Thread Rating:
  • 0 Vote(s) - 0 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5

লাভ এন্ড লাস্ট ইন ঢাকা (লেখক: কাদের সাইমুন)
#11

(খ)

ঢাকা ডিবেট ফেস্ট আসছে। নর্থ সাউথ ডিবেট ক্লাব থেকে দুইটা টিম যাবে।  প্রথম টিম আগেই ফাইনাল হয়ে গেছে। তিনজন সিনিয়র। রাফিয়া হাসান, তানভীর আহমেদ আর সাদমান চৌধুরী। রাফিয়া ক্লাবের অন্যতম সেরা স্পিকার। লজিক্যাল স্ট্রাকচার আর রিবাটালে তার হাত পরিষ্কার। তানভীর স্টাইলিশ স্পিকার, কন্ট্রোলড অ্যাগ্রেশন নিয়ে কথা বলে। সাদমান নীরব কিন্তু মারাত্মক। কেস ফ্রেমিংয়ে তার দক্ষতা অন্য লেভেলের। তিনজনে মিলে গত দুই বছরে কয়েকটা বড় টুর্নামেন্ট জিতেছে। ক্লাবে সবাই জানে, প্রথম টিম মানেই প্রায় নিশ্চিত কোয়ালিফিকেশন। তাদের নিয়ে কারো কোনো দ্বিধা নেই।

দ্বিতীয় টিমের দুইজন আগেই ঠিক হয়ে গেছে। বুশরা এবং মাহিকা। মাহিকা বুশরার এক বছরের সিনিয়র। দুজনের আন্ডারস্ট্যান্ডিং ভালো। কথা কম বলে, কিন্তু একে অপরের পয়েন্ট ধরতে পারে। বুশরা কেস বিল্ড করে, মাহিকা রিবাটালে ধারালো থাকে। তৃতীয় সদস্য নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

কমিটি মিটিংয়ে নামগুলো উঠল। কয়েকজনের নাম আলোচনা হচ্ছিল। হঠাৎ নোমানের নামও উঠল। বুশরা একটু অবাক হয়ে তাকাল। নোমান ক্লাবে আসে ঠিকই। ছোটখাটো প্র্যাকটিস রাউন্ডে মাঝে মাঝে কথা বলে। কিন্তু বড় কোনো ম্যাচে তাকে সে দেখেনি। ডিবেটার হিসেবে তার কোনো পরিচিতিও নেই বুশরার চোখে। ছেলেটা ক্লাবে এসে পা তুলে বসে, ফোন দেখে, হালকা কথা বলে। দায়িত্বকে কখনো সিরিয়াসলি নেয় বলে মনে হয় না। এমন মানুষের নাম ক্যান্ডিডেট হিসেবে উঠতে দেখে বুশরার ভ্রূ কুঁচকে গেল।

সিনিয়রদের মধ্যে একজন, আরিয়ান, বলল, 
“নোমান ভালো করে। ওর চান্স আছে।”

বুশরা কিছু বলল না। মনে মনে বিরক্ত হলো। নোমান আর তার এক টিমে—এই চিন্তাটাই অস্বস্তিকর। ছেলেটা ক্লাবে এসে এমনভাবে আচরণ করে যেন সবকিছু হালকা। এমন মানুষকে নিয়ে বড় প্রতিযোগিতায় যাওয়াটা ঠিক মনে হচ্ছিল না। সে চেয়েছিল তৃতীয় সদস্য হিসেবে কেউ একজন সিরিয়াস, পরিচিত ডিবেটার আসুক। নোমান নয়।

শেষে সিদ্ধান্ত হলো, একটা বাছাই ডিবেট হবে। দশজন ক্যান্ডিডেট। একই টপিকের পক্ষে-বিপক্ষে পাঁচ মিনিট করে কথা বলবে। সিলেকশন কমিটি ভোট দিয়ে তৃতীয় সদস্য ঠিক করবে।

টপিক ঠিক হলো: 
**“This House believes that social media has done more harm than good to modern relationships.”**

---

বাছাই রাউন্ডের দিন ক্লাব রুম ভরে গিয়েছিল। সামনে স্পিকারদের জন্য জায়গা, পেছনে দর্শক। বুশরা আর মাহিকা পেছনের সারিতে বসল। খাতা খুলে রাখল। কথা কম। শুধু পর্যবেক্ষণ।

প্রথম কয়েকজন ক্যান্ডিডেট কথা বলল। একজন খুব জোরে জোরে পয়েন্ট দিল, কিন্তু স্ট্রাকচার ছিল না। আবেগ দিয়ে ভরিয়ে রাখার চেষ্টা করছিল। আরেকজন খুব সাবধানে কথা বলল, প্রতিটা শব্দ মাপজোখ করে, কিন্তু কোনো ধার ছিল না। তৃতীয়জন উদাহরণ দিতে গিয়ে গুলিয়ে ফেলল। চতুর্থজন ভালো শুরু করল, কিন্তু মাঝপথে পয়েন্ট হারিয়ে ফেলল।

মাহিকা আস্তে বলল, 
“দ্বিতীয়জনের কেস পরিষ্কার ছিল। কিন্তু অ্যাটাক নেই। শুধু ডিফেন্ড করছে।”

বুশরা মাথা নাড়ল। 
“প্রথমজন শুধু আবেগ দিয়েছে। লজিক কম। তৃতীয়জন উদাহরণে ডুবে গেছে।”

এভাবে একটার পর একটা স্পিচ চলতে থাকল। বুশরা মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। কে কী পয়েন্ট দিচ্ছে, কোথায় দুর্বলতা, কোথায় ওভারকনফিডেন্ট সব নোট করছিল। মাহিকাও মাঝে মাঝে মন্তব্য করছিল। দুজনেই প্রায় একমত হচ্ছিল বেশিরভাগ স্পিকার নিয়ে। কেউ কেউ ভালো বলছিল, কিন্তু ফেস্ট লেভেলের জন্য যথেষ্ট নয় বলে মনে হচ্ছিল।

শেষের দিকে নোমান উঠল। বুশরা সোজা হয়ে বসল। মনে মনে একটা প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল—ছেলেটা হালকা কথা বলবে, হাসবে, কোনো গভীর পয়েন্ট দিতে পারবে না। ক্লাবে সে যেমন আচরণ করে, স্পিচেও তেমনই হবে। নোমান মাইকের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কোনো কাগজ নেই। হাত পকেটে। একটু চুপ করে থেকে শুরু করল। গলাটা স্থির। কোনো তাড়াহুড়ো নেই। সে বলল, সোশ্যাল মিডিয়া সম্পর্ককে ধ্বংস করেনি। সম্পর্কের ভিতরের অসততাকে শুধু দৃশ্যমান করেছে। আগে মানুষ লুকিয়ে রাখত। এখন লুকানোর জায়গা কমেছে। এটা ক্ষতি না, উন্মোচন। সে কয়েকটা উদাহরণ দিল—পুরনো সম্পর্কের ভণ্ডামি, নতুন সম্পর্কের স্বচ্ছতা, অতিরিক্ত এক্সপোজারের ভয়। লজিকাল কানেকশন পরিষ্কার রাখল। রিবাটালে আগের কয়েকজনের পয়েন্ট তুলে এনে ভেঙে দিল। শেষের দিকে বলল, আমরা সোশ্যাল মিডিয়াকে দোষ দিই কারণ নিজেদের দুর্বলতাকে স্বীকার করতে চাই না। সম্পর্কের ব্যর্থতার দায় অন্যের ওপর চাপানো সহজ।

স্পিচ শেষে ঘরে একটু নীরবতা রইল। কয়েকজন মাথা নাড়ল।

মাহিকা আস্তে বলল, 
“ভালো বলেছে। পয়েন্টগুলো পরিষ্কার। আর কনফিডেন্স আছে। গলার টোনও কন্ট্রোলড।”

বুশরা কিছু বলল না। খাতায় কলম ঘষছিল। মনে মনে খুঁত ধরতে চাইছিল। স্ট্রাকচার একটু লুজ ছিল হয়তো। উদাহরণ আরও মজবুত হতে পারত। শেষের লাইনটা একটু বেশি ড্রামাটিক মনে হয়েছে। কিন্তু যুক্তিগুলো দুর্বল ছিল না। এটা সে অস্বীকার করতে পারল না। ছেলেটা যেভাবে আগের স্পিকারদের পয়েন্ট তুলে ভেঙেছে, সেটা সহজ কাজ না।

মাহিকা আবার বলল, 
“আমার মনে হয় ও ভালো ডিবেটার। আর একটু প্র্যাকটিস করলে ফেস্টের জন্য রেডি হয়ে যাবে। ওর মধ্যে একটা ন্যাচারাল ফ্লো আছে।”

বুশরা মাথা নাড়ল শুধু। মনে মনে বলল, কীভাবে সম্ভব? এতদিন তো দেখিনি। ছেলেটা ক্লাবে এসে এমন করে কথা বলে যেন সবকিছু হালকা। অথচ আজকের স্পিচে হালকা কিছু ছিল না। কোনো অতিরিক্ত হাসি ছিল না। কোনো অপ্রয়োজনীয় কথা ছিল না। শুধু পয়েন্ট। পরিষ্কার পয়েন্ট। 

এই দ্বন্দ্বটা তার ভেতর চাপ সৃষ্টি করছিল। সে নোমানকে একটা ফ্রেমে ফেলে রেখেছিল হালকা, দায়িত্বহীন, সিরিয়াস নয়। আজকের স্পিচ সেই ফ্রেমটা কেঁপে দিয়েছে।

---

রেজাল্ট ঘোষণা হলো সন্ধ্যায়। নোমান নির্বাচিত। 

বুশরা খবরটা শুনে চুপ করে থাকল। ভেতরে একটা অস্বস্তি চাপছিল। সে সিদ্ধান্ত নিল ক্লাব প্রেসিডেন্টের সাথে আলাদা করে কথা বলবে। আয়ানকে সে সম্মান করে। আয়ানের কথাবার্তায় একটা পরিপক্কতা আছে। তিনি কখনো হালকা করে কিছু বলেন না। তাই তার কাছে গিয়ে নিজের আপত্তিটা রাখাটাই যৌক্তিক মনে হলো।

প্রেসিডেন্টের অফিস রুমে গিয়ে দাঁড়াল বুশরা। আয়ান ল্যাপটপ দেখছিলেন। মাথা তুলে তাকালেন।

“বলো বুশরা।”

বুশরা সোজাসুজি বলল, 
“স্যার, নোমানকে নেওয়াটা ঠিক হয়নি মনে হচ্ছে। ঢাকা ডিবেট ফেস্ট ছোট প্রতিযোগিতা না। এখানে দেশের সেরা টিমগুলো আসে। নোমান ক্লাবে তেমন ডিবেট করেনি। বড় মঞ্চে ভড়কে যেতে পারে। আমরা টিম হিসেবে দুর্বল হয়ে যাব।”

আয়ান চেয়ার ছেড়ে একটু হেলান দিয়ে বসলেন। চশমাটা সরিয়ে রাখলেন। 
“তুমি ওকে কম চেনো।”

বুশরা চুপ করে থাকল। আয়ানের গলায় কোনো বিরক্তি ছিল না। শুধু একটা শান্ত নিশ্চয়তা।

আয়ান বললেন, 
“নোমানকে আমি আগে থেকে চিনি। কলেজে ও খুব ভালো ডিবেটার ছিল। কলেজে এসে আরও ধারালো হয়। ঢাকার অনেক টপ ডিবেটারকে ও কলেজ-কলেজ লেভেলে ফেস করেছে। কয়েকজন তো এখন ইউনিভার্সিটি লেভেলেও নামকরা। ওদের কেউ কেউ এখনো বলে, নোমানকে আর্গুমেন্ট দিয়ে চাপানো মুশকিল ছিল। ওর একটা অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল—পরিস্থিতি যত খারাপ হোক, গলার টোন কখনো ভাঙত না।”

বুশরা অবাক হয়ে তাকাল। আয়ান আবার বললেন, 
“একবার আন্তঃকলেজ ফেস্টে ওর টিম ফাইনালে উঠেছিল। ও পজিশন থ্রি ছিল। শেষ স্পিচে পুরো কেসটা উল্টে দিয়েছিল। জজরা পরে বলেছিল, ওই স্পিচ না হলে ম্যাচটা অন্যভাবে যেত। আরেকবার একটা টিম ওকে টার্গেট করে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেছিল। নোমান হাসিয়ে উড়িয়ে দিয়ে শুধু লজিকে ফিরে গিয়েছিল। রেগে যায়নি। ওর ওই কন্ট্রোলটাই ওর শক্তি। অনেকেই ভালো কথা বলে। কিন্তু চাপের মুখে শান্ত থাকাটা আলাদা ব্যাপার।”

আয়ান একটু থেমে বললেন, 
“ক্লাবে ও কম করে কারণ ও চায় না। না পারার জন্য না। তুমি ওকে শুধু ক্লাবের হালকা ভার্সন দেখেছ। আসলটা অন্য। ও যখন সিরিয়াস হয়, তখন অন্য মানুষ হয়ে যায়।”

বুশরা দাঁড়িয়ে শুনছিল। কথাগুলো তার মাথায় ঘুরছিল। আয়ানকে সে বিশ্বাস করে। আয়ান কখনো অতিরঞ্জন করেন না। তাই নোমানের এই পুরনো পরিচয়টা তার কাছে অবিশ্বাস্য লাগছিল। যে ছেলেটা ক্লাবে পা তুলে বসে, দায়িত্বকে হালকা করে, সেই ছেলেটা একসময় এতটা সিরিয়াস ডিবেটার ছিল—এই চিন্তাটা মানতে কষ্ট হচ্ছিল। আয়ানের মুখে নোমানের প্রশংসা শোনাটা আরও অদ্ভুত লাগছিল। কারণ আয়ান খুব কম মানুষের প্রশংসা করেন।

আয়ান শেষে বললেন, 
“তুমি ওর সাথে টিম করবে। সুযোগ দাও। দেখো। আমি ভুল করছি না।”

বুশরা শুধু মাথা নাড়ল। আর কিছু বলল না। রুম থেকে বেরিয়ে করিডোরে এসে দাঁড়াল। জানালা দিয়ে বাইরের আলো পড়ছিল। মনে মনে একটাই কথা ঘুরছিল—

ছেলেটা আসলে কী?

যতবার সে নোমানকে একটা ফ্রেমে ফেলতে চেয়েছে, ততবার ফ্রেমটা ভেঙে গেছে। আজকের দিনে আরও একবার ভাঙল। প্রথমে ক্লাব ডে-তে, তারপর আজকের স্পিচে, এখন আয়ানের মুখে। 

বুশরা স্কার্ফ ঠিক করল। ব্যাগ কাঁধে নিল। হাঁটতে শুরু করল। 
মনে মনে বিস্ময়টা চেপে রাখল। কিন্তু বিস্ময়টা থেকে গেল। একটা অস্বস্তিকর, অস্বীকার করা যায় না এমন বিস্ময়।
Reply
#12

(গ)

আবিদের মনে সেদিনের আড্ডাটা বারবার ফিরে আসছিল। নোমানের কথাগুলো। শরীর ছাড়া প্রেম অসম্পূর্ণ। নারীদেহ মানুষকে উন্মত্ত করে। পালপিটেশন মানে শরীরের অতৃপ্ত ক্ষুধা।
প্রথমে আবিদ রেগে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল নোমান সবকিছুকে শরীরের নিচে নামিয়ে আনছে। প্রেমকে সস্তা করে দিচ্ছে। ভালোবাসাকে শুধু একটা শারীরিক প্রতিক্রিয়া বানিয়ে ফেলছে। সে রাতে ঘরে ফিরেও বিরক্ত ছিল। মনে মনে নোমানকে অনেক কথা বলেছিল। কিন্তু রাত গভীর হলে, একা থাকলে, কথাগুলো অন্যভাবে বাজতে শুরু করল।
নোমান কি পুরোপুরি ভুল?
আবিদ নিজেকে প্রশ্ন করল। সে যৌনতাকে তুচ্ছ করে দেখিয়েছে তর্কের সময়। বলেছে তাদের সম্পর্কে কাম নেই, শুধু ভালোবাসা আছে। কথাটা সত্যি। সে বিশ্বাস করে। কিন্তু যৌনতা কি আসলেই তুচ্ছ? সন্তান উৎপাদনের মাধ্যম ছাড়া আর কিছু না? নাকি মন আর শরীরকে এক করার আরেকটা উপায়?
সে ভাবল, মানুষ শুধু মন দিয়ে বাঁচে না। শরীরও আছে। শরীরের চাহিদাও আছে। সেই চাহিদাকে অস্বীকার করলে কি নিজের একটা অংশকেই অস্বীকার করা হয়? নোমান এটাই বলেছিল। যুক্তিটা সহজ। অস্বীকার করা কঠিন। শরীরকে বাদ দিয়ে যদি কেউ নিজেকে সম্পূর্ণ ভাবে, তাহলে সে নিজেরই অর্ধেককে অস্বীকার করে।
আবার অন্যদিকে ভাবল, সবকিছু যদি শরীর দিয়ে মাপা হয়, তাহলে ভালোবাসা আর কামের মধ্যে পার্থক্য থাকে কী? তাহলে তো পশু আর মানুষ এক হয়ে যায়। সে এটা মানতে রাজি না। তার গার্লফ্রেন্ডের সাথে যে শান্তি সে পায়, যে নিরাপত্তা অনুভব করে, যে পরিপূর্ণতা অনুভব করেসে টা শুধু শরীরের অতৃপ্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। সে যখন তার কাছে বসে, তখন শরীরের কোনো ক্ষুধা মনে আসে না। শুধু একটা গভীর শান্তি আসে। এটা কি মিথ্যা হতে পারে?
তবুও নোমানের কথাগুলো মাথা থেকে যাচ্ছিল না। রাতের পর রাত সে দুই পাশের যুক্তিগুলো সাজাচ্ছিল। একবার নোমানের পক্ষে, একবার নিজের পক্ষে। কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারছিল না। শুধু বিভ্রান্ত হচ্ছিল।
আবিদ ভাবল, বুশরা কি তাদের সম্পর্কের বর্তমান অবস্থায় সত্যিই খুশি? সে নিজে খুশি। কিন্তু বুশরা? মেয়েটা কখনো অভিযোগ করে না। কখনো চাহিদা প্রকাশ করে না। সবসময় শান্ত। সবসময় সন্তুষ্ট। এটা কি স্বাভাবিক? নাকি সেও অনেক কিছু চেপে রাখে? মেয়েরা কি সবসময় সব কথা বলে? নাকি অনেক কিছু ভেতরে পুষে রাখে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তার কাছে নেই। আলোচনা করার মতোও কেউ নেই। সাজিদকে বলা যাবে না। নোমানকে তো আরও না। একমাত্র বুশরা। তাই সে ঠিক করল, পরে যখন দেখা হবে, তখন আস্তে করে এই বিষয়টা তুলবে। সরাসরি না। একটু ঘুরিয়ে। কিন্তু তুলবেই। না তুললে মনের ভেতরের এই দ্বন্দ্ব আরও বাড়বে।

