Forums
গল্প:অঘোষিত হৃদয়সন্ধি (Writer: Raisa Mehran) - Printable Version

+- Forums (https://forum.xgossip.fun)
+-- Forum: Storeys Category (https://forum.xgossip.fun/forumdisplay.php?fid=1)
+--- Forum: Genaral Stories (https://forum.xgossip.fun/forumdisplay.php?fid=2)
+--- Thread: গল্প:অঘোষিত হৃদয়সন্ধি (Writer: Raisa Mehran) (/showthread.php?tid=8)



গল্প:অঘোষিত হৃদয়সন্ধি (Writer: Raisa Mehran) - X Man - 09-01-2026

"আমার বউ আমাকে কিডন্যাপ করে বিয়ে করেছে!! কী করে ভুলে যাই বলো তো?"

হাসপাতালের করিডোরে মানুষের আনাগোনার মাঝে আচমকা এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এল। কালো স্যুট-প্যান্টে মোড়ানো সুঠাম শরীরের যুবক ফারিশ নওয়ান। খয়েরি চোখের মণি আর চোখে ঝকঝকে চশমাটা তাকে এক আলাদা আভিজাত্য দিয়েছে। মুখে হালকা চাপ দাড়ি আর ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা সেই বাঁকা হাসিটা আরিশার বিরক্তির কারণ।ফারিশের কণ্ঠস্বরে একরাশ দুষ্টুমি। অথচ তার হাত বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে ফ্লোরে। সেই রক্তের দিকে তাকিয়ে আরিশার কলিজাটা যেন মোচড় দিয়ে উঠল, কিন্তু মুখে সে কঠোরতা বজায় রাখল। আরিশা জবাব দিল—

"ফর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশন, কিডন্যাপ আমি করলেও বিয়েটা আপনি করেছেন। তাও আবার রাগের মাথায়!"

ফারিশ আবারও হাসল। যেন এই মুহূর্তটাই সে উপভোগ করছে। অবশ্য আরিশাকে জ্বালাতে তার ভালোই লাগে। 

"আরেহ, বিয়ে করতেই তো কিডন্যাপটা করেছিলে, নাকি?"

আরিশার বিরক্তি এবার চরমে পৌঁছাল। এই মানুষের যুক্তির সামনে দাঁড়ানো দায়। তিক্ত কণ্ঠে সে বলল,

 "দেখুন,এখানে এখন অনেক মানুষ!!সবার সামনে এখন এই বিষয় নিয়ে কথা না বলাই ভালো।আফটারঅল আমাদের বিয়ের ব্যাপারে কেউই জানে না!!"

আরিশার কথায় ফারিশ পুনরায় বাঁকা হাসে। স্থির দৃষ্টি আরিশার চোখে নিবন্ধ করে সে শান্ত স্বরে বলল,

 "হাত থেকে রক্ত পরছে ব্যান্ডেজ করো!"

আরিশা অপ্রস্তুত হয়ে তুতলিয়ে উঠল,

 "আমি পারবো না!!আঙ্কেল আই মিন স্যারকে ডেকে আনছি।স্যার করে দিবে!!"

আরিশার কথা পছন্দ হয় না ফারিশের। খানিকটা চাপা স্বরে বলে, 

"আই সেইড ইউ দ্যাট মিনস অনলি ইউ!!"

আরিশা নিজেকে সরিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু পিছন থেকে ফারিশের কণ্ঠস্বর তাকে থামিয়ে দিল,

 "হাত থেকে কিন্তু রক্ত পড়ছে! খুব বেশি!"

আরিশার মনটা নরম হতে শুরু করেছিল, ঠিক তখনই তার এক ক্লাসমেট এগিয়ে এসে বলল,

 "আমি ব্যান্ডেজ করে দিই স্যার?"

ক্লাসমেটের অতি-উৎসাহ দেখে আরিশার মাথায় যেন আগুন জ্বলে উঠল। সে কড়া গলায় বলল,

 "তোর পড়া কি শেষ? তুই কি ডাক্তার হয়ে গেছিস?"

প্রতিপক্ষও দমে যাওয়ার পাত্রী নয়, সে পাল্টা উত্তর দিল, 

"সামান্য ব্যান্ডেজ করতে ডাক্তার হতে হয় না।তাছাড়া তুইও তো এখনও স্টুডেন্টই!"

তর্কাতর্কির মাঝে আরিশা দেখল ফারিশ উঠে দাঁড়াচ্ছে চলে যাওয়ার জন্য। এক মুহূর্তের দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে  আরিশা ফারিশের হাত ধরে হিড়হিড় করে বসিয়ে দিল তাকে। ফারিশের ঠোঁটে তখন বাঁকা হাসি।

"জামা খুলুন!" 

আরিশার হুকুম।ফারিশ অবাক হওয়ার ভান করে চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে বলল,

 "মানে কী? এভাবে সবার সামনে...?"

আরিশা দাঁতে দাঁত চেপে বলল, 

"আপনার বাহুতে আঘাত লেগেছে। ব্যান্ডেজ করতে হলে শার্ট তো সরাতেই হবে। আপনি যা ভাবছেন তা নয়!"

সবার উৎসুক দৃষ্টি এড়িয়ে  আরিশা ফারিশকে ভেতরের কেবিনে নিয়ে গেল। খুব যত্ন করে, পরম মমতায় ক্ষতের চিকিৎসা করতে লাগল সে। ফারিশ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার এই কিডন্যাপার বউটার দিকে। কাজ শেষ করে  আরিশা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, 

"বিশ্রাম নিন। আমি স্যারকে বলছি আপনাকে দেখে যেতে। আমার ক্লাস আছে।"

"রাতে কল করব। ধরো কিন্তু!"

ফারিশের দাবিতে অধিকার ছিল।আরিশা কোনো উত্তর না দিয়ে হনহনিয়ে বেরিয়ে গেল কেবিন থেকে। ফারিশ তার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। মেয়েটা বড্ড জেদি!! ফাইন ফাইন!! 

_______

আরিশা ধরাম করে শব্দ করে দরজাটা খুলে। দরজা খোলার শব্দে ডাক্তার নাসির লাফিয়ে উঠেন। ঠিকই বুঝতে পারে সেই চেনা পরিচিত ঝড় এসে হাজির। 

" স্যার..আই মিন আঙ্কেল!! "

আরিশার ডাকে ডাক্তার নাসির পুনরায় লাফ মেরে উঠে বসেন। 

" আঙ্কেল!! তোমার ছেলে কিন্তু এবার বাড়াবাড়ি করছে!! সারাক্ষণ আমাকে বিরক্ত করা!! আমি কিন্তু আর সহ্য করবো না!! পরে কিছু একটা হয়ে গেলে কিন্তু আমাকে দোষ দিতে পারবে না!! "

আরিশার কথায় ডা নাসির চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আরাম করে চা খেতে খেতে বলে, 

" আরে রিলাক্স.... "

কথাটা শেষ করার আগেই  আরিশা টেবিলে জোরে বারি দিয়ে উঠে। সেই বারির শব্দে ডা নাসির আবারও লাফিয়ে সোজা হয়ে বসে। 

" তোমার রিলাক্সের গুষ্টি কিলাই!! তোমার ছেলে যদি আমাকে আর একবারও বিরক্ত করে তবে কিন্তু তোমার খবর আছে। সব রাগ তোমার উপর ঝাড়বো!! "

" বুঝেছি, বুঝেছি। আজকেই বাসায় গিয়ে ওকে শায়েস্তা করবো। তুই এবার শান্ত হ!! "

আরিশা এবার জোরে জোরে নিঃশ্বাস নেয়। 

" ক্লাস আছে। আমি গেলাম!! "

" আমার দেওয়া পড়াটা শিখেছিস!! "

পিছন থেকে চোখ ছোট ছোট করে মি নাসির জিজ্ঞাসা করে। 

" মানে আঙ্কেল,জানো তো, তোমার ছেলে ফাজিল হলেও তুমি কিন্তু অনেক ভালো!! "

মি নাসির এবার আরিশার কান টেনে ধরে। 

" চালাকী করা হচ্ছে তাই না!! "

" আহহ,সরি আঙ্কেল।কাল ঠিকই শিখে আসব। এখন আমি গেলাম!! "

মি নাসির থেকে ছাড়া পেয়ে কোনোরকম পালায় আরিশা। মি নাসির হেসে উঠে। 

" তুমি এভাবে আমার কিডন্যাপারের কান টানতে পারো না!! "

বুকে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে কথাটা বলে ফারিশ। 

" লা হাওলা ওয়ালা কুয়াতা ইল্লাবিল্লাহ!! তুই এখানে কিভাবে?? "

মি নাসির চমকে পিছনে তাকিয়ে বলে। ফারিশ বাবার কথায় পাত্তা না দিয়ে তীক্ষ্ণ নজরে এখনও তার দিকে তাকিয়ে। 

" তোমাকে ইদানীং কেন জানি আমার সন্দেহ হয়!!খুববব বেশি!!"

ছেলের কথায় মি নাসির শুকনো ঢোক গিলে। ছেলেকে কিডন্যাপের পিছনে যে তারও হাত ছিল এটা কোনোভাবে জেনে যায়নি তো!! 

"  এনিওয়ে, এক কাপ কফি দিতে বলো তো!! মাথাটা বেশ ধরেছে!! "

কথাটা বলতে বলতেই চেয়ারে গিয়ে বসে চশমাটা খুলে টেবিলে রাখে ফারিশ। মি নাসির হতাশার দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে। এই দুইজনের জ্বালায় তার নাজেহাল দশা। 

( অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ?) 


 



RE: গল্প:অঘোষিত হৃদয়সন্ধি (Writer: Raisa Mehran) - X Man - 09-01-2026



শহরের ব্যস্ত কাজী অফিসের বাইরে তখন ফ্লাশলাইটের ঝলকানি আর সংবাদকর্মীদের হুড়োহুড়ি। ভেতরের গুমোট পরিবেশে দাঁড়িয়ে আছে দুজন—একজন দেশের নামকরা তরুণ লয়ার ফারিশ নওয়ান, আর অন্যজন মেডিকেল কলেজের দুঃসাহসী ছাত্রী আরিশা।বাইরে তখন গুঞ্জন উঠছে, 

"বিখ্যাত লয়ার ফারিশ নওয়ানকে কিডন্যাপ করে বিয়ে করেছে মেডিকেল পড়ুয়া এক ছাত্রী!"

 জানালার পর্দাটা একটু সরিয়ে বাইরের দৃশ্যটা দেখেই ফারিশের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সে ধীর পায়ে ঘুরে দাঁড়াল আরিশার দিকে। তার চোখের দৃষ্টিতে তখন আগুন।

"এসবের মানে কী আরিশা? তুমি আমাকে কিডন্যাপ করেছ? এই লয়ার ফারিশ নওয়ানকে?"

 ফারিশের কণ্ঠস্বর তখন রাগে কাঁপছে।আরিশা প্রথমে কিছুটা ভড়কে গেলেও পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল। বুক ফুলিয়ে, বেশ একটা বিজয়িনী ভাব ধরে সে সোজা ফারিশের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

 "ইয়েস, ইয়েস! আমি আরিশা বলে কথা!"

ফারিশের ধৈর্য এবার বাঁধ ভাঙল। সে দাঁতে দাঁত চেপে আরিশার দিকে এক পা এগোতেই আরিশা ‘বাপরে’ বলে এক দৌড়ে গিয়ে কাজীর চেয়ারের পেছনে লুকাল।

"খবরদার! একদম কাছে আসবেন না বলছি! এসব কী শুরু করেছেন?" 

আরিশার কণ্ঠে তখন ভয়ের চেয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা বেশি।ফারিশের রাগ যেন এবার সপ্তমে চড়ল। সে আর্তনাদ করে ওঠার মতো স্বরে বলল,

 "আমিও তো জানতে চাই এসবের মানে কী! এই নিউজ যদি একবার পুরোপুরি বাইরে ছড়ায়, তবে আমার রেপুটেশন—সব মাটির নিচে চলে যাবে! কী ভেবে এই কাজ করলে তুমি?"

আরিশা কাজীর পেছনে থেকে মুখটা বের করে আমতা আমতা করে বলল, 

"আরে, আমি কি ভেবেছি নিউজটা এমন হুরহুর করে চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে? আসলে দোষটা তো আপনারই! আপনি তো জানেন, আমার ইগোতে হার্ট করলে আমার মাথা ঠিক থাকে না। আপনি কেন বলেছিলেন যে আমার মতো পাগলকে এই দুনিয়ায় কেউ বিয়ে করবে না? কেন? তাই তো রাগের মাথায় আপনাকে তুলে নিয়ে এসেছি! ভেবেছিলাম আপনাকে বিয়ের ভয় দেখিয়ে ছেড়ে দেব। তাতে আমিও একটু মানসিক শান্তি পাবো। কিন্তু—"

ফারিশের মুখের কথা যেন হারিয়ে গেল। সে বড় বড় চোখ করে আরিশার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর অবিশ্বাস্য রকমের নরম স্বরে বলল,

 "আসলেই আরিশা, তোমাকে পাগল বলাটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল।"

আরিশা মনে মনে বেশ একটা তৃপ্তির হাসি হাসল। ভাবল, যাক—কিডন্যাপ করাটা তবে সার্থক হয়েছে। মি লয়ার তবে লাইনে এসেছেন! সে একটু হাসি হাসি মুখ করে যেই না কিছু বলতে যাবে, অমনি ফারিশের গলার স্বর বদলে গেল।

"আসলে তুমি তো পাগলেরও ওপরের স্তরের কিছু একটা! মানে পুরোই সংজ্ঞাহীন। একটা পাগলও তোমাকে দেখলে লজ্জা পেয়ে নিজের চিকিৎসা করতে হাসপাতালে ভর্তি হবে! রাগের মাথায় কিডন্যাপ করেছি! বাহ! এবার সামলাও এই রাজকীয় কেলেঙ্কারি!"

আরিশা এবার তেড়ে গিয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই দরজার বাইরে রিপোর্টারদের হাজারো প্রশ্নের আওয়াজ তার কানে এল। ফারিশ এবার হতাশায় নিজের কপালটা আঙুল দিয়ে স্লাইড করতে করতে ঘরের ভেতর পাইচারি করতে লাগল। হঠাৎ ফারিশ থেমে গেল। আরিশার দিকে একটা তীক্ষ্ণ নজর দিয়ে গম্ভীর গলায় নির্দেশ দিল, 

"এখানেই থাকবে! খবরদার, এক পা-ও বাইরে যাবে না। যা করার আমাকেই করতে হবে। আমি আসছি!"

আরিশাকে একা রেখে ফারিশ ঝড়ের বেগে বাইরের দিকে পা বাড়াল।আর ওদিকে আরিশা বোকার মতো দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল—সে কি আসলেই একটু বেশি করে ফেলেছে?

বাহিরে যেতেই সব রিপোর্টাররা দৌড়ে এসে ঘিরে ধরে ফারিশকে। ফারিশ যখন মনে মনে একটা যুতসই অজুহাত সাজাতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই তার দৃষ্টি গেল রাস্তার ওপারে।সেখানে দেখা যাচ্ছে এক বিচিত্র দৃশ্য। ফারিশের একমাত্র চাচাতো ভাই  প্রফেসর আয়ান আর আরিশার বেস্ট ফ্রেন্ড ইনায়া। তারা দুজন যথারীতি একে অপরের সাথে ঝগড়া করতে করতে হেঁটে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে এই ‘শাপে-নেউলে’ জোড়াকে এখানে দেখে ফারিশের বিস্ময়ের সীমা রইল না। এরা এখানে কেন? কিন্তু পরক্ষণেই লয়ার মস্তিষ্কে বিদ্যুতের মতো একটা দারুণ বুদ্ধি খেলে গেল।ফারিশ মুখে একটা চওড়া আত্মবিশ্বাসী হাসি ফুটিয়ে রিপোর্টারদের উদ্দেশ্যে বলল,

 "আপনারা একটু শান্ত হোন। কাজী অফিসে আসার মানেই কি এই যে আমিই বিয়ে করতে এসেছি? এমনও তো হতে পারে আমি কারো বিয়েতে সাক্ষী হতে এসেছি!"

রিপোর্টাররা একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছুটা দমে গেল। ফারিশ সুযোগ বুঝে আয়ানের দিকে আঙুল উঁচিয়ে নাটকীয় স্বরে ঘোষণা করল,

 "আমার একমাত্র চাচাতো ভাই, প্রখ্যাত প্রফেসর আয়ান—আপনারা তো চেনেনই ওকে! আর ওর পাশেই দাঁড়িয়ে আছে মেডিকেল কলেজের মেধাবী ছাত্রী মিস ইনায়া। আজ এই জুটিরই বিয়ে!"

নিউজ যেন পলকে মোড় নিল। রিপোর্টাররা নতুন ব্রেকিং নিউজের গন্ধে ফারিশকে ছেড়ে পঙ্গপালের মতো দৌড়ে গেল আয়ান আর ইনায়ার দিকে। ওদিকে কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ নিজেকে মিডিয়ার ক্যামেরার সামনে আবিষ্কার করে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল আয়ান আর ইনায়া।রিপোর্টাররা মাইক্রোফোন বাড়িয়ে দিয়ে চিৎকার শুরু করল,

 "প্রফেসর আয়ান, বিখ্যাত লয়ার ফারিশ নওয়ানের একমাত্র চাচাতো ভাইকে কিডন্যাপ করে বিয়ে করেছে মেডিকেল পড়ুয়া এক ছাত্রী!"

নিমিষেই সম্পূর্ণ দায়ভার অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে ফারিশ একটা তৃপ্তির শ্বাস ফেলল। বিপদ আপাতত কেটে গেছে দেখে সে বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে শিস বাজাতে বাজাতে কাজী অফিসের ভেতরে ঢুকল।ওদিকে আরিশা ভেতরে দাঁড়িয়ে জানালার আড়াল থেকে সবটাই দেখেছে আর শুনেছে। সে অবাক হয়ে ভাবছিল, মানুষ কতটা ধুরন্ধর হলে চোখের পলকে নিজের বিয়েটাকে অন্যের ঘাড়ে এভাবে চাপিয়ে দিতে পারে! ফারিশ ভেতরে ঢুকতেই আরিশা বাঁকা হাসিতে হাততালি দিয়ে উঠল।

"জিও লয়ার জিও! সাবাস! নিজের বিয়ের কেস অন্যের ঘাড়ে কী সুন্দর পার করে দিলেন! আপনার আইনি বুদ্ধি তো দেখছি ক্রিমিনালদের চেয়েও ধারালো!"

আরিশার বিদ্রুপাত্মক প্রশংসায় ফারিশ মোটেও দমে গেল না। বরং শার্টের কলারটা একটু ঠিক করে, চোখেমুখে একরাশ আভিজাত্য মাখানো ভাব নিয়ে আরিশার দিকে তাকিয়ে বলল,

 "ধন্যবাদ! একেই বলে ‘লয়ারস ব্রেইন’। বিপদে ধীরস্থির থাকাই হলো জেতার মূল চাবিকাঠি।"

"আচ্ছা ঠিক আছে, আপনি তাহলে আপনার ব্রেইন নিয়ে থাকুন, আমি গেলাম!! " 

আরিশা যেই না গটগট করে চলে যেতে চাইল, ফারিশ বিদ্যুৎগতিতে তার কবজি চেপে ধরল। তার স্পর্শে আরিশা যেন মুহূর্তের জন্য জমে গেল।

"যাচ্ছেন কোথায়? বিয়ে করবেন না? আসুন, বিয়ে করি!" 

ফারিশের গলায় তখন রাগের আভাস। আরিশা এবার সত্যি সত্যিই ঘাবড়ে গেল। আমতা আমতা করে বলল, 

"মা... মা... মানে...?"

"মানে তুমি এখন আমায় বিয়ে করবে! তোমার বিয়ে করার শখ আমি আজ একেবারে মিটিয়ে ছাড়ব!" 

ফারিশের চোখেমুখে তখন এক অদ্ভুত প্রতিশোধের নেশা। আরিশা পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,

 "না না না, আম্মা! আমি বিয়ে করতাম না। আমি মজা করছিলাম!"

ফারিশ ভ্রু কুঁচকে কড়া গলায় ধমক দিল, 

"চুপ! কাজী সাহেব, বিয়ে পড়ানো শুরু করুন!! "

"নো, নেভার, কাভি নেহি!" 

আরিশা তখন মরিয়া হয়ে মাথা নাড়ছে।ফারিশ এবার চাল চালল তার মোক্ষম অস্ত্র দিয়ে। সে খুব সাবলীলভাবে আরিশার হাত ছেড়ে দিয়ে পকেটে হাত রাখল। মুখে একরাশ তাচ্ছিল্য ফুটিয়ে বলল,

 "অবশ্য ঠিকই তো! আমার মতো হ্যান্ডসাম, ফেমাস আর এলিগ্যান্ট একজন মানুষের সাথে তোমায় ঠিক যায় না। ব্যাপারটা দেরিতে হলেও তুমি বুঝতে পেরেছ দেখে ভালো লাগল।"

ব্যাস! তির একদম ঠিক জায়গায় বিঁধেছে। আরিশার ইগোতে এবার যেন পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটল। রাগে তার কান দিয়ে গরম ধোঁয়া বের হওয়ার উপক্রম। সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে এক লাফে কাজীর সামনে গিয়ে টেবিলের ওপর সজোরে এক বাড়ি দিল। বেচারা কাজী সাহেব তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিলেন কি না কে জানে, বাড়ির শব্দে তিনি আসন ছেড়ে কয়েক ইঞ্চি ওপরে লাফিয়ে উঠলেন।

"কাজী! কবুল বলুন!" 

আরিশার গর্জনে পুরো ঘর থরথর করে কেঁপে উঠল।ফারিশ আর কাজী—দুজনই পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। ফারিশ মনে মনে ভাবল, "সর্বনাশ! মেয়েটা কি রাগের মাথায় আমাকে ছেড়ে এই বুড়ো কাজীকেই কবুল বলে বসবে নাকি?"আরিশা নিজের ভুল বুঝতে পেরে দ্রুত নিজেকে সামলে নিল। পুনরায় চেঁচিয়ে উঠল, 

"আই মিন, বিয়ে পড়ুন! না না মানে বিয়ে পড়ানো শুরু করুন। ধুরর!"

কাজী সাহেব আর এক মুহূর্ত দেরি করার সাহস পেলেন না। তিনি চটপট খাতা-কলম বের করে নিজের কাজে লেগে পড়লেন। এই আপদদের তাড়াতাড়ি দূর করা দরকার।

অতীতের সেই স্মৃতিগুলো মনে পড়তেই আরিশার মেজাজ যেন আরও তিরিক্ষি হয়ে উঠল। সে  চেয়ারে বসেই বাচ্চাদের মতো হাত-পা নেড়ে  কাঁদতে শুরু করল। মনে মনে নিজেকেই গালি দিতে লাগল—কে বলেছিল ওইদিন রাগের মাথায় ওই শয়তানকে পার্মানেন্টলি নিজের লাইফে টেনে আনতে? শখ করে বাঘ বন্দি করতে গিয়ে এখন নিজেই খাঁচায় বন্দি! সে টেবিলে হাত রেখে নিজের কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে বিড়বিড় করল, 

"আরিশা, তোর কপালটাই খারাপ!"

