Forums
দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - Printable Version

+- Forums (https://forum.xgossip.fun)
+-- Forum: Storeys Category (https://forum.xgossip.fun/forumdisplay.php?fid=1)
+--- Forum: Mature Stories 18% (https://forum.xgossip.fun/forumdisplay.php?fid=4)
+--- Thread: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) (/showthread.php?tid=63)

Pages: 1 2 3 4 5


দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - Bad Boy - 09-21-2026

‘দি কাউ ইজ আ ভেরি ইউজফুল অ্যানিমেল। বাট ইন মাই কান্ট্রি, ট্রাফিক জ্যাম ইজ মোর ইউজফুল। বিকজ ইট টিচেস আস পেশেন্স...’
সকাল সাতটায় আমার ঘুম ভাঙল এই অদ্ভুত ইংরেজি শুনে। কণ্ঠস্বরটা তুহিনের। সে আমার পাশের রুমেই থাকে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে এখন খুব সম্ভবত হাত-পা নেড়ে আইইএলটিএস (IELTS)-এর স্পিকিং টেস্টের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সে যুক্তরাজ্যে যাবে। সে জন্য সে গরুর রচনার সাথে ট্রাফিক জ্যাম মিশিয়ে এক অভিনব দর্শনের জন্ম দিচ্ছে।
আমি বিছানায় উঠে বসলাম।
মেস বলতে সাধারণত মানুষের চোখে যে ছবিটা ভাসে— ঘিঞ্জি একটা ঘর, দড়িতে লুঙ্গি ঝুলছে, ছারপোকা মারা তোশক আর ডাইনিং টেবিলে তরকারির হলুদ দাগ— আমাদের বাসাটা ঠিক তেমন না। মিরপুরের এই বাসাটায় চারটা রুম। আমরা চারজন ব্যাচেলর থাকি। ভাড়া বিশ হাজার। প্রত্যেকে পাঁচ হাজার করে দিই। এর বাইরে বিদ্যুৎ, পানি আর গ্যাসের বিল ভাগাভাগি হয়।
আমাদের খাওয়া-দাওয়ার সিস্টেমটাও একটু অন্যরকম। মেসে সাধারণত দুই বেলা মিল থাকে, আমাদের এখানে তা নেই। দুপুরে আমরা সবাই যার যার অফিস বা কাজে বাইরে থাকি, তাই দুপুরের খাবারের কোনো ঝামেলা নেই। রহিমা খালা নামের একজন বয়স্ক মহিলা সন্ধ্যাবেলা আসেন। শুধু রাতের রান্নাটা করে দিয়ে চলে যান।
আমরা চারজনের মধ্যে তিনজনই ছোটখাটো চাকরি করি। শুধু তুহিন কিছু করে না। তার কাজ হলো সারাদিন ইংলিশ মুভি দেখা আর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ইংরেজদের মতো উচ্চারণ করার বৃথা চেষ্টা করা। ওর বাবা-মা গ্রাম থেকে টাকা পাঠান, সেই টাকায় তার দিব্যি চলে যায়।
আমি খাট থেকে নেমে মুখ ধুতে গেলাম। তুহিনের রুমের দরজা খোলা। আমাকে দেখতে পেয়েই সে চওড়া হাসি দিল।
‘ব্রাদার রাশেদ, গুড মর্নিং! হাউ ইজ দ্য ওয়েদার টুডে?’
আমি তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বললাম, ‘ওয়েদার ভালো। তবে তুমি গরুর রচনার সাথে ট্রাফিক জ্যাম কেন মেলাচ্ছ, সেটা বুঝতে পারছি না। এক্সামিনার যদি জিজ্ঞেস করে তোমার প্রিয় প্রাণী কী, তুমি কি বলবে ট্রাফিক জ্যাম?’ তুহিন একটুও দমল না। ‘ভাই, আপনি বুঝবেন না। আইইএলটিএস-এ লজিক দেখে না, দেখে ফ্লুয়েন্সি। আপনি কত কনফিডেন্টলি গাঁজাখুরি কথা ইংরেজিতে বলতে পারেন, সেটাই হলো মেইন ফ্যাক্ট।’
কথা মন্দ বলেনি। আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষই তো এই থিওরিতে চলছে। কে কত কনফিডেন্টলি মিথ্যা বলতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করে তার সফলতা।


আমি নিজের রুমে ফিরে এলাম। আমার রুমটা বেশ ছিমছাম। এক পাশে একটা সিঙ্গল খাট, আরেক পাশে ছোট একটা পড়ার টেবিল। টেবিলের ওপর কয়েকটা ডিকশনারি, ল্যাপটপ আর ছড়ানো ছিটানো কিছু কাগজ।

টেবিলের ওপর রাখা আমার মানিব্যাগটার দিকে চোখ পড়ল। মাসের দশ তারিখ পেরিয়েছে। পকেটের অবস্থা ধীরে ধীরে হালকা হতে শুরু করেছে। আমার অফিস থেকে বেতন দেয় পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা। এই পঁয়ত্রিশ হাজার টাকার একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে। এরা মাসের এক তারিখে দলবেঁধে আমার অ্যাকাউন্টে ঢোকে, আর দশ তারিখের ভেতর এরা হাওয়া হয়ে যায়।

মিরপুরে এই চার রুমের ফ্লাটের একটা রুমের ভাড়া, রহিমা খালার বেতন, বাজারের টাকা, অফিসে যাওয়া-আসা, দুপুরের খাওয়া আর আমার দৈনিক এক প্যাকেট সিগারেটের খরচ মিলিয়ে পঁচিশ হাজার টাকা কীভাবে যেন উড়ে যায়। বাকি থাকে দশ হাজার। এই দশ হাজার টাকা আমি অত্যন্ত পবিত্র মনে করে মাসের শুরুতে নওগাঁয় বাবার কাছে পাঠিয়ে দিই।

আমি নওগাঁর ছেলে। পড়াশোনা করেছি নওগাঁ জিলা কলেজে। আহামরি কোনো ছাত্র ছিলাম না। ক্লাসের ফার্স্ট বয় বা সেকেন্ড বয় টাইপ ছেলেদের আমার সবসময় ভিনগ্রহের প্রাণী মনে হতো। আমি ছিলাম মাঝামাঝি গোত্রের। তবে আমার একটা অদ্ভুত শখ ছিল। বই পড়া আর সিনেমা দেখা। লুকিয়ে লুকিয়ে সেবা প্রকাশনীর বই পড়া আর সুযোগ পেলেই হলে গিয়ে সিনেমা দেখা।
জিলা কলেজ থেকে পাস করে নওগাঁ কলেজে ভর্তি হলাম। সেখানেও পড়াশোনার একই ধারা। কিন্তু কীভাবে কীভাবে যেন ঢাকা ইউনিভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষায় টিকে গেলাম। শুধু টিকেই গেলাম না, সাবজেক্ট পেয়ে গেলাম জার্নালিজম!

আমার বাবা আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন। তার ধারণা হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জার্নালিজম পড়া মানেই পাস করে বের হওয়ার সাথে সাথে আমি টেলিভিশনের পর্দায় বুম হাতে দাঁড়িয়ে যাব। সারা দেশের মানুষ আমাকে দেখবে।

বাস্তবতা যে কতটা ভিন্ন, তা আমি ঢাকায় এসে বুঝেছি। জার্নালিজম পাস করে আমি এখন কাজ করি ‘ঢাকা পেপারস’ নামের একটা অনলাইন পোর্টালে। সেখানে আমি ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কে বসে বিদেশি খবর বাংলায় অনুবাদ করি। সোজা কথায়, আমি একজন অনুবাদক। টেলিভিশনের পর্দায় আমাকে কেউ দেখে না। আমার নামের বাইলাইনটাও খবরের একদম নিচে এমন ছোট করে দেওয়া থাকে যে, আতশ কাঁচ দিয়ে খুঁজতে হয়।

তবুও বাবা খুশি। তিনি গ্রামের ভুসিমালের দোকানে বসে চা খেতে খেতে এলাকার লোকদের বলেন, ‘আমার বড় ছেলে ঢাকা পেপারসে আন্তর্জাতিক খবর সামলায়। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কী পলিসি নিল, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট কোথায় বোমা মারল— সব আমার ছেলের হাত দিয়ে পাস হয়ে দেশে ছড়ায়।’

বাবার এই আনন্দটুকুর জন্যই আমি মাসের শুরুতে দশ হাজার টাকা পাঠিয়ে দিই।

ল্যাপটপটা অন করতেই ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে তাকালাম। মায়ের কল।

সকালবেলা মায়ের ফোন আসা মানেই কোনো না কোনো দুঃসংবাদ। সুসংবাদ দেওয়ার জন্য মায়েরা সাধারণত দুপুরবেলা বেছে নেন। আমি ফোন ধরলাম, ‘হ্যালো মা, বলো।’ মায়ের গলা কাঁপছে। ‘রাশেদ, তুই কি অফিসে যাস?’
‘না, মাত্র উঠলাম। কী হয়েছে? বাবা ঠিক আছে তো?’
‘তোর বাপ ঠিক আছে। কিন্তু তোর ছোট ভাই নিহাদ তো একটা কাণ্ড করে বসছে।’

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। নিহাদ, আমার ছোট ভাই। আমার চেয়ে ৬ বছরের ছোট। খুব উড়নচণ্ডী। পড়াশোনায় একদম মন নেই। আমি বললাম, ‘কী কাণ্ড? আবার কারও সাথে মারামারি করেছে?’

‘মারামারি না। কাল রাতে বন্ধুদের সাথে কার যেন একটা মোটরসাইকেল নিয়ে ঘুরতে গেছিল। রাস্তায় স্লিপ কেটে পড়ে বাইকের সামনের অংশ পুরা ভাইঙ্গা ফেলছে। যার বাইক, সে এখন ক্ষতিপূরণ চায়।’

‘ক্ষতিপূরণ কত চায়?’

‘দশ হাজার টাকা। তোর বাপ তো শুনেই রেগে আগুন। বলছে, সে এক টাকাও দেবে না। ছেলে জেলে গেলে যাক। কিন্তু আমি তো মা, আমি ক্যামনে সহ্য করি বল? লোকটা আজ সকালেও আইসা দোকানের সামনে চিল্লাচিল্লি করছে।’

আমি শান্ত গলায় বললাম, ‘মা, তুমি বাবাকে কিছু বোলো না। আমি দেখছি। নিহাদকে একটু সাবধানে থাকতে বোলো। ঢাকা শহর হলে কথা ছিল, নওগাঁর মতো জায়গায় এত স্পিডে বাইক চালানোর কী আছে?’
মা একটু আশ্বস্ত হলেন। ‘তুই টাকা পাঠাবি?’
‘হ্যাঁ, পাঠাব। তুমি টেনশন কোরো না।’

ফোন রেখে আমি আমার ল্যাপটপের এক্সেল শিটটা খুললাম। সেখানে আমার সেভিংসের একটা হিসাব রাখা আছে।

আমার আয়ের আরেকটা উৎস আছে। আমি ‘চন্দ্রবিন্দু’ নামের একটা প্রকাশনীতে পার্ট-টাইম প্রুফ রিডারের কাজ করি। অন্যের লেখা ভুল বানানের পাণ্ডুলিপি লাল কালি দিয়ে শুদ্ধ করা। কাজটা বিরক্তিকর হলেও আমি মনোযোগ দিয়ে করি। তাছাড়া বাজারে আমার নিজের অনুবাদ করা দুটো বই আছে। বই দুটো মোটামুটি চলে। এদেশে অনুবাদকের খুব একটা দাম নেই, তবে মাস শেষে কিছু রয়্যালটি আসে।

প্রুফ দেখা আর বইয়ের রয়্যালটি মিলিয়ে প্রকাশনী থেকে আমার মাসে হাজার দশেক টাকা আসে। এই টাকাটা আমি কখনো ছুঁয়েও দেখি না। এটা সোজা আমার সেভিংস অ্যাকাউন্টে চলে যায়।

বাবার একটা স্বপ্ন ছিল, জীবনে একবার হজ করবেন। কিন্তু ভুসিমালের দোকান চালিয়ে সংসার চালানোর পর হজের টাকা জমানো তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। আমার স্বপ্ন, বাবাকে হজ না হোক, অন্তত উমরাহটা করাব। মাকেও সাথে পাঠাব।

আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি, দুজনের উমরাহ প্যাকেজে প্রায় তিন লাখ টাকার মতো লাগবে। আমার সেভিংস অ্যাকাউন্টে গতকাল পর্যন্ত জমা ছিল এক লাখ চল্লিশ হাজার টাকা।

আমি এক্সেল শিটে এক লাখ চল্লিশ হাজার থেকে দশ হাজার বিয়োগ করলাম। সংখ্যাটা নেমে এলো এক লাখ ত্রিশ হাজারে। আমার স্বপ্নটা আরও কয়েক মাসের জন্য পিছিয়ে গেল।

হিসাবটা মেলাতেই আমার মনটা খারাপ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হলো না। আমার মনে এক ধরনের অদ্ভুত নির্লিপ্ততা কাজ করে। যেকোনো পরিস্থিতি মেনে নেওয়ার এক অদ্ভুত ক্ষমতা আমার আছে। আমি জানি, জীবনে দুই আর দুইয়ে সবসময় চার হয় না। মাঝে মাঝে বাইশও হয়ে যায়, আবার শূন্যও হয়ে যায়।

আমি শার্ট গায়ে দিয়ে বের হওয়ার জন্য প্রস্তুত হলাম।

মিরপুর দশ নাম্বার থেকে কারওয়ান বাজার যাওয়ার বাস ধরতে হবে। আমার অফিসের শিফট শুরু হয় সকাল দশটায়। দশ নাম্বারের গোলচত্বরে এসে দাঁড়ালে মনে হয়, ঢাকা শহরে মানুষের চেয়ে বাসের সংখ্যা বেশি, আবার বাসে ওঠার সময় মনে হয় বাসের চেয়ে মানুষের সংখ্যা বেশি। এক অদ্ভুত গোলকধাঁধা।

একটা ‘বিকল্প অটো’ বাস এসে দাঁড়াল। আমি ভিড় ঠেলে ওঠার চেষ্টা করলাম। ঢাকা শহরে বাসে ওঠার কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। এখানে ‘যোগ্যতমের উদ্বর্তন’ বা সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট থিওরি কাজ করে। যে যত বেশি কনুই চালাতে পারবে, সে তত সহজে বাসে উঠতে পারবে।

আমি কনুই চালিয়ে বাসের ভেতরে জায়গা করে নিলাম। বসার সিট নেই। হ্যান্ডেল ধরে ঝুলে থাকতে হবে। আমার ঠিক পাশেই এক ভদ্রলোক অত্যন্ত বিরক্তি নিয়ে তার চশমার কাঁচ মুছছেন।

ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ভাই, ঢাকা শহরটা একটা গ্যাস চেম্বার হয়ে গেছে, খেয়াল করেছেন?’
আমি মাথা নাড়লাম, ‘জি। তবে গ্যাস চেম্বারে সাধারণত বাস চলে না, এখানে চলছে।’

ভদ্রলোক আমার রসবোধ বুঝলেন না। তিনি গম্ভীর মুখে বললেন, ‘আমি মতিঝিল যাচ্ছি। এই জ্যাম ঠেলে কখন পৌঁছাব আল্লাহ মালুম। আপনি কী করেন ভাই?’
‘আমি অনুবাদ করি।’
‘অনুবাদ? মানে কোর্ট-কাচারির দলিল-দস্তাবেজ?’
‘না। বিদেশি খবর অনুবাদ করি। একটা অনলাইন পত্রিকায়।’

ভদ্রলোক একটু হতাশ হলেন বলে মনে হলো। ‘ও আচ্ছা। খবর। দেশে তো খবরের অভাব নেই, আবার বিদেশি খবর! কে পড়ে এসব?’

কথাটা খুব একটা মিথ্যা না। আমাদের দেশের মানুষের অন্যের হাঁড়ির খবর জানার আগ্রহ বেশি। ট্রাম্প আমেরিকায় কী করল, তার চেয়ে পাশের বাড়ির ভাবি কেন আজকে শাড়ি পরে বের হলো, সেই খবর এদেশের মানুষের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বাস কারওয়ান বাজার পৌঁছাতে পৌঁছাতে দশটা বেজে গেল। আমি বাস থেকে নেমে ‘ঢাকা পেপারস’-এর অফিসের দিকে হাঁটতে লাগলাম।

আমাদের অফিসটা একটা কমার্শিয়াল বিল্ডিংয়ের পাঁচতলায়। অফিসে ঢুকতেই নিউজ রুমের চিরাচরিত কোলাহল কানে এল। সবাই ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে খটখট করে টাইপ করছে। কেউ কেউ ফোনে চিৎকার করে কথা বলছে।

আমি আমার ডেস্কে গিয়ে বসলাম। ডেস্কটা একদম কোণায়। জানালা দিয়ে বাইরের রাস্তা দেখা যায়। আমি ল্যাপটপ অন করতেই আমাদের শিফট ইনচার্জ এহসান ভাই আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন।

এহসান ভাইয়ের বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। মাথার চুল সামনের দিকে বেশ পাতলা। তিনি সারাক্ষণ একটা অদ্ভুত তাড়াহুড়োর মধ্যে থাকেন। পৃথিবীতে যেন এইমাত্র বিরাট কোনো প্রলয় ঘটে গেছে এবং সেটা ব্রেকিং নিউজ হিসেবে না দেওয়া পর্যন্ত তার শান্তি নেই, এমন একটা ভাব।

‘রাশেদ, আজকে কিন্তু বেশ কয়েকটা ইম্পর্ট্যান্ট নিউজ আছে। জলদি হাত চালাও।’

আমি বললাম, ‘কী নিউজ ভাই?’

এহসান ভাই একটা প্রিন্ট করা কাগজ আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন। ‘ফ্রান্সের এক লোক তার সমস্ত সম্পত্তি একটা বিড়ালকে উইল করে দিয়েছে। বিড়ালটার নাম হচ্ছে লুসি। লুসির নামে এখন নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, গাড়ি আর ড্রাইভার আছে। নিউজটা একটু রসিয়ে রসিয়ে লিখবে। মানুষ এসব পড়তে খুব পছন্দ করে।’

আমি কাগজটার দিকে তাকালাম। আমার এক লাখ চল্লিশ হাজার টাকার সেভিংস আর নিহাদের বাইকের ক্ষতিপূরণ বিশ হাজার টাকার কথা মনে পড়ল। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে লুসি নামের কোটিপতি বিড়ালের খবরটা বাংলায় অনুবাদ করতে শুরু করলাম।

অনুবাদ করতে করতে আমার হঠাৎ মনে হলো, আমি যদি ফ্রান্সের ওই বিড়ালটা হতাম, তাহলে আমার বাবা-মাকে উমরাহ করতে পাঠাতে কোনো সমস্যাই হতো না। হয়তো লুসি নিজেই একদিন মক্কায় গিয়ে উমরাহ করে আসবে, কে জানে!

খবরটা শেষ করে মাত্র সাবমিট করেছি, এমন সময় আমার মোবাইলটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে দেখলাম, ‘চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনী- মতিন সাহেব’।

মতিন সাহেব চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীর মালিক। লোকটা ভালো, তবে অত্যন্ত হিসেবি। তিনি এক কাপ চা খাওয়াতেও দশবার হিসাব করেন।

আমি ফোন ধরলাম, ‘জি মতিন সাহেব, বলুন।’
‘রাশেদ ভাই, কেমন আছেন? আপনাকে গত সপ্তাহে দেওয়া বইটার প্রুফ দেখা শেষ? জমা দেওয়ার ডেট তো কালকে। কাজ কি শেষ হয়েছে?’

‘জি, প্রায় শেষ। আজ রাতের ভেতর কমপ্লিট করে কাল অফিসে দিয়ে আসব।’

‘খুব ভালো। আর শোনো ভাই, নতুন একটা অনুবাদের কাজ হাতে এসেছে। একটা স্প্যানিশ থ্রিলার বইয়ের ইংরেজি ভার্সন। তুমি কি করতে পারবে?’

আমার বুকের ভেতরটা একটু ধক করে উঠল। নতুন বইয়ের অনুবাদ মানে নতুন রয়্যালটি। নতুন টাকা। 

আমি স্বাভাবিক গলা বজায় রেখে বললাম, ‘পারব। তবে আমার রেটটা কিন্তু এবার একটু বাড়াতে হবে মতিন সাহেব। আগের রেটে পোষাচ্ছে না।’

মতিন সাহেব সঙ্গে সঙ্গে গলা নামিয়ে ফেললেন। যেন আমি তার কাছে কিডনি চেয়ে বসেছি। ‘আরে রাশেদ ভাই, আপনি তো জানেনই প্রকাশনা শিল্পের কী করুণ অবস্থা! কাগজের যা দাম! বই তো বিক্রি হয় না। তার ওপর অনুবাদের বই। লোকে তো এখন পিডিএফ পড়ে। আমি তো আপনাকে আপন মানুষ মনে করে কাজটা দিতে চাইলাম।’

আমি মনে মনে হাসলাম। প্রকাশকদের এই এক কথা। কাগজের দাম আর প্রকাশনা শিল্পের করুণ অবস্থা। অথচ প্রতি বছর বইমেলায় তারা নতুন গাড়ি কিনে ঘুরে বেড়ায়।

আমি বললাম, ‘ঠিক আছে, কাল যখন প্রুফ দিতে যাব, তখন রেট নিয়ে কথা হবে।’
‘আচ্ছা ভাই, চলে আসেন। কাল একসাথেই চা খাব।’

ফোন রেখে আমি একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। স্প্যানিশ থ্রিলার বইটার অনুবাদ করতে পারলে হয়তো বিশ হাজার টাকা একসঙ্গে পাওয়া যাবে।

আমি আবার ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকালাম। এহসান ভাই আরেকটা নিউজ পাঠিয়েছেন। এবার আর কোনো বিড়ালের খবর না। মেক্সিকোতে ড্রাগ কার্টেলের গোলাগুলিতে সাধারণ মানুষের মৃত্যুর খবর।

আমি কি-বোর্ডে আঙুল চালাচ্ছি। আমার মাথার ভেতর তখন মেক্সিকোর গোলাগুলির বদলে ঘুরে বেড়াচ্ছে তিন লাখ টাকার স্বপ্ন, নিহাদের অ্যাকসিডেন্ট, আর স্প্যানিশ থ্রিলারের রেট।

আমার জীবনটা এই অনুবাদের মতোই। এক ভাষার আবেগ অন্য ভাষায় বোঝানোর ব্যর্থ চেষ্টা। আমি আমার চারপাশের পৃথিবীর খবর বাংলায় অনুবাদ করি, কিন্তু আমার নিজের জীবনের ভেতরের খবর কেউ অনুবাদ করতে পারে না।

অফিস থেকে বের হতে হতে সন্ধ্যা ৬টা বেজে গেল। কারওয়ান বাজারের মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি বাসের জন্য। ঢাকা শহরের এই সময়টা সবচেয়ে অদ্ভুত। রাস্তার সোডিয়াম বাতির হলুদ আলোয় সবকিছু কেমন যেন মায়াময় মনে হয়। ধুলোমাখা বাতাস, হর্ন, মানুষের চিৎকার— সব কিছু মিলিয়ে একটা বিরাট বিশৃঙ্খলা। অথচ এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই এক ধরনের অদ্ভুত শান্তি আছে।

বাস এলে আমি উঠলাম। এবার বসার সিট পেয়েছি। জানালার পাশে। আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি। বাতাস এসে আমার মুখে লাগছে। আমার পকেটে পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা বেতনের হিসাব, আর মাথায় তিন লাখ টাকার স্বপ্ন।

বাস এগোচ্ছে। আমার জীবনও এগোচ্ছে। আমি রাশেদ আহমেদ। আমার গল্প শুরু হলো। আপনি শুনছেন তো?



RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - Bad Boy - 09-21-2026

২।
আমাদের ‘ঢাকা পেপারস’ অফিসে প্রায় সত্তর জন লোক কাজ করে। সত্তর জন মানুষ একটা ফ্লোরে বসে যখন একসাথে ল্যাপটপের কি-বোর্ডে আঙুল চালায়, তখন অদ্ভুত একটা শব্দ হয়। চোখ বন্ধ করে শুনলে মনে হবে, বিশাল কোনো টিনের চালে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে।

অফিসটা মূলত কয়েকটা ডেস্কে ভাগ করা। ন্যাশনাল ডেস্ক, পলিটিক্স, এন্টারটেইনমেন্ট, স্পোর্টস এবং ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক। এর মধ্যে সবচেয়ে নিরিবিলি এবং শান্তিতে থাকি আমরা। মানে ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কের মানুষজন।

আমাদের ডেস্কে আমরা মোট তিনজন। আমি, মামুন আর আমাদের লাইন ম্যানেজার এহসান ভাই। আমি আর মামুন সমান লেভেলের কর্মী। আমাদের পদবি এক, কাজ এক, বেতনও এক। এমনকি আমাদের ল্যাপটপের কনফিগারেশনও এক। আমাদের কাজ হলো রয়টার্স, বিবিসি বা আল-জাজিরা থেকে বিদেশি খবরগুলো নামিয়ে অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে বাংলায় অনুবাদ করে দেওয়া।

মামুন ছেলেটা বেশ ইন্টারেস্টিং। তার ইংরেজি জ্ঞান ভয়ংকর রকমের আক্ষরিক। সে মাঝে মাঝেই অনুবাদ করতে গিয়ে এমন সব বাক্য তৈরি করে, যা পড়লে চমকে উঠতে হয়। সেদিন দেখলাম সে ‘He kicked the bucket’ (সে মারা গেছে) অনুবাদ করেছে— ‘সে বালতিতে লাথি মেরেছে’। আমি তাকে অনেক বুঝিয়েছি যে বিদেশি খবরের মধ্যে বালতি বা লাথির কোনো জায়গা নেই। সে আমার কথা শোনে, কিন্তু দুই দিন পর আবার নিজের নিয়মে ফিরে যায়।

অফিসে আমার ছুটি সোমবার। আর মামুনের ছুটি শুক্রবার।

শুক্রবার ছুটি থাকা মানে আপনি সামাজিকভাবে একজন প্রতিষ্ঠিত মানুষ। আপনি জুমার নামাজ পড়তে পারবেন, দুপুরে বাসায় গরুর মাংস দিয়ে ভাত খেতে পারবেন, বিকেলে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে পারবেন। কিন্তু সোমবার ছুটি থাকাটা এক ধরনের সামাজিক অভিশাপ। সোমবার আপনার সব বন্ধু অফিসে ব্যস্ত। রাস্তায় জ্যাম, বাজারে ভিড়। সোমবার আপনি চাইলেও কারও সাথে আড্ডা দিতে পারবেন না।

তাই সোমবারে মাঝেমধ্যে ‘চন্দ্রবিন্দু’ প্রকাশনীর অফিসে যাই।

চন্দ্রবিন্দুর অফিসটা কাঁটাবনে। পুরনো একটা বিল্ডিংয়ের দোতলায়। সেখানে সবসময় নতুন ছাপানো বইয়ের গন্ধ, আঠা আর পুরনো কাগজের গন্ধ মিলেমিশে একটা অদ্ভুত ঘ্রাণ তৈরি করে। এই ঘ্রাণটা আমার খুব পরিচিত এবং প্রিয়।

প্রকাশনীর মালিক মতিন সাহেব আমাকে বেশ পছন্দ করেন, কারণ আমি বিনা পয়সায় তার অফিসের একটা চেয়ার দখল করে বসে থাকলেও, মাঝে মাঝে ফ্রি-তে দু-একটা পাণ্ডুলিপির প্রুফ দেখে দিই।

বিকেলের দিকে এখানে বেশ জমজমাট আড্ডা হয়। ঢাকা শহরের কিছু উদীয়মান কবি, সাহিত্যিক আর বেকার বুদ্ধিজীবীরা এখানে জড়ো হন। তারা অত্যন্ত গম্ভীর মুখে চায়ে চুমুক দেন এবং ফরাসি সাহিত্য, লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তবতা কিংবা উত্তর-আধুনিকতা নিয়ে এমনভাবে আলোচনা করেন, যেন এই সমস্যাগুলো সমাধান না হলে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ধ্বংস হয়ে যাবে।

আমি চুপচাপ তাদের কথা শুনি। মাঝে মাঝে তারা আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, "কী রাশেদ ভাই, আপনার কী মত?"
আমি খুব সাবলীল ভঙ্গিতে বলি, "আপনারা যা বলেছেন, এর বাইরে আসলে আর কিছু বলার নেই। আমি আপনাদের সাথে একমত।"

এই একটা বাক্যের কারণে চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীর আড্ডায় আমার বেশ কদর আছে। সবাই আমাকে ‘সমঝদার’ এবং ‘জ্ঞানী’ মানুষ হিসেবে সম্মান করে। মাঝে মাঝে এই প্রকাশনী থেকে বইয়ের মোড়ক উন্মোচন বা পাঠচক্রের আয়োজন করা হয়। তখন আমাকেও ডাকা হয়। আমি গম্ভীর মুখে স্টেজে বসে থাকি। দু-চারটে কঠিন শব্দ ব্যবহার করে বইয়ের ওপর আলোচনা করি। মানুষজন খুব মনোযোগ দিয়ে শোনে।

এরকমই এক সোমবার সকালের কথা। আমি মেসে বসে ঝিমুচ্ছি। হঠাৎ চন্দ্রবিন্দুর মতিন সাহেবের ফোন।
আমি ফোন রিসিভ করলাম, "জি মতিন সাহেব, বলুন।"
মতিন সাহেব একটু ব্যস্ত গলায় বললেন, "রাশেদ ভাই, সামনের বুধবার সন্ধ্যায় কি আপনার সময় হবে? একটু আসতে হবে আমাদের অফিসে।"
"কী ব্যাপার? কোনো জরুরি কাজ?"
"তেমন কিছু না। একটা বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠান। ছোট করে। আপনাকে একটু কথা বলতে হবে।"
"কোন বই?"
"ওই যে, দশ-পনেরো দিন আগে আপনি যে বইয়ের প্রুফ দেখলেন না?"

আমি স্মৃতি হাতড়ে মনে করার চেষ্টা করলাম। হ্যাঁ, একটা কবিতার বই।
আমি বললাম, "লেখকের নাম কী যেন?"
"আনিকা নাওহার। বইয়ের নাম ‘মিথ্যা মুখোশ, সত্য মুখোশ’। আপনি তো প্রুফ দেখেছেন, বইটা নিয়ে ভালো-মন্দ দুই-চার কথা বলবেন আরকি। পারবেন না?"
আমি বললাম, "পারব। কিন্তু বুধবার তো আমার অফিস ভাই। ৬টার আগে তো ফ্রি হতে পারব না।"
"আরে ভাই, আমার প্রোগ্রাম তো পাঁচটা থেকে, একটু ম্যানেজ করেন।"
"ঠিক আছে, দেখতেছি।"
"দেখতেছি না, আপনার থাকা লাগবে।"
"আচ্ছা, আসব আমি। প্যারা নাই।"

ফোন রেখে আমি ল্যাপটপে ‘মিথ্যা মুখোশ, সত্য মুখোশ’ বইটার পিডিএফ ফাইল ওপেন করলাম। বই নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রস্তুতি লাগে। নাহলে স্টেজে উঠে বোকার মতো তাকিয়ে থাকতে হয়। বাংলাদেশে এমনিতেই মহিলা কবির সংখ্যা কম। যারা আছেন, তারা বেশিরভাগই ফেসবুকে দুই লাইনের স্ট্যাটাস দেন, যেগুলোকে ঠিক কবিতা বলা যায় না। আনিকা নাওহার সেই হিসেবে কিছুটা ব্যতিক্রম। উনি মোটামুটি পরিচিত। তবে উনাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি না।

আমি বইয়ের পিডিএফের শেষে দেওয়া ‘লেখক পরিচিতি’ অংশটা বের করলাম। উনার জন্ম বাংলাদেশে। কিন্তু বেড়ে ওঠা এবং বর্তমান নিবাস ইংল্যান্ডে। উনার মতো কবিদের আমরা বলি ‘পরিযায়ী পাখি’ বা ‘অতিথি পাখি’। এরা বছরে একবার দেশে আসেন। ঠিক বইমেলার আগে আগে। এসে নিজেদের টাকায় বই প্রকাশ করেন, পুরো বইমেলায় অত্যন্ত সুন্দর শাড়ি পরে স্টলে স্টলে ঘুরে বেড়ান, পাঠকদের অটোগ্রাফ দেন। তারপর বইমেলা শেষ হলেই আবার ইংল্যান্ড বা আমেরিকায় ফিরে যান। পরের এগারো মাস তাদের আর কোনো খবর থাকে না।

লেখক পরিচিতির নিচে একটা ছবি দেওয়া আছে। ফ্ল্যাপের ছবি। ছবি অনুযায়ী উনার বয়স বোঝা মুশকিল, তবে ফ্ল্যাপের লেখায় দেওয়া আছে— জন্ম ১৯৯০, অর্থাৎ বয়স ৩৬।

ফ্ল্যাপের ছবির একটা অদ্ভুত নিয়ম আছে। এখানে সবাইকেই একটু চিন্তিত এবং সুন্দর দেখায়। আনিকা নাওহারকেও খুব সুন্দর লাগছে। তার চোখের দৃষ্টিতে এক ধরনের উদাসীনতা আছে, যেটা কবিদের জন্য বাধ্যতামূলক। একজন কবি যদি বাজারের ফর্দ হাতে নিয়ে তোলা ছবি ফ্ল্যাপে দেন, মানুষ সেই বই কিনবে না। কবিদের থাকতে হয় মেঘ, বৃষ্টি আর বিষণ্ণতার কাছাকাছি।

আমি উনার কয়েকটা কবিতা আবার পড়লাম। প্রুফ দেখার সময় খেয়াল করেছিলাম, উনি ‘শূন্যতা’ শব্দটা খুব বেশি ব্যবহার করেছেন। প্রায় প্রতিটি কবিতাতেই কোনো না কোনো শূন্যতা আছে। ইংল্যান্ডের মতো একটা সুন্দর দেশে বসে একজন মানুষের ভেতরে এত শূন্যতা কোথা থেকে আসে, সেটা আমার মতো মিরপুরের মেসে থাকা একজন সাধারণ অনুবাদকের পক্ষে বোঝা মুশকিল।

বুধবারের জন্য আমি আমার মাথায় একটা ছোটখাটো স্ক্রিপ্ট তৈরি করে ফেললাম। স্টেজে উঠে আমি বলব— "আনিকা নাওহারের কবিতায় আমরা এক ধরনের প্রবাসকালীন বিচ্ছিন্নতাবোধ দেখতে পাই। এই শূন্যতা শুধু ব্যক্তির নয়, এই শূন্যতা যেন পুরো আধুনিক সভ্যতার..." ইত্যাদি ইত্যাদি। এই ধরনের কথাগুলো শুনতে খুব ভারী মনে হয়, কিন্তু বাস্তবে এর কোনো মানে নেই।