দুদিন পর তাদের দেখা হলো। ক্যাম্পাসের বাইরে একটা শান্ত ক্যাফেতে। বিকেলের দিক। লোকজন কম। জানালার পাশে একটা টেবিল। বাইরে গাছের পাতা নড়ছিল হালকা বাতাসে। আবিদ এসেছিল একটু আগে। বুশরা এসে বসল। স্কার্ফ ঠিক করে নিল। হালকা হাসি দিয়ে আবিদের দিকে তাকাল।
কথা শুরু হলো সাধারণ বিষয় নিয়ে। ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, পরিবার, আগামী মিডটার্ম। আবিদ মাঝে মাঝে চুপ করে যাচ্ছিল। চায়ের কাপ ঘোরাচ্ছিল আঙুলে। চোখ তুলে তাকাচ্ছিল, আবার নামিয়ে ফেলছিল। বুশরা লক্ষ করল।
“কী হয়েছে?” বুশরা জিজ্ঞেস করল। গলায় একটু উদ্বেগ। “এত চুপচাপ কেন? কিছু বলার আছে নাকি?”
আবিদ মুখ তুলল। একটু ইতস্তত করল। গলা পরিষ্কার করল।


“না... মানে... একটা কথা ছিল। কিন্তু... জানি না কীভাবে বলব।”
“বলো। ইতস্তত কোরো না। মনের কথা বলো। আমি আছি তো।”
আবিদ গলা পরিষ্কার করল আবার। চোখ নামিয়ে রাখল। কাপের দিকে তাকিয়ে বলল,


“তুমি... তুমি আমাদের সম্পর্ক নিয়ে খুশি তো?”
বুশরা একটু অবাক হয়ে তাকাল। যেন আকাশ থেকে পড়ল। চোখ বড় হয়ে গেল এক মুহূর্তের জন্য।


“কী? হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন? আমি কিছু ভুল করেছি নাকি?”
আবিদের কান গরম হয়ে গেল। গলা শুকিয়ে আসছিল। সে জানত সত্যি কথা বলতে পারবে না। নোমান আর সাজিদের সাথে আড্ডার কথা বললে বুশরা অস্বস্তিতে পড়বে। হয়তো রেগেও যাবে। তাই বানিয়ে বলল,


“না... তুমি কিছু করোনি। একটা পডকাস্ট দেখছিলাম। সেখানে বলা হচ্ছিল... যৌনতা প্রেমের একটা বড় অংশ। ছাড়া সম্পর্ক অসম্পূর্ণ থাকে। অনেক সম্পর্ক এই কারণে দুর্বল হয়ে যায়। আমাদের... আমাদের তো এটা নেই। তাই ভাবলাম... তুমি কি এই কারণে অসন্তুষ্ট? কোনো অভাব বোধ করো? কিছু মনে মনে চাও কিন্তু বলো না?”
বুশরা শুনে মুখ লাল হয়ে গেল। চোখ নামিয়ে ফেলল। কানের কাছ পর্যন্ত রক্ত উঠে গেল। এই প্রথম আবিদের মুখ থেকে এমন কথা শুনছে। অস্বস্তি চাপল সারা শরীরে। গলা শুকিয়ে গেল। সে কী উত্তর দেবে বুঝতে পারছিল না। আবিদ তার লজ্জা দেখে আরও বিব্রত হলো। হাত দিয়ে মাথা চুলকে বলল,


“স্যরি... স্যরি। আমি এমন কথা তোলার কথা ছিল না। তুমি অস্বস্তিতে পড়লে। আমি বোকামি করেছি।”
বুশরা মাথা নাড়ল। গলা নামিয়ে বলল, খুব আস্তে,


“না... না। আমি... আমি আমাদের সম্পর্কে খুব খুশি। সত্যি। কোনো অভাব নেই। তুমি এসব কেন ভাবছ?”
আবিদ তাকিয়ে রইল। পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারল না। বুশরা কনজারভেটিভ। সে জানে। এমন কি হতে পারে যে সে নিজের ভেতরের কোনো ইচ্ছা লুকিয়ে রাখছে? তাই শিওর হতে চাইল। নোমানের যুক্তিগুলোকে পডকাস্টের নামে সাজিয়ে বলল। গলা একটু কাঁপছিল।
“পডকাস্টে আরও বলছিল... শরীর আমাদের অস্তিত্বের অংশ। তাকে বাদ দিয়ে ভালোবাসা অসম্পূর্ণ। শরীরের চাহিদা থাকলে সেটা অস্বীকার করা ঠিক না। মানুষ নিজের একটা অংশকে দমিয়ে রাখে। পরে সেটা সমস্যা তৈরি করে। তোমার কী মনে হয়? এসব কথা কি একেবারে ভুল?”
বুশরা একটু চুপ করে থাকল। আঙুল দিয়ে স্কার্ফের কিনার মুচড়ে ধরছিল। তারপর আস্তে বলল,


“আমি... আমি খুশি। আমাদের যা আছে, তাতেই। যৌনতা... সেটা বিয়ের পর আসবে। তখন হবে। এখন দরকার নেই। এখন আমাদের যেটা আছে, সেটাই যথেষ্ট। আমি এতেই শান্তি পাই।”
কথাটা বলে সে আর চোখ তুলল না। আবিদও চুপ করে গেল। আর বেশি কথা হলো না সেদিন। দুজনেই অস্বস্তিতে চা খাচ্ছিল। মাঝে মাঝে চোখ পড়ছিল একে অপরের দিকে, তারপর সরে যাচ্ছিল। আবিদ মনে মনে ভাবছিল বুশরা সত্যিই খুশি, নাকি শুধু বলে যাচ্ছে? তার গলার স্বর তো একটু কাঁপছিল। বুশরা মনে মনে ভাবছিল আবিদ হঠাৎ এমন কথা তুলল কেন? তার কি সত্যিই এসব ভাবনা আছে? নাকি সত্যিই কোনো পডকাস্ট দেখেছে?
ক্যাফে থেকে বেরোনোর সময় দুজনেই যার যার ভিতরে চিন্তায় মগ্ন ছিল। ওদের সম্পর্কের ভিতর নতুন এক প্রশ্ন হাজির হয়েছে যার উত্তর দুইজনের অজানা।

রাতে বাসায় ফিরে আবিদ বিছানায় শুয়ে তাকিয়ে রইল ছাদের দিকে। ফ্যানের শব্দ শুনছিল। বুশরার কথাগুলো ঘুরছিল মাথায়। সে যৌনতাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেয়নি। বলেছে বিয়ের পর হবে। তার মানে কি তার মনেও এই চিন্তা আছে? আগ্রহ আছে, কিন্তু কনজারভেটিভভাবে বড় হওয়ার কারণে প্রকাশ করতে পারে না? যদি তাই হয়, তাহলে তার ভেতর একটা চাপা আকাঙ্ক্ষা আছে। সেই আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কের জন্য কতটা ভালো হবে? আবিদের কি উচিত হবে নিজে থেকে এই ব্যাপারে একটু উদ্যোগ নেওয়া? নাকি অপেক্ষা করাই ভালো? যদি সে কিছু করে আর বুশরা প্রস্তুত না থাকে, তাহলে সব নষ্ট হয়ে যেতে পারে। আবার যদি বুশরার সত্যিই চাহিদা থাকে আর সে কিছু না করে, তাহলে বুশরা ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে পারে। মনে মনে একটা টানাপোড়েন তৈরি হলো। সে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারল না। শুধু জানালার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ।
অন্যদিকে বুশরাও রাতে একইভাবে চিন্তা করছিল। বিছানায় শুয়ে স্কার্ফ খুলে রেখেছিল পাশে। আবিদ কেন হঠাৎ এই প্রশ্ন তুলল? সে কি চায় তাদের সম্পর্কে যৌনতা প্রবেশ করুক? কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব? আবিদ যখন কথা বলছিল, তখন মুখ লাল হয়ে গিয়েছিল, তোতলাচ্ছিল। এত লাজুক মানুষ কী করে এমন চাহিদা প্রকাশ করবে? নাকি সে নিজেও খুব লাজুক, কনজারভেটিভ—তাই নিজের ইচ্ছাটা কোনো পডকাস্টের নামে চালিয়ে দিয়েছে? বুশরা বান্ধবীদের আড্ডায় শুনেছে, সিনিয়র মেয়েদের কাছে শুনেছে—ছেলেরা যৌনতায় বেশি আগ্রহী হয়। শান্ত ছেলেরাও এর বাইরে নয়। অনেকেই লুকিয়ে রাখে। আবিদ কি ইঙ্গিত দিয়ে এটাই বোঝাতে চেয়েছে? সে ভালো ছেলে—এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তার মনে এই চিন্তা এসে থাকলে বুশরার কী করা উচিত? সে কি আবিদকে জিজ্ঞেস করবে সরাসরি? নাকি চুপ করে থাকবে? যদি চুপ করে থাকে আর আবিদের সত্যিই এমন চাহিদা থাকে, তাহলে কি সে আবিদকে অতৃপ্ত রাখবে?
বুশরা কোনো উত্তর পেল না। শুধু একটা সংশয় নিয়ে চোখ বুজল। মনে মনে আবিদের লাল মুখটা ভেসে উঠছিল বারবার। আর নোমানের নাম না জানা কোনো পডকাস্টের কথা।
দুজনেই সে রাতে সহজে ঘুমোতে পারেনি।


দুজনেই একই প্রশ্নের ভিন্ন মুখোমুখি হয়েছিল।


কোনো উত্তর পায়নি।
Reply
#13

আপডেট ৬

(ক)

ঢাকা ডিবেট ফেস্টের প্রস্তুতি শুরু হওয়ার পর থেকে বুশরার রুটিনটা একটু বদলে গেছে। আগে সে শুধু নিজের পড়াশোনা আর আবিদের সাথে সময় নিয়ে ব্যস্ত থাকত। এখন তার সপ্তাহের চারদিন ডিবেট প্র্যাকটিসে কাটছে। মাহিকা আর নোমানের সাথে। সাপ্তাহে চার দিন এক ঘন্টা করে। মাঝে মাঝে ডিবেট ক্লাবের অফিসে বসে তিন জন। কোন কোন দিন কোন ফাকা ক্লাস রুমে। একদিন নিচের প্লাজাতেও বসেছিল। প্রস্তুতির সময়টাতে নিজেরা নিজেরা কোন টপিক ঠিক করে আলোচনা করে ঠিক কিভাবে এনালাইসিস করা যায় দ্রুততম সময়ে মূল যুক্তি গুলো।  কিভাবে প্রতিপক্ষের যুক্তি আগে থেকে অনুমান করে সেগুলো কে অকেজো করে দেওয়া যায় নিজেদের বক্তব্যের সময়। প্রতিপক্ষ তাদের যুক্তির বিরুদ্ধে কি কথা বলতে পারে। এইসব প্রাকটিসে কাটছে। সিনিয়র হিসেবে মাহিকা মাঝে মাঝে কিছু টিপস দেয়। মাঝে একদিন এনএসইউর এর অন্য ডিবেট গ্রুপটার সাথে আলোচনা হলো। ঠিক হলো ঢাকা ফেস্টের সাত দিন আগে একটা প্রস্তুতিমূলক ডিবেট হবে দুই গ্রুপের মাঝে যাতে মূল ডিবেটের আগে একটু ওয়ার্ম আপ হয়ে যায়।

ডিবেট প্রাকটিস শুরু হবার প্রথম সপ্তাহটা বুশরার কাছে অস্বস্তিকর লেগেছিল। নোমান এলেই তার শরীর একটু শক্ত হয়ে যায়। নোমানের সাথে তার কখনো সরাসরি কথা হয় নি। ডিবেট ক্লাবের বাইরে বা কোন কমন ক্লাসে হয়তো দুই একটা কথা হয়েছে। লাস্ট একদিন ক্লাসের দরজার কাছে বন্ধুদের নিয়ে জোরে কথা বলছিল দেখে একটা কথা কাটাকাটি হয়েছিল। এইসব কারণে নোমানের সম্পর্কে শুরু থেকে একটা নেগেটিভ ধারণা বুশরার। আবার ক্লাব ফেস্টের সময় নোমানের কাজকর্ম দেখে মনে হয়েছে ছেলেটা কাজ করতে জানে। সব মিলিয়ে বুশরার পর্যবেক্ষণ ছেলেটা খুব সহজে কথা বলে, সহজে হাসে, সহজে রাগ করে না। কিন্তু একটা কেয়ারলেস ব্যাপার আছে ছেলেটার মাঝে। ডিবেট প্রাকটিসে দেখা যাবে কোন দিন দশ মিনিট দেরীতে আসবে আবার যেদিন টাইমমত আসবে সেদিন দশ মিনিট আগে চলে যাবে। কোন দিন পকেটে কলম থাকবে না আবার কোন দিন আলোচনার মাঝে মোবাইল স্ক্রল শুরু করে দিবে। বুশরার চোখে এটা দায়িত্বহীনতার লক্ষণ। অথচ প্র্যাকটিসের সময় নোমান যখন কেস ভাঙে, তখন তার চোখে একটা অন্য মানুষ দেখা যায়। মনোযোগী। ধারালো। বুশরা আরেকটা জিনিস লক্ষ্য করেছে নোমানের ব্যাপারে। মেয়েরা সহজে নোমানের প্রতি আকৃষ্ট হয়। বুশরা স্বীকার করে প্রচলিত নিয়মে নোমান হ্যান্ডসাম। লম্বা। চেহারায় ঠিক চকলেট বয় টাইপ ব্যাপার নেই বরং একটা রাফ লুক আছে। ড্রেসাপে খুব মনযোগ দেয় বুঝা যায়। আবার খেলাধূলায় ভাল। চেহারা, গুড এথলেট এইসব সুপারফেশিয়াল ব্যাপার। আজ আছে কাল নেই। বুশরা মানুষের ভিতরের চরিত্র নিয়ে আগ্রহী বেশি। যদিও নোমান সম্পর্কে খুব বেশি জানে না বুশরা তবে এইটুকু বুঝে এই ধরনের ছেলেদের গার্লফ্রেন্ডের অভাব হয় না। এরা সমাজের প্লেবয়। যারা সম্পর্কে কে ঠুনকো ভাবে। এক সম্পর্ক থেকে অন্য সম্পর্কে প্রজাপতির মত উড়ে বেড়ায় তাদের কে সহ্য করতে পারে না বুশরা। সমাজ, ধর্ম, পরিবার থেকে শেখা মূল্যবোধ তাকে এইসব মানুষ থেকে দূরে থাকতে শিখিয়েছে। তবে মেয়েরা অনেক সময় এই ধরণের ছেলেদের পছন্দ করে। ওর নিজের বান্ধবী আর সাদিয়া আর কাশফিয়া যেমন ফ্যানগার্লের মত আচরণ করে দূর থেকে নোমান কে দেখলে তাতে ওর নিজের লজ্জা লাগে। কাশফিয়া, সাদিয়ার সাথে ওর অনেক মিল। ওদের ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড এক রকম। সাদিয়া হি-জাব করে। কাশফিয়া হি-জাব না করলেও কাপড়ে খুব পরিশীলিত। তারপরেও ওদের এই রকম হ্যাংলামো বুঝে উঠতে পারে না বুশরা। একদিন বুশরা বলেছিল, তোরা কি বুঝিস তোদের মত আর অনেক মেয়ে হয়তো এই ছেলেটা কে চায়? আর এই ছেলেটাকে দেখলেই বুঝা যায় হয়ত এক সাথে চার পাচটা মেয়ে ঘুরাচ্ছে। খেয়াল করে দেখ হাটার সময় যে মেয়ে হাই দিচ্ছে তার সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। একটু কি পার্সনালিটি নেই ছেলেটার? সাদিয়া উত্তর দিল সবাই ওকে চায় দেখে তো আমরা ওকে চাই। বুশরা অবাক হয়ে বলল মানে? সাদিয়া বলল দেখ বাজারে গিয়ে তুই কোন ফোনটা কিনিস? যে ফোনটা আজকাল বেশি চলছে। সবাই যে ফোনটা কিনছে। কারণ তুই কাস্টমার এর স্যাটিশফেকশন থেকে ফোন কোয়ালিটি আন্দাজ করতে পারবি। এই যে নোমান কে দেখে বাকি মেয়েরা ছটফট করে উঠে এটা থেকে বুঝা যায় আমি এমন কিছু একটা পছন্দ করছি যার ভ্যালু আছে। আর অনেকে যেটা চায়। বুশরা বলল এটা কেমন তুলনা হল? মানুষ তো পণ্য না যে অন্য কাস্টমার কি বলল তা দেখে কিনতে হবে। সম্পর্ক তো এমন হওয়া উচিত যেটাতে একদম ফ্রেশ কাউকে পাওয়া যায়। কাশফিয়া এইবার পাশ থেকে বলল ডিয়ার তোমার কথাতে তোমার উত্তর আছে। তুমি বলেছ ফ্রেশ কাউকে দরকার রিলেশনের জন্য। এইবার বল তুমি পণ্যের সাথে তুলনা কর নি? বুশরা বলল কিভাবে? কাশফিয়া বলল কারণ সাদিয়া ফোনের তুলনা দিয়েছে মানুষের সাথে আর তুই দিলি ভেজিটেবলের সাথে। ভেজিটেবল মানুষ ফ্রেশ চায়। এইবার হো হো করে হেসে উঠে সাদিয়া। কাশফিয়া সাদিয়ার সেইসব পণ্যের সাথে তুলনা মনে করে একটু কান লাল হয় বুশরার। এমনকি ওদের ডিবেট টিমের সিনিয়র মাহিকা আপু পর্যন্ত নোমান কে হালকা ছাড় দেন। এই যে দশ মিনিট পরে আসা কখনো দশ মিনিট আগে চলে যাওয়া এইগুলা নিয়ে আপু তেমন কিছু বলে না। একদিন মাহিকা আপু কে এই ব্যাপারে কমপ্লেইন করার পর আপু বলল আরে নোমান একটু এমন। আপুর কথার সুরে প্রশ্রয়ের সুর। বান্ধবীদের অহেতুন নোমানের প্রতি দূর্বলতা আর মাহিকা আপুর প্রশ্রয় এইসব নোমানের প্রতি বুশরার বিরক্তি আরেকটু শক্ত করে।



নোমানের সাথে ইন্টারেকশনে বুশরার জড়তা থাকলেও নোমান এমন ভাবে কথা বলে যেন বহু দিনের পরিচিত। একদিন প্র্যাকটিসের সময় বুশরা একটা পয়েন্ট আটকে গেল। মাহিকা সাহায্য করতে গিয়েও পারল না। নোমান খাতা থেকে মাথা তুলে বলল, 

“এক সেকেন্ড। তোমার সেকেন্ড আর্গুমেন্টটা উল্টো করে দাঁড় করাও। তাহলে প্রথমটার সাথে কানেক্ট হবে।”

বুশরা তাকাল। নোমান উঠে এসে তার খাতার পাশে দাঁড়াল। আঙুল দিয়ে লাইন দেখিয়ে বলল। তার হাতের গন্ধটা বুশরার নাকে এল পারফিউম আর হালকা সিগারেটের মিশ্রণ। বুশরা দ্রুত খাতা সরিয়ে নিল। সিগারেটের গন্ধ একদম সহ্য হয় না বুশরার তবে আজকের পারফিউমের গন্ধ সাথে মিলে অন্য রকম লাগছে। তবে এমন গা ঘেষে দাড়ানোয় একটু অস্বস্তি হলো বুশরার জোড় গলায় বলল,

“আমি বুঝেছি, একটু সরে দাড়াও।”

নোমান একটু হাসল। 
“রাগ করছ?”

