Forums
গল্প :অরুনরঙা প্রনয় Writer :Priynshi Chowdhury - Printable Version

+- Forums (https://forum.xgossip.fun)
+-- Forum: Storeys Category (https://forum.xgossip.fun/forumdisplay.php?fid=1)
+--- Forum: Genaral Stories (https://forum.xgossip.fun/forumdisplay.php?fid=2)
+--- Thread: গল্প :অরুনরঙা প্রনয় Writer :Priynshi Chowdhury (/showthread.php?tid=2)



গল্প :অরুনরঙা প্রনয় Writer :Priynshi Chowdhury - X Man - 08-29-2026

Part:01
জীবনে কখনো শুনেছেন বাসর রাতে নববধূকে দিয়ে একগাদা কাপড় ধোয়ানো হচ্ছে? নিশ্চয়ই না। আজ আমার ডাফার স্বামী ওরফে শায়ান তালুকদার, আমাকে দিয়ে বাসর রাতে কাপড় ধোয়াচ্ছে। অস্বাভাবিক রকমের বাড়াবাড়ি ব্যাপার এটা। এদিকে
রাত অনেক হয়েছে। বাথরুমের ঠান্ডা মেঝেতে টুল নিয়ে বসে আমি একের পর এক কাপড় সাবান মেখে ধুয়ে যাচ্ছি। ঠান্ডা পানিতে হাত ডুবিয়ে রাখতে রাখতে আঙুলের চামড়াগুলো কুঁচকে যেতে শুরু করেছে। তার চেয়েও বেশি কষ্ট হচ্ছে একটা ব্যাপারে। আমার যত্ন করে লাগানো নেইলপলিশ ধীরে ধীরে উঠে যাচ্ছে। বাপের বাড়িতে থাকতে এসব কাজ তো কখনো করিনি। বাবার আদরের মেয়ে ছিলাম আমি। অথচ সেই বাবাই না জানি কী ভেবে আমাকে এই পাগল ছেলেটার সঙ্গে বিয়ে দিলেন! তার ওপর আবার শায়ান হুমকি দিচ্ছে, কাজ না করলে বাবাকে ফোন করবে। এদিকে বাবাকে আমি প্রচন্ড ভয় পাই। তার সামনে গিয়ে এসব বলতে পারব না বলেই হয়তো সব চুপচাপ সহ্য করে যাচ্ছি। নইলে এই বদমাশ শায়ান তালুকদারকে আমি ঠিকই দেখে নিতাম! শালা বেয়াদব একটা! অথচ এই ছেলেই কিনা আমার ছোটবেলা থেকে বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলো। কিন্তু বিয়ের পর আজ এই রুপ পরিবর্তনের জন্য বেস্ট শত্রু হয়ে গেছে।

ভাবনার মাঝে ঠিক তখনই বাথরুমের বাইরে থেকে ভেসে এলো গম্ভীর, পুরুষালী কণ্ঠস্বর,
“অরু! এই অরু! আরও দুটো প্যান্ট ছিলো। ওগুলোও বালতিতে অ্যাড কর।”

অরুনীমা মুখ বাঁকিয়ে তাকালো দরজার দিকে। শায়ান দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। যেন এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক দৃশ্য। অথচ অরুনীমার অন্য বান্ধবীরা তাকে এভাবে কাজ করতে দেখলে নিশ্চিত অক্কা পেতো। আর শায়ান হাতে করে আরও দুটো জিন্স এনে অরুনীমার সামনে রাখা বালতিতে ফেললো। অরুনীমা অসহায় চোখে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। তার ঠোঁটটা অজান্তেই বেঁকে গেলো অভিমানে। আর সে? দিব্যি ভাবসাব নিয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শায়ান হেসে বলল,
“না না সোনা, তোর এই ইনোসেন্ট পাপ্পি আইস দেখিয়ে কোনো লাভ নেই। আমি গলছি না। চুপচাপ এগুলো ধুয়ে রেখে দে। কাল সকালে ছাদে গিয়ে মেলে দিবি। আজকের মতো এতটুকুই কাজ।”

কথা শেষ করে শায়ান চলে যেতে উদ্যত হলো। কিন্তু হঠাৎই অরুনীমা কাতর হয়ে ডেকে উঠলো,
“শায়ান!”

শায়ানের পা থেমে গেলো। অরুনীমা জিজ্ঞেস করে,
“তুই আমাকে এভাবে শাস্তি দিচ্ছিস কেন? আমরা না বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলাম! তার ওপর এখন তো আমি তোর বউ… তাও তুই আমাকে দিয়ে এসব করাচ্ছিস?”

শায়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল অরুনীমার দিকে। তার চোখে অদ্ভুত এক শান্ত ভাব। সে বলল,
“এটাই তো সমস্যা, অরু। তুই আমার বউ হয়েছিস।কাগজে কলমে, সমাজের চোখে। কিন্তু আমাদের মধ্যে তো সত্যিকারের স্বামী-স্ত্রীর সেই সম্পর্কটা নেই। সেটা আমরা দুজনেই জানি।”

শায়ানের কথা শুনে অরুনীমার বুকটা কেমন করে উঠলো। আসলেই অরুনীমা আর শায়ান বিয়ের দশ মিনিট আগে নিজেদের মধ্যে কথা বলেছে এই বিয়ে তাদের বাবার জোরে হলেও তারা একচুয়ালি স্বামী-স্ত্রী হবে না। তারা আগের মতো বেস্ট ফ্রেন্ডই থাকবে। সুযোগ বুঝে সেপারেশন নেবে। যেহেতু তারা কেউই প্রস্তুত ছিলো না। শায়ান আবার বলল,
“যেদিন তুই আমাকে সত্যি সত্যি স্বামী বলে মেনে নিতে পারবি, সেদিন আমি তোকে মাথায় করে রাখব। তার আগে নোপ!”

অরুনীমা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। হাতে এখনো সাবানের ফেনা লেগে। চোখ সরাসরি শায়ানের দিকে রেখে প্রশ্ন করলো,
“তুই আমাকে মেনেছিস?”

শায়ান কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। তারপর মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে খুব আলতো করে হেসে বলল,
“কবুল বলার সাথে সাথেই।”

অরুনীমা স্তব্ধ হয়ে গেলো। কি বলল সে? কিন্তু এমন তো কথা ছিলো না! এই বিয়েটা হয়েছে অরুনীমার বাবার জোরে, হুট করে, কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই। বন্ধুত্বের সহজ সম্পর্কটা এক মুহূর্তে বদলে গিয়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে পরিণত হওয়া এতটাই কি সহজ? এত তারাতাড়ি শায়ান কিভাবে মেনে নিলো অরুনীমাকে! কিছুক্ষণ স্থির হয়ে ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইলো। মনে হলো, মাথার ভেতর হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। তারপর ধীরে ধীরে আবার টুলে বসে পড়লো অরুনীমা। ভাবনা ছেড়ে বালতির ভেতর ভেজা কাপড়গুলো আবার ধুতে শুরু করলো। 

-------------------------------------

কাপড় ধোয়ার দীর্ঘ যুদ্ধ শেষ করে অরুনীমা যখন ফ্রেশ হয়ে ঘরে ঢুকলো তখন রাত অনেকটাই গাঢ় হয়ে এসেছে। অরুনীমা তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে দেখে বিছানার হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে আছে শায়ান। তার হাতে ফোন, চোখ স্ক্রিনে নিবদ্ধ। অরুনীমাকে আসতে দেখে সে ধীর ভঙ্গিতে ফোনটা পাশে রেখে দিল। অরুনীমা বিছানায় বসলো। কিছুক্ষণ শায়ানের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
“একটা কথা বলতো, বাবা তোর সাথে আমার বিয়ে দিল কেন? ব্যাপারটা কিছুতেই মাথায় ঢুকছে না।”

শায়ান কাঁধ ঝাঁকিয়ে স্বাভাবিকভাবে বলল,
“আমি কি জানি? তোর বাবাকে জিজ্ঞেস কর।”

অরুনীমা সঙ্গে সঙ্গে মুখ বাঁকালো। সেই চেনা অভিমানী ভঙ্গি। শায়ান সেটা দেখে মৃদু হেসে বলল,
“ ঘুমাবি না? নাকি রাতটা বসেই কাটানোর প্ল্যান?”

অরুনীমা একটু থেমে আবার প্রশ্ন করলো,
“আমরা… ডিভোর্স নেব না?”

শায়ান এবার চোখ তুলে অরুনীমার দিকে তাকালো। শান্ত স্বরে বলল,
“তোর যদি অন্য কাউকে পছন্দ থাকে যাকে তুই বিয়ে করতে পারবি, তাহলে আমি তোকে ডিভোর্স দিয়ে দেব। কোনো সমস্যা নেই। ডিভোর্সের জন্য অস্থির হচ্ছিস কেন? এমন কেউ আছে?”

অরুনীমা বিরক্ত হয়ে বলল,
“ওহ ইয়ার! আমার কাউকে পছন্দ থাকলে তুই জানতি না? আমার তো ছেলে মানুষে ফোবিয়া আছে। তুই আর আমার বাপ ছাড়া আমার লাইফে কোনো ছেলের অস্তিত্বই রাখি নি। আমি তো জীবনে বিয়েই করতাম না, ভাই! কি থেকে কি হয়ে গেলো বুঝলামি না! ”

শায়ান এবার চিত হয়ে শুয়ে পড়লো। ছাদের দিকে তাকিয়ে ধীর স্বরে বলল,
“তাহলে চুপ থাক। ডিভোর্সের প্ল্যান চেঞ্জড।”

অরুনীমা ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই শায়ান গম্ভীর গলায়  বলল,
“বি ম্যাচিউর, অরু। সারাজীবন একা থাকা যায় না। প্রতিটা মানুষের বেঁচে থাকার জন্য একটা সঙ্গী দরকার। তাছাড়া আমরা সমাজে বাস করি। তোর এই ফোবিয়া কেউ বুঝবে না। উল্টো দিনশেষে হাজারটা কথা উঠবে।”

একটু থেমে শায়ান হালকা হেসে বলল,
“আর আমরা তো হাসব্যান্ড–ওয়াইফ থোরাই না হলাম। বন্ধু হিসেবেই দিব্যি কাটিয়ে দিতে পারব। আমাদের ভেতরের গল্প তো আর কেউ জানবে না। তাছাড়া সামাজিক একটা সম্পর্কেও আছি। তাই তুইও চেপে যা।”

অরুনীমা মাথা নেড়ে বলল,
“সব বুঝলাম। কিন্তু আজকে আমি ঘুমাব কোথায়? ওই সোফাটা ছোট, আর মেঝেতে ঘুমানো ইম্পসিবল!”

শায়ান ভ্রু কুঁচকে বলল,
“খাটে কি সমস্যা?”

অরুনীমা চোখ বড় বড় করে তাকালো। যেন বিস্ময়কর কিছু শুনেছে৷ বলল,
“আমি একটা ছেলের সাথে ঘুমাব? তাও এক খাটে?”

শায়ান ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি টেনে বলল,
“তো কি করবি? বিয়ে যেহেতু একটা ছেলেকেই করেছিস, ছেলের সাথেই তো ঘুমাতে হবে, তাই না?”

অরুনীমা একটু গুটিসুটি হয়ে শায়ানকে ধাক্কা দিয়ে বলল,
“তাহলে সর ওই সাইডে চেপে ঘুমা। মাঝে বড় একটা কোলবালিশ দে। যতই হোক ছেলেমানুষ তুই, রিস্কি ব্যাপার-স্যাপার!”