মঙ্গলবার অফিসে গিয়েই আমি এহসান ভাইয়ের ডেস্কের সামনে দাঁড়ালাম।
এহসান ভাই তখন খুব মনোযোগ দিয়ে আল-জাজিরার ওয়েবসাইট খুলে কী একটা নিউজ পড়ছেন। তার কপালে ভাঁজ। পৃথিবীর কোথাও কোনো বোমা ফুটলে বা কোনো দেশের সরকার পতন হলে এহসান ভাইয়ের কপালের ভাঁজ গভীর হয়।
"এহসান ভাই?" আমি শান্ত গলায় ডাকলাম।
এহসান ভাই চোখ না তুলেই বললেন, "বলো রাশেদ। সিরিয়ার অবস্থা তো ভালো না। আরেকটা হামলা হয়েছে।"
"সিরিয়ার অবস্থা তো গত দশ বছর ধরেই ভালো না ভাই। আমি অন্য একটা বিষয়ে কথা বলতে এসেছিলাম।"
এহসান ভাই এবার মুখ তুলে তাকালেন। "কী বিষয়?"
"আগামীকাল বুধবার আমাকে একটু আগে ছাড়তে হবে। মানে, বিকেল ৩টার দিকে।"

অফিসে ছুটি বা আর্লি লিভ চাওয়ার সময় বসের চোখের দিকে সরাসরি তাকাতে হয় না। একটু অপরাধী ধরনের চেহারা করে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। আমি সেই চেষ্টা করলাম।
এহসান ভাই ভ্রু কুঁচকে বললেন, "তিনটায়? কেন? তোমার তো আবার বিয়ে-শাদির ব্যাপার নেই যে পাত্রী দেখতে যাবে।"
"পাত্রী না ভাই। একটা প্রকাশনা অনুষ্ঠান আছে কাঁটাবনে। সেখানে আমাকে একটু কথা বলতে হবে।"
"কীসের প্রকাশনা?"
"কবিতার বই।"
এহসান ভাই এমনভাবে আমার দিকে তাকালেন, যেন আমি তাকে বলেছি আমি মঙ্গল গ্রহে যাওয়ার জন্য টিকিট কাটতে যাচ্ছি।
"কবিতা? তুমি কবিতা নিয়ে কথা বলবে? তুমি তো অনুবাদক। তুমি কবিতা বোঝো?"
আমি বিনীত গলায় বললাম, "একটু-আধটু বুঝি ভাই। প্রুফ রিডিংয়ের কাজ তো করি। সেখান থেকেই ডাকছে।"
এহসান ভাই দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "ঠিক আছে, যাও। তবে ভাই, তুমি তো জানোই এগুলার কী সব টাইম-ইন, টাইম-আউটের হিসাব করে। একদিন যেহেতু ৩ ঘণ্টা আগে চলে যাবা, আরেকদিন কিন্তু ৩ ঘণ্টা বেশি করে কাভার আপ করে দিও।" 
আমি বললাম, "জি ভাই, অবশ্যই।"

আমি ডেস্কে ফিরে, নিউজ করলাম প্রথমে দুটো। একটা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আপডেট। আরেকটা ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে, যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব। নিউজ দুটো শেষ করে আনিকা নাওহারের ‘মিথ্যা মুখোশ, সত্য মুখোশ’-এর পিডিএফ বের করে আবার দু-একটা কবিতা পড়লাম।

মানুষ আসলে সারাজীবনই মুখোশ পরে থাকে। আমি যে কাল স্টেজে উঠে উনার কবিতার ভূয়সী প্রশংসা করব, সেটাও একটা মুখোশ। কারণ আমি জানি, উনার কবিতাগুলো খুব সাধারণ মানের। কিন্তু আমি সেটা বলব না।
মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, মিথ্যা বলাটা একটা শিল্প। আর আমরা সবাই সেই শিল্পের ছোটখাটো এক একজন শিল্পী।
বুধবার সকালটা অন্য আট-দশটা সাধারণ দিনের মতোই শুরু হলো। তাড়াহুড়ো করে গল্প এগিয়ে নেওয়ার কিছু নেই। মানুষের জীবন তো আর সিনেমার ট্রেইলার না যে শুধু অ্যাকশন আর ক্লাইম্যাক্স থাকবে। জীবনের বেশিরভাগ অংশ জুড়েই থাকে একঘেয়েমি, পুনরাবৃত্তি আর ভীষণ সাধারণ কিছু মুহূর্ত।

আমাদের মেসের সকালবেলাটা বেশ ইন্টারেস্টিং। চার রুমের এক বাসিন্দার নাম রাজু। একটা ওষুধ কোম্পানির সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ, অল্প বেতন। তবে এইটা ওর আপাত জীবন। ওর টার্গেট সরকারি চাকরি। সে বিসিএস পরীক্ষার্থী। তার জীবনের একটাই লক্ষ্য— যেকোনো মূল্যে সরকারের একজন গ্যাজেটেড কর্মকর্তা হওয়া। এজন্য সে প্রতিদিন ভোরে উঠে বারান্দায় পায়চারি করে আর বিড়বিড় করে সাধারণ জ্ঞান মুখস্থ করে।

আজ সকালে ঘুম ভাঙতেই শুনলাম রাজু বারান্দায় দাঁড়িয়ে আপন মনে বলছে, "বুলগেরিয়ার রাজধানী সোফিয়া, মুদ্রার নাম লেভ... বুরকিনা ফাসোর রাজধানী ওয়াগাদুগু, মুদ্রার নাম ফ্র্যাঙ্ক..."
আমি বিছানা ছেড়ে উঠে বারান্দায় গেলাম। চোখেমুখে ঘুমের রেশ। রাজু আমাকে দেখে পড়া থামিয়ে বলল, "রাশেদ ভাই, উঠলেন?"
আমি হাই তুলে বললাম, "হুম। তুমি তো দেখি আজ আফ্রিকায় চলে গেছ। বুরকিনা ফাসো নিয়ে পড়েছ।"

রাজু গম্ভীর মুখে বলল, "ভাই, বিসিএস জিনিসটা হলো একটা মহাসাগর। কোথা থেকে যে এক মার্কের প্রশ্ন চলে আসবে, কেউ জানে না। গত বছর প্রশান্ত মহাসাগরের একটা ছোট দ্বীপের রাজধানীর নাম জিজ্ঞেস করেছিল। আমি রিস্ক নিতে চাই না।"
আমি বললাম, "খুব ভালো। তা বুরকিনা ফাসোর রাজধানী ওয়াগাদুগু, এটা জেনে তোমার জীবনে ঠিক কী উন্নতি হবে বলে তুমি মনে করো?"

রাজু একটু থতমত খেয়ে গেল। তারপর বলল, "উন্নতি তো হবে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার পর। তখন তো আর বুরকিনা ফাসো নিয়ে ভাবতে হবে না। তখন ভাবব পোস্টিং আর প্রমোশন নিয়ে। আপাতত এই ওয়াগাদুগুই আমার ভবিষ্যৎ।"

আমি হাসলাম। রাজুর লজিক খুব পরিষ্কার। আমি বাথরুমে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালাম। ব্যাচেলর মেসে সকালবেলা বাথরুমের সিরিয়াল পাওয়াটা অনেকটা লটারি জেতার মতো। আমাদের ফ্ল্যাটে বাথরুম দুটো। কিন্তু সকাল আটটা থেকে নয়টার মধ্যে এই দুটো বাথরুম নিয়ে রীতিমতো স্নায়ুযুদ্ধ চলে। আমি গিয়ে দেখলাম, তুহিন একটা বাথরুম দখল করে বসে আছে। ভেতর থেকে আইইএলটিএস-এর স্পিকিং প্র্যাকটিসের শব্দ আসছে। সে বাথরুমে বসেও ইংরেজিতে কথা বলছে।

"ইয়েস, আই থিংক গ্লোবাল ওয়ার্মিং ইজ আ ভেরি বিগ ইস্যু..."
আমি বাথরুমের দরজায় টোকা দিয়ে বললাম, "তুহিন ভাই, গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ে পরে থিংক করো। এখন বাথরুমটা একটু ছাড়ো। আমার অফিসে লেট হয়ে যাচ্ছে।"
তুহিন ভেতর থেকেই বলল, "জাস্ট টু মিনিটস, ব্রাদার! আই অ্যাম অলমোস্ট ডান।"

সকাল দশটায় আমি কারওয়ান বাজারে ‘ঢাকা পেপারস’-এর অফিসে এসে পৌঁছালাম।
অফিসের পরিবেশ প্রতিদিনের মতোই। সবাই ল্যাপটপে মুখ গুঁজে আছে। আমি আমার ডেস্কে গিয়ে বসলাম। ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কে আমি আর মামুন পাশাপাশি বসি। মামুন আজ খুব সিরিয়াস মুখে একটা নিউজ অনুবাদ করছে। তার ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আমার চোখ আটকে গেল।

সে একটা আমেরিকান নিউজ এজেন্সির খবর অনুবাদ করছে। খবরটা হলো, ক্যালিফোর্নিয়ায় একটা ব্যাংকে ডাকাতি করতে গিয়ে একজন লোক হাতেনাতে ধরা পড়েছে। ইংরেজিতে লেখা ছিল: "The bank robber was caught red-handed by the security officer."
মামুন তার স্বভাবসুলভ আক্ষরিক অনুবাদ করেছে: "ব্যাংক ডাকাতটিকে পুলিশ লাল হাতে ধরে ফেলে।"

আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, "মামুন, একটু এদিকে তাকাও।"
মামুন চোখ না সরিয়েই বলল, "বলেন ভাই। খুব ইম্পর্ট্যান্ট নিউজ। ক্যালিফোর্নিয়ায় ডাকাতি।"
"ডাকাতি ঠিক আছে। কিন্তু ডাকাতটা লাল হাতে ধরা পড়ল কীভাবে? সে কি ডাকাতি করার আগে হাতে আলতা মেখেছিল?"

মামুন এবার আমার দিকে তাকাল। "লাল হাত মানে? ওহ, 'রেড-হ্যান্ডেড' বুঝাচ্ছেন? তো রেড মানে তো লাল আর হ্যান্ড মানে হাত। লাল হাতই তো হয়।"
আমি অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে বললাম, "রেড-হ্যান্ডেড একটা ইডিয়ম। এর মানে হলো হাতেনাতে ধরা পড়া। লাল হাতে ধরা পড়া না। তুমি যদি এটা পাবলিশ করো, পাঠকরা ভাববে ক্যালিফোর্নিয়ার ডাকাতরা হাতে মেহেদি বা আলতা দিয়ে ডাকাতি করতে যায়।"

মামুন একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাসল। "ও আচ্ছা! ঠিক আছে ভাই, চেঞ্জ করে দিচ্ছি। আপনি না থাকলে যে আমার কী হতো!"
"আমার কিছু হতো না, তবে ঢাকা পেপারসের পাঠকদের ইংরেজি জ্ঞান সম্পর্কে অদ্ভুত একটা ধারণা তৈরি হতো।" আমি বলে নিজের ল্যাপটপ অন করলাম।

দুপুরের দিকে এহসান ভাই আমাদের ডেস্কে এলেন। তার হাতে একটা কফির মগ।
"রাশেদ, আজকে তো তুমি একটু আগে বের হবে, তাই না?"
আমি ল্যাপটপ থেকে মুখ তুলে বললাম, "জি ভাই।"
"হ্যাঁ, মনে আছে। যাওয়ার আগে ইউরোপের ওই নিউজটা একটু দেখে দিয়ে যেও। আর শোনো, ওই যে কবিতার বই নিয়ে কথা বলতে যাচ্ছ... বই পড়েছ তো ঠিকমতো? নাকি শুধু ফ্ল্যাপ পড়েই স্টেজে উঠে যাবে?"

আমি হাসলাম। "প্রুফ দেখার সময় পুরো বই-ই পড়তে হয়েছে ভাই। চিন্তা করবেন না, মান-সম্মান ডুববে না।"
"বেস্ট অফ লাক,"
বলে এহসান ভাই চলে গেলেন। এহসান ভাই যেতেই মামুন ফিসফিস করে বলল, "রাশেদ ভাই, কাহিনী কী?"
"কীসের কাহিনী?"
"এই যে আপনি কবিতা-টবিতা নিয়ে কথা বলতে যাচ্ছেন। প্রেম-ট্রেম নাকি?"
আমি হাসলাম। "প্রেম হবে কার সাথে? বইয়ের কাগজের সাথে?"

মামুন চোখ ছোট করে বলল, "কাগজের সাথে না। নিশ্চয়ই কোনো মহিলা কবি। আমি খেয়াল করেছি, পুরুষ কবিদের অনুষ্ঠানে কেউ আগে ছুটি নিয়ে যায় না। মহিলা কবিদের ব্যাপার আলাদা। তা কবির বয়স কত?"
আমি মামুনের দিকে তাকিয়ে বললাম, "ছত্রিশ। ইংল্যান্ডে থাকেন।"
মামুন একটু হতাশ হলো বলে মনে হলো। "ছত্রিশ? তাইলে তো খালাম্মা। খালাম্মাদের বইয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য আপনি নিউজ ফেলে যাচ্ছেন? আপনার লজিক তো আমি বুঝতেছি না ভাই।"

আমি ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখে বললাম, "মামুন, পৃথিবীতে সব কিছুর লজিক থাকে না। তুমি যেমন ‘He kicked the bucket’-এর অনুবাদ করো বালতিতে লাথি মারা, এটাও ঠিক সেরকম। এর কোনো লজিক নেই, কিন্তু ব্যাপারটা ঘটে।"
মামুন আর কথা বাড়াল না। সে তার রয়টার্সের নিউজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

বিকেল চারটার দিকে আমি অফিস থেকে বের হলাম।
কারওয়ান বাজার থেকে কাঁটাবনের দূরত্ব খুব বেশি না হলেও ঢাকা শহরের জ্যামে সেটা পাড়ি দেওয়া একটা ছোটখাটো যুদ্ধ। আমি একটা রিকশা নিলাম। রিকশাওয়ালা ষাট টাকা চাইল, আমি দরদাম করলাম না। আজ আমার ভেতরে এক ধরনের অদ্ভুত চাঞ্চল্য কাজ করছে। প্রতিদিনের একঘেয়ে রুটিনের বাইরে গিয়ে আজ আমি একটা সাহিত্য আড্ডায় কথা বলতে যাচ্ছি। যদিও আমি জানি, এসব আড্ডার বেশির ভাগ কথাই ফাঁকা আওয়াজ, তবুও একটু তো ভালো লাগেই।

কাঁটাবনে চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীর অফিসে যখন পৌঁছালাম, তখন সন্ধ্যা চারটা পয়তাল্লিশ বাজে।
অফিসের ভেতরটা বেশ জমজমাট। নতুন বইয়ের গন্ধ, সিউডোর (Sudo) আঠার গন্ধ আর চায়ের গন্ধ মিলেমিশে একটা অদ্ভুত সাহিত্যিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। মতিন সাহেব অত্যন্ত ব্যস্ত ভঙ্গিতে এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করছেন। তার পরনে একটা ইস্ত্রি করা পাঞ্জাবি। প্রকাশকরা সাধারণত খুব সাধারণ পোশাকে থাকেন, কিন্তু কোনো অনুষ্ঠান থাকলে তারা হঠাৎ করেই বুদ্ধিজীবীদের মতো পোশাক পরেন।

আমাকে দেখেই মতিন সাহেব এগিয়ে এলেন। "আরে রাশেদ ভাই! আসেন আসেন। আপনার জন্যই ওয়েট করছিলাম। অনুষ্ঠান তো একটু পরেই শুরু হয়ে যাবে।"
আমি বললাম, "বাকিরা কোথায়? লেখক এসেছেন?"

"হ্যাঁ, উনি তো সেই কখন এসে বসে আছেন। উনার তো ইংল্যান্ডের অভ্যাস, একদম টাইম ধরে চলে। আসেন, আপনাকে পরিচয় করিয়ে দিই।"

আমি মতিন সাহেবের পেছন পেছন প্রকাশনীর ভেতরের দিকের ছোট কেবিনটার দিকে এগোলাম। কেবিনের দরজা খোলা।
ভেতরে ঢুকতেই আমার চোখের দৃষ্টি কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল। আমার মনের ভেতরে খুব সূক্ষ্ম, কিন্তু স্পষ্ট একটা ধাক্কা লাগল। আমি সাধারণত খুব সহজে চমকাই না। ঢাকা শহরে থাকতে থাকতে এবং সারাদিন দুনিয়ার সব উদ্ভট খবর অনুবাদ করতে করতে আমার আবেগ-অনুভূতি বেশ ভোঁতা হয়ে গেছে। কিন্তু এই মুহূর্তে আমি সত্যিই চমকে গেলাম।

সোফায় যিনি বসে আছেন, তিনি আনিকা নাওহার।
বইয়ের ফ্ল্যাপে পড়েছিলাম উনার বয়স ছত্রিশ। কিন্তু এই মহিলাকে দেখে কোনোভাবেই ছত্রিশ মনে হচ্ছে না। ইংল্যান্ডের পরিষ্কার আবহাওয়া, দূষণমুক্ত পরিবেশ আর উন্নত জীবনযাপন সম্ভবত মানুষের বয়সকে একটা জায়গায় ফ্রিজ করে দেয়। আমাদের দেশের ছত্রিশ বছর বয়সী একজন সাধারণ গৃহিণীর চেহারায় যেখানে সংসারের ক্লান্তি আর বয়সের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে, সেখানে আনিকা নাওহারের চেহারায় এক অদ্ভুত উজ্জ্বলতা।

উনার পরনে একটা গাঢ় মেরুন রঙের সিল্কের শাড়ি। শাড়ি পরার ধরনে একটা দারুণ আভিজাত্য আছে, আবার একই সাথে আছে একটা সূক্ষ্ম অবহেলা। স্লিভলেস ব্লাউজের সাথে শাড়ির আঁচলটা কাঁধের ওপর দিয়ে খুব সুন্দরভাবে লুটিয়ে পড়েছে। আমার চোখ অনুবাদকের চোখ। খুঁটিনাটি খেয়াল করা আমার পেশাগত রোগ। আনিকা নাওহারের শারীরিক সৌন্দর্যের একটা অদ্ভুত আবেদন আছে, যা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

তাঁর গায়ের রঙ নিখুঁত ফর্সা, তবে ফ্যাকাশে নয়। চোখের দৃষ্টিতে একটা শান্ত, স্নিগ্ধ ভাব। কিন্তু সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে তাঁর শারীরিক গড়ন। যাকে ইংরেজিতে বলে পারফেক্ট ‘আওয়ারগ্লাস’ ফিগার। আমি মনে মনে একটা দ্রুত হিসাব কষলাম। আমার আন্দাজ খুব একটা ভুল হয় না। উনার ভাইটাল স্ট্যাটস সম্ভবত ৩৬-২৮-৩৬ এর আশেপাশে হবে। ভরাট এবং সুডৌল বক্ষদেশ, শাড়ির কুঁচির ফাঁক দিয়ে হালকা উঁকি দেওয়া মেদহীন ছিপছিপে কোমর আর আকর্ষণীয় নিতম্ব— সবকিছু মিলিয়ে ছত্রিশ বছরের একজন পূর্ণাঙ্গ নারীর যে শারীরিক আবেদন থাকতে পারে, সেটা তাঁর মাঝে শতভাগ, বরং তার চেয়েও বেশি উপস্থিত। অথচ এই পুরো আবেদনটার মধ্যে কোনো উগ্রতা নেই। আছে এক ধরনের পরিশীলিত মুগ্ধতা।

হালকা মেকআপ করেছেন তিনি। ঠোঁটে শাড়ির সাথে মিলিয়ে গাঢ় মেরুন রঙের লিপস্টিক। চুলগুলো খোঁপা করা, সেখান থেকে দু-এক গোছা অবাধ্য চুল ঘাড়ের কাছে এসে পড়েছে। পুরো রুমের বাতাসে একটা খুব দামি পারফিউমের গন্ধ ভাসছে। শ্যানেল বা ডিওর-এর কোনো একটা পারফিউম হবে হয়তো।



RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - Bad Boy - 09-21-2026

৩।

সবকিছু মিলিয়ে ছত্রিশ বছরের একজন পূর্ণাঙ্গ নারীর যে শারীরিক আবেদন থাকতে পারে, সেটা তাঁর মাঝে শতভাগ, বরং তার চেয়েও বেশি উপস্থিত। অথচ এই পুরো আবেদনটার মধ্যে কোনো উগ্রতা নেই। আছে এক ধরনের পরিশীলিত মুগ্ধতা। হালকা মেকআপ করেছেন তিনি। ঠোঁটে শাড়ির সাথে মিলিয়ে গাঢ় মেরুন রঙের লিপস্টিক। চুলগুলো খোঁপা করা, সেখান থেকে দু-এক গোছা অবাধ্য চুল ঘাড়ের কাছে এসে পড়েছে। পুরো রুমের বাতাসে একটা খুব দামি পারফিউমের গন্ধ ভাসছে। শ্যানেল বা ডিওর-এর কোনো একটা পারফিউম হবে হয়তো।

 
মতিন সাহেব গলা খাঁকারি দিলেন। "আনিকা আপা, এই যে আমাদের রাশেদ ভাই। রাশেদ আহমেদ। উনিই আপনার বইয়ের প্রুফ দেখেছেন। খুব মেধাবী ছেলে। ঢাকা পেপারসের ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কে আছেন, আবার আমাদের এখানেও সময় দেন।"

আনিকা নাওহার মুখ তুলে তাকালেন। উনার চোখের মণি দুটো হালকা বাদামি। উনি খুব মিষ্টি করে হাসলেন।

"ওহ, আপনিই রাশেদ সাহেব? আপনার কথা মতিন ভাইয়ের কাছে অনেক শুনেছি। থ্যাংক ইউ সো মাচ। আপনি খুব যত্ন করে আমার পাণ্ডুলিপির প্রুফ দেখেছেন। আমি দেখেছি, আপনি অনেকগুলো চমৎকার শব্দ ব্যবহার করে আমার কিছু লাইনের ইমপ্রুভমেন্টও করেছেন।"

উনার গলার স্বরটা খুব মোহনীয়। বাংলা উচ্চারণে সামান্যতম কোনো বিদেশি টান নেই। একদম নিখুঁত, প্রমিত বাংলা।

আমি একটু অপ্রস্তুত বোধ করলাম। আমার পকেটে পঁচিশ হাজার টাকার বাজেট, মেসে রাজুর বুরকিনা ফাসোর রাজধানী মুখস্থ করা আর অফিসে মামুনের বালতিতে লাথি মারা— এসবের মাঝখান থেকে উঠে এসে হঠাৎ করে এরকম একজন অপরূপা, সুশিক্ষিত এবং অভিজাত নারীর সামনে দাঁড়িয়ে থাকাটা একটু কেমন যেন পরাবাস্তব মনে হচ্ছিল।

আমি গলা পরিষ্কার করে বললাম, "ধন্যবাদ। আপনার কবিতাগুলো আসলে বেশ ভালো। প্রুফ দেখার সময় আমাকে খুব একটা কষ্ট করতে হয়নি। বানান ভুল প্রায় ছিলই না।"

আনিকা নাওহার আরেকটু হাসলেন। "আমি তো বছরে একবার আসি দেশে। বাংলা ভাষার চর্চাটা ওভাবে হয় না লন্ডনে। তাই একটু ভয়েই ছিলাম।"

মতিন সাহেব ঘড়ি দেখে বললেন, "চলুন আপা, বাইরে সবাই অপেক্ষা করছে। আমরা প্রোগ্রামটা শুরু করে দিই।"

প্রকাশনীর সামনের দিকের বড় রুমটায় তখন জনা বিশেক মানুষ জড়ো হয়েছেন। এদের মধ্যে কয়েকজন বয়স্ক কবি, কয়েকজন তরুণ সাহিত্যিক এবং কিছু পত্রিকা অফিসের সাহিত্য পাতার লোক।

সামনে একটা ছোট টেবিল রাখা। সেখানে আনিকা নাওহারের ‘মিথ্যা মুখোশ, সত্য মুখোশ’ বইয়ের কয়েকটা কপি সাজানো। আমাকে এবং আনিকা নাওহারকে পাশাপাশি দুটো চেয়ারে বসানো হলো। আমার গা ঘেঁষেই উনি বসেছেন। উনার পারফিউমের দামি সুবাসটা আমার স্নায়ুকে কিছুটা হলেও এলোমেলো করে দিচ্ছে।

অনুষ্ঠান শুরু হলো। মতিন সাহেব ছোট্ট একটা স্বাগত বক্তব্য দিলেন। এরপর একজন বয়স্ক কবি আনিকা নাওহারের সাহিত্যচর্চা নিয়ে বেশ কিছু ভারিক্কি কথা বললেন, যার অর্ধেকই আমি বুঝতে পারলাম না।

এরপর মতিন সাহেব আমার দিকে তাকালেন। "এবার আমাদের তরুণ অনুবাদক এবং প্রুফরিডার রাশেদ আহমেদ বইটির ওপর তার পাঠ প্রতিক্রিয়া জানাবেন।"

আমি আস্তে করে উঠে দাঁড়ালাম। আমি জানি, এই ধরনের জায়গায় কী বলতে হয়। আমি গলাটা একটু খাদে নামিয়ে, অত্যন্ত গম্ভীর মুখে বলতে শুরু করলাম।

"উপস্থিত সবাইকে শুভ সন্ধ্যা। আনিকা নাওহারের ‘মিথ্যা মুখোশ, সত্য মুখোশ’ বইটির পাণ্ডুলিপি পড়ার সুযোগ আমার হয়েছিল। আমরা যারা ঢাকা শহরে থাকি, আমাদের চারপাশের বাস্তবতা বড়ই রূঢ়। কিন্তু আনিকা নাওহার যখন সুদূর ইংল্যান্ডে বসে কবিতা লেখেন, তখন তার কবিতায় আমরা এক ধরনের প্রবাসকালীন বিচ্ছিন্নতাবোধ বা ডায়াসপোরা (Diaspora) দেখতে পাই। এই শূন্যতা শুধু ব্যক্তির নয়, এই শূন্যতা যেন পুরো আধুনিক সভ্যতার।"

আমি আড়চোখে আনিকা নাওহারের দিকে তাকালাম। উনি খুব মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনছেন। উনার চোখে একটা মুগ্ধতার আবেশ।

আমি চালিয়ে গেলাম, "উনার কবিতায় শব্দচয়ন খুব সহজ, কিন্তু তার ভেতরের অর্থ অনেক গভীর। যেমন একটা কবিতায় উনি বলেছেন, ‘আমি আয়নায় নিজেকে দেখি, কিন্তু ছায়াটা আমার নয়’। এই যে আত্মপরিচয়ের সংকট, আইডেন্টিটি ক্রাইসিস, এটাই উনার কবিতার মূল সুর। আমি মনে করি, এই বইটি আমাদের সমসাময়িক বাংলা কবিতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হয়ে থাকবে।"

আমি বক্তব্য শেষ করে বসলাম। সবাই হাততালি দিল। আনিকা নাওহার আমার দিকে সামান্য ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বললেন, "অসাধারণ বলেছেন আপনি। আমার নিজের কবিতায় যে এত গভীরতা আছে, সেটা আমি নিজেও জানতাম না।"

উনার বলার ভঙ্গিতে একটা সূক্ষ্ম হিউমার ছিল। আমি বুঝতে পারলাম, এই নারী শুধু সুন্দরীই নন, যথেষ্ট বুদ্ধিমতী এবং রসিকও। আমি মৃদু হেসে বললাম, "সমালোচকদের কাজই হলো লেখকের না-জানা কথাগুলো বানিয়ে বানিয়ে বলা।"

আনিকা নাওহার এবার শব্দ করে হেসে উঠলেন।

আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন শেষ হলো। বইয়ের ফিতা কাটা হলো। এরপর শুরু হলো চা-চক্র। সিউডোর আঠা আর বইয়ের গন্ধের সাথে এবার সিঙারা আর চায়ের গন্ধ যোগ হলো। সবাই আনিকা নাওহারকে ঘিরে ধরেছে অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য।

আমি ভিড় থেকে একটু দূরে, একটা বুকশেলফে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিলাম আর সিঙারায় কামড় দিচ্ছিলাম। আমার কাজ শেষ। এখন আমার মেসের দিকে রওনা হওয়ার কথা।

হঠাৎ দেখলাম আনিকা নাওহার ভিড় ঠেলে আমার দিকেই এগিয়ে আসছেন। উনার হাতে উনার বইয়ের একটা কপি। শাড়ির আঁচলটা আলতো করে এক হাতে ধরা। হাঁটার সময় উনার শরীরের নিখুঁত ঢেউগুলো খুব সুন্দর একটা ছন্দের সৃষ্টি করছে।

উনার দিকে তাকিয়ে আমার মিরপুরের মেসের কথা মনে পড়ল। এই মহিলার সাথে আমার কোনোভাবেই কোনো সংযোগ হতে পারে না। আমরা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই গ্রহের বাসিন্দা।

উনি আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। "রাশেদ সাহেব, আপনি পালিয়ে যাচ্ছেন না তো?"

আমি সিঙারার শেষ অংশটুকু গিলে বললাম, "পালিয়ে যাব কেন? আমার কাজ তো শেষ। চা খাচ্ছিলাম।"

উনি বইটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। "এটা আপনার জন্য। আমি অটোগ্রাফ দিয়েছি। যদিও আপনি প্রুফ দেখার সময় পুরোটা পড়েছেন, তবুও লেখকের নিজের হাতের একটা কপি আপনার কাছে থাকা উচিত।"

আমি বইটা নিলাম। প্রথম পাতায় খুব সুন্দর পেঁচানো অক্ষরে লেখা— ‘রাশেদ আহমেদকে, যিনি আমার কবিতার ভেতরের শূন্যতাটুকু এত সুন্দর করে ধরতে পেরেছেন। শুভকামনা— আনিকা নাওহার।’

আমি বললাম, "অনেক ধন্যবাদ। বইটা আমি সযত্নে রাখব।"

"আমি আসলে আপনার সাথে একটু কথা বলতে চাইছিলাম," আনিকা একটু ইতস্তত করে বললেন।

"বলুন।"

"আমি আমার পরের বইয়ের কাজ শুরু করেছি। একটা উপন্যাস।"

"খুব ভালো কথা।"

"আমি চাই, আমার ওই উপন্যাসের পাণ্ডুলিপিটাও আপনি এডিট করে দিন। মানে, প্রুফ দেখা আর ভাষাটা একটু ঠিকঠাক করে দেওয়া। আমি মতিন ভাইকে বলেছিলাম, কিন্তু উনি বললেন আপনি নাকি খুব ব্যস্ত থাকেন। তাই সরাসরি আপনাকে বলা।"

আমি একটু অবাক হলাম। আমার মতো একজন সাধারণ অনুবাদকের কাছে একজন লন্ডনপ্রবাসী সুন্দরী লেখিকা সরাসরি কাজ চাইছেন।

আমি বললাম, "ব্যস্ত থাকি ঠিকই, তবে সময় বের করা যাবে। আপনি পাণ্ডুলিপি পাঠালে আমি দেখে দেব।"

"দ্যাটস গ্রেট!" আনিকার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। "আমি কি আপনার ফোন নাম্বারটা পেতে পারি? মানে, আমি তো হোয়াটসঅ্যাপেই স্ক্রিপ্ট পাঠাব। আপনার সাথে যোগাযোগ রাখতে সুবিধা হবে।"

একজন অপরূপা নারী নিজে থেকে ফোন নাম্বার চাইছে, আর আমি ঢাকা শহরের একজন সামান্য ব্যাচেলর মানুষ হয়ে সেটা দেব না— এমন বোকা আমি নই।

আমি বললাম, "অবশ্যই।"

আমি আমার নাম্বারটা বললাম। আনিকা নিজের আইফোন বের করে নাম্বারটা সেভ করে নিলেন।

"আমি আপনাকে একটা মিসড কল দিয়ে রাখছি। আমার নাম্বারটা সেভ করে নিয়েন। আনিকা নামে।"

আমার পুরনো শাওমি ফোনটা বেজে উঠল। আমি স্ক্রিনে দেখলাম একটা আননোন নাম্বার।

"পেয়েছি," আমি বললাম।

"ওকে রাশেদ। আমি পাণ্ডুলিপি রেডি করে আপনাকে হোয়াটসঅ্যাপে নক করব। আর হ্যাঁ, আপনার আজকের স্পিচটা সত্যিই খুব দারুণ ছিল।"

আনিকা নাওহার আবার ভিড়ের ভেতর হারিয়ে গেলেন। আমি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার হাতের তালুতে উনার দেওয়া বইটার স্পর্শ। বাতাসে তখনো উনার পারফিউমের হালকা সুবাস লেগে আছে। ৩৬-২৮-৩৬ এর এক অদ্ভুত রহস্যময়ী নারী, যিনি ইংল্যান্ডে আইটি ফার্ম চালান, আবার বাংলায় শূন্যতার কবিতা লেখেন।

আমি প্রকাশনীর অফিস থেকে বেরিয়ে রাস্তায় এলাম। রাত আটটা বাজে। কাঁটাবনের রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টের আলোয় সবকিছু একটু ঘোলাটে লাগছে।
আমি পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলাম। কল হিস্ট্রিতে গিয়ে সর্বশেষ নাম্বারটা সেভ করলাম। ‘Anika Nawhar’.

নামটা সেভ করার সময় আমার মনের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো। আমার একঘেয়ে, রুটিনবাঁধা জীবনে, যেখানে কিম জং উনের মিসাইল, নিহাদের বাইকের ক্ষতিপূরণ আর মেসের বাথরুমের লাইন ছাড়া আর কিছু ছিল না— সেখানে হঠাৎ করে একটা খুব দামি পারফিউম মাখা, মেরুন শাড়ি পরা আভিজাত্য এসে উঁকি দিয়েছে।

আমি একটা সিগারেট ধরালাম। ধোঁয়া ছেড়ে আকাশের দিকে তাকালাম। ঢাকা শহরের আকাশে তারা দেখা যায় না। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে, ধোঁয়ার আড়ালে কোথাও হয়তো দু-একটা তারা জ্বলজ্বল করছে।

 
মানুষ হিসেবে আমি অত্যন্ত বিরক্তিকর। কথাটা আমি কোনো বিনয় দেখানোর জন্য বলছি না। আমি আসলেই বিরক্তিকর একজন মানুষ। আমার জীবনে কোনো নাটকীয়তা নেই, কোনো গভীর ট্র্যাজেডি নেই, এমনকি উল্লেখ করার মতো কোনো রোমাঞ্চও নেই। একটা সিনেমার স্ক্রিপ্ট হিসেবে আমার জীবন নিয়ে যদি কোনো পরিচালক সিনেমা বানাতে চান, তবে সেই সিনেমার প্রথম দশ মিনিটেই দর্শকরা ঘুমিয়ে পড়বে এবং পরিচালককে টিকিটের টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য হলের বাইরে বিক্ষোভ হবে।

আমার প্রতিদিনের রুটিন একটা ফটোকপি মেশিনের মতো। সকালে উঠি, রহিমা খালার রান্না করা আগের রাতের বাসি তরকারি দিয়ে দুটা রুটি খাই, মিরপুর দশ নাম্বার থেকে কনুই চালিয়ে বিকল্প বাসে উঠি, কারওয়ান বাজারে অফিসে যাই, ল্যাপটপের সামনে বসে দুনিয়ার তাবৎ খবর বাংলায় অনুবাদ করি, তারপর আবার বাসের হাতল ধরে ঝুলে ঝুলে মেসে ফিরে আসি। এর মধ্যে কোনো থ্রিল নেই।

আমি ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কে বসে প্রতিদিন দেখি পৃথিবীতে কত কী ঘটে যাচ্ছে! ফ্রান্সে দাঙ্গা হচ্ছে, মেক্সিকোতে মাফিয়ারা পুলিশের সাথে গুলি বিনিময় করছে, জাপানে ভূমিকম্প হচ্ছে, আমেরিকায় কোনো এক সিরিয়াল কিলার ধরা পড়ছে। এই পুরো পৃথিবীটা একটা বিশাল অ্যাকশন মুভি। আর সেই মুভির এক কোণায়, মিরপুরের একটা স্যাঁতস্যাঁতে মেসের বাসিন্দা রাশেদ আহমেদ অত্যন্ত শান্তিতে তার একঘেয়ে, বিরক্তিকর জীবন পার করছে।

আমার এই একঘেয়ে জীবন নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপ নেই। বরং আমি এটাই পছন্দ করি। আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি একটা শামুকের মতো। নিজের খোলসের ভেতর গুটিসুটি মেরে পড়ে থাকতেই আমার সবচেয়ে বেশি আরাম লাগে। খোলস থেকে মাথা বের করলেই বাইরের পৃথিবীর রোদে আমার চোখ ধাঁধিয়ে যায়।

ঢাকা শহরে আমার চেনাজানার পরিধি নেহাত ছোট না। সাংবাদিকতার সাথে (পড়ুন, অনুবাদের সাথে) যুক্ত থাকার কারণে, আর চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীতে যাতায়াতের সুবাদে আমার ফোনবুকে কয়েকশ মানুষের নাম্বার সেভ করা আছে। রাস্তাঘাটে বের হলে অনেকেই হাত তুলে বলে, ‘কী অবস্থা রাশেদ ভাই?’ আমিও দাঁত বের করে হাসি, বলি, ‘এই তো ভাই, চলছে। আপনার খবর কী?’

