Thread Rating:
  • 1 Vote(s) - 5 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5

গল্প: অযাচিত প্রণয়  (Writer: Sana Sheikh)( সমাপ্ত)
#1
Heart 

কানাডা থেকে খালাতো বোনের বিয়ে খেতে এসে নিজেরই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হবে শুনে থ হয়ে গেছে ইমরান । মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছে না তবে মস্তিষ্ক টগবগ করে ফুটছে।

এয়ারপোর্ট থেকে সোজা ছোট খালার বাড়িতে এসেছে। আর আসার দশ মিনিট পরেই শুনছে বর পালিয়ে গেছে গার্লফ্রেন্ডের সাথে। বর ছাড়া বর যাত্রী কি করতে আসবে ? তারা কল করে তুলির বাবার কাছে মাফ চেয়েছেন । তুলির বাবা এখন কি করবেন ? তার মেয়ের কি হবে ? টেনশনে পেশার লো হয়ে নিচে পড়ে গেছেন। মাথায় পানি ঢেলে ওনাকে কিছুটা স্বাভাবিক করা হয়েছে । কিন্তু একটা কথাও বলছেন না তিনি । রাগে থরথর করে কাঁপছেন শুধু । আদরের মেয়ের সামনে কোন মুখে দাঁড়াবেন তিনি ? কি জবাব দেবেন মেয়েকে ? ওই ছেলেকে সামনে পেলে জ*বাই করবেন তামিম ইকবাল। গার্লফ্রেন্ড নিয়ে পালিয়েই যখন যাবি বিয়ের আগের দিন গেলি না কেনো ? বিয়ের দিন কেনো গেলি ? গার্লফ্রেন্ড আছে তাহলে বিয়েতে রাজী কেনো হয়েছিলি ? বিয়ের আগে বললি না কেনো ? 
তুলির মা মিসেস ইয়ানা  স্তব্ধ হয়ে রয়েছেন । 
তুলি এখনো এই সবের কিছুই জানে না , বাড়ির ভেতর রয়েছে এখনো , ওকে সাঁজানো হচ্ছে । বিয়ে বাড়ি পুরো শোকসভায় পরিণত হয়েছে । হই হই , রৈ রৈ , ডিজে গান সব থেমে গেছে । 
এমন এক মুহূর্তে ইমরানের বাবা মুস্তাফিজুর রহমান বলেন ,

_ বিয়ে আজকে হবেই ।

তামিম ইকবাল চোখ তুলে তার দিকে তাকান । 
তারপর আর কি ? ইমরানকে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে । 

বেচারা এই কথা শোনার পর থেকে সাপের মতো ফোস ফোস করছে । কোন দুঃখে বিয়ে খেতে এসেছিল ? 
চ্যারার (কেঁচো) মত চিকন মেয়েকে বিয়ে করবে তাও ইমরান মাহমুদুল ? "সারহীন চিকন সাদা মুলা" বলে ডাকতো সবাই ছোট বেলায়  তুলিকে । কেউ কেউ "ওয়েট লেস তুলা" বলে ডাকতো । আবার কেউ কেউ কেঁচো , কেইছা বা চ্যারা বলে ডাকতো ।  এতো চিকন ছিল ছোট বেলায়। তবে দেখতে পুতুলের মতো লাগতো। সারা দিন ফ্যার ফ্যার করে দৌড়ে বেড়াতো । দুই পাশের ঝুঁটি দুটো উচুঁ নীচু হতো কদম দেওয়ার সাথে সাথে । আর কেঁচো , কেইছা বা চ্যারা বলে ডাকার একটা কারণ আছে তা হলো তুলি ছোট বেলায় মাটি দিয়ে বেশি খেলতো। মাটিতে খেলতে না দিলে গলা ছেড়ে চিৎ*কার করে কান্না করতো। বলা যায় মাটির পোকা ছিল তুলি। এই কারণেই এমন অদ্ভুত অদ্ভুত নামে ডাকতো ওর কাজিনরা । সাথে বড়রাও ভালোবেসে ডাকতো। তুলিকে সবাই পছন্দ করলেও ইমরান করতো না ছোট থেকেই । মাটিতে ল্যাটা দিয়ে বসে খেলা ওর সবচেয়ে অপছন্দ । নিজে তো খেলবেই না অন্য কাউকে খেলতেও দেবে না । গ্রামে নানু বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার পর তুলিকে দেখে একশো হাত দূরে থাকতো। কারণ তুলি ইমরানকে দেখেই দৌড়ে যেতো ওর কোলে চড়ার জন্য । আর গিয়েই নিজের গায়ের ধুলো বালি মাটি ইমরানের গায়ে লাগিয়ে দিতো। তখন ইমরান না পারতো তুলিকে মা*রতে আর না পারতো সহ্য করতে। বেচারা সাপের মতো ফোস ফোস করে নিজেকে শান্ত করতো। 

আর আজকে কিনা সেই তুলিকে বিয়ে করতে হবে ? যাকে ও দুই চোখে দেখতে পারে না । ওর কথা স্মরণ হলে রাগে মাথা ফেটে যায় । ছোট বেলায় নানু বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার পর কি জ্বালান জ্বালাতো ওকে । তখন থেকেই দুচোখে দেখতে পারে না । 

বিয়ের হৈ হৈ রৈ রৈ ডিজে গান আবার শুরু হয় । 
সবাই খুশি হলেও ইমরান কোনো ভাবেই খুশি হতে পারছে না । কিভাবে খুশি হবে ? ওর ত্রিশ বছরের সিঙ্গেল জীবনের ইতি ঘটতে চলেছে । তাও ওর অপছন্দের মেয়ের সাথে । 
ডাক্তারি পড়া শেষ করে কানাডা তেই ডাক্তারি পেশায় নিয়োজিত হয়েছে। এক বছরের মধ্যে ওই দেশের নাগরিকত্ব পেয়েছে। তার পর পনেরো দিনের ছুটি নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিল গত তিন বছর আগে। তখন দুবার দেখেছিল তুলিকে । তার পর আর দেখা হয়নি । 

ইমরানকে একটা রুমে রেস্ট নেওয়ার জন্য পাঠানো হয়েছে । রুমে এসে মাকে কাছে ডাকে ।  মিসেস ইরানী কাছে আসতেই ইমরান রেগে রেগে বলে ,

_ এসব কি হচ্ছে আম্মু ? আসলাম বিয়ে খেতে , আর এখন নিজেরই বিয়ে!

_ বয়স তো কম হয়নি , বিয়ে তো করতেই হবে একদিন না একদিন । তাহলে আজকে করলে সমস্যা কোথায় ? 

_ তুলিকে আমি বিয়ে করবো না ।

_ কেনো ? কি সমস্যা ? তুলি স্মার্ট সুন্দরী শিক্ষিত মেয়ে। তোর পাশে ওকেই মানাবে । 

_ তুমি বুঝতে পারছো না কিছু ?

_ নাহ্ আর বুঝতে চাই ও না । বিয়ে করতে বললেই তোর না না শুধু । বিয়ের কথা উঠলেই নানান বাহানা । 

_ বিয়ে করবো কিন্তু ওকে না । অন্য মেয়ে বিয়ে করবো। 

_ এ দেখি ভূতের মুখে রাম রাম । মুডি বয় ইমরান মাহমুদুল বিয়ে করবে ? তাও নিজের মুখে বলছে ? স্বপ্ন দেখছি না তো আমি ? 

_ মজা করছো আমার সাথে ? 

_ একদমই না ।

_ আমি তুলিকে বিয়ে করবো না এটাই শেষ কথা । 

_ আমি তুলি কেই আমার বাড়ির বউ বানাবো । 

_ ওকেই কেনো বানাতে হবে ?

_ ওকে আমার পছন্দ হয়েছে ওকেই বউ বানাবো। ওকে আমার বাড়ির বউ না বানালে আমি ওই বাড়িতে আর ফিরবো না ।

 কপাল ভ্রু কুঁচকে কিছু সময় মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে ইমরান । তারপর বলে ,

_ ওর বাড়ির বউ হওয়ার সাথে তোমার বাড়ি ফেরার কি সম্পর্ক ? 

_ তুলিকে আমার পছন্দ হয়েছে, ওকে বাড়ির বউ হিসেবে মেনে নিয়েছি আমি । ওকেই বউ বানাতে হবে এটাই আমার শেষ কথা । 

_ আরেক ছেলে আছে তো তার সাথে বিয়ে দিয়ে দাও। ওদের দুজনের স্বভাব চরিত্র এক । 

_ গিয়ে রাজি করা তোর ভাইকে । 

_ করাচ্ছি ।

_ হুম যা ।

ইমরান পকেট থেকে ফোন বের করে ওর মায়ের কাছ থেকে ওয়াইফাই পাসওয়ার্ড নিয়ে ওয়াইফাই কানেক্ট করে । তার পর ছোট ভাই কামরান মাহমুদুল এর ফোনে ম্যাসেজ পাঠায় । 
মিসেস ইরানী কে ডাক দেওয়ায় সে রুম থেকে বেরিয়ে চলে যায় । ছেলের বিয়ে তার অনেক কাজ । 

একটু পরেই কামরান চলে আসে বড় ভাইয়ের কাছে । 
ইমরান গম্ভীর থমথমে হয়ে পায়চারি করছে । 
এতো রাস্তা জার্নি করে এই লোক ক্লান্ত হয়নি নাকি ? চিৎ পটাং হয়ে বিশ্রাম না নিয়ে এভাবে পায়চারি করছে কেনো ? একটু পরেই তো বিয়ে , এখন বিশ্রাম না নিলে বিশ্রাম নেওয়ার সময় পাবে না তো আর । 

_ হ্যাঁ ভাইয়া বলো কি বলবে !
 
_ আমি এই বিয়ে করবো না ।

_ কেন?

_ করবো না মানে করবো না । এতো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবো না । 

কামরান বির বির করে বলে ,

_ খ্যাক খ্যাক করার স্বভাব যায়নি এখনো । 

তারপর বড় ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে ,

_ বিয়ে করবে না তো আমি কি করবো ? 

_ তুই এই বিয়ে ক 

মাঝ খানে থামিয়ে দেয় কামরান । 

_ জীবনেও না ভাই , আমার গার্লফ্রেন্ড আছে ।

_ তো কি হয়েছে ?

_ ওকে আমি অনেক ভালোবাসি । ওকে রেখে অন্য কাউকে বিয়ে করলে বাসর করার আগেই আমার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে । তাছাড়া তুলার বস্তা কে আগে আমি বড় বোনের নজরে দেখতাম আর এখন  ভাবী হিসেবে মেনে নিয়েছি। বড় বোন আর ভাবী মায়ের সমান । আস্তাগফিরুল্লাহ আস্তাগফিরুল্লাহ আস্তাগফিরুল্লাহ এই কথা আর জীবনেও উচ্চারণ করবে না ভাইয়া । আল্লাহ তায়ালা পাপ দেবে । 

_ সর আমার চোখের সামনে থেকে । 

_ আমি এসেছি নাকি ? তুমিই তো ডেকেছো। কি সুন্দর গার্লফ্রেন্ডের সাথে প্রেমালাপ করছিলাম । 

_ তোর মধ্যে লজ্জা সরম বলতে কিছু কি আছে ?

_ নাহ্ , একদম নেই । 

ইমরান তেড়ে যায় কামরানের দিকে । কামরান দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায় । 
ভদ্র সভ্য ইমরান পারছে না ছোট ভাইকে একটা গালী দিতে । ওর আপন ভাই এমন হয়ে গেছে ভাবতেই অবাক লাগে । কেমন লাগাম ছাড়া কথা বলে বড় ভাইয়ের সামনে । লাজ লজ্জা কিচ্ছু নেই । বাড়িতে থাকলে একদম সোজা করে রাখতো । 
পুনরায় পায়চারি করতে শুরু করে । কিভাবে বিয়ে বন্ধ করা যায় । ছোট ভাইয়ের মত বাঁদর মেয়েকে কিছুতেই বিয়ে করবে না ইমরান । এই মেয়েকে কেনো শুধু ! কোনো মেয়ে কেই বিয়ে করতে চায় না ইমরান । বিয়ে মানেই ঝামেলা , আর ঝামেলা মানে প্যারা । আর প্যারা থাকলে মনে শান্তি থাকে না । আর মনে শান্তি না থাকলে কিছুই ভালো লাগে না । ঝামেলা প্যারা আর অশান্তি নিজের জীবনে চায় না ইমরান । একা একাই খুব সুখে শান্তিতে আছে ও । ওর একার জীবনে ব্যাঘাত ঘটতে দেবে না ইমরান । কিন্তু কি করবে ? ছোট ভাই তো বিয়ে করবে না বললো । 

______________________

বিয়ে সম্পন্ন হয়ে যায় । তুলি রোবটের মতো বসে রয়েছে । পাশেই বসে রয়েছে আরেক রোবট । 
তুলি ঘাড় ঘুরিয়ে একবার ইমরানের মুখের দিকে তাকায় । ইমরান গম্ভীর হয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে । কি ভাবছে মনে মনে কে জানে । 
ইমরানের ওই চাহনি দেখে মাথা ঘুরে ওঠে তুলির ।  এই রোবটের সাথে কিভাবে থাকবে ? এই রোবটের আদো কোনো অনুভূতি আছে কি না সন্দেহ আছে । 
দুলতে দুলতে স্টেজের উপরেই কাত হয়ে শুয়ে পড়ে । 
টেনশনে মাথা ঘুরছে ভন ভন । চোখে দেখছে সর্ষে ফুল। 
দুনিয়ায় ছেলের অভাব পড়েছিল ? বিয়ে টা নাহয় আরো দুই চার দশ বছর পর করতো কোনো সমস্যা নেই তো তুলির । 

চলবে..............
 