শায়ান হালকা হেসে বিছানার মাঝখানে একটা বড় বালিশ রেখে দিয়ে সরে যায় পাশে। অরুনীমা সাবধানে এসে বিছানায় শুয়ে পড়লো। তবে পরনের শাড়িতে তার অস্বস্তি হচ্ছিল। কারণ জীবনে সে শাড়ি পরেনি। অস্বস্তিটা বোঝা যাচ্ছিল স্পষ্টই। শায়ান সেটা লক্ষ্য করে বলল,
“জেদ করে লাগেজ তো আনলি না বাড়ি থেকে। শাড়িতে নিশ্চয়ই কম্ফোর্ট হবে না। আলমারিতে আমার অনেকগুলো টি-শার্ট আছে। সেখান থেকে আমার যেকোনো একটা টি-শার্ট পরে নিতে পারিস।”

অরুনীমা এক মুহূর্তও দেরি করলো না। উঠে গিয়ে আলমারি খুলে একটা ঢিলেঢালা টি-শার্ট বের করলো। অবশ্য শায়ানের সব টি-শার্টে আরও দু-তিনটে অরুনীমা নিমেষে হয়ে যাবে। ভাবনা ছেড়ে তারপর ওয়াশরুমে গিয়ে কাপড় বদলে আবার এসে শুয়ে পড়লো অরুনীমা। বিছানায় কিছুক্ষণ চুপচাপ কাটলো  নিরবতায়। তারপর অরুনীমা শায়ানের পাশে কাত হয়ে নিজের হাতের ওপর মাথা রেখে শায়ানের দিকে তাকিয়ে কৌতুহলী হয়ে বলল,
“শোন… তুই আমার না বলার আগেই সব বুঝিস কী করে? ছোটবেলা থেকেই এটা খেয়াল করি।”

শায়ান ধীরে হেসে বলল,
“অনেক বছরের রিসার্চ করার ফল এটা।”

অরুনীমা ছোট ছোট চোখে তাকালো। তারপর শায়ান নিজে চোখ বন্ধ করে বলল,
“এবার ঘুমা। কাল সকালে আমার অফিস আছে।”

অরুনীমা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। ক্লান্ত থাকায়  কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই অরুনীমার শ্বাসপ্রশ্বাস ধীর হয়ে এলো, ঘুম তাকে টেনে নিয়ে গেলো অন্য জগতে। শায়ানও চোখ বন্ধ করেছিলো। কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার চোখ খুললো। নীরবে তাকিয়ে রইলো পাশে ঘুমিয়ে থাকা অগোছালো, অবুঝ মেয়েটার অরুনীমার দিকে। তার কপালের ওপর এলোমেলো হয়ে পড়া ছোট ছোট বেবি হেয়ারগুলো শায়ান আলতো করে তর্জনী আঙুল দিয়ে সরিয়ে দিলো। ঘুমের মাঝে অরুনীমাকে দেখতে আলাদা এক শান্তি লাগে শায়ানের।

কত বছর হয়ে গেলো। বন্ধুত্বের নামেই পাশে ছিলো সে। আজ অরুনীমা তার স্ত্রীও হয়ে গেছে। তবু এতদিনেও শায়ান তার মনের অনুভূতি জানাতে পারেনি। কারণ সে জানে, অরুনীমা বুঝবে না। কখনোই বুঝবে না মেয়েটা। উল্টো হেসে উড়িয়ে দেবে। সে বুঝবে না যে, শায়ানের অনুভূতি বন্ধুত্বের সীমানা অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। এতটাই দূরে চলে গেছে, যেখানে ভালোবাসার অন্ত নেই। তবু দিনশেষে একটাই শান্তি আছে তার মনে। অরুনীমা এখন তার। চিরদিনের জন্য।

চলমান.......






RE: গল্প :অরুনরঙা প্রনয় Writer :Priynshi Chowdhury - X Man - 08-29-2026

পর্ব:০২


শায়ান একজন সরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা। সদ্য কর্মজীবনে পদার্পণ করেছে সে, প্রায় তিনমাসের মতো। বিকেল চারটায় ব্যাংকের কাজ শেষ করে শায়ান বের হয়। প্রতিদিনের ন্যায় ব্যাংক থেকে বেরিয়ে শহরের ব্যস্ত রাস্তায় পা রাখে সে। ব্যাংক বিকেল চারটায় ছুটি হওয়ায় নিয়মমতো আধঘণ্টার পথ পেরিয়ে সাড়ে চারটার দিকে সে পৌঁছায় বাড়িতে। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই খেয়াল হলো ঘরটা নিরব। চারপাশে তাকিয়ে দেখলো অরুনীমা নেই ঘরে।

শায়ান অরুনীমাকে খুঁজতে গিয়ে বারান্দায় পা রাখতেই চোখে পড়লো মেয়েটাকে। মেঝেতে বসে আছে সে, দু’হাত ভরে কিছু শিউলি ফুল নিয়ে। বারান্দা থেকে হাত বাড়ালেই শিউলি ফুলগুলো ধরা যায়। এই নিয়েই অরুনীমা নিজের ছোট্ট জগতে ডুবে আছে অন্তর্চিন্তায়। শায়ানের ডাকে চমকে উঠলে সম্বিৎ ফেরে তার। মাথা তুলে তাকাতেই শায়ান জিজ্ঞেস করে, 
“একা বসে কি করছিস এখানে?”

অরুনীমা একটু হকচকিয়ে উঠে দাঁড়ালো। হালকা হাসলো স্বভাবসুলভ ভাবে, 
“এমনিই… বসে ছিলাম। তুই কখন এলি?”

“এই তো, একটু আগে। দুপুরে কিছু খেয়েছিস? রান্না তো করে যাইনি আজ।”

অরুনীমা ঘরের ভেতরে এসে সোফায় বসলো। অনায়াস ভঙ্গিতে হাত-পা ছড়িয়ে বসে বলল,
“পিজ্জা অর্ডার করেছিলাম। হাফ খেয়েই পেট ভরে গেছে। তোর জন্য বাকিটা রেখে দিয়েছি, টেবিলে।”

শায়ান একমুহূর্ত আশ্চর্য ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলো মেয়েটার দিকে। পরক্ষণেই ভাবনায় এলো অবশ্য মেয়েটার দোষ কি! রান্না শেখার সুযোগই বা কবে পেয়েছে সে? আর যাইহোক, খাবার নষ্ট করা যাবে না। আজকে দুপুরের খাবার হিসাবে পিজ্জা দিয়েই কাজ চালাতে হবে। তাই আর কিছু না বলে চুপচাপ ফ্রেশ হয়ে এসে টেবিলের ওপর রাখা পিজ্জার বাক্স খুলে খেতে খেতে শায়ান বলল, 
“তোর একটু হলেও রান্নাবান্না শেখা উচিত ছিলো, অরু।”

এই কথা শুনে অরুনীমা সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। বেশ প্রতিবাদী কন্ঠে বলল, 
“কেন? আমি মেয়ে বলে?”

শায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৃদু গলায় বলল,
“সবসময় এক লাইন বেশি বুঝিস কেন? মেয়ে বলে শিখতে হবে কখন বললাম? কাজ শেখার কোনো জেন্ডার নেই। আমাকে দেখ, আমি তো ঘরের কাজ সবই পারি মোটামুটি। এতদিন তো নিজেই করেছি সব। কাজ করায় কেউ ছোট হয়ে যায় না।”

কথাটা শুনে অরুনীমা একটু চুপ করলো। শায়ানের কথাগুলো সত্যি, কোনো ভুল নেই। তবু অরুনীমা ঠোঁটে দুষ্টু হাসি এনে বলল,
“তুই আছিস না? যেহেতু তুই আমার বর হয়ে গেছিস, একজন কাজ-ফাজ জানলেই তো হয়! আমি পারবো না বাবা, এসব!"

শায়ান খাওয়া দাওয়ার পাট চুকিয়ে গ্লাসের পানি ঢকঢক করে এক চুমুকে শেষ করলো। তারপর গ্লাসটা রেখে শান্ত গলায় বলল,
“না, তোকে শিখতেই হবে। তোকে রান্নাও আমি শেখাবো। আমার উপর নির্ভরশীল কেন থাকবি? আমি না থাকলে কি করবি? তখন তো তোর না খেয়ে থাকতে হবে!"

শায়ানের কথার ভুল মানে বোঝে অরুনীমা। ওর মস্তিষ্ক ভেবে নেয় শায়ান দূরে চলে যাওয়ার কথা বলেছে, বাকি কথাগুলো কানে পৌছায় না তার। তাই অরুনীমা ভয়ার্ত গলায় শায়ানের হাত চেপে ধরে জিজ্ঞেস করে,
"মানে, কোথায় যাবি তুই?"

শায়ান হেসে মাথা নাড়লো,
“পাগলি! কোথাও না। তোকে ছেড়ে কোথায় যাবো আমি? আমার গন্তব্যই তো তুই। আমি বোঝাতে চাইছি কয়দিন অর্ডার করে খাবি? বাইরের খাবার প্রতিদিনের জন্য না। হেলথ্ ইস্যুর ব্যাপার আছে তো!"

অরুনীমা এবার বুঝলো শায়ানের কথার মানে। ও তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলো। পরক্ষণেই অযাচিত ভাবনা ঝেড়ে শায়ানের আরেকটু কাছে গিয়ে বসে। শায়ানের ঝাঁকড়া ঘন চুলে শিউলি ফুলগুলো গুজতে থাকে এক এক করে। তারপর একটু ভেবে বুদ্ধি খাটিয়ে বলল,
“তাহলে… আমরা একটা মেইড রাখি? এতে দুজনেরই কষ্ট কমবে।”

শায়ান হেসে ফেললো মেয়েটার বোকা বোকা কথায়। এদিকে মেয়েটার এমন পাগলামিও উপভোগ করছে সে। অরুনীমা স্কুল লাইফ থেকে মাঝে মাঝেই এমন ফুল গুজে দিতো শায়ানের চুলে। এতে সে কি আনন্দ পায় কে জানে? কিন্তু শায়ান কোনোকিছুতেই আটকায় না তাকে। অরুনীমার কথার প্রতিউত্তরে ওর কপালে আলতো করে টোকা দিয়ে বলল,
 “গাধা! এই টাকায় কুলোবে? আর সংসারটাও তো গোছাতে হবে আমাদের, ভুলে যাচ্ছিস?”

অরুনীমা এবার হাঁটু ভাজ করে সোফায় বসে বেশ আগ্রহ নিয়ে বাচ্চাদের মতো ভাবুক স্বরে বলল,
“কি কি করতে হবে? মানে কোথা থেকে শুরু করবো আমরা?”

শায়ান চারপাশে তাকালো। ঘরটা অবলোকন করলো তীক্ষ দৃষ্টিতে। কি আছে কি নেই তা মনে মনে লিস্ট করে ফেললো। শায়ান নিজের মাথা থেকে একটা ফুল নিয়ে চারপাশে ইশারা করে ঘর দেখতে বলে। এরপর অরুনীমার কানে দুটো ফুল গুজে দিতে দিতে বলল, 
“আমার ফার্নিচার প্রায় নেই বললেই চলে। আমি তো ব্যাচেলর ছিলাম এতদিন, প্রয়োজনীয় জিনিস ছাড়া তেমন কিছুই কেনা হয়নি। এই যেমন বড় আলমারি, বড় সোফা, ডাইনিং টেবিল, একটা টিভি আরও প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র। প্রতি মাসে একটা একটা করে কিনবো। ফ্রিজ এটাতেই চলে যাবে। 
আর এই বাসাটাও পাল্টাতে হবে। একটা ফ্ল্যাট দেখেছি আমি অলরেডি। কথাও হয়েছে।”

অরুনীমা শায়ানের কথায় সায় জানিয়ে বলল,
“ভালোই করেছিস। এই বাসাটা একদমই ছোট। একটা রুম, তাও যেন বাক্স সাইজ! আমার বাসার বাথরুম এর থেকে বড় ছিলো!”