কিন্তু এই ‘চেনাজানা’ মানুষগুলোর মধ্যে আমার একজনও ‘বন্ধু’ নেই।

বন্ধু বলতে আমি সেই মানুষটাকে বুঝি, যাকে রাত তিনটার সময় ফোন করে বলা যায়, ‘দোস্ত, আমার খুব মন খারাপ, তুই আয়।’ আমার ফোনবুকে এমন কোনো নাম্বার নেই। আর সত্যি কথা বলতে কী, আমার কখনো কাউকে রাত তিনটায় ফোন করার প্রয়োজনও পড়ে না। আমার মন খারাপ হলে আমি কাউকে ডাকি না। আমি চুপচাপ বারান্দায় ইজি চেয়ারটায় বসে একটা সিগারেট ধরাই। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে আকাশের দিকে তাকাই। ঢাকা শহরের আকাশে তারা দেখা যায় না, কিন্তু আমি মনে মনে কয়েকটা তারা বসিয়ে নিই। আমার কাছে নিজের সঙ্গটাই সবচেয়ে নিরাপদ মনে হয়।

মানুষের সঙ্গ আমার খুব একটা পছন্দ না। আমি গভীর সম্পর্ক ভয় পাই। গভীর সম্পর্ক মানেই হলো দায়িত্ব, প্রত্যাশা আর দিন শেষে একগাদা অভিমান। আমি হালকা কথাবার্তাতেই সবচেয়ে বেশি খুশি। ওই যে, রাস্তায় দেখা হলে ‘কেমন আছেন’, ‘দিনকাল কেমন যাচ্ছে’, ‘বাসায় সব ভালো তো’— এই ধরনের কথা। এই কথাগুলোর কোনো ওজন নেই। এগুলো বাতাসের মতো। বললাম, আর মিলিয়ে গেল। কেউ কারো কাছে কোনো জবাবদিহিতার মধ্যে থাকল না।

আজ অফিসে এসে ল্যাপটপ খুলেই আমি একটা অদ্ভুত খবর পেলাম। রয়টার্সের নিউজ। জাপানের টোকিও শহরে এক লোক নিজেকে ভাড়া দেয়। তার কাজ হলো, যাদের বন্ধু নেই বা যারা একা, তাদের সাথে সময় কাটানো। সে কোনো কথা বলে না, কোনো উপদেশ দেয় না। শুধু চুপচাপ পাশে বসে থাকে। ক্লায়েন্ট চাইলে সে তার সাথে কফি খায় বা পার্কে হাঁটে। এর বিনিময়ে সে প্রতি ঘণ্টায় দশ হাজার ইয়েন চার্জ করে।

খবরটা অনুবাদ করতে করতে আমার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। আমি মনে মনে ভাবলাম, লোকটার পেশাটা তো দারুণ! আমার চরিত্রের সাথে একদম মানিয়ে যায়। আমিও তো চুপচাপ থাকতে পছন্দ করি। টোকিওতে থাকলে হয়তো আমিও ভালো একটা ব্যবসা করতে পারতাম।

আমার পাশের ডেস্কে মামুন বসে আছে। সেও একটা নিউজ নিয়ে খুব গম্ভীর।

আমি বললাম, "মামুন, কী নিউজ করছ?"

মামুন চোখ না তুলেই বলল, "ভাই, ফ্লোরিডায় এক লোক তার পোষা কুমিরের সাথে বিয়ে করেছে। কুমিরের নাম ডেইজি। লোকটা কুমিরটাকে ওয়েডিং গাউন পরিয়ে চার্চে নিয়ে গেছে।"

"খুবই ভালো খবর। তা তুমি কি অনুবাদ করছ?"

মামুন গর্বের সাথে বলল, "আমি হেডলাইন দিয়েছি— 'ফ্লোরিডায় কুমিরের গলায় বরমাল্য, ভালোবাসার জয়'।"

আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, "মামুন, কুমিরের গলায় বরমাল্য দিলে কুমির যদি বরের মাথা কামড়ে ধরে, তখন ভালোবাসার জয়টা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? তুমি হেডলাইন দাও— 'পোষা কুমিরকে বিয়ে এক ব্যক্তির'।"

মামুন একটু হতাশ হলো। "ভাই, আপনার নিউজে কোনো ইমোশন নাই। আপনি একদম শুকনা মানুষ। সব কিছুতেই আপনি এত ফ্যাক্ট খোঁজেন কেন?"

মামুনের কথা খুব একটা ভুল না। আমি আসলেই শুকনা মানুষ। আমার ভেতরে ইমোশনের পরিমাণ খুবই কম।

আমাদের অফিসে বেশ কয়েকজন নারী, তরুণী এবং মেয়ে কলিগ আছেন। একটা পত্রিকা অফিসে সব ধরনের মানুষই থাকে। এন্টারটেইনমেন্ট ডেস্কে আছে নিতি। মেয়েটা সারাদিন বলিউড আর হলিউডের গসিপ নিয়ে পড়ে থাকে। তার ঠোঁটে সবসময় কড়া লাল লিপস্টিক থাকে আর চোখে থাকে রাজ্যের কৌতূহল। সে মাঝে মাঝে আমার ডেস্কে এসে দাঁড়ায়।

"রাশেদ ভাই, আপনার কাছে কি টাইপ-সি চার্জার হবে?" নিতি চুইংগাম চিবাতে চিবাতে জিজ্ঞেস করে।

আমি ড্রয়ার থেকে চার্জারটা বের করে দিই।

"থ্যাংক ইউ ভাই! জানেন, আজকে দীপিকা পাড়ুকোনের একটা ইন্টারভিউ পড়লাম। মেয়েটা যা না স্মার্ট! আপনার দীপিকাকে কেমন লাগে?"

আমি খুব নিরাসক্ত গলায় বলি, "ভালো।"

"শুধু ভালো? আরে, শি ইজ আ গডেস! আপনি এমন কেন ভাই? কোনো কিছু নিয়েই আপনার কোনো এক্সাইটমেন্ট নাই।"

নিতি চার্জার নিয়ে চলে যায়। আমি আবার আমার কাজে মন দিই।

ন্যাশনাল ডেস্কে আছেন ফারহানা আপা। উনার বিয়ে হয়েছে বছর তিনেক আগে। উনার দুনিয়া উনার স্বামীকে ঘিরে। উনি মাঝে মাঝে টিফিন বক্সে করে বাসা থেকে খাবার নিয়ে আসেন। খাওয়ার সময় আমাকে ডাকেন।

"রাশেদ, এদিকে আসো। আজ তোমার ভাইয়ার পছন্দের খমাংসের ভুনা এনেছি। খেয়ে দেখো তো কেমন হয়েছে।"

আমি এক টুকরো মাংস মুখে দিয়ে বলি, "খুব ভালো হয়েছে আপা।"

"তোমার ভাইয়া তো এক বসায় চার পিস মাংস খেয়ে ফেলে। সে আবার একটু ঝাল বেশি পছন্দ করে।"

আমি মাথা নাড়ি। ফারহানা আপার স্বামীর ঝাল খাওয়ার ক্ষমতা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই, কিন্তু আমি সেটা প্রকাশ করি না। আমি হালকা হাসিমুখে উনার কথা শুনি।

এই যে নিতি বা ফারহানা আপা— এদের সবার সাথেই আমার সম্পর্ক এই পর্যন্তই। অফিসে দেখা হলে হাসি বিনিময় করা, কেউ কিছু খেতে দিলে খাওয়া, আর ফেসবুকের কল্যাণে কারো জন্মদিন হলে টাইমলাইনে গিয়ে একটা দায়সারা ‘হ্যাপি বার্থডে! মেনি হ্যাপি রিটার্নস অফ দ্য ডে’ লিখে দেওয়া। এর জবাবে তারা আমাকে লেখে, ‘থ্যাংক ইউ রাশেদ ভাই’। ব্যস, সম্পর্ক শেষ। পরের বছর জন্মদিনের আগ পর্যন্ত এই সম্পর্কের আর কোনো অগ্রগতি হয় না।

আমার জীবন এভাবেই খুব মসৃণভাবে, কোনো ঢেউ ছাড়া গড়িয়ে যাচ্ছে।কিন্তু সম্প্রতি এই মসৃণ জীবনে একটা ছোটখাটো ঢেউ তোলার চেষ্টা করছেন আমার মা। মা ইদানীং ফোনে কথা বলার সময় কথায় কথায় বিয়ের প্রসঙ্গ টানছেন। সরাসরি কিছু বলেন না, আকার-ইঙ্গিতে বোঝানোর চেষ্টা করেন।

আজ দুপুরে খাওয়ার পর পরই মায়ের ফোন। আমি তখন অফিসের লাউঞ্জে বসে চা খাচ্ছিলাম।

"হ্যালো মা, বলো।"

"রাশেদ, খেয়েছিস?" মায়ের গলার স্বর খুব নরম। এই নরম স্বরের মানেই হলো সামনে কোনো কঠিন কথা আসছে।

"হ্যাঁ মা, এইমাত্র খেলাম। তুমি খেয়েছ?"

"আমি আর কী খাব! বয়স হচ্ছে, শরীরে নানান রোগবালাই বাসা বাঁধছে। আজ সকালে তোর ছোট ফুপুর সাথে কথা হলো।"

"ফুপুর কী অবস্থা?"

"ফুপুর অবস্থা তো ভালো। ফুপাতো ভাই সুমনের তো ছেলে হলো কালকে। ফুটফুটে একটা বাচ্চা। সুমন তো তোর চেয়ে দুই বছরের ছোট। সে এখন সন্তানের বাবা হয়ে গেল।"

আমি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলাম। "খুব ভালো খবর। সুমনকে আমার হয়ে কংগ্র্যাচুলেট করো। আমি পরে ওকে ফোন দিয়ে দেব।"

মা এবার মোক্ষম চালটা চাললেন। "সুমনের ছেলে হয়েছে, আর তুই এখনো মিরপুরের মেসে পড়ে আছিস। তোর তো এখন বয়স কম হলো না। উনত্রিশ পার হয়ে যাচ্ছে। আর কতদিন এভাবে একা একা থাকবি? এবার তো একটা সংসার করা দরকার।"

আমি শান্ত গলায় বললাম, "মা, সংসার করার জন্য যে যোগ্যতা লাগে, সেটা আমার এখনো হয়নি।"

মা রেগে গেলেন। "কীসের যোগ্যতা? তোর কি হাত-পা নেই? তুই কি চাকরি করিস না? মাসে পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা বেতন পাস। ঢাকা শহরে একটা স্বামী-স্ত্রী চলার জন্য এই টাকা যথেষ্ট।"

"মা, সংসারের যোগ্যতা মানে শুধু টাকা না। সংসারের যোগ্যতা হলো ম্যাচুরিটি। মানসিক পরিপক্বতা। আমার মনে হয় না আমার সেই ম্যাচুরিটি এখনো এসেছে।"

"এসব তুই বইয়ের ভাষায় কথা বলছিস। বিয়ে করলে সব ম্যাচুরিটি এমনিতেই চলে আসবে। মানুষ কি শিখে তারপর বিয়ে করে? বিয়ে করার পর শেখে।"

"মা, এটা তো কোনো ড্রাইভিং কলেজ না যে রাস্তায় গাড়ি নামিয়ে তারপর ধাক্কা খেতে খেতে চালানো শিখব। এটা আরেকজন মানুষের জীবনের ব্যাপার। আপাতত আমি এসব নিয়ে ভাবছি না।"

মা একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "তুই বুঝবি না। আমরা মরে গেলে যখন দুনিয়ায় তোর আপন বলতে কেউ থাকবে না, তখন বুঝবি একা থাকার কী কষ্ট।"

মায়েরা এই একটা জায়গায় এসে খুব সুন্দর ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করতে পারেন। আমি আর কথা বাড়ালাম না। মাকে শান্ত করে ফোনটা কেটে দিলাম।

ফোন কেটে আমি লাউঞ্জের কাঁচের জানালা দিয়ে বাইরের কারওয়ান বাজারের ব্যস্ত রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।



RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - Bad Boy - 09-21-2026

৪

মায়ের কথাটা আমি একদম উড়িয়ে দিতে পারিনা। সমাজে থাকতে গেলে বিয়ে-শাদি নিশ্চয়ই করতে হবে। আমাদের সমাজ ব্যবস্থাটাই এমনভাবে তৈরি যে, আপনি সারাজীবন একা থাকতে পারবেন না। একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর আপনি যদি একা থাকেন, সমাজ আপনাকে বাঁকা চোখে দেখতে শুরু করবে। লোকে ভাববে আপনার চরিত্রে কোনো সমস্যা আছে, অথবা আপনার শারীরিক কোনো অক্ষমতা আছে। সমাজ চায় সবাই একটা ছাঁচে ঢালা জীবন পার করুক। পড়াশোনা, চাকরি, বিয়ে, বাচ্চা, রিটায়ারমেন্ট এবং মৃত্যু। এর বাইরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই।

আমি জানি, আমাকেও কোনো একদিন এই সিস্টেমের কাছে মাথা নত করতে হবে। কোনো একদিন আমাকেও একটা বিয়ের পিঁড়িতে গিয়ে বসতে হবে। কিন্তু আপাতত না। আমি এখনো নিজের সাথে জীবন কাটানোটা উপভোগ করছি।


তবে একটা মানুষের সাথে জীবন শেয়ার করা মানে কী?

এর মানে হলো, আপনার একান্ত ব্যক্তিগত শূন্যতাটুকু অন্য একজনকে ভাগ করে দেওয়া। আপনার বাথরুম, আপনার বিছানা, আপনার পড়ার টেবিল— সবকিছুতে অন্য একজনের অস্তিত্ব মেনে নেওয়া। আমি কি এর জন্য প্রস্তুত?

আমার মনে হয়, আমি এখনো ভেতর থেকে একটা অপরিণত বালক হয়ে আছি। যে বালক প্রতিদিন সকালে উঠে অফিসে আসে, গম্ভীর মুখে কি-বোর্ডে আঙুল চালিয়ে বিশ্বের বড় বড় খবর অনুবাদ করে, কিন্তু দিন শেষে সে চায় কেউ তাকে বিরক্ত না করুক। সে চায় নিজের একটা জগৎ, যেখানে সে একা।

অফিসে আমার নারী কলিগদের দিকে তাকালে আমার কখনোই মনে হয়নি, এদের কারো সাথে জীবন শেয়ার করা যায়। নিতি, ফারহানা আপা বা অন্য যারা আছেন— তারা সবাই ভালো মানুষ। কিন্তু তাদের সাথে জীবন কাটানোর কথা ভাবলে আমার কেন যেন দমবন্ধ লাগে। আমার মনে হয়, এদের সাথে বিয়ে হলে আমাকে সারাজীবন শাহরুখ খানের সিনেমার রিভিউ শুনতে হবে, অথবা গরুর মাংসের ভুনার রেসিপি নিয়ে আলোচনা করতে হবে।

এই যে ‘ম্যাচুরিটি’ বা পরিপক্বতার কথা আমি মাকে বললাম, এই জিনিসটা আসলে কী? হঠাৎ করে আমার চোখের সামনে আনিকা নাওহারের মুখটা ভেসে উঠল।

গত মঙ্গলবার চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীর সেই ছোট্ট কেবিনটায় আমি যে নারীটিকে দেখেছিলাম। ছত্রিশ বছর বয়সী এক পরিপূর্ণ নারী। উনার দিকে তাকিয়ে আমার একবারের জন্যও মনে হয়নি যে উনি কোনো অপরিণত বা অগভীর মানুষ। উনার বসার ভঙ্গি, উনার শাড়ির আঁচল টেনে নেওয়ার ধরন, এমনকি উনার চোখের শান্ত দৃষ্টি— সবকিছুর মধ্যে একটা দারুণ আভিজাত্য এবং মানসিক পরিপক্বতা ছিল।

আমি মনে মনে একটা অদ্ভুত হিসাব মেলাতে শুরু করলাম। আমি যদি কখনো বিয়ে করি, তবে আমার এমন কাউকেই দরকার। যার সাথে কথা বলার জন্য আমাকে শাহরুখ খানের সাহায্য নিতে হবে না। যার সাথে আমি চুপচাপ বসে থাকলেও মনে হবে না যে আমি সময় নষ্ট করছি। আনিকা নাওহারের মতো রূপবতী, গুণবতী, আকর্ষণীয় এবং পরিণত (Mature) কাউকে যদি আমি বিয়ে করতে পারতাম, তবে বিষয়টা মন্দ হতো না।

উনার শারীরিক গঠন, ওই যে ৩৬-২৮-৩৬ এর নিখুঁত জ্যামিতি— সেটা শুধু একটা বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়। আমার মনে হয়, একজন নারীর শরীর যখন তার বয়সের সাথে সাথে পূর্ণতা পায়, তখন তার মনটাও পূর্ণতা পায়। আনিকা নাওহারের সেই পূর্ণতাটুকু আছে। উনার সাথে কথা বলার সময় মনে হচ্ছিল, আমি এমন একজনের সাথে কথা বলছি যে আমার প্রতিটি কথার ওজন বুঝতে পারছে। উনার পারফিউমের সেই হালকা শ্যানেল বা ডিওর-এর সুবাসটা আমার মাথার ভেতর এখনো মাঝেমধ্যে হানা দেয়।

আমি জানি, আনিকা নাওহারের মতো কাউকে বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব না। আর আনিকা নাওহারকে তো নয়ই। আমি জানি উনি বিবাহিতা। চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীর মতিন সাহেবের সাথে একদিন কথার ছলে জেনেছিলাম। মতিন সাহেব বলেছিলেন, "আনিকা আপার হাসব্যান্ড তো অনেক বড় ইঞ্জিনিয়ার। লন্ডনে উনাদের বিশাল বাড়ি। আপা তো শখে লেখালেখি করেন।"

সুতরাং আনিকা নাওহার আমার কাছে একটা সুন্দর স্বপ্নের মতো। একটা স্ট্যান্ডার্ড। যদি কখনো বিয়ে করতেই হয়, তবে আমি এমন কাউকেই খুঁজব, যার ভেতরে আনিকা নাওহারের মতো একটা স্থিরতা আছে। যে আমাকে আমার মতো থাকতে দেবে, আবার একই সাথে আমার একাকীত্বটাকে একটা সুন্দর সঙ্গ দিয়ে ভরিয়ে তুলবে।

আমি লাউঞ্জ থেকে উঠে আবার আমার ডেস্কে ফিরে এলাম। ল্যাপটপের স্ক্রিনে একটা নতুন নিউজ এসেছে। স্পেনের মাদ্রিদে এক লোক তার বাড়ির ছাদে একটা বিশাল টেলিস্কোপ বানিয়েছে, শুধু মঙ্গল গ্রহ দেখার জন্য। তার দাবি, মঙ্গল গ্রহে নাকি মানুষের চেয়েও উন্নত কোনো প্রাণী আছে।

আমি কি-বোর্ডে হাত রাখলাম। স্পেনের লোকটার মঙ্গল গ্রহের প্রতি এই আকর্ষণ দেখে আমার হাসি পেল। মানুষ নিজের পৃথিবীর মানুষদের সাথে ঠিকমতো যোগাযোগ করতে পারে না, অথচ কোটি কোটি মাইল দূরের মঙ্গল গ্রহের প্রাণীর সাথে যোগাযোগ করার জন্য টেলিস্কোপ বানিয়ে বসে আছে!আমি অনুবাদ করতে শুরু করলাম।

"স্পেনের মাদ্রিদ শহরের এক বাসিন্দা মহাকাশ গবেষণায় এক নতুন চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছেন..."

অফিস শেষ করে মেসে ফিরতে ফিরতে রাত আটটা বেজে গেল। আজ মেসে রহিমা খালা আসেননি। তুহিন আর রাজু মিলে ডিম ভাজি আর ডাল রান্না করেছে। আমি চুপচাপ তাদের সাথে খেতে বসলাম।

তুহিন খেতে খেতে বলল, "রাশেদ ভাই, আপনি তো নিউজ করেন। আপনি কি জানেন কানাডায় ইমিগ্রেশনের নতুন রুলস কী?"

আমি ভাতে ডাল মাখাতে মাখাতে বললাম, "তুহিন, আমি ইন্টারন্যাশনাল নিউজ অনুবাদ করি, ইমিগ্রেশন কনসালটেন্সি করি না। তুমি গুগলে সার্চ করলেই তো পারো।"

রাজু ডিমের কুসুমটা মুখে দিয়ে বলল, "রাশেদ ভাইয়ের তো কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই। উনি মিরপুরের মেসে বসে সারা জীবন কাটিয়ে দেবেন। তাই না ভাই?"

আমি হাসলাম। কোনো উত্তর দিলাম না। রাজু কথাটা খুব একটা ভুল বলেনি।আমার আসলেই কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই। আমি শুধু চাই, আমার সেভিংস অ্যাকাউন্টে তিন লাখ টাকা জমুক, বাবা-মা উমরাহ করে আসুক, আর আমি আমার এই শান্ত, বিরক্তিকর জীবনে প্রতিদিন সকালে উঠে এক কাপ চা খেয়ে অফিসে যাই।

খাওয়া শেষ করে আমি বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। মিরপুরের রাস্তায় তখনো প্রচুর গাড়ি। সিএনজির হর্ন আর বাসের ইঞ্জিনের শব্দে চারপাশ মুখরিত। আমি পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরালাম। সিগারেটের ধোঁয়াটা বাতাসের সাথে মিশে যাচ্ছে।

আকাশে আজ মেঘ নেই। দূর থেকে ঢাকা শহরের সোডিয়াম বাতিগুলোকে মনে হচ্ছে যেন পৃথিবীতে নেমে আসা এক ঝাঁক ক্লান্ত তারা। 



মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য কী? এই অতি গাম্ভীর্যপূর্ণ এবং দার্শনিক প্রশ্নটা সাধারণত মানুষের মাথায় আসে গভীর রাতে। যখন চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার থাকে, ঘরের ভেতর টিকটিকি পোকা ধরার জন্য ওত পেতে থাকে, আর মানুষের চোখে ঘুম থাকে না— ঠিক তখন। কিন্তু আমার মাথায় এই প্রশ্নটা এল সকালবেলা, মিরপুর দশ নাম্বারের গোলচত্বরে দাঁড়িয়ে ‘বিকল্প অটো’ বাসের জন্য অপেক্ষা করার সময়।

চারপাশের দিকে তাকালে জীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে বিভ্রান্ত হওয়াটা খুব স্বাভাবিক। আমার সামনে দিয়ে একটা লোক এক কাঁধে মুরগির খাঁচা আর অন্য কাঁধে সবজির বস্তা নিয়ে দৌড়াচ্ছে। তার জীবনের এই মুহূর্তের উদ্দেশ্য হলো কাওরান বাজারে গিয়ে এগুলো বিক্রি করা। একটু দূরে এক ট্রাফিক পুলিশ অত্যন্ত বিরক্ত মুখে হাত নেড়ে একটা রিকশাকে থামাচ্ছেন। তার জীবনের উদ্দেশ্য হলো এই জ্যাম কমানো, অথবা রিকশাওয়ালার কাছ থেকে বিশ টাকা জরিমানা আদায় করা।

কিন্তু সামগ্রিকভাবে, একটা মানুষের জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য কী? আমি বাস থেকে ধাক্কাধাক্কি করে ওঠার সময় এই বিষয়টা নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে শুরু করলাম। বাসে আজ বসার সিট পাইনি। একটা রডের হ্যান্ডেল ধরে বাদুড়ের মতো ঝুলে আছি। আমার ঠিক নিচে বসা এক ভদ্রলোক পত্রিকা পড়ছেন। পত্রিকার হেডলাইন— ‘শেয়ারবাজারে ধস, কোটিপতি থেকে রাস্তায়’।

আমি ভাবলাম, এই যে আমরা প্রতিদিন সকালে উঠে গাধার মতো খাটছি, মাস শেষে কিছু টাকা পাচ্ছি, আবার সেই টাকা দিয়ে চাল-ডাল কিনছি— এর শেষ কোথায়?

কেউ কেউ বলেন, মানুষের জীবনের সবচেয়ে মহৎ উদ্দেশ্য হলো নিজের বাবা-মাকে দেখে রাখা। কথাটা অবশ্যই খুব সুন্দর এবং পবিত্র। আমার নিজের জীবনের বর্তমান উদ্দেশ্যও অনেকটা সেরকমই। আমার সেভিংস অ্যাকাউন্টে তিন লাখ টাকা জমবে, আর আমি আমার বাবা-মাকে মক্কায় উমরাহ করতে পাঠাব। এটা ভেবে আমি এক ধরনের মানসিক শান্তি পাই।

কিন্তু আমি যদি লজিক দিয়ে চিন্তা করি, তাহলে এখানে একটা বড় ফাঁকি আছে। বাবা-মা তো আর অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন না। প্রকৃতির নিয়মেই তারা একদিন পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবেন। তখন কী হবে? তখন কি আমার জীবনের উদ্দেশ্য শেষ হয়ে যাবে? তখন আমি কী করব?

এই প্রশ্নের উত্তর সমাজ খুব সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে। সমাজ বলে, বাবা-মা চলে যাওয়ার পর তোমার জীবনের উদ্দেশ্য হবে তোমার নিজের সন্তানদের দেখে রাখা। তাদের বড় করা, পড়াশোনা করানো, মানুষের মতো মানুষ করা।

আমি বাসের হ্যান্ডেল ধরে দুলতে দুলতে ভাবলাম, এটা তো তাহলে একটা রিলে রেসের মতো হয়ে গেল! রিলে রেসে যেমন একজন দৌড়ে এসে আরেকজনের হাতে কাঠি ধরিয়ে দেয়, জীবনটাও ঠিক তাই। আমার বাবা-মা আমাকে বড় করেছেন, আমি আমার সন্তানদের বড় করব, তারা তাদের সন্তানদের বড় করবে। এটা একটা বায়োলজিক্যাল সাইকেল। এখানে মহত্ত্বের কিছু নেই। কুকুর-বিড়ালও তাদের বাচ্চাদের দেখে রাখে। তাহলে আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে মানুষের জীবনের বিশেষ উদ্দেশ্যটা কী দাঁড়াল?

কেউ কেউ বলেন, মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য হলো অন্যের উপকার করা, মানুষের সেবা করা। যেমন মাদার তেরেসা। এই লজিকটা শুনতেও খুব ভালো লাগে। কিন্তু বাস্তব জীবনে অন্যের উপকার করাটা খুব কঠিন কাজ। আমি নিজের মেসের মিলের টাকাই ঠিকমতো হিসাব করে কুলিয়ে উঠতে পারি না, আমি আবার কার উপকার করব? বাসে আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ঘর্মাক্ত লোকটার যদি এখন পকেটমার হয়ে যায়, আমি কি নিজের পকেট থেকে তাকে টাকা দেব? দেব না। আমি বড়জোর ‘আহারে, বেচারার পকেটটা গেল’ বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলব। এর বেশি কিছু না।

আবার আরেক দলের মানুষ আছেন, যারা ভাবেন জীবন হলো অ্যাডভেঞ্চার। তারা বলেন, ‘ইউ অনলি লিভ ওয়ানস’— ইয়োলো (YOLO)। জীবন মাত্র একবার। সুতরাং এই জীবনে প্রচুর টাকা কামাতে হবে, আইফেল টাওয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলতে হবে, সুইজারল্যান্ডে স্কাই-ডাইভিং করতে হবে।

আমি এই ‘অ্যাডভেঞ্চার’ দলের মানুষদের কথা ভেবে একটু হাসলাম। আমার অ্যাডভেঞ্চার শুরু হয় মিরপুরের মেস থেকে কারওয়ান বাজারের অফিসে যাওয়ার পথে। বিকল্প বাসের যে ঝাঁকুনি আর ড্রাইভারের যে ব্রেক কষার স্টাইল, তাতে সুইজারল্যান্ডের স্কাই-ডাইভিংয়ের চেয়ে কোনো অংশে কম থ্রিল পাওয়া যায় না। তাছাড়া, পঁচিশ হাজার টাকা বাজেটের ভেতর জীবন পার করা একজন অনুবাদকের কাছে অ্যাডভেঞ্চার মানে হলো মাসের পঁচিশ তারিখে পকেটে এক হাজার টাকা বেঁচে যাওয়া।

আমি একবার একটা ইংরেজি আর্টিকেলে পড়েছিলাম— 'টাইম ইজ আ ফ্ল্যাট সার্কেল'। মানুষের জীবন নাকি একটা সমতল বৃত্তের মতো। এই জীবনে আমরা যা করছি, তা আমরা বারবার করব। অনন্তকাল ধরে এই একই জিনিস ঘটতে থাকবে। আমি রাশেদ আহমেদ, একজন সাধারণ অনুবাদক, অনন্তকাল ধরে এই বিকল্প বাসে ঝুলতে ঝুলতে কারওয়ান বাজারে যাব। অনন্তকাল ধরে এহসান ভাই আমাকে তাড়া দেবেন, আর অনন্তকাল ধরে আমি কিম জং উনের মিসাইলের খবর বাংলায় অনুবাদ করব।

চিন্তাটা মাথায় আসতেই আমার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। অনন্তকাল ধরে একই কাজ করে যাওয়ার চেয়ে ভয়ংকর কোনো শাস্তি আর হতে পারে না। গ্রিক পুরাণের সিসিফাসের মতো, যে একটা পাথর পাহাড়ের চূড়ায় তোলে, আর সেটা আবার গড়িয়ে নিচে পড়ে যায়। আমার জীবনটাও কি একটা সিসিফাসের পাথর?

অফিসে যখন পৌঁছালাম, তখন সকাল দশটা বেজে দশ মিনিট। এহসান ভাই আজ একটু শান্ত আছেন। পৃথিবীর কোথাও হয়তো গতরাতে বড় ধরনের কোনো অঘটন ঘটেনি। আমি ডেস্কে গিয়ে ল্যাপটপ অন করলাম। আমার পাশের ডেস্কে মামুন বসে আছে। সে গভীর মনোযোগ দিয়ে একটা নিউজ পড়ছে।

"কী ব্যাপার মামুন? এত সিরিয়াস কেন?" আমি জিজ্ঞেস করলাম। মামুন আমার দিকে ফিরে তাকাল। তার চোখে এক ধরনের দার্শনিক দৃষ্টি। সে বলল, "রাশেদ ভাই, আপনি কি জানেন বিলিয়নিয়ার জেফ বেজোস তার স্ত্রীর সাথে ডিভোর্স দিয়ে নতুন একটা মেয়ের সাথে প্রেম করছে?"

আমি বললাম, "হ্যাঁ, জানি। পুরোনো খবর। তো এতে তোমার এত সিরিয়াস হওয়ার কী আছে? জেফ বেজোস কি তার সম্পত্তির কোনো অংশ তোমাকে লিখে দিচ্ছে?"

মামুন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "ভাই, সম্পত্তির কথা হচ্ছে না। আমি আসলে একটা জিনিস নিয়ে চিন্তা করছিলাম। এই যে মানুষ এত টাকা কামায়, এত ক্ষমতা অর্জন করে, এত বড় বড় কোম্পানি বানায়— এগুলোর আসল উদ্দেশ্য কী?"

আমি একটু নড়েচড়ে বসলাম। একটু আগে বাসে আমি ঠিক এই জিনিসটা নিয়েই ভাবছিলাম। আমি বললাম, "কী? তুমিই বলো।" মামুন খুব গম্ভীর গলায় বলল, "নারী। ভাই, মানুষের জীবনের, বিশেষ করে পুরুষ মানুষের জীবনের সব উদ্দেশ্য, ইচ্ছা, আগ্রহ— সব কিছুর মূলেই হলো নারী। আপনি পৃথিবীর ইতিহাস দেখেন। ট্রয়ের যুদ্ধ কেন হয়েছিল? হেলেনের জন্য। সম্রাট শাহজাহান তাজমহল কেন বানিয়েছিলেন? মমতাজের জন্য। একজন পুরুষ যখন প্রচুর টাকা কামাতে চায়, তখন সে আসলে কী চায়? সে চায় ওই টাকা দিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নারীটিকে নিজের করে পেতে। আল্টিমেটলি এত টাকা দিয়ে সে নারীকে জিততে চায়।"

আমি অবাক হয়ে মামুনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ছেলেটা মাঝে মাঝে ‘বালতিতে লাথি মারা’ টাইপ অনুবাদ করলেও, তার মাথার ভেতরে দেখি একটা আস্ত দার্শনিক বাস করছে।

মামুন বলতে থাকল, "ক্ষমতা হলেও একই কথা ভাই। একজন মন্ত্রী বা বড় নেতা যখন ক্ষমতা দেখায়, তখন সে আসলে অবচেতন মনে প্রমাণ করতে চায় যে সে কতটা শক্তিশালী। আর শক্তিশালী পুরুষের প্রতি নারীরা দুর্বল থাকে। আপনি যতই বলেন না কেন যে মানুষ নিজের শান্তির জন্য টাকা কামায়, আসলে তা না। নারীই হলো পুরুষের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য।"

মামুনের এই ‘সিরিয়াস ফিলোসফি’ শুনে আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। কথাটা কি আসলেই সত্যি? ফ্রয়েডীয় তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষের সমস্ত কাজের পেছনে নাকি অবদমিত যৌনাকাঙ্ক্ষা কাজ করে। মামুনের কথাটাও অনেকটা সেরকমই। একজন মানুষ সারাজীবন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে যখন একটা বিশাল অট্টালিকা বানায়, তখন সে আসলে চায় ওই অট্টালিকার বারান্দায় একজন সুন্দরী নারী এসে দাঁড়াক। ওই নারী তার সম্পদের প্রশংসা করুক। নারী ছাড়া পুরুষের সমস্ত অর্জন যেন অর্থহীন।

আমি নিজের জীবনের দিকে তাকালাম। আমার বয়স উনত্রিশ। নারী কখনোই আমার জীবনের মূল ফোকাস ছিল না। আমি মেয়েদের থেকে সচেতনভাবেই একটু দূরত্ব বজায় রেখে চলেছি। অফিসে নিতি বা ফারহানা আপার সাথে আমার কথা হয়, কিন্তু সেটা ওই ‘ভাই-বোন’ টাইপ সহকর্মীর সম্পর্ক। এর বাইরে কিছু না। রাস্তাঘাটে সুন্দরী মেয়ে দেখলে আমি হয়তো এক সেকেন্ডের জন্য তাকাই, কিন্তু পরক্ষণেই চোখ নামিয়ে নিই। আমার মনে হতো, আমার মতো একজন ম্যাড়ম্যাড়ে, বিরক্তিকর এবং স্বল্প আয়ের মানুষের জীবনে কোনো রোমান্টিক অ্যাঙ্গেল থাকতে পারে না।

আমি সবসময় ভেবে এসেছি, বিয়ে-শাদি আমি করব সমাজ রক্ষার জন্য। বাবা-মায়ের চাপে পড়ে। আমার নিজের ভেতরের কোনো তাগিদ থেকে নয়।
কিন্তু...

