "তুমি জানো আমি কী চাইছি... প্লিজ রাশেদ... আমার ওইখানে মুখ দাও... আমার মধুভাণ্ডারে তোমার জিভ ছোঁয়াও। আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি... প্লিজ..." আনিকা প্রায় কান্নার সুরে অনুনয় করতে লাগলেন।
আমি তবুও ভাবলেশহীন। আমি উনার উরুর ওপর হাত রেখে বললাম, "বুঝতে পারছি না তো আপনি কীসের কথা বলছেন। আমি তো আপনার সারা শরীরেই আদর করলাম।"
"না! তুমি ওই জায়গাটা বাদ দিচ্ছ... ইচ্ছে করে বাদ দিচ্ছ। তুমি জানো না আমার কেমন লাগছে? আমার ভেতরে যেন আগুন জ্বলছে। রাশেদ, তুমি কি চাও আমি মরে যাই? প্লিজ ওখানে মুখ দাও..."
আনিকা উনার কোমরটা সামান্য উঁচু করে উনার সেই গোপন অরণ্য আমার মুখের দিকে এগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেন। উনার মধুভাণ্ডার এখন কামনার রসে ভিজে পিচ্ছিল হয়ে আছে। আমি উনার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকালাম। উনার চোখে এখন কেবল আত্মসমর্পণ। আমি বুঝতে পারলাম, সময় হয়ে গেছে। আমার অনুবাদক মস্তিষ্ক এখন এই পরিস্থিতির চূড়ান্ত দখল নিতে চাইল। আমি খুব ধীর গলায় বললাম, "আমি ওখানে মুখ দিতে পারি আনিকা। কিন্তু তার আগে আপনাকে আমার কিছু শুনতে হবে, আপনাকে একই কথা বলতে হবে।"
"কী কথা? আমি সব বলব... তুমি যা চাও আমি তাই বলব। শুধু তুমি আমাকে শান্তি দাও..." আনিকা ছটফট করতে করতে বললেন।
"বলেন— আমি আজ থেকে আমার শরীরের সমস্ত অধিকার রাশেদকে দিলাম।"
আনিকা এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। উনার গলা দিয়ে সেই কথাগুলো বেরিয়ে এল যেন উনার আত্মার গভীর থেকে আসছে— "আমি... আমি আজ থেকে আমার শরীরের সব অধিকার রাশেদকে দিলাম। সব... সব তোমার..."
আমি হাসলাম। কিন্তু আমার দাবি এখনো শেষ হয়নি। আমি চাইছিলাম উনার ভেতরের সেই লন্ডনপ্রবাসী লেখিকার ইগোটাকে পুরোপুরি ধুলোয় মিশিয়ে দিতে। আমি উনার দুই উরুর মাঝখানে হাঁটু গেড়ে বসলাম। উনার সেই উন্মুক্ত মধুভাণ্ডার এখন আমার চোখের একদম সামনে। সেখান থেকে এক তীব্র, আদিম নারীত্বের ঘ্রাণ ভেসে আসছে।
আমি বললাম, "বলেন— আজ এই মুহূর্ত থেকে রাশেদ আমার একমাত্র পুরুষ, আমার স্বামী, আমার প্রভু।"
আনিকা নাওহার, যিনি লন্ডনের অভিজাত মহলে বিচরণ করেন, যিনি শব্দের কারিগর— তিনি এখন এক সামান্য অনুবাদকের দাসী হয়ে গেছেন। উনি উনার দুই হাত বাড়িয়ে আমার কোমর জড়িয়ে ধরলেন। উনার গলার স্বর কাঁপছে, কিন্তু উনার উচ্চারণে কোনো দ্বিধা নেই। "আজ... আজ এই মুহূর্ত থেকে রাশেদ আমার একমাত্র পুরুষ। রাশেদ আমার স্বামী... রাশেদ আমার প্রভু। আমি তোমার দাসী রাশেদ... এখন আমাকে মুক্তি দাও... প্লিজ..."
উনার এই জবানবন্দি শোনার পর আমার শরীরের ভেতর এক চরম বিজয়ের আনন্দ বয়ে গেল।আজ এক পরম রূপবতী এবং বিদুষী নারীকে মানসিক এবং শারীরিকভাবে জয় করে ফেলেছি। আমি আর দেরি করলাম না।
আমি আমার মাথা নিচু করলাম। উনার সেই উত্তপ্ত, ভেজা এবং কামনার রসে টইটম্বুর মধুভাণ্ডারের ওপর আমি আমার মুখ নামিয়ে আনলাম। উনার শরীরের সেই সুমিষ্ট এবং বন্য ঘ্রাণ আমার নাসারন্ধ্রে আঘাত করল। খুব ধীরে, খুব পরম আদরে আমি আমার জিভ উনার সেই সংবেদনশীল মধুভাণ্ডারের কেন্দ্রে স্থাপন করলাম।
"আহহহহহহ!"
আনিকা একটা দীর্ঘ, তীক্ষ্ণ এবং স্বর্গীয় চিৎকার দিয়ে উঠলেন। উনার পুরো শরীরটা ধনুকের মতো বেঁকে গেল। উনার হাত দুটো আমার চুলে শক্ত করে বিলি কাটতে শুরু করল। আমার জিভ এখন উনার সেই ভিজে থাকা গহ্বরের ভেতরে তার জাদুকরী খেলা শুরু করেছে। উনার মধুভাণ্ডারের সেই উষ্ণতা আর পিচ্ছিলতা আমার জিভে এক অবর্ণনীয় স্বাদের জন্ম দিচ্ছিল। আমি যেন পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র অমৃত পান করছি। উনার ভেতরের সেই রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা কামনার রসগুলো আমি আমার জিভ দিয়ে শুষে নিতে লাগলাম।
আনিকা এখন আর কোনো কথা বলতে পারছেন না। উনার মুখ দিয়ে কেবল একটা একটানা গোঙানি বেরিয়ে আসছে— 'উমমমম... উমমমম...'। উনার প্রতিটি পেশি, প্রতিটি কোষ এখন আমার জিভের শাসনের নিচে। এই বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের নিস্তব্ধ বেডরুমে এখন কেবল দুটি নগ্ন দেহের ঘর্ষণ, ভারী দীর্ঘশ্বাস আর আমার জিভের সেই ভেজা শব্দের রাজত্ব। মানুষের আদিম প্রবৃত্তিগুলো যখন জাগ্রত হয়, তখন তার ভেতরের আধুনিক সভ্যতা, ভব্যতা আর মেকি ভদ্রতার দেয়ালগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। এই ভাষা ঠোঁটের নয়, এ ভাষা শরীরের। এই ভাষার কোনো ডিকশনারি নেই, কোনো ব্যাকরণ নেই; আছে শুধু এক তীব্র হাহাকার আর সেই হাহাকার মেটানোর এক সর্বগ্রাসী তৃষ্ণা।
আনিকার মধুভাণ্ডারের ওপর যখন আমি আমার মুখ নামিয়ে আনলাম, তখন আমার মনে হলো আমি এক নিষিদ্ধ অরণ্যে প্রবেশ করেছি। সেখান থেকে এক তীব্র, আদিম এবং মাদকতাময় নারীত্বের ঘ্রাণ আমার মস্তিষ্ককে অবশ করে দিচ্ছিল। আমি আমার জিভ দিয়ে উনার সেই রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা কামনার রসগুলো আস্বাদন করতে শুরু করলাম। উনার মধুভাণ্ডার এখন কামনার জোয়ারে টইটম্বুর। আমি খুব ধীর লয়ে আমার জিভ উনার সেই সংবেদনশীল কেন্দ্রের চারপাশে ঘোরাতে লাগলাম। উনার মধুভাণ্ডারের উপরিভাগের সেই ছোট্ট অঙ্কুরটি যখন আমার জিভের স্পর্শ পেল, আনিকা যেন আক্ষরিক অর্থেই বিছানা থেকে ছিটকে উঠতে চাইলেন। উনার দুই হাত আমার চুলে এমনভাবে বিলি কাটছে যে মনে হচ্ছে উনি আমাকে উনার শরীরের ভেতরে টেনে নিতে চাইছেন।
"আহহহ... রাশেদ... উমমম..."
উনার গলা দিয়ে যে গোঙানি বের হচ্ছিল, তা কোনো মানুষের গলার শব্দ বলে মনে হচ্ছিল না। ওটা ছিল এক তৃষ্ণার্ত বন্য প্রাণীর আর্তনাদ। আমি আমার জিভ দিয়ে উনার সেই মধুভাণ্ডারের গভীরে প্রবেশ করার চেষ্টা করলাম। উনার শরীরের ভেতরের উষ্ণতা আর সেই পিচ্ছিল রসের স্বাদ আমাকে এক অন্য জগতে নিয়ে গেল। আমি উনার সেই কামনার গুহার প্রতিটি কোণ আমার জিভ দিয়ে লেহন করতে লাগলাম। উনার উরু দুটো এখন আমার মাথার দুপাশে প্রবল শক্তিতে চেপে বসেছে। উনি ছটফট করছেন। উনার শরীরটা বিছানার সাদা চাদরের ওপর এক অদ্ভুত ছন্দে মোচড়াচ্ছে। আমার জিভের প্রতিটা আঘাতে উনার শরীর দিয়ে যেন বিদ্যুৎ খেলে যাচ্ছিল। আমি কখনো খুব দ্রুত, কখনো খুব ধীর লয়ে আমার জিভের জাদু চালিয়ে যাচ্ছিলাম। উনার মধুভাণ্ডার থেকে কামনার রস এখন ঝরনার মতো ঝরছে, যা আমার চিবুক আর ঠোঁট ভিজিয়ে দিচ্ছিল।
বেশ কিছুক্ষণ ধরে আমি উনার সেই মধুভাণ্ডারে আমার জিভের খেলা চালিয়ে গেলাম। আনিকা এখন চরম উন্মাদনার এক শিখরে পৌঁছে গেছেন। উনার চোখ দুটো উল্টে গেছে, মুখটা হাঁ হয়ে আছে, আর উনার নিশ্বাস এখন কামারের হাপরের মতো শব্দ করছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই, যখন উনি এক চরম বিস্ফোরণের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে, হঠাৎ উনার ভেতরের সেই দর্পিত লন্ডনপ্রবাসী নারীটি যেন এক অদ্ভুত বন্যতায় জেগে উঠল। উনি হঠাৎ আমার চুল মুঠো করে ধরলেন এবং প্রবল আক্রোশে চিৎকার করে বলে উঠলেন— "কুত্তার বাচ্চা! আর কত খেলবি? আর কতক্ষণ তড়পাবি আমাকে? এবার আসল খেলা শুরু কর! আমি আর পারছি না! আমাকে শেষ করে দে!"
আমি মুহূর্তের মধ্যে আমার জিভ সরিয়ে নিলাম। আমি হাঁটু গেড়ে বসে উনার দুই উরুর মাঝখান থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে নিলাম। আনিকা মুহূর্তের মধ্যে বুঝতে পারলেন উনি কী ভুল করেছেন। উনার সেই চরম উত্তেজনার স্রোত মাঝপথে থেমে যাওয়ায় উনি এক ভয়ংকর শূন্যতায় পড়ে গেছেন। উনি তাকিয়ে দেখলেন আমি উনার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে শান্ত হয়ে বসে আছি। উনার চোখে এখন এক প্রবল আতঙ্ক। উনি বুঝতে পারলেন, উনি উনার মালিককে অপমান করেছেন। "প্রভু... ওহ প্রভু... আমি... আমি দুঃখিত..." আনিকা প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে আমার কাছে এগিয়ে এলেন। উনার নগ্ন শরীরটা তখনো কামনার তাপে কাঁপছে। উনি উনার দুই হাত দিয়ে আমার পা জড়িয়ে ধরলেন।
"সরি... প্রভু, সরি! আমার মাথা ঠিক ছিল না। আমি পাগল হয়ে গেছিলাম। আমি কিছু চাই না... আপনি যা ইচ্ছা করুন। আমাকে যেভাবে খুশি সাজা দিন। শুধু আমাকে ছেড়ে যাবেন না। আমাকে এই যন্ত্রণার মধ্যে ফেলে রাখবেন না প্রভু... প্লিজ!"