“না।”

“রাগ করলে বলো। আমি দূরে সরে যাই।”

বুশরা জবাব দিল না। নোমানও আর কিছু না বলে নিজের জায়গায় ফিরে গেল। কিন্তু বুশরার মনে সেই সিগারেট মিশ্রিত পারফিউমের গন্ধটা লেগে রইল অনেকক্ষণ।

রাতে বাসায় ফিরে সে আবিদকে ফোন করল। আবিদ জিজ্ঞেস করল কেমন কেটেছে দিন। বুশরা বলল, “ভালো।” আর কিছু বলল না। আবিদও চাপ দিল না। ফোন কাটার পর বুশরা ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকল। মনে মনে বলল, 

“আমি শুধু টিমের জন্য ওর সাথে কথা বলছি। অন্য কিছু না।”

কিন্তু নিজেকেই বিশ্বাস করাতে পারল না পুরোপুরি।


দ্বিতীয় সপ্তাহে প্র্যাকটিসে আর চাপ বাড়ল। একদিন মাহিকা দেরি করল। বুশরা আর নোমান একা রুমে বসে রইল প্রায় বিশ মিনিট। নোমান প্রথমে ফোন দেখছিল। তারপর ফোন রাখল। 

“তুমি আমাকে পছন্দ করো না, তাই না?”

বুশরা খাতা থেকে মাথা তুলল। 
“এটা কেমন প্রশ্ন?”
নোমান বলল,
“এই প্রশ্নে সমস্যা কি? আমি জিজ্ঞেস করছি তুমি কি আমার উপর বিরক্ত?”

“মানুষ তার বন্ধুদের উপর বিরক্ত হয় বা রাগ করে। তোমার সাথে আমার বিরক্ত হবার মত পরিচয় নেই” বুশরা স্বীকার না করলেও ওর গলায় ঝাঝ ভিন্ন কথা বলে।

নোমান বুশরার খোচার পরেও রাগ করলো না ঠিক। বলল “আচ্ছা বন্ধু না হই, ডিবেট টিমে তো একসাথে আছি। নিজেদের মাঝে বোঝাপড়া ভাল হলে টিম কেমিস্ট্রি বাড়বে। ডিবেট কিন্তু ঠিক ফরমুলার মত জিতে না। টিম কেমিস্ট্রি হেল্প করে জিততে। তাই নিজেদের মাঝে বোঝাপড়া বাড়ানোটা আমাদের দ্বায়িত্বর মাঝে পড়ে।”

নোমানের মুখে দায়িত্বের কথা শুনে বুশরা এইবার ক্ষেপে যায় “দায়িত্বের ব্যাপার? তুমি ডিবেটকে যতটা সিরিয়াসলি নাও, আমি তার চেয়ে বেশি নিই।”

নোমান হালকা হাসল। 
“আমি সিরিয়াসলি নেই। শুধু তোমার মতো দায়িত্ব শো অফ করি না।” নোমানের গলায় এইবার হালকা খোচা। বুশরা চুপ করে গেল। নোমান তার দিকে তাকিয়ে থাকল। মেয়েটার স্কার্ফ আজ হালকা নীল। গলার কাছে একটু ঘামের চিহ্ন। গরম পড়েছে। নোমানের চোখ সেখানে আটকে গেল এক মুহূর্তের জন্য। সে দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল।  এমনিতে বুশরা রেগে আছে তার উপর ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখলে আবার কি বলবে কে জানে।

মনে মনে নিজেকে নিজে বলল, 
“এই মেয়েটার দিকে এভাবে তাকাচ্ছিস কেন? ও তোকে কিছু দেবে না। এই ধরনের মেয়েদের নখড়া বেশি। এরা নিজেদের সতী ভাবে আর জগতের সবাই কে রাবণ। এদের কে ভাল কথা বললেও এরা ভাবে কোন স্বার্থ আছে।”

অথচ চোখ আবার চলে যাচ্ছিল। বুশরার হাতের দিকে। আঙুলের দিকে। সরু আংগুল। পিয়ানো শিল্পীদের মত। সরু আংগুলে পৃষ্ঠা উল্টাচ্ছে খাতার।মাহিকা এসে পড়ায় কথা আর এগোল না। কিন্তু সেই বিশ মিনিটের নীরবতা দুজনের মনেই লেগে রইল।



একদিন প্র্যাকটিসের পর নোমান বুশরাকে বলল, 
“কালকের কেসটা নিয়ে আমি একটা নতুন অ্যাপ্রোচ ভেবেছি। চাইলে শুনতে পারো।”

বুশরা প্রথমে না বলতে চেয়েছিল। কিন্তু কেসটা গুরুত্বপূর্ণ। তাই বলল, “বলো।”

দুজনে সিঁড়ির কোণে দাঁড়াল। নোমান কথা বলতে বলতে হাত নাড়ছিল। বুশরা শুনছিল। নোমানের গলার স্বর কম। কাছ থেকে শুনতে গেলে তার শ্বাসও শোনা যায়। বুশরার গায়ে একটা অস্বস্তিকর উত্তাপ ছড়াল। নোমানের শরীর থেকে সেদিনের সেই পারফিউম মিশ্রিত সিগারেটের ঘ্রাণ। সে একটু পিছিয়ে দাঁড়াল। নোমান লক্ষ করল। কিন্তু কিছু বলল না।

কথা শেষে বুশরা বলল, 
“আইডিয়াটা খারাপ না।”

নোমান হাসল। 
“‘খারাপ না’ মানে তোমার মুখে অনেক বড় প্রশংসা।”

বুশরা মুখ ঘুরাল। চলে গেল। নোমান তার পিছন থেকে তাকিয়ে থাকল। মেয়েটার হাঁটার ভঙ্গিটা দেখল। কাঁধ সোজা। মাথা উঁচু। যেন পৃথিবীর সব নিয়ম তার পক্ষে।  এই উদ্ধত্ব হেটে যাওয়া মেয়েটার ভিতরের মেয়েটা কে ওর দেখতে ইচ্ছে করে। সব সময় কি এমন উদ্ধত্ব? প্রেমিকের সামনেও? বুশরা কে নিয়ে এমন প্রশ্ন মনে আসায় একটু বিরক্ত হলো। অহেতুক সময় নষ্ট। নোমান যাদের পছন্দ করে তারা অনেক বেশি সাবলীল। বুশরার মত এমন নৈতিকতা আকড়ে থাকা কেউ না।
Reply
#14

(খ)

আবিদের মনে বুশরার সাথে সেই ক্যাফের কথোপকথনটা এখন আর কেবল একটা ঘটনা হয়ে নেই। সেটা একটা দীর্ঘ ছায়া হয়ে তার দিনের পর দিন জুড়ে থেকে গেছে। বুশরা বলেছিল সে খুশি। বলেছিল যৌনতা বিয়ের পর আসবে। বলেছিল এখন যা আছে তাতেই তার শান্তি। কথাগুলো ঠিক ছিল। পরিষ্কার ছিল। অথচ আবিদের মনে হচ্ছিল কথাগুলোর পেছনে আরও কিছু আছে যেটা সে ধরতে পারছে না। বুশরা উত্তর দেবার আগে কয়েক সেকেন্ড থেমে ছিল। এই কয়েক সেকেন্ডের মানে কি? আবিদের একটা অভ্যাস হচ্ছে মাথার ভিতর অনেক কিছু চিন্তা করে ফেলে বাস্তবে হয়তো যা ঘটবে না। তাই বুশরার এই কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা কে অনেক ভাবে বিশ্লেষণ করে ফেলে আবিদ। এই নীরবতা কি  নরমাল? বুশরা কি তার ভিতরের ইচ্ছা চাহিদা গোপন করছে? বুশরা সব সময় ওর খুশির জন্য অনেক কিছু করে। তাহলে কি ওর  খুশির জন্য নিজের উত্তর চেপে গেছে সে জন্য কি কয়েক সেকেন্ড দেরি হয়েছে উত্তর দিতে?

আজকাল রাতে ঘরে ফিরে বিছানায় শুয়ে অনেকক্ষণ ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। ফ্যানের শব্দ শুনে, ঘূর্ণায়মান ফ্যানের দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে মনে নোমানের কথাগুলো ঘুরছিল বারবার। শরীর ছাড়া প্রেম অসম্পূর্ণ। নারীদেহ মানুষকে উন্মত্ত করে। পালপিটেশন মানে শরীরের অতৃপ্ত ক্ষুধা। আবিদ প্রথমে রেগে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল নোমান সবকিছুকে নামিয়ে আনছে শরীরের স্তরে। প্রেমকে সস্তা করে দিচ্ছে। ভালোবাসাকে একটা শারীরিক প্রতিক্রিয়া বানিয়ে ফেলছে। সে নিজেও সেদিন তর্কের সময় জোরে বলেছিল তাদের সম্পর্কে কাম নেই, শুধু ভালোবাসা আছে। সম্মান আছে। শান্তি আছে। কথাটা তার মুখ দিয়ে বেরোনোর সময় সে বিশ্বাস করেছিল। এখনো বিশ্বাস করতে চায়। কিন্তু রাত গভীর হলে, একা থাকলে, বিশ্বাসটা একটু কেঁপে যায়।

মানুষ কি শুধু মন দিয়ে বাঁচে? শরীর কি সত্যিই এতটা গৌণ? আবিদ নিজেকে প্রশ্ন করছিল বারবার। সে যখন বুশরার কাছে বসে, তখন শরীরের কোনো ক্ষুধা অনুভব করে না। শুধু একটা গভীর শান্তি আসে। একটা নিরাপত্তা। যেন পৃথিবীর সব চাপ এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায়। এটা কি মিথ্যা হতে পারে? নোমান যদি ঠিক হয়, তাহলে এই শান্তিটাকে কী বলে? অভ্যাস? ভয়? নাকি সত্যিই ভালোবাসা?

আবার অন্যদিকে ভাবে যদি শরীর এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে সে এতদিন নিজেকে কী বোঝাচ্ছিল? সে কি নিজের শরীরকে অস্বীকার করে চলেছে? বুশরাকে কি সে একটা দেবীর মতো করে তুলেছে, জীবন্ত মানুষের বদলে? প্রশ্নগুলো তার ঘুম কেড়ে নিচ্ছিল। এক রাত, দুই রাত, তারপর একটানা কয়েক রাত।

সে সাজিদের সাথে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিল। সাজিদকে সে বিশ্বাস করে। সাজিদ তাকে জাজ করবে না। একদিন দুপুরে ক্যাফেটেরিয়ায় দুজনে বসল। চারপাশে লোকজনের কথাবার্তা, প্লেট গ্লাসের শব্দ, দূর থেকে কেউ হাসছিল। আবিদ চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ঘোরাচ্ছিল অনেকক্ষণ। সাজিদ তার দিকে তাকিয়েছিল চুপচাপ। জানত আবিদ কিছু বলবে। সময় নিয়ে বলবে।

আবিদ শেষ পর্যন্ত মুখ খুলল। বুশরার সাথে ওর কথোপকথন বলল। স্বীকার করল কিছুদিন ধরে কনফিউজড। নোমানের কথাগুলো মাথা থেকে যাচ্ছে না। সে জানে নোমান অন্যরকম মানুষ। নোমানের জীবন অন্যরকম। কিন্তু যুক্তিগুলো এত সহজ যে অস্বীকার করা কঠিন। সাজিদ শুনছিল। মাঝে মাঝে মাথা নাড়ছিল। আবিদ বলেছিল সে বুশরাকে ভালোবাসে। এটা নিয়ে তার কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ভালোবাসা কি শুধুই মনের ব্যাপার? শরীর কি সম্পূর্ণ আলাদা কিছু? নাকি দুটো জিনিস একসাথে জড়িয়ে থাকে এমনভাবে যে একটাকে বাদ দিলে অন্যটা অসম্পূর্ণ হয়ে যায়? বুশরা কি চায় ওর কাছে? নাকি সে আসলে শরীর চায় তাই এইসব ভাবছে?

সাজিদ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বলেছিল, প্রত্যেকটা মানুষ আলাদা হয়। কারো কাছে শরীর খুব বড় জিনিস। কারো কাছে মন। তুই যেটা অনুভব করিস, সেটাই তোর সত্যি। নোমানের সত্যি দিয়ে তোর সত্যিকে মাপতে গেলে গুলিয়ে যাবে। আবিদ মাথা নাড়ল। কথাটা ঠিক। অথচ মনে শান্ত হল না। সাজিদ আবার বলেছিল, তুই যদি নিজেকে জোর করে নোমানের মতো ভাবতে শুরু করিস, তাহলে তুই নিজের মতো থাকতে পারবি না। আর নিজের মতো না থাকতে পারলে বুশরার সাথেও স্বাভাবিক থাকতে পারবি না।

আবিদ সেদিন সাজিদের কথাগুলো মেনে নিয়েছিল। বাইরে মেনে নিয়েছিল। ভেতরে কিন্তু প্রশ্নগুলো থেকে গিয়েছিল। রাতে বাসায় ফিরে আবার সেই একই চক্রে ঘুরতে শুরু করল মন। বুশরা কি সত্যিই খুশি? নাকি সেও অনেক কিছু চেপে রাখে? মেয়েরা কি সবসময় সব কথা বলে? নাকি অনেক কিছু ভেতরে পুষে রাখে এমনভাবে যে একসময় সেটা সম্পর্কের ভেতর ফাটল ধরায়?

আবিদ ভাবত, সে নিজেও তো অনেক কিছু চেপে রাখে। সে কখনো বুশরাকে বলেনি যে মাঝে মাঝে তার শরীর চায়। বলেনি যে রাতে একা থাকলে তার মনে হয় কাউকে ছুঁয়ে দেখার। বলেনি যে বুশরার কাছে বসলে মাঝে মাঝে তার হাতটা তার হাতের কাছে আনতে ইচ্ছে করে। সে এসব চেপে রাখে কারণ সে মনে করে এসব চাওয়া ভালোবাসাকে নোংরা করে দেয়। কিন্তু নোমান যদি ঠিক হয়? যদি এই চাওয়াগুলোই ভালোবাসার অংশ হয়? বিয়ের পর যদি এই জিনিস গুলো করা জায়েজ হয় তাহলে বিয়ের আগে এই জিনিস গুলো চাওয়া কি অপরাধ?

এই প্রশ্নগুলো তাকে একটা অদ্ভুত অপরাধবোধের ভেতর ফেলে দিচ্ছিল। সে মনে করত সে বুশরাকে অসম্মান করছে এসব ভেবে। আবার মনে করত সে নিজের সাথে অসৎ হচ্ছে এসব না ভেবে। দুই দিক থেকেই সে কোণঠাসা হয়ে যাচ্ছিল আবিদ। মনের ভিতর প্রশ্ন আবার বুশরার প্রতি সম্মানবোধ।

কয়েকদিন পর আবিদ নোমানের সাথে দেখা হয়ে গেল। ইচ্ছে করে নয়। ক্যাম্পাসের করিডোরে হঠাৎ মুখোমুখি হয়ে গিয়েছিল। নোমান তাকে দেখে হাসি দিয়ে ডাক দিল। বলল, মুখটা শুকনো লাগছে কেন। আবিদ জবাব দিল কিছু না। দুজনে পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল। কথা হলো সাধারণ। ক্লাসের কথা। আবহাওয়ার কথা। ফুটবল ম্যাচের কথা। আবিদ ইচ্ছে করেই কোনো গভীর বিষয় তুলল না। নোমানও তুলল না। অথচ আবিদের মনে হচ্ছিল নোমান সব বুঝে ফেলেছে। নোমানের সহজ হাঁটা, সহজ কথা বলা, সহজ হাসি সবকিছু তার কাছে একটা নিঃশব্দ প্রশ্ন হয়ে উঠছিল। নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করল আবিদ আমি এত সংকোচে থাকি কেন? নিজেকে কেন এত কন্ট্রোল করে রাখি? অল্প এক দুইটা  নিয়ম ভাংগতে আমার কেন এত ভয় হয়? নোমানের মত কেয়ার ফ্রি কেন চলতে পারি না। নিজের প্রেমিকার  হাত ধরার কথা ভাবলে, নিজের প্রেমিকা কে জড়িয়ে ধরার  কথা ভাবলে কেন নিজের ভিতরে অপরাধবোধে ভরে যায়।

আবিদ সেদিন নোমানের পাশ থেকে সরে যেতে চেয়েছিল তাড়াতাড়ি। কিন্তু পা সরেনি সহজে। নোমানের উপস্থিতি তার ভেতর একটা অস্বস্তিকর আয়না ধরিয়ে দিচ্ছিল। সেই আয়নায় সে নিজেকে দেখতে পাচ্ছিল একজন ভালো ছেলে, একজন দায়িত্বশীল ছেলে, একজন যে ভালোবাসাকে পবিত্র রাখতে চায়। অথচ সেই পবিত্রতার ভেতর একটা শুকনো অনুভূতিও দেখতে পাচ্ছিল। যেন সবকিছু ঠিক আছে, অথচ কিছু একটা ঘাটতি আছে। তার নিজের ভিতরের ইচ্ছা, প্রেমিকার ইচ্ছা সব কি সে পূরণ করতে পারছে? নাকি সমাজ, ধর্ম, পরিবারের ভয়ে গুটিয়ে রেখেছে সব কিছু। কেন কোন রকম পাপবোধ ছাড়া নোমানের মত কেয়ার ফ্রি ভাবে জীবন কে উপভোগ করতে পারছে না।

রাতে আবিদ আবার একা হলো। বুশরার মেসেজ এল। সাধারণ মেসেজ। কেমন আছিস। পড়াশোনা কেমন চলছে। আবিদ উত্তর দিল। সাধারণ উত্তর। অথচ মেসেজ পাঠানোর পর তার মনে হলো সে আবারও কিছু লুকিয়ে রাখল। সে বুশরাকে জিজ্ঞেস করতে পারত তুই সত্যিই খুশি তো? আমাদের মধ্যে কি কিছু কম আছে? তুই কি কখনো চাস যে আমি তোকে অন্যভাবে ছুঁই? কিন্তু সে জিজ্ঞেস করল না। কারণ সে ভয় পায় উত্তরটা কী হতে পারে। যদি বুশরা বলে হ্যাঁ, তাহলে তার তৈরি করা পুরো ভালোবাসার কাঠামোটা কেঁপে যাবে। যদি বলে না, তখন কি বুশরার কাছে তার ভাল ছেলে ইমেজ ভেংগে চুড়ে যাবে? 

আবিদ ভাবত, ভালোবাসা কি এতটা জটিল হওয়ার কথা ছিল? সে তো সহজ ভালোবাসা চেয়েছিল। একটা মেয়ে, একজন প্রেমিকা, একটা সম্পর্ক, একটা ভবিষ্যৎ। বিয়ে, সংসার, সন্তান। সব হালাল। সব পরিষ্কার। অথচ এখন মনে হচ্ছে সেই সহজ পথটার ভেতরেই একটা জটিলতা লুকিয়ে ছিল যেটা সে আগে দেখেনি। নোমান সেই জটিলতাটাকে সামনে এনে ধরে দিয়েছে। আর এখন আর উপেক্ষা করা যাচ্ছে না।

সে বুশরার শরীরের কথা ভাবে না এটা সে নিজেকে বোঝাতে চায়। কিন্তু মাঝরাতে চোখ বন্ধ করলে বুশরার হাতের কথা মনে পড়ে। তার আঙুলের কথা। তার গলার কাছের চামড়ার কথা যেটা স্কার্ফের ফাঁক দিয়ে মাঝে মাঝে দেখা যায়। বুশরা হেটে গেলে পিছন থেকে যখন দেখে তখন ওর কোমরের দুলনি মনে পড়ে। গলা শুকিয়ে আসে। আবিদ দ্রুত চোখ খুলে ফেলে। নিজেকে ধমক দেয়। এসব চিন্তা করা উচিত না। এসব চিন্তা বুশরাকে অসম্মান করা। ওর মত ভাল ছেলের এইসব চিন্তা করা ঠিক না। অথচ চিন্তাগুলো থামে না। থামলেও কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে আসে।

আবিদ এখন বুঝতে পারছিল যে ক্রমশ সে দুই পা দুই নৌকায় দিয়ে দিচ্ছে। একদিকে তার বিশ্বাস ভালোবাসা মনের ব্যাপার, শরীর গৌণ, বিয়ের আগে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। অন্যদিকে তার শরীর আর নোমানের যুক্তি শরীর অস্তিত্বের অংশ, তাকে অস্বীকার করলে নিজেকেই অস্বীকার করা হয়। দুই নৌকাই তার নিজের। কোনোটাকেই সে ছাড়তে পারছে না। আর দুই নৌকায় পা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার ফলে সে ধীরে ধীরে ভারসাম্য হারাচ্ছে।

সে ভাবত, বুশরা যদি জানতে পারে তার মনের এই অবস্থা, তাহলে কী হবে? বুশরা কি তাকে দুর্বল ভাববে? নাকি খারাপ ভাববে? নাকি ভয় পাবে? আবিদ জানে বুশরা কনজারভেটিভ। জানে সে নিয়ম মানে। জানে সে বিয়ের আগে কোনো শারীরিক সম্পর্ক চায় না। তাহলে সে নিজেই বা এসব নিয়ে এত ভাবছে কেন? সে কি বুশরাকে বদলাতে চাইছে? নাকি নিজেকে বদলাতে চাইছে?