Reply
#2

Part:02

কনে বিদায় হয়। যাওয়ার সময় তুলির সে কি কান্না। সে কিছুতেই যাবে না। মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছে, বাবাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছে , ছোট ভাইকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছে ওকে যেন না পাঠানো হয়। কিন্তু বিয়ে যখন হয়েছে তখন শশুর বাড়িতে তো যেতেই হবে , এটাই নিয়ম। 
পুরোটা সময় নিশ্চুপ থেকেছে ইমরান। বেচারা লং জার্নি করে এসেছে বাংলাদেশে। ভীষণ ক্লান্ত হয়ে আছে, বিশ্রাম প্রয়োজন । কিন্তু কিসের বিশ্রাম ? কিসের কি ? আসতে না আসতেই একটা বউ জুটিয়ে দিয়েছে বাবা মা চৌদ্দ গুষ্টি মিলে। 

বাড়িতে ফিরে কোনো কথা না বলে নিজের সুটকেস টা নিয়ে সোজা নিজের রুমে চলে আসে ইমরান । 
বউ আর বাসর গোল্লায় যাক। সুটকেস থেকে টাওয়েল ট্রাউজার আর টিশার্ট বের করে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে। ক্লান্ত থাকলেও বেশ সময় নিয়ে শাওয়ার নেয়। 
ড্রেস চেঞ্জ করে রুমে আসে, তারপর রুম অন্ধকার করে বেডে শুয়ে পড়ে। বাকি চিন্তা ভাবনা আগামী কাল করা যাবে এখন ঘুমোনো যাক। 
,
,
তুলি সোফায় বসে আছে। নড়ছেও না চরছেও না। বেচারির মুখের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। কি থেকে কি হয়ে গেলো এখনো বুঝতে পারছে না। 

শিহাব কে সামনে পেলে কাঁচা চিবিয়ে খাবে তুলি। 
 বিয়ে ঠিক হওয়ার আগে দুজন যখন দেখা করেছিল তখন তুলি বার বার জিজ্ঞেস করেছিল বিয়ে তে কোনো সমস্যা বা অমত আছে কি না ! শিহাব বার বার বলেছিল কোনো সমস্যা নেই , অমত ও নেই। 
ব্যাটা এক নাম্বারের লু*চ্চা বদ*মায়েশ শ*য়*তা*ন । 
বিয়ের আগে খুব তো দাঁত কপাটি বের করে বলেছিল  প্রেমও করেনি কোনো দিন। আর আজকে বিয়ের দিন গার্লফ্রেন্ড নিয়ে পালিয়ে গেলো। 
একমাত্র ওই শ*য়*তা*ন শিহাবের জন্য ওর বিয়ে ইমরানের সাথে হয়েছে। সামনে পেলে টুকরো টুকরো করে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেবে। 

মিসেস ইরানী এক গ্লাস ওরেঞ্জ জুস নিয়ে আসেন তুলির জন্য। তুলি খেতে না চাইলেও জোর করে খাইয়ে দেয়। 

_ রুমে যা লেহেঙ্গা চেঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে হালকা ড্রেস পরে নিস। 

_ আচ্ছা । 

বলেই তুলি সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। ভঙ্গুর হয়ে এলোমেলো পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করে। 
মিসেস ইরানী দেখেন তুলির সুটকেস টা নিচেই রয়ে গেছে। তিনি সুটকেস টা হাতে নিয়ে তুলির পেছন পেছন যান। 
তুলিকে গেস্ট রুমে প্রবেশ করতে দেখে ডেকে ওঠেন।

_ তুলি ওদিকে কোথায় যাচ্ছিস ?

_ রুমে ।

_ সেটা তো দেখতে পাচ্ছি , কিন্তু ওই রুমে কেনো ?

_ তাহলে কোন রুমে যাবো ?

_ ইমরানের রুমে ।

_ জীবনেও না খালামণি । 

_ কেনো ? এখন তোরা দুজন স্বামী স্ত্রী । দুজন এক রুমেই থাকবি আজ থেকে। তাড়াতাড়ি এই রুমে আয়। 

_ না আমি ওই রুমে যাবো না। তোমার ছেলে দেখলেই খ্যাক খ্যাক করে উঠবে আগের মতোই। 

_ কিচ্ছু বলবে না এখন। এখন কি তোদের সম্পর্ক আগের মত নাকি ? 

তুলি গেস্ট রুমে ঢুকে যায়। ও জীবনেও ইমরানের রুমে যাবে না। ক্লাস থ্রীতে থাকতে একবার ওর রুমে ঢুকেছিল। ভুল করে একটা সো পিস ভেঙে ফেলেছিল , সেজন্য কি জোড়ে চড় মে*রে*ছিল ওর গালে ভলেনি তুলি ।  তার পর মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আর জীবনেও ওই নাক উচু , অহংকারী , গম্ভীর বদ মেজাজী ইমরানের রুমে আর সামনে কোনো দিন যাবে না।  রাইটার সানা শেখ। তারপর থেকে তুলিও ইমরানকে পছন্দ করে না। ওর সামনেও যায় না সহজে। অতি প্রয়োজন হলে তখনই যেতো। 

 মিসেস ইরানী গেস্ট রুমে প্রবেশ করেন। 

_ তুলি চল এখান থেকে। 

_ এখানেই ঠিক আছি আমি। 

_ তুই ঠিক থাকলেও এভাবে কোনো দিন তোদের দুজনের সম্পর্ক ঠিক হবে না। নিঃসন্দেহে তুই একজন ভালো মেয়ে। আমার ছেলে ও ভালো একজন ছেলে। ছোট বেলায় কি হয়েছে, না হয়েছে সেসব নিয়ে এখনো রেষারেষি করবি দুজন ? এখন তোরা দুজন স্বামী স্ত্রী। হালাল সম্পর্ক তোদের। তোরা এখন একে অপরের পরিপূরক। দুজনেরই চেষ্টা করতে হবে সম্পর্ক  স্বাভাবিক করার। এভাবে দূরে দূরে থাকলে তো হবে না মা । বোঝার চেষ্টা কর । 

তুলি কিছু না বলে চুপ করে রইলো। ভালো লাগছে না, বেশি কিছু ভাবতেও ইচ্ছে করছে না। নিজে থেকেই গেস্ট রুম থেকে বেরিয়ে ইমরানের রুমের সামনে এসে দাঁড়ায়। সুটকেস টা হাতে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। 
পুরো রুম অন্ধকারে নিমজ্জিত। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। 
বুক ধড়ফড় করছে তুলির। ইমরান ওকে এখানে দেখে কেমন রিয়েক্ট করবে ? কিছু বলবে কি ? যদি রাগারাগি করে ? যা করবে , করবে সেটা পড়ে দেখা যাবে। 

অন্ধকারে খুঁজে খুঁজে রুমের লাইট অন করে। সাথে সাথেই পুরো রুম সাদা আলোয় আলোকিত হয়ে যায়। 
বেডের দিকে তাকিয়ে দেখে উপুর হয়ে শুয়ে আছে ইমরান। ইমরানের সাথে একই রুমে থাকতে হবে ভাবতেই হার্ট বিট বেড়ে যায়। পুরো শরীর জুড়ে শিহরণ খেলে যায়। মৃদু কাঁপতে থাকে পুরো শরীর। সুটকেস খুলে ভেতর থেকে জামা পায়জামা আর ওড়না নিয়ে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে। 
লেহেঙ্গা চেঞ্জ করে নেয়। মেকআপ রিমুভ করে হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নেয়। তারপর লেহেঙ্গা হাতে নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে। লেহেঙ্গা সোফার উপরে রেখে হাত মুখ মুছে নেয়। ড্রিম লাইট অন করে বড় লাইট অফ করে দেয়। 

রুমের ডোর লক করে একটু একটু করে বেডের দিকে এগিয়ে যায়। আর একটু একটু করে ওর হার্টের শব্দ বাড়তে থাকে। হাত দিয়ে বুক চেপে ধরে রইলো যেন শব্দ না হয়। কিন্তু অবাধ্য হৃদযন্ত্র থরথর করে কাঁপতেই থাকে। কাঁপতে কাঁপতেই বেডে উঠে শুয়ে পড়ে কিনার ঘেঁষে। বেডের মাঝ বরাবর শুয়ে আছে ইমরান। ওর ভারী শ্বাসের শব্দ তুলির কানে ভেসে আসছে। সেই সাথে ইমরানের গা থেকে ভেসে আসছে পুরুষালি ঘ্রাণ। 
দম আটকে নেয় তুলি। কেমন হাসফাঁস লাগছে এই মুহূর্তে। ইমরানের পাশে শুয়ে থাকতে অস্বস্তি বোধ হচ্ছে। 
চোখ বন্ধ করে নেয়। সাথে সাথেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ইমরানের চেহারা। ধপ করে চোখ খুলে তাকায় আবার। ঘাড় ঘুরিয়ে ইমরানের দিকে তাকায়। ড্রিম লাইটের নীল আলোয় বোঝা যাচ্ছে না ইমরানের চেহারা। ইমরানের দিকে ঘুরে চোখ বন্ধ করে নেয় আবার। অনুভব করার চেষ্টা করে ওরা দুজন হাসবেন্ড ওয়াইফ। বিয়ে হয়ে গেছে দুজনের। আজকের পর থেকে মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ওর সাথেই থাকতে হবে। 
,
,
সকালে ঘুম হালকা হয়ে আসে ইমরানের। কাত থেকে চিৎ হয়ে শোয়। অনুভব করে বুকের উপর অনেক ভারী কিছু রয়েছে । কোলবালিশের ওজন তো এত বেশি না । এটা কি লোহার কোলবালিশ নাকি ? না হলে এত বেশি ওজন কেনো ? মুখের উপর সুরসুরি লাগায় নাক মুখ কুঁচকে একটু চোখ খুলে তাকায়। মুখের উপর থেকে হাত দিয়ে চুল গুলো সরিয়ে দেয়। ওর চুল তো এত লম্বা নয়। রাইটার সানা শেখ।
চুল গুলো থেকে অসাধারণ ঘ্রাণ ভেসে আসছে। কোন শ্যাম্পুর স্মেইল এটা ? ও তো এই শ্যাম্পু ব্যবহার করে না। ভালো ভাবে বুকের দিকে তাকাতেই দেখে ওর বুকের উপর তো কোলবালিশ নয় আস্ত একটা মানুষ শুয়ে আছে। তাও মেয়ে মানুষ । 
এক ঝটকায় বুকের উপর থেকে তুলিকে বেডে ফেলে দেয়। ধড়ফড়িয়ে নিজেও শোয়া থেকে উঠে বসে। তুলি নিজেও লাফিয়ে শোয়া থেকে উঠে বসে। 
দুজনের দৃষ্টি আটকায় একে অপরের মুখের দিকে। 
দুজনেরই পূর্বের ঘটনা স্মরণ হতে কিছুটা সময় লাগলো। 

Reply
#3

Part:03
 
লাফিয়ে বেড থেকে নেমে দাঁড়ায় ইমরান। দুই হাতে ভালো ভাবে চোখ কচলে আবার তাকায় বেডের দিকে। ফোলা ফোলা চোখ মুখ, এলোমেলো চুল-পরনের কাপড়। ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে ওর দিকেই। আবার নিজের দিকে তাকায় ইমরান। আবার বেডে বসে থাকা তুলির দিকে তাকায়। 
ডান হাত উচু করে আঙ্গুল তুলে তুলির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলে ,

_ এই তুই এখানে কি করছিস ? কখন এসেছিস এই রুমে ? আমার বুকের উপর শুয়ে কি করছিলি ? 

তুলির চোখ দুটো বড় বড় হয়ে যায়। ও ইমরানের বুকের উপর উঠে শুয়ে ছিল ? সিরিয়াসলি ? 

_ কিরে কথা বলছিস না কেনো ? 

_ আমি কখন তোমার বুকের উপর উঠে শুয়ে ছিলাম ? আমি তো বেডের এই কিনার ঘেঁষে শুয়ে ছিলাম। 

_ আমি মিথ্যে বলছি ? হাতির মতো শরীর টা নিয়ে তো আমার বুকের উপরেই শুয়ে ছিলি। 

_ একদম মিথ্যে দোষারোপ করবে না আমাকে। আর আমার শরীর হাতির মতোও না , মাত্র চল্লিশের উপর আট কেজি ওজন আমার। আর তোমার বুকের উপর উঠে শুয়ে থাকার কোনো সখ বা ইচ্ছে আমার নেই। নিশ্চই তুমি নিজেই আমাকে তোমার বুকের উপর তুলেছিলে আর এখন আমার দোষ দিচ্ছো। কোন বদ মতলবে আমাকে তোমার বুকের উপর তুলেছিলে ? 

তুলির কথা শুনে ইমরানের রাগ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে। গলা ছেড়ে ডেকে ওঠে ,

_ আম্মু আম্মু আম্মুউউউউ ।

মিসেস ইরানী রান্না শেষ করে টেবিলে খাবার সাজিয়ে রাখছিলেন। বড় ছেলের হাক ডাক শুনে বুয়া কে খাবার সাজাতে বলে দ্রুত ইমরানের রুমের দিকে এগিয়ে যান। 
ইমরানের গলা ছেড়ে ডাক শুনে কামরান আর মুস্তাফিজুর রহমান ও রুম থেকে বেরিয়ে আসে। 
তিন জন একসাথে এসে দাঁড়ায় ইমরানের রুমের সামনে। 

ডোরের দিকেই তাকিয়ে ছিল ইমরান। 

_ ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি দেখছো ? ভেতরে আসো।

তিন জন একসাথে ভেতরে প্রবেশ করে। 
মিসেস ইরানী বলেন ,

_ কি হয়েছে ? এভাবে চিৎ/কার করছিস কেন?

_ তুলি এই রুমে কি করছে ?

_ তো কোন রুমে থাকবে ? 

_ কোন রুমে থাকবে সেটা আমি কিভাবে জানবো ? 