আমি কোনো কথা বললাম না। আমি শুধু উনার দিকে এক শীতল, কঠোর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। আনিকা উনার মাথা আমার পায়ের ওপর রাখলেন। উনার কান্নার শব্দে ঘরটা ভারী হয়ে উঠল। উনার দর্প, উনার আভিজাত্য, উনার শিক্ষা— সবকিছু আজ এক সামান্য অনুবাদকের পায়ের নিচে লুটোপুটি খাচ্ছে।
"ক্ষমা করুন প্রভু... আর কখনো হবে না। আমি আপনার দাসী। আপনি যা বলবেন আমি তাই করব। শুধু আমাকে একটু দয়া করুন..." আনিকার শরীর এখন চরম তৃষ্ণায় নীল হয়ে যাচ্ছে।
আমি কিছুক্ষণ পর উনার চিবুক ধরে উনার মুখটা ওপরে তুললাম। উনার চোখের মণি দুটো এখন কামনায় আর অনুতাপে টলমল করছে। আমি বললাম। "এবার শুয়ে পড়ুন।" আনিকা এক বাধ্য পুতুলের মতো বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে পড়লেন। উনার দুই পা উনার বুকের কাছে টেনে নিয়ে উনার সেই মধুভাণ্ডার সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দিলেন আমার জন্য। আমি আমার সেই কুতুব মিনারের মতো দণ্ডায়মান, পাথরের মতো শক্ত হয়ে থাকা পুরুষাঙ্গটি বের করলাম। ওটা এখন চরম উত্তেজনায় কাঁপছে। কিন্তু আমি সরাসরি উনার ভেতরে প্রবেশ করলাম না। আমি শুরু করলাম এক নতুন মনস্তাত্ত্বিক খেলা।
আমি আমার পুরুষাঙ্গটি উনার মধুভাণ্ডারের চারপাশের নরম চামড়ার ওপর দিয়ে ঘষতে শুরু করলাম। উনার জঘনের ওপর দিয়ে, উরুর ভাঁজ দিয়ে আমি আমার পৌরুষকে স্লাইড করালাম। উনার মধুভাণ্ডারের প্রবেশপথে আমার পুরুষাঙ্গের শীর্ষদেশ বা টিপটা বারবার ছুঁয়ে দিচ্ছিলাম, কিন্তু ভেতরে ঢোকাচ্ছিলাম না। আনিকা উনার কোমর বারবার ওপরের দিকে তুলছেন। উনি চাইছেন আমি উনার ভেতরে প্রবেশ করি। কিন্তু আমি প্রতিবারই উনাকে ফাঁকি দিচ্ছিলাম।
"প্রভু... ওহ স্বামী... মালিক আমার... আর আমাকে তড়পাবেন না। আমি মরে যাব... প্লিজ আমাকে আপনার ভেতরে নিন... প্লিজ!" আনিকা ছটফট করতে করতে বিছানার চাদর ছিঁড়ে ফেলার উপক্রম করলেন।
উনার মধুভাণ্ডার এখন কামনার রসে পিচ্ছিল হয়ে আছে। আমি আমার পুরুষাঙ্গের টিপটা উনার প্রবেশপথে রেখে আলতো করে ভেতরে এক ইঞ্চি ঢুকিয়ে আবার বের করে আনলাম। আনিকা একটা তীক্ষ্ণ শব্দ করে উনার কোমর উঁচিয়ে ধরলেন, কিন্তু আমি ততক্ষণে আবার বাইরে চলে এসেছি।
"বলেন— আমি কে?" আমি উনার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললাম। "আপনি... আপনি আমার মালিক... আপনি আমার সব কিছু। রাশেদ... আমাকে দয়া কর প্রভু..." আনিকা প্রলাপ বকতে শুরু করলেন।
আমি বুঝতে পারলাম, উনার ধৈর্যের শেষ সীমা অতিক্রান্ত হয়েছে। এবার আসল খেলার সময়। আমি আমার দুই হাত দিয়ে উনার কোমর শক্ত করে ধরলাম। উনার পা দুটো আমার কাঁধের ওপর তুলে নিলাম। তারপর খুব ধীরে, অত্যন্ত পরম আদরে আমি আমার পুরুষাঙ্গের শীর্ষদেশ উনার মধুভাণ্ডারের প্রবেশপথে স্থাপন করলাম। এবং তারপর শুরু হলো আমাদের সেই মহাজাগতিক যাত্রা। আমি খুব ধীর গতিতে চাপ দিতে শুরু করলাম। উনার মধুভাণ্ডারের পেশিগুলো প্রথমে একটু বাধা দিচ্ছিল, যেন তারা তাদের দীর্ঘদিনের অবরোধ ভাঙতে চাইছে না। কিন্তু আমার পৌরুষের কাঠিন্যের কাছে তারা নতি স্বীকার করতে বাধ্য হলো। আমি উনার ভেতরে মাত্র তিন ইঞ্চি প্রবেশ করলাম। আনিকা এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে উনার পিঠ বিছানা থেকে ওপরে তুললেন। আমি অনুভব করলাম উনার ভেতরের সেই অদ্ভুত উষ্ণতা। উনার পিচ্ছিল রস আমার প্রবেশকে সহজ করে দিচ্ছিল।
আমি আমার গতি অপরিবর্তিত রেখে আরও একটু ভেতরে ঢুকলাম। এবার আমি উনার অর্ধেকের বেশি দখল করে নিয়েছি। আনিকার চোখ দুটো বন্ধ, ঠোঁট কামড়ে ধরে উনি সেই তীব্র অনুভূতির স্বাদ নিচ্ছেন। আমি বুঝতে পারছি উনার ভেতরের প্রতিটি দেওয়াল আমাকে স্বাগত জানাচ্ছে। এক অদ্ভুত ঘর্ষণ, এক অদ্ভুত শিহরণ। আমি আমার কোমর স্থির রেখে উনার মধুভাণ্ডারের ভেতরের সঙ্কোচন অনুভব করার চেষ্টা করলাম।
এক ধাক্কায় আমি আমার সমস্ত পৌরুষ উনার মধুভাণ্ডারের একদম তলদেশ পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিলাম। উনার জরায়ুমুখের সাথে আমার পুরুষাঙ্গের শীর্ষের সেই প্রথম সংঘর্ষ। আনিকা এক তীক্ষ্ণ চিৎকার দিয়ে আমার পিঠ জড়িয়ে ধরলেন। উনার নখগুলো আমার চামড়ায় বসে গেল। আমার মনে হলো, আমি যেন এক বিশাল শূন্যতা পূর্ণ করেছি। উনার ভেতরটা আমাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরল। আমরা দুজন এখন এক শরীর, এক প্রাণ।
আমি খুব ধীর লয়ে আমার শরীরটাকে সামনে-পেছনে করতে শুরু করলাম। বাইরে এসির ঠান্ডা, কিন্তু আমাদের শরীরের ঘর্ষণে এখন এক দাবানল তৈরি হয়েছে। আমার প্রতিটা চলনে উনার ভেতরের পিচ্ছিল রসের সেই ভেজা শব্দ 'চপ চপ' করে বাজছিল। আমি উনার চোখের দিকে তাকালাম। সেখানে এক অবর্ণনীয় সুখের আভা। আমি উনার ঠোঁটে এক গভীর চুমু খেয়ে আমার গতি সামান্য বাড়ালাম।
আমি এবার উনার ভেতরে ছোট ছোট কিন্তু দ্রুত ধাক্কা দিতে শুরু করলাম। উনার শরীরটা আমার প্রতিটা ধাক্কায় বিছানার ওপর ছিটকে ছিটকে উঠছিল। উনার সেই ভরাট স্তনযুগল এখন বুনো ছন্দে দুলছে। আমি উনার স্তনদুটো হাত দিয়ে খামচে ধরলাম। উনার মধুভাণ্ডারের পেশিগুলো প্রতিবার আমাকে প্রবল শক্তিতে চিপে ধরছিল, যেন তারা আমাকে আর বাইরে যেতে দিতে চায় না। আনিকা এখন অনর্গল গোঙাচ্ছেন— "রাশেদ... প্রভু... আরও... আরও..."
আমার অনুবাদক মস্তিষ্ক এখন পুরোপুরি শাটডাউন হয়ে গেছে। আমি এখন এক আদিম পশু। আমি উনার ভেতরে দীর্ঘ এবং সজোরে থাপ্পড় দিতে শুরু করলাম। উনার কোমরটা আমি দুই হাতে শক্ত করে ধরে এমনভাবে আছড়ে পড়ছিলাম যেন আমি কোনো পাহাড় ভাঙছি। আমাদের শরীরের ঘর্ষণে বিছানাটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে কাঁপছিল। ঘরটা এখন আমাদের ভারী নিশ্বাস আর কামনার গোঙানিতে ভরে গেছে। আনিকার ঘাম আমার বুকে লাগছে। আমি আমার গতির চরমে পৌঁছে গেলাম। আমি উনার মধুভাণ্ডারের একদম গভীরতম কোণগুলো আমার পুরুষাঙ্গ দিয়ে তন্নতন্ন করে খুঁজছিলাম। উনার ভেতরের পেশিগুলো এখন এক অদ্ভুত ছন্দে কাঁপছে। আমি বুঝতে পারলাম, উনি খাদের একদম কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছেন। উনার পা দুটো আমার কোমর জড়িয়ে ধরল প্রবল শক্তিতে। উনার মাথা এদিক-ওদিক দুলছে। আমি উনার কানে কামড় দিয়ে আরও জোরে আমার ধাক্কাগুলো চালিয়ে গেলাম।
হঠাৎ আনিকার শরীরটা ধনুকের মতো বেঁকে গেল। উনার ভেতরের পেশিগুলো আমাকে এমন এক প্রবল শক্তিতে আঁকড়ে ধরল যে আমার মনে হলো আমি আর নড়াচড়া করতে পারব না। উনি এক দীর্ঘ, তীক্ষ্ণ এবং স্বর্গীয় চিৎকার দিয়ে উঠলেন। উনার সারা শরীর থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। উনার চরম মুহূর্তটা এসে গেছে। উনি উনার সমস্ত রস আমার ওপরে ঢেলে দিলেন। উনার সেই বন্য কাঁপুনি আমাকেও পাগল করে দিল। আনিকার সেই কাঁপুনি আর উনার মধুভাণ্ডারের সেই তীব্র সঙ্কোচন আমার ভেতরের শেষ বাঁধটুকুও চুরমার করে দিল। আমার তলপেটের নিচ থেকে এক গরম লাভার স্রোত আগ্নেয়গিরির মুখ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসার জন্য প্রস্তুত হলো। আমি উনার বুকের ওপর আমার সমস্ত ওজন দিয়ে ঝাপিয়ে পড়লাম। আমার মুখ দিয়ে এক পশুর মতো হুঙ্কার বেরিয়ে এল। এবং সেই মুহূর্তেই, এক প্রচণ্ড, মহাজাগতিক বিস্ফোরণের মাধ্যমে আমার সমস্ত জমানো উত্তেজনা, সমস্ত তৃষ্ণা, সমস্ত পবিত্র বীর্য উনার মধুভাণ্ডারের একদম গভীরে প্রবল বেগে আছড়ে পড়ল।
আমি যেন এক অনন্ত অন্ধকারের ভেতর দিয়ে নক্ষত্রের মতো ছুটে গিয়ে এক প্রশান্ত মহাসাগরে গিয়ে পড়লাম। বিস্ফোরণের সেই কয়েক সেকেন্ড আমার চেতনা যেন হারিয়ে গিয়েছিল। কোনো চিন্তা ছিল না, কোনো অভাব ছিল না। শুধু এক অপার্থিব সুখ। আস্তে আস্তে উত্তেজনা থিতিয়ে এল। আমি নিস্তেজ হয়ে আনিকার শরীরের ওপর লুটিয়ে পড়লাম। আমার হৃৎপিণ্ডটা তখনো উনার বুকের খাঁচার সাথে পাল্লা দিয়ে ধুকপুক করছে। আমরা দুজনেই হাঁপাচ্ছি। ঘরটা নিস্তব্ধ, শুধু আমাদের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ ছাড়া।
আনিকার সেই ৩৬-২৮-৩৬ জ্যামিতি এখন আমার নিচে পিষ্ট হয়ে আছে। উনার ফর্সা শরীরটা এখন আমাদের দুজনের ঘামে আর কামনার রসে ভিজে একাকার। উনার হাত দুটো এখনো আলতো করে আমার চুল জড়িয়ে আছে। আমি উনার ঘাড়ের কাছে আমার মুখ গুঁজে দিয়ে বড় বড় শ্বাস নিতে লাগলাম। উনার শরীরের সেই শ্যাম্পু আর ঘামের মিশ্রিত ঘ্রাণ আমাকে এক অদ্ভুত প্রশান্তি দিচ্ছিল। আমরা এভাবেই লেপ্টে রইলাম। কতক্ষণ জানি না। সময় হয়তো আবার তার ফ্ল্যাট সার্কেলে ফিরে গেছে। কিন্তু এই মুহূর্তটা চিরকালের জন্য আমাদের দুই শরীরের কোষে কোষে খোদাই হয়ে রইল।
রাত তখন কটা বাজে? দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকানোর মতো মানসিক বা শারীরিক অবস্থা আমার নেই। তবে আমার ভেতরের বায়োলজিক্যাল ঘড়ি বলছে, রাত হয়তো একটা কি দেড়টা হবে। কিংবা দুইটাও বাজতে পারে। বিজ্ঞানী এবং দার্শনিকরা বলেন, চরম শারীরিক মিলনের পর মানুষের মন সাধারণত এক ধরনের দার্শনিক শূন্যতায় ভোগে। কিন্তু আমি এবং আনিকা নাওহার এখন কোনো শূন্যতায় ভুগছি না। শাওয়ারের নিচে সেই প্রথম বন্যতা, আর তারপর বিছানার ওপর সেই দীর্ঘ, মহাজাগতিক তৃপ্তির পর আমরা দুজনেই এখন যেন এক অদ্ভুত স্ফূর্তির বাগানে শুয়ে আছি।
বেডরুমের মায়াবী স্পটলাইটের আলোয় আনিকার নগ্ন, ঘর্মাক্ত শরীরটা আমার পাশেই এলিয়ে আছে। উনার মাথাটা আমার বুকের ওপর। উনার চুল থেকে এখনো একটা মিষ্টি শ্যাম্পুর ঘ্রাণ আসছে, যার সাথে মিশে আছে আমাদের দুজনের কামনার আদিম নোনতা গন্ধ। উনার নিশ্বাস আমার বুকের লোমগুলোর ওপর আছড়ে পড়ছে। এক অদ্ভুত, অপার্থিব প্রশান্তি। মনে হচ্ছে, পৃথিবীর সমস্ত যুদ্ধ, সমস্ত অভাব, সমস্ত কোলাহল এই বেডরুমের দরজার ওপাশে চিরকালের জন্য থেমে গেছে।
কিন্তু মানুষের শরীর বড়ই বেইমান একটা যন্ত্র। আপনি যতই আধ্যাত্মিকতার চূড়ায় বসে থাকুন না কেন, আপনার শরীরের ভেতরে থাকা নিরেট বায়োলজিক্যাল ইঞ্জিনটা যখন তার জ্বালানি চাইবে, তখন পৃথিবীর কোনো দর্শনই কাজে আসবে না। হঠাৎ করে এই পিনপতন নিস্তব্ধতার মাঝে খুব মৃদু কিন্তু অদ্ভুত, বেমানান শব্দ হলো। গুড়গুড়... গ্রররর... শব্দটা আনিকার পেট থেকে এল।
আমি চমকে উনার দিকে তাকালাম। আনিকাও একটু অপ্রস্তুত হয়ে মাথা তুলে আমার দিকে তাকালেন। তারপর হঠাৎ করেই আমরা দুজনে হো হো করে হেসে উঠলাম। রোমান্টিক সিনেমা বা উপন্যাসে এই ব্যাপারটা কখনো দেখানো হয় না। নায়ক-নায়িকা যখন চরম প্রেম আর শরীর বিনিময়ের পর বিছানায় শুয়ে থাকে, তখন ব্যাকগ্রাউন্ডে খুব সুন্দর একটা সেতার বা বাঁশির সুর বাজে। কিন্তু বাস্তবে, এতক্ষণ ধরে শরীরের ওপর দিয়ে যে রোলারকোস্টার যায়, তার ফলে পেটের ভেতর রীতিমতো একটা দুর্ভিক্ষ শুরু হয়ে যায়।
"রাশেদ," আনিকা হাসতে হাসতেই বললেন, "আমার তো মনে হচ্ছে পেটের ভেতর ইঁদুর দৌড়াচ্ছে। প্রচণ্ড ক্ষুধা পেয়েছে।"
"পাওয়ারই কথা," আমি উনার ফর্সা, মসৃণ কাঁধে একটা চুমু খেয়ে বললাম।
"যে পরিমাণ ক্যালরি বার্ন হয়েছে গত দুই ঘণ্টায়, তাতে ক্ষুধা না লাগলে আপনাকে চেকআপ করাতে হতো। আমার নিজেরও মনে হচ্ছে আস্ত একটা গরু খেয়ে ফেলতে পারব।"
আনিকা বিছানায় উঠে বসলেন। উনার নগ্ন, ভরাট শরীরটা আলো-আঁধারিতে একটা মাস্টারপিস পেইন্টিংয়ের মতো দেখাচ্ছে। "চলো, ফুডপান্ডায় কিছু অর্ডার করি। কাচ্চি বা পিজ্জা টাইপ কিছু," আনিকা উনার ফোনটা হাতড়াতে হাতড়াতে বললেন।
"দাঁড়ান দাঁড়ান!" আমি ধড়ফড় করে উঠে বসলাম। "ফুডপান্ডা অর্ডার করবেন? রাত এখন কয়টা বাজে খেয়াল করেছেন? দুইটা বাজে!"