প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর নেই। আর প্রশ্নগুলো দিনের পর দিন আরও ভারী হয়ে তার বুকের ভেতর জমছে। আবিদ এখনো বুশরাকে ভালোবাসে। এটা সে জোর দিয়ে বিশ্বাস করে। কিন্তু ভালোবাসার সংজ্ঞাটা এখন আর আগের মতো পরিষ্কার নেই। সংজ্ঞাটা এখন একটা কুয়াশার ভেতর ঢাকা পড়েছে। আর সেই কুয়াশার ভেতর থেকে নোমানের গলার স্বর বারবার ভেসে আসছে মাই সিলি বয়। ইউ নিড এ গুড সেক্স।

আবিদ সেই স্বরকে ঘৃণা করে। অথচ উপেক্ষা করতে পারে না।
Reply
#15

(গ)

আবিদের মুখ থেকে সেদিন যে প্রশ্নগুলো বেরিয়ে এসেছিল, সেগুলো বুশরার মনে একটা অদ্ভুত ফাটল তৈরি করে দিয়েছিল। প্রথমে সে বুঝতেই পারেনি কী ঘটছে। ক্যাফেতে বসে যখন আবিদ ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করেছিল তাদের সম্পর্ক নিয়ে সে খুশি কি না, তখন বুশরার প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল বিস্ময়। তারপর যখন আবিদ পডকাস্টের কথা বলে যৌনতাকে প্রেমের বড় অংশ হিসেবে তুলে ধরেছিল, তখন বিস্ময়টা ধীরে ধীরে একটা গভীর অস্বস্তিতে রূপান্তরিত হয়েছিল। বুশরা সেদিন লজ্জায় মুখ লাল করে ফেলেছিল। গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। উত্তর দিতে গিয়ে তার নিজেরই কণ্ঠস্বর কাঁপছিল। সে বলেছিল সে খুশি। বলেছিল যৌনতা বিয়ের পর আসবে। বলেছিল এখন যা আছে তাতেই তার শান্তি। কথাগুলো সে সত্যি মনে করেই বলেছিল। অথচ বাসায় ফিরে, একা হয়ে, রাতের অন্ধকারে শুয়ে থাকার সময় সেই কথাগুলো আর আগের মতো সত্য মনে হচ্ছিল না।

বুশরা এতদিন ভেবেছিল তাদের সম্পর্ক একটা সুন্দর, পরিষ্কার গতিতে চলছে। পড়াশোনা শেষ হবে। তারপর চাকরি। দুই-তিন বছরের মধ্যে বিয়ে। তারপর একটা ছোট্ট ফ্ল্যাট। দুইটা বাচ্চা। একটা ছেলে, একটা মেয়ে। সকালে নাশতা করে অফিসে যাওয়া। সন্ধ্যায় একসাথে চা খাওয়া। ছুটিতে কোথাও বেড়াতে যাওয়া। এই ছবিগুলো সে এতবার মনে মনে এঁকেছে যে সেগুলো প্রায় বাস্তব মনে হত। আবিদের সাথে গল্প করার সময় সে এই পরিকল্পনাগুলো শেয়ার করত। আবিদ খুশি মনে শুনত। মাঝে মাঝে নিজের মতামত যোগ করত। কোন এলাকায় ফ্ল্যাট নেওয়া ভালো হবে, বাচ্চাদের নাম কী রাখা যায়, বিয়ের পর কার বাবা-মায়ের সাথে কতদিন থাকা হবে এসব নিয়ে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলেছে। বুশরার কাছে এই ভবিষ্যৎটা একটা নিরাপদ আশ্রয়ের মতো ছিল। যেখানে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে। সবকিছু হালাল। সবকিছু সুন্দর।

এখন হঠাৎ করে আবিদের প্রশ্নগুলো সেই সুন্দর ছবিটার মাঝখানে একটা ফাটল ধরিয়ে দিয়েছে। বুশরা বুঝতে পারছিল না আবিদ আসলে কী চায়। সে কি সত্যিই শুধু একটা পডকাস্ট দেখে কৌতূহলী হয়েছে? নাকি এটা তার নিজের চাওয়াকে ঘুরিয়ে বলার একটা উপায়? আবিদ কি তার কাছে যৌনতা চায়? এটা কি সেই চাওয়ার একটা পরোক্ষ প্রকাশ? বুশরা এতদিন আবিদকে অন্য ছেলেদের থেকে আলাদা ভেবে এসেছে। আবিদ জোরে কথা বলে না। মেয়েদের দিকে উল্টো দৃষ্টিতে তাকায় না। হাত ধরার জন্য তাড়া করে না। চুমু খাওয়ার কথা বলে না। বুশরা তাকে নিরাপদ মনে করত। এখন সেই নিরাপত্তাটাই একটু কেঁপে যাচ্ছে। আবিদ কি আসলে ওর মতোই অন্য ছেলেদের মতো? শুধু ভদ্রতার আড়ালে লুকিয়ে আছে?

এই প্রশ্নগুলো বুশরার ভেতর জড়িয়ে যেতে লাগল দিনের পর দিন। পড়াশোনার সময় মনে পড়ত। ডিবেট প্র্যাকটিসের সময় মনে পড়ত। লাইব্রেরিতে বসলে মনে পড়ত। এমনকি নামাজ পড়ার সময়ও মাঝে মাঝে এসে ভিড় করে বসত। বুশরা নিজেকে শাসিয়ে নিত। এসব চিন্তা করা পাপ। আবিদকে খারাপ চোখে দেখা ঠিক না। অথচ চিন্তাগুলো থামত না। থামলেও কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে আসত। আবিদের লাল মুখটা মনে পড়ত। যেভাবে সে তোতলাতে তোতলাতে কথা বলেছিল। যেভাবে স্যরি স্যরি করেছিল। বুশরার মনে হত, যদি আবিদ সত্যিই শুধু পডকাস্ট দেখে জিজ্ঞেস করত, তাহলে এতটা লজ্জা পেত না হয়তো। লজ্জাটাই যেন তার ভেতরের চাওয়ার প্রমাণ।

একদিন দুপুরে সাদিয়া আর কাশফিয়ার সাথে দেখা হলো ক্যাফেটেরিয়ার এক কোণে। বুশরা প্রথমে কিছু বলতে চায়নি। মনে মনে ভয় পাচ্ছিল। যদি ওরা তাকে খারাপ ভাবে? যদি ওরা বলে সে বেশি ভাবছে? অথচ ভেতরের চাপ এতটা বেড়ে গিয়েছিল যে আর ধরে রাখা যাচ্ছিল না। সে আস্তে আস্তে শুরু করল। প্রথমে ঘুরিয়ে বলল। বলেছিল আবিদ একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করেছে। সম্পর্ক নিয়ে। খুশি কি না এইটা নিয়ে। সাদিয়া আর কাশফিয়া মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। তারপর সাদিয়া জোর করতে লাগল। আসল কথাটা কী ছিল জানতে চাইল। বুশরা আরও কিছুক্ষণ রাখঢাক করার পর সব খুলে বলল। পডকাস্টের কথা। যৌনতাকে প্রেমের বড় অংশ বলার কথা। আবিদের প্রশ্নগুলো। তারপর তার নিজের মনে যে সংশয়গুলো জন্মেছে সেগুলোও।

সাদিয়া আর কাশফিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। কথাগুলো যেন তাদের দুজনেরও অপ্রত্যাশিত ছিল। বুশরা সহজে নিজের কিছু শেয়ার করে না। আবিদের সাথে প্রেম এটা লুকায় না কিন্তু এমন না যে আবিদের সাথে কি কথা হচ্ছে বা তাদের সম্পর্ক এখন কেমন সেসব শেয়ার করে। সাদিয়া আগে কথা বলল। সে নিজে কখনো প্রেম করেনি। তাই তার সরাসরি অভিজ্ঞতা নেই। কিন্তু অন্য বান্ধবীদের কাছ থেকে অনেক কিছু শুনেছে। প্রেমের একটা পর্যায়ে ছেলেরা শরীর চায়। কেউ শুধু হাত ধরতে চায়। কেউ চুমু খেতে চায়। কেউ মেয়ের বুকে হাত দিতে চায়। কেউ আরও বেশি চায়, যৌনির কাছাকাছি হাত নিয়ে যেতে চায়, অথবা পুরোপুরি শরীর চায়। অনেকে ঘুরতে যাওয়ার নাম করে সুযোগ করে নেয়। কেউ কেউ বলে যদি না দাও তাহলে সম্পর্ক রাখার মানে নেই। এভাবে ব্ল্যাকমেইল করে আদায় করে। সাদিয়া থামল একটু। তারপর বলল, আবিদ কিন্তু এসব করছে না। সে জোর করছে না। ব্রেকআপের হুমকি দিচ্ছে না। বরং বুশরার সম্মতি চাইছে। ভালো ছেলে বলেই হয়তো এভাবে ঘুরিয়ে বলছে। তাই এতটা ভয় পাওয়ার হয়তো কিছু নেই।

কাশফিয়া সাদিয়ার কথার সাথে একমত হল। মাথা নাড়ল। তারপর একটু চুপ করে থাকল। চোখ নামিয়ে রাখল। মনে হচ্ছিল সে কিছু বলতে চাইছে কিন্তু দ্বিধা করছে। শেষ পর্যন্ত নিজে থেকেই বলে ফেলল যে সে নিজেও প্রেম করছে। সাদিয়া আর বুশরা দুজনেই অবাক হয়ে তাকাল। কাশফিয়া ওর প্রেমের কথা কখনো বলে নি। সাদিয়া যখন মাঝে মাঝে টিজ করে জিজ্ঞেস করেছে তখনো না। এখন কাশফিয়া এত সহজে এসব কথা বলবে বলে কেউ ভাবেনি। কাশফিয়ার মুখে সবসময় দুষ্টুমির হাসি থাকলেও এতটা খোলাখুলি শরীরের কথা বলবে এটা অপ্রত্যাশিত ছিল। কাশফিয়া আস্তে আস্তে বলতে থাকল। তার প্রেমিকের সাথে ডেটিং-এ মাঝে মাঝে স্পর্শ হয়। চুমু খায়। সুযোগ পেলে তার বুকে হাত দেয়। কাশফিয়া নিজেও কয়েকবার প্যান্টের উপর দিয়ে তার বিএফের পুরুষাঙ্গে হাত দিয়েছে। কথাগুলো বলার সময় কাশফিয়ার গলা একটু নামতে থাকল। মুখ লাল হয়ে আসছিল। তবু সে থামল না। সাদিয়া দুষ্টুমি করে জিজ্ঞেস করল কেমন লাগে। কাশফিয়া একটু চুপ করে থেকে বলল, চুমু খাওয়ার সময় মনে হয় নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসবে। বুকে হাত দিলে শরীরের ভেতর একটা উত্তেজনা ছড়িয়ে যায় যেন সবকিছু ভেঙে পড়বে। আর যখন প্যান্টের উপর দিয়ে হাত দেয়, তখন মনে হয় ভেতরে একটা শক্ত কিছু নড়াচড়া করছে। কাশফিয়ার শ্বাস বলেতে থাকল কথাগুলো বলার সময়। তার বুক ওঠানামা করছিল। সাদিয়া আর বুশরারও বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত চাপ অনুভূত হচ্ছিল। নিষিদ্ধ কিছু জানার আর বলার একটা গোপন আনন্দ যেন তিনজনের মাঝে ছড়িয়ে গিয়েছিল।

বুশরা শুনছিল। কাশফিয়ার মুখ থেকে এইসব কথা বেরোচ্ছে দেখে তার নিজেরই গলা শুকিয়ে আসছিল। কাশফিয়াকে সে ভালো মেয়ে বলেই জানত। একটু দুষ্টুমি আছে, একটু কথায় কথায় টিজ করে, কিন্তু এতটা খোলাখুলি শরীরের কথা বিশেষ করে পুরুষাঙ্গের কথা এভাবে বলবে ভাবেনি। কাশফিয়া যখন বলেছিল “ভেতরে একটা শক্ত কিছু নড়াচড়া করছে”, তখন বুশরার মনে হয়েছিল তার নিজের কানই বিশ্বাস করতে চাইছে না। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল। মনে মনে ভাবল, কাশফিয়া এসব কেমন করে বলে? লজ্জা করে না? অথচ কাশফিয়ার মুখ লাল। শ্বাস কষ্টকর। তাহলে লজ্জা তো হচ্ছে। তবু বলছে। বুশরার মনে হলো, লজ্জা আর কৌতূহল একসাথে থাকতে পারে। নিষিদ্ধ জিনিস বলার আনন্দ আলাদা। শোনার আনন্দও আলাদা। তিনজনেই সেদিন সেই আনন্দটা ভাগ করে নিচ্ছিল চুপচাপ।

বুশরা শেষে বলেছিল সে ওদের কথা বুঝতে পারছে। কিন্তু তার পক্ষে এসব সম্ভব না। সে অন্যরকম। কথাটা বেরোনোর সাথে সাথে কাশফিয়ার মুখ একটু বিষণ্ণ হয়ে গিয়েছিল। চোখ নামিয়ে ফেলেছিল। বুশরা বুঝতে পেরেছিল তার কথায় কাশফিয়া অপমানিত বোধ করেছে। যেন বুশরা বলতে চেয়েছে কাশফিয়া খারাপ মেয়ে, আর সে নিজে ভালো। বুশরা তাড়াতাড়ি স্যরি বলেছিল। বলেছিল সে এমন কিছু বোঝাতে চায়নি। কথা আর এগোয়নি সেদিন। তিনজনেই একধরনের অস্বস্তিকর নীরবতা নিয়ে উঠে গিয়েছিল। বুশরার মনে সেই নীরবতাটা বিকেল পর্যন্ত লেগে থাকল। কাশফিয়ার লাল মুখটা মনে পড়ছিল। তার শ্বাসকষ্টের কথা মনে পড়ছিল। আর নিজের মুখ থেকে বেরোনো সেই “আমি অন্যরকম” কথাটা মনে পড়ছিল। বুশরা ভাবল, সে কি সত্যিই অন্যরকম? নাকি শুধু নিজেকে অন্যরকম বলে ভুলিয়ে রাখতে চায়?

সেই রাতে সাদিয়া মেসেঞ্জারে একটা লিংক পাঠাল। একটা রেডিট গ্রুপের। মুস-লিম ম্যারেজ অ্যান্ড রিলেশনশিপ প্রবলেমস। সাথে আরও কয়েকটা পোস্টের লিংক। বুশরা প্রথমে খুলতে চায়নি। তবে এরপর সাদিয়া একটা লম্বা মেসেজ পাঠালো। মেসেজ টা পড়ল,

“আজকে কাশফিয়াকে তুই যে “আমি অন্যরকম” বললি, সেটা বলা উচিত হয়নি। ও হেল্প করতে গিয়ে নিজের গোপন কথা খুলে বলছিল, সেসময় এমন কথা ওকে হার্ট করেছে। তুই যাওয়ার পর ও একদম চুপ হয়ে গিয়েছিল। কাশফিয়া ভাল মেয়ে। ও আমাদের কাছে ওর গোপন কথা শেয়ার করেছে একমাত্র তোর দ্বিধার কথা শুনে। যতে ওর কথা শুনে তুই একটু স্বস্তি পাস। আর তুই যা শুনলি বা যে দ্বিধার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিস, এগুলো নতুন কিছু না। অনেক প্র্যাকটিসিং মুস-লিম ছেলে-মেয়েই এর মধ্যে দিয়ে যায়। যে লিংকগুলো দিয়েছি, পড়লে বুঝতে পারবি।  পরে সুযোগ করে কাশফিয়াকে আলাদা করে সামনাসামনি স্যরি বলবি। সবার সামনে না, তাহলে ও আরও লজ্জা পাবে।’


বুশরার প্রথমে খুলতে চায় নি তবে সাদিয়ার মেসেজ পড়ে কৌতুহলে শেষ পর্যন্ত খুলে ফেলল। প্রথম পোস্টটা পড়ল ধীরে ধীরে।

Female (26): 
I’ve been with my fiancé for three years. We are both practicing Mu-slims and decided to wait until marriage. Lately he has been distant. When I asked, he said he feels like something is missing. He didn’t say sex directly but I could tell. Now I keep wondering if I’m being unfair. Is it wrong to want to stay pure but also keep him? I feel guilty for even thinking about this.

বুশরা পোস্টটা পড়ে ফোনটা একটু নামিয়ে রাখল। মেয়েটার কথাগুলো যেন তার নিজের মনের কথা। তিন বছরের সম্পর্ক। দুজনেই ধর্ম পালন করে। বিয়ের আগে অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত। তারপর ছেলেটা দূরে সরে যেতে শুরু করে। কিছু একটা কম আছে বলে। সরাসরি যৌনতার কথা বলে না। কিন্তু বোঝা যায়। মেয়েটা ভাবে সে কি অন্যায় করছে? পবিত্র থাকতে চাওয়া কি ভুল? ছেলেটাকে ধরে রাখতে গিয়ে কি নিজের বিশ্বাস ভাঙবে? বুশরা মনে মনে আবিদের সাথে তুলনা করল। আবিদও তো দূরে সরে যায়নি। কিন্তু প্রশ্ন করেছে। ঘুরিয়ে ফিরে একই কথা বলেছে কিছু একটা কম আছে কি না। বুশরা ভাবল, এই মেয়েটা যে অপরাধবোধ করছে, সে নিজেও কি তাই করছে? আবিদকে খারাপ চোখে দেখার জন্য? নাকি নিজের মনে যৌনতার চিন্তা আসার জন্য?

দ্বিতীয় পোস্ট খুলল।

Male (28): 
My girlfriend is a good Mu-slim girl. I respect that. But sometimes I feel frustrated. We only hold hands occasionally. I don’t want to pressure her into haram, but I also don’t know how long I can keep suppressing this. Has anyone else felt like their relationship is stuck because of physical boundaries? I’m scared I’ll end up resenting her.

