RE: The Barter System (By:andygarfield) -
Bad Boy - 09-02-2026
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ: নিষিদ্ধ মোহনা
১২.১. একটি অনভিপ্রেত বিকেল ও অপরাধবোধের প্রতিধ্বনি
করিডোরের সেই বদ্ধ, আধো-অন্ধকার পরিসরটায় বাতাস যেন জমাট বেঁধে পাথর হয়ে গিয়েছিল। রাহুলের দুটো পা মেঝের মার্বেলের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে সেঁটে আছে, শিরা-উপশিরা বেয়ে নেমে যাচ্ছে এক হিমশীতল স্রোত। বন্ধ বাথরুমের ওপার থেকে ভেসে আসা সেই জলের একটানা ঝমঝম শব্দের আড়ালে, ওর মায়ের—ডক্টর ইন্দিরা সেনের—সেই আদিম, রুদ্ধশ্বাস, এবং আত্মভোলা গোঙানিগুলো ওর মগজের ভেতর একটা প্রলয়ঙ্করী সাইক্লোন তৈরি করছিল।
"উফ্... রাহুল... আহ্... হ্যাঁ... আমার বাবুটা..."
শব্দগুলো কোনো অলীক কল্পনা ছিল না। ওগুলো আছড়ে পড়ছিল ওর কানের পর্দায়, ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছিল ওর উনিশ বছরের সাজানো, শৃঙ্খলাপরায়ণ পৃথিবীটাকে। ওর নিজের নামটা মায়ের ওই চরম তৃষ্ণার্ত, স্খলিত কণ্ঠস্বরে শুনে রাহুলের মনে হলো ওর হৃৎপিণ্ডটা গলার কাছে উঠে এসে সজোরে আছড়ে পড়ছে। এক তীব্র, দমবন্ধ করা অপরাধবোধ, ভয়, আর তার সাথে মিশে থাকা এক ব্যাখ্যাহীন, ঘোর-লাগা উত্তেজনা ওকে পাথরের মূর্তিতে পরিণত করেছিল। ও নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গিয়েছিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে, স্তব্ধতাকে ফালাফালা করে বেজে উঠল কলিং বেল।
‘ডিং-ডং...’
প্রথমবার শব্দটা রাহুলের কানে পৌঁছলই না। ওর চেতনা তখন ওই বন্ধ দরজার ওপারের বাষ্পার্ত, নিষিদ্ধ দুনিয়ায় বন্দি। কয়েক সেকেন্ড পর, আবারও শব্দটা বেজে উঠল, এবার আরও একটু দীর্ঘ, আরও একটু অধৈর্য।
‘ডিং-ডং... ডিং-ডং...’
রাহুলের ঘোর কাটল এক তীব্র বৈদ্যুতিক শকের মতো। ও চমকে উঠে ঘাড় ঘোরাল সিঁড়ির দিকের শূন্যতার দিকে। ওর পুরো শরীরটা একটা অজানা ত্রাসে থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। কে হতে পারে এই সময়ে? ঘড়িতে তো সবে তিনটে বাজে! গঙ্গা মাসি তো আজ আর আসবে না। কোনো পার্সেল? কোনো আত্মীয়?
ও আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। নিজের কাঁপতে থাকা পা দুটোকে কোনোমতে টেনে নিয়ে ও সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। প্রতিটি ধাপে পা ফেলার সময় ওর মনে হচ্ছিল ওর শরীরটা যেন তুলোর মতো হালকা, অথচ মগজটা সীসার মতো ভারী। ওর পরনে সেই তাড়াহুড়ো করে গলানো ছাই রঙের শর্টস আর সাদা টি-শার্ট। নিজের শরীরের ভেতরের সেই সদ্য-সমাপ্ত স্খলনের ক্লান্তি আর শূন্যতাটা তখনও ওকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
নিচে নেমে, সদর দরজার কাছে এসে ও কাঁপা হাতে ছিটকিনিটা নামিয়ে লকটা ঘোরাল। দরজাটা খুলতেই, দুপুরের তপ্ত রোদের হলকা আর বাইরের চড়া আলো ওর চোখে এসে পড়ল। আর সেই আলোর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে রাহুল ভূত দেখার মত থতমত খেয়ে গেল।
সুব্রত সেন। ওর বাবা।
সুব্রতর হাতে তাঁর সেই চিরচেনা চামড়ার ব্যাগ, কপালের দু-পাশে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে, আর চেহারায় এক চরম বিরক্তি আর ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।
রাহুলের মগজটা যেন সম্পূর্ণ ব্ল্যাঙ্ক হয়ে গেল। বাবা? এই সময়ে? বাবার তো রোটারি ক্লাবে থাকার কথা! রাত আটটার আগে তো ফেরার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না! ও প্রায় অস্ফুট, তোতলানো গলায় বিড়বিড় করে উঠল, "বা... বাবা? তুমি... তুমি এত তাড়াতাড়ি?"
সুব্রত কপালের ঘামটা বাঁ হাতের পিঠ দিয়ে মুছে একটা বিরক্তিকর শব্দ করে ভেতরে ঢুকলেন। রাহুলের মুখের ওই পাংশুটে, হতবাক চেহারাটা তাঁর চোখ এড়িয়ে গেল, কারণ তাঁর নিজের মাথার ভেতর তখন অন্য বিরক্তি ঘুরপাক খাচ্ছে।
"আর বলিস না!" সুব্রত ব্যাগটা ড্রয়িংরুমের সেন্টার টেবিলের ওপর একরকম ছুঁড়ে দিয়েই ধপ করে সোফায় বসে পড়লেন। "রোটারি ক্লাব না ছাই! পলিটিক্স করে করেই সব শেষ হয়ে গেল দেশের। আজ আর মিটিং বসলই না।"
রাহুল কোনোমতে দরজার লকটা আটকে দিয়ে বাবার দিকে ঘুরল। ওর বুকটা তখন কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করছে। ও আপ্রাণ চেষ্টা করছে নিজের গলার স্বরটাকে স্বাভাবিক রাখার। "বসল না মানে? দুপুরের পর থেকে তো থাকার কথা ছিল... তুমি তো ওই জন্যই..."
"আরে সে তো ছিল বটেই," সুব্রত নিজের গলার টাইটা একটু আলগা করতে করতে চরম উষ্মার সাথে বললেন। "কিন্তু ক্লাবের ওই যে নতুন সেক্রেটারি হয়েছে—পরিমল, ওই লোকটা পুরো মিটিংটাকে একটা রাজনৈতিক মঞ্চ বানিয়ে ছাড়ল। লাস্ট মোমেন্টে খবর এল, শাসক দলের ওই যে স্থানীয় বিধায়ক, সে নাকি হঠাৎ প্রধান অতিথি হয়ে জাঁকিয়ে বসবে। অথচ আমাদের প্রোগ্রামটা ছিল পুরোপুরি অরাজনৈতিক, একটা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি নিয়ে আলোচনা।"
"তাতে... তাতে কী হলো?" রাহুল যন্ত্রচালিতের মতো প্রশ্ন করল। ওর কান খাড়া হয়ে আছে ওপর তলার দিকে। ওই নিস্তব্ধতার মধ্যে যদি কোনোভাবে মায়ের একটা শব্দ, জলের একটা আওয়াজ নিচে নেমে আসে!
"তাতে কী আর হবে!" সুব্রত সোফার গদিতে পিঠ এলিয়ে দিয়ে পা দুটো ছড়িয়ে দিলেন। "সিনিয়র মেম্বাররা বেঁকে বসল। সোজা বলে দিল, ক্লাবের ফ্লোরে কোনো নেতার দাদাগিরি বা চাটুকারিতা চলবে না। ব্যস, হলের বাইরেই দুই পক্ষের মধ্যে এমন একচোট কথা কাটাকাটি আর সিন ক্রিয়েট শুরু হয়ে গেল যে শেষমেশ আজকের মতো প্রোগ্রামটাই প্যাক-আপ করে দিতে বাধ্য হলো প্রেসিডেন্ট। বুঝলাম ওখানে দাঁড়িয়ে থেকে শুধু শুধু প্রেশার বাড়িয়ে লাভ নেই, তাই সোজা ড্রাইভারকে বললাম গাড়ি ঘুরিয়ে নিতে। জঘন্য একটা দিন।"
সুব্রত কথাগুলো বলতে বলতেই নিজের পায়ের জুতো দুটো খুলতে শুরু করলেন। তারপর একটা গভীর, ক্লান্ত শ্বাস ফেলে ওপরের দিকে তাকালেন।
"যাই, ওপরে গিয়ে আগে একবার গা ধুয়ে একটু রেস্ট নিই। মাথাটা বড্ড ধরেছে এই রোদে আর চেঁচামেচিতে।"
কথাটা শোনার সাথে সাথেই রাহুলের মগজে যেন একটা সাইরেন বেজে উঠল। ওপরে যাবে? বাবা ওপরে যাবে? যদি বাবা সিঁড়ি দিয়ে ওঠে, তাহলে তো সোজা নিজের ঘরের দিকে যাওয়ার জন্য ওই লম্বা করিডোরটা পার হতে হবে। আর ঠিক সেই করিডোরের মাঝখানেই মায়ের বাথরুম। বাথরুমের দরজাটা হয়তো লক করা আছে, কিন্তু বাবা যদি ওই দরজার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মায়ের কোনো... মায়ের কোনো শব্দ শুনে ফেলে? যদি কলিং বেলের আওয়াজ মায়ের কানে না গিয়ে থাকে? যদি মা এখনও...
রাহুলের মেরুদণ্ড দিয়ে এক বরফ-শীতল আতঙ্কের স্রোত নেমে গেল। না, বাবাকে কোনোভাবেই এখন ওপরে যেতে দেওয়া যাবে না। অন্তত আরও পনেরো-কুড়ি মিনিট বাবাকে নিচে আটকে রাখতেই হবে।
সুব্রত সোফা থেকে ওঠার জন্য সদ্য হাতে ভর দিয়েছেন, ঠিক তখনই রাহুল প্রায় মরিয়া হয়ে, নিজের গলার স্বরটাকে একটু চড়িয়ে বলে উঠল, "বাবা! তুমি... তুমি একটু চা খাবে? তোমায় বড্ড টায়ার্ড দেখাচ্ছ... বরং একটু চা হলে..."
সুব্রত থমকে গেলেন। তিনি একটু অবাক হয়ে ছেলের দিকে তাকালেন। "চা? হ্যাঁ, চা একটা হলে মন্দ হতো না। ওই ঝামেলার পর থেকে গলাটা শুকিয়ে আছে।" তিনি আবার সোফায় বসে পড়লেন, কিন্তু পরক্ষণেই তাঁর নজর গেল সিঁড়ির দিকে। "দাঁড়া, তোর মা তো এতক্ষণে ফিরে আসার কথা, তাই না? ও কি ঘরে আছে? দাঁড়া, ডাকছি..."
এই বলে সুব্রত স্বভাববশতই একটু গলা চড়িয়ে ওপরের দিকে তাকিয়ে হাঁক পাড়লেন, "ইন্দিরা?.... শুনছ? আমি চলে এসেছি..."
"না, না, না!" রাহুল প্রায় চিৎকার করে উঠল, ওর দুটো হাত অবচেতনভাবেই সামনের দিকে উঠে এসেছে বাবাকে থামানোর জন্য। "মা... মা ব্যস্ত আছে বাবা! ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরে কীসব ইম্পরট্যান্ট কাজ নিয়ে বসবে বলেছিল, এখন আর ডিসটার্ব করার দরকার নেই। আমি...ইয়ে মানে... আমি করে দিচ্ছি তোমায় চা।"
সুব্রত ভুরু কুঁচকে ছেলের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে এবার স্পষ্ট কৌতূহল এবং এক চিমটে বিস্ময়। রাহুল, যে ছেলে সারাদিন বইয়ে মুখ গুঁজে থাকে, যে নিজের এক গ্লাস জল গড়িয়ে খায় না, সে আজ নিজে থেকে চা বানাতে চাইছে?
"তুই চা বানাবি?" সুব্রতর ঠোঁটের কোণে একটা হালকা, ব্যঙ্গাত্মক হাসি ফুটে উঠল। "তুই জানিস চা বানাতে? কবে শিখলি এইসব?"
রাহুলের হাত-পা তখন আক্ষরিক অর্থেই ঘামছে। ও ঢোক গিলে, কোনোরকমে একটা নার্ভাস হাসি মুখে ফুটিয়ে বলল, "হ্যাঁ... হ্যাঁ, আমি জানি। আমি তো মাকে চা বানাতে দেখেছি অনেকবার... ইটস প্রিটি সিম্পল বাবা, আমি ঠিক পারব।"
সুব্রত একটু হেসে হাত নাড়লেন। "থাক বাবা, তোকে আর ওসব করতে হবে না। ওই দুধ আর জল গুলিয়ে একটা অখাদ্য কিছু বানাবি। তার চেয়ে তুই যা, নিজের হোমওয়ার্ক কর গিয়ে। আমি তোর মাকে ডেকে নিচ্ছি, ও দু-মিনিটে বানিয়ে দেবে।"
"আমি আমার হোমওয়ার্ক সব আগেই করে নিয়েছি," রাহুল এবার একগুঁয়েমির ভান করে বলে উঠল, যেন বাবার এই তাচ্ছিল্য ওর ইগোতে লেগেছে। "তুমি আমাকে একবার সুযোগ তো দাও! আমি প্রমিস করছি, একদম খারাপ হবে না। প্লিজ লেট মি ডু ইট।"
সুব্রত এবার সত্যিই অবাক হলেন। ছেলের এই হঠাৎ জেগে ওঠা গৃহকর্মের শখ তাঁকে বেশ হতবাক করল। তিনি একটু কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন, "কী যে হলো তোর হঠাৎ করে... আচ্ছা ঠিক আছে, কর। বানা তোর চা। বেশি করিস না কিন্তু, আমি কিন্তু ওই মিডিয়াম সাইজের যে কাপটায় নরম্যালি খাই, ওইটারই এক কাপের একটু কম খাবো। "
"শুধু তোমার জন্য কেন, আমি নিজের জন্যও বানাব," রাহুল তড়িঘড়ি বলল, পরিস্থিতিটাকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টায়।
"ঠিক আছে। ওহ এক সেকেন্ড, দেখি তোর মা-ও হয়তো চা খেতে পারে এখন, জিজ্ঞেস করে দেখছি। দাঁড়া..." সুব্রত আবার মুখ খুলতে যাচ্ছিলেন, "ইন্দি—"
"বাবা, বললাম তো মা বড্ড বিজি!" রাহুল মরিয়া হয়ে মাঝপথেই তাঁকে থামিয়ে দিল। ওর মগজ তখন বাঁচার জন্য নতুন একটা মিথ্যের জাল বুনছে। "মা... মা তো অলরেডি আমার হাতের চা খেয়েছে আগে! ওই তো সেদিন, তুমি যখন ছিলে না। মায়ের এখন লাগবে না। মা এখন ফুল কনসেন্ট্রেশন দিয়ে কাজ করছে, এখন ডিস্টার্ব করলে রেগে যাবে। আমি পরে আবার মা কে চা করে খাওয়াব খন।"
রাহুলের এই ডাহা মিথ্যে কথাটা—যে ইন্দিরা ওর হাতের চা খেয়েছে—সুব্রতর কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো। তিনি জানেন, ইন্দিরা কাজের সময় কতটা মুড-সুইং করেন এবং ডিস্টার্বড হতে কতটা অপছন্দ করেন। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোফার গদিতে আরও একটু রিল্যাক্স করে বসে পড়লেন।
"ঠিক আছে, যা। উদ্ধার কর গিয়ে তোর চা নিয়ে। আমি একটু বসছি এখানেই, পেপারটা দেখি।"
রাহুলের বুকের ওপর থেকে যেন এক টন ওজনের একটা পাথর নেমে গেল। ও ঘাড় নেড়ে অত্যন্ত দ্রুতপায়ে রান্নাঘরের দিকে হাঁটা দিল।
রান্নাঘরে ঢুকে ও প্রথমে স্ল্যাবের ওপর দুটো হাত রেখে একটা গভীর, কাঁপানো শ্বাস ফেলল। ওর বুকটা তখনো ধড়ফড় করছে। কিন্তু এখন স্বস্তি পাওয়ার সময় নয়। আসল বিপদ তো সামনে। ও তো জীবনেও চা বানায়নি! চা পাতা কতটা দিতে হয়, চিনি কতটা লাগে, জল কতক্ষন ফোটাতে হয়—এর বিন্দুমাত্র ধারণাও ওর নেই। আর বাবার মতো খুঁতখুঁতে মানুষকে যদি ও এখন একটা অখাদ্য কিছু বানিয়ে দেয়, বাবা সোজা মাকে ডাকতে শুরু করবে।
ওর মনের ভেতর কেমন যেন পাগল পাগল করতে লাগল। হঠাৎ ওর পকেটে থাকা ফোনটার কথা মনে পড়ল। ও দ্রুত ফোনটা বের করে চ্যাটজিপিটি (ChatGPT) অ্যাপটা খুলল। কাঁপাকাঁপা হাতে টাইপ করল: "Give me step-by-step instructions for a first-timer on how to make Indian milk tea. Very simple, proper measurements for two cups. Start from turning on the induction oven."
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই স্ক্রিনে একটা ঝকঝকে, নিখুঁত তালিকা ভেসে উঠল।
রাহুল ফোনটা রান্নাঘরের স্ল্যাবের হেলান দিয়ে রেখে, ঠিক একজন বাধ্য কেমিস্ট্রি ল্যাবের স্টুডেন্টের মতো ইনস্ট্রাকশনগুলো ফলো করতে শুরু করল। প্রথমে ইনডাকশন ওভেনটা অন করল। একটা সসপ্যানে মেপে দেড় কাপ জল বসাল। জলটা সামান্য গরম হতেই, ফোনের নির্দেশমতো দু-চামচ চা-পাতা দিল। জলের রঙটা ধীরে ধীরে কালচে হতে শুরু করল। এরপর চিনি দিল। চা-পাতার সেই বুনো, চেনা গন্ধটা যখন রান্নাঘরে ছড়াতে শুরু করল, রাহুলের মনে হলো ওর নার্ভাসনেসটা কিছুটা হলেও কমছে। সবশেষে একটু দুধ ঢেলে দিল। ফুটন্ত চায়ের রঙটা যখন সেই নিখুঁত বাদামি রঙে পরিণত হলো, ও বুঝল যে এক্সপেরিমেন্ট সাকসেসফুল।
চা-টা ছাঁকনি দিয়ে দুটো সুন্দর চিনামাটির কাপে ঢেলে একটা ট্রে-তে সাজাল ও। ঠিক তখনই ওর নজর গেল কাউন্টারের এক কোণে রাখা এক কাঁদি টাটকা কলাগুলোর দিকে। ওর মনে পড়ে গেল, বাথরুমের সেই চরম উত্তেজক মুহূর্তের পর মা ওকে বলেছিল, "খালি পেটে থাকিস না সোনা... দুটো কলা অন্তত খেয়ে নিস।"
মায়ের কথাগুলো মনে পড়তেই রাহুলের বুকের ভেতরটা একটা অদ্ভুত, তীক্ষ্ণ ব্যথায় আর লজ্জায় মোচড় দিয়ে উঠল। ওই বাথরুম, মায়ের ওই ভেজা নগ্ন শরীর, ওর নিজের সেই অনিয়ন্ত্রিত স্খলন, আর তারপর... মায়ের ওই একাকী, তীব্র গোঙানি। ও দ্রুত মাথা ঝাঁকিয়ে ওই চিন্তাগুলোকে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। এখন এসব ভাবলে চলবে না। ট্রে-টার একপাশে দুটো কলা রেখে ও সোজা ড্রয়িংরুমের দিকে বেরিয়ে এল।
সুব্রত তখন সোফায় হেলান দিয়ে বসে ওইদিনের আনন্দবাজারটা ঘাঁটছিলেন। রাহুল ট্রে-টা সেন্টার টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল।
"এই নাও বাবা, তোমার চা।"
সুব্রত কাগজটা নামিয়ে রেখে একটু সন্দিহান চোখে চায়ের কাপটা তুলে নিলেন। একটা ছোট চুমুক দিলেন। তারপর তাঁর ভুরু দুটো সামান্য ওপরে উঠে গেল।
"অ্যাঁ! খারাপ করিসনি তো! বেশ একটা কড়া টেক্সচার এসছে। আমি তো ভেবেছিলাম তুই পুরো দুধ-জল করে আনবি।" সুব্রত বেশ তৃপ্তির সাথেই আরেকটা চুমুক দিলেন। "ইন্দিরার মতো ওই পারফেক্ট ফ্লেভারটা আসেনি ঠিকই, ও তো আবার একটু আদা-এলাচ দিয়ে বানায়, কিন্তু ফার্স্ট-টাইমার হিসেবে তুই লেটার মার্কস পেলি।"
"থ্যাঙ্কস বাবা," রাহুল নিজের চায়ের কাপটা আর একটা কলা নিয়ে সোফার অন্য প্রান্তে বসল। চা-টা মুখে দিয়ে ও নিজেও বেশ অবাক হলো। সত্যিই খারাপ হয়নি।
তারা দুজনে মুখোমুখি বসে চা খেতে লাগল। সুব্রতর মেজাজ এখন অনেকটাই শান্ত। তিনি রাহুলের পড়াশোনা, সামনের সেমিস্টারের রুটিন, আর ওর কিছু বন্ধুদের কথা জিজ্ঞেস করতে শুরু করলেন। রাহুলও অত্যন্ত মেকানিক্যালি, একদম মুখস্থ করা উত্তরের মতো হ্যাঁ-হুঁ করে জবাব দিয়ে যাচ্ছিল। ওর বাইরের খোলসটা একদম শান্ত, বাধ্য ছেলের মতো, কিন্তু ওর ভেতরের রাডারটা তখনো ওপর তলার সামান্যতম শব্দের দিকে ফোকাস করা।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে, ড্রয়িংরুমের নিস্তব্ধতাকে হালকা ভেদ করে ওপর তলার করিডোর থেকে রাহুলের কানে একটা অত্যন্ত মৃদু, অথচ তীক্ষ্ণ শব্দ ভেসে এল।
'ক্লিক।'
বাথরুমের দরজার লক খোলার শব্দ।
রাহুলের চায়ের কাপ ধরা হাতটা শূন্যে থমকে গেল। ওর হৃৎপিণ্ডটা যেন এক সেকেন্ডের জন্য স্পন্দিত হতে ভুলে গেল।
কয়েক সেকেন্ডের নিস্তব্ধতা। তারপর করিডোরের মেঝেতে হেঁটে যাওয়ার খুব অস্পষ্ট, নরম আওয়াজ। আর ঠিক তার সাত সেকেন্ড পর...
'খট।'
শোবার ঘরের দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ।
রাহুল একটা দীর্ঘ, নিঃশব্দ স্বস্তির শ্বাস ফেলল। ওর পুরো শরীরটা যেন একটা রবারের মতো আলগা হয়ে সোফার ওপর এলিয়ে পড়ল। মা সেফ। মা নিজের ঘরে ঢুকে গেছে। বাবা আর কিচ্ছু জানতে পারবে না। ওর এই ছোট্ট মিথ্যের নাটকটা অন্তত মায়ের ওই চরম ব্যক্তিগত, নিষিদ্ধ মুহূর্তটাকে পৃথিবীর চোখের আড়ালে লুকিয়ে রাখতে পেরেছে।
বাকি চায়ের পর্বটা বড্ড একঘেয়েভাবেই কাটল। সুব্রত তাঁর অফিসের কিছু সমস্যা নিয়ে কথা বলছিলেন, রাহুল শুধু মাঝে মাঝে মাথা নেড়ে সায় দিচ্ছিল। ওর আর কিছুই শোনার বা বোঝার দরকার ছিল না। ওর একমাত্র তৃপ্তি ছিল, বাবা মায়ের ওই প্রাইভেট টাইমটায় কোনো ব্যাঘাত ঘটাতে পারেনি।
দিনের বাকি অংশটা একটা দমবন্ধ করা, থমথমে অস্বস্তির মধ্যে দিয়ে কাটল। রাহুল নিজের ঘর থেকে আর বেরোয়নি।
অবশেষে এল রাতের ডিনারের সময়।
ডাইনিং টেবিলের তিনটে চেয়ারে তিনজন মানুষ বসে আছে। সুব্রত টেবিলের মাথায়, তাঁর ডানদিকে ইন্দিরা, আর বাঁ-দিকে রাহুল। টেবিলে গঙ্গা মাসির সকালে বানিয়ে রাখা রুটি, ডাল, আর চিকেনের একটা লাইট প্রিপারেশন। কিন্তু পরিবেশটা মোটেই লাইট নয়।
রাহুল নিজের প্লেটের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রুটির টুকরোটা ডালের বাটিতে ডোবাচ্ছিল। ওর একবারের জন্যও মায়ের চোখের দিকে তাকানোর সাহস হচ্ছিল না। ওর ভেতরে থাকা সেই অপরাধবোধটা এখন এক বিশাল পাহাড়ে পরিণত হয়েছে।
ইন্দিরা খাচ্ছিলেন খুব ধীরে ধীরে। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন তিনি কোনো দীর্ঘ গভীর ঘুম ভেঙে এইমাত্র উঠেছেন। তাঁর চোখের কোলটা সামান্য ফোলা, গালদুটোয় এক অদ্ভুত ফ্যাকাসে, ক্লান্ত আভা। তাঁর নড়াচড়াগুলো বড্ড ধীর, বড্ড মন্থর। তিনি খাবার খাচ্ছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর মন যেন এই ঘরে নেই, অন্য কোনো এক পরাবাস্তব দুনিয়ায় আটকে আছে।
সুব্রত এই নিস্তব্ধতাটা ভাঙলেন।
"তা, ইন্দিরা, তোমার কাজ তো দেখছি শেষই হচ্ছে না। দুপুরেও তো বেরোলে না ঘর থেকে। এই প্রেশারটা নিলে তোমার শরীর টিকবে কী করে?" সুব্রত একটা রুটির টুকরো মুখে পুরে বললেন।
ইন্দিরা মুখ না তুলেই অত্যন্ত নিচু, শান্ত গলায় বললেন, "কাজ তো করতেই হবে। পেপারটা আজকে না পাঠালে ডেডলাইন মিস হতো। তা... তোমার ক্লাবের মিটিংটা তো ক্যানসেল হলো শুনলাম?"
"হ্যাঁ, আর বোলো না। ওই পলিটিক্যাল গুন্ডাদের জন্য..." সুব্রত আবার তাঁর সেই দুপুরের বিরক্তিটা প্রকাশ করতে লাগলেন।
রাহুল মাথা নিচু করেই খাচ্ছিল। হঠাৎ সুব্রত রাহুলের দিকে ফিরে একটু হাসলেন।
"ওহ, ভালো কথা, ইন্দিরা! তুমি তো জানো না, তোমার ছেলে আজ আমাকে বেশ সারপ্রাইজ দিয়েছে।"
ইন্দিরা এবার মুখ তুলে সুব্রতর দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে এক ক্লান্ত জিজ্ঞাসা। "সারপ্রাইজ?"
"আমি দুপুরে ফিরে এসে যখন বললাম চা খাব, ও বলল ও নাকি বানিয়ে দেবে। আমি তো অবাক! জীবনে যে ছেলে এক গ্লাস জল গড়িয়ে খায় না, সে বানাবে চা! কিন্তু বিশ্বাস করো, চা-টা বেশ ভালোই বানিয়েছিল। ও আমাকে বলল যে ও নাকি তোমাকে চা বানাতে দেখে দেখেই শিখে গেছে। তুমিই নাকি ওকে শিখিয়েছ পরোক্ষে। আর তোমাকেও নাকি চা খাইয়েছিল আগে এক দিন। ওর কিন্তু এ-বিষয়েও ট্যালেন্ট আছে।" সুব্রত বেশ গর্বিত ভঙ্গিতেই কথাটা বললেন।
টেবিলের ওপর মুহূর্তের জন্য একটা পিনপতন নিস্তব্ধতা নেমে এল।
ইন্দিরা প্রথম কয়েক সেকেন্ড সুব্রতর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর চোখের দৃষ্টিটা শূন্য। তারপর খুব ধীরে ধীরে, হালকা হেসে বললেন, "বেশ, ভালো কথা।" কিন্তু তাঁর সেই প্রখর, বুদ্ধিজীবী মগজটা তখন ইতিমধ্যেই এই ছোট্ট, আপাত-নিরীহ তথ্যটাকে প্রসেস করতে শুরু করে দিয়েছে।
রাহুল চা বানিয়েছে? দুপুরে সুব্রত ফেরার পর?
ইন্দিরা খুব ভালো করেই জানেন, তিনি তাঁর উনিশ বছরের ছেলেকে জীবনে কোনোদিন চা বানানো শেখাননি। এমনকি রাহুল তাঁর রান্না দেখতে বা শিখতে কোনোরকম আগ্রহও কোনোদিন দেখায়নি। তাহলে রাহুল সুব্রতকে এই ডাহা মিথ্যে কথাটা কেন বলল?
হিসেবটা মেলাতে ইন্দিরার মগজে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল।
সুব্রত দুপুরে ফিরেছিল। সুব্রত নিশ্চয়ই ওপরে আসতে চেয়েছিল। আর রাহুল... রাহুল নিজের বাবাকে আটকে রাখার জন্য, তাঁকে নিচে বসিয়ে রাখার জন্য এই মিথ্যে চা বানানোর নাটকটা করেছে। কেন করেছে?
কারণ... কারণ ওই সময়ে ইন্দিরা বাথরুমের ভেতরে ছিলেন।
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই, ইন্দিরার ফর্সা মুখমণ্ডলটা এক লহমায় টকটকে লাল হয়ে উঠল। তাঁর চোখের তারা দুটো আতঙ্কে, আর এক চরম, অবর্ণনীয় লজ্জায় প্রসারিত হয়ে গেল। তাঁর হাতের চামচটা প্লেটের ওপর একটা মৃদু 'ঠং' শব্দ করে খসে পড়ল।
তাঁর মনে পড়ে গেল ওই দুপুরের কথা। ইন্দিরা বুঝতে পারলেন। তিনি সবটা বুঝতে পারলেন।
রাহুল জানত তিনি বাথরুমের ভেতরে আছেন। রাহুল জানত সুব্রত ওপরে গেলে সব শেষ হয়ে যাবে। তার মানে... রাহুল ওই বাথরুমের দরজার ঠিক বাইরেই ছিল। রাহুল তাঁর ওই গোঙানি শুনেছে। রাহুল তাঁর ওই নাম ধরে ডাকাটা শুনেছে। রাহুল সবটা... সবটা জানে।
এই চরম, হিমশীতল সত্যটা ইন্দিরার মগজে আছড়ে পড়তেই তাঁর মনে হলো কেউ যেন তাঁর গলাটা শক্ত করে চেপে ধরেছে। লজ্জায়, ঘৃণায়, আর এক গভীর ত্রাসে তাঁর মাথাটা আপনাআপনি বুকের কাছে নেমে এল। তিনি আর এক মুহূর্তের জন্যও মাথা তুলে সুব্রত বা রাহুলের দিকে তাকাতে পারলেন না।
"হ্যাঁ... মানে..." ইন্দিরা অত্যন্ত তোতলানো, ফিসফিস করা গলায় কোনোমতে বললেন, তাঁর চোখদুটো প্লেটের ওপর স্থির, "ও তো... ও তো সব দেখেই শেখে... ও খুব... স্মার্ট ছেলে..."
সুব্রত এই অস্বাভাবিকতাটা খেয়াল করলেন না। তিনি নিজের খাওয়া আর বকবক কন্টিনিউ করলেন।
কিন্তু রাহুল বুঝতে পারল। মায়ের ওই চামচ পড়ে যাওয়া, ওই মুখ লাল হয়ে যাওয়া, আর ওইভাবে মাথা নিচু করে নেওয়া—রাহুল খুব ভালো করেই বুঝতে পারল যে মা সমীকরণটা মিলিয়ে ফেলেছে। মা জেনে গেছে যে রাহুল সব শুনেছে।
রাহুলের নিজেরও মনে হলো ওর যেন এখনই মাটি ফুঁড়ে ঢুকে যেতে ইচ্ছে করছে। ও আর একটা দানাও মুখে তুলতে পারল না। কোনোমতে হাতের রুটির টুকরোটা শেষ করে ও উঠে দাঁড়াল।
"আমার... আমার খাওয়া হয়ে গেছে বাবা। আমি শুতে যাচ্ছি। গুডনাইট মা... গুডনাইট বাবা।"
ইন্দিরা মাথা তুলেও দেখলেন না। শুধু একটা অস্ফুট শব্দ করলেন। রাহুল প্রায় ছুটে ডাইনিং রুম থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
রাহুল নিজের ঘরের দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়ে সোজাসুজি বিছানায় গিয়ে আছড়ে পড়ল। ঘরের আলোটা জ্বালানোরও প্রয়োজন বোধ করল না ও। শুধু রাস্তার স্ট্রিট ল্যাম্পের হলুদ আলোটা জানলা দিয়ে এসে বিছানার এক কোণে পড়েছে।
ও একটা সাইড-বালিশ শক্ত করে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরল। ওর বুকের ভেতরটা তখন একটা কুরুক্ষেত্র। অপরাধবোধ, আত্মগ্লানি, আর এক ব্যাখ্যাহীন আদিম সুখ—এই তিনটে জিনিস ওর মগজকে ফালাফালা করে দিচ্ছিল।
ও একজন খারাপ ছেলে। ও একটা জঘন্য, নোংরা ছেলে। এই কথাটা ওর মনের ভেতর হাতুড়ির মতো বাজতে লাগল। মা ওকে এত ভালোবাসে, ওকে নিজের বুকে জায়গা দিয়েছে, ওকে নিজের ছোটবেলার স্মৃতিগুলো ফিরিয়ে দিতে চেয়েছে, আর ও কী করল? ও নিজের শরীরের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। ওর এই উনিশ বছরের অবাধ্য শরীরটা মায়ের ওই পবিত্র, স্নেহমাখা ছোঁয়ার মর্যাদা রাখতে পারল না। ওই বাথরুমের ভেতরে, মায়ের ওই নরম হাতের তালুতে ওর যে বিস্ফোরণটা ঘটেছিল, সেটা তো কোনোভাবেই হওয়ার কথা ছিল না! ও কেন আটকাতে পারল না নিজেকে? মায়ের ওই ফর্সা, সুন্দর হাতের ও পেটের ওপর ওর শরীরের ওই নোংরা, আঠালো জিনিসটা ছিটকে পড়ার দৃশ্যটা ওর চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠতে লাগল।
লজ্জায় রাহুলের চোখ থেকে জল বেরিয়ে এল। ও বালিশের কভারে মুখ গুঁজে ডুকরে কেঁদে উঠল। ও মায়ের ভালোবাসার অপব্যবহার করেছে। মায়ের বিশ্বাস ভেঙেছে ও। মা কি ওকে ঘেন্না করছে এখন?
কিন্তু... কিন্তু পরক্ষণেই ওর মগজের অন্য একটা অন্ধকার, অবদমিত কোণ থেকে একটা অন্য স্বর ভেসে এল।
'কিন্তু তোর তো ভালো লেগেছিল, রাহুল...'
হ্যাঁ, লেগেছিল। ওর মনে পড়ল, যখন মায়ের আঙুলগুলো ওর শরীরে ওই চরম ম্যাজিকটা তৈরি করছিল, তখন ওর মনে হয়েছিল ও যেন স্বর্গে পৌঁছে গেছে। ওর মনে হয়েছিল, পৃথিবীর আর কেউ ওকে এতটা ভালোবাসতে পারে না, এতটা তৃপ্তি দিতে পারে না। ওই চরম মুহূর্তে ওর মায়ের প্রতি যে তীব্র, উদ্দাম ভালোবাসা জন্মেছিল, তা কোনো সাধারণ সম্পর্কের গণ্ডিতে বাঁধা যায় না।
কিন্তু এই চিন্তাটাই ওকে আরও বেশি আতঙ্কিত করে তুলল। না, না! এটা ঠিক নয়! এটা নরমাল নয়! একজন ছেলের তার মায়ের সামনে এভাবে... এভাবে উত্তেজিত হওয়াটা সম্পূর্ণ পাপ! এটা বিকৃতি! ও কি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছে? ভগবান, ও কী করে ফেলল! রাহুল বালিশটাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
ঠিক একই সময়ে, লম্বা করিডোরের একদম অন্য প্রান্তে, ইন্দিরার ঘরের পরিবেশটাও ছিল এক চরম মনস্তাত্ত্বিক কুরুক্ষেত্র।
সুব্রত তখন নিচে বসে টিভিতে নিউজ দেখছেন, ওপরে আসতে তাঁর আরও অন্তত আধ ঘণ্টা দেরি হবে। ঘরের সমস্ত আলো নেভানো। ইন্দিরা নিচের তলার সব কাজ সেরে এসে বিছানায় শুয়ে আছেন, তাঁর চোখদুটো খোলা, আর সেই চোখ দিয়ে অনর্গল, নিঃশব্দে জলের ধারা গড়িয়ে পড়ছে কানের পাশ দিয়ে।
অপরাধবোধ। এক ভয়ংকর, সর্বগ্রাসী অপরাধবোধ তাঁকে কুরে কুরে খাচ্ছিল।
তিনি কী করেছেন আজ দুপুরে? বাথরুমের ওই বদ্ধ দরজার আড়ালে তিনি ঠিক কী করেছেন?
ইন্দিরার মনে পড়ে গেল সেই চরম মুহূর্তের কথা। হাতের ফর্সা মুঠোয় যখন তিনি রাহুলের সেই অমূল্য সম্পদটিকে তার সম্পূর্ণ, দৃঢ় এবং স্পন্দনশীল রূপে ধারণ করেছিলেন, তখন এক বাঁধভাঙা, অনন্ত ভালোবাসায় তাঁর বুকটা যেন কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উথলে উঠেছিল। এক অদ্ভুত বিস্ময় আর নিবিড় মমতায় তাঁর মন বারবার ফিসফিস করে বলছিল—তাঁর ছোট্ট সোনাটা আজ সত্যিই কত বড় হয়ে গেছে! তারপর, রাহুল যখন বাথরুম থেকে বেরিয়ে গেল, যখন ওর ওই চরম স্খলনের উষ্ণতাটা তাঁর পেটের ত্বকে তখনও লেগে ছিল, তখন তাঁর ভেতরে যেন একটা ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি সজোরে ফেটে পড়েছিল। তাঁর মনে হয়েছিল, ওই মুহূর্তে তাঁর নারীসত্তা এবং মাতৃসত্তা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। তাঁর মনে হয়েছিল, ছেলের ওই চরম সমর্পণটাই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য, সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আর সেই ঘোরের বশেই... সেই আদিম, পাগলপারা ভালোবাসার ঘোরেই তিনি নিজের শরীরে হাত দিয়েছিলেন। তিনি নিজের শরীরকে তৃপ্তি দিয়েছিলেন, আর সেই তৃপ্তির চরম সীমায় পৌঁছে তিনি তাঁর নিজের সন্তানের নাম ধরে আর্তনাদ করেছিলেন।
তখন... ঠিক ওই মুহূর্তে... জিনিসটাকে একটুও ভুল মনে হয়নি। মনে হয়েছিল, এটাই তো স্বাভাবিক! এটাই তো মাতৃত্বের আর প্রেমের এক চরম, অলৌকিক মাত্রা! ওর প্রতি তাঁর যে তীব্র টান, সেটাকে এক্সপ্রেস করার আর কোনো উপায় তাঁর শরীর খুঁজে পায়নি।
কিন্তু এখন, এই রাতের অন্ধকারে, যুক্তিবাদী, প্রাজ্ঞ ডক্টর ইন্দিরা সেনের মনে হলো, তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে জঘন্য, সবচেয়ে চরিত্রহীনা নারী।
"আমি কী করে পারলাম..." ইন্দিরা অন্ধকারে ফিসফিস করে ফুঁপিয়ে উঠলেন, নিজের হাতদুটো দিয়ে নিজের মুখটা ঢেকে ফেললেন তিনি। "ওটা... ওটা আমার ছোট্ট ছেলে... আমার নিজের নাড়ি-ছেঁড়া ধন... আর আমি জাস্ট... আমি ওর কথা ভেবে..."
তিনি নিজের চিন্তাকেও একটা রূপ দিতে পারছিলেন না আত্মগ্লানিতে। একজন মা হয়ে তিনি এমন একটা নোংরা কাজ করেছেন! তিনি একটা খারাপ মা। তাঁর ওই পিএইচডি ডিগ্রি, ইউনিভার্সিটির সম্মান, সমাজের চোখে তাঁর ওই আভিজাত্যের মুখোশ—সবকিছু তাঁর কাছে এখন একতাল আবর্জনার মতো মনে হচ্ছিল।
আর তার চেয়েও বড় ভয়ংকর সত্যিটা হলো... রাহুল সব শুনেছে।
ইন্দিরার সারা শরীর একটা তীব্র আতঙ্কে শিউরে উঠল। ছেলেটা ওই দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ওর মায়ের ওই জঘন্য রূপটা টের পেয়েছে। ও কি ট্রমাটাইজড হয়ে গেছে? ও কি ওর মাকে এখন ঘেন্না করছে? তিনি কি নিজের ছেলের জীবনটা চিরকালের মতো শেষ করে দিলেন?