_ তুই জানবি না কেনো ? তোর বউ তোর রুমে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। 

_ না ও আমার রুমে থাকবে না। 

_ ও এই রুমেই থাকবে।

_ বলছি তো থাকবে না।

_ বলছি তো থাকবে।

_ ওকে নিয়ে যাও আমার চোখের সামনে থেকে। ওই বের হ আমার রুম থেকে।

_ একদম বের হবি না তুলি। এই রুমে ইমরানের যতটা অধিকার আছে, তোরো ঠিক ততটাই অধিকার আছে। মনে রাখবি এখন এই রুম তোরো। এই বাড়িও এখন তোর।  এই বাড়ির সব কিছুতেই তো অধিকার আছে এখন। কারো কথা শুনে কিছুতেই এই রুম থেকে বের হবি না। গত কাল থেকে ইমরান ও তোর , ওকে কিছুতেই ছাড়বি না। 

"গত কাল থেকে ইমরান ও তোর , ওকে কিছুতেই ছাড়বি না"।  এই কথা গুলো তুলির কানে রিপিট রিপিট হয় কয়েক বার। অদ্ভুত শিহরন বয়ে যায় পুরো শরীর জুড়ে।
অদ্ভুত এক অনুভূতি হয়। শরীর জুড়ে বিদ্যুৎ খেলে যায়। 

মায়ের কথা গুলো শুনে ফুঁসে ওঠে ইমরান। খ্যাপাটে কন্ঠে বলে,

_ একদম না। তুলি কিছুতেই এই রুমে থাকবে না। আর ও যদি থাকে তাহলে আমি থাকবো না।

_ না থাকলি। 

_ আম্মু।

_ চিৎ/কার করছিস কেনো ? কানে শুনতে পাই তো আমি। আমার কানে কোনো সমস্যা নেই, আস্তে কথা বল। কানের পর্দা ফাটিয়ে দিবি নাকি ? 

_ ওকে নিয়ে যাও আমার রুম থেকে।

_ দুনিয়া উল্টে গেলেও না। বিয়ে করেছিস এখন থেকে ওর দায়িত্ব তোর।

_ জোর করে বিয়ে করিয়েছো তোমরা। আমার ঝামেলাহীন জীবনে ঝামেলা জুটিয়ে দিয়েছো তোমরা সবাই মিলে। 

_ জীবনে ঝামেলা না থাকলে জীবনের আনন্দ বোঝা যায় না। ভালো থাকতে হলে জীবনে ঝামেলার প্রয়োজন আছে। জঞ্জাল ভালো কাঙ্গাল ভালো না। তাই ঝামেলা নিয়ে জীবন যাপন কর। অকারণে চিৎ/কার চেঁচা/মেচি করবি না। রান্না শেষ হয়েছে ফ্রেশ হয়ে দুজন  খেতে আয় অনেক বেলা হয়ে গেছে। 

তারপর ছোট ছেলে আর স্বামীর দিকে তাকান।

_ চলো খাবার খাবে। 

রুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে আবার বলেন,

_ তারাতারি আসবি দুজন , খাবার ঠান্ডা হয়ে যাবে নয়তো। 

চলে যায় তিন জন। 
তুলির দিকে খ্যাপাটে দৃষ্টিতে তাকায় ইমরান। 

_ বের হ আমার রুম থেকে। 

কেনো যেনো আজ তুলির একটুও ভয় করছে না ইমরান কে, আবার আগের মত রাগ ও উঠছে না। আগে দেখলেই ভয় কাজ করতো, রাগ উঠতো। ইমরানের চুল গুলো টেনে ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করতো। রাগে ওর সামনেই আসতো না। 
গত কাল রাতেও ভয় কাজ করলো এই রুমে আসতে। যদি রেগে আবারো চড় দেয় ছোট বেলার মত ! অথচ আজকে সেসব কিছুই হচ্ছে না। উল্টো ইমরানের উপর শোধ তুলতে ইচ্ছে করছে। ভয়ের চেয়ে ইমরানের উপর রাগ বেশি জমে আছে। ছোট বেলায় ওর সাথে যা যা করেছে সেসবের শোধ তুলবে আস্তে আস্তে সুধে আসলে। তুলিকে তো চেনেনা। হাড় মাংস জ্বা/লিয়ে খাবে ওর। এখন আর আগের সেই তুলি নেই। 

_ কি বলছি কানে যাচ্ছে না ? বের হ আমার রুম থেকে।

আয়েশ করে হাত পা ছড়িয়ে বেডে শুয়ে পড়ে তুলি। ইমরানের দিকে তাকিয়ে গা জ্বা/লা এক হাসি ফুটিয়ে বলে ,

_ যা বো না। তোমার যেতে ইচ্ছে করলে তুমি যাও। 

ধমক দিয়ে বলে,

_ যা আমার চোখের সামনে থেকে।

_ ঠ্যাকা পড়েনি আমার কারো কথা শুনতে।

মৃদু চিল্লিয়ে বলে,

_ তুলিকা।

_ জি ভাইয়া।

_ বের হতে বলেছি আমি। 

_ খালামণি কি বলে গেলো মনে নেই ? 

ইমরান গজগজ করতে করতে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে। 
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ফোস ফোস করছে। কত বড় সাহস ওর মুখে মুখে তর্ক করে ! আগে দেখলে তো ভয়ে হাঁটু কাপতো। ওর সামনেই আসতো না। 
আয়নার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভেবে ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা দেখা যায়। 

তুলি বেড থেকে নেমে এলোমেলো বেড গুছিয়ে রাখে। 
ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল গুলো ব্রাশ করে নেয়। সুটকেস থেকে টুথব্রাশ বের করে হাতে নিয়ে ঘুরে ফিরে রুম টা দেখতে শুরু করে। 
এই রুমে খুব কমই আসা হয়েছে ওর। ইমরানের উপর রাগ করেই এই রুমে প্রবেশ করতো না। 

ফ্রেশ হয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে ইমরান। তুলিকে দেখেও কিছু বলে না। তুলি একবার ইমরানের দিকে তাকিয়ে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে। 
তুলি ওয়াশরুমে প্রবেশ করতেই ইংরেজিতে কয়েক টা বকা দেয় ইমরান। 
এক'টা মাস কোনো রকমে সহ্য করতে পারলেই হয়। 

এক টেবিলে বসেই সকালের খাবার শেষ করে পাঁচ জন। 

খাওয়া শেষে তৈরি হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় ইমরান। স্কুল কলেজের বন্ধুদের সাথে দেখা করতে যাবে। সারা দিন আর ফিরবে না বাড়িতে। 
আশ্চর্য্য তুলিকে দুই চোখে দেখতে ইচ্ছে করছে না। 
তুলিকে দেখলেই রাগ বেড়ে যাচ্ছে তরতর করে। ছোট বেলায় দেখলে যতটা রাগ হতো , তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি রাগ হচ্ছে এখন। ইচ্ছে তো করছে এক আছাড়ে তুলির ভবলীলা সাঙ্গ করে দিতে। 

ইমরান বেরিয়ে যেতেই মুখ ভেংচি কা/টে তুলি। 
দেখলেই ইচ্ছে করছে মাথা ফাটিয়ে দিতে। 
তুলি নিজেকে দেখে নিজেই আশ্চর্য্য হচ্ছে সকাল থেকে। ওর ভেতরে এত সাহস কোথা থেকে আসলো ? সাহস ওয়ালা জ্বীন ভর করেনি তো ওর উপর ? না হলে এত সাহস তো হওয়ার কথা ছিল না। নানান টেনশানে গত কাল বিয়ে শেষ হওয়ার পর যেখানে মাথা ঘুরে স্টেজেই শুয়ে পড়েছিল সেখানে আজ ইমরানের মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মত বুদ্ধি ওর মাথায় কিলবিল করছে। 
সত্যি সত্যিই বোধহয় জ্বীন ভর করেছে। 

বেডে শুয়ে পড়ে। ঘুম পাচ্ছে ভীষণ, ক্লান্ত ও লাগছে। বিয়ের চক্করে পরে কয়েক দিন ধরে ঘুমোতে পারেনি। শপিং মল , পার্লার দৌড়াদৌড়ি করতে করতেই 
আধম/রা অবস্থা। এখন ঘুমোতে পারলে একটু ভালো লাগবে। গত রাতেও ঘুমোতে পারেনি টেনশনে। শেষ রাতের দিকে ঘুমিয়েছিল একটু । 

________________

রাতে বাড়ি ফেরে ইমরান। কোনো কিছুই বলে না চুপ চাপই থাকে। ঝামেলা করে কাজ নেই মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে। 
রাতের খাবার টাও একসাথেই খায় পাঁচ জন। 

খাওয়া শেষ করে আগে আগে রুমে চলে আসে তুলি। কে জানে শ*য়*তা*ন ইমরান আগে রুমে এসে যদি ডোর লক করে দেয় ? তাহলে তুলি ওকে শায়েস্তা করবে কিভাবে ? 

রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে শুয়ে পড়ে তুলি। একটু পর রুমে আসে ইমরান। ডোর লক করে বেডের দিকে তাকাতেই মেজাজ তুঙ্গে। 

_ বেড থেকে নাম।

_ কেন?

_ তোর সাথে এক বেডে ঘুমাবো না আমি। তুই নিচে ঘুমাবি।

বেড থেকে একটা বালিশ তুলে ছুঁড়ে দেয় ইমরানের দিকে। বালিশ টা ক্যাচ ধরে ইমরান। 
তুলি বলে ,

_ "সারওয়ালা সাদা মুলা" তুমি নিচে ঘুমাও। 

রেগে তুলির দিকে তাকিয়ে রইলো ইমরান। ওর ডাক ওকেই ফিরিয়ে দিচ্ছে ! ছোট বেলায় সকলের সাথে সাথে ইমরান নিজেও মাঝে মধ্যে তুলিকে "সারহীন সাদা মুলা" বলে ডাকতো। তার শোধ তুলতে আজ ওকে "সারওয়ালা সাদা মুলা" বলে ডাকছে। 
চিৎকার করে বলে , 

_ তুলির বাচ্চা।

_ সবে মাত্র গত কাল বিয়ে হলো , এখনই বাচ্চা কোথা থেকে আসবে ? পাগল হয়েছো নাকি তুমি ? 