বুশরা এই পোস্টটা পড়ে আরও বেশি অস্থির হয়ে উঠল। এবার ছেলেটার দিক থেকে। মেয়েটা ধর্ম মানে। ছেলেটা সম্মান করে। কিন্তু হতাশ হয়। মাঝে মাঝে শুধু হাত ধরা ছাড়া আর কিছু হয় না। হারামে ঠেলতে চায় না। কিন্তু কতদিন দমিয়ে রাখবে নিজেকে? সম্পর্ক কি আটকে আছে শারীরিক সীমার কারণে? শেষ পর্যন্ত মেয়েটার প্রতি বিদ্বেষ জন্মাবে কি না সেই ভয়। বুশরা মনে মনে আবিদের জায়গায় এই ছেলেটাকে বসাল। আবিদ কি এভাবেই হতাশ? আবিদ কি দমিয়ে রাখছে নিজেকে? আবিদ কি একদিন তার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে? বুশরা ভয় পেল। গলা শুকিয়ে গেল। যদি আবিদ সত্যিই এমন অনুভব করে, তাহলে সে কী করবে? হাত ধরতে দেবে? চুমু খেতে দেবে? তার বুকে হাত দিতে দেবে? না দিলে কি আবিদ দূরে সরে যাবে?

তৃতীয় পোস্ট খুলল।

Female (24): 
We are getting married in eight months. My fiancé recently asked if we could “do more” before the wedding. Not full sex, but more than kissing. I said no. Now he seems quiet. I keep checking my phone waiting for his texts. I feel like I’m losing him over something I believe is right. How do you balance deen and the fear of being left?

বুশরা এই পোস্টটা পড়ে ফোনটা বালিশের উপর রেখে দিল। আট মাস পর বিয়ে। ছেলেটা বিয়ের আগে আরও কিছু চায়। পুরো যৌনতা না। কিন্তু চুমুর চেয়ে বেশি। মেয়েটা না বলেছে। এখন ছেলেটা চুপ। মেয়েটা ফোন চেক করতে থাকে। মনে হয় সে হারাচ্ছে ছেলেটাকে। যে জিনিসটা সে ঠিক বলে বিশ্বাস করে, সেই জিনিসের জন্যই হারাচ্ছে। দ্বীন আর একা হয়ে যাওয়ার ভয় দুটোর মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করবে? বুশরা মনে মনে নিজেকে এই মেয়েটার জায়গায় বসাল। আবিদ যদি একদিন বলে আরও কিছু চায়? সে যদি না বলে? আবিদ যদি চুপ হয়ে যায়? সে কি আবিদকে হারাবে? বুশরার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। লজ্জায় আর ভয়ে তার গা ঘামতে শুরু করল। ফ্যানের বাতাস গায়ে লাগছিল। অথচ ঘাম ঝরছিল। সে আবিদকে হারাতে চায় না। অথচ নিজের বিশ্বাসও ছাড়তে চায় না। দুই দিক থেকেই সে চেপে যাচ্ছিল।

তিনটা পোস্ট পড়ার পর বুশরার মনে সাদিয়া আর কাশফিয়ার কথাগুলো মিলিয়ে যেতে লাগল। সাদিয়া বলেছিল ছেলেরা একটা পর্যায়ে শরীর চায়। কাশফিয়া বলেছিল চুমু খেলে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে, বুকে হাত দিলে শরীর ভেঙে পড়ার মতো উত্তেজনা হয়, প্যান্টের উপর দিয়ে হাত দিলে ভেতরে শক্ত কিছু নড়াচড়া করে। বুশরা এসব কথা মনে করতে গিয়ে নিজেরই শরীর গরম হয়ে উঠছিল। লজ্জায় মুখ লাল হয়ে যাচ্ছিল একা একা শুয়ে থেকেও। সে ভাবল, কাশফিয়া যে অনুভূতির কথা বলেছে, সেগুলো কি সত্যিই এত তীব্র? আবিদ যদি তাকে ছুঁয়ে দেয়, তাহলে কি তারও এমন হবে? বুশরা দ্রুত মাথা নাড়ল। এসব চিন্তা করা উচিত না। অথচ চিন্তাগুলো থামছিল না। রেডিটের মেয়েগুলোর অপরাধবোধ, ছেলেগুলোর হতাশা, কাশফিয়ার লাল মুখ, সাদিয়ার বিশ্লেষণ সব মিলিয়ে তার ভেতর একটা বড় সংকট জেগে উঠেছিল। সে আসলে কী চায়? আবিদ আসলে কী চায়? দুই প্রশ্নের কোনোটারই উত্তর তার কাছে ছিল না। শুধু সংশয় ছিল। আর সংশয়টা রাতের অন্ধকারে আরও বড় হতে থাকল। বুশরা ঘুমাতে পারল না। শুধু তাকিয়ে থাকল ছাদের দিকে। আর মনে মনে একই প্রশ্ন ঘুরতে থাকল বারবার সে কি আবিদকে হারাবে, নাকি নিজেকে হারাবে? সে কি নিজে এমন কিছু চায়?

রাত যত গভীর হচ্ছিল, বুশরার মনের ভেতরের দ্বন্দ্ব তত স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। সে আবিদকে ভালোবাসে। এটা নিয়ে তার কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ভালোবাসার মানে কি শুধু একসাথে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা? শুধু নিরাপদ দূরত্বে থেকে একে অপরকে সম্মান করা? নাকি ভালোবাসার ভেতরে শরীরেরও একটা জায়গা আছে যেটা সে এতদিন অস্বীকার করে এসেছে? কাশফিয়ার কথাগুলো তার কানে বাজছিল বারবার। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসা। শরীর ভেঙে পড়ার মতো উত্তেজনা। ভেতরে শক্ত কিছু নড়াচড়া করা। বুশরা এসব কল্পনা করতে গিয়ে নিজেকেই থামিয়ে দিচ্ছিল। অথচ কল্পনাগুলো থামছিল না। আবিদের হাত যদি তার হাতে লাগে? আবিদের ঠোঁট যদি তার ঠোঁটে লাগে? আবিদের হাত যদি তার বুকে যায়? ভেবে তার শরীর কাঁপছিল। লজ্জায় আর ভয়ে বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠছিল। সে আবিদকে হারাতে চায় না। অথচ নিজের বিশ্বাসও ছাড়তে চায় না। দুই দিক থেকেই সে চেপে যাচ্ছিল। আর সেই চাপের ভেতর থেকে কোনো পরিষ্কার উত্তর বেরোচ্ছিল না। শুধু প্রশ্ন বেরোচ্ছিল। আর প্রশ্নগুলো  সে রাতে ওকে আর ঘুমাতে দেয় নি।
Reply
#16

আপডেট ৭
-

(ক)

বিকেলের রোদটা একটু হেলে পড়েছিল। ক্যাম্পাসের বাইরে ফুটপাতের ওপর একটা ছোট চায়ের দোকান। প্লাস্টিকের চেয়ার, ময়লা টেবিল, আর বাতাসে চায়ের সাথে মিশে থাকা ধোঁয়ার গন্ধ। আবিদ আর সাজিদ সেখানে বসেছিল। দুজনের সামনে দুটো কাপ। কথা হচ্ছিল সাধারণ বিষয়ে । ক্লাসের প্রেসার, আসন্ন পরীক্ষা, আর একটুখানি ফুটবল। আবিদের কাঁধে ল্যাপটপের ব্যাগ। কালো রঙের, একটু ভারী। সে মাঝে মাঝে হাত দিয়ে ব্যাগটা স্পর্শ করে নিচ্ছিল, যেন নিশ্চিত হতে চায় সেখানেই আছে।

হঠাৎ পাশ থেকে কয়েকজন ছেলে এগিয়ে এল। সংখ্যায় পাঁচ-ছয়জন। বয়স আন্দাজ বিশ-পঁচিশের মধ্যে। পোশাক এলোমেলো, চোখে একটা অস্থিরতা। আবিদ আর সাদিজ থেকে অল্প দূরে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে জোরে জোরে কথা বলতে থাকল। আবিদ সাজিদ দুইজনে বিরক্ত হলো এত জোরে কথা বলায়। ওদের কথার শব্দে নিজেদের কথা নিজেরা শুনতে কষ্ট হচ্ছে। আবিদ একটু পাশ ফিরে একটা ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল ভাই একটু আস্তে কথা বলবেন, সমস্যা হচ্ছে। ছেলেটা ওর দিকে তাকালো তারপর গ্রুপের ভিতর গিয়ে কিছু একটা বলল। প্রথমে কয়েক সেকেন্ড কথার তোড় কমে গেলে তবে এইবার অন্য রকম ফিসফিসানি। ভিতর থেকে কার একজনের গলা। এত বড় সাহস কোন বাপের পোলার। গ্রুপের একজন সোজা আবিদের দিকে এসে দাঁড়াল। যে একটু লম্বা আর শক্তিশালী দেখতে, আবিদের ব্যাগের দিকে আঙুল তুলে বলল কিছু একটা। গলার স্বর উঁচু। অভিযোগটা স্পষ্ট ব্যাগটা তাদের কোনো পরিচিত ছেলের। চুরি করা। আবিদ প্রথমে বুঝতেই পারেনি। সে মাথা নাড়ল, না বলার চেষ্টা করল। সাজিদও পাশে থেকে ব্যাখ্যা করতে গেল। কিন্তু ছেলে গুলো শোনার মেজাজে ছিল না। এত দ্রুত ঘটনা ঘটতে থাকলো যে আবিদ বা সাজিদ কেউ ঠিক কি হচ্ছে বুঝে উঠতে পারল না।

আবিদ সাজিদের প্রতিবাদের মুখে ছেলে গুলো তাদের ঘিরে ফেলল। একজন আবিদের কাঁধে হাত রাখল। আরেকজন ব্যাগ টেনে ধরল। আবিদের গলা শুকিয়ে গেল। চুরির অপবাদ। সে কখনো এমন কিছুর মুখোমুখি হয়নি। তার হাত কাঁপছিল। সাজিদের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। দুজনেই ভয় পেয়েছিল। ভয়টা শুধু শারীরিক আঘাতের নয়। অপমানের। অজানা লোকের সামনে চোর বলে অভিযুক্ত হওয়ার। চারপাশের মানুষজন দূর থেকে তাকিয়েছিল, কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি। ঢাকার রাস্তায় এমন দৃশ্য নতুন নয়। মানুষ দূরে থাকে।

যেহেতু কথা আবিদ বলেছিল এবং আবিদের কাধে ব্যাগ আছে তাই পুরো গ্রুপটা আবিদ কে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সাজিদ ফোন বের করল। হাত কাঁপতে কাঁপতে নোমানকে ডুবল কল দিল। নোমান কল ধরার আগে ঠাস করে জোরে একটা শব্দ হলো। সাজিদ তাকিয়ে  দেখে আবিদ গাল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। এইভাবে প্রকাশ্যে কেউ তাকে বিনা কারণে চড় মারতে পারে এটা যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। এর মাঝে নোমান ফোন ধরল। কথা খুব সংক্ষেপ। সাজিদ অল্প কথায় শুধু বলল কোথায় আছে, কী হচ্ছে, আর তাড়াতাড়ি আসতে। নোমান ওপাশ থেকে কিছু জিজ্ঞেস করেছিল কি না, সাজিদ ঠিক শোনেনি। শুধু কেটে দিল। আবিদের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। যেন বলতে চাইল হেল্প আসছে।

সময়টা লম্বা মনে হয়েছিল। আসলে হয়তো সাত-আট মিনিট। লোকগুলো এখনো ঘিরে ছিল। একজন আবিদের ব্যাগ জোর করে খুলতে চাইছিল। আবিদ দুই হাত দিয়ে ব্যাগ চেপে ধরেছিল। তার কপালে ঘাম। চোখে জল আসার মতো অবস্থা, কিন্তু সে আটকে রেখেছিল। সাজিদ বারবার বলছিল এটা ভুল, ব্যাগটা আবিদের নিজের, ভেতরে ল্যাপটপ আছে, আইডি কার্ড আছে। কিন্তু কথাগুলো বাতাসে হারিয়ে যাচ্ছিল।

নোমান এল কয়েকজনকে সাথে নিয়ে। রাফি ছিল, তানভির ছিল, আরও দু-তিনজন চেনা মুখ। তারা দূর থেকেই পরিস্থিতি দেখে নিয়েছিল। নোমান সোজা এগিয়ে গিয়ে মাঝখানে দাঁড়াল। তার চেহারায় রাগের কোনো চিহ্ন ছিল না। শুধু একটা শান্ত, স্থির দৃষ্টি। সে আগে আবিদের দিকে একবার তাকাল। তারপর লোকগুলোর দিকে। প্রথমে সে মিটমাটের চেষ্টা করল। কথা বলল আস্তে। পরিচয় দিল। আবিদের পরিচয় দিল। বলল আমরা নর্থ সাউথের ছাত্র, ব্যাগটা আবিদের নিজের, ভেতরে ল্যাপটপ আর বই আছে। সে নিজেও দেখতে পারে। লোকগুলোর মধ্যে একজন একটু নরম হল মনে হয়েছিল। কিন্তু যে লম্বা ছেলেটা নেতৃত্ব দিচ্ছিল, সে মানল না। গলার স্বর আরও চড়া করল। বলল তারা নিশ্চিত, ব্যাগটা চোরাই। নোমানের কথায় কান দিল না।

নোমান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর ফোন বের করল। একটা নম্বরে কল দিল। কথা বলল খুব সংক্ষেপে। নাম ধরে ডাকল কাউকে। “বড় ভাই” বলে সম্বোধন করল। পরিস্থিতি এক লাইনে বলল। লোকেশন দিল। তারপর ফোন কাটল। দু-তিন মিনিটের মধ্যেই আরেকজন এল। বয়স তিরিশের কাছাকাছি, গাড়ি থেকে নেমে সোজা এগিয়ে এল। তার উপস্থিতিতে বাতাসটা যেন একটু বদলে গেল। লোকগুলো চিনল তাকে। কথা কম হল। ওই মানুষটা শুধু কয়েকটা কথা বলল। গলার স্বর নীচু, কিন্তু ওজনে ভারী। লোকগুলো মাথা নিচু করল। একজন ক্ষমা চাইল। তারপর সরে গেল দ্রুত। ছেলে গুলো চলে যেতে নোমান গাড়ি থেকে নামা লোকটার কাছে দাঁড়িয়ে সালাম দিল আর এত দ্রুত আসার জন্য বার বার ধন্যবাদ দিল। সাজিদ আর আবিদ দুইজন তখন খানিকটা ট্রমা গ্রস্ত। নোমান সেই গাড়ি থেকে নামা লোকের সাথে কি কথা বলছে ঠিক না শুনলেও বুঝল নোমান খালি একটু পর পর জ্বি ভাই, জ্বি ভাই করে সম্মান দেখাচ্ছে। একটু পর লোকটা আবিদ সাজিদের পিঠ চাপড়ে দিয়ে কিছু একটা বলে আবার গাড়িতে উঠে চলে গেল।  আবিদ তখনো ব্যাগ চেপে ধরেছিল। তার হাত কাঁপছিল। সাজিদের চোখ ছলছল হয়ে গিয়েছিল। দুজনেই যেন হঠাৎ বাতাস পেয়েছিল। নোমান পাশ থেকে আবিদের কাঁধে হাত রাখল। শক্ত করে নয়। শুধু একটা স্পর্শ। আবিদ সেই স্পর্শ অনুভব করল। তার ভেতরের ভয়টা একটু একটু করে নামতে শুরু করল।

নোমানের সাথে আসা ছেলেরাও পাশে দাঁড়িয়েছিল। কেউ বেশি কথা বলল না। শুধু উপস্থিতি দিয়েই যেন একটা দেয়াল তৈরি করেছিল। আবিদ আর সাজিদ দুজনেই বারবার ধন্যবাদ বলছিল। কথাগুলো গুছিয়ে বেরোচ্ছিল না। শুধু মুখ দিয়ে বেরোচ্ছিল ধন্যবাদ, ধন্যবাদ। নোমান মাথা নাড়ল। বলল চল, এখান থেকে সরে যাই।

তারা কাছের একটা দোকানে গেল। ছোটখাটো রেস্টুরেন্ট। আবিদ জোর করেই সবাইকে নিয়ে ঢুকল। ট্রিট দিল। চা, সিঙ্গাড়া, বেশ কিছু খাবার। নোমান আপত্তি করলেও আবিদ শুনল না। সাজিদও পাশে থেকে জোর দিল। টেবিলে সবাই বসল। কথা কম হচ্ছিল। আবিদের হাত এখনো একটু কাঁপছিল। সে বারবার নোমানের দিকে তাকাচ্ছিল। মনে মনে বলছিল দুবার। দুবার এই ছেলেটা তাকে বিপদ থেকে বের করে এনেছে। নোমান চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বলল, এমন ছেলেরা নিরীহ ভদ্র ছেলেদের দেখলেই এসে টাকা খাবার ধান্দায় পড়ে। তোদের চেহারায়, কথায়, পোশাকে ভদ্রতা আছে। তাই টার্গেট করে। এদের কাজই এই। আবিদ মাথা নাড়ল। কথাটা তার বুকে লাগল। সে নিজেও টের পাচ্ছিল সে প্রতিবাদ করতে গিয়েও গলার স্বর কাঁপিয়ে ফেলেছিল। নোমানের মতো শান্তভাবে দাঁড়াতে পারেনি।

খাবার শেষ হওয়ার পর বাইরে এসে দাঁড়াল তারা। সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে। রাস্তায় লাইট জ্বলছে। আবিদ নোমানের দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আজ থেকে আর তুমি বলব না। তুই বল। দুবার আমাকে এভাবে বাঁচালির পর তোকে আর দূরের মানুষ ভেবে কথা বলতে ইচ্ছে করে না। নোমান প্রথমে একটু অবাক হল। তারপর হাসল। হালকা, একটু মুচকি  হাসি। মাথা নাড়ল। রাজি হল। নোমান বলল ওকে, যেহেতু আমাকে বন্ধু বলে স্বীকার করলি এখন থেকে তাহলে তোর ভাল মন্দের দ্বায়িত্ব  নিতে হবে আমাকে। গুরুজনের গলার ভংগী নকল করে বলা কথাটা আবিদ আর সাজিদের মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলল।

সেদিনের পর থেকে তাদের কথা বলার ধরন বদলে গেল। আবিদের মুখে “তুই” শব্দটা এল। নোমানও ফিরিয়ে দিল। বন্ধুত্বটা যেন একটা অদৃশ্য রেখা পেরিয়ে অন্য জায়গায় চলে গেল। আবিদ মনে মনে অনুভব করল এই ছেলেটা শুধু সাহায্য করেনি। তাকে একটা নিরাপত্তা দিয়েছে। নোমানের কথায় টের পেয়েছে ঐদিন গাড়ি থেকে নামা ভদ্রলোক স্থানীয় এক যুবদল নেতা। নোমানের পরিচিত। আবিদ অবাক হলো নোমান যে খালি বাস্কেটবল খেলায় বা মেয়েদের সাথে ফ্লার্টিং এ ওস্তাদ তা না বরং ভার্সিটির বাইরের পলিটিক্যাল বড় ভাইদের চিনে। আবিদের ধারণা ছিল এমন লোকদের যারা চিনে এরা নিজেরাও গুন্ডা প্রকৃতির কিন্তু নোমানের সাথে তার কোন মিল নেই। নোমানের সাথে যত মিশছে তত ভাংগা গড়ার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে আবিদের চিন্তাভাবনা নোমান সম্পর্কে। নোমানের সহজ ব্যবহার, আড্ডা মাতিয়ে রাখার শক্তি আর দরকার পরলে হাজির হয়ে বিনা বাক্যে হেল্প করে পরে সেটা নিয়ে কোন রকম রিটার্ন না চাওয়া। সব মিলিয়ে আবিদের জগতে নতুন ভাল বন্ধু হিসেবে নোমানের আবির্ভাব একটা অবশ্যাম্ভাবী ব্যাপার এখন।