কিন্তু মামুনের কথাটা শোনার পর থেকে আমার মাথার ভেতর একটা মুখ বারবার ভেসে উঠতে লাগল। আনিকা নাওহার। গত মঙ্গলবার চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীর সেই ছোট কেবিনটায় আমি তাকে দেখেছিলাম। ছত্রিশ বছর বয়সী এক অপরূপ নারী। উনার সেই গাঢ় মেরুন শাড়ি, নিখুঁত ফর্সা ত্বক, আর একটা পারফেক্ট ‘আওয়ারগ্লাস’ ফিগার। ওই যে আমি মনে মনে হিসাব করেছিলাম— ৩৬-২৮-৩৬ এর এক অদ্ভুত জ্যামিতি।

আমি ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছি, কিন্তু আমার চোখের সামনে ভাসছে আনিকা নাওহারের সেই অবাধ্য চুলের গোছা, যেটা উনার ঘাড়ের কাছে এসে পড়েছিল। উনার দামি পারফিউমের গন্ধটা যেন এখনো আমার নাসারন্ধ্রে লেগে আছে।

আমি নিজেকে একটা প্রশ্ন করলাম। যদি মামুনের কথা সত্যি হয়, যদি মানুষের জীবনের আল্টিমেট উদ্দেশ্য একজন নারীই হয়— তাহলে সেই নারীটি কেমন হওয়া উচিত? নিতি বা ফারহানা আপার মতো কেউ? যার সাথে সারাজীবন পাশের বাসার ভাবির গসিপ আর গরুর মাংসের রেসিপি নিয়ে কথা বলতে হবে? নাকি আনিকা নাওহারের মতো কেউ?

আমি চোখ বন্ধ করে দৃশ্যটা কল্পনা করার চেষ্টা করলাম। আমি কাজ থেকে ফিরেছি। আমার ড্রয়িংরুমে একটা বুকশেলফ। সেখানে অনেক বই। আর সোফায় বসে আছেন আনিকা নাওহার। উনার হাতে একটা কফির মগ। উনি আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো চপলতা নেই, আছে এক ধরনের গভীর প্রশান্তি আর মানসিক পরিপক্বতা। উনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, "আজকের দিনটা কেমন কাটল আপনার?" আর আমি উনাকে বললাম, "আজকে অফিসে একটা ফরাসি দার্শনিকের খবর অনুবাদ করছিলাম..."

কল্পনাটা করতেই আমার বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠল। আমি চোখ খুলে ফেললাম। আমার মতো মানুষের জীবনে এরকম কল্পনা করাটাও এক ধরনের অপরাধ। আনিকা নাওহার একজন বিবাহিতা নারী। লন্ডনে উনার স্বামী আছেন, যিনি অনেক বড় ইঞ্জিনিয়ার। উনাদের বিশাল আইটি ফার্ম আছে। আনিকা নাওহার আমার থেকে যোজন যোজন দূরের এক নক্ষত্র। উনি শুধু শখে দেশে আসেন, বই বের করেন, আর আমার মতো অনুবাদকদের দিয়ে উনার বইয়ের শূন্যতা নিয়ে বক্তব্য দেওয়ান।

কিন্তু লজিক্যালি চিন্তা করলে, আনিকা নাওহারের এই উপস্থিতি আমার দর্শনে একটা বিশাল পরিবর্তন এনে দিয়েছে। আমি এতদিন ভাবতাম, আমি একা থাকতে পছন্দ করি। আমার নারীসঙ্গ পছন্দ না। কিন্তু আনিকাকে দেখার পর আমার মনে হচ্ছে, বিষয়টা আসলে তা নয়। আমার নারীসঙ্গ পছন্দ না, এটা ভুল। বরং, আমার ‘সাধারণ’ নারীসঙ্গ পছন্দ না। আমি আসলে খুঁজছিলাম এমন কাউকে, যার ভেতরে একটা গভীরতা আছে। যার শারীরিক সৌন্দর্য আমাকে আকর্ষণ করবে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আকর্ষণ করবে তার বুদ্ধিমত্তা, তার কথা বলার ভঙ্গি, তার আভিজাত্য।

যদি আনিকা নাওহারের মতো রূপবতী, গুণবতী, আকর্ষণীয় এবং পরিণত (Mature) একজন নারী জীবনের উদ্দেশ্য হয়, তবে সেই উদ্দেশ্যটা কিন্তু একেবারেই মন্দ হয় না। বরং, তেমন একজন নারীকে জয় করার জন্য, তার মনোযোগ পাওয়ার জন্য, আমি হয়তো জীবনের যেকোনো ফ্ল্যাট সার্কেল ভাঙতে রাজি আছি।

"ভাই, কী ভাবছেন এতক্ষণ ধরে?" মামুনের কথায় আমার ঘোর কাটল।

আমি গলা পরিষ্কার করে বললাম, "কিছু না। তোমার জেফ বেজোসের থিওরি নিয়েই ভাবছিলাম। কথাটা তুমি খুব একটা খারাপ বলোনি।" মামুন বিজয়ের হাসি হাসল। "আমি তো আপনাকে বলি ভাই, দুনিয়ার সব লজিক ফেল মারবে, কিন্তু আমার লজিক ফেল মারবে না। আপনি মিলিয়ে দেখেন।"

আমি আর কথা বাড়ালাম না। ল্যাপটপে নতুন একটা খবর এসেছে। ইতালির ভেনিস শহরে এক বৃদ্ধ দম্পতি তাদের বিয়ের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে আবার বিয়ে করেছেন। আমি খবরটা অনুবাদ করতে শুরু করলাম। কিন্তু আমার শব্দগুলোর ভেতরে কেমন যেন একটা নরম অনুভূতি কাজ করতে লাগল।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। অফিসের লাউঞ্জে বসে আমি একা চা খাচ্ছি। বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি নেমেছে। ঢাকা শহরে বৃষ্টি নামলে রাস্তার যে কী জঘন্য অবস্থা হয়, সেটা সবাই জানে। ড্রেনের পানি উপচে রাস্তা তলিয়ে যায়। রিকশাওয়ালারা ভাড়া ডাবল করে দেয়। কিন্তু লাউঞ্জের এই কাঁচের জানালা দিয়ে বৃষ্টি দেখতে মন্দ লাগে না।

হঠাৎ আমার প্যান্টের পকেটে মোবাইলটা ভাইব্রেট করে উঠল। আমি মোবাইলটা বের করলাম। হোয়াটসঅ্যাপের নোটিফিকেশন। আমি স্ক্রিন আনলক করলাম। মেসেজটা এসেছে 'Anika Nawhar' এর কাছ থেকে।আমার আঙুলগুলো একটু কাঁপল। আমি মেসেজটা ওপেন করলাম।

"Hi Rashed, this is Anika. Hope you are having a good day. আমি আমার নতুন উপন্যাসের প্রথম তিনটে চ্যাপ্টারের ড্রাফট রেডি করেছি। আপনাকে পাঠালাম। সময় করে একটু দেখে জানাবেন, ল্যাঙ্গুয়েজটা ঠিক আছে কি না। No rush. টেক ইওর টাইম।"

মেসেজের নিচে একটা পিডিএফ ফাইল অ্যাটাচ করা। আমি মেসেজটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম। এই মেসেজটার মধ্যে রোমান্টিক কিছু নেই। এটা সম্পূর্ণ একটা প্রফেশনাল মেসেজ। একজন লেখক তার প্রুফরিডারকে পাণ্ডুলিপি পাঠিয়েছেন। এর বেশি কিছু না।

কিন্তু আমার কেন যেন মনে হলো, এই মেসেজটা আমার সেই ‘ফ্ল্যাট সার্কেল’ জীবনের একঘেয়েমিতে একটা ছোট্ট ঢিল ছুঁড়ে মেরেছে। পুকুরের শান্ত জলে ঢিল পড়লে যেমন ছোট ছোট তরঙ্গ তৈরি হয়, আমার মাথার ভেতর এখন ঠিক তেমন কিছু তরঙ্গ তৈরি হচ্ছে।

আমি টাইপ করতে শুরু করলাম। "Hello Anika. Got the file. I will look into it tonight and let you know. Thanks."

মেসেজটা সেন্ড করে আমি মোবাইলটা টেবিলে রাখলাম। তারপর চায়ের কাপে একটা বড় চুমুক দিলাম। বাইরে বৃষ্টি আরও তীব্র হয়েছে। কারওয়ান বাজারের মোড়ে একটা বাস আটকে আছে। মানুষজন ছাতা মাথায় দিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছে। সবকিছু ঠিক আগের মতোই আছে। ঢাকা শহরের বিশৃঙ্খলা, আমার পঁচিশ হাজার টাকা বাজেটের জীবন, আর মিরপুরের মেস। কিন্তু আমার ভেতরে আজ একটা পরিবর্তন এসেছে। আজ আমি জানি, আমার জীবনের উদ্দেশ্য যদি কোনোদিন বদলায়, তবে সেটা কেমন হবে। আমি আনিকা নাওহারকে পাব না, সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি। কিন্তু আনিকা নাওহার আমাকে শিখিয়ে দিয়ে গেলেন, আমার গন্তব্যটা আসলে কী হতে পারে। জীবনটা সত্যিই মাঝে মাঝে খুব ইন্টারেস্টিং হয়ে ওঠে।



RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - Bad Boy - 09-21-2026

৫।
ঢাকা শহরে সময় কখনোই ঘড়ির কাঁটার নিয়মে চলে না। এখানে সময়ের নিজস্ব একটা আপেক্ষিকতা আছে। আইনস্টাইন যদি সুইজারল্যান্ডে না জন্মে ঢাকায় জন্মাতেন, তাহলে থিওরি অফ রিলেটিভিটি আবিষ্কার করার জন্য উনাকে ট্রেনের উদাহরণ দিতে হতো না; মিরপুর থেকে কারওয়ান বাজার রুটের যেকোনো লোকাল বাসে একবার উঠিয়ে দিলেই উনি মহাকর্ষ আর সময়ের সব সূত্র এক নিমেষে বুঝে যেতেন।


আমার অফিসের অফিশিয়াল সময় হলো সকাল দশটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা। কাগজে-কলমে আট ঘণ্টার ডিউটি। কিন্তু ঢাকায় আট ঘণ্টার কোনো অফিস নেই। কারওয়ান বাজার থেকে মিরপুর দশ নাম্বারের দূরত্ব খুব বেশি না হলেও, এই পথটুকু পাড়ি দিতে আমার প্রতিদিন গড়ে দুই ঘণ্টা সময় লাগে। যাওয়ার সময় এক ঘণ্টা, আসার সময় এক ঘণ্টা। অর্থাৎ, আমার আট ঘণ্টার অফিস আসলে আমার জীবনের দশটা ঘণ্টা গিলে খায়। দিনের চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে দশ ঘণ্টা যদি অফিসে আর রাস্তায় চলে যায়, আট ঘণ্টা ঘুমে যায়, তবে একজন ব্যাচেলর মানুষের নিজের জন্য বাঁচার সময় থাকে মাত্র ছয় ঘণ্টা। এই ছয় ঘণ্টাতেই তাকে বাজার করতে হয়, কাপড় ধুতে হয়, বাবা-মায়ের সাথে ফোনে কথা বলতে হয়, আর জীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে হতাশ হতে হয়।

আজ বারো তারিখ। ফেব্রুয়ারি মাস।

ফেব্রুয়ারি মাস মানেই ঢাকা শহরে একটা হালকা বসন্তের আমেজ থাকার কথা। শিমুল-পলাশ ফুটুক বা না ফুটুক, অন্তত বাতাসে একটা শুকনো, ঝিরঝিরে ভাব থাকে। কিন্তু আজ প্রকৃতিও যেন ঢাকা শহরের ট্রাফিক জ্যামের মতো পাগল হয়ে গেছে।

অফিস থেকে বের হয়েছি তখন সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা বাজে। কারওয়ান বাজারের সিগন্যালে দাঁড়িয়ে বিকল্প বাসের জন্য অপেক্ষা করছি, হঠাৎ আকাশ কালো করে মেঘ করে এল। কোনো পূর্বাভাস নেই, কোনো প্রস্তুতি নেই— ঝুপ করে একপশলা ভারী বৃষ্টি নেমে গেল।

ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে এই বৃষ্টির কোনো বৈজ্ঞানিক বা ভৌগোলিক লজিক আমার জানা নেই। কোথা থেকে এল এই বৃষ্টি, কীভাবে এল, খোদাই জানে! তড়িঘড়ি করে একটা বাসে উঠে পড়লাম। বাসের ভেতরটা গাদাগাদি ভিড়। আমি কোনোমতে জানালার পাশে একটা সিট পেয়ে গেলাম, যেটা ঢাকা শহরে রীতিমতো লটারি পাওয়ার সমতুল্য। বাস চলতে শুরু করল। বাইরে ঝুম বৃষ্টি। বাসের অন্য যাত্রীরা হুড়মুড় করে কাঁচের জানালাগুলো টেনে বন্ধ করে দিচ্ছে, যেন বাইরের এক ফোঁটা পানি ভেতরে এলে তারা গলে যাবে।

আমার পাশে বসা ভদ্রলোকও তার পাশের জানালাটা বন্ধ করার জন্য হাত বাড়ালেন। আমি তাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, "ভাই, জানালাটা একটু খোলা থাক না।"

ভদ্রলোক বিরক্ত হয়ে বললেন, "বলেন কী ভাই? গায়ে ছিটা লাগবে তো! ফাল্গুন মাসের বৃষ্টি, গায়ে লাগলে জ্বর আসবে।"

আমি শান্ত গলায় বললাম, "জ্বর আসলে প্যারাসিটামল খেয়ে নেব। কিন্তু এই অসময়ের বৃষ্টি তো আর রোজ পাব না।"

ভদ্রলোক আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন আমি পাবনা মেন্টাল হাসপাতাল থেকে এইমাত্র পালিয়ে বাসে উঠেছি। তিনি বিরবির করে কী যেন একটা বললেন, কিন্তু জানালাটা বন্ধ করলেন না।

আমি জানালার কাঁচটা অর্ধেক খুলে দিলাম। বৃষ্টির ছাঁট সরাসরি এসে আমার মুখে-বুকে লাগতে শুরু করল। বাতাসে একটা অদ্ভুত সোঁদা গন্ধ। ধুলোমাখা ঢাকা শহরের বুকে যখন প্রথম বৃষ্টি পড়ে, তখন মাটি আর ধুলো মিশে এই ঘ্রাণটা তৈরি হয়। আমার শার্টের হাতা ভিজে যাচ্ছে, চশমার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটা জমছে। কিন্তু আমার অদ্ভুত এক ধরনের ভালো লাগা শুরু হলো। মনে হলো, এই যে প্রতিদিন পঁচিশ হাজার টাকার বাজেটে জীবন পার করা, নিহাদের বাইকের ক্ষতিপূরণ নিয়ে টেনশন করা, আর ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে কিম জং উন বা জেফ বেজোসের খবর অনুবাদ করা— এই সমস্ত যান্ত্রিকতার বাইরে আমি আসলে প্রকৃতিরই একটা অংশ। বৃষ্টির এই শীতল ফোঁটাগুলো যেন আমার একঘেয়ে জীবনের ওপর একটা সতেজ প্রলেপ বুলিয়ে দিচ্ছে।

বৃষ্টির কথা ভাবতে ভাবতেই আমার মাথায় এল— ফেব্রুয়ারি মাস তো অর্ধেক চলে গেল! বইমেলা চলছে। আমি এখনো একদিনও বইমেলায় যাইনি। মিরপুরের মেস আর কারওয়ান বাজারের অফিস— এই চক্রের বাইরে বের হওয়া হয়নি। ঠিক করলাম, আগামী সোমবার যাব। সোমবার আমার ডে-অফ। ১৬ই ফেব্রুয়ারি পড়বে দিনটা। একা একা বাংলা একাডেমির মাঠে ঘুরব। কিছু বই কেনা দরকার। কয়েকটা ভালো ইংরেজি থেকে বাংলা ডিকশনারি, আর আমার প্রিয় দুজন স্প্যানিশ লেখকের অনুবাদ।

বইমেলার কথা ভাবতে গিয়েই আমার আরেকটা কথা মনে পড়ল। এই মাসের শেষে ছুটি নিয়ে কয়েকদিনের জন্য গ্রামের বাড়ি নওগাঁ যাব। হাতে তিন দিন ছুটি জমিয়ে রাখব। বাবা-মাকে দেখে আসা দরকার। উমরাহ করানোর টাকা তো জমাতে পারছি না, অন্তত সশরীরে গিয়ে মুখটা তো দেখিয়ে আসি!

বইমেলা আর বইয়ের চিন্তার সুতোর টানটা হঠাৎ করেই আমার মস্তিষ্কের আরেকটা প্রকোষ্ঠে গিয়ে ধাক্কা খেল। বইমেলা মানেই বই, বই মানেই প্রকাশনী, আর প্রকাশনী মানেই আনিকা নাওহার।

আজ বিকেলের ঘটনা।

আমি নিউজরুমে বসে রয়টার্সের একটা খবর অনুবাদ করছিলাম। নিউজটা ছিল ইউরোপের কোনো এক দেশের মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে। অত্যন্ত বোরিং একটা কাজ। আমাদের নিউজ রুমের এক কোণায় একটা টেলিভিশন সবসময় চালু থাকে। সাউন্ড মিউট করা থাকে, শুধু স্ক্রিনে নিউজ চ্যানেলগুলো চলতে থাকে। মাঝে মাঝে ব্রেকিং নিউজ এলে এহসান ভাই চিল্লিয়ে ওঠেন, "ওই রাশেদ, ভলিউমটা দে তো!"

আজ বিকেলে আমি ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলে একটু ঘাড় মটকাচ্ছিলাম, তখন হঠাৎ টিভি স্ক্রিনের দিকে আমার চোখ আটকে যায়।

টেলিভিশনে তখন ‘বইমেলা প্রসঙ্গ’ নামের একটা লাইভ প্রোগ্রাম হচ্ছিল। একজন উপস্থাপিকা বইমেলার কোনো একটা স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে লেখকদের ইন্টারভিউ নিচ্ছিলেন।

আমি দেখলাম, টিভি স্ক্রিনে আনিকা নাওহার দাঁড়িয়ে আছেন। নিউজ রুমের কোলাহল, এহসান ভাইয়ের চিল্লাচিল্লি, মামুনের কি-বোর্ডের খটখট শব্দ— সবকিছু যেন আমার কান থেকে মুছে গেল। আমি একদৃষ্টে টিভির দিকে তাকিয়ে রইলাম। স্ক্রিনের নিচে লেখা— ‘আনিকা নাওহার, প্রবাসী কবি ও ঔপন্যাসিক’।

ইন্টারভিউটা ছিল মাত্র তিন-চার মিনিটের। টিভিতে সাউন্ড মিউট করা ছিল বলে আমি উনার কথা শুনতে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু আমার শোনার দরকারও ছিল না। আমি শুধু দেখছিলাম।

কী অপূর্ব দেখাচ্ছিল উনাকে! পরনে একটা হালকা ছাই রঙের জামদানি শাড়ি, যার পাড়ে চিকন রূপালি সুতোর কাজ। শাড়িটা উনার শরীরের সাথে এমনভাবে লেপ্টে ছিল যেন ওটা কোনো কাপড় নয়, বরং উনার ব্যক্তিত্বেরই একটা সম্প্রসারিত অংশ। কাঁধের ওপর দিয়ে এলিয়ে পড়া আঁচল, আর খোলা চুলগুলো বাতাসে হালকা উড়ছে। উনার সেই বিখ্যাত শান্ত, স্নিগ্ধ হাসিটা স্ক্রিন ভেদ করে যেন সোজা আমার ডেস্কে এসে পড়ছিল। উপস্থাপিকা যখন কোনো প্রশ্ন করছিলেন, উনি খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন এবং তারপর উত্তর দেওয়ার সময় উনার ঠোঁটের নিখুঁত নড়াচড়া আর চোখের বুদ্ধিমত্তার দীপ্তি— সবকিছু মিলিয়ে উনাকে একটা চলন্ত পেইন্টিংয়ের মতো মনে হচ্ছিল।

আমি মনে মনে ভাবলাম, একটা ছত্রিশ বছর বয়সী নারী কীভাবে এত সুন্দর হতে পারে! উনার সেই ৩৬-২৮-৩৬-এর শারীরিক জ্যামিতি ক্যামেরার লেন্সেও একটুও ম্লান হয়নি; বরং টিভি স্ক্রিনে উনাকে আরও বেশি রহস্যময়ী, আরও বেশি আকর্ষণীয় লাগছিল।

মাত্র তিন-চার মিনিট। তারপর ক্যামেরা ঘুরে গেল অন্য কোনো লেখকের দিকে। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার ল্যাপটপের স্ক্রিনে ইউরোপের মুদ্রাস্ফীতিতে ফিরে গেলাম। কিন্তু আমার মাথার ভেতরে ওই ছাই রঙের জামদানি শাড়িটা আটকে রইল।

বাস যখন মিরপুর দশ নাম্বারে পৌঁছাল, তখনো ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছে। আমি বাস থেকে নেমে মেসে হাঁটা ধরলাম। আমার কাছে ছাতা নেই। আমি ভিজতে ভিজতেই এগোলাম। মেসে যখন পৌঁছালাম, তখন আমি পুরোপুরি কাকভেজা। শার্ট শরীরের সাথে লেপ্টে আছে, চুল থেকে পানি ঝরছে।

মেসের দরজা খুলল তুহিন। আমাকে এই অবস্থায় দেখে সে চোখ কপালে তুলে বলল, "হোয়াট হ্যাপেনড ব্রাদার? ইউ লুক লাইক আ ওয়েট ক্যাট! এই অসময়ে বৃষ্টি কই পেলেন?"

আমি জুতো খুলতে খুলতে বললাম, "আকাশে মেঘ ছিল, সেখান থেকেই পেয়েছি। বৃষ্টি কি আমি পকেটে করে এনেছি নাকি?"

তুহিন মাথা নেড়ে বলল, "ভেরি ব্যাড ওয়েদার। আমার আইইএলটিএস-এর লিসেনিং মক টেস্ট ছিল, বৃষ্টির শব্দের জন্য কনসেন্ট্রেশন ব্রেক হয়ে গেছে।"

আমি তুহিনকে পাশ কাটিয়ে আমার রুমে গেলাম। ভেজা কাপড়গুলো ছেড়ে একটা শুকনো টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরলাম। তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে অদ্ভুত এক ধরনের ক্লান্তি ভর করল শরীরে। বৃষ্টির পানিতে ভেজার কারণে শরীরটা একটু শীত শীত করছে, আবার ভেতর থেকে একটা ঘুম ঘুম ভাবও আসছে।

রহিমা খালা রান্না করে টেবিলে খাবার ঢেকে রেখে গেছেন। আমি আর দেরি না করে ডাইনিংয়ে গিয়ে খেয়ে নিলাম। মেন্যু সেই চিরচরিত— পাতলা ডাল, ডিম ভুনা আর আলুর ভর্তা। কিন্তু আজ অমৃতের মতো লাগল।

খাওয়া শেষ করে আমি বিছানায় এসে শুলাম। আজ আর কোনো বইয়ের প্রুফ দেখার কাজ নেই। চন্দ্রবিন্দুর মতিন সাহেবকে গতকালই সব বুঝিয়ে দিয়ে এসেছি। আনিকা নাওহারের উপন্যাসের প্রথম তিন চ্যাপ্টারও পড়া শেষ। ল্যাঙ্গুয়েজ নিয়ে আমার কিছু অবজারভেশন আমি উনাকে হোয়াটসঅ্যাপে জানিয়ে দিয়েছি। উনি শুধু একটা 'থাম্বস আপ' ইমোজি দিয়ে রিপ্লাই দিয়েছিলেন।

বাইরে বৃষ্টির শব্দটা একটানা বেজেই চলেছে। টিনের চাল হলে বৃষ্টির শব্দটা তীক্ষ্ণ হতো, কিন্তু ঢাকার কংক্রিটের ছাদের ওপর বৃষ্টির শব্দটা একটা গোঙানির মতো শোনায়। আমি চোখ বন্ধ করলাম। ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে যেতে আমার খুব একটা সময় লাগল না।

কিন্তু সেই রাতে আমি যে স্বপ্নটা দেখলাম, তা আমার অনুবাদক জীবনের সমস্ত লজিক, সমস্ত ফ্যাক্ট আর সমস্ত বাস্তবতাকে চুরমার করে দিল।

স্বপ্নটা শুরু হলো খুব রিয়েলিস্টিক একটা সেট-আপ দিয়ে। আমি দেখলাম, আমি বাংলা একাডেমির বইমেলায় দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু মেলাটা স্বাভাবিক নেই। আকাশ ভেঙে ভয়ানক বৃষ্টি নামছে। চারিদিকে একটা চরম বিশৃঙ্খলা আর আতঙ্ক। লেখক, পাঠক, দর্শনার্থীরা সবাই দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়াচ্ছে। প্রকাশকরা স্টলের ভেতর থেকে বড় বড় নীল আর সাদা রঙের পলিথিন বের করে তাদের হাজার হাজার টাকার বই ঢাকার চেষ্টা করছে। চারদিকে শুধু চিৎকার, "বই ভিজে গেল! পলিথিন দাও! ত্রিপল টানাও!"

আমি মেলার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি। চারপাশের এই ভয়াবহ হুড়োহুড়ির মাঝে আমি একদম স্থির। হঠাৎ আমি একটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করলাম। আমার পাশ দিয়ে হাজার হাজার মানুষ দৌড়াচ্ছে, কিন্তু কেউ আমাকে দেখতে পাচ্ছে না। আমি যেন এই পৃথিবীতে থেকেও নেই। আমি একটা অদৃশ্য সত্তা।

তার চেয়েও বড় যে ধাক্কাটা আমি খেলাম, তা হলো নিজের দিকে তাকিয়ে। আমি দেখলাম, আমার শরীরে কোনো কাপড় নেই। আমি সম্পূর্ণ নগ্ন। বাস্তব জীবনে এরকম পরিস্থিতিতে পড়লে যেকোনো মানুষের লজ্জায়, ভয়ে হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু স্বপ্নে আমার ভেতরে কোনো লজ্জা কাজ করল না। বরং, আমার মনে হলো এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক অবস্থা। এই যে আকাশ থেকে অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে, এই বৃষ্টি আমার সম্পূর্ণ অনাবৃত শরীরকে ধুয়ে দিচ্ছে। আমার মনে হচ্ছিল, এই বৃষ্টি যেন শুধু পানি নয়, এটা একটা পবিত্র জলধারা। ঢাকা শহরের পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের রাশেদের গায়ে যে ক্লান্তি, যে হতাশা, যে একঘেয়েমি জমেছিল— এই বৃষ্টি যেন আমার শরীরের প্রতিটি লোমকূপ থেকে সেই ময়লাগুলো ধুয়ে পরিষ্কার করে দিচ্ছে। আমি যেন আদিম যুগের কোনো এক পবিত্র মানব, যে প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে গেছে।

আমি চোখ বন্ধ করে মুখটা আকাশের দিকে তুলে দুই হাত প্রসারিত করলাম। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা আমার বুকে, পেটে, ঊরুতে এসে আছড়ে পড়ছে। এক অদ্ভুত আদিম শান্তি।

ঠিক সেই মুহূর্তে আমি অনুভব করলাম, কেউ একজন আমার প্রসারিত ডান হাতটা আলতো করে ধরল। স্পর্শটা এতই জীবন্ত আর এতই কোমল ছিল যে আমি চমকে চোখ খুললাম। আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন আনিকা নাওহার।

চারপাশে তখনো পলিথিন টানানোর যুদ্ধ চলছে, কিন্তু আমাদের চারপাশে যেন একটা অদৃশ্য বৃত্ত তৈরি হয়ে গেছে, যেখানে শুধু আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ নেই। আমি অবাক হয়ে উনার দিকে তাকালাম। এবং আমার স্নায়ুগুলো যেন মুহূর্তের জন্য অবশ হয়ে গেল।

আনিকা নাওহারও সম্পূর্ণ অনাবৃত। তাঁর শরীরে এক সুতোও কোনো আবরণ নেই। আমি একজন অনুবাদক। আমি শব্দের কারিগর। কিন্তু উনাকে সেই অবস্থায় দেখে আমার মনে হলো, পৃথিবীর কোনো ভাষার কোনো ডিকশনারিতে এমন কোনো শব্দ তৈরি হয়নি, যা দিয়ে উনার সেই মুহূর্তের রূপকে বর্ণনা করা যায়।

বৃষ্টির পানি উনার মাথা থেকে শুরু করে সারা শরীরে গড়িয়ে পড়ছে। উনার ভেজা চুলগুলো পিঠের ওপর লেপ্টে আছে। আমি উনার শারীরিক গঠনের যে জ্যামিতির কথা ভেবেছিলাম, আজ তা কোনো কাপড়ের আড়াল ছাড়া, সম্পূর্ণ আদিম এবং নিখুঁতরূপে আমার চোখের সামনে উপস্থিত।

উনার কাঁধের গড়নটা যেন কোনো গ্রিক ভাস্করের নিপুণ হাতে খোদাই করা মার্বেল পাথর। বৃষ্টির পানি সেই কাঁধ বেয়ে নেমে আসছে উনার সুডৌল, পূর্ণাঙ্গ এবং উদ্ধত বক্ষদেশের ওপর। পানিগুলো সেখানে বাধা পেয়ে দুই ভাগ হয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ছে। উনার নিটোল পেট, নাভির গভীরতা এবং তারপর সেই সরু কোমর— সবকিছু মিলিয়ে এক অদ্ভুত নান্দনিকতার সৃষ্টি করেছে। কোমরের নিচ থেকে উনার নিতম্বের বাঁকটা এতই নিখুঁত আর এতই মসৃণ যে, মনে হচ্ছিল প্রকৃতি তার সমস্ত শিল্পবোধ দিয়ে এই নারীদেহটি নির্মাণ করেছে।

উনার ফর্সা ত্বকের ওপর বৃষ্টির পানির ফোঁটাগুলো মুক্তোর মতো জ্বলজ্বল করছিল। ঠান্ডায় উনার শরীরের রোমকূপগুলো সামান্য জেগে উঠেছে, আর বক্ষচূড়া দুটো সামান্য দৃঢ় হয়ে আছে।

কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই সম্পূর্ণ নগ্নতার মাঝে কোনো ধরনের অশ্লীলতা বা কদর্যতা ছিল না। উনাকে দেখে আমার মনে কোনো পাশবিক বা আদিম কামনার উদ্রেক হলো না; বরং আমার মনে হলো আমি যেন পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র এবং সুন্দর কোনো শিল্পকর্মের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। বতিচেল্লির সেই বিখ্যাত পেইন্টিং ‘দ্য বার্থ অফ ভেনাস’-এর ভেনাস যেন ক্যানভাস থেকে নেমে এসে সরাসরি বৃষ্টির নিচে আমার পাশে দাঁড়িয়েছে।

উনি আমার হাতটা শক্ত করে ধরে উনার সেই শান্ত, স্নিগ্ধ চোখ জোড়া তুলে আমার দিকে তাকালেন। উনার চোখে কোনো লজ্জা বা জড়তা ছিল না। ছিল এক ধরনের গভীর আত্মসমর্পণ এবং আত্মবিশ্বাস।

বৃষ্টির ঝমঝম শব্দের মাঝেই উনি খুব নরম গলায় বললেন, "রাশেদ, এখানে আর কোনো মুখোশ নেই। না মিথ্যার, না সত্যের। এখানে শুধু আমরা আছি।"

উনার কথাগুলো বৃষ্টির শব্দের সাথে মিশে একটা অদ্ভুত সিম্ফনি তৈরি করল। আমি কিছু বলতে পারলাম না। আমি শুধু উনার হাতের উষ্ণতা অনুভব করলাম। এই কনকনে ঠান্ডা বৃষ্টির মাঝেও উনার হাতটা কী অদ্ভুত গরম!