"তো কী হয়েছে? ঢাকা শহরে এখন অনেক রেস্টুরেন্ট সারারাত খোলা থাকে।"
"রেস্টুরেন্ট খোলা থাকে আমি জানি। কিন্তু আপনার এই ষোলো তলা বিল্ডিংয়ের সিকিউরিটি সিস্টেমের কথা একটু ভাবুন। নিচে মেইন গেট, তারপর কোলাপসিবল গেট, তারপর কেঁচি গেট। এগুলো সব তো দশটা-এগারোটার দিকেই তালা মেরে দেয়। এখন ফুডপান্ডার ছেলে এলে তো দারোয়ানকে ডেকে তুলতে হবে।"
আনিকা একটু থমকালেন। "তা অবশ্য ঠিক।"
"দারোয়ানকে ডাকতে হলে হয় আপনাকে ইন্টারকমে কল দিতে হবে, নয়তো নিচে যেতে হবে," আমি লজিক দেওয়া শুরু করলাম। "দারোয়ান বেচারা ঘুম থেকে উঠে বিরক্ত হবে। রাত দুইটার সময় একটা ছেলে আপনার ফ্ল্যাটে খাবার দিয়ে যাবে, আর দারোয়ান ঘাড় চুলকাতে চুলকাতে ভাববে— 'ম্যাডাম তো একাই থাকে, এত রাতে ম্যাডাম এত খাবার অর্ডার করল কেন?' আর যদি কোনোভাবে দারোয়ান টের পায় যে এই ফ্ল্যাটে আমি আছি, তাহলে তো কাল সকালেই পুরা বিল্ডিংয়ে মাইকিং হয়ে যাবে। আমরা দুজনেই এই গভীর রাতে কোনো সিন ক্রিয়েট করে আশেপাশের মানুষের নজর কাড়তে চাই না, তাই না?"
আনিকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মোবাইলটা রেখে দিলেন। "ইউ আর রাইট। ঢাকা শহরে একা থাকা নারীদের পদে পদে আতশ কাঁচের নিচ দিয়ে হাঁটতে হয়। কিন্তু রাশেদ, আমার তো খুব ক্ষুধা লেগেছে। আমি তো ক্ষুধার জ্বালায় ঘুমাতে পারব না।" আমি হাসলাম। "রান্নাঘরে কিছু নেই?"
"রান্নাঘর তো আমি ওভাবে ইউজই করি না। চা-কফি আর হয়তো কয়েক প্যাকেট ম্যাগি নুডলস থাকতে পারে। বেলাল লাস্ট বার যখন এসেছিল, তখন নিয়ে এসেছিল। ওগুলো তো আর এক্সপায়ার হয়ে যায়নি মনে হয়।"
"ম্যাগি নুডলস! আলহামদুলিল্লাহ!" আমি যেন হাতে চাঁদ পেলাম। "রাত দুইটার সময় ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে এক বাটি গরম নুডলস স্বর্গের খাবারের চেয়ে কোনো অংশে কম না। চলুন, আজকে শেফ রাশেদ আহমেদের হাতের স্পেশাল নুডলস আপনাকে খাওয়াব।"
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) -
Bad Boy - 09-27-2026
১৯
আমরা দুজন বিছানা থেকে নামলাম। একটা খুব অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করলাম। আমরা কেউই কাপড় পরার কোনো প্রয়োজন বোধ করলাম না। লজ্জা বা সংকোচের যে পর্দাটা ছিল, সেটা বাথটাবের পানিতে আর এই বিছানার চাদরে পুরোপুরি ধুয়ে মুছে গেছে। আমি আর আনিকা, সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় বেডরুম থেকে বেরিয়ে করিডোর ধরে কিচেনের দিকে এগোতে লাগলাম।
দৃশ্যটা পরাবাস্তব। ধানমন্ডির একটা অত্যাধুনিক, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। সেন্ট্রাল এসি চলছে। ফ্লোরে দামি উডেন টাইলস। আর সেই ফ্ল্যাটের ভেতর দিয়ে সম্পূর্ণ আদিম যুগের মানব-মানবীর মতো আমরা দুজন হেঁটে যাচ্ছি। কিচেনে ঢুকে আমি লাইট জ্বালালাম। বিশাল মডুলার কিচেন। আমি ক্যাবিনেট ঘেঁটে চার প্যাকেট নুডলস, কয়েকটা পেঁয়াজ আর কাঁচামরিচ বের করলাম। "আপনি বসুন আনিকা। আমি বানাচ্ছি," আমি একটা ছুরি নিয়ে পেঁয়াজ কাটতে শুরু করলাম।
আনিকা কিচেন আইল্যান্ডের মার্বেল টপের ওপর লাফ দিয়ে উঠে বসলেন। উনার দুই হাত দুই পাশে ভর দেওয়া। পা দুটো নিচে ঝুলছে।আমি পেঁয়াজ কুচি করছি, আর আড়চোখে উনার দিকে তাকাচ্ছি। কিচেনের উজ্জ্বল সাদা আলোয় উনার শরীরটা এখন কোনো রহস্যময় ছায়ায় ঢাকা নেই। সবকিছু স্পষ্ট। উনার ফর্সা, মসৃণ ত্বক, উনার ভরাট, উদ্ধত স্তনযুগল, উনার সমতল পেট— সবকিছু মিলে আমাকে যেন আবার পাগল করে দিচ্ছে। "রাশেদ, তুমি কি সত্যিই ভালো নুডলস বানাতে পারো?" আনিকা উনার পা দুটো একটু দুলিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
"ব্যাচেলরদের প্রধান এবং একমাত্র টিকে থাকার অস্ত্রই হলো নুডলস আনিকা। আমরা নুডলস দিয়ে বিরিয়ানির স্বাদ আনতে পারি," আমি হাসিমুখে বললাম। কিন্তু আমার হাসিটা বেশিক্ষণ টিকল না। আনিকা হঠাৎ করে উনার কিচেন আইল্যান্ডে বসা অবস্থাতেই উনার পা দুটো একটু বেশি ফাঁক করে দিলেন। আমি পেঁয়াজ কাটতে কাটতে হঠাৎ থমকে গেলাম। আমার চোখ আপনাআপনি উনার দুই পায়ের মাঝখানের সেই গোপন, রহস্যময় উপত্যকার দিকে চলে গেল। একটু আগে যেখানে আমার জিভ তার সমস্ত তৃষ্ণা মিটিয়েছে, সেই জায়গাটা এখন কিচেনের আলোয় সম্পূর্ণ উন্মুক্ত।
আমি ঢোঁক গিললাম। "আনিকা... কী করছেন?" আনিকা খুব নিরীহ মুখে একটা মিষ্টি হাসি দিলেন। "কিছু না তো। আমি দেখছি তুমি কীভাবে পেঁয়াজ কাটো।" কিন্তু উনি শুধু দেখছিলেন না। উনার ডান হাতটা খুব ধীর গতিতে নেমে এল উনার নিজের শরীরের সেই উন্মুক্ত কেন্দ্রের দিকে। নারীরা তাদের ক্ষমতার জায়গাটা খুব ভালো করে জানে। তারা জানে একজন পুরুষকে কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে একটা লালা-ঝরা কুকুরে পরিণত করা যায়।
আনিকা উনার আঙুলগুলো দিয়ে উনার নিজের মধুভাণ্ডারের বাইরের নরম পাপড়িগুলোতে খুব আলতো করে স্পর্শ করতে শুরু করলেন। উনার চোখ কিন্তু আমার চোখের সাথে লক করা। উনার ঠোঁটে সেই দুষ্টু, আবেদনময়ী হাসি। আমার হাতের ছুরি থেমে গেছে। আমি বোকার মতো তাকিয়ে আছি। "আনিকা... প্লিজ... আমি কিন্তু পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে আঙুল কেটে ফেলব," আমি কোনোরকমে শব্দগুলো উচ্চারণ করলাম। আমার গলা শুকিয়ে গেছে।
উনি শুনলেন না। উনার আঙুলগুলো এখন একটু ভেতরে প্রবেশ করছে। উনি উনার নিজের শরীরকে নিজেই আদর করছেন, আর আমাকে সেটা দেখাচ্ছেন। উনার শ্বাস-প্রশ্বাস একটু ভারী হয়ে আসছে। উনার চোখ দুটো আধবোজা হয়ে যাচ্ছে। আমার মনে হলো আমার মাথার ভেতর কেউ একটা ডিনামাইট ফাটিয়ে দিয়েছে। একটু আগের সেই নিস্তেজ হয়ে যাওয়া শরীরটা আবার নতুন করে ফুঁসে উঠতে শুরু করল। আমার পুরুষাঙ্গটি আবার মাথা তুলে দাঁড়াল। "রাশেদ..." আনিকা উনার আঙুল চালাতে চালাতেই ফিসফিস করে ডাকলেন। "দেখো... আমার আবার ইচ্ছা করছে।"
"আনিকা, আপনি কিন্তু আগুন নিয়ে খেলছেন। চুলার পানি এখনো ফুটতে শুরু করেনি, কিন্তু আমার ভেতরের পানি ফুটে যাচ্ছে। আমি যদি এখন রান্না ফেলে আপনার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ি, তাহলে কিন্তু সারা রাত না খেয়ে থাকতে হবে," আমি প্রায় ধমকের সুরে বললাম, যদিও আমার ধমকটা আমার নিজের কানেই খুব দুর্বল শোনাল। আনিকা খিলখিল করে হেসে উঠলেন। উনি উনার হাতটা সরিয়ে নিলেন। "ওকে বাবা, ওকে! আগে পেট পূজা, তারপর অন্য কিছু। তুমি রান্না করো। আমি আর ডিস্টার্ব করব না।"
কিন্তু উনি ডিস্টার্ব করা থামালেন না। কিছুক্ষণ পর উনি কিচেন আইল্যান্ড থেকে নেমে আমার পেছনে এসে দাঁড়ালেন। উনার নরম, নগ্ন শরীরটা আমার পিঠের সাথে লেপ্টে গেল। উনার দুই হাত আমার কোমর জড়িয়ে ধরল। আমি চুলায় নুডলসের মশলা দিচ্ছি, আর উনি পেছন থেকে উনার মুখটা আমার ঘাড়ে ঘষছেন। উনার বক্ষদেশ আমার পিঠে ক্রমাগত একটা অদ্ভুত শিহরণ তৈরি করছে। "খুব সুন্দর গন্ধ বেরিয়েছে তো," আনিকা আমার পিঠে একটা চুমু খেয়ে বললেন।
"গন্ধটা নুডলসের না আনিকা, গন্ধটা আপনার গায়ের," আমি চুলার আঁচ কমিয়ে দিয়ে বললাম। নুডলস রান্না শেষ হলো। আমি দুটো প্লেটে সমান করে ভাগ করলাম। গরম ধোঁয়া উঠছে। "চলুন, খাওয়ার আগে আরেকবার শাওয়ার নিয়ে নিই," আনিকা বললেন। "রান্নাঘরের পেঁয়াজ-রসুনের একটা গন্ধ গায়ে লেগে গেছে। আর বিছানার ঘামটাও তো ধোয়া দরকার।"
"ঠিক আছে, চলুন।"
আমরা আবার বাথরুমে ঢুকলাম। তবে এই শাওয়ারটা প্রথম শাওয়ারের মতো বন্য বা আদিম ছিল না। এটা ছিল চরম ভালোবাসার, অদ্ভুত মায়ায় মাখানো একটা স্নান। আমরা রেইন-শাওয়ারের নিচে পাশাপাশি দাঁড়ালাম। আমি উনার চুলে শ্যাম্পু মাখিয়ে দিলাম। খুব সাবধানে, পরম আদরে আমি উনার পিঠ ঘষে দিলাম। আনিকাও সাবান মেখে আমার বুক, আমার পিঠ ধুয়ে দিলেন। আমরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসছিলাম। কোনো উত্তেজনা নেই, কোনো তাড়াহুড়ো নেই। শুধু এক ধরনের শান্ত, পবিত্র নির্ভরতা।
পানি দিয়ে যখন আমাদের শরীর ধুয়ে গেল, তখন মনে হলো আমরা যেন সমস্ত ক্লান্তি, সমস্ত পাপবোধ, আর সমস্ত পার্থিব হিসাব-নিকাশ ধুয়ে ফেলেছি। বাথরুম থেকে বেরিয়ে আমরা তোয়ালে দিয়ে শরীর মুছলাম। "এবার আপনার গাউন পরার পালা," আনিকা হাসিমুখে বললেন।
উনি আলমারি থেকে উনার একটা সিল্কের স্লিপিং গাউন বের করে পরলেন। গাউনটা মেরুন রঙের, উনার ফর্সা ত্বকের সাথে দারুণ মানিয়েছে। আর আমাকে দিলেন বেলাল সাহেবের সেই গাঢ় নীল রঙের গাউনটা। আমরা ডাইনিং টেবিলে মুখোমুখি বসলাম। মাঝখানে ধোঁয়া ওঠা ম্যাগি নুডলস। পৃথিবীর সেরা শেফ যদি এখন আমাকে ক্যাভিয়ার বা স্টেক এনে দিত, আমি হয়তো ছুঁড়ে ফেলে দিতাম। রাত আড়াইটার সময়, একজন অপরূপা নারীর সাথে বসে, ভালোবাসার স্নান সেরে এই যে ম্যাগি নুডলস খাওয়া— এর চেয়ে সুস্বাদু খাবার পৃথিবীতে আর কিছু হতে পারে না।
আমরা খুব তৃপ্তি নিয়ে, কাঁটাচামচ দিয়ে নুডলস খেলাম। আনিকা ঝালের কারণে একটু ‘শিস শিস’ শব্দ করছিলেন, আর আমি উনার সেই ভঙ্গিটা উপভোগ করছিলাম। খাওয়া শেষ করে আমরা ড্রয়িংরুমের সোফায় গিয়ে বসলাম। আমি পকেট থেকে আমার বেনসনের প্যাকেটটা বের করলাম।
"আমি একটা সিগারেট খাব আনিকা। আপনি মাইন্ড করবেন?"