ঢাকার রাতের আলো আর শব্দ। সেই রাতে আবিদের মনে হল, কিছু কিছু মানুষ জীবনে হঠাৎ এসে দাঁড়ায়। আর তারপর আর দূরে সরে না। নোমান এমনই একজন হয়ে উঠছে যেন তার কাছে।
Reply
#17

(খ)
-
আবিদের মনে কনফিউশনটা দিন দিন ভারী হয়ে উঠছিল। বুশরার সাথে সেই হাত ধরার পর থেকে শরীরের প্রতিক্রিয়াগুলো আর মন থেকে যাচ্ছিল না। রাতে একা থাকলে হাতের উষ্ণতা মনে পড়ত। আঙুলের চাপ মনে পড়ত। নিজেকে বারবার বলত এসব চিন্তা ঠিক না। অথচ চিন্তাগুলো থামত না। দুবার বিপদ থেকে নোমান তাকে বাঁচিয়েছে। সাজিদের মুখে শুনেছে মেয়েদের ব্যাপারে নোমান অনেক পটু। নিজের চোখেও দেখেছে সুন্দরী মেয়েরা অনায়াসে এসে নোমানের সাথে কথা বলে, হাসে, কাছে ঘেঁষে দাঁড়ায়। তাই আবিদ ঠিক করল নোমানের কাছেই পরামর্শ নেবে। সব কথা খুলে বলবে না। শুধু পরিস্থিতিটা বলবে। গার্লফ্রেন্ডের নাম কখনো মুখে আনবে না।
একদিন বিকেলের দিকে ক্যাম্পাসের প্লাজার এক কোণে দুজনে বসল। চারপাশে লোকজন যাতায়াত করছিল। কেউ ফোন দেখছিল, কেউ দল বেঁধে গল্প করছিল। আবিদ প্রথমে সাধারণ কথা বলল। তারপর আস্তে আস্তে মূল কথায় এল। বলল তার গার্লফ্রেন্ডের সাথে একটা বিষয় নিয়ে সে কনফিউজড। সম্পর্ক ভালো। মেয়েটা ভালো। কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয় কিছু একটা কম আছে। শরীরের ব্যাপার। সে নিজেও চাপাচাপি করতে চায় না। মেয়েটা কনজারভেটিভ। ধর্ম মানে। বিয়ের আগে কিছু চায় না। অথচ আবিদের নিজের শরীর মাঝে মাঝে অন্য কথা বলে।
নোমান শুনছিল। পায়ের উপর পা তুলে বসেছিল। মুখে সেই পরিচিত হালকা হাসি। আবিদ যখন থামল, নোমান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল, আমি তো আগেই বলেছি যৌনতা দরকারি। শরীরকে অস্বীকার করলে নিজেকেই অস্বীকার করা হয়। তবে তোর গার্লফ্রেন্ড যেহেতু কনজারভেটিভ, তার ইচ্ছা থাকলেও সহজে প্রকাশ করবে না। তোকেও সহজে এগোতে হবে। জোর করলে উল্টো সরে যাবে। আগে সাইনগুলো বুঝতে হবে।
আবিদ জিজ্ঞেস করল, কী সাইন? নোমান আঙুল গুণে গুণে বলতে লাগল। ধর, হঠাৎ করে তোর সাথে দেখা করতে এল আগের চেয়ে বেশি সাজগোজ করে। লিপস্টিক দিল, চুলে একটু বেশি যত্ন নিল, কাপড় বেছে পরল। অথবা তোর দিকে অতিরিক্ত মনোযোগ দিতে শুরু করল—কথার ফাঁকে ফাঁকে তোর দিকে তাকিয়ে থাকল, হাসল, কাছে বসল। এর মানে হচ্ছে সে মনোযোগ চাইছে। নিজেকে দেখাতে চাইছে। এই সাইনগুলো মিললে বুঝবি ভেতরে কিছু একটা আছে। তখন পরের ধাপে এগোতে হয়। আস্তে আস্তে। হাত ধরা, কাছে বসা, চোখের দৃষ্টি—এগুলো দিয়ে টেস্ট করতে হয়। আবিদ মাথা নাড়ল। কথাগুলো তার মাথায় ঘুরতে লাগল। সাইন। সাজগোজ। অতিরিক্ত মনোযোগ। সে মনে মনে বুশরার কথা ভাবল। বুশরা কি কখনো এমন করেছে? নাকি সে নিজেই লক্ষ করেনি?
নোমান আরও বলল, কনজারভেটিভ মেয়েরা অনেক সময় নিজেরাই জানে না তারা কী চায়। শরীর চায়, মন ভয় পায়। দুটোর মধ্যে যুদ্ধ চলে। তুই যদি ধৈর্য ধরে সাইন পড়তে পারিস, তাহলে বুঝতে পারবি কতদূর যাওয়া যায়। আবিদ চুপচাপ শুনল। তার মনে একটা অদ্ভুত আস্থা জন্মাচ্ছিল নোমানের কথার উপর। এই ছেলেটা মেয়েদের মন পড়তে জানে। দেখেওছে অনেক। তাই তার কথাগুলো হালকা লাগছিল না।
সেদিনের পর আবিদ বুশরার প্রতিটা আচরণ লক্ষ করতে শুরু করল। কী পরছে, কীভাবে তাকাচ্ছে, কতটা কাছে বসছে। মনের ভেতর নোমানের কথাগুলো বাজছিল বারবার।
________________________________________________________
অন্যদিকে বুশরাও একই রকম কনফিউশন নিয়ে ঘুরছিল। কাশফিয়ার সাথে সেদিনের কথার পর থেকে তার মনে প্রশ্নগুলো আরও জোরালো হয়েছে। সে সাদিয়া আর কাশফিয়াকে নিয়ে একদিন বসল। তিনজনে মিলে। ক্যাফেটেরিয়ার এক কোণে। চারপাশের শব্দ আড়াল করে তারা নিজেদের মধ্যে ডুবে গেল।
বুশরা আগে তার সন্দেহের কথা বলল। আবিদ হয়তো আরও কিছু চায়। সে নিজেও এখন আর আগের মতো নিশ্চিত নয়। তিনজনে মিলে নানা রকম স্ট্র্যাটেজি আলোচনা করতে লাগল। কেউ বলল সরাসরি জিজ্ঞেস কর। কেউ বলল আরও সময় দে। কেউ বলল একটু সুযোগ করে দাও। শেষ পর্যন্ত তারা একটা নরমাল রাস্তায় আগানোর সিদ্ধান্ত নিল। জোর করে কিছু না। শুধু একটু ইঙ্গিত।
সাদিয়া বলল, তুই তো প্রায় সময় মেকআপ ছাড়াই যাস। এখন যেদিন আবিদের সাথে দেখা হবার চান্স থাকবে, একটু লিপস্টিক লাগা। গালে হালকা ব্লাশ। খুব বেশি না। শুধু যতটুকু হলে চেহারাটা একটু উজ্জ্বল লাগে। কাশফিয়া পাশ থেকে বলল, ধর এমন একটা আবায়া পরলি যেটা তোকে আকর্ষণীয় দেখায়। তোর হালকা সবুজ একটা আবায়া আছে। ওটা পরলে খুব সুন্দর লাগে। তেমন কিছু পরবি। তারপর যদি দেখিস আবিদ প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, তাহলে বুঝবি তোর সন্দেহ ঠিক। আবিদ তোদের সম্পর্কে আরও কিছু চায়।
বুশরা জিজ্ঞেস করল, কী ধরনের প্রতিক্রিয়া? কাশফিয়া একটু চুপ করে থেকে বলল, যদি ধর তোর সাজগোজ চোখেই না পড়ে, তাহলে বুঝবি তুই একদম ভুল বুঝেছিস। আবিদের ভেতর কিছু নেই। আবার যদি ধর তোর সাজপোশাকের প্রশংসা করে বারবার, চোখ বারবার তোর দিকে যায়, তাহলে বুঝবি আগ্রহ আছে। কিন্তু সেকেন্ড ধাপে যাবার সাহস নেই। আর যদি ধর তোর হাত ধরে বসে হঠাৎ করে, আঙুল ঘষে, কাছে ঘেঁষে, তাহলে বুঝবি ছেলেটা ভেতরে ভেতরে হর্নি।
সাদিয়া “হাহা” করে হেসে উঠল। কাশফিয়ার মুখ লাল হয়ে গেল। বুশরাও লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলল। অথচ কথাগুলো তার মনে গেঁথে গেল। লিপস্টিক। ব্লাশ। সবুজ আবায়া। প্রশংসা। হাত ধরা। হর্নি। শব্দগুলো ঘুরপাক খেতে লাগল।
তিনজনে আরও কিছুক্ষণ কথা বলল। কীভাবে সাজবে, কী বলবে, কীভাবে তাকাবেএ সব নিয়ে। বুশরার মনে হচ্ছিল সে যেন কোনো নাটকের জন্য রিহার্সাল করছে। অথচ নাটকটা তার নিজের জীবন। সে জানত এসব করা মানে নিজে থেকে একটা সিগন্যাল দেওয়া। আবিদ যদি সেই সিগন্যাল ধরে, তাহলে কী হবে? যদি না ধরে, তাহলেই বা কী হবে? মনের ভেতর ভয় আর কৌতূহল দুটোই জন্মাচ্ছিল।
সেদিনের পর বুশরা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখতে শুরু করল অন্যভাবে। সবুজ আবায়াটা বের করে দেখল। লিপস্টিকের টিউব হাতে নিল। গালে আঙুল বুলিয়ে কল্পনা করল ব্লাশ লাগানোর পর কেমন লাগবে। তার শরীরের ভেতর একটা অদ্ভুত উত্তেজনা কাজ করছিল। লজ্জায় মুখ গরম হয়ে যাচ্ছিল। অথচ সে থামছিল না। মনে মনে বলছিল শুধু একটু টেস্ট। শুধু দেখার জন্য। কিছুই হবে না। অথচ গভীরে গভীরে জানত, কিছু একটা বদলে যাচ্ছে।
আবিদও তার দিক থেকে সাইন খুঁজতে শুরু করেছিল। দুজনেই একে অপরের দিকে তাকিয়ে ছিল এখন। কেউ কাউকে সরাসরি কিছু বলছিল না। শুধু অপেক্ষা করছিল। কোনো একটা ছোটখাটো ইঙ্গিতের। কোনো একটা ভুলের। কোনো একটা সাহসের।
রাতের অন্ধকারে দুজনেই আলাদা আলাদা বিছানায় শুয়ে একই প্রশ্ন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ভাবছিল। কতদূর যাওয়া যায়? কতদূর যাওয়া উচিত? আর যদি একবার পা বাড়িয়ে ফেলি, তাহলে আর পেছনে ফেরা যায় কি না।
Reply
#18

(গ)
-
-
-

বুশরা কাশফিয়ার সাথে দেখা করার আগে অনেকবার মনে মনে কথাগুলো সাজিয়ে নিয়েছিল। কী বলবে, কীভাবে বলবে, কোন শব্দটা বাদ দেবে। সাদিয়ার মেসেজের পর থেকে তার মনে একটা অস্বস্তি লেগেই ছিল। কাশফিয়াকে সেদিন আঘাত করেছে। সেটা সে বুঝতে পেরেছিল। চোখের দৃষ্টিতে, মুখের বিষণ্ণতায়, নীরবতায়। এখন সেই ক্ষতটা একটু হলেও মেরামত করতে চাইছিল।

ক্যাম্পাসের এক কোণে, লাইব্রেরির পেছনের বেঞ্চিতে বসল দুইজন। চারপাশে লোকজন কম। দুপুরের রোদ গাছেদের পাতায় আটকে সরু সরু আলোর রেখা তৈরি করেছে মাটিতে। বুশরা প্রথমে কথা বলতে পারছিল না। কাশফিয়াও চুপচাপ বসেছিল। দুজনের মধ্যে একটা অদৃশ্য দেয়াল এখনো দাঁড়িয়ে। কিছুক্ষণ পর বুশরাই মুখ খুলল। সে সরাসরি স্যরি বলল। কথাটা গুছিয়ে বলার চেষ্টা করল। বলল, সে নিজে থেকেই জিজ্ঞেস করেছিল বলেই কাশফিয়া তার গোপন কথাগুলো বলেছিল। সেখানে তার “আমি অন্যরকম” কথাটা বলা ঠিক হয়নি। আসলে সে ওটা বলেছিল এই বোঝাতে যে সে এইসব ব্যাপারে আরেকটু বেশি ভীতু। বেশি সংকোচবোধ করে। বেশি ভয় পায়। কাশফিয়াকে আলাদা বা খারাপ বোঝানোর কোনো ইচ্ছে তার ছিল না। কথাগুলো বলতে গিয়ে বুশরার গলা একটু কেঁপে গিয়েছিল। সে কাশফিয়ার মুখের দিকে তাকাতে পারছিল না।

কাশফিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে শুনল। তারপর আস্তে করে বলল, সে একটু মাইন্ডই করেছিল। হার্ট হয়েছিল। কারণ বন্ধু ভেবে যখন কেউ গোপন কথা শেয়ার করে, তারপর যদি অন্যজন নিজেকে আলাদা প্রমাণ করতে চায়, তাহলে মনে হয় যেন বিশ্বাস ভেঙে গেল। যেন সেই শেয়ার করা কথাগুলো এখন বোঝা হয়ে দাঁড়াল। বুশরা বারবার স্যরি বলল। বলল এমন কিছু না, এমন কিছু না। তার কণ্ঠে অপরাধবোধ মিশে ছিল। কাশফিয়া শেষ পর্যন্ত মাথা নাড়ল। বলল ঠিক আছে। কথাটা আর বাড়াল না। তাদের মনোমালিন্য পুরোপুরি মিটল না, কিন্তু যে ফাটল ধরেছিল অন্তত সে ফাটল জোড়া লাগানোর প্রথম পদক্ষেপ এই ভুল স্বীকার।

সাদিয়া সেদিন ছিল না। শুধু তারা দুজন। এই একার উপস্থিতিটাই বুশরা আর কাশফিয়া কে অনেক বেশি অনেস্ট  করে তুলল নিজেদের মাঝে। কাশফিয়া কিছুক্ষণ পর জিজ্ঞেস করল আবিদের সেই প্রশ্নগুলো নিয়ে বুশরার এখন কী মনে হচ্ছে। বুশরা চুপ করে থাকল। তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল। সে কনফিউজড। একবার মনে হয় আবিদ আসলেই যৌনতা চায়। আরেকবার মনে হয় হয়তো তাকে টেস্ট করে দেখতে চায় সে কতদূর যাবে। যদি সত্যিই চায়, তাহলে সে কী উত্তর দেবে? হ্যাঁ, নাকি না? এতদিন ধরে সে ধর্ম পালন করে এসেছে। যৌনতাকে বিয়ের পরের জিনিস হিসেবে দেখে এসেছে। এখন যদি হঠাৎ এমন কিছু সামনে আসে, তাহলে কী হবে? সে কি প্রস্তুত? মনের ভেতর এই প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে দিনের পর দিন।

রেডিটের পোস্টগুলোর কথাও বলল। পড়ে মনে হয়েছে পোস্টদাতাদের কথায় যুক্তি আছে। অনেকেই একই দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। হারাম-হালালের টানাপোড়েন, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার ভয়, নিজের বিশ্বাস ভাঙার ভয় সব মিলিয়ে একটা জটিল জায়গা। কিন্তু সেই যুক্তিগুলো বাস্তবে কীভাবে মেনে নেবে, সেটা এখনো বুঝতে পারছে না। মাথায় যুক্তি আছে, শরীরে ভয় আছে, মনে অপরাধবোধ আছে।

কাশফিয়া শুনছিল। তার চোখে একটা চেনা অনুভূতির ছাপ। সে বলল, সেইম কনফিউশনের মধ্যে দিয়ে সে নিজেও গেছে। বুশরা তখন জিজ্ঞেস করল, তাহলে সে কীভাবে এই কনফিউশন থেকে মুক্তি পেল? কী সিদ্ধান্ত নিল? কাশফিয়া একটু হাসল। হাসিতে ক্লান্তি মেশানো। বলল, তোর আর আমার মতো কনজারভেটিভ ফ্যামিলিতে যারা বড় হয়েছে, তাদের এই কনফিউশন থেকে আসলে পুরো মুক্তি নেই। একটু না একটু গিল্ট ফিলিংস থেকেই যায়। সে কখনো শরীরের কথা শোনে, কখনো ধর্মের নিয়মের কথা মানে। দুটোর মধ্যে দোল খায়। কখনো একদিকে হেলান দেয়, কখনো অন্যদিকে।

তারপর কাশফিয়া চুপ করে থাকল কিছুক্ষণ। মনে হচ্ছিল সে আরও কিছু বলতে চাইছে। শেষ পর্যন্ত বলল, তোর সাথে অনেক কথা শেয়ার করে ফেলেছি অলরেডি। আরেকটা কথা শেয়ার করি। প্লিজ সাদিয়াকে বলিস না। বুশরা মাথা নাড়ল। কাশফিয়া আস্তে আস্তে বলতে শুরু করল। মাঝে মাঝে তার মন আর শরীর দুটোই উতলা হয়ে যায়। তখন আর কন্ট্রোল থাকে না। হর্নি হয়ে যাই। শরীরের ভেতর একটা আগুন জ্বলে। তখন বয়ফ্রেন্ড চাইলে দু-একটা চুমু খেতে দেয়। বুবসে হাত দিতে দেয়। কয়েকবার কাপড়ের উপর দিয়ে পুসিতে হাত দিতে দিয়েছে। কথাগুলো বলার সময় কাশফিয়ার গলা নামতে থাকে। মুখ লাল হয়ে আসে। তবু থামে না।

বুশরা পুরো লাল হয়ে গেল। তার শ্বাস বেড়ে গেল। বুকের ভেতর ধুকপুকানি শুরু হলো। এইসব হারাম কথা। অথচ শুনতে একটা অদ্ভুতভাবে ভালো লাগছিল। নিষিদ্ধ কিছু শোনার সেই গোপন আনন্দ। কাশফিয়া যখন বলেছিল কাপড়ের উপর দিয়ে পুসিতে হাত, তখন বুশরার মনে হয়েছিল তার নিজের শরীরটাই যেন একটু কেঁপে উঠল। সে পা দুটো শক্ত করে জড়ো করল। বুশরা বলল, এগুলো তো হারাম। কাশফিয়া মাথা নাড়ল। জানি। কিন্তু সে একটা রুল ঠিক করেছে। যখন আর পারে না, ভেতরে আগুন জ্বলে, তখন এইটুকু করে কিছুটা জ্বালা কমায়। যাতে একদম পাগল হয়ে না যায়। আর পরে বাসায় গিয়ে মাস্টারবেট করে। “মাস্টারবেট” শব্দটা কাশফিয়ার মুখ থেকে বেরোনোর সাথে সাথে বুশরার মুখ আরও লাল হয়ে গেল। ছি। কী বলে। সে মুখ ফিরিয়ে নিল। অথচ কান দুটো যেন আরও সজাগ হয়ে উঠল।

কাশফিয়া তার অবস্থা দেখে একটু খোচা দিল। কেন, তুই মনে হয় করিস না মাস্টারবেট? সত্যি বল। কসম খা। বুশরা উত্তর দিল না। চুপ করে থাকল। কাশফিয়া আবার জিজ্ঞেস করল, তুই হর্নি হস না? বুশরার গলা মৃদু হয়ে এল। বলল, রোজা রাখি আমি মাসে বেশ কয়েকদিন। কাশফিয়া প্রথমে বুঝতে পারেনি। তারপর টের পেল। বুশরা বলতে চাইছে সেই পুরোনো নিয়মের কথা নিজের যৌন জ্বালা মেটানোর বৈধ উপায় না থাকলে রোজা রেখে শরীরের উপর কন্ট্রোল রাখা। কাশফিয়া জিজ্ঞেস করল, এতে হয়? বুশরা মাথা নাড়ল। না। মাঝে মাঝে মাসে দুই মাসে একবার করতে হয়। কাশফিয়া সোজাসুজি জিজ্ঞেস করল, মাস্টারবেশন? বুশরা মাথা নাড়ল। হ্যাঁ। শব্দটা উচ্চারণ করতে চায়নি। শুধু মাথা নাড়ায় স্বীকার করল।

কাশফিয়া তখন হালকা হাসল। বলল, জানিস, আমি মাস্টারবেশনের সময় আমার বিএফকে ভাবি। হালাল মাস্টারবেশন। দুজনেই হেসে উঠল। হাসিটা লজ্জা আর স্বস্তির মিশেল। কাশফিয়া আবার জিজ্ঞেস করল, তুই কী ভাবিস? কাকে ভাবিস? বুশরা উত্তর দিল না। এত লজ্জার কথা কীভাবে বলে। সে রূপকথার কোনো রাজকুমারীর কথা ভাবে। কোনো অজানা রাজকুমার তাকে উদ্ধার করছে। অথবা কখনো কখনো শুধু একজোড়া শক্ত হাত, একটা উষ্ণ শরীর। মুখহীন। পরিচয়হীন। এসব কীভাবে মুখ ফুটে বলা যায়?