আমরা দুজন সম্পূর্ণ অনাবৃত অবস্থায়, হাতে হাত রেখে, বৃষ্টির নিচে দাঁড়িয়ে রইলাম। চারপাশে পৃথিবীর সমস্ত বই ভিজে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, সমস্ত জ্ঞান ধুয়ে মুছে যাচ্ছে, কিন্তু আমাদের সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। আমরা দুজন যেন পৃথিবীর আদি মানব-মানবী, যারা সবেমাত্র স্বর্গের বাগানে চোখ খুলেছে।

হঠাৎ করে একটা প্রচণ্ড শব্দ হলো। হয়তো মেঘ ডাকার শব্দ, অথবা বাসের কোনো হর্ন। আমার ঘুমটা ভেঙে গেল। আমি ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসলাম। আমার বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। সারা শরীর ঘামে ভিজে জবজবে। বাইরে তখনো বৃষ্টির সেই একটানা গোঙানির শব্দ চলছে।

আমি অন্ধকারে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে বসে রইলাম। আমার ডান হাতের তালুটা তখনো গরম হয়ে আছে। আমি স্পষ্ট অনুভব করতে পারছি, আনিকা নাওহারের সেই নরম হাতটা যেন এখনো আমার হাতের মুঠোয় ধরা আছে।

আমি দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেললাম। আমার মাথার ভেতর তখন ঝড় বয়ে যাচ্ছে। এক অদ্ভুত, বর্ণনাতীত অনুভূতি। সিগমুন্ড ফ্রয়েড সাহেব সত্যি খুব ভালো জানতেন। মানুষের মন বড়ই জটিল একটা জায়গা।

আমি সবসময় নিজেকে একজন ‘শুকনা’ মানুষ বলে দাবি করে এসেছি। আমি ভেবেছি আমার ভেতরে ইমোশন নেই, কামনা নেই, বাসনা নেই। আমি একজন নিরাসক্ত অনুবাদক, যে শুধু অন্যের খবর ট্রান্সলেট করে।

কিন্তু আজ রাতের এই স্বপ্ন আমাকে সম্পূর্ণ নগ্ন করে দিল। শুধু স্বপ্নে নয়, বাস্তবেও। ফ্রয়েড বলেছেন, মানুষের অবদমিত কামনা-বাসনাগুলো, যেগুলো সে সজ্ঞানে স্বীকার করতে চায় না, সেগুলো স্বপ্নের মাধ্যমে প্রতীকী বা সরাসরি রূপ নিয়ে বেরিয়ে আসে।

আমি আনিকা নাওহারকে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম, এটা সত্যি। উনার রূপ, উনার আভিজাত্য আমাকে আকর্ষণ করেছিল। কিন্তু আমি অবচেতন মনে উনাকে এতটা তীব্রভাবে, এতটা আদিমভাবে চেয়েছি— সেটা আমি নিজেই জানতাম না।

আমার এই সাধারণ, পঁচিশ হাজার টাকা বাজেটের জীবনে, যেখানে আমি আমার বাবা-মায়ের উমরাহ নিয়ে চিন্তা করি, সেখানে একজন বিবাহিত, লন্ডনপ্রবাসী, আইটি ফার্মের মালিক এবং রূপবতী নারীর প্রতি আমার এই আকাঙ্ক্ষা— এটা শুধু অবাস্তবই নয়, এটা রীতিমতো হাস্যকর।

কিন্তু স্বপ্ন তো আর লজিক বোঝে না। স্বপ্ন ব্যাংক ব্যালেন্স দেখে না, স্বপ্ন সমাজ বোঝে না। আমি বিছানা থেকে নেমে এক গ্লাস পানি খেলাম। গলার ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলো এসে পড়েছে রুমে। আয়নায় নিজের মুখটা দেখলাম।

সাধারণ একটা মুখ। কিন্তু এই সাধারণ মুখের আড়ালে যে একটা আদিম, বন্য এবং ক্ষুধার্ত পুরুষ লুকিয়ে আছে, সেটা আমি আজ প্রথম আবিষ্কার করলাম। আমি মনে মনে হাসলাম। একটা তিক্ত হাসি।

"রাশেদ আহমেদ, তুমি আর যাই হও, তুমি কোনো সাধু নও। তুমিও রক্ত-মাংসের একজন মানুষ। এবং তোমার ভেতরের সেই মানুষটা আজ রাতে বৃষ্টির নিচে আনিকা নাওহারের সাথে যে আদিম স্নানটা করেছে, সেটা তুমি সারাজীবনেও ভুলতে পারবে না।"

বাইরে বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই। আমি আবার বিছানায় গিয়ে শুলাম। কিন্তু আমি জানি, আজ রাতে আমার আর ঘুম আসবে না। আমার ডান হাতের তালুটা জ্বলছে।

ফ্রয়েড সাহেবের থিওরি আর আমার বাস্তবতার মাঝখানে আনিকা নাওহার এখন এক প্রবল বৃষ্টির নাম হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। যে বৃষ্টিতে ভিজলে মানুষ পবিত্র হয়, না কি আরও বেশি তৃষ্ণার্ত হয়— সেটা আমি জানি না।



RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - Bad Boy - 09-21-2026

৬

যৌনতা জিনিসটা আসলে কী? সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখের নিচের কালি দেখতে দেখতে আমি এই অতি জটিল এবং আদিম বিষয়টা নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম। গত রাতের সেই অদ্ভুত, নগ্ন এবং বন্য স্বপ্নের পর আমার মস্তিষ্ক যেন স্বাভাবিক লজিকে কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। আমার মনে হচ্ছে, আমি যেন নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছি। যে রাশেদ আহমেদকে আমি চিনতাম— শান্ত, নিরাসক্ত, পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের একঘেয়ে অনুবাদক— তার ভেতরে এত তীব্র একটা আদিম ক্ষুধা লুকিয়ে ছিল, সেটা আমি নিজেই জানতাম না।

যৌনতা নিয়ে আমাদের সমাজে এক ধরনের অদ্ভুত লুকোচুরি আছে। আমরা সবাই এই প্রক্রিয়ার ফসল, অথচ আমরা এমন ভান করি যেন এটা পৃথিবীতে এক্সিস্টই করে না। বাসে একটু গা লাগলে আমরা এমনভাবে চমকে উঠি, যেন আমরা সবাই আকাশ থেকে পড়া কোনো পবিত্র ফেরেশতা। আমি ব্রাশে পেস্ট লাগাতে লাগাতে ভাবলাম, যৌনতা নিয়ে পৃথিবীর বড় বড় দার্শনিক আর বিজ্ঞানীরা কী বলে গেছেন?


সিগমুন্ড ফ্রয়েডের কথা ধরলে, মানুষের জীবনের প্রতিটি কাজের পেছনেই নাকি অবদমিত যৌনাকাঙ্ক্ষা কাজ করে। আপনি যে একটা সুন্দর বাড়ি বানাচ্ছেন, ভালো চাকরি খুঁজছেন, এমনকি সুন্দর করে চুল আঁচড়াচ্ছেন— সবকিছুর পেছনেই আছে বিপরীত লিঙ্গকে আকর্ষণ করার একটা সুপ্ত বাসনা। রিচার্ড ডকিন্স তার ‘দ্য সেলফিশ জিন’ বইয়ে বলেছেন, আমরা মানুষেরা হচ্ছি আমাদের জিনের বহনকারী গাড়ি মাত্র। আমাদের জিনের একটাই উদ্দেশ্য— যেকোনো মূল্যে সারভাইভ করা এবং বংশবৃদ্ধি করা। আর এই বংশবৃদ্ধির জন্য জিন আমাদের মস্তিষ্কে এমন একটা কেমিক্যাল রিঅ্যাকশন তৈরি করে, যার নাম আমরা দিয়েছি ‘যৌনতা’ বা ‘প্রেম’। জিন আমাদের বোকা বানিয়ে নিজের কাজ উদ্ধার করে নেয়।

কিন্তু পুরুষ আর নারীর কাছে যৌনতার ধারণা কি এক?

আমি বেসিনে মুখ ধুতে ধুতে ভাবলাম, না, এক নয়। বিবর্তনবাদ অনুযায়ী, একজন পুরুষের মূল লক্ষ্য হলো তার জিন যত বেশি সম্ভব ছড়িয়ে দেওয়া। কারণ পুরুষের রিপ্রোডাক্টিভ কস্ট বা প্রজনন ব্যয় খুব কম। তাই পুরুষ প্রকৃতিগতভাবেই ‘ভিজ্যুয়াল’ বা দৃষ্টি-নির্ভর। একটা সুন্দর, প্রতিসম (symmetrical) শরীর, চওড়া নিতম্ব, ভরাট বক্ষদেশ— এগুলো দেখলে পুরুষের মস্তিষ্ক সিগন্যাল দেয় যে, এই নারী সুস্থ এবং সন্তান ধারণে সক্ষম। তাই পুরুষ খুব সহজেই শারীরিক সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়।

অন্যদিকে, একজন নারীর প্রজনন ব্যয় অনেক বেশি। তাকে দীর্ঘ নয় মাস গর্ভধারণ করতে হয়, জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়। তাই নারী শুধু শরীর দেখে আকৃষ্ট হয় না। সে খোঁজে নিরাপত্তা, ক্ষমতা, বুদ্ধিমত্তা এবং কমিটমেন্ট। সে চায় এমন একজন পুরুষ, যে তাকে এবং তার সন্তানকে প্রটেকশন দিতে পারবে। এ কারণেই হয়তো পুরুষরা পর্নোগ্রাফি বা ভিজ্যুয়াল জিনিসের প্রতি বেশি আসক্ত হয়, আর নারীরা আকৃষ্ট হয় ইমোশনাল কানেকশন বা রোমান্টিক উপন্যাসের প্রতি।

প্রাচীনকালে যৌনতা ছিল নেহাতই একটা বায়োলজিক্যাল প্রয়োজন। টিকে থাকার লড়াই। কিন্তু আধুনিক মানুষ এই বায়োলজিক্যাল প্রয়োজনটাকে একটা বিশাল ইন্ডাস্ট্রিতে পরিণত করেছে। যৌনতা এখন শুধু আর প্রজননের উপায় নেই, এটা এখন ক্ষমতা, বিনোদন আর পণ্যের প্রতীক।

এই যে আমি আনিকা নাওহারের কথা ভাবছি, এটা কেন হচ্ছে? আমার হঠাৎ করে একটা অদ্ভুত থিওরির কথা মনে পড়ল। এডওয়ার্ড ওয়েস্টারমার্কের ‘ওয়েস্টারমার্ক ইফেক্ট’। মানুষ কেন নিজের মা, বোন বা পরিবারের কাছের মানুষদের নিয়ে কখনো যৌনভাবে ভাবে না? অথচ রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া সম্পূর্ণ অপরিচিত একটা মেয়েকে নিয়ে খুব সহজেই ফ্যান্টাসাইজ করতে পারে! কেন?

সমাজবিজ্ঞানীরা হয়তো বলবেন, এটা সমাজের নিয়ম বা নৈতিকতার কারণে। কিন্তু বিবর্তনবাদীরা বলেন অন্য কথা। প্রকৃতি খুব স্মার্ট। রক্তের সম্পর্কের কারও সাথে প্রজনন হলে জেনেটিক মিউটেশন বা বিকলাঙ্গ সন্তান হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। তাই প্রকৃতি মানুষের মস্তিষ্কে একটা বিল্ট-ইন সফটওয়্যার দিয়ে দিয়েছে। জন্মের পর থেকে জীবনের প্রথম কয়েক বছর আমরা যাদের সাথে একসাথে বড় হই, যাদেরকে প্রতিদিন দেখি— আমাদের মস্তিষ্ক তাদেরকে ‘ডু নট টাচ’ বা ‘ফ্যামিলি’ নামক ফোল্ডারে সেভ করে ফেলে। এদের প্রতি আমাদের কোনো সেক্সুয়াল রেসপন্স তৈরি হয় না। একেই বলে ওয়েস্টারমার্ক ইফেক্ট।

কিন্তু যখনই আমরা ফ্যামিলির বাইরে নতুন কোনো মুখ দেখি, নতুন কোনো জিন দেখি— মস্তিষ্ক তখন হিসেব কষতে শুরু করে। আর সেই নতুন মুখটার যদি একটা পারফেক্ট ৩৬-২৮-৩৬ জ্যামিতি থাকে, যদি তার শরীরে একটা দামি পারফিউমের গন্ধ থাকে, আর তার চোখে যদি একটা পরিণত বুদ্ধিমত্তার ছাপ থাকে— তখন মস্তিষ্ক অ্যালার্ম বাজিয়ে ওঠে— “মেট! মেট! মেট!”

আমি তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে নিজের ঘরে ফিরে এলাম। আমার মস্তিষ্ক গত রাতে আনিকা নাওহারকে দেখে ঠিক এই অ্যালার্মটাই বাজিয়েছে। মেসের সকালবেলাটা আজ বেশ শান্ত। রাজু আজ বারান্দায় নেই। সে হয়তো কাল রাত জেগে বিসিএস পড়েছে , এখন ঘুমাচ্ছে। আমি ডাইনিংয়ে গিয়ে দেখলাম তুহিন বসে বসে রুটি আর ডিম ভাজি খাচ্ছে।"গুড মর্নিং ব্রাদার রাশেদ!" তুহিন ডিমের কুসুম দিয়ে রুটি ছিঁড়তে ছিঁড়তে বলল।

"মর্নিং। আইইএলটিএস-এর কী অবস্থা?"

তুহিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। "ভাই, স্পিকিং নিয়ে প্যারা নাই। আই ক্যান স্পিক লাইক এ নেটিভ। বাট রিডিংয়ে গিয়ে আটকে যাচ্ছি। এত কঠিন কঠিন প্যাসেজ দেয়! কালকে একটা প্যাসেজ পড়লাম ডাইনোসরের বিলুপ্তি নিয়ে। আচ্ছা ভাই, ডাইনোসররা যে মরে গেল, এটা নিয়ে আমাদের এত টেনশন করার কী আছে? আমরা কি ওদের আত্মীয় লাগি?"

আমি চেয়ার টেনে বসে রুটি ছিঁড়তে ছিঁড়তে বললাম, " আত্মীয় লাগি না ঠিকই, তবে আমরা ডাইনোসরদের রিপ্লেসমেন্ট। ওরা বিলুপ্ত না হলে আমরা আসতাম না। আমাদের অস্তিত্বের সাথে ওদের বিলুপ্তি যুক্ত।" তুহিন চোখ পিটপিট করে বলল, "আপনার কথাবার্তা মাঝে মাঝে আমি বুঝি না ভাই। খুব ফিলোসফিক্যাল।" আমি হাসলাম। আমার নিজের ফিলোসফি নিয়েই আমি আজ বিপদে আছি, তুহিন আর কী বুঝবে!

সকাল নয়টা চল্লিশে আমি কারওয়ান বাজারের বাসে ঝুলছি।

বিকল্প বাস আজ অতিরিক্ত ভিড়। আমার সামনে একটা কলেজপড়ুয়া ছেলে তার বিশাল ভারী ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশে এক বয়স্ক লোক, যিনি বাসের প্রতিটা ঝাঁকুনিতে আল্লাহ-রসুলের নাম জপছেন। এই বাসের ভেতরের মানুষগুলোকে দেখলে মনে হয় না যে এদের জীবনে যৌনতা, রোমান্স বা প্রেম বলে কিছু আছে। অথচ এরা প্রত্যেকেই সেই আদিম প্রক্রিয়ার ফসল।

অফিসে পৌঁছালাম দশটা দশে।

এহসান ভাই আজ একটু উত্তেজিত। তার কপালে ভাঁজ। আমাকে দেখেই বললেন, "রাশেদ, আজকে কিন্তু প্রচুর প্রেসার। ইউক্রেন-রাশিয়া বর্ডারে আবার উত্তেজনা শুরু হয়েছে। আমি তোমাকে কয়েকটা নিউজ অ্যাসাইন করেছি, একদম ঝটপট নামিয়ে ফেলবে।" আমি ডেস্কে গিয়ে বসলাম। মামুনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম সে একটা ফরাসি নিউজ পোর্টালের খবর অনুবাদ করছে। "কী খবর মামুন?" আমি ল্যাপটপ অন করতে করতে জিজ্ঞেস করলাম। মামুন খুব উৎসাহ নিয়ে বলল, "ভাই, ফাটাফাটি নিউজ। ফ্রান্সের এক মন্ত্রীর সাথে এক মডেলের পরকীয়া ফাঁস হয়ে গেছে। আমি হেডলাইন দিচ্ছি— ‘ফরাসি নেতার পরকীয়ায় ফ্রান্স জুড়ে ছি ছি রব, মডেলের সাথে গোপন অভিসার’।" আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, "মামুন, এটা ফ্রান্স, বাংলাদেশ না। ফ্রান্সে পরকীয়া নিয়ে কেউ ছি ছি করে না। ওদেশে এটা খুব ডালভাত ব্যাপার। তুমি হেডলাইন দাও— ‘ফ্রান্সের রাজনীতিতে নতুন স্ক্যান্ডাল: মডেলের সাথে মন্ত্রীর সম্পর্ক ফাঁস’।" মামুন একটু হতাশ হলো। "ভাই, আপনার নিউজগুলো এত শুকনা কেন? একটু মসলা না দিলে কি নিউজ পড়ে মজা আছে?"

"আমাদের কাজ খবর দেওয়া, চটপটি বানানো না মামুন।"

আমি আমার কাজে মন দিলাম। ইউক্রেন-রাশিয়ার বর্ডারের খবর। ট্যাঙ্ক, মিসাইল, কূটনীতি, মৃত্যু। কিন্তু আমার মাথার ভেতর তখনো একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃশ্যপটের রেশ রয়ে গেছে। আনিকা নাওহারের সেই বৃষ্টিভেজা, নগ্ন শরীরটা আমার নিউরনের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি যখন ল্যাপটপে টাইপ করছি— "রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন এক কঠোর বার্তায় জানিয়েছেন...", তখন আমার চোখের সামনে ভাসছে আনিকা নাওহারের সেই নিটোল নাভির গভীরতা।

আমি কয়েকবার চোখ বন্ধ করে মাথা ঝাঁকালাম। এ কেমন পাগলামি শুরু হয়েছে আমার! আমি একজন ম্যাচিউর মানুষ। আমি জানি এই ফ্যান্টাসির কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। তবুও আমার মন বারবার ওই কল্পনার জগতেই ছুটে যাচ্ছে। সারাদিন অফিসে কাজের প্রচুর চাপ ছিল। ফারহানা আপা আজ বাসা থেকে চিকেন বিরিয়ানি এনেছিলেন। আমাকে ডেকে খাওয়ালেন। নিতি এসে দুইবার আমার ডেস্ক থেকে স্ট্যাপলার নিয়ে গেছে আর বলেছে, "রাশেদ ভাই, আপনি আজ এত চুপচাপ কেন? প্রেমে-টেমে পড়লেন নাকি?"

আমি মুচকি হেসে বলেছি, "অনুবাদকদের প্রেমে পড়ার কোনো নিয়ম নেই নিতি। আমরা শুধু অন্যের প্রেমের খবর অনুবাদ করি।" অফিস শেষ করে মেসে ফিরতে ফিরতে রাত আটটা বেজে গেল।
আজ মেসে রহিমা খালা খুব সাধারণ রান্না করেছেন। আলু ঘাটি আর ডিমের তরকারি। আমি চুপচাপ খেয়ে নিজের রুমে এসে দরজা বন্ধ করে দিলাম।

আমার রুমের ভেতরে এক ধরনের গুমোট নীরবতা। সিলিং ফ্যানটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে ঘুরছে। বাইরে রাস্তার গাড়িঘোড়ার আওয়াজ অনেক কমে এসেছে। আমি আমার ছোট বিছানায় পিঠ এলিয়ে দিলাম। ঘরের আলো নেভানো, শুধু রাস্তার সোডিয়াম বাতির হলুদ আলো জানালার গ্রিল গলে আমার বিছানার ওপর একটা জেলখানার মতো ছায়া তৈরি করেছে। আমি প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলাম।

স্ক্রিন আনলক করতেই হোয়াটসঅ্যাপের আইকনটা চোখে পড়ল। আমার আঙুলগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে হোয়াটসঅ্যাপে চলে গেল। কন্টাক্ট লিস্টে গিয়ে সার্চ করলাম— 'Anika Nawhar'। উনার কোনো মেসেজ আসেনি। আমার পাঠানোর কথাও না। আমি গতকাল রাতে উনার উপন্যাসের ভাষা নিয়ে যে ফিডব্যাক দিয়েছিলাম, উনি শুধু একটা থাম্বস আপ দিয়েছিলেন। আমি উনার নামের ওপর ট্যাপ করে চ্যাটবক্সটা ওপেন করলাম। তারপর উনার প্রোফাইল পিকচারটার (DP) ওপর ক্লিক করলাম। ছবিটা বড় হয়ে আমার পুরো স্ক্রিন জুড়ে ভেসে উঠল।

ছবিটা ইংল্যান্ডে তোলা। ব্যাকগ্রাউন্ডে লন্ডনের টেমস নদী আর বিশাল একটা নাগরদোলা— লন্ডন আই। শীতের দেশ বলে আনিকা নাওহার বেশ জম্পেশ শীতের কাপড় পরে আছেন। উনার গায়ে একটা গাঢ় নীল রঙের ভারী ট্রেঞ্চ কোট। গলায় একটা লাল রঙের মাফলার খুব সুন্দর করে পেঁচানো। মাথার চুলগুলো খোলা, বাতাসে একটু উড়ছে। দুই হাত ওভারকোটের পকেটে ঢোকানো। ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে উনি খুব স্বাভাবিক, স্নিগ্ধ একটা হাসি দিয়েছেন।

ছবিতে উনার শরীরের এক ইঞ্চি চামড়াও দৃশ্যমান নয়, শুধু মুখমণ্ডল ছাড়া। একদমই রিভিলিং বা আবেদনময় কোনো ছবি নয়। সম্পূর্ণ শালীন, পরিশীলিত এবং একজন বুদ্ধিমতী লেখকের যেমন ছবি হওয়া উচিত, ঠিক তেমনই। কিন্তু মানুষের মস্তিষ্ক বড়ই অদ্ভুত। সে যা দেখতে পায় না, তা কল্পনা করে নিতে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে।

আমি অন্ধকারে বিছানায় শুয়ে উনার ওই শীতের পোশাকে ঢাকা ছবিটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম। আর হঠাৎ করেই আমার শরীরের ভেতর একটা প্রচণ্ড উত্তাপ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল। আমার শ্বাসের গতি ভারী হয়ে এল। আমার কল্পনার ক্যানভাসে ছবিটা পাল্টাতে শুরু করল। আমি চোখ বন্ধ করলাম। আমার মাথার ভেতর তখন আর লন্ডনের টেমস নদী নেই। আমার কল্পনায় আনিকা নাওহার এখন আমার এই ছোট্ট, অন্ধকার রুমের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছেন।

আমি কল্পনায় দেখতে পাচ্ছি, উনি খুব ধীর লয়ে উনার গলার ওই লাল মাফলারটা খুলে ফেললেন। উনার চোখের সেই শান্ত, বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিটা এখন আর নেই; সেখানে এখন এক ধরনের বন্য, ক্ষুধার্ত এবং আদিম তৃষ্ণা। আমি বিছানা থেকে উঠে উনার সামনে দাঁড়ালাম। উনার শরীর থেকে সেই চেনা শ্যানেল পারফিউমের গন্ধটা আমার নাসারন্ধ্রে এসে ধাক্কা দিচ্ছে। আমি কল্পনায় উনার গাঢ় নীল ট্রেঞ্চ কোটের বোতামগুলো একটা একটা করে খুলতে শুরু করলাম। উনার ভারী ওভারকোটটা খসে মেঝেতে পড়ে গেল। আমার শরীরের ভেতরের উত্তাপটা এখন একটা আগ্নেয়গিরির মতো ফুটছে। আমি আমার ট্রাউজারের ভেতর হাত দিলাম। আমার পুরুষাঙ্গ তখন চরম উত্তেজনায় কঠিন হয়ে আছে। আমার হাতের মুঠোয় আমি নিজের সেই স্পন্দনশীল আদিমতাকে অনুভব করলাম।

কল্পনার জগতে আনিকা নাওহারের আবরণগুলো একে একে খসে পড়ছে। আমি উনাকে জড়িয়ে ধরলাম। উনার সেই ফর্সা, নিখুঁত কাঁধের ওপর আমার ঠোঁট রাখলাম। আমি স্পষ্ট অনুভব করছি উনার গায়ের উত্তাপ। উনার সেই ৩৬-২৮-৩৬-এর জ্যামিতিক শরীরটা এখন আমার দুই হাতের মুঠোয়। আমি উনার ভরাট বক্ষদেশের ওপর আমার মুখ গুঁজে দিলাম। উনার গায়ের পারফিউমের সুবাসের সাথে এখন মিশে গেছে এক ধরনের নোনতা ঘামের গন্ধ— যেটা সম্পূর্ণ আদিম এবং পাশবিক। আমার হাতের গতি বাড়তে লাগল। আমি বিছানায় চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছি, কিন্তু কল্পনায় আমি আনিকাকে আমার বিছানায় টেনে নিয়েছি। উনার দুই পায়ের মাঝখানে আমি আমার শরীরটাকে স্থাপন করেছি। উনার সেই সুডৌল, মসৃণ ঊরু দুটো আমার কোমর জড়িয়ে আছে।

"রাশেদ..." কল্পনার আনিকা ফিসফিস করে আমার নাম ধরল। উনার সেই প্রমিত বাংলার মোহনীয় কণ্ঠস্বর এখন কামনার আধিক্যে ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে। উনার নখগুলো আমার পিঠে বসে যাচ্ছে।
আমি উনার শরীরের গভীরে প্রবেশ করলাম। আমার কল্পনায় কোনো রোমান্স নেই, কোনো সাহিত্য নেই। সেখানে শুধু আছে ঘাম, ঘর্ষণ আর মাংসের আদিম উল্লাস। আমি উনার ঠোঁট দুটো কামড়ে ধরলাম। উনার ভারী শ্বাস-প্রশ্বাস আমার কানের কাছে একটা ঝড়ের মতো আছড়ে পড়ছে। আমি উনার কোমরের বাঁকটাকে দুই হাতে শক্ত করে ধরে আরও তীব্রভাবে, আরও বন্যভাবে উনার ভেতরে নিজেকে সঞ্চালিত করতে লাগলাম।

উনার শরীরটা ধনুকের মতো বেঁকে যাচ্ছে। উনার গলা দিয়ে একটা অস্ফুট, চাপা গোঙানির শব্দ বের হচ্ছে। আমার হাতের মুঠি আরও দ্রুত হলো। আমার শরীরের প্রতিটি স্নায়ু , প্রতিটি শিরা টানটান হয়ে গেছে। আমার শ্বাস আটকে আসছে। কল্পনায় আনিকার শরীরটা আমার নিচে প্রবল তৃষ্ণায় কাঁপছে। উনার সেই আভিজাত্য, উনার সেই লেখিকা সত্তা— সব কিছু গলে গিয়ে এখন শুধু একটা তৃষ্ণার্ত নারীদেহ আমার সামনে উন্মুক্ত।"আনিকা..." আমি বাস্তবেও একটা চাপা গোঙানি দিয়ে উঠলাম।

আমার শরীরের ভেতর থেকে একটা তীব্র বৈদ্যুতিক শক যেন মেরুদণ্ড বেয়ে ওপরে উঠে এল। এবং ঠিক পরমুহূর্তেই এক প্রচণ্ড, বন্য স্খলনের মাধ্যমে আমার শরীরের সমস্ত জমানো উত্তেজনা, সমস্ত তৃষ্ণা ছিটকে বেরিয়ে এল। আমি হাঁপাতে লাগলাম। আমার বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। হাতের তালুতে সেই আঠালো, উষ্ণ তরলের স্পর্শ।

কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমার মাথাটা সম্পূর্ণ ফাঁকা হয়ে রইল। কোনো চিন্তা নেই, কোনো দর্শন নেই, কোনো ইউক্রেন-রাশিয়ার বর্ডার নেই। শুধু এক ধরনের অদ্ভূত, শূন্য প্রশান্তি। কিন্তু এই প্রশান্তির আয়ু খুব কম। আস্তে আস্তে আমার শ্বাস স্বাভাবিক হয়ে এল। আমি চোখ খুললাম। রাস্তার হলুদ আলোটা এখনো আমার বিছানায় পড়ে আছে। সিলিং ফ্যানটা আগের মতোই ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করছে। আমার এক হাতে মোবাইলটা ধরা, স্ক্রিনে তখনো আনিকা নাওহারের সেই ওভারকোট পরা শালীন ছবিটা জ্বলজ্বল করছে।

হঠাৎ করে আমার ভেতরে এক ধরনের তীব্র অপরাধবোধ এবং একাকিত্ব ভর করল। পোস্ট-কয়টাল ট্রিস্টেস (Post-coital tristesse)— যৌন স্খলনের পর মানুষের মনে যে হঠাৎ করে একটা তীব্র বিষণ্ণতা নেমে আসে, এটা বিজ্ঞানেরই একটা প্রমাণিত বিষয়। কিন্তু আমার এই বিষণ্ণতাটা বিজ্ঞানের চেয়েও অনেক বেশি বাস্তব। আমি বাথরুমে গেলাম। নিজেকে পরিষ্কার করে বেসিনের আয়নায় নিজের দিকে তাকালাম।

আমি এইমাত্র একজন বুদ্ধিমতী, অভিজাত এবং আমার চেয়ে যোজন যোজন দূরের এক বিবাহিতা নারীর সম্পূর্ণ শালীন একটা ছবি দেখে মাস্টারবেট করেছি। আমার নিজেকে খুব ক্ষুদ্র, খুব নোংরা এবং খুব একা মনে হলো।

মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য কী? নারী?

যদি তা-ই হয়, তবে সেই উদ্দেশ্য পূরণের জন্য আমি যে পথটা বেছে নিয়েছি, সেটা আমার নিজের কাছেই খুব করুণ মনে হচ্ছে। আমি জানি, আনিকা নাওহারের সাথে বাস্তবে আমার কোনোদিন এরকম কিছু হবে না। আমি কেবল অন্ধকারে শুয়ে কল্পনার ফানুস উড়াতে পারি।

আমি তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে রুমে ফিরে এলাম। মোবাইলটা চার্জে লাগিয়ে আমি আবার বিছানায় শুয়ে পড়লাম। বাইরে ঢাকা শহরটা ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। কাল সকালে আবার আমাকে উঠতে হবে, আবার সেই বিকল্প বাসে ঝুলতে হবে, আবার সেই অন্যের খবর অনুবাদ করতে হবে। আমি চোখ বন্ধ করলাম। আমার হাতের তালুতে তখনো আনিকা নাওহারের কল্পিত উষ্ণতা লেগে আছে। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। এই শহরে আমার মতো বিরক্তিকর মানুষের বেঁচে থাকার জন্য হয়তো মাঝে মাঝে এরকম কিছু আদিম, নোংরা এবং গোপন কল্পনার প্রয়োজন হয়। নাহলে এই একঘেয়ে রুটিনের চাপে আমি হয়তো কবেই পাগল হয়ে যেতাম।



RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - Bad Boy - 09-21-2026

৭


ফেব্রুয়ারি মাসের ষোলো তারিখ। সোমবার। আজ আমার ডে-অফ। সকাল থেকেই আমার ভেতরে এক ধরনের অদ্ভুত ছটফটানি কাজ করছিল। ব্যাচেলর মানুষদের ছুটির দিন সাধারণত কাটে ঘুমিয়ে, মেসের মিলের হিসাব কষে, অথবা সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে জীবনের উদ্দেশ্য হাতড়ে। কিন্তু আজ আমার রুটিন ভিন্ন। আমি আজ বইমেলায় যাব।

বইমেলায় যাওয়ার পেছনে একটা খুব শক্ত লজিক আমি নিজেকে দিয়েছি। আমি একজন অনুবাদক। আমাকে প্রচুর পড়তে হয়। আমার কিছু ডিকশনারি কেনা দরকার। বিশেষ করে একটা ভালো স্প্যানিশ-টু-ইংলিশ ডিকশনারি, আর গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের কয়েকটা বইয়ের নতুন অনুবাদ। এই লজিকটা এতটাই শক্ত যে, আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখে চোখ রেখে বললাম, “রাশেদ, তুমি নিতান্তই সাহিত্যের টানে মেলায় যাচ্ছ। এর বাইরে অন্য কোনো উদ্দেশ্য তোমার নেই।”

কিন্তু পাঠকদের কাছে আমি মিথ্যা বলতে চাই না। আমি জানি আমি কেন মেলায় যাচ্ছি। আমি মেলায় যাচ্ছি আনিকা নাওহারকে দেখতে। ব্যাপারটা আসলে হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া কোনো সমাপতন নয়। গত কয়েকদিন ধরে আমি একটা অদ্ভুত রোগে ভুগছি। রোগের নাম— ‘ফেসবুক স্টকিং’। আনিকা নাওহার আমাকে উনার নাম্বার দিয়েছিলেন পাণ্ডুলিপি পাঠানোর জন্য। আমি অত্যন্ত স্মার্ট একটা ছেলের মতো সেই নাম্বারটা সেভ করেছিলাম, কিন্তু উনাকে ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানোর সাহস আমার হয়নি। ঢাকা শহরের পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের একজন অনুবাদক, ইংল্যান্ড প্রবাসী এক কোটিপতি আইটি ফার্মের মালকিনকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাবে— এটা ভাবতেই আমার আঙুল কেঁপে যেত।

কিন্তু রিকোয়েস্ট না পাঠালেও, ফেসবুকের মার্ক জাকারবার্গ সাহেব স্টকিং করার চমৎকার ব্যবস্থা করে রেখেছেন। আনিকা নাওহারের প্রোফাইল লক করা নেই। পাবলিক প্রোফাইল। আমি দিনে অন্তত তিনবার সেই প্রোফাইলে ঢুঁ মারি। আজ সকালেই উনার প্রোফাইলে একটা পোস্ট দেখলাম। বাংলা একাডেমির বটতলার একটা ছবি দিয়ে উনি লিখেছেন— "আজকের বিকেলটা কাটবে চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীর স্টলে। প্রিয় পাঠকদের অপেক্ষায়।"

ব্যাস। আমার ডিকশনারি কেনার লজিকটা সাথে সাথেই জন্ম নিয়ে নিল। বিকেল চারটার দিকে আমি মেলায় পৌঁছালাম। বাংলা একাডেমি আর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মাঝখানে যে ধুলাবালি আর মানুষের সমুদ্র, তার ভেতরে আমি নিজেকে সঁপে দিলাম। ঢাকা শহরের মানুষ এমনিতেই বই পড়ে কম, কিন্তু বইমেলায় আসে সবচেয়ে বেশি। মেলায় আসাটা আমাদের একটা বাৎসরিক তীর্থযাত্রার মতো হয়ে গেছে।

আমি লিটল ম্যাগ চত্বর ঘুরে, এদিক-ওদিক ধাক্কা খেয়ে কয়েকটা বই কিনলাম। একটা স্প্যানিশ ডিকশনারি, আর দু-চারটে অনুবাদের বই। বইগুলো একটা পলিথিনের ব্যাগে ঝুলিয়ে আমি খুব ধীর পায়ে চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীর স্টলের দিকে এগোতে লাগলাম। স্টলের কাছাকাছি আসতেই আমার বুকের ভেতর ধুকপুকানি শুরু হয়ে গেল। আমি দূর থেকে স্টলটা দেখতে পাচ্ছিলাম। বেশ বড় স্টল। সামনে অনেক মানুষের ভিড়। সেলসের দুজন ছেলে দাঁড়িয়ে ঘাম মুছতে মুছতে বই বিক্রি করছে।

আমি চোখ ঘুরিয়ে আনিকা নাওহারকে খুঁজলাম। হ্যাঁ, উনি আছেন। স্টলের ভেতরের দিকে, যেখানে একটু বসার জায়গা করা হয়েছে, সেখানে উনি বসে আছেন। উনার পরনে আজ একটা অফ-হোয়াইট রঙের শাড়ি, সাথে কালো রঙের স্লিভলেস ব্লাউজ। উনার খোলা চুলগুলো কাঁধের এক পাশ দিয়ে সামনে এসে পড়েছে। উনার হাতে একটা কফির কাপ। কিন্তু আমার চোখ আটকে গেল উনার সামনের চেয়ারটায়। সেখানে বসে আছেন কবি সৈকত আমিন।

সৈকত আমিন এই প্রজন্মের একজন বেশ জনপ্রিয় কবি। উনার কবিতার চেয়ে উনার গলার স্বর, উনার চাপদাড়ি, আর উনার কাঁধে ঝোলানো খদ্দরের ঝোলাব্যাগটা বেশি জনপ্রিয়। উনি অত্যন্ত রোমান্টিক ভঙ্গিতে আনিকার দিকে ঝুঁকে পড়ে কথা বলছেন, আর আনিকা উনার কথায় হেসে উঠছেন। দৃশ্যটা দেখার সাথে সাথে আমার পেটের ভেতর একটা অদ্ভুত মোচড় দিয়ে উঠল। অ্যাসিডিটি হলে মানুষের পেটে যেমন একটা জ্বালাপোড়া শুরু হয়, আমার ঠিক তেমন একটা জ্বালাপোড়া শুরু হলো। কিন্তু এটা গ্যাস্ট্রিকের জ্বালাপোড়া নয়, এটা জেলাসি। ঈর্ষা।

আমি অবাক হয়ে নিজেকে প্রশ্ন করলাম, আমি জেলাস ফিল করছি কেন? আনিকা নাওহার আমার কে? কেউ না। উনি একজন বিবাহিত নারী, ইংল্যান্ডে থাকেন। আমি উনার বইয়ের একজন সামান্য প্রুফরিডার মাত্র। সৈকত আমিনের মতো প্রতিষ্ঠিত কবি উনার সাথে বসে কফি খাবে, গল্প করবে— এটাই তো স্বাভাবিক। আমি কেন ঈর্ষায় জ্বলে যাচ্ছি? মানুষের মন বড়ই অদ্ভুত। লজিক দিয়ে ঈর্ষাকে ঠেকিয়ে রাখা যায় না। আমার মনে হচ্ছিল, আমি এক্ষুনি গিয়ে সৈকত আমিনের দাড়িগুলো ধরে টান দিই, আর বলি— "ভাই, আপনি কবিতা লেখেন ভালো কথা, কিন্তু এত কাছে ঘেঁষে কথা বলছেন কেন?"
কিন্তু আমি তো আর রাস্তার গুণ্ডা নই, আমি একজন ভদ্র অনুবাদক। আমি স্টলের সামনে গিয়ে এমন একটা ভাব ধরলাম যেন আমি এই পৃথিবীতে আনিকা নাওহার বা সৈকত আমিন নামের কাউকে চিনিই না। আমি সেলসের ছেলেটার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর মুখে বললাম, "ভাই, মার্কেজের 'হান্ড্রেড ইয়ারস অফ সলিচ্যুড'-এর নতুন অনুবাদটা কি আপনাদের এখানে বের হয়েছে?"