শায়ান মুচকি হেসে বলল,
“তোমার হাসব্যান্ডের স্যালারিটাও দেখতে হবে, ম্যাডাম। ধুমধাড়াক্কা কিনলেই তো হবে না, তাহলে টান পড়বে। তবে যে ফ্ল্যাটটা দেখেছি খারাপ না, আমার এন্ট্রি লেভেলের স্যালারির সাথে অ্যাডজাস্টেড। ওই বাড়িতে দুটো বড় রুম আছে, কিচেন প্লাস বাথরুম। আর তোর পছন্দ মতো একটা বড়সড় বারান্দা!”

বড় বারান্দার কথায় অরুনীমার মুখে হালকা হাসি ফুটে উঠলো। বারান্দা তার কাছে শুধু একটি স্থাপত্য নয়, বরং তার স্বপ্নের এক ছোট্ট প্রাঙ্গণ। বারান্দা জিনিসটা তার প্রচন্ড শখের। সে বিভিন্ন ফুল গাছ লাগিয়ে, পাখি রেখে, দোলনা দিয়ে সাজিয়েছিলো নিজের ঘরের বারান্দা। সৌখিনতা, স্বাচ্ছন্দ্যে ভরপুর ছিলো। কিন্তু বিয়ের পর সব বিপরীত। কিন্তু অরুনীমা কখনোই শায়ানকে সরাসরি বলেনি এই বাড়ির ছোট্ট বারান্দাটি তার ভালো লাগে না, কিংবা এই বাড়ির সংকীর্ণতায় তার দম বন্ধ হয়ে আসে। কিন্তু শায়ান ঠিক বুঝে নিয়েছে। তবে শায়ানের মুখে স্যালারির কথা শুনে অরুনীমা বুদ্ধিমতীর ন্যায় সুবিধা অসুবিধা ভাবলো। ধীর গলায় জিজ্ঞেস করলো ,
“ভাড়া কত?”

“পাঁচ হাজার। বেশ কমেই পেয়েছি।”

অরুনীমা ধীরে মাথা নাড়লো। তারপর বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পেরে কিছুটা গম্ভীর হয়ে শায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
"কোনোমতে গ্রাজুয়েশন শেষ করে বসে আছি, সব তো জানিস। ইচ্ছে নেই তবুও মনে হচ্ছে একটা চাকরি পেলে তোকে হেল্প করতে পারতাম। বাপের টাকায় খেয়েছি এতদিন, লাইফ ইজি ছিলো। বাট নাও আ'ই ফিল লাইক, আই শ্যু'ড ডু সামথিং ঠু! তোর একা চাপ হয়ে যাচ্ছে সব!"

শায়ান অরুনীমার গাল টিপে দিয়ে নরম গলায় বলল, “এত ভাবিস না। তোকে ক্যারি করার সামর্থ্য এই শায়ান তালুকদারের আছে। তাছাড়া এমবিএ কর, শুধু শুধু বসে থেকে লাভ কি? ততদিনে চাকরি পেলে তো হলোই।"

অরুনীমা সারাজীবন পড়াশোনা থেকে দশ হাত দূরে থাকে। এতটা করেছে নিজের বাবার জোরে। আর আজ  শায়ান কিনা পড়াশোনার কথাই বলছে! তাহলে বিয়ে করে লাভ কি হলো? তাই আবার পড়াশোনার কথা শুনে আতঙ্কিত হয়ে উঠে অরুনীমা বলল,
“না না! পড়াশোনা আর না! নো ওয়ে! এই পড়ালেখায় চাকরি পেলে বলিস, করবো। কিন্তু আবার পড়ালেখা, নোপ!"

এমন কথায় শায়ান হো হো করে হেসে উঠলো। ঠোঁট কামড়ে রসিকতা করে বলল,
“তাহলে আমার হাউজ ওয়াইফ হয়ে যা!”

অরুনীমাও হেসে ফেললো। মাথা নাড়িয়ে আলতো হেসে বলল, 
“সেটাও পারবো না। রান্নাটান্না, ঘরের কাজ কিচ্ছু পারি না। কারণ আমি একটা অকর্মা! বাবা ঠিকই বলতো, আমি কোনো কাজের না। ইউজলেস একটা! তাই বিয়ে দিয়ে ঝামেলা নামিয়ে দিয়েছে।”

শায়ান এবার আর হাসলো না। কারণ, অরুনীমা মোটেও মজা করে নি। বরং, মজার ছলে নিজের ভেতরের অভিমান প্রকাশ করেছে। তা বুঝতে অপারগ নয় শায়ান। শায়ান অরুনীমার হাতটা আলতো করে নিজের হাতে নিয়ে ধমকে বলল,
“ফালতু কথা বলিস না, অরু। বাবারা একটু বকাঝকা করেই। ওসব মনে রাখতে নেই। বরং এটা ভাব, বাবার বকা শোনার জন্যও কপাল লাগে। যেটা তোর আছে।”

অরুনীমা চুপ করে তাকিয়ে রইলো শায়ানের দিকে। ওর কথাটা গভীর। এই যেমন, বাপের বকা শোনার কপাল শায়ানের নেই। ছেলেটার যে কেউ থেকেও নেই। ওর বাবা-মা দুজনই আলাদা হয়ে গিয়ে নিজেদের মতো আছে বহুবছর। নিজেদের জীবনে ব্যস্ত তারা সন্তান-সন্ততি নিয়ে। আর শায়ান একাকিত্মকে সঙ্গী করে থেকেছে এতকাল। আর হাইস্কুল জীবনে পেয়েছিলো অরুনীমার মতো বন্ধুকে। এরা দুজন আলাদা হয় নি কখনো, ছোট থেকে এখন পর্যন্ত একসাথে আছে। আর স্টি'ল স্বামী-স্ত্রী হয়ে যাওয়ায় আলাদা হওয়ার প্রশ্নই নেই। দিনশেষে ভালো কিছু বলতে শায়ান এটাই বলে। শায়ান তার অরুকে দিয়েই একজীবন খুশি খুশি কাটিয়ে দিতে পারবে। জীবনের প্রতি আর কোনো অভিযোগ রাখবে না সে।

বিদ্যমান ঘরের নীরবতায় হালকা বাতাস আসছে জানালার পর্দা নাড়িয়ে। বিকেলের লালচে-হলুদ আলো এসে পড়েছে ঘরটায়। বারান্দায় পড়ে থাকা কিছু শিউলি ফুলের গন্ধে এক অদ্ভুত মায়া ছড়িয়ে যাচ্ছে। কিছু অপূর্ণতার মাঝেও ছোট্ট এক সংসার গড়ে উঠার মৃদু প্রতিশ্রুতি দুজনের। একটা সুন্দর পূর্নতার খোঁজ দুটো মনই যে চায়। চড়ুই পাখিদের আপাতত সংসার গোছানোর চিন্তা চলছে।

--------------------------------------

রাতটা অদ্ভুত নীরবতায় মোড়া। রান্নাঘরের গরম ভাতের গন্ধ এখনও বাতাসে ভাসছে। শায়ান নিজের হাতে রান্না করেছে আজ সহজ, আন্তরিক আয়োজনে। দুজনে পাশাপাশি বসে রাত আটটার মধ্যেই খাওয়া সেরে নেয়। তারপর গল্প, ছোট ছোট কথা, টুকরো হাসিতে সময় যায়। কিন্তু তখন রাত খুব বেশি হয় নি। সময় যেন এগোতে চাইছিলো না, আটকে ছিলো কোথাও। শায়ান অরুনীমাকে লক্ষ্য করে হালকা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“বোর লাগছে?”

অরুনীমা দ্রুত মাথা নাড়লো। আসলেই লাগছে কিছুটা। তার চোখে একটু অস্থিরতা। শায়ান উঠে দাঁড়িয়ে ড্রয়ার থেকে মানিব্যাগ পকেটে ভরে বলল,
“চল, বাইরে থেকে একটু হেঁটে আসি তাহলে।”

বাইরে যাওয়ার কথাটা শুনেই অরুনীমার মুখে আলাদাই ঝিলিক ফুটে উঠলো। সে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে পরনের লেডিস শার্টের উপর গলায় স্কার্ফটা জড়িয়ে নেয়। তার লম্বা খোলা চুলগুলো পনিটেল করে বেঁধে নেয়। তারপর নিঃশব্দে শায়ানের পিছু নিলো অদ্ভুত নিশ্চিন্ত ভরসা নিয়ে।

শায়ান অরুনীমা পাশাপাশি হাঁটছে। দু'একটা রিকশা, সিএনজি যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে মাঝে মাঝে। তাছাড়া রাস্তাটা প্রায় ফাঁকা। তবে দূরে কয়েকজন ছেলেপুলে আড্ডা দিচ্ছিলো। হঠাৎই শায়ান অরুনীমাকে আলতো টেনে নিজের পাশ বদলে নিলো। আর বেশ সচেতন এক তাড়নায় ওর হাতটা ধরে ফেললো নিজের মুঠোয়। অরুনীমা প্রথমে কিছু বুঝতে পারেনি। সামনেও খেয়াল করে নি। কিন্তু শায়ানের হাতের উষ্ণ স্পর্শটা টের পেতেই সে ঘুরে তাকালো। চোখে বিস্ময় আর অচেনা প্রশ্নসুচক দৃষ্টি। শায়ান তা লক্ষ্য করে একটু জোর গলায় বলল,
“এভাবে তাকানোর কিছু নেই। আমি পরপুরুষ নই। আর… আই হ্যাভ দ্য রাই'ট।”

রাইট শব্দটাতে শায়ানের জোরই ছিলো আলাদা। তা বুঝতে অসুবিধা হয় নি অরুনীমার। এদিকে শায়ানের কথাগুলোতে ছিলো নিজের স্ত্রীর প্রতি মিশ্র অনুভূতি। দাবি, অধিকার আর লুকানো স্নেহের অনুভূতি। 
অরুনীমা নিজেও হাত ছাড়ালো না। শুধু ধীরস্বরে বলল,
“আমি এসবের সঙ্গে খুব একটা কম্ফোর্টেবল নই, তুই জানিস। এসবকিছুই নতুন আমার কাছে… এই অনুভূতিগুলোও।”

শায়ান অরুনীমার অস্বস্তির কথা শুনে হাতটা ছাড়িয়ে নিতে যাচ্ছিলো। কিন্তু তার আগেই অরুনীমা নিজেই পুরুষালী হাতটা আরও শক্ত করে ধরে রাখলো। না নিজে ছাড়লো, আর না শায়ানকে ছাড়াতে দিলো। অরুনীমার কণ্ঠে এবার একরকম দৃঢ়তা, 
“ছাড়িস না। তুই আমাকে পরিচয় করাবি সবকিছুর সঙ্গে… কম্ফোর্টও তুই'ই করাবি।”