তুলির দিকে তেড়ে যায় ইমরান।

Reply
#4

Part:04
লাফিয়ে বেডে উঠে যায় ইমরান। ধড়ফড়িয়ে শোয়া থেকে উঠে বসে তুলি। তুলির দুই পাশে হাত দিয়ে ওর দিকে ঝুঁকে যায় ইমরান। দুজনের মাঝে কয়েক ইঞ্চির দুরত্ব। ইমরান দাঁতে দাঁত চেপে কটমট করে বলে,
_ কি বললি আবার বল।
_ কি বলেছি ?
_ মনে নেই ?
_ না , কি বলেছি ?
_ বের হ আমার রুম থেকে। 
_ হবো না, রুম তোমার একার নাকি ? এই রুম আমারও রুম। এই রুমে থাকবো নাকি থাকবো না সেটা আমার ইচ্ছে। এই রুম থেকে কখন বের হবো, কখন আসবো সেটাও আমার ইচ্ছে। তোমার ভালো না লাগলে ওই যে দরজা আছে , ওখান দিয়ে বেরিয়ে যাও। 
_ তুলি ।
_ আস্তে বললেও শুনতে পাই আমি।
_ তুই ভয় পাশ না আমাকে ?
_ তুমি বা/ঘ না ভা/ল্লু/ক যে তোমাকে দেখে ভয় পেতে হবে ? 
_ বা/ঘ ভা/ল্লু/কের মতো কা/ম/ড় দিয়ে খেয়েও ফেলতে পারি। 
এই কথা ইমরানের মুখ দিয়ে বের করতে দেরি তবে এই কাজ তুলির করতে দেরি হয় না। 
একটু সোজা হয়ে ইমরানের টিশার্টের উপর দিয়েই ওর বুকে কা/ম/ড় দিয়ে ধরে।  হতভম্ভ হয় ইমরান। রা/ক্ষ/স নাকি এই মেয়ে ?  
ব্যাথা পেয়ে তুলিকে নিজের কাছ থেকে সরানোর চেষ্টা করে কিন্তু পারে না। এত জোড়ে কা/ম/ড় দিয়ে ধরেছে যে মনে হচ্ছে বুকের চামড়াই উঠে যাবে। 
তুলির বাহু ধরে বলে,
_ তুলি ছাড় বলছি , নয়তো কিন্তু তোর কপালে দুঃখ আছে। 
ঠেলে ঠুলে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দেয় তুলি কে। 
সোজা হয়ে বসে ইমরান। তুলি একটু সরে যায় ওর কাছ থেকে। ইমরান বুকে হাত চেপে ডলা দেয় কয়েক টা। 
ইমরানের মুখ লাল হয়ে গেছে। টিশার্ট উপরে তুলে বুকের দিকে তাকায়। র/ক্ত জমাট বেঁধে ফুলে উঠেছে। 
কি জোড়ে কা/ম/ড় টা দিয়েছে ! মনে হচ্ছে জায়গা টুকু পচে গেছে। তুলিও তাকায় ইমরানের বুকের দিকে। 
ফর্সা লোমশ বুকে তুলির সিলমোহর বসে গেছে। 
ইমরান রেগে তুলির দিকে তাকায়।
_ রা/ক্ষ/স নাকি তুই ? কি করেছিস ?
_ জীবনে দ্বিতীয় বার আমাকে কা/ম/ড়ে খাওয়ার সখ যেন না জাগে সেই কাজ। 
টিশার্ট ঠিক করে একটা বালিশ হাতে তুলে নেয় ইমরান। বালিশ দুই হাতে ধরে তুলির দিকে এগিয়ে বলে,
_ আজকে তোকে বালিশ চাপা দিয়ে মে/রে/ই ফেলবো। 
_ ডাক্তারের কাজ মানুষ সুস্থ্য করা, খু/ন করা না। তাই ভুলেও এই কাজ করতে আসবে না ডাক্তার সাহেব। 
_ জীবনে অনেক মানুষ সুস্থ্য করেছি একজন খু/ন করলে কিছুই হবে না। 
তুলি লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে। ইমরানের দিকে তাকিয়ে হেসে বলে,
_ এখন মা/র/তে সুবিধা হবে। 
তুলি যানে ইমরান যাই বলুক ওকে জানে মা/র/বে না। 
রাগে ফোস ফোস করতে করতে হাতের বালিশ টা পাশে রেখে উপুর হয়ে শুয়ে পড়ে। 
_ শ/য়/তা/ন মহিলা লাইট অফ করে দিয়ে আয়। 
তুলি অন্য পাশ ফিরে শুয়ে বলে ,
_ ঠ্যাকা পড়েনি আমার। তোমার সমস্যা হলে তুমি অফ করে দিয়ে আসো। 
বালিশ থেকে মুখ তুলে তুলির দিকে তাকায় ইমরান। তুলির মুখ দেখা যাচ্ছে না, শুধু পিঠ দেখা যাচ্ছে। দুজনের মাঝে দুই হাত দূরত্ব তৈরি হয়েছে। দুজনেই বেডের দুই পাশে কিনার ঘেঁষে শুয়ে আছে। 
ইমরান বুঝতে পারছে না হঠাৎ তুলির এত পরিবর্তন কিভাবে হলো ? এই তুলি তো সেই তুলি না। যেই তুলি বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পরে ভয়ে টেনশনে মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিল সেই তুলি কিনা বিয়ের পরের দিন থেকে ওর মুখে মুখে তর্ক করছে ? এটাও সম্ভব ? 
তুলিকে আর কিছু না বলে ইমরান নিজেই বেড থেকে নেমে লাইট অফ করে দিয়ে বেডে এসে শুয়ে পড়ে আবার। 
_ ভুলেও আমার বুকের উপর উঠবি না। আর এই বালিশ টা তো কোনো ভাবেই ক্রস করবি না। 
বলেই মাঝখানে কোলবালিশ রেখে দেয়। তুলি সাড়া শব্দ করে না। ইমরান ও আর কিছু না বলে চুপ চাপ শুয়ে রইলো। ছুটির এই এক'টা মাস কোনো ভাবে তুলিকে সহ্য করে নিতে পারলেই হয়। একবার কানাডা ফিরে গেলে ভুলেও আর বাংলাদেশে ফিরে আসবে না। 
এই বিয়ে, সংসার , ভালোবাসা এসব ওকে দিয়ে হবে না। এই সব কিছুর প্রতি কোনো আগ্রহ নেই ওর  সেই ছোট বেলা থেকেই। বিয়ের পর থেকে ওর মাথাই ঠিক ঠাক কাজ করছে না। ওর সাজানো গোছানো পরিপাটি সিঙ্গেল জীবন এলোমেলো হয়ে ডবল হয়ে গেছে। যেখানে বিয়েই করতে চায়নি , সেখানে নিজের অপছন্দের একজন কে কিছুতেই বউ হিসেবে মেনে নিতে পারছে না। কানাডা ফিরে যাবে বাংলাদেশে আর ফিরবে না এটাই ভালো বুদ্ধি। 
কিন্তু ইমরান ভুলে গেছে মানুষ সব সময় যা ভাবে , যেভাবে করতে চায় তা প্রকৃতির নিয়মেই পরিবর্তন হয়ে যায়। আমরা চাইলেই সব হয় না। 
যেখানে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা ওদের জুটি বেঁধে দিয়েছেন সেখানে ইমরান চাইলেই কি তুলির থেকে আলাদা হতে পারবে ? 
________________ 
অনেক গুলো  দিন পেরিয়ে যায়। দুজনের সম্পর্কের কোনো উন্নতি হয়নি। আগের মতোই রয়েছে এখনো। ইমরান সকালে বাড়ি থেকে বের হয় দুপুরে ফিরে খাবার খেয়ে আবার বেরিয়ে যায়। মাঝ রাতে বাড়ি ফেরে ততক্ষণে তুলি ঘুমে বিভোর। এসে নিজেই বেড়ে খেয়ে শুয়ে পড়ে। 
এর মধ্যে দুবার তুলির বাবার বাড়িতে গিয়েছিল। 
কারো কোনো কথা শোনে না ইমরান। কেউ বেশি কিছু বলেও না, বললেই রেগে যায়। এমনিতেই জোর করে বিয়ে টা করিয়েছে। 
আর কোনো উপায়ও ছিল না তখন এটা করা ছাড়া। একটা মেয়ের বিয়ের দিন যখন কোনো কারণে বিয়ে টা ভেঙে যায় তখন সেই মেয়ে আর পরিবারের কেমন অবস্থা হয় তা অন্য কেউ আন্দাজ করতে পারবে না। সমাজের চোখে কতটা ছোট হতে হয় তা কারো অজানা নয়। এই একটা কথার জের ধরে বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন কথা শোনায় মেয়ে টা কে, তার পরিবার কে। মেয়েটার দোষ নেই সেটা কারো চোখে পড়ে না। বিয়ে টা কেনো ভেঙে গেলো সেটাও কেউ দেখবে না। শুধু দেখবে মেয়েটার বিয়ে ভেঙে গেছে কোনো কারণে। মেয়েটা খারাপ , কোনো দোষ আছে, বড় কোনো ঘাপলা নিশ্চই আছে তাই বিয়ে টা হয়নি। এই সমাজের মানুষ জন বড়ই অদ্ভুত। তারা তিল কে তাল বানিয়ে তবেই ছারে। 
ইমরান ম্যাচিউর একজন ছেলে হয়ে এমন আচরণ করবে কেউ ভাবেনি। ভেবেছিল একবার বিয়ে টা হয়ে গেলে আস্তে আস্তে সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে। 
কিন্তু ইমরান কিছুতেই তুলিকে মেনে নিতে পারছে না। তুলিকে দেখলে অটোমেটিক ওর রাগ বেড়ে যায়। রাগ হওয়ার মতো কোনো কারণ নেই তবুও রাগ হয়। 
আর এক সপ্তাহ তার পর ইমরানের ফ্লাইট। এই এক সপ্তাহ ইমরানের কাছে এক বছরের মতো লাগছে। সময় যেন আগাচ্ছে না। সময়ের কা/টা থেমে গেছে। 
পরিবারের সাথেও সেরকম সময় পাড় করে না। 
আজ রাতে বারোটার পর বাড়ি ফেরে ইমরান। ড্রইং রুমে এসে দেখে ওর মা সোফায় বসে আছে। একটু অবাক হয় মাকে দেখে। আজ এখনো জেগে আছে কেনো ? 
_ আজ এখনো ঘুমাওনি কেনো আম্মু ?
মিসেস ইরানী ইমরানের দিকে তাকান। ইমরানকে বেশ ক্লান্ত লাগছে। 
_ কোথায় ছিলি ?
_ রাস্তার মোড়ে।
_ কটা বাজে এখন ?
_ বারোটা পনেরো।
_ নতুন বউ ঘরে রেখে এত রাত পর্যন্ত বাইরে থাকার মানে কি ইমরান ? এক সপ্তাহ পর তোর ফ্লাইট , এই কটা দিন মেয়ে টা কে একটু সময় তো দিতে পারিস। 
ওর মনের উপর দিয়ে কি বয়ে যায় কখনো বোঝার চেষ্টা করেছিস ? তোর সামনে হাসি খুশি থাকে বলে তুই ভাবিস তুলি খুশি আছে ? ওর কষ্ট হয় না ? ওর খারাপ লাগে না ? মেয়েটা সারা দিন ওই রুমের মধ্যে চুপ চাপ বসে থাকে। কথা বলতে গেলে বলতে চায় না। আগে কামরানের সাথে কত হাসি খুশিতে সময় পাড় করতো, এখন কামরানের সাথেও কথা বলে না। প্রয়োজন ছাড়া রুমের বাইরে বের হয় না। মেয়ে টা ভেতরে ভেতরে গুমরে গুমরে শেষ। মাঝে মাঝেই দেখি ওর চোখ মুখ ফোলা ফোলা থাকে। চোখ লাল হয়ে থাকে। কিছু বলতে গেলে শোনে না, ইগনোর করে। জোর করে কিছু বলতেও পারি না। মেয়েটার ভালো করতে গিয়ে উল্টো খারাপ করে দিলাম বোধহয়। নিজের কাছে নিজেকেই অপরাধী মনে হয় এখন। আমার এই সিদ্ধান্ত টা ভুল ছিল হয়তো। 
ইমরান কিছু বলে না। মাথা নিচু করে মায়ের সব কথা শোনে। 
_ খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়। 
কিছু না বলে ফ্রেশ হওয়ার জন্য চলে যায় ইমরান। 
রুমে এসে বেশ অবাক হয়। আজ রুম ফাঁকা, তুলি নেই রুমে। ওয়াশরুম, বেলকনিতে কোথাও নেই তুলি। কোথায় গেলো ? ড্রেসিং টেবিলের উপর তুলির জিনিস গুলো নেই। ড্রেসিং টেবিল ফাঁকা। আলমারি খুলে দেখে, আলমারি ফাঁকা। তুলির একটা ড্রেস ও নেই। 
হয়তো অন্য রুমে শিফ্ট হয়ে গেছে। ওর জন্য ভালোই হয়েছে। বেশি কিছু না ভেবে টাওয়েল নিয়ে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে। 
ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে আসে। মিসেস ইরানী তখনো সোফায় বসে আছেন। তার মন টা বিষন্ন হয়ে আছে। 
ইমরান সোজা গিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে। নিজেই বেড়ে খেতে শুরু করে। কিন্তু আজকে কেনো যেনো খাবার গলা দিয়ে নামছে না। অল্প কিছু খাবার খেয়ে হাত ধুয়ে উঠে দাঁড়ায়। বাকি খাবার ফ্রিজে তুলে রেখে দেয়। 
সব কিছু করে সোফার কাছে এসে দাঁড়ায়। 
_ অনেক রাত হয়েছে ঘুমোতে যাও আম্মু।
_ তুই যা।
যায় না ইমরান। বুঝতে পারে কিছু একটা হয়েছে। অন্য দিন তো এমন করে না। 
_ তুলি কোথায় আম্মু ?
মিসেস ইরানী মুখ তুলে ইমরানের মুখের দিকে তাকান।
_ চলে গেছে।
চমকায় ইমরান।
_ কোথায় গেছে ?
_ ওর বাবার বাড়িতে। 
_ কেনো ?
_ তোর জন্য।
_ আমার জন্য ? 
_ হ্যাঁ তোর জন্যই। তুলি এই বাড়িতে থাকলে তো তোর অনেক সমস্যা। ওর জন্য তুই নিজের বাড়িতেই থাকতে পারিস না। সারা দিন বাইরে বাইরে থাকিস। নিজের ফ্যামিলির সাথেও সময় কা/টা/তে পারিস না। তোর রুম দখল করেছে, তোর বাড়ি দখল করেছে, তোর ফ্যামিলি কে তোর কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছে। তাই তোর সব কিছু তোকে ফিরিয়ে দিয়ে চলে গেছে। তুই আমাদের বড় ছেলে। তোর প্রতি আমাদের টান টাও বেশি। কত গুলো বছর ধরে তো দূরে দূরেই থাকিস। ছুটিতে আসিস অল্প কিছু দিনের জন্য। এবার এক মাসের ছুটিতে আসলি। তোকে আমরা কাছে পেয়েও পেলাম না। বাংলাদেশে আছিস তো আর এক সপ্তাহ। এই এক সপ্তাহ যেন নিজের ফ্যামিলির সাথে সময় কা/টা/তে পারিস তাই চলে গেছে। তোর কোনো সমস্যার কারণ আর তুলি হবে না। 
মায়ের কথা গুলো শুনে ইমরান বলতে পারে না কিছু। মিসেস ইরানীর চোখে টলমলে পানি। 
_ কি বল তো বাবা আমরা যেমন টা পরিকল্পনা করি , যা সিদ্ধান্ত নেই সেরকম কিছুই হয় না বেশির ভাগ সময়, আমাদের সিদ্ধান্ত ও ভুল হয়। তুলির বাবা কেই দেখ না , মেয়ের জন্য শত শত ছেলে দেখে একজন পছন্দ করলো। একটা মাত্র মেয়ে , তাকে কিছুতেই দূরে বিয়ে দেবে না। সেজন্য খুঁজে খুঁজে কাছাকাছি মেয়ের বিয়ে ঠিক করলো। তার মনে কত আনন্দ ছিল , কত কিছু ভেবেছিল মেয়ের বিয়ে নিয়ে। সেসব করলোও, সবই ঠিক ঠাক মতোই হচ্ছিল। হচ্ছিল কিন্তু হয়নি, শেষ মুহূর্তে এসে বিয়ে টা ভেঙে গেলো। বিয়ে ভেঙে যাওয়ায় মেয়ে টা কে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হতো। সেজন্য  আমি আর তোর বাবা একটা সিদ্ধান্ত নিলাম। তুলি আমাদের চোখের সামনে বড় হয়েছে , ধরতে গেলে কোলে পিঠে মানুষ করেছি। তুলি খুবই ভালো একজন মেয়ে। ওর মতো মেয়ে আজ কাল হয় না। তাই তোর সাথে জোর করেই বিয়ে টা দিলাম। ভেবেছিলাম দুজনেরই ভালো হবে। আমাদের ও একটা মেয়ে হবে। একে অপরের সাথে ভালো থাকবি। আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সেসব কিছুই হলো না। দুজনের ভালো করতে গিয়ে দুজনেরই খারাপ করে দিলাম। 
মিসেস ইরানীর চোখ থেকে টুপ টুপ করে কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে। দ্রুত সেই পানি টুকু মুছে নিয়ে উঠে দাঁড়ান।  নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলেন,
_ গিয়ে ঘুমিয়ে পড় অনেক রাত হয়েছে। 
ইমরান কিছু সময় আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। মায়ের বলা কথা গুলো মাথায় ঘুর পাক খাচ্ছে। 
ড্রইং রুমের লাইট গুলো অফ করে ধীর পায়ে রুমের দিকে এগিয়ে যায়। খালি বেড দেখেই তুলির কথা মনে পড়ে। রুমের মাঝ খানে চুপ চাপ দাঁড়িয়ে বেডের দিকে তাকিয়ে রইলো।
Reply
#5