আমি আনিকাদের দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে বইয়ের পাতা উল্টাতে লাগলাম। একটা লাইন আমি অন্তত পাঁচবার পড়লাম, কিন্তু মাথার ভেতর কিছুই ঢুকল না। আমার পুরো মনোযোগ আমার পিঠের পেছনে।
হঠাৎ একটা পরিচিত , মোহনীয় কণ্ঠস্বর আমার কানে ভেসে এল।"আরে, এই রাশেদ সাহেব না?" আমি এমনভাবে চমকে ওঠার ভান করলাম, যেন আমি মেলায় এসে আনিকা নাওহারকে দেখে রীতিমতো আকাশ থেকে পড়েছি। "ওহ! আনিকা আপা! আপনি এখানে?"

আনিকা কফির কাপটা টেবিলে রেখে উঠে দাঁড়ালেন। "আমি তো থাকবই, আমার বইয়ের স্টল। কিন্তু আপনি মেলায়? আজকে তো আপনার অফিস থাকার কথা।" আমি খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বললাম, "আজ সোমবার। আমার ডে-অফ। ভাবলাম মেলা থেকে কিছু ডিকশনারি কিনে নিয়ে যাই।" আনিকা আমার দিকে এগিয়ে এলেন। উনার সেই চেনা দামি পারফিউমের গন্ধটা মেলা প্রাঙ্গণের ধুলাবালির গন্ধকে হারিয়ে দিয়ে আমার নাকে এসে ঢুকল।

সৈকত আমিনও উঠে দাঁড়ালেন। আনিকা আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। "সৈকত ভাই, এ হচ্ছে রাশেদ। আমার বইয়ের চমৎকার এডিটিং আর প্রুফরিডিংয়ের পেছনে এর অবদান অনেক।"

সৈকত আমিন আমার দিকে এমন একটা অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকালেন, যেন আমি মেলা প্রাঙ্গণের ঝাড়ুদার। উনি হাত মেলালেন না, শুধু মাথা নেড়ে বললেন, "ও আচ্ছা।"

তারপর আনিকার দিকে ফিরে বললেন, "আনিকা, আমি তাহলে উঠি। ওইদিকে আরেকটা স্টলে আমার পাঠকরা অপেক্ষা করছে। আমি কাল আপনাকে ফোন দেব।" আনিকা হাসিমুখে বিদায় দিলেন।

সৈকত আমিন চলে যাওয়ার পর আমার ভেতরের সেই অ্যাসিডিটিটা যেন জাদুর মতো গায়েব হয়ে গেল। আমার মনে হলো, আমি যেন কোনো অলিম্পিক গেমসে গোল্ড মেডেল জিতে গেছি।
আনিকা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "চলুন, মেলাটা একটু ঘুরে দেখি। এই স্টলে বসে থাকতে থাকতে আমার কোমরে ব্যথা হয়ে গেছে।" আমরা দুজন স্টল থেকে বেরিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম।
মেলায় প্রচুর ভিড়। আনিকা নাওহার আমার ঠিক পাশ ঘেঁষে হাঁটছেন। ভিড়ের কারণে মাঝে মাঝেই উনার শরীরের নরম স্পর্শ আমার বাহুতে এসে লাগছে। প্রতিটা স্পর্শে আমার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা বিদ্যুতের ঝটকা নেমে যাচ্ছে।

আমি খুব চেষ্টা করছি স্বাভাবিক থাকার। কিন্তু আমার চোখ বারবার অবাধ্য হয়ে যাচ্ছে। উনার অফ-হোয়াইট শাড়ির ফাঁক দিয়ে উনার ফর্সা, মেদহীন কোমরের একটা অংশ বারবার উঁকি দিচ্ছে। উনার হাঁটার ছন্দে উনার সেই ৩৬-২৮-৩৬ জ্যামিতির নিখুঁত ঢেউগুলো এমনভাবে দুলছে যে, আমার মনে হচ্ছিল আমি যদি এখন অনুবাদ বাদ দিয়ে এই নারীকে নিয়ে কবিতা লিখতে বসতাম, তাহলে সৈকত আমিনকে দশ গোল দিয়ে দিতাম।

"রাশেদ, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?" আনিকার কথায় আমি চমকে উনার দিকে তাকালাম।
"জি, বলুন।"
"আপনি আমার সামনে এত জড়তা দেখাচ্ছেন কেন? আপনি তো খুব দারুণ কথা বলেন। সেদিন বইয়ের মোড়ক উন্মোচনে কী সুন্দর করে শূন্যতা, আইডেন্টিটি ক্রাইসিস নিয়ে কথা বললেন! তাহলে এখন এত কম কথা বলছেন কেন?"

আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। আমি উনাকে কীভাবে বোঝাব যে, উনার শারীরিক এই অদ্ভুত মোহনীয়তা আমাকে কথা বলতে দিচ্ছে না? আমার মাথার ভেতর শুধু একটাই চিন্তা— এই নারীর শরীরের প্রতিটি ভাঁজ, প্রতিটি বাঁক এত নিখুঁত হয় কীভাবে? আমি গলা পরিষ্কার করে বললাম, "আসলে আমি এমনিতেই কথা কম বলি। আর ঢাকা শহরের এই ভিড়ের মধ্যে কথা বলতে গেলে এনার্জি নষ্ট হয়। আমি বরং আপনার কথা শুনতে বেশি পছন্দ করছি।"

আনিকা খিলখিল করে হেসে উঠলেন। "আপনি খুব ডিপ্লোম্যাটিক আনসার দেন। এনিওয়ে, আপনি কী বই কিনলেন?"  আমি আমার পলিথিনের ব্যাগটা উনার দিকে বাড়িয়ে দিলাম। "কিছু ডিকশনারি আর অনুবাদের বই। আর হ্যাঁ... আমার নিজের একটা বইও ব্যাগে আছে। এটা আমার প্রথম দিকের একটা স্প্যানিশ অনুবাদ। খুব একটা চলেনি বাজারে। কপিটা মেলায় একটা পুরোনো স্টলে পেলাম, তাই নিজের জন্যই কিনে নিলাম।"

আনিকা বইটা আমার হাত থেকে নিলেন। বইটার নাম  'অন্ধকার গোলকধাঁধা'। উনি বইয়ের প্রচ্ছদটা হাত বুলিয়ে দেখলেন।"আমি এই বইটা নেব," আনিকা বললেন।
"আপনার পড়ে ভালো লাগবে না। অনুবাদ খুব কাঁচা।"
"তাতে কী? এটা আমার এডিটরের বই। আমি অবশ্যই পড়ব। দাঁড়ান, আমি একটা ছবি তুলি।"

আনিকা উনার আইফোনটা বের করলেন। "রাশেদ, বইটা আমাকে দেওয়ার মতো করে ধরে দাঁড়ান।" আমি উনার দিকে বইটা বাড়িয়ে ধরলাম। উনি এক হাতে বইটা ধরে, আরেক হাতে ক্যামেরা অন করে একটা ছবি তুললেন। ছবি তোলা শেষ করে উনি বললেন, "আমি এই ছবিটা ফেসবুকে আপলোড করে আপনার বইয়ের একটা সুন্দর বিজ্ঞাপন দিয়ে দেব। দেখবেন, আগামী বছর আপনার বইয়ের কাটতি বেড়ে গেছে।"

আমি হাসলাম।

"এবার বলুন," আনিকা আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বললেন, "আমার কাছ থেকে এত বড় একটা ফেভার পাচ্ছেন, বিনিময়ে আমাকে কী খাওয়াবেন?"
প্রশ্নটা শোনার সাথে সাথে আমার মাথার ভেতর আমার সেই বন্য, আদিম সত্তাটা চিৎকার করে উঠল— "আমার শরীর! আমি আমার শরীর খাওয়াতে চাই আপনাকে!"

কিন্তু আমি তো রাশেদ আহমেদ। আমাকে ভদ্রতার মুখোশ পরে থাকতে হয়। আমি সেই আদিম চিৎকারটাকে গলার কাছে আটকে রেখে, অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং নিরীহ ভঙ্গিতে বললাম, "চলুন, আপনাকে মেলা প্রাঙ্গণের সবচেয়ে ভালো চা খাওয়াই। এখানে একটা স্টলে খুব চমৎকার মাল্টা চা বানায়।" আনিকা হাসলেন। "ডান। চলুন।"

আমরা চা খেলাম। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আমি আমার সেই মাস্টারস্ট্রোকটা খেললাম। আমি খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বললাম, "আনিকা আপা, আপনি যখন ফেসবুকে ছবিটা আপলোড করবেন, তখন আমাকে একটু ট্যাগ করে দিয়েন। তাহলে আমার বন্ধুরাও দেখতে পাবে।"

আনিকা চায়ের কাপ নামিয়ে একটু ভ্রু কুঁচকে বললেন, "ট্যাগ করব কীভাবে? আপনি তো আমার ফ্রেন্ডলিস্টেই নেই।" আমি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললাম, "ওহ, তাই তো! খেয়ালই ছিল না। আপনি বরং আমাকে একটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দিন। আমি অ্যাকসেপ্ট করে নেব।"

এটা ছিল আমার জীবনের অন্যতম সেরা একটা ট্রিক। আমি নিজে রিকোয়েস্ট পাঠালে সেটা কেমন যেন ‘ডেসপারেট’ মনে হতো। কিন্তু আমি পরিস্থিতি এমনভাবে তৈরি করলাম যে উনি নিজেই আমাকে রিকোয়েস্ট পাঠাতে বাধ্য হলেন। আনিকা সাথে সাথেই ফোন বের করে আমার নাম সার্চ করলেন। "এই যে, রাশেদ আহমেদ। প্রোফাইল পিকচারে একটা কালো বিড়ালের ছবি। তাই না?"

"জি।"
"পাঠিয়ে দিয়েছি। অ্যাকসেপ্ট করুন।"

আমি ফোন বের করে রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করলাম। আমার ভেতরে তখন একটা দামামা বাজছে। আমি আনিকা নাওহারের ফ্রেন্ডলিস্টে ঢুকে গেছি। মেলা থেকে মেসে ফিরতে ফিরতে রাত নয়টা বেজে গেল।

আজ মেসে রহিমা খালা আসেননি। রাজু আর তুহিন মিলে বাইরে থেকে তেহারি কিনে এনেছে। আমি কোনোমতে একটু তেহারি মুখে গুঁজে নিজের রুমে এসে দরজা বন্ধ করে দিলাম। সারাটা দিন আমার বেশ ভালো কেটেছে। কিন্তু রুমে ঢোকার পর থেকেই আমার ভেতর এক ধরনের অদ্ভুত, অস্বস্তিকর নেশার টান পড়তে শুরু করল। আমার মনে হচ্ছে আমার শরীরে অক্সিজেনের অভাব হচ্ছে। আমার হাতের তালু ঘামছে।

আমি জানি এই নেশাটা কীসের। আমি লাইটটা বন্ধ করে দিলাম। শুধু আমার টেবিল ল্যাম্পটা জ্বলছে। আমি পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলাম। আমার শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হতে শুরু করেছে। আমি মোবাইলটা হাতে নিয়ে বাথরুমের দিকে পা বাড়ালাম। ব্যাচেলরদের মেসে বাথরুম হলো একমাত্র পবিত্র এবং একান্ত নিজস্ব জায়গা। যেখানে পৃথিবীর কেউ আপনাকে ডিস্টার্ব করবে না।

আমি বাথরুমের দরজা ভেতর থেকে ছিটকিনি আটকে দিলাম। কমোডের ঢাকনাটা ফেলে তার ওপর বসলাম। বাথরুমের ভেতরের সাদা টাইলসগুলো একটু স্যাঁতস্যাঁতে, একটা ফিনাইলের গন্ধ ভাসছে বাতাসে। আমার আঙুলগুলো কাঁপছে। আমি ফেসবুক অ্যাপটা ওপেন করলাম। সোজা চলে গেলাম আনিকা নাওহারের প্রোফাইলে। আজ মেলায় তোলা সেই ছবিটা উনি আপলোড করেছেন। ক্যাপশনে লিখেছেন— "আমার প্রিয় প্রুফরিডার এবং চমৎকার একজন অনুবাদক রাশেদের সাথে বইমেলার এক পড়ন্ত বিকেল।" আমাকে ট্যাগ করা হয়েছে। ছবিতে শত শত লাইক আর কমেন্ট পড়ছে।
কিন্তু আমি ওই ছবির দিকে তাকালাম না। আমার উদ্দেশ্য ভিন্ন।

আমি উনার 'ফটোস' সেকশনে গেলাম। 'অ্যালবামস'-এ ক্লিক করলাম। উনার অনেকগুলো অ্যালবাম। 'লন্ডন ডায়েরিজ', 'বইমেলা ২০২৩', 'প্যারিস ভ্যাকেশন'। আমি স্ক্রল করতে করতে নিচের দিকে নামতে লাগলাম। আমার চোখ খুঁজছে এমন কিছু, যা আমার ভেতরের এই আদিম, বন্য নেশাটাকে শান্ত করতে পারে।

হঠাৎ একটা অ্যালবামে এসে আমার আঙুল থেমে গেল। অ্যালবামের নাম— 'বালি গেটঅ্যাওয়ে - ২০২১'। আমি অ্যালবামটা ওপেন করলাম। প্রথম ছবিটা দেখেই আমার মস্তিষ্কে যেন একটা শর্টসার্কিট হয়ে গেল। আমার চোখের তারা বড় হয়ে এল। ছবিটা একটা সুইমিংপুলের। আনিকা নাওহার পুলের নীল জলের ভেতর দাঁড়িয়ে আছেন। উনার পরনে একটা কালো রঙের টু-পিস সুইমস্যুট।

আমি আমার ট্রাউজারের বোতামটা খুলে ফেললাম। আমার ডান হাতের বুড়ো আঙুলটা মোবাইলের স্ক্রিনের ওপর, আর আমার বাম হাত চলে গেল আমার ট্রাউজারের ভেতর। আমার শরীরের সমস্ত রক্ত যেন এক জায়গায় এসে জমা হয়েছে। আমার সেই সুখের দণ্ডটি এখন চরম উত্তেজনায় পাথরের মতো কঠিন হয়ে আছে। আমি বাম হাত দিয়ে আমার সুখের দণ্ডটিকে মুঠি করে ধরলাম। আর ডান হাত দিয়ে ছবিগুলো একটা একটা করে সুইপ করতে লাগলাম।

দ্বিতীয় ছবি। আনিকা পুলের পাড়ে একটা ডেকচেয়ারে শুয়ে আছেন। উনার শরীর সম্পূর্ণ শুকনো। সূর্যের আলো উনার ফর্সা, মসৃণ ত্বকের ওপর ঠিকরে পড়ছে। কালো সুইমস্যুটের ওপরের অংশটা উনার ভরাট বক্ষদেশকে কোনোমতে আটকে রেখেছে। উনার দুই বক্ষের মাঝখানের সেই গভীর খাঁজটা আমার চোখের সামনে উন্মুক্ত। আমি চোখ বন্ধ করলাম। বাম হাতের মুঠিটা আরও শক্ত করে আমার সুখের দণ্ডের ওপর ওপর-নিচ করতে লাগলাম। আমার শ্বাস-প্রশ্বাস বাথরুমের দেয়ালে ধাক্কা খাচ্ছে।

আমি কল্পনায় দেখতে পাচ্ছি, আমি সেই বালির সুইমিংপুলে আনিকার ওপর ঝুঁকে আছি। উনার সেই ফর্সা, রোদ-পোহানো শরীরটা আমার নিচে। আমি উনার কালো সুইমস্যুটের ফিতেগুলো দাঁত দিয়ে টেনে খুলে ফেলছি। উনার সেই উন্মুক্ত, উদ্ধত বক্ষচূড়া দুটো আমার ঠোঁটের নিচে। ডান হাতে আমি আরেকটা ছবি সুইপ করলাম।

এবার আনিকা পুলের জলের ভেতর থেকে অর্ধেক শরীর তুলে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাসছেন। উনার চুলগুলো ভিজে গলার কাছে লেপ্টে আছে। পানির কারণে সুইমস্যুটের কাপড়টা উনার শরীরের সাথে একদম মিশে গেছে, যার ফলে উনার নাভির গভীরতা এবং কোমরের নিচের সেই নিখুঁত বাঁকটা স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে। আমি কল্পনার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে গেলাম। আমার বাম হাতের গতি এখন একটা যন্ত্রের মতো হয়ে গেছে। ঘর্ষণের ফলে আমার হাতের তালুতে এক ধরনের উত্তাপ তৈরি হয়েছে।

আমি কল্পনায় আনিকাকে পুলের পানির ভেতরে জড়িয়ে ধরলাম। উনার ভেজা , পিচ্ছিল শরীরটা আমার শরীরের সাথে ঘষা খাচ্ছে। আমি উনার মসৃণ ঊরু দুটোর মাঝখানে আমার শরীরটাকে স্থাপন করেছি। উনার দুই হাত আমার গলা জড়িয়ে ধরে আছে। আমি পাগলের মতো উনার ঘাড়, উনার বুক, উনার ভেজা ঠোঁট চুম্বন করছি।"আনিকা..." আমি বাথরুমের নিস্তব্ধতায় ফিসফিস করে উনার নাম উচ্চারণ করলাম।

আমার কল্পনায় আনিকার চোখ দুটো কামনায় বুজে আসছে। উনি আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বলছেন, "রাশেদ... আরও... আরও..." আমার শরীরের সমস্ত স্নায়ু টানটান হয়ে ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। আমার তলপেটের নিচে একটা প্রচণ্ড চাপ তৈরি হচ্ছে। আমি জানি, আমি আর বেশিক্ষণ এই উত্তেজনা ধরে রাখতে পারব না। আমি আরেকটা ছবি সুইপ করলাম। এই ছবিতে আনিকা পুলের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছেন। পেছন থেকে তোলা ছবি। উনার সেই সুডৌল, আকর্ষণীয় নিতম্বের গঠনটা সম্পূর্ণ অনাবৃত প্রায়।

ছবিটা দেখার সাথে সাথেই আমার ভেতরের সেই বাঁধ ভেঙে গেল। একটা তীব্র, বৈদ্যুতিক স্রোত আমার মেরুদণ্ড বেয়ে ওপরে উঠে এল। আমি মাথাটা পেছনের দিকে হেলিয়ে দিলাম। আমার মুখ দিয়ে একটা অস্ফুট, বন্য গোঙানি বের হয়ে এল। এবং সেই মুহূর্তেই আমার সুখের দণ্ড থেকে এক প্রচণ্ড, উষ্ণ স্খলনের মাধ্যমে আমার সমস্ত জমানো উত্তেজনা, সমস্ত নেশা, সমস্ত ফ্যান্টাসি ছিটকে বেরিয়ে এল বাথরুমের মেঝের ওপর।

আমি হাঁপাতে লাগলাম। আমার বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে। হাতের মুঠোটা শিথিল হয়ে গেছে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমার মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে গেল। কোনো ছবি নেই, কোনো কল্পনা নেই। আনিকা নাওহার নেই। তারপর ধীরে ধীরে সেই পরিচিত, তীব্র নিস্তেজতা এবং অপরাধবোধ আমাকে গ্রাস করতে শুরু করল।

পোস্ট-নাট ক্ল্যারিটি (Post-nut clarity)।

আমি মোবাইলটা লক করে কমোডের ওপর রাখলাম। আমার বাম হাতে এবং বাথরুমের ফ্লোরে আমার কামনার চিহ্নগুলো একটা সাদা, আঠালো তরল হয়ে পড়ে আছে। আমি বাথরুমের আয়নায় নিজের দিকে তাকালাম। চোখগুলো লাল হয়ে আছে। চুল উষ্কখুষ্ক। আমি রাশেদ আহমেদ। একজন অনুবাদক। আমি একটু আগে বইমেলায় গিয়েছিলাম, অত্যন্ত ভদ্রভাবে সাহিত্যের কথা বলেছিলাম। আর এখন, মেসে ফিরে এসে বাথরুমের ভেতর এক বিবাহিতা নারীর ছবি দেখে একটা পশুর মতো মাস্টারবেট করলাম।

মানুষের দুটো রূপ থাকে। একটা সে সমাজকে দেখায়, আরেকটা সে বাথরুমের দরজা বন্ধ করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখায়। আমি পানির ট্যাপটা ছেড়ে দিলাম। ঠান্ডা পানি দিয়ে হাত পরিষ্কার করতে করতে ভাবলাম, আমার এই ফ্যান্টাসির শেষ কোথায়? এই যে আমি আনিকা নাওহারকে নিয়ে এই অসম্ভব, নোংরা অথচ তীব্র উত্তেজনাময় কল্পনার জগতে ঢুকে পড়েছি— এখান থেকে আমি বের হবো কীভাবে? নাকি আমি বের হতে চাইই না?

আমি মুখ ধুয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলাম। রুমের ফ্যানটা এখনো ক্যাঁচক্যাঁচ করে ঘুরছে। আমি বিছানায় এসে শুয়ে পড়লাম। আমার শরীরটা এখন সম্পূর্ণ নিস্তেজ। কোনো শক্তি নেই। কিন্তু আমার মাথার ভেতর একটা জিনিস খুব পরিষ্কার হয়ে গেছে। আমি আনিকা নাওহারের প্রেমে পড়িনি। আমি উনার শরীরের প্রেমে পড়েছি। উনার সেই ৩৬-২৮-৩৬-এর জ্যামিতির প্রেমে পড়েছি। আর এই প্রেমটা আমাকে ধীরে ধীরে একটা অন্ধকারের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। যে অন্ধকারের শেষ কোথায়, সেটা আমি নিজেও জানি না।



RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - Bad Boy - 09-21-2026

৮

ফেব্রুয়ারি মাসের ষোল তারিখের পর থেকে আমার জীবনের রুটিন, দর্শন এবং ব্যাংক ব্যালেন্স— এই তিনটিরই আমূল পরিবর্তন ঘটল। আমি সবসময় নিজেকে অতি হিসেবি, ম্যাড়ম্যাড়ে এবং রুটিন-বাঁধা মানুষ হিসেবে দাবি করে এসেছি। আমার কাছে জীবন একটা এক্সেল শিটের মতো। কোথায় কত খরচ হবে, কোথায় কতটুকু আবেগ দেখানো হবে, তার সবকিছুর একটা নির্দিষ্ট ছক কাটা। কিন্তু আনিকা নাওহার নামের সেই ছত্রিশ বছর বয়সী, লন্ডন প্রবাসী, বিবাহিতা নারী আমার এক্সেল শিটে এমন  ভাইরাস ঢুকিয়ে দিলেন যে পুরো সিস্টেম ক্র্যাশ করে গেল। ১৬ তারিখ রাতের পর থেকে পরবর্তী এক সপ্তাহ আমি প্রতিদিন বইমেলায় যাওয়া শুরু করলাম।


আমার অফিসের ডিউটি শেষ হয় সন্ধ্যা ছয়টায়। কারওয়ান বাজার থেকে শাহবাগ হয়ে টিএসসি— এই রাস্তার জ্যাম সম্পর্কে যার ন্যূনতম ধারণা আছে, সে জানে সন্ধ্যা ছয়টায় অফিস থেকে বের হয়ে কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ বইমেলায় যাওয়ার কথা ভাববে না। বইমেলা বন্ধ হয় রাত সাড়ে আটটায়। বাসে উঠলে আমি মেলায় পৌঁছাব মেলা বন্ধ হওয়ার ঠিক পনেরো মিনিট আগে। তখন বই দেখা তো দূরের কথা, মেলার ধুলো ওড়ার দৃশ্য দেখা ছাড়া আর কোনো কাজ থাকবে না। তাই আমি আমার পঁচিশ হাজার টাকা বাজেটের জীবনে এক চরম বিলাসী সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি বাসের বদলে উবার মোটো (Uber Moto) ব্যবহার করা শুরু করলাম।

উবার মোটো ঢাকা শহরের এক অদ্ভুত আবিষ্কার। এই সার্ভিসের বাইকাররা নিজেদেরকে ঢাকা শহরের রাস্তায় ভ্যালেন্টিনো রসি বা মার্ক মার্কেজ মনে করেন। তাদের কাছে ফুটপাত, ডিভাইডার, উল্টোপথ বলে কিছু নেই; তাদের লক্ষ্য একটাই— যেকোনো মূল্যে গন্তব্যে পৌঁছানো। সন্ধ্যা ছয়টা বাজার সাথে সাথে আমি এহসান ভাইয়ের ডেস্কের সামনে দিয়ে প্রায় দৌড়ে বের হতাম। এহসান ভাই অবাক হয়ে বলতেন, "কী ব্যাপার রাশেদ? এত তাড়া কীসের? বউ তো নাই যে বাসায় গিয়ে জবাবদিহি করতে হবে!"

আমি হাসিমুখে বলতাম, "বউ নাই ভাই, কিন্তু মেলা আছে। মেলা শেষ হয়ে যাচ্ছে।"

নিচে নেমে একটা উবার মোটো ডাকতাম। বাইকার এলে আমি পেছনে বসে বলতাম, "ভাই, আমার খুব তাড়া। সাড়ে ছয়টার ভেতর আমাকে টিএসসি পৌঁছাতে হবে। আপনি পারলে রকেটের মতো উড়ান।"

বাইকাররাও আমার মনের অবস্থা বুঝতে পারত কি না কে জানে, তারা কারওয়ান বাজারের জ্যাম এড়িয়ে, কখনো ফুটপাতের ওপর দিয়ে, কখনো রিকশার চাকার গা ঘেঁষে এমনভাবে বাইক চালাত যে, আমার মনে হতো মেলায় যাওয়ার আগে আমি হয়তো সোজা ঢাকা মেডিকেলের ইমার্জেন্সিতে গিয়ে পৌঁছাব।

কিন্তু এসব মৃত্যুভয় আমার মাথায় তখন কাজ করত না। আমার মাথায় শুধু একটা ছবি ঘুরত— আনিকা নাওহার। যতই জ্যাম থাকুক, বাইকারদের কল্যাণে আমি প্রতিদিন ছয়টা চল্লিশ থেকে ছয়টা পঞ্চাশের ভেতর মেলায় ঢুকে পড়তাম। প্রথম দুই দিনের কথা বলি। ১৭ এবং ১৮ তারিখ। এই দুই দিন আমি সম্পূর্ণ স্টকার (Stalker) মোডে ছিলাম। মেলায় ঢুকেই আমি আমার শিকারি চোখের দৃষ্টি জ্বেলে আনিকা নাওহারকে খুঁজতাম। মেলা প্রাঙ্গণের হাজার হাজার মানুষ, ধুলো, বইয়ের স্টল— সবকিছুর ভিড়ে আমি অত্যন্ত সন্তর্পণে এক স্টল থেকে আরেক স্টলে ঘুরতাম। আমার উদ্দেশ্য বই কেনা নয়, আমার উদ্দেশ্য ছিল দূর থেকে উনাকে দেখা।

১৭ তারিখে উনাকে দেখলাম অন্য একটা প্রকাশনীর স্টলে দাঁড়িয়ে আছেন। পরনে একটা গাঢ় সবুজ রঙের শাড়ি। সাথে একটা কালো শাল। শীতের আমেজ তখনো পুরোপুরি যায়নি। আমি ভিড়ের আড়ালে, একটা বড় স্টলের পিলারের পেছনে দাঁড়িয়ে উনাকে দেখছিলাম। উনি কয়েকজন তরুণের সাথে কথা বলছিলেন। উনার হাসির সময় গালে যে একটা ছোট টোল পড়ে, সেটা আমি দূর থেকেই খেয়াল করলাম।

১৮ তারিখে উনার পরনে ছিল একটা নীল সালোয়ার কামিজ। শাড়ির বাইরে উনাকে এই প্রথম দেখলাম। সালোয়ার কামিজে উনার সেই ৩৬-২৮-৩৬ জ্যামিতি আরও বেশি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছিল। বুকের ওড়নাটা একপাশে আলতো করে রাখা। আমি সেদিন একটা লিটল ম্যাগের স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে উনাকে দেখলাম। আমি দেখলাম উনি কীভাবে কথা বলার সময় হাত নাড়েন, কীভাবে মাথার চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দেন।

এই দুই দিন আমি উনার সামনে যাইনি। আমার ভেতরে এক ধরনের অদ্ভুত অপরাধবোধ আর সংকোচ কাজ করছিল। আমি তো উনার কেউ নই! আমি প্রতিদিন উনার সামনে গিয়ে দাঁড়ালে উনি কী ভাববেন? উনি তো আর বোকা নন। একজন নারী খুব সহজেই বুঝতে পারে কোন পুরুষ তাকে কোন দৃষ্টিতে দেখছে। আমি ভয় পাচ্ছিলাম, যদি আমার চোখের সেই আদিম ক্ষুধাটা উনি ধরে ফেলেন!

কিন্তু ১৯ তারিখে এসে আমার সব লজিক, সব লজ্জা কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সেদিন মেলায় ঢুকে আমি প্রায় এক ঘণ্টা ধরে পুরো সোহরাওয়ার্দী উদ্যান আর বাংলা একাডেমি চত্বর চষে ফেললাম, কিন্তু আনিকাকে কোথাও দেখলাম না। আমার বুকের ভেতর এক ধরনের অদ্ভুত শূন্যতা আর হাহাকার শুরু হলো। মনে হচ্ছিল, আজকের দিনটাই বৃথা হয়ে গেল। ঢাকা শহরের এত জ্যাম ঠেলে, বাইকের পেছনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আসাটাই লস!