ঠিক সেই মুহূর্তে সাইড টেবিলে রাখা ফোনের স্ক্রিনটা আবার জ্বলে উঠল। সেখানে বড় বড় অক্ষরে নাম লেখা— 'মাইগ্রেন'।১৮ বার! গুনে গুনে আঠারো বার কল করেছে ফারিশ। কিন্তু আরিশার জেদ পাহাড় সমান, সে ফোনটা ধরার কোনো নামগন্ধও করল না।
অপরদিকে, আরিশার বেলকনির ঠিক নিচে অন্ধকারে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে ফারিশ। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আরিশার বেলকনির দিকে। খয়েরি চোখের মণি দুটো যেন রাগে আর উদ্বেগে জ্বলছে। আঠারো বার কল করার পরও যখন ওপাশ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া গেল না, তখন ফারিশের ধৈর্যের বাঁধ এক্কেবারে ভেঙে গেল। সে দাঁতে দাঁত চেপে ফোনটা পকেটে ঢোকাল। কোনো কিছু বিচার-বিবেচনা না করেই শার্টের হাতাটা একটু গুটিয়ে নিল সে। তারপর উপরে উঠতে শুরু করল। লয়ার হওয়ার পাশাপাশি যে তার কিছু শরীরচর্চার নেশাও আছে, সেটা আজ কাজে লেগে গেল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই একদম উপরে উঠে বেলকনির মেঝের ওপর নিঃশব্দে পা রাখল ফারিশ। তার পরনের সাদা শার্টটা মৃদু বাতাসে দুলছে। তার মুখে সেই পরিচিত বাঁকা হাসিটা। সে ধীর পায়ে ভিতরের দিকে এগোতে লাগল।



RE: গল্প:অঘোষিত হৃদয়সন্ধি (Writer: Raisa Mehran) - X Man - 09-01-2026

 Part:03

বেশ অনেকক্ষণ টেবিলে মাথা গুঁজে পড়ে থাকার পর আরিশা যেন নতুন উদ্যমে জেগে উঠল। নিজের গাল দুটো হালকা থাপড়ে সে নিজেকেই শাসন করল, 

"নাহ আরিশা! এখন এসব ফালতু চিন্তা করলে চলবে না। কাল আইটেম আছে! খারাপ করলে আঙ্কেল সবার সামনে ঝাড়বে। আগে পড়াশোনা সামলাই, পরে ওই মাইগ্রেনকে সাইজ করার অনেক সময় পাওয়া যাবে।"

আরিশার কথা শেষ হতেই  মুহূর্তেই ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে এক গম্ভীর কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনি তুলল— 

"হুমম, এটাই ঠিক হবে!"

আরিশা চমকে উঠে সোজা দাঁড়িয়ে পড়ল।  আতঙ্কে পেছন ফিরে তাকাতেই তার চোখ চড়কগাছ। ফারিশ! সে পরম নিশ্চিন্তে আরিশার বিছানায় হেলান দিয়ে, পায়ের ওপর পা তুলে শুয়ে আছে। তার তীক্ষ্ণ খয়েরি চোখের দৃষ্টি আরিশার ওপর নিবদ্ধ।আরিশা তোতলাতে তোতলাতে বলল, 

"আ-আপনি! আপনি এখানে কীভাবে? মানে... কোত্থেকে ঢুকলেন?"

ফারিশ উঠে বসে বিছানার চাদরটা একটু ঠিক করে নিল। তারপর শান্ত গলায় বলল,

 "কল করেছিলাম। গুনে গুনে আঠারো বার। কেন ধরা হয়নি?"

ফারিশের সেই একই পুরোনো জেরার ধরনে আরিশার রাগ উঠে গেল। সে হাত নেড়ে বলল,

 "ফোন ধরিনি বলে আপনি এভাবে ডাকাতের মতো মানুষের ঘরে ঢুকে পড়বেন? আল্লাহ, তওবা! কী জামানা এল!"

ফারিশের কপাল কুঁচকে গেল। আরিশার এই ন্যাকামি আর নাটক তাকে রাগানোর জন্য যথেষ্ট। ফারিশকে চুপ থাকতে দেখে আরিশা আরও তেড়ে এল,

 "হয়েছে এবার, প্লিজ এখান থেকে যান! আমার কাল পরীক্ষা, আমায় পড়তে হবে।"

ফারিশ নির্বিকার গলায় জবাব দিল,

 "তো পড়ো না! আমি কি তোমার মুখ চেপে ধরেছি নাকি হাত বেঁধে রেখেছি?"

"উফফ!" 

আরিশা রাগে গজগজ করে উঠল।

"উফফফ!" 

ফারিশও ঠিক একই ঢঙে তাকে ভেঙিয়ে বলল।
আরিশা এবার চোখ ছোট ছোট করে ফারিশের দিকে তাকায়।এই আপদকে এত সহজে বিদায় করা যাবে না। ফারিশ হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে পা বাড়াল। 

"ফাইন! আমি তবে আন্টির সাথে দেখা করতে গেলাম।অনেক দিন ধরে বলছিল আমার সাথে দেখা করবে।"

ফারিশের এই কথা শুনে আরিশার হার্টবিট মিস হওয়ার উপক্রম হলো। সে এক দৌড়ে ফারিশের সামনে গিয়ে দুই হাত ছড়িয়ে বাধা দিল,

 "নো নো নো! কোনোভাবেই না। এখান দিয়ে একদমই না। যেখান দিয়ে এসেছেন, সেখান দিয়েই বিদায় হোন!"

ফারিশ ভ্রু কুঁচকে আরিশার হাতে আলতো ধাক্কা দিয়ে বলল,

 "ইউ! সরো বলছি।"

আরিয়া জেদ করে ফারিশের হাত ধরতে যেতেই ফারিশের মুখটা যন্ত্রণায় কিছুটা কুঁচকে গেল। আরিশার মনে পড়ে গেল সেই ক্ষতের কথা। সে তৎক্ষণাৎ হাত ছেড়ে দিয়ে ব্যাকুল হয়ে উঠল,

 "সরি সরি! আমি ইচ্ছা করে করিনি। আপনার হাতের কী অবস্থা? ব্যথা কমেনি?"

"আই অ্যাম ফাইন," 

ফারিশের গলার স্বর কিছুটা শীতল।আরিশার মুখটা মলিন হয়ে গেল। সে অনুতপ্ত স্বরে বলল,

 "এই কারণেই আপনাদের এই লয়ার পেশাটা আমার দুচোখের বিষ। ভীষণ রিস্কি! সবসময় শত্রু লেগেই থাকে। এর চেয়ে আয়ান ভাইয়ের মতো প্রফেসর হওয়া অনেক ভালো, অন্তত মারামারি তো নেই!"

ফের সেই আয়ান! ফারিশের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। কথায় কথায় শুধু আয়ানের প্রসংশা!!ফারিশ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো।

"আরিশা! একটু দরজাটা খোল তো মা! কতবার মানা করেছি পড়ার সময় দরজা না লাগাতে? খোল বলছি!"

মায়ের গলা শুনে আরিশার কলিজা শুকিয়ে গেল। সে মরিয়া হয়ে ফারিশের দিকে তাকাল,

 "প্লিজ, প্লিজ! এখনই এখান থেকে যান।"

ফারিশ এই সুযোগটা হাতছাড়া করল না। সে ঠোঁটের কোণে সেই শয়তানি হাসিটা ঝুলিয়ে বলল,

 "কী বললে? আরেকবার বলো তো? ঠিক শুনতে পাইনি তো!"

আরিশা দাঁতে দাঁত চেপে কোনোমতে আদব বজায় রেখে বলল,

 "প্লিজ... যান!"

ফারিশ এবার তৃপ্তির হাসি হাসল।

 "হুহ, এভাবেই বিনয়ী হয়ে চলবে। আই লাইক ইট!" 

কথাটা বলেই ফারিশ চলে যেতে লাগল। আরিশা লম্বা একটা শ্বাস ফেলে বিড়বিড় করল, 

"তোকে পরে দেখে নেব শয়তান!" 

কথাটা বলেই সে হাসি মুখে দরজা খুলতে এগিয়ে গেল।

ফারিশ নিচে নেমে চলে যেতে গেল কিন্তু ঠিক তখনই পিছন থেকে একটা কন্ঠস্বর ভেসে এল। আরিশার বাবা অর্থাৎ মি দিদারের কন্ঠ। 

"কিরে ফারিশ? তুই এই অসময়ে আমাদের বাড়িতে? তাও আবার এই বাগান দিয়ে বের হচ্ছিস যে !" 

মি. দিদারের চোখেমুখে একরাশ বিস্ময়।ফারিশ একগাল চওড়া হাসি দিয়ে এগিয়ে গিয়ে মি. দিদারের কাঁধে হাত রাখল। যেন কতদিন পর প্রিয় বন্ধুর সাথে দেখা হয়েছে, এমন ঢঙে বলল,

 "কী অবস্থা শ্বশুর আব্বা? শরীরের কী খবর?"

মি. দিদার ফারিশের হাতটা কাঁধ থেকে সরিয়ে দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার চোখেমুখে রাজ্যের আফসোস। তিনি হতাশ স্বরে বলে উঠলেন, 

"ছাড় তো তোর ওই ‘শ্বশুর আব্বা’ ডাক! সারাজীবন শুধু শ্বশুর আব্বা, শ্বশুর আব্বা করেই গেলি। কিন্তু যখনই বলি আমার মেয়ে আরিশাকে বিয়ে কর, তখনই তো তোর যত রাজ্যের আপত্তি! এখন এই মাঝরাতে শ্বশুর আব্বা বলে তেল দিয়ে কী হবে?"

মি দিদারের কথা শুনে ফারিশ মনে মনে ভাবল, "শ্বশুর আব্বা, আপনি জানলে হার্ট অ্যাটাক করবেন যে আপনার মেয়ে আমাকে অলরেডি কিডন্যাপ করে বিয়ে করে ফেলেছে! এখন তো শুধু আনুষ্ঠানিকতা বাকি।"কিন্তু মুখে সে বেশ নিরীহ একটা ভাব ফুটিয়ে বলল,

 "আরে আঙ্কেল, তুমি তো জানোই তোমার মেয়ে কত বড় ত্যাঁড়া! ওকে সামলানোর ক্ষমতা কি আমার আছে?"

" বিয়ে করনা ভাই, আমার মেয়েটাকে বিয়ে করনা। এতো টেনশন আর নিতে পারছি না!!ঘুমের মধ্যেও আতঙ্কে থাকি!!কখন এই মেয়ের ইগো হার্ট হয় আর নতুন কোনো অদ্ভুত কান্ড ঘটিয়ে বসে!!"

মি. দিদারের কথা শুনে ফারিশের কপাল কুচকায় ফারিশ।

"আচ্ছা বিপদে পড়লাম তো! ওইদিকে বাসায় গেলে তোমার বন্ধু, আই মিন আমার ড্যাডি জ্বালায়—বলে আরিশাকে বিয়ে করে বাসায় আন। আর এখানে আসলে তুমি জ্বালাও। আচ্ছা, আমার বিয়ের পেছনেই কেন লেগে আছো তোমরা সবাই? একটা ব্যাপারই বুঝলাম না, মেয়েকে বিদায় করতে এত তাড়া কিসের শুনি?"

মি. দিদার এবার ফারিশের কাঁধে হাত রেখে দুজন বাগানের পথ ধরে হাঁটতে শুরু করলেন। তিনি বেশ বিজ্ঞের মতো গম্ভীর মুখে বোঝাতে থাকলেন, 

"শোন ফারিশ। যখন তোর লাইফে একটা ঘূর্ণিঝড় আসবে, তখন তোর পালানোর রাস্তা আছে। মানে সামনে দিয়ে আসলে তুই পেছন দিয়ে পালাবি, আর পেছন দিয়ে আসলে সামনে দিয়ে পালাবি। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় যদি একসাথে দুটো হয়, তবে পালাবি কোত্থেকে?"

মি. দিদারের এমন দার্শনিক তত্ত্বে ফারিশ কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে গেল। তারপর সে-ও মি. দিদারের কাঁধে হাত রেখে রহস্যময় এক হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করল,

 "বাই এনি চান্স, তুমি কি এই 'ঘূর্ণিঝড়' বলতে আন্টি আর আরিশাকে বোঝাচ্ছ?"

মি. দিদার যেন মনের কথাটি বলতে পেরে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। তিনি সশব্দে হেসে বললেন,

 "ইয়েস ইয়েস! এই না হলে আমার লয়ার ছেলে! কত তাড়াতাড়ি ধরে ফেলেছিস দেখ!"

ফারিশ এবার পকেট থেকে ফোনটা বের করে মি. দিদারের চোখের সামনে নাচাতে লাগল। তার ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা শয়তানি হাসি।

 "গ্রেট! তো আমি যে তোমার এই বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি রেকর্ড করেছি, তা এখনই আন্টি আর আরিশাকে পাঠিয়ে দিই? কী বলো?"

মি. দিদারের হাসি মুহূর্তেই হাওয়া হয়ে গেল। তিনি শুকনো মুখে ফ্যাকাশে চোখে কিছুক্ষণ ফারিশের দিকে তাকিয়ে রইলেন। পরক্ষণেই ধ্যান ফিরে পেয়ে হুংকার দিয়ে উঠলেন,

 "দাঁড়া শয়তান ছেলে! বাপ-বেটা দুটোই সমান শয়তান! ডিলিট কর বলছি!"

মি. দিদার রেগে তেড়ে আসতেই ফারিশ হাসতে হাসতে এক দৌড়ে গিয়ে নিজের গাড়িতে উঠে পড়ল। গাড়ির স্টার্ট দিয়ে জানালার কাঁচ নামিয়ে সে চিৎকার করে বলল, 

"শুভ রাত্রি ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলাকারী শ্বশুর আব্বা!"

ফারিশের গাড়ি যখন স্টার্ট নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, মি. দিদার তখন অন্ধকারে দাঁড়িয়ে গজগজ করে বলতে লাগলেন, 

"নাসিরটাকে ফোন করতে হবে, ওর ছেলেটা দিন দিন হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে!"

_________

" ওই আরিশা!! কিছু করনা!! সবাই বলছে আমার আর ঐ শয়তানটার নাকি বিয়ে দিবে!! আরে কোন কেসে ফাসলাম বলতো। আমাদের তো বিয়ে হয়ই নি!! কিছু করনা!! "

ইনায়ার কথায় আরিশা কিছুক্ষণ থুতনিতে হাত দিয়ে ভাবল। তারপর তার ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত শয়তানি হাসিটা ফুটে উঠল। সে ইনায়াকে কাছে টেনে কানে কানে ফিসফিস করে কিছু একটা বলল।ইনায়া চোখ কপালে তুলে অস্ফুট স্বরে বলল, 

"তুই সিওর? এটা করলে আসলেই বিয়েটা ক্যানসেল হবে?"

আরিশা আত্মবিশ্বাসের সাথে আঙুল চুটকিয়ে বলল, 

"হান্ড্রেড পার্সেন্ট! তুই শুধু শুরু কর, বাকিটা আমি দেখে নেব।"

ড্রয়িং রুমে তখন পিনপতন নীরবতা। একপাশে বসে আছেন মি. নাসির আর তার স্ত্রী, অন্যপাশে মি. নাসিরের ভাই মি. নাভান আর তার স্ত্রী। ইনায়ার মা-বাবাও বেশ গম্ভীর মুখে বসে আছেন। মাঝখানে অপরাধীর মতো বসে আছে আয়ান আর তার পাশে বসা ফারিশ। আরিশা এক কোনায় বসে নখ খুঁটছে, যেন সে কিছুই জানে না। সবাই যখন আলোচনা করছে যে কীভাবে এই মিডিয়া কেলেঙ্কারির হাত থেকে বাঁচতে আয়ান আর ইনায়ার বিয়েটা দিয়ে দেওয়া যায়, ঠিক তখনই ইনায়া ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করল।সে মাথা নিচু করে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। ইনায়ার মা শান্ত গলায় বললেন, 

"সবাইকে সালাম কর মা!"

উপস্থিত সবার দৃষ্টি এখন ইনায়ার ওপর। ইনায়া বেশ কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকল, তারপর হুট করে যেন তার ভেতরে কোনো অশুভ আত্মা ভর করল! সে হুংকার দিয়ে সজোরে চিৎকার করে সালাম দিল—

"আসসালামু আলাইকুম!!!"

সালাম দেওয়ার সাথে সাথে সে কিছুটা নিচু হয়ে মি নাভানের পায়ের কাছে হাত নিয়ে আবার পরক্ষণেই স্প্রিংয়ের মতো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।হঠাৎ এই সালাম বিস্ফোরণ আর ইনায়ার অস্বাভাবিক আচরণে ড্রয়িং রুমে রীতিমতো ভূমিকম্প শুরু হয়ে গেল। মি. নাভান, মি. নাসির আর আয়ান—তিনজনই ভয়ে সোফার ওপর এক হাত লাফিয়ে উঠলেন। আয়ান তো প্রায় সোফার পেছনে লুকানোর উপক্রম! বাকিরা আতঙ্কে বুকে হাত দিয়ে থ হয়ে বসে রইলেন।ফারিশ বড় বড় চোখ করে নিজের ধড়ফড় করতে থাকা বুকে হাত রাখল। তার উকিল মস্তিষ্ক এই পরিস্থিতির কোনো আইনি ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছে না। হঠাৎ তার নজর গেল আরিশার দিকে। আরিশা মুখ চেপে হাসছে! ফারিশের বুঝতে আর বাকি রইল না যে এই সার্কাস-এর  মাস্টারমাইন্ড কে।ইনায়ার মা লজ্জায় আর অপমানে লাল হয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, 

"কী হচ্ছে এসব ইনায়া? পাগলামি করছ কেন?"

ইনায়া এবার আরিশার শেখানো অনুযায়ী চোখ দুটো উল্টে একটা বিচিত্র মুখভঙ্গি করল। ড্রয়িং রুমের আবহাওয়া মুহূর্তেই বিয়ের আলোচনা থেকে মানসিক হাসপাতাল এর দিকে মোড় নিতে শুরু করল। 
ড্রয়িং রুমের পরিবেশটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমথমে হয়ে রইল। ইনায়া হঠাৎ শান্ত হয়ে একদম লক্ষ্মী মেয়ের মতো আরিশার পাশে গিয়ে বসল। বড়রা ভাবলেন, যাক—মেয়েটা বোধহয় এতক্ষণে শান্ত হয়েছে। মি. নাসির চশমাটা ঠিক করে পুনরায় গলা পরিষ্কার করলেন।

"যা বলছিলাম, যেহেতু মিডিয়াতে নিউজ চলে গেছে, তাই দেরি করা ঠিক হবে না। আমাদের মান-সম্মানের কথা ভেবে—"

ঠিক তখনই এক অদ্ভুত শব্দে সবার কথা থেমে গেল। ইনায়া চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে একদম মুখের সামনে ধরে সশব্দে চুমুক দিচ্ছে—

"চুউউউউ... চুউউউউউউ!"

চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার এমন তীব্র শব্দ এর আগে এই ড্রয়িং রুমে কেউ শোনেনি। মি. নাভান বিস্ময়ে কথা হারিয়ে ফেললেন। ইনায়া কাপটা নামিয়ে রেখে আয়েশ করে ঠোঁট চাটল। তারপর বেশ চিন্তিত মুখে বলল,

 "আমমম... চা-টা অস্থির হয়েছে, তবে ঝালটা একটু কম হয়েছে!"

"ঝাল! চায়ে ঝাল কম হয়েছে মানে কী?" 

মি. নাভান শুকনো ঢোক গিললেন। তিনি মনে মনে ভাবলেন, "হে খোদা! শেষ পর্যন্ত আমার ছেলের কপালে কি এক পাগল জুটল !!"মুরুব্বিরা ইনায়াকে আপাতত  ইগনোর করার সিদ্ধান্ত নিলেন। মি. নাসির বেশ গম্ভীর গলায় চূড়ান্ত রায় দিলেন,

 "যাই হোক, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আগামী মাসেই খুব ধুমধাম করে তোমাদের বিয়ে দেব!"

সিদ্ধান্তটা শোনা মাত্রই যেন ড্রয়িং রুমে বোমা ফাটল। ইনায়া আর আয়ান—দুজনেই সোফা থেকে স্প্রিংয়ের মতো লাফ দিয়ে একসাথে দাঁড়িয়ে পড়ল।

"অসম্ভব! আমি মরে গেলেও একে বিয়ে করব না!" 

দুজনেই একসাথে চিৎকার করে উঠল।আয়ানের মা এবার বিরক্ত হয়ে বললেন, 

"বিয়ে তো অলরেডি করেই ফেলেছ! এখন এত ঢং করছ কেন? সবাই এখন জানে তোমরা জামাই-বউ।"

ইনায়ার মাথার রগ এবার রাগে ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। মনে মনে ভাবল, "কে বলেছিল ওইদিন ওই আয়ান শয়তানটাকে ওই রাস্তা দিয়ে যেতে?"রাগের চোটে ইনায়ার হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে গেল। সে হুট করে আয়ানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আয়ানের চুলগুলো খামচে ধরল। আয়ানও কম যায় না! সে-ও ‘আউচ’ বলে চিৎকার দিয়ে ইনায়ার পরিপাটি করে বাঁধা চুলে হ্যাঁচকা টান দিল।

"ছাড় বলছি ডাইনি! আমার চুলের জেল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে!" 

আয়ানের আর্তনাদ।

"আগে তুই ছাড় শয়তান! তোর জন্য আজ আমার এই দশা!" 

ইনায়ার পালটা গর্জন।ব্যাস! ড্রয়িংরুম মুহূর্তেই কুস্তি লড়ার রিংয়ে পরিণত হলো। দুই হবু বর-কনের এই হুলস্থুল চুলাচুলি দেখে মি. নাসির আর মি. নাভান সোফা ছেড়ে পালিয়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। ড্রয়িং রুমের অবস্থা এখন আর ড্রয়িং রুমের মতো নেই, যেন রীতিমতো রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে! একদিকে আয়ান আর ইনায়া একে অপরের চুল ধরে কুস্তি লড়ছে, আর অন্যদিকে আরিশা সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে এক মুহূর্ত দেরি করল না।ফারিশ যখন হাঁ করে আয়ান-ইনায়ার চুল টানাটানি দেখছিল, ঠিক তখনই আরিশা ঝড়ের বেগে তার সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর জমে থাকা সব ক্ষোভ আর বিরক্তি নিয়ে ফারিশের হাতে আর পিঠে ধপাধপ কিল-ঘুষি বসাতে শুরু করল।

"সব! সব সব সব আপনার জন্য!"

 আরিশার চিৎকারে ফারিশ কয়েক সেকেন্ড ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে শুধু মার খেয়ে গেল।হঠাৎ ধ্যান ফিরতেই ফারিশ আরিশার হাত দুটো খপ করে ধরে ফেলল।সে আরিশার দিকে তেড়ে গিয়ে গর্জে উঠল, 

"কিডন্যাপটা কে করেছে শুনি??"

আরিশা এবার পালানোর পথ খুঁজতে শুরু করল। ফারিশ এক পা আগায় তো আরিশা দুই পা পেছায়। শুরু হলো ড্রয়িং রুম জুড়ে ইঁদুর-বেড়াল দৌড়ানি! ফারিশ সোফার ওপর দিয়ে লাফিয়ে আরিশাকে ধরতে যাচ্ছে, আর আরিশা ডাইনিং টেবিলের চারপাশে ঘুরছে।এই নতুন দৃশ্য দেখে আয়ান আর ইনায়া নিজেদের যুদ্ধ থামিয়ে দিল। তারা এখনো একে অপরের চুল মুঠো করে ধরে রেখেই বিস্ময়ে হা হয়ে তাকিয়ে আছে। ড্রয়িং রুমের বাকি বড়রাও অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে। তাদের চোখেমুখে একটাই প্রশ্ন— "এদের হঠাৎ কী হলো?"ইনায়া চুলের মুঠি ধরা অবস্থাতেই ফিসফিস করে আয়ানকে বলল, 

"এদের আবার কি হলো ভাই?"

আয়ান নিজের চুলের গোছায় টান খেয়ে মুখ বিকৃত করে উত্তর দিল, 

"সেটাই তো!!আমাদের দুঃখে এরা কেন কুস্তি লড়ছে!!"



RE: গল্প:অঘোষিত হৃদয়সন্ধি (Writer: Raisa Mehran) - X Man - 09-01-2026

 04

হাসপাতালের দীর্ঘ, সুনসান করিডোর ধরে হেঁটে যাচ্ছে আরিশা আর ইনায়া। গায়ে সাদা অ্যাপ্রন আর দুজনের মুখেই তখন চিন্তার গভীর ভাঁজ। সেই তখন থেকেই আরিশার কাছে ইনায়া অনবরত নাকে কেঁদে চলেছে। অনেক বুঝিয়ে, মাথায় হাত বুলিয়ে, নানা রকম সান্ত্বনা দিয়ে আরিশা মাত্রই ইনায়াকে কিছুটা শান্ত করেছে।
ইনায়া চোখ মুছে নাক টানতে টানতে ক্ষোভ উগরে দিল,

 "ভাই!!! ওই আয়ান শয়তানটাকে যদি এবার উচিত শিক্ষা দিতে না পেরেছি না... কী বলব তোকে! শয়তানটা সারাটা জীবন শুধু আমাকে জ্বালিয়েই গেল..."