একটা দীর্ঘ, অন্ধকার করিডোর। তার দুই প্রান্তে দুটো আলাদা ঘর। আর সেই দুটো ঘরে, দুটো আত্মা, যারা একে অপরকে পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসে, তারা আজ রাতের এই নিস্তব্ধতায় এক ব্যাখ্যাহীন, নিষিদ্ধ, এবং চরম অপরাধবোধের দহনে নিঃশব্দে কেঁদে চলল। তাদের এই কান্নার কোনো ভাষা ছিল না, কোনো সান্ত্বনা ছিল না, ছিল কেবল এক ভাঙা, ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ের হাহাকার।
(continued in the next post...)
RE: The Barter System (By:andygarfield) -
Bad Boy - 09-02-2026
(continuation of Chapter 12....)
১২.২. দূরত্বের দহন এবং এক অমৃত-সন্ধান
বৃহস্পতিবারের সকালটা শুরু হয়েছিল এক অদ্ভুত, দমবন্ধ করা শূন্যতা নিয়ে। বাইরের কলকাতায় এপ্রিলের চড়া রোদ পিচগলা রাস্তায় আগুন ঝরাচ্ছে, গাড়ির হর্ন আর লোকজনের কোলাহলে মহানগরী তার চেনা ছন্দে ছুটছে। কিন্তু এই বিস্তীর্ণ জনসমুদ্রের মাঝেও দুটো আলাদা জায়গায়, দুটো মানুষের ভেতরের পৃথিবীটা যেন থমকে বরফ হয়ে আছে।
কলেজের কেমিস্ট্রি ক্লাসরুমে জানলার ধারের বেঞ্চটায় বসে আছে রাহুল। প্রফেসরের একটানা, একঘেয়ে লেকচার আর হোয়াইটবোর্ডে খসখস করে মার্কার চলার শব্দ ওর কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। ওর মগজে কিছুই ঢুকছে না। গতকাল রাতের সেই ভয়াবহ, হিমশীতল অপরাধবোধ এখন একটা নির্দিষ্ট সম্পৃক্ত বিন্দুতে পৌঁছে থিতু হয়ে গেছে। আত্মগ্লানির সেই তীক্ষ্ণ দহনটা একটু প্রশমিত হলেও, তার জায়গা নিয়েছে এক সম্পূর্ণ নতুন, সর্বগ্রাসী অনুভূতি—এক তীব্র, বুক-কাঁপানো শূন্যতা।
ও মাকে কাছে পাচ্ছে না।
আজ সকালে ব্রেকফাস্ট টেবিলে ও মায়ের চোখের দিকে তাকাতেই পারেনি। মাথা নিচু করে দুটো রুটি গিলে কোনোমতে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে পালিয়ে এসেছে। কিন্তু এখন, এই কোলাহলমুখর ক্লাসরুমে বসে ওর মনে হচ্ছে, ওর বুকের ভেতর থেকে কেউ যেন ওর প্রাণভোমরাটা কেড়ে নিয়েছে। ওর শুধু মায়ের কথা মনে পড়ছে। ডক্টর ইন্দিরা সেন—ওর মা, ওর আশ্রয়, ওর পৃথিবী। এই ব্রহ্মাণ্ডে মায়ের মতো কেউ নেই, কেউ হতেও পারে না। ওর হৃদয়ের প্রতিটি কোণ, প্রতিটি স্পন্দন শুধু ওই একজন মানুষের জন্যই সংরক্ষিত। আর সেই মানুষটার প্রতি ওর যে অগাধ, সীমাহীন ভালোবাসা, তা প্রকাশের কোনো ভাষা ওর জানা নেই। অথচ, গত বিকেলের ওই ঘটনার পর থেকে মা আর ছেলের মাঝখানে যে একটা অদৃশ্য, কাঁচের দেওয়াল উঠে গেছে, সেটা রাহুলকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছিল। চব্বিশ ঘণ্টাও পেরোয়নি, অথচ ওর মনে হচ্ছে যেন যুগ যুগ ধরে ও মাতৃস্নেহ থেকে বিচ্ছিন্ন। এই দূরত্ব ওকে পাগল করে দিচ্ছিল, ফ্রাস্ট্রেটেড করে দিচ্ছিল। কিন্তু একই সাথে, ওর ভেতরের সেই লজ্জার কাঁটাটা ওকে বারবার বিদ্ধ করছিল। মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর, স্বাভাবিকভাবে কথা বলার বিন্দুমাত্র সাহস ওর নেই।
দীর্ঘক্ষণ নিজের ভেতরের এই কুরুক্ষেত্রে লড়াই করার পর, রাহুল আর পারল না। প্যান্টের পকেট থেকে খুব সন্তর্পণে ফোনটা বের করল ও। হোয়াটসঅ্যাপে মায়ের নামের চ্যাটবক্সটা খুলল। আঙুলগুলো কাঁপছে ওর। দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে, মাত্র কয়েকটা শব্দ ও টাইপ করল:
"Maa, I am sorry."
মেসেজটা সেন্ড করেই ও ফোনটা উলটে বেঞ্চের ওপর রেখে দিল। বুকের ভেতরটা তখন হাতুড়ির মতো পিটছে।
অন্যদিকে, ইউনিভার্সিটির ইতিহাস বিভাগের হেড-অফ-দ্য-ডিপার্টমেন্টের নিজস্ব, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত চেম্বারে বসে আছেন ডক্টর ইন্দিরা সেন। আজ তাঁর কোনো লেকচার নেই। টেবিলের ওপর ডেস্কটপ খোলা, স্ক্রিনে বেশ কয়েকটা আনরিড ইমেইল আর আগামী সপ্তাহের সেমিনারের শিডিউল জ্বলজ্বল করছে। কিন্তু তাঁর ওই প্রখর, শৃঙ্খলাপরায়ণ মগজ আজ তাঁর বিন্দুমাত্র নির্দেশ মানছে না। ইউনিভার্সিটির এই নিভৃত, শান্ত চেম্বারে বসে তাঁর মন আজ বড্ড বেশি অস্থির, যা তাঁর স্বভাবের সম্পূর্ণ বিপরীত।
রাহুলের মতোই তাঁর ভেতরের সেই আত্মগ্লানি আর লজ্জার ঝড়টা এখন কিছুটা শান্ত হয়েছে। কিন্তু তার জায়গায় যে অনুভূতিটা তাঁকে গ্রাস করেছে, তা আরও অনেক বেশি গভীর, অনেক বেশি যন্ত্রণাদায়ক। তিনি তাঁর সোনা ছেলেটাকে বড্ড মিস করছেন।
অবশ্যই একজন মা তার সন্তানকে ভালোবাসবে, এতে তো কোনো প্রশ্নই নেই। কিন্তু গত বিকেল থেকে ছেলের সাথে এই যে মানসিক দূরত্ব, ওকে বুকে টেনে নিতে না পারার এই যে অব্যক্ত যন্ত্রণা—তা ইন্দিরার হৃদয়কে ফালাফালা করে দিচ্ছিল। তাঁর মতো একজন প্রাজ্ঞ, যুক্তিবাদী, বুদ্ধিজীবী নারীর কাছেও এই অদ্ভুত, আদিম অনুভূতির কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা নেই। তিনি বারবার স্ক্রিনের ইমেইলগুলোতে ফোকাস করার চেষ্টা করছেন, আর বারবার রাহুলের সেই নিষ্পাপ মুখটা, ওর ওই মিষ্টি, চপল হাসিটা তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠছে।
তিনি ভাবছেন। গভীরভাবে, তলিয়ে ভাবছেন।
ছেলেটা আজ সকালে কেমন মাথা নিচু করে খেয়ে বেরিয়ে গেল! ওর মনের ভেতর এখন কী চলছে, তা তো তিনি খুব ভালো করেই জানেন। ছেলেটা নিশ্চয়ই এখন চরম লজ্জায়, চরম অনুশোচনায় কুঁকড়ে আছে। ও ভাবছে ও বোধহয় ওর মায়ের সামনে এক চরম জঘন্য কাজ করে ফেলেছে। বেচারা হয়তো এখন একাকীত্বে ভুগছে, যার সাথে কথা বলার, যার মনের কথা শোনার কেউ নেই। ইন্দিরা তো খুব ভালো করেই জানেন, মা-ই রাহুলের সব। আর একজন মা হয়ে, তিনি কীভাবে নিজের ছেলেকে এই চরম বিষণ্ণতায় ডুবিয়ে রাখতে পারেন?
তাছাড়া, কাল যা হয়েছে, সেটা তো তাঁর নিজেরই প্রশ্রয়ে হয়েছে, তাই না? তিনি তো নিজেই... তিনি নিজেই তো নিজের ফর্সা হাতের মুঠোয় ছেলের ওই অমূল্য, স্পন্দনশীল সম্পদটাকে ধারণ করেছিলেন। তিনি নিজেই তো নিজের নরম আঙুল দিয়ে ওর শরীরে সেই ম্যাজিকটা তৈরি করেছিলেন, যতক্ষণ না পর্যন্ত ওই তীব্র, তপ্ত বিস্ফোরণটা তাঁর নিজের শরীরের ওপর আছড়ে পড়ে।
ইন্দিরা চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজলেন। তাঁর মগজ এক জটিল, মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের গভীরে তলিয়ে গেল। ওই যে উষ্ণ, ঘন, আঠালো স্রোতটা... ওই যে ছেলের শরীর থেকে নিঃসৃত হওয়া অমৃতধারা... ওটা তো আসলে ওর ভেতরের পুঞ্জীভূত ভালোবাসারই এক পরম, নির্ভেজাল প্রকাশ। হ্যাঁ, ওটা ভালোবাসাই ছিল। সম্ভবত ভালোবাসার সবচেয়ে আদিম, সবচেয়ে খাঁটি রূপ। ওই অমৃত, ওই অমেয় প্রেম তো তাঁর ছেলেটার শরীরের গভীরে তাঁর জন্যই সঞ্চিত ছিল! আর গতকাল বাথরুমের সেই বদ্ধ, নিভৃত পরিসরে, হয়তো সেটাই ছিল সেই সঞ্চিত অমৃতের আত্মপ্রকাশের সঠিক সময়। আর তার পরে... রাহুল বাথরুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর... বাথরুমের ওই একাকীত্বে তাঁর নিজের সাথে যা ঘটেছিল, সেটাও তো একই মুদ্রার অন্য পিঠ, তাই না? তাঁর নিজের নারীশরীরের গভীর থেকে উঠে আসা সেই চরম তৃপ্তির অমৃত... সেটাও তো ওই ছেলেটার জন্যই সঞ্চিত ছিল। হয়তো ওটাই ছিল সেই চরম সমর্পণের নির্দিষ্ট মুহূর্ত।
তিনি অদৃষ্টে বিশ্বাস করেন, কপালের লিখনে বিশ্বাস করেন। এই যে দুটো মানুষের শরীর আর মন এইভাবে সমস্ত সামাজিক বেড়াজাল ভেঙে একাকার হয়ে যাচ্ছে, এটা তো নিয়তি ছাড়া আর কিছুই নয়!
এই ভাবনাগুলো যত তাঁর মগজে দানা বাঁধতে লাগল, তাঁর ভেতরের সেই অপরাধবোধের জালটা আস্তে আস্তে সরে গিয়ে সেখানে এক পরম, নিঃশর্ত মাতৃত্ব আর তীব্র ভালোবাসার জন্ম দিল। তাঁর শুধু মনে হতে লাগল, কখন তিনি বাড়ি ফিরবেন, কখন তাঁর ছেলেটাকে বুকে জড়িয়ে ধরবেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে তাঁর ল্যাপটপের পাশে রাখা ফোনটা একটা মৃদু কম্পনে জানান দিল। হোয়াটসঅ্যাপ নোটিফিকেশন।
স্ক্রিনে রাহুলের নাম।
"Maa, I am sorry."
মেসেজটা পড়ামাত্র ইন্দিরার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। তাঁর নাড়ি ছিঁড়ে যাওয়ার মতো একটা কষ্ট হলো। তিনি যা ভয় পাচ্ছিলেন, ঠিক তাই। তাঁর বাবুসোনাটা সত্যিই প্রচন্ড ভেঙে পড়েছে। তাঁর খুব ইচ্ছে করছিল অনেক কিছু টাইপ করে পাঠাতে, ওকে শান্ত করতে। কিন্তু তিনি পারলেন না। এই কথাগুলো চ্যাটে বলা যায় না। রাহুল তো এখন কলেজে, ছেলেটা বাড়ি ফিরলে ওকে বুকে নিয়ে সব বলতে হবে।
তিনি ফোনটা নামিয়ে রেখে ডেস্কটপের স্ক্রিনের দিকে তাকালেন। নাহ্, আজ আর কোনো কাজ তাঁর দ্বারা হবে না। একটুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকার পর, তিনি এক ঝটকায় কম্পিউটারটা শাট ডাউন করে দিলেন। ব্যাগ গুছিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠলেন। আজ তিনি তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরবেন। বাড়ি ফিরে নিজের হাতে রাহুলের জন্য ওর সবচেয়ে প্রিয় রান্নাটা করবেন—চিকেন কোরমা। মায়ের হাতের চিকেন কোরমা খেলে ছেলেটার মন এমনিতেই অর্ধেক ভালো হয়ে যাবে।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল।
রাহুল ক্লান্ত পায়ে নিজের ফ্ল্যাটের সদর দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। পকেট থেকে চাবি বের করে লকে ঘোরাতে যাবে, তখনই ওর নাকে একটা খুব চেনা, অত্যন্ত সুস্বাদু গন্ধ এসে ধাক্কা দিল। পেঁয়াজ বেরেস্তা, ঘি, আর গরম মশলার এক তীব্র, মোহনীয় সুবাস।
দরজাটা খুলতেই ও দেখল ড্রয়িংরুম আর ডাইনিং স্পেসটা ফাঁকা, কিন্তু রান্নাঘরের ভেতর আলো জ্বলছে। আর সেই আলোর নিচে দাঁড়িয়ে আছেন ওর মা।
রাহুলের মগজটা যেন এক লহমায় একটা টাইম মেশিনে চড়ে বেশ কয়েকটা দিন পিছিয়ে গেল। ঠিক এইরকমই একটা বিকেল ছিল। ঠিক এভাবেই ও কলেজ থেকে ফিরে দেখেছিল মা আজ তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে এসেছে। সেদিন... সেদিন ও নিজের ব্যাগটা নামিয়ে রেখে, সোজা রান্নাঘরে গিয়ে পেছন থেকে মাকে দু-হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরেছিল। চমকে উঠে মা বলেছিল, "ওহ্ রাহুল! কী হচ্ছে কী? ভয় পাইয়ে দিয়েছিলি তো!"
সেদিনের সেই প্রতিটা মুহূর্ত, প্রতিটা কথা, সেই প্রথম বার্টার সিস্টেমের প্রস্তাব—সবকিছু যেন ওর চোখের সামনে একটা সিনেমার দৃশ্যের মতো ভাসতে শুরু করল।
কিন্তু আজ... আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। আজ ও চাইলেও ওইভাবে পেছন থেকে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরতে পারবে না। ওর বুকের ভেতরটা হাহাকার করছে মায়ের একটু ছোঁয়া পাওয়ার জন্য, কিন্তু ওর পা দুটো যেন মেঝের সাথে আটকে আছে। ওই চরম লজ্জার স্মৃতি, ওই অপরাধবোধ ওকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে।
রাহুল খুব ধীর, নিস্তব্ধ পায়ে ড্রয়িংরুমের সোফার ওপর নিজের ব্যাগটা নামিয়ে রাখল। তারপর অত্যন্ত সন্তর্পণে, প্রায় চোরের মতো রান্নাঘরের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
"মা... তুমি আজ তাড়াতাড়ি চলে এসেছ," ওর গলার স্বরটা বড্ড নিচু, বড্ড মিনমিনে শোনাল।
ইন্দিরা খুন্তি নাড়া থামিয়ে ওর দিকে ফিরলেন। তাঁর ফর্সা মুখে এক পরম স্নিগ্ধ, মাতৃত্বের লাবণ্য মাখানো হাসি।
"হ্যাঁ সোনা, আজ আর ইউনিভার্সিটিতে কোনো ক্লাস ছিল না। তাই ভাবলাম তাড়াতাড়ি ফিরে আমার বাবুটার জন্য ওর ফেভারিট চিকেন কোরমাটা বানিয়ে ফেলি।"
রাহুল মায়ের চোখের দিকে তাকাতে পারল না। ও দৃষ্টিটা মেঝের দিকে নামিয়ে নিয়ে একটা ম্লান, অর্ধেক হাসি হাসল। ঘাড়টা সামান্য নেড়ে বলল, "গন্ধটা... গন্ধটা খুব সুন্দর বেরোচ্ছে, মা।"
এর বেশি আর একটা কথাও ওর মুখ থেকে বেরোলো না। ও ধীর পায়ে ঘুরে দাঁড়াল নিজের ঘরের দিকে চলে যাওয়ার জন্য।
"রাহুল, দাঁড়া।"
ইন্দিরার গলাটা খুব শান্ত, কিন্তু তার মধ্যে এক অমোঘ নির্দেশ ছিল।
রাহুল থমকে দাঁড়াল। তারপর খুব ধীরে ধীরে মায়ের দিকে আবার ঘুরল।
ইন্দিরা রান্নাঘরের কাউন্টারে খুন্তিটা নামিয়ে রাখলেন। তারপর অত্যন্ত ধীর, স্থির পায়ে এগিয়ে এলেন ওর দিকে। "আমি তোর মেসেজটা দেখেছি, সোনা।"
রাহুলের বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করে উঠল। ও কী বলবে বুঝতে পারল না। শুধু বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল।
ইন্দিরা ওর একদম সামনে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর কণ্ঠস্বর এখন এক নিবিড়, উষ্ণ প্রলেপের মতো নরম। "কী হয়েছে, সোনা? তুই ওই মেসেজটা কেন করলি?"
রাহুল একটু আমতা আমতা করে, অস্পষ্ট তোতলানো গলায় বিড়বিড় করল, "ওহ্... না মানে... কিছু না মা, ওসব বাদ দাও... নেভারমাইন্ড..."
ইন্দিরা নিজের ডান হাতটা তুলে রাহুলের বাঁ কাঁধের ওপর আলতো করে রাখলেন। তাঁর আঙুলের ওই সামান্য স্পর্শেই রাহুলের সারা শরীরে একটা শিহরণ খেলে গেল।
"না, তোকে বলতেই হবে," ইন্দিরার গলার স্বরে এক অসীম প্রশ্রয়। "তুই কেন মেসেজটা পাঠালি? তুই কিসের জন্য সরি বলছিস? আমাকে বল সোনা, তুই তো জানিস তোকে এমন মুখ গোমড়া করে থাকতে দেখলে মায়ের বুকের ভেতরটা কেমন ফেটে যায়।"
রাহুল মুখটা আরও নিচু করে নিল। ওর পক্ষে শব্দগুলো উচ্চারণ করা যেন পাহাড় ঠেলার মতো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
ইন্দিরা এবার ওর আরেকটা কাঁধের ওপরও নিজের অন্য হাতটা রাখলেন। গলার স্বরটা এক খাদে নামিয়ে, একদম ফিসফিস করে বললেন, "সোনা... কিসে তোর এত মন খারাপ? তোকে এত বিষণ্ণ দেখাচ্ছে কেন রে বাবু?"
রাহুল তবু চুপ।
"সোনা..." ইন্দিরা ওর কাঁধদুটোয় একটু আদুরে চাপ দিয়ে বললেন, "আমি তোকে কাল ওই সময়েও বলেছিলাম... আমি তোকে আজ আবার বলছি... ইটস ওকে... এটা পারফেক্টলি ওকে। তুই যা ভেবে কষ্ট পাচ্ছিস, সেটার জন্য মায়ের মনে বিন্দুমাত্র কোনো রাগ বা বিরক্তি নেই।"
রাহুল একটু অবাক হয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকাল।
"এটা একটা খুব স্বাভাবিক ফিজিক্যাল রিয়্যাকশন, সোনা," ইন্দিরা অত্যন্ত প্রাজ্ঞ, অথচ স্নেহার্দ্র গলায় বোঝাতে শুরু করলেন। "তুই তো বায়োলজিতে এসব পড়েছিস, তাই না বাবু? তাহলে তুই কেন এত গিল্ট ফিল করছিস? প্লিজ সোনা... এমন করিস না... আমার বাবুটাকে এত স্যাড দেখলে মায়ের একটুও ভালো লাগে না।"
কথাগুলো বলতে বলতেই ইন্দিরা খেয়াল করলেন, রাহুলের চোখের কোণে জলের ধারা চিকচিক করে উঠেছে। এই দৃশ্যটা ইন্দিরার বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে দিল।
"ওহ্ সোনা আমার..."
তিনি নিজের দুটো হাত রাহুলের কাঁধ থেকে সরিয়ে নিয়ে ওর ফর্সা গালদুটো দুই হাত দিয়ে আলতো করে ধরলেন। ঠিক যেমন করে একজন মা তার ছোট্ট, অবোধ শিশুকে সান্ত্বনা দেয়, ঠিক সেই পরম মমতায় তিনি ফিসফিস করে বলতে লাগলেন:
"আমার কথাটা শোন, ওটা একদমই ন্যাচারাল রে বাবু, ট্রাস্ট মি। ওটা হয়েছিল কারণ... কারণ তুই ওই সময়টায়... বড্ড ভালো ফিল করছিলি, বড্ড আরাম পাচ্ছিলি... তাই তো, সোনা?"
রাহুল চোখের জল আর আটকে রাখতে পারল না। ওর গাল বেয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। ও মাথা নেড়ে হ্যাঁ-সূচক সায় দিল।
ইন্দিরা নিজের শাড়ির আঁচলটা তুলে নিয়ে অত্যন্ত নরম হাতে ওর গালের সেই জলের ধারাটা পরম মমতায় মুছিয়ে দিলেন।
"মা সব জানে রে সোনা। দেখ, শরীর যখন ওরকম চরম একটা ভালো লাগার স্তরে পৌঁছায়... তখন শরীর এভাবেই রিয়্যাক্ট করে। এতে ভুল বা নোংরা কিচ্ছু নেই বাবু। আর জানিস তো? আমি তো বরং বলব যে ওই সময়... ওই রিলিজটা হয়ে গিয়ে... খুব ভালো হয়েছে। ওর পর তো তোর শরীরটা অনেক বেশি রিল্যাক্সড, অনেক বেশি হালকা লাগছিল, তাই না সোনা?"
রাহুল এবার একটু লাজুকভাবে মাথা নাড়ল। ওর ভেতরের সেই জমাট বাঁধা দুঃখ আর লজ্জার মেঘটা যেন মায়ের এই জাদুকরী কথাগুলোতে একটু একটু করে কাটতে শুরু করেছে।
ইন্দিরা ওর গালে একটা হালকা চিমটি কেটে বললেন, "দেখলি তো? তাহলে আর সরি ফিল করার কী আছে রে বোকা?"
রাহুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অবশেষে ওর গলার স্বর ফিরে পেল। ও তোতলাতে তোতলাতে, নিচু স্বরে বলল, "আমি... আমার খুব লজ্জা লাগছিল কারণ... কারণ ব্যাপারটা তো... তোমার সামনে ঘটেছিল..."
ইন্দিরা এবার একগাল মুক্তোঝরা, স্নিগ্ধ হাসি হাসলেন। তাঁর চোখদুটো মাতৃত্বের এক গভীর সমুদ্রে পরিণত হলো।
"ওহ্ সোনা... দ্যাটস... দ্যাটস টোটালি ফাইন..." তিনি ওর গালদুটো আরেকটু আদরে চেপে ধরে বললেন, "আমার ওতে বিন্দুমাত্র কোনো প্রবলেম হয়নি... ওটা আমার সামনে ঘটেছিল কারণ... ওই যে বললাম... কারণ ওই সময়ে তুই বড্ড ভালো ফিল করছিলিস... তাই না?"
ইন্দিরা একটু থামলেন, সঠিক শব্দগুলো হাতড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেন।
"কারণ... তুই তো তোর মাকে... খুব ভালোবাসিস... তাই তো রে সোনা?"
রাহুল মাথা নেড়ে, অত্যন্ত নিচু, ফিসফিস করা আর মিইয়ে আসা গলায় বলল, "হ্যাঁ মা..."
ইন্দিরা নিজের মুখটা রাহুলের মুখের আরও একটু কাছে নিয়ে এলেন। "তোর ওই সময়ে... ঠিক কেমন লাগছিল...মাকে একটু বলবি সোনা?"
রাহুল ওর আর্দ্র চোখদুটো দিয়ে মায়ের চোখের দিকে তাকাল। ওর গলার স্বর আবেগে বুজে আসছে। "আমি... আমি ফিল করছিলাম... আমি তোমার কাছে... কতটা আদরের... আমার দারুন আরাম লাগছিল মা... তুমি কি সুন্দর... করছিলে... আর আমার নিজের বুকের ভেতরটাও... তোমার জন্য ভালোবাসায়... কিরম যেন করছিল মা... আমি বলে বোঝাতে পারব না..."
রাহুলের এই কথাগুলো শোনার পর ইন্দিরার বুকের ভেতরটা এক বিশাল, উত্তাল জলোচ্ছ্বাসের মতো ফুলে উঠল। ছেলের এই খাঁটি, নির্ভেজাল অনুভূতিগুলো যেন হুবহু তাঁর নিজেরই সেই অফিস-রুমে বসে থাকা ভাবনাগুলোর প্রতিধ্বনি! তারা মা এবং ছেলে যেন আক্ষরিক অর্থেই এক আত্মা, এক মন।
ইন্দিরা সম্পূর্ণ ইমোশনাল হয়ে পড়লেন। তাঁর গলাটা কেঁপে উঠল। "তুই তোর মাকে কতটা ভালোবাসিস রে, সোনা?"
রাহুলের চোখদুটো তখন অসীম এক তৃপ্তিতে আর আশ্রয়ের শান্তিতে ভরে উঠেছে। ও ফিসফিস করে বলল, "এই পুরো ইউনিভার্সের চেয়েও বেশি, মা..."
আর এক সেকেন্ডও দেরি করলেন না ইন্দিরা। তিনি এক প্রবল, বন্য এবং তীব্র আকুলতায় রাহুলকে নিজের বুকের সাথে সজোরে টেনে নিলেন। তাঁর দুটো হাত রাহুলের পিঠকে এমনভাবে পেঁচিয়ে ধরল যেন তিনি ওর শরীরটাকে নিজের শরীরের সাথে মিশিয়ে দিতে চাইছেন। রাহুলও নিজের দুটো লম্বা, চওড়া হাত দিয়ে মায়ের কোমর আর পিঠ শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
"ওহ্ সোনা... আমার রাহুল... আমার ছোট্ট বাবুটা..." ইন্দিরার গলা দিয়ে এক বুক-ফাটা, অবাধ্য আবেগ চিরে বেরোতে লাগল। "আমি এই ফিলিংটা বড্ড মিস করছিলাম রে! আমি তোকে বড্ড মিস করছিলাম সোনা... সো... সো... মাচ... কাল থেকে তোকে এমন গোমড়া মুখে দেখে আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছিল... তুই জানিস না রে রাহুল, তোর মা তোকে ঠিক কতটা ভালোবাসে।"
রাহুল মায়ের এই তীব্র আলিঙ্গনের মধ্যে নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দিল। বেশ কিছুক্ষণ পর ও নিজের হাতের বাঁধনটা সামান্য আলগা করে, মায়ের ঘাড়ের কাছ থেকে মুখটা তুলে একটু পিছিয়ে এল।
"মা..." রাহুল ওর সেই চেনা, একটু বোকা বোকা আর নিষ্পাপ গলায় বলল, "তার মানে তুমি সত্যিই আমার ওপর একটুও রেগে নেই?"
ইন্দিরা ওর এই চরম সরলতায় খিলখিল করে হেসে উঠলেন, অথচ তাঁর নিজের চোখের কোণ দিয়ে তখন এক ফোঁটা আনন্দের অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।
"দূর বোকা ছেলে!" তিনি হাসতে হাসতেই ওর চুলে একটা আলতো টান দিলেন। "তোর ওপর কেউ রাগ করতে পারে? আমার সোনাটা..."
ঠিক সেই মুহূর্তে রাহুলের চোখ পড়ল মায়ের গাল বেয়ে নেমে আসা ওই জলের ফোঁটাটার দিকে। ও আর কিছু না ভেবেই নিজের পরনে থাকা টি-শার্টের নিচের দিকের প্রান্তটা এক টানে তুলে ধরল, এবং অত্যন্ত সাবধানে, পরম মমতায় সেই কাপড়টা দিয়ে ইন্দিরার গালের ওই অশ্রুবিন্দুটা মুছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল।
ইন্দিরা ওর এই আকস্মিক আচরণে একটু কনফিউজড হয়ে গেলেন। "কী করছিস কী তুই, রাহুল?"
রাহুল অত্যন্ত স্বাভাবিক, অথচ এক গভীর রোম্যান্টিক এবং কাব্যিক আদরে বলল, "তুমি একটু আগে তোমার শাড়ির আঁচল দিয়ে আমার চোখের জল মুছিয়ে দিলে না? তাই আমি আমার টি-শার্টের কোণটা দিয়ে তোমার জলটা মুছিয়ে দিচ্ছি।"
ছেলের এই অসামান্য, আদুরে কথাটায় ইন্দিরা একগাল হাসিতে ফেটে পড়লেন। তাঁর হাসিটা রান্নাঘরের দেওয়ালগুলোতে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। তাঁর বুকের ভেতরটা এক অনাবিল আনন্দে ভরে গেল—তাঁর সেই চেনা, ফাজিল, একগুঁয়ে অথচ অসীম ভালোবাসায় ভরা ছেলেটা অবশেষে তার নিজের ফর্মে ফিরে এসেছে।
"ওহ গড! এই তো!" তিনি হাসতে হাসতে রাহুলের গালদুটো আবার টেনে ধরলেন। "এতক্ষণ আমার এই বাঁদর ছেলেটা কোথায় লুকিয়ে ছিল?"
রাহুলও মায়ের সাথে সাথে একগাল চওড়া হাসিতে যোগ দিল, আর তারপর দুজনে আবার একে অপরকে এক পরম, নিবিড় আলিঙ্গনে বেঁধে ফেলল।
সেই আলিঙ্গন যেন আর ভাঙতেই চায় না।
গত সন্ধ্যা থেকে শুরু করে আজকের বিকেল পর্যন্ত যে এক দমবন্ধ করা নীরবতা, যে অপরাধবোধ আর লজ্জার দেওয়ালটা তাদের দুজনকেই তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছিল, এই একটা আলিঙ্গন যেন সেই সমস্ত অন্ধকারকে ধুয়ে মুছে সাফ করে দিচ্ছিল। একে অপরের শরীরের ওম, একে অপরের প্রতি সেই অগাধ ভালোবাসা যেন তাদের সমস্ত কলঙ্ক, সমস্ত গিল্টকে দূরে ঠেলে সরিয়ে দিচ্ছিল। কেউই কাউকে ছাড়তে চাইছে না।
হঠাৎ ইন্দিরার নাকে একটা হালকা গন্ধ এসে ঠেকল। তাঁর মগজের সেই নিখুঁত গৃহিণীর সেন্সরটা অ্যালার্মটা বেজে উঠল।
"ওহ্ হো!" ইন্দিরা এক ঝটকায় একটু সজাগ হয়ে উঠলেন। "আমাকে এবার ইনডাকশনের পাওয়ারটা কমাতে হবে, চিকেনটা হয়ে এসেছে।"
তিনি রাহুলের আলিঙ্গন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে রান্নাঘরের কাউন্টারের দিকে দু-পা এগোলেন। কিন্তু রাহুল তাঁকে ছাড়ার পাত্র নয়। ও সাথে সাথেই পেছন থেকে গিয়ে আঠার মতো মায়ের পিঠের সাথে লেপ্টে গেল। ওর দুটো হাত ইন্দিরার কোমরের সামনে দিয়ে এসে পেটের কাছে লক হয়ে গেল, আর চিবুকটা এসে বসল মায়ের ঘাড়ের ঠিক ডান দিকের খাঁজে।
ইন্দিরা এই অবস্থাতেই, পিঠে একটা উনিশ বছরের ছেলের পুরো ভার নিয়েই একটু ঝুঁকে ইনডাকশনের পাওয়ারটা কমালেন, তারপর প্যানের ঢাকনাটা তুলে খুন্তি দিয়ে কোরমাটা নাড়তে লাগলেন।
"উফ্, কী ফাটাফাটি গন্ধ বেরোচ্ছে মা..." রাহুল মায়ের ঘাড়ের ওপর নিজের নাকটা ঘষতে ঘষতে, গভীর একটা শ্বাস নিয়ে ফিসফিস করে বলল।
"তোর ফেভারিট বলে কথা," ইন্দিরা খুন্তি নাড়তে নাড়তেই একটু ঘাড় হেলিয়ে হাসলেন। "কাল থেকে তো ঠিকমতো খাসনি। আজ একদম পেট পুরে খাবি কিন্তু, বলে দিলাম।"
"তুমি নিজে হাতে খাইয়ে দিলে তবেই খাব," রাহুল একদম বাচ্চাদের মতো আবদার জুড়ে দিল।
"উফ্, দূর পাগল ছেলে, তোর বাবা থাকবে তো!" ইন্দিরা একটা প্রশ্রয়ের দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "আজকের দিনটা নিজে খেয়ে নে, পরে একদিন না হয় তোকে খাইয়ে দেব।"
আরও দু-মিনিট নাড়াচাড়া করার পর, তিনি ইনডাকশনের সুইচটা অফ করে দিলেন এবং প্যানটা ঢেকে দিয়ে সেটাকে 'কিপ ওয়ার্ম' মোডে রেখে দিলেন।
রাহুল মায়ের কোমরে জড়ানো হাতদুটোকে আরও একটু শক্ত করে নিজের দিকে চেপে ধরে ফিসফিস করল, "মা, তোমার তো রান্না কমপ্লিট, তাই না?"
"হ্যাঁ, প্রায় হয়ে গেছে সোনা।"
"মা, প্লিজ..." রাহুলের গলার স্বরে এবার এক অবাধ্য, নেশাগ্রস্ত আর্তি। "বাবা ফিরতে তো মনে হয় এখনও অন্তত কুড়ি মিনিট দেরি আছে... চলো না... আমার ঘরে... একটু আদর করব... কাল সন্ধে থেকে আমার না... খুব আদর করতে ইচ্ছে করছিল... কিন্তু উপায় ছিল না... মনটা পুরো ঘেঁটে গেছিল... তুমি তো জানোই সবটা... যাই হোক... চলো না একটু মা?"
ইন্দিরা খুব ভালো করেই জানেন রাহুল কী অনুভব করছে, কারণ তাঁর নিজের শরীরের ভেতরেও ঠিক একই রকম এক দাবানল জ্বলছে। তবু, তাঁর সেই চিরচেনা অভ্যাসবশত তিনি সামান্য একটু বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেন, যদিও সেই বাধার মধ্যে আগের মতো সেরকম কোনো জোর ছিল না।
"সোনা, আমি এখন তোর ঘরে যেতে পারব না রে... আমাকে এই কোরমাটাতে ঠিক দশ মিনিট পর একটু ঘি অ্যাড করতে হবে..."
তিনি একটু ঘুরে রাহুলের দিকে ফিরে, ওকে আবার বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলেন।
"আমরা বরং এভাবেই একটু দাঁড়িয়ে থাকি, সোনা। এটাও তো আদর, তাই না? এভাবেই তোকে বুকে নিয়ে থাকি, তাহলে আমি রান্নাটার কাছাকাছিও থাকতে পারব।"
রাহুল একটু মুখ ফুলিয়ে বলল, "দিস ইজ গুড মা, রিয়েলি, ডোন্ট গেট মি রং। কিন্তু প্লিজ... একটু শুয়ে শুয়ে আদর করতে ইচ্ছে করছে যে..."
ছেলের এই অত্যন্ত সরল, অথচ সরাসরি মনের কথা বলে ফেলার ধরণটা ইন্দিরার বুকের ভেতরটা সবসময় আন্দোলিত করে দেয়। তাঁর গালদুটো সামান্য লাল হয়ে উঠল।
"আচ্ছা আচ্ছা বাবা, তাহলে কী লিভিং রুমের সোফাটায় গিয়ে শুবি? তোর ঘরে এখন সত্যিই যেতে পারব না রাহুল। তোর নাম করে এত যত্ন করে বানালাম, লাস্ট মোমেন্টে রান্নাটা পারফেক্ট না হলে আমার মুড একদম অফ হয়ে যাবে বলে দিলাম।"
রাহুল খুব ভালো করেই জানে ওর মা কতটা পারফেকশনিস্ট। ও সাথে সাথে ঘাড় নেড়ে বলল, "হ্যাঁ হ্যাঁ, দ্যাট ইজ টোটালি ফাইন। সোফাতেই চলো।"
"কিন্তু সোফার স্পেসটা তো বড্ড ছোট রে, রাহুল। ওখানে দুজন শোব কী করে?"
রাহুল ওর সেই চেনা, নির্লজ্জ আর ফাজিল টোনে বলে উঠল, "বা রে, বেশি জায়গা নিয়ে হবে টা কী... আমি তো তোমার গায়ের ওপর শুয়ে আদর করব।"
এই চরম দুষ্টুমিভরা কথাটা শুনে ইন্দিরার গালদুটো এবার রীতিমতো টকটকে লাল হয়ে গেল। তিনি এক কৃত্রিম বিরক্তির সাথে রাহুলের কাঁধের ওপর একটা হালকা চড় কষালেন।
"দূর, অসভ্য ছেলে কোথাকার! মার সাথে ওইভাবে কথা বলতে আছে?"
(rest of the Chapter in the next post...)
RE: The Barter System (By:andygarfield) -
Bad Boy - 09-02-2026
(rest of Chapter 12...)
১২.৩. ওষ্ঠাধরের কাব্য
রান্নাঘর সংলগ্ন লিভিং রুমে এসে তারা দুজনে সেই থ্রি-সিটার সোফাটার সামনে দাঁড়াল। ইন্দিরা প্রথমে খুব সাবধানে, একটু গুটিসুটি মেরে সোফাটায় চিত হয়ে শুলেন। তারপর দুই হাত বাড়িয়ে রাহুলকে খুব আলতো করে নিজের গায়ের ওপর টেনে নিলেন।
রাহুল নিজের শরীরের পুরো ভারটা মায়ের ওপর না ছেড়ে, একটু কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে ওঁর শরীরের সাথে নিজেকে একেবারে খাপে খাপে মিলিয়ে নিল। দুজনের শরীর এমনভাবে মিশে গেল যে মনে হলো তারা যেন একটা অবিচ্ছেদ্য সত্তা।
ইন্দিরা নিজের হাতদুটো দিয়ে রাহুলের ঘাড় আর মাথাটা পরম মমতায় ধরে, ওর গালে, কপালে আর গলার কাছে একের পর এক উষ্ণ, গভীর চুমু খেতে লাগলেন। রাহুলও নিজেকে আর আটকাতে পারল না। ও নিজের মুখটা মায়ের ফর্সা, মসৃণ গলার ভাঁজে গুঁজে দিয়ে সেখানে পাগলের মতো আদর করতে শুরু করল।
"উমম... মা... আমার বড্ড ভালো লাগছে..." রাহুল ফিসফিস করে বলতে লাগল, ওর ঠোঁটদুটো ইন্দিরার গলার ত্বকে অবিরাম ঘষে চলেছে। "তুমি জাস্ট বিশ্বাস করতে পারবে না আমি কাল থেকে কতটা কষ্ট পেয়েছি... তোমাকে ছাড়া আমার এক মুহূর্তও ভালো লাগে না মা..."
"আমি জানি সোনা... উমম... আমারও তো ঠিক একই অবস্থা ছিল রে..." ইন্দিরা ওর চুলে আঙুল চালাতে চালাতে এক ঘোরের মধ্যে বিড়বিড় করলেন। "আমার সোনাটা... মা তো এখন এখানেই আছে বাবু... একদম তোর কাছে..."
নিস্তব্ধ লিভিং রুমে তখন কেবলই তাদের দুজনের দ্রুত, ভারী শ্বাসের শব্দ, আর ত্বকের ওপর ঠোঁট ছোঁয়ানোর সেই ভিজে, মাদকতাময়—'মুয়াহ্... উমম... আহ্'—আওয়াজগুলো প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।
"ওহ মা... তোমার গায়ের এই গন্ধটা... আমি জাস্ট পাগল হয়ে যাই..." রাহুল আরেকটু ওপরে উঠে এসে মায়ের চিবুকে একটা গাঢ় চুমু খেল।
ইন্দিরা খিলখিল করে হেসে উঠে ওর নাকে একটা চিমটি কাটলেন। "পাকা ছেলে! সারাক্ষণ শুধু মাকে তোষামোদ করা! উফ্ সোনা... কাতুকুতু লাগছে রে... একটু আস্তে..."