"অফকোর্স নট। দাও, আমাকেও একটা দাও।"
আমি অবাক হলাম। "আপনি সিগারেট খান?"
"মাঝে মাঝে। খুব স্ট্রেস থাকলে বা খুব রিল্যাক্সড মুডে থাকলে। আজকে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে রিল্যাক্সড মুডে আছি।"
আমি দুটো সিগারেট ধরালাম। একটা উনার হাতে দিলাম। আমরা দুজন ড্রয়িংরুমের বিশাল সোফায়, আধো অন্ধকারে বসে পাশাপাশি সিগারেট টানতে লাগলাম। সিগারেটের ধোঁয়াগুলো বাতাসে রিং তৈরি করে মিলিয়ে যাচ্ছে। কেউ কোনো কথা বলছি না। এই নীরবতার একটা আলাদা ভাষা আছে। আমরা দুজনেই জানি, আজ রাতের এই ঘটনা আমাদের দুজনের জীবনকেই একটা নতুন, অচেনা রাস্তায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সিগারেট শেষ করে আমি ছাইদানিতে বাটটা গুঁজে দিলাম।
"অনেক রাত হলো আনিকা। এবার তো ঘুমানো দরকার," আমি উঠে দাঁড়ালাম। "হুম," আনিকাও উঠে দাঁড়ালেন। আমি আমার নীল স্লিপিং গাউনের বেল্টটা একটু টেনে বেঁধে বললাম, "আমি তাহলে আমার গেস্ট রুমে যাচ্ছি। গুড নাইট।" আমি গেস্টরুমের দিকে মাত্র এক পা বাড়িয়েছি, হঠাৎ আনিকা পেছন থেকে আমার হাতটা ধরলেন। উনার হাতের স্পর্শে আমি থমকে দাঁড়ালাম। ঘাড় ঘুরিয়ে উনার দিকে তাকালাম।
আনিকার চোখে এখন একটা গভীর মায়া। একটা অদ্ভুত নির্ভরতা। উনি খুব মৃদু , শান্ত গলায় বললেন—"গেস্ট রুম না রাশেদ। আজ থেকে আমার রুমে আসো।" আমি স্তব্ধ হয়ে উনার দিকে তাকিয়ে রইলাম। 'আমার রুমে আসো।' এই কথাটা শুধু একটা ফিজিক্যাল ইনভিটেশন নয়। এটা একটা ইমোশনাল একসেপ্টেন্স। একজন নারী যখন একজন পুরুষকে তার নিজস্ব, ব্যক্তিগত বিছানায় সারারাতের জন্য জায়গা দেয়, তখন সে আসলে তার পুরো অস্তিত্বটাকেই সেই পুরুষের হাতে সঁপে দেয়। আমি কোনো কথা না বলে উনার হাতটা আমার হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরলাম।
আমরা দুজন হেঁটে উনার মাস্টার বেডরুমে ঢুকলাম। সেই বিশাল কিং-সাইজ বিছানা। যে বিছানায় একটু আগে আমরা একটা প্রলয়ঙ্করী ঝড় তুলেছিলাম, সেটা এখন আবার শান্ত হয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।আমরা বিছানায় উঠলাম। আনিকা বেডসাইড ল্যাম্পটা নিভিয়ে দিলেন। ঘরটা সম্পূর্ণ অন্ধকার হয়ে গেল। আমরা দুজনে সেই বিশাল, নরম কমফোর্টারের নিচে নিজেদেরকে ডুবিয়ে দিলাম।
আমি আনিকাকে আমার বুকের ভেতর টেনে নিলাম। উনার মাথাটা আমার কাঁধের ওপর। উনার একটা হাত আমার বুকের ওপর রাখা। আমি আমার এক হাত দিয়ে উনার পিঠ জড়িয়ে ধরে আছি। উনার শরীরের সেই মিষ্টি, সতেজ ঘ্রাণটা আমার নাসারন্ধ্রে এসে লাগছে। আমি উনার কপালের ওপর একটা দীর্ঘ, পরম আদরের চুমু খেলাম। আনিকা আমার বুকের ভেতর আরও একটু গুটিসুটি মেরে ঢুকে গেলেন। উনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিসফিস করে বললেন, "গুড নাইট, রাশেদ।"
"গুড নাইট, আনিকা।"
আমি চোখ বন্ধ করলাম। ঢাকা শহরের এই যান্ত্রিক, কোলাহলময় পৃথিবীতে, এই ধানমন্ডির ষোলো তলা বিল্ডিংয়ের সাত তলার একটা ফ্ল্যাটে, আমি রাশেদ আহমেদ আজ রাতে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ হিসেবে ঘুমিয়ে পড়লাম। আমার মাথার ভেতর এখন কোনো কিম জং উন নেই, কোনো মেসের কার্ফ্যু নেই, কোনো তিন লাখ টাকার উমরাহ ফান্ডের টেনশন নেই। এখন শুধু আছে এই অন্ধকার, এই কমফোর্টারের ওম, আর আমার বাহুডোরে বন্দী থাকা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নারী।
জীবনটা সত্যিই মাঝে মাঝে খুব অদ্ভুত, আর খুব সুন্দর।
সকালের আলো যখন ধানমন্ডির এই ষোলো তলা বিল্ডিংয়ের সাত তলার ফ্ল্যাটের ভারী পর্দা ভেদ করে ভেতরে ঢোকার বৃথা চেষ্টা করছিল, আমার ঘুম তখন ভেঙে গেছে। আমার বুকের ওপর পরম নিশ্চিন্তে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছেন আনিকা নাওহার। উনার নিশ্বাসের একটা অদ্ভুত, শান্ত ছন্দ আছে। আমি খুব সাবধানে, যেন একটা কাঁচের পুতুল নাড়াচাড়া করছি, এমন ভঙ্গিতে উনার মাথাটা আমার বুক থেকে সরিয়ে নরম বালিশের ওপর রাখলাম। উনি ঘুমের ঘোরেই একটু উসখুস করলেন, তারপর কমফোর্টারটা জড়িয়ে ধরে আবার গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলেন। আমি বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে উনার ঘুমন্ত, এলোমেলো মুখটার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।
পৃথিবীর সমস্ত রোমান্টিক উপন্যাসের হিরোরা এই সময় যেটা করে, সেটা হলো প্রেমিকার কপালে একটা চুমু খেয়ে, তাকে বাহুডোরে আটকে সারাদিন বিছানায় শুয়ে থাকে। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য, আমি কোনো রোমান্টিক উপন্যাসের হিরো নই। আমি ঢাকা শহরের এক সাধারণ মধ্যবিত্ত, পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কের অনুবাদক। আমার বিছানায় স্বর্গের অপ্সরী শুয়ে থাকলেও, আমাকে ঠিক দশটার সময় কারওয়ান বাজারের অফিসে গিয়ে হাজিরা খাতায় ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিতে হবে। পুঁজিবাদী সমাজ বড়ই নিষ্ঠুর। সে মানুষের প্রেম বোঝে না, সে বোঝে প্রডাক্টিভিটি।
আমি বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হলাম। কাল রাতের সেই ধুলোমাখা শার্ট আর প্যান্টটাই আবার গায়ে চাপাতে হলো। যাওয়ার আগে আমার মনে হলো, আনিকা ঘুম থেকে উঠে তো ক্ষুধার্ত থাকবেন। কাল রাতে আমরা শুধু এক বাটি ম্যাগি নুডলস খেয়েছি। আমি ড্রয়িংরুমে এসে আমার মোবাইল থেকে ফুডপান্ডা অ্যাপটা ওপেন করলাম। সকালের নাশতা হিসেবে কী অর্ডার করা যায়? আমি নিজের জন্য একটা চিকেন স্যান্ডউইচ আর ব্ল্যাক কফি অর্ডার করলাম। কিন্তু আনিকার জন্য? আমি তো জানি না উনি সকালে কী খেতে পছন্দ করেন। লন্ডনে থাকা মানুষ, হয়তো সকালে শুধু কর্নফ্লেক্স বা ওটস খান। আবার এমনও তো হতে পারে, দেশে এসেছেন বলে দেশি খাবার খেতে ইচ্ছে করছে!
আমি কোনো রিস্ক নিলাম না। আমি আনিকার জন্য একটা স্যান্ডউইচ, একটা চিকেন শর্মা এবং এক বক্স ভুনা খিচুড়ি অর্ডার করে দিলাম। তিন ধরনের তিন আইটেম। ঘুম থেকে উঠে উনার যেটা মুড হবে, উনি সেটা খাবেন। খাবার এলে আমি নিজের স্যান্ডউইচটা ড্রয়িংরুমে বসেই গিলে নিলাম। আনিকার খাবারগুলো ডাইনিং টেবিলে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে রাখলাম। তারপর উনাকে হোয়াটসঅ্যাপে একটা মেসেজ ড্রাফট করলাম: "আমি অফিসে বের হলাম। ডাইনিং টেবিলে তোমার নাশতা রাখা আছে। ঘুম থেকে উঠেই খেয়ে নিও। আমি অফিস শেষ করে সরাসরি চলে আসব।"
মেসেজটা সেন্ড করে আমি খুব সাবধানে ফ্ল্যাটের দরজা লক করে বেরিয়ে এলাম। নিচে নেমে রিকশা খুঁজছি, এমন সময় পকেটে ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। আনিকার রিপ্লাই এল নাকি? ফোন বের করে দেখি, মেসেজ এসেছে ঠিকই, তবে আনিকার নয়। মেসেজ এসেছে আমার মিরপুরের মেসের বয়োজ্যেষ্ঠ রুমমেট, বিসিএস পরীক্ষার্থী রাজুর কাছ থেকে।
রাজু লিখেছে: "রাশেদ ভাই, ঘটনা কী? গত দুই দিন ধইরা আপনের কোনো খোঁজখবর নাই! রাইতে মেসে ফেরেন না। আপনের মিল তো চালু। খালায় রান্ধা রাইখা যায়, আর সেই খাবার নষ্ট হইতেছে। মেসের খাবার নষ্ট হওয়া তো ভাই জাতীয় পাপ! আপনি কি হঠাৎ কইরা কাউকে কিছু না বইলা গ্রামের বাড়ি নওগাঁ চইলা গেলেন নাকি?"