ইনায়ার অমন চিৎকার মার্কা আক্ষেপে আরিশা একটা ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নিজের কপালে হাত দিয়ে বলল,

 "আয়ান ভাই এটলিস্ট যথেষ্ট ভালো রে। অন্তত ওই ‘মাইগ্রেন’-এর মতো  না। তুই মাত্র কয়েকবছরের জ্বালানোর কথা বলছিস!! আর ওই মাইগ্রেন তো ছোটবেলা থেকেই আমায় জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে আসছে!"

আসলে এই চারজনের সম্পর্কের জালটা বেশ পুরনো আর জটিল। ফারিশ আর আরিশার মা-বাবা একে অপরের বহু বছরের পুরনো বন্ধু। পারিবারিক এই গভীর বন্ধুত্বের সুবাদেই আরিশা, ফারিশ আর আয়ানের একসাথে বড় হওয়া। ফারিশ আর আয়ান দুজনেই আরিশার থেকে ঠিক ৬ বছরের বড়। কিন্তু ফারিশ ছোটবেলা থেকেই আয়ানকে আরিশার কাছাকাছি দেখলে রেগে যেত। তার  সবসময় মনে হতো, আয়ানের বুঝি আরিশার ওপর একটু আদিখ্যেতা বেশি! ওদিকে বেচারা আয়ানের সারাটা জীবন কেটে গেল ফারিশকে বুক চাপড়ে এটা বোঝাতে যে—সে আরিশাকে নিজের আপন ছোট বোনের চোখেই দেখে, অন্য কোনো চোখে নয়! 
এমনই এক পারিবারিক আবহে, আরিশা যখন ক্লাস এইটে পড়ে, তখন তার জীবনে আগমন ঘটে ইনায়ার। ইনায়া আর আরিশার বন্ধুত্বটা যেমন প্রথম দিনেই জমে গিয়েছিল, আয়ান আর ইনায়ার সমীকরণটা হয়েছিল ঠিক উল্টো। তাদের প্রথম সাক্ষাৎটাই হয়েছিল এক তুমুল ঝগড়ার মধ্য দিয়ে, আর সেই যে শুরু—আজ এত বছর পরও তাদের সেই ঝগড়া সমানভাবে চলমান!
আরিশার আক্ষেপ শুনে ইনায়া এবার ফারিশের পক্ষে সাফাই গাইতে শুরু করল, 

"শুন আরিশা, ফারিশ ভাই কিন্তু মানুষ হিসেবে যথেষ্ট ভালো!! তুই শুধু শুধু ওনার সাথে ঝগড়া করিস আর ওনাকে খ্যাপাস!"

ইনায়ার মুখে ফারিশের এই গুণগান শুনে আরিশা বিরক্তিতে মুখ বাঁকাল। একদম ভেঙিয়ে উঠে বলল,

 "ওহহ, কত ভালো মানুষ রে..."

"ভালো কথা!! তুই তো নাসির স্যারকে বলে এই বিয়েটা আটকাতে পারিস, আরিশা!!স্যার তো তোকে অনেক স্নেহ করেন, স্যার নিশ্চয়ই তোর কথা শুনবে!!"

ইনায়ার আইডিয়া শুনে আরিশা খিলখিল করে হেসে উঠল, 

"স্যার মানে আঙ্কেল?? হাসাস না ইনায়া! লাস্ট দুইদিন ধরে উনি ফারিশের ভয়ে ঠিকমতো কথাই বলছে না। নিজের ছেলের সামনে কেমন যেন চোরের মতো গুটিসুটি মেরে থাকে। আমি তো এটাই বুঝলাম না, উনি হঠাৎ নিজের ওই লয়ার ছেলেকে কেন এত ভয় পাচ্ছে?? এ নাকি আবার শহরের নামকরা হার্ট স্পেশালিস্ট, ডাক্তার নাসির! ছেলের সামনে এলেই ওনার নিজের হার্টবিট বন্ধ হওয়ার জোগাড় হয়!"

আরিশা হাসতে হাসতে কথাটা বলছিল। কিন্তু সে খেয়াল করেনি, ইনায়া গত কয়েক সেকেন্ড ধরে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, ইনায়া অনেকক্ষণ ধরেই ক্রমাগত নিজের হাত নেড়ে আরিশাকে থামানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। ভয়ে বেচারির  মুখটা একেবারে শুকিয়ে  গেছে।আরিশা এবার একটু বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,

 "আরে কী হয়েছে তোর? কথা না বলে পেছনে ওভাবে হাত দিয়ে কীসের ইশারা দিচ্ছিস? পেছনে কি কোনো ভূত এসেছে?"

কথাটা শেষ করতে করতেই আরিশার ঠোঁটের কোণের চওড়া হাসিটা আচমকা স্তব্ধ হয়ে গেল।বুঝতে আর বাকি থাকে না এবারও সে যার নামে বলছে সেই ব্যক্তি তার পিছনে এসে হাজির। 

" আ.. আমার ফোনটা বোধহয় ক্লাসে রয়ে গেছে। আমি গেলাম!! "

কথাটা বলেই কোনোরকম পালায় ইনায়া। আরিশা এবার মুখে একটা বেশ বড়সড় কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে ঝট করে পেছনে তাকাল।

"আরে আঙ্কেল যে!! আসসালামু আলাইকুম! কেমন আছেন?"

কিন্তু আরিশার মিষ্টি কথার জাদু এবার আর কাজে দিল না। কথা শেষ হওয়ার আগেই মি. নাসির  আরিশার ডান কানটা খপ করে চেপে ধরলেন। 

 "কেন ভয় পাই, তুই জানিস না? তোর ওই বুদ্ধিতে তোকে হেল্প করতে গিয়ে এখন আতঙ্কে আমার দিন কাটাতে হচ্ছে! ওদিকে ঘরে আমার নিজের ছেলে সারাক্ষণ আমার দিকে কেমন সন্দেহভাজন আর তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে থাকে।"

কানের  টানে আরিশার মুখের ওই সাজানো হাসি মুহূর্তেই গায়েব হয়ে গেল। সে এক হাত দিয়ে নিজের কানটা বাঁচানোর চেষ্টা করতে করতে বলে উঠল,

 "বুঝেছি! বুঝেছি আঙ্কেল!! নিজের ভুল একদম অক্ষরে অক্ষরে বুঝেছি। এবার তো কানটা ছাড়ো! আমার একটাই না... মানে আমার দুইটাই মাত্র কান, আঙ্কেল! একটা ছিঁড়ে গেলে তখন আমি কি করবো!!ছাড়ো!!"

আরিশার করুণ দশা দেখে মি. নাসির একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অবশেষে তার কানটা ছেড়ে দিল। 
কানটা ডলতে ডলতে আরিশা একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। দ্রুত প্রসঙ্গ ঘোরানোর জন্য সে এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলল,

 "তা... আঙ্কেল, তোমার সেই গুণধর ছেলে এখন কোথায়?"

মি. নাসির হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে  উত্তর দিলেন,

 "কোথায় আবার? ওনার কাজে গেছেন! "

___________

" আমি লয়ার ফারিশ নওয়ান। আমায় কিডন্যাপ করবে এই সাহস কারোর এখনও হয়নি!! আর আপনারা নিউজে রটাচ্ছিলেন আমায় কিডন্যাপ করে জোর করে বিয়ে করা হয়েছে? হাউ ফানি!!"

ফারিশের কণ্ঠের সেই গাম্ভীর্য আর ধারালো কথায় উপস্থিত সাংবাদিকদের বুক কেঁপে উঠল। 

"এনিওয়ে, আপনাদের এই খবরটা দিল কে? সোর্সটা কী আপনাদের?"

ভিড়ের মধ্য থেকে একজন সিনিয়র সাংবাদিক আমতা আমতা করে বললেন,

 "আসলে... আমাদের ফোনে একটা আননোন নাম্বার থেকে মেসেজ এসেছিল, স্যার! সেখানে বলা হয়েছিল লয়ার ফারিশ নওয়ানকে কাজী অফিসে আটকে রাখা হয়েছে।"

"মেসেজ!!"

ফারিশের ভ্রু দুটো কুঁচকে গেল। কে এই কাজ করতে পারে? সে যে কাজী অফিসে ছিল, এই খবর বাইরের একজন মানুষ জানলই বা কী করে? ফারিশ আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে গম্ভীর গলায় আদেশ দিল, 

"আমায় নাম্বারটা এখনই শেয়ার করবেন। আর লিসেন,আমার ভাইয়ের নামে যে নিউজটা আপনারা করেছিলেন, তা আগামী দশ মিনিটের মধ্যে ডিলিট করার ব্যবস্থা করুন। নয়তো আপনাদের আমি আস্ত রাখব না! মানহানির এমন মামলা ঠুকব যে কোর্টের চক্কর কাটতে কাটতে জীবন পার হয়ে যাবে।"

ফারিশের এই প্রকাশ্য হুমকিতে সাংবাদিকরা ভয়ে হড়বড় করে সায় দিল। মাথা নাড়তে নাড়তে তারা যে যেভাবে পারল দ্রুত সেখান থেকে  পালাল।চারিদিক ফাঁকা হতেই ফারিশ এবার ঘুরে  তার পাশে ফাইলপত্র হাতে দাঁড়িয়ে থাকা জুনিয়র সহকারী লয়ার আসিফের দিকে স্থির চোখে তাকাল। কন্ঠস্বর কিছুটা নিচু করে জিজ্ঞেস করল, 

"ওনার কী অবস্থা? তোমায় একবার দেখে আসতে বলেছিলাম, গিয়েছিলে?"

ফারিশের এই প্রশ্নে আসিফের মুখেভঙ্গি এক নিমেষে বদলে গেল। সে আতঙ্কে আর অস্বস্তিতে আমতা আমতা করতে লাগল। 

"কী বলেন স্যার এসব!! এই কেসটা কত বড় আর কতটা সেনসিটিভ, আপনার কোনো ধারণা আছে? ওইখানে এই মুহূর্তে যাওয়াটা যে কতটা লাইফ রিস্ক, আপনি তো জানেনই!! "

ফারিশ এবার  দাঁতে দাঁত চেপে  আসিফের দিকে তাকাল। তার মানে এই ভীতু ছেলেটা ভয়ে ওখানে পা-ই রাখেনি! সে তৎক্ষণাৎ নিজের চেয়ার ছেড়ে  উঠে দাঁড়াল।

"রেডি হও আসিফ, আমরা এখনই সেখানে যাব!"

কথাটা শুনে আসিফ প্রায় কেঁদে ফেলার মতো মুখ করে বলল,

 "কিন্তু স্যার! আপনার বিকেলে অন্য একটা বড় কর্পোরেট মার্ডারের কেস নিয়ে বসার কথা আছে... তাছাড়া ক্লায়েন্টরা আপনার জন্য অফিসে অপেক্ষা করছে..."

"আমি বলেছি আমরা এখন ওইখানেই যাব!"

 ফারিশ আসিফের কথা মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে তার স্বভাবসুলভ ডমিনেটিং গলায় বলল, 

"অন্য আর যে কোনো জরুরি কাজই থাকুক না কেন, বর্তমানে আমার কাছে এই কেসটা অনেক বেশি ইম্পোর্ট্যান্ট। নাও, হারি আপ!"

কোর্টের সেই অতীব জরুরি কেসটার উদ্দেশ্যেই নিজের গাড়ি নিয়ে রওনা হয়েছিল ফারিশ। আর  আসিফ নিজের বাইক নিয়ে আসছিল ফারিশের গাড়ির ঠিক পেছনে পেছনে। কিন্তু শহরের ব্যস্ততম এক মোড়ে এসে হঠাৎ করেই ফারিশের গাড়ির ব্রেক কষার তীব্র শব্দ হলো। পেছনের বাইকে থাকা আসিফও কোনোমতে ব্রেক চেপে নিজেকে সামলাল। সে অবাক হয়ে ফারিশের গাড়ির দিকে তাকাতেই দেখল, ফারিশ অলরেডি গাড়ি থেকে নেমে পড়েছে। তার চোয়ালটা রাগে শক্ত হয়ে উঠেছে।
রাস্তার ঠিক ওপারেই দাঁড়িয়ে আছে আরিশা আর  আয়ান। আয়ান আরিশার সাথে হেসে হেসে কথা বলছে।

"কী হচ্ছে এখানে??"

ফারিশের গম্ভীর কন্ঠস্বর শুনতেই আয়ান আর আরিশা দুজনেই রীতিমতো চমকে উঠল। ভাইয়ের মুখের এই চেনা মুখভঙ্গি দেখে আয়ানের বুঝতে আর বাকি রইল না যে—ভাই আবারও চরম ক্ষেপেছে! আয়ান তাড়াহুড়ো করে দুই হাত নেড়ে ফারিশকে বোঝানোর সুরে বলতে শুরু করল, 

"আরে, ফারিশ!! আসলে আজ ভার্সিটির ক্লাসটা একটু তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গিয়েছিল তো, তাই বাড়ি ফিরছিলাম। মাঝরাস্তায় এসে দেখি আরিশা এখানে একা দাঁড়িয়ে আছে। ওর গাড়িটা হুট করে খারাপ হয়ে গিয়েছিল, স্টার্ট নিচ্ছিল না। তাই আমি জাস্ট একটু হেল্প করতে..."

ফারিশ আয়ানের কথার কোনো উত্তর না দিয়ে, জাস্ট একটা তীক্ষ্ণ চাউনি দিল। তারপর কোনো বাক্যব্যয় না করে আয়ানের কাঁধে হাত রেখে, তাকে ঘুরিয়ে তার নিজের গাড়ির দিকে একটা আলতো ধাক্কা দিল। সেই আলতো ধাক্কার বার্তাটা খুব পরিষ্কার ছিল—‘এখান থেকে এখনই বিদায় হ!’আয়ান আর নিজের বিপদ ডেকে আনতে চাইল না। সে আরিশার দিকে একটা ‘আল্লাহ হাফেজ’ মার্কা অসহায় চাউনি দিয়ে আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে নিজের গাড়ির দিকে চলে গেল।ঠিক তখনই আসিফ তার বাইকটা রাস্তার পাশে স্ট্যান্ড করে ফারিশের কাছে হেঁটে এল। সে ফারিশকে ওভাবে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বেশ আতঙ্কিত গলায় বলল, 

"স্যার, যাবেন না? সময় পার হয়ে যাচ্ছে তো!"

ফারিশ আসিফের কথার জবাব দেওয়ারও প্রয়োজন বোধ করল না। সে আসিফের সামনে গিয়ে দাঁড়াল এবং কোনো কথা না বলে আসিফের হাত থেকে তার বাইকের চাবিটা এক ঝটকায় কেড়ে নিল। তারপর নিজের পকেট থেকে কার-এর চাবিটা বের করে আসিফকে দিল।

"তুমি গাড়ি নিয়ে যাও, আমি পরে আসছি!"

আসিফ তো আকাশ থেকে পড়ল। সে চাবিটা হাতে নিয়ে হতভম্ব হয়ে বলল,

 "মানে কী স্যার! আপনি না মাত্র কয়েক মিনিট আগে বললেন—এখন ওই কেসটা ব্যতীত অন্য কোনো কাজই আপনার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়! তবে এখন আবার কী হলো? স্যার, আমি ওই ডেঞ্জারাস জায়গায় একা যেতে পারব না!! ওটা মারাত্মক রিস্কি!"

ফারিশ আরিশার দিকে এক পলক তাকিয়ে, চোখ ঘুরিয়ে আসিফের দিকে তাকাল। দাঁতে দাঁত চেপে গম্ভীর ধমকের সুরে ডাকল—

"আসিফ!!!"

 আসিফ আর একটা শব্দও উচ্চারণ করার সাহস পেল না। সে শুকনো একটা ঢোক গিলে, চাবিটা পকেটে পুরে বাধ্য ছেলের মতো ফারিশের গাড়ির দিকে পা বাড়াল।

এতক্ষণ ধরে ঘটে যাওয়া পুরো ঘটনাটা এক দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছিল আরিশা। ফারিশ আসিফকে বিদায় করে দিয়ে একবার আরিশার দিকে তাকাল। সে আরিশার দিকে চেয়েই নিজের পকেট থেকে ফোনটা বের করল এবং দ্রুত কাউকে একটা কল দিল। ওপাশ থেকে কল রিসিভ হতেই খুব সংক্ষিপ্ত গলায় কিছু একটা বলল ফারিশ, যা আরিশার কান অব্দি পৌঁছাল না। কথা শেষ হতেই ফোনটা আবার পকেটে রেখে সে পুনরায় আরিশার একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। দুই জনের মাঝখানের দূরত্বটা মাত্র কয়েক ইঞ্চি।

"চলো!!" 

কথাটা শুনে আরিশা কপালটা কুঁচকে, চিবুকটা সামান্য উঁচিয়ে বলল,

 "কোথায়??"

"বেশি প্রশ্ন না করে বাইকে ওঠো!"

কথাটা বলতে বলতেই ফারিশ বাইকের ওপর  উঠে বসল। বাইক স্টার্ট দেওয়ার আগে সে চশমাটা খুলে কোনো অনুমতি না নিয়েই আরিশার বাড়িয়ে রাখা হাতের মুঠোয় গুঁজে দিল। তারপর নিজের হেলমেটটা মাথায় পরে নিল। বাইকের হ্যান্ডেলে ঝুলে থাকা অপর হেলমেটটা টেনে নিয়ে সে আরিশার দিকে ঝুঁকে এল এবং আরিশার কিছু বলার আগেই পরম যত্নে সেটা আরিশার মাথায় পরিয়ে দিল। বাইকের পেছনে আড়ষ্ট হয়ে উঠে বসে আরিশা একটু নড়েচড়ে বসল। মাঝখানের দূরত্বটা বজায় রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে সে কিছুটা চড়া গলায় বলল,

 "বাসায় চলুন তাড়াতাড়ি!! মা নিশ্চয়ই এতক্ষণে আমার জন্য টেনশন করছে!"

"আমরা এখন বাসায় যাব না।"

"তবে? কোথায় যাব?" 

আরিশা এবার আসলেও বেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।কিন্তু ফারিশের কাছ থেকে কোনো উত্তর পাওয়া গেল না। আরিশা উত্তর না পেয়ে পুনরায় একটু চেঁচিয়ে বলল, 

"আরে বলুন না কোথায় যাচ্ছেন? মা তো সত্যিই টেনশন করবে!"

ফারিশ হেলমেটের কাঁচটা সামান্য তুলে বাঁকা হেসে আয়না দিয়ে আরিশার দিকে তাকাল। তারপর নির্বিকার গলায় বলল, 

"আন্টিকে অলরেডি ফোন করে বলে দিয়েছি যে তুমি আমার সাথে আছো। সো, নো প্রবলেম।"

ফারিশের কথা শুনে আরিশা অবাক হয়। 

" মা আপনার কথায় রাজি হলো?? অথচ ইনায়ার সাথে ঘুরতে যেতে চাইলে রাজি হয় না!! "

আরিশার কথায় ফারিশ এবার কিছুটা কপাল কুচকায়। 

" ঘুরতে যেতে ইচ্ছে করলে আমায় বলবে, আমি নিয়ে যাব। অন্য কারোর সাথে কেন যাবে, হ্যাঁ?? "

ফারিশের কথায় কোনো উত্তর না দিয়ে বাইক ধরে আরও ভালো করে বসে আরিশা। 

 " ধরে বসো!! "

" ধরলাম তো!! "

"বাইককে না, আমাকে।"

 ফারিশ লুকিং গ্লাসে আরিশার দিকে তাকিয়ে শান্ত চোখে বলল।আরিশা এবার নিজের চিবুকটা আরও উঁচিয়ে জেদি গলায় উত্তর দিল,

 "পারব না!!"

ফারিশ খুব ভালো করেই জানে, এই  মেয়ে এত সহজে শুনবে না। তাকে বাগে আনার জন্য ফারিশের কাছে দারুণ সব টেকনিক জানা আছে। সে আর এক মুহূর্তও কথা বাড়াল না।বাইক স্টার্ট দিল। পুরো ফুল স্পিড!গতির এই আকস্মিক ধাক্কায় আরিশা নিজের ভারসাম্য ধরে রাখতে পারল না। দুই হাত ছিটকে চলে এল সামনের দিকে। আরিশা একদম না চাইতেও ফারিশকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। নিজের অজান্তেই তার চোখ দুটো ভয়ে বন্ধ হয়ে এল।
বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ ছাপিয়ে আরিশা চিৎকার করে বলল,

 "স্পিড কমান প্লিজ! আমার ভীষণ ভয় করছে!!"

হেলমেটের ভেতরে ফারিশের ঠোঁটের কোণে সেই চেনা বাঁকা হাসিটা ফুটে উঠল। আরিশাকে নিজের এত কাছে পেয়ে তার ভেতরের সমস্ত রাগ যেন এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে আর আরিশাকে না জ্বালিয়ে আস্তে আস্তে বাইকের স্পিডটা কমিয়ে নিয়ে এল একদম স্বাভাবিক গতিতে।স্পিড কমতেই আরিশা একটু স্বস্তি পেল, কিন্তু ফারিশের পিঠ থেকে নিজের হাত দুটো সরাল না। সে মুখটা সামান্য বাঁকিয়ে গাল ফুলিয়ে বিড়বিড় করল, 

"একটা আস্ত অসভ্য লোকের সাথে আমার বিয়ে হয়েছে! মানি না এই বিয়ে আমি!!"

আরিশার এই কিউট অভিযোগে ফারিশ একদম শব্দ করে হেসে উঠল। মাথাটা সামান্য দুলিয়ে বলল, 

"আই নো, আমিও মানি না!"

আরিশা এবার একটু কৌতূহলী হয়ে ফারিশের কাঁধের ওপর দিয়ে উঁকি মেরে জিজ্ঞেস করল,

 "আচ্ছা, এবার অন্তত দয়া করে বলবেন যে আমরা যাচ্ছি কোথায়?"

ফারিশ বাইকটা শহরের কোলাহল ছেড়ে একটু ফাঁকা, গাছপালায় ঘেরা সুন্দর রাস্তার দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। সে বেশ রসিকতা করে বলল,

 "এতটা বছর সিঙ্গেল লাইফের মহাসুখে ছিলাম। আজ হুট করে সেই সিঙ্গেল লাইফের সমাধি হয়ে গেল, আমরা অফিসিয়ালি মিঙ্গেল হয়ে গেলাম! তাই ভাবলাম ঐতিহাসিক দিনটার উপলক্ষে একটা লং ড্রাইভে যাওয়া যাক, কী বলো ওয়াইফ?"

ফারিশের মুখে এই 'সিঙ্গেল লাইফের সমাধি'র কথা শুনে আরিশা নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে খিলখিল করে হেসে উঠে বলল,

 "হাহা, এটা অবশ্য আপনি একদম ঠিক বলেছেন!!"

 আরিশা এবার এই লং ড্রাইভটা বেশ উপভোগ করতে শুরু করল। বাইকটা তখন অনেকটা পথ পেরিয়ে বেশ মনোরম একটা রাস্তার মোড়ে এসে পৌঁছেছে।হঠাৎ আরিশার চোখ গেল রাস্তার পাশে এক বৃদ্ধ লোকের দিকে, যিনি গোলাপি রঙের হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করছেন। আরিশা বাচ্চাদের মতো উত্তেজিত হয়ে ফারিশের পিঠে কিল মেরে চেঁচিয়ে উঠল,

 "এই এই থামুন! থামুন বলছি!!"

ফারিশ হঠাৎ আরিশার এই আকস্মিক চিৎকারে কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে কপাল কুঁচকে বলল, 

"কেন? কী হলো?"

"হাওয়াই মিঠাই খাব!! ওই দেখুন আঙ্কেল হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করছে!"

 আরিশা এক হাত দিয়ে রাস্তার ওপারটা দেখিয়ে চোখ দুটো চকচক করে বলল। ফারিশ বাইকের স্পিড একদম কমিয়ে নিয়ে এল, কিন্তু মুখে দুষ্টুমি মাখিয়ে বলল,

 "উঁহু, দিব না!!"