শায়ান আলতো হেসে অরুনীমার হাত ধরেই সামনে চোখ রেখে হাঁটতে হাঁটতে মৃদু গলায় বলল,

"তোর অনুভুতিগুলো নতুন, কিন্তু আমার নয়। অনেক অনেক পুরোনো আমার অনুভুতি। কালও ভেবেছি জানাবো না তোকে। কিন্তু শান্তি পাচ্ছি না কেন জানি। চল আজ তোকে বলেই দেই, আই ফার্স্ট ফল ইন লা'ভ উইথ ইয়্যু, হোয়েন আই ওয়াজ ইন ক্লাস নাই'ন। দ্যাটস হোয়েন আই রিয়ালাইজড আই হ্যাড ফিলিংস ফ'র ইয়্যু। এন্ড আই স্টিল লা'ভ ইয়্যু।”

এক মুহূর্তের জন্য সময় থমকে গেলো। অরুনীমা স্তব্ধ হলো সব শুনে। বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইলো শায়ানের দিকে। কি অকপটে স্বীকারক্তি দিয়ে দিলো শায়ান! অরুনীমা ভাবতেও পারেনি এমন কিছু। শায়ানকে সে বন্ধু ছাড়া অন্য কিছু ভাবে নি কখনো। ভাবতে পারেই নি। 

এদিকে সব বলতে পেরে, অরুনীমাকে অবাক করতে পেরে শায়ানের ঠোঁটে ধীরে ধীরে একটুকরো গভীর হাসি ফুটে উঠলো। এদিকে শায়ানের ফিলিংস জেনে অস্বস্তি হওয়া শুরু করেছে অরুনীমার। আবার সেই ফোবিয়া এসেছে জাপটে ধরেছে ওকে। অরুনীমা কি ভেবে যেন হাত ছাড়াতে উদ্ধত হয়। মোচরাতে থাকে খানিকটা। তা বুঝে শায়ান এবার ধমকে বলল,

"এসব শুনে হাত ছাড়াতে গেলে মা'র খাবি আমার হাতে! আমি কিছু নিয়ে জোর করছি না তোকে। আর না আমি বিয়ের পর চেঞ্জ হয়েছি যাতে তোর অস্বস্তি হয়। আমরা বন্ধুই আছি, আজ শুধুমাত্র অনুভূতিটুকুর স্বীকারক্তি দিয়েছি। তাছাড়া, আই গেভ ই'য়্যু টাই'ম ফর এভরিথিং। আমার একজীবনের পুরো সময় তোকে দিয়েছি। এনা'ফ না?"

অরুনীমা কিছু বলল না। মাথা নামিয়ে নিলো। ওর যেন কেমন লাগছে সব শুনে। শায়ানের কথায় অস্বস্তি দূর হলেও পুরোপুরি সহজ হতে পারছে না সে। শায়ান এবার আরও শক্ত করে ধরে রাখলো মেয়েলি নরম, উষ্ণ হাতটা। হাঁটার মাঝে অরুনীমার শীর্ন হাতটা উঁচু করে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ালো তালুতে। অরুনীমার বিমুঢ় হয়ে তাকালো, কিন্তু বাঁধা দেবার সাহস বা অবকাশই কোনোটাই রইলো না। এই স্পর্শ থেকে অজান্তেই শুরু হলো তাদের নতুন কোনো গল্পের প্রথম সুচনা। হয়তোবা নতুন অনুভুতির সুচনা। 

চলমান.......

[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। ? ?]
 



RE: গল্প :অরুনরঙা প্রনয় Writer :Priynshi Chowdhury - X Man - 08-29-2026

পর্ব:০৩


পরের সপ্তাহে শুক্রবারে ঠিক করা ফ্ল্যাটটা'য় উঠলো শায়ান আর অরুনীমা। শায়ানের সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় এইদিনই তারা পরিকল্পনা করেছিলো ফ্ল্যাটে উঠবে। অন্যথায়, শায়ানের সময় হবে না। তাই  পরিকল্পনামাফিক সেদিনই নতুন ফ্ল্যাটে আসে তারা। 

জানালার কাঁচে বিকেলের আলো এসে পড়ে ঝিকমিক করছে। একে একে সকাল থেকে সবগুলো ফার্নিচার এসেছে ভ্যানে করে। কার্টুনের ভেতর থেকে বের হচ্ছে তাদের নতুন জীবনের ছোট ছোট সাজানো মুহূর্তগুলো। সপ্তাহ ধরে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্রের সাথে বিভিন্ন শো-পিছ, ছবি, ফেয়ারি লাইট কিনেছিলো অরুনীমা পছন্দ করে। শায়ানও আপত্তি করেনি কোনো কিছুতে। অরুনীমা ঘর সাজাতে চাইছে, সাজাক। একটু সংসারী হোক মেয়েটা, এই তো চায় শায়ান। তাই খুশি খুশি মেয়েটার সব আবদার মেনেছে সে।

ঘর সাজাতে সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে অরুনীমাই। ভারী কাজগুলো অবশ্য শায়ান করেছে। ঘর সাজানোর সেই মুহূর্তগুলোর মাঝেই হারিয়ে গিয়েছিলো অরুনীমা। সে কখনো রান্নাঘরে, কখনো ড্রয়িংরুমে, আবার কখনো দৌড়ে চলে যাচ্ছে বারান্দায়। মোটকথা, বাড়িটা অরুনীমার মনমতো হয়েছে একেবারে। একটা ছোট্ট সুখপাখি যেন নতুন উৎস পেয়েছে। আর এই উৎস নব্য অনুভুতির সুচনার। 

অরুনীমার সবচেয়ে বেশি টান বাড়ির বারান্দাটার প্রতি। শহরের ওপরে ঝুলে থাকা ছোট্ট এক টুকরো আকাশ দেখা যায়। যেখানে দাঁড়িয়ে নিজের মতো করে নিঃশ্বাস নেওয়া যায়। প্রশান্তি অনুভুত হয়। অরুনীমা চোখ দুটো বন্ধ করে বারান্দায় গ্রিল ধরেই দাঁড়িয়ে ছিলো। দমকা বাতাসে শরীরটা জুড়িয়ে যাচ্ছিলো তার। শায়ান ফার্নিচারগুলো মোটামুটি গুছিয়ে রেখে চুপচাপ এসে দাঁড়ালো তার পেছনে। অরুনীমার চুলে হালকা বাতাস লেগে উড়ছে পেছন দিকে। শায়ান একবার তাকালো অরুনীমার দিকে। তারপর একটু নরম গলায় বলল,
“বলেছিলাম না, বারান্দাটা তোর ভালো লাগবে? কিন্তু আরও অনেক কিছু কেনা হয়নি। এই যেমন সাকুলেন্ট, ল্যান্টার্ন, কুশন, ওয়াল হ্যাংগিং, আরও কত কি বাকি! এখনো কিছুই সাজাতে পারিনি রে।”

অরুনীমা মুখ ঘুরিয়ে তাকালো। তার ঠোঁটের কোণে সেই চেনা দুষ্টু হাসি। শায়ানের বাহুতে আলতো ঘুষি মেরে বলল,
“নো প্রবলেম, ব্রো! আমরা দুজন মিলে আস্তে আস্তে সাজাবো। প্যারা নিস না। তাছাড়া যেগুলো দরকার, সেগুলো আগে কিনেছি। এতটুকু বোঝদার তো আমি হয়েছি, ইয়ার!"

'ব্রো' শব্দটা শায়ানের কানে গিয়ে বাজলো কাঁটার মতো। মুহুর্তেই চোখ-মুখ কুঁচকে ফেললো সে চরম বিরক্তিতে। তাই শায়ান বাজখাই গলায় ধমকে বলল,
“এই শোন! একদম ব্রো ব্রো করবি না! আমাদের বিয়ে হয়ে গেছে। এসব শুনতে ওইয়া'র্ড লাগে! তার চেয়ে বড় কথা আমার রাগ লাগে।”

অরুনীমা কোমরে হাত রেখে একটু ঝুঁকে তাকালো তার দিকে। চোখে মারাত্মক সন্দেহের মিশেল নিয়ে বলল,
"নতুন তো আর ডাকছি না। সারাজীবন এই ডাক শুনেই বড় হলি আমার সাথে! এখন জ্বলছে কেন?"

শায়ান ঠোঁট গোল করে শ্বাস ফেলে। অরুনীমা সরু চোখে তাকিয়ে আবার বলল,
“এই ওয়েট ওয়েট! স্বৈরাচারী স্বামী হওয়ার প্ল্যান করছিস নাকি? কেমন যেন স্মেল পাচ্ছি…”

“বা’ল!”

একটা বিরক্তির শব্দ ছুঁড়ে দিয়ে শায়ান হনহন পায়ে বারান্দা ছেড়ে চলে গেলো ঘরের ভেতরে। তার পায়ের শব্দটা ভারী, কিন্তু তাতে লুকানো অভিমানটা আরও ভারী। অরুনীমা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো অপলকভাবে। তারপর হেসে ফেললো। একটা স্বচ্ছ, নির্ভার সে হাসি। শায়ানকে রাগাতে পারলে তার অন্যরকম পৌশাচিক আনন্দ আসে। ছোটবেলা থেকেই। তাই এই কাজ অরুনীমার প্রিয়। 

ঘরে ঢুকেই শায়ান মেঝেতে শুয়ে পড়েছে দুম করে। কারণ বেড এখনো ঠিকঠিক হয়নি, তোষক বিছানো হয় নি। যদিও সকাল থেকে দুটোতে মিলে একসাথে খাটছে। তবে কাজও শেষ হয়নি সব। একটু স্থিরতা পেতেই শায়ান মেঝেতে আশ্রয় নিয়েছে। বাম হাতটা মাথার নিচে রেখে শায়ান সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখে অদ্ভুত এক শূন্যতা।

অরুনীমা ঘরে এসে চুপচাপ তার পাশে শুয়ে পড়লো জায়গা করে। দুজনের মাঝে খানিকক্ষণ কোনো কথা নেই, কোনো শব্দ নেই। শুধু দুজনের নিঃশ্বাসের নরম ওঠানামার ভার রয়েছে। অরুনীমা ধীরে ধীরে শায়ানের ডান হাতটা টেনে এনে নিজের মাথার নিচে রাখলো, বালিশের প্রক্সি হিসেবে। শায়ান তাতেও কিছু বলল না। সে নির্লিপ্ত রয়েছে বরাবরের মতো। অরুনীমা সিলিংয়ের দিকে তাকিয়েই নরম গলায় বলল,
“এত রাগিস কেন? আমি তো মজা করি তোর সাথে। বুঝিস না?”

শায়ান চুপ। অরুনীমার কণ্ঠে এবার একটু আদুরে জেদ আসে। ঠোঁট উল্টে সে বলল,
“কিরে, কথা বলিস না কেন?”

শায়ান ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে পাশ ফিরে তাকালো তার দিকে। শায়ানের চোখ দুটো স্থির, গভীর। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে জিজ্ঞেস করলো, 
“এত জ্বালাস কেন আমাকে, অরু?”

অরুনীমা আরেককটু কাছে আসে শায়ানের। এক হাতে শায়ানের কোমর জড়িয়ে ধরে সে। চোখভরা দুষ্টুমি নিয়ে ঠোঁট টিপে হেসে বলে,
“ভালো লাগে… ”

কিছুসময় বাদে শায়ান ধীরে ধীরে উঠে বসলো। তার নড়াচড়ায় অরুনীমাও সজাগ হয়ে উঠে বসে। শায়ান উঠে দাঁড়িয়ে টি-শার্টটা একটু টেনেটুনে ঠিক করলো। তারপর স্বাভাবিক গলায় বলল,
“আমি বেডটা গুছিয়ে নিই আগে। তুই গিয়ে রান্না বসা।”

অরুনীমা থমকে গেলো। তার চোখে স্পষ্ট বিস্ময়,
“আমি?”