কথা এভাবেই চলতে থাকল। দুজনে একে অপরের কথা বুঝতে শুরু করল। কাশফিয়া বলল, অনেক সময় কিছুটা কম্প্রোমাইজ করতে হয়। পুরোপুরি একদিকে থাকলে শরীর বা মন  কোনোটা না কোনোটা ভেঙে যায়। বুশরা তার কথা শুনে আরও কনফিউজড হয়ে পড়ল। তার মনে হচ্ছিল কাশফিয়া যে জায়গায় দাঁড়িয়ে, সেখানে একটা বাস্তবতা আছে যেটা সে এখনো মানতে রাজি নয়। অথচ শরীরের প্রতিক্রিয়াগুলো অন্য কথা বলছিল। বুকের ধুকপুকানি, গলার শুষ্কতা, পায়ের মধ্যে অদ্ভুত টান সব মিলিয়ে সে টের পাচ্ছিল যে তার ভেতরের দেয়ালেও সুক্ষ চিড় ধরেছে।

তারা যখন উঠে দাঁড়াল, রোদটা আরও হেলে পড়েছিল। বুশরার মনে সেই কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছিল। হর্নি। মাস্টারবেট। কাপড়ের উপর দিয়ে হাত। আগুন জ্বালা কমানো। কম্প্রোমাইজ। শব্দগুলো তার মাথায় বাজছিল। সে জানত এসব কথা আগে কখনো এত খোলাখুলি শোনেনি। আর শোনার পর আর আগের মতো থাকা যায় না। কিছু একটা বদলে যায়। ভেতরে। চোখে না দেখা জায়গায়।

বাসায় ফিরে বুশরা অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকল। জানালার পাশে। বাইরে বিকেলের আলো। তার মনে কাশফিয়ার লাল মুখটা ভেসে উঠছিল। আর নিজেরই লাল মুখ। সে দিন শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি। শুধু এটুকু বুঝেছিল কনফিউশনটা আরও গভীর হয়েছে যে গভীরতার কোন তল ওর এই মূহুর্তে জানা নেই।
Reply
#19