আমি মেসেজটা পড়ে হাসব না কাঁদব বুঝতে পারলাম না। আমার জীবনের এক প্রান্তে আনিকা নাওহারের মতো একটা বিলিয়নিয়ার, আভিজাত্যে মোড়ানো নারীর সাথে এক বিছানায় রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা; আর অন্য প্রান্তে মেসের এক প্লেট ডাল-ভাত নষ্ট হওয়া নিয়ে বিসিএস পরীক্ষার্থীর হাহাকার! এই দুই চরম বৈপরীত্য নিয়েই তো আমার জীবন।
আমি রাজুকে রিপ্লাই দিলাম: "বাড়ি যাইনি রাজু। একটা ইমার্জেন্সি কাজে আটকা পড়েছি। আজ রাতে মেসে ফিরব।"
আজ রাতে মেসে ফিরব— এই কথাটা লিখে আমি নিজেই নিজের সাথে একটা প্রতারণা করলাম। আমি খুব ভালো করেই জানি, আমার মন, আমার শরীর, আমার পুরো অস্তিত্ব এখন ওই ষোলো তলা বিল্ডিংয়ের সাত তলার ফ্ল্যাটের জন্য ছটফট করছে। কিন্তু মেসে তো আমাকে একবার যেতেই হবে। আমার প্রতিদিনের ব্যবহার্য কাপড়চোপড়, শেভিং কিট, ডিকশনারি— এগুলো তো আনতে হবে।
কারওয়ান বাজারের অফিসে যখন পৌঁছালাম, তখন দশটা বেজে দশ মিনিট। এহসান ভাই যথারীতি ল্যাপটপের ওপর হুমড়ি খেয়ে আছেন। আমাকে দেখেই বললেন, "রাশেদ, আজকে কিন্তু আমেরিকার পলিটিক্স নিয়ে বেশ কয়েকটা ভাইটাল নিউজ আছে। তুমি ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারকে নিয়ে যে স্পেশাল রিপোর্টটা আসছে, সেটা ধরো।"
আমি সুবোধ বালকের মতো ডেস্কে গিয়ে বসলাম। ল্যাপটপ অন করে জ্যারেড কুশনার আর তার স্ত্রী ইভাঙ্কা ট্রাম্পের একটা নিউজ ওপেন করলাম। স্ক্রিনে জ্যারেড আর ইভাঙ্কার একটা খুব সুন্দর, গ্ল্যামারাস ছবি ভাসছে। জ্যারেড কুশনার লম্বা, সুঠাম দেহের অধিকারী, পরনে দামি স্যুট। আর ইভাঙ্কা ট্রাম্প একটা চমৎকার গাউন পরে স্বামীর হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি নিউজটা অনুবাদ করতে শুরু করলাম। কিন্তু আধা ঘণ্টা পার হওয়ার পর আমি খেয়াল করলাম, আমার মাথার ভেতর এক অদ্ভুত হ্যালুসিনেশন শুরু হয়েছে।
আমি স্ক্রিনের ওই ছবির জ্যারেড কুশনারের মুখের জায়গায় নিজের মুখটা দেখতে পাচ্ছি! আর ইভাঙ্কা ট্রাম্পের ওই সোনালি চুলের জায়গায় আমি দেখতে পাচ্ছি আনিকা নাওহারের সেই অবাধ্য, কালো, ভেজা চুল। আনিকা উনার সেই অফ-হোয়াইট শাড়ি পরে আমার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। উনার সেই মোহনীয় হাসি, উনার সেই ৩৬-২৮-৩৬-এর নিখুঁত লাস্যময়ী শরীরটা আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।
আহা! কী অদ্ভুত, কী ঐশ্বরিক সেই দৃশ্য! আমি চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। প্রেমের চেয়ে বড় জাদুকর আর কেউ নেই। প্রেম একটা পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের ম্যাড়ম্যাড়ে অনুবাদককে মুহূর্তের মধ্যে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের বিলিয়নিয়ার জামাইয়ের সাথে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে দেয়। ঘড়ির কাঁটা যখন দুপুর বারোটা ছুঁল, আমার হোয়াটসঅ্যাপটা বেজে উঠল।
স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে আনিকার নাম। আমার হৃৎপিণ্ডটা একটা লাফ দিল। আমি দ্রুত মেসেজটা ওপেন করলাম। এখান থেকে শুরু হলো আমাদের সেই কাঙ্ক্ষিত টেক্সটিং বা মেসেজ আদান-প্রদান।
আনিকা: "গুড মর্নিং! এইমাত্র ঘুম থেকে উঠলাম। টেবিলে দেখি এলাহি কারবার! স্যান্ডউইচ, শর্মা, আবার সাথে ভুনা খিচুড়ি! তুমি কি ভেবেছ আমি সকালে উঠে রাক্ষসের মতো খাওয়া শুরু করব?"
আমি: "গুড মর্নিং! আমি তো জানতাম না সকালে তোমার মুড কেমন থাকবে। যদি ব্রিটিশ মুডে থাকো, তাই স্যান্ডউইচ। আর যদি খাঁটি বাঙালি মুডে থাকো, তাই খিচুড়ি। সেফ সাইডে থাকার জন্য সব অপশন ওপেন রেখেছি।"
আনিকা (হাসির ইমোজি দিয়ে): "হা হা হা! তুমি সত্যিই পাগল। থ্যাংকস ফর দ্য ফুড। খিচুড়িটাই খাচ্ছি এখন। এনিওয়ে, শোনো, একটা ইম্পর্ট্যান্ট কথা আছে।"
আমি: "বলো। শুনছি।"
আনিকা: "আমি দেশে আর মাত্র আট-নয় দিন আছি। এই কয়দিন আমি চাই না তুমি ওই মিরপুরের মেসে যাও। তুমি আজ থেকে ডিরেক্ট অফিস থেকে ধানমন্ডিতে আসবে। এখান থেকেই অফিসে যাবে। এটাই এখন তোমার বাসা।"
আমি: "সেটা কী করে হয় আনিকা? আমার তো মেসে একবার যেতেই হবে। আমার প্রতিদিনের ব্যবহার্য কিছু জিনিসপত্র, অফিসের কাপড়চোপড়— এগুলো তো আনতে হবে।"
আনিকা: "কিচ্ছু লাগবে না রাশেদ। কিচ্ছু না। তোমার যা যা লাগবে, সব আমি ম্যানেজ করে রাখব। এই ফ্ল্যাটে সব আছে। তুমি জাস্ট অফিস শেষ করে একটা উবার নিয়ে সোজাসুজি আমার এখানে চলে আসবে। আন্ডারস্টুড?"
আমি: "বাবাহ! এটা কি রিকোয়েস্ট নাকি ডিরেক্ট অর্ডার?"
আনিকা: "এটা অর্ডার। লন্ডনের সিইও আনিকা নাওহারের অর্ডার না, এটা তোমার আনিকার অর্ডার। তুমি এই আট দিন পুরোপুরি আমার। আমি তোমাকে এক মুহূর্তের জন্যও অন্য কোথাও শেয়ার করতে চাই না।"
আমি: "তোমার এই অর্ডারের সামনে তো দেখি জাতিসংঘের রেজুলেশনও ফেইল মারবে। ঠিক আছে মাই লর্ড, তোমার হুকুমই শিরোধার্য। আমি ডিরেক্ট ধানমন্ডিই আসব।"
আনিকা (ভালোবাসার ইমোজি দিয়ে): "গুড বয়। আমি বিকেলে মেলায় যাব। তুমি অফিস থেকে ডিরেক্ট মেলায় চলে আসবে। ওখান থেকে আমরা একসাথে বাসায় ফিরব। আই মিস ইউ।"
আমি: "আই মিস ইউ টু। মেলায় দেখা হচ্ছে।"
মেসেজ পর্ব শেষ হওয়ার পর আমি ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে একটা বোকা হাসি হাসলাম। আমার বুকের ভেতরটা একটা উষ্ণ, মধুর অনুভূতিতে ভরে গেল। একজন নারী যখন তার অধিকারবোধের জায়গা থেকে এমনভাবে শাসন করে, তখন পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাধীন পুরুষটারও সেই শাসনের শেকলে বাঁধা পড়তে ভালো লাগে। আমি আর মিরপুরে যাব না। আগামী আট-নয় দিন আমার ঠিকানা ধানমন্ডির ওই বিলাসবহুল ফ্ল্যাট।
কিন্তু আমার তো সারাদিন অফিস। আনিকা চলে যাবে আট-নয় দিন পর। এই কটা দিন যদি আমি অফিসে দশ ঘণ্টা করে সময় কাটাই, তাহলে উনাকে সময় দেব কখন? আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। দুপুর দুইটার দিকে আমি এহসান ভাইয়ের ডেস্কের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। "এহসান ভাই, একটু কথা ছিল," আমি খুব বিনয়ী গলায় বললাম।এহসান ভাই ল্যাপটপের কি-বোর্ড থেকে হাত না সরিয়েই বললেন, "বলো। কোনো নিউজে ঝামেলা?"
"না ভাই। নিউজ সব ক্লিয়ার। আমি আসলে ছুটির ব্যাপারে কথা বলতে এসেছিলাম।"
‘ছুটি’ শব্দটা শোনার সাথে সাথে এহসান ভাইয়ের হাতের টাইপিং থেমে গেল। কর্পোরেট অফিসে বসদের কাছে ‘ছুটি’ শব্দটা একটা অ্যালার্জির মতো। এই শব্দ শুনলেই তাদের গায়ে চুলকানি শুরু হয়ে যায়। "ছুটি? হঠাৎ ছুটি কেন? তোমার তো কোনো সিক লিভ বা ইমার্জেন্সি কিছু শুনিনি," এহসান ভাই ভ্রু কুঁচকে বললেন। "ইমার্জেন্সি কিছু না ভাই। আমার অ্যানুয়াল লিভ থেকে বেশ কিছু ছুটি তো পাওনা আছে। আমি সামনের এক সপ্তাহ, মানে আগামী সাত দিন ছুটি নিতে চাচ্ছিলাম।"
এহসান ভাই এমনভাবে আমার দিকে তাকালেন যেন আমি তার কাছে তার একটা কিডনি চেয়ে বসেছি। অফিসে যারা কাজ ফাঁকি দেয়, যারা ফাঁকিবাজ, তারা ঠিকই মাসের পর মাস ছুটি ম্যানেজ করে ফেলে। কিন্তু আমার মতো গাধা টাইপের কর্মী, যারা চুপচাপ নিজের ডেস্কের কাজটুকু করে যায়— তারা যখন তাদের প্রাপ্য ছুটিটুকু চায়, তখন বসদের মনে হয় আসমান ভেঙে পড়েছে।
"এক সপ্তাহ! পাগল হয়েছ রাশেদ?" এহসান ভাই নড়েচড়ে বসলেন। "এখন তো ইন্টারন্যাশনাল নিউজের চরম ক্রাইসিস টাইম। ইউক্রেন-রাশিয়া, মিডল-ইস্ট সব জায়গায় আগুন জ্বলছে। তুমি চলে গেলে এই ডেস্কে আমি আর মামুন মিলে কীভাবে সামলাব?" আমি খুব শান্তভাবে লজিক দিলাম, "ভাই, আমার ছুটিগুলো তো আমার পাওনাই ছিল। আমি তো সারা বছর কোনো ছুটি নিইনি। আর মামুন একাই পারবে, ও এখন খুব ফাস্ট নিউজ নামাতে পারে।"
"উঁহু! আহা! এটা কেমন কথা হলো!" এহসান ভাই মাথা নাড়তে লাগলেন। "হঠাৎ করে এক সপ্তাহের ছুটি দেওয়া খুব ডিফিকাল্ট। তুমি বরং দুই দিনের ছুটি নাও।" আমি ছাড়ার পাত্র নই। আমার কাছে এখন কিম জং উন বা জো বাইডেনের চেয়ে আনিকা নাওহারের সাথে কাটানো প্রতিটা সেকেন্ড অনেক বেশি মূল্যবান। আট-নয় দিন পর উনি চলে যাবেন আট হাজার মাইল দূরে। এই সময়টুকু আমি কোনো কর্পোরেট দাসত্বে নষ্ট করতে রাজি নই।
"ভাই, আমার এটা খুব ইমার্জেন্সি। আমাকে এক সপ্তাহের ছুটিটা দিতেই হবে," আমি একটু শক্ত গলায় বললাম। এহসান ভাই আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝলেন, আজ এই ছেলেটা নাছোড়বান্দা। উনি একটা বিরক্তিকর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।"ঠিক আছে। কিন্তু আজ আর কাল তোমাকে ফুল অফিস করতে হবে। পরশু দিন থেকে তুমি এক সপ্তাহের লিভে যাও। আমি এইচআরে মেইল করে দিচ্ছি।"
আমি মনে মনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। পরশু থেকে এক সপ্তাহ মানে আনিকার ফ্লাইট পর্যন্ত আমি পুরোপুরি ফ্রি। উনার পুরো সময়টাই আমি আমার করে নিতে পারব। "থ্যাংক ইউ ভাই," বলে আমি নিজের ডেস্কে ফিরে এলাম। বিকেলে আনিকার কথামতো আমি মেসেজ দিয়ে আমার মেসের ম্যানেজার (যে আসলে আমাদেরই একজন রুমমেট) তুহিনকে জানিয়ে দিলাম:
"তুহিন, আমি আগামী আট-নয় দিন মেসে আসব না। আমার মিল আজ থেকে বন্ধ রাখিস। আমার একটা পার্সোনাল কাজ আছে, ঢাকার বাইরে থাকতে হতে পারে।"
তুহিন রিপ্লাই দিল: "ওকে ব্রাদার। নো টেনশন। আই উইল ম্যানেজ।"
ব্যাস। মিরপুরের সাথে আমার আগামী আট দিনের সমস্ত সম্পর্ক অফিশিয়ালি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। সন্ধ্যা সাতটার দিকে আমি বাংলা একাডেমির বইমেলায় পৌঁছালাম। আজ মেলায় আমার হাঁটার ভঙ্গিটা অন্য দিনের মতো ছিল না। গত কয়েকদিন আমি আনিকার পাশে হাঁটতাম একজন স্টকার বা একজন মুগ্ধ ভক্ত হিসেবে। খুব সাবধানে, আড়ষ্ট হয়ে, পাছে উনি কিছু মনে করেন!