Part:05

নিজের রুম অন্ধকার করে বেডে শুয়ে আছে তুলি। চোখের কোণা বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে উষ্ণ তরল। ঘুমোতে চাইলেও ঘুম আসছে না কিছুতেই। মনের মধ্যে জমানো দুঃখ কষ্ট গুলো উপচে বেরিয়ে আসছে। বুকের ভেতর অসহনীয় যন্ত্রণা হচ্ছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে। এই কষ্ট কাকে দেখাবে ? কাকে বোঝাবে মনের কষ্ট গুলো ? বাবা মায়ের কাছে বলতে পারবে না, তাহলে তারাও কষ্ট পাবে। 
ওর সাথে এমন টা কেনো হলো ? 
বিয়ে নিয়ে সব মেয়ের সুন্দর একটা স্বপ্ন থাকে। বিয়ের পরের দিন গুলো নিয়ে থাকে নানান জল্পনা, কল্পনা। ওরো ছিল কিন্তু সব শেষ হয়ে গেছে। ওর সুন্দর স্বপ্ন, জল্পনা, কল্পনা সব ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। 
নিজের জীবনের সাথে সাথে আরেক জনের জীবন ও জটিল করে তুলেছে। কি করবে কিছুই মাথায় আসছে না। উপুড় হয়ে শুয়ে বালিশে মুখ গুজে গুমরে কাঁদে। 
,
,
নিজের রুমের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে ইমরান। ঘুম আসছে না আজ। কেমন হাসফাঁস লাগছে। বেলকনির এপাশ থেকে ওপাশে পায়চারি করে। আবার স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে  দূর আকাশ পানে তাকায়। আজ আকাশ ঘুটঘুটে অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে আছে। টিপ টিপ করে জ্ব/ল/ছে কয়েক টা তারা। মেঘ মেঘ হয়ে আছে আকাশে। রাতে বৃষ্টি হওয়ার সম্ভবনা আছে। 
বেলকনিতে রাখা টুলের উপর বসে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো বাইরের দিকে। 

_______________________

সকালে ঘুম থেকে ওঠে ইমরান। ঘুমিয়েছিল শেষ রাতে। মাথা ভার ভার হয়ে আছে, মাথা সোজা করতে ইচ্ছে করছে না। তবুও বেড থেকে উঠে দাঁড়ায়। টাওয়েল নিয়ে দুলতে দুলতে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে। 
পঁচিশ মিনিট পর ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে কোমরে টাওয়েল জড়িয়ে। 

অল্প সময়ের মধ্যে ড্রেস পরে তৈরি হয়ে নেয়। প্রয়োজনীয় সব নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে  আসে। এগিয়ে যায় বাবার রুমের দিকে। মুস্তাফিজুর রহমান ওয়াশরুমে রয়েছেন। ভেতর থেকে পানির শব্দ আসছে। 

_ আব্বু।

কয়েক বার ডাকার পর শুনতে পান ছেলের ডাক।

_ হ্যাঁ বলো।

_ কারের চাবি টা কোথায় ? 

_ ড্রেসিং টেবিলের উপর।

_ আমি কার নিয়ে বের হচ্ছি।

_ আচ্ছা। 

চাবি নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে নিচে নেমে আসে। ড্রইং রুম পুরো ফাঁকা। এগিয়ে যায় কিচেনের কাছে। ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখে ওর মা মিসেস ইরানী আর কাজের বুয়া রান্না করতে ব্যস্ত। আজকে এখনো রান্না হয়নি ? অন্য দিন তো আরো সকালে রান্না শেষ হয়ে যায়। 

_ আম্মু আমি বের হচ্ছি।

হঠাৎ বড় ছেলের গলার স্বর শুনে চমকে ওঠেন মিসেস ইরানী। পেছন ফিরে ছেলের দিকে তাকিয়ে বলেন,

_ কোথায় যাবি ? রান্না প্রায় শেষ, খেয়ে যা। 

_ এসে খাবো, আসছি এখন।

বলেই বেরিয়ে যায়, মাকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ দেয় না। 

গ্যারেজ থেকে কার বের করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। 
,
,
কলিং বেলের শব্দ শুনে সোফা থেকে উঠে ডোরের কাছে এগিয়ে যায় তুহিন। সকাল সকাল কে এলো ? 
ডোর খুলে ডোরের সামনে ইমরানকে দেখে ভূ/ত দেখার মত চমকে ওঠে।  

_ ভাইয়া তুমি , তুমি সত্যিই এসেছো ?

_ কি মনে হয় ?

হাত বাড়িয়ে ইমরানের হাত ছুঁয়ে দেয়। তারপর দুই হাতে জাপটে ধরে খুশি হয়ে বলে,

_ কেমন আছো ভাইয়া ?

_ আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি, তুই কেমন আছিস ?

_ আলহামদুলিল্লাহ আমিও ভালো আছি। কালকে আপুর সাথে আসলে না কেনো ভাইয়া ? আপু বললো তুমি নাকি আমাদের বাড়িতে আর আসবে না ! 

তুহিনের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,

_ আসবো না কেনো ? আজকে এসেছি , ভবিষ্যতেও আসবো। 

_ তুহিন কে এসেছে ?

ভেতর থেকে তুলির মা মিসেস ইয়ানার গলার স্বর ভেসে আসে। 

_ ভাইয়া এসেছে।

_ কোন ভাইয়া ?

_ বড় ভাইয়া , ইমরান ভাইয়া।

ইমরানের নাম শুনে কিচেন থেকে বেরিয়ে আসেন মিসেস ইয়ানা। ডোরের দিকে তাকিয়ে দেখেন তুহিন তখনো ইমরানকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। 

_ ওকে ওখানে দার করিয়ে রেখেছিস কেনো ? ওকে ভেতরে আসতে দে। 

_ হে হে ভুলে গেছিলাম। 

ছেলের বলার ধরণ দেখে মুচকি হাসেন মিসেস ইয়ানা। ইমরানের ঠোঁটের কোণেও হাসির রেখা দেখা যায়। 

ভেতরে প্রবেশ করে ইমরান। 

_ কেমন আছো ইমরান ?

_ আলহামদুলিল্লাহ ভালো, তুমি কেমন আছো ?

_ আলহামদুলিল্লাহ ভালো, কাল আসলে না কেনো তুলির সাথে ? 

_ ওই একটু বিজি ছিলাম।

_ কয়েক দিনের জন্য দেশে এসেও কি এত বিজি থাকো ?

আমতা আমতা করে বলে,

_ তুলি কোথায় ?

_ ওর রুমেই আছে , ঘুম থেকে ওঠেনি এখনো। 

ইমরান আর কিছু না বলে তুলির রুমের দিকে এগিয়ে যায়। মিসেস ইয়ানা দ্রুত কিচেনের দিকে এগিয়ে যান ডাইনিং টেবিল সাজানোর জন্য। ইমরান আসবে জানলে আরো কিছু আইটেম রান্না করতেন। তুলিও তো বলেনি আজ ইমরান আসবে। 

ইমরান তুলির রুমের সামনে এসে দাঁড়ায়। হাত বাড়িয়ে ডোর ঠ্যালা দিতেই খুলে যায়। 

_ এই মেয়ে ডোর লক করে ঘুমায় না ?

বির বির করতে করতে রুমের ভেতর প্রবেশ করে। পুরো রুম তখনও অন্ধকার হয়ে আছে। ডোর খোলায় একটু একটু আলো আসছে। ভোঁ ভোঁ করে ঘুরছে ফ্যান। বেডের দিকে তাকায়, আবছা আলোয় তুলিকে খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। এগিয়ে গিয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে থাই গ্লাস খুলে দেয়। সাথে সাথেই পুরো রুম আলোকিত হয়ে যায়। আবার তাকায় বেডের দিকে। 
কাথা দিয়ে গলা পর্যন্ত ঢেকে ঘুমিয়ে আছে তুলি। 
ঘুরে এসে তুলির কাছে দাঁড়ায়। 

_ তুলি , এই তুলি ওঠো তুলি। 

তুলির সাড়া শব্দ নেই। ঘুমে বিভোর হয়ে আছে। 
ইতস্তত করে তুলির গায়ের উপর থেকে কাথা টেনে সরিয়ে নেয় ইমরান। নড়ে চড়ে ওঠে তুলি। নাক মুখ কুঁচকে চোখ বন্ধ রেখেই কাথা খোঁজে। না পেয়ে স্থির হয়ে যায়। 

_ এই তুলি ওঠো।

ঘুমের ঘোরেই কপাল ভ্রু কুঁচকে যায় তুলির। ডাক কানে পৌঁছালেও মস্তিষ্ক সজাগ হচ্ছে না। এত বেশি ঘুম পাচ্ছে যা বলার বাইরে। 

তুলির অবস্থা দেখে ওর দিকে তাকিয়ে দুই আঙ্গুলের সাহায্যে কপালে স্লাইড করতে শুরু করে ইমরান। কিছু সময় তুলির দিকে তাকিয়ে থেকে ওর হাত ধরে টেনে ওঠানোর চেষ্টা করে বলে,

_ আর কত ঘুমাবে ? ওঠো এখন। 

_ যা তো ভাই ডিস্টার্ব করিস না কতক্ষণ আগেই ঘুমিয়েছি। তুই নিজের কাজে যা। 

হাত ছেড়ে দিয়ে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে রইলো ইমরান। একটু পরেই বুঝতে পারে তুলি ঘুমের ঘোরে তুহিন মনে করছে ওকে। 

_ তুলি তুহিন না আমি ইমরান। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখো আগে। 

তুলির বাহু ঝাকিয়ে কথা গুলো বলে ইমরান।  ইমরানের নাম কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই ফট করে চোখ খুলে তাকায় তুলি। চোখের সামনে ইমরানকে দেখে কতক্ষন ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইলো। তারপর তড়িৎ গতিতে শোয়া থেকে উঠে বসে। দুই হাতে চোখ কচলে আবার তাকায় ইমরানের দিকে। বিশ্বাস হচ্ছে না ইমরান এসেছে। হাত বাড়িয়ে ইমরানের গাল স্পর্শ করে। যখন বুঝতে পারে সত্যি সত্যিই ইমরান এসেছে তখন চোখ দুটো আপনাআপনি বড় হয়ে যায়। অবিশ্বাস্য কন্ঠে বলে,

_ তুমি এখানে!

ইমরান চুপ করে তুলির চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে, ফোলা ফোলা ও লাগছে অনেক। চোখ মুখ কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। সারা রাত ঘুমায়নি ? পুরো রাত কেঁদেছে নাকি ? 

_ তুমি এখানে কেনো এসেছো ? 

_ তোমাকে নিতে।

_ কেনো ?

_ কেনো আবার ? তোমার শশুর বাড়িতে নিয়ে যেতে এসেছি। উঠে ফ্রেশ হয়ে তৈরি হয়ে নাও। 

_ যাবো না আমি তোমার সাথে। আর ওই বাড়িতেও ফিরে যাবো না। 

_ কেনো যাবে না ?

_ ভালো লাগে না তাই যাবো না। তোমার সাথে থাকবো না আমি। 

_ অত কথা শুনতে চাই না আমি, উঠে ফ্রেশ হয়ে তৈরি হও। 

_ বললাম তো যাবো না আর ওই বাড়িতে। 

_ তুলি মেজাজ গরম হচ্ছে কিন্তু এখন। 

_ আই ডোন্ট কেয়ার। 

_ তুলি।

_ কাকে রাগ দেখাচ্ছো তুমি ? তোমরা সবাই কি পেয়েছো আমাকে ? যখন যার যা ইচ্ছে তা চাপিয়ে দেবে আমার উপর ? তোমাদের সকলের সব সিদ্ধান্ত চুপ চাপ মেনে নেবো সব সময় ? আমার নিজের কোনো ইচ্ছে নেই ? আমার নিজের জীবন নিয়ে নিজের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নেই ? তোমরা যে যখন যা বলবে তাই পালন করতে হবে আমাকে ? 

_ তোমার উপর আর কেউ কোনো সিদ্ধান্ত চাপাবে না। তোমার যা ইচ্ছে তাই করবে তুমি। 

_ ডি/ভো/র্স দিয়ে দাও আমাকে।  

ধমক দিয়ে ওঠে ইমরান।

_ ভালো ভাবে বলছি ভালো লাগছে না ? দেবো নাকি কানের নিচে একটা লাগিয়ে ? পাঁচ মিনিটে ফ্রেশ হয়ে তৈরি হবি নয়তো কিভাবে তৈরি করিয়ে নিয়ে যেতে হবে আমার খুব ভালো করেই জানা আছে। 

_ যাবো না আমি।

_ ঘাড় ত্যাড়ামি করবি না তুলি। 

_ একশো বার করবো, হাজার বার করবো। তাতে তোমার কি ?

_ আমার কি ?