শায়ান হালকা হেসে বলল,
“হ্যাঁ, তুই। সিম্পল কিছু একটা রান্না কর। ভাত-ডাল তো পারবি এটলিস্ট!”

অরুনীমা একটু সংকোচে নিচের ঠোঁট কামড়ে ভাবতে লাগলো। সে আর রান্না! দুটো তো বিপরীত শব্দ! তাছাড়া ওভাবে কখনো ট্রাইও করা হয়নি। তবুও নিজের অদক্ষতাকে লুকাতে চাওয়ার প্রয়াস করতে নরম গলায় বলল,
“ইউটিউব দেখে করে দিচ্ছি… সমস্যা নেই। আমি যাই তাহলে।”

এই বলে অরুনীমা চলে যায়। তার চলে যাওয়ার পানে তাকিয়ে আছে শায়ান। বিস্মিত হয়ে রইলো সে। প্রায় হতবিহ্বল হয়েছে বলা চলে। অবশ্য হওয়ারই কথা। ভাত-ডালও নাকি ইউটিউব দেখে করবে! কি আজব কান্ড! এসব ভাবতে ভাবতেই একটু অদ্ভুতভাবে মাথা নেড়ে নিজেকে সামলে নিলো শায়ান। এই অদ্ভুত মিষ্টি বাস্তবতাকে মেনে নিতে শিখছে সে ধীরে ধীরে।

 বেডের তোষক ঠিক করে, চাদর টেনে বিছানাটা পরিপাটি করতে করতে শায়ানের ঠোঁটের কোণে একটা হাসি লেগেই রইলো অরুনীমার কথা ভেবে। এই অগোছালো মেয়েটাই বোধহয় তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর বিশৃঙ্খলা। যা সে খুশি খুশি মানতে প্রস্তুত। এসব মানতে একটুও দ্বিধা নেই শায়ানের। এটা ঠিক মেয়েটা হুটহাট শায়ানকে অবাক করে দেয় তার কর্মকান্ডে। কিন্তু শায়ান জানে, একটা গোছালো, শৃঙ্খল শায়ানের জীবনে একটা অগোছালো, বিশৃঙ্খল অরুনীমার খুব দরকার ছিলো। ভাবনার মাঝে রান্নাঘর থেকে অরুনীমার ডাক ভেসে এলো,
“শায়ান! ভাজি না অমলেট খাবি?”

শায়ান হাতের কাজ বহাল রেখে বালিশে কভার লাগাতে লাগাতে হালকা গলায় উত্তর দিলো,
“ভাজি কর। ডালের সাথে খেতে ভালো লাগবে।”

রান্নাঘরে তখন এক নতুন যুদ্ধ চলছে। ইউটিউবের ভিডিও আর অরুনীমার মনোযোগী আন্তরিক চেষ্টার এক অদ্ভুত মিশেল। গ্যাসের আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে মেয়েটা নিজের অজান্তেই একটা নতুন জীবনের প্রথম পাঠ নিচ্ছে। যথাসম্ভব রান্না শেষ করে কিছুক্ষণ পর, ছোট্ট টেবিলের ওপর একে একে খাবার সাজিয়ে রাখতে লাগলো অরুনীমা। তার স্বভাবসুলভ অগোছালো ভঙ্গিতেই। এরই মধ্যে একবার পানির গ্লাস ফেলে দিয়েছে, আরেকবার ছোট বাটি ফেলে দিয়েছে। এসব দেখতে দেখতে অভ্যস্থ শায়ানের কোনো অসুবিধা হয় নি। তাই সে মুখ বুজে চুপ করে ছিলো আর হতাশ হয়ে দেখছিলো অরুনীমার আজব রকম কাজকারবার।  

অবশ্য আজ অরুনীমা গর্বের সাথে ফিরেছে রান্নাঘর থেকে। যেন কিছু একটা উদ্ধার করে এসেছে সে। রান্না করা তার কাছে অসম্ভব একটি কাজ ছিলো। বিধায় প্রথমবার আশানুরূপ রান্না না হলেও খুব একটা খারাপ হয় নি অরুনীমা নিশ্চিত।  নিজের মাথার ঘাম ফেলার ভঙ্গিতে উচ্ছসিত স্বরে অরুনীমা বলল,
“এই শায়ান! দেখ পেরেছি আমি। কুকিং অতটাও কঠিন না! ট্রাই করতে থাকলে আরও ভালো করে পারবো। তাই না বল?”

শায়ান মৃদু হেসে এগিয়ে এলো। তার চোখে একরাশ মুগ্ধতা স্ত্রীর প্রতি। খাবারের জন্য নয়, মেয়েটার সহজ সরল চেষ্টার জন্য। শায়ান স্নিগ্ধ হেসেই অরুনীমার কপালে শব্দ করে ঠোঁট ছোঁয়ালো বড্ড আবেগ নিয়ে।
এ-ই কদিনে এসব ছোটখাটো স্পর্শ নির্দিধায় দিয়ে ফেলে শায়ান। কারণ, ওর মধ্যে জড়তা কখনোই ছিলো না। আর এখন তো স্পর্শের মালিকানাও আছে তার। অরুনীমা যে ওর হয়ে গেছে। 

তবে অরুনীমা এমন স্পর্শে একটু গুটিয়ে গেলো বটে। চোখ পিটপিট করে এদিক ওদিক তাকালো অস্বস্তিতে। দু-কাঁধ সংকুচিত করে একটু সরে দাঁড়ালো। নিজের ভেতরের অদ্ভুত উত্তাল অনুভুতি বুঝতেই নিজেকে দ্রুত সামলে নিলো সে। কারণ, এইসব স্পর্শ এখনো তার অভ্যাসে পরিণত হয়নি।  শায়ানকে তো মেনেছে কিন্তু এই অনুভুতির মর্ম ঠাওর করতে পারেনি। তাই নিজেকে সামলে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলো অরুনীমা। শায়ান সেসব তার অগোচরেই লক্ষ্য করে অমলিন হাসে। অরুনীমা শায়ানের এসব কান্ডে খানিকটা তুতলে বলল,
"খে..খেতে বস! খাবার ঠান্ডা হয়ে যাবে নাহলে।"

শায়ান অরুনীমার অস্বস্তি টের পেলো। এই সামান্য ছোঁয়াতেই কেন যে এমন গুটিয়ে যায় মেয়েটা বুঝ আসে না তার। কিন্তু শায়ানের'ই বা কি করার? তারও তো ইচ্ছে হয় ভালোবাসার মানুষটাকে ছুঁতে, ভালোবাসতে। এত বিধিনিষেধ কেন মানবে সে। তবুও অরুনীমার সিদ্ধান্তকে চুড়ান্ত রেখে শায়ান এগোচ্ছে না। এগোবেও না। শায়ানও মনে মনে জেদ চাপিয়ে রেখেছে। যে, যেদিন অরুনীমা তাকে নিজের মুখে ভালোবাসার কথা স্বীকার করবে, সেদিন তাদের মধ্যে কোনো দুরত্ব থাকবে না। এরজন্য যত অপেক্ষা করতে হোক, শায়ান ধৈর্য্যের সহিত করবে। এবার অরুনীমার অস্বস্তি দূর করে প্রসঙ্গ বদলাতে শায়ান বলল,
"কি করেছি বল তো! ডাইনিং টেবিল কিনেছি কিন্তু কয়েকটা চেয়ার কেনা হয়নি। মনেও তো করালি না আমাকে! তোর তো নিচে বসে খেতে প্রবলেম হবে।"

অরুনীমা নিচে বসে প্লেটে ভাত বাড়তে বাড়তে ধিমি কন্ঠে বলল,
"আমার নিজেরই মনে ছিলো না চেয়ার কেনার কথা। আর আমার চিন্তা করিস না। আমার কোনো প্রবলেম হচ্ছে না।"

শায়ানও নিচে বসলো ছোট টেবিলটার কাছে। দুজন মুখোমুখি বসেছে টেবিলের বিপরীত প্রান্তে। অরুনীমা চুপচাপ ভাত বাড়ছে দেখে শায়ান গম্ভীর গলায় বলল,
"বিয়ে হওয়ার পর থেকে শুধু এডজাস্ট'ই করে যাচ্ছিস। বিরক্ত লাগছে না এসব?"

অরুনীমা এবার চোখ তুলে তাকালো শায়ানের দিকে। হাত থেমে গেছে চলমান খাবার পরিবেশনের কাজে। সব অস্বস্তি ঝেড়ে ফেলে দৃঢ় গলায় সে উত্তর দিলো,
"জানিস, তোকে নিয়ে না এ-ই কদিন আমি অনেক ভেবেছি! বুঝে শুনেই মেনেছি তোকে সারাজীবন একসাথে কাটাতে, হাসব্যান্ড ওয়াইফ হয়ে। সুতরাং, এডজাস্ট শব্দটা আমার সাথে যায় না। কারণ, আমরা কেউ অপরিচিত নই। তুই আমার অগোছা'লো, ইম্যাচিউ'র, ঝামে'লা আমিটাকে'ই গ্রহন করেছিস। আর আমি আমার গু'ড বয়, পারফেক্ট ম্যা'ন শায়ানকে। তাই এডজাস্টের শব্দটা ওঠাস না। আর ওঠালেও এডজাস্ট তুই করছিস আমার সাথে, আমি না। বিকজ, তুই ভালো কোনো মেয়ে ডিসার্ভ করিস। আমার মতো...."

শায়ানের রাগ হলো অরুনীমার কথায়। ও যা ইচ্ছে তা বলে যাচ্ছে কখন থেকে। শায়ানের অনুভূতি বুঝতে এখনো অপারগ অরুনীমা! তাই অরুনীমাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে উচ্চস্বরে গমগমে গলায় শায়ান বলল,
"চুপ!! এত কথা বলে দিলি না বুঝেই! শোন তাহলে, আমি তোকেই ডিজার্ব করি, অরু! আমার তোকেই লাগবে! কজ, আই ওয়ান্ট ইয়্যু, আই লাভ ইয়্যু!! "

চলমান.......

[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। ? ?]
 



RE: গল্প :অরুনরঙা প্রনয় Writer :Priynshi Chowdhury - X Man - 08-29-2026

পর্ব:০৪


সকাল গড়িয়ে দুপুরের দিকে এগোচ্ছে। প্রতিদিনের ন্যায় সময়মতো অফিসে বেরিয়ে গেছে শায়ান। বাড়িটা আজ বরাবরের মতো নিস্তব্ধ। অরুনীমা সকাল সকাল গোসল সেরে বারান্দার কোণে একটা চেয়ার টেনে বসেছে। বেশ ঠান্ডা আবহাওয়া আজ। একটু রোদের দেখা মিলতেই অরুনীমা বারান্দায় চলে গিয়েছিলো। অল্প রোদ এসে পড়েছে তার গালে, চুলে। মুলত, ভেজাগুলো চুল শুকোচ্ছে সে। তার ভঙিমায় বেশ সতেজতা মিশে আছে আজ। আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে সে। নীল বিস্তারে ভাসছে তার অগোছালো ভাবনাগুলো। ভাবনাগুলো… কত রকমের! কিছু অযাচিত, কিছু গভীর, কিছু আবার অদ্ভুত মিষ্টি। তবে অরুনীমার সব ভাবনার মূল বিষয়বস্তু এখন শায়ান। একটু একটু ভালো লাগতে শুরু করেছে তার, মনের অজান্তেই। 

গত রাতের পর অরুনীমা একদম নিশ্চিতভাবে এটা বুঝেছে যে শায়ান তাকে ভালোবাসে। সেরকম ভালোবাসাই বাসে, যেমনটা বাসলে ভালোবাসার মানুষটিকে আগলে রাখা যায়, আঁকড়ে ধরে রাখা যায় সারাজীবন। রাগের মাথায়, ঠান্ডা মাথায় সব ভাবেই শায়ানের স্বীকারক্তি পেয়েছে। এবং তা শুধুই অরুনীমার প্রতি ভালোবাসা। 

“শুধুই ভালোবাসা?”