প্রায় মিনিট পাঁচেক ধরে এই স্বর্গীয়, অবিরাম আদরের পর, রাহুল হঠাৎ নিজের মুখটা একটু ওপরে তুলল। ওর চোখে এক অদ্ভুত, ধূর্ত অথচ শিশুসুলভ প্রশ্ন।
"মা, তোমার কি মনে আছে, কাল স্নান করার সময় তুমি আমাকে ভার্বালি একটা প্রমিস করেছিলে?"
ইন্দিরা ওর গালে চুমু খেতে খেতে, একটু আনমনাভাবেই বললেন, "কী প্রমিস রে? যে আমি তোকে স্নান করিয়ে দেব, আর তুই আমাকে স্নান করিয়ে দিবি?"
"হ্যাঁ," রাহুল বলল। "কিন্তু তুমি তো শুধু আমাকেই স্নান করালে। তুমি আমাকে এত সুন্দর করে শ্যাম্পু করে দিলে, সাবান মাখিয়ে দিলে... আমি তো জাস্ট ফিল করছিলাম যেন আমি পৃথিবীর সবচেয়ে স্পয়েল্ড আর প্যাম্পার্ড ছেলে। আই লাভড ইট মা। আমার তো ইচ্ছে করছিল তুমি যদি আমাকে রোজ এভাবেই স্নান করিয়ে দিতে!"
ইন্দিরা চোখ উলটে এক চরম তাচ্ছিল্যের ভান করে বললেন, "উফ্ রাহুল, স্টপ বিহেভিং লাইক আ বেবি এগেইন! এত বড় ধেড়ে ছেলেকে রোজ রোজ স্নান করাব আমি?"
"না না, আমার পয়েন্টটা সেটা নয়," রাহুল একটু গম্ভীর হয়ে বলল। "আমার পয়েন্ট হলো, আমি তো তোমাকে... মানে তোমাকে তো স্নান করাতে পারলাম না মা। মনে আছে?"
ইন্দিরা এক সেকেন্ডের জন্য একটু থমকালেন। তারপর খুব ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বললেন, "ওয়েল, টেকনিক্যালি বলতে গেলে, কথাটা সত্যি।"
"নট টেকনিক্যালি, রিয়েলি! এটাই তো ফ্যাক্ট," রাহুল জোর দিয়ে বলল। তারপর একটু থেমে, এক অদ্ভুত ঘোর-লাগা গলায় জিজ্ঞেস করল, "চলো না মা, আরেকদিন একসাথে চান করি? কবে করবে বলো? আমার বড্ড ইচ্ছে করছে তোমাকে নিজের হাতে শ্যাম্পু করে দিতে, তোমার গায়ে সাবান মাখিয়ে তোমাকে ভালো করে ধুয়ে দিতে।"
রাহুলের এই সরাসরি প্রশ্নে ইন্দিরা যেন একটু ফাঁপরে পড়ে গেলেন। তিনি নিজেকে একটু ডিফেন্ড করার চেষ্টা করে, কিছুটা তোতলাতে তোতলাতে বললেন, "রাহুল, ওটা... ওটা জাস্ট একটা ওয়ান-টাইম থিং ছিল রে সোনা... আমরা তো আর রোজ রোজ এইসব... মানে, এইসব রেগুলারলি করতে পারি না রাহুল।"
"কেন মা?" রাহুল খুব নিষ্পাপ চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল। "তোমার ভালো লাগেনি?"
ছেলের এই মোক্ষম, সরাসরি প্রশ্নে ইন্দিরা এক প্রকার স্পটলাইটের নিচে পড়ে গেলেন। তাঁর ফর্সা গালদুটো আবার লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। তিনি শব্দগুলো গোছানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে বললেন, "ওয়েল... আই মিন... দেখ, আইডিয়া অফ দিস..."
"উফ্ মা!" রাহুল ওকে মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে চরম বিরক্তিতে বলল, "তুমি কি ইউনিভার্সিটিতে তোমার স্টুডেন্টদের এভাবেই আনসার দাও নাকি? এত ফিলার ওয়ার্ডস ইউজ করে?"
ইন্দিরা এবার এক চরম কৃত্রিম রাগে চোখ পাকিয়ে ওর দিকে তাকালেন। কিন্তু তাঁর ঠোঁটের কোণে তখন এক প্রচ্ছন্ন, হার-মানা হাসি উঁকি দিচ্ছে। তিনি মনে মনে ভাবলেন, এই স্মার্ট, অ্যানয়িং আর তর্কবাগীশ ছেলেটা সত্যিই নিজের পুরনো ফর্মে ফিরে এসেছে।
"ওকে, ফাইন! আই লাইকড ইট..." ইন্দিরা একটা গভীর শ্বাস ছেড়ে, লজ্জামাখা গলায় প্রায় ফিসফিস করে স্বীকার করলেন, "অ্যাকচুয়ালি, আই লাভড ইট। হ্যাপি নাউ?"
রাহুল একগাল বিজয়ী হাসি হাসল। "দেখলে তো? আমি জানতাম। আর তুমি খুব ভালো করেই জানো আমার কতটা ভালো লেগেছে পুরো ব্যাপারটা। তাহলে... আবার কেন নয়, মা?"
ইন্দিরা এবার একটু অসহায়ভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "আহ্, ব্যাপারটা কমপ্লিকেটেড সোনা... ইউ সি... "
রাহুল আবার একটা ভুরু কুঁচকে, অদ্ভুত দৃষ্টিতে ওঁর দিকে তাকাল, যেন বুঝিয়ে দিচ্ছে মা আবার সেই ফিলার ওয়ার্ডস দিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছে।
ইন্দিরা ওর ওই লুকটা দেখে লজ্জায় আর একটু হেসে ফেলে বললেন, "উফ্ রাহুল, অন্তত একটা মিনিটের জন্য তোর এই স্মার্টঅ্যাসগিরিটা একটু বন্ধ রাখা যায় না? ঠিক আছে বাবা, ঠিক আছে... আসল প্রবলেমটা হলো... ব্যাপারটা সাংঘাতিক রিস্কি। তোর বাবা আর গঙ্গা মাসি বাড়িতে থাকতে এটা করা প্রায় অসম্ভব। কাল তোর বাবা ক্লাবে গেছিল বলেই না আমরা সুযোগটা পেলাম, মনে নেই? আর ভাগ্যিস তুই স্নান করে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেছিলিস! নাহলে একবার ভাব, তোর বাবা যদি ওই সময়ে ফিরত, আর টানা কলিং বেল বাজানোর পর কেউ দরজা খুলছে না দেখে নিজের চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে সোজা ওপরে চলে আসত... উফ্... জাস্ট ভেবে দেখ একবার... কী সাঙ্ঘাতিক কেলেঙ্কারিটাই না হতো! বুঝতে পারছিস ব্যাপারটা কতটা ভয়ের?"
রাহুল একটু হতাশ হলো ঠিকই, কিন্তু আশা ছাড়ল না। "কিন্তু নিশ্চয়ই কোনো না কোনো উপায় বেরোবে, মা..."
"মেবি, কিন্তু এখন ওসব নিয়ে ভেবে মাথা খারাপ করিস না সোনা," ইন্দিরা ওকে আরও একটু কাছে টেনে নিয়ে বললেন। "লেটস নট স্পয়েল দিস মোমেন্ট। আমাকে কিন্তু একটু পরেই উঠে ঘি-টা দিতে হবে।"
রাহুল এবার ওর মুখটা ইন্দিরার মুখের একদম কাছাকাছি নামিয়ে আনল। ওদের দুজনের শ্বাস একে অপরের ত্বকে আছড়ে পড়ছে।
"মা..." রাহুল খুব নিচু, আদুরে গলায় ডাকল।
"হুমম সোনা?"
"আরও একটা জিনিস আছে যেটা তুমি প্রমিস করেছিলে... কাল স্নান করার সময়... মনে আছে?"
ইন্দিরার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। "কী অন্য জিনিস?"
"তুমি প্রমিস করেছিলে... আমাকে ওইটা করতে দেবে..."
"কী করতে দেব?" ইন্দিরার গলাটা শুকিয়ে আসছে।
রাহুল নিজের ডান হাতের তর্জনীটা তুলে অত্যন্ত আলতো করে ইন্দিরার নরম, গোলাপি ঠোঁটদুটো ছুঁয়ে দিল। "আমাকে... এখানে... কিস করতে দেবে..."
ইন্দিরার সারা শরীর উত্তেজনার এক প্রবল ধাক্কায় শিউরে উঠল। তাঁর মুখমণ্ডল এক লহমায় টকটকে লাল হয়ে গেল। তিনি অত্যন্ত অস্পষ্ট, জড়ানো গলায় বিড়বিড় করলেন, "তুই... তুই সত্যিই... ওটা করতে চাস, সোনা? এ... এখন?"
রাহুলের চোখে তখন এক অতলস্পর্শী ভালোবাসা আর অদম্য তৃষ্ণা। ওর মুখটা মায়ের মুখের ওপর আরও একটু নেমে এল। "হ্যাঁ মা... ওটা ঠিক কেমন লাগে, আমি বুঝতে চাই..."
"কি... কিন্তু... আমরা তো ওটা আগেই করেছি... তাই না...?" ইন্দিরার শ্বাস দ্রুত হয়ে এসেছে। "দু'বার... তাই তো?"
"হ্যাঁ... মা... কিন্তু ওটা তো জাস্ট... শুধু ঠোঁটে ঠোঁট ঠেকানো... আর এরকম চেপে ধরার মতো ছিল..." রাহুল নিজের দুটো আঙুল একসাথে চেপে ধরে নিজের ঠোঁটে ঠেকিয়ে ওঁর ওই লাজুক চুমুটার নকল করে দেখাল।
ছেলের এই কাণ্ড দেখে ইন্দিরা এই চরম নার্ভাসনেসের মধ্যেও ফিক করে হেসে ফেললেন। "উফ্... তুই পারিসও বটে! তাতে কী হয়েছে? ওটাও তো ঠোঁটে চুমু খাওয়াই।"
রাহুল খুব আদুরে, ঘোরের ঘোরে বিড়বিড় করল, "কিন্তু মা, ওভাবে তো... ওভাবে তো ওরা করে না..."
ইন্দিরা একটু কৌতূহলী হয়ে ভুরু কুঁচকালেন। "কী বলতে চাইছিস তুই, সোনা? কারা কী করে না?"
রাহুল অত্যন্ত নিচু, লাজুক স্বরে বলল, "আমি সিনেমাতে দেখেছি... মা... কীভাবে নায়ক-নায়িকারা করে... আজকাল তো টিপিক্যাল বলিউড মুভিতেও ওইসব সিন থাকে..."
ইন্দিরা কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন বোবা হয়ে গেলেন। এই ছেলেটা তাঁকে আক্ষরিক অর্থেই প্রতি মুহূর্তে চমকে দিচ্ছে। তিনি এক চরম বিস্ময় আর লজ্জামিশ্রিত ফিসফিসানিতে বললেন, "তুই নায়ক-নায়িকাদের মতো চুমু খেতে চাস? কিন্তু কেন? আমি কি তোর নায়িকা নাকি?"
রাহুলের চোখের দৃষ্টি এবার এক চরম পূজারিণীর মতো পবিত্র হয়ে উঠল। ও ফিসফিস করল, "তুমিই আমার সব, মা। তুমিই আমার নায়িকা, আমার স্বর্গের পরী।"
এই কথাগুলো ইন্দিরার বুকের ভেতরটা এক আদিম, সর্বগ্রাসী আবেগে ভরিয়ে তুলল। তাঁর চোখের কোণদুটো ভিজে উঠল। "ওহ্ সোনা... ওভাবে বলিস না রে..."
রাহুল ওর সেই আর্দ্র, অনুনয় ভরা চোখদুটো দিয়ে তাকিয়ে ফিসফিস করল, "প্লিজ মা... ওরমভাবে করতে বড্ড ইচ্ছে করছে... প্লিজ তুমি একটু শিখিয়ে দাও না..."
ইন্দিরার ভেতরের শেষ প্রতিরক্ষার প্রাচীরটুকুও ধূলিসাৎ হয়ে গেল। তিনি নিজের দুটো ফর্সা, নরম হাত তুলে রাহুলের গালদুটো আলতো করে ধরলেন।
"মাই বেবি বয়... আমার বাবু..."
তিনি রাহুলের মুখটা নিজের মুখের ওপর নামিয়ে আনতে আনতে, এক চরম মাদকতাময়, নিষিদ্ধ ফিসফিসানিতে নির্দেশ দিলেন:
"ঠোঁটটা একটু ফাঁক কর সোনা..."
রাহুল মন্ত্রমুগ্ধের মতো নিজের ঠোঁটদুটো সামান্য আলগা করে দিল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে, ইন্দিরার নরম, উষ্ণ ঠোঁটজোড়া এসে মিলিত হলো ওর ঠোঁটের সাথে। প্রথম স্পর্শটা ছিল অত্যন্ত ধীর, খুব সাবধানী এবং নরম—ঠিক যেন এক পবিত্র আরাধনা। ইন্দিরা খুব হালকাভাবে ওর ওপরের ঠোঁটটা নিজের ঠোঁটের মাঝে নিয়ে একটুখানি চুষে নিলেন, তারপর নিচের ঠোঁটটায়। রাহুল অত্যন্ত অনভিজ্ঞ, কিন্তু ও ওর সমস্ত সত্তা দিয়ে মায়ের এই ছোঁয়াটাকে অনুভব করার চেষ্টা করছিল।
"এই তো... ঠিক এভাবেই..." ইন্দিরা চুমুর ফাঁকেই খুব অস্পষ্ট, ভেজা স্বরে ফিসফিস করে ওকে শেখাতে লাগলেন। "জাস্ট গো উইথ দ্য ফ্লো, সোনা... রিল্যাক্স..."
ধীরে ধীরে সেই চুম্বনের তীব্রতা বাড়তে শুরু করল। ইন্দিরা এবার নিজের মুখটা সামান্য হেলিয়ে, রাহুলের ঠোঁটের ওপর একটু বেশি চাপ দিলেন। তাঁর জিভের ডগাটা অত্যন্ত সন্তর্পণে রাহুলের ওই সামান্য ফাঁক হয়ে থাকা ঠোঁটের মাঝখান দিয়ে গলে গিয়ে ওর ভেতরের উষ্ণ আর্দ্রতাকে ছুঁয়ে দিল।
রাহুলের শরীরটা একটা প্রবল ইলেকট্রিক শকে ধনুকের মতো বেঁকে গেল। ওর অনভিজ্ঞ স্নায়ুগুলো যেন এই চরম অনুভূতির ধাক্কা সামলাতে পারল না। ও নিজের হাতদুটো দিয়ে ইন্দিরার কোমরটাকে পাগলের মতো শক্ত করে চেপে ধরল। ওর মুখ থেকে একটা দীর্ঘ, খাবি খাওয়া গোঙানি বেরিয়ে এল— "উমমম... মা..."
ইন্দিরা চুমুর ফাঁকেই একটু দম নিয়ে, অত্যন্ত নরম আর ভেজা স্বরে ফিসফিস করলেন, "এই তো... ঠিক এভাবেই সোনা... একদম রিল্যাক্স কর..."
এরপর ইন্দিরা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। তাঁর নিজের ভেতরের নারীসত্তাও তখন এক উন্মত্ত জলোচ্ছ্বাসে ভাসছে। তিনি নিজের জিভটাকে সম্পূর্ণভাবে রাহুলের মুখের ভেতর প্রবেশ করিয়ে দিলেন। রাহুলের আনাড়ি, কিন্তু উষ্ণ জিভের সাথে তাঁর প্রাজ্ঞ জিভের এক চরম, আদিম খেলা শুরু হলো। নিস্তব্ধ লিভিং রুমে তখন কেবলই তাদের দুজনের প্রবল শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ, আর সেই সাথে জিভ আর ঠোঁট মিলে যাওয়ার এক চরম মাদকতাময়, ভিজে শব্দ— 'স্লরপ... উমম... আহ্...'—প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
রাহুল যেন এক অজানা, অপার্থিব স্বর্গে বিচরণ করছে। মায়ের মুখের সেই চেনা গন্ধের সাথে মিশে থাকা এক অদ্ভুত মিষ্টি স্বাদ ওর সমস্ত চেতনাকে আচ্ছন্ন করে দিচ্ছিল। ও ওর সমস্ত শক্তি দিয়ে মায়ের ঠোঁটদুটোকে চুষতে লাগল, ওর জিভটা পাগলের মতো মায়ের মুখের ভেতরকার অমৃতের খোঁজ করছিল। "উমম... মা... আআহ্..."
কিন্তু এই রুদ্ধশ্বাস, উদ্দাম আদরের ঘোরে রাহুলের শরীর ওর মগজের নিয়ন্ত্রণ মানতে চাইল না। মায়ের নরম, উষ্ণ শরীরের ওপর লেপ্টে থাকা অবস্থায়, ওর নিম্নাঙ্গের সেই ঘুমন্ত স্পন্দনটি এক প্রবল রক্তস্রোতে জেগে উঠতে শুরু করল। মাত্র কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সেটি সম্পূর্ণ ঋজু, কঠিন এবং স্ফীত হয়ে উঠল, আর কাপড়ের ওপর দিয়েই সরাসরি গিয়ে ঠেকল ইন্দিরার পেটের নিচের অংশের নরম ভাঁজে।
ওই চরম কঠিন আর উষ্ণ চাপটা টের পেতেই রাহুলের ঘোরটা যেন এক লহমায় কেটে গেল। ওর মনে পড়ে গেল গতকাল বাথরুমের সেই চরম অস্বস্তিকর আর লজ্জার মুহূর্তটির কথা। ওর বুকের ভেতরটা আতঙ্কে কেঁপে উঠল। ও চুমুটা মাঝপথেই ভেঙে দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে নিজের কোমরটা পেছনের দিকে সরিয়ে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করল।
কিন্তু ইন্দিরা ওকে সরতে দিলেন না। রাহুলের শরীরের ওই চরম, অবাধ্য কাঠিন্যটা নিজের শরীরের ওপর টের পেয়ে তাঁর ভেতরের নারীসত্তা এক অদ্ভুত, নিষিদ্ধ শিহরণে কেঁপে উঠেছিল। সেই সঙ্গে তাঁর মাতৃসত্তা বুঝতে পারল ছেলেটা কী পরিমাণ লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছে। তিনি এক মুহূর্তও দেরি না করে নিজের দুটো হাত দিয়ে রাহুলের কোমরটা শক্ত করে চেপে ধরলেন এবং ওকে আরও জোরে নিজের শরীরের সাথে লেপ্টে নিলেন, যাতে ওই স্পন্দনশীল কাঠিন্যটা তাঁর শরীরের সাথে একদম নিবিড়ভাবে মিশে যায়।
"সরিস না..." ইন্দিরা চোখ বুজে, অত্যন্ত নরম আর ঘোরে-থাকা গলায় ফিসফিস করে উঠলেন। তাঁর শ্বাস তখন ভারী। "একদম নড়বি না... এভাবেই থাক... কিচ্ছু হয়নি সোনা... সব ঠিক আছে..."
মায়ের এই পরম প্রশ্রয় আর চরম স্বীকৃতির কাছে রাহুলের সমস্ত লজ্জা, সমস্ত ভয় নিমেষে গলে জল হয়ে গেল। ওর ভেতর থেকে একটা দীর্ঘ, কাঁপানো স্বস্তির শ্বাস বেরিয়ে এল। "মা..." ও আবার ডুকরে উঠে নিজের মুখটা গুঁজে দিল ইন্দিরার ঠোঁটের ওপর।
এবার চুম্বনের তীব্রতা যেন জাগতিক সমস্ত ব্যাকরণ চুরমার করে দিল। কোনো আড়াল, কোনো সংকোচ আর অবশিষ্ট রইল না। রাহুলের অনভিজ্ঞ জিভ যখন এক অদম্য তৃষ্ণায় ইন্দিরার ওষ্ঠাধরের সীমানা পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল, তখন ইন্দিরাও নিজেকে সম্পূর্ণ উজাড় করে দিলেন। তাঁর প্রাজ্ঞ, স্নিগ্ধ জিভটি অবলীলায় জড়িয়ে ধরল ছেলের সেই মরিয়া আবেগটিকে। দুটি রসনার এই নিবিড়, পিচ্ছিল এবং উন্মত্ত আলিঙ্গনে শুরু হলো এক অভাবনীয় আদানপ্রদান। তাদের উষ্ণ, সিক্ত লালারস একে অপরের মুখের ভেতর মিশে গিয়ে এমন এক মদির স্রোতের জন্ম দিল, যা কোনো অপার্থিব অমৃতের মতো দুই শরীরের শিরায় শিরায় আগুন ধরিয়ে দিচ্ছিল। ঠোঁটের ফাঁকে আটকে থাকা সেই ভিজে, মোহময় স্বাদটুকু যেন তাদের মাঝখানের শেষ সামাজিক সীমারেখাটুকুও চিরতরে মুছে দিল। বেশ কয়েক মিনিট ধরে চলল তাদের এই অবাধ্য, রুদ্ধশ্বাস মোহাবেশ—যেন অনন্তকাল ধরে তৃষ্ণার্ত দুটি নদী এক অনিবার্য মোহনায় এসে নিজেদের সমস্ত অস্তিত্ব বিলীন করে দিয়েছে। অবশেষে, যখন ফুসফুসের প্রতিটা কোণ অক্সিজেনের অভাবে প্রায় ফেটে যাওয়ার উপক্রম, ইন্দিরা খুব ধীরে ধীরে, ভিজে ঠোঁটের এক গভীর, সিক্ত শব্দ তুলে নিজের মুখটা ছাড়িয়ে নিলেন।
দুজনেই হাঁপাচ্ছে। তাদের চোখদুটো একে অপরের ওপর স্থির, দৃষ্টিতে এক চরম নেশাগ্রস্ত ঘোর।
ইন্দিরা কয়েক সেকেন্ড সময় নিলেন নিজের হুঁশ ফেরানোর জন্য। তারপর তিনি রাহুলের ওই হতবাক মুখটার দিকে তাকিয়ে একটা হালকা, খিলখিল হাসি হাসলেন। তিনি নিজের শাড়ির আঁচলটা তুলে নিয়ে অত্যন্ত মমতায় রাহুলের ঠোঁটের কোণায় লেগে থাকা লালার দাগটা মুছিয়ে দিলেন।
"ওহ, এবার উঠি রে... আমাকে এবার রান্নাটা শেষ করতেই হবে।"
তিনি একরকম জোর করেই সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালেন এবং দ্রুত পায়ে রান্নাঘরের দিকে গিয়ে কোরমাটার ওপর ফিনিশিং টাচ দিতে শুরু করলেন।
রাহুল সোফায় ওভাবেই চিত হয়ে শুয়ে রইল। ওর মগজ তখন একটু আগে ঘটে যাওয়া ওই চরম, অবিশ্বাস্য ঘটনাটাকে প্রসেস করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। ওর পুরো শরীরটা যেন পালকের মতো হালকা হয়ে গেছে।
কয়েক মিনিট পর, ঘোর কাটিয়ে ও উঠে দাঁড়াল এবং ধীর পায়ে রান্নাঘরে ঢুকল। পেছন থেকে গিয়ে ইন্দিরাকে অত্যন্ত নরম, পরম ভালোবাসায় জড়িয়ে ধরল।
"থ্যাঙ্ক ইউ মা। আই লাভ ইউ সো মাচ।"
ইন্দিরা এবার আর ওকে ধমক দিলেন না। তাঁর গলার স্বর অনেক বেশি শান্ত, অনেক বেশি কোমল। "সোনা... এবার একটু ছাড় আমাকে... কোরমাটা বাটিতে ঢালতে হবে তো..."
রাহুল ওঁর পিঠে মুখ ঘষতে ঘষতে একটানা বিড়বিড় করতে লাগল, "মা, তুমি এত ভালো... তুমি এত মিষ্টি... এত সুন্দর..."
ইন্দিরা খুন্তি দিয়ে কোরমাটা একটা বড় কাঁচের বাটিতে ঢালতে শুরু করলেন। ঠিক তখনই রাহুলের নজর গেল মায়ের ঘাড়ের দিকে। ইন্দিরা আক্ষরিক অর্থেই দরদর করে ঘামছেন।
"মা, তুমি তো প্রচন্ড ঘামছ..." রাহুল একটু চিন্তিত গলায় বলল।
"হ্যাঁ..." ইন্দিরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "সেটা তো এই ঘ্যানঘ্যানে, পুঁচকে ছেলেটা আঠার মতো আমার গায়ে সেঁটে আছে বলেই... উফ্ যা গরম, মনে হচ্ছে গিয়ে একবার ভালো করে স্নান করেই নিতে হবে আমাকে।"
রাহুল ওর সেই চরম ফাজিল, খুনসুটি মেশানো টোনে বলে উঠল, "স্নান? আমি আসব নাকি সাথে?"
ইন্দিরা এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়িয়ে ওর কাঁধের ওপর একটা হালকা কিন্তু সশব্দ চড় কষালেন। তিনি চোখেমুখে এক চরম বিরক্তি ফোটানোর চেষ্টা করলেন, কিন্তু রাহুল খুব স্পষ্ট দেখতে পেল তাঁর ঠোঁটের কোণে একটা চাপা, প্রশ্রয়ের হাসি উঁকি দিচ্ছে।
"অসভ্য ছেলে কোথাকার! একদম সোজা নিজের ঘরে যা, গিয়ে পড়াশোনা কর... তোর বাবা যেকোনো মুহূর্তে চলে আসবে এখন। যা কথা সব ডিনার টেবিলে হবে।"
রাহুল একটু হেসে মায়ের মুখের দিকে তাকাল, আর তারপর ওর চোখদুটো একটু বড় হয়ে গেল। "মা, তোমার লিপস্টিক... একদম ঘেঁটে গেছে।"
ইন্দিরা চমকে উঠলেন। তিনি তড়িঘড়ি নিজের শাড়ির আঁচল দিয়ে ঠোঁটদুটো ঢেকে ফেললেন। "উফ্! আমি ঠিক করে নিচ্ছি। এবার যা তো তুই, শিগগির পালা..."
রাহুল নিজের ঘরে ফিরে এল। ওর মনে হচ্ছিল ওর শরীরের ওপর যেন কোনো মাধ্যাকর্ষণ শক্তি কাজ করছে না, ও যেন হাওয়ায় ভাসছে।
সন্ধেবেলা সুব্রত বাড়ি ফেরার পর, তারা তিনজন রোজকার মতোই ডাইনিং টেবিলে ডিনার করতে বসল। কিন্তু গতকালের সেই থমথমে, দমবন্ধ করা পরিবেশের ছিটেফোঁটাও আজ আর নেই। রাহুলের মুখে একটা শান্ত, প্রশান্ত হাসি লেগে আছে। ও আজ অনেক বেশি রিল্যাক্সড, অনেক বেশি কথা বলছে। সুব্রতর সাথে কলেজের প্রোজেক্ট নিয়ে হাসিমুখে আলোচনা করছে। ইন্দিরাও মাঝে মাঝে আলোচনায় যোগ দিচ্ছেন।
ডিনারের পর রাহুল নিজের ঘরে ফিরে গেল। মন দিয়ে পড়াশোনা করল, হোমওয়ার্ক শেষ করল, আর তারপর ঘড়ির কাঁটা এগারোটা পেরোতেই ঘরের আলো নিভিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল।
অন্ধকার ঘর। রাহুলের মুখে একটা তৃপ্তির হাসি লেগেই আছে। ও চোখ বন্ধ করে বিকেলের সেই ফ্রেঞ্চ কিসের তীব্র, উষ্ণ অনুভূতিটা বারবার নিজের মনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছিল, নিজের সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে সেই অনুভূতিকে নিজের সত্তার সাথে মাখিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। ওর মনে হচ্ছিল, গত বেশ কয়েক বছরের মধ্যে ও এতটা আনন্দ, এতটা নিখাদ সুখ আর কোনোদিন পায়নি।
ঠিক সেই মুহূর্তে, ওর মাথার কাছের ফোনটা একটা মৃদু শব্দ করে উঠল। হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ।
ও চোখ খুলে ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিনে ইন্দিরার নাম।
ইন্দিরা: "কিরে, ঘুমিয়ে পড়লি নাকি?"
রাহুল দ্রুত টাইপ করল:
রাহুল: "না মা, জাস্ট ঘুমোতে যাচ্ছিলাম। কী হলো হঠাৎ? সব ঠিক আছে তো?"
ইন্দিরা: "না রে, তেমন কিছু না। জাস্ট বলতে চাইছিলাম যে... আজ বিকেলে যা যা হলো... প্রমিস কর তুই জীবনেও কাউকে এসব ঘুণাক্ষরেও বলবি না।"
রাহুল একটু হেসে টাইপ করল:
রাহুল: "উফ্ মা, আর কতবার প্রমিস করব বলো তো? মায়ের দিব্যি কাটছি, আমি কাউকে কিচ্ছু বলব না।"
কয়েক সেকেন্ড পর ইন্দিরার মেসেজ এল:
ইন্দিরা: "যে ব্যাপারটায় তোর মা নিজেই ইনভলভড, সেটা নিয়ে আবার মায়ের দিব্যি কাটিস কী করে রে গাধা? :laughing: "
রাহুল রিপ্লাই দিল:
রাহুল: "আচ্ছা বাবা ঠিক আছে, তাহলে মা কালীর দিব্যি! আমি কাউকে কিচ্ছু বলব না। :laughing: "
ইন্দিরা: "গুড বয়। ❤️"
এরপর কিছুক্ষণ কোনো মেসেজ এল না। রাহুল ফোনটা নামিয়ে রাখতে যাবে, ঠিক তখনই ও দেখল স্ক্রিনের ওপর আবার 'টাইপিং...' দেখাচ্ছে। ও অপেক্ষা করতে লাগল।
ইন্দিরা: "সোনা, স্নান করার সময় আমি তোকে আরেকটা প্রমিস করেছিলাম মনে আছে? আমি তো ভুলেই গেছিলাম, মনে হচ্ছে তুইও ভুলে গেছিস।"
রাহুল ভুরু কুঁচকে একটু মাথা চুলকাল। মা আবার কীসের কথা বলছে? ও টাইপ করল:
রাহুল: "তাই নাকি? আবার কীসের প্রমিস?"
পরের মেসেজটায় ইন্দিরা শুধু একটা ইমোজি পাঠালেন: একটা লাল বৃত্তের ইমোজি।
রাহুলের মগজে যেন এক লহমায় একটা বিদ্যুতের ফ্ল্যাশ খেলে গেল। ওর মনে পড়ে গেল বাথরুমের ভেতরের সেই কথাগুলো! ও দ্রুত টাইপ করল:
রাহুল: "ওহ হ্যাঁ, টিপ! একদম, মনে পড়েছে মা। স্নান সেরে বেরোনোর পর তোমার ওই ভিজে চুলে লাল টিপ পরা মুখটা দেখলে জাস্ট পাগল হয়ে যেতাম।"
তারপর একটা পজ। স্ক্রিনে আবার 'টাইপিং...' দেখাচ্ছে।
কয়েক সেকেন্ড পর, একটা মেসেজের সাথে একটা ছবির ফাইল লোড হতে শুরু করল হোয়াটসঅ্যাপে। ছবিটা লোড হতে হতে রাহুল মেসেজের টেক্সটটা পড়ল:
ইন্দিরা: "আজ রান্না সেরে স্নান করার পর তুললাম। ছবিটা দেখে ডিলিট করে দিস সোনা।"
রাহুলের হাতদুটো উত্তেজনার চোটে সামান্য কাঁপতে শুরু করল। ওর বুকের ভেতরটা হাতুড়ির মতো পিটছে। ছবিটার ওই লোডিং সার্কেলটা যেন ঘুরতেই চাইছে না।
অবশেষে, ছবিটা সম্পূর্ণ লোড হলো।
রাহুল চোখের পলক ফেলতে পারছিল না। ওর মনে হলো, এই পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য, সমস্ত পবিত্রতা আর সমস্ত আদিম মোহ যেন ওই একটা ছবির ফ্রেমে বন্দি হয়ে ওর হাতের মুঠোয় ধরা দিয়েছে।
RE: The Barter System (By:andygarfield) -
Bad Boy - 09-05-2026
ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ: সময়ের চোরাস্রোত
১৩.১. একটি মখমলি বন্দিদশা
সময়ের এক স্বকীয় ধর্ম আছে; সে নিজের মতো করে সমস্ত কিছুর ভারসাম্য তৈরি করে নেয়। এপ্রিল মাসটা ছিল এক প্রগাঢ়, অমেয় দহনের মাস—বোধহয় ইন্দিরা এবং রাহুল দুজনের জীবনেরই পার করে আসা সবচেয়ে স্পন্দনশীল, সবচেয়ে উথালপাথাল করা একটা সময়। সেই যে বিশেষ বিকেলবেলায় রাহুল কলেজ থেকে বাড়ি ফিরে মাকে আচমকা রান্নাঘরে আবিষ্কার করেছিল, আর সেখান থেকেই জন্ম নিয়েছিল 'বার্টার সিস্টেম' নামক চুক্তির খেলা—তারপর ধীরে ধীরে, অলক্ষ্যে, বিন্দু বিন্দু করে এক অন্যরকম মোহনায় এসে মিশেছিল তাদের সম্পর্ক। দিন গড়িয়েছে, আর একের পর এক ঘটনার আবর্তে মা ও ছেলের মাঝখানের সেই চেনা সমীকরণটা আরও গাঢ়, আরও নিবিড়, এবং আরও অনেক বেশি সংজ্ঞাহীন হয়ে উঠেছে।
রাহুলের কাছে পুরো বিষয়টা ছিল আক্ষরিক অর্থেই এক অভাবনীয় রূপকথার মতো। যে মা বাইরের পৃথিবীর কাছে, এমনকি বাবার সামনেও এক নিশ্ছিদ্র, রাশভারী আর মেপে চলা অধ্যাপিকার বর্মে মোড়া থাকেন, সেই মা-ই যখন তারা দুজন একা থাকে, তখন সম্পূর্ণ এক অন্য মানুষ। রাহুল যেন ধীরে ধীরে তার সত্যিকারের মাকে দেখতে পেয়েছে—যে মা তার কাছে ধরা দিয়েছে এক অসীম স্নেহের, প্রশ্রয়ের এবং তার চেয়েও অনেক বেশি কিছুর এক উষ্ণ আশ্রয় হয়ে। অন্যদিকে, ইন্দিরার কাছেও এটা ছিল এক অন্যরকম রূপকথার আখ্যান। তাঁর সেই ছোট্ট, কোল-জুড়ে থাকা বাবুসোনাটা, যে চিরকাল তাঁর চোখের মণি ছিল, সে যে কখন চোখের সামনে এত বড় হয়ে গেছে, তা তিনি টেরই পাননি। সে এখন আর কেবল এক অবোধ শিশু নেই; সে এখন এক সুঠাম, বুদ্ধিদীপ্ত, মার্জিত এবং সুর্দশন যুবক—যার চোখের ওই অবাধ্য, তৃষ্ণার্ত চাউনি আর গলার ওই সম্মোহনী স্বর পৃথিবীর অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে তাঁর বুকের ভেতরে বেশি তোলপাড় তুলতে পারে।
কিন্তু বাস্তব তো আর নিছক রূপকথা নয়; বাস্তবের স্বাদ বরাবরই একটু অম্ল-মধুর। পড়াশোনা, কাজ, দৈনন্দিন দায়িত্ব—এগুলোকে তো আর অনন্তকাল এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এগুলোই তো তাঁদের পরিচয়ের সবচেয়ে বড় ভিত্তি। মে মাস পড়তে না পড়তেই, রাহুল এবং ইন্দিরা দুজনেই নিজেদের জগতে মারাত্মকভাবে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। রাহুলের জন্য একটা দারুণ খবর এসেছিল—মে মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে শুরু করে আইআইটি মাদ্রাজে (IIT Madras) একটা অত্যন্ত সম্মানজনক সামার প্রজেক্ট করার সুযোগ পেয়েছে সে। খবরটা শোনার পর সুব্রত এবং ইন্দিরা দুজনেই গর্বে ফেটে পড়েছিলেন। রাহুল নিজেও যথেষ্ট খুশি ছিল, কিন্তু সেই সাফল্যের আড়ালে ওর বুকের বাঁ দিকটায় এক চিনচিনে, চাপা বিষাদ জমাট বাঁধছিল। আগামী তিনটে মাস সে তার মাকে চোখের দেখা দেখতে পাবে না! অন্য ছেলেমেয়েদের বাবা-মায়েরা হয়তো কোনো উইকেন্ডে গিয়ে তাদের সন্তানদের সাথে দেখা করে আসবে, কিন্তু রাহুলের ক্ষেত্রে সেটা প্রায় অসম্ভব। বাবা আর মা দুজনেরই যা কাজের চাপ আর শিডিউল, তাতে চেন্নাই উড়ে যাওয়াটা পুরোদস্তুর একটা অলীক কল্পনা। একজন সফল ও কর্মপাগল বাবা-মায়ের সন্তান হওয়ার মাশুল বোধহয় এটাই—জীবনজুড়ে এমন ছোট ছোট অজস্র ইচ্ছাকে প্রতিনিয়ত বিসর্জন দিয়ে চলতে হয়।
চেন্নাই উড়ে যাওয়ার আগে, মে মাসের প্রথম দিকটায়, রাহুল আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছিল মায়ের সাথে একটুখানি একান্তে সময় কাটানোর। সেই যে লিভিং রুমের সোফায় শুয়ে মায়ের ঠোঁটের ওই নরম, ভিজে আর অমৃতের মতো স্বাদ সে পেয়েছিল—তার রেশ যেন আজও ওর ঠোঁটে এবং মুখের ভেতরে এক মায়াবী আবেশ হয়ে জড়িয়ে আছে। ওই স্মৃতিটা বোধহয় কোনোদিনও ওর মন থেকে মুছবে না। ওর হৃদয়ের গভীরতম প্রকোষ্ঠে নিজের মায়ের প্রতি এক অন্ধ, নিঃশর্ত এবং প্রায় পূজার স্তরের এক নিবিড় ভালোবাসা পাকাপাকিভাবে জায়গা করে নিয়েছিল। ও শুধু সারাদিন সুযোগ খুঁজত। কখনও কলেজ থেকে ফিরে, কখনও বাবা অফিসে বেরিয়ে যাওয়ার পর, আবার কখনও রাতে বাবা যখন ড্রয়িংরুমে টিভির খবরে ডুবে থাকতেন। ওর শুধু ইচ্ছে করত ওই দিনের মতো মাকে আরও একবার পাগলের মতো চুমু খেতে, নিদেনপক্ষে একটু জড়িয়ে ধরতে। ওর ইচ্ছে করত মায়ের সাথে এপ্রিলের সেই দিনের মতো আবারও একবার শাওয়ারের নিচে গিয়ে দাঁড়াতে। কিন্তু সময় কোথায়? পরিস্থিতি এখন বড্ড প্রতিকূল। শুধু যে ধরা পড়ে যাওয়ার চরম ঝুঁকি ছিল তা-ই নয়, ইন্দিরা নিজেও তাঁর ইউনিভার্সিটির ক্লাস, সেমিনার আর পেপার চেকিং নিয়ে বড্ড বেশি পরিশ্রান্ত ছিলেন। ফলে, মে মাসের এই প্রথম পনেরোটা দিন কেটে গেল কেবলই কিছু ছেঁড়া ছেঁড়া, লুকোচুরি মাখা গোপন মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে; দীর্ঘক্ষণ একসাথে কাটানোর কোনো অবকাশই মিলল না তাদের। তবে যেটুকু সময় তারা পেত, ওইটুকু সময়ের জন্য তারা নিজেদের ওই মা-ছেলের নিভৃত, নিজস্ব অভয়ারণ্যে প্রবেশ করত — যা বাইরের ওই রূঢ়, একঘেয়ে আর বর্ণহীন বাস্তব থেকে অনেক, অনেক দূরে।
১০ই মে। রবিবার সকাল।
বাইরের আকাশে তখন রোদের পারদ চড়তে শুরু করেছে। সুব্রত আজ সকালে নিজেই বাজারের থলি হাতে বেরিয়ে গেছেন। নিচতলায় গঙ্গা মাসি জলের বালতি আর লাইসল নিয়ে মেঝে মোছার কাজে ব্যস্ত। আর ওপর তলায়, নিজের ঘরের ঠান্ডা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ল্যাপটপ খুলে বসে আছেন ইন্দিরা।
করিডোরের মেঝেতে কোনো শব্দ না করেই রাহুল এসে দাঁড়াল মায়ের ঘরের দরজার সামনে। দরজাটা ভেজানো ছিল। ও খুব আলতো করে টোকা দিয়ে দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
"মা, বাবা তো বাজার করতে বেরোল এইমাত্র। তুমি কি খুব ব্যস্ত এখন?" রাহুলের গলার স্বরটা খুব নিচু, কিন্তু বড্ড আশাবাদী।
ইন্দিরা ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই, চশমার ফাঁক দিয়ে একবার স্ক্রলিং করতে করতে বললেন, "হ্যাঁ রে রাহুল, আমার এক স্টুডেন্টের পেপারটা নিয়ে বসেছি, কালকেই ফাইনাল সাবমিশন আছে, একবার রিভাইজ করে দিচ্ছি।"
রাহুল ধীর পায়ে টেবিলের আরেকটু কাছে এগিয়ে গেল। ওর চোখেমুখে এক চাপা, অবাধ্য আর্তি। "মা, বলছি এই কাজটা কি একটু পরে করা যাবে? আমি তো সারাদিনে তোমার সাথে ভালো করে দুটো কথা বলারও সময় পাই না... জানোই তো... জাস্ট তুমি আর আমি..."