_ হ্যাঁ।

আর কথা না বাড়িয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায় ইমরান। তুলিকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে। ওয়াশরুমে দার করিয়ে বলে,

_ পাঁচ মিনিটের মধ্যে ফ্রেশ হয়ে বের হবি নয়তো যেমন আছিস সেভাবেই নিয়ে চলে যাবো। 

বলেই ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে। ওর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো তুলি। অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে আজ ইমরানকে দেখে। 
এই ইমরান তো সেই ইমরান নয়। ইমরানের কি হলো হঠাৎ ? এত দিন রুম থেকে বের করে দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে আর আজ ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। তুলির স্মরণ হয় ইমরান ওকে আজ তুমি তুমি বলে সম্বোধন করছিল। শেষে রেগে গিয়ে তুই তুই বলেছে। এক রাতে এত পরিবর্তন ? আশ্চর্য্য ।

ইমরান রুমে এসে তুলির সুটকেস খুজতে শুরু করে। আশে পাশে তাকিয়ে দেখে আলমারির পাশেই দার করিয়ে রেখেছে। উচু করতেই বুঝতে পারে ভর্তি রয়েছে এখনো। তবুও একবার খুলে দেখে নেয়। কাপড় চোপড় আর প্রয়োজনীয় সব কিছু না নিয়ে গেলে এসব নেওয়ার জন্য আবার আসতে হবে। 

তুলি ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে দেখে ইমরান বেডের উপর বসে আছে। তুলি অবাক হয় এটা দেখে যে ইমরান ওর বেড গুছিয়ে পরিপাটি করে রেখেছে। 

কিছু না বলে হাত মুখ মুছে মুখে ক্রিম লাগায়  সময় নিয়ে। চুল গুলো ব্রাশ করে আস্তে আস্তে বেশ সময় নিয়ে। 

ইমরান বেডে বসে তুলির কর্ম কান্ড দেখে রাগে ফুলছে। এই বাড়িতে যতটা ঠান্ডা মেজাজ নিয়ে এসেছিল এখন ঠিক ততটাই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে তুলির ব্যবহারে। এই মেয়ে ইচ্ছে করেই যে ওকে রাগাচ্ছে বুঝতে বাকি নেই ইমরানের। দোষ শুধু ওর একার ! তুলির কোনো দোষ নেই ! এক নাম্বারের হাড় ব/জ্জা/ত মেয়ে একটা। শিরায় শিরায় শ/য়/তা/নি বুদ্ধি দিয়ে ঠাসা। 
সারা রাত জেগে যা যা ভেবেছিল এখন ঠিক তার উল্টো করতে ইচ্ছে করছে। রাতে মায়ের বলা কথা গুলো ওর উপর ইফেক্ট ফেলেছিল। তুলির দিক টাও ভেবে দেখেছিল , এই সম্পর্ক হওয়ার জন্য তুলির তো দোষ নেই। দুজন কেই জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়েছে। যাই হোক পরিবার তো সন্তানের ভালোই চায় সব সময়। দুই পরিবার আর তুলির কথা ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কষ্ট করে না হয় মানিয়ে চলার চেষ্টা করবে। আস্তে আস্তে এক সময় ঠিক হয়ে যাবে সব কিছু। 
কিন্তু এখন ইচ্ছে করছে তুলিকে এখানেই ফেলে চলে যেতে। এই মেয়ে ওর লাইফে থাকা মানে ঝামেলা আর ঝামেলা। ঘাড় ত্যাড়ামিতে তো সেরা সেটা এতো দিনে বুঝে গেছে। 
,
,
খাওয়া দাওয়া সেরে এগারোটার পর পর তুলিদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে ইমরান তুলিকে সাথে নিয়ে। 
তুলি কিছুতেই আসবে না, তুলির মা ও চাইছিলেন তুলি আর দুই এক দিন থেকে যাক। বিয়ের পর মাত্র তিন দিন থাকা হয়েছে বাবার বাড়িতে। কিন্তু ইমরান কয়েক দিন পর চলে যাবে তাই আর বেশি কিছু বলেননি। 

ইমরানের পাশে ফ্রন্ট সিটে মুখ গোমড়া করে বসে আছে তুলি। এক মনে ড্রাইভ করছে ইমরান। 
তুলির কত শখ ছিল বরের সাথে লং ড্রাইভে যাবে। হাতে হাত রেখে অনেক পথ হাটবে। বরের কাধে মাথা রেখে সূর্যাস্ত দেখবে। কিন্তু এই ইমরানকে দিয়ে ওর এই স্বপ্ন গুলো কোনো দিন পূরণ হবে না। ব্যাটা নিরামিষ একটা । তুলি এটাও বুঝে গেছে ইমরান একবার কানাডা ফিরে গেলে ভুলেও আর বাংলাদেশে ফিরে আসবে না। এখন হয়তো বাবা মায়ের জন্য ফিরিয়ে নিচ্ছে ওকে। 

____________________

আজ কানাডা ফিরে যাবে ইমরান। ওর সাথে তুলিও যাবে। তুলির ইমারজেন্সি পেপার্স রেডি করিয়েছেন মুস্তাফিজুর রহমান। তুলি ইমরানের সাথে কানাডা যাবে শুনে ইমরানের মুখ টা দেখার মতো হয়েছিল। বেচারা না পারছে কিছু বলতে আর না পারছে কিছু করতে। গত এই কয়েক দিন একদম ভালো ছেলে , ভালো হাসবেন্ড সেজে থেকেছে ইমরান। অতি প্রয়োজন ছাড়া ভুলেও বাড়ির বাইরে পা রাখেনি। 
ইমরানের এই কয়েক দিনের আচরণে ওর বাবা মা বেশ খুশি। তুলিকে আর আগের মতো লাগেনি। হাসি খুশিই লেগেছে এই কয়েক দিন। 

বিকেল পাঁচ টায় বাড়ি থেকে বের হয় তুলি ইমরান। ওদের দুজন কে বিদায় জানাতে দুই পরিবারের সবাই এয়ারপোর্টে যাবে। 

এয়ারপোর্টে পৌঁছে তুলি ওর মাকে জড়িয়ে ধরে অনেক কাঁদে। ওর একটুও কানাডা যাওয়ার ইচ্ছে নেই। শশুর শাশুরির জন্য যেতে হচ্ছে। ওখানে যাওয়ার পর ইমরান ওর সাথে কেমন ব্যবহার করবে কে জানে ! ওখানে তো ওর আপন বলতে আর কেউ থাকবে না। মনের মধ্যে অনেক কষ্ট জমা হলে মায়ের কাছে যাওয়া হবে না। বলতে না পারলো, মায়ের মুখ টা তো দেখতে পারতো এখানে থাকলে। 
আবার শাশুরি মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে। 

ইমিগ্রেশনের সময় হয়ে যাওয়ায় সকলের থেকে বিদায় নিয়ে ভেতরে এগিয়ে যায় দুজন। কয়েক বার পেছন ফিরে তাকায় তুলি। ইমরান একবারও তাকায় না। তবে ওর চোখেও পানি ছলছল করছে। সানগ্লাসের আড়ালে ঢাকা পড়েছে সেই পানি। মনে পাথর চাপা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে দূর দেশে। 

Reply
#6

Part:06

লম্বা এক জার্নি শেষে কানাডায় এসে পৌঁছায় ইমরান আর তুলি। এয়ারপোর্টে থেকে বেরিয়ে আসতেই নজরে আসে লাল রঙের মার্সিডিজ বেঞ্জ এর সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লিয়াম এর দিকে। ইমরানকে নেওয়ার জন্যই এসেছে লিয়াম। লিয়াম কানাডিয়ান।  ইমরান আর লিয়াম খুব ভালো বন্ধু। দুজন একই সাথে ডাক্তারি পড়া শেষ করেছে। এখন একই হসপিটালে কর্মরত আছে দুজন। দুজন থাকেও একই ভবনে তবে আলাদা আলাদা ফ্ল্যাটে। 

ইমরান এগিয়ে আসে লিয়াম এর কাছে। ওর সাথে সাথে এগিয়ে আসে তুলি। ইমরানের দুই হাতে দুটো সুটকেস, একটা ওর আরেক টা তুলির। 
ইমরানের পাশে মেয়ে মানুষ দেখে চোখ দুটো ছোট ছোট হয় লিয়াম এর। কে এই মেয়ে ? 
তুলির পা থেকে মাথা অব্দি নজর বুলিয়ে নেয় লিয়াম। তুলির পরনে ব্ল্যাক কালার গাউন বোরকা। মুখে মাস্ক সাথে ব্ল্যাক হিজাব বাধা। মুস্তাফিজুর রহমান তুলির জন্য বোরকা হিজাব কিনে এনেছিলেন। এমনিতেও তুলি বাড়ির বাইরে বের হলে বোরকা হিজাব পরেই বের হতো সব সময়। যদিও সেভাবে পর্দার নিয়ম পালন করে না। তার পরও বোরকা হিজাব পরেই বের হতো। 

লিয়াম এর দৃষ্টি অনুসরণ করে ইমরান নিজেও তুলির দিকে তাকায়। তারপর আবার লিয়াম এর মুখের দিকে তাকায়। 

_ কেমন আছো লিয়াম ? 

_ ভালো , তুমি কেমন আছো ?

_ আলহামদুলিল্লাহ। 

_ ও কে হয় তোমার ?

_ ও তুলিকা জান্নাত , আর তুলি ও আমার কানাডিয়ান ফ্রেন্ড লিয়াম। 

লিয়াম হাত বাড়ায় তুলির দিকে হ্যান্ডসেক করার জন্য। 
তুলি হাত বাড়ানোর আগেই ইমরান নিজেই হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডসেক করে। তারপর বলে ,

_ দ্রুত চলো আমরা ভীষণ ক্লান্ত। 

লিয়াম কিছু বলতে চাইছিল কিন্তু বললো না। তুলির সাথে হ্যান্ডসেক করতে চাইল কিন্তু বাধ সাধলো ইমরান। বেচারার খুশি খুশি মনটা ফুড়ুৎ করে অমাবস্যার ঘুটঘুটে অন্ধকারে তলিয়ে গেলো। 

কারে উঠে বসে তিন জন। পেছনে বসে তুলি আর ইমরান। ড্রাইভিং সিটে লিয়াম। কার স্টার্ট করে ছুটে চলে অটোয়ার দিকে। 
রাতের সুন্দর পরিবেশ আর রাস্তা দেখে মুগ্ধ তুলি। অবাক হয়ে শুধু বাইরের পরিবেশ দেখে যায়। 
ইমরান কারের সিটে হেলান দিয়ে বসে লিয়াম এর সাথে কথা বলতে থাকে। 
,
,
লিয়াম এর কার এসে দাঁড়ায় একটি বহুতল ভবনের সামনে। কারের ভেতর থেকে বেরিয়ে ভবনের উপরের দিকে তাকায় তুলি। এই ভবনে কয়টা ফ্লোর আছে ? 
ইমরান কারের ভেতর থেকে সুটকেস দুটো বের করে নেয়। লিয়াম কার পার্ক করতে চলে যায়। 

তিন জন একসাথে ভেতরে প্রবেশ করে। লিফটে চড়ে নির্দিষ্ট ফ্লোরে এসে থামে। তারপর এগিয়ে যায় নিজ নিজ ফ্ল্যাটের দিকে। 

লিয়াম এর অনেক কিছু জানার আগ্রহ থাকলেও এখন প্রকাশ করলো না। পরে জিজ্ঞেস করবে ইমরান কে। 

নিজের ফ্ল্যাটে এসে ড্রইং রুমে দাঁড়ায় ইমরান। আশে পাশে নজর বুলায় তুলি। ইমরান তুলির সুটকেস তুলির দিকে ঠেলে দিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে,

_ তুমি ওই রুমে থাকবে। আর ওটা আমার রুম, ভুলেও আমার রুমে প্রবেশ করবে না। যা যা প্রয়োজন হবে বলবে আমি এনে দেবো। নিজের রান্না নিজে করে খাবে, আমি কাউকে রান্না করে খাওয়াতে পারবো না। আমার জন্যও রান্না করতে হবে না তোমার , আমি নিজের রান্না নিজে করেই খাবো। তোমার যা ইচ্ছে করতে পারো, আমার কোনো ব্যাপারে নাক গলাতে আসবে না। একদম বউয়ের অধিকার ফলাতে আসবে না। তুমি তোমার মতো, আমি আমার মতো। 

তুলি তো ভেবেছিল ইমরান ওকে আলাদা ফ্ল্যাটে রাখবে। ওর মুখও দেখবে না কোনো দিন। সেই প্রথম দিন গুলোর মতোই খ্যাক খ্যাক করে কথা বলবে। যাই হোক ইমরান যা যা বলেছে তুলি তাই মেনে নিয়ে বলে,

_ ঠিক আছে। তুমিও আমার রুমে আমার অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করবে না। আমার কোনো বিষয়ে নাক গলাতে আসবে না। স্বামীর অধিকার ফলাতে তো একদমই আসবে না। 

নিজের রুমের দিকে চলে যায় ইমরান। তুলি নিজেও পাশের রুমে চলে আসে। রুম টা তুলির বেশ পছন্দ হয়েছে। খুব বেশি বড়ও না আবার ছোটও না। মজার ব্যাপার হচ্ছে সব কিছুর রঙ অফ হোয়াইট আর ধূসর রঙের। যার জন্য রুমের সৌন্দর্য আরো বেড়ে গেছে। 
খুব বেশি কিছু নেই রুমে , বেড , ড্রেসিং টেবিল, আলমারি, দুটো সিঙ্গেল সোফা, একটা ছোট কেবিনেট, আর ছোট একটা গোল টেবিল। ছিমছাম সাজের রুম টা দেখতে চমৎকার। 
বোরকা হিজাব খুলে ফ্রেশ হতে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে। ফ্রেশ হয়ে এসেই উপুর হয়ে বেডে শুয়ে পড়ে। 
মনে পড়ে বাবা , মা, ভাই , শশুর , শাশুরি আর কামরানের কথা। 
বেডের উপর রাখা ফোন টা হাতে তুলে মুখ উচু করে ফোনের স্ক্রিনে তাকায়। কল করবে কিভাবে ? ওর কাছে তো এই দেশের সিম কার্ড নেই। ইমরানের ফোন থেকে কল করতে হবে। কিন্তু এখন মোটেও বেড থেকে উঠে ইমরানের রুমে যেতে ইচ্ছে করছে না। আবার ইমরান তুলিকে ওর রুমে যেতেও নিষেধ করেছে।  ইমরান রুম থেকে বের হলে কথা বলবে সিদ্ধান্ত নেয়। এখন একটু ঘুমাবে , ভীষণ ক্লান্ত লাগছে।
ফোন টা রেখে উপুর হয়ে শুয়েই চোখ বন্ধ করে নেয়। 