(ঘ)
-
-
আবিদের ভেতরের দ্বন্দ্ব এখন আর কেবল রাতের অন্ধকারেই জেগে উঠত না। দিনের বেলায়ও তা তাকে অনুসরণ করত। ক্লাসে বসে প্রফেসরের কথা শুনতে গিয়ে হঠাৎ বুশরার হাতের নরম অনুভূতি মনে পড়ত। লাইব্রেরিতে বই খুলে পাতা উল্টাতে গিয়ে মনে হত সেদিনের সেই আঙুলের উষ্ণতা। ক্যাফেটেরিয়ায় একা চা খেতে গিয়ে দেখত অন্য কাপলদের হাত ধরাধরি করে বসতে। তাদের সহজ স্পর্শ দেখে তার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত হাহাকার চলত। সে নিজেকে বারবার বলত এসব চিন্তা অনর্থক। বুশরার সাথে সম্পর্ক ভালো। সে খুশি। তাহলে আর কী চাওয়া? অথচ শরীর অন্য ভাষায় কথা বলত। রাতে একা বিছানায় শুয়ে থাকলে শরীরের চাহিদা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠত। সে চাপা দিত। গভীর রাতে আর বেশি বেশি ইবাদত করত। তবু মন শান্ত হত না। এক ধরনের অস্বস্তি তাকে ঘিরে ধরত। যেন সে নিজেরই একটা অংশকে অস্বীকার করে চলেছে।
আবিদ নার্ড। সংশয়ের সমাধান সে সবসময় খুঁজত যুক্তি আর তথ্যের মধ্যে। তাই এক রাত গভীর করে ল্যাপটপ খুলল। ঘরের লাইট নিভিয়ে শুধু স্ক্রিনের আলোতে মুখ আলোকিত করে রাখল। গুগলে সার্চ করল নানাভাবে। “Should couples engage in physical intimacy before marriage”, “Benefits of limited physical touch in conservative relationships”, “Is premarital sex necessary for long-term compatibility”, “Religious couples and physical boundaries before marriage”। সার্চ রেজাল্টে অনেকগুলো ব্লগ, সাবস্ট্যাক আর্টিকেল আর ফোরাম পোস্ট এল। কয়েকটার ভিউ লক্ষের ওপরে। সে ধীরে ধীরে কয়েকটা খুলে পড়তে শুরু করল।
প্রথমটা একটা পরিচিত রিলেশনশিপ কোচের সাবস্ট্যাক থেকে। শিরোনাম ছিল “The Quiet Language of Touch”。 লেখক লিখেছিলেন:
“Physical touch is not merely a prelude to sex. It is a language of its own. When two people communicate only through words and never through the body, an entire dimension of the relationship remains unexplored. Limited, consensual touch,holding hands across a table, a lingering hug at goodbye, a forehead kiss can deepen emotional safety rather than threaten it. It tells the other person: I desire you, yet I also respect the boundaries you have set. For many couples, especially those raised in conservative environments, this gradual language becomes the bridge between pure emotion and embodied love.”
আবিদ পড়ে কিছুক্ষণ থামল। কথাগুলো তার মনের গভীরে গিয়ে বিঁধল। সে আবার পড়ল।
দ্বিতীয় আর্টিকেলটা আরও সরাসরি ছিল। একজন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট লিখেছিলেন একটা লম্বা পিস:
“In my practice I have seen many couples who waited until the wedding night for any form of physical contact. A significant number later described a strange sense of disconnect in the bedroom. Not because sex is the most important thing, but because the body carries its own memory and its own vocabulary. Gradual physical exploration before marriage within clearly agreed and respected limits, often helps partners understand each other’s pace, fears, and desires. Crossing the final line remains a deeply personal decision. But denying all touch can create a pressure cooker of unspoken tension that eventually damages the very emotional intimacy the couple is trying to protect.”
তৃতীয়টা একটা সাবস্ট্যাক আর্টিকেল ছিল যার শিরোনাম “Soft Boundaries, Stronger Bonds”。 সেখানে লেখা ছিল:
“If both partners come from religious or highly conservative backgrounds, the answer is not always total abstinence from every form of touch until the wedding night. Soft boundaries holding hands, sitting close enough to feel each other’s warmth, light affectionate gestures can actually reduce the overwhelming pressure of the ‘first time’. They allow the body to learn the other person’s presence slowly. The goal is not to rush toward sex, but to prevent the body from becoming a stranger to the person you love.”
আবিদ তিনটা আর্টিকেল মনোযোগ দিয়ে পড়ল। কিছু লাইন আবার পড়ল। তারপর ল্যাপটপ বন্ধ করল। ঘরের অন্ধকারে শুয়ে থাকল। মাথায় অনেক কথা ঘুরছিল। নোমান যে কথাগুলো বলেছিল যৌনতা দরকারি, শরীরকে অস্বীকার করলে নিজেকেই অস্বীকার করা হয়, কনজারভেটিভ মেয়েরা ইচ্ছা থাকলেও সহজে প্রকাশ করে না সেই কথাগুলোর সাথে এই লেখাগুলো যেন একটা পরিশীলিত সেতু তৈরি করছিল। সে ঠিক করল, ধীরে ধীরে আগাবে। প্রথমে প্রশংসার পরিমাণ বাড়াবে। বুশরার কাপড়ের প্রশংসা, হাতের প্রশংসা, চেহারার প্রশংসা। তারপর যদি পরিবেশ নেয়, হাত ধরবে। অন্য কাপলদের মতো করে। জোর করবে না। শুধু একটু কাছে যাবে। দেখবে বুশরা কী প্রতিক্রিয়া দেয়। এইসব ভাবতে ভাবতে নেক্সট ডেটের ব্যাপারে অনেক রকম ভাবনা চিন্তা শুরু করল আবিদ।
______________________________________________________
অন্যদিকে বুশরাও সেদিন ডেটের প্রস্তুতি নিচ্ছিল অন্যভাবে। সাদিয়া আর কাশফিয়ার কথাগুলো বারবার মনে পড়ছিল। সে তার হালকা সবুজ আবায়াটা আলমারি থেকে বের করল। গত কয়েক সপ্তাহে ওজন সামান্য বেড়েছিল। আবায়াটা শরীরের সাথে আগের চেয়ে একটু বেশি অটোসটো ভাবে লেগেছিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে ধীরে ধীরে আবায়াটা পরল। বুকের কাছে হালকা টাইট হয়ে আছে। স্তনের উঁচু অংশ দুটো কাপড়ের ভেতর দিয়ে উচু হয়ে আছে। বুশরা আয়নার দিকে তাকিয়ে থাকল অনেকক্ষণ। নিজের শরীরকে যেন প্রথমবার দেখছে এমন মনে হচ্ছিল।
সে আবায়ার উপর দিয়ে নিজের বুকে হাত রাখল। দুই হাত দিয়ে স্তনের আকার আলতো করে ধরল। নরম। উষ্ণ। আঙুলের চাপে সামান্য নরম অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল। লজ্জায় তার গাল লাল হয়ে গেল। তবু হাত সরাল না। কয়েক সেকেন্ড রাখল। তারপর ধীরে ধীরে কোমরের দিকে নামিয়ে নিল। সরু কোমর। তারপর হঠাৎ করে হিপস স্ফীত হয়ে উঠেছে। আবায়ার কাপড় সেখানেও একটু টানটান। সে আবায়ার উপর দিয়ে কোমর থেকে নিতম্বের দিকে হাত বুলিয়ে দিল। সফট। ভরাট। গোলাকার। তার তনু শরীরের তুলনায় বুক আর নিতম্বে মাংসের পরিমাণ বেশি এটা সে জানত। অন্য সময় মেয়ে কাজিনরা নিজেরা নিজেদের মাঝে মজা করার সময় অন্য কাজিনদের টিজ ওকে একটা লজ্জায় ফেলত। তবে আয়নায় আজ  নিজের শরীরের এই গোপন জ্যামিতি দেখে তার ভেতর একটা অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি জাগল। লজ্জা। আর তার সাথে এক ধরনের গোপন গর্ব। সে আবার বুকের দিকে হাত নিয়ে গেল। কাপড়ের উপর দিয়ে স্তনের আকার আরও একবার অনুভব করল। নরম। পূর্ণ। চাপলে সামান্য নড়ে। লজ্জায় চোখ বন্ধ করে ফেলল। মনে মনে বলল এসব চিন্তা কেন করছ তুমি বুশরা? অথচ হাত সরাতে পারছিল না সহজে। শরীরের এই অংশগুলো যেন হঠাৎ করেই তার সচেতনতার কেন্দ্রে চলে এসেছে।
সে ঠোঁটে লাল লিপস্টিক লাগাল। হালকা করে। আঙুল দিয়ে ঠোঁটের রেখা ঠিক করল। তারপর আবার আয়নায় তাকাল। সবুজ আবায়া, লাল ঠোঁট, ফর্সা মুখ, গভীর চোখ। নিজেকেই অন্যরকম লাগছিল। যেন সে অন্য কোনো মেয়েকে দেখছে আয়নায়। যে মেয়েটা সাজছে কাউকে দেখানোর জন্য। লজ্জায় তার বুকের ভেতর ধড়ফড় শুরু হল।
আবিদ বুশরা ক্যাফেতে বসল লাঞ্চের জন্য। জানালার পাশের টেবিল। বাইরে দুপুরের রোদ ক্যাফের কাচ ভেদ করে টেবিলের উপর পড়েছিল। আবিদ ফুলহাতা সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট পরে এসেছিল। চুল আঁচড়ানো। বুশরার চোখে সেদিন আবিদকে অন্যরকম লাগছিল। সুদর্শন এটা সে আগেও জানত। কিন্তু আজ প্রথমবার সচেতনভাবে তার শারীরিক সৌন্দর্য পর্যবেক্ষণ করছিল। কাঁধের প্রস্থ, গলার রেখা, শার্টের ভেতর দিয়ে বুকের সমতল আকার, হাতের শিরা, আঙুলের লম্বা আকৃতি। বুশরার মনে হল আবিদের শরীরে একটা শান্ত, পরিচ্ছন্ন সৌন্দর্য আছে। যে সৌন্দর্য চিৎকার করে না। শুধু দাঁড়িয়ে থাকে।
আবিদের চোখেও বুশরা সেদিন আলাদা। সবুজ আবায়া শরীরের সাথে লাগছে। লাল লিপস্টিক ঠোঁটে। মুখটা লম্বাটে, খাড়া নাক, পাতলা লাল ঠোঁট, গভীর চোখ, ফর্সা ত্বক। আবিদ চেহারার সৌন্দর্য আগেও দেখেছে। কিন্তু আজ তার চোখ আবায়ার ভেতর দিয়ে শরীরের আকার খুঁজছিল। বুকের মৃদু উঁচু অংশ, কোমরের সরু রেখা, তারপর হিপসের স্ফীতি। সে লজ্জিত হচ্ছিল নিজের এই দৃষ্টিতে। অথচ চোখ সরাচ্ছিল না। মনে মনে বলছিল স্তনগুলো কাপড়ের নিচে কেমন নরম হবে। নিতম্বের গোলাকার অংশ কেমন। উরুর রেখা আবায়ার ভাঁজে কেমন লুকানো। তার শরীরের ভেতর একটা অদ্ভুত ক্ষুধা জেগে উঠছিল। সার্চ করে পড়া অনেক গুলো আর্টিকেলের উত্তেজক অংশ ওর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল।
আবিদ প্রশংসা শুরু করল। অভ্যাস নেই বলে ইতস্তত করছিল। কথাগুলো বেরোচ্ছিল টিনেজারের মতো অপটু। “আজ খুব সুন্দর লাগছো… এই আবায়াটা… রঙটা তোমার সাথে খুব মিশেছে… হাতগুলোও… খুব সুন্দর… মুখটাও…” বুশরা মজা পাচ্ছিল আবিদের এমন হঠাত তোতলানোতে। লজ্জাও পাচ্ছিল। মনে পড়ছিল কাশফিয়া আর সাদিয়ার কথা ছেলেরা যখন শারীরিকভাবে কাছে যেতে চায়, তখন মেয়েদের বেশি প্রশংসা করে। বুশরা চুপ করে থাকল। চোখ নামিয়ে রাখল। আবিদ সেই চুপ থাকাটাকে সম্মতি ভেবে নিল।
খাবার শেষে আবিদ হঠাৎ করেই বলল, “বুশরা… তোমার হাতটা কি ধরতে পারি?” বুশরা লজ্জায় মুখ লাল করে ফেলল। গলা শুকিয়ে গেল। মানা করতে ইচ্ছে করছিল। অথচ মনে হল যদি মানা করে তাহলে আবিদ কষ্ট পাবে। দুঃখ পাবে। তাই কিছু বলল না। শুধু চুপ করে থাকল। আবিদ তার ফর্সা, নরম হাত দুটো নিজের হাতের ভেতর নিল। আঙুলগুলো আস্তে করে জড়িয়ে ধরল। এমন নরম হাত আবিদের শরীরে একটা কারেন্ট বইয়ে দিল। ভদ্র ছেলে আবিদ মেয়েদের হাত এইভাবে ধরার সুযোগ পায় না। তাই এই নরম স্পর্শে তার প্যান্টের ভেতর পুরুষত্বের চিহ্ন ধীরে ধীরে জেগে উঠতে শুরু করল। শক্ত হতে লাগল। গরম হতে লাগল। সে পা দুটো শক্ত করে জড়ো করল যাতে বোঝা না যায়। নিজেকে চেপে ধরল। অথচ হাত ছাড়তে পারছিল না। বুশরার আঙুলের নরম অনুভূতি তার শরীরের প্রতিটি স্নায়ুতে ছড়িয়ে পড়ছিল।
বুশরাও টের পাচ্ছিল। আবিদের হাতের উষ্ণতা। আঙুলের চাপ। বুক ধড়ফড় করছিল জোরে। একটু আগে কোক খাওয়ার পরও গলা শুকিয়ে আসছিল। পেটের কাছে একটা সুরসুরি অনুভূতি। অপরিচিত। উত্তপ্ত। যেন কোনো নরম আগুন জ্বলে উঠেছে নিচের দিকে। তার শরীরের ভেতর দিয়ে একটা কারেন্ট বয়ে যাচ্ছিল। সে আর সহ্য করতে পারল না। হাত ছাড়িয়ে নিল আস্তে করে। আবিদ একটু অপ্রস্তুত হল। মুখ লাল হয়ে গেল। বুশরা আস্তে বলল, “প্র্যাকটিসের সময় হয়েছে… যেতে হবে।” আবিদ মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ… ক্লাসেরও টাইম হয়ে আসছে।”
তারা ক্যাম্পাসে এল। চুপচাপ। দুজনের বুকেই উত্তেজনা। কেউ কাউকে কিছু বলার সাহস করল না। যে যার পথে চলে গেল। আবিদের শরীরে এখনো সেই কারেন্টের অনুভূতি জ্বলছিল। বুশরার শরীরেও আগুনের ছাপ রয়ে গিয়েছিল।
___________________________________________________________
বুশরা ডিবেট প্র্যাকটিস রুমে ঢুকল। আবিদের স্পর্শ এখনো শরীরে লেগে আছে। গরমে আর লজ্জায় মুখ লাল। সবুজ আবায়া, লাল লিপস্টিক, ফর্সা লাল চেহারা। মাহিকা মেসেজ দিয়েছে একটু দেরি করে আসবে। রুমে শুধু নোমান।
নোমান মাথা তুলে তাকাল। আর তাকিয়ে থাকল। যেন হঠাৎ কোনো হীরার খনি আবিষ্কার করেছে। সবুজ আবায়া শরীরের সাথে লাগছে। বুকের কাছে কাপড়ের টান, হিপসের স্ফীতি, লাল ঠোঁট, লাল গাল। নোমানের গলার কাছে কথা আটকে গেল। তার জিন্সের ভেতর বাড়া টাইট হয়ে উঠল এক নিমিষে। শক্ত। ভারী। শিরা ফুলে উঠেছে মনে হচ্ছিল। আবায়া পরা মেয়েদের সে সাধারণত তেমন আকর্ষণীয় মনে করত না। কিন্তু আজ বুশরা ব্যতিক্রম। দামী পারফিউমের ঘ্রাণ তার নাকে এল। মিষ্টি, গভীর, একটু মসৃণ। তার ভেতরের পুরুষটা জেগে উঠল পুরো শক্তি নিয়ে। নোমানের প্যান্টের ভিতর লুকিয়ে থাকা বাঘটা যে হঠাত হালুম করে উঠল এটা পুরো ন্যাচারাল। নোমান কিছু ভাবে নি আগে, এখন বুশরা রুমে ঢোকার পর ভাবার সুযোগ পায় নি। অটোমেটিক ওর ভিতরের পুরুষটা জেগে উঠেছে।
নারীদেহ নোমানের দূর্বলতা। এতদিন বুশরা কে দেখেও সে দেখেনি। আজকে এই নতুন  বুশরা নোমানের ভিতর একটা দোলাচাল তৈরি করেছে। এই দোলাচাল কি সাময়িক না সত্যি সত্যি কিছু তাই টেস্ট করার জন্য নোমান খাতা নিয়ে বুশরার পাশে এসে দাঁড়াল। খাতায় লেখা যুক্তি গুলো দেখানোর অজুহাতে। বুশরার ঘ্রাণ তার নাকে লাগল আরও ভালভাবে। তার পুরুষাঙ্গ পুরোদমে দাঁড়িয়ে গেল। শক্ত। টানটান। বুশরা পাশে দাঁড়িয়ে খাতার দিকে তাকিয়েছিল। নোমানের শরীর থেকে আসা ঘাম, সিগারেট আর পারফিউমের মিশ্র গন্ধ তার নাকে ঢুকল। আবিদের গন্ধ এমন নয়। আবিদ সবসময় পরিষ্কার, মিষ্টি পারফিউম ব্যবহার করে। ঘামের গন্ধ সে পছন্দ করে না। আবিদকে বলেছেও। আবিদ তাই সব সময় বুশরার সাথে দেখা করবার আগে তার ঘামের গন্ধ কমানোর চেষ্টা করে। নোমান সেসবের ধার ধারে না। তার শরীরের এই বন্য, হিংস্র পুরুষালি গন্ধে যারা তার বিছানায় গেছে তারা পাগল হয়। বুশরা সেসব জানে না। কিন্তু আজ এই গন্ধ তার তনুমনে একটা থইথই নেশার আবহ তৈরি করল। আলাদা করে ঘাম আর সিগারেটের গন্ধ তার চরম অপছন্দ। অথচ আজ এই দুইটা মিশে একটা পুরুষালি ঘ্রাণ হয়ে তাকে আবিষ্ট করে ফেলছিল। সে বুঝতে পারছিল না কী হচ্ছে। শরীর আবেশে আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে। আটকাতে পারছিল না। গলা শুকিয়ে আসছিল। পেটের নিচে সুরসুরি জেগে উঠেছিল।
নোমান আবায়ার উপর দিয়ে তার বুক আর পাছার দিকে তাকাল। মনে মনে বুশরার শরীরের মাপ নিতে থাকল। অশ্লীল কথাগুলো ঘুরতে লাগল মাথায়। এই পাঁচ ফুটি ছোটখাটো মেয়েটার ভেতর বুঝি খুব গোপন আর দামী কিছু লুকানো আছে। দুধগুলো কাপড়ের নিচে কেমন নরম আর ভারী হবে। চাপলে আঙুল ডুবে যাবে। দুটো গোল গোল দুধ হাতে নিয়ে চাপতে ইচ্ছে করছে। পাছাগুলো কেমন গোল আর টানটান। দুই হাত দিয়ে চেপে ধরে টানতে ইচ্ছে করছে। থাইগুলো কেমন মসৃণ আর উষ্ণ। থাইয়ের ভেতরের দিকটা হাত বুলিয়ে দেখতে ইচ্ছে করছে। সেই গোপন সম্পদ উন্মোচন করে দেখতে ইচ্ছে করল। জিভে জল এসে গেল। তার পুরুষাঙ্গ আরও শক্ত হয়ে উঠল। তারপর নিজেকে বকা দিল। কী ভাবছিস হালার পুত? এই মেয়ে তোর জন্য না। এরা নখরাদার। এরা নিজেদের সতী সাজে আর সবাইকে রাবণ ভাবে। দূরে থাক। এইসব ভাবার পরেও চোখ আর মন সরাতে পারছিল না নোমান।
বুশরা ভাবছিল কী হল আজকে? মানুষের ঘাম আর সিগারেটের গন্ধ কেন তার ভেতর ছটফট অবস্থা তৈরি করছে? কেন আবার গলা শুকিয়ে আসছে? পেটের নিচে সেই সুরসুরি কেন? আবিদের হাত ধরার পর যে অনুভূতি হয়েছিল, তার থেকে আলাদা। আরও গভীর। আরও বিপজ্জনক। সে খাতার দিকে তাকিয়ে থাকল। নোমানের উপস্থিতি তার শরীরে একটা অদ্ভুত চাপ তৈরি করছিল। যে চাপ সে আটকাতে পারছিল না।
ঠিক সে সময় মাহিকা এসে পড়ায় আর কিছু এগোল না। দুজনেই নিজের জায়গায় ফিরে গেল। নোমানের শরীর তখনো উত্তেজিত। জিন্সের ভেতর শক্ত অনুভূতি সহ্য করতে কষ্ট হচ্ছিল। বুশরার শরীরেও আগুন জ্বলছিল। অনভিজ্ঞ বুশরা সেই আগুনের গতিপ্রকৃতি ঠিক বুঝতে পারছিল না। সে বুঝতে পারছিল না এই আগুনের উৎস আবিদ, নাকি নোমান, নাকি দুটোই।
__________________________________________________
রাতে বুশরা সাদিয়া আর কাশফিয়ার সাথে কনফারেন্স কলে কথা বলল। আবিদের হাত ধরার কথা বিস্তারিত বলল। দুজনের অস্বস্তি। নিজের ভেতরের অনুভূতি। খারাপ লাগেনি এটাও স্বীকার করল। সাদিয়া পরামর্শ দিল মেসেজ পাঠাতে। “আজকের ডেটের জন্য ধন্যবাদ। এটা আমার সেরা ডেট।” কাশফিয়াও জোর দিল। বুশরা লজ্জায় অনেকক্ষণ ইতস্তত করল। শেষ পর্যন্ত পাঠাল।
আবিদ ডেটের পর থেকে একটু মনমরা ছিল। মনে হচ্ছিল হাত ধরে একটু বেশি এগিয়ে গেছে কিনা। বুশরা হাত ছাড়িয়ে নিয়েছিল। হয়তো খারাপ লেগেছে। ঠিক তখন বুশরার মেসেজ এল। পড়ে তার মুখে হাসি ফুটে উঠল। খুশিতে বুকটা ভরে গেল। নোমানকে জানানো উচিত মনে হল। মেসেজ পাঠাল—
“নোমান, তোর পরামর্শ কাজে লেগেছে। I am so happy. Talk to you in the campus.”
এদিকে নোমান রুমে বসে ভাবছিল। আজকে বুশরার সাজগোজ কেন তার ভেতর এমন প্রতিক্রিয়া তৈরি করল। মনে মনে তার শরীর কেমন হতে পারে ভাবছিল আরও কাঁচাভাবে। আবায়ার নিচে দুধগুলো কেমন গোল আর ভারী। চাপলে কেমন নরম অনুভূতি হবে। দুটো দুধ মুখে নিয়ে চুষতে ইচ্ছে করছে। পাছাগুলো কেমন নরম আর গোল। দুই হাত দিয়ে চেপে ধরে আলাদা করে দেখতে ইচ্ছে করছে। থাইয়ের ভেতরের দিক কেমন মসৃণ আর উষ্ণ। থাই দুটো আলাদা করে হাত বুলিয়ে ভেতরের গরম অনুভব করতে ইচ্ছে করছে। লম্বাটে মুখ, খাড়া নাক, পাতলা লাল ঠোঁট, গভীর চোখ সব মিলিয়ে একটা বিপজ্জনক সৌন্দর্য। সে নিজেকে থামিয়ে দিল বারবার। এই চিন্তা আর না। এই মেয়ে অন্য জগতের। অথচ চিন্তাগুলো থামছিল না।
ঠিক তখন আবিদের মেসেজ এল। পড়ে নোমান হাসল। আবিদ ভালো ছেলে। তাকে হেল্প করতে পেরে ভালো লাগল। মেসেজ পাঠাল—
“Happy for you, lover boy.”
আবিদ সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল—
“You are my hero, playboy. You gave me the right advice.”
আবিদ মেসেজ পাঠানোর পর বিছানায় শুয়ে পড়ল। ঘরের অন্ধকার। সে চোখ বন্ধ করল। বুশরার হাতের নরম অনুভূতি মনে পড়ল। তার স্তনের কথা মনে পড়ল। আবায়ার নিচে যে নরম উঁচু অংশ দেখেছিল। নিতম্বের গোলাকার আকার। সে নিজের পুরুষাঙ্গ হাতে নিল। আস্তে আস্তে। শৈল্পিকভাবে। যেন কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছে। বুশরার স্তন দুটো তার মনে ভেসে উঠল। নরম। ফর্সা। বোঁটা দুটো গোলাপি। সে কল্পনা করল নিজের হাত সেখানে রাখছে। আঙুল দিয়ে বৃত্তাকারে ঘষছে। বুশরার নিতম্বের কথা ভাবল। গোল। নরম। দুই হাত দিয়ে চেপে ধরছে। তার পুরুষাঙ্গ শক্ত হয়ে উঠল। সে আস্তে আস্তে নড়াতে শুরু করল। চোখ বন্ধ। বুশরার মুখ। লম্বাটে। খাড়া নাক। পাতলা লাল ঠোঁট। গভীর চোখ। সে কল্পনা করল বুশরা তার উপরে। স্তন দুটো তার বুকের উপর এসে পড়ছে। নিতম্ব তার পুরুষাঙ্গের উপর চাপ দিচ্ছে। সে হাতের গতি বাড়াল। শ্বাস গভীর হয়ে এল। বুশরার উরুর কথা ভাবল। মসৃণ। ফর্সা। দুই উরুর মাঝখানে তার মুখ রেখেছে। সে আরও দ্রুত নড়াতে লাগল। শরীর টানটান হয়ে উঠল। শেষ পর্যন্ত একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে আনন্দের তরঙ্গে ভেসে গেল। শরীর কাঁপতে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর শান্ত হল। চোখের পেছনে বুশরার মুখটা এখনো ভেসে থাকল। একটা গিল্ট আর একটা ভালবাসা একসাথে জেগে উঠল ওর পুরুষাংগের বিস্ফোরণের পর।
নোমান মেসেজ পড়ার পর বিছানায় শুয়ে পড়ল। হাত দিয়ে জিন্সের বোতাম খুলে ফেলল। বাড়াটা বের করে হাতে নিল। শক্ত। টানটান। শিরা ফুলে আছে। সে বুশরার কথা ভাবল। আবায়ার নিচে দুধগুলো কেমন হবে। গোল। ভারী। নরম। চাপলে আঙুল ডুবে যাবে। সে কল্পনা করল দুটো দুধ হাতে নিয়ে চাপছে। মুখে নিয়ে চুষছে। বোঁটা দুটো জিভ দিয়ে চেটে নিচ্ছে। পাছার কথা ভাবল। গোল। টানটান। দুই হাত দিয়ে চেপে ধরে আলাদা করে দেখছে। থাপ্পড় দিচ্ছে। থাইয়ের কথা ভাবল। মসৃণ। উষ্ণ। থাই দুটো আলাদা করে হাত বুলিয়ে ভেতরের গরম অনুভব করছে। সে বাড়াটা শক্ত করে ধরে দ্রুত নড়াতে শুরু করল। চোখ বন্ধ। বুশরার লম্বাটে মুখ। খাড়া নাক। পাতলা লাল ঠোঁট। গভীর চোখ। সে কল্পনা করল বুশরাকে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে রেখেছে। দুধ দুটো মুখে নিয়ে চুষছে। পাছা দুটো হাতে চেপে ধরে টানছে। বাড়াটা তার ভেতরে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। সে আরও দ্রুত নড়াল। শ্বাস হাঁপিয়ে উঠল। শেষ পর্যন্ত একটা গভীর আওয়াজ করে নিঃশেষিত হল। শরীর কেঁপে উঠল। তারপর শান্ত হল। চোখের পেছনে বুশরার সবুজ আবায়া আর লাল ঠোঁট এখনো ঘুরপাক খাচ্ছিল। নোমানের মনে হল গত দুই সাপ্তাহ কার সাথে কিছু না করার কারণে বুঝি বুশরার শরীর ওর ভিতর ঝড় তুলছে আজ।
অন্য দিকে আবিদ কে মেসেজ পাঠানোর পর বুশরা ফোনটা পাশে রেখে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। ঘরের ভিতর রাতে ঘুমানোর সময় পাতলা টিশার্ট আর কখনো স্কার্ট কখনো প্লাজো পড়ে। আজকে টিশার্ট আর প্লাজো পড়ে আছে। ঘরের লাইট নিভিয়ে দিয়েছিল। শুধু জানালা দিয়ে বাইরের রাস্তার আলো এসে পড়ছিল বিছানার উপর। সেই আলোতে  নিজের হাত দেখতে থাকল। এরপর দুপুরে আবিদের হাতের মুঠোয় ওর হাত ধরে থাকার কথা মনে পড়ল। আবিদের স্পর্শ যেন অনুভব করছে এই রাতে, অন্ধকার ঘরে।  এক হাত দিয়ে অন্য হাত বুলোতে শুরু করল বুশরা। আবিদ যেভাবে ধরেছিল, সেভাবেই। আঙুলের ফাঁকে আঙুল। হাতের তালুতে তালু। তার হাতের রোমগুলো খাড়া হয়ে উঠল। একটা শিহরণ বাহু বেয়ে কাঁধ পর্যন্ত উঠে গেল। সে দুই পা জোড় করে চেপে ধরল। নিজের ভেতরের আবেগটা কন্ট্রোল করার চেষ্টা করল। পারল না। শরীর যেন জেগে উঠছে। গেঞ্জির কাপড় বুকের উপর দিয়ে নরমভাবে লাগছিল। প্লাজোর কাপড় উরুর উপর দিয়ে। সে গেঞ্জির উপর দিয়ে নিজের বুকে হাত রাখল। শ্বাস গভীর হয়ে এল। দুই স্তনের নরম আকার আঙুলের নিচে চাপা পড়ল। সে আলতো করে চেপে দেখল। নরম। উষ্ণ। আঙুল দিয়ে বৃত্তাকারে ঘষতে লাগল। চোখ বন্ধ। শ্বাস আরও গভীর।
দুই পায়ের মাঝে একটা কোলবালিশ টেনে নিল। জোর করে চেপে ধরল। উরুর মাংস দিয়ে বালিশটাকে পিষে ধরল। মনে হল যেন আবিদকে চেপে ধরেছে। আবিদের শরীর তার দুই উরুর মাঝখানে। সে বালিশটাকে আরও শক্ত করে চেপে ধরল। গেঞ্জির উপর দিয়ে স্তন দুটো চেপে চেপে খেলতে লাগল। আঙুল দিয়ে বোঁটাগুলোর জায়গায় হালকা চাপ দিল। একটা মৃদু সুখের ঢেউ তার শরীরের নিচের দিকে নেমে গেল। সে পা দুটো আরও শক্ত করে জড়ো করল। বালিশটাকে উরুর মাংস দিয়ে পিষতে লাগল। শ্বাস হাঁপিয়ে উঠছিল। গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল। পেটের নিচে একটা গরম সুরসুরি জেগে উঠেছিল। সে ঠিক মাস্টারবেট করছিল না। কাপড়ের উপর দিয়েই। কিন্তু শরীর যেন চাইছিল আরও।
ঠিক তখন তার নাকের ভেতর নোমানের সেই গন্ধটা ভেসে এল। স্মৃতি থেকে। সিগারেট মিশ্রিত ঘামের গন্ধ। পারফিউমের সাথে মেশা সেই বন্য পুরুষালি ঘ্রাণ। গন্ধটা তার শরীরে একটা ঝড় তুলে দিল। হঠাৎ করেই। সে বালিশটাকে দুই মাংসল উরু দিয়ে এমনভাবে চেপে ধরল যেন পিষে ফেলতে চাইছে। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। স্তনের উপর আঙুলের চাপ আরও জোরালো হয়ে গেল। চোখের পেছনে অন্ধকারে নোমানের শরীরের গন্ধ ঘুরপাক খাচ্ছিল। আবিদের হাতের নরম স্পর্শ আর নোমানের গন্ধ দুটো মিলে তার শরীরকে একটা অদ্ভুত জায়গায় নিয়ে যাচ্ছিল। সে পা দুটো কাঁপিয়ে বালিশ চেপে ধরে থাকল। গেঞ্জির উপর দিয়ে স্তন দুটো নিংড়ে নিংড়ে খেলতে থাকল। শরীরের ভেতর দিয়ে একটা গরম ঢেউ বয়ে গেল। সে মুখ গুঁজে বালিশে চেপে ধরল। শব্দ বেরোতে দিল না। শরীরের এই তীব্র প্রতিক্রিয়া অবাক করে দিল বুশরা কে। হঠাত করে নাকে এসে লাগা নোমানের ঘাম আর সিগারেটের গন্ধ ওকে বিস্মিত করে দিয়েছে।
নিজেকে বুঝার জন্য বুশরা বালিশ চেপে ধরে শুয়ে থাকল আরও কিছুক্ষণ। গেঞ্জির উপর দিয়ে স্তন দুটো নিংড়ে নিংড়ে খেলতে থাকল। আঙুল দিয়ে বোঁটার জায়গায় চাপ দিতে থাকল। দুই উরু দিয়ে বালিশটাকে পিষতে থাকল। নোমানের গন্ধ এখনো নাকে লাগছিল। আবিদের হাতের স্পর্শ এখনো হাতে লাগছিল। দুইটাই যেন সত্য। দুটো স্মৃতি মিলে তার শরীরকে একটা অদ্ভুত তীব্রতায় নিয়ে যাচ্ছে আবার, অল্প কয়েক মিনিটের মাঝে। সে পা দুটো কাঁপিয়ে বালিশ চেপে ধরে থাকল। শ্বাস হাঁপিয়ে উঠছিল। গলা দিয়ে মৃদু আওয়াজ বেরিয়ে আসছিল। শেষ পর্যন্ত একটা গভীর শিহরণ তার শরীরের নিচের দিক দিয়ে বয়ে গেল। পা দুটো শক্ত হয়ে গেল। স্তনের উপর আঙুলের চাপ জোরালো হয়ে থাকল। কিছুক্ষণ পর শরীর ধীরে ধীরে শান্ত হল। সে বালিশটা আলগা করে দিল। চোখ খুলল। ঘরের অন্ধকার। শ্বাস এখনো অস্থির। গেঞ্জির কাপড় ঘামে ভিজে গিয়েছিল বুকের কাছে। সে মুখ গুঁজে বালিশে শুয়ে থাকল। মনে মনে আবিদের হাত আর নোমানের গন্ধ দুটোই ঘুরপাক খাচ্ছিল। কোনোটাই যাচ্ছিল না। একটা তীব্র অপরাধবোধ ওর মনের ভিতর বয়ে চলতে থাকল সে রাতে।
এইভাবে সেই রাতে তিনজন মানুষ নিজেদের অজান্তে একটা অদৃশ্য সুতোয় একে অপরের সাথে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে গেল।
Reply


Forum Jump:


Users browsing this thread: 1 Guest(s)