ইন্দিরা এবার ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে রাহুলের মুখের দিকে তাকালেন। তিনি খুব ভালো করেই জানেন ওর এই কথার পেছনের অর্থ কী। তাঁর প্রাজ্ঞ, বুদ্ধিজীবী মনটা একবার সতর্ক করে দিল। "সোনা, এখন নয়। তুই তো জানিস আমি এখন কাজ করছি।"
"জানি মা..." রাহুল আরেকটু কাছে ঘেঁষে এসে, প্রায় ফিসফিস করে বলল, "আমি খুব ভালো করেই জানি তুমি কাজ করার সময় কতটা ফোকাসড থাকো, আর সেই ফোকাস ভাঙলে তোমার কতটা বিরক্তি লাগে... কিন্তু প্লিজ মা, কতগুলো সপ্তাহ কেটে গেল... আর... আমি জাস্ট দেখলাম বাবা এইমাত্র গেট দিয়ে বেরোল, তাই আর আটকাতে পারলাম না নিজেকে..."
ইন্দিরা একটা গভীর শ্বাস ফেললেন। তিনি মনে মনে যথেষ্ট দ্বিধাগ্রস্ত, কিন্তু একই সাথে তাঁর মাতৃসত্তার গভীরে লুকিয়ে থাকা রাহুলের প্রতি সেই টানটা যেন এই সুযোগটার জন্যই অবচেতনভাবে অপেক্ষা করছিল। এক মাস আগেও যদি রাহুল কাজের মাঝখানে এভাবে বিরক্ত করতে আসত, তিনি হয়তো সোজা ধমক দিয়ে ওকে ওর নিজের ঘরে পড়তে পাঠিয়ে দিতেন। কিন্তু আজ? আজ ওই ছেলেটার ওই নরম, তৃষ্ণার্ত আর আর্দ্র চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে তাঁর বুকের ভেতরে এমন একটা অজানা স্পন্দন শুরু হলো, যাকে কোনো যুক্তির সংজ্ঞায় ফেলা যায় না।
"সোনা... তুই তো জানিস ব্যাপারটা কতটা রিস্কি..." ইন্দিরা গলার স্বর নামিয়ে, প্রায় অস্ফুটভাবে বললেন। "গঙ্গা মাসি তো নিচেই আছে, যেকোনো মুহূর্তে ওপরে চলে আসতে পারে..."
"আমি... আমি না হয় দরজাটা লক করে দিচ্ছি মা?" রাহুল দ্রুত সমাধান বাতলে দিল।
ইন্দিরার চোখদুটো সামান্য বড় হয়ে গেল। "সেটা তো আরও বেশি খারাপ হবে রে বোকা! আমি তো কাজ করার সময় কোনোদিন দরজা লক করি না, বড়জোর ভেজিয়ে রাখি, যদি না জামাকাপড় পাল্টানোর ব্যাপার থাকে... আর তাছাড়া তুই আমার ঘরের ভেতরে, আর দরজা ভেতর থেকে লক করা... গঙ্গা মাসি যদি ওপরে এসে দেখে দরজা বন্ধ, ও তো মনে মনে সন্দেহ করবে।"
রাহুল ওর সেই মোক্ষম, নাছোড়বান্দা হাসিটা হাসল। "কিন্তু মা, তুমি তো ওই দিনও দরজাটা লক করেছিলে, মনে আছে? ওই যে, সেই দিন... আমি টিউশন থেকে ফেরার পর... তুমি আর আমি তো তখন এই ঘরেই ছিলাম..."
ছেলের এই স্পষ্ট, নির্লজ্জ ইঙ্গিতে ইন্দিরার ফর্সা গালদুটো মুহূর্তের মধ্যে লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। তিনি একটা কপট বিরক্তির শ্বাস ফেলে বললেন, "উফ্! আমি বোধহয় তখন কিছু একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম, আমার মাথা কাজ করছিল না তখন... কিন্তু সোনা, প্লিজ... আজ নয়। অন্য কোনোদিন?"
মায়ের এই সাময়িক প্রত্যাখ্যানের ধাক্কায় রাহুলের উচ্ছ্বসিত মুখটা নিমেষে যেন শ্রাবণের মেঘের মতো কালো হয়ে গেল। ওর চোখের সেই জ্বলজ্বলে, অবাধ্য আশার আলোটা এক লহমায় নিভে গিয়ে সেখানে জমাট বাঁধল এক গভীর, আর্দ্র হতাশা; চওড়া কাঁধ দুটো অবচেতনভাবেই সামান্য ঝুলে পড়ল। ছেলের এই নিঃশব্দ অভিমান আর বিষণ্ণতার দৃশ্যটা ইন্দিরার বুকের ভেতর এক তীক্ষ্ণ যন্ত্রণার চাবুক কষাল। তাঁর প্রাজ্ঞ, শৃঙ্খলাপরায়ণ মগজটা যতই যুক্তি বা বিপদের কথা বলুক না কেন, তাঁর ভেতরের মাতৃসত্তাটা এই আহত মুখের দিকে তাকিয়ে আক্ষরিক অর্থেই হাহাকার করে উঠল।
ইন্দিরা ভাবলেন, এই উনিশ বছর বয়সে অন্য দশটা সাধারণ ছেলে ঠিক কী চায়? দামি স্পোর্টস বাইক, লেটেস্ট মডেলের স্মার্টফোন, বন্ধুদের সাথে উদ্দাম আড্ডা, নয়তো কোনো বান্ধবীর হাত ধরে ঘোরার স্বাধীনতা। তারা তো কবেই মায়ের আঁচল ছেড়ে নিজেদের আলাদা একটা স্বাধীন জগৎ তৈরি করে নেয়। কিন্তু তাঁর এই ছেলেটা? ওর কোনো জাগতিক বস্তুর প্রতি বিন্দুমাত্র লোভ নেই। ওর সমস্ত তৃষ্ণা, ওর বয়ঃসন্ধির সমস্ত চাওয়া-পাওয়া, ওর যাবতীয় রাগ-অভিমান—সবকিছু কেবল একটা নির্দিষ্ট বিন্দুর চারপাশে ঘুরপাক খায়, আর সেই বিন্দুটা হলেন তিনি নিজে। এই বিশাল, কোলাহলমুখর পৃথিবীতে ওর একমাত্র চাওয়া শুধু ওর মায়ের একটুখানি সময়, মায়ের শরীরের ওই চেনা ওমটুকু, আর ওই নিবিড় সান্নিধ্যের একচেটিয়া অধিকার। একজন নারী, একজন মা হিসেবে কারোর কাছে এতটা কাঙ্ক্ষিত, এতটা অমূল্য মনে হওয়ার যে এক মাদকতা আছে, তা তিনি কিছুতেই অস্বীকার করতে পারলেন না। ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার বৃথা চেষ্টাটা ত্যাগ করে তিনি বুঝলেন, এই ছেলেটার ওই নিষ্পাপ, তৃষ্ণার্ত চোখের কাছে তিনি বরাবরই এক পরাজিত, নিরুপায় মা। তিনি নিজেকে আর কিছুতেই শক্ত করে ধরে রাখতে পারলেন না।
"ও বাই দ্য ওয়ে... ও এখন ঠিক কী করছে নিচে?" ইন্দিরা হঠাৎ প্রসঙ্গ পালটে খুব নিচু গলায় জিজ্ঞেস করলেন।
"গঙ্গা মাসি? ও তো নিচে লিভিংরুমটা মুছছে এখন..." রাহুলের গলায় আবার একটু আশার আলো ফিরে এল।
ইন্দিরা কয়েক সেকেন্ড ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কী যেন একটা হিসেব কষলেন। "হুমম... আর দোতলাটা তো খানিক্ষন আগেই মুছে গেল..." তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, চোখদুটো রাহুলের ওপর স্থির করে ফিসফিস করলেন, "...ঠিক আছে... লক করে দে দরজাটা... কিন্তু জাস্ট পাঁচ মিনিটের জন্য। ওকে সোনা?"
রাহুলের চোখের মণি দুটো যেন হাজার ওয়াটের বাল্বের মতো জ্বলে উঠল। ও এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে ছিটকিনিটা সশব্দে তুলে দিল।
দরজা লক করেই রাহুল সোজা এগিয়ে গেল ইন্দিরার বিশাল, নরম বিছানাটার দিকে।
"রাহুল, দাঁড়া দাঁড়া!" ইন্দিরা তড়িঘড়ি চেয়ার থেকে প্রায় অর্ধেক উঠে দাঁড়িয়ে বাধা দিলেন। "আমি জাস্ট আজ সকালেই নতুন বেডকভারটা পেতেছি সোনা... ওটা এক্ষুনি ঘাঁটিস না, তাহলে আমাকে আবার ওই ভারী চাদরটা চারদিক থেকে গুঁজে টেনে টুনে ঠিক করতে হবে। প্লিজ।"
রাহুল বিছানার সামনে থমকে দাঁড়াল। একটু কনফিউজড হয়ে ও এদিক-ওদিক তাকাল, ঠিক বুঝতে পারছিল না তাহলে এখন কী করবে।
ইন্দিরা একটু মুচকি হেসে, নিজের রিভলভিং চেয়ারটার ওপর সোজা হয়ে বসে হাত দুটো কে সামনে প্রসারিত করে বললেন, "এদিকে আয়। আমার কোলে এসে বোস।"
রাহুলের চোখেমুখে এক অদ্ভুত, লাজুক হাসি ফুটে উঠল। ও ধীর পায়ে মায়ের ওই রিভলভিং চেয়ারটার কাছে এগিয়ে এল। তারপর ঠিক সাইকেল চালানোর মতো করে, নিজের দুটো পা ইন্দিরার দুই কোমরের পাশ দিয়ে গলিয়ে দিয়ে, সরাসরি মায়ের কোলের ওপর, ওঁর মুখোমুখি হয়ে বসল। ইন্দিরার পরনে একটা সুতির নরম ছাপা শাড়ি, আর রাহুলের শর্টসের নিচে ওর শক্ত, পেশিবহুল উরু দুটো ইন্দিরার শরীরের সাথে একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে সেঁটে গেল।
ইন্দিরা নিজের দুটো ফর্সা, নরম হাত রাহুলের ঘাড়ের ওপর দিয়ে নিয়ে গিয়ে ওর ঘন, রুক্ষ চুলের মধ্যে ডুবিয়ে দিলেন। অত্যন্ত স্নিগ্ধ, মাতৃসুলভ গলায় ফিসফিস করে বললেন, "তোর চুলগুলো বড্ড বড় হয়ে গেছে রে সোনা... সামনের সপ্তাহে একবার সেলুনে গিয়ে কাটিয়ে নিস, কেমন?।"
"করিয়ে নেব মা... সামনের সপ্তাহে তো চেন্নাই যাওয়ার প্যাকিংও শুরু করতে হবে..." রাহুল মায়ের গলার খাঁজে নিজের নাকটা ঘষতে ঘষতে বলল।
"উফ্, সে কথা আর মনে করাস না... তুই চলে গেলে আমার যে এই বাড়িটাতে কী অবস্থা হবে..." ইন্দিরা ওর পিঠে হাত বুলাতে লাগলেন। তাঁর গলার স্বরে এক চিরচেনা, মাতৃসুলভ বিষণ্ণতা।
রাহুল ওঁর গলার খাঁজে আরেকটু সেঁধিয়ে গিয়ে নিচু স্বরে বলল, "আমিও তোমায় বড্ড মিস করব মা। আইআইটি-র প্রজেক্টটা নিয়ে আমি এক্সাইটেড ঠিকই, কিন্তু চেন্নাই গিয়ে ফাঁকা হস্টেলের ঘরে ফিরে যখন তোমায় দেখতে পাব না... তখন যে আমার কী অবস্থা হবে ভেবেই এখন থেকে কেমন যেন ব্ল্যাঙ্ক লাগছে।"
"ওখানে তো সারাদিন ল্যাবেই পড়ে থাকবি," ইন্দিরা ওর চুলে আঙুল চালাতে চালাতে কড়া, অথচ আদুরে গলায় শাসন করলেন। "কিন্তু খাওয়াদাওয়ার দিকেও নজর দিতে হবে, বলে দিলাম! ওখানে তো আর মা বসে থাকবে না যে রোজ বকাঝকা করে তোর মুখে খাবার তুলে দেবে। বাইরের উল্টোপাল্টা খাবার খাবি, আর শরীর খারাপ করবি। প্রমিস কর, রোজ টাইমলি লাঞ্চ আর ডিনার করবি?"
রাহুল সামান্য মাথা তুলে মায়ের চোখের দিকে তাকাল। রিভলভিং চেয়ারের ওই সীমিত পরিসরে ওদের দুজনের শরীর তখন একেবারে খাপে খাপে মিলে আছে। ইন্দিরার উষ্ণ শ্বাস রাহুলের গায়ে আছড়ে পড়ছে, আর রাহুলের পেশিবহুল উরুর চাপ ইন্দিরার শাড়ির ওপর দিয়ে এক অদ্ভুত, অবাধ্য উত্তাপ ছড়াচ্ছে।
"প্রমিস করছি, করব..." রাহুলের গলার স্বরটা এবার আর সেই বাধ্য ছেলের মতো শোনাল না। গলাটা বেশ খাদে নেমে গেছে। ও মায়ের ঘাড়ের কাছে নাক ঘষে একটা দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে বলল, "কিন্তু তোমার হাতের রান্নার ওই চেনা স্বাদটা তো আর পাব না মা। আর... আর তোমার এই গন্ধটা... "
ইন্দিরা একটু হাসার চেষ্টা করলেন, কিন্তু তাঁর নিজের গলার স্বরও তখন এই নিবিড়, ঘর্মাক্ত নৈকট্যের কারণে সামান্য কাঁপছে। "পাগল ছেলে... তিনটে মাস তো দেখতে দেখতে কেটে যাবে..."
"তিন মাস অনেক লম্বা সময়, মা," রাহুল ফিসফিস করে বলল। ওর চোখদুটো এবার সরাসরি ইন্দিরার নরম, গোলাপি ঠোঁটের ওপর এসে স্থির হলো। "জানো মা, ওখানে একা থাকার সময়... আমার সবচেয়ে বেশি কোনটার কথা মনে পড়বে?"
ইন্দিরার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। তিনি খুব ভালো করেই বুঝতে পারছিলেন ছেলের কথার অভিমুখ কোন দিকে যাচ্ছে। ফর্সা গালদুটো মুহূর্তের মধ্যে রক্তিমাভ হয়ে উঠল তাঁর। "কী... কীসের কথা?"
রাহুল মাথাটা সামান্য তুলে, মায়ের চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে, একদম ঘোরের ঘোরে ফিসফিস করে বলল:
"তোমার ঠোঁটের স্বাদ, মা..." রাহুলের গলার স্বর এবার এক তীব্র, নেশাতুর ফিসফিসানিতে ভেঙে পড়ল। "ওই দিনের ওই চুমুটার কথা আমি কিছুতেই মাথা থেকে বের করতে পারছি না। যেভাবে তুমি... যেভাবে তুমি তোমার জিভ দিয়ে আমাকে আদর করেছিলে... উফ্, ওই স্বাদটা আমার সারাক্ষণ মনে পড়ে। আমরা কি... আমরা কি এখন আর একবার ঠিক ওইভাবে চুমু খেতে পারি, মা? প্লিজ?"
ছেলের মুখে এই চরম, অবাধ্য এবং নির্লজ্জ কথাটা এত সহজে বেরোতে দেখে ইন্দিরার মুখমণ্ডল আবার এক গাঢ় লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল। তিনি ওর কানের লতিটা হালকা করে টেনে দিয়ে ফিসফিস করলেন, "সোনা... তুই এই কথাগুলো এমন ক্যাজুয়ালি বলিস না... যেন মনে হয় এটা কোনো ব্যাপারই না... যেন জলভাত..."
রাহুল মায়ের চোখের ওই লজ্জামাখা হাসির দিকে তাকিয়ে আরও একটু কাছে ঘেঁষে এল। "প্লিজ মা... কতগুলো উইক কেটে গেল..."
ইন্দিরা কয়েক সেকেন্ড ওর ওই তৃষ্ণার্ত, আর্দ্র চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর তাঁর সেই চিরচেনা, রিংমাস্টার মায়ের রূপটা একটু উঁকি দিল। "আমাকে আগে প্রমিস কর যে সারাদিন আজ মন দিয়ে পড়াশোনা করবি? কোনো ফাঁকিবাজি চলবে না কিন্তু।"
রাহুল সাথে সাথে বাধ্য ছাত্রের মতো ওপর-নিচ মাথা নাড়ল। "হ্যাঁ মা, আমি প্রমিস করছি। এটার পর আমি একদম ফ্রেশ ফিল করব, আর আমার পড়ার ফোকাস দশ গুণ বেড়ে যাবে।"
ইন্দিরা এবার একটা চাপা হাসিতে ফেটে পড়লেন। তাঁর বুকটা রাহুলের বুকের সাথে ঘষা খেয়ে দুলতে লাগল। "ফ্রেশ? হা হা হা, সোনা, তুই পারিসও বটে! এর মধ্যে ফ্রেশ হওয়ার মতো কী আছে রে পাগল?"
রাহুল একটু লাজুক, চপল হাসি হেসে বলল, "আমি ওসব জানি না মা... তুমি এখন ওরম প্রফেসরদের মতো লজিক দেওয়া আর কঠিন কঠিন প্রশ্ন করা বন্ধ করো তো..."
ইন্দিরা একটা প্রশান্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের ডান হাতটা দিয়ে রাহুলের গালটা পরম মমতায় ছুঁয়ে দিলেন। তাঁর বুড়ো আঙুলটা রাহুলের ঠোঁটের ওপর দিয়ে আলতো করে পিছলে গেল। তিনি অত্যন্ত নিবিড়, নেশাগ্রস্ত গলায় ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন:
"তোর মনে আছে তো, সোনা... ওটা কীভাবে করতে হয়?"
রাহুল ওর চোখদুটো আধবোঁজা করে, মায়ের হাতের ওই জাদুকরী স্পর্শটা উপভোগ করতে করতে বলল, "হ্যাঁ মা... আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না... তুমি আমাকে যা যা শিখিয়েছ, আমি কি আজ পর্যন্ত কোনোদিন ভুলেছি?"
ইন্দিরার ভেতরে থাকা সেই প্রখর মাতৃত্ব আর এক আদিম অধিকারবোধ এবার সম্পূর্ণভাবে জেগে উঠল। তিনি ওর চুলে আরেকবার হাত বুলিয়ে দিয়ে, ঠিক যেমন করে তিনি ওকে ছোটবেলায় ঘুম পাড়ানোর সময় কথা বলতেন, ঠিক সেই সুরে, সেই মোহময় ছন্দে ফিসফিস করতে শুরু করলেন:
"আমি জানি সোনা..." একটু পজ নিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "বল তো... মায়ের সবচেয়ে স্মার্ট ছেলে কে?"
রাহুল এক ঘোরের মধ্যে, অত্যন্ত নিচু স্বরে উত্তর দিল, "আমি... মা..."
ইন্দিরা নিজের মুখটা রাহুলের মুখের আরও একটু কাছে নিয়ে এলেন। তাদের নাক দুটো প্রায় ছুঁয়ে গেল। "মায়ের সবচেয়ে মিষ্টি, সবচেয়ে আদরের বাবুটা কে?"
রাহুলের গলার স্বর এবার উত্তেজনায় কাঁপতে শুরু করল। "আমি... মা..."
ইন্দিরার মুখটা এবার এতটাই কাছে চলে এল যে তাঁর উষ্ণ শ্বাস রাহুলের ঠোঁটের ওপর আছড়ে পড়তে লাগল। "মায়ের সবচেয়ে বাধ্য, সবচেয়ে লক্ষ্মী ছেলেটা কে?"
রাহুলের গলা দিয়ে যেন শব্দ বেরোচ্ছিল না, ও শুধু একটা অস্ফুট গোঙানির মতো করে বলল, "আমি... মা..."
ইন্দিরার ঠোঁটদুটো এবার রাহুলের ঠোঁটকে প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছে। তাঁর চোখের দৃষ্টি তখন এক অতল, নেশাতুর সমুদ্রে পরিণত হয়েছে। "বল... কে তার মাকে এই পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসে?"
রাহুল নিজের দুই চোখ শক্ত করে বুজে ফেলে, এক চরম সমর্পণের সুরে ফিসফিস করল, "আমি... মা..."
আর এই কথাটা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই মাঝখানের ওই কয়েক মিলিমিটারের শূন্যস্থানটুকু চিরতরে মুছে গেল। তাদের ঠোঁটজোড়া এক প্রবল, অমোঘ এবং আদিম তৃষ্ণায় একে অপরের ওপর আছড়ে পড়ল।
গত কয়েক সপ্তাহের সমস্ত জমাট বাঁধা দূরত্ব, অপেক্ষার ক্লান্তি আর না-পাওয়ার ব্যাকুলতা যেন এই একটিমাত্র চুম্বনের প্রথম স্পর্শেই সম্পূর্ণ বাষ্পীভূত হয়ে গেল। আগের সেই সোফায় ঘটে যাওয়া চুম্বনের মুহূর্তগুলো তো এর কাছে নিছক একটা প্রারম্ভিকা মাত্র ছিল; এটি ছিল অনেক বেশি তৃষ্ণার্ত, অনেক বেশি বেপরোয়া আর সর্বগ্রাসী। রাহুলের উন্মত্ত, উষ্ণ রসনা বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে ইন্দিরার ওষ্ঠাধরের সীমানা পেরিয়ে সরাসরি তাঁর মুখের ভেতর প্রবেশ করল, যেন সে কোনো দীর্ঘ মরুর বুকে খুঁজে পেয়েছে এক পসলা অমৃতের সন্ধান।
ইন্দিরার গলা চিরে একটা রুদ্ধশ্বাস, দীর্ঘ গোঙানি বেরিয়ে এল। তিনি নিজের দুই হাতের তালু দিয়ে রাহুলের মাথাটা পিছন থেকে আরও জোরালোভাবে চেপে ধরলেন। রিভলভিং চেয়ারের ওপর রাহুলের পুরো শরীরের সেই আকস্মিক আর বন্য ভারে চেয়ারের নিচের চাকাগুলো একটা হালকা 'ক্যাঁচ-ক্যাঁচ' শব্দ করে ফ্লোরের ওপর সামান্য এদিক-ওদিক পিছলে যেতে লাগল। কিন্তু সেই যান্ত্রিক শব্দ বা নড়াচড়ার দিকে দুজনের কারোরই বিন্দুমাত্র হুঁশ ছিল না।
রাহুলের দুই হাত তখন ইন্দিরার কোমর ও পিঠের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে তাঁকে নিজের আরও গভীরে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করছে। সুতির শাড়ি ও ব্লাউজের পুরু আবরণ থাকা সত্ত্বেও, রাহুল নিজের চওড়া, পেশিবহুল বুকটাকে সজোরে চেপে ধরল ইন্দিরার নরম স্তনযুগলের ওপর। কাপড়ের বাধা পেরিয়েও দুটি উষ্ণ বক্ষের সেই নিবিড়, পিষ্ট করা চাপে যেন ধিকিধিকি জ্বলে ওঠা কোনো সুপ্ত আগুন মুহূর্তে দাবানল হয়ে গেল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই, রাহুলের কোমরের নিচের সেই অনিয়ন্ত্রিত, পুরুষালি কাঠিন্য সরাসরি গিয়ে ধাক্কা খেল ইন্দিরার নাভিপ্রান্ত এবং পেটের কোমল অংশে। ওই উষ্ণ, পুরুষালি স্পন্দনের স্পষ্ট চাপ যখন সরাসরি ইন্দিরার নাভিতে গিয়ে আঘাত করল, তাঁর সর্বাঙ্গ একটা প্রবল শিহরণে থরথর করে কেঁপে উঠল।
এই অপ্রত্যাশিত ধাক্কায় ইন্দিরার শরীরটা দুলে উঠলেও, চুম্বন ভাঙার বদলে তিনি এক ঘোরের বশে নিজেকে রাহুলের দিকে আরও বেশি করে সঁপে দিলেন। তাঁর ফর্সা আঙুলগুলো রাহুলের ঘাড়ের দু'পাশ দিয়ে উঠে গিয়ে অগোছালো চুলগুলোকে এক অবর্ণনীয় আকুলতায় খামচে ধরল, আর তাদের ঠোঁট ও জিহ্বার সেই রুদ্ধশ্বাস আদানপ্রদান যেন আরও গভীর, আরও উন্মত্ত এক নেশায় পরিণত হলো।
সময়ের সমস্ত হিসাব মুছে দেওয়া এই দীর্ঘ, লালাসিক্ত মোহাবেশ চলল বেশ কয়েক মিনিট। অবশেষে, যখন ফুসফুসে অক্সিজেনের টান ক্রমশ অসহনীয় হয়ে উঠল, তখন এক সিক্ত, অস্ফুট শব্দ তুলে তারা খুব ধীরে ধীরে একে অপরের ঠোঁট থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করল। দুজনেরই বুক তখন হাপরের মতো ওঠানামা করছে; একে অপরের থেকে সামান্য মুখ সরিয়ে, কপালের সাথে কপাল ঠেকিয়ে তারা কেবলই স্তব্ধ হয়ে দুজনের উষ্ণ, দ্রুত শ্বাসগুলো অনুভব করতে লাগল।
রাহুলের চোখদুটো তখন এক বন্য, ঘোর-লাগা নেশায় চকচক করছে। ও নিজের ডান হাতটা দিয়ে ইন্দিরার ব্লাউজের ওপরের কাপড়টা খামচে ধরে, প্রায় অনুনয়ের সুরে, চরম খাবি-খাওয়া গলায় বলল:
"মা... প্লিজ... এটা একটু খোলো না... "
ইন্দিরা হাঁপাতে হাঁপাতেই নিজের একটা হাত রাহুলের হাতের ওপর রাখলেন। তাঁর চোখদুটোও ভালোবাসায় আর কামনায় ভিজে আছে। "না সোনা... প্লিজ... এখন না... বড্ড রিস্কি হয়ে যাবে..."
তিনি রাহুলের হাতটা ব্লাউজ থেকে সরিয়ে দিয়ে, নিজের শাড়ির আঁচলটা একটু সরিয়ে তাঁর ফর্সা, মসৃণ ঘাড় আর কলারবোনটা ওর চোখের সামনে অনাবৃত করে দিলেন। তাঁর গলার স্বর এবার এক চরম, মোহময় ফিসফিসানিতে নেমে এল।
"এই তো... এই জায়গাগুলো তো আছে সোনা... এখানে কর..."
রাহুল আর এক সেকেন্ডও অপেক্ষা করল না। ও এক বন্য নেকড়ের মতো নিজের মুখটা ডুবিয়ে দিল ইন্দিরার ওই ফর্সা, সুবাসিত ঘাড়ের খাঁজে। ওর উষ্ণ, আর্দ্র ঠোঁটদুটো পাগলের মতো চুমু খেতে শুরু করল, আর সেই সাথে ওর জিভটা অত্যন্ত দ্রুত এবং নির্লজ্জভাবে ইন্দিরার কলারবোন আর ঘাড়ের নরম ত্বকটাকে চাটতে শুরু করল।
ইন্দিরার সারা শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল। তাঁর মাথাটা পেছনের দিকে হেলে গেল, আর চোখদুটো আপনাআপনিই বুজে এল।
"মা... ওহ মা... আই লাভ ইউ... আই লাভ ইউ সো মাচ..." রাহুল ওর ওই ভিজে, লালাসিক্ত আদরের ফাঁকে ফাঁকেই একটানা বিড়বিড় করতে লাগল। ওর জিভের ওই তীব্র, অবিরত লেহন ইন্দিরার স্নায়ুগুলোকে এক চরম প্রান্তিকের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল।
"উফ্... সোনা..." ইন্দিরার গলা দিয়ে এক অসংলগ্ন, আদুরে গোঙানি চিরে বেরোতে লাগল। "অত জোরে না... আমার মিষ্টি বাবুটা... ওহ গড... আমার সোনা ছেলেটা... আহ্... এরম... করতে নেই... সোনা..." তাঁর ফর্সা আঙুলগুলো রাহুলের চুলগুলোকে আরও শক্ত করে খামচে ধরল। "এত জোরে... চাটলে... মায়ের যে...বড্ড সুড়সুড়ি লাগে রে... উমমম... আহ্... একটু আস্তে চাট সোনা... উফ্..."
কিন্তু রাহুল থামার বদলে আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠল। ওর উষ্ণ, অবাধ্য জিভটা এবার কলারবোনের গণ্ডি ছাড়িয়ে ধীরে ধীরে উঠে এল ইন্দিরার কণ্ঠনালীর ঠিক ওপরে, যেখানে তাঁর স্পন্দিত শিরাটা পাগলের মতো ধুকপুক করছে। ওই ফর্সা, পেলব ত্বকের ওপর রাহুলের ভিজে ঠোঁট আর জিভের অবিরাম, রাক্ষুসে লেহন ইন্দিরার অবশিষ্ট সমস্ত আত্মনিয়ন্ত্রণকে যেন এক লহমায় ধসিয়ে দিল। তাঁর গলা দিয়ে বেরিয়ে এল এক একটানা, রুদ্ধশ্বাস আর্তির সুর— "আআহ্... উমমম... সোনা... উফ্... পাগল করে দিবি তুই আমাকে... আআহ্..."—তাঁর আঙুলগুলো রাহুলের পিঠের শার্টটাকে খামচে ধরে যেন এই উন্মত্ত জলোচ্ছ্বাসের মাঝে কোনোমতে টিকে থাকার একটা মরিয়া আশ্রয় খুঁজছিল।
এই চরম, মাদকতাময় দহনের মাঝখানেই, যখন তাদের পারিপার্শ্বিক জ্ঞান প্রায় বিলুপ্তির পথে—ঠিক তখনই একটা শব্দ আছড়ে পড়ল।
‘ঠক... ঠক... ঠক...’
দরজায় ঠোকা দেওয়ার শব্দ।
রিভলভিং চেয়ারের ওপর মা এবং ছেলের ওই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা শরীরদুটো যেন এক লহমায় পাথর হয়ে গেল। রাহুলের ঠোঁটটা ইন্দিরার খোলা লালাচ্ছন্ন গলার কাছেই জমে গেল। ইন্দিরার হৃৎপিণ্ডটা যেন এক সেকেন্ডের জন্য স্পন্দিত হতেই ভুলে গেল। দুজনেরই শ্বাস গলার কাছে আটকে আছে।
(continued in the next post...)
RE: The Barter System (By:andygarfield) -
Bad Boy - 09-05-2026
(continuation...)
দরজার ওপার থেকে ভেসে এল গঙ্গা মাসির সেই চেনা, হিন্দি মেশানো গলা।
"ম্যাডাম জি... আপ আন্দর হ্যায় ক্যায়া?"
ইন্দিরা নিজের চোখদুটো ভয়ে বড় বড় করে রাহুলের দিকে তাকালেন। তাঁর পুরো শরীরটা তখন একটা প্রবল প্যানিক অ্যাটাকে কাঁপছে। তিনি একটা ঢোক গিলে, নিজের গলাটা পরিষ্কার করে, যতটা সম্ভব স্বাভাবিক এবং শান্ত শোনানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে বললেন:
"হ্যাঁ... হ্যাঁ গঙ্গা। আমি তো ভেতরেই আছি। কী হলো?"
গঙ্গা মাসির গলাটা দরজার ওপার থেকে একটু চিন্তিত শোনাল। "ওহ... কুছ নহী ম্যাডাম জি। আপনে রাহুল বাবা কো দেখা হ্যায় ক্যায়া কঁহী?"
ইন্দিরার বুকটা ধক করে উঠল। তিনি রাহুলের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত চাপা, কাঁপা গলায় বললেন, "না তো। আমি তো ওকে দেখিনি। কেন? কী হয়েছে?"
গঙ্গা মাসি ওপার থেকে জানাল, "আরে, থোড়ি দের পেহলে বাবা নে মুঝসে চায়ে মাঙ্গা থা। ম্যায়নে বোলা কি পোছা খতম করকে বানা দুঙ্গী। আভি চায়ে বানাকে উনকে কামরে মে গ্যয়ি, তো দেখা কি বাবা তো আন্দর হ্যায় হি নহী। পুরা ঘর ঢুঁড় লিয়া, কঁহী নহী মিলে।"
এই কথাটা শোনার পর ইন্দিরা এবং রাহুল দুজনেরই চোখ কপালে উঠল। রাহুলের মনে পড়ে গেল, সত্যিই তো! ও মাসিকে এক কাপ চা করে দিতে বলেছিল। কিন্তু মাসি ফ্লোর মুছতে এত দেরি করছিল, আর ঠিক সেই সময়েই বাবা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় ও এতটাই এক্সাইটেড হয়ে পড়েছিল যে চায়ের কথা বেমালুম ভুলে সোজা মায়ের ঘরে চলে এসেছিল।
ইন্দিরা রাহুলের দিকে তাকিয়ে একটা কৃত্রিম, শাসন-মেশানো বিরক্তির দৃষ্টি হানলেন। কিন্তু গঙ্গা মাসিকে তো কিছু একটা বলতে হবে। তিনি অত্যন্ত চতুরতার সাথে গলার স্বরটা পালটে বললেন:
"ওহ, আচ্ছা। তুই চিন্তা করিস না গঙ্গা। ও বাড়িতেই কোথাও আছে, হয়তো ব্যালকনিটার দিকে গেছে বা কিছু। তুই এক কাজ কর, নিচে গিয়ে ওর চা টা ডাইনিং টেবিলে ঢাকা দিয়ে রাখ। আমি ওকে টেক্সট করে দিচ্ছি যে ওর চা রেডি।"
"ঠিক হ্যায় ম্যাডাম জি," গঙ্গা মাসি বলল। তারপর স্পষ্ট শোনা গেল ওর পায়ের চটির শব্দটা সিঁড়ি দিয়ে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে।
পায়ের শব্দটা পুরোপুরি মিলিয়ে যাওয়ার পর, ঘরের ভেতরের ওই বদ্ধ বাতাসে একটা দীর্ঘ, রুদ্ধশ্বাস স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার শব্দ শোনা গেল। দুজনেই যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার মতো করে হাঁপাতে শুরু করল।
ইন্দিরা এক ঝটকায় রাহুলের নাকটা নিজের দুই আঙুল দিয়ে বেশ জোরেই টিপে ধরলেন।
"আস্ত একটা গাধা তুই!" তিনি ফিসফিস করে, দাঁতে দাঁত চেপে ধমকে উঠলেন। "তোর মনে ছিল না যে তুই ওকে চা বানাতে বলেছিস? আর সেই অবস্থাতেই তুই আমার ঘরে এসে... "
রাহুল নিজের নাকটা ছাড়িয়ে নিয়ে বড্ড অপরাধী, কাঁচুমাচু মুখে বলল, "আই অ্যাম সো সো সরি মা... আমার সত্যিই মাথা থেকে একদম বেরিয়ে গেছিল। বাবা যেই বাজার করতে বেরোল, আমার মাথায় আর কিচ্ছু কাজ করছিল না... আমি সোজা তোমার ঘরে চলে এসেছিলাম।"
ইন্দিরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের কপালে হাত দিলেন। "উফ্... তোকে নিয়ে কী করব বল তো? তোকে আমি কতবার বলেছি এসব জিনিস কতটা রিস্কি... তুই কি সত্যিই একদিন আমার হার্ট অ্যাটাক করিয়ে তবে শান্তি পাবি?"
রাহুল মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে অত্যন্ত আদুরে, তোতলানো গলায় বলল, "ওহ মা, প্লিজ... ওরম উল্টোপাল্টা কথা বলতে বারণ করেছি না তোমায়? সবকিছু তো ঠিকঠাকই মিটে গেল। মাসি তো নিচেই চলে গেছে।"
ইন্দিরা ওকে নিজের কোল থেকে একটু ঠেলে সরানোর চেষ্টা করে বললেন, "এবার তুইও নিচে যা। তোর চা জুড়িয়ে জল হয়ে যাবে।"
রাহুল একটুও না নড়ে, মায়ের চোখের দিকে এক চরম তৃপ্ত, নেশাগ্রস্ত হাসি হেসে বলল, "ঠিক আছে মা... তবে... আমার আর এখন চা না খেলেও চলবে... তোমাকে চুমু খেয়ে নিয়েছি... আমার পেট এমনিতেই ভরে গেছে... আর আমার কিচ্ছু খাওয়ার দরকার নেই।"
ছেলের এই নির্লজ্জ, অথচ ভালোবাসায় মাখানো কথাটা শুনে ইন্দিরার গালদুটো আবার লাল হয়ে উঠল। তিনি ওর কাঁধের ওপর একটা মৃদু, আদুরে চড় কষিয়ে বললেন, "থাম তো... অসভ্য, দুষ্টু ছেলে কোথাকার! মার সাথে খালি দুষ্টুমি, না?"
রাহুল কিন্তু সাথে সাথে উঠল না। রিভলভিং চেয়ারের ওপর মায়ের কোলে বসে থাকা অবস্থাতেই ও আরও কয়েক মুহূর্ত ইন্দিরার ওই আরক্তিম, মায়াবী মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। ওর দু'চোখে তখন এক গভীর, অতলস্পর্শী তৃপ্তির নেশা, যা গত কয়েক সপ্তাহের সমস্ত যন্ত্রণাকে ভুলিয়ে দিয়েছে। ও নিজের ডান হাতটা তুলে খুব আলতো করে ইন্দিরার উষ্ণ গালটা ছুঁল। ওর বুড়ো আঙুলটা অত্যন্ত মমতায় ইন্দিরার একটু আগের সেই লালাসিক্ত, স্ফীত ঠোঁটের কোণটা স্পর্শ করল। তারপর এক ঘোরের বশে, বুক-চেরা স্বস্তির সাথে ফিসফিস করে বলল:
"থ্যাঙ্ক ইউ, মা... থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ। তুমি জানো না, ঠিক এভাবেই তোমাকে আবার কাছে পাওয়ার জন্য, তোমার ওই স্বাদটা আবার ফিল করার জন্য এই ক'টা দিন আমি কী পাগলের মতো ওয়েট করেছি! আমার যে কী ভালো লেগেছে মা... আমি বলে বোঝাতে পারব না। তুমি আমাকে জাস্ট বাঁচিয়ে দিলে।"
ছেলের এই সরাসরি, বুক-খোলা কৃতজ্ঞতা আর তীব্র ভালোবাসার অভিব্যক্তিতে ইন্দিরার ভেতরের শেষ কৃত্রিম বিরক্তিটুকুও গলে গেল। তাঁর চোখদুটো অসীম প্রশ্রয়ে আর এক গোপন ভালোলাগায় নরম হয়ে এল। তিনি রাহুলের ওই হাতের ওপর নিজের হাতটা রেখে, একটা গভীর, স্নেহমাখা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিসফিস করলেন, "পাগল ছেলে আমার... এত সুন্দর সুন্দর করে কথা বলতে কোত্থেকে শিখলি বল দেখি? যাই হোক, এবার যা... আর দেরি করিস না, মাসি আবার খুঁজতে আসবে।"
মায়ের এই নরম সম্মতির পর, রাহুল বাধ্য ছেলের মতো রিভলভিং চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। ওর শরীর তখন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে। রাহুল নিজের টি-শার্টটা একটু ঠিক করে নিয়ে বলল, "আমি মাসিকে বলে দেব যে আমি বাথরুমে ছিলাম, পটি করছিলাম... তাই শুনতে পাইনি।"
ইন্দিরা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন।
হঠাৎ রাহুলের মাথায় একটা কথা খেলে গেল। "ওহ বাই দ্য ওয়ে, তুমি তো মাসিকে বললে যে তুমি জামাকাপড় পালটাচ্ছ... মাসি তো ভাবল তুমি বাইরে কোথাও বেরোবে। এখন কি হবে?"
ইন্দিরা একগাল প্রশ্রয়ের হাসি হেসে নিজের শাড়ির আঁচলটা ঠিক করতে করতে বললেন, "ওহ, ওসব নিয়ে তোকে মাথা ঘামাতে হবে না। আমি ঠিক ম্যানেজ করে নেব। আমি গিয়ে বলব যে আমার ওষুধের স্ট্রিপটা খুঁজে পাচ্ছিলাম না বলে বেরোনোর জন্য রেডি হচ্ছিলাম ফার্মেসিতে যাব বলে, কিন্তু পরে ড্রয়ারের ভেতর পেয়ে গেছি, তাই আর যাইনি।"
রাহুল মুগ্ধ চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। "বাপ রে! সো স্মার্ট মা... তুমি তো দেখছি লজিক বানাতে একদম ওস্তাদ!"