ফারিশের মুখে এই সরাসরি 'না' শুনে আরিশার মুখের সমস্ত আনন্দ এক সেকেন্ডে উধাও হয়ে গেল। সে বাচ্চাদের মতো ঠোঁট উল্টে, অভিমানী মুখে ফারিশের পিঠ থেকে হাত সরিয়ে আবার বাইকের পেছনের অংশ ধরে বসে রইল। ফারিশ আয়নায় আরিশার ওই গম্ভীর আর গোমড়া মুখটা দেখে মনে মনে হাসতে লাগল।মেয়েটাকে জ্বালাতে তার ভালোই লাগে। পরক্ষণেই আরিশা রেগে ফারিশের দিকে তাকায়। এত তাড়াতাড়ি মেনে যাওয়ার মেয়ে আরিশা নয়। 

"শুনুন না, প্লিজ.. একটা ছোট্ট আবদারই তো করলাম!! "

 তোমার এই ছোট্ট আবদার পূরণ করতে করতেই আবার জীবন শেষ। পারবো না!! "

"প্লিজ... প্রিটি প্লিজ..... "

" নোপ!!আমি ফারিশ নওয়ান যেহেতু একবার না বলেছি তার মানে না!!"

আরিশা এবার রেগে ফারিশের কাধে কয়েকটা বারি দিয়ে বলে, 

"আপনার এসব ভাব অন্যদের সামনে দেখাবেন, সেখানে কাজে দিলেও আমার সামনে তা দুই সেকেন্ডও থাকে না। এবার বলুন আমার কথা শুনবেন কিনা?? "

আরিশার এই কান্ডে ফারিশ সঙ্গে সঙ্গে বাইক থামিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে আরিশার দিকে তাকায়। 

"পুরাই জল্লাদ মেয়ে!! বাঁচাও আল্লাহ!!"

ফারিশ এবার গিয়ে আরিশার জন্য হাওয়াই মিঠাই এনে দিয়ে পুনরায় বাইক স্টার্ট দেয়। আরিশা এক হাতে ফারিশকে ধরে অপরহাতে হাওয়াই মিঠাই খেতে থাকে। 

" খাবেন?? "

" নাহ, তুমিই খাও!! "

মিররে আরিশাকে একবার দেখে ফারিশ এবার গাইতে শুরু করে, 

"এলে নীলচে মাস, আমি সাজাবো ঘাস
তুমি পা ফেলে আনবে বাহার
এলে মেঘলা দিন, আমি খুব রঙিন
হয়ে সামলাবো আকাশ তোমার..."



RE: গল্প:অঘোষিত হৃদয়সন্ধি (Writer: Raisa Mehran) - X Man - 09-01-2026

 05

আরিশার সাথে সারাদিন পাগলামি আর বেশ কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরির পর, ফারিশ তার সেই অতীব প্রয়োজনীয় কেসটার কাজে গিয়ে এখন সবেমাত্র বাসায় ফিরল। কোটের বোতামটা খুলতে খুলতে সে যখন ড্রয়িংরুমে পা রাখল, তখনই তার চোখ গেল সামনের সোফাটায়।
সেখানে বেশ আরাম করে বসে মি. নাসির আয়েশ করে চা খাচ্ছেন আর ফোনের স্ক্রিনে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে কী যেন দেখছেন। ফারিশ শান্ত কিন্তু দৃঢ় পায়ে এগিয়ে গিয়ে ঠিক মি নাসিরের মুখোমুখি দাঁড়াল। 

"তোমার সাথে কিছু জরুরি কথা আছে, ড্যাড!!"

ফারিশের সেই গম্ভীর স্বর কানে আসতেই মি. নাসির বিষম খাওয়ার মতো করে আতঙ্কে ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ তুলে তাকালেন। সামনে তাকাতেই দেখলেন—ছেলের চোখে সেই চিরচেনা তীরের মতো সন্দেহ মেশানো তীক্ষ্ণ চাউনি! মি. নাসিরের বুকের ভেতরটা যেন গুরগুর করে উঠল।

"ড্যাড!!"

 ফারিশ পুনরায় ডাকল, এবার গলায় গাম্ভীর্যের মাত্রাটা আরেকটু চড়া।মি. নাসির এবার আর সোফায় বসে থাকার সাহস পেলেন না। হাতের চায়ের কাপটা তড়িঘড়ি করে টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ালেন।

"হ্যাঁ... হ্যাঁ হ্যাঁ, হবে হবে! অবশ্যই কথা হবে রে বাপ। আসলে মাত্রই ওয়াশরুম... থুড়ি! হসপিটাল থেকে এলাম তো। আমি একটু ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে আসি। তুই বোস, তুই একটু রিল্যাক্স কর!!"

মি. নাসিরের কথা শুনে ফারিশ হাত পকেটে ঢুকিয়ে, ভ্রু জোড়া কুঁচকে ওনার দিকে তাকাল। একদম জেরা করার ভঙ্গিতে সন্দেহভরা প্রশ্নে বলল,

 "হসপিটাল থেকে এসে ফ্রেশ না হয়েই সোফায় বসে চা খাচ্ছ, ড্যাড?"

ছেলের এই যুক্তির সামনে মি. নাসির মনে মনে একটা শুকনো ঢোক গিললেন। কপালে সামান্য ঘাম জমল ওনার। আর কোনো অজুহাত খুঁজে না পেয়ে নিজের কপালে হাত দিয়ে বললেন,

 "প্রেসারটা হুট করে বড্ড বেড়েছে রে ! আমি গেলাম!!"

কথাটা শেষ করারও তর সইল না ওনার। ফারিশকে আর কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে মি. নাসির প্রায় এক প্রকার দৌড়েই সেখান থেকে পালালেন।বাবার এমন অদ্ভুত চোরের মতো পলায়ন দেখে ফারিশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে কোটটা খুলে সোফার পাশে রাখল এবং নিজে বেশ আরাম করে সোফাটায় হেলান দিয়ে বসল।
পকেট থেকে ফোনটা বের করে সে লক খুলল। চ্যাট লিস্টের ওপরের দিকে থাকা 'আরু' নামটার ওপর আঙুল ছুঁইয়ে একটা ছোট মেসেজ টাইপ করে সেন্ড করে দিল—

"ইও!! হোয়াটস আপ??"

মেসেজটা পাঠাতেই ফারিশের সেই  গম্ভীর হয়ে থাকা ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মিষ্টি, বাঁকা হাসি ফুটে উঠল।

তিন ঘণ্টা!! ঠিক তিন-তিনটে ঘণ্টা পার হয়ে গেছে, কিন্তু মি. নাসিরের ওয়াশরুম থেকে বের হওয়ার কোনো নামগন্ধই নেই!এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে ফারিশ আরিশার সাথে বেশ অনেকক্ষণ ফোনে চ্যাট করল, নিজের রুমে গিয়ে ফ্রেশ হলো,  এক মগ কড়া ব্ল্যাক কফি খেল, এমনকি ল্যাপটপে নিজের কিছু জরুরি কেসের কাজও গুছিয়ে ফেলল—কিন্তু মি. নাসিরের দেখা নেই তো নেই-ই! একটা মানুষ তিন ঘণ্টা ধরে ওয়াশরুমে কী করতে পারে, তা ফারিশের মাথাতেও ঢুকছে না।ফারিশের ধৈর্যের বাঁধ এবার সত্যিই ভেঙে গেল। সে কফির মগটা টেবিলের ওপর দড়াম করে নামিয়ে রেখে সোজা মি. নাসিরের বেডরুমে গিয়ে ঢুকল। তারপর ওয়াশরুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে ধাক্কাতে লাগল—

"ড্যাড!!" 

ফারিশের গলায় এবার স্পষ্ট রাগ।ওদিকে ওয়াশরুমের ভেতরে তখন এক এলাহী কাণ্ড চলছে! মি. নাসির ওয়াশরুমের বড় আয়নাটার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে হাত-পা নেড়ে রিহার্সাল করছিলেন যে, ছেলে সামনে এলে ঠিক কী কী বাহানা দেওয়া যায়। তিনি মনে মনে ভাবছিলেন, ‘ছেলে কি আসলেই ধরে ফেলেছে যে ওই কিডন্যাপ নাটকের মূল মাস্টারমাইন্ড আমিই ছিলাম? আরিশাকে ওই বুদ্ধিটা আমিই দিয়েছিলাম?’ ঠিক এমনই এক ভাবনার চরম মুহূর্তে দরজায় ওই বিকট শব্দ আর ফারিশের গগনবিদারী ডাক শুনে মি. নাসির চমকে উঠল!
তিনি ভয়ে প্রায় লাফিয়ে উঠে কাঁপাকাঁপা গলায় বললেন,

 "কে... কে? কে ধাক্কায়?"

ফারিশ দরজায় আরেকটা থাপ্পড় মেরে চরম বিরক্তিতে রেগে বলল,

 "পাশের বাড়ির কুদ্দুসের বউ!! দরজাটা খুলবে ড্যাড?? এতক্ষণ ধরে ওয়াশরুমে বসে বসে তুমি ঠিক কী করছ শুনি??"

ছেলের মুখে এমন ত্যাড়া উত্তর শুনে মি. নাসির একটু সাহস সঞ্চয় করার চেষ্টা করলেন। ভেতরের ভয়টা ঢাকতে একটু নার্ভাস হাসি হেসে বললেন,

 "কী করি মানে?? মানুষ ওয়াশরুমে এসে কী করে?? হিহি... আমার এত বড় লয়ার ছেলে দেখি এটাও জানে না!!"

"ড্যাড!! ফাজলামো বন্ধ করে বের হও!!"

"না!! বের হব না।"

"ড্যাড!!"

মি. নাসির এবার ভেতরে দাঁড়িয়েই একটু চড়া গলায় আক্ষেপ করার ভান করলেন,

 "আরে কী আজব! কী জামানা এলো রে বাবা! এই যুগে দেখছি নিজের বাড়িতে শান্তিতে একটু ওয়াশরুমও ইউজ করা যায় না! প্রাইভেসি বলে কিছু রাখল না এরা!"

ফারিশ আর এক সেকেন্ডও নষ্ট করতে চাইল না। সে দরজার হাতলটা শক্ত করে চেপে ধরে শেষ হুঁশিয়ারি দিল,

 "তুমি নিজের ইচ্ছায় সম্মান নিয়ে বের হবে, নাকি আমি পা দিয়ে লাথি মেরে এই দরজাটা ভাঙব? ডিসাইড করো, ড্যাড!"

ছেলের এই দরজা ভাঙার ডিরেক্ট হুমকিতে মি. নাসিরের সমস্ত রিহার্সাল এক নিমেষে ভেস্তে গেল। মি নাসির খুব ভালো করেই জানে,লয়ার ফারিশ নওয়ান যা মুখে বলে, তা কাজে করে দেখায়। আর কোনো উপায় না দেখে, মি. নাসির অত্যন্ত মলিন আর চোরের মতো একটা মুখভঙ্গি করে আস্তে করে ওয়াশরুমের দরজাটা খুললেন।

"কী আজব!! তোরা বাপ-ছেলে মিলে ঘরের মধ্যে কী শুরু করে রেখেছিস বল তো? আমরা নিচতলা থেকেও তোদের এই চিৎকার-চেঁচামেচি শুনতে পাচ্ছি!!"

দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে কোমর হাত দিয়ে রুখে দাঁড়ালেন ফারিশের মা, মিসেস ফাতেমা। 
ফারিশ দরজার হ্যান্ডেল থেকে হাত সরিয়ে বিরক্ত মুখে মায়ের দিকে তাকাল। তারপর সোজা মি. নাসিরের দিকে আঙুল তুলে বলল, 

"কী শুরু করেছি, সেটা তোমার হাসবেন্ডকে জিজ্ঞাসা করো, মম!! একটা মানুষ এতক্ষণ ধরে ওয়াশরুমে বসে কী করতে পারে? তিন ঘণ্টা ধরে ভেতরে লকড!!এ নাকি ডাক্তার নাসির!!"

ছেলের মুখে এই অদ্ভুত নালিশ শুনে মিসেস ফাতেমা আকাশ থেকে পড়লেন। তিনি চোখ বড় বড় করে মি. নাসিরের দিকে তাকালেন। চরম অবাক হয়ে বললেন,

 "তুমি তিন ঘণ্টা ধরে ওয়াশরুমে বসে আছ?! আর ওদিকে তোমার ভাই সারা বাড়ি জুড়ে তোমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে!!"

মি. নাসির আমতা আমতা করতে লাগল। 
ফারিশ এবার লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে জেরা শুরু করার জন্য যেই না মি. নাসিরের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে মুখ খুলতে যাবে, ঠিক তখনই তার পকেটের ফোনটা বিকট শব্দে কেঁপে উঠল। পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই ফারিশে কুঁচকালো। এটা কোনো সাধারণ কল নয়—একেবারে ‘কোর্ট’ আর তার সেই অতি গোপনীয় বিশেষ কেসটার সাথে জড়িত একটা ভীষণ জরুরি কল! এই কলটা এই মুহূর্তে ইগনোর করার কোনো সুযোগই তার কাছে নেই।ফারিশ ফোনটা হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে মি. নাসিরের দিকে তীরের মতো তীক্ষ্ণ এক চাউনি ছুঁড়ে দিল। দাঁতে দাঁত চেপে অত্যন্ত নিচু কিন্তু ধারালো গলায় বলল—

"তোমাকে আমি পরে দেখে নিচ্ছি, ড্যাড! জাস্ট ওয়েট!!"

কথাটা শেষ করেই সে আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। ফোনটা কানের কাছে চেপে ধরে নিজের রুমের দিকে চলে গেল।ফারিশ চোখের আড়াল হতেই মি. নাসির স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। 

________

"আম গাছে কাঁঠাল ওঠে, কাঁঠাল গাছে জাম,
আমি মি চোর তাই চুরি করিলাম!! ওহ, চুরি করিলাম!!"

নিজের তৈরি এমন চমৎকার ছন্দে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে ড্রয়ারের ভেতরের জিনিসপত্র ওলটপালট করছিল মি. চোর। চুরি করার এমন পরম মুহূর্তে নিজের প্রতিভা দেখে সে নিজেই মনে মনে বেশ পুলকিত।ঠিক তখনই ঘরের স্তব্ধতা ভেঙে পেছন থেকে একটা মিষ্টি কিন্তু মারাত্মক ত্যাড়া কণ্ঠস্বর ভেসে এল—

"বাহ! গানটা বেশ দারুণ তো!!"

"হিহি, ধন্যবাদ! ধন্যবাদ!!"

নিজের এমন শৈল্পিক প্রশংসা শুনে আর লোভ সামলাতে পারল না মি. চোর। একদম গদগদ হয়ে হেসে ধন্যবাদ জানাল সে। কিন্তু ধন্যবাদ দেওয়া শেষ হতেই চট করে তার চোরের মাথায় বিদ্যুতের মতো একটা তীব্র ঝিলিক খেলে গেল—‘আরে! আমি তো চুরি করতে এসেছি! আমার প্রশংসা করল কে?!’পরক্ষণেই ঘোর কাটতেই আতঙ্কে ও চরম বিস্ময়ে চমকে পেছন ফিরে তাকাল সে। আর তাকিয়েই তার কলিজা শুকিয়ে কাঠ!সামনে দাঁড়িয়ে আছে আরিশা। এক হাত বুকের ওপর গুঁজে রাখা, আর অন্য হাতে ধরা মেডিকেলের একটা মোটা বই। কপালটা একদম কুঁচকে, চোখ দুটো ছোট ছোট করে সে মি. চোরের দিকে তাকিয়ে আছে। আরিশা তার হাতের ভারী বইটা দিয়ে মি. চোরের দিকে ইশারা করে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, 

"চুরি করার জন্য এই পুরো এলাকায় আর কোনো মানুষ পাওনি তুমি?? আমার ঘরটাই পেয়েছ চুরি করতে!! তাও আবার বুক ফুলিয়ে গান গাওয়া হচ্ছে?!"

মি. চোর এবার দুই হাত জোড় করে, মুখটা একদম কাঁদো কাঁদো বানিয়ে করুণ সুরে বলে উঠল, 

"মাফ করে দিন ম্যাম!! খোদার কসম, যদি আগে থেকে জানতাম আপনারা এখনো জ্যান্ত জেগে আছেন, তবে কি আর এই মাঝরাতে রিস্ক নিয়ে চুরি করতে আসতাম??"

কথাটা বলতে বলতেই চোরের চোখ গেল আরিশার হাতের ওই মোটা বইটার ওপর। সে যেন হঠাৎ কোনো রহস্য ভেদ করে ফেলেছে—এমন ভঙ্গিতে এক আঙুল উঁচিয়ে বলে উঠল, 

"এক মিনিট, এক মিনিট! ওটা মেডিকেলের  বই না?! আপনি মেডিকেলের স্টুডেন্ট?? ধুরর ভাই! আগে বলবেন তো!! শুধু শুধু আজকের পুরো রাতটাই আমার লস গেল!"

আরিশা অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। চোর আবার কপাল চাপড়ে আক্ষেপ করতে করতে বলতে লাগল,

 "আপনারা মেডিকেলের ছাত্র-ছাত্রীরা তো আবার রাতেই ঘুমান না! সারারাত ওই বই নিয়ে জেগে থাকেন। ধুরর, পুরাই কপাল খারাপ! একদম লস প্রজেক্ট!!"

কথাটা শেষ করেই মি. চোর আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করা নিরাপদ মনে করল না। সে কাঁধের ঝোলাটা ঠিকঠাক করে হনহনিয়ে একদম বেলকনির দিকে পা বাড়াল—যেখান দিয়ে সে পাইপ বেয়ে উঠেছিল। ওদিকে আরিশা তো রীতিমতো হা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মনে মনে ভাবল—‘এ তো দেখছি এক্কেবারে হাইলি এডুকেটেড চোর! চুরি করতে এসে মেডিকেলের বইও চিনে ফেলে!’কিন্তু চোরটা বেলকনি দিয়ে লাফ দেওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে আরিশার মাথায় এক দারুণ শয়তানি বুদ্ধি খেলে গেল। সে ঠোঁটের কোণে একটা দুষ্টুমিষ্টি হাসি ফুটিয়ে ডাকল—

"চোর ভাই!! একটা চমৎকার ডিল করবে আমার সাথে??"

মি. চোর অলরেডি বেলকনির রেলিংয়ে এক পা তুলে দিয়েছিল, তখনই কানে কথাটা আসায় সে চট করে পা নামিয়ে কৌতূহলী চোখে ঘুরল। জিজ্ঞেস করল,

 "কীসের ডিল??"

আরিশা হাতের বইটা টেবিলের ওপর রেখে একটু এগিয়ে এল। 

"আমার পাশের রুমে আমার বাবার ঘর। তুমি ওনার ঘরে গিয়ে ওনার আলমারি থেকে যা টাকা সরাতে পারবে, তার ৮০% হবে আমার, আর বাকি ২০% তোমার! আর হ্যাঁ, সাথে বাবার ক্রেডিট কার্ডটাও খুঁজে এনে আমাকে দেবে। আসলে লাস্ট টাইম শপিংয়ে একটু বেশি খরচ করে ফেলেছিলাম তো, তাই বাবা রাগ করে কার্ডটা লক করে নিজের কাছে লুকিয়ে রেখেছে, দিচ্ছেই না! তো... ডিলে তুমি রাজি??"

মি. চোর আরিশার এমন অদ্ভুত আর লোভনীয় অফার শুনে থমকে গেল। নিজের বাপের ঘরে চুরি করানোর জন্য চোরকে পার্টনারশিপ অফার করছে একটা মেয়ে! চোর কিছুক্ষণ হিসাব কষে বলল, 

"উমম... ২০% তো বড্ড কম ম্যাম! ৫০-৫০ করা যায় না? আধাআধি?"

আরিশা এক চুলও নড়ল না। সে শক্তভাবে মাথা নেড়ে কড়া গলায় ‘না’ বলে দিল,

 "নোপ! কোনো ৫০-৫০ হবে না। ডিল একটাই—৮০-২০। রাজি থাকলে বলো, নাহলে এখনই ‘চোর চোর’ বলে চিৎকার দিয়ে পুরো বাড়ি মাথায় তুলব!"

বাঘের ঘরে এসে এমন ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়ে বেচারা চোর আর কী-ই বা করবে! সে মনে মনে ভাবল—আজকের এই অপয়া রাতে খালি হাতে ফিরে যাওয়ার চেয়ে ২০% পাওয়াও তো অনেক বড় লাভ!সে আর দ্বিমত না করে দাঁত বের করে হেসে বলল, 

"আচ্ছা ঠিক আছে ম্যাম, রাজি! কিছু না পাওয়ার চেয়ে কিছু পাওয়া তো ঢের ভালো! চলুন, আপনার বাপের ক্রেডিট কার্ড উদ্ধার অভিযানে নামা যাক!"

বেশ অনেকক্ষণ খোঁজাখুঁজি করার পর, অবশেষে ক্রেডিট কার্ডটা খুঁজে পেল মি. চোর। একদম যুদ্ধ জয়ের খুশি নিয়ে সে পা টিপে টিপে আরিশার বাবা মি. দিদারের রুম থেকে বেরিয়ে এল।নিজের হাতের আঙুলে কার্ডটা নাচাতে নাচাতে ফিসফিস করে বলল,

 "পেয়ে গেছি ম্যাম;!!"

কার্ডটা দেখেই আরিশার চোখ দুটো চকচক করে উঠল। সে চোরের হাত থেকে ওটা এক ঝটকায় ছিনিয়ে নিয়ে বলল,

 "ওহহ, সেরা!! সত্যি বলছি চোর ভাই, আমার ক্ষমতা থাকলে আমি তোমাকে এই বছরের ‘বেস্ট চোর’-এর অ্যাওয়ার্ড দিতাম!!"

নিজের কাজের এমন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়ে মি. চোর তো খুশিতে গদগদ। সে বিনয়ের সাথে মাথা চুলকে বলল, 

"তা ম্যাম, প্রশংসা তো পাইলাম। কিন্তু কার্ডের পাসওয়ার্ডটা কী? টাকাটা তুলতে তো ওটা লাগবে।"

"পাসওয়ার্ড!!" 

আরিশার মুখের চওড়া হাসিটা একটু থমকে গেল। সে কপালে আঙুল ঠেকিয়ে আকাশ-পাতাল ভাবতে ভাবতে বলল, 

"আম্ম... আরে, একটু আগেও তো মনে ছিল! কী যেন পাসওয়ার্ডটা... ধুর!"

মি. চোর এবার চরম বিরক্ত হয়ে হাত উল্টাল,

 "আরে! কেমন মেডিকেল স্টুডেন্ট আপনি?! এত মোটা মোটা বই মুখস্থ করে ফেলেন, আর বাপের কার্ডের পাসওয়ার্ডটুকু আপনার মনে নেই?? আপনার মেমোরি তো দেখি একদম জং ধরা!"

একটা চোরের মুখে নিজের মেমোরি নিয়ে এমন কটূক্তি শুনে আরিশা রেগে ফায়ার হয়ে তার দিকে তাকাল। তখনই মাথায় একটা ক্লিক করতেই সে চেঁচিয়ে উঠল, 

"মনে পড়েছে!!"

আরিশার কথা শুনে মি. চোর এবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে খুশি হয়ে হাত বাড়িয়ে বলল,

 "তাহলে ম্যাম, এবার আমার চুক্তি অনুযায়ী ওই ২০% ক্যাশ টাকাটা দিয়ে দেন? আমার আবার তাড়া আছে।"

আরিশা এবার এক হাত কোমরে দিয়ে, অন্য হাতে ক্রেডিট কার্ডটা চেপে ধরে বাঁকা হাসল, 

"কীসের ২০%!! আমি কোনো ২০% চিনি না!! ভাগো এখান থেকে!"

কথাটা বলেই মি. চোরকে কোনো কিছু বোঝার সুযোগ না দিয়ে আরিশা পুরো বাড়ি মাথায় তুলে চিৎকার দিয়ে উঠল—

"চোর!! চোর!!! মা... বাবা... বাঁচাও, ঘরে চোর ঢুকেছে!!!"