আমি আর পারলাম না। লজ্জার মাথা খেয়ে, আমার সেই অতি-ভদ্র, ম্যাড়ম্যাড়ে অনুবাদক সত্তাটাকে গলা টিপে মেরে আমি পকেট থেকে ফোন বের করলাম। উনার নাম্বারে ডায়াল করলাম। কয়েকবার রিং হওয়ার পর উনি ফোন ধরলেন। "হ্যালো?" উনার সেই মোহনীয় কণ্ঠস্বর। মেলা প্রাঙ্গণের কোলাহলের মাঝেও গলাটা খুব স্পষ্ট শোনাল। আমার গলা একটু শুকিয়ে গেল। আমি একটু কেশে বললাম, 

"হ্যালো আনিকা? আমি রাশেদ বলছিলাম।"
"আরে রাশেদ! কেমন আছেন আপনি? উপন্যাসের ড্রাফট তো আর কিছু পাঠালাম না, আপনিও তো কোনো খোঁজ নিলেন না।"
"এই তো, আছি ভালোই। ড্রাফট পাঠান, আমি দেখে দেব। আপনি কি এখন মেলায় আছেন?" আমি খুব স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করার চেষ্টা করলাম।
"হ্যাঁ, মেলায় তো প্রতিদিনই আসি। এখন আছি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে। 'অক্ষরবৃত্ত' প্রকাশনীর স্টলের পেছনে যে কফি শপটা আছে, সেখানে বসে আছি। আপনি কি মেলায় নাকি?"
"জি, এইমাত্র এলাম। ভাবলাম আপনি থাকলে একটু দেখা করে যাই।"
"অফকোর্স! চলে আসুন এখানে। আমি আছি।"

ফোন রাখার পর আমার মনে হলো, আমি যেন এভারেস্ট জয় করে ফেলেছি। আমি দ্রুত পায়ে 'অক্ষরবৃত্ত' প্রকাশনীর স্টলের দিকে এগোলাম। পেছনে কফির দোকানে গিয়ে দেখলাম, আনিকা বসে আছেন। আজ উনার পরনে একটা ছাই রঙের শাড়ি, সাথে লাল ব্লাউজ। উনার সামনে টেবিলে কফির কাপ। আর উনার উল্টোদিকের চেয়ারে বসে আছে এক তরুণ। ছেলেটার চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, কাঁধে ঝোলা ব্যাগ। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, কবি বা সাহিত্য সমালোচক টাইপ কেউ হবে। আমি গিয়ে উনাদের টেবিলের সামনে দাঁড়ালাম। 

"আনিকা," আমি ডাকলাম।  আনিকা মুখ তুলে আমাকে দেখে খুব সুন্দর করে হাসলেন। "আসুন রাশেদ। বসুন।" উনি ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বললেন, "নিলয়, এ হচ্ছে রাশেদ। খুব ভালো একজন অনুবাদক। আর রাশেদ, এ হলো নিলয়। নতুন কবিতা লেখে।"  নিলয় আমার দিকে এমনভাবে তাকাল যেন আমি একটা অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র। আমি সেদিকে পাত্তা না দিয়ে আনিকার পাশের খালি চেয়ারটায় বসে পড়লাম। "তা রাশেদ, আজ কী বই কিনলেন?" আনিকা কফির কাপে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

আমি একটা মিথ্যা কথা বললাম। "তেমন কিছু না। আজকে মূলত হাঁটতে এসেছি।" নিলয় নামের ছেলেটা আবার তার সাহিত্যিক আলোচনা শুরু করল। "আনিকা আপা, আমি যেটা বলছিলাম, লাতিন আমেরিকান ম্যাজিক রিয়ালিজমের যে ধারাটা, সেটা কিন্তু আমাদের বাংলা সাহিত্যে ওভাবে আসেনি। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ একটু চেষ্টা করেছিলেন..." আমি ছেলেটার ম্যাজিক রিয়ালিজম নিয়ে কোনো আগ্রহ দেখালাম না। আমার ম্যাজিক রিয়ালিজম তখন আমার ঠিক পাশেই বসে আছে।

আমি আনিকার দিকে আড়চোখে তাকালাম। লাল রঙের স্লিভলেস ব্লাউজের হাতার কাছ দিয়ে উনার ফর্সা, মসৃণ বাহুটা উন্মুক্ত হয়ে আছে। শাড়ির আঁচলটা একটু সরে যাওয়ায় উনার কলারবোন বা কণ্ঠাস্থির নিখুঁত খাঁজটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আমি আমার দৃষ্টিকে খুব সাবধানে উনার মুখের দিকে ধরে রাখার চেষ্টা করছি, কিন্তু আমার চোখ বারবার সেই গভীর খাঁজগুলোর দিকে পিছলে যাচ্ছে। আমি মুখে অত্যন্ত গম্ভীর একটা ভাব ধরে রাখলাম। যেন আমি নিলয়ের ম্যাজিক রিয়ালিজমের কথায় খুব মনোযোগ দিচ্ছি। "রাশেদ, আপনার কী মনে হয়?" আনিকা হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন। আমি একটু নড়েচড়ে বসলাম। "আসলে, ম্যাজিক রিয়ালিজম ব্যাপারটা তো আমাদের যাপিত জীবনের সাথেই মিশে আছে। এই যে আমরা ঢাকা শহরে এত যানজট, এত দূষণের মাঝেও বেঁচে আছি, স্বপ্ন দেখছি— এটাই তো সবচেয়ে বড় ম্যাজিক রিয়ালিজম।"

আমার এই অত্যন্ত সস্তা এবং রেডিমেড দার্শনিক উত্তরে আনিকা বেশ ইমপ্রেসড হলেন বলে মনে হলো। উনি হাসলেন। নিলয় বুঝতে পারল যে তার একক আধিপত্যে ভাগ বসেছে। সে কিছুক্ষণ পর ঘড়ি দেখে উঠে পড়ল। নিলয় চলে যাওয়ার পর আনিকা আমার দিকে একটু ঝুঁকে এলেন। উনার পারফিউমের ঘ্রাণটা এবার আরও তীব্রভাবে আমাকে আঘাত করল।

"আপনার কিন্তু খুব সেন্স অফ হিউমার আছে রাশেদ। আপনি চুপচাপ থাকলেও, আপনার কথায় একটা তীক্ষ্ণতা থাকে," আনিকা বললেন।

আমি মনে মনে বললাম, আমার তীক্ষ্ণতা এখন আমার কথার চেয়ে আমার চোখের দৃষ্টিতে বেশি।"চলুন, মেলাটা একটু ঘুরি," আনিকা উঠে দাঁড়ালেন। সেই দিন থেকে শুরু হলো আমার জীবনের নতুন এক অধ্যায়। ১৯ তারিখ থেকে ২৩ তারিখ পর্যন্ত, মেলার শেষ দিনগুলোর প্রতিটা বিকেল এবং সন্ধ্যা আমি আনিকার সাথে কাটালাম। আমি অফিসে কাজ শেষ করেই উবার মোটোতে উড়ে মেলায় আসতাম। আনিকাকে খুঁজে বের করতাম। তারপর আমরা দুজন মিলে মেলায় হাঁটতাম।

এই চার-পাঁচ দিন আমি আনিকার সাথে প্রচুর কথা বলেছি। সাহিত্য, অনুবাদ, লন্ডন শহরের আবহাওয়া, উনার আইটি ফার্মের ব্যবসা, আমার অনুবাদক জীবনের হতাশা— সব কিছু। আনিকা খুব ভালো শ্রোতা। উনি যখন কথা শোনেন, তখন চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে থাকেন। উনার সেই বাদামি চোখের দৃষ্টিতে এমন একটা কিছু আছে, যা যেকোনো পুরুষকে মুহূর্তের জন্য হলেও সম্মোহিত করে ফেলতে পারে। 

কিন্তু আমার ভেতরের অবস্থাটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমরা যখন লিটল ম্যাগ চত্বরের পাশ দিয়ে হাঁটতাম, আমি উনাকে মার্কেজের অনুবাদ নিয়ে কথা বলতাম, আর আমার চোখ পড়ে থাকত উনার হাঁটার সময় কোমরের সেই নিখুঁত দুলুনির দিকে। আমরা যখন চা খেতাম, আমি উনাকে বলতাম কীভাবে স্প্যানিশ ভাষা থেকে বাংলায় অনুবাদ করতে গিয়ে কালচারাল গ্যাপ তৈরি হয়, আর আমার মন তখন ব্যস্ত থাকত উনার ঠোঁটের লিপস্টিকের রঙ আর উনার বক্ষদেশের সেই সুডৌল গঠনের পরিমাপ করতে।

আমার এই দ্বৈত সত্তা আমাকে মাঝে মাঝে নিজের কাছেই খুব অদ্ভুত বানাত। বাইরে থেকে আমি একজন নিরাসক্ত, বুদ্ধিদীপ্ত অনুবাদক, যে সাহিত্যের গভীরে ডুব দিতে পারে। আর ভেতরে আমি একজন ক্ষুধার্ত নেকড়ে, যে সুযোগ পেলেই এই অপরূপা নারীকে ছিঁড়েখুঁড়ে খেতে চায়। কী সুন্দর, কী অপরূপ, কী স্বর্গীয় কিছু হতে পারে এই নারীর শরীর! আমি মাঝে মাঝে উনার পাশে হাঁটতে হাঁটতে আনমনা হয়ে যেতাম। উনার শাড়ির কুঁচির নিচ দিয়ে যখন উনার হাইহিল পরা পায়ের গোড়ালিটা একটু দেখা যেত, আমার মনে হতো আমি বুঝি শ্বাস নিতে ভুলে গেছি।

কিন্তু আমার এই স্বর্গীয় অনুভূতির একটা চড়া মূল্য আমাকে চোকাতে হচ্ছিল। এবং সেটা হলো আর্থিক মূল্য। আনিকা নাওহার লন্ডন প্রবাসী। উনার লাইফস্টাইল অনেক উঁচু। উনি মেলার ধুলোমাখা টং দোকানের চা খেতে পারেন না। উনাকে নিয়ে যেতে হয় মেলার বাইরের ভালো কোনো কফিশপে। সেখানে দুই কাপ কফি আর হালকা স্ন্যাকসের বিল আসে আটশ থেকে হাজার টাকা। শুধু তাই নয়। মেলা শেষে আনিকাকে রিকশায় তুলে দেওয়ার দায়িত্বটাও আমি নিজের কাঁধে নিয়ে নিলাম। আনিকা থাকেন উনার এক আত্মীয়ের বাসায়, ধানমন্ডিতে। আমি মেলার গেট থেকে রিকশা ডাকতাম।

"আমি দিয়ে আসছি আপনাকে," আমি বলতাম।

আনিকা প্রথম দিন একটু আপত্তি করেছিলেন। "আরে না না, আপনি কেন যাবেন! আপনার তো মিরপুরে উল্টো রাস্তা।" আমি বীরদর্পে বলতাম, "তাতে কী? ঢাকা শহরে রাত আটটা আর রাত দশটা একই কথা। আমি নামিয়ে দিয়ে তারপর যাব।" রিকশায় আনিকার পাশে বসাটা ছিল আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রোমাঞ্চ। রিকশার ছোট্ট সিটে উনার শরীরের কিছুটা অংশ আমার শরীরের সাথে লেগে থাকত। ঢাকা শহরের স্পিডব্রেকার বা খানাখন্দে রিকশা যখন ঝাঁকুনি খেত, তখন উনার শরীরটা আরও একটু আমার দিকে হেলে পড়ত। আমি আমার বাম হাতটা রিকশার হুডের রড ধরে এমনভাবে রাখতাম, যেন আমার হাতের নিচেই আনিকার শরীরটা উত্তপ্ত আছে। উনার শ্যাম্পু করা চুলের ঘ্রাণ আর শ্যানেল পারফিউম মিলে রিকশার ভেতরের পরিবেশটাকে একটা স্বপ্নের মতো বানিয়ে দিত।

ধানমন্ডিতে উনাকে নামিয়ে দিয়ে, উনার রিকশা ভাড়া মিটিয়ে আমি যখন আরেকটা সিএনজি বা উবার নিয়ে মিরপুর ফিরতাম, তখন আমার পকেট কাঁদত। এই সাত দিনে আমার কী পরিমাণ খরচ হয়েছে, তার একটা হিসাব আমি মনে মনে করলাম। 

প্রতিদিন উবার মোটোতে কারওয়ান বাজার থেকে মেলায় যাওয়া— ২০০ টাকা।
আনিকাকে নিয়ে কফি শপে বসা— ১০০০ টাকা।
উনাকে ধানমন্ডি ড্রপ করার রিকশা ভাড়া— ১৫০ টাকা।
ধানমন্ডি থেকে আমার মিরপুর ফেরা— ৩০০ টাকা।
সব মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ষোলশো থেকে সতেরোশো টাকা।

সাত দিনে আমার খরচ হয়ে গেল প্রায় বারো হাজার টাকা! আমার সারা মাসের থাকা-খাওয়ার বাজেট পঁচিশ হাজার। আর আমি মাত্র সাত দিনে আমার বেতনের তিন ভাগের এক ভাগ একটা মেয়ের পেছনে উড়িয়ে দিলাম, যে মেয়ে কোনোদিন আমার হবে না, যাকে আমি কোনোদিন ছুঁতেও পারব না! আমার সেই 'উমরাহ ফান্ড'-এর তিন লাখ টাকার স্বপ্নটা দূর থেকে আমাকে ভেঙচি কাটতে লাগল। বাবা-মায়ের পবিত্র উমরাহ ফান্ডের টাকা আমি একজন বিবাহিত নারীর সাথে কফি খেয়ে আর রিকশায় ঘুরে শেষ করে দিচ্ছি।

আমি কি পাগল হয়ে গেলাম?

হ্যাঁ, আমি পাগলই হয়ে গিয়েছিলাম। লজিক, ভবিষ্যৎ, ব্যাংক ব্যালেন্স— কোনো কিছুই আমার এই উন্মাদনাকে আটকাতে পারছিল না। শুধু মেলায় দেখাই নয়, আমাদের যোগাযোগটা ভার্চুয়াল জগতেও ছড়িয়ে পড়ল। আমি মেসে ফিরে রাতে উনাকে মেসেজ দেওয়া শুরু করলাম। প্রথমে খুব প্রফেশনাল মেসেজ। 

আমি: "আজকের মেলাটা বেশ ভালো ছিল। আপনার নতুন বইয়ের রেসপন্স তো দেখলাম চমৎকার।" 
আনিকা: "সবই আপনাদের মতো পাঠকদের ভালোবাসা। আর হ্যাঁ, থ্যাংকস ফর ড্রপিং মি হোম। আপনি না থাকলে রিকশা পাওয়াই মুশকিল হতো।"
আমি: "এটা কোনো ব্যাপার না। ঢাকা শহরের এই জ্যামে আপনাকে একা ছেড়ে দেওয়াটা ঠিক হতো না।"

ধীরে ধীরে মেসেজের ধরন পাল্টাতে লাগল।

আনিকা: "আপনার কি স্প্যানিশ সাহিত্য ছাড়া অন্য কিছু পড়তে ভালো লাগে না?"
আমি: "লাগে। তবে স্প্যানিশদের মতো প্যাশন অন্য সাহিত্যে কম। আচ্ছা, আপনি সব সময় এত পারফেক্ট শাড়ি পরেন কীভাবে? লন্ডনে তো নিশ্চয়ই শাড়ি পরার সুযোগ পান না।"
আনিকা (হাসির ইমোজি): "শাড়ি পরাটা একটা আর্ট রাশেদ। এটা প্র্যাকটিসের চেয়ে ভেতরের অনুভূতির ওপর নির্ভর করে। আর আপনাকে কে বলল আমি পারফেক্ট শাড়ি পরি?"
আমি: "আমার অনুবাদকের চোখ বলছে। আপনার আজকের নীল শাড়িটা আপনাকে খুব মানিয়েছিল।"

এই ধরনের টুকটাক প্রশংসামূলক কথা, একটু ফ্লার্ট, একটু বুদ্ধিবৃত্তিক আলাপ— এভাবেই আমাদের রাতের চ্যাটগুলো দীর্ঘ হতে লাগল। আনিকাও বেশ এনজয় করছিলেন বলে মনে হলো। হয়তো ইংল্যান্ডের যান্ত্রিক জীবনে উনার বোরিং স্বামীর সাথে উনার এমন কোনো সাহিত্যিক বা ফ্লার্টিংয়ের স্পেস ছিল না। আমি উনার সেই স্পেসটা পূরণ করছিলাম। কিন্তু আমার ভেতরের গল্পটা তো শুধু চ্যাটিংয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না।

রাত বারোটা বা একটার দিকে আনিকা যখন মেসেজ দিতেন, "গুড নাইট রাশেদ, কাল দেখা হবে," তখন আমার আসল রাত শুরু হতো। আমি আমার মেসের বিছানা ছেড়ে বাথরুমে যেতাম। দরজাটা ভেতর থেকে ছিটকিনি দিয়ে আটকে দিতাম। তারপর আমার মোবাইলটা খুলতাম। আনিকা নাওহারের ফেসবুক প্রোফাইল। আমার চোখের সামনে ভাসত আজ বিকেলের সেই দৃশ্য। রিকশায় আমার পাশে বসা আনিকার শরীর। উনার সেই লাল ব্লাউজের হাতা, উনার উন্মুক্ত কলারবোন।

আমি বাথরুমের নিস্তব্ধতায় আমার ট্রাউজার খুলে ফেলতাম। আমার ডান হাতের আঙুলগুলো মোবাইলের স্ক্রিনে আনিকার ছবিগুলোর ওপর বুলিয়ে যেত, আর আমার বাম হাত আমার নিজের শরীরের সেই চরম উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে ঘর্ষণ তৈরি করত। আমার কল্পনার কোনো সীমা-পরিসীমা ছিল না। আমি কল্পনায় আনিকার সেই অফ-হোয়াইট শাড়িটা উনার শরীর থেকে খুলে ফেলতাম। উনার সেই ৩৬-২৮-৩৬-এর নিখুঁত শরীরটাকে আমি আমার দুই হাতের মুঠোয় পিষে ফেলতাম।

আমি কল্পনায় দেখতাম , আনিকা আমার এই স্যাঁতস্যাঁতে বাথরুমের ফ্লোরে শুয়ে আছেন। উনার চোখে সেই শান্ত, বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টি নেই। সেখানে এখন বন্য কামনার আগুন। আমি উনার দুই পায়ের মাঝখানে নিজেকে স্থাপন করতাম। উনার ঠোঁট দুটো কামড়ে ধরে উনার শরীরের গভীরে প্রবেশ করতাম।"রাশেদ... উমমম..." কল্পনার আনিকা আমার কানের কাছে গোঙাতেন।

আমি আমার হাতের গতি আরও বাড়াতাম। আমার শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হয়ে যেত। আমার মনে হতো, আমি যেন আমার সমস্ত জমানো হতাশা, আমার পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের গ্লানি, আমার একঘেয়ে জীবনের বিরক্তি— সব কিছু উনার শরীরের ভেতর ঢেলে দিয়ে নিজেকে মুক্ত করছি। একটা তীব্র, বৈদ্যুতিক স্রোত আমার মেরুদণ্ড বেয়ে উঠত। আমি মাথা পেছনের দিকে হেলিয়ে একটা অস্ফুট শব্দ করতাম। এবং পরমুহূর্তেই আমার শরীরের সমস্ত জমানো উত্তেজনা একটা উষ্ণ, আঠালো স্খলনের মাধ্যমে বাথরুমের মেঝের ওপর আছড়ে পড়ত। তারপর আবার সেই নিস্তেজতা। সেই পোস্ট-কয়টাল বিষণ্ণতা।

আমি পানির ট্যাপ ছেড়ে নিজেকে পরিষ্কার করতাম। আয়নায় নিজের লাল হয়ে থাকা চোখগুলোর দিকে তাকাতাম। আমি জানতাম, আমি একটা ইল্যুশনের মধ্যে বাস করছি। আনিকা নাওহার আমার কাছে একটা অলীক ফ্যান্টাসি ছাড়া আর কিচ্ছু না। আমি আমার সারা মাসের জমানো টাকা খরচ করে উনাকে রিকশায় পৌঁছে দিচ্ছি, উনাকে কফি খাওয়াচ্ছি, উনার সাথে বুদ্ধিবৃত্তিক কথা বলছি— আর তার বিনিময়ে আমি বাথরুমের মেঝেতে দাঁড়িয়ে মাস্টারবেট করে আমার অবৈধ্য সুখ খুঁজে নিচ্ছি। এর চেয়ে প্যাথলজিক্যাল, এর চেয়ে করুণ জীবন আর কী হতে পারে? কিন্তু তবুও আমি এই চক্র থেকে বের হতে পারছিলাম না। ড্রাগ অ্যাডিক্টরা যেমন জানে যে ড্রাগ তাদের ধ্বংস করে দিচ্ছে, তবুও তারা সেটা ছাড়ে না— আমার অবস্থাও ঠিক তেমন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আনিকা নাওহার আমার কাছে একটা কোকেনের মতো হয়ে গিয়েছিলেন। উনার শরীরের ওই অদ্ভুত মোহনীয়তা, উনার ওই আভিজাত্য আমাকে নেশাগ্রস্ত করে ফেলেছিল।

আমি রুমে ফিরে বিছানায় শুয়ে পড়তাম। আগামীকাল আবার অফিস। আবার সেই বিকল্প বাস। আবার এহসান ভাই। কিন্তু সন্ধ্যা হলেই আমি আবার উবার মোটো ডাকব। আবার সেই রকেটের মতো উড়ে মেলায় যাব। আবার সেই আনিকা নাওহারের পাশে হাঁটব। কারণ, মানুষের জীবন তো মাত্র একটাই। আর এই একঘেয়ে জীবনে যদি কোনো রূপবতী নারী কিছুদিনের জন্য হলেও একটা মরিচীকার মতো এসে দাঁড়ায়, তবে সেই মরিচীকার পেছনে দৌড়াতেও এক ধরনের অদ্ভুত, ধ্বংসাত্মক আনন্দ আছে। আমি রাশেদ আহমেদ। আমার এই ধ্বংসের পথে হাঁটা কেবল শুরু হয়েছে।



RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - Erotic Lovers - 09-24-2026

৯

পুরুষেরা নারীর শরীরের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এটা জগতের সবচেয়ে আদিম, নগ্ন এবং অকাট্য সত্য। আপনি যদি হাজারটা পুরুষকে ধরে এনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করান এবং তাদের বুকের ভেতর এক্সরে মেশিন বা লাই-ডিটেক্টর লাগিয়ে জিজ্ঞেস করেন— "ভাই, আপনি কি কোনো নারীকে শুধু তার মন, তার বুদ্ধিমত্তা বা তার আত্মার সৌন্দর্যের জন্য ভালোবাসেন?"

আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, হাজারে একজন পুরুষ পাওয়াও দুষ্কর হবে, যে বলবে, "হ্যাঁ, আমি নারীর শরীর দেখি না, আমি তার আত্মা দেখি।" যে এই কথা বলবে, সে হয় চরম মিথ্যুক, নয়তো সে শারীরিকভাবে অক্ষম, অথবা সে কোনো পীর-দরবেশ। পুরুষের মস্তিষ্ক প্রোগ্রাম করা হয়েছে খুব সহজ একটা অ্যালগরিদম দিয়ে। এটা একটা ভিজ্যুয়াল হার্ডওয়্যার। রাস্তা দিয়ে একটা মেয়ে হেঁটে যাচ্ছে। পুরুষের চোখ এক ন্যানোসেকেন্ডের মধ্যে মেয়েটার শরীরের একটা স্ক্যান করে ফেলে। মেয়েটার মুখটা কি সুন্দর? তার বক্ষদেশ কি ভরাট? তার কোমর কি সরু? তার নিতম্ব কি আকর্ষণীয়? এই জ্যামিতিক হিসাবগুলো মিলে গেলেই পুরুষের মস্তিষ্কে ডোপামিন রিলিজ হয়। তার ভেতর আদিম বাসনা জেগে ওঠে। এই বাসনার কোনো মহৎ উদ্দেশ্য নেই, এর উদ্দেশ্য স্রেফ দখল করা এবং ভোগ করা।

কিন্তু আমার মাথায় গত কয়েকদিন ধরে একটা অদ্ভুত দার্শনিক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। পুরুষ নাহয় নারীর শরীরের লোভে পাগল হয়, কিন্তু একজন নারী কেন একজন পুরুষের প্রেমে পড়ে? নারীরা কিসে আকৃষ্ট হয়? পুরুষের শরীরে? আমি বাথরুমের আয়নায় নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে এই কথাটা ভাবছিলাম আর হাসছিলাম। পুরুষের শরীর আবার সুন্দর হয় নাকি? পুরুষ প্রজাতিটা দেখতে চরম কুৎসিত একটা প্রাণী। সারা গায়ে লোম, খসখসে চামড়া, এবড়োখেবড়ো পেশি, কর্কশ কণ্ঠস্বর। পৃথিবীতে লাখো-কোটি পুরুষের মধ্যে হয়তো হাতেগোনা কয়েকজন ব্র্যাড পিট বা টম ক্রুজ আছেন, যাদের দেখে মনে হতে পারে, "হ্যাঁ, লোকটা সুন্দর।" কিন্তু বাদবাকি ৯৯.৯৯% পুরুষই তো আমার বা আপনার মতো নিতান্তই সাধারণ, ম্যাড়ম্যাড়ে এবং আলুথালু।

তাহলে এত এত সুন্দরী নারী এই সাধারণ, কুৎসিত পুরুষগুলোর প্রেমে পড়ে কীভাবে? তারা এই পুরুষদের জন্য কাঁদে কেন? তাদের সাথে জীবন পার করে দেয় কীভাবে? নারীর আসলে আগ্রহটা কিসে? বিবর্তনবাদ বা ইভোলিউশনারি বায়োলজি বলে, আদিম যুগে নারীদের টিকে থাকার জন্য এমন একজন পুরুষের দরকার ছিল, যে পেশিশক্তিতে বলীয়ান, যে শিকার করে আনতে পারবে, এবং যে গুহার সামনে দাঁড়িয়ে বন্য প্রাণীর হাত থেকে নারীকে রক্ষা করতে পারবে। অর্থাৎ, নারীর কাছে আকর্ষণীয় ছিল পুরুষের ‘নিরাপত্তা দেওয়ার ক্ষমতা’।

যুগ পাল্টেছে। মানুষ এখন আর গুহায় থাকে না, বন্য প্রাণীও আক্রমণ করে না। কিন্তু নারীর মস্তিষ্কের সেই আদিম সফটওয়্যারটা আজও আপডেট হয়নি। শুধু ‘পেশিশক্তি’র জায়গাটা দখল করে নিয়েছে ‘সামাজিক ও আর্থিক ক্ষমতা’। আধুনিক যুগে একজন নারী একজন পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হয় তার ক্ষমতা, তার প্রতিপত্তি, তার ব্যাংক ব্যালেন্স এবং তার সামাজিক অবস্থান দেখে। কারণ এই জিনিসগুলো তাকে একটা সাবকনশাস সিগন্যাল দেয়— "এই লোকটার সাথে থাকলে আমি এবং আমার অনাগত সন্তান সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত থাকব।" একজন বিলিয়নিয়ার বৃদ্ধ, যার মাথায় চুল নেই, পেট মোটা— তার পাশেও দেখবেন একজন বিশ্বসুন্দরী তরুণী দাঁড়িয়ে আছে। এটা কোনো ম্যাজিক নয়, এটা বিবর্তনের খেলা। নারীরা পুরুষের টাকা বা ক্ষমতাকে ভালোবাসে, কারণ টাকাটাই এখন আধুনিক যুগের ‘শিকার করে আনা হরিণের মাংস’।

কিন্তু শুধু টাকাই কি সব? না। সাইকোলজি বলে অন্য কথা। পুরুষ প্রেমে পড়ে চোখ দিয়ে, আর নারী প্রেমে পড়ে কান দিয়ে। নারীরা আকৃষ্ট হয় পুরুষের বুদ্ধিমত্তায়, তার রসবোধে (Sense of humor), তার কণ্ঠস্বরে এবং তার কনফিডেন্সে। একজন পুরুষ যখন খুব গুছিয়ে কথা বলে, যখন তার কথার ভেতর একটা রহস্য থাকে, যখন সে একজন নারীকে অনুভব করাতে পারে যে "তুমি স্পেশাল"— তখন নারী সেই পুরুষের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে। নারীরা চায় এমন কাউকে, যে তার কথা মন দিয়ে শুনবে, যে তার চোখের দিকে তাকিয়ে তার আত্মার ভেতরে ঢুকতে পারবে।

একজন নারী আসলে পুরুষের শরীর চায় না, সে চায় পুরুষের মনোযোগ। সে চায় একজন পুরুষ তাকে জয় করুক, তার বুদ্ধিমত্তা দিয়ে, তার রসবোধ দিয়ে, তার ব্যক্তিত্বের সেই আলফা-মেল (Alpha male) অরা দিয়ে। আমি নিজের কথা ভাবলাম। আমি রাশেদ আহমেদ। মিরপুরের মেসে থাকি। বেতন পঁচিশ হাজার টাকা। দেখতে চরম সাধারণ। আমার না আছে ক্ষমতা, না আছে টাকা, না আছে কোনো গ্ল্যামার।

তাহলে আনিকা নাওহারের মতো একজন নিখুঁত, আভিজাত্যে মোড়ানো, লন্ডনপ্রবাসী বড়লোক নারী আমার সাথে প্রতিদিন মেলায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটছেন কেন? উনি আমাকে রাত জেগে মেসেজ দিচ্ছেন কেন? উত্তরটা খুব সোজা। 

আমি হয়তো উনার কাছে একটা ‘নভেলটি’ বা নতুনত্ব। ইংল্যান্ডের যান্ত্রিক জীবনে উনার স্বামী হয়তো সারাদিন আইটি ফার্মের ব্যালেন্স শিট নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। উনাকে হয়তো কেউ উনার কবিতার শূন্যতা নিয়ে এত সুন্দর করে লেকচার দেয় না। উনার চোখের দিকে তাকিয়ে কেউ হয়তো এত মনোযোগ দিয়ে উনার কথা শোনে না।

আমি উনার সেই ইন্টেলেকচুয়াল খিদেটা মেটাচ্ছি। আমি খুব গুছিয়ে কথা বলি, একটু রহস্য করে হাসি, উনার রূপের প্রশংসা করি খুব সাবধানে, একটু ঘুরিয়ে। উনার মনে হচ্ছে, আমি একজন গভীর বোধসম্পন্ন মানুষ। কিন্তু উনি জানেন না, আমার এই বুদ্ধিবৃত্তিক মুখোশের পেছনে কতটা বন্য, কতটা ক্ষুধার্ত এবং কতটা ইতর একটা পুরুষ লুকিয়ে আছে। উনি জানেন না, উনার সাথে আমি যখন স্প্যানিশ সাহিত্য নিয়ে কথা বলি, তখন আমার চোখ উনার শাড়ির কুঁচির নিচে উনার নাভির গভীরতা মাপতে ব্যস্ত থাকে। উনি জানেন না, রাতে উনার মেসেজ পেয়ে আমি বাথরুমের ফ্লোরে উনার ছবি দেখে আমার অবদমিত পশুকে শান্ত করি। নারীরা হয়তো পুরুষের মন খোঁজে। কিন্তু আমি একজন খাঁটি পুরুষ। আমি আনিকা নাওহারের মন চাই না। আমি উনার ওই স্বর্গীয় শরীরটা চাই।

২৫ ফেব্রুয়ারি। দিনটা আগের দিনগুলোর মতোই শুরু হলো। সেই একই একঘেয়ে রুটিন। সকালে রহিমা খালার বাসি রুটি, বিকল্প বাসের কনুই-যুদ্ধ, আর কারওয়ান বাজারের অফিস। অফিসে এসে আমি কিম জং উনের খবর বাদ দিয়ে সিরিয়ার খবর অনুবাদ করতে বসলাম। এহসান ভাই আজ একটু বেশি চিল্লাচিল্লি করছেন। মামুন তার ডেস্কে বসে "পুতিনের নতুন প্রেমিকা" নিয়ে একটা চটকদার খবর বানাচ্ছে। সবকিছু একদম নরমাল।

কিন্তু আমার মাথার ভেতর সারাদিন ধরে একটা ঘড়ি টিকটিক করছিল। কখন ছয়টা বাজবে! পাঁচটা চল্লিশ মিনিটে আমি বাথরুমে গিয়ে মুখ ধুয়ে এলাম। চুলটা একটু চিরুনি দিয়ে ভিজিয়ে আঁচড়ালাম। চোখে-মুখে একটা ফ্রেশ ভাব আনার চেষ্টা করলাম। পাঁচটা পঞ্চাশ মিনিটে আমি আমার ডেস্ক থেকে আনিকাকে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিলাম। 

আমি: "কোথায় আপনি?" এক মিনিটের মধ্যেই রিপ্লাই এল।
আনিকা: "মেলায়। আজ একটু আগেই চলে এসেছি। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে লেকের পাড়ে বসে আছি। আপনি বের হয়েছেন?"
আমি: "জাস্ট বের হচ্ছি। জ্যাম না থাকলে সিক্স ফর্টির ভেতর পৌঁছে যাব। ওয়েট ফর মি।"
আনিকা: "ওয়েটিং।"

ছয়টা বাজার সাথে সাথেই আমি ল্যাপটপ শাটডাউন করে এহসান ভাইকে একটা সালাম দিয়ে দৌড় দিলাম। নিচে নেমে উবার মোটো ডাকলাম। আজকের বাইকারটা মনে হয় আগে কোনোকালে রেসিং ট্র্যাকে রেস করত। সে কারওয়ান বাজার থেকে শাহবাগ পৌঁছাল মাত্র পঁচিশ মিনিটে। ছয়টা পঁয়ত্রিশ মিনিটে আমি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের লেকের পাড়ে এসে দাঁড়ালাম।

আনিকা একটা কংক্রিটের বেঞ্চে বসে ছিলেন। উনাকে দেখেই আমার বুকের ভেতরকার সেই চিরচেনা ধাক্কাটা নতুন করে লাগল। আজ উনার পরনে একটা কুচকুচে কালো রঙের শাড়ি। কালো শাড়িতে যেকোনো নারীকে সুন্দর লাগে, কিন্তু আনিকা নাওহারকে কালো শাড়িতে দেখে মনে হচ্ছিল, উনি যেন সাক্ষাৎ রাতের দেবী ‘নিক্স’। ব্লাউজটাও কালো, স্লিভলেস এবং পিঠের দিকটা বেশ গভীর করে কাটা। উনার ফর্সা, মসৃণ পিঠের অনেকটা অংশ উন্মুক্ত। শীতের শেষ দিকের এই হালকা বাতাসে উনার খোলা চুলগুলো উড়ছে। ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিক।


আমি উনার পাশে গিয়ে বসলাম। "লেট হয়ে গেল?" আমি জিজ্ঞেস করলাম। উনি আমার দিকে ফিরে হাসলেন। "একদম না। ইউ আর অন টাইম।" আমরা আড্ডা দিতে শুরু করলাম। প্রতিদিনের মতোই। মেলার ভিড়, মানুষের কোলাহল, মাইকে ভেসে আসা নতুন বইয়ের ঘোষণা— সবকিছুর বাইরে আমরা দুজন যেন একটা আলাদা দ্বীপে বসে আছি।

আনিকা উনার নতুন উপন্যাসের প্লট নিয়ে কথা বলছিলেন। আমি মাথা নেড়ে নেড়ে সায় দিচ্ছিলাম। কিন্তু আমার চোখ উনার সারা শরীরে একটা রাডারের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছিল। কালো শাড়ির ব্লাউজের ফাঁক দিয়ে উনার ভরাট, উদ্ধত বক্ষদেশের যে রূপরেখাটা বোঝা যাচ্ছিল, তা আমার স্নায়ুতে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছিল। উনি যখন কথা বলার সময় হাত নাড়ছিলেন, উনার উন্মুক্ত ফর্সা বাহুর পেশিগুলো একটা অদ্ভুত সম্মোহনী ছন্দের সৃষ্টি করছিল।

আমি উনার কথা গিলছিলাম না, আমি উনার রূপ গিলছিলাম। উনার শরীরের প্রতিটি ভাঁজ, প্রতিটি বাঁক আমি আমার চোখের তৃষ্ণা দিয়ে পান করছিলাম। এত সুন্দর, এত আকর্ষণীয়, এত স্বর্গীয় একটা শরীর কীভাবে হতে পারে! আমি মনে মনে ভাবছিলাম, এই শরীরটা যদি একবার, শুধু একবারের জন্য আমার বিছানায়, আমার দুই হাতের নিচে আসত— তাহলে হয়তো আমি হাসতে হাসতে মরে যেতে পারতাম।

রাত পৌনে নয়টা বাজল। মেলায় ভিড় কমতে শুরু করেছে। "চলুন, ওঠা যাক। মেলা তো বন্ধ হয়ে যাবে," আনিকা বললেন। আমরা মেলা থেকে বেরিয়ে এলাম। প্রতিদিনের মতোই আমি উনাকে ধানমন্ডি ড্রপ করার জন্য একটা রিকশা নিলাম। রাত নয়টা। ঢাকা শহরের রাস্তায় তখন গাড়ির স্রোত। নিওন আলো, সোডিয়াম বাতি আর হেডলাইটের আলো মিলেমিশে এক অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ। রিকশায় আমরা পাশাপাশি বসেছি। রিকশার ছোট্ট পরিসরে উনার শরীরটা আমার শরীরের সাথে খুব হালকাভাবে লেপ্টে আছে।

আমি আমার বাঁ হাতটা রিকশার হুডের রডের ওপর এমনভাবে রাখলাম, যেন আনিকা আমার হাতের বলয়ের ভেতর নিরাপদ আছেন। রিকশা যখনই স্পিডব্রেকার পার হচ্ছিল বা গর্তে পড়ছিল, উনার নরম শরীরটা এসে আমার কাঁধে আর বাহুতে ধাক্কা খাচ্ছিল। উনার গায়ের সেই দামি শ্যানেল পারফিউমের গন্ধটা রাতের শীতল বাতাসে মিশে একটা মাতাল করা ঘ্রাণ তৈরি করেছে। আমি চোখ বন্ধ করে একটা গভীর শ্বাস নিলাম। এই ঘ্রাণটা, এই স্পর্শটা আমার ভেতরে একটা আদিম বিস্ফোরণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

আমি আড়চোখে উনার দিকে তাকালাম। রাস্তার আলো-আঁধারিতে উনার কালো শাড়িতে ঢাকা শরীরটাকে একটা রহস্যময়ী ভাস্কর্যের মতো মনে হচ্ছিল। উনার ঘাড়ের কাছে চুলগুলো একটু সরে যাওয়ায় গলার ফর্সা অংশটা দেখা যাচ্ছে। আমার প্রচণ্ড ইচ্ছে করছিল, আমি আমার মুখটা ওখানে গুঁজে দিই। উনার ঘাড়ের ওই জায়গাটায় আমি আমার দাঁত বসিয়ে দিই। কিন্তু আমি তো রাশেদ আহমেদ। ভদ্র, অনুবাদক। আমি আমার পশুকে শিকল পরিয়ে রাখলাম।

ধানমন্ডির ২ নাম্বার রোডের ভেতরে একটা সুউচ্চ অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের সামনে এসে রিকশা থামল। এই বিল্ডিংটা আমি গত কয়েকদিন ধরে দেখছি। পনেরো-ষোল তলা হবে। গ্লাস আর স্টিলের তৈরি অত্যাধুনিক একটা টাওয়ার। সামনে বিশাল লোহা আর কাঠের তৈরি মেন গেট। ভেতরে সিকিউরিটি গার্ডদের জন্য আলাদা রুম। সিসি ক্যামেরা বসানো।

এই ধরনের বিল্ডিংয়ে ঢাকা শহরের এলিট ক্লাসরা থাকে। মিরপুরের মেসের একজন ব্যাচেলর হিসেবে এই বিল্ডিংয়ের দিকে তাকালেই আমার এক ধরনের হীনম্মন্যতা কাজ করে। এখানে ব্যাচেলরদের কেউ ফ্ল্যাট ভাড়া দেবে না, তা তো শতভাগ নিশ্চিত। আর দিলেও, এই বিল্ডিংয়ের এক মাসের মেইনটেন্যান্স বা সার্ভিস চার্জই হয়তো আমার সারা মাসের বেতনের সমান। আমি রিকশা থেকে নেমে আনিকাকে নামতে সাহায্য করলাম। "থ্যাংক ইউ রাশেদ," আনিকা শাড়িটা একটু ঠিক করে নিয়ে বললেন। প্রতিদিন এই জায়গাতেই আমাদের বিদায় পর্ব সম্পন্ন হয়। উনি ভেতরে ঢুকে যান, আর আমি আরেকটা রিকশা বা সিএনজি নিয়ে মিরপুরের দিকে রওনা দিই।

কিন্তু আজ আনিকা গেটের দিকে না গিয়ে আমার দিকে ফিরে দাঁড়ালেন। "রাশেদ, আপনি প্রতিদিন এত কষ্ট করে আমাকে নামিয়ে দিয়ে যান। আর এখান থেকে আপনাকে আবার সেই মিরপুর ফিরতে হয়। আমি সত্যিই খুব গিল্টি ফিল করি," আনিকা নরম গলায় বললেন। আমি বীরদর্পে মুচকি হাসলাম। "গিল্টি ফিল করার কী আছে আনিকা? আমি তো আগেই বলেছি, এই জ্যামের শহরে আপনাকে একা ছেড়ে দেওয়াটা আমার বিবেকে বাধে। ইটস মাই প্লেজার।"

আনিকা একটু চুপ করে রইলেন। তারপর উনার সেই বাদামি চোখ জোড়া আমার চোখের ওপর স্থির করে বললেন, "আজকে আর এখান থেকে ফিরে যাবেন না। আজকে বাসায় আসুন। এক কাপ চা খেয়ে যান।" অফারটা শোনার সাথে সাথে আমার বুকের ভেতর যেন একটা হাতুড়ি দিয়ে কেউ প্রচণ্ড জোরে বাড়ি মারল। বাসায় আসুন! এক কাপ চা খেয়ে যান!