ইন্দিরা হাসলেন। তারপর রাহুল যখন দরজার দিকে এগোচ্ছে, তিনি একটু গম্ভীর, অথচ প্রচ্ছন্ন হাসির সুরে বললেন:
"আর শোন রাহুল... নিচে গিয়ে গঙ্গা মাসিকে বলবি আমার জন্য এক কাপ কফি বানিয়ে দিতে। তবে এখন নয়, ঠিক পনেরো মিনিট পর ওপরে দিয়ে যেতে বলবি। বুঝতে পেরেছিস?"
রাহুল একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "কেন মা, ওকে বললে ও তো এখনই দিয়ে যাবে..."
ইন্দিরা ওর চোখের দিকে এক অদ্ভুত, রহস্যময় এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল দৃষ্টিতে তাকালেন। তাঁর গলার স্বরটা এবার এক গভীর, মাদকতাময় ফিসফিসানিতে নেমে এল।
"না সোনা, পনেরো মিনিট পরে দিতে বলিস... একটু বাথরুমে যেতে হবে এখন..."
রাহুলের একটা ঢোক গিলে মাথা নেড়ে বলল, "ওকে মা... আমি বলে দিচ্ছি..."
রাহুল দরজা খুলে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল। আর ইন্দিরা সেই শূন্য ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে, নিজের ফর্সা হাতের আঙুলগুলো দিয়ে নিজের জ্বলন্ত গালদুটো ছুঁয়ে, এক দীর্ঘ, গভীর তৃপ্তির শ্বাস নিলেন।
চেন্নাই পাড়ি দেওয়ার ঠিক আগে, মে মাসের শেষ সপ্তাহটা যেন এক অদ্ভুত, দমবন্ধ করা ব্যাকুলতায় কেটেছিল। বড় কোনো সুযোগ নেই, দীর্ঘ কোনো সময় নেই। শুধু এখানে-ওখানে ছড়িয়ে থাকা কয়েকটা পলক-ফেলা গোপন ক্ষণ।
ক্ষণিকের চাউনি। একটুখানি ছোঁয়া। একটা অসম্পূর্ণ দীর্ঘশ্বাস।
বাবার খবরের কাগজের আড়ালে ডাইনিং টেবিলে বসে থাকার সময়, ইন্দিরা যখন জলের গ্লাসটা রাহুলের দিকে এগিয়ে দিতেন, তখন তাঁদের আঙুলগুলো কয়েক সেকেন্ডের জন্য একে অপরকে ছুঁয়ে থাকত। আঙুলের ডগায় ওই সামান্য ঘর্ষণ। আর তাতেই যেন হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ খেলে যেত দুজনের শিরায় শিরায়। বিকেলে সুব্রত যখন নিজের ঘরে, রান্নাঘরের দরজার আড়ালে চা ছাঁকার সময় রাহুল হয়তো আচমকা একদম পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়ত। নিশ্বাসের দূরত্ব। শাড়ির আঁচলটা লাগত ওর কাঁধে; আর ইন্দিরার হাতটা অজান্তেই কেঁপে উঠত এক নেশাতুর আবেশে।
কখনও বা করিডোর দিয়ে পাশাপাশি হেঁটে যাওয়ার সময়, যখন কেউ কোথাও নেই, রাহুল চকিতে মায়ের ঘাড়ের কাছে একটা উষ্ণ, দ্রুত চুমু এঁকে দিয়েই নিজের ঘরে পালিয়ে যেত। পেছনে রেখে যেত ইন্দিরার একগাল আরক্তিম লজ্জার হাসি। গলার কাছে জমে থাকা এক মিষ্টি উত্তাপ। গভীর রাতে, যখন পুরো বাড়ি ঘুমে আচ্ছন্ন, জল খাওয়ার নাম করে ডাইনিং স্পেসের আবছা আলোয় দুজনের আচমকা দেখা। কোনো কথা না বলে শুধু একে অপরের হাতটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য শক্ত করে ধরে রাখা। চোখের তারায় জমে থাকা অনেক না-বলা কথা। একটা নীরব প্রতিশ্রুতি।
কখনও আবার ব্যালকনিতে কাপড় মেলার সময়, রোদ ঝলমলে দুপুরে রাহুলের একটা দুষ্টু, আদুরে চাহনি ইন্দিরার সমস্ত গাম্ভীর্যকে এক নিমেষে ধুলোয় মিশিয়ে দিত। এই ছোট ছোট, খণ্ডিত মুহূর্তগুলোই ছিল তাদের ওই বিশাল, গোপন ক্যানভাসের একেকটা উজ্জ্বল তুলির টান। এই চুরি করা সময়গুলোই যেন চেন্নাইয়ের ওই দীর্ঘ তিন মাসের বিরহের প্রস্তুতি হিসেবে তাদের দুজনের হৃদয়ের গভীরে এক চিরস্থায়ী, অলঙ্ঘনীয় মোহরের মতো খোদাই হয়ে গিয়েছিল।
১৩.২. ছায়ার অবগুণ্ঠনে এক শাশ্বত অর্ঘ্য
সময়ের আরও এক নিজস্ব প্রবহমান ধর্ম আছে; সে কারও অনুভূতির তীব্রতার কাছে থমকে দাঁড়ায় না। দেখতে দেখতে চোখের পলকে আগস্ট মাস এসে গেল। কলকাতার আর্দ্র, ভ্যাপসা গরমের স্মৃতি পেছনে ফেলে রাহুল তখন আইআইটি মাদ্রাজের নিজস্ব এক যান্ত্রিক, সুশৃঙ্খল এবং ঈষৎ রুক্ষ প্রাত্যহিকতায় সম্পূর্ণভাবে নিজেকে সঁপে দিয়েছে। ওর সেই চিরচেনা, অধ্যবসায়ী মগজটা এখন দিনরাত এক করে ল্যাবরেটরির ডেটা, অ্যালগরিদম আর প্রজেক্টের জটিল সমীকরণের গভীরে ডুব সাঁতার কাটছে। ওর সুপারভাইজার ওর কাজের নিষ্ঠা দেখে মুগ্ধ। কিন্তু ওই বড়সড়, একঘেয়ে হস্টেলের ঘরে, কিংবা ল্যাবের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বদ্ধ বাতাসে ওর অন্তরাত্মা প্রতিনিয়ত এক অমেয়, তৃষ্ণার্ত হাহাকারে পুড়ে খাক হচ্ছিল।
রাহুল ওর মাকে পাগলের মতো মিস করছিল। প্রতিদিন নিয়ম করে অন্তত দু'বার সে বাড়িতে ফোন করে। কিন্তু সেই ফোনকলগুলো বেশিরভাগ সময়ই এমন এক রুটিন-বাঁধা সময়ে হয়, যখন সুব্রত সেন বাড়িতে উপস্থিত থাকেন। ফলে সেই কথোপকথনের ব্যাকরণটাও হয়ে দাঁড়ায় অত্যন্ত মেপে মেপে বলা, যান্ত্রিক কিছু শব্দের আদানপ্রদান। "কী খেয়েছিস?", "প্রজেক্ট কতদূর এগোল?", "রাতে ঠিকমতো ঘুমোচ্ছিস তো?"—এর বাইরে মা ও ছেলের সেই একান্ত নিজস্ব, গোপন, এবং নিবিড় পৃথিবীর কোনো ছোঁয়াই ওই ফোনকলগুলোতে থাকে না। রাহুলের কানটা তৃষ্ণার্ত চাতকের মতো শুধু একটুখানি ওই আদুরে, ফিসফিস করা ডাক শোনার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকে, কিন্তু তা আর হয়ে ওঠে না।
অন্যদিকে, ডক্টর ইন্দিরা সেনের অবস্থাও কিছুমাত্র ভিন্ন ছিল না। বাইরে থেকে দেখলে তিনি সেই একই প্রাজ্ঞ, রাশভারী, এবং নিখুঁত নারী। ইউনিভার্সিটির লেকচার, পিএইচডি স্কলারদের মিটিং, আর বাড়িতে সংসার সামলানোর মাঝে তাঁর মুখমণ্ডলে কোনো ক্লান্তি বা অভাববোধের ছাপ নেই। তিনি একজন অত্যন্ত পরিণতমনস্কা নারী; তিনি খুব ভালো করেই জানেন, তাঁর এই সাময়িক বিরহ বা মানসিক অস্থিরতার কথা ঘুণাক্ষরেও রাহুলকে বুঝতে দেওয়া চলবে না। ছেলেটা ওর জীবনের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ একটা সুযোগ পেয়েছে। সেখানে দাঁড়িয়ে মায়ের কান্নাকাটি বা দুর্বলতা যদি ছেলেটার ফোকাস নষ্ট করে দেয়, তবে একজন মা হিসেবে তাঁর চেয়ে বড় অপরাধী আর কেউ হবে না। তাই, যখনই রাহুলের সাথে ফোনে বা হোয়াটসঅ্যাপে কথা হয়, ইন্দিরা সব সময় একটা চনমনে, উৎসাহব্যঞ্জক মুখোশ পরে থাকেন। তিনি প্রতিনিয়ত ওকে উদ্বুদ্ধ করেন, বলেন, "আর তো ক'টা দিন সোনা, খুব ভালো করে, মন দিয়ে কাজ কর..."
কিন্তু এই মেকি আত্মবিশ্বাসের আড়ালে, তাঁর বুকের বাঁ দিকের খাঁচাটা যেন প্রতিনিয়ত এক অব্যক্ত যন্ত্রণায় ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছিল। এই বিচ্ছেদ তাঁকে রাহুলের চেয়েও অনেক বেশি গভীরে গিয়ে আঘাত করেছিল। যখন পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ হয়ে যেত, সুব্রত যখন নিজের কাজে মগ্ন, তখন তিনি রাহুলের ফেলে যাওয়া ঘরের দরজার কাছে গিয়ে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকতেন। ওর বিছানার চাদরে, ওর পড়ার টেবিলে তিনি হয়ত নিজের অজান্তেই খুঁজে বেড়াতেন সেই ফেলে আসা এপ্রিল মাসের মাদকতাময় স্মৃতিগুলোকে। নিজের ল্যাপটপের ফোল্ডারে থাকা রাহুলের কিছু ছবি তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা একদৃষ্টে চেয়ে দেখতেন। হয়তো কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠানে তোলা ছবি, কিংবা কলেজ যাওয়ার আগে ক্যাজুয়াল টি-শার্ট পরা মুহূর্ত। কিন্তু ওই নিতান্তই সাধারণ ছবিগুলোতে ওর চওড়া কাঁধ আর অবাধ্য চোখের চাউনি দেখলেই ইন্দিরার স্মৃতির পর্দায় ভেসে উঠত সেই বন্য সমর্পণের রাতে ছেলেটার ওই ঘর্মাক্ত, তৃপ্ত মুখচ্ছবি। সাধারণ ছবির আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই নিবিড়, গোপন স্মৃতিগুলো তাঁর স্নায়ুতন্ত্রে এক অমোঘ, জ্বলন্ত লাভার মতো প্রবাহিত হতো। তাঁর নিজেরই শরীরের প্রতিটি রোমকূপ, প্রতিটি শিরা-উপশিরা যেন ওর সেই উষ্ণ, পুরুষালি, অথচ এক অন্ধ, তৃষ্ণার্ত সমর্পণে ভরা স্পর্শের জন্য হাহাকার করত।
মাঝে মাঝে, মধ্যরাতের নিস্তব্ধ প্রহরে, যখন শোবার ঘরের দেওয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দ ছাড়া আর কোনো স্পন্দন শোনা যেত না, ইন্দিরার ঘুম ভেঙে যেত। তিনি অত্যন্ত সন্তর্পণে, নিঃশব্দে পাশ ফিরে দেখতেন সুব্রত গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন কি না। তাঁর নাক ডাকার একটানা শব্দটা নিশ্চিত করলে, ইন্দিরা খুব সাবধানে বিছানা থেকে নামতেন। পায়ের পাতায় ভর দিয়ে, অন্ধকারের বুক চিরে তিনি এগিয়ে যেতেন নিজের ব্যক্তিগত বাথরুমটির দিকে।
বাথরুমের দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে তিনি যখন ভেতরে ঢুকতেন, সেই পরিচিত টাইলস আর শাওয়ার কিউবিকলটার দিকে তাকালেই তাঁর মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে যেত এক প্রবল, অপ্রতিরোধ্য শিহরণ। তিনি শাওয়ারের কাঁচের পার্টিশনটায় হাত রাখতেন। তাঁর মনে পড়ত সেই চরম বিকেলের কথা। ওই তো ওইখানটায়... ওই জায়গাতেই তো রাহুল ওর সেই স্পন্দনশীল, অনিয়ন্ত্রিত পৌরুষ নিয়ে তাঁর ফর্সা, সাবান-মাখা হাতের তালুতে এক উষ্ণ, আঠালো অমৃতের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল। ইন্দিরা চোখ বন্ধ করে সেই অদৃশ্য, বাতাসে মিলিয়ে যাওয়া গন্ধটা, সেই উত্তাপটা অনুভব করার আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। নিজের অজান্তেই তাঁর হাত চলে যেত নিজের শরীরের সেই গোপন, সংবেদনশীল উপত্যকায়; যেখানে তাঁর নারীসত্তা এবং মাতৃসত্তা মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল।
এমনই এক রাতে, ইন্দিরার সেই অবচেতন তীর্থযাত্রার মাঝপথে হঠাৎ করেই সুব্রতর ঘুম ভেঙে গেল। আধো-ঘুমে, তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখে তিনি হাত বাড়িয়ে দেখলেন পাশের জায়গাটা খালি। বিছানার চাদরটা ঠান্ডা। সুব্রত চোখ কচলালেল, তবে ওঠার চেষ্টা করলেন না, শরীরটা বড্ড ক্লান্ত ছিল তাঁর। কিন্তু চোখটা সামান্য খুলতেই তিনি দেখলেন, বেডরুমের দরজাটা খুব সামান্য একটু ফাঁক করা, আর সেই ফাঁক দিয়ে করিডোরের ওপার থেকে, ইন্দিরার বাথরুমের দরজা গলে একটা অত্যন্ত ক্ষীণ, হলদেটে আলোর রেখা ঘরের মেঝের ওপর এসে পড়েছে।
সুব্রত ওভাবেই পাশ ফিরে শুয়ে রইলেন। মিনিট দশেক পর, পায়ের অত্যন্ত মৃদু, প্রায় নিঃশব্দ আওয়াজ তুলে ইন্দিরা ঘরে ঢুকলেন। তাঁর শ্বাস তখন সামান্য ভারী, আর বুকের ওঠানামাটা অন্ধকারের মধ্যেও একটু বেশিই স্পষ্ট। তিনি খুব সাবধানে বিছানায় উঠতে যাবেন, ঠিক তখনই সুব্রতর তন্দ্রালু, ঈষৎ ঘড়ঘড়ে গলাটা নীরবতা চিরে দিল:
"কী হলো গো ইন্দিরা? মাঝরাতে হঠাৎ উঠলে যে? শরীর ঠিক আছে তো?"
হঠাৎ এই প্রশ্নে ইন্দিরার হৃৎপিণ্ডটা যেন এক লহমায় গলার কাছে ছিটকে উঠে এল। তাঁর শিরদাঁড়া দিয়ে এক বরফ-শীতল আতঙ্কের স্রোত নেমে গেল। তিনি এক সেকেন্ডের জন্য জমে পাথর হয়ে গেলেন। কিন্তু তাঁর সেই প্রখর, তীক্ষ্ণ মগজটা পরিস্থিতি সামাল দিতে একটুও সময় নিল না।
"ওহ্... তুমি জেগে আছ?" ইন্দিরা নিজের গলার স্বরটাকে যতটা সম্ভব শান্ত এবং স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে বললেন, "তেমন কিছু না... ওই একটু গ্যাসের প্রবলেম হচ্ছিল মনে হয়। পেটটা কেমন ভারী ভারী লাগছিল, তাই একটু বাথরুমে গেলাম। এখন ঠিক আছে।"
তিনি খুব সাবধানে সুব্রতর পাশে এসে শুয়ে পড়লেন এবং নিজের গায়ের ওপর চাদরটা টেনে নিলেন। সুব্রত চোখ না খুলেই, অন্ধকারের মধ্যে কয়েকবার গভীরভাবে নাক টেনে বাতাস শুঁকলেন। তাঁর ভুরুদুটো সামান্য কুঁচকে গেল।
"তুমি কি এই মাঝরাতে ডিওডোরেন্ট বা পারফিউম মেখেছ নাকি? কেমন একটা ভাল গন্ধ পাচ্ছি..." সুব্রত ঘুমের ঘোরেই একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
গন্ধটা তাঁর কোনো পারফিউমের নয়, গন্ধটা আসলে ওই লেবুর সুবাস দেওয়া রুম ফ্রেশনারের। বাথরুমের ওই তীব্র স্মৃতির ঘোরে নিজের শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর, তাঁর নারীশরীরের কোনো গোপন, অবাধ্য গন্ধ যাতে বদ্ধ বাতাসে টিকে না থাকে, তার জন্য তিনি সেই এপ্রিলের দুপুরের মতোই অভ্যাসবশত ওই রুম ফ্রেশনারটা স্প্রে করেছিলেন। সেই চড়া, লেবুর গন্ধটাই এখন সুব্রতর নাকে পৌঁছে গেছে। তিনি নিজের ডান হাতের আঙুলগুলো চাদরের নিচে শক্ত করে মুঠো করলেন।
"পারফিউম? ধুর! এই মাঝরাতে আমি পারফিউম মাখতে যাব কোন দুঃখে!" ইন্দিরা অত্যন্ত মসৃণভাবে, একটা চাপা বিরক্তির ভান করে বিড়বিড় করলেন, "জানোই তো... গ্যাসের প্রবলেম হলে বাথরুমের অবস্থাটা বড্ড... মানে, একটু আনপ্লেজেন্ট হয়ে যায়। ওই বিশ্রী গন্ধটা ঢাকতে আমি একটু এয়ার ফ্রেশনার স্প্রে করে দিলাম আর কী।"
সুব্রত তাঁর এই কথাটায় ঘুমের ঘোরেই একটু শব্দ করে হেসে উঠলেন। হাসির দমকে তাঁর বুকের ওপর রাখা হাতটা কেঁপে উঠল। "তা বটে... গ্যাস তো আর লোক বুঝে গন্ধ ছড়ায় না। ঠিকই করেছ।"
তিনি আর কোনো প্রশ্ন না করে পাশ ফিরে, নিজের কোলবালিশটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আবার ঘুমের অতলে তলিয়ে গেলেন।
ইন্দিরা ওভাবেই চিৎ হয়ে শুয়ে রইলেন বেশ কিছুক্ষণ। তাঁর বুকের ভেতরটা তখন হাতুড়ির মতো পিটছে। তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারলেন তাঁর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। তিনি খুব সন্তর্পণে নিজের শাড়ির আঁচলটা তুলে কপালের সেই হিমশীতল ঘামটা মুছে নিলেন। একটা গভীর, রুদ্ধশ্বাস স্বস্তির নিশ্বাস তাঁর ঠোঁট চিরে বেরিয়ে এল। একটা চরম বিপদের হাত থেকে তিনি এযাত্রা বেঁচে গেছেন। শরীরের সেই গোপন, উদ্দাম মুক্তির শেষে স্নায়ু বেয়ে নেমে আসা এক অনিবার্য, মন্থর ক্লান্তি, ভয়, আর এক অদ্ভুত লুকোচুরি খেলার অবর্ণনীয় তৃপ্তিতে তাঁর শরীরটা অবশেষে ঘুমের কোলে ঢলে পড়ল।
(rest of the Chapter in the next post...)
RE: The Barter System (By:andygarfield) -
Bad Boy - 09-05-2026
(rest of the Chapter...)
১৪ই আগস্ট। শুক্রবার।
রাহুলের প্রজেক্ট শিডিউল অনুযায়ী, প্রতি শুক্রবার ওর সুপারভাইজারের সাথে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ রিভিউ মিটিং থাকে। ইন্দিরা এই রুটিনটা খুব ভালো করেই জানেন। আর তাই, গত আড়াই মাস ধরে প্রতি শুক্রবার সকালে তিনি নিয়ম করে রাহুলকে হোয়াটসঅ্যাপে একটা লম্বা, উৎসাহব্যঞ্জক টেক্সট পাঠান। ওই কয়েকটা শব্দ, ওই মাতৃস্নেহে মোড়ানো আশীর্বাদগুলো রাহুলের কাছে কোনো সঞ্জীবনীর চেয়ে কম কিছু নয়; ওগুলো পড়লেই ওর মনে হয়, ওর মায়ের সেই উষ্ণ হাতটা যেন ওর পিঠের ওপর এসে বসেছে।
আজ সকালেও তার কোনো ব্যতিক্রম হলো না। সকাল সাড়ে আটটা বাজতেই ইন্দিরার ফোন থেকে মেসেজটা উড়ে গেল চেন্নাইয়ের আকাশে।
**ইন্দিরা:** "গুড মর্নিং রাহুল। আজকের মিটিংয়ের জন্য তোকে অনেক অনেক গুড উইশেস। জানি তুই ফাটিয়ে দিবি। অল দ্য বেস্ট সোনা। ❤️"
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মেসেজটা ব্লু-টিক হয়ে গেল। স্ক্রিনের ওপরে ভেসে উঠল ‘typing...’।
**রাহুল:** "গুড মর্নিং মা! থ্যাঙ্ক ইউ। কিন্তু আজ আসলে কোনো মিটিং নেই। স্যার আজ ছুটি নিয়েছেন।"
ইন্দিরা একটু অবাক হয়ে নিজের কি-বোর্ডে আঙুল রাখলেন।
**ইন্দিরা:** "তাই নাকি? হঠাৎ ছুটি কেন?"
**রাহুল:** "কাল তো ১৫ই আগস্ট, ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে। আর সেটা এমনিতেই শনিবার পড়ে গেছে, তাই এক্সট্রা কোনো উইকেন্ড হলিডে পাওয়া গেল না। সেই জন্যই স্যার আজকে ফ্রাইডে-টা অফ নিয়ে নিয়েছেন, যাতে একটা লং উইকেন্ড কাটাতে পারেন।"
ইন্দিরার ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
**ইন্দিরা:** "বাহ্! তোদের স্যারের তো দেখছি বেশ সুবিধে! আমার যদি এমন অপশন থাকত! আমাকে তো আজকেও কলেজ ছুটতে হবে। লাঞ্চের পর একটা টানা দু'ঘণ্টার ক্লাস আছে আমার থার্ড ইয়ারের সাথে।"
**রাহুল:** " :laughing: সবাই তো আর আমার মায়ের মতো এত ডেডিকেটেড আর সিরিয়াস প্রফেসর নয়! তুমি তো জাস্ট একটা ওয়ার্কাহোলিক রিংমাস্টার!"
**ইন্দিরা:** "পাকা ছেলে! মাকে নিয়ে ইয়ার্কি? :pouting-face: ❤️"
এর পর বেশ কিছুক্ষণ ধরে তাদের মধ্যে সেই চিরচেনা, রুটিনমাফিক অথচ অত্যন্ত আন্তরিক মা-ছেলের কথোপকথন চলতে লাগল। ইন্দিরা জানতে চাইলেন গতকাল রাতে হস্টেলের মেসে কী খেতে দিয়েছিল। রাহুল যথারীতি মেসের পনিরের তরকারির তীব্র নিন্দা করল, আর বলল যে ও ইন্দিরার হাতের সেই মাটন কষা আর চিকেন কোরমা কতটা মিস করছে। ইন্দিরা ওকে বকা দিলেন, কেন ও রোজ রাতে এত দেরি করে ঘুমোচ্ছে; চোখের নিচে কালি পড়ে যাচ্ছে কি না সেটার খোঁজ নিলেন। আগামী সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই ওর নতুন সেমিস্টার শুরু হয়ে যাবে, সেটা নিয়ে ওর প্রিপারেশন কেমন—সেসব নিয়েও বেশ কিছু কথা হলো।
ধীরে ধীরে, আলোচনার মোড়টা প্রজেক্টের দিকে ঘুরে গেল।
**ইন্দিরা:** "তা, মিটিং না থাকলেও প্রজেক্টের কাজ কতদূর এগোল তোর? আর তো মোটে দুটো সপ্তাহ বাকি। কমপ্লিট করতে পারবি তো ডেডলাইনের আগে?"
রাহুলের তরফ থেকে রিপ্লাই আসতে এবার কয়েক সেকেন্ড বেশি সময় লাগল।
**রাহুল:** "হ্যাঁ মা, একদম লাস্ট ফেজে আছি। আর সেই জন্যই প্রেশারটা এখন দশ গুণ বেড়ে গেছে। ডেটা অ্যানালিসিসগুলো কিছুতেই ঠিকঠাক মিলছে না, বারবার রান করাতে হচ্ছে। খুব স্ট্রেসফুল যাচ্ছে গত কয়েকটা দিন। মাথাটা যেন ফেটে যাচ্ছে মাঝে মাঝে।"
মেসেজটা পড়ে ইন্দিরার বুকের ভেতরটা এক ঝটকায় ভারী হয়ে উঠল। তিনি খুব ভালো করেই জানেন, তাঁর এই ছেলেটা পড়াশোনা নিয়ে কতটা সিরিয়াস, আর কতটা নিখুঁতভাবে ও কাজ করতে চায়। কিন্তু এই প্রথমবার, ওর এত বড় একটা মানসিক চাপের সময়, তিনি ওর পাশে নেই। তিনি ওর কপালের ঘামটা মুছে দিতে পারছেন না, ওর মাথায় হাত বুলিয়ে ওকে শান্ত করতে পারছেন না। তাঁর মাতৃসত্তা এক অদ্ভুত অসহায়তায় ডুকরে কেঁদে উঠল।
**ইন্দিরা:** "ওহ্ সোনা আমার... আমি বুঝতে পারছি তোর ওপর কতটা চাপ যাচ্ছে। প্লিজ বাবু, মাঝে মাঝে একটু ব্রেক নিবি। একটানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকবি না। আর মাত্র তো কয়েকটা দিন... তারপরই তো তুই বাড়ি ফিরে আসবি। জাস্ট হোল্ড অন সোনা, অ্যান্ড কিপ গোয়িং।"
**রাহুল:** "আমি জানি মা... কিন্তু আমি সত্যি আর পারছি না। আমি তোমাকে বড্ড মিস করছি মা... জাস্ট বড্ড বেশি মিস করছি।"
এই কথাটা এর আগেও রাহুল বহুবার বলেছে, কিন্তু আজকের এই 'মিস করছি' শব্দগুলোর ওজন যেন অনেক বেশি। এর মধ্যে লুকিয়ে আছে এক চরম অবসাদ আর একাকীত্বের হাহাকার। ইন্দিরার চোখদুটো ঝাপসা হয়ে এল।
**ইন্দিরা:** "আমি জানি রে বাবু... আমারও কি তোকে ছাড়া এক মুহূর্ত ভালো লাগে? তুই ফিরে আয়... আমি কথা দিচ্ছি, তুই বাড়ি ঢুকলে তোকে আমি এমন শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরব যে তুই সব স্ট্রেস ভুলে যাবি। তোকে আমি ছাড়বই না।"
রাহুলের ঘর থেকে আবার 'typing...' দেখা গেল।
**রাহুল:** "শুধু জড়িয়ে ধরবে? কতদিন হয়ে গেল... আমি তোমাকে একটু চুমু খেতে পারিনি মা..."
ইন্দিরার বুকটা ধক করে উঠল। তাঁর আঙুলগুলো স্ক্রিনের ওপর স্থির হয়ে গেল। তিনি চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন, যদিও তিনি নিজের স্টাডি রুমেই একা বসে আছেন।
**ইন্দিরা:** "রাহুল! সোনা, প্লিজ... চ্যাটে এসব লিখিস না বাবু। তুই জানিস এটা ঠিক নয়।"
**রাহুল:** "কেন মা? প্লিজ... আমি এখানে বড্ড একা ফিল করছি... সারাক্ষণ শুধু তোমার কথাই মনে পড়ছে আমার। আমার কিচ্ছু ভালো লাগছে না... ঠিক আছে, তুমি যদি চ্যাটে লিখতে না চাও, আমি তোমাকে কল করছি?"
ইন্দিরা দ্রুত, প্রায় প্যানিকের সাথে টাইপ করলেন।
**ইন্দিরা:** "না না না! একদম কল করবি না এখন সোনা! তোর বাবা ওই পাশের ছোট স্টাডি রুমটায় বসে ল্যাপটপে কাজ করছে, ও পরিষ্কার সব শুনতে পাবে। প্লিজ সোনা, ট্রাস্ট মি... তুই যদি এখন আমার সামনে থাকতিস, আমি তোকে হাজার হাজার বার আদর করতাম, তোকে সারা মুখে চুমু খেতাম... আমার সোনা ছেলে, আমার বাবু, আমার পুচু... প্লিজ মা-কে একটু বোঝার চেষ্টা কর।"
রাহুলের দিক থেকে কয়েক সেকেন্ড কোনো রিপ্লাই এল না। তারপর একটা মেসেজ ঢুকল।
**রাহুল:** "জানো মা... মাঝে মাঝে রাতে যখন আমি শুয়ে থাকি, আমি চোখ বন্ধ করে ইমাজিন করি যে তুমি আমার ঠিক পাশেই শুয়ে আছো... একদম সেই রাতের মতো... আমরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আছি..."
ইন্দিরা চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর নিজের গালদুটো তখন ভিজে উঠেছে।
**ইন্দিরা:** "ওহ্ সোনা... তুই আমাকে কাঁদাবি এবার। তুই কি সারাক্ষণ এভাবেই স্যাড হয়ে থাকিস ওখানে?"
**রাহুল:** "হ্যাঁ মা... তুমি তো জানো তুমিই আমার সবকিছু... যখন আমি পড়াশোনা করি না, তখন আমার মাথায় শুধু তুমি আর তুমিই ঘুরপাক খাও। আর যখন এই স্ট্রেস আর ফ্রাস্ট্রেশনটা একদম লিমিট ক্রস করে যায়... তখন আমি তোমার ওই ছবিটা বের করে দেখি... আর বিশ্বাস করো, কিছুক্ষণ ওই ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকলে আমার ভেতরটা অনেকটা শান্ত হয়ে যায়।"
ইন্দিরা ভুরু কুঁচকে স্ক্রিনের দিকে তাকালেন। ছবি? কোন ছবির কথা বলছে রাহুল? তাঁর মগজটা একটু পেছনের দিকে দৌড়ল, আর পরক্ষণেই তাঁর স্মৃতিতে একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল।
**ইন্দিরা:** "কোন ছবি? তুই... তুই কি কয়েক মাস আগের সেই বাথরুমের ছবিটার কথা বলছিস? ওহ্ মাই গড, সোনা! তুই এখনও ওই ছবিটা নিজের ফোনে রেখে দিয়েছিস? আমি তোকে সেদিন ওটা ডিলিট করতে বলেছিলাম না? কেউ দেখে ফেললে কী কেলেঙ্কারিটা হতে পারে ভাবতে পারছিস?"
ইন্দিরার আঙুলগুলো এবার রাগে নয়, এক চরম উদ্বেগে কাঁপতে শুরু করল। তিনি দ্রুত টাইপ করলেন:
**ইন্দিরা:** "তোর তো একজন রুমমেট আছে না? কী যেন নাম ওর?"
**রাহুল:** "উদয়ন।"
**ইন্দিরা:** "হ্যাঁ, উদয়ন! যদি ও কোনোভাবে তোর ফোন ঘাঁটতে গিয়ে ওটা দেখে ফেলে? তুই ডিলিট করিসনি কেন রাহুল? তুই মায়ের কথা কেন শুনিসনি?"
রাহুল বুঝতে পারল মা কতটা প্যানিক করছে। ও অত্যন্ত শান্তভাবে, পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে লিখল:
রাহুল: "মা, প্লিজ... আগে একটু শান্ত হও মা। তুমি যদি এটা ভেবে ভয় পাও যে অন্য কেউ ছবিটা দেখে ফেলবে, তাহলে বিশ্বাস করো, এই পৃথিবীতে আমি ছাড়া আর কারো ওটা দেখার কোনো চান্স নেই। ছবিটা আমার ফোনের এমনি গ্যালারিতে নেই মা, ওটা পাসওয়ার্ড দিয়ে লক করা একটা হিডেন ফোল্ডারের ভেতর সেভ করা আছে। আর উদয়ন? ও তো আমার অনেক আগেই রাতে ঘুমিয়ে কাদা হয়ে যায়। তাছাড়া ওর বিছানাটা এমন দিকে যে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখারও কোনো উপায় নেই আমি ফোনে কী করছি। তাই প্লিজ মা, তুমি একদম চিন্তা কোরো না।"
ইন্দিরা মেসেজটা পড়ে একটু স্বস্তি পেলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর ভেতরের সেই অভিভাবক সত্তাটা তখনও পুরোপুরি শান্ত হয়নি।
**ইন্দিরা:** "ওকে, আমি মানলাম উদয়ন দেখবে না। কিন্তু আমি তো তোকে সেদিনই ওটা ডিলিট করতে বলেছিলাম, তাই না? তুই কেন করিসনি? মায়ের কথা শুনতে তোর কী প্রবলেম হয় রাহুল?"
**রাহুল:** "মা, প্লিজ... আমার সিচুয়েশনটা একটু বোঝার চেষ্টা করো। হ্যাঁ, আমার অনেক আগেই তোমাকে বলা উচিত ছিল যে আমি ওটা ডিলিট করিনি। আই অ্যাম সো সরি ফর দ্যাট মা। আসলে এত কিছু হচ্ছিল তখন, আমি সুযোগই পাইনি তোমাকে বলার। কিন্তু মা, আমি তোমার পায়ে পড়ছি... প্লিজ আমাকে ওটা ডিলিট করতে বোলো না।"
ইন্দিরা একটু নরম হলেন। তাঁর আঙুলের গতি ধীর হয়ে এল।
**ইন্দিরা:** "কী হয়েছে সোনা? তুই এমনভাবে কথা বলছিস কেন?"
রাহুল: "আমার ফোনে তোমার খুব বেশি ছবি নেই মা। এমনিতে তো তুমি ছবি তুলতে বা ক্যামেরার সামনে পোজ দিতে একদম পছন্দ করো না, আমি জানি। কিন্তু এই ছবিটা... এই ছবিটা আমার কাছে বড্ড স্পেশাল, মা। এটা তুমি নিজের হাতে তুলেছিলে... শুধুমাত্র আমার জন্য। এটা তোমার তরফ থেকে পাওয়া আমার সবচেয়ে দামি উপহার। আর সত্যি বলতে কী, এটাই এখন আমার একমাত্র ওষুধ মা। যখন প্রচণ্ড স্ট্রেস হয়, যখন মনে হয় আমি আর একদম পারছি না... আমি তখন ওই ফোল্ডারটা খুলে তোমার ওই রূপটার দিকে তাকিয়ে থাকি। তখন আমার মনে হয়, তুমি আমার একদম পাশেই আছো। আমার ভেতরটা কেমন যেন শান্ত হয়ে যায়, মা।"
মেসেজটা পড়ে ইন্দিরার বুকের ভেতরটা যেন একটা বিশাল, অতলস্পর্শী ভালোবাসার সমুদ্রে পরিণত হলো। তাঁর চোখের কোল বেয়ে জলের ধারা নেমে এল। তাঁর এই বাচ্চা ছেলেটা, তাঁর বাবুসোনাটা, তাঁর পাঠানো ওই চরম ব্যক্তিগত, নিষিদ্ধ একটা ছবিকে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি রত্নের মতো আগলে রেখে দিয়েছে! ও ওই ছবিটার মধ্যে খুঁজছে ওর মায়ের সেই আদিম, নিঃশর্ত আশ্রয়টাকে।
ইন্দিরা কি নিজেও এই ছেলেটার জন্য ঠিক এমনটাই অনুভব করেন না? তিনি একজন পরিণতমনস্কা নারী, তিনি তাঁর আবেগগুলোকে সমাজের কঠিন আবরণে ঢেকে রাখতে জানেন। কিন্তু তাঁর এই ছোট্ট ছেলেটা, যে আজ হাজার কিলোমিটার দূরে, সম্পূর্ণ একা, তার নিজের মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দিনের পর দিন একটা অচেনা পরিবেশে লড়াই করছে—সে যদি তার মায়ের একটুখানি সান্নিধ্যের জন্য ওই ছবির দ্বারস্থ হয়, তবে সেটা কি খুব অস্বাভাবিক?
ইন্দিরা ভাবলেন, রাহুল কতটা ম্যাচিওর! ও ছবিটাকে একটা পাসওয়ার্ড-প্রোটেক্টেড ফোল্ডারে লুকিয়ে রেখেছে, শুধু তাঁর প্রাইভেসি, তাঁর সম্মান রক্ষা করার জন্য। এমন একটা সমঝদার, মিষ্টি আর দায়িত্বশীল ছেলের কাছ থেকে তিনি কীভাবে ওর ওই একমাত্র বাঁচার রসদটুকু কেড়ে নিতে পারেন? কোন অধিকারে?
তিনি নিজের শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখদুটো মুছে নিয়ে অত্যন্ত নরম, মমতায় মোড়ানো আঙুলে টাইপ করলেন:
**ইন্দিরা:** "সোনা... প্লিজ শুধু একটু সাবধান থাকিস, ওকে? তুই খুব ভালো করেই জানিস ওটা মায়ের কতটা প্রাইভেট আর সেনসিটিভ একটা ছবি... জাস্ট খেয়াল রাখিস যাতে কারও চোখে না পড়ে।"
এতক্ষণ ইমোশনাল হয়ে থাকলেও, রাহুল মায়ের এই মেসেজটা পেয়ে নিজের সেই চিরচেনা, ফাজিল ফর্মে ফিরে এল।
**রাহুল:** "কেউ না? তাহলে তো আমিও আর দেখতে পাব না..."
ইন্দিরা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে একটা কপট রাগের ইমোজি ( :unamused-face: ) দিলেন, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনি এক অদ্ভুত তৃপ্তি আর আনন্দ পাচ্ছিলেন এই ভেবে যে, তাঁর ছেলেটা অন্তত একটু হলেও হালকা ফিল করছে।
**ইন্দিরা:** "তোর কি মুখের কোনো লাগাম নেই রে বাঁদর ছেলে? এত সিরিয়াস ইমোশনাল কথার মাঝখানেও তোকে একটা স্টুপিড ইয়ার্কি মারতেই হবে, তাই না?"
**রাহুল:** "সরি মা :laughing: ... দেখলে তো? তোমার সাথে জাস্ট একটুখানি চ্যাট করলেই আমার সারা দিনের মুড কেমন ম্যাজিকের মতো ভালো হয়ে যায়। এনিওয়ে... তার মানে তুমি বলছ, আমি তোমার ওই ছবিটা দেখতে পারি, তাই তো মা?"
ইন্দিরা: "হ্যাঁ রে বাবা হ্যাঁ, আমার সোনা বাবু তার মায়ের ছবি যখন খুশি, যতবার খুশি দেখতে পারে। কারণ... ওটা তো শুধুই তোর জন্য তোলা রে সোনা।"
রাহুলের দিক থেকে এবার কোনো ইয়ার্কি এল না। ও অত্যন্ত আন্তরিকতা আর গভীরতার সাথে লিখল:
**রাহুল:** "মা, তোমাকে আমি বড্ড ভালোবাসি। তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না।"
মেসেজটা পড়ে ইন্দিরার চোখের জল আর বাধা মানল না। একজন মা হিসেবে তিনি বুঝতে পারছিলেন ওই ছোট্ট বাক্যটার পেছনে কতটা তীব্র আর খাঁটি আবেগ লুকিয়ে আছে। তাঁর মনে হচ্ছিল, সব কাজ, সব দায়িত্ব ফেলে এক্ষুনি একটা ফ্লাইট ধরে চেন্নাই চলে যান, আর ছেলেটাকে বুকের মধ্যে এমনভাবে পিষে ধরেন যাতে ওর সমস্ত কষ্ট দূর হয়ে যায়। আর... আর ওর সারা মুখে আর গায়ে নিজের সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে চুমু খেতে থাকেন।
তিনি চোখের জল মুছে হঠাৎ ঘড়ির দিকে তাকালেন। ন'টা বেজে পঁয়তাল্লিশ মিনিট। তাঁকে এবার রেডি হতেই হবে। কিন্তু তিনি কিছুতেই এই চ্যাটটা এখন ছেড়ে উঠতে পারছিলেন না। তাঁর ছেলের এখন তাঁকে দরকার, আর তিনি যতক্ষণ সম্ভব ওর সাথে এভাবেই কথা বলে যাবেন। তাই তিনি ঠিক করলেন, চ্যাট করতে করতেই তিনি রেডি হবেন।
**ইন্দিরা:** "আমিও তোকে বড্ড ভালোবাসি রে সোনা। শোন, আমাকে তো এবার কলেজের জন্য রেডি হতে হবে। তুই ততক্ষণ বল তো, প্রজেক্টে আর নতুন কী কী করলি?"