নিজেই মনে মনে প্রশ্ন করে সে। তারপর হালকা হেসে ফেলে বিরবির করে বলে, 
"উ'হু… গভী'র ভালোবাসা।”

এমন ভাবনার মাঝেই দরজায় টোকার আওয়াজ হয়। অরুনীমা তা শুনতে পেয়ে ভ্রু কুচকায়। এই সময় শায়ান তো ফিরবে না… তাহলে কে? ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যায় সে। দরজা খুলতেই এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায় অরুনীমা।
সামনে তাকিয়ে দেখে তার বাবা অরুনাভ শিকদার। পরনে স্বাভাবিক কোটপ্যান্ট। নিজের বাবাকে প্রায় মাসখানেক পর দেখছে অরুনীমা। বিয়ের পর একটা ফোনকল অব্দি পায় নি সে। অথচ আজ হঠাৎ… সামনে দাঁড়িয়ে।
অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে অরুনীমা। পরক্ষণেই অরুনাভ এগিয়ে এসে মেয়েকে আলতো করে জড়িয়ে ধরেন। আর বললেন,
“আম্মু, কেমন আছো? কতদিন দেখি না তোমায়…”

কথাগুলো শুনেই বুকের ভেতর জমে থাকা অভিমানগুলো এক নিমেষে নরম হয়ে উবে যায়। অরুনীমা মৃদু হেসে বলে,
“ভালো আছি, বাবা… ভেতরে এসো।”

অরুনাভ শিকদার ভেতরে আসলেন। এসেই ঘরের আশেপাশে চোখ বুলালেন তীক্ষ চোখে। ছোট্ট, গুছানো একটা সংসার। ঘরটা তার কাছে ছোটখাটোই মনে হলো। স্পেসটা আরেকটু দরকার ছিলো। তবে মুখে তিনি তা বললেন না। গিয়ে সোফায় বসলেন। অরুনীমাকেও টেনে পাশে বসালেন। তারপর বললেন,
"তুমি আমার ওপর রাগ করে আছো তাইনা? কারণ জোর করে তোমায় শায়ানের সাথে বিয়ে দিয়েছি। কিন্তু বিশ্বাস করো, শায়ানের থেকে উপযুক্ত পাত্র তোমার জন্য কেউ হতোই না।"

অরুনীমা মাথা নাড়ে ধীরে। তারপর বলল,
“না বাবা… রাগ করে নেই। আর করবোই বা কেন? এইযে তুমি তো বললে, শায়ান আমার জন্য উপযুক্ত। সত্যিই তো! তখন রাগ হলেও এখন বুঝতে পারছি… তুমি ভুল বলোনি।”

অরুনাভ মৃদু মাথা দোলালেন। তারপর অরুনীমা অভিযোগ করে বলল,
"আর উপযুক্ত থাকলেও পেটে পেটে শয়তানী আছে। জানো বাবা, শায়ান আমার ওপর প্রতিশোধ নিয়েছে ওকে রিজেক্ট করার। ও আমাকে দিয়ে একগাদা কাপড় ধুয়িয়েছিলো বিয়ের প্রথম দিন। ভাবতে পারছো?"

অরুনাভ ভরকালেন সামান্য। বিস্মিত হয়ে বললেন,
"কিহ? এখন বলো না এই কারণে তুমি মেনে নিয়েছো শায়ানকে?"

অরুনীমা হেসে বলে, 
"ধুর নাহ! আমার ইনোসেন্ট ফেস দেখে গলিয়ে ফেলেছি পরদিনই, হাহাহা! অবশ্য শায়ান নিজের কাজ নিজেই করে সব। ওই একদিনই শিক্ষা দিয়েছিলো আমাকে।"

অরুনাভ নিজেও মৃদু হাসলেন এদের খুনসুটির গল্প শুনে। তারপর চারপাশে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন,
“এই বাড়িতে থাকতে তোমার অসুবিধা হচ্ছে না?”

অরুনীমা উঠে দাঁড়িয়ে হেসে বলে,
“একদমই না। বরং খুব পছন্দ হয়েছে। এবার তুমি বলো, কফি না চা?"

অরুনাভ মৃদু হেসে বললেন,
"অবশ্যই চা।"

অরুনীমা সাথে সাথে কিচেনে চলে গিয়ে চা করে আনলো ঝটপট। তারপর বাবার সাথে অনেকদিন পর দীর্ঘক্ষন আলাপচারিতা হলো। অরুনীমাও সব অভিমান ভুলে বলতে লাগে এই বাড়িটা সে কিভাবে কিভাবে সাজিয়েছে, শায়ান কতটা হেল্প করেছে।সব শুনে অরুনাভ খানিকটা অবাক হলেন বটে। মেয়েটা কি এক ঝলকে বোঝদার হয়ে গেলো! তিনি বলেই ফেললেন,
"এত কিছু করেছো তুমি? রান্নাও করতে পারো?"

অরুনীমা হেসে ফেলে,
“অত ভালো না… তবে খাওয়ার মতো। কাল রাতেও আমিই রান্না করেছি। শায়ান তো খুব প্রশংসা করলো!”

অরুনাভের কপাল কুঁচকে যায় হালকা। সন্দেহজনক গলায় জিজ্ঞেস করে, 
“শায়ান তোমাকে দিয়ে রেগুলার রান্না করায়?”

অরুনীমা শান্ত গলায় বলল,
"না। রান্নাটা আগে ওই করতো। আমি নিজে থেকেই ভেবেছি রান্না করবো, যেহেতু বাসায় বসেই থাকি। ও বাইরে থেকে এসে ক্লান্ত শরীরে আবার কিভাবে রান্না করবে? এটা কি ঠিক? তাও ও নিজেই জোর করে কিচেনে গেলে আমি বারণ করে দিই।"

অরুনাভ আরও অবাক হলেন মেয়ের এরুপ পরিবর্তনে। কিন্তু ভালোও লাগলো দুটোতে মিলেমিশে আছে দেখে। অরুনাভ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন,
"এভাবে বসে না থেকে তোমার আর্ন করা উচিত, আম্মু। এতে দুজনেই নিজেদের সংসারের হাল ধরতে পারবে।"

অরুনীমা মাথা নাড়ে,
"রুটিন মাফিক চাকরি-বাকরি, অন্যের কর্তৃত্ব আমার পছন্দ না, তুমি তো জানোই বাবা। তাই ওসবে যাচ্ছি না। তবে হ্যাঁ, আমি নিজের মতো করে আর্ন করবো ভেবেছি। একটা প্রাইভেট স্কুলে শায়ান কথা বলেছে। সামনের মাস থেকে আমি সেখানে পড়াবো। যা বেতন তাতে ভালোভাবেই চলে যাবে আমার।"

অরুনাভ মাথা নাড়ালেন আলতো করে। এবার বাবা-মেয়ের আলাপ-আলোচনার শেষ প্রান্তে অরুনাভ কোটের ভেতর থেকে মোটা মোটা দুটো টাকার বান্ডিল বের করেন। তারপর তা অরুনীমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেন,
"এগুলো রাখো। প্রয়োজনে ব্যবহার করবে।"

অরুনীমা বিস্মিত হয়ে তাকালো। সাথে সাথে সেই বান্ডিলগুলো ফেরত দিয়ে বলল,
"এসব কি করছো, বাবা? এগুলো নিতে পারবো না আমি!"

“কেন?” 

অরুনীমা মৃদু শ্বাস ফেলে বলল,
"শায়ান এসব জানলে ওর ইগো হার্ট হবে, বাবা। এক কথায় ইনসাল্ট হবে ওর। তাছাড়া, আমাদের এত টাকার দরকার নেই। উই আর ফাইন। হ্যাঁ, এ মাসে ফার্নিচার কিনে বাড়িঘর গোছানোয় একটু টান পড়েছে, বাট উই ওইল ম্যানেজ।"

অরুনাভ উদিগ্ন কন্ঠে বললেন,
"এগুলোকে আমার সাহায্য ভাবছো কেন? ধরে নাও এটা আমার তরফ থেকে উপহার তোমাদের দুজনের জন্য। এখন বাবারা কি ভালোবেসে কিছু দিতেও পারবে না?"

অরুনীমা তার বাবার হাত আগলে ধরে মায়াময় গলায়  বলল,
"তুমি শুধু দোয়া করো আমাদের জন্য। আর কিচ্ছু চাই না।"

অরুনাভ বিমুঢ় হয়ে তাকিয়ে রইলেন মেয়ের দিকে। এসব শুনে আর জোর করলেন না। শায়ান কেমন ছেলে তা ভালো করেই জানে অরুনাভ। কিন্তু মেয়ের সুখের জন্য এতটুকু দিতে চেয়েছিলেন। তবে মেয়েটা এই ক'দিনে এত বোঝদার হয়েছে তা বুঝতে বাকি নেই আর। অবশেষে উঠে দাঁড়িয়ে তিনি মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,
"সব সময় দোয়া করি তোমাদের জন্য। আজ আসি।"

অরুনীমা মাথা নাড়ায়। বিদায় নিয়ে চলে যান অরুনাভ। দরজা বন্ধ করে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে অরুনীমা। তারপর এক দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে কিচেনে ঢোকে। গান চালিয়ে দেয় ফোনে। একটু একটু করে রান্না জিনিসটা আয়ত্বে আসছে অরুনীমার। বুঝতে পারছে সে। আর ভালোবাসা মানে শুধুমাত্র অনুভূতি নয়। ভালোবাসা মানে দুজনের দায়িত্ব। একটু একটু করে অবুঝপনা থেকে শেখা। আর দু’জন মিলে নিজেদের একটা সুখময় পৃথিবী গড়ে তোলা। 

--------------------------

বিকেলের দিকে অফিস থেকে বাড়ি ফেরে শায়ান। বেশ ক্লান্তি নিয়েই শায়ান বাড়ি ফিরেছে। দরজা পেরিয়ে হাত দুটো উপরে তুলে কসরত ভঙ্গিতে নিজেকে একটু হালকা করে নিলো। তারপর বাইরের কাপড় বদলে, তোয়ালে কাঁধে নিয়ে সরাসরি চলে গেলো ওয়াসরুমে। কিছুক্ষণ পর ফিরে এলো ভেজা চুলে, জলবিন্দু গড়িয়ে পড়ছে কপাল বেয়ে। ঘরে ঢুকেই তার চোখ আটকে গেলো অরুনীমার দিকে।
মেয়েটা ব্যস্ত হাতে খাবার গুছিয়ে রাখছে। অদ্ভুত ব্যস্ততা তার চলাফেরায়। চুল মুছতে মুছতে শায়ান এগিয়ে গিয়ে হালকা গলায় বলল,
"বাড়িতে কে এসেছিলো রে?"

অরুনীমা একটু চমকে তাকিয়ে বলল,
"তুই বুঝলি কীভাবে?"

শায়ান ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
"দুটো চায়ের কাপ নিশ্চয়ই তুই একা খাবি না।"

অরুনীমা নরম স্বরে উত্তর দিলো,
"বাবা এসেছিলো।"

"আংকেল এসেছিলো! এত তাড়াতাড়ি যেতে দিলি কেন?"