ইমরান ফ্রেশ হয়ে বেডে হেলান দিয়ে বসে। তারপর ফোন হাতে নিয়ে খাবার অর্ডার করে দুজনের জন্য। এখন আর রান্না করার বিন্দু মাত্র ইচ্ছে নেই। তুলির ও হয়তো সেম অবস্থা। রাতের খাবার টা অর্ডার করেই খাবে। সকালে না হয় রান্না করা যাবে। 
ফ্ল্যাট মেড পরিষ্কার করে রেখে গেছে আগেই। সপ্তাহে একদিন ফ্ল্যাট পরিষ্কার করায় মেড কে দিয়ে। বাকি সব নিজেই করে। ফ্ল্যাটের চাবি লিয়াম এর কাছে দিয়ে গিয়েছিল , ওই মেড কে দিয়েছিল আবার। 

খাবার অর্ডার করার বিশ মিনিটের মধ্যেই কলিং বেল বেজে ওঠে। রুম থেকে বেরিয়ে খাবার রিসিভ করে।  খাবারের প্যাকেট আর প্রয়োজনীয় সব কিছু ডাইনিং টেবিলের উপর রেখে তুলির রুমের সামনে এসে দাঁড়ায়। ভেতরে প্রবেশ করতে গিয়েও থেমে যায়। 
হাত বাড়িয়ে ডোর নক করে। কয়েক মিনিট পেরিয়ে গেলেও তুলির সাড়া শব্দ পাওয়া যায় না। আবার নক করে, গলা উঁচিয়ে ডাকে কয়েক বার। তবে তুলির কোনো সাড়াশব্দ নেই। কপাল ভ্রু কুঁচকে কিছু সময় পর ডোর হাত দিয়ে ঠ্যালা দেয়। বরাবরের মতই খুলে যায় ডোর। এই তুলি জীবনেও ডোর লক করে না , সেটা হোক রাতে বা দিনে। ভেতরে প্রবেশ করে বেডের দিকে তাকিয়ে দেখে তুলি উপুর হয়ে শুয়ে আছে। কুঁচকে যাওয়া কপাল ভ্রু আরো কুঁচকে যায়। তুলি কি এভাবে শুয়ে শুয়ে কাদঁছে ? কিন্তু কাদার তো শব্দ আসছে না। নীরবে কাদঁছে বোধহয়। যাই হোক তাতে ওর কি ? অনুভূতিহীন হার্টলেস মানুষ একটা। অন্যের কথা ভাবার সময় আছে নাকি ওর ? একা একা থাকতে থাকতে অভ্যাস হয়ে গেছে একা থাকার। সিদ্ধান্ত নিয়েছিল জীবনে বিয়ে করবে না একা একাই পাড় করবে বাকি জীবন। কিন্তু হলো টা কি ? ওর স্বপ্নের একলা থাকার জীবনে দোকলা জুটে গেছে। ওর মনের শান্তি গায়েব হয়ে গেছে। ভালো লাগে না কিছু। সব কিছু মেনে নিতে চাইলেও পারে না। একটু একটু অনুভূতি জন্ম নিলেও কিছু সময় পর আবার 
ম/রে যায় সেই অনুভূতি। 

বেশি কিছু না ভেবে তুলির শিয়রে দাঁড়ায়। ভালো ভাবে তাকিয়ে দেখে এই মেয়ে তো বিভোর হয়ে ঘুমাচ্ছে। ভারী শ্বাস ফেলার শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে ইমরান। কোনো মানুষ আরামে বিভোর হয়ে ঘুমালেই এভাবে শ্বাস নেয়। 

_ তুলি এই তুলি ওঠো,  তুলি।

কোনো সাড়া শব্দ নেই। এতক্ষণ নরম গলায় মিষ্টি স্বরে ডাকলেও এবার রসকষহীন কর্কশ গলায় ডাকতে শুরু করে। শুধু শুধু মেজাজ গরম হচ্ছে। 
ইমরানের রসকষহীন কর্কশ গলার স্বর শুনে পিটপিট করে তাকায় তুলি। ঘাড় ঘুরিয়ে ইমরানের মুখের দিকে তাকায়। চোখের পাতা টেনে তুলতে চাইলেও পারছে না। চোখ বন্ধ করে ঘুম জড়ানো গলায় বলে,

_ কি হয়েছে ? চ্যাচাচ্ছো কেনো এভাবে ? 

_ আমি চ্যাচাই ?

_ নাহ্ , ডক্টর ইমরান মাহমুদুল চ্যাচায়। 

ইমরান রেগে ডেকে ওঠে,

_ তুলি। 

_ সরো তো ঘুমোতে দাও।

_ উঠে খাবার খেয়ে তারপর ঘুমাও। 

_ এখন আমি রান্না করতে পারবো না।

_ রান্না করতে হবে না, খাবার অনলাইন থেকে এনেছি। 

_ তুমি খাও আমি খাবো না। 

_ কেনো ?

_ খিদে নেই আমার। 

_ খিদে নেই কেনো ?

_ ফ্লাইটে খেয়েছি না। ডিস্টার্ব করবে না আমাকে, যাও এখান থেকে। 

_ খাবার খেয়ে তার পর জন্মের ঘুম ঘুমা, এখন ওঠ। 

তুলি চোখ বন্ধ রেখেই কর্কশ গলায় বলে ,

_ খাবো না বলছি তো, যাও এখান থেকে। শুধু শুধু আমার আরামের ঘুম হারাম করতে এসেছে। 

ইমরানের গরম মেজাজ আরো গরম হয়। শোয়া থেকে টেনে তুলে বসিয়ে দেয় তুলি কে। বিকেলে ফ্লাইটে দুবার মুখে দিয়েছিল খাবার। তারপর আর কিছু খায়নি। ওই টুকু খাবার খেয়ে নাকি ওর পেট এখনো ভরা আছে ! 
যা বলবে তাই বিশ্বাস করবে ইমরান ! ওতো ছোট মানুষ না ? 

টেনে বসিয়ে দেওয়ায় পূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ইমরানের দিকে। কিছু সময় তাকিয়ে থেকে ঘাড় কাত করে বলে,

_ এ্যাই তুমি আমার অনুমতি ছাড়া আমার রুমে এসেছো কেনো ? আবার আমার উপর জোর খাটাচ্ছো। 

_ খেয়ে আমাকে উদ্ধার কর। না খেয়ে ম/রে গেলে তোর বাপ মা তো তখন আমার গলায় দড়ি ঝুলিয়ে দেবে। তাদের মেয়েকে কানাডায় এনে না খাইয়ে রেখে খু/ন করেছি আমি। তোর শশুর শাশুরি তো গুলি করে 
 মা/র/বে আমাকে। এখন উঠে কটা গিলে তারপর ঘুমা। 

_ এ্যাই তোমার সমস্যা কি হ্যাঁ ? এবার তুই আরেক বার তুমি। যে কোনো একটা বলে সম্বোধন করবে। 

কোনো কথা না বলে তুলির হাত ধরে টেনে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে। সোজা ডাইনিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। তুলিকে একটা চেয়ারে বসিয়ে নিজেও বসে পাশে। তারপর দুজনের জন্য খাবার বেড়ে নেয়। একটা প্লেট তুলির সামনে এগিয়ে দেয় , অন্যটা নিজে নেয়। কোনো কথা না বলে হাত ধুয়ে খাওয়া শুরু করে তুলি। ইমরান নিজেও খাওয়া শুরু করে। 
এই টুকু সময়ের মধ্যেই তুলির উপর ভীষণ বিরক্ত ইমরান। এই মেয়ে তো রান্না করার আলসেমিতে না খেয়েই ম/র/বে বোধহয়।  শেষ পর্যন্ত না আবার ওকেই রান্না করে খাওয়াতে হয়। টাকা খরচ করে ঝামেলা বয়ে এনেছে এত দূর। 
খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে আড়চোখে কয়েক বার তাকায় তুলির দিকে। তুলি একমনে খেয়ে চলেছে। যত দ্রুত খাওয়া শেষ হবে তত দ্রুত ঘুমাতে পারবে।

খাওয়া শেষ করে চেয়ার ছেড়ে উঠে রুমের দিকে চলে যায় তুলি। হা করে ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো ইমরান। প্লেট বাটি না গুছিয়ে, না ধুয়েই চলে গেলো ? এসব এখন ওকেই করতে হবে। 
একা একা বকবক করতে করতে প্লেট বাটি গুছিয়ে কিচেনের দিকে এগিয়ে যায় ধুয়ে রাখার জন্য। 

Reply
#7

Part:07
পরের দিন তুলি ঘুম থেকে ওঠে বেলা এগারোটায়। শান্তির ঘুম ঘুমিয়েছে আজ। গত রাতে যতটা খারাপ লেগেছে এখন ঠিক ততটাই ভালো লাগছে। বেড থেকে নেমে হেলে দুলে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে ড্রেস নিয়ে। 
একে বারে শাওয়ার নিয়ে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসে। 

ভেজা চুল গুলো টাওয়েল দিয়ে মুছে নেয়।  তার পরও এক ফোঁটা দু ফোঁটা করে টুপ টাপ পানি গড়িয়ে পড়ছে। হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে না শুকালে হবে না। ওর হেয়ার ড্রায়ার টা নিয়ে আসেনি। এখন ইমরানের টা দিয়ে কাজ চালাতে হবে। পরে শপিং মলে গিয়ে প্রয়োজনীয় সব কিনে নিয়ে আসবে। 
চুল গুলো মুক্ত করে দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে। ক্লান্তি আর ঘুমের কারণে ফ্ল্যাট টা দেখা হয়নি গত কাল ভালো ভাবে। 
ড্রইং রুমে দাঁড়িয়ে আশে পাশে নজর বুলায়। ফ্ল্যাটে দুটো বেড রুম, দুই রুমেই এটাচ বাথরুম আছে। ড্রইং রুম আর কিচেন। তুলির রুমে বেলকনি নেই,  ইমরানের রুমে হয়তো আছে। বেশ সুন্দর করে সাঁজানো গোছানো ড্রইং রুম টা। ঘাড় ঘুরিয়ে ইমরানের রুমের দিকে তাকায়। ডোর খোলাই রয়েছে। এগিয়ে যায় সেদিকে। ডোরের সামনে দাঁড়িয়ে ভেতরে উঁকি দেয়। তবে ইমরানকে দেখা গেলো না। হাত দিয়ে ডোর নক করে, ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ আসে না। 

_ ঘুমিয়ে পড়েছো নাকি জেগে আছো ? কথা বলছো না কেনো ? 

গলায় টাওয়েল ঝুলিয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে ইমরান। পরনে রয়েছে টু কোয়ার্টার প্যান্ট। ফর্সা লোমশ ঠ্যাং দুটো বেরিয়ে আছে। গায়ে কোনো পোশাক নেই , উদাম গা। ভেজা চুল গুলো কপাল ময় ছড়িয়ে রয়েছে। চোখ দুটো প্রায় ঢেকে রেখেছে ভেজা চুল গুলো। 
টাওয়েলের এক পাশ দিয়ে চুল মুছতে মুছতে তুলির সামনে এসে দাঁড়ায়। তুলি ইমরানের পা থেকে মাথা অব্দি পরখ করে নিয়ে নিচের দিকে দৃষ্টি স্থির করে দাঁড়িয়ে রইলো। এই লোক বাংলাদেশ থেকে আসতে না আসতেই নিজের রূপ বদল করে নিলো ! অর্ধ ন গ্ন হয়ে ওর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে নি/র্ল/জ্জে/র মতোন। 
এক দিনেই লজ্জা সরম সব শেষ। বাংলাদেশে সাধু সেজে থেকেছে আর এখানে এসেই এই রূপ। 

_ কি হয়েছে চিল্লাচ্ছিস কেনো এভাবে ? জানিস না এটা ভদ্র সভ্য লোকের ফ্ল্যাট ? এই ফ্ল্যাটে চিৎকার চেঁচামেচি করা নিষেধ। চিৎকার চেঁচামেচি করে নিজেকে অস/ভ্য অভ/দ্র প্রমাণ করবি না।

ফট করে ইমরানের মুখের দিকে তাকায় তুলি। চোখে মুখে রাগী ভাব ফুটিয়ে বলে ,

_ আমি নিজেকে অস/ভ্য অভ/দ্র প্রমাণ করছি ?  তুমি নিজেই তো একটা নির্ল/জ্জ্ব পুরুষ মানুষ।  একটা মেয়ের সামনে এভাবে আসতে লজ্জা করে না ?

ইমরান নিজের দিকে তাকিয়ে আবার তুলির দিকে তাকায়। গম্ভীর স্বরে বলে,

_ কিভাবে এসেছি আমি ? আমার পরনে কি ড্রেস নেই ? আমি কি ড্রেস ছাড়া নাকি ? লজ্জা কেনো করবে ? আশ্চর্য্য। কি জন্য ডাকছিস সেটা বল।

_ হেয়ার ড্রায়ার টা দাও। 

_ তোর হেয়ার ড্রায়ার আমার কাছে নেই।

_ আমার টা না , তোমার টা। 

_ আমার টা কেনো দেবো ?