রাহুল উৎসাহের সাথে বলতে শুরু করল, কীভাবে ওদের টিমের একটা বড় ক্যালকুলেশন আটকে ছিল, আর তারপর ওদের প্রফেসর কীভাবে একটা ব্রিলিয়ান্ট আইডিয়া দিয়ে পুরো প্রবলেমটা সলভ করে দিলেন।
এদিকে, নিজের ঘরের শান্ত পরিবেশে দাঁড়িয়ে ইন্দিরা তাঁর পরনের আরামদায়ক, হালকা সুতির ঘরের শাড়িটার আঁচল খসিয়ে দিলেন। ফোনটা বিছানার ওপর রাখা। শাড়িটা খুলে ইজিচেয়ারের ওপর রাখতেই মে মাসের গুমোট গরমের মাঝে সিলিং ফ্যানের বাতাস তাঁর অনাবৃত ত্বকে একটা অদ্ভুত আরাম বুলিয়ে দিল। তিনি ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে টাইপ করলেন:
**ইন্দিরা:** "বাহ্! তোদের স্যার তো দেখছি সত্যি খুব ব্রিলিয়ান্ট। এমন প্রফেসরের আন্ডারে কাজ করাটাও তো একটা বড় এক্সপেরিয়েন্স।"
মেসেজটা পাঠিয়ে তিনি নিজের ঘরের সুতির ব্লাউজ আর ব্রা-টার হুক খুলতে শুরু করলেন। হুকগুলো খুলতেই তাঁর মনে পড়ে গেল সেই সকালের কথা, যেদিন রাহুলের উষ্ণ, আনাড়ি আঙুলগুলো এই হুকগুলোর ওপর দিয়েই খেলা করেছিল। একটা অদ্ভুত, নিষিদ্ধ শিহরণ তাঁর মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে গেল। আজ সকালে স্নান সেরে ওঠার পর পরা পরিষ্কার সায়া আর প্যান্টিটা পাল্টানোর কোনো দরকার ছিল না, তাই নিম্নাঙ্গের সেই আবরণটুকু শরীরে অবিকৃত রেখেই তিনি সম্পূর্ণ অনাবৃত বক্ষে আলমারির সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।
রাহুলের রিপ্লাই এল:
**রাহুল:** "হ্যাঁ মা, কিন্তু প্রবলেম হলো স্যার ব্রিলিয়ান্ট ঠিকই, কিন্তু মানুষ হিসেবে বড্ড খিটখিটে। একটু ভুল হলেই এমন রিয়্যাক্ট করেন যেন আমরা মহাভারত অশুদ্ধ করে ফেলেছি। এই লাস্ট উইকগুলোতে ওই জন্যই স্ট্রেসটা বেশি।"
ইন্দিরা আলমারি থেকে তাঁর বাইরে পরার পোশাকটা বের করলেন—সাদা মোটিফ করা একটা গাঢ় বাদামি রঙের সুতির শাড়ি। সাথে মানানসই একটা বাদামি ব্লাউজ আর নিখুঁত ফিটিংয়ের ব্রা। তিনি অভ্যস্ত হাতে ব্রা-টা পরে নিয়ে, ব্লাউজের বোতামগুলো আটকাতে শুরু করলেন।
**ইন্দিরা:** "ওটা সব ফিল্ডেই হয় রে সোনা। বড় মানুষদের একটু টেম্পারামেন্টাল ইস্যু থাকেই। তুই জাস্ট নিজের কাজে ফোকাস রাখ, স্যারের কথায় পার্সোনালি কিছু নিস না।"
ব্লাউজটা পরার পর তিনি বাদামি শাড়ির কুঁচিগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ধরতে শুরু করলেন। শাড়ির খসখস শব্দটা নিস্তব্ধ ঘরে এক অদ্ভুত ছন্দ তৈরি করছিল। তিনি শাড়িটা পরে, আঁচলটা কাঁধের ওপর পিন-আপ করে ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে বসলেন।
**রাহুল:** "চেষ্টা তো করছি মা... কিন্তু মাঝে মাঝে সত্যিই মনে হয় সব ছেড়েছুড়ে সোজা বাড়িতে পালিয়ে আসি। তোমার কোলে মাথা রেখে জাস্ট ঘুমিয়ে পড়ি।"
রাহুলের এই ফিরে আসা স্ট্রেস আর হতাশার কথাটা ইন্দিরার বুকের ভেতর আবার একটা ধাক্কা দিল। তিনি ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে বসে নিজের চুলগুলো চিরুনি দিয়ে আঁচড়াতে শুরু করলেন। তাঁর মুখের রেখাগুলোতে এক প্রচ্ছন্ন ক্লান্তি আর বিষণ্ণতা। তিনি চিরুনিটা নামিয়ে রেখে, নিজের সবচেয়ে প্রিয়, হালকা মেরুন রঙের লিপস্টিকের টিউবটা খুললেন। ঠোঁটে নিখুঁতভাবে রংটা লাগাতে লাগতে তিনি ভাবতে লাগলেন, এই ছেলেটাকে শান্ত করার জন্য তিনি ঠিক কী করতে পারেন?
**ইন্দিরা:** "আর তো মাত্র দু'সপ্তাহ, সোনা। একটু কষ্ট করে ম্যানেজ করে নে। আমি তো আছি।"
রাহুলের তরফ থেকে কয়েক সেকেন্ড কোনো রিপ্লাই এল না। তারপর স্ক্রিনে একটা মেসেজ ফুটে উঠল:
**রাহুল:** "মা, একটা রিকোয়েস্ট করব?"
ইন্দিরা লিপস্টিকের ক্যাপটা আটকে রেখে ফোনটা হাতে নিলেন। তাঁর ভুরুদুটো সামান্য কুঁচকে গেল।
**ইন্দিরা:** "কী রিকোয়েস্ট, সোনা? তুই আবার এমনভাবে বলছিস কেন?"
স্ক্রিনে আবার 'typing...' ভেসে উঠল।
**রাহুল:** "আই মিন... মা... তুমি কি আমাকে আরেকটা ছবি পাঠাবে?"
ইন্দিরা কিছু একটা রিপ্লাই দেওয়ার কথা ভাবছেন, ঠিক তখনই দেখলেন রাহুলের মেসেজটা এডিট হয়ে গেল।
**রাহুল:** "আই মিন... মা... তুমি কি আমাকে ঠিক ওইরকম আরেকটা ছবি পাঠাবে?"
ইন্দিরা এবার পরিষ্কার বুঝতে পারলেন ছেলেটা ঠিক কী চাইছে। তাঁর বুকের ভেতরটা এক প্রবল, বন্য ধাক্কায় কেঁপে উঠল। তাঁর হাতদুটো সামান্য কাঁপছে। তিনি ঢোক গিলে টাইপ করলেন:
**ইন্দিরা:** "সোনা... আরেকটা ছবি? এখন?"
**রাহুল:** "হ্যাঁ মা, প্লিজ।"
ইন্দিরা অত্যন্ত নার্ভাস হয়ে, পরিস্থিতিটাকে একটু ঘোরানোর চেষ্টা করে লিখলেন:
**ইন্দিরা:** "ওয়েল, আমি তো কলেজের জন্য পুরো রেডি হয়ে গেছি সোনা। আমি বরং এখনকার মতো একটা কুইক সেলফি তুলে পাঠিয়ে দিই? সেটা হলে হবে, বাবু?"
রাহুল খুব ভালো করেই জানে, মায়ের ওই অত্যন্ত মার্জিত, শাড়ি-পরা প্রফেশনাল মুখটার ছবি দেখলে ওর মন ভালো হবে ঠিকই, কিন্তু ওর শরীরের ভেতরে জমে থাকা ওই চরম স্ট্রেস আর অবদমিত তৃষ্ণাটা কিছুতেই মিটবে না। আর ইন্দিরাও সেটা খুব ভালো করেই জানতেন। তিনি শুধু নিজের ভেতরের ওই প্রবল, নিষিদ্ধ অনুভূতিটাকে কোনোমতে আটকানোর জন্যই এই কথাটা লিখেছিলেন।
**রাহুল:** "মা প্লিজ। ওই ছবিটার মতো। প্লিজ মা।"
**ইন্দিরা:** "কিন্তু সোনা, আমি তো বললাম আমি বেরোনোর জন্য পুরো রেডি হয়ে গেছি। প্লিজ বোঝার চেষ্টা কর সোনা।"
**রাহুল:** "নিশ্চয়ই কোনো না কোনো উপায় আছে, মা..."
ইন্দিরা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে ভাবলেন। আর পরক্ষণেই তাঁর মাথায় একটা সাংঘাতিক ভয়ংকর চিন্তার উদয় হলো। উদয়ন! রাহুলের রুমমেট! হায় ভগবান! এই মুহূর্তে যদি তিনি এমন কোনো ছবি পাঠান, আর উদয়ন যদি সেটা কোনোভাবে দেখে ফেলে? না, না, তিনি কিছুতেই এই রিস্ক নিতে পারবেন না। তাঁর পেটের ভেতরটা এক অজানা, স্নায়বিক আতঙ্কে গুলিয়ে উঠল।
ঠিক তখনই স্ক্রিনে রাহুলের পরের মেসেজটা ফুটে উঠল।
**রাহুল:** "মা প্লিজ... এখানে কেউ নেই। উদয়ন তো লোকাল ছেলে। স্যার যেহেতু আজ নেই, ও কাল রাতেই নিজের বাড়ি চলে গেছে। সোমবার ফিরবে। এই গোটা ঘরে শুধু আমি আছি, মা। আর আমার ফ্লোরের বাকি স্টুডেন্টদের আজ ক্লাস আছে, নয়তো প্রজেক্টের কাজ আছে, তাই পুরো ফ্লোরটাই একদম ফাঁকা। আমাকে কেউ ডিস্টার্ব করবে না মা। ট্রাস্ট মি।"
মেসেজটা পড়ে ইন্দিরার বুকের ওপর থেকে শুধু যে এক বিশাল পাথর নেমে গেল তা-ই নয়, তিনি এক গভীর বিস্ময় এবং প্রবল আবেগে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন। তিনি তো নিজের আশঙ্কার কথা বা উদয়নের কথা চ্যাটে ঘুণাক্ষরেও লেখেননি! তাহলে রাহুল কী করে এক লহমায় বুঝে গেল যে ওর মা ঠিক কোন ভয়ে গুটিয়ে যাচ্ছেন? এই অলৌকিক মানসিক বোঝাপড়াটা ইন্দিরার বুকের ভেতর ভালোবাসার এক নতুন, অতলস্পর্শী জোয়ার নিয়ে এল। তাঁর এই একমাত্র সন্তান, তাঁর নাড়ি-ছেঁড়া ধন—তাঁর নিজের হৃৎপিণ্ডটা যেমন ওর জন্য প্রতি মুহূর্তে স্পন্দিত হয়, ছেলেটার হৃদয়ও ঠিক সেভাবেই মায়ের প্রতিটি না-বলা কথা, প্রতিটি লুকোনো ভয় নিমিষে পড়ে ফেলতে পারে। বাহ্যিক দুটো আলাদা শরীর হলেও, তারা তো আসলে একটাই সত্তা, একটাই আত্মা! এই অমোঘ সত্যটা উপলব্ধি করতেই তাঁর সেই দীর্ঘ স্বস্তির নিশ্বাসের সাথে সাথেই ধীরে ধীরে এসে বাসা বাঁধল এক শিরশিরে, গোপন উত্তেজনা। তাঁর কাঁপতে থাকা আঙুলগুলো আবার কিপ্যাডের ওপর চলতে শুরু করল।
**ইন্দিরা:** "সোনা... তুই সত্যিই এখন ওরকম একটা ছবি চাস?"
**রাহুল:** "মা... এটা পেলে আমার সব স্ট্রেস, সব কষ্ট এক নিমিষে গায়েব হয়ে যাবে... আমি অনেক বেশি হ্যাপি ফিল করব..."
ইন্দিরা বুঝতে পারছিলেন না তিনি কী লিখবেন। তাঁর ভেতরের সমস্ত লজিক, সমস্ত সমাজ-সংস্কার তখন ওই ছেলেটার আকুলতার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। তিনি শেষমেশ নিজের মনের ওই কাঁপানো, লাজুক অনুভূতিটাই টাইপ করে বসলেন।
**ইন্দিরা:** "সোনা, মায়ের বড্ড লজ্জা করছে রে... অনেকগুলো দিন কেটে গেছে তো..."
**রাহুল:** "মা, এতে লজ্জার কী আছে? আমিই তো আছি এখানে... অন্য কেউ তো নয়, তাই না?"
মেসেজটা পড়ে ইন্দিরা আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারলেন না। "আমিই তো... অন্য কেউ তো নয়"—এই প্রায় একই রকম কথাটা তিনি নিজেই তো রাহুলকে বলেছিলেন, সেই এপ্রিল মাসের ওই দুপুরে, যখন রাহুল বাথরুমের ভেতর তাঁকে প্রথমবার সম্পূর্ণ অনাবৃত অবস্থায় দেখে আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছিল। নিয়তির কী অদ্ভুত খেলা!
ইন্দিরা ফোনটা নামিয়ে রেখে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার দিকে তাকালেন। জানলার পর্দাগুলো খোলা থাকায় পূর্বাহ্ণের কড়া, উজ্জ্বল রোদ এসে পড়েছে তাঁর মুখের ওপর। আয়নার প্রতিবিম্বটায় তিনি দেখলেন, সেখানে রাহুলের সেই আদুরে, প্রশ্রয়দাত্রী 'মা' বসে নেই; সেখানে বসে আছেন ডক্টর ইন্দিরা সেন। তাঁর সেই নিখুঁতভাবে পরা বাদামি শাড়ি, পরিপাটি করে আঁচড়ানো চুল, আর ঠোঁটের ওই মেরুন লিপস্টিক—সব মিলিয়ে তিনি এখন এক অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ, সম্মানিত এবং মাঝে মাঝে ভয়-জাগানো এক অধ্যাপিকার প্রতিমূর্তি। এই প্রখর আলোর নিচে, এই নিখুঁত প্রফেশনাল রূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে তাঁর পক্ষে রাহুলের সেই আকাঙ্ক্ষিত, আদরের 'মা' হয়ে ওঠাটা বড্ড কঠিন ঠেকছিল। এই অবয়বটা বড্ড বেশি কেতাদুরস্ত, বড্ড বেশি আনুষ্ঠানিক। তাঁকে এই আলো আর এই প্রফেশনাল আবরণ থেকে মুক্তি পেতেই হবে।
তিনি ধীর পায়ে উঠে গিয়ে জানলার ভারী, গাঢ় রঙের পর্দাগুলো একে একে টেনে দিলেন। মুহূর্তের মধ্যে সেই কড়া রোদ বাইরে আটকে গিয়ে ঘরের ভেতর নেমে এল এক আবছা, মখমলি অন্ধকার। এই আধো-অন্ধকার পরিবেশে তাঁর ওই রাশভারী প্রফেসরের মুখোশটা যেন ধীরে ধীরে খসে পড়তে লাগল। চারপাশের এই ছায়াঘেরা প্রচ্ছায়া তাঁকে এক নিবিড় নিরাপত্তা দিল; যেন এই অন্ধকারের অবগুণ্ঠনেই তাঁর ভেতরের সেই সত্যিকারের নারী, সেই সমর্পিত মাতৃত্ব তার সমস্ত আড়ষ্টতা ঝেড়ে ফেলে নির্ভয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে।
তিনি বিছানায় ফিরে এসে ফোনটা হাতে নিয়ে টাইপ করলেন:
**ইন্দিরা:** "দাঁড়া সোনা, দেখছি কী করা যায়... আমি তো বেরোনোর জন্য একদম শাড়ি-টারি পরে রেডি হয়ে গেছি, তাই একটু অসুবিধা হবে... আর শোন, ছবিটা কিন্তু একটু অন্ধকার আসবে রে, ঠিক আছে?"
**রাহুল:** "ওহ্ মা, তোমাকে এসব কিচ্ছু বলতে হবে না। তুমি যাই পাঠাও না কেন, সেটা আমার কাছে ওই আগের ছবিটার মতোই পৃথিবীর সবচেয়ে দামি উপহার হয়ে থাকবে।"
এরপর বেশ কয়েক মিনিট চ্যাটবক্সে একটা পিনপতন নীরবতা।
ইন্দিরা ভাবছেন তিনি ঠিক কী করবেন। এক প্রবল, উথালপাথাল করা মাতৃত্ব আর নারীত্বের জলোচ্ছ্বাস তাঁর ভেতরে আছড়ে পড়ছে। অবশেষে তিনি একটা উপায় বের করলেন... হ্যাঁ, এভাবেই করা যেতে পারে... খুব বেশি সময় লাগবে না... আর তাছাড়া... তাঁর ওই বাচ্চা ছেলেটার বুকের ওই পুঞ্জীভূত হাহাকারটাকে তো শান্ত করতেই হবে।
চেন্নাইয়ের হস্টেলের ঘরে বসে রাহুল তখন রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে। ওর হৃৎপিণ্ডটা পাগলের মতো বুকের পাঁজরে ধাক্কা মারছে।
অবশেষে, স্ক্রিনে একটা ইমেজ ফাইল লোড হতে শুরু করল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ছবিটা পুরোটা ফুটে উঠল।
একটা সেলফি।
RE: The Barter System (By:andygarfield) -
Bad Boy - 09-05-2026
ছবিটা খুলতেই রাহুলের বুকের ভেতর সেই পুরনো, চেনা আগ্নেয়গিরিটা সজোরে ফেটে পড়ল। এপ্রিলের সেই প্রথম ছবিটা দেখে ওর যে তীব্র উষ্ণতা আর শিহরণ হয়েছিল, এই মুহূর্তের অনুভূতিটা তার চেয়ে অন্তত দশ গুণ বেশি শক্তিশালী, দশ গুণ বেশি মাদকতাময়। ওর মগজের শিরা-উপশিরাগুলো যেন এক প্রবল উত্তেজনায় ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলো। ওর চোখদুটো ছবিটার প্রতিটা ইঞ্চিতে আটকে গেল। শরীরের সমস্ত রক্ত যেন নিমেষে নেমে এল ওর তলপেটে। অবচেতনভাবেই ওর হাতদুটো চলে গেল ওর ট্র্যাকপ্যান্টের ওপর। কাপড়ের ওপর দিয়েই ও নিজের সেই ঋজু, স্পন্দনশীল, এবং চরম উত্তপ্ত হয়ে ওঠা পৌরুষটিকে শক্ত করে চেপে ধরল।
ঠিক দু-তিন মিনিট পর, ছবির নিচে ইন্দিরার একটা লম্বা মেসেজ ফুটে উঠল। মেসেজটা আদ্যোপান্ত এক মায়ের তার ছেলের প্রতি অন্ধ, নিঃশর্ত এবং সর্বগ্রাসী ভালোবাসায় মোড়ানো।
**ইন্দিরা:** "রাহুল, এটা শুধুই তোর জন্য। আবার বলছি সোনা, প্লিজ সাবধানে রাখিস এটা, বাইরের কারও চোখে যেন না পড়ে। তুই তো জানিস মা তোকে কতটা ভালোবাসে, তাই না? আমার বাচ্চা, আমার সোনা, আমার বাবু, আমার পুচু... মা তোকে ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে পারে না রে। তুই-ই মায়ের সব, মায়ের গোটা পৃথিবী। মা তার বাবুর জন্য সবকিছু করতে পারে, সব..."
মেসেজটা পড়তে পড়তেই রাহুলের শরীরের ভেতরের ওই দাবানলটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল। ও ট্র্যাকপ্যান্টের দড়িটা টেনে আলগা করে দিল এবং নিজের ওই উত্তপ্ত, কাঁপতে থাকা স্পন্দনটিকে সরাসরি হাতের মুঠোয় বের করে আনল। স্ক্রিনের ওপর জ্বলজ্বল করতে থাকা মায়ের ওই মোহময় রূপের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকেই ওর হাতটা চলতে শুরু করল। হাতের ওই ওঠানামার ছন্দে ওর মগজে বিদ্যুতের মতো খেলে গেল সেই এপ্রিলের দুপুরের স্মৃতিটা। বাথরুমের সেই ঠান্ডা জলের নিচে মায়ের নরম, ফর্সা আঙুলগুলো ঠিক এভাবেই তো ওকে ধরেছিল! মায়ের হাতের সেই জাদুকরী, পিচ্ছিল ছন্দের কথা মনে করে রাহুল নিজের হাতের মুঠোটাকে ঠিক সেইভাবেই চালাতে লাগল, যেন ওর নিজের হাত নয়, স্বয়ং মা-ই ওকে আদর করে দিচ্ছে।
ও মেসেজের পরের অংশটা পড়তে শুরু করল:
**ইন্দিরা:** "প্লিজ আর একটুও মন খারাপ করে থাকিস না। আমার ছবিটার দিকে তাকা সোনা, আর ভাব যে মা তোর একদম পাশেই আছে। মা তোকে শান্ত করে দিচ্ছে, ঠিক যেমনটা মা সবসময় করে। মা তোকে নিজের বুকের মধ্যে শক্ত করে পিষে ধরে আছে, যেন আর কোনোদিন তোকে ছেড়ে দেবে না। তোর সারা মুখে, কপালে হাজার হাজার চুমু খাচ্ছে মা। আর হ্যাঁ... ঠোঁটেও খাচ্ছে সোনা... ওই যে... তোর যেরম ভাল লাগে... ঠিক ওইভাবেও চুমু খাচ্ছে সোনা... জিভ দিয়ে... ঠিক সেই দিনের মতো... শুধুই তোর জন্য।"
রাহুলের হাতের ওঠানামার গতি এবার বন্য, রাক্ষুসে হয়ে উঠল। স্ক্রিনের ছবিটার দিকে অপলক তাকিয়ে থেকে ওর মুখ দিয়ে ছিটকে বেরিয়ে আসতে লাগল অস্ফুট, ঘোরে-থাকা কিছু শব্দ। "ওহ্ মা... আমার মা... আমার সুন্দরী মা... বড্ড ভালোবাসি তোমায়..."
ও হাঁপাতে হাঁপাতে মেসেজের পরের অংশটা পড়তে লাগল:
**ইন্দিরা:** "তোর কি এখন একটু ভালো লাগছে, সোনা? আমার মিষ্টি বাবুটা... মা যখন তোর কাছেই আছে, তখন তুই কী করে এত কষ্ট পাস বল তো... মা তো আছেই..."
রাহুলের হাতের মুঠো আরও শক্ত, আরও দ্রুত হয়ে উঠল। "হ্যাঁ মা... আমার বড্ড ভালো লাগছে... খুব খুব ভালো লাগছে... শুধু তোমার জন্য মা... আমার মা... আহ্..." ওর গলা দিয়ে এখন কেবলই কিছু অবাধ্য, স্যাঁতসেঁতে গোঙানি বেরিয়ে আসছিল।
**ইন্দিরা:** "সোনা, আর মাত্র দুটো সপ্তাহ... দেখতে দেখতে কেটে যাবে। তারপরই তুই বাড়ি ফিরে আসবি... তোর মায়ের কাছে ফিরে আসবি। মা তোর জন্য অপেক্ষা করে থাকবে সোনা। তুই বাড়ি ফিরলে, আমি তোকে আগের সব বারের চেয়ে আরও অনেক বেশি শক্ত করে জড়িয়ে ধরব... আমি তোকে এমনভাবে আদর করব, এমনভাবে চুমু খাব যা তুই আগে কোনোদিন পাসনি। সেদিন তুই যেভাবে মায়ের ঘাড়ে আর গলায় তোর জিভ দিয়ে আদর করছিলি... তুই ফিরে এলে আবার ওভাবেই করবি সোনা, যতক্ষণ তোর মন চায়। মা তোকে একটুও বাধা দেবে না। আর মায়ের ওই তিলটা... মা তো জানে মায়ের বাবুসোনা ওই ছোট তিলটা কত ভালোবাসে। তুই ওটাতেও তোর ঠোঁট ছোঁয়াবি, জিভ দিয়ে চাটবি, যেভাবে খুশি আদর করবি। মায়ের বগলের ওই যে গন্ধটা তোকে পাগল করে, ওই যে ছোট ছোট চুলগুলোতে মুখ গুঁজে তুই চুমু খেতে ভালোবাসিস... তুই ফিরে আয় সোনা, মা তোর জন্য ওগুলো আর শেভ করবে না কথা দিয়েছে না? তুই ওখানে যত খুশি মুখ ঘষবি, নাক ঘষবি, চুমু খাবি, চাটতে ইচ্ছে করলে চাটবি... আর সেদিনের মতো যদি দু-একটা চুল তোর মুখে চলেও যায়, তুই একদম চিন্তা করবি না, মা নিজের হাতে তোর মুখ থেকে সেগুলো বের করে দেবে। ওসব তো শুধু তোর জন্যই রে... আর... সোনা... তোর যখনই দরকার হবে... আমি তোকে... তোকে খাওয়াব... মায়ের ঠিক ওইখান থেকে... যেটা তুই এখন ছবিতে দেখছিস..."
মায়ের এই কথাগুলো—অক্ষরের পর অক্ষরে বোনা এক আদিম, সর্বগ্রাসী সমর্পণের প্রতিশ্রুতি—যখন স্ক্রিনে ভাসতে থাকা সেই মোহময়, অনাবৃত দৃশ্যপটের সাথে মিশে গেল, রাহুলের অবচেতন মন আর শরীরের মাঝের শেষ বাঁধটুকুও নিমিষে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। ওর চোখের তারায় তখন এক ঘোরলাগা, উন্মত্ত নেশা। নিশ্বাসের শব্দগুলো ততক্ষণে এক রুদ্ধশ্বাস, ভারী গোঙানিতে পরিণত হয়েছে।
নিচে নেমে যাওয়া ট্র্যাকপ্যান্টের বাঁধন থেকে আগেই মুক্ত হওয়া ওর উন্মুক্ত, ঘর্মাক্ত তলপেট আর নিম্নাঙ্গ এক অপ্রতিরোধ্য, চূড়ান্ত স্পন্দনে টানটান হয়ে গেল। হাতের মুঠোটার শেষ, মরিয়া ওঠানামার সাথে সাথে ওর পুরো শরীরটা শূন্যে একটা ধনুকের মতো প্রবলভাবে বেঁকে এল। মগজের কোষে কোষে আছড়ে পড়া সেই অবর্ণনীয় আবেগের জলোচ্ছ্বাসকে ও আর এক মুহূর্তের জন্যও আটকে রাখতে পারল না।
"আআআহহহহ মাআআআআআআ!!!!"
হস্টেলের ওই ফাঁকা, নিস্তব্ধ ঘরে ওর গলা চিরে একটা বন্য আর্তনাদ বেরিয়ে এল। আর তার সাথেই ওর শরীর থেকে এক উষ্ণ, ঘন, তপ্ত স্রোত প্রবল বেগে ছিটকে বেরিয়ে এসে আছড়ে পড়ল ওর নিজেরই পেটের ওপর, ওর হাতের আঙুলগুলোর ফাঁকে। একটা নিবিড়, অন্ধকারী তৃপ্তি আর তারপর ধেয়ে আসা এক চূড়ান্ত ক্লান্তির ঝলকানি ওর সমস্ত চেতনাকে আচ্ছন্ন করে দিল।
কয়েক মিনিট পর।
রাহুলের বুকটা তখন হাপরের মতো দ্রুত ওঠানামা করছে। সারা শরীর ঘামে ভিজে জবজবে। ও কোনোমতে, ওই ঝাপসা, অশ্রুসজল চোখদুটো দিয়ে মেসেজের একদম শেষ লাইনগুলো পড়ল:
ইন্দিরা: "আর তো মোটে দুটো সপ্তাহ, সোনা। প্লিজ নিজের খেয়াল রাখিস। মন দিয়ে পড়াশোনা করিস, একদম ফোকাস হারাবি না। মায়ের ভালোবাসা আর আশীর্বাদ সবসময় তোর সাথে আছে।"
RE: The Barter System (By:andygarfield) -
Bad Boy - 09-05-2026
চতুর্দশ পরিচ্ছেদ: দূরত্বের মেঘ এবং সীমানার শেষ প্রহর
১৪.১. অবরুদ্ধ শ্রাবণ
আগস্ট মাসের শেষ দিক। তিলোত্তমা কলকাতার আকাশ তখন বর্ষার দীর্ঘস্থায়ী কান্নার শেষে এক ক্ষণস্থায়ী, সিক্ত স্নিগ্ধতায় জিরিয়ে নিচ্ছে। শ্রাবণের সেই একটানা, প্রলয়ঙ্করী বর্ষণ বিদায় নিলেও, ভাদ্রের খেয়ালি মেঘেরা মাঝে মাঝেই ঝেঁপে বৃষ্টি নামিয়ে শহরের পিচগলা রাস্তাগুলোকে ধুয়ে দিয়ে যাচ্ছে। ৩০শে আগস্ট, রবিবার। আইআইটি মাদ্রাজের দীর্ঘ তিন মাসের কঠোর, মেধানিঙড়ানো সামার প্রজেক্টের সফল সমাপ্তি ঘটিয়ে রাহুল আজ তার চিরচেনা শহরের বুকে, নিজের চেনা আশ্রয়ে ফিরে আসছে। কলকাতা এয়ারপোর্ট থেকে বেরোনোর পর গাড়ির কাঁচ দিয়ে বাইরের এই সদ্যস্নাত, ধূলিহীন, সতেজ শহরটাকে দেখতে দেখতে ওর মনে হচ্ছিল, ওর নিজের ভেতরের জমানো তিন মাসের অপেক্ষার ধুলোবালিও যেন ওই বৃষ্টির জলেই ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেছে।
দীর্ঘ নব্বই দিনের বিরহ।
কলকাতার এই সিক্ত, মাতাল করা বাতাসের মতোই রাহুলের বুকের ভেতরটা আজ এক অমেয়, দুর্বিনীত উচ্ছ্বাসে স্পন্দিত হচ্ছে। তিন মাস পর ও আবার ওর মাকে কাছে পাবে। মায়ের সেই চেনা সুবাস, সেই উষ্ণতা, সেই স্পর্শ—সবকিছুই আজ ওর হাতের মুঠোয় ধরা দেবে। ওর স্মৃতির ক্যানভাসে বারবার ফিরে আসছিল সপ্তাহদুয়েক আগের সেই বিশেষ দিনটার কথা। সেই দিন, যেদিন মা ওকে হোয়াটসঅ্যাপে ওই ছবিটা পাঠিয়েছিল—শিক্ষিত মার্জিত রুচিশীল অধ্যাপিকার বসনে মোড়া, অথচ পবিত্র বক্ষবৃন্ত উদ্ভাসিত করা সেই দিব্য দেবীরূপ। সেই ছবির সাথে জুড়ে থাকা মায়ের সেই কথাগুলো—"তুই-ই মায়ের সব, মায়ের গোটা পৃথিবী", "ঠিক ওইভাবেও চুমু খাচ্ছে সোনা... জিভ দিয়ে", "তুই ওটাতেও তোর ঠোঁট ছোঁয়াবি, জিভ দিয়ে চাটবি, যেভাবে খুশি আদর করবি", আর সবশেষে সেই অমোঘ, নেশাতুর প্রতিশ্রুতি..."তোকে খাওয়াব... মায়ের ঠিক ওইখান থেকে"— প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য ওর মগজে ছোটবেলায় মুখস্থ করা নামতার মতোই চিরস্থায়ীভাবে খোদাই হয়ে গেছে।
চেন্নাইয়ের হস্টেলের সেই দীর্ঘ, একাকী রাতগুলোতে, যখন ওর রুমমেট উদয়ন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকত, রাহুল নিজের মাথার ওপর চাদরটা টেনে নিয়ে এক নিভৃত, অন্ধকার ঘেরাটোপ তৈরি করত। সেই ঘেরাটোপের ভেতর, ফোনের স্ক্রিনে ফুটে ওঠা মায়ের ওই দেবীর মতো রূপের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকতে থাকতে ওর শরীর আর মন এক অপার্থিব তৃষ্ণায় হাহাকার করে উঠত। মাঝে মাঝে, যখন আইআইটি ক্যাম্পাসের বিশাল, ছায়াঘেরা রাস্তা দিয়ে ও একা হাঁটত, অথবা ক্যান্টিনের এক কোণে বসে আনমনে টিফিন খেত, তখন মায়ের ওই মেসেজের টুকরো টুকরো শব্দগুলো ওর শিরায় শিরায় আগুন ধরিয়ে দিত। কিছু কিছু রাতে, যখন ছবির সেই ঐশ্বরিক সৌন্দর্য এবং মেসেজের ওই সর্বগ্রাসী সমর্পণের ভাষা ওর সহনশীলতার সমস্ত বাঁধ ভেঙে দিত, রাহুল তখন চাদরের অন্ধকারে নিজের সেই অবাধ্য, স্ফীত পৌরুষটিকে হাতের মুঠোয় ধারণ করত। চোখ বন্ধ করে মায়ের সেই উষ্ণ, মসৃণ ত্বকের কল্পনা করতে করতে ও নিজের ভেতরের সেই উদ্বেলিত, আদিম লাভাস্রোতকে মুক্ত করে দিত—ঠিক যেন নিজের আরাধ্যা দেবীর চরণে এক পরম, খাঁটি এবং পবিত্র অর্ঘ্য নিবেদন করছে। এই শেষ দু'সপ্তাহ ও এভাবেই বেঁচে ছিল।
আজ, গাড়ির নরম সিটে মাথা এলিয়ে দিয়ে, জানলার কাঁচ ভেদ করে বৃষ্টির জলে স্নান করা তিলোত্তমার দিকে তাকিয়ে থাকা রাহুলের মনের ভেতরের পুঞ্জীভূত সমস্ত ক্লান্তি, দীর্ঘ বিরহের হাহাকার আর সেই পুরনো, অহেতুক অপরাধবোধের শেষ চিহ্নটুকুও আর নেই। অনুভূতির আকাশ এখন মেঘহীন নীলের মতো পরিষ্কার, আর ওর লক্ষ্য স্ফটিকের চেয়েও স্বচ্ছ। এই তিনটে মাসের অবদমিত দহন, একাকীত্ব আর হাজারো বিনিদ্র রজনী ওকে একটা পরম সত্য শিখিয়েছে—সমাজের কোনো নিয়ম বা সংস্কারের চেয়ে ওর ভালোবাসা অনেক বেশি সত্যি। এখন আর কোনো সংশয় বা পিছিয়ে আসার জায়গা নেই ওর মনে। বাড়ি ফিরে সে শুধু একটা জিনিসই চায়।
সে তার সত্তার শেষ বিন্দুটি নিংড়ে ঢেলে দিতে চায় মায়ের পরম উত্তাপের গভীরে।
গাড়িটা যখন সেন বাড়ির ড্রাইভওয়েতে এসে ঢুকল, রাহুলের হৃৎপিণ্ডটা গলার কাছে লাফিয়ে উঠল। সদর দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলেন সুব্রত এবং ইন্দিরা।
ইন্দিরার পরনে আজ একটা চাপা, ছাইরঙা সুতির শাড়ি। চোখেমুখে এক প্রচ্ছন্ন, আভিজাত্যপূর্ণ গাম্ভীর্য, যা তিনি সবসময় সুব্রতর সামনে পরিধান করে থাকেন। গাড়ি থেকে নেমে রাহুল যখন এগিয়ে গেল, ওর চোখ দুটো শুধু একটা মানুষের দিকেই স্থির ছিল। ইন্দিরার চোখের কোণে এক ক্ষণিক, বিদ্যুতের মতো খেলে যাওয়া আর্দ্রতা রাহুল স্পষ্ট দেখতে পেল, কিন্তু পরক্ষণেই তা নিখুঁতভাবে ঢেকে গেল এক সাধারণ, মেপে চলা মাতৃসুলভ হাসিতে।
"কেমন আছিস, রাহুল? ফ্লাইটে কোনো প্রবলেম হয়নি তো?" সুব্রত এগিয়ে এসে ছেলের পিঠে একটা সন্তোষজনক, পুরুষালি চাপড় দিলেন।
"না না, কোনো প্রবলেম হয় নি। ফ্লাইট একদম অন টাইম ছিল," রাহুল একটা কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে উত্তর দিল। ওর মনটা তখন হাহাকার করছে মাকে একবার শক্ত করে জড়িয়ে ধরার জন্য। কিন্তু সুব্রতর উপস্থিতিতে সেই সহজ আবেগটুকু প্রকাশ করার কোনো উপায় এই সেন পরিবারে নেই।
ইন্দিরা একটু এগিয়ে এসে অত্যন্ত সাধারণ, পরিমিত ভঙ্গিতে রাহুলের কাঁধে হাত রাখলেন। "খুব ক্লান্ত লাগছে তোকে। ভেতরে আয়, ফ্রেশ হয়ে নে।" তাঁর স্পর্শটা ছিল কয়েক সেকেন্ডের, কিন্তু ওই সামান্য সময়ের মধ্যেই তাঁর আঙুলগুলো রাহুলের কাঁধের পেশিতে যে একটা সূক্ষ্ম, গোপন চাপ দিয়ে গেল, তাতেই রাহুলের সারা শরীরে এক শিহরণ বয়ে গেল।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নামল। ডাইনিং টেবিলে এলাহি আয়োজন। সুব্রতর উপস্থিতির কারণে বাড়ির আবহাওয়া সেই চিরচেনা, শুষ্ক শৃঙ্খলায় মোড়া। খাবার টেবিলে বসে মূলত সুব্রত এবং রাহুলের মধ্যেই কথাবার্তা চলছিল, আর ইন্দিরা শুধু প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছিলেন এবং মাঝে মাঝে দু-একটা কথা যোগ করছিলেন।
"তোর অ্যাডভাইজারের মেইল পেয়েছিলাম আমি," সুব্রত একটা মাছের টুকরো কাঁটা থেকে ছাড়াতে ছাড়াতে বেশ গর্বিত গলায় বললেন। "উনি তোর পারফরম্যান্সে ভীষণ ইমপ্রেসড। একজন সেকেন্ড ইয়ার আন্ডারগ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট হিসেবে তুই যে লেভেলের ডেডিকেশন দেখিয়েছিস, সেটা সত্যিই প্রশংসনীয়। সামনের বুধবার থেকে তো আবার থার্ড ইয়ারের ক্লাস শুরু, তাই না?"
"হ্যাঁ বাবা," রাহুল মাথা নেড়ে বলল। ওর চোখ প্লেটের ওপর নিবদ্ধ থাকলেও, ইন্দিরার প্রতিটি চালচলন ও ঠিক মেপে নিচ্ছিল। "প্রজেক্টটা সত্যিই খুব হেকটিক ছিল। লাস্ট কয়েকটা দিন তো ল্যাব থেকে বেরোনোরই সময় পাইনি।"
"সে তো তোর মুখ দেখেই বুঝতে পারছি," সুব্রত একটু হাসলেন। "চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। এই ক'টা দিন অন্তত বইখাতা একদম ছুঁয়েও দেখবি না।"
রাহুল একটু অবাক হলো। বাবার মুখে এমন 'বই না ছোঁয়ার' নির্দেশ সত্যিই বিরল। ও একটু স্বস্তির হাসি হেসে বলল, "আমিও সেটাই ভাবছিলাম বাবা। জাস্ট কাল আর পরশু—সোমবার আর মঙ্গলবার—এই দুটো দিনই তো ছুটি। একটু রিল্যাক্স করব এই দু'দিন।"
ইন্দিরা জলের গ্লাসটা রাহুলের দিকে এগিয়ে দেওয়ার সময় ক্ষণিকের জন্য ওর চোখের দিকে তাকালেন। দীর্ঘ তিনটে মাস পর নিজের নাড়ি-ছেঁড়া ধনকে এত কাছ থেকে দেখতে পেয়ে তাঁর বুকের ভেতরটা এক অনাবিল, মাতাল করা আনন্দে উথলে উঠছিল। তাঁর খুব ইচ্ছে করছিল ডাইনিং টেবিলের এই সমস্ত শুষ্ক রীতিনীতি, সুব্রতর ওই রাশভারী উপস্থিতির তোয়াক্কা না করে এক্ষুনি ছেলেটাকে দু-হাতে নিজের বুকের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরতে; ওর ওই ক্লান্ত, শ্রান্ত মুখটায় অজস্র চুমু এঁকে দিয়ে নিজের সেই চেনা, আদুরে গলায় বলতে—"আমার বাবুটা, বড্ড মিস করেছি রে তোকে!" কিন্তু এই নিয়ন্ত্রিত, শৃঙ্খলাপরায়ণ আবহাওয়ায় নিজের সেই স্নেহময়ী রূপটিকে প্রকাশ করার বিন্দুমাত্র কোনো উপায় তাঁর নেই। গ্লাসটা হাতবদল হওয়ার ওই সামান্য ভগ্নাংশ সেকেন্ডে রাহুলের চোখদুটো যখন তাঁর চোখের সাথে মিলল, ইন্দিরার সেই গভীর, কাজল-কালো দৃষ্টিতে ফুটে উঠল এক বোবা হাহাকার আর অসীম ভালোবাসার এক গোপন প্রলেপ। চোখের ওই এক লহমার চাউনিতেই তিনি যেন নিঃশব্দে উজাড় করে দিলেন তাঁর গত নব্বই দিনের জমে থাকা সমস্ত তৃষ্ণা, আর ঠিক এই মুহূর্তে ছেলেকে নিজের মতো করে কাছে টানতে না পারার এক বুক-ফাটা অসহায়তা। মায়ের ওই নীরব, সজল চোখের ভাষাটা পড়তে রাহুলের একটুও ভুল হলো না, আর সাথে সাথেই ওর বুকের ভেতর এক উষ্ণ, বিষণ্ণ স্পন্দন ডানা ঝাপটে উঠল।
"হ্যাঁ, তুই ফুল রেস্ট নে," সুব্রত জলের গ্লাসে চুমুক দিয়ে গলাটা পরিষ্কার করলেন। "আর শোন, তোর থার্ড ইয়ারের ক্লাস শুরু হওয়ার আগে কী কী লাগবে আমাকে একটা লিস্ট দিস তো। নতুন বই, রেফারেন্স মেটেরিয়াল, ফাইলস, মার্কার—যা যা দরকার..."