মি. চোরের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল! চোখের পলকে সে বুঝতে পারল—একেবারে জ্যান্ত ‘চোরের ওপর বাটপারি’ কাকে বলে! এই মেয়ে তো ডাকাতের চেয়েও ভয়ঙ্কর! সে নিজের ডিফেন্সে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই আরিশার গগনবিদারী চিৎকারে মি. দিদার আর মিসেস নাহারের ঘুম ভেঙে গেল। তারা ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এল এবং কোনো কিছু না ভেবেই বেচারা মি. চোরকে জাপটে ধরে ফেলল।মি. চোর তখন মার খাওয়ার ভয়ে নয়, বরং আরিশার এমন চরম বিশ্বাসঘাতকতায় ডুকরে কেঁদে উঠল। 

 "আল্লাহ রে... কী শয়তান মেয়ে রে বাবা! এই মেয়ে যার কপালে আছে, সে তো নির্ঘাত শেষ!!! আল্লাহ, ওই  বেচারাকে তুমি বাঁচাইয়ো... ওনাকে একটু সহ্য করার ধৈর্য দিও... আমীন!"

আরিশা তখন  এক কোণে দাঁড়িয়ে মি. চোরের ওই করুণ দশা দেখে ঠোঁট টিপে এক শয়তানি হাসি দিল। তারপর নিজের ফোনটা বের করে সরাসরি ফারিশকে কল দিল।
ওদিকে, সারাদিনের তীব্র ধকল শেষে ফারিশ তখন নিজের বিছানায় উপুড় হয়ে, একটা বালিশ শক্ত করে আঁকড়ে ধরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। এসি-র ঠান্ডা বাতাসে মাত্রই তার চোখটা একটু লেগেছিল। এমন সময় ফোনটা কর্কশ শব্দে বেজে উঠতেই তার ঘুমের বারোটা বেজে গেল। চরম বিরক্তিতে চোখ না খুলেই সে ফোনটা হাতরে নিল। কিন্তু লক স্ক্রিনে ‘আরু’ নামটা জ্বলজ্বল করতে দেখেই তার ভেতরের সমস্ত ঘুম আর ক্লান্তি এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল! সে বিছানায় লাফ মেরে ধড়ফড় করে উঠে বসল।

"হ্যালো, আরু!! এনি প্রবলেম?! তুমি ঠিক আছ তো??" 

ফারিশের গলায় অস্থিরতা।

 "আরে, অনেক প্রবলেম ফারিশ, অনেক প্রবলেম! আমার ঘরে চোর ঢুকেছে!!"

"হোয়াট!! চোর? তোমার ঘরে?!" 

ফারিশের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়িয়েই হুঙ্কার দিল,

 "ধরে রাখো ওই শয়তানটাকে! এত বড় সাহস, আমার আর..."

রাগ আর আবেগের মাথায় কথাটি বলতে গিয়েও ঠিক মাঝপথে ব্রেক কষল ফারিশ।

 "আমার আর...? কী থামলেন কেন?"

ফারিশ নিজের গলাটা একটু ঝেড়ে, নিজেকে সামলে নিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

 "আই মিন... আমার আঙ্কেলের বাসায় ঢোকার সাহস পায় কী করে ওই চোর! তুমি একদম ভয় পেও না আরু, আমি এখনই আসছি!!"

ফোনটা কেটেই ফারিশ এক সেকেন্ডও নষ্ট না করে গায়ে শার্ট জড়িয়ে বাইকের চাবি নিয়ে বেরিয়ে পরে।



RE: গল্প:অঘোষিত হৃদয়সন্ধি (Writer: Raisa Mehran) - X Man - 09-01-2026

06

চোরকে সামলানোর পর নিজের ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজল মি. দিদার। কিন্তু না, সাধের ক্রেডিট কার্ডটা কোথাও নেই! মাথায় হাত দিয়ে মি. দিদার যখন হুঙ্কার দিয়ে মি. চোরকে ধরতে যাবে, ঠিক তখনই আরিশা বুঝতে পারল—চোর মুখ খুললে আজ তার দফা রফা! সে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে চোরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং ধুমধাম কয়েকটা লাগিয়ে বেচারাকে অজ্ঞান করে ফেলল।এদিকে ক্রেডিট কার্ডের শোকে মি. দিদার এখন ড্রয়িংরুমের চেয়ারে বসে রীতিমতো বিলাপ জুড়ে দিয়েছেন। ওনার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে কার্ড নয়, কলিজার একটা টুকরো হারানো গিয়েছে। ফারিশ আর মিসেস নাহার স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে ওনার কাণ্ড দেখছেন। ওদিকে আরিশা ঠিক বাবার সামনে সোফায় বসে বিরক্ত মুখে পা নাচাচ্ছে। মনে মনে বিড়বিড় করছে—

"অ্যাহহ, নাটক যে কত দেখব! কাঁদো কাঁদো, কাঁদতে কাঁদতে শহীদ হয়ে যাও তবুও বোম ফাটলেও তোমায় আমি ক্রেডিট কার্ড ফেরত দিচ্ছি না!এখন ওটা আমার!"

ফারিশ এতক্ষণ চুপ করে সবটা পর্যবেক্ষণ করছিল। তার উকিল মস্তিষ্ক আরিশার ওই চোরা চাউনি আর অতি-উৎসাহী হয়ে চোরকে অজ্ঞান করা দেখে পুরো বিষয়টা ধরে ফেলেছে। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরিশার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে শান্ত কিন্তু গম্ভীর গলায় বলল—

"আরিশা!! আঙ্কেলকে ক্রেডিট কার্ডটা দিয়ে দাও!!"

ফারিশের এমন ডিরেক্ট অ্যাটাকে আরিশা একদম বিষম খাওয়ার মতো চমকে উঠল। তুতলিয়ে নিজেকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে বলল,

 "আ.. আমি কোথায় থেকে দেব? আমি কি চোর নাকি?"

"আরিশা!!"

 ফারিশ এবার গলায় কিছুটা চাপ দিয়ে পুনরায় ডাকল।মি. দিদার ‘ক্রেডিট কার্ড’ নামটা শুনতেই তড়াক করে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন। যেন মৃতদেহে প্রাণ ফিরে এসেছে!

 "কে... কে নিয়েছে আমার কার্ড? তুই আরিশা? দিয়ে দে মা!!"

আরিশা এবারও আমতা আমতা করে বলল,

 "আ... আমি কেন নেব? চোরই তো নিল হয়তো!"

ফারিশ এবার এক পা এগিয়ে আসতেই আরিশার সব প্রতিরোধ ভেঙে গেল। সে রেগে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল, 

"হ্যাঁ, নিয়েছি তো বেশ করেছি! ওই চোর নিলে তো তোমার সব টাকা যেত, এখন আমি নিলে বড়জোর অল্প কিছুই খরচ করব! এতে কান্নার কী আছে?"

মি. দিদার এবার রীতিমতো কাঁপতে শুরু করলেন।

 "খবরদার! এক টাকাও যদি তুই ওই কার্ড থেকে খরচ করেছিস, তবে তোর খবর আছে!"

বাবার এমন বাড়াবাড়ি কিপ্টেমি দেখে আরিশা হতাশ হয়ে তার মায়ের দিকে তাকাল।

 "এই কিপ্টেটাকে তুমি কী দেখে বিয়ে করেছিলে মা? সিরিয়াসলি!"

মিসেস নাহার এবার একটা গভীর আফসোসমাখা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

 "আরে তখন আমার আবেগে কাজ করেছে, বিবেকে না রে মা। এ পাবলিক যে এত কিপ্টে তা বলার বাইরে। বিশ্বাস করবি না ফারিশ, গতকাল সে ব্রাশ করতে গিয়ে দেখে টুথপেস্ট শেষ। বললাম নতুন একটা বের করো! আমার কথা না শুনে ওই শেষ হয়ে যাওয়া টুথপেস্টের টিউবটাকে পোস্টমর্টেম করে ইউজ করছে! এর কিপ্টামো কল্পনারও বাহিরে। তবে আমার ক্ষেত্রে আবার সে হাত খুলে খরচ করে!"

লাস্টের কথাটা বেশ গদগদ হয়ে লাজুক হাসিতে বললেন মিসেস নাহার। ফারিশ আর আরিশা দুজনেই হা হয়ে মিসেস নাহারের দিকে তাকিয়ে রইল। ফারিশ এবার আরিশার দিকে ফিরে শান্ত গলায় বলল—

"আঙ্কেলকে কার্ডটা দিয়ে দাও আরিশা। তোমার যা টাকা লাগবে আমাকে বলো, আমি দিচ্ছি!"

আরিশা এবার ফারিশের দিকে ফিরে চোখ ছোট করে তাকাল। 

"নাহ, অসম্ভব! নিজের বউয়ের বেলায় ঠিক আর বাকিদের বেলায় বেঠিক? এই কার্ড থেকে আজ ২০ হাজার টাকা খরচ করে তবেই আমি শান্তি পাব। বাই!!"

কথাটা বলেই আরিশা ক্রেডিট কার্ডটা বাতাসে নাচাতে নাচাতে গটগট করে বাইরে বেরিয়ে গেল। ফারিশ একবার মি. দিদারের করুণ মুখের দিকে তাকিয়ে আরিশার পিছু নিল।ওদিকে মি. দিদার আবার চেয়ারে ধপ করে বসে বিলাপ শুরু করলেন, 

"গেল গেল... আমার সব গেল রে!শয়তান মেয়েটা একদম নানার মতো হয়েছে!!"

মি. দিদারের কথায় মিসেস নাহার এবার রাগে জ্বলে উঠলেন।

 "একদম কথায় কথায় আমার বাপকে টানবে না দিদার!"

"হাজার বার টানব! তোমাকে বিয়ে করার জন্য ওই শ্বশুরকে পটাতে কম খরচ তো আর করিনি! ... সব গেল..."

________

মিসেস ফাতেমা আর আরিশা বেশ গল্প করতে করতে বাগানে হাঁটছিলেন।পরিবেশটা বেশ মনোরম। ঠিক এমন সময় ফারিশের এক ক্লায়েন্ট এলো। সচরাচর ফারিশ কোনো ক্লায়েন্টকে বাসায় নিয়ে আসে না, সে তার প্রফেশনাল লাইফটা খুব আলাদা রাখতেই পছন্দ করে। তবে আজকের ব্যাপারটা এতটাই জরুরি আর গোপনীয় যে, সে বাধ্য হয়েই লোকটিকে নিজের স্টাডি রুমে নিয়ে গেল।গল্পের মাঝখানে হঠাৎ মিসেস ফাতেমা আরিশার কাঁধে হাত রেখে বেশ উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে উঠলেন, 

"ওহ, ভালো কথা আরিশা! বলতে একদম ভুলে গেছি। তোর আঙ্কেলরা মিলে আজ বসেছিল, আয়ান আর ইনায়ার এনগেজমেন্টের দিন একদম পাকা করে ফেলেছে!"

"কী বলো আন্টি!!" 

আরিশার চোখে তীব্র বিষ্ময়। 

 "আয়ান ভাই আর ইনায়া কি জানে এই খবর?"

মিসেস ফাতেমা একটু হেসে বললেন,

 "এতক্ষণে হয়তো জেনে গেছে।"

খবরটা শুনে আরিশা এবার সত্যিই চরম দুঃশ্চিন্তায় পড়ে গেল। ইনায়া আর আয়ান ভাইয়ের সমীকরণ যা—তাতে সত্যি সত্যি যদি এদের বিয়ে দেওয়া হয়, তবে বাসর রাতেই তো একে অপরকে নির্ঘাত মার্ডার করবে! আর পরের দিন সকালে মি ফারিশ নওয়ানকে খুনের মামলা লড়তে হবে। আরিশা আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দৌড়ে আয়ানের রুমের দিকে রওনা দিল। কিন্তু সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে মাঝপথেই তার দেখা হয়ে গেল আয়ানের সাথে। আয়ানকে দেখে মনে হচ্ছে সে অলরেডি কোনোভাবে আগাম সংকেত পেয়ে গেছে। তার মুখভঙ্গি পুরো ফ্যাকাসে হয়ে আছে।আরিশাকে দেখেই আয়ান প্রায় কেঁদে দেওয়ার মতো মুখ করে বলল,

 "আরে আরিশা, তোর কাছেই যাচ্ছিলাম রে! এখন কী করব বল তো বোইন? বাড়িতে তো দেখছি সবাই হুটহাট সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছে। সত্যি সত্যি ওই ডাইনিটার সাথে আমার বিয়ে দিয়ে দেবে রে!"

আরিশা দুই হাত কোমরে দিয়ে বিরক্তি নিয়ে বলল,

 "আরে ধুর! তুমি তো মস্ত বড় লয়ারের ভাই। তোমার ওই লয়ার ভাইকে কোনো বুদ্ধি দিতে বলতে পারছ না? ও তো কত জটিল কেস সমাধান করে!"

আয়ান এবার কপাল চাপড়ে বলল,

 "আরে ওকে কী বলব! আমার বিয়ে ঠিক হওয়ার খবরে তো ওই ব্যাটাই সবচেয়ে বেশি এক্সাইটেড!  তুই কিছু একটা কর বোইন! তোর মাথায় তো সবসময় শয়তানি বুদ্ধি ঘুরে বেড়ায়, এই ভাইটাকে বাঁচা!"

আরিশা এবার এক ভুরু উঁচিয়ে আয়ানের দিকে তাকাল।সে বুঝতে পারল না কথাটা প্রশংসা ছিল নাকি দুর্নাম। তবে আরিশার মাথায় তখন অন্য ছক। যেহেতু মি. লয়ার ফারিশ নওয়ানই বিপদে ফেলেছে—তবে উদ্ধার করার দায়িত্বও তাকেই নিতে হবে।আরিশা এবার দৃঢ় পায়ে হাঁটা শুরু করল। আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,

 "চলো মি. লয়ারের কাছেই যাওয়া যাক! তাকেই বলব এই কেসের সমাধান করতে।"

আয়ানও আর দ্বিমত না করে আরিশার পেছন পেছন গুটিগুটি পায়ে ফারিশের স্টাডি রুমের দিকে পা বাড়াল। 

স্টাডি রুমের গাম্ভীর্য তখন তুঙ্গে। ফারিশ তার ক্লায়েন্টের দেওয়া অত্যন্ত সেনসিটিভ একটা ফাইল চেক করছিল, আর ঠিক সেই মুহূর্তে জানালার ওপার থেকে ভেসে এল সেই অতি পরিচিত বেসুরো সুর, 

"Oh whoaa~
 Aha! 
Oh whoaa hoo~
Aha! 
Oh whoa oh hoo~
Hoo"

ফারিশের কলমটা কাগজের ওপর থমকে গেল। সে আড়চোখে দেখল, জানালার ওপারে আয়ান আর আরিশা রীতিমতো স্টেজ পারফরম্যান্সের ভঙ্গিতে হাত-পা ছুড়ছে। আয়ান যেন কোনো অপেরা সিঙ্গার, আর আরিশা তার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিশিয়ান!ফারিশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করল। ক্লায়েন্ট লোকটা একবার জানালার দিকে তাকায়, একবার ফারিশের দিকে। তার চোখেমুখে রাজ্যের বিস্ময়। ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে মি. নাসিরের রাগী কণ্ঠস্বর শোনা গেল, 

"কোন শয়তানের গলায় যক্ষ্মা হয়েছে রে?? এভাবে ছাগলের মতো ভ্যা ভ্যা করছিস কেন??"

মি নাসিরের চিৎকারে আরিশা আর আয়ান দমে যাওয়া তো দূরের কথা, তারা যেন দ্বিগুণ উৎসাহ পেল। আরিশা আয়ানকে চোখ টিপে ইশারা করল—‘কাজ হচ্ছে আয়ান ভাই, ক্যারি অন!’ তারা এবার রুমের আরও কাছে এসে গান শুরু করল, 

"You know you love me, 
Love me
I know you care...
You care
Just shout whenever, and I will be there!
I'll be there"

ফারিশের মাথা তখন রাগে দপদপ করছে।বিশেষ করে আয়ান আর আরিশার এই ক্লোজনেস তার সহ্যক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল, 

"ডিসটেন্স!! ডিসটেন্স!!"

ফারিশের সামনে বসে থাকা ক্লায়েন্ট ঘাবড়ে গিয়ে চেয়ারটা একটু পিছিয়ে নিয়ে কাঁচুমাচু হয়ে বলল,

 "দূরেই তো আছি স্যার! একদম সোশ্যাল ডিসটেন্স মেইনটেইন করছি!"

ফারিশ ক্লায়েন্টের দিকে এক মুহূর্তের জন্য তাকাল। তার চোখে তখন খুনের নেশা। সে আবার জানালার ওপারে আরিশাদের দিকে তাকিয়ে সজোরে টেবিল চাপড়ে হুঙ্কার দিল,

 "আই সেইড ডিসটেন্স!!!"

ফারিশের সেই গর্জনে আরিশা আর আয়ান ‘বাপ রে’ বলে এক দৌড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। ওদিকে স্টাডি রুমের ভেতর ক্লায়েন্টের অবস্থা শোচনীয়! সে ভয়ে এক লাফে চেয়ারের ওপর উঠে দাঁড়িয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, 

"আরে স্যার! আমি তো দূরেই আছি! একদম তিন হাত দূরে!"

ফারিশ তখনও রাগে ফুঁসছে দেখে ক্লায়েন্ট আর রিস্ক নিল না। সে চেয়ার থেকে নেমে এক দৌড়ে রুমের কর্নারে থাকা শোকেজের ওপর উঠে হাঁটু গেড়ে বসল। কাঁপা গলায় বলল, 

"এর থেকে আর ডিসটেন্স সম্ভব না স্যার! তবুও রাইগেন না, হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে আমার!"

ফারিশের মাথার রাগ তখন সপ্তম আকাশে। সে আর সহ্য করতে না পেরে ড্রয়ার টেনে তার লাইসেন্স করা বন্দুকটা হাতে নিল। সেটা হাতে নেওয়া মাত্রই ক্লায়েন্ট লোকটা দৌড় দিল।

"২৪ আওয়ারের মধ্যে যদি সঠিক তথ্য না পেয়েছি..." 

ফারিশের বাক্য শেষ হওয়ার আগেই ক্লায়েন্টের চিৎকার ভেসে এল ওপার থেকে—

"পাবেন পাবেন স্যার! ২৪ কেন, ১৪ আওয়ারের মধ্যে সব খবর আপনার টেবিলে থাকবে! দয়া করে ট্রিগার টিপবেন না!"

চরম উত্তেজনার মাঝেও আরিশা আর আয়ান তখন পাশের ঘরের কোণ থেকে উঁকি দিয়ে এই দৃশ্য দেখে হাসিতে লুটিয়ে পড়ছে। ফারিশ বন্দুকটা টেবিলের ওপর রেখে লম্বা একটা শ্বাস নিল।সম্ভবত নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করছে।



RE: গল্প:অঘোষিত হৃদয়সন্ধি (Writer: Raisa Mehran) - X Man - 09-01-2026

07 

রুমের এক কোণে গালে হাত দিয়ে চরম করুণ একটা মুখ বানিয়ে সোফায় বসে আছে আয়ান। অপরদিকে ডেঞ্জারজোন আঁচ করতে পেরে আরিশা আর এক মুহূর্তও ঝুঁকি নিল না। সে তাড়াহুড়ো করে নিজের ফোনটা বের করে এমন একটা ভাব করল যেন সে মেডিকেলের অত্যন্ত জটিল কোনো নোট অতি মনোযোগ দিয়ে মুখস্থ করছে!ফারিশ দুজনের দিকেই একবার তীক্ষ্ণ চাউনি দিয়ে পুনরায় টেবিলের ফাইলের দিকে মন দিল। ফারিশকে ফাইলে ব্যস্ত দেখতে পেয়ে আরিশা এবার ফোন থেকে চোখ সরাল। সে আয়ানের দিকে তাকিয়ে নিজের চোখ জোড়া বড় বড় করে, ভ্রু নাচিয়ে ইশারায় কিছু একটা বলার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। আয়ানও ফারিশের হাত থেকে বাঁচার শেষ উপায় হিসেবে আরিশার সেই চোখের ভাষা অত্যন্ত গভীর মনোযোগ দিয়ে ডিকোড করার চেষ্টা করছে।কিন্তু ফারিশ ফাইলে ব্যস্ত থাকলেও তার তীক্ষ্ণ চোখ দুটো কিন্তু ফাঁকি দেওয়া অসম্ভব! এই দৃশ্য দেখা মাত্রই ফারিশের ভেতরের রাগ আবারও জেগে উঠল। কেন ওই ছেলের সাথেই আরিশাকে চোখের ইশারায় এত গোপন কথা বলতে হবে?! যা বলার, ডিরেক্ট তার সাথে বলতে পারে না? সে কোনো বাক্যব্যয় না করে, পাশের সোফায় রাখা একটা ভারী কুশন টেনে নিয়ে সজোরে ছুড়ে মারল আয়ানের মুখ বরাবর। হঠাৎ এই অতর্কিত কুশন-আক্রমণে আয়ান ‘ওরে বাপ রে’ বলে এক হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে ছিটকে নড়েচড়ে উঠল।

"বুঝলি আয়ান, কলেজে পড়াকালীন আমাদের ক্লাসে একটা মেয়ে ছিল না রে??"

কথাটা বলতে বলতেই ফারিশ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর দুই হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে দিয়ে ধীর কিন্তু গম্ভীর পায়ে আয়ানের সোফার কাছে এসে দাঁড়াল। সে আরিশাকে এমনভাবে সম্পূর্ণ ইগনোর করছে, যেন আরিশা নামের কেউ এই রুমে এক্সিস্টই করে না! ওদিকে আয়ান তো পুরো আকাশ থেকে পড়ল। ফারিশের মাথায় আবার কোন নতুন ভূত চাপল? মাঝখান থেকে ভূত-ভবিষ্যত ভুলে সে এখন কলেজের মেয়ের গল্প কেন তুলছে?

"একটা কেন ভাই!! আমাদের ক্লাসে তো অনেক মেয়েই ছিল!!" 

আয়ানের এই অতি-লজিক্যাল উত্তর শুনে ফারিশের মন চাইল এই ফাইলটা দিয়েই ওনাকে কয়েকটা উত্তম-মধ্যম দিতে! তবুও সে নিজের ভেতরের রাগটা কোনোমতে গিলে ফেলে মুখে এক কৃত্রিম শান্ত ভাব এনে বলল, 

"আরে, ওই যে সুন্দর করে মেয়েটা!!"

"সুন্দর!! আর এই কথা তুই বলছিস??" 

আয়ান এবার সত্যিই ভীষণ অবাক হলো। যে ফারিশ নওয়ান মেয়েদের থেকে দশ হাত দূরে থাকে, সে আজ নিজে থেকে একটা মেয়ের সৌন্দর্যের সার্টিফিকেট দিচ্ছে!

"হুমমম, মেয়েটা সত্যিই খুব সুন্দর!!" 

ফারিশ যেন বেশ আয়েশ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল।

"কী নাম তার ভাই? একবার বল তো! আমার তো মনে পড়ছে না।"

আয়ানের এই ডিরেক্ট প্রশ্নে লয়ার ফারিশ নওয়ান এবার নিজের তৈরি ফাঁদেই পা দিয়ে বেশ থতমত খেয়ে গেল। মনে মনে ভাবল—‘ধুর! মিথ্যে গল্প বানাতে গিয়ে তো নামের কথা মাথায় ছিল না! এখন কোন নাম বলি?’ সে নিজের আমতা আমতা করে বলল, 

"ওই তো... আমম... ওই আর... আর... আররা!!"
"আররা!!"

আয়ান আর আরিশা দুজনেই একসাথে এক সুরে অবাক হয়ে চেঁচিয়ে উঠল। আররা আবার কেমন অদ্ভুতুড়ে নাম!

"কিন্তু ভাই, আমাদের পুরো কলেজ লাইফে আররা নামের তো কোনো মেয়েই ছিল না!!"

"তুই বেশি জানিস নাকি আমি?!"

 ফারিশ এক ধমক দিয়ে আয়ানকে থামিয়ে দিল। তারপর আরিশার দিকে আড়চোখে এক পলক তাকিয়ে বেশ জোর দিয়েই বলল,

 "তুই শুধু এটা শোন, মেয়েটা আমায় গতকাল রাতে ফেসবুকে নক করেছিল। ওহ হো, মেয়েটা কিন্তু আগের থেকেও অনেক বেশি সুন্দর হয়েছে এখন! মাশআল্লাহ!!"