কিছুটা আক্ষেপ শায়ানের গলায়। আর কিছুক্ষণ থাকলে দেখা করতে পারতো শায়ান। অরুনীমা সংক্ষিপ্ত জবাবে বলে, 
"কাজ ছিলো…"

শায়ান জিজ্ঞেস করে,
"খেয়েছিস তুই?"

খাওয়ার প্লেটটা এগিয়ে দিয়ে অরুনীমা বলল,
"হুম, মাত্রই। তারাতাড়ি খেয়ে ছাদে আয়, আমি গেলাম।"

এই বলে অরুনীমা টি-শার্টের উপর গলায় ওরনা পেচিয়ে চলে যায় ছাদে। শায়ান নিজেও খাওয়া শেষ করে ঘরের দরজা লাগিয়ে চলে আসে। অরুনীমা তখন ছাদের কিনারায় রেলিঙ ধরে দাঁড়িয়ে ছিলো। আজকের আবহাওয়া অনুযায়ী দমকা বাতাস বইছে। পাশে দুটো ফুলের গাছ। মেয়েটা ছাদে দুটো ফুলের গাছ লাগিয়েছে। তবে এখনো ফুল ফোটে নি। শায়ান যখন ছাদে উঠলো, তখন সন্ধ্যার হাওয়া জোরে বইছে। আকাশের রঙ বদলাতে শুরু করেছে। শায়ান অরুনীমার পাশে দাঁড়িয়ে গলা খাকারি দিয়ে চলে,
"আজকে স্যালারি পেয়েছি।"

অরুনীমার চোখ খুশিতে জ্বলে উঠলো,
"বাহ! তাহলে আজ ট্রিট! রাতে রান্না নেই!"

শায়ান মুচকি হেসে মাথা নাড়লো,
"ওসব পরে। আমি কিছু এনেছি তোর জন্য!"

অরুনীমা কৌতুহলী হয়ে বলল,
"তাই? কি এনেছিস দে!"

শায়ান সতর্ক করে বলল,
"দিচ্ছি, তার আগে বল তুই হাসবি না?"

অরুনীমা নিজের মাথা চাপড়ে বলল,
"আমি কেন হাসবো? আরে বাবা... দেখা না!"

শায়ান পেছন থেকে একটা বক্স সামনে আনে। অরুনীমা কৌতূহল নিয়ে খুলতেই থমকে গেলো। ভেতরে রঙিন চুড়ির সারি। তা দেখে খানিকটা থমকে সে বলে,
"এগুলো!"

শায়ানের কণ্ঠে ছিলো একরাশ নির্লিপ্ততা,
"আই নো, তুই চুড়ি-টুরি পরিস না, পছন্দ না তোর এগুলো। কিন্তু তোর হাতে এই সবকটা রঙই মানাবে। ফেরার সময় দেখে পছন্দ হলো, তাই কিনে আনলাম এগুলো।"

কিছুক্ষণ শায়ানের দিকে তাকিয়ে থেকে অরুনীমা বলল,
" বক্সটা ধর, এনেছিস যখন পরে দেখি।"

শায়ান বক্সটা ধরলে অরুনীমা নীল রঙের কিছু চুড়ি বের করে পরতে চেষ্টা করে। কিন্তু হাতে ঢুকছে না।কিছুক্ষণ চেষ্টা করে একটু বিরক্ত হয়ে শায়ানকে বলে,
"ছোট সাইজ মনে হচ্ছে!"

শায়ান বক্সটা নিচে রেখে হালকা গলায় বলে,
"হতে পারে। আমাকে দে, আমি ট্রাই করে দেখি একবার।"

অরুনীমা হাত বাড়ালে শায়ান প্রথমবারে খুব সহজেই চুড়িগুলো পরিয়ে দিলো। তারপর বলল,
"গাধা! ঠিক সাইজ'ই এনেছি। আরেকটু বড় হলে খুলে পড়ে যেতো।"

অরুনীমা ঠোঁট উল্টায়। সে কি করে বুঝবে? অরুনীমা ঠোঁট ফুলিয়ে হাতটা উল্টেপাল্টে দেখলো। নাহ, খারাপ না। সত্যিই সুন্দর লাগছে। সে হঠাৎ জিজ্ঞেস করলো,
"কাল কি খাওয়াবি বল?"

"তোর যা ইচ্ছে।"

তারপর নিঃশব্দে অরুনীমা মাথাটা শায়ানের কাঁধে রাখলো। তারপর আঙুল দিয়ে শায়ানের হাতে পরা ব্রেসলেট ঘোরাতে লাগলো আনমনে। দুজনের চোখজোড়া তখন সামনে নিবিষ্ট। হঠাৎ শায়ান খেয়াল করে বলল,
"এই! তুই আমার টি-শার্ট পরেছিস কেন?আমার ফেবারিট এটা!"

অরুনীমা নির্বিকার,
"আমার ভালো লেগেছে। সমস্যা নেই, শেয়ার করবো।"

"আমরা সিবলিংস না কিন্তু!"

শায়ানের ঠান্ডা গলায় বলে। কিন্তু অরুনীমা একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উত্তর দেয়, 
"কিন্তু কাপল তো!"

শায়ান পাশ ফিরে ছোট ছোট চোখে তাকায়।অরুনীমা সেসবে পাত্তা না দিয়ে বলল,
"জানিস আজ একটা মুভি দেখছি। হেব্বি রোমান্টি'ক মুভি!"

শায়ান ভ্রু কুচকে বলে,
"তুই এনাইম ছেড়ে রোমান্টিক মুভি দেখছিস কবে থেকে?"

অরুনীমা বলল,
"এনাইমেও রোমান্টিক সিন আছে, তুই বুঝবি না। আচ্ছা যেটা বলছিলাম শোন। মুভিটাতে নায়িকা নায়কের গালে কি'স করে। তো সেখানেই ব্যাকগ্রাউন্ড মিউসিক বাজে, তারপর গান শুরু হয়। কিন্তু আমার প্রশ্ন একটা সাধারণ চুমুতে নায়কের কি এমন হয়ে গেলো যে নায়িকার সাথে তার নাচতে হবে! এগুলো মানুষ কিভাবে দেখে!"

শায়ান বেশ জোরেই হেসে ফেললো মেয়েটার অদ্ভুতরকম উদ্ভট কথাবার্তা শুনে। অরুনীমা এবার কাঁধ থেকে মাথা তুলে মুখ কুচকে বলল,
"হাসিস না তো! পারলে জবাব দে, ইয়ার! লজিক পেলাম না আমি!"

শায়ান অরুনীমার মাথায় টোকা দিয়ে বলল,
"এসব দেখিস না তুই। পেকে যাবি।"

অরুনীমা হাহুতাশ করতে করতে বলল,
"পাকা উচিত আমার। নাও, আ'ম টুয়েন্টি ফাইভ। আর কবে পাকবো, হু'হ!"

অরুনীমার এবার কি ভেবে যেন বলল,
"শোন, একটু নিচু হ তো!"

"কেন?"

"চু'মু দেবো। এক্সপেরিমেন্ট করবো তোর ওপর।"

শায়ান স্তব্ধ। মেয়েটা কি আবোল-তাবোল বলছে! মাথাটা বিগড়েছে নিশ্চিত। তাই ধমকে বলল, 
"পাগল হয়েছিস? কি বলছিস?"

অরুনীমা এবার দুষ্টুমি করে বলল,
"আরে শা/লা নিচু হ! নিজেও তো দিলি কাল। এমনিতে জীবনে সব এক্সপেরিমেন্টের দরকার আছে। আর তাছাড়া তোর সাথে সব লিগ্যাল আমার। নিচু হ এবার কথা না বলে!"

শেষমেশ বাধ্য হয়ে শায়ান নিজের গাল বাড়িয়ে দিলো। অরুনীমা নিজের পায়ে ভর করে সামান্য উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে টু'প করে একখানা চু'মু বসালো শায়ানের খসখসে গালটায়। পরপর দু'বার এমন করলো। শায়ান বিমুঢ় হয়েই রইলো নড়াচড়া বন্ধ করে। এরপর অরুনীমা ভাবুক কন্ঠে বলল,
"তেমন কিছুই তো হলো না। নরমাল'ই লাগলো!"

শায়ান তা শুনে মুচকি হাসে। তারপর মাথাটা ঝুঁকিয়ে নিজেই টু'প করে অরুনীমার গালে ঠোঁট চেপে ধরে বলল,
"আমি ঠিকমতো করলে সেটা নরমাল লাগতো না।"

এইসব শুনে অরুনীমা ত্রস্ত বেগে তাকালো শায়ানের দিকে। কিন্তু শায়ান তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে মিছে হাই তুলছে—যেন কিছুই হয়নি। অরুনীমা বুঝতে পারছে, ছেলেটা দিনদিন লাগাম ছাড়া হচ্ছে, অসভ্য হচ্ছে! তারমধ্যে আজ তো অরুনীমা নিজেই সুযোগ করে দিয়েছে। তাই অরুনীমা রেগেমেগে বেশ জোরেই ঘুষি মারলো শায়ানের বাহুতে। এতে শায়ানের কিছুই হলো না। বরং শায়ান ঠোঁট কাম'ড়ে হেসে হুট করেই লাগামছাড়া হলো সত্যি সত্যি। আচমকা অরুনীমার হাত ধরে টেনে নিজের সাথে চেপে ধরলো। নিজের পুরু ঠোঁট দাবিয়ে আরও তিন-চারটে চু'মু খেলো অরুনীমার নরম গালটায়। এবার অরুনীমা স্তব্ধ, বিস্মিত, বিমুঢ়। নিজেকে ছাড়াতে ভুলে গেলো সে। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো শায়ানের দিকে। অরুনীমা তেঁতে উঠে বলল,
"তুই কেন চু'মু দিলি আমায়?" 

শায়ান মুচকি হেসে বলল, 
“এভরি অ্যাকশন হ্যাজ আ রিঅ্যাকশ'ন, অরুনীমা ডার্লিং। তুই আমাকে আগে চু'মু দিয়েছিস, আমিও ফেরত দিয়ে দিলাম। ইয়্যু নো না, শায়ান তালুকদার ঋন রাখে না।” 

#চলমান.......

(মন্তব্য করেন না কেন? ??)

[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। ? ?]

 



RE: গল্প :অরুনরঙা প্রনয় Writer :Priynshi Chowdhury - X Man - 08-29-2026

পর্ব:০৫


শায়ান আজ ব্যাংক থেকে দুপুর বারোটার মধ্যেই হাফ টাইম কাজ করে বাড়িতে হাজির। সাথে পুরো সাত দিনের ছুটি পেয়েছে বিয়ে উপলক্ষে ম্যানেজারের পক্ষ থেকে উপহারস্বরুপ! শায়ান তো খুশিমনে বাড়িতে এসেছে সামান্য কিছু কেনাকাটা করে। ঘরে এসে বিছানায় শপিং ব্যাগগুলো রেখে দেয়। এরপর ধীরে ধীরে হাত চলে যায় শার্টের বোতামে। পরনের শার্ট খুলতে থাকে সে। বোতামগুলো খুলতে খুলতেই তার দৃষ্টি ঘুরে বেড়ায় চারপাশে। অরুনীমাকে খুঁজতে। না পেয়ে অরুনীমাকে ডেকে উঠে একবার,
“অরু?”