কথা বলতে বলতেই তিনি একটু থামলেন। কিছু একটা ভেবে মত পালটে বললেন, "না দাঁড়া, লিস্ট দিয়ে আর কী হবে! তুই বরং এক কাজ কর... তুই নিজেই আমার সাথে চল না কলেজ স্ট্রিটে। ওখানে গিয়ে নিজেই দেখে-বেছে তোর যা যা প্রয়োজন সব কিনে নিবি। কী বলিস? কবে যাবি? কাল সোমবার... না না, কাল সোমবারটা তুই বরং বাড়িতে ঘুমিয়েই কাটাস, তোর রেস্ট নেওয়াটা খুব দরকার। আমরা বরং মঙ্গলবার বেরোতে পারি। তুই আমাকে বলিস কখন বেরোতে চাস, আমি তো বাড়িতেই থাকব।"
সুব্রতর এই শেষ কথাটা রাহুলের কানের পর্দা ভেদ করে মগজে ঢুকতেই ওর মাথার ভেতর যেন একটা বিশাল ঘণ্টা বেজে উঠল।
রাহুলের হাত থেকে চামচটা প্রায় খসে পড়তে যাচ্ছিল। ও খাওয়া থামিয়ে, একটু ভ্রু কুঁচকে, অস্পষ্ট, ঘোরের গলায় জিজ্ঞেস করল, "ওয়েট... বাবা, তুমি... তুমি বাড়িতে থাকবে? কিন্তু... তোমার তো সোমবার আর মঙ্গলবার অফিসে যাওয়ার কথা, তাই না?"
সুব্রত একটা রুটির টুকরো মুখে পুরে অত্যন্ত স্বাভাবিক, নির্লিপ্ত গলায় বোমাটা ফাটালেন।
"ওহ্, তোকে বলা হয়নি বুঝি? না না, আমি আগামী বেশ কিছুদিন অফিস যাচ্ছি না। আসলে আমার অফিসের ওই ফ্লোরটাতে একটা মেজর রেনোভেশনের কাজ শুরু হয়েছে। পুরো ইন্টারিয়র চেঞ্জ হচ্ছে। ওই কাজটা শেষ হতে অন্তত পক্ষে দু'সপ্তাহ তো লাগবেই। তাই আগামী কয়েকদিন আমি ওয়ার্ক-ফ্রম-হোম করছি। তবে চিন্তা করিস না, যেহেতু বাড়িতেই থাকব, আমার শিডিউল এখন অনেকটাই ফ্লেক্সিবল। তুই মঙ্গলবার যখনই বলবি, আমি মিটিং অ্যাডজাস্ট করে তোর সাথে বেরিয়ে যাব।"
রাহুলের মনে হলো ওর পায়ের তলা থেকে কেউ যেন ডাইনিং রুমের পুরো মেঝেটা এক হ্যাঁচকায় টেনে সরিয়ে নিয়েছে।
ও একটা স্বয়ংক্রিয় পুতুলের মতো শুধু মাথাটা ওপর-নিচ করল, "ওকে বাবা... আমি... আমি জানাব।"
কিন্তু ওর বুকের ভেতর তখন যে প্রলয়ঙ্করী সুনামিটা শুরু হয়েছে, তার কোনো শব্দ বাইরের কেউ শুনতে পেল না। ওর নিশ্বাস আটকে আসছিল।
দুই সপ্তাহ? চোদ্দোটা দিন?
রাহুল কয়েক সেকেন্ডের জন্য ব্ল্যাঙ্ক হয়ে গেল। বাবা বাড়িতে থাকবে... সব সময়! এই কথাটা ওর মগজে হাতুড়ির মতো আছড়ে পড়তে লাগল। সকালবেলা ও যখন কলেজে যাবে, বাবা বাড়িতে। বিকেলে যখন ফিরে আসবে, বাবা বাড়িতে। সন্ধেবেলা, রাতে—সব সময় বাবা এই বাড়ির ভেতরে উপস্থিত থাকবে! তার মানে... তার মানে ও ওর মায়ের সাথে এক সেকেন্ডের জন্যও একা হতে পারবে না!
ওর সাজানো, রঙিন, স্বপ্নময় প্রাসাদটা এক নিমেষে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। তিনটে মাস... নব্বইটা দিন ও একটা মাত্র আশায় বুক বেঁধে কাটিয়েছে—বাড়ি ফিরে মাকে দু-হাত দিয়ে বুকের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরবে। আর এখন? মা ওর সামনে বসে আছে, মাত্র কয়েক ফুট দূরে, অথচ ও মায়ের হাতটা পর্যন্ত ধরতে পারবে না।
কবে সে মাকে আবার নিজের মতো করে কাছে টানতে পারবে? কবে সে মাকে চুমু খেতে পারবে? কবে মিলবে মায়ের ওই নরম, ফর্সা ত্বকের উষ্ণতায় নিজেকে বিলীন করে দেওয়ার সুযোগ? আর বাথরুমের শাওয়ারের নিচের সেই আদিম, রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তগুলো—সেগুলো তো এখন প্রায় অলীক কল্পনার মতো ঠেকছে। কবে হবে? দু'সপ্তাহ পর? এই তৃষ্ণার্ত, হাহাকার করা বুকের কাছে আগামী চোদ্দোটা দিন যে আক্ষরিক অর্থেই দু'বছরের চেয়েও দীর্ঘ আর যন্ত্রণাদায়ক। এই না-পাওয়ার দমবন্ধ করা অপেক্ষাটাই তো ওকে তিলে তিলে শেষ করে দেবে। ওর অবস্থা এখন সেই তৃষ্ণার্ত চাতক পাখির মতো, যে সামনে টলটলে জলের সরোবর দেখতে পাচ্ছে, কিন্তু তার এক ফোঁটাও পান করার অধিকার তার নেই।
রাহুল অত্যন্ত ধীর, যন্ত্রণাকাতর দৃষ্টিতে ইন্দিরার দিকে তাকাল।
ইন্দিরাও ওর দিকেই তাকিয়ে ছিলেন। তাঁর চোখের গভীরে এক জমাট বাঁধা, ধূসর বিষণ্ণতা লুকিয়ে আছে, যা সুব্রতর চোখে ধরা না পড়লেও রাহুলের কাছে সেই মুহূর্তে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। রাহুল বুঝতে পারল, মা-ও ওর মতোই ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়েছে। ওই চোখের দিকে তাকিয়ে রাহুল এক নির্বাক, মরিয়া আর্জি জানাল—'মা... প্লিজ কোনো একটা রাস্তা বের করো... তুমি তো সবসময় পারো।'
ছোটবেলা থেকে জীবনে যখনই কোনো বড় সমস্যা বা জটিল বিপদে পড়েছে রাহুল, ওর মা ঠিক কোনো না কোনো জাদুমন্ত্রে তাকে সেই সংকট থেকে উদ্ধার করেছেন। মায়ের আঁচলের তলায় ওর জীবনের সব সমস্যার সমাধান লুকিয়ে থাকে। কিন্তু ভাগ্যের কী নিষ্ঠুর পরিহাস, আজকের এই সন্ধ্যায় এবং আগামী দিনগুলোতে, 'মাকে মায়ের মতো করে কাছে পাওয়াটাই' যেন রাহুলের জীবনের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে অসম্ভব এক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাকি দিনটা এক ধরনের ঘোলাটে, দমবন্ধ করা কুয়াশার মধ্যে দিয়ে কাটল।
রাহুল নিজের ব্যাগপত্তর নিয়ে ঘরে ফিরে গেল। পরে রাতে ডিনার করার সময় ওর মনে হচ্ছিল, প্লেটের খাবারগুলো যেন ওর গলায় কাঁটার মতো বিঁধছে। ও বারবার আড়চোখে মায়ের দিকে তাকাচ্ছিল। ইন্দিরাকে আজ যেন আরও বেশি সুন্দর, আরও বেশি স্নিগ্ধ আর মাতৃসুলভ দেখাচ্ছিল, কিন্তু সেই সৌন্দর্য ওর ভেতরের যন্ত্রণাকে কমানোর বদলে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল ওর কাছে পৃথিবীর সব চেয়ে দামি রত্নটা আছে, অথচ আসলে ওর কাছে কিছুই নেই।
ও কি ওর বাবার ওপর রেগে আছে? না, ঠিক তা নয়। বাবা তো আর ইচ্ছে করে বাড়িতে থাকছে না, অফিসের রেনোভেশনের জন্যই থাকছে। এতে বাবার তো কোনো দোষ নেই। কিন্তু... পরক্ষণেই ওর মগজের অন্য একটা কোণ থেকে এক বিদ্রোহী যুক্তি মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। হ্যাঁ, একদিক থেকে দেখলে দোষ তো বাবারই! বাবা এই বাড়ির পরিবেশটাকে এমন একটা মিলিটারি ক্যাম্প বানিয়ে রেখেছে যে, মা নিজের ছেলের সাথে একটু স্বাভাবিকভাবে, খোলাখুলিভাবে আদর করতেও ভয় পায়। বাবা যদি আর পাঁচটা সাধারণ, বন্ধুসুলভ বাবার মতো হতো, তাহলে মাকে তো আর এভাবে দুটো আলাদা রূপ নিয়ে বাঁচতে হতো না!
ওর চিন্তার সুতোটা ছিঁড়ে গেল পকেটে ফোনটা বেজে ওঠায়। একটা মেসেজ এসেছে। ও ফোনটা বের করে দেখল, কোনো একটা ইনস্যুরেন্স কোম্পানির প্রমোশনাল মেসেজ। মেসেজের নিচে 'কোট অফ দ্য ডে' বলে লেখা: "Everything happens for a reason."
রাহুলের মেজাজ এমনিতেই সপ্তমে চড়ে ছিল। এই জ্ঞানগর্ভ বাণীটা পড়ে ওর পিত্তি জ্বলে গেল। ও মেসেজটা পুরো না পড়েই ডিলিট করে দিল। তারপর খাওয়া শেষ করে নিজের ঘরে গিয়ে সোজা বিছানায় আছড়ে পড়ল। শরীর এবং মন—দুটোই আজ চরম অবসাদে ডুবে আছে। ও আর কিছু না ভেবেই চোখ বুজল এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই এক গভীর, অন্ধকার ঘুমে তলিয়ে গেল।
পরদিন সকাল। ৫:৩০ মিনিট।
রাহুলের ঘুমটা ভেঙে গেল। গত রাতে অত্যন্ত ক্লান্তিতে বড্ড তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছিল ও, তাই আজ সকালে এত ভোরেই ওর চোখ খুলে গেছে। রাহুলের পরনে কেবল একটা কালো রঙের শর্টস, ওপরের দিকটা অনাবৃত। এমনিতে এভাবেই খালি গায়ে ঘুমোনোই ওর রোজকার অভ্যাস। ও চোখ কচলে পাশ থেকে ফোনটা তুলে নিল। হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকেই দেখল গত সন্ধ্যার কয়েকটা আনরিড মেসেজ জমে আছে। কাল ওর রিপ্লাই দেওয়ার মতো কোনো মানসিক অবস্থাই ছিল না। একটা বন্ধু জিজ্ঞেস করেছে ও চেন্নাই থেকে ফিরেছে কি না, আরেকজন জানতে চেয়েছে সামনের সেমিস্টারে ও কী কী ইলেকটিভ কোর্স নিচ্ছে। অত্যন্ত যান্ত্রিকভাবে, ছোট ছোট রিপ্লাই দিয়ে কাজ সেরে, ও ফেসবুক খুলল। উদ্দেশ্যহীনভাবে স্ক্রল করে কিছু রিলস আর পোস্ট দেখছিল, মগজটা তখন একটা শূন্যতায় ভাসছে।
ঠিক তখনই, ওর ঘরের বন্ধ দরজায় একটা অত্যন্ত মৃদু, প্রায় নিঃশব্দ টোকা পড়ার শব্দ হলো।
রাহুল ফোন থেকে চোখ তুলে দরজার দিকে তাকাল। ওর হৃৎপিণ্ডটা এক লহমায় থমকে গেল।
দরজার নবটা খুব ধীরে ধীরে ঘুরল। তারপর দরজাটা সামান্য ফাঁক করে, নিঃশব্দ পায়ে ঘরের ভেতর প্রবেশ করলেন ইন্দিরা।
রাহুল চরম বিস্ময়ে আর এক বুক-ধকধক করা ঘোরে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। ও কি স্বপ্ন দেখছে? ও দ্রুত দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকাল। সাড়ে পাঁচটা বাজে! এই কাকভোরে মা ওর ঘরে কী করছে?
ইন্দিরা খুব সাবধানে, যাতে একটুও শব্দ না হয়, দরজার ছিটকিনিটা তুলে দিলেন। 'ক্লিক' করে একটা অত্যন্ত ক্ষীণ শব্দ হলো। তারপর তিনি ধীর, ক্লান্ত পায়ে এগিয়ে এলেন রাহুলের বিছানার দিকে।
রাহুল বিছানায় একটু উঠে বসে পিঠটা হেডবোর্ডে ঠেকিয়ে বসল। ইন্দিরার পরনে একটা খুব সাধারণ, আরামদায়ক নীল আর সাদা প্রিন্টের সুতির শাড়ি। তাঁর চুলগুলো এলোমেলো, অবিন্যস্ত। আর তাঁর ফর্সা, তীক্ষ্ণ মুখে এক গভীর, অতলস্পর্শী ক্লান্তির ছাপ।
ইন্দিরা বিছানার একপাশে এসে বসলেন। তাঁর চোখদুটো রাহুলের মুখের ওপর স্থির।
"সোনা," তাঁর গলার স্বরটা বড্ড নিচু, ভারী, আর একটু ভাঙা ভাঙা। "আমি দেখলাম তুই হোয়াটসঅ্যাপে অনলাইন আছিস... তাই ভাবলাম একবার আসি... তুই এত সকালে জেগে কেন রে বাবু? এখনও তো ভোর..."
রাহুল একটা ঢোক গিলল। ওর গলাটা শুকিয়ে আসছিল। "মা, আমি কাল সাড়ে ন'টার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম... তাই ঘুমটা ভেঙে গেল... এনিওয়ে, কিন্তু তুমি এত সকালে উঠে পড়েছ কেন মা? আর তোমাকে এত টায়ার্ড দেখাচ্ছে কেন? তুমি কি রাতে ঠিক করে ঘুমোওনি?"
ইন্দিরা এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি শুধু ওই ক্লান্ত, কিন্তু অসীম ভালোবাসায় ভেজা চোখদুটো দিয়ে ওর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন।
রাহুল বিছানায় আরও একটু সোজা হয়ে বসে, উদ্বিগ্ন গলায় বলল, "তার মানে... তুমি সারা রাত ঘুমোওনি..."
"আমার কথা ছাড় সোনা," ইন্দিরা একটা দীর্ঘ, কাঁপানো শ্বাস ফেলে ওর কথায় বাধা দিলেন। "আমি ঘুমিয়েছিলাম... কিন্তু ঘুমটা বারবার ভেঙে যাচ্ছিল..."
রাহুল কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ইন্দিরা ওকে হাত তুলে থামিয়ে দিলেন। তাঁর গলার স্বর এবার এক অদ্ভুত, গাঢ় আবেগে বুজে এল।
"আমি... আমি কাল তোকে দেখছিলাম, রাহুল। ডাইনিং টেবিলে বসে তোর বাবা যখন বলল যে ও আগামী দু'সপ্তাহ বাড়িতেই থাকবে... আমি তোর মুখের ওই এক্সপ্রেশনটা দেখেছি, সোনা। দ্যাখ, নিজের বাবার বাড়িতে থাকা নিয়ে একজন ছেলের এমন কষ্ট পাওয়াটা যতই অনুচিত হোক না কেন... আমি খুব ভালো করেই জানি তোর বুকের ভেতরটা কেন ওরম করছিল। আর তোর কষ্ট হলে, তোর বুক ফাটলে, তোর মায়ের বুকের ভেতরটা যে তার চেয়েও দ্বিগুণ জোরে ভাঙে রে সোনা... তুই সেটা জানিস তো?"
রাহুল মন্ত্রমুগ্ধের মতো মায়ের ওই আর্দ্র চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে রইল।
"আমি... আমি সারা রাত শুধু এটাই ভেবেছি..." ইন্দিরা ফিসফিস করে বলতে লাগলেন, তাঁর আঙুলগুলো শাড়ির আঁচলটা মুচড়ে ধরে আছে। "মাঝরাতে বারবার আমার ঘুম ভেঙে যাচ্ছিল... ভোরের দিকে যখন আবার ঘুম ভাঙল, আমি ফোনটা তুলে একটু অন্য কিছু দেখার চেষ্টা করছিলাম, মনটা ডাইভার্ট করার জন্য। আর তখনই দেখলাম তুই অনলাইন। তোর বাবা তখন অঘোরে ঘুমোচ্ছে, নাক ডাকছে। তাই... তাই আমি আর নিজেকে আটকাতে পারলাম না রে সোনা... আমি চলে এলাম তোর কাছে..."
রাহুলের মুখের ওই মেঘলা বিষণ্ণতাটা এক নিমিষে কেটে গিয়ে সেখানে একটা অত্যন্ত নরম, স্নিগ্ধ হাসি ফুটে উঠল।
ইন্দিরা নিজের দুটো ফর্সা, নরম হাত রাহুলের চওড়া, অনাবৃত কাঁধের ওপর রাখলেন। তিনি ওভাবেই ওর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন।
"তুমি... তুমি ওভাবে কী দেখছ, মা?" রাহুল বড্ড মোলায়েম, ফিসফিস করা গলায় জিজ্ঞেস করল।
"তোকে..." ইন্দিরার গলার স্বরটা যেন কোনো এক গভীর গুহা থেকে ভেসে এল।
রাহুল একটু লাজুক হয়ে, ঘাড়টা সামান্য একপাশে হেলিয়ে বলল, "কিন্তু তুমি তো আমাকে এর আগেও কত হাজারবার দেখেছ..."
"কিন্তু গত তিন মাস তো দেখিনি রে সোনা..." ইন্দিরার কণ্ঠস্বর এবার কেঁপে উঠল।
"ওয়েল, তুমি তো আমাকে কালকেই দেখলে, তাই না?"
"হ্যাঁ, দেখেছি," ইন্দিরা মাথা নাড়লেন। তাঁর চোখদুটো ছলছল করে উঠল। "কিন্তু আমি আমার ছেলেটার ওই মুখটা মনে রাখতে চাই না। কাল রাতের ওই আহত, ভেঙে-পড়া, বিষণ্ণ মুখটা আমি মনে রাখতে চাই না। আমি এই মুখটা দেখতে চাই... আমার ছেলেটার এই হাসিখুশি, সুন্দর, মিষ্টি, আর... আর এত হ্যান্ডসাম মুখটা..."
কথাগুলো বলতে বলতেই ইন্দিরার হাতদুটো রাহুলের কাঁধ থেকে পিছলে উঠে এল ওর গালে। তাঁর ফর্সা, নরম আঙুলগুলো রাহুলের চোয়াল আর গালের ওপর এক পরম মমতায় বুলিয়ে যেতে লাগল।
রাহুল মায়ের এই জাদুকরী স্পর্শে চোখ বুজে ফেলল। "মা... চেন্নাই থেকে বেরোনোর পর থেকে আমি শুধু এই মুহূর্তটার জন্যই ছটফট করছিলাম... কবে বাড়ি ফিরব, আর কবে তোমার সাথে একটু সময় কাটাব... জাস্ট তুমি আর আমি..."
"আমিও রে সোনা..." ইন্দিরার গলার স্বর এবার ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। তাঁর গাল বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। "তোর কোনো আইডিয়া নেই আমি তোকে কতটা মিস করেছি... কতটা..."
"ওহ্ মা..."
রাহুল আর একটা শব্দও খরচ করল না। ও দুই হাত বাড়িয়ে ইন্দিরাকে নিজের বুকের সাথে এক প্রবল, বন্য, এবং রুদ্ধশ্বাস আলিঙ্গনে টেনে নিল। ইন্দিরাও নিজের দুই হাত দিয়ে রাহুলের পিঠটাকে এমনভাবে পেঁচিয়ে ধরলেন, যেন ওকে নিজের শরীরের সাথে মিশিয়ে দেবেন। নব্বই দিনের জমে থাকা সমস্ত বিরহ, সমস্ত শূন্যতা, আর সমস্ত অবদমিত তৃষ্ণা যেন এই একটা আলিঙ্গনের তীব্রতায় ফেটে পড়ল।
ঘরের ওই আধো-অন্ধকার নিস্তব্ধতায় শুধু শোনা যেতে লাগল দুটো মানুষের ভারী, দ্রুত শ্বাসের শব্দ। রাহুলের খালি, উষ্ণ বুকের সাথে ইন্দিরার নরম শরীরটা একেবারে পিষ্ট হয়ে যাচ্ছিল।
"উমম... মা..." রাহুলের গলা থেকে এক অস্ফুট, ঘোরে-থাকা গোঙানি বেরিয়ে এল। ও মায়ের চুলের সুবাসে নাক ডুবিয়ে গভীর শ্বাস নিতে লাগল।
ইন্দিরা ওর ঘাড়ের কাছে মুখ গুঁজে ফিসফিস করতে লাগলেন, "আমার বাবুটা... আমার সোনা... আমার মনা..."
রাহুল মাকে নিজের বুকের সাথে আরও একটু শক্ত করে পিষে ধরে, ভারী নিঃশ্বাসের মাঝে ফিসফিস করে বলল, "তুমি জানো না মা... শেষ দু'সপ্তাহে হস্টেলে রোজ রাতে আমি চাদরের তলায় লুকিয়ে শুধু তোমার ওই ছবিটা দেখতাম... আর ভাবতাম..."
ইন্দিরার হাত দুটো রাহুলের পিঠে আরও নিবিড়ভাবে চেপে বসল। তাঁর উষ্ণ নিঃশ্বাস রাহুলের ঘাড়ে আছড়ে পড়ছে। "কী ভাবতিস, সোনা? মায়ের কথা বড্ড মনে পড়ত?"
"মনে পড়ত মানে? আমার তো মনে হতো ঠিক যেন কোনো দেবী... আমার নিজের স্বর্গের দেবী আমার দিকে তাকিয়ে আছে... আমার জাস্ট পাগল পাগল লাগত মা..."
ছেলের এই আকুল, পূজারির মতো কথায় ইন্দিরার বুকের ভেতরটা এক অসীম, আদিম আদরে উথলে উঠল। তিনি রাহুলকে এক রুদ্ধশ্বাস বাহুপাশে নিজের সাথে আরও নিবিড়ভাবে লেপ্টে নিলেন। তাঁর ঠোঁটদুটো রাহুলের ঘাড়ের ত্বকে এলোমেলোভাবে ঘষা খাচ্ছিল। "ওহ্, আমার সোনা ছেলেটা... আমার পাগল বাবু... উমম... মা-ও তোকে ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারেনি রে... আহ্..."
তাদের এই অবিচ্ছেদ্য, দমবন্ধ করা আলিঙ্গনে কেবলই শোনা যেতে লাগল দুটো মানুষের ভারী, তৃষ্ণার্ত শ্বাস, আর ত্বকের সাথে ত্বক পিষ্ট হওয়ার একটা স্যাঁতস্যাঁতে, নেশাতুর শব্দ। বেশ কিছুক্ষণ এই রুদ্ধশ্বাস, ঘাম-ভেজা আলিঙ্গনে আবদ্ধ থাকার পর, যখন রাহুলের বুকের সাথে ইন্দিরার নরম শরীরটা একেবারে খাপে খাপে মিশে গেছে, ঠিক তখনই তিনি অত্যন্ত নিচু, কাঁপানো, এবং এক নেশাগ্রস্ত ফিসফিসানিতে বলে উঠলেন:
"সোনা... ব্লাউজের হুকগুলো একটু খুলে দিবি?"
রাহুলের শরীরের ভেতর দিয়ে যেন হাজার ভোল্টের একটা কারেন্ট বয়ে গেল। ও উত্তেজনার চোটে এক সেকেন্ডের জন্য একদম জমে বরফ হয়ে গেল। তারপর, মাকে ওই আলিঙ্গনের মধ্যেই ধরে রেখে, ওর কাঁপতে থাকা আঙুলগুলো খুব সাবধানে, অত্যন্ত ধীর ছন্দে ইন্দিরার পিঠের ওপর নেমে গেল। একটা একটা করে ব্লাউজের হুক খুলতে শুরু করল ও। প্রতিটি 'ক্লিক' শব্দ যেন এই ভোরের নিস্তব্ধতায় এক একটা নতুন, নিষিদ্ধ জগতের দরজা খুলে দিচ্ছিল।
হুকগুলো খোলা হয়ে গেলে, রাহুল আলিঙ্গনটা সামান্য আলগা করে ইন্দিরাকে একটু সোজা হতে সাহায্য করল। তারপর খুব সন্তর্পণে, পরম শ্রদ্ধায় তাঁর কাঁধ থেকে ব্লাউজটা নামিয়ে দিল।
ইন্দিরার শরীরের ওপরের অংশে আজ কোনো ব্রা নেই।
রাহুলের চোখদুটো বিস্ময়ে, মুগ্ধতায় আর এক পূজারির দৃষ্টিতে স্থির হয়ে গেল। তিনটে মাস পর ও আবার ওর মায়ের এই ঐশ্বরিক রূপ দেখছে। ভোরের সেই ম্লান, নীলচে আলোয় ইন্দিরার সেই ফর্সা, পরিপুষ্ট এবং সুডৌল স্তনযুগল যেন শ্বেতপাথরে খোদাই করা কোনো প্রাচীন, নিখুঁত ভাস্কর্যের মতো উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। মাতৃত্বের এক চরম পবিত্রতা এবং নারীত্বের এক নিবিড় পূর্ণতার মিশেল যেন ওই অবয়বে থমকে আছে। তাঁর স্তনের সেই মসৃণ, পেলব ঢাল আর তার কেন্দ্রে ফুটে থাকা ওই গাঢ় বাদামি, সংবেদনশীল বৃন্ত দুটি রাহুলের মগজকে সম্পূর্ণ অবশ করে দিল।
রাহুলের হাতটা অবচেতনভাবেই একটু সামনের দিকে এগিয়ে গেল ওই ঐশ্বরিক সৌন্দর্যকে স্পর্শ করার জন্য, কিন্তু পরক্ষণেই এক অদ্ভুত, আড়ষ্ট দ্বিধায় হাতটা মাঝপথেই থমকে গেল।
ইন্দিরা ওর এই দ্বিধাটা বুঝতে পারলেন। তাঁর মুখে এক প্রশ্রয়ের, উষ্ণ হাসি ফুটে উঠল। তিনি অত্যন্ত নরম, গাঢ় স্বরে ফিসফিস করলেন:
"ভয় পাস না সোনা... ছুঁয়ে দেখ... কয়েক মাস আগেই তো তুই এখান থেকেই খেয়েছিলি, মনে নেই? মায়ের কাছে এখন আবার কিসের এত লজ্জা রে বাবু?"
অনুমতি পেয়ে রাহুলের হাতদুটো আর স্থির থাকতে পারল না। ওর আঙুলগুলো গিয়ে অত্যন্ত আলতো করে, যেন কোনো ভঙ্গুর কাঁচের জিনিস ধরছে, ইন্দিরার ওই ফর্সা, নরম স্তনযুগলকে স্পর্শ করল। ত্বকের ওই উষ্ণ, তুলতুলে স্পর্শ রাহুলের আঙুলের ডগা দিয়ে ওর শিরায় শিরায় এক বন্য মাদকতা ছড়িয়ে দিল। ও খুব ধীরে ধীরে, এক ছন্দোবদ্ধ মমতায় স্তনদুটিকে নিজের হাতের তালুতে তুলে নিয়ে আদর করতে শুরু করল।
"আআহ্..." ইন্দিরার গলা চিরে একটা দীর্ঘ, স্বস্তির নিশ্বাস বেরিয়ে এল। তাঁর চোখদুটো আপনা থেকেই বুজে গেল। "হ্যাঁ... সোনা... ঠিক ওভাবেই... উমম..."
রাহুল এক ঘোরের মধ্যে বিড়বিড় করতে লাগল, "মা... তুমি এত সুন্দর... এত নরম... আমার জাস্ট পাগল পাগল লাগছে মা..." ওর আঙুলগুলো এবার স্তনবৃন্তগুলোকে আলতো করে ছুঁতে শুরু করল, আর সেই স্পর্শে সেগুলো ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে উঠতে লাগল।
"উফ্... আমার সোনা বাবুটা..." ইন্দিরার মাথাটা পেছনের দিকে সামান্য হেলে গেল, তাঁর আঙুলগুলো রাহুলের বিছানার চাদরটাকে শক্ত করে খামচে ধরল। "তোর এই হাতের ছোঁয়াটা... আমি বড্ড মিস করছিলাম রে... আহ্... কর সোনা... আদর কর মাকে..."
রাহুল এবার দুই হাত দিয়ে মাতৃবক্ষের সেই স্নিগ্ধ, ভারী পেলবতাকে আরও গভীরভাবে আপন করে নিল। ওর হাতের তালুর উষ্ণ, অবাধ্য সঞ্চালন ইন্দিরার স্নায়ুগুলোকে এক মাদকতাময় আবেশে আচ্ছন্ন করে দিচ্ছিল। স্তনবৃন্তগুলো রাহুলের আঙুলের ঈষৎ রুক্ষ, অথচ পরম যত্নশীল ঘর্ষণে আরও কঠিন ও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। ইন্দিরার গলা চিরে বেরিয়ে আসতে লাগল রুদ্ধশ্বাস, এলোমেলো গোঙানি— "আআহ্... উমম... সোনা... একটু জোরে... উফ্... হ্যাঁ... ঠিক ওভাবেই... আহ্হ্হ্..."
ছেলের হাতের এই বন্য, অথচ মায়াবী নিপীড়ন ইন্দিরার শরীর থেকে সমস্ত ভারসাম্য কেড়ে নিচ্ছিল। তাঁর হাঁটু দুটো কাঁপতে শুরু করল, আর পেশিগুলো এই অদম্য অনুভূতির তোড়ে শিথিল হয়ে এল। তিনি আর সোজা হয়ে বসে থাকতে পারলেন না। এক আচ্ছন্ন আবেশে তিনি বিছানার ওপর চিত হয়ে লুটিয়ে পড়লেন, আর রাহুলও ওর শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে সোজা গিয়ে পড়ল ইন্দিরার শরীরের ওপর।
ইন্দিরা সাথে সাথে নিজের দুই হাত দিয়ে রাহুলকে নিজের ওপর শক্ত করে চেপে ধরলেন।
রাহুল মায়ের মুখের খুব কাছে নিজের মুখটা নিয়ে গিয়ে, অত্যন্ত আর্দ্র, নেশাতুর গলায় ফিসফিস করে বলল, "মা... খুব চুমু খেতে ইচ্ছে করছে..." ও ওর ঠোঁটদুটো ইন্দিরার ঠোঁটের দিকে নামিয়ে আনতে গেল।
RE: The Barter System (By:andygarfield) -
Bad Boy - 09-05-2026
কিন্তু ইন্দিরা নিজের একটা তর্জনী রাহুলের ঠোঁটের ওপর আলতো করে চেপে ধরে ওকে থামিয়ে দিলেন। তাঁর চোখে এক মাতৃসুলভ হাসি।
"না সোনা, এখন নয়," তিনি খুব নরম করে বোঝানোর সুরে বললেন, "আমরা কেউই সকালে ব্রাশ করিনি এখনও। এই অবস্থায় ওরম করতে আমার খুব অস্বস্তি হবে সোনা। আর ওটা আনহাইজিনিক-ও বটে।"
রাহুল এই চরম রোম্যান্টিক মুহূর্তের মাঝখানে মায়ের এই নিখুঁত, ঘরোয়া, আর হাইজিন-সচেতন লজিক শুনে ফিক করে হেসে ফেলল। মা তো মা-ই হয়, তা পরিস্থিতি যতই মাতাল করা হোক না কেন!
"তাহলে আমি কি চট করে গিয়ে দাঁতটা ব্রাশ করে আসব, মা?" রাহুল একটু দুষ্টুমি করে জিজ্ঞেস করল।
ইন্দিরা ওকে নিজের শরীরের সাথে আরও একটু শক্ত করে লেপ্টে ধরে, ওর ঘাড়ের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললেন, "না সোনা, এখন না। প্লিজ, এই বিছানা ছেড়ে তুই এখন এক মুহূর্তের জন্যও কোথাও যাবি না।" তিনি একটু থামলেন, তারপর তাঁর গলার স্বরটা এক অদ্ভুত, নেশাগ্রস্ত, আর অধিকারবোধে ভরা ফিসফিসানিতে পালটে গেল।
"এখন বরং... মা একটু তার সোনা বাবুটাকে আদর করুক?"
রাহুল অবাক হয়ে মায়ের ওই গভীর, কাজল-কালো চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে এখন এক অসীম তৃষ্ণা আর ভালোবাসার সাগর টলটল করছে।
রাহুল কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই ইন্দিরা বলে উঠলেন: "মায়েরও তো তার ছেলেটাকে আদর করতে ইচ্ছে করতে পারে, তাই না? মায়ের... মায়ের আদর খাবি না... সোনা?"
রাহুলের পুরো শরীরটা একটা প্রবল উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। ও মন্ত্রমুগ্ধের মতো মাথা নেড়ে, ঘোরের ঘোরে বলল, "হ্যাঁ... হ্যাঁ... মা... খাবো... তুমি করো... আদর করো মা..."
আর একটা মুহূর্তও নষ্ট না করে ইন্দিরা যেন তাঁর গত তিন মাসের জমিয়ে রাখা সমস্ত বিরহ, সমস্ত তৃষ্ণাকে এক ঝটকায় মুক্ত করে দিলেন। তিনি নিজের মুখটা রাহুলের ঘাড়ের কাছে গুঁজে দিয়ে, পাগলের মতো ওর ওই উষ্ণ, ঘর্মাক্ত ত্বকে চুমু খেতে শুরু করলেন।
"উমম... আহ্... মা..." রাহুল একটা প্রবল শিহরণে কুঁকড়ে গিয়ে অস্ফুট শব্দ করে উঠল।
ইন্দিরার ঠোঁটদুটো রাহুলের ঘাড় থেকে নেমে এসে ওর চওড়া, পেশিবহুল কাঁধের ওপর পরপর অজস্র, তীব্র চুমু এঁকে দিতে লাগল। তারপর, ঠিক যেমন করে রাহুল চেন্নাই যাওয়ার আগে তাঁর কলারবোন আর ঘাড়ের খাঁজে আদর করেছিল, আজ ইন্দিরা সেই একই ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। তাঁর উষ্ণ, আর্দ্র জিভটা রাহুলের কাঁধ আর ঘাড়ের ভাঁজগুলোর ওপর দিয়ে এক চরম, বন্য ছন্দে লেহন করতে শুরু করল।
"আআহ্... মা... ওহ গড..." রাহুলের শরীরটা বিছানার ওপর ধনুকের মতো বেঁকে গেল। মায়ের জিভের এই নিপুণ, রাক্ষুসে আদর ওর স্নায়ুগুলোকে একেবারে অবশ করে দিচ্ছিল।
ইন্দিরা ওই আদরের ফাঁকেই একটু হাঁপাতে হাঁপাতে, অত্যন্ত নিচু, নেশাতুর গলায় জিজ্ঞেস করলেন: "তোর ভালো লাগছে তো, সোনা?"
রাহুল কাঁপতে কাঁপতে, প্রায় গোঙানির সুরে বলল: "হ্যাঁ... বড্ড ভালো লাগছে মা... উফ্... প্লিজ... তুমি থেমো না মা..."
(continued....)
RE: The Barter System (By:andygarfield) -
Bad Boy - 09-05-2026
(...continuation of the Chapter)
রাহুল তখন ইন্দিরার ওপর পুরোপুরি ভর দিয়ে শুয়ে আছে, ওর চওড়া বুকটা ইন্দিরার বুকের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে সেঁটে আছে। সেই অবস্থাতেই, রাহুলকে নিজের ওপর রেখেই, ইন্দিরা খুব সন্তর্পণে বিছানার চাদর ঘেঁষে নিজের শরীরটাকে একটু নিচের দিকে পিছলে নামিয়ে আনলেন। এই সামান্য স্থান পরিবর্তনের ফলে তাঁর মুখটা এখন রাহুলের সেই মসৃণ, প্রায় রোমহীন এবং সুগঠিত বুকের ঠিক ওপরে এসে স্থির হলো। তিনি সেখানেও ওই একই তীব্রতায় চুমু খেতে লাগলেন।
"আমার সোনা ছেলেটা..." ইন্দিরা চুমুর ফাঁকে ফাঁকে ফিসফিস করতে লাগলেন, "কত বড় হয়ে গেছে... কত স্ট্রং হয়ে গেছে..."
তারপর, এক চরম, অপ্রত্যাশিত মুহূর্তে, ইন্দিরা নিজের ঠোঁটদুটো রাহুলের বুকের বাঁ দিকের ছোট, শক্ত বৃন্তটার ওপর রাখলেন এবং অত্যন্ত আলতো করে সেটা চুষতে শুরু করলেন।
"মাআআআ!! আআআহহহ!!"
রাহুল যেন একটা ইলেকট্রিক শকে লাফিয়ে উঠল। ও হাসতে হাসতে, ছটফট করতে করতে বিছানায় এদিক-ওদিক গড়াতে শুরু করল। "উফ্ মা!! বড্ড কাতুকুতু লাগছে... তুমি কী করছ মা... ছাড়ো... হা হা হা... প্লিজ মা..."
ছেলের এই ছটফটানি আর খিলখিল হাসি দেখে ইন্দিরা মুহূর্তের জন্য নিজের মুখটা ওপরে তুললেন। তাঁর চোখেমুখে তখন এক অপরিসীম ভালোবাসা আর চরম প্রশ্রয়ের হাসি। তিনি একটু কপট অভিমানের সুরে, আদুরে গলায় বললেন:
"বা রে! মা-কে ওখানে করার সময় কিছু না, আর মা করলেই দোষ?"
কথাটা বলেই তিনি আবার নিজের মুখটা ওর বুকের ওপর নামিয়ে নিয়ে সেই একই জায়গায় আরও একটু জোরে আদর করতে লাগলেন।
"উফ্ মা... হা হা হা... আমি মরে যাব... আহ্... মা..." রাহুলের হাসি আর গোঙানির শব্দগুলো ভোরের ওই নিস্তব্ধ ঘরে এক অদ্ভুত, মায়াবী সিম্ফনি তৈরি করতে লাগল।
ধীরে ধীরে ইন্দিরার আদরের তীব্রতা আর আবেগ এক বন্য, অনিয়ন্ত্রিত মাত্রায় পৌঁছাতে লাগল। তাঁর জিভটা রাহুলের বুকের পেশিগুলোর ওপর দিয়ে এক উত্তপ্ত লাভাস্রোতের মতো পিছলে যেতে লাগল। চুমু খেতে খেতে তিনি আবার রাহুলের ঘাড় আর কাঁধের কাছে উঠে এলেন। তাঁর শ্বাস তখন বড্ড ভারী, তাঁর মগজের ওপর থেকে সমস্ত নিয়ন্ত্রণ যেন হারিয়ে যাচ্ছে।
তাঁর মুখটা রাহুলের চওড়া কাঁধের ওপর একটা রুদ্ধশ্বাস, পাগলাটে পথ তৈরি করল। তিনি ওকে এমন এক সর্বগ্রাসী তীব্রতায় চুমু খাচ্ছিলেন, যা ক্রমশ এক চরমতম অধিকারবোধের রূপ নিচ্ছিল। আর ঠিক সেই চরম ঘোরের মাথায়, যখন তাঁর মাতৃত্ব আর নারীত্বের সমস্ত সংজ্ঞা একাকার হয়ে গেছে, ইন্দিরা নিজের দাঁত দিয়ে রাহুলের কাঁধের ওই নরম ত্বকের ওপর একটা বন্য, অধিকারের কামড় বসিয়ে দিলেন।
"আআআহহহহ!"