ফারিশ মুখে একটা তৃপ্তির হাসি ফুটিয়ে ‘মাশআল্লাহ’ শব্দটা এমনভাবে উচ্চারণ করল, যেন বিষাক্ত তীরের মতো ওটা সরাসরি আরিশার কানে গিয়ে বিঁধল।ওদিকে আরিশার ভেতরের আগুন এবার ধপ করে জ্বলে উঠল। সুন্দর!! আবার তার ওপর মাশআল্লাহ!! বাহ রে বাহ! এই মাইগ্রেন নামক মি লয়ারের তো দেখছি দিন দিন বেশ প্রমোশন হচ্ছে! ঘরে বউ রেখে মাঝরাতে ফেসবুকের আররাকে নিয়ে মাশআল্লাহ জপ করা হচ্ছে?!আরিশা আর নিজের রাগ ধরে রাখতে পারল না। সে হাতের ফোনটা সোফার ওপর আছাড় মারার মতো করে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, রেগে আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, 

" যারা নিজের বৌ রেখে অন্য মেয়ের প্রসংশা করে বুঝলে আয়ান ভাই, তাদের গালে ঠাস ঠাস দুটো থাপড়া মেরে নদীতে ভাসাই দেওয়া উচিত। "

কথাটা বলেই রেগে বেরিয়ে যায় আরিশা। ফারিশ শুকনো ঢোক গিলে। নাহ, মেয়েটা সত্যিই ডেঞ্জারাস। ফারিশও আরিশার পিছু নেয়। অপরদিকে আয়ান কিছুই বুঝে উঠে না। এরই মধ্যে হঠাৎ ইনায়ার ফোন আসে। 

" উফফ, আবার কোন ঝামেলা!! "

বিরক্তিতে কথাটা বলেই ফোন ধরে আয়ান। 

" হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন আয়ান!! "

আয়ানের এবার সত্যিই হার্ট অ্যাটাক করার দশা। 

" লা হাওলা ওয়ালা কুয়াতা ইল্লা বিল্লাহ!! এতো সুন্দর ভাবে কথা বললো!! ওই শয়তান জিন, ইনায়াকে ছেড়ে দে বলছি। মেয়েটা এমনিতেই ডাইনি, কেন নিজের বিপদ নিজে ডেকে আনছিস?? একবার যদি ও জানতে পারে না তবে তোরেও আস্ত রাখবে না জিন ভাই। ছেড়ে দে ওকে!! "

ইয়ানা অনেক কষ্টে নিজেকে বুঝিয়ে আয়ানকে ফোন করেছিল এই বিয়ে আটকানো নিয়ে কোনো প্যান করতে কিন্তু আয়ানের কথায় এবার তার মাথা গরম হয়। 

" তোরে উস্টা শয়তান। সামনে পাইলে তোর চুল ছিড়বো!! "

কথাটা বলেই ফোন কাটে ইনায়া। নাহ, এবার প্যান বি কাজে লাগাতে হবে। 

__________

সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে হঠাৎ ফারিশ আরিশাকে ডাক দেয়। 

" আরিশা !! "

আরিশা পেছন ঘুরে দাঁড়ায়। কপাল কুচকে বলে, 

" বলুন!! "

 "তোমার কিছুক্ষণ পরেই তো ক্লাস আছে, তাই না? যাওয়ার সময় তোমার বাসা থেকে  প্রয়োজনীয় বইগুলো নিয়ে নিবে। তোমাকে আর ড্যাডকে একসাথে ড্রপ করে আমি সরাসরি কোর্টে যাব।একটা ইম্পর্ট্যান্ট কেসের কাজ আছে। হারি আপ!!"

ফারিশের এমন এক লাইনের অর্ডার শুনে আরিশা এবার একটু কাঁচুমাচু করতে লাগল। আসলে আজ ওর ক্লাসে যাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই। সে আমতা আমতা করে বলল, 

"আজ... আজ না যাই? !"

ফারিশ এক হাত পকেটে পুরে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে  বলল, 

"উঁহু, কোনো বাহানা চলবে না! এভাবে ফাঁকিবাজি করলে পরে দেখা যাবে পেশেন্টের হার্টের চিকিৎসা করতে গিয়ে ওনার হার্টের বদলে হাতই কেটে ফেলেছ!!"

ফারিশের এই উপহাস শুনে আরিশা রেগে উঠল। সে ফারিশের দিকে এক পা এগিয়ে এসে দাঁত কিড়মিড় করে বলল, 

"হাঁ! যদি সেই পেশেন্টটা কোনোভাবে আপনি হন, তবে আমি সত্যিই তাই করব! যত্তসব!!"

রেগে কথাটা বলেই এক ঝটকায় মুখ ঘুরিয়ে হনহনিয়ে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল আরিশা। ফারিশ অবাক হয়ে কিছুক্ষণ ওর যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটার মুখের ওপর জবাব দেওয়ার এই ধৃষ্টতা দিন দিন বেড়েই চলেছে!

"কী রে? এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে  প্রেম করা হচ্ছে বুঝি??"

আচমকা মি. নাসিরের রসিক কণ্ঠস্বর শুনে ফারিশ চমকে সেদিকে তাকাল। বাবার এমন রোমান্টিক তত্ত্বে ফারিশ চরম বিরক্ত হয়ে বলল,

 "কিসব ফালতু কথা বলছ ড্যাড!! তোমার কি চোখের সমস্যা হয়েছে? কোনটা ঝগড়া আর কোনটা প্রেম—এটুকুর পার্থক্যও বোঝো না??"

মি. নাসির এবার ফারিশের একদম কাছে এসে ওর কাঁধে হাত রাখলেন। চোখ টিপে বললেন,

 "আরে তোদের এই ঝগড়া তো রোমান্টিক প্রেমকাহিনীকেও হার মানাবে রে বাপ!পছন্দ যেহেতু করিস তবে বিয়েটা করে নে না বাপ! আমার আরিশা মামণিকে বিয়ে করে ধুমধাম করে এই ঘরের লক্ষ্মী বানিয়ে নিয়ে আয়!!"

"অসম্ভব! আমি আর ওকে পছন্দ? দুঃস্বপ্নেও না!!!"

মি. নাসির এবার ফারিশের এই তীব্র অস্বীকৃতি দেখে ওকে কিছু বলতেই যাবে, তার আগেই ফারিশ নিজের হাত বাড়িয়ে চট করে মি. নাসিরের ডান হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। ফারিশের হাতের এই আকস্মিক ও অনমনীয় বাঁধনে মি. নাসির ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তার মুখের দিকে তাকাল।

 "বুধবার, সকাল ৯টা ৩০ মিনিট। কোথায় ছিলে তুমি, ড্যাড??"

মি. নাসির এবার বুঝলেন তিনি কত বড় বিপদে পড়েছেন! মনে মনে নিজেকেই একটা থাপ্পড় মেরে বললেন—‘কে বলেছিল রে তোকে একে জ্বালাতে আসতে?! এখন সামলা ওকিল ছেলের জেরা!’মি. নাসির নিজের হাতের কবজিটা ফারিশের মুঠো থেকে ছাড়ানোর একটা ব্যর্থ চেষ্টা করে আকাশ থেকে পড়ার ভান করলেন,

 "কবে... কবে যেন বললি সময়টা রে বাপ??"

"বুধবার!" 

"ওহ, বুধবার!! আরে কোথায় আর থাকবো?? হসপিটাল!! ওই দিন ওয়ান অ্যান্ড ওনলি হসপিটালেই ছিলাম আমি। খুবই সিরিয়াস এক পেশেন্ট এসেছিল রে ফারিশ! ওনার হার্ট প্রায় বন্ধই হয়ে যাচ্ছিল।" 

মি. নাসির বুক ফুলিয়ে এক্কেবারে খাঁটি মিথ্যে কথাটা বলে দিলেন।ফারিশ এবার ঠোঁটের কোণে এক বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তুলল।

 "তাই নাকি, ড্যাড? তবে যে তোমার ফোনের লোকেশন হিস্ট্রি বলছে—গত বুধবার সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে তুমি হসপিটাল তো দূর, শহরের সবচেয়ে বড় মেইন কাজী অফিসের ঠিক পেছনের গলিটায় দাঁড়িয়ে ছিলে!!"

কাজী অফিসের নাম শুনতেই মি. নাসিরের কলিজা যেন এক লাফে মুখের কাছে চলে এল।  তাও নিজেকে সামলে নিয়ে মুখে একটা বিশাল কৃত্রিম আর নার্ভাস হাসি ঝুলিয়ে বলে উঠলেন—

"হেহে... দেখেছিস!! এই মেডিকেল স্টুডেন্ট আর হার্টের পেশেন্টদের জ্বালায় আমার ব্রেইনটা না একেবারে ড্যামেজ হয়ে গেছে রে বাপ! কাজী অফিস? হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে! আরে ওই দিন তো ওইখান দিয়েই আমি আমার এক বন্ধুর মেয়ের  দাদির ছেলের নাতির মায়ের কাকার শ্বশুরের মামার ছেলের মেয়ের নাতির মায়ের মেয়ের ইমার্জেন্সি চিকিৎসা করতে গেছিলাম! মারাত্মক ক্রিটিক্যাল কন্ডিশন ছিল ওনার, একদম স্পট ডেথ হওয়ার অবস্থা! !"

মি. নাসিরের এই চোদ্দ পুরুষের সম্পর্কের আজগুবি সমীকরণ শুনে ফারিশ চোখ ছোট ছোট করে তাকাল। সে খুব ভালো করেই জানে, আরিশার সেই জোর করে বিয়ে করার নাটকের আসল ডিরেক্টর কে ছিল!ফারিশ মি. নাসিরের হাতটা ছেড়ে দিল তারপর গম্ভীর গলায় বলল,

 "তোমার ওই মহাজাগতিক পেশেন্টের চিকিৎসার গল্পটা না হয় আমি কোর্ট থেকে ফিরে পরে শুনব। এখন আর কথা না বাড়িয়ে সোজা গিয়ে গাড়িতে বসো, ড্যাড!!"

কথাটা বলেই ফারিশ আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না, লম্বা লম্বা পায়ে বাইরের দিকে বেরিয়ে গেল। ওদিকে মি. নাসির আর এক মুহূর্তও দেরি করা নিরাপদ মনে করলেন না। তিনি হাফ ছেড়ে বাঁচলেন যে ছেলে আজ আর বেশি জেরা করেনি। জুতো জোড়া কোনোমতে পায়ে গলিয়ে, প্রায় এক প্রকার দৌড়েই গিয়ে ফারিশের গাড়ির ফ্রন্ট সিটে একদম বাধ্য ছেলের মতো সিটবেল্ট বেঁধে বসে রইলেন। 

গন্তব্যস্থলে পৌঁছানো মাত্রই মি. নাসির যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। তিনি গাড়ি থামার সাথে সাথেই তাড়াহুড়ো করে নেমে পড়লেন। গাড়ি থেকে এবার আরিশা নামতেই ফারিশ ঠোঁটের কোণে এক চিলতে নরম হাসি ফুটিয়ে তুলল। বেশ মিষ্টি গলায় বলে উঠল,

 "আল্লাহ হাফেজ!! ভালো করে পড়ো !"

আরিশাও ফারিশের দিকে তাকিয়ে হেসে বিদায় নিল। কিন্তু এই সুন্দর আর সাবলীল দৃশ্যটি দূর থেকে একজনের চোখে একদম তীরের মতো গিয়ে বিঁধল। সে আর কেউ নয়, আরিশার সেই ক্লাসমেট লিজা। লিজা অনেকদিন ধরেই লয়ার ফারিশ নওয়ানের ওপর ক্রাশ খেয়ে বসে আছে।
ফারিশের গাড়িটা চলে যেতেই লিজা চোখমুখ শক্ত করে পাশে থাকা বান্ধবী নওরীনের দিকে তাকিয়ে হিংস্র গলায় জিজ্ঞেস করল, 

"গাড়ির ভেতরে কে ছিল রে, নওরীন?? আমার লয়ার নয়তো!!"

নওরীন লিজার কথা শুনে একচিলতে উপহাসের হাসি হাসল। সে আরিশার দিকে তাকিয়ে লিজাকে খোঁচা দিয়ে বলল,

 "আমার লয়ার?! আরে রাখ তো তোর লয়ার! তোর লয়ার তো তোকে চিনেও না রে লিজা। লিজা বলে যে এই পৃথিবীতে কোনো মেয়ে এক্সিস্ট করে, লয়ার ফারিশ নওয়ান তা জানেও না। সো স্যাড!!"

নওরীনের এমন উপহাসে লিজার রাগ যেন দ্বিগুণ হয়ে গেল। সে আরিশার যাওয়ার পথের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,

 "ডক্টর নাসির স্যারের বন্ধুর মেয়ে হয়ে এই মেয়েটা বেশ অতিরিক্ত সুবিধা পাচ্ছে! সারাক্ষণ দেখি আমার লয়ারের আশেপাশেই ঘোরে। ফারিশ আজ আমায় না চিনলেও, কাল ঠিকই চিনবে। আই সোয়ার!!"

"সেগুড়ে বালি! তুই জাস্ট স্বপ্নই দেখে যা!"

হঠাৎ পেছন থেকে রুবেলের কণ্ঠস্বর শুনে লিজা ঝটকা মেরে সেদিকে তাকাল। রুবেলও লিজার ফ্রেন্ড সার্কেলেরই একজন।লিজা এবার রুবেলের একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আঙুল উঁচিয়ে বলল,

 " চ্যালেঞ্জ করিস না রুবেল! আমি লিজা, ভুলে যাস না!! যা আমি চাই, তা আমি কেড়েই নিই।"

 কথাটা বলেই রাগে ফুসতে ফুসতে ক্লাসরুমের দিকে চলে গেল লিজা। রুবেল তখন ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে একটা বাঁকা, রহস্যময় হাসি দিল। 
অপরদিকে আরিশা আর ড্যাডকে ড্রপ করার পর ফারিশ যখন কোর্টের দিকে যাচ্ছিল, তখনই তার ফোনে একটা অত্যন্ত গোপন ও জরুরি কল এল। ওপাশ থেকে আসিফের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল—

"স্যার, এক মারাত্মক কারচুপি হয়ে গেছে! খুনের মামলার প্রধান আসামি জগুকে আইনি ফাঁকফোকর দেখিয়ে জামিনে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে! অথচ আপনি ওর বিরুদ্ধে সমস্ত অকাট্য প্রমাণ আর জ্যান্ত সাক্ষী পেশ করেছিলেন!"

খবরটা কান অব্দি পৌঁছানো মাত্রই মুহূর্তের মধ্যে ফারিশের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। রাগে ও ক্ষোভে তার ফর্সা মুখাবয়ব একদম রক্তবর্ণ ধারণ করল।  সে আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। স্টিয়ারিং হুইলটা শক্ত করে চেপে ধরে, পায়ের নিচে থাকা এক্সিলারেটরে সজোরে চাপ দিল সে।গাড়িটা তখন শহরের ব্যস্ত রাস্তা ছিঁড়ে  হাই স্পিডে কোর্টের উদ্দেশ্যে ছুটে চলল।



RE: গল্প:অঘোষিত হৃদয়সন্ধি (Writer: Raisa Mehran) - X Man - 09-01-2026

08 

হাইকোর্টের সামনের চত্বরটি যেন এক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।তীব্র রোদকে উপেক্ষা করে চারিদিকে মানুষের ভিড়। জগু—যাকে ঘিরে গত কয়েক মাস ধরে শহরজুড়ে আতঙ্ক, সে আজ জামিনে মুক্তি পেয়েছে। তার দলবল হাইকোর্টের গেটের সামনেই উল্লাস করছে, সাধারণ পথচারীদের ওপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে। আসিফ এবং ফারিশের বাকি বিশ্বস্ত পুলিশ অফিসাররা অসহায় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। ওপর মহলের চাপে তাদের হাত-পা বাঁধা। করার কিছুই নেই। জগুর উদ্ধত হাসি আর তার সহযোগীদের উল্লাসে এক অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করেছে।ঠিক তখনই একটি কালো গাড়ি এসে তীব্র শব্দে ব্রেক কষল। গাড়ি থেকে নামল ফারিশ নওয়ান। তার পরনে কালো স্যুট, চোখে দামি সানগ্লাস, আর মুখে বরাবরের মতো গম্ভীর এক কঠোর ভাব। তাকে দেখামাত্রই অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের ঝাঁক ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ল।

"ফারিশ সাহেব! জগু তো ছাড়া পেয়ে গেল, আইনের কি তবে পরাজয় হলো?"

"আপনি কি মনে করেন জগুকে আটকানো আর সম্ভব নয়?"

একের পর এক তীক্ষ্ণ প্রশ্নে ফারিশের কপালে বিরক্তির ভাজ পরল। তার মেজাজ এমনিতেই সপ্তমে চড়ে আছে, তার ওপর এই সাংবাদিকদের বিরক্তিকর চিৎকার। সে উত্তর দেওয়ার জন্য ঠোঁট খুলতেই জগুর বিদ্রূপাত্মক কণ্ঠস্বর ভিড় ঠেলে ভেসে এল।

"হ্যালো লয়ার ফারিশ নওয়ান! খবর কী আপনার? বেশ তো বুক ফুলিয়ে বলেছিলেন আমায় জেলে পচাবেন, তা শাস্তিটা কি হলো স্যার? জেলের ভাত তো আমার নসিব হলো না!"

জগু তার দলবল নিয়ে এগিয়ে এল ফারিশের ঠিক সামনে। তার চোখে উপহাসের ঝিলিক। সাংবাদিকরা ক্যামেরা তাক করল এই চরম মুহূর্তে। ফারিশ বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। সে জগুর চোখের দিকে এক পলক তাকাল, তারপর খুব শান্ত অথচ শীতল গলায় বলল, 

"শাস্তি এখনো শেষ হয়নি জগু। এটা কেবল একটা ছোট বিরতি।"

কথাটা শেষ করেই মুহূর্তের মধ্যে ফারিশ তার কোমরের পিস্তলটি বের করল। কোনো সতর্কবার্তা ছাড়াই সে সরাসরি জগুর ডান পায়ে লক্ষ্য করে ট্রিগার টিপল। ‘ঠাস!’—এক জোরালো শব্দে হাইকোর্ট প্রাঙ্গণ স্তব্ধ হয়ে গেল। গুলির আঘাতে আর্তনাদ করে জগু মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। তার পায়ের ক্ষত দিয়ে গলগল করে রক্ত ঝরছে। জগুর লোকরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ফারিশ তার বাঁ হাতের ইশারায় আসিফদের সংকেত দিল।আসলে আসার সময় ফারিশের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়ায়নি যে, জগুর সাঙ্গপাঙ্গরা কোমরে আগ্নেয়াস্ত্র লুকিয়ে রেখেছে। ফারিশ আসিফকে আগেই নির্দেশ দিয়েছিল যে, সাংবাদিক ও জনতার ভিড়ের আড়ালে কৌশলে তাদের নিরস্ত্র করতে হবে। ফারিশের বুদ্ধিতে আসিফরা সেই অসাধ্য সাধন করে ফেলেছে—এখন জগুর লোকরা অসহায়, তাদের হাতের বন্দুকগুলো গায়েব।ফারিশ এবার ধীর পায়ে জগুর কাছে এগিয়ে গিয়ে তার কলার চেপে ধরে টেনে তুলল। তার চুল শক্ত করে মুঠোয় বন্দি করে কানের কাছে পিস্তল ঠেকিয়ে ফারিশ গর্জে উঠল,

 "তুই একটা শয়তান, জগু। তুই জানিস, আমি জানি, এমনকি এই দাঁড়িয়ে থাকা সাংবাদিকরাও জানে তুই খুনি। আমি যখন কোনো কেস হাতে নিই, তখন সেটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি থামি না।"

এর পরেই ফারিশ শুরু করল তার মারধর। মারের চোটে জগু তখন এক বিধ্বস্ত মানুষ। তার দলবল অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে—পিস্তলবিহীন তারা তখন ফারিশের এই অমানবিক রাগ দেখে ভয়ে আড়ষ্ট। ফারিশ যেন আজ আইনের মারপ্যাঁচ নয়, বরং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা করতে ব্যস্ত। জগু তখন যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে ফারিশের পায়ের কাছে গড়াগড়ি খাচ্ছে।তারপরই পুলিশ অফিসারের কাছে গিয়ে বলে, 

"ক্ষমা করে দিন স্যার! আমি অপরাধী, আমি খুন করেছি! আমাকে ফাঁসি দিন, যা ইচ্ছা তাই করুন—কিন্তু এই মানুষটার হাত থেকে আমাকে বাঁচান! আর সহ্য হচ্ছে না!"

জগুর এই আর্তনাদ চারপাশের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো। উপস্থিত জনতার মাঝে এক অদ্ভুত স্তব্ধতা, তারপরই শুরু হলো প্রচণ্ড স্লোগান—"লয়ার ফারিশ নওয়ান জিন্দাবাদ!" ফারিশের সম্মানে চারপাশ কেঁপে উঠল।ফারিশ এবার নিজের টি-শার্টের কলারটা একটু ঠিক করে নিয়ে সাংবাদিকের ক্যামেরার দিকে তাকাল। তার চোখের দৃষ্টিতে তখন এক তেজ। সে শান্ত স্বরে বলল, 

"দিস ইজ ফর জগুস সো কল্ড হাই-র‍্যাঙ্কিং বস—সাহস থাকলে এই ফারিশ নওয়ানের সামনাসামনি এসে শয়তানি করো। দেখি তুমি কত বড় শয়তান!"

কথাটা বলেই পিছনে একবারও না তাকিয়ে ফারিশ কোর্ট ভবনের ভেতরে ঢুকে গেল।

হসপিটালের লবি। বড় স্ক্রিনের টিভিটাতে তখন ফারিশ নওয়ানের সেই গর্জন প্রচারিত হচ্ছে। উপস্থিত ডাক্তার, নার্স আর রোগীরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে আছেন ফারিশের সেই দুঃসাহসিক অভিযানের দিকে। পুরো হসপিটালে এক পিনপতন নীরবতা। ঠিক সেই মুহূর্তেই আরিশার খুশির আর্তনাদ সেই নীরবতা খানখান করে দিল।

"জিও লয়ার সাহেব, জিও!! সাবাশ!"

মুহূর্তের মধ্যে চারপাশ থেকে একঝাঁক বিরক্ত দৃষ্টি আরিশার দিকে নিক্ষিপ্ত হলো। সবাই যেভাবে গভীর মনোযোগ দিয়ে টিভি দেখছিল, আরিশার এই আকস্মিক চিৎকারে তারা যেন ঘোর থেকে বাস্তবে ফিরে এল। লজ্জিত আরিশা নিজের ভুল বুঝতে পেরে দুই ঠোঁট চেপে ধরে এক কোণায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে পড়ল। তবে তার চোখেমুখে এখনো সেই  হাসি ।মি. নাসির এক কোণায় দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি প্রথমে আরিশার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন, যেন আরিশার এই চঞ্চলতা তিনি বেশ উপভোগ করছেন। পরক্ষণেই তার দৃষ্টি টিভি স্ক্রিনে স্থির হলো। সেখানে ফারিশ তখন দৃঢ় পায়ে কোর্ট ভবনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মি. নাসিরের বুকটা গর্বে ফুলে উঠল। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল তার। ছেলে হিসেবে ফারিশ সবসময়ই এমন—অন্যায়ের সাথে আপস করা তার ধাতে নেই।ঠিক সেই সময়েই করিডোরের অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা লিজা স্ক্রিনে ফারিশের মুখটা দেখামাত্রই বিমোহিত হয়ে পড়ল। তার দুচোখে তখন এক অদ্ভুত আবেশ।

"ব্রো... আমি তো আবারও আমার লয়ারের প্রেমে পড়ে গেলাম!!"

 লিজার কণ্ঠে এক ধরনের পাগলামি মেশানো মুগ্ধতা।পাশে থাকা নওরীন আর রুবেল লিজার দিকে তাকাল। লিজার এই অতি-নাটকীয়তায় রুবেল ভ্রু কুঁচকে বলে উঠল, 

"প্রতি দুই সেকেন্ড পরপর একই ডাইলোগ দিস না তো! কানে লাগছে।"

"বেশি কথা বলছিস কিন্তু তুই, রুবেল!" 