এই রাত নয়টার সময় একজন বিবাহিতা নারী আমাকে তার ফ্ল্যাটে ডাকছেন! আমার শরীরের ভেতরের রক্ত চলাচলের গতি তিনগুণ বেড়ে গেল। আমার মাথার ভেতরকার আদিম পুরুষটা আনন্দে চিৎকার করে উঠল— "যা ব্যাটা! ভেতরে যা! আজ তোর কপাল খুলে গেছে!" কিন্তু আমার বাইরের ভদ্র, বুদ্ধিবৃত্তিক মুখোশটা সাথে সাথে অন হলো। আমি জানি, নারীরা খুব সহজে রাজি হওয়া পুরুষদের পছন্দ করে না। একটু 'প্লে হার্ড টু গেট' খেলতে হয়।

আমি মুখে একটা বিনয়ী, অনিচ্ছুক ভাব ফুটিয়ে তুলে বললাম, "আরে না না! আজ আর চা খাব না। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। কাল তো আবার অফিস আছে। আরেক দিন খাব।" আমার মনে মনে তখন দোয়া দরুদ পড়া শুরু হয়ে গেছে— 'হে আল্লাহ, উনি যেন জোড়াজুরি করেন! উনি যেন আমার এই 'না' টাকে মেনে নিয়ে চলে না যান! উনি যদি এখন চলে যান, আমি হয়তো রিকশার চাকার নিচে মাথা দিয়ে মরে যাব!'

আমার দোয়া কবুল হলো।

আনিকা একটু জেদের সুরে বললেন, "আরে না। কোনো কথা শুনব না। আজ আপনাকে চা খেতেই হবে। আপনি প্রতিদিন আমাকে ড্রপ করেন, আর আমি আপনাকে এক কাপ চা না খাইয়েই বিদায় দিই— এটা খুব আনসিভিলাইজড দেখায়। চলুন, ভেতরে চলুন।" আমি আর দ্বিতীয়বার না করলাম না। আমি অত্যন্ত 'নিরুপায়' ভঙ্গিতে একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, "আপনি যখন এত করে বলছেন... ঠিক আছে, চলুন। তবে খুব বেশিক্ষণের জন্য নয় কিন্তু।"

আনিকা হাসলেন। "আচ্ছা বাবা, বেশিক্ষণ আটকে রাখব না আপনাকে।" আমরা মেইন গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। সিকিউরিটি গার্ড আনিকাকে দেখে স্যালুট দিল। আমার দিকে একবার আড়চোখে তাকাল, কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেল না।

ভেতরে ঢুকে দেখলাম বিশাল এক লবি। মার্বেল পাথরের ফ্লোর। এক কোণায় একটা ফোয়ারা, যদিও সেটা এখন বন্ধ। দুটো অত্যাধুনিক লিফট। আমরা লিফটে গিয়ে দাঁড়ালাম। আনিকা ৭ নাম্বার বাটনটা চাপলেন। লাকি সেভেন। লিফট খুব নিঃশব্দে ওপরে উঠতে লাগল। লিফটের ভেতরের আয়নায় আমি আনিকার পাশে নিজেকে দেখলাম। পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের রাশেদ আহমেদ, একজন বিলিয়নিয়ার, অপরূপা নারীর পাশে দাঁড়িয়ে আছে। এটা কি কোনো স্বপ্ন, নাকি সত্যিই ঘটছে? সাত তলায় লিফট থামল। একটা ফ্লোরে মাত্র দুটো ফ্ল্যাট। আনিকা ডান দিকের ফ্ল্যাটের সামনে গিয়ে উনার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে চাবি বের করলেন। দরজা খুলে উনি আমাকে ভেতরে ইশারা করলেন। "আসুন।"

আমি ভেতরে পা রাখলাম।

এবং সাথে সাথে আমি বুঝতে পারলাম, আমি একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতে এসে পড়েছি। ফ্ল্যাটটা বিশাল। আমার মিরপুরের চার রুমের পুরো মেসটা হয়তো এই ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমটার সমান হবে। বিশাল স্পেস। ফ্লোরে কাঠের টেক্সচার দেওয়া দামি টাইলস। সেন্ট্রাল এসির ঠান্ডা বাতাস আমাকে ছুঁয়ে গেল। সিলিংয়ে ফলস সিলিং করা, সেখান থেকে ওয়ার্ম হোয়াইট স্পটলাইটের আলো পুরো ঘরটাকে একটা মায়াবী রূপ দিয়েছে।

এক পাশে বিশাল এল-প্যাটার্নের একটা লেদার সোফা। দেয়ালে বড় বড় সব পেইন্টিং। এক কোণায় একটা ইনডোর প্ল্যান্ট। সামনের দিকে ডাইনিং স্পেস, আর তার ওপাশে হয়তো বেডরুমগুলো। আমি আন্দাজ করলাম, এই ফ্ল্যাটে অন্তত চারটা বা পাঁচটা বিশাল রুম আছে। আমি সোফার পাশে একটা সিঙ্গেল কাউচে আড়ষ্ট হয়ে বসলাম। আনিকা উনার ভ্যানিটি ব্যাগটা একটা টেবিলের ওপর রেখে আমার দিকে ঘুরলেন। "আপনার ফ্ল্যাটটা তো দারুণ সুন্দর," আমি চারদিকে তাকাতে তাকাতে বললাম। 

আনিকা একটু হাসলেন। উনার সেই হাসিতে এক ধরনের অদ্ভুত রহস্য লুকিয়ে ছিল। "আমার ফ্ল্যাট না রাশেদ, আমার মামার ফ্ল্যাট। আমি যখন বছরে একবার দেশে আসি, তখন আমি এখানেই থাকি।" আমার বুকের স্পন্দন মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। "মানে... আপনি এই এত বড় ফ্ল্যাটে... একাই থাকেন?"

"হ্যাঁ। আমি একাই থাকি।" আনিকা খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বললেন। আমার মাথার ভেতরে এখন আর কোনো লজিক কাজ করছে না। রাত সাড়ে নয়টা। ১৬ তলা বিল্ডিংয়ের সাত তলার একটা বিশাল, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। ফ্ল্যাটে আমি আর আনিকা নাওহার ছাড়া পৃথিবীতে আর কেউ নেই। সম্পূর্ণ একা। আমি একজন ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো উনার দিকে তাকালাম।

আনিকা উনার কালো শাড়ির আঁচলটা একটু ঢিলা করে দিলেন। উনার সেই মোহনীয় , ফর্সা, মসৃণ কাঁধ এবং পিঠের অংশটুকু স্পটলাইটের আলোয় যেন চকচক করে উঠল।"আপনি বসুন রাশেদ। আমি কিচেন থেকে চা নিয়ে আসছি," এই বলে আনিকা কিচেনের দিকে পা বাড়ালেন। আমি সোফায় জমে গিয়ে উনার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

এই পুরো সময়টা— সেই রিকশা থেকে শুরু করে লিফট হয়ে এই কিচেন অব্দি যাওয়ার সময়টুকু— আমি উনার রূপ, উনার আকর্ষণ, উনার শারীরিক বাঁকগুলোকে আমার চোখ দিয়ে গিলেছি। উনার সেই কালো শাড়ি পরা ৩৬-২৮-৩৬ জ্যামিতি যখন হেঁটে যাচ্ছিল, উনার নিতম্বের সেই মোহনীয় দুলুনি, উনার সরু কোমরের সেই ছন্দ— সবকিছু আমি পান করছিলাম। উনার শরীরের প্রতিটি নড়াচড়া যেন আমাকে নেশাগ্রস্ত করে দিচ্ছিল। আমি যেন এক ফোঁটা সুধা পান করছিলাম, যা আমাকে আরও বেশি তৃষ্ণার্ত করে তুলছে।

আনিকা কিচেনের দরজার কাছে গিয়ে একটু থামলেন। ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে উনার সেই রহস্যময় হাসিটা হাসলেন। "রাশেদ, ডান দিকের করিডোর দিয়ে প্রথম দরজাটা বাথরুম। আপনি চাইলে ফ্রেশ হয়ে নিতে পারেন। আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে আসছি।" উনি কিচেনের ভেতর ঢুকে গেলেন। আমি সোফা থেকে উঠলাম। আমার পা দুটো কাঁপছে। আমার শরীরের ভেতরের সেই অবদমিত, বন্য পুরুষটা এখন শিকল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসার জন্য উন্মাদ হয়ে আছে।

আমি ডান দিকের করিডোর ধরে বাথরুমের দিকে এগোলাম। আমার মাথার ভেতর শুধু একটাই বাক্য প্রতিধ্বনিত হচ্ছে— "উনি একা থাকেন। এই ফ্ল্যাটে উনি সম্পূর্ণ একা।" আমি বাথরুমের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম। আমার মুখমণ্ডল ঘামে ভিজে গেছে। রাশেদ আহমেদ, পঁচিশ হাজার টাকার অনুবাদক, আজ হয়তো এমন একটা কিছু অনুবাদ করতে যাচ্ছে, যার ভাষা পৃথিবীর কোনো ডিকশনারিতে লেখা নেই। আমি বাথরুমের আয়নায় নিজের বন্য চোখের দিকে তাকালাম।



RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - Erotic Lovers - 09-24-2026

১০।
আমি চোখেমুখে একটু পানি দিলাম। ধানমন্ডির এই বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের বাথরুমের বেসিনের পানির তাপমাত্রাও মনে হচ্ছে নিখুঁতভাবে সেট করা। পানিটা খুব বেশি ঠান্ডাও না, আবার গরমও না। একটা মোলায়েম, স্নিগ্ধ পরশ।

মুখে পানি ছিটিয়ে ঢাকা শহরের রাস্তার ধুলোবালি আর সারাদিনের ক্লান্তিটা খানিকটা ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করলাম। তোয়ালে স্ট্যান্ডে ঝোলানো ধবধবে সাদা, সুগন্ধি তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে আয়নায় নিজের দিকে তাকালাম। আমার ভেতরের সেই আদিম, ক্ষুধার্ত নেকড়েটা আয়নার ওপাশ থেকে আমার দিকে তাকিয়ে যেন দাঁত বের করে হাসছে। আমি মনে মনে তাকে ধমক দিলাম, "চুপ করে থাক ব্যাটা! এটা মিরপুরের মেস না, এটা একটা ভদ্রলোকের ফ্ল্যাট।"

বাথরুম থেকে বেরিয়ে আমি আবার ড্রয়িংরুমের সেই বিশাল লেদার সোফায় এসে বসলাম। সেন্ট্রাল এসির ঠান্ডা বাতাসে শরীরটা জুড়িয়ে যাচ্ছে। কিচেন থেকে খুব মৃদু একটা টুংটাং শব্দ আসছে। আনিকা নাওহার চা বানাচ্ছেন।

আমি গলাটা একটু চড়িয়ে বললাম, "আনিকা, আপনি চাইলে আমি চা বানাতে হেল্প করতে পারি।" কিচেন থেকে আনিকার সেই মোহনীয় কণ্ঠস্বর ভেসে এল, "আরে না না, আপনাকে হেল্প করতে হবে না। আমার বানানো প্রায় শেষ।"

আমি সোফায় হেলান দিয়ে বসে রইলাম। একটু পরেই আনিকা একটা কাঠের ট্রে হাতে নিয়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকলেন। ট্রে-তে দুটো ধবধবে সাদা সিরামিকের মগ। মগগুলো দেখে দামি মনে হচ্ছে। উনি ট্রে-টা আমার সামনের গ্লাস-টপ সেন্ট্রাল টেবিলের ওপর রাখলেন। তারপর নিজের মগটার ওপর একটা ছোট পিরিচ দিয়ে সেটা ঢেকে দিলেন।

"রাশেদ, আপনি চা খান। গরম আছে। আমি জাস্ট একটু ফ্রেশ হয়ে আসছি।" 
"ঠিক আছে।"

আনিকা ঘুরে দাঁড়ালেন এবং নিজের বেডরুমের দিকে পা বাড়ালেন। আমি সোফায় স্থির হয়ে বসে রইলাম, কিন্তু আমার চোখ জোড়া যেন আঠা দিয়ে উনার শরীরের সাথে সেঁটে গেল। আমি একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম উনার হেঁটে যাওয়ার ভঙ্গির দিকে। কী অদ্ভুত একটা ছন্দ উনার হাঁটায়! কালো শাড়ির কুঁচিগুলো উনার প্রতিটি কদমের সাথে একটা মায়াবী ঢেউ তুলছে। উনার সেই নিখুঁত, সরু কোমর আর তার ঠিক নিচেই প্রশস্ত, আকর্ষণীয় নিতম্বের আন্দোলন— সবকিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছিল আমি যেন কোনো ক্লাসিক্যাল ড্যান্সারের পারফরম্যান্স দেখছি। হাইহিল ছাড়া খালি পায়ে হাঁটছেন উনি, তবুও উনার হাঁটার মধ্যে এক ধরনের রাজকীয় আভিজাত্য। শাড়ির আঁচলটা কাঁধ থেকে একটু খসে পড়েছে, আর উনার ফর্সা, মসৃণ পিঠের অনেকটা অংশ করিডোরের আলোয় জ্বলজ্বল করছে। আমি যেন সম্মোহিত হয়ে গেলাম। এত সুন্দর, এত অপরূপ একটা মানবদেহ কীভাবে হতে পারে!

আনিকা বেডরুমে ঢুকে গেলেন। এরপর করিডোরের শেষের দিক থেকে একটা দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ এল। আমি শব্দ শুনে বুঝলাম, উনি বাথরুমে ঢুকেছেন। এবং ঠিক সেই মুহূর্তে আমার মস্তিষ্কের ভেতরে একটা ভয়ানক যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। আমার মাথার ভেতরে থাকা সেই আদিম পুরুষটা ফিসফিস করে বলতে শুরু করল, "রাশেদ, যা না! একটু এগিয়ে গিয়ে করিডোরের দেয়ালের আড়াল থেকে উঁকি দে। হয়তো বাথরুমের দরজাটা পুরোপুরি ভেজানো নেই। হয়তো একটু ফাঁক আছে। তুই দেখতে পাবি উনি কীভাবে ওই কালো শাড়িটা শরীর থেকে খসিয়ে ফেলছেন। জাস্ট একবার ভাব, ওই কালো আবরণের নিচে উনার সেই ফর্সা, রোদ-পোহানো শরীরটা..."

আমার বুকের ভেতরটা ধকধক করতে লাগল। আমি সোফা থেকে প্রায় এক ইঞ্চি উঠেও পড়েছিলাম। আমার পায়ের পেশিগুলো উন্মুখ হয়ে আছে করিডোরের দিকে এগোতে। কিন্তু পরক্ষণেই আমার ভেতরের 'ভদ্র অনুবাদক' সত্তাটা কষে একটা থাপ্পড় মারল আমাকে। "রাশেদ! তুই কি পাগল হয়ে গেলি? তুই একজন শিক্ষিত ছেলে। তুই যদি এখন উঁকি দিস, আর উনি যদি কোনোভাবে বুঝতে পারেন, তোর আর কোনো সম্মান থাকবে? উনি তোকে পুলিশে না দিক, অন্তত ঘাড় ধাক্কা দিয়ে ফ্ল্যাট থেকে বের করে দেবেন। তোর এই ছ্যাঁচড়ামির কোনো ক্ষমা নেই।"

আমি নিজেকে দমিয়ে ধপ করে আবার সোফায় বসে পড়লাম। দুই হাত দিয়ে নিজের মাথাটা চেপে ধরলাম। আমি প্রাণপণ চেষ্টা করছি মন থেকে এই দৃশ্যগুলো সরাতে। আমি লজিক্যালি চিন্তা করার চেষ্টা করলাম— কিম জং উনের মিসাইল, ইউক্রেনের যুদ্ধ, মিরপুরের মেস, নিহাদের বাইকের ক্ষতিপূরণ। কিন্তু হায় রে! আমার এই মন এত বেহায়া কেন!

আমার সমস্ত লজিককে লাথি মেরে আমার কল্পনার ক্যানভাসে বারবার আনিকা নাওহারের নগ্ন শরীরের ছবি ভেসে উঠতে লাগল। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম, উনি বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে উনার কালো ব্লাউজের হুকগুলো খুলছেন। উনার সেই ভরাট, উদ্ধত বক্ষদেশ মুক্ত হয়ে যাচ্ছে। পানি ছেড়ে উনি যখন শাওয়ারের নিচে দাঁড়াচ্ছেন, পানির ফোঁটাগুলো উনার সেই ৩৬-২৮-৩৬ জ্যামিতিক শরীরের প্রতিটি বাঁক বেয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ছে। উনার ভেজা চুলগুলো পিঠে লেপ্টে আছে।

আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। আমার শরীরের নিচের দিকে একটা প্রচণ্ড চাপ আর উত্তেজনা তৈরি হতে শুরু করেছে। আমি দ্রুত টেবিল থেকে চায়ের মগটা তুলে নিলাম। গরম চা খেলে হয়তো আমার এই নোংরা, অবাধ্য স্নায়ুগুলো একটু শান্ত হবে।

আমি চা হাতে নিয়েই বসে রইলাম। কতক্ষণ বসে ছিলাম জানি না। ঢাকা শহরের এই কোলাহলমুক্ত, এসি-চলা ফ্ল্যাটের ভেতর সময় যেন থমকে আছে। বেশ কিছুক্ষণ পর, আমি যখন চায়ের মগে চুমুক দেওয়ার জন্য মগটা ঠোঁটের কাছে নিয়ে গেছি, ঠিক তখনই বেডরুমের দরজা খোলার শব্দ হলো।

আমি চোখ তুলে তাকালাম। আনিকা বেডরুম থেকে বেরিয়ে আসছেন।উনাকে দেখে আমি চায়ের মগে এমনভাবে বিষম খেলাম যে, গরম চা আমার গলায় আটকে গেল। আমি "খক খক" করে কাশতে শুরু করলাম। কোনোমতে মগটা টেবিলে নামিয়ে রেখে আমি চোখ বড় বড় করে উনার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমি আউলে গেলাম। আমার মস্তিষ্ক শর্টসার্কিট হয়ে গেল।

একটু আগে যে নারীকে আমি একটা কুচকুচে কালো শাড়িতে গ্রিক দেবীর মতো রাজকীয় আর রহস্যময়ী রূপে দেখেছি, সেই নারী এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রূপে আমার সামনে দাঁড়িয়ে। উনার পরনে এখন একটা খুব ঢিলেঢালা সাদা রঙের টি-শার্ট (যাকে আমরা ব্যাচেলররা বাংলায় সোজাসাপ্টা ‘গেঞ্জি’ বলি)। টি-শার্টটার সামনে ইংরেজিতে কী যেন লেখা। আর নিচে একটা ঢিলেঢালা শর্ট প্যান্ট বা প্লাজো টাইপের কিছু, যেটা উনার হাঁটুর ঠিক নিচ পর্যন্ত এসে শেষ হয়েছে।

উনার মুখে মেকআপের কোনো লেশমাত্র নেই। ঠোঁটের সেই গাঢ় লাল লিপস্টিক ধুয়ে ফেলা হয়েছে। মুখটা একদম ফ্রেশ, সতেজ। চুলগুলো একটা তোয়ালে দিয়ে মোছা হয়েছে, তবে এখনো আগায় হালকা ভেজা ভাব লেগে আছে। সব মিলিয়ে উনাকে এখন আর কোনো ছত্রিশ বছর বয়সী, লন্ডনপ্রবাসী, আইটি ফার্মের মালকিন মনে হচ্ছে না। উনাকে দেখে মনে হচ্ছে, ঢাকা ইউনিভার্সিটির ফার্স্ট ইয়ারে পড়া কোনো তরুণী, যে মাত্রই ক্লাস শেষ করে হলে ফিরে ক্যাজুয়াল কাপড় পরেছে।

আমার দম আটকে যাওয়ার উপক্রম হলো। একটা নারী শাড়িতে এত আবেদনময়ী হতে পারে, সেটা আমি জানতাম। কিন্তু একটা সাধারণ ঢিলেঢালা গেঞ্জি আর শর্ট প্লাজোতে যে একজন নারী এত বেশি ভয়ংকর সুন্দর আর আকর্ষণীয় হতে পারে, সেটা আমার ধারণার বাইরে ছিল। ঢিলেঢালা টি-শার্টের ভেতর দিয়ে উনার শরীরের সেই নিখুঁত ভরাট গঠনটা সরাসরি বোঝা না গেলেও, উনার হাঁটার সময় টি-শার্টের কাপড়ের ভেতর দিয়ে উনার বক্ষদেশের যে একটা সূক্ষ্ম মুভমেন্ট আমি খেয়াল করলাম, তা আমার রক্তচাপ বাড়িয়ে দিল। উনার হাঁটুর নিচ থেকে ফর্সা, মসৃণ পায়ের পাতা পর্যন্ত উন্মুক্ত।

"কী হলো রাশেদ? বিষম খেলেন নাকি?" আনিকা হাসিমুখে আমার সামনের সোফায় এসে বসলেন। বসার সময় উনার প্লাজোটা আরেকটু ওপরে উঠে গিয়ে উনার ফর্সা হাঁটুর কিছুটা অংশ বের হয়ে পড়ল।

আমি কোনোমতে কাশি থামিয়ে বললাম, "হ্যাঁ... মানে চা-টা একটু বেশি গরম তো, তাই গলায় লেগে গেছে। এখন ঠিক আছে।" আনিকা উনার মগের ওপর থেকে পিরিচটা সরিয়ে চায়ের মগটা হাতে নিলেন। উনার গা থেকে এখন আর সেই শ্যানেল পারফিউমের গন্ধ আসছে না। বরং একটা খুব রিফ্রেশিং, সাবান বা শাওয়ার জেলের হালকা, সতেজ ঘ্রাণ আসছে। এই ঘ্রাণটা আরও বেশি অন্তরঙ্গ, আরও বেশি ব্যক্তিগত।

"শাড়িতে আসলে বেশিক্ষণ থাকা যায় না। ঢাকা শহরের যা ধুলাবালি আর গরম! তাই একবারে শাওয়ার নিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। কিছু মনে করেননি তো?" আনিকা চায়ে চুমুক দিয়ে খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বললেন।

"না না, মনে করার কী আছে! আপনি আপনার বাসায় আছেন, আপনি কমফোর্টেবল থাকবেন, এটাই তো স্বাভাবিক," আমি আমার চোখের দৃষ্টিকে অত্যন্ত ভদ্রভাবে উনার মুখের ওপর স্থির রাখার চেষ্টা করে বললাম। যদিও আমার চোখ বারবার বিদ্রোহী হয়ে উনার টি-শার্টের গলার কাছের ফাঁকা অংশটার দিকে চলে যেতে চাইছিল।

আনিকা সোফায় একটা পা মুড়ে খুব আয়েশ করে বসলেন। এই বসার ভঙ্গিটা এতটাই ইনফর্মাল এবং অন্তরঙ্গ যে, আমার মনে হলো আমি যেন উনার খুব কাছের কেউ।

"জানেন রাশেদ, এই বাসাটা আসলে আমার মামার," আনিকা নিজে থেকেই গল্প শুরু করলেন। আমি একটু নড়েচড়ে বসলাম। "তাই নাকি? আপনার মামা কী করেন?"

আনিকা একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন। "মামা সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন। পিডব্লিউডি বা ওইরকম কোনো একটা ডিপার্টমেন্টে খুব বড় পোস্টে ছিলেন। সোজাসাপ্টা বাংলায় বললে, আমার মামা ছিলেন একজন প্রচণ্ড দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষ। সারা জীবন দুই হাত ভরে নিজের ইচ্ছেমতো ঘুষ খেয়েছেন। ঢাকা শহরের গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি মিলিয়ে উনার অনেকগুলো ফ্ল্যাট আছে। এই বিল্ডিংয়ের এই ফ্ল্যাটটাও উনার।"

আমি একটু অবাক হয়ে বললাম, "উনি এখন কোথায় থাকেন? দেশেই?"

"আরে না!" আনিকা হো হো করে হেসে উঠলেন। "বাংলাদেশের দুর্নীতিবাজ আমলাদের শেষ গন্তব্য কোথায় হয়, আপনি জানেন না? রিটায়ারমেন্টের পর মামা উনার অবৈধ টাকার পাহাড় নিয়ে সোজা ইউএসএ চলে গেছেন। এখন নিউইয়র্কে বসে বসে মসজিদে নামাজ পড়েন, আর ফেসবুকে বাংলাদেশের রাজনীতি আর ইসলামিক মূল্যবোধ নিয়ে বড় বড় জ্ঞানগর্ভ স্ট্যাটাস দেন। এটা একটা খুব ক্লাসিক প্যাটার্ন, তাই না?"

আমিও হাসলাম। "একদম। হালাল দুর্নীতির খুব সুন্দর একটা রিটায়ারমেন্ট প্ল্যান। তো এই ফ্ল্যাটটা কি তাহলে পড়েই থাকে?"

"হ্যাঁ, পড়েই থাকে। মামার তো আর টাকার অভাব নেই যে ভাড়া দিয়ে দুই পয়সা কামাতে হবে। বরং ভাড়া দিলে ফ্ল্যাট নষ্ট হবে, এই ভয়ে তালা মেরে রেখেছেন। আমি বা আমার হাসব্যান্ড, অথবা আমার কাজিনরা যখন বিদেশ থেকে দেশে আসি, তখন আমরা কয়েকদিনের জন্য এই ফ্ল্যাটগুলো ব্যবহার করি। মামা আমাদের কাছে চাবি দিয়ে রেখেছেন।"

"আপনার হাসব্যান্ড..." আমি খুব সতর্কভাবে সুযোগটা লুফে নিলাম। "আপনার হাসব্যান্ড তো মনে হয় দেশে আসেন না খুব একটা?"

আনিকা চায়ের মগটা দুই হাত দিয়ে ধরে একটু উদাস ভঙ্গিতে বললেন, "ও খুব ব্যস্ত থাকে। ওর তো ইউনিভার্সিটিতে পড়ানোর পাশাপাশি নিজের রিসার্চের অনেক প্রজেক্ট থাকে। বছরে হয়তো দুই-এক সপ্তাহের জন্য একবার দেশে আসে। আমার মতো এত লম্বা ছুটি ম্যানেজ করতে পারে না।"

"আপনাদের বিয়ে হয়েছে কতদিন?" আমি খুব স্বাভাবিক একটা কৌতূহল দেখানোর ভান করে জিজ্ঞেস করলাম।

আনিকা একটু পেছনের দিকে হেলান দিলেন। উনার চোখ দুটো একটু ওপরের দিকে উঠল, যেন স্মৃতির পাতা হাতড়াচ্ছেন। "আমাদের বিয়ের বয়স তো প্রায় ছয় বছর হয়ে গেল।"

"আপনাদের কি লাভ ম্যারেজ ছিল?" আমি জিজ্ঞেস করলাম। আমার ভেতরে এক ধরনের অদ্ভুত মাসোকিজম কাজ করছিল। যে নারীকে আমি মনে মনে এত তীব্রভাবে কামনা করছি, তার অন্য একজন পুরুষের সাথে ভালোবাসার গল্প শুনতে আমার বুকের ভেতরটা পুড়ছিল ঠিকই, কিন্তু আমি তবুও শুনতে চাইছিলাম।

আনিকা হাসলেন। সেই হাসিতে একটু নস্টালজিয়া ছিল। "হ্যাঁ, লাভ ম্যারেজ। আমাদের পরিচয় ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে। আমি পড়তাম ইংলিশে, আর বেলাল— মানে আমার হাসব্যান্ড— ছিল আমার তিন ব্যাচ সিনিয়র। ইকোনোমিক্সে পড়ত। টিএসসিতে একটা কালচারাল প্রোগ্রামে আমাদের প্রথম পরিচয়। আমি সেদিন একটা আবৃত্তি করছিলাম, আর ও ছিল অর্গানাইজারদের একজন।"

"তারপর প্রেম?"

"তারপর তো ঢাকা ভার্সিটির চিরচেনা প্রেমের গল্প। হাকিম চত্বরে বসে চা খাওয়া, চারুকলায় আড্ডা, শাহবাগে রিকশায় ঘোরা। বেলাল খুব ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট ছিল। অনার্স-মাস্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। ওর লক্ষ্যই ছিল বাইরে গিয়ে পিএইচডি করা। আমি যখন থার্ড ইয়ারে, তখন ও স্কলারশিপ নিয়ে ইউকে চলে গেল।"

"লং ডিসট্যান্স রিলেশনশিপ?" আমি মন্তব্য করলাম। "এটা তো খুব কঠিন জিনিস।"

"কঠিন তো বটেই," আনিকা একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "প্রায় চার বছর আমরা লং ডিসট্যান্সে ছিলাম। তখন তো আর হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জারের যুগ এত সহজ ছিল না। স্কাইপিতে কথা হতো। ও ওখানে পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত, আমি এখানে। অনেক চড়াই-উতরাই ছিল। অনেকবার মনে হয়েছে এই সম্পর্ক টিকবে না। কিন্তু বেলাল মানুষ হিসেবে খুব স্টেডি। ওর ইমোশন কম, কিন্তু কমিটমেন্ট খুব স্ট্রং। ও পিএইচডি শেষ করে ওখানেই একটা ইউনিভার্সিটিতে টিচিং পজিশন পেয়ে গেল।"

আমি চুপচাপ শুনছিলাম। আনিকার টি-শার্টের গলার অংশটা একটু ঢিলা থাকায়, উনি যখন নড়াচড়া করছিলেন, তখন উনার ফর্সা বুকের উপরিভাগের একটা ছোট অংশ আমার চোখে পড়ছিল। আমি আমার দৃষ্টিকে উনার চোখের ওপর ধরে রাখার জন্য আপ্রাণ যুদ্ধ করছিলাম।

"তারপর ও দেশে ফিরে এল," আনিকা বলে চললেন। "এসে অফিশিয়ালি আমাকে প্রপোজ করল। আমাদের দুই পরিবার রাজি হলো। খুব ধুমধাম করে আমাদের বিয়ে হলো। বিয়ের মাস ছয়েক পর আমি স্পাউস ভিসায় ইউকে চলে গেলাম। তারপর থেকে তো ওখানেই আছি।"

"আপনার কি ওখানে গিয়ে একা লাগত না? নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ।"

"প্রথমে একটু লাগত। বেলাল তো সারাদিন ইউনিভার্সিটিতে পড়ে থাকত। আমি বাসায় একা। তখন আমি একটা আইটি ফার্মে জব শুরু করলাম। কাজ শিখলাম। এরপর ধীরে ধীরে আমি নিজেই একটা ছোট আইটি ফার্ম দাঁড় করালাম। লেখালেখিটাও সিরিয়াসলি শুরু করলাম। আসলে মানুষ যখন খুব একা হয়ে যায়, তখন সে হয়তো টাকার পেছনে ছোটে, নয়তো শিল্পের পেছনে। আমি দুটোই করার চেষ্টা করেছি।"

আমি আনিকার দিকে তাকিয়ে রইলাম। উনার কথাগুলোর মধ্যে এক ধরনের অদ্ভুত বাস্তববোধ আছে। কোনো রোমান্টিক ন্যাকামি নেই। ছয় বছরের বিবাহিত জীবন উনাকে অনেক বেশি প্র্যাকটিক্যাল করে তুলেছে। "ছয় বছর তো অনেক সময়," আমি হঠাৎ করেই কথাটা বলে ফেললাম।

"হ্যাঁ, দেখতে দেখতে সময় চলে যায়," আনিকা চায়ের শেষ চুমুকটা দিলেন। আমাদের মাঝখানে একটা অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল। ড্রয়িংরুমের সেন্ট্রাল এসির মৃদু গুঞ্জন ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।

আমি উনার চোখের দিকে তাকালাম। এই নারী, যিনি এত সুন্দর, এত বুদ্ধিমতী, যার একটা সেটেলড লাইফ আছে— উনার ভেতরে কি কোনো শূন্যতা নেই? উনার লেখা কবিতাগুলোতে যে এত আইডেন্টিটি ক্রাইসিসের কথা, এত একাকিত্বের কথা— সেটা কি শুধুই সাহিত্যের জন্য, নাকি উনার দাম্পত্য জীবনে কোনো ফাঁকি আছে?

আমার সাংবাদিক এবং অনুবাদক মস্তিষ্কের কৌতূহলটা হঠাৎ করে আমার ভদ্রতার সীমানাটা অতিক্রম করে গেল। আমি জানি, এই প্রশ্নটা করা আমার উচিত হচ্ছে না। এটা অত্যন্ত ব্যক্তিগত, এমনকি একটু অভদ্রোচিত একটা প্রশ্ন। কিন্তু আমার ভেতরের সেই অবদমিত ঈর্ষা, সেই অধিকারবোধ এবং উনার সম্পর্কে সবকিছু জানার একটা বন্য আগ্রহ আমাকে প্রশ্নটা করতে বাধ্য করল।

আমি চায়ের কাপটা টেবিলে নামিয়ে রেখে, উনার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে, একটু নিচু কিন্তু স্পষ্ট গলায় বললাম—"আনিকা, আপনাদের বিয়ের ছয় বছর হয়ে গেছে। আপনাদের তো সেটেলড লাইফ। ছেলে-মেয়ে না থাকাটা কি আপনাদের কোনো কনশাস ডিসিশন?"

কথাটা বাতাস কেটে আনিকার কানে পৌঁছানোর পর, ড্রয়িংরুমের পরিবেশটা যেন মুহূর্তের জন্য বরফ হয়ে গেল। আমি দেখলাম, আনিকার মুখের সেই ক্যাজুয়াল, সতেজ হাসিটা হঠাৎ করেই থেমে গেল। উনার বাদামি চোখের তারায় একটা অদ্ভুত অস্বস্তি আর বিব্রতকর ছায়া ফুটে উঠল। উনি উনার খালি চায়ের মগটার দিকে দৃষ্টি নামিয়ে নিলেন। উনার হাত দুটো একটু শক্ত হয়ে মগটাকে আঁকড়ে ধরল।আনিকা চুপ করে আছেন। উনার নীরবতা ফ্ল্যাটের বাতাসকে ভারী করে তুলছে।