রাহুলের মুখ থেকে একটা তীক্ষ্ণ, যন্ত্রণার আর্তনাদ ছিটকে বেরোলো।
এই শব্দটা ইন্দিরার মগজে যেন এক বালতি বরফ-ঠান্ডা জল ঢেলে দিল। তিনি এক লহমায় তাঁর ওই অনিয়ন্ত্রিত, উন্মত্ত ঘোর থেকে বাস্তবে ছিটকে ফিরে এলেন। তিনি বুঝতে পারলেন ভালোবাসার চরম আতিশয্যে তিনি ঠিক কী করে ফেলেছেন। তাঁর ভেতরের সেই বন্য প্রেমিকা নিমেষে উধাও হয়ে গিয়ে সেখানে আবার তাঁর সেই চিরচেনা, উদ্বিগ্ন মাতৃসত্তা ফিরে এল।
"ওহ গড!! সোনা... আমি কি তোকে ব্যথা দিয়ে ফেললাম?" ইন্দিরা প্রায় ডুকরে কেঁদে ওঠার মতো গলায় বলে উঠলেন। তিনি রুদ্ধশ্বাসে রাহুলের কাঁধের ওপরের ওই জায়গাটার দিকে তাকালেন। সেখানে একটা গাঢ়, লালচে-নীল দাগ—এক প্রগাঢ় 'লাভ বাইট' ফুটে উঠেছে।
"আই অ্যাম সো সো সরি, বাবু... আমি... আমি একদম ইচ্ছে করে করিনি... ওহ গড..." ইন্দিরা কাঁপাকাঁপা হাতে ওই দাগটার ওপর আলতো করে আঙুল ছোঁয়ালেন, তাঁর গলা ভয়ে কাঁপছে। "জায়গাটা তো একদম লাল হয়ে গেছে... রক্ত বেরোয়নি তো? না... থ্যাঙ্ক গড..."
তিনি খুব সাবধানে রাহুলকে নিজের শরীরের ওপর থেকে সরিয়ে দিয়ে বিছানায় উঠে বসলেন। তড়িঘড়ি নিজের শাড়ির আঁচলটা দিয়ে অনাবৃত বুকটাকে ঢেকে ফেললেন। তাঁর চোখেমুখে এক প্রবল অপরাধবোধ আর মাতৃসুলভ উদ্বেগ।
এই দাগটা নেহাতই কোনো সাধারণ আঘাতের চিহ্ন নয়। এটা তাঁর অন্তহীন, অন্ধ এবং সর্বগ্রাসী ভালোবাসার এক জ্বলন্ত মোহর। এই দাগটি যেন নিঃশব্দে প্রমাণ করে যে তাঁর ভেতরের মাতৃসত্তা আসলে কোনো শুষ্ক, সামাজিক শৃঙ্খলার খোলসে আটকে থাকার মতো বিষয় নয়; বরং এটাই হলো মাতৃত্বের সবচেয়ে আদিম, নিখাদ এবং প্রগাঢ়তম রূপ—যেখানে স্নেহের আতিশয্যে একজন মা তার নিজের নাড়ি-ছেঁড়া ধনকে নিজের অস্তিত্বের সাথে সম্পূর্ণভাবে গ্রাস করে নিতে চায়। সন্তানকে ভালোবাসার এই অমোঘ, বন্য প্রকাশ তাঁর নিজের কাছে এক পরম সত্য হলেও, তাদের এই নিজস্ব স্বর্গের বাইরে থাকা ওই রূঢ়, হিসেবি পৃথিবীর চোখে এই আদরের চিহ্নটাই যে এক ভয়ংকর বিপদের অশনিসংকেত, তা বুঝতে ইন্দিরার এক মুহূর্তও দেরি হলো না।
"সোনা, তুই একদম চিন্তা করিস না, এটা এমন কিছু সিরিয়াস নয়। শোন..." ইন্দিরা অত্যন্ত নরম, যত্নশীল মায়ের গলায় নির্দেশ দিতে শুরু করলেন। তিনি নিজের ব্লাউজটা হাতে নিয়ে দ্রুত গায়ে গলালেন। "তোর টি-শার্টটা পরে নে। তারপর এক্ষুনি নিচে যা, গিয়ে ফ্রিজ থেকে আইস প্যাকটা নিয়ে আয়, ঠিক আছে? তোকে ওই জায়গাটাতে কোল্ড কমপ্রেস করতে হবে। তারপর একটু আর্নিকা জেল লাগিয়ে নিবি, দেখবি খুব তাড়াতাড়ি ব্যথাটা কমে যাবে। আমার বাথরুমের ক্যাবিনেটেই আর্নিকা জেল রাখা আছে। একদম চিন্তা করিস না বাবু... উফ্ ভগবান, আমি এটা কী করে করতে পারলাম..."
রাহুল মায়ের এই অপরাধবোধ আর প্যানিক দেখে একটু হাসল। ও ইন্দিরার একটা হাত ধরে খুব মোলায়েম গলায় ওকে শান্ত করার চেষ্টা করল: "ইটস ওকে মা, তুমি যা বলছ তাই করব। প্লিজ তুমি নিজের ওপর রাগ কোরো না। আমার সত্যিই খুব বেশি ব্যথা লাগেনি।"
ছেলের এই মিষ্টি, পরিণত কথাটা শুনে ইন্দিরার চোখদুটো আবার জলে ভরে এল। তিনি আবেগতাড়িত গলায় বলে উঠলেন: "ওহ সোনা... তুই এত সুইট কেন রে?"
তিনি এগিয়ে গিয়ে রাহুলকে আরেকবার অত্যন্ত মমতায়, আলতো করে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালেন।
"একদম দেরি করিস না সোনা, ওকে? যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বরফটা লাগিয়ে নে।" তিনি দরজার দিকে পা বাড়ালেন, তারপর একবার ঘাড় ঘুরিয়ে সতর্ক করে বললেন, "আর সোনা... ঘর থেকে বেরোনোর আগে অবশ্যই একটা টি-শার্ট গায়ে দিয়ে নিস, ওকে? তোর বাবা উঠে পড়তে পারে। আমি এখন ঘরে যাচ্ছি। ব্রেকফাস্টের সময় দেখা হবে, ঠিক আছে সোনা?"
দরজাটা একটা মৃদু 'ক্লিক' শব্দ করে বন্ধ হয়ে গেল। ঘরের ভেতর তখন কেবল ভোরের সেই স্নিগ্ধ আলো, আর রাহুলের কাঁধে জেগে থাকা এক অমোঘ, সর্বগ্রাসী অধিকারের চিহ্ন।
১৪.২. অসমাপ্ত দহন
কোনো উপাদেয় খাবারের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকলে, তা একেবারেই না পাওয়ার চেয়ে যদি সামান্য একটুখানি চেখে দেখার সুযোগ মেলে, তবে সেই না-পাওয়ার ক্ষুধা যেন আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। মনস্তত্ত্বের ভাষায় একেই বলে 'জাইগারনিক এফেক্ট'—যেখানে কোনো অসমাপ্ত অভিজ্ঞতা মানুষের মনে এক প্রবল আকুলতা তৈরি করে এবং সেই অভিজ্ঞতাটি সম্পূর্ণ করার জন্য এক ব্যাকুল অস্থিরতা বা মরিয়া ভাব জাগিয়ে তোলে। গত সোমবার ভোরের সেই অভাবনীয় এবং রুদ্ধশ্বাস আদরের পর থেকে রাহুল এবং ইন্দিরা—দুজনের মনের অবস্থাই ঠিক ওই তত্ত্বের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
সেদিন ভোরের সেই লগ্নটি ছিল এক পরম প্রাপ্তির মুহূর্ত, কিন্তু একই সাথে তা যেন রয়ে গিয়েছিল এক অসমাপ্ত আখ্যান হয়ে। সেই যে উন্মত্ত, ঘর্মাক্ত আলিঙ্গনের মাঝে ইন্দিরা নিজের সর্বগ্রাসী অধিকারবোধের বশবর্তী হয়ে রাহুলের কাঁধে নিজের ঠোঁট আর দাঁতের এক প্রগাঢ় মোহর এঁকে দিয়েছিলেন, সেই দাগটা গত কয়েকদিনে সময়ের নিয়মে এবং ওষুধের প্রলেপে অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে। লালচে-নীলচে সেই কালশিটে এখন ত্বকের রঙের সাথে মিশে গিয়ে এক ফ্যাকাসে, হলদেটে রূপ নিয়েছে। কিন্তু ওই দাগটা শরীর থেকে মুছে গেলেও, মা ও ছেলের মনের ভেতরে একে অপরের সান্নিধ্য পাওয়ার যে আগুনটা সেদিন জ্বলে উঠেছিল, তা বিন্দুমাত্র নেভেনি; বরং না-পাওয়ার হতাশায় তা আরও প্রখর হয়েছে।
মুশকিল হলো, রূঢ় বাস্তব তার নিজের নিয়মেই চলে। সোমবারের পর থেকেই আবার সেই যান্ত্রিক, একঘেয়ে রুটিনের যাঁতাকল শুরু হয়ে গেছে। রাহুলের সেমিস্টারের ক্লাস শুরু হয়েছে, পড়ার চাপ বাড়তে শুরু করেছে। অন্যদিকে ইন্দিরার ইউনিভার্সিটিও পুরোদমে চলছে; পর পর লেকচার, পিএইচডি স্কলারদের গাইড করা, অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ মিটিং—সব মিলিয়ে তাঁর দম ফেলার ফুরসত নেই। কিন্তু এই সমস্ত ব্যস্ততার চেয়েও তাদের মাঝখানে সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে নিশ্ছিদ্র দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটাই মানুষ—সুব্রত সেন। অফিসের রেনোভেশনের কারণে তিনি এখন পুরোপুরি 'ওয়ার্ক ফ্রম হোম' করছেন। মানুষটা যেন এক ভারী, নির্লিপ্ত এবং অবচেতন মেঘের মতো সারাক্ষণ এই বাড়ির ছাদের ওপর ঝুলে আছেন, যার উপস্থিতি মা ও ছেলের মাঝখানের ওই তৃষ্ণার্ত বাতাসটাকে সারাক্ষণ ভিজিয়ে রাখলেও, এক ফোঁটা শান্তির বৃষ্টি নামতে দিচ্ছে না।
এই দমবন্ধ করা প্রতীক্ষা, সারাক্ষণের স্নায়বিক চাপ আর রোজকার একঘেয়ে রুটিনের যাঁতাকলে পড়ে তাঁরা দুজনেই একটা খুব সাধারণ, অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিলেন। আর মাত্র কয়েকদিন পর, এই সামনের রবিবারেই রাহুলের কুড়িতে পদার্পণ।
বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বরের তিন তারিখের রাত।
রোজকার মতো নিয়মমাফিক, নীরবতায় মোড়া ফ্যামিলি ডিনার শেষ করে তিনজনেই নিজেদের ঘরে চলে গেছেন। ইন্দিরার শোবার ঘরের পরিবেশটা এখন বেশ শান্ত। তিনি নিজের স্টাডি-ডেস্কের সামনের আরামদায়ক চেয়ারটায় বসে ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছেন। আগামীকালের শিডিউল চেক করার জন্য তিনি গুগল ক্যালেন্ডারটা খুলেছিলেন; চোখ বোলাতে বোলাতেই তাঁর দৃষ্টি হঠাৎ থমকে গেল রবিবারের তারিখটার ওপর। সেখানে একটা নীল রঙের ব্লকে অটোমেটেড রিমাইন্ডার জ্বলজ্বল করছে: "Rahul's birthday"।
স্ক্রিনের ওই ছোট লেখাটার দিকে তাকাতেই ইন্দিরার শান্ত, গম্ভীর চোখদুটো এক লহমায় এক অনাবিল, স্নিগ্ধ আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তাঁর বাবুসোনাটা... তাঁর নিজের নাড়ি-ছেঁড়া ধনটা দেখতে দেখতে কুড়ি বছরে পা দিতে চলেছে! কিন্তু সেই আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই এক গভীর, তীক্ষ্ণ অপরাধবোধ তাঁর বুকের ভেতরটায় খোঁচা মারল। তিনি কেমন মা? নিজের একমাত্র সন্তানের জন্মদিনটা তাঁর মাথা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে গিয়েছিল? তাঁকে কি না গুগল ক্যালেন্ডারের রিমাইন্ডার দেখে মনে করতে হচ্ছে যে তাঁর ছেলের জন্মদিন আসছে!
ল্যাপটপের আলোয় ইন্দিরার ফর্সা, অভিজাত মুখের রেখাগুলোতে এক সূক্ষ্ম বিষণ্ণতা ফুটে উঠল। অবশ্য, এই ভুলে যাওয়ার পেছনে তাঁর নিজের কাজের চাপের চেয়েও বোধহয় এই বাড়ির নিরুত্তাপ পরিবেশটাই বেশি দায়ী। সুব্রত মানুষটাই এমন। তাঁর ওই চরম প্র্যাক্টিক্যাল, হিসেবি আর ব্যবসায়িক মগজে জন্মদিন পালনের মতো বিষয়গুলো নেহাতই সময় আর অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। সুব্রতর সাথে এই সুদীর্ঘ সংসার জীবনে থাকতে থাকতে ইন্দিরা নিজেও যেন নিজের মনটাকে ওই একই যান্ত্রিক তরঙ্গে বেঁধে ফেলেছিলেন; জন্মদিনটাকে আর পাঁচটা সাধারণ দিনের মতোই দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন।
কিন্তু... তাঁর ওই শক্ত, কেতাদুরস্ত এবং গম্ভীর মুখোশের ঠিক পেছনেই হৃদয়ের যে একটা নরম, গোপন কুঠুরি আছে—যেখানে তিনি শুধু একজন মা, যেখানে তাঁর ছেলের প্রতি এক অন্ধ, নিঃশর্ত ভালোবাসার রত্নভাণ্ডার লুকোনো আছে—সেই কুঠুরির দরজাটা মাঝে মাঝেই সামান্য ফাঁক হয়ে যেত, তা এই 'বার্টার সিস্টেম' নামক চুক্তির খেলা শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই। তিনি প্রতি বছর রাহুলের জন্মদিনে ওই মেপে চলা রুটিনের মাঝেই একটুখানি নিজের মতো করে মাতৃত্বের ছোঁয়া মিশিয়ে দিতেন। অন্তত এই একটা দিন, যতই কাজ থাকুক না কেন, তিনি নিজের হাতে রাহুলের সবথেকে পছন্দের পদগুলো রান্না করতেন, আর অবশ্যই নিয়ম করে বানাতেন বাঙালির সেই চিরায়ত স্নেহের প্রতীক—মায়ের হাতের পায়েস। এবারও তিনি ঠিক সেটাই করবেন। কিন্তু এবছর... এই সমস্ত নতুন, রুদ্ধশ্বাস আর বন্য অনুভূতির আদানপ্রদানের পর, তাঁর মন চাইছিল ছেলেটার জন্য আরও অনেক কিছু করতে। অনেক, অনেক বেশি কিছু।
'থপ!'
হঠাৎ পেছন থেকে আসা একটা ভারী শব্দে ইন্দিরার চিন্তার সুতোটা ছিঁড়ে গেল। তিনি ঘাড় ঘুরিয়ে বিছানার দিকে তাকালেন। সুব্রত এতক্ষণ বিছানায় একপাশে কাত হয়ে শুয়ে জেমস ক্লিয়ারের 'অ্যাটমিক হ্যাবিটস' বইটা পড়ছিলেন। শব্দটা বইটা বন্ধ করে বেডসাইড টেবিলের ওপর রাখার। সুব্রত চশমাটা খুলে পাশে রাখলেন, তারপর মাথার কাছের বালিশটা ঠিক করে নিয়ে পুরোপুরি শুয়ে পড়লেন। গায়ের ওপর হালকা চাদরটা টেনে নিতে নিতে তিনি অত্যন্ত যান্ত্রিক, অভ্যস্ত গলায় বললেন, "গুড নাইট।"
"গুড নাইট," ইন্দিরাও ঠিক ততটাই যান্ত্রিক, রুটিনমাফিক একটা উত্তর দিলেন। একটা অস্ফুট, দীর্ঘশ্বাস তাঁর গলা থেকে বেরিয়ে এল। তিনি আবার ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে ঘুরে গিয়ে আগামীকালের মিটিংয়ের পয়েন্টগুলো দেখতে শুরু করলেন।
আরও বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেছে। রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা।
আগামীকালের মিটিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় কয়েকটা ইমেইলের রিপ্লাই দেওয়া শেষ করে ইন্দিরা ল্যাপটপের ঢাকনাটা নামিয়ে রাখলেন। ঘাড়ের পেছনের পেশিগুলো একটু শক্ত হয়ে এসেছে, চোখের পাতায় একটা মন্থর ঘুম-ঘুম ভাব। বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখলেন, সুব্রত ততক্ষণে নিয়মিত শ্বাসের সাথে ঘুমের অতলে তলিয়ে গেছেন।
ঠিক এই সময়টাতে, গত কয়েকটা দিনের মতোই, ইন্দিরার মনটা অবচেতনভাবে ওই লম্বা করিডোরটা পার হয়ে চলে গেল রাহুলের বন্ধ দরজার ওপারে। ছেলেটা এখন কী করছে? নিশ্চয়ই জেগে আছে। হয়তো কালকের ক্লাসের পড়া তৈরি করছে। ইন্দিরার বুকের ভেতরটা এক অজানা, অবাধ্য তৃষ্ণায় টনটন করে উঠল। তাঁর খুব ইচ্ছে করছিল পা টিপে টিপে উঠে গিয়ে একবার রাহুলের ঘরে উঁকি মারতে। কিন্তু তিনি জানেন, সেটা একেবারেই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। সুব্রত যদি কোনো কারণে টের পেয়ে যান, তাহলে হাজারটা অপ্রীতিকর প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে।
আর কোনো উপায় না দেখে তিনি টেবিলের ওপর থেকে নিজের ফোনটা তুলে নিলেন। অন্তত মেসেজ করে তো দেখা যায় ছেলেটা কী করছে। হয়তো ওরও নিজের জন্মদিনের কথা বিন্দুমাত্র মনে নেই।
হোয়াটসঅ্যাপটা খুলে তিনি রাহুলের চ্যাটবক্সে ঢুকলেন।
**ইন্দিরা:** "রাহুল, ঘুমিয়ে পড়েছিস?"
করিডোরের ওপারে, নিজের নিভৃত ঘরে রাহুল তখন বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আগামীকালের কেমিস্ট্রি ক্লাসের নোটসগুলো রিভাইস করছিল। কিন্তু ওর মগজটাও ঠিক ওর মায়ের মতোই একই ফ্রিকোয়েন্সিতে ঘুরপাক খাচ্ছিল। চোখের সামনে কেমিক্যাল ইকুয়েশনগুলো ভাসলেও, ওর অবচেতন মন জুড়ে কেবলই লেপ্টে ছিল মায়ের গায়ের সেই চেনা সুবাস, সেই নরম, ফর্সা ত্বকের উষ্ণতা। হঠাৎ ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠে মেসেজ টোনটা বাজতেই ওর নিস্তেজ চোখদুটোয় এক লহমায় একটা খুশির ঝিলিক খেলে গেল। মায়ের মেসেজ।
**রাহুল:** "না মা, কালকের ক্লাসের জন্য একটু পড়ছিলাম।"
ইন্দিরার ঠোঁটের কোণে একটা প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। নিজের ছেলের এই শৃঙ্খলার প্রতি তাঁর বরাবরই একটা আলাদা দুর্বলতা আছে।
**ইন্দিরা:** "ওহ, ঠিক আছে। তাহলে আর কথা বাড়াচ্ছি না, মন দিয়ে পড় সোনা।"
একজন দায়িত্বশীল মা এবং কড়া প্রফেসরের মতো তিনি ছেলের পড়াশোনাটাকেই অগ্রাধিকার দিলেন।
রাহুল ফোনটা নামিয়ে রাখতে গিয়েও পারল না। ওর ভেতরের সেই না-পাওয়ার হাহাকারটা আঙুলের ডগায় এসে ভর করল।
**রাহুল:** "আমি অলরেডি অনেকক্ষণ ধরে একটানা পড়ছি মা, মাথা আর কাজ করছে না। বাকিটা কাল সকালে ক্লাসের আগে দেখে নেব।"
ইন্দিরা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড থমকালেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন না কী রিপ্লাই দেবেন। ছেলেটার হয়তো এখন ফোন ঘেঁটে সময় নষ্ট করার চেয়ে চোখ বুজে একটু রেস্ট নেওয়াটা বেশি জরুরি। তিনি কিছু টাইপ করার আগেই দেখলেন স্ক্রিনে আবার মেসেজ ঢুকছে।
**রাহুল:** "মা, আমি আর জাস্ট নিতে পারছি না। আই অ্যাম মিসিং ইউ সো মাচ। বাবা সারাক্ষণ বাড়িতে বসে আছে, আমি তোমার সাথে পাঁচটা মিনিট শান্তিতে কথাও বলতে পারি না, আর জড়িয়ে ধরা তো অনেক দূরের কথা। মা... বাবা তো ঘুমিয়ে পড়েছে... তুমি কি প্লিজ একবার আমার ঘরে আসবে?"
ছেলের এই কাঙালের মতো আকুতি পড়ে ইন্দিরার বুকের বাঁ দিকটা মুচড়ে উঠল। তাঁর নিজেরও তো একই অবস্থা। কিন্তু তিনি পরিণতমনস্কা, তাঁকে তো ঝুঁকির দিকটা মাথায় রাখতেই হবে।
**ইন্দিরা:** "আমি বুঝতে পারছি সোনা। মা সব বোঝে। কিন্তু তুই তো জানিস, এখন যাওয়াটা একদমই সেফ নয়। তোর বাবা বাড়িতে থাকলে আমি রিস্ক নিতে পারব না।"
**রাহুল:** "মা, তাহলে কাল খুব ভোরে আসবে? ঠিক সোমবারের মতো? আমি ৫:৩০-টায় অ্যালার্ম দিয়ে রাখব, ঠিক উঠে পড়ব মা, কোনো অসুবিধে হবে না।"
ইন্দিরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর ভেতরে যতই ইচ্ছা থাকুক, মায়ের কর্তব্যবোধ তাঁকে আটকাল।
**ইন্দিরা:** "না না সোনা, আমি তোকে সবসময় কী বলি মনে নেই? অন্তত আট ঘণ্টার ঘুম তোর জন্য খুব জরুরি। বিশেষ করে এখন সেমিস্টার চলছে, তোর রুটিন ঠিক রাখাটা মাস্ট। তুই এমনিতেই অনেক রাত অবধি জাগিস, সেটা ঠিক আছে, কিন্তু সেক্ষেত্রে এত ভোরে ওঠার কোনো দরকার নেই।"
রাহুল আর কোনো তর্ক করল না, শুধু একটা বিষণ্ণ মুখের ইমোজি (?) পাঠিয়ে দিল।
ইন্দিরা বুঝতে পারলেন ছেলেটার মনটা পুরোপুরি ভেঙে গেছে। ওকে একটু চাঙ্গা করার জন্য, আর পরিস্থিতিটা হালকা করার জন্য তিনি একটা চপল, আদুরে মেসেজ টাইপ করলেন।
**ইন্দিরা:** "ওরম দুঃখ দুঃখ মুখ করে থাকলে চলবে সোনা? সামনে কী আসছে, মাথায় আছে?"
রাহুলের মেসেজ আসতে একটু সময় লাগল। ও হয়তো সত্যিই বুঝতে পারেনি।
**রাহুল:** "কী আবার? এক্সাম তো এখনও কয়েক সপ্তাহ দেরি আছে মা..."
ইন্দিরা নিজের ঘরে বসে শব্দ করে হেসে ফেললেন। ছেলেটা সত্যিই একটা আস্ত পাগল।
**ইন্দিরা:** "দূর পাগল! তোর কি মনে হয়, আমি সারাক্ষণ খালি হয় পরীক্ষা, নয় অ্যাসাইনমেন্টের ডেডলাইন—এইসব নিয়েই জ্ঞান দিই? আমি কি এতটাই বোরিং আর খিটখিটে মা?"
**রাহুল:** "তাহলে কীসের কথা বলছ মা?"
**ইন্দিরা:** "আমার বাবুটার যে জন্মদিন! এই রবিবার।"
রাহুল ওর নিজের বিছানায় বসে নিজের কপালেই একটা হালকা চাপড় মারল। সত্যি তো!
**রাহুল:** "ওহ্ হ্যাঁ, তাই তো! আমার তো জাস্ট মাথাতেই ছিল না ব্যাপারটা।"
**ইন্দিরা:** "যাই হোক সোনা, তুই কিন্তু রবিবারের পর থেকে আর টিনএজার নোস। দেখতে দেখতে কুড়ি বছরের একটা আস্ত যুবক হয়ে গেলি। চোখের সামনে আমার ছেলেটা এত বড় হয়ে যাচ্ছে ভাবলেই কেমন যেন অদ্ভুত লাগে। তা, এবছর নিজের জন্মদিনটা নিয়ে তোর কী ফিলিং হচ্ছে বল তো? কোনো স্পেশাল প্ল্যান আছে নাকি মাথায়?"
**রাহুল:** "জন্মদিন নিয়ে আমার এমনিতেও কোনো এক্সাইটমেন্ট নেই। কী-ই বা আর স্পেশাল হবে? প্রতি বছর যা হয়, এবারও তাই হবে... সেই একই রুটিন, একই বোরিং দিন।"
রাহুলের এই নিস্পৃহ, হতাশ মেসেজটা পড়ে ইন্দিরার বড্ড মায়া হলো। এই ছেলেটা সত্যিই এই বাড়িতে কোনো আনন্দ, কোনো সেলিব্রেশনের উষ্ণতা পায়নি কোনোদিন। তিনি একটু অভিমানের ভান করে টাইপ করলেন।
**ইন্দিরা:** "ওহ আচ্ছা! তার মানে প্রতি বছর জন্মদিনে মায়ের হাতের ওই স্পেশাল রান্না, আর ওই পায়েস... ওগুলোর কোনো দামই নেই তোর কাছে? ওগুলো তোর কাছে বোরিং? ঠিক আছে, তাহলে এ বছর আর আমি কিচ্ছু রাঁধব না।"
মায়ের এই অভিমানী মেসেজটা দেখে রাহুল এক সেকেন্ডে সোজা হয়ে বসল। ও তড়িঘড়ি ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে শুরু করল।
**রাহুল:** "আরে না না মা! অফকোর্স নট! তুমি কী সব বলছ! তোমার হাতের ওই রান্নাটাই তো জন্মদিনের বেস্ট পার্ট। ওটা ছাড়া তো আমার জন্মদিনই হবে না! তুমি এবারও বানাবে তো মা? প্লিজ?"
ইন্দিরা মুচকি হেসে রিপ্লাই দিলেন।
**ইন্দিরা:** "অবশ্যই বানাব সোনা। তুই যখন এত করে রিকোয়েস্ট করছিস, তখন তোর এই বোরিং মা-কে তো রান্নাঘরে ঢুকতেই হবে। বল কী খাবি? সেই আগের বারের মতো বাসন্তী পোলাও আর মাটন কষা?"
**রাহুল:** "হ্যাঁ মা! একদম ওই মেনুটাই। আর সাথে তো ওই ঘন করে বানানো পায়েসটা, কাজু আর কিশমিশ দেওয়া। জাস্ট ভাবলেই আমার জিভে জল চলে আসছে।"
**ইন্দিরা:** "হুমম, দেখতে পাচ্ছি আমার পেটুক ছেলেটার নজর কোথায়। ঠিক আছে, মা তোর জন্য স্পেশাল করে সব বানিয়ে দেবে। তুই শুধু মায়ের বাধ্য ছেলে হয়ে থাকবি।"
চ্যাটটা এবার খুব সহজ, ঘরোয়া এবং আদুরে একটা খাতে বইতে শুরু করল। মা আর ছেলের এই ডিজিটাল নৈকট্যটুকু যেন তাদের মাঝখানের ওই কয়েকটা ঘরের ব্যবধান মুছে দিচ্ছিল।
কিন্তু ধীরে ধীরে, খুব মসৃণভাবে, রাহুলের মেসেজের সুরটা একটু পালটে গেল।
**রাহুল:** "মা... শুধু যদি বাবা এই উইকেন্ডে বাড়িতে না থাকত, তাহলে কত মজাই না হতো, তাই না?"
মেসেজটা পড়ে ইন্দিরার কপালে সামান্য ভাঁজ পড়ল। তিনি জানেন রাহুলের এই ফ্রাস্ট্রেশনের কারণ কী, কিন্তু তবুও একজন মা হিসেবে তিনি এই ধরনের মন্তব্য প্রশ্রয় দিতে পারেন না।
**ইন্দিরা:** "না সোনা, তোর বাবাকে নিয়ে ওভাবে কথা বলতে নেই। মানুষটা হয়তো বাইরে থেকে একটু গম্ভীর, তাঁর এক্সপ্রেশনগুলো হয়তো একটু অন্যরকম, কিন্তু উনি ভেতরে ভেতরে তোকে খুব ভালোবাসেন রে বাবু। তোর ভালোর জন্যই তো উনি সারাদিন এত খাটেন।"
**রাহুল:** "সরি মা... আমি আসলে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারিনি। লাস্ট কয়েকটা দিন আমার সত্যিই খুব কষ্টে কাটছে। তোমাকে চোখের সামনে দেখেও ছুঁতে না পারার কষ্টটা তুমি বুঝবে না..."
ছেলের এই আহত, বিষণ্ণ মেসেজটা ইন্দিরার বুকের ভেতরটা আবার মুচড়ে দিল। পরিস্থিতিটা একটু হালকা করার জন্য, এবং নেহাতই একটু মজার ছলে তিনি টাইপ করে ফেললেন একটা বেশ বিপজ্জনক প্রশ্ন।
**ইন্দিরা:** "আচ্ছা বাবা, মানলাম। ধর যদি তোর বাবা বাড়িতে না থাকত, তাহলে তুই কী করতিস?"
রাহুলের ঘর থেকে রিপ্লাই আসতে এক সেকেন্ডও সময় লাগল না। যেন এই উত্তরটা ওর মগজে সারাক্ষণ তৈরিই ছিল।
**রাহুল:** "আমি আবার তোমার সাথে চান করতাম, মা। আমি তোমাকে নিজের হাতে সাবান মাখিয়ে দিতাম, তোমাকে ধুয়ে দিতাম..."
মেসেজটা স্ক্রিনে ফুটে উঠতেই ইন্দিরার শরীরটা যেন একটা তীব্র ইলেকট্রিক শকে কেঁপে উঠল। তাঁর হাতের তালু ঘেমে উঠল, আর ফর্সা মুখমণ্ডল এক লহমায় টকটকে লাল হয়ে গেল। তিনি বিন্দুমাত্র প্রত্যাশা করেননি যে রাহুল এত দ্রুত, এত সরাসরি এমন একটা চরম উত্তেজনাময় উত্তর দেবে। তাঁর নারীশরীরের আনাচেকানাচে সেই বাথরুমের পিচ্ছিল, বন্য স্মৃতির উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল। তিনি বুঝতেই পারছিলেন না কী রিপ্লাই দেবেন। তাঁর প্রাজ্ঞ মগজ যেন ক্ষণিকের জন্য পুরোপুরি ব্ল্যাঙ্ক হয়ে গেল। আর কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে তিনি শুধু রাহুলের কথাটাই একটা প্রশ্নবোধক বাক্যে টাইপ করে পাঠিয়ে দিলেন।
**ইন্দিরা:** "তুই... তুই আমার সাথে আবার স্নান করবি?"
রাহুলের ঘর থেকে রিপ্লাই আসতে এক সেকেন্ডও সময় লাগল না।
**রাহুল:** "হ্যাঁ মা। তোমার কি মনে নেই সেই প্রমিসগুলোর কথা? আমি নিজের হাতে তোমাকে সাবান মাখিয়ে দেব, ভালো করে স্নান করিয়ে দেব... কতগুলো মাস কেটে গেল মা, আমরা তো ওটা আর করতেই পারলাম না। আর তুমিও তো বলেছিলে যে তোমার ইচ্ছে করে, মনে নেই?"
ছেলের এই সরাসরিভাবে সব পুরোনো প্রতিশ্রুতির কথা মনে করিয়ে দেওয়ার পর ইন্দিরার বুকের ভেতরের প্রতিরক্ষার শেষ দেওয়ালটুকুও যেন ধসে পড়ল। তাঁর আঙুলগুলো কিপ্যাডের ওপর কাঁপছিল। অনেকক্ষণ পর, নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে তিনি স্রোতে গা ভাসিয়ে দেওয়ার মতো, একটা প্রায় আত্মসমর্পণ করার ভঙ্গিতে মেসেজ লিখলেন।
**ইন্দিরা:** "হ্যাঁ, আমার মনে আছে... দেখা যাক, ঈশ্বর চাইলে হয়তো হবে কোনোদিন। ওসব কথা আর ভাবিস না সোনা, যা ঘুমিয়ে পড় এবার।"
কিন্তু রাহুল এখন আর থামার পাত্র নয়। ওর ভেতরের ওই না-পাওয়ার হাহাকারটা এবার একটা মরিয়া রূপ নিল।
**রাহুল:** "মা, অন্তত তুমি কি এমন কোনো সময় বের করতে পারো, যেখানে আমরা দুজনে সামনাসামনি বসে একটু মন খুলে কথা বলতে পারি? একটা রিজনেবল অ্যামাউন্ট অফ টাইম? তুমি তো জানো মা, তুমি ছাড়া এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই যার সাথে আমি আমার মনের সব কথা শেয়ার করতে পারি..."
ইন্দিরার বুকটা ভারী হয়ে এল। তিনি নিজেও তো ঠিক এটাই চান। কিন্তু উপায় কোথায়? সুব্রত যতদিন বাড়িতে আছে, এই চার দেওয়ালের ভেতর একান্তে কথা বলাটা প্রায় অসম্ভব।
**ইন্দিরা:** "আমি তোর কষ্টটা বুঝতে পারছি সোনা। মায়েরও একই অবস্থা। কিন্তু উপায় তো দেখছি না রে বাবু। তোর বাবা বাড়িতে থাকলে সেটা কোনোভাবেই পসিবল নয়।"
রাহুলের চিন্তা যেন ইন্দিরার সঙ্গেই একই ছন্দে মিলছিল। ও দ্রুত একটা সমাধান বের করল।
**রাহুল:** "মা, আমি জানি বাড়িতে পসিবল নয়। তাহলে বাইরে কোথাও হলে কেমন হয়? মা, আমার কালকের ক্লাস তো বিকেল ৫টায় শেষ হয়ে যাবে। তুমি কি ইউনিভার্সিটি থেকে ওই সময়টায় বেরোতে পারবে? তাহলে আমরা কোথাও একটু দেখা করতে পারি... ধরো, এলিয়ট পার্কে?"
ইন্দিরা মেসেজটা দেখে একটু থমকালেন। এলিয়ট পার্ক? তাঁর ল্যাপটপটা আবার খুলে দ্রুত ক্যালেন্ডারটা চেক করলেন।
**ইন্দিরা:** "না সোনা, কাল বিকেল পাঁচটার সময় আমার একজন পিএইচডি স্টুডেন্টের সাথে মিটিং আছে। আমি বেরোতে পারব না।"
**রাহুল:** "তাহলে তুমি কি প্লিজ মিটিংটা রিশিডিউল করতে পারো? ও তো একজন স্টুডেন্ট, ও নিশ্চয়ই কিছু মনে করবে না।"
**ইন্দিরা:** "না বাবু, সেটা ঠিক হবে না। আমি অলরেডি এই মিটিংটা একবার রিশিডিউল করেছি। এটা মঙ্গলবারে হওয়ার কথা ছিল। আমি আবার পেছাতে পারব না, সেটা খুব আনপ্রফেশনাল দেখাবে।"
রাহুল এবার ওর সমস্ত আবেগ ঢেলে দিল মেসেজে।
**রাহুল:** "প্লিজ মা... প্লিজ... জাস্ট এই একবারের জন্য... একটু ভেবে দেখো মা। আমার জন্মদিনটাও তো রবিবার পড়েছে, মানে ওইদিনও বাবা বাড়িতে, আর আমরাও বাড়িতে। আমি তোমার সাথে ভালো করে দুটো কথাও বলতে পারব না। প্লিজ মা, আমি জানি স্টুডেন্টরা তোমাকে কতটা রেসপেক্ট করে, আর তারা খুব ভালো করেই জানে প্রফেসর সেন কতটা বিজি থাকেন। তুমি যদি মিটিংটা আরেকবার পিছিয়ে দাও, ও একটুও মাইন্ড করবে না। প্লিজ মা..."
ইন্দিরা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে রইলেন। তাঁর মনের ভেতর একটা প্রবল, উথালপাথাল করা দ্বন্দ্ব শুরু হলো।
একদিকে তাঁর প্রফেশনাল এথিক্স, তাঁর কড়া রুটিন; আর অন্যদিকে তাঁর ছেলেটার ওই করুন, তৃষ্ণার্ত হাহাকার। তিনি চোখ বন্ধ করে ভাবার চেষ্টা করলেন। এলিয়ট পার্ক... ময়দান চত্বরের ওই সবুজ প্রান্তর। মাথার ওপর খোলা আকাশ, আর চারপাশে এক অচেনা, নাম-না-জানা ভিড়। সেখানে তিনি 'প্রফেসর ইন্দিরা সেন' নন, সেখানে তাঁর কোনো পরিচয় নেই। সেখানে তিনি শুধুই একজন সাধারণ নারী, যে তাঁর হৃদয়ের টুকরোটার সাথে দেখা করতে গেছে।
হ্যাঁ, এটা ঠিক যে সেটা একটা পাবলিক স্পেস। সেখানে দাঁড়িয়ে রাহুলকে বুকে জড়িয়ে ধরার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু অন্তত সেখানে কেউ তাঁদের চেনে না। তাঁরা পাশাপাশি বসে অন্তত এক-দেড় ঘণ্টা মন খুলে কথা তো বলতে পারবেন। হয়তো বেঞ্চে বসে একসাথে ঝালমুড়ি খেতে পারবেন। আর... আর যদি রাহুল চায়, হয়তো একটুক্ষণ ওর হাতটাও ধরে থাকতে পারবেন তিনি।
আর তারপর... সূর্য যখন পশ্চিমে ঢলে পড়বে, গোধূলির আলো যখন নিভে গিয়ে পার্কের বড় বড় গাছগুলোর নিচে একটা নিবিড়, ছায়াঘেরা অন্ধকার নেমে আসবে... তখন হয়তো... হয়তো তাঁরা একটু আড়ালে গিয়ে... একে অপরকে জড়িয়ে ধরতে পারবেন।
এই শেষ চিন্তাটা মাথায় আসতেই ইন্দিরার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা আদিম, নিষিদ্ধ রোমাঞ্চের শিহরণ বয়ে গেল। তিনি নিজেই নিজের ভাবনায় শিউরে উঠলেন। এ তিনি কী ভাবছেন! ঠিক যেন সেইসব উঠতি বয়সী, কলেজ-পালানো প্রেমিক-প্রেমিকাদের মতো, যারা নিজেদের কড়া বাবা-মায়ের চোখ এড়িয়ে পার্কের অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে একটুখানি আদর চুরি করতে যায়। আর আজ... আজ তিনি নিজে একজন মাঝবয়সী নারী, একজন মা হয়ে... নিজের জন্ম দেওয়া সাবালক ছেলের সাথে ঠিক সেই একই রকম একটা লুকোচুরির, একটা চুরি-করা প্রেমের শিহরণ কল্পনা করছেন!
তিনি একটা গভীর শ্বাস নিয়ে কিপ্যাডে আঙুল রাখলেন।
**ইন্দিরা:** "ঠিক আছে, রাহুল। কাল সাড়ে পাঁচটা। এলিয়ট পার্ক।"
মেসেজটা পাওয়ার সাথে সাথে রাহুলের অন্ধকার ঘরে যেন একটা সশব্দ, উজ্জ্বল বোমা ফাটল। ওর পুরো শরীরটা একটা বন্য, লাগামছাড়া আনন্দে লাফিয়ে উঠল। ও বিছানায় প্রায় উঠে দাঁড়িয়ে মেসেজ টাইপ করতে লাগল।
**রাহুল:** "থ্যাঙ্ক ইউ থ্যাঙ্ক ইউ থ্যাঙ্ক ইউ মা!!! আই অ্যাম সো এক্সাইটেড! তুমি জাস্ট আমাকে বাঁচিয়ে দিলে মা! আই লাভ ইউ সো সো মাচ!"
ওর পাঠানো একগাদা লাল হার্ট ইমোজির দিকে তাকিয়ে ইন্দিরার ঠোঁটে এক পরম, স্নিগ্ধ হাসি ফুটে উঠল। তাঁর বুকের ভেতরটা এক অসীম উষ্ণতায় কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেল।
**ইন্দিরা:** "এবার ভালো করে ঘুমো সোনা। কাল কথা হবে।"
(continued...)