লিজা রুবেলের দিকে রেগে তাকাল।নওরীন পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে এবং ঝামেলা এড়াতে মাঝখানে কথা বলে উঠল,

 "আচ্ছা, এখন এসব বাদ দে তো! ক্লাসের সময় হয়ে গেছে। সবাই অলরেডি ক্লাসে ঢোকা শুরু করেছে, চল দেরি হয়ে যাবে।"

নওরীনের কথায় আর তর্ক বাড়াল না লিজা। সে শেষবার টিভি স্ক্রিনের দিকে এক পলক তাকিয়ে, হাঁটা শুরু করল। তার পেছনে রুবেল আর নওরীন।

_________

বাড়ি ফেরা মাত্রই এক উৎসবের আমেজ। ড্রয়িং রুমে পা রাখতেই আয়ানের সেই স্বভাবজাত উচ্ছ্বাস,

 "ওয়েলকাম, ওয়েলকাম! আমাদের হিরো লয়ার!"

ফারিশ হাসল। আয়ানকে ফারিশকে কাছে টেনে নিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।বাসার সবার সাথে অনেকক্ষণ কথা বলার পর ফারিশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

 "আমি একটু ফ্রেশ হয়ে আসি, প্রচণ্ড টায়ার্ড লাগছে।"

সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতেই মি নাসিরের দুষ্টুমিমাখা কণ্ঠে বাধা পেল ফারিশ, 

"হ্যাঁ, এখন টায়ার্ড লাগছে, কিন্তু উপরে গেলে আর টায়ার্ড লাগবে না!"

ফারিশ কথার অর্থ ঠিক বুঝতে পারল না। বাবার দিকে একবার ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে সে উপরে উঠে গেল। কিন্তু নিজের রুমের দরজায় হাত রাখতেই এক অদ্ভুত শিহরণ খেলল তার শরীর দিয়ে।
দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই সেই দৃশ্য! আরিশা তার রুমের ভেতরেই দাঁড়িয়ে, মুখে এক চিলতে মিষ্টি হাসি নিয়ে ফারিশের দিকে তাকিয়ে আছে। ফারিশের হৃৎপিণ্ড যেন ধক করে উঠল, মুহূর্তের জন্য তার শ্বাস-প্রশ্বাস থেমে যাওয়ার উপক্রম! সে কল্পনাও করেনি, এই মুহূর্তে আরিশাকে এখানে দেখতে পাবে।

"ওয়েলকাম, মিস্টার লয়ার!" 

আরিশার কণ্ঠে এক অদ্ভুত মোহ।ফারিশের মুখে স্বাভাবিক কোনো কথা এল না। সে যেন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কিছুক্ষণ নীরবতার পর আরিশা নিজেই এগিয়ে এল,

 "আজ তো আপনি পুরো ফাটিয়ে দিয়েছেন ফারিশ! ওই জগুটাকে যা ধোলাই দিয়েছেন না, জাস্ট অসাধারণ!"

নিজের প্রতি আরিশার এই মুগ্ধতা দেখে ফারিশের ভেতরে এক অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করল। সে বাঁকা হেসে দুষ্টুমির ছলে বলে উঠল,

 "তা এত ভালো কাজের জন্য শুধু ওয়েলকাম? আয়ানের মতো জড়িয়ে ধরেও তো ওয়েলকাম করতে পারতে!"

সে জানত, আরিশার কাছে এমন আবদার অবান্তর। আরিশা কখনও এমন করবে না।সে মজা করেই কথাটা বলেছিল। কিন্তু পরক্ষণেই যা ঘটল, তাতে ফারিশের দুনিয়া যেন উল্টে গেল। আরিশা কোনো দ্বিধা না করে, এক পলকে এগিয়ে এসে ফারিশকে জড়িয়ে ধরল।

"আরে, আপনি তো এখন আমার জামাই। জড়িয়ে ধরাই যায়! আচ্ছা, আপনি ফ্রেশ হন, আমি গেলাম!"

বলেই এক ঝটকায় ফারিশকে ছেড়ে দ্রুত পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল আরিশা। ফারিশ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার শরীরের প্রতিটি শিরায় তখন বিদ্যুতের ঝিলিক। ‘জামাই’! শব্দটি তার কানে এখনো বাজছে। আর এই জড়িয়ে ধরাটা—এটা কি শুধুই উদ্দীপনা, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো অনুভূতি?নিজের মুখের ওপর দুহাত চাপা দিল ফারিশ। হৃদপিণ্ডের সেই তীব্র ধুকপুকানি যেন বুকের পাঁজর ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে। সে ধীরগতিতে দেয়ালের গায়ে ভর দিয়ে মেঝের ওপর বসে পড়ল। 

"ওই শয়তানের হাড্ডি, আইডিয়া দে বলছি! কাল এনগেজমেন্ট, আর তুই কি না এখন আমার সাথে মশকরা করছিস? কিছু একটা উপায় বের কর, নইলে আমি শেষ!"

আরিশা শান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে হাত দুটো ভাঁজ করে বলল, 

"আগে রেসপেক্ট দেও আয়ান ভাই! তারপর বুদ্ধির কথা ভাবা যাবে।"

আয়ান বাধ্য হয়েই দুই হাত জোড় করে এবার বলল,

 "ওকে ওকে, আমার বোন, লক্ষ্মী বোন! এবার প্লিজ কিছু একটা কর। সত্যি বলছি, এই বিয়ে করার চেয়ে মরে যাওয়া ঢের ভালো!"

আয়ানের এই "মরে যাওয়ার" কথা শুনে আরিশার চোখের কোণে এক দুষ্টুমির ঝলক খেলে গেল। সে লাফিয়ে উঠে বলল,

 "রাইট! রাইট! ঠিক ধরেছো! তুমি মরে যাবে—এটাই তো সেরা সলিউশন!"

আরিশার এই অস্বাভাবিক উত্তেজিত মন্তব্য শুনে আয়ান এক পা পিছিয়ে গেল। তার বুকটা ধক করে উঠল।

 "আরে ভাই, আমি তো মজা করছিলাম! তুই এত সিরিয়াসলি কেন নিচ্ছিস?"

আরিশা এবার এক রহস্যময় হাসি হেসে বলল, 

"আরে আয়ান ভাই, তুমি কি সত্যিই মরবে নাকি? আমি তোমাকে বলছি সুইসাইড করার নাটক করতে! বিষয়টা ভেবে দেখো— বাসায় কেউ তোমার কথা কানেই তুলছে না। কিন্তু তুমি যদি সুইসাইড করার নাটক করে সবাইকে ব্ল্যাকমেইল করতে পারো, তবে তারা তোমার কথা শুনতে বাধ্য! ভয় পেয়ে সবাই বিয়ে বাতিল করে দেবে।"

আয়ান কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মাথায় বুদ্ধিটা বেশ খেলেছে! সে কিছুটা ইতস্তত করে বলল, 

"আসলেই কি কাজ হবে?"

আরিশা আত্মবিশ্বাসের সাথে চোখের পলক ফেলে বলল, 

"হান্ড্রেড পার্সেন্ট! তুমি শুধু আমার প্ল্যান অনুযায়ী কাজ কর। "

১০মিনিট পর____

" আয়ান ভাই কেউ আসছে, কাজে লেগে পরো!! "

" এই আরিশা, যদি সত্যিই মরে যাই!! "

" আরে দুই একবার মরলে কিছু হবে না। ক্যারি অন!! "

আরিশার কথায় আয়ান এবার চেয়ার থেকে নামে। 

" দুই একবার মরলে কিছু হবে না মানে?? এই তোকে খুব একটা সুবিধার লাগছে না!! আমি গেলাম!! "

" আমার ফেন্ডকে বুঝি বিয়ে করার খুব ইচ্ছে?? "

আরিশা শয়তানি হাসি দিয়ে বলে। আয়ান গিয়ে পুনরায় চেয়ারে উঠে দাঁড়ায়। 

" ওকে আমি গেলাম। কেউ আসছে!! "

কথাটা বলেই আরিশা চলে যায়। মিসেস ফাতেমা তখন রুমে আসে। সুযোগ বুঝে আয়ানও তখন ওড়নাটা ফ্যানে ঝুলায়।

" মাশআল্লাহ,আয়ান। তুই ফ্যান পরিষ্কার করছিস?? আজ সূর্য কোনদিকে উঠল। আচ্ছা ভালো, ভালো করে পরিষ্কার কর!! "

মিসেস ফাতেমার কথায় আয়ান আকাশ থেকে পরে। কিছু বলার আগেই এবার তার মায়ের রাগি কন্ঠ ভেসে আসে। 

" আমার নতুন ওড়নাটা তবে তুই নিয়েছিস শয়তান!! দাঁড়া, এটা দিয়ে ফ্যান পরিষ্কার করা হচ্ছে?? "

আয়ানের মা তেড়ে যেতেই আয়ান চেয়ার থেকে নামে। কিসের সুইসাইড কিসের কি!! ভয়ে এক দৌড়ে ফারিশের রুমে গিয়ে থামে!! সেখানে আরিশাকে দেখেই রেগে উঠে আয়ান, 

" শয়তানের শয়তান!! এই তোর আইডিয়া!! তোরে?!! "

আয়ান তেড়ে যেতে গেলেই আরিশা ভয়ে পিছিয়ে যায়। আর তখনই টেবিলের কফির কাপ থেকে কফি ফারিশের ফাইলে পরে। 

" আয়ান ভাই, এটা তুমি কি করলে। মাইগ্রেন তো আমাদের আর ছাড়বে না!! "

" আমি করেছি মানে, তুই করেছিস এটা!! "

তাদের কথার মাঝেই ওয়াশরুম এর দরজা খোলার শব্দ পায়। 

" যদি, যদি তুমি বলেছো এটা আমি করেছি তবে তোমাকে আমি ইনায়ার দাদীর সাথে বিয়ে দিব। উনি আরও বড় ডাইনি!! আর আঙ্কেল মানে তোমার বাবার হাতে বকা আর ফারিশের হাতে মার খাওয়াবো। আর... "

আরিশার হুমকির চোটে আয়ান শেষ। ফারিশ এবার বের হয়েই কপাল কুচকে আয়ান আর আরিশার দিকে তাকায়। দুটো আবারও একসাথে। সদ্য গোছল করে বের হওয়ার মাথা কিছুটা ঠান্ডা থাকলেও নিজের ফাইলের বারোটা বাজানো দেখে মাথা গরম হয় তার। 

" আয়ান ভাইকে কিছু বলবেন না প্লিজ!! "

আরিশা তুতলিয়ে বলে। ফারিশ এবার আরিশার দিকে এগিয়ে এসে বলে, 

" একজন লয়ারকে শিখাচ্ছো কে দোষী!! "

আয়ান এবার শুকনো ঢোক গিলে ফারিশের সামনে আসে । 

" আমাকে যা খুশি কর তুই কিন্তু আরিশাকে বকিশ না প্লিজ। "

এমনিতেই মাথা গরম তার উপর আয়ানের আরিশার প্রতি এই আলগা পিরিত দেখে আরও মাথা গরম হয় ফারিশের।সে আয়ানের দিকে এগোতে এগোতে ফিসফিসিয়ে বলে, 

" ওর প্রতি তোর এতো দরদ কিসের!! আমার আরুর প্রতি দরদ আমি দেখাব। তোর এতো দরদ কিসের?? "

ফারিশের কথায় ভয় ভুলে আয়ান এবার হাসে। 

" আমার আরু!! ব্যাপার কি ব্রো?? কেমন জানি রহস্য রহস্য গন্ধ পাচ্ছি!! "

" কথা ঘুরোনোর চেষ্টা করছিস!! "

কথাটা বলেই ফারিশ এবার আয়ানকে মারতে থাকে। অপরদিকে তাদের কথপোকথন না শুনলেও এই দৃশ্য দেখে আরিশা হেসে উঠে। আরিশার হাসির শব্দে ফারিশ এবার তার দিকে তাকায়। নিজেকে যথেষ্ট শান্ত রাখার চেষ্টা করেও রাগি চোখে আরিশার দিকে তাকিয়ে ধমকিয়ে উঠে, 

" আরিশা!! "

ব্যাস। ফারিশের ধমক খেয়ে ঠোঁট উল্টে ছলছল চোখে শব্দ করে কান্না শুরু করে আরিশা। 

" অ্যা......... অ্যা........ অ্যা.......... "

 প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে, কিন্তু আরিশার কান্নার বিরাম নেই।তার কান্নার শব্দ পুরো বাড়ি জুড়ে।ফারিশ কয়েকবার তার কাছে গিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছে, কিন্তু আরিশা বলতে নারাজ। মিসেস ফাতেমা কোনো উপায়ান্তর না দেখে আরিশাকে বুকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, আরিশার কান্নার মাঝেই হঠাৎ হঠাৎ এক চিলতে হাসি ফুটে উঠছে। সে আয়ানের মার খাওয়ার সেই দৃশ্যটা মনে করে হাসছে, আর পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে আবার জোরে কাঁদতে শুরু করছে। এই অদ্ভুত আচরণ দেখে আয়ান নিজেও হতভম্ব হয়ে এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে। ফারিশের অবস্থা তখন বড্ড করুণ। সে প্রচণ্ড অপরাধবোধে ভুগছে।অবশেষে সে আরিশার কাছে যেতে সক্ষম হলো। আরিশা তখনো অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। ফারিশ আলতো করে আরিশাকে নিজের দিকে ঘোরাল।  আরিশার ভেজা চোখ হাত দিয়ে মুছিয়ে দিতে দিতে ফারিশের কণ্ঠে এক দারুণ মলিন সুর—

"সরি আরু, রিয়েলি সরি! মাথাটা ঠিক ছিল না, রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। প্লিজ, কান্না থামাও!"

আরিশা চুপচাপ। ফারিশ এবার একটু ঝুঁকে আরিশার চোখের দিকে তাকিয়ে আবারও ফিসফিস করে বলল,

 "সরি আরু, প্লিজ!"

আরিশা ধীরলয়ে ফারিশের দিকে তাকাল।ফারিশ এক চিলতে হেসে আরিশার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। 

"তোমার জন্য একটা জিনিস এনেছি, দেখবে না?"

আরিশার চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে মাথা নাড়ল। ফারিশ হেসে বলল,

 "তাহলে চলো!"

ফারিশ আরিশার হাত ধরে রুমের বাইরে নিয়ে যেতে শুরু করল। পুরো দৃশ্যটা দেখে আয়ান তো হা করে তাকিয়ে আছে। সে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না—এ কী হলো? ফারিশ নওয়ানের মতো মানুষ নিজে থেকে সরি বলছে?আরে কার সরি বলার কথা ছিল আর কে বলল! 
যাবার সময় আরিশা একবার আয়ানের দিকে ঘুরে তাকাল। তার চোখের কোণে তখনো অশ্রু, কিন্তু ঠোঁটের কোণে বিজয়ের হাসি। আয়ানকে ইশারায় সে বুঝিয়ে দিল—"দিস ইজ কল্ড রিভার্স টেকনিক!"আয়ান সত্যিই আবারও আরিশার ফ্যান হলো। নাহ এই মেয়ের সাথে কেউই পারবে না। আয়ান এবার নিচে যাচ্ছিল ঠিক তখনই ইনায়ার কল আসে। 

" হ্যালো!! "

" সোজা বাংলায় বলছি সোজা বাংলায় উত্তর দিবেন। এখন আপনি কোথায়!! "

" বাসায়!! "

আয়ান অবাক হয়ে উত্তর দেয়। 

" বাসার ঠিক কোন যায়গায়?? "

" বাগানে যাচ্ছি!! "

" গুড!! "

ইনায়া ফোনটা কাটে। সব প্রস্তুতি নিয়ে হেসে বলে, 

" আয় না আয়, আজ যাস্ট একবার আয়!! তোর একদিন কি আমার একদিন!! "

অপরদিকে আয়ানকে হঠাৎ উপর থেকে মি নাসির ঢেকে উঠে। আয়ান সোফায় বসা তার বাবার দিকে তাকিয়ে বলে, 

" ড্যাড, গার্ডেনে গাড়ির চাবিটা ফেলে এসেছি। একটু আনতে পারবে প্লিজ। আমি আঙ্কেলের কাছে গেলাম!! "

মি নাভান ছেলের কথায় সায় দিয়ে গার্ডেনে যায়। 

( কেমন হয়েছে বলো! ??)



RE: গল্প:অঘোষিত হৃদয়সন্ধি (Writer: Raisa Mehran) - X Man - 09-01-2026

 09

বাগানে অন্ধকার ভালোই নেমেছে। মি. নাভান  বাগানের দিকে এগিয়ে গেলেন। আজ কেন জানি বাগানটা অস্বাভাবিক অন্ধকার লাগছে। তিনি বিরক্তির সাথে বিড়বিড় করলেন, 

"কিরে, আজ বাগানের লাইটগুলো দেওয়া হয়নি?? এত অন্ধকার কেন?"

হঠাৎ মি নাভান শুনতে পেল ভারী বুটের শব্দ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক ঝটকায় তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল কেউ! চোখের পলকে মি. নাভানের মাথায় একটা ভারী বস্তা ঢুকিয়ে সেটা শক্ত করে আটকে দিল আক্রমণকারী। মি. নাভান অন্ধকারে কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না, দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম।ইনায়া তখন উত্তেজনায় কাঁপছে। ওড়নাটা মুখের ওপর শক্ত করে পেঁচিয়ে, কণ্ঠস্বর ভরাট করে ধমক দিল, 

"করবি করবি আর বিয়ে! আজ তোর এই বিয়ের শখ চিরতরে মিটিয়েই ছাড়বো!"

বস্তার ভেতর থেকে মি. নাভানের আর্তনাদ ভেসে এল, 

"আরে কে ভাই তুই? আরে ছাড়! কী করছিস এসব?"

ইনায়া যেন কোনো কথা কানেই তুলল না। সে এবার বস্তাবন্দি মি. নাভানের পিঠে ধুমধাম কিল-ঘুষি মারতে মারতে বলল, 

"নেহি ছাড়ুঙ্গি! বল, আর বিয়ে করবি? শখ কত বড়!"

মি. নাভান তখন ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়ে ভাঙা গলায় চিৎকার করছেন, 

"আরে ভাই, আমি আবার কেন বিয়ে করতে যাব? আমি তো অলরেডি ম্যারিড! আমার বউ ঘরে আছে!"

ইনায়ার চোখ তখন চড়কগাছে!

 "ওহ মোর আল্লাহ! বিবাহিত হয়েও আবার বিয়ে করার শখ? দাঁড়া, তোর এই শখ আজ পিটিয়ে বের করছি!"

ইনায়া এবার যেন নতুন উদ্যমে বস্তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। মি. নাভানের তখন অবস্থা কাহিল।

"আল্লাহ রে! আজকাল দেখছি বিয়ে করেও শান্তি নেই! কোথা থেকে কোন শয়তান এসে যে আক্রমণ করে বসলো!"

"একে তো বিয়ে করার সাহস করেছে, তার ওপর আবার বড় বড় কথা!"

ইনায়ার গলার স্বর রাগে কাঁপছিল। সে বস্তাটিকে ধরে  ঝাকাতে শুরু করল। বস্তার ভেতরে থাকা মি. নাভানের অবস্থা তখন দফারফা।ঠিক তখনই কারোর পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। মি. নাসিরের গম্ভীর কণ্ঠস্বর নিস্তব্ধতাকে চিরে ভেসে এল,

 "আরে, এত অন্ধকার কেন? কেউ নেই নাকি এখানে?"

মি. নাসিরের উপস্থিতি টের পেয়েই ইনায়ার হুঁশ ফিরল। সে ভয়ংকর রকমের ভড়কে গেল। তড়িঘড়ি করে বস্তাটি ছেড়ে সে অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে ঝোপের আড়ালে গিয়ে নিজেকে আড়াল করল। মি. নাসির বাগানের বাতিগুলো জ্বালালেন। তীব্র আলোয় চারপাশ ঝলমলিয়ে উঠল। কিন্তু চোখ তুলতেই মি. নাসিরের হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। সামনেই পড়ে আছে একটি বিশাল বস্তা, যা নিজের জায়গা থেকে অদ্ভুতভাবে নড়ছে।

"লা হাওলা ওয়ালা কুয়াতা ইল্লা বিল্লাহ!" 

মি. নাসির আতঙ্কে কয়েক কদম পিছিয়ে গেলেন। কাঁপাকাঁপা গলায় তিনি বিড়বিড় করলেন,

 "বস্তা এভাবে ডান্স করছে কেন? নির্ঘাত... নির্ঘাত কোনো জিন-ভূত এসে আস্তানা গেড়েছে এখানে!"

ভয়ের চেয়েও তখন তাঁর ভেতরে কাজ করছিল তীব্র উত্তেজনা। মাটিতে পড়ে থাকা একটি মজবুত লাঠি হাতে তুলে নিলেন তিনি। আত্মরক্ষার বদলে আক্রমণের ভঙ্গিতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন বস্তাটির ওপর।

"জিন বাবাজি, তুমি এই নাসিরকে এখনো চেনো না!" 

মি. নাসির হুংকার দিয়ে উঠলেন, 

"আজ তোকে পিটিয়ে ভূত ছাড়িয়ে তবেই ছাড়ব!"

লাঠির প্রতিটি ঘা পড়ছে বস্তার ওপর, আর ভেতর থেকে ভেসে আসছে মি. নাভানের করুণ আর্তনাদ। ইনায়া আড়াল থেকে পুরো দৃশ্যটা দেখছিল। তার রাগের জায়গায় এখন কাজ করছে অদ্ভুত এক আনন্দ। সে আড়াল থেকে বের হয়ে এল এবং উত্তেজনার চোটে মি. নাসিরের সুরের সাথে সুর মিলিয়ে উৎসাহ দিতে লাগল,

 "আরো জোরে, আঙ্কেল! হেইশসা! পিটিয়ে একদম সমান করে দিন! আরো জোরে!"

শত যুদ্ধের পর, ধুঁকতে ধুঁকতে মি. নাভান কোনোমতে বস্তার বাঁধন ছিঁড়ে মাথা বের করতে সক্ষম হলেন। কিন্তু বাতির আলোয় যখন মি. নাসির আর ইনায়া দেখল বস্তার ভেতরে বন্দী ব্যক্তিটি আর কেউ নন, স্বয়ং মি. নাভান, তখন তাদের কিডনি ভয়ের চোটে মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসার জোগাড় হলো! মি. নাসিরের হাতের লাঠি থরথর করে কাঁপতে লাগল।দৃশ্যটি ফারিশের বেলকনি থেকে আরিশা দেখছিল। নিচে কী ঘটছে তা ঠিকঠাক বুঝে ওঠার আগেই সে ধরে নিল যে কোনো ভয়াবহ অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। কোনো চিন্তা না করেই হাতের কাছে থাকা এক জগ ঠান্ডা পানি সে নিচে ঢেলে দিল।হঠাৎ মাথায় হিমশীতল পানি পড়তেই মি. নাসির গর্জে উঠলেন,

 "কোন শয়তান রে!!"

তৎক্ষণাৎ নিচে তাকিয়ে আরিশা তার ভুল বুঝতে পারল। আতঙ্কে তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। নিজের বিপদ আঁচ করতে পেরে জগটি ফেলে দিয়ে তৎক্ষণাৎ সে সিঁড়ি দিয়ে নিচে দৌড়াতে শুরু করল। আরিশা নিচে নেমেই ইনায়াকে নিজের কাছে টেনে আনল। ইনায়ার তখন চোখের পানি আর নাকের পানি একাকার।

"এই ইনায়া, এখানে এসব কী হচ্ছে বলবি? আর তুই কখন এলি??"

ইনায়া তখন কাঁপছে। ভয়ে আর কান্নায় জড়িয়ে আসা গলায় আরিশার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, 

"বিরাট সর্বনাশ হয়ে গেছে রে! আমি আসলে রং নাম্বারে ডায়াল করেছিলাম। আয়ানকে শায়েস্তা করতে গিয়ে ভুল করে আঙ্কেলকেই শায়েস্তা করে বসে আছি!"

কথাটা শুনে আরিশার চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। সে নিজের কপালে হাত দিয়ে বিড়বিড় করে উঠল, 

"ইয়া মাবুদ!! তুই কি করলি এটা!"