সাড়া না পেলে শায়ান এগিয়ে গিয়ে কিচেনে উঁকি দেয়, বারান্দায় তাকায়। কিন্তু নাহ, কোথাও নেই। ভ্রু কুঁচকে যায় তার। মেয়েটা গেলো কোথায় হঠাৎ?
ঠিক তখনই বাথরুমের দরজা খুলে মেয়েলী মৃদু গুনগুন সুর গাইতে গাইতে অরুনীমা বের হয়ে আসে।
অরুনীমা বেরিয়েছে মাত্রই, শরীরে কেবল ভেজা সাদা তোয়ালে জড়ানো। মাথার ভেজা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গলায় আর ঘাড়ে লেপ্টে ছড়িয়ে আছে। তার গায়ের হালকা জলের ফোঁটাগুলো  শ্বেতবর্ণের দেহে চিকচিক করছে।

গলা পেয়ে অরুনীমার দিকে চোখ চলে যায় শায়ানের। মুহূর্তটা থেমে যায়। শায়ান সেদিকে তাকাতেই স্থির হয়ে যায়। শায়ান থমকে গিয়ে দেখতে থাকে মেয়েটাকে। ফর্সা হাঁটু উন্মুক্ত তার। এদিকে অরুনীমাও হতবিহ্বল হয়ে শায়ানকে দেখে। শায়ানের পরনে শুধু জিন্স প্যান্ট, উপরের অংশ উন্মুক্ত। কারণ শায়ান সবেই চেঞ্জ করছিলো।

পরিস্থিতি বুঝতে না বুঝতেই অরুনীমা দৌড়ে গিয়ে বাথরুমের দরজার পাশে ঝোলানো পর্দার আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। শায়ান এখনো ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে। অরুনীমার অস্বস্তিতে গলা কাঁপে সামান্য,
“তুই এখন বাসায় কেন? তোর তো ব্যাংকে থাকার কথা!”

শায়ান একপেশে হালকা হাসি হেসে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে আসতে বলে, 
“আজ হাফ টাইম ছিলো… আর পুরো এক সপ্তাহের ছুটি পেয়েছি।”

শায়ানের কাছে আসা টের পেতেই অরুনীমা তাড়াতাড়ি বলে ওঠে,
“এই এই! এদিকে এগিয়ে আসছিস কেন? দূরে থাক!”

কিন্তু শায়ান থামে না। বরং এক চিলতে দুষ্টু হেসে আরও কাছে এসে দাঁড়ায় অরুনীমার। তারপর পর্দাসহ মেয়েটাকে জাপটে জড়িয়ে ধরে। অরুনীমা ওই শক্ত বাহুবন্ধনীতে কেঁপে ওঠে। সে গুটিয়ে গিয়ে বলে,
“এসবের মানে কি শায়ান! ছাড় তো, ফাজলামি করবি না!”

শায়ান অরুনীমার গলায় লেপ্টে থাকা চুলগুলো সরাতে সরাতে হাস্কি কন্ঠে বলল,
"এসে গেছে!"

অবুঝ স্বরে অরুনীমা সুধায়,
"কে?"

শায়ান হালকা স্বরে বলে,
“মুড এসে গেছে!”

অরুনীমা কাঁপা কণ্ঠে বলে,
“না না… প্লিজ…”

শায়ান মুচকি হাসে।
“একটা চু'মু খেতে এটলিস্ট! এটুকু তো চাইতেই পারি?”

অরুনীমার অসহায় হয়ে কাতর গলায় বলে, 
"উফ'ফ! এখন আবার কিসের চু'মু? কাল থেকে সারাদিন খালি চু'মুই খাচ্ছিস!"

শায়ান হালকা হেসে বলে, 
"এগুলো তো কিছুই নয়। এর থেকেও বড় বড় চু'মু দেবো, ট্রাস্ট মি। ইয়্যু নো হোয়াট? আমি খুব ভালো চু'মু দিতে পারি!"

আর কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করেই শায়ান ধীরে, খুব সংক্ষিপ্তভাবে প্রথমবারের মতো অরুনীমার ঠোঁটে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয়। এবং তা সেকেন্ডেরও কম সময়। আর তাতেই অরুনীমা বাকরুদ্ধ। সে খামচে ধরে শায়ানের কাঁধ। সেই ক্ষণটুকু যেন অরুনীমার ভেতরটা কাঁপিয়ে দেয়। সে নিস্তব্ধ হয়ে রয়। এই অনুভূতিও তার কাছে একেবারেই নতুন। সম্পুর্ন নতুন। 

শায়ান আর কিছু না বলে। একরকম স্বাভাবিকতায় অরুকে সরিয়ে বাথরুমে ঢুকে যায়। এবার গোসল দেবে সে। আর অরুনীমা কিছুক্ষণ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে অবুঝ ভঙ্গিতে। তারপর হঠাৎ নিজের হুঁশ ফিরে পেয়ে দ্রুত ঘরের ভেতর গিয়ে কাঁপা হাতে আলমারি খুলে জামাকাপড় নেয়। তার গাল লাল হয়ে উঠেছে ক্রমশ। অথচ তার রাগ হওয়া উচিত ছিলো! এখন রাগ কেন আসছে না তার? কি অস্বস্তিকর অসহ্য অনুভূতি! 

------------------

মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। আকাশজুড়ে মেঘের গম্ভীর গর্জন। বাইরেটা অন্ধকার। দুপুর হলেও চারদিক এমন অন্ধকারে ঢাকা যে সময়টাকে বোঝাই যাচ্ছে না। মনে হয় সন্ধ্যা নেমে এসেছে অকালেই।

শায়ান সবে গোসল সেরে, ভেজা চুলে হাত বুলাতে বুলাতে ঘরে ঢুকলো। শরীরে শুধু একটা ট্রাউজার প্যান্ট। দরজার কাছে দাঁড়িয়েই তার চোখ থেমে গেলো বিছানার উপর বসে অরুনীমার দিকে। যে গভীর মনোযোগে নেইলপলিশ লাগাচ্ছে। আর মাঝে মাঝে অরুনীমা ফু দিচ্ছে নখে। 

শায়ান এগিয়ে এসে তার পাশে বসে। হালকা করে তার বাহুতে ধাক্কা দিয়ে বলল,
"ওই, ঘুরতে যাবি?"

অরুনীমা নখে হালকা ফু দিয়ে শুকাতে শুকাতে বলল, "এই বৃষ্টিতে...কোথায়? আর কি উপলক্ষে?"

"মেঘ সরে যাচ্ছে। একটু পর কমে যাবে বৃষ্টি। ভাবছি ব্রিজের কাছে যাবো। আমাদের থ্রি মান্থ অ্যানিভার্সারি আজ, ভুলে গেলি?"

অরুনীমা একবার শায়ানের দিকে তাকিয়ে হালকা মাথা নেড়ে বলল, 
" সরি, ভুলি গেছিলাম। আচ্ছা, যাবো।"

একটু থেমে শায়ান গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, 
" আজকে একটু শাড়ি পরবি?"

অরুনীমা মুখ কুচকে তাকালো, 
"পারলে তো! ওসব আমি পারি না।"

শায়ান যেন এই অপেক্ষাতেই ছিলো। তাই দ্রুত বলল, 
"আমি পরিয়ে দেই।"

সরু চোখে তাকালো অরুনীমা। 
"সুযোগ নিচ্ছিস!"

"তোর কাছ থেকে আবার কিসের সুযোগ? তুই পুরোটাই তো আমার।"

একটু নরম হেসে অরুনীমা উঠে দাঁড়ালো। কিছুক্ষণ পর ফিরে এলো বাকি কাপড় পরে। আর তারপর শায়ান ইউটিউব দেখে ধীরে, যত্ন করে তাকে শাড়ি পরিয়ে দিলো। পরানো শেষে অরুনীমা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে বলল,
"এই... আমাকে তো সুন্দর লাগছে, তাই না?"

পেছন থেকে শায়ানের গলায় এক অদ্ভুত মুগ্ধতা, 
"খুউউব!"

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অরুনীমা বলল, 
"ফার্স্ট টাইম শাড়ি পরলাম। তোর জন্য যে আর কী কী করতে হবে!"

শায়ান মৃদু হেসে বলল, 
"সংসার করতে হবে আমার সাথে। ভালো বউ হতে হবে। আর আমাকে ভালোবাসতে হবে।"

কথাটা শুনে অরুনীমা চুপ হয়ে যায়। পিটপিট চোখে দেখতে থাকে শায়ানকে। এর মধ্যেই শায়ান শার্ট গায়ে দিতে শুরু করে বাইরে যাওয়ার জন্য। বোতামে হাত দিতেই অরুনীমা এগিয়ে এসে নিজের হাতে একে একে বোতাম লাগাতে লাগলো। অপ্রত্যাশিত কান্ড! শায়ান নিজেও অবাক হলো। কোমল গলায় অরুনীমা বলল,
"এই শায়ান! আমি সংসার করবো তোর সাথে। একটা ভালো বউ হবো তোর, দেখিস! আর..."

শায়ান কাতর হলো পরের কথাটা শুনতে,
"আর?"

অরুনীমা একটু লজ্জালু কন্ঠে বলল, 
"আর তোকে খুব খুব খুব ভালোবাসবো।

শায়ান স্নিগ্ধ হেসে উঠলো, 
"ভালোবাসা বুঝিস তুই?"

অরুনীমা একটু থেমে নিজের অনুভূতিগুলো গুছিয়ে বলল, 
"কী জানি! তবে একটা জিনিস বুঝেছি... আমাদের বন্ধুত্ব আর স্বামী-স্ত্রীর অনুভূতি এক না। এই যেমন, তুই কাছে আসলে আমার হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, তুই চু'মু দিলে আমি লজ্জা পাই। তোর জন্য রান্না করতে ভালো লাগে। তুই আমার কেয়ার করলে তখন তোকেও ভালো লাগে। আর জানিস, তুই ঘুমালে আমি তোকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখি।"

শায়ান আরও অবাক হয়। অরুনীমা একটু থেমে শায়ানের চোখে চোখ রেখে মৃদু স্বরে বলল, 
"এখন কেমন যেনো তোকে অন্যরকম ভালো লাগে আমার। এইসব বিয়ের পর থেকে হচ্ছে। আগে তো এমন লাগতো না। তাহলে এগুলোকে কি বলে?"

শায়ান কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো। তারপর সব বুঝতেই ধীরে ধীরে তার ঠোঁটে এক উজ্জ্বল হাসি ফুটলো। প্রাপ্তির হাসি। অস্থির হয়ে শায়ান বলল,
"কি করে ফেলেছিস, অরু! আমাকে লুকিয়ে দেখিস তুই! আর আমাকে তোর ভালো লাগে?"

অরুনীমা মাথা নেড়ে হেসে বলল, 
"হু। এটা কি ভালোবাসা?"

হঠাৎ করেই শায়ান তাকে দুহাতে তুলে নিলো। অরুনীমাও চমকে গলা জড়িয়ে ধরলো শায়ানের। শায়ান অরুনীমাকে কোলে তুলে ঘোরালো ঘরের মাঝখানে। এমন কান্ডে ফিচ করে হেসে ফেলে অরুনীমা। কিছুক্ষণ পর থেমে শায়ান উচ্ছ্বসিত হয়ে অরুনীমাকে বলল,
"ডেফিনেট'লি… এটাই ভালোবাসা।"

অরুনীমা নিজেও অবাক হয়ে শায়ানের গালে হাত রেখে জানতে চায়,
"এই শায়ান! তার মানে কি ভালোবাসা হয়ে গেছে? "

শায়ান স্নিগ্ধ হাসলো। চোখ দুটো ছলছল করছে তার। এরপর শায়ান অরুনীমার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলল, 
"হয়ে গেছে!"

 ______________|| সমাপ্ত ||________________

[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। ? ?]