কিন্তু আজ... আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
আমি মেলায় আনিকাকে খুঁজে বের করলাম। উনি আজ একটা হালকা নীল রঙের সুতির শাড়ি পরেছেন। উনাকে দেখেই আমি এগিয়ে গিয়ে, মেলা প্রাঙ্গণের হাজারো মানুষের ভিড়ের মাঝখানেই খুব সাবলীলভাবে উনার ডান হাতটা আমার হাতের মুঠোয় তুলে নিলাম। আনিকা একটু চমকে আমার দিকে তাকালেন, তারপর উনার মুখে একটা প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। উনিও উনার আঙুলগুলো আমার আঙুলের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে নিলেন।
আমরা মেলায় হাঁটছি। হাতে হাত রেখে। আমাদের হাঁটার মধ্যে এমন একটা অধিকারবোধ, এমন একটা ক্যাজুয়াল কনফিডেন্স ছিল— দূর থেকে দেখলে যে কারো মনে হবে আমরা বহু বছরের বিবাহিত স্বামী-স্ত্রী। ঢাকা শহরের এই ভিড়ে কেউ আমাদের চেনে না, কেউ আমাদের দিকে জাজমেন্টাল দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে না। আজ আমার ভেতরে কোনো অস্বস্তি নেই, কোনো ভয় নেই। আমার হাতের মুঠোয় এখন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নারীর হাত। আনিকা আজ বেশ মেজাজে আছেন। উনি লিটল ম্যাগ চত্বর থেকে শুরু করে বড় বড় প্যাভিলিয়ন— সব জায়গায় ঘুরলেন। উনি অনেকগুলো বই কিনলেন। বেশিরভাগই কবিতার বই, আর কিছু লাতিন আমেরিকান উপন্যাসের অনুবাদ। বইয়ের ব্যাগগুলো আমি এক হাতে বইছি, আর অন্য হাতে আনিকার হাত।
"তোমার তো দেখি সাহিত্যের প্রতি বেশ ভালোই টান আছে," আমি উনার দিকে তাকিয়ে বললাম।
"আমি তো সাহিত্যিক মানুষ রাশেদ। আমি তো শুধু আইটি ফার্মের সিইও না," আনিকা হাসিমুখে বললেন। "আর তাছাড়া, লন্ডনের ওই যান্ত্রিক জীবনে এই বাংলা বইগুলোই তো আমাকে আমার শেকড়ের সাথে জুড়ে রাখে।"
রাত সাড়ে আটটার দিকে মেলার গেট বন্ধ হওয়ার অ্যানাউন্সমেন্ট শুরু হলো। আমরা মেলা থেকে বেরিয়ে এলাম। আজ আমি আর রিকশা ডাকলাম না। আমি পকেট থেকে মোবাইল বের করে উবার অ্যাপে একটা এসি গাড়ির রিকোয়েস্ট দিলাম। আমার মনে হলো, আজ আনিকাকে রিকশার ঝাঁকুনিতে নেওয়াটা ঠিক হবে না। তাছাড়া, আমার পকেটের অবস্থা যাই হোক না কেন, আমি এখন উনার ‘অফিশিয়াল’ পার্টনারের মতো ফিল করছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই উবারের সাদা রঙের একটা সেডান গাড়ি এসে আমাদের সামনে দাঁড়াল।
আমরা পেছনের সিটে গিয়ে বসলাম। গাড়ির এসি চলছে। জানালার কাঁচ বন্ধ। বাইরের কোলাহল একদম শূন্যে নেমে এসেছে। "ধানমন্ডি যাবেন তো স্যার?" ড্রাইভার জিজ্ঞেস করল। আমি হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ার আগেই আনিকা হঠাৎ বলে উঠলেন, "ভাইয়া, একটু আড়ংয়ের সামনে দিয়ে যাবেন। সায়েন্স ল্যাবের আড়ংয়ে একটু থামতে হবে।"
আমি অবাক হয়ে আনিকার দিকে তাকালাম। "আড়ংয়ে? এই রাতে আড়ংয়ে কী কাজ?"
আনিকা আমার দিকে ফিরে একটা রহস্যময় হাসি দিলেন।
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) -
Bad Boy - 09-27-2026
২০
আনিকা আমার দিকে ফিরে একটা রহস্যময় হাসি দিলেন। "কাজ আছে। আমি তোমাকে বলেছিলাম না যে তোমার মেসে যাওয়ার দরকার নেই? তোমার যা লাগবে আমি ম্যানেজ করব? একজন মানুষের আট দিন থাকার জন্য তো কিছু বেসিক জিনিস লাগে। জামাকাপড়, স্লিপিং সুট, আরও কিছু দরকারি জিনিস। আমি তোমাকে আড়ং থেকে ওগুলো কিনে দেব।"
আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। "আরে, এটা কেমন কথা! আমি আমার কাপড়..."
আনিকা আমার ঠোঁটের ওপর উনার একটা আঙুল রেখে আমাকে থামিয়ে দিলেন। "শশশ! কোনো কথা না। আমি বলেছি, তুমি এখন আমার। আর আমার মানুষের কী লাগবে না লাগবে, সেটা দেখার দায়িত্ব আমার।" আমি আর কোনো কথা বলতে পারলাম না। উবারের গাড়িটা শাহবাগ পেরিয়ে সায়েন্স ল্যাবের দিকে এগোতে লাগল। আমার মাথার ভেতর তখন একটা অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করছে। একজন নারী যখন একজন পুরুষকে এতটা যত্ন করে, এতটা অধিকার নিয়ে শাসন করে— তখন সেই পুরুষের আর কোনো নিজস্ব ফিলোসফি বা ইগো অবশিষ্ট থাকে না।
গাড়ি এসে সায়েন্স ল্যাবের আড়ংয়ের সামনে থামল।
পৃথিবীতে পুরুষ মানুষের জন্য সবচেয়ে বিরক্তিকর কাজগুলোর একটি হলো শপিং করা। আর সেই শপিং যদি হয় কোনো শপিং মলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুরে ঘুরে জামাকাপড় কেনা, তাহলে তো কথাই নেই। সাধারণ মধ্যবিত্ত পুরুষদের শপিংয়ের একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্ন থাকে। তারা দোকানে ঢোকে, চোখের সামনে যে শার্ট বা প্যান্টটা প্রথম পড়ে সেটা হাতে নেয়, দাম দেখে, সাইজ ঠিক থাকলে পেমেন্ট করে পাঁচ মিনিটের মধ্যে দোকান থেকে বেরিয়ে আসে। কোনো দরদাম নেই, কোনো বাছবিচার নেই। কিন্তু নারীদের শপিংয়ের ব্যাকরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা শপিং মলে যায় পৃথিবী জয় করার প্রস্তুতি নিয়ে।
সায়েন্স ল্যাবের আড়ংয়ের সামনে যখন উবারের গাড়িটা থামল, তখন রাত আটটা বাজে। ঢাকা শহরের রাস্তায় তখন গাড়ির হর্ন আর মানুষের কোলাহলের চূড়ান্ত রূপ। আমরা গাড়ি থেকে নেমে আড়ংয়ের সেই বিশাল, আলো ঝলমলে কাঁচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম। আড়ংয়ের ভেতরে ঢোকার সাথে সাথেই এক ধরনের অদ্ভুত, আভিজাত্যের গন্ধ নাকে এসে লাগে। নতুন কাপড়ের গন্ধ, দামি পারফিউমের গন্ধ, আর এসির কনকনে ঠান্ডা বাতাস মিলেমিশে একটা এলিট পরিবেশ। আমি রাশেদ আহমেদ, মিরপুরের মেসে থাকা পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের এক সাধারণ অনুবাদক, এই পরিবেশে নিজেকে সবসময় একটা মিসফিট বা বেমানান প্রাণী বলে মনে করি। আমার মনে হয়, এখানকার সিকিউরিটি গার্ডরাও হয়তো বুঝতে পারে যে এই লোকটার পকেটে আড়ং থেকে কিছু কেনার মতো কোনো টাকা নেই, সে স্রেফ হাওয়া খেতে ঢুকেছে।
কিন্তু আজ পরিস্থিতি ভিন্ন। আজ আমি একা নই। আমার পাশে আছেন আনিকা নাওহার। উনার পরনের নীল শাড়ি, উনার হাঁটার রাজকীয় ভঙ্গি আর উনার চোখের সেই প্রখর আত্মবিশ্বাস পুরো আড়ংয়ের পরিবেশটাকে যেন উনার নিজের ড্রয়িংরুমের মতো ক্যাজুয়াল বানিয়ে দিল। আমরা সোজা দোতলায়, মেনজ ওয়্যার বা ছেলেদের কাপড়ের সেকশনে চলে গেলাম।
আমি ভেবেছিলাম, উনি হয়তো আমার ওই ফ্ল্যাটে থাকার জন্য একটা সাধারণ ট্রাউজার আর একটা স্লিপিং শার্ট কিনে দেবেন। কিন্তু আনিকা নাওহারের ডিকশনারিতে 'সাধারণ' বলে কোনো শব্দ নেই। উনি একটা ট্রলির ঝুড়ি হাতে নিলেন। তারপর একদিক থেকে শুরু করলেন। প্রথমে ট্রাউজার বা ক্যাজুয়াল প্যান্টের সেকশন। উনি খুব মনোযোগ দিয়ে কাপড়ের টেক্সচার দেখছেন। কয়েকটা ট্রাউজার আমার কোমরের কাছে এনে মাপ বুঝার চেষ্টা করলেন। "আনিকা, একটা প্যান্ট হলেই তো হয়। রাতে ঘুমানোর সময় তো আর ফ্যাশন শো করব না," আমি উনার পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বললাম।
উনি আমার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে নীল, ছাই রঙ, আর জলপাই রঙের তিন-চারটে ট্রাউজার ঝুড়িতে ফেলে দিলেন। তারপর উনি আমার খুব কাছে ঘেঁষে দাঁড়ালেন। উনার ঠোঁটটা আমার কানের কাছে এনে এমন একটা নিচু, রেশমি গলায় ফিসফিস করে বললেন, "তোমার কোমরের সাইজটা একদম পারফেক্ট রাশেদ। আমি জাস্ট দেখছি, এই প্যান্টগুলো তোমার শরীর থেকে খুলে ফেলা কতটা সহজ হবে।" কথাটা শোনার সাথে সাথে আমার কানের লতি লাল হয়ে গেল। আমি চারদিকে আড়চোখে তাকালাম। সেলসম্যানরা একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। এই নারী কি পাগল? আড়ংয়ের মতো একটা পাবলিক প্লেসে দাঁড়িয়ে কেউ এমন কথা বলে! আমার শরীরের ভেতর দিয়ে একটা বিদ্যুতের ঝলক বয়ে গেল।
এরপর আমরা গেলাম ফতুয়ার সেকশনে। আমি জীবনে কখনো আড়ংয়ের ফতুয়া পরিনি। নিউমার্কেটের ফুটপাত থেকে কেনা দুই-তিনশো টাকার ফতুয়াই আমার ভরসা। আনিকা খুব সুন্দর ডিজাইনের, হালকা সুতোর কাজ করা দুটো ফতুয়া বেছে নিলেন। "এই ফতুয়াগুলো পরলে তোমাকে একদম খাঁটি বাঙালি বাবু মনে হবে," আনিকা আবার আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে এলেন। উনার পারফিউমের গন্ধটা আমাকে পাগল করে দিচ্ছিল। উনি খুব দুষ্টু একটা হাসি দিয়ে ফিসফিস করে বললেন, "বাঙালি পুরুষ ফতুয়ায় কত সুন্দর লাগে জানো? তবে ফতুয়ার নিচের শরীরটা তার চেয়েও বেশি সুন্দর।"
আমি একটা ঢোঁক গিললাম। "আনিকা, আপনি কিন্তু পাবলিক প্লেসে আমাকে নার্ভাস করে দিচ্ছেন। আমি তো শপিং বাদ দিয়ে অন্য কিছু ভাবতে শুরু করব।"
"ভাবো না! কে মানা করেছে?" উনি চোখ টিপে হাসলেন।
এরপর উনি গেলেন টি-শার্টের দিকে। সেখান থেকে নিলেন তিনটা খুব সফট এবং দামি ফেব্রিকের ক্যাজুয়াল টি-শার্ট। আমি বললাম, "কী শুরু করলেন? এত টি-শার্ট দিয়ে আমি কী করব?" আনিকা উনার হাত দিয়ে একটা টি-শার্টের কাপড় পরখ করতে করতে ফিসফিসিয়ে বললেন, "আমার ফ্ল্যাটে ঘুমানোর জন্য খুব আরামদায়ক কাপড় লাগে রাশেদ। আর তা নাহলে, কোনো কাপড় না হলেও চলে। অপশনটা তোমার।"
আমার বুকের স্পন্দন আবার বেড়ে গেল। এই নারীর প্রতিটি কথার ভেতর একটা করে সুপ্ত আগ্নেয়গিরি লুকিয়ে আছে। কাপড়ের পাট চুকিয়ে আমি ভাবলাম শপিং শেষ। কিন্তু না। আনিকা আমাকে টেনে নিয়ে গেলেন শার্টের সেকশনে। "অফিসে যাওয়ার জন্য তো কিছু শার্ট লাগবে, তাই না? ওই একই শার্ট পরে তো আর আট দিন অফিসে যেতে পারবে না," আনিকা বললেন।
আমি বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলাম। "আনিকা, অফিসের শার্ট আমার মেসেই আছে। আমি ম্যানেজ করে নেব। প্লিজ, আর কিছু কিনবেন না।" আনিকা শুনলেন না। উনি চারটা খুব এক্সক্লুসিভ, ফর্মাল এবং সেমি-ফর্মাল শার্ট পছন্দ করলেন। একটা শার্ট আমার বুকের ওপর ধরে ফিটিং দেখতে দেখতে উনি উনার সেই বিখ্যাত, ঘাতক ফিসফিসানিটা আবার শুরু করলেন। "শার্টে তোমাকে দারুণ মানাবে রাশেদ। তোমার চওড়া কাঁধের সাথে খুব ভালো যাবে।" উনি একটু থামলেন। তারপর উনার চোখের দৃষ্টিটা একটু নিচে নামিয়ে, ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তুলে বললেন, "তবে সত্যি কথা বলতে কী... আমার বেশি ভালো লাগে তোমাকে শার্ট ছাড়া দেখতে।"