ইনায়া ডুকরে কেঁদে ওঠার ভান করে বলল, 

"ভাই, এবারের মতো বাঁচা! যে করেই হোক আমাকে এখান থেকে উদ্ধার কর!"

ঠিক তখনই বাগানে ধীর পায়ে প্রবেশ করল ফারিশ আর আয়ান। বাগান থেকে আসা আর্তনাদ আর হট্টগোল শুনেই তারা পরিস্থিতি বুঝতে বের হয়েছিল। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আরিশা এক মুহূর্ত দেরি করল না। ইনায়ার পিঠ চাপড়ে, তার কানের কাছে ঝটপট কিছু একটা বলে দিল। কথাটি শুনতেই ইনায়ার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল, কিন্তু আরিশার নির্দেশে সে একটা গভীর শ্বাস নিয়ে নিজেকে কিছুটা সামলে নিল।

"হায় আল্লাহ, কোন শয়তান রে আমার এই অবস্থা করলো!! "

মি নাসির ভয়ে ইনায়াকে ইশারা দেয় যাতে তার নাম না বলে। ইনায়াও এমন একটা ভাব ধরে যেন নো টেনশন আঙ্কেল আমি আপনাকে বাঁচাবো!! 

" কে আমায় বস্তায় পুরলো রে. ... "

মি নাভানের এই কথায় মি নাসির এবার একটু স্বস্তি পায়। মার দিলেও বস্তায় তো আর সে ভরে নি!! গলার স্বর উচিয়ে বলল, 

" হ্যাঁ, হ্যাঁ , কে এই কাজ করল?? "

"আমার মনে হয় আমি কালো শার্ট পরা কারোকে দেখলাম, শ্বশুর আব্বা!!"

ইনায়া বেশ ইনোসেন্ট একটা ফেইস নিয়ে বলে। 
মি নাভান এবার তাদের মধ্যে উপস্থিত একমাত্র কালো শার্ট পরিহিত আয়ানের দিকে তাকায়। 

"আর আমার গায়ে পানি ফেললো কে!! "

মি নাসিরও এবার রেগে বলে। কথাটা শুনে ইনায়ার মতো আরিশাও বেশ একটা ইনোসেন্ট ফেইস নিয়ে বলে, 

"আঙ্কেল ,তুমি তো এখানেই দাঁড়িয়ে ছিলে।বরাবর উপরে তাকালেই বুঝা যাবে!! "

মি নাসির এবার উপরে তাকায়। ফারিশের বেলকনি। 

"ভাই, তুই একটা ঝাড়ু নে আর আমি একটা!! " 

রেগে বলে উঠে মি নাসির। মি নাভানও ভাইয়ের সাথে সায় দেয়। বাগানের এক কোণে পরে থাকা দুটো ঝাড়ু দুইজনই হাতে নেয়। অপরদিকে ফারিশ আর আয়ান কিছুই বুঝে উঠছে না!! 

" এরা এভাবে আমাদের দিকে তাকাচ্ছে কেন?? "

ফারিশের কথায় আয়ানও বেশ চিন্তিত ভঙ্গিতে বলে, 

" সেটাই তো বুঝছি না ব্রো!! "

তারা বোঝার আগেই মি নাভান এবার মি নাসিরের উদ্দেশ্যে বলে উঠে, 

" বল, বিসমিল্লাহ!!! "

" বিসমিল্লাহ!! "

ব্যাস, ম্যারাথন দৌড় শুরু। ফারিশ আর আয়ান কিছু না বুঝেই দৌড়ে যাচ্ছে আর তাদের পিছনে মি নাসির আর নাভান। 

" খবরদার, ড্যাড। আমি নামকরা একজন লয়ার। ঐ ঝাড়ু দূরে রাখো আমার থেকে। "

" আমিও নামকরা প্রফেসর। রেসপেক্ট মি!! "

কিন্তু কে শুনে কার কথা!! আরিশা এবার ইনায়ার কাঁধে হাত রেখে বেশ ভাব ধরে বলে, 

" বুঝলি ইনায়া, এটাকে বলে ডেঞ্জার টান্সফার টেকনিক!! শিখে রাখ!! "

" হ, হ, ভাই, তুই বেস্ট!! তুই সেরা!! "



RE: গল্প:অঘোষিত হৃদয়সন্ধি (Writer: Raisa Mehran) - X Man - 09-01-2026

10
 

বিশাল, রাজকীয় অট্টালিকার ভেতরের পরিবেশটা থমথমে। আলিশান ড্রয়িংরুমের মাঝখানে রাখা মখমলের সোফাটায় হেলান দিয়ে বসে আছেন শহরের উচ্চ ক্ষমতার অধিকারী, অত্যন্ত উচ্চপদস্থ এক প্রভাবশালী ব্যক্তি। চারপাশের দামি ঝাড়বাতি আর দেয়ালে ঝোলানো প্রাচীন চিত্রকর্মগুলো তার আভিজাত্যের জানান দিলেও, ঘরের ভেতরের বাতাসটা এই মুহূর্তে এক অদ্ভুত নৃশংসতায় ভারী হয়ে আছে। তার ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে তার এক অনুগত সহযোগী রাশেদ এবং রাশেদের পাশে তার ছেলে।রুমের পিনপতন নীরবতা ভেঙে সেই ক্ষমতাধর ব্যক্তিটি হাতের দামি চুরুটে একটা লম্বা টান দিলেন। ধোঁয়াটা বৃত্তাকারে বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে অত্যন্ত ধীর, কিন্তু তীক্ষ্ণ গলায় বললেন,

"তবে শেষ পর্যন্ত জগুর শাস্তিটা হলোই...!"

ব্যক্তিটির এই শীতল কণ্ঠস্বর শুনে রাশেদ এক পলক তার দিকে তাকাল। রাশেদের চোখের মণি দুটো অপমানে আর তীব্র ক্ষোভে জ্বলজ্বল করে উঠল।রাশেদের ভেতরের সেই দহন টের পেয়ে সোফায় বসা ব্যক্তিটি ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিদ্রূপের হাসি ফোটালেন। চুরুটের ছাইটা অ্যাশট্রেতে ঝেড়ে তিনি আবার বলতে শুরু করলেন,

 "তোদের বংশের ছেলেগুলোর জেদ কিন্তু মারাত্মক রাশেদ! সত্যি বলতে, আই লাইক ইট! কিন্তু মনে রাখিস, অতিরিক্ত জেদ পতনের কারণ হয়। তাই যত দ্রুত সম্ভব এই লয়ার ফারিশকে আমাদের পথ থেকে সরাতে হবে। আন্ডারস্ট্যান্ড? ফারিশ আমাদের অনেক বড় ক্ষতি করে দিয়েছে, ওকে আর সময় দেওয়া যাবে না।"

একটু থেমে, ব্যক্তিটি সোজা হয়ে বসলেন।

" ভালো কথা!!তোর ওয়াইফের খোঁজ পেলি??"

" নাহ, ফারিশ তাকে নতুন কোনো গোপন জায়গায় নিয়ে গেছে!!"

" যা করার তাড়াতাড়ি কর। ওর কাছে কিন্তু আমাদের অনেক তথ্য আছে!!"

কথাটা বলা শেষ হতেই হঠাৎ ব্যক্তিটির চোখের চাউনি এবার পৈশাচিক হয়ে উঠল। রাশেদের কাঁধে হাত রেখে অত্যন্ত নিচু কিন্তু বিষাক্ত স্বরে বললেন,

 "তবে তোদের বংশের ছেলেগুলোর জেদ যতই হোক না কেন রাশেদ, দিনশেষে তারা কিন্তু আমার পায়ের নিচেই থাকবে। বুঝলি? ঠিক... তোর মতো!"

কথাটা শেষ করেই লোকটা একটা উচ্চস্বরে শয়তানি আর তাচ্ছিল্যের হাসি দিল। সেই অট্টহাসি পুরো রাজকীয় রুমটায় প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। রাশেদকে চরম অপমানের সাগরে ডুবিয়ে দিয়ে, নিজের ক্ষমতার দম্ভ নিয়ে ধীর পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল সেই উচ্চপদস্থ ব্যক্তি।সে আড়াল হতেই এতক্ষণ ধরে চেপে রাখা ক্ষোভে ফেটে পড়ল রাশেদের ছেলে। সে বাবার দিকে এগিয়ে এসে উত্তেজিত গলায় বলল,

 "ড্যাড! লোকটা তোমাকে এভাবে অপমান করল? তুমি মুখ বুজে সহ্য করলে?!"

ছেলের রাগ দেখে রাশেদের ঠোঁটের কোণে এবার এক রহস্যময়, কুটিল হাসি ফুটে উঠল। চোখের ভেতরের ক্ষোভটা নিমেষেই এক ঠান্ডা প্রতিশোধের নেশায় রূপ নিল। সে ছেলের পিঠে হাত রেখে অত্যন্ত শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল,

 "ক্ষমতা আছে রে ছেলে, ক্ষমতা আছে! ওর হাতে এখন এমন শক্তি আছে যে, এই মুহূর্তে ওর দেওয়া চরম অপমানটাও আমাদের হাসিমুখে সহ্য করতে হবে। কিন্তু মনে রাখিস, দিন একরকম যায় না। সঠিক সময়টা শুধু আসতে দে... তখন এই প্রতিটা অপমানের জবাব আমি সব সুদে-আসলে ফিরিয়ে দেব! একটা হিসাবও বাকি থাকবে না।"

_________

গাড়িতে ক্যাজুয়ালি হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ফারিশ। পরনে তার অত্যন্ত নিখুঁত কাটের ব্লেজার আর শার্ট। এক হাত পকেটে গুঁজে অন্য হাতে সে নিবিষ্ট মনে ফোনে স্ক্রল করে চলেছে, যেন চারপাশের কোনো কিছুতেই তার কোনো আগ্রহ নেই। আজ ইনায়া আর আয়ানের এনগেজমেন্ট।  উৎসবের আমেজ। মি. নাসির আর নাভান এতক্ষণ ধরে ফারিশের ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে অনবরত দাঁত বের করে হেসেই চলেছে। তাদের হাসির পেছনের খোঁচাটা ফারিশ খুব ভালো করেই বোঝে, কিন্তু সে তাদের একবিন্দুও পাত্তা দিচ্ছে না; বরং সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করে নিজের গাম্ভীর্য ধরে রেখেছে। কাল রাতে কোনোমতে সে আর আয়ান নিজেদের ইজ্জতটুকু বাঁচিয়ে অক্ষত অবস্থায় ফিরতে পেরেছে। এক্কেবারে ঝাঁড়ু নিয়ে তাড়া করা হয়েছিল তাদের! ভাবা যায়? লয়ার ফারিশকে ঝাঁড়ু পেটা করার উপক্রম! সময় আসুক! তখন সেও দেখে নিবে। ঠিক তখনই আয়ান হন্তদন্ত হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এল। আয়ানকে দেখা মাত্রই বাড়ির বাকি সদস্যরা একে একে গাড়িতে গিয়ে উঠতে লাগল। চারপাশের এই ব্যস্ততার মাঝেই হুট করে যেন পুরো পৃথিবীর গতি স্তব্ধ হয়ে গেল ফারিশের জন্য। তার হাতের ফোনের স্ক্রিনটা অনাবশ্যকভাবেই সচল রইল, কিন্তু ফারিশের গভীর চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিটা গিয়ে আটকে গেল সামনে।সেদিক থেকে হেঁটে আসছে আরিশা। পরনে তার এক চমৎকার খয়েরি রঙের গাঢ় শাড়ি। কাল রাতের ঝামেলার পর মিসেস ফাতেমা আরিশাকে আর নিজের বাসায় ফিরতেই দেননি। জোর করেই নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলেন এবং আজ নিজের আলমারি থেকে বের করে নিজের পছন্দের এই অপূর্ব খয়েরি শাড়িটা আরিশাকে পরিয়েছেন।হেঁটে আসতে আসতে আরিশার চোখও একসময় গিয়ে থমকে গেল ফারিশের ওপর। লোকটাকে আজও বরাবরের মতোই অসম্ভব, তীব্র রকমের সুন্দর লাগছে। আরিশার বুকটাও ক্ষণিকের জন্য কেঁপে উঠল। তবে সেই মুগ্ধতা পরক্ষণেই আড়াল করে নিল সে। আজ ফারিশের মুখ থেকে নিজের প্রশংসা শুনতেই হবে—এই প্রতিজ্ঞা নিয়ে আরিশা এগিয়ে গেল ফারিশের দিকে। তার একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শাড়ির আঁচলটা আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে, চোখের পলক দ্রুত ফেলে এক অদ্ভুত মিষ্টি ঢং করা শুরু করল সে। কখনও এদিক ওদিক তাকাচ্ছে, কখনও শাড়ির কুঁচি ঠিক করার বাহানা করছে, যেন সে ফারিশকে বাধ্য করছে তাকে দেখতে।ফারিশ এতক্ষণ ধরে অপলক, মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে ছিল আরিশার দিকে। মেয়েটার এই চঞ্চলতা, এই ঢং তার খুব ভালোই লাগে। আরিশার দিকে তাকিয়ে ফারিশের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে ওঠে, আর সে নিজের মনের গহীনে অত্যন্ত আকুল হয়ে বলে উঠল—

" অসম্ভব সুন্দর লাগছে, অসম্ভব!! কিন্তু মরে গেলেও তা স্বীকার করবো না। যাস্ট অসাধারণ!! "

তবে পরক্ষণেই ফারিশ নিজেকে সামলে নিল
গম্ভীর হয়ে সে ফোনের স্ক্রিনটা লক করে পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে ধীর ও নিচু গলায় বলল,

 "ঢংটা শেষ হলে এবার দয়া করে গাড়িতে উঠুন । যত্তসব পাগলামি!! "

ব্যাস, আরিশার মাথাটা এবার এক্কেবারে গরম হয়ে গেল! এত কষ্ট করে শাড়ি পরে ঢং করা, আর এই লোকটার মুখে প্রশংসা তো দূরের কথা, উল্টো খোঁচা? রাগে মুখ লাল করে আরিশা আর এক মুহূর্তও ভাবল না; ধপাধপ করে ফারিশের চওড়া কাঁধ লক্ষ্য করে কয়েকটা  কিল বসিয়ে দিল। ফারিশ স্বাভাবিক ভাবেই দাঁড়িয়ে রইল যেন কিছুই হলো না, কিন্তু আরিশা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে হনহন করে গিয়ে গাড়ির পেছনের সিটে ধপাস করে বসে পড়ল।ঠিক তখনই আয়ান বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে বলল,

 "ফারিশ, তুই ড্রাইভ কর, আমি পেছনে বসছি!!"

কথাটা বলেই আয়ান যখন আরিশার পাশের খালি জায়গাটাতে বসতে যাবে, ঠিক তখনই ঘটল অঘটন। ফারিশ দ্রুত গতিতে এগিয়ে এসে পেছন থেকে আয়ানের কোটের কলারটা খপ করে ধরে নিজের দিকে টেনে এক কর্কশ ধমক দিয়ে উঠল,

 "মানে কী, হ্যাঁ?! ফাজলামি পেয়েছিস?!"

আয়ান ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। সে নিজের কলারটা ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে করে বলল,

 "আরে! আবার কী হলো তোর? সেকেন্ডে সেকেন্ডে শুধু রাগ ওঠে! আঙ্কেল তো সামনে বসছে, তো আমি কোথায় বসব শুনি?!"

ফারিশ আয়ানের কোনো অজুহাত শুনল না। সে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আয়ানকে একপাশে সরিয়ে দিয়ে নিজে আরিশার ঠিক পাশের সিটটাতে গিয়ে জাঁকিয়ে বসল। তারপর জানালার কাচ দিয়ে বাইরে তাকিয়ে অত্যন্ত শীতল কিন্তু ভারী গলায় বলল, 

"তুই ড্রাইভ কর!!"

"কী?!" 

 আয়ান প্রতিবাদ করতে গিয়েও ফারিশের সেই চোখ-মুখের তপ্ত আর গরম চাউনি দেখেই চুপ হয়ে গেল। সে আর কথা বাড়ানোর সাহস পেল না; তাড়াহুড়ো করে গিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসে পড়ল।গাড়ি স্টার্ট দিতেই চলতে শুরু করল। আরিশা তখনো অভিমানে গাল ফুলিয়ে ফারিশের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিজের ফোনের স্ক্রিনে মগ্ন হওয়ার ভান করছে। অপরদিকে, সামনের লুকিং মিররে ফারিশের চোখ। সে একদৃষ্টিতে মিররের দিকে তাকিয়ে আছে এবং আরিশার ওই রাগী রাগী মুখটা দেখে তার ঠোঁটের কোণে এতক্ষণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠেছে।গাড়ির পেছনের সিটের এই নীরব প্রেমের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধটা সামনের সিটে বসা মি. নাসিরের চোখ এড়াতে পারল না। তিনি লুকিং মিররে নিজের ছেলের ওই বোকা প্রেমে পড়ার চাউনিটা খুব ভালো করেই লক্ষ্য করলেন।মি নাসিরের ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় হাসি খেলা করে গেল। তিনি বেশ আয়েশ করে গাড়ির সিটে পিঠ ঠেকিয়ে, মৃদু গুঞ্জন তুলে গানের সুরে বলে উঠলেন—

"তুমি বন্ধু আছাড় খেয়ে প্রেমে পড়েছ...
আর আমি বন্ধু বললেই তখন হয়ে যাবে যত দোষ!!"

মি. নাসিরের এই আকস্মিক গানের সুরে গাড়ির বাকি সদস্যরা কেউই কিছু বুঝতে পারল না। তারা সবাই যে যার মতো বোকা বনে রইল।
পরস্পর কোনো কথা না হলেও, যাকে উদ্দেশ্য করে এই মোক্ষম তীরটি ছোঁড়া হয়েছে, সে কিন্তু ঠিকই বুঝেছে। ফারিশ লুকিং মিরর থেকে চোখ সরিয়ে অত্যন্ত ক্ষিপ্ত আর রেগে নিজের বাবার দিকে তাকাল। মি. নাসির তখনো দাঁত বের করে সামনের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসছেন। 

_______

"ওওও দরদ-এ-দরদ দে মেঁ টুকুড়ে মঙ্গদা,
 ওতে মঙ্গকে করদা..."

গানের সেই চড়া সুর আর চিৎকার মেশানো তালে আরিশা তখন এতটাই মগ্ন যে, তার নিজের হাত-পায়ের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণই ছিল না। গিটারে স্ট্রাম করার মতো করে সে তার হাতের  চামচটা বাতাসে দোলাচ্ছিল। আর ঠিক তখনই, সুরের এক চরম মুহূর্তে চোখ বন্ধ করে তান দিতে গিয়ে আরিশা তার হাতের ভারী চামচটা দিয়ে পাশে বসা বেচারা আয়ানের নাকে সপাটে এক বাড়ি বসিয়ে দিল!

"আউচ!" 

আয়ান নিজের নাকটা চেপে ধরে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠল।অপরদিকে, এতক্ষণ ধরে আরিশার গান শোনার জন্য মি. নাসির যেখানে সবচেয়ে বেশি লাফালাফি করছিলেন, অনবরত আবদার করছিলেন—তিনি এখন বাকিদের মতো ভয়ে একেবারে সিট ছেড়ে এক লাফে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ড্রয়িংরুমের  বাকি সবাইও তখন ভয়ে বুক চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে, যেন কোনো ভয়ানক বোমাবাজি থেকে এইমাত্র তারা অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরল।আরিশা গান থামিয়ে চোখ খুলল। চামচটা হাতে নিয়ে সবার এমন আতঙ্কিত মুখভঙ্গি দেখে সে বেশ অবাক হয়ে বলল, 

"কী ব্যাপার?! তোমরা সবাই এভাবে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছ কেন? গানটা কি সুন্দর হয়নি?!"

ইনায়ার বাবা নিজের বুক থেকে হাতটা নামিয়ে, ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বললেন,

 "না... মানে... গান এতই সুন্দর আর প্রভাবশালী হয়েছে যে, আমাদের পা আপনাআপনি সোজা হয়ে গেছে মা! বসে থাকার সাহস পাচ্ছিলাম না।"

মি. দিদার এতক্ষণ ধরে এক কোণে দাঁড়িয়ে কপালে হাত দিয়ে ছিলেন। এবার তিনি জামার হাতা গুটিয়ে সামনে এগিয়ে এলেন এবং মি. নাসিরের দিকে তাকিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন,

 "এই জন্য! ঠিক এই জন্যই আমি মানা করেছিলাম! নাহ, নাসিরের আজ আমার মেয়ের লাইভ কনসার্ট শুনতেই হবে। কবে কোন ছোটবেলায় একটু সুন্দর করে গুনগুন করে গেয়েছিল, তাতেই উনি গায়ক আবিষ্কার করে ফেললেন! আরে, ওকে তো আর আমি এমনি এমনি ডাক্তারি পড়াচ্ছি না। ও..."

মি. দিদারের কথার মাঝপথেই মি. নাসির এবার হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন। তিনি খোঁচা মেরে বললেন,

 "হ হ দিদার, তুই কেন ওরে ডাক্তারি পড়াচ্ছিস, সেই আসল রহস্য আমার খুব ভালো করেই জানা আছে!"

"কেন?!" 

 সবাই এবার ভীষণ কৌতূহলী হয়ে একসাথে সমস্বরে জিজ্ঞাসা করে উঠল। মি. দিদার এবার সবার উৎসুক চাউনি দেখে একটু গলা ঝেড়ে, বেশ একটা গাম্ভীর্য আর ভাব ধরে সোজা হয়ে বসলেন। তারপর বললেন,

 "আরে ভাই, ঘটনা হলো—একবার নাহার হঠাৎ করে বেশ বড়সড় অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখন তার চিকিৎসা করাতে গিয়ে আমার পকেট থেকে এক্কেবারে বেশ ভালো অঙ্কের টাকা খসে যায়! টাকা দেওয়ার সময় বুকটা আমার হু হু করে উঠেছিল। তখনই মনে মনে  সিদ্ধান্ত নিই—মেডিক্যালের খরচ যেভাবেই হোক ফ্যামিলির ভেতরেই রাখতে হবে! মেয়েকে কষ্ট করে হলেও ডাক্তার বানাব। নিজের চিকিৎসা তো বটেই, এটলিস্ট ভবিষ্যতের লাখ লাখ টাকার চিকিৎসা খরচ তো বাঁচবে!"

কথাটা শেষ হতেই পুরো ড্রয়িংরুমে এক অদ্ভুত পিনপতন নীরবতা নেমে এল। সবাই একেবারে হাঁ করে মি. দিদারের দিকে তাকিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে রইল। 
 "হায়রে কিপ্টা!"

সবাই একত্রে কথাটা বলে উঠে। এরই মাঝে ইনায়া এবার একটু লাজুক  ভঙ্গিতে সবার উদ্দেশ্যে বলল,

 "আঙ্কেল, এনগেজমেন্টের মূল পর্ব তো হয়েই গেল। এবার আপনারা কিছু মনে না করলে... আমি কি আয়ানের সাথে একটু আড়ালে, একা কথা বলতে পারি?"

কথাটা শুনেই এতক্ষণ ধরে নাক ডলে লাল করে রাখা আয়ানের বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে উঠল। তার মনে চরম এক সন্দেহ দানা বাঁধল। ইনায়ার চোখের কোণের ওই রহস্যময় চাউনি দেখে তার সুবিধার লাগলো না।আয়ান পেছনে পা বাড়িয়ে পালানোর চেষ্টা করতে চাইল, 

"না মানে... এখন একা কথা বলার কী দরকার..."

কিন্তু তার কথা শেষ করার সুযোগই কেউ দিল না। আরিশা আর বাকিরা মিলে একপ্রকার জোর করেই, পিঠে হাত দিয়ে ঠেলে ধাক্কাতে ধাক্কাতে বেচারা আয়ানকে ইনায়ার সাথে পাশের রুমের দিকে পাঠিয়ে দিল। ফারিশ শুধু আড়াল থেকে  ভাইয়ের এই বলির পাঁঠা হওয়ার দৃশ্যটা দেখে ঠোঁট টিপে একটু হাসল, আর তার চোখ আবারও গিয়ে থমকাল চামচ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই খয়েরি শাড়ি পরা মায়াবিনীর ওপর।

( ইনায়া আয়ানকে একা কেন ডাকলো?? ??)