উনার এই কথাটা আমাকে আক্ষরিক অর্থেই বোবা করে দিল। আমি আশেপাশে তাকিয়ে দেখলাম কেউ আমাদের শুনছে কি না। আড়ংয়ের এই কর্পোরেট, শান্ত পরিবেশে দাঁড়িয়ে আমরা দুজন যেন একটা গোপন, আদিম প্রেমের খেলা খেলছি। শার্ট কেনা শেষ হলো। আমি মনে মনে হিসাব করছি, বিল কত আসতে পারে। কিন্তু আনিকার শপিংয়ের লিস্ট তখনো শেষ হয়নি। উনি আমাকে নিয়ে গেলেন অ্যাকসেসরিজ সেকশনে। সেখান থেকে উনি একটা খুব সুন্দর, ভারি ক্রিস্টালের ছাইদানি (অ্যাশট্রে) নিলেন।
"এটা কেন?" আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
"তুমি যে চেইন স্মোকার, সেটা আমি জানি। আমার ফ্ল্যাটে তো কোনো অ্যাশট্রে নেই। তুমি তো ছাই ফেলে আমার বিছানা নোংরা করে ফেলবে। তাই এটা নিলাম," আনিকা বললেন।
তারপর উনি একটা খুব দামি, খাঁটি চামড়ার মানিব্যাগ নিলেন। "মানিব্যাগ কেন? আমার তো মানিব্যাগ আছেই," আমি আমার পকেট থেকে আমার পুরনো, জীর্ণ, চামড়া-ওঠা মানিব্যাগটা বের করে দেখালাম। আনিকা সেটার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। "ওই মানিব্যাগের দিন শেষ রাশেদ। নতুন মানিব্যাগে নতুন স্মৃতি জমা করে রাখবে।" সবশেষে উনি একটা সানগ্লাসের স্ট্যান্ডের সামনে দাঁড়ালেন। সেখান থেকে একটা বেশ স্টাইলিশ, কালো ফ্রেমের সানগ্লাস তুলে নিয়ে আমার চোখে পরিয়ে দিলেন।
"পারফেক্ট!" আনিকা একটু পিছিয়ে গিয়ে আমাকে দেখে বললেন।
"সানগ্লাস দিয়ে আমি কী করব? আমি তো আর হিরো না।"
"হিরো না, কিন্তু তোমার চোখ দুটো খুব ডেঞ্জারাস রাশেদ। ওই শিকারি চোখ দুটো মাঝে মাঝে লুকিয়ে রাখা দরকার," আনিকা খুব নিচু গলায়, চোখে চোখ রেখে বললেন।
আমি পুরোপুরি পরাস্ত। আমার আর কোনো কথা বলার ক্ষমতা অবশিষ্ট নেই। আমরা কাউন্টারে গেলাম বিল পেমেন্ট করার জন্য। ক্যাশিয়ার একে একে জিনিসগুলোর বারকোড স্ক্যান করছে, আর মনিটরে দাম উঠছে। আমি জীবনে সবসময় বঙ্গবাজার বা নিউমার্কেট থেকে ৬০০-৭০০ টাকার শার্ট পরা লোক। আমি আড়চোখে দেখলাম, আনিকার পছন্দ করা একটা শার্টেরই দাম ২৪০০ থেকে ২৫০০ টাকা। ট্রাউজারগুলোর দামও আকাশছোঁয়া।
স্ক্যানিং শেষ হওয়ার পর ক্যাশিয়ার ছেলেটা খুব বিনীত গলায় বলল, "ম্যাম, আপনাদের মোট বিল এসেছে ঊনত্রিশ হাজার তিনশো পঞ্চাশ টাকা।" ২৯,৩৫০ টাকা!
সংখ্যাটা শোনার পর আমার মনে হলো, আমার মাথার ওপর দিয়ে একটা রকেট উড়ে গেল। আমার সারা মাসের বেতন পঁচিশ হাজার টাকা। আর এই নারী মাত্র আধঘণ্টার শপিংয়ে আমার এক মাসের বেতনের চেয়েও বেশি টাকা স্রেফ আমার জামাকাপড় আর ছাইদানির পেছনে উড়িয়ে দিলেন! আমি মানসিকভাবে চরম একটা ধাক্কা খেলাম। মধ্যবিত্ত পুরুষদের একটা বড় সমস্যা হলো তাদের ইগো। তারা চায় নারীদেরকে প্রটেক্ট করতে, তাদের জন্য খরচ করতে। কিন্তু যখন উল্টোটা ঘটে, তখন তাদের ইগোতে খুব সূক্ষ্ম একটা আঁচড় পড়ে।
আনিকা খুব দ্রুত উনার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটা প্ল্যাটিনাম ক্রেডিট কার্ড বের করে ক্যাশিয়ারের হাতে দিলেন। আমি আনিকার দিকে তাকালাম। আমার হঠাৎ করে নিজেকে খুব দামি একজন ‘মেল প্রস্টিটিউট’ বা এসকর্ট বলে মনে হতে লাগল। যেন আমার কোনো ধনী, অভিজাত 'ওনার' বা মালিক আমাকে খুশি করার জন্য, আমার সার্ভিসের বিনিময়ে আমাকে দামি দামি গিফট কিনে দিচ্ছেন। ব্যাপারটা আমার কাছে অপমানজনক মনে হলো না, বরং খুব হাস্যকর এবং পরাবাস্তব মনে হলো। আমি, মিরপুরের মেস নিবাসী রাশেদ আহমেদ, একজন বিলিয়নিয়ার নারীর ‘কিপ্ট’ বা পালিত পুরুষ হয়ে গেছি! এই ফিলিংসটার ভেতরে একটা অদ্ভুত, নিষিদ্ধ আনন্দ আছে।
আমি উনার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললাম, "কী শুরু করলেন আনিকা? পুরো আড়ংটা কিনে নেবেন নাকি?" আনিকা কার্ড পাঞ্চ মেশিনে পিন কোড দিতে দিতে আমার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। উনার সেই বাদামি চোখে একটা অদ্ভুত অধিকারবোধ। উনি খুব নিচু গলায়, শুধু আমি যেন শুনতে পাই এমনভাবে বললেন, "তুমি তো আমাকেই কিনে নিয়েছ রাশেদ। আমার পুরো সত্তাটা এখন তোমার। আমি আর কী-ই বা দিতে পারি তোমাকে?"
কথাটা আমার বুকের ভেতরটা এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিল। এই নারী জানে কীভাবে একজন পুরুষের সমস্ত ইগো, সমস্ত লজিককে একটা মাত্র বাক্য দিয়ে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে হয়।
বিল পেমেন্ট করে আমরা বিশাল দুটো শপিং ব্যাগ নিয়ে আড়ং থেকে বের হলাম। বাইরে এসে দেখি, আমাদের জন্য অপেক্ষমাণ উবারের ড্রাইভার বেশ বিরক্ত মুখে গাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে। ঢাকা শহরের উবার ড্রাইভাররা এমনিতেই খুব সেনসিটিভ প্রজাতির মানুষ। তাদের পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করালেই তারা ট্রিপ ক্যানসেল করে দেওয়ার হুমকি দেয়।
আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। "ভাই, একটু দেরি হয়ে গেল। সরি।" ড্রাইভার মুখটা বাংলার পাঁচের মতো করে বলল, "ভাই, আপনাদের তো পাঁচ মিনিট বইলা আধা ঘণ্টা পার কইরা দিলেন। আমার তো অন্য ট্রিপ ধরার টাইম পার হইয়া যাইতেছে। ঢাকা শহরে ওয়েটিংয়ের যে টাকা দেয় অ্যাপে, ওইটা দিয়া তো আমার পোষায় না।" আমি কিছু বলার আগেই আনিকা খুব শান্ত, কনফিডেন্ট গলায় বললেন, "প্যারা নাই ভাইয়া। অ্যাপে ওয়েটিংয়ের যে টাকা আসবে, আমি আপনাকে তার চেয়ে অনেক বেশি বকশিশ দিয়ে দেব। আপনি জাস্ট রিল্যাক্স করে ড্রাইভ করেন।"
টাকা যে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যাজিক, সেটা আবার প্রমাণ হয়ে গেল। 'বকশিশ' শব্দটা শোনার সাথে সাথেই ড্রাইভারের বিরক্তি একদম কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে তড়িঘড়ি করে গাড়ির পেছনের ডিকি খুলে আমাদের শপিং ব্যাগগুলো যত্ন করে রাখল।"ঠিক আছে ম্যাডাম, ওঠেন। কোনো সমস্যা নাই," ড্রাইভার দাঁত বের করে হাসল। আমরা গাড়িতে উঠলাম। গন্তব্য ধানমন্ডি।
"রাশেদ, বাসায় তো খাবার নেই। চলো রাস্তার পাশ থেকে কিছু দেশি খাবার কিনে নিই," আনিকা গাড়িতে বসেই বললেন।
"ঠিক আছে। স্টার কাবাব বা কোনো দেশি রেস্টুরেন্ট থেকে পার্সেল নিয়ে নেব।"
আমরা ধানমন্ডির ভেতরে একটা ভালো রেস্টুরেন্টের সামনে গাড়ি থামালাম। আমি নেমে গিয়ে রাতের খাবারের জন্য সাদা ভাত, গরুর কালা ভুনা, লইট্টা শুঁটকি ভুনা, আর ঘন ডাল পার্সেল নিলাম। আনিকা গাড়ি থেকেই আমাকে ইশারা করে বললেন রাস্তার পাশের একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে কিছু স্ন্যাকস, চিপস, চকোলেট আর কয়েক বোতল স্প্রাইট নিয়ে আসতে। সব কেনাকাটা শেষ করে আমরা যখন আনিকার সেই ষোলো তলা বিল্ডিংয়ের সাত তলার ফ্ল্যাটে এসে পৌঁছালাম, তখন রাত প্রায় দশটা।
ফ্ল্যাটের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই সেই পরিচিত, শান্ত, এসির ঠান্ডা বাতাস আমাদের স্বাগত জানাল। আনিকা উনার শাড়িটা পাল্টে একটা খুব আরামদায়ক, ঢিলেঢালা ম্যাক্সি টাইপের ড্রেস পরে নিলেন। আমি আড়ংয়ের ব্যাগ থেকে একটা নতুন ট্রাউজার আর ফতুয়া বের করে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। নতুন ফতুয়া গায়ে দিয়ে, ড্রয়িংরুমের সেই বিশাল লেদার সোফায় বসে আমি একটা অদ্ভুত শান্তি অনুভব করলাম।
আমি নতুন অ্যাশট্রেটা টেবিলের ওপর রাখলাম। পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরালাম। আনিকাও আমার পাশে এসে বসলেন। আমি উনার দিকে সিগারেটের প্যাকেটটা এগিয়ে দিলাম। উনি একটা সিগারেট নিয়ে আমার লাইটার থেকেই ধরালেন। দুজনে পাশাপাশি বসে সিগারেট খাওয়ার ভেতরে একটা খুব গভীর, ইমোশনাল ইনটিমেসি আছে। সিগারেটের ধোঁয়াগুলো বাতাসে মিশে যাচ্ছে, আর আমরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছি। কোনো কথা নেই, শুধু নীরবতার এক অদ্ভুত বোঝাপড়া। সিগারেট শেষ করে আমরা ডাইনিং টেবিলে খেতে বসলাম।
মাটির পাত্রে বা সিরামিকের প্লেটে দেশি খাবার খাওয়ার মজাটাই আলাদা। গরুর কালা ভুনা আর লইট্টা শুঁটকি দিয়ে ভাত মেখে খাওয়ার সময় আনিকার মুখটা একটু লাল হয়ে গেল।
"উফফ! দারুণ ঝাল, কিন্তু কী টেস্ট!" আনিকা স্প্রাইটের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বললেন। "বিদেশে বসে এই কালা ভুনা আর শুঁটকির স্বাদ পাওয়া যায় না আনিকা। এটা শুধু ঢাকা শহরের জ্যাম আর ধুলোবালির সাথেই মানায়," আমি হাসিমুখে বললাম।
আমরা খুব আস্তে-ধীরে, আড্ডা দিতে দিতে খাওয়া শেষ করলাম। আনিকা উনার লন্ডনের জীবনের কথা বলছিলেন, আমি বলছিলাম আমার মেসের বন্ধুদের কথা। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে আমরা হাত ধুয়ে আবার ড্রয়িংরুমে এলাম। রাত তখন সাড়ে এগারোটার মতো বাজে।
আমি ভাবছিলাম, এবার হয়তো আমরা বেডরুমের দিকে যাব। গতকাল রাতের সেই অপূর্ণতা, সেই বন্যতা আজ হয়তো পূর্ণতা পাবে। আমার শরীরের ভেতর আবার সেই পরিচিত উত্তেজনা কাজ করতে শুরু করেছে। কিন্তু আনিকা হঠাৎ করে একটা অদ্ভুত প্রস্তাব দিয়ে বসলেন। উনি ডাইনিং স্পেসের পাশের একটা কাঠের ক্যাবিনেটের দিকে হেঁটে গেলেন। ক্যাবিনেটের দরজা খুলে উনি একটা বেশ পরিচিত শেপের বোতল বের করে আনলেন।
বোতলটা দেখে আমার চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। একটা ব্ল্যাক লেবেল হুইস্কি! আনিকা বোতলটা আর দুটো ক্রিস্টালের গ্লাস হাতে নিয়ে সোফায় আমার পাশে এসে বসলেন।
"রাশেদ," আনিকা খুব শান্ত, অথচ চরম একটা উত্তেজক গলায় বললেন, "আজ রাতে আমরা দুজনে মদ খাব।"
আমি হতভম্ব হয়ে উনার দিকে তাকিয়ে রইলাম। "মদ? মানে অ্যালকোহল?"
"হ্যাঁ। অ্যালকোহল। লন্ডনে এটা আমাদের খুব রেগুলার ব্যাপার, কিন্তু দেশে আমি খুব একটা খাই না। আজ আমার খেতে ইচ্ছে করছে।"
আমি একটু নার্ভাস হয়ে গেলাম। "কিন্তু আনিকা, আমি তো ওসবের খুব একটা অভ্যস্ত না। আমি তো সাধারণ মানুষ।" আনিকা খিলখিল করে হেসে উঠলেন। "আরে বাবা, ভয় পাচ্ছ কেন? আমি তো তোমাকে মাতাল করে ড্রেনে ফেলে দেব না। আমরা জাস্ট হালকা ড্রিংক করব। একটু রিল্যাক্সড হবো।" উনার চোখের দৃষ্টিটা এবার একটু পাল্টে গেল। সেই দৃষ্টিতে এখন একটা বন্য, আদিম এবং চরম কামনার আগুন জ্বলছে।
উনি আমার কানের খুব কাছে মুখ নিয়ে এসে ফিসফিস করে বললেন, "রাশেদ, আমি দেখতে চাই, মাতাল অবস্থায় তুমি আমাকে কীভাবে আদর করো। কাল রাতে তো তুমি পুরো সেন্সে ছিলে, তাতেই আমাকে পাগল করে দিয়েছ। আজ আমি দেখতে চাই, যখন তোমার মাথার ভেতরের সমস্ত লজিক, সমস্ত কন্ট্রোল হারিয়ে যাবে, তখন তুমি কতটা বন্য হতে পারো। আমি তোমার সেই বন্যতাটা ফিল করতে চাই।"
উনার কথাটা শোনার পর আমার শরীরের সমস্ত রক্ত যেন এক মুহূর্তে মাথায় উঠে এল। মাতাল অবস্থায় আদর! এই নারী আমাকে নিয়ে এমন সব ফ্যান্টাসির জগতে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন, যে জগতের দরজা আমি জীবনেও খোলার কথা ভাবিনি।
"ঠিক আছে," আমি একটা গভীর শ্বাস নিয়ে বললাম। "আজ রাতে তাহলে আপনার রুলস।"
আনিকা হাসিমুখে গ্লাসে হুইস্কি ঢাললেন। আমরা গ্লাস দুটো হাতে নিয়ে ফ্ল্যাটের সাথে লাগোয়া বিশাল বারান্দাটায় গিয়ে বসলাম। বারান্দায় দুটো বেতের চেয়ার আর একটা ছোট টেবিল রাখা। আমরা সেখানে বসলাম। রাত তখন বারোটা পেরিয়েছে। ঢাকা শহরের রাস্তাঘাট এখন অনেকটা শান্ত। দূর থেকে দুই-একটা দূরপাল্লার বাসের হর্ন বা ট্রাকের শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছে না। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকের একটা খুব মিষ্টি, ঠান্ডা বাতাস বারান্দা দিয়ে আমাদের গায়ে এসে লাগছে।
আমি আমার ফোনটা বের করে ইউটিউব ওপেন করলাম। "একটা গান ছাড়ি আনিকা?" আমি জিজ্ঞেস করলাম। "ছাড়ো। তোমার যা ইচ্ছে।" আমি সার্চ করে আমার খুব প্রিয় একটা গান প্লে করলাম। কবীর সুমনের গান। ফোনের স্পিকার থেকে খুব মৃদু, কিন্তু স্পষ্ট ভলিউমে গানটা বাজতে শুরু করল।
অচেনা নদীর স্রোতে চেনা চেনা ঘাট দেখে নামি
চেনা তবু চেনা নয়, এভাবেই স্রোত বয়ে যায়
খোদার কসম জান, আমি ভালোবেসেছি তোমায়।
গানের সুরটা রাতের এই নিস্তব্ধতা, বারান্দার এই ঠান্ডা বাতাস, আর আমাদের হাতের হুইস্কির গ্লাসের সাথে এমন একটা অপার্থিব পরিবেশ তৈরি করল, যে মনে হলো আমরা যেন পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো এক মায়াবী দ্বীপে বসে আছি। আমি আনিকার দিকে তাকালাম। উনি চোখ বন্ধ করে গানের সুরটা শুনছেন। উনার ঠোঁটে একটা শান্ত হাসি। উনার এক হাত আমার হাতের ওপর রাখা। আমি হুইস্কির গ্লাসে একটা ছোট চুমুক দিলাম। তরল আগুনটা গলা দিয়ে নেমে গিয়ে বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত উষ্ণতা তৈরি করল।
রাত মাত্র শুরু হয়েছে। এবং আমি জানি, এই রাতের শেষটা হবে এমন কিছু, যা আমার জীবনের সমস্ত হিসাব-নিকাশ পাল্টে দেবে।
মানুষের জীবন আর সিনেমার স্ক্রিপ্টের মধ্যে একটা খুব বেসিক পার্থক্য আছে। সিনেমায় যখন নায়ক-নায়িকা রাতে বারান্দায় বসে মদ খায়, ব্যাকগ্রাউন্ডে রোমান্টিক গান বাজে, তখন দর্শকরা খুব ভালো করেই জানে এর পরের দৃশ্যটা কী হতে যাচ্ছে। তারা সোজা বেডরুমে যাবে, এবং সারা রাত ধরে এমন এক প্রলয়ঙ্করী প্রেমের ঝড় বইবে যা দেখে আটলান্টিক মহাসাগরের ঢেউও লজ্জা পাবে। কিন্তু বাস্তব জীবন কোনো স্ক্রিপ্ট মেনে চলে না। বাস্তব জীবনে মানুষের একটা অদ্ভুত বায়োলজিক্যাল যন্ত্র থাকে, যার নাম শরীর।
গত রাতে বারান্দায় বসে হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে আমি যে লেভেলের ফ্যান্টাসির রাজ্য তৈরি করেছিলাম, তার দশ ভাগও যদি বাস্তবে রূপ নিত, তাহলে আজ হয়তো ঢাকার কোনো এক পত্রিকায় খবর বের হতো— "ধানমন্ডিতে অতিরিক্ত রোমান্সের কারণে এক অনুবাদকের করুণ মৃত্যু।" কিন্তু বাস্তবে ঘটল অন্য ঘটনা। হুইস্কির ওই কয়েক পেগ, সারাদিন বইমেলায় হাঁটা, আড়ংয়ে শপিং করা এবং তারও আগে বাথটাবের সেই নার্ভ-কাঁপানো আদিম ধকল— সব কিছু মিলিয়ে আমাদের দুজনের শরীরেই একটা চরম ক্লান্তি ভর করেছিল। অ্যালকোহল জিনিসটা খুব অদ্ভুত। এটা কখনো আপনাকে উড়তে সাহায্য করে, আবার কখনো আপনাকে আক্ষরিক অর্থেই মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। গতকাল রাতে আমাদের ক্ষেত্রে দ্বিতীয়টাই ঘটেছিল।
বারান্দা থেকে আমরা যখন টলমল পায়ে বেডরুমে এসে বিশাল সেই বিছানায় পড়লাম, তখন আমাদের মাথার ভেতর কোনো গভীর রোমান্স কাজ করছিল না। কাজ করছিল এক অদ্ভুত অবসাদ মেশানো ঘুম। অবশ্যই, এক বিছানায় সম্পূর্ণ অনাবৃত দুজন নারী-পুরুষ শুয়ে থাকলে একদম সন্ন্যাসীদের মতো ঘুমিয়ে পড়ে না। আমাদের মধ্যেও কিছু হলো। আমি আনিকাকে জড়িয়ে ধরলাম, উনার ঠোঁটে কিছু এলোমেলো, ক্লান্ত চুমু খেলাম। আমার হাত উনার সেই সুডৌল, ভরাট স্তনের ওপর গিয়ে আশ্রয় নিল। আনিকাও উনার একটা পা আমার কোমরের ওপর তুলে দিয়ে আমাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরলেন। উনার হাত আমার বুকে, পেটে কিছুটা আদর করল। কিন্তু ওই পর্যন্তই। আমাদের শরীর আমাদেরকে খুব কড়া ভাষায় জানিয়ে দিল, "ভাইসব, আজকের মতো কোটা শেষ। এবার দয়া করে ঘুমাও।"
আমরা সেই এলোমেলো, আধা-জাগ্ৰত, আধা-ক্লান্ত অবস্থাতেই একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়লাম। রাত তখন কটা হবে? হয়তো সাড়ে বারোটা কি একটা। সেন্ট্রাল এসির ঠান্ডা বাতাস আর কমফোর্টারের ওম— এই দুইয়ের মাঝখানে আমরা দুজন যেন শীতকালের দুটো সাপের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে গভীর, নিশ্ছিদ্র ঘুমে তলিয়ে গেলাম।
সকালে যখন আমার ঘুম ভাঙল, তখন ঘড়িতে কাঁটায় কাঁটায় আটটা।
আমি আগেই বলেছি, আমার ভেতরের বায়োলজিক্যাল অ্যালার্মটা খুব বেইমান। সে জানে না আমি আজ ধানমন্ডির রাজপ্রাসাদে আছি নাকি মিরপুরের মেসে। সে তার ডিউটি পালন করে আমাকে ঠিক আটটায় জাগিয়ে দিল। আমি চোখ মেলে তাকালাম। আমি আর আনিকা এমন একটা অবস্থায় শুয়ে আছি, যেটা কোনো সভ্য ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন। উনার ডান হাতটা আমার গলার নিচ দিয়ে গিয়ে আমার কাঁধ খামচে ধরে আছে। উনার একটা পা আমার দুই পায়ের মাঝখানে। আমার বাঁ হাতটা উনার কোমরের নিচে চাপা পড়ে অবশ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। উনার ফর্সা, মসৃণ পিঠটা আমার বুকের সাথে একেবারে লেপ্টে আছে। উনার চুলের সেই শ্যাম্পু আর অ্যালকোহল মেশানো একটা অদ্ভুত বুনো গন্ধ আমার নাকের ডগায়।
দৃশ্যটা এতই মায়াবী এবং এতই সুন্দর যে, আমার ইচ্ছে করছিল সময়টাকে এখানেই থামিয়ে দিই। এই নারী, যার রূপের আগুনে আমি গতকাল পুড়ে ছাই হয়েছি, সে এখন একটা ছোট্ট শিশুর মতো আমার বুকে মুখ গুঁজে ঘুমাচ্ছে। কিন্তু আমাকে উঠতে হবে। আমার পঁচিশ হাজার টাকার অনুবাদকের চাকরি আমাকে ডাকছে। আজ অফিসে গিয়ে আমাকে লিভ অ্যাপ্লিকেশনটা ফর্মালি জমা দিতে হবে।
আমি খুব সাবধানে, যেন একটা বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয় করছি, এমন ভঙ্গিতে নিজেকে আনিকার বাঁধন থেকে মুক্ত করতে শুরু করলাম। প্রথমে উনার হাতটা খুব আলতো করে সরিয়ে বালিশের ওপর রাখলাম। তারপর আমার অবশ হয়ে যাওয়া বাঁ হাতটা উনার কোমরের নিচ থেকে টেনে বের করলাম। আনিকা ঘুমের ঘোরেই একটু "উমমম" শব্দ করে পাশ ফিরলেন। কমফোর্টারটা উনার বুক থেকে কোমর পর্যন্ত নেমে গেল। সকালের এই মিষ্টি আলোয় উনার উন্মুক্ত পিঠ এবং নিতম্বের বাঁক দেখে আমার আবার শ্বাস আটকে আসার উপক্রম হলো। আমি খুব দ্রুত চোখ সরিয়ে নিলাম। এখন এইসব দেখার সময় না। এখন দেখলে অফিসে যাওয়া হবে না।
আমি বিছানা থেকে নেমে বাথরুমে গেলাম।