_ কারণ আমার নেই তাই।

_ কেনো নেই ?

তুলি রাগে গজগজ করতে করতে ইমরানের সামনে থেকে চলে যায়। নিজের দেশ ছাড়তে না ছাড়তেই 
 পা/গ/ল হয়ে গেছে এই লোক। অর্ধ ন্যাং/টা হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছে, আবার একের পর এক প্রশ্ন করেই যাচ্ছে।  পেছন থেকে ইমরান গলা ছেড়ে বলে,

_ টেবিলে খাবার রাখা আছে খেয়ে নিস অলস মেয়ে কোথাকার। 

তুলি কোনো কিছু না বলে সোজা ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসে চেয়ার টেনে খাবার খাওয়ার জন্য। ঢাকনা তুলে খাবার দেখে নাক মুখ কুঁচকে নেয়। একটা আপেল, দুটো সিদ্ধ ডিম, পাউরুটির দুটো পিস, জ্যাম আর একটা কলা।  ভেবেছিল ইমরান ভালো মন্দ খাবার রান্না করেছে। যাই হোক যা রেডি করে রেখেছে তাই খাবে এখন। কষ্ট করে আর রান্না করতে হলো না। ভালোই হলো ওর জন্য , খিদেও পেয়েছে ভীষণ। 
খাওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়ায়। প্লেট বাটি গুছিয়ে রেখে সোফায় এসে বসে আরাম করে। 
ইমরান হেয়ার ড্রায়ার আর নিজের ফোন টা হাতে নিয়ে এসে বসে তুলির পাশে দূরত্ব বজায় রেখে। 

_ নাও ধরো। 

ঘাড় কাত করে তাকায় তুলি। গিরগিটি একটা, মিনিটে মিনিটে রূপ বদলায়। 

_ তাকিয়ে তাকিয়ে চেহারা কি দেখছো ? ফোন টা নিয়ে বাংলাদেশে কথা বলো। 

হাত বাড়িয়ে ফোন টা হাতে তুলে নেয় তুলি। লক দেওয়া নেই ফোনে। প্রথমে মায়ের ফোনে কল করে। বাবা মা ভাই এর সাথে দীর্ঘ সময় কথা বলে। কথা বলতে বলতে বেশ ইমোশনাল হয়ে যায় তুলি। কান্না পাচ্ছে ভীষণ সকল কে ছেড়ে এসে। 
তারপর কল করে শাশুরি মায়ের ফোনে। সকলের সাথে কথা বলে অনেক টা সময়। ওদের এখানে বেলা বারোটা বাজলেও বাংলাদেশে তখন রাত প্রায় দশ টা। 
সকলের সাথেই কথা বলে। ইমরান ও কথা বলে। ইমরান গত রাতেও বাবা মা আর শাশুরি মায়ের সাথে কথা বলেছিল। তুলি তখন ওয়াশরুমে ছিল যার কারণে কথা বলতে পারেনি। বাড়ির কেউ আর ওদের ডিস্টার্ব ও  করেনি। 

ইমরান হেয়ার ড্রায়ার টা তুলির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে,

_ তোমার ফোন টা নিয়ে আসো ওয়াইফাই কানেক্ট করে দেই। 

_ ওয়াইফাই আছে ?

_ থাকবে না কেনো ? 

_ তাহলে গত কাল কেনো বলোনি ?

_ মনে ছিল না। 

সোফা ছেড়ে উঠে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যায় তুলি। আগে চুল গুলো শুকিয়ে বেঁধে নেয়। তারপর ফোন টা হাতে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে। ড্রইং রুমে এসে দেখে সোফায় লিয়াম বসে আছে ইমরানের পাশে। কোনো একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে দুজন। তুলি লিয়াম এর সামনে যেতে চায় না, পরমুহুর্তেই কিছু একটা ভেবে এগিয়ে যায় ওদের দুজনের সামনে। তুলিকে দেখতেই লিয়াম এর চোখে মুখে খুশির ঝিলিক খেলে যায়। ছেলে টা এমনিতেও হাসি খুশি স্বভাবের। অন্য সব ডাক্তার দের মত গুরুগম্ভীর না। হাসি মুখে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ায়। তুলির দিকে হাত বাড়িয়ে বলে ,

_ হাই তুলিকা।

তুলি নিজেও হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডসেক করে হেঁসে বলে বলে ,

_ হ্যালো। 

_ কেমন আছো ?

_ আলহামদুলিল্লাহ ভালো আপনি কেমন আছেন ?

_ হুম ভালো। তোমার কথাই ইমরানকে জিজ্ঞেস করছিলাম এতক্ষণ। 

_ কেনো ?

_ এমনি, বসো সোফায়। 

_ হুম। 

তুলি ইমরানের পাশে বসে নিজের হাতের ফোন টা এগিয়ে দেয় ইমরানের দিকে। 
ইমরান ফোন টা হাতে নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে কটমট করে বাংলায় বলে ,

_ অন্য পুরুষের সাথে কেনো এতো হেসে হেসে কথা বলতে হবে ? হ্যান্ডসেক কেনো করতে হবে ? 

তুলি অবাক হওয়ার ভান ধরে বলে,

_ অন্য পুরুষ কোথায় ? বরের বন্ধু মানে আমারো বন্ধু। বন্ধুর সাথে সবাই হেঁসে হেসেই কথা বলে। আর হ্যান্ডসেক করলে সমস্যা কোথায় ? 

_ আমার বন্ধু বলে ও তোরো বন্ধু ? 

_ হ্যাঁ অবশ্যই।

_ এখন ও যদি বলে , "বন্ধুর বউ মানে আমারো বউ"।  তাহলে তুই ওর বউ হয়ে গেলি ? 

_ হ্যাঁ অবশ্যই। 

ইমরানের শক্ত চোখ মুখ আরো শক্ত হয়ে যায়। তুলি কি বলে ফেলেছে বুঝতে পেরে তাড়াহুড়ো করে বলে ,

_ এই না না আস্তাগফিরুল্লাহ , আস্তাগফিরুল্লাহ , আস্তাগফিরুল্লাহ একদম না। ওর বউ হতে যাবো কেনো আমি ? 

_ প্রথমে তো স্বীকার  ঠিকই করলি। 

তুলি দাঁত কপাটি বের করে বলে,

_ জেলাসী ফিল হচ্ছে ?

_ জেলাসী হবে কেনো ? 

_ তুমি তো আমাকে তোমার বউ হিসেবে মানোই না। সেখানে ও আমাকে নিজের বউ বলে দাবি করবে কিভাবে ? উল্টো বলবে "বন্ধুর বোন মানে আমারো বোন"।  

লিয়াম ওদের দুজনের কথপোকথন বুঝতে না পেরে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে দুজনের মুখের দিকে। নিজস্ব ভাষায় কি বলছে দুজন ? দেখে মনে হচ্ছে ইমরান কিছুটা রেগে আছে। রেগে গেলে ইমরানের কপাল আর ঘাড়ের রোগ গুলো ফুলে ফেঁপে ওঠে। এখনো তাই হয়েছে। 

তুলির ফোনে ওয়াইফাই কানেক্ট করে দিয়ে সোফা ছেড়ে উঠে কিচেনের দিকে এগিয়ে যায় ইমরান। 
লিয়াম তুলির মুখের দিকে তাকায়। হেসে বলে,

_ তোমার এখানে আসার কারণ কি ? স্টাডি নাকি অন্য কিছু ? 

তুলি কিছু বলবে তার আগেই ইমরানের গলার স্বর ভেসে আসে।

_ লিয়াম চা নাকি কফি কোন টা খাবে ?

_ চা। 

চুলায় পানি গরম হতে দিয়ে সোফায় বসে থাকা তুলি আর লিয়াম এর দিকে তাকায় ইমরান। লিয়াম এর পরনে ওর মতোই টু কোয়ার্টার প্যান্ট। শ্বেতাঙ্গ ঠ্যাং দুটো বেরিয়ে আছে। গায়ে ঢিলে ঢালা হোয়াইট টিশার্ট। ব্ল্যাক কালার চুল গুলো তুলনামূলক একটু বড়। নিঃসন্দেহে ইমরানের থেকে লিয়াম বেশি হ্যান্ডসাম। লিয়াম এর চোখের মণি দুটো নীলচে বর্ণের। যার জন্য লিয়ামকে আরো বেশি ভালো লাগে। লিয়াম যখন হাসে তখন আরো বেশি ভালো লাগে দেখতে। 
তুলির সাথে কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে হাসছে লিয়াম, সাথে তুলিও হাসছে। রাগ হয় ইমরানের। 

তাড়াতাড়ি চা কফি বানিয়ে নিয়ে কিচেন থেকে বেরিয়ে আসে ইমরান। লিয়াম এর হাতে চায়ের কাপ তুলে দিয়ে দুজনের মাঝ খানে বসে পড়ে ইমরান। 
তুলির দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে আস্তে আস্তে বলে,

_ ওর সাথে এত কিসের হাসাহাসি ? ও ডক্টর হলেও এক নাম্বারের প্লে বয়। ফ্লাটিং করতে এক্সপার্ট। তাই ওর সাথে কম কথা বলবে।

_ তো কি হয়েছে ? ভারী মিষ্ট স্বভাবের একজন মানুষ।  কি সুন্দর করে কথা বলে , তোমার মতো খ্যাপা স্বভাবের হবে নাকি ? যে কিনা কথায় কথায় খ্যাক খ্যাক করবে ? জীবন সঙ্গী হলে তো লিয়াম এর মতোই হওয়া উচিত। একদম পার্টনার ম্যাটেরিয়াল।

গরম চোখে তুলির দিকে তাকিয়ে রইলো ইমরান। 

Reply
#8

 Part:08

ইমরান না পারছে কিছু বলতে আর না পারছে কিছু করতে। রাগে ফোস ফোস করতে করতে কফির মগে চুমুক দেয়। সাথে সাথেই আবার মুখের কফি ফেলে দিয়ে লাফিয়ে উঠে দাঁড়ায়। জিহ্ববা  টা বোধহয় পু/ড়ে গেছে। লিয়াম আর তুলি ও দাঁড়িয়ে যায়। ইমরান দ্রুত পায়ে কিচেনের দিকে এগিয়ে যায়। 
কফির মগ রেখে ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানির বোতল বের করে পানি খায়। 
কফির মগ হাতে নিয়ে কফি বেসিনে ঢেলে ফেলে দেয়। এখন আর কফি খাওয়ার মুড নেই। 
তুলি এগিয়ে আসে কিচেনে। 

_ জিহ্ববা পু/ড়ে গেছে ?

_ যা সামনে থেকে।

_ ভালো কথা জিজ্ঞেস করলাম তাতেও ভালো লাগছে না ? 

_ তোকে জিজ্ঞেস করতে বলেছি ?

_ মানবতার খাতিরে জিজ্ঞাসা করলাম। 

_ তোর মানবতা অন্য জায়গায় গিয়ে দেখা। 

_ চেনা জানা হলে দেখাবো ইনশা আল্লাহ। 

_ তুই যাবি সামনে থেকে ?

_ নাহ্।

ইমরান নিজেই কিচেন থেকে বেরিয়ে যায়। অসহ্যকর মেয়ে একটা। 

তুলি ফ্রিজের দিকে এগিয়ে যায়। দুপুরে খাওয়ার জন্য রান্না করতে হবে। দুপুর প্রায় হয়েই এসেছে। 
ফ্রিজ খুলে টাটকা টাটকা সবজি, মাছ দেখতে পায়। ইমরান মার্কেটে গিয়েছিল ? কখন গেলো ? তুলি ঘুম থেকে ওঠার আগেই গিয়েছিল ? যখনই যাক তাতে ওর কি ? সব কিছু যখন আছে তখন রান্না করবে আর খাবে। ডাক্তার জামাই কে ফকির জামাই বানিয়েই ছাড়বে। খেয়ে খেয়েই ইমরানের ব্যাংক ব্যালেন্স জিরো করে দেবে। কথা গুলো ভেবেই মুচকি হাসে। 
ফ্রিজ থেকে গরুর মাংস, মাছ আর সবজি বের করে
রান্নার জন্য সব কিছু গুছিয়ে নিতে শুরু করে। 

ইমরান সোফায় এসে বসে আবার। এখন আরাম লাগছে। জিহ্ববা টা পু/ড়ে গেছে বোধহয়।  কেমন যেন হয়ে গেছে এখন। 

_ ইমরান তুলিকা তোমার কি হয় ? 

_ বউ।

বুঝতে পারে না লিয়াম কারণ বউ শব্দ টা ইমরান বাংলায় বলেছে। কপাল ভ্রু কুঁচকে বলে ,

_ কি ?

_ আমার ওয়াইফ। 

"আমার ওয়াইফ" বাক্য গুলো শুনে চমকে ওঠে লিয়াম। বিশ্বাস করতে পারছে না ইমরান বিয়ে করেছে। 

_ সত্যি বলছো নাকি মজা করছো ?

_ সত্যি কথা , মিথ্যে কেনো বলবো ?

_ তুমি বিয়ে করলে আর আমাকে জানালেও না ! 

_ তোমাকে জানানোর মত পরিস্থিতি ছিলো না। 

_ কেনো ?

কিভাবে বিয়ে টা হয়েছে খুলে বলে ইমরান। বেশ ইন্টারেস্টিং লাগে লিয়াম এর কাছে। সব শুনে খুশি হয় লিয়াম। যাই হোক শেষমেষ ওর রসকষ হীন কাঠখোট্টা নিরামিষ বন্ধুটা বিয়ে করেছে তাহলে। মেয়ে মানুষে তো এর এলার্জি ছিল। মেডিকেলে পড়া কালীন সময়ে বেশ কয়েক জন বাঙ্গালী মেয়ে ইমরানের প্রেমে পড়েছিল। প্রোপোজ ও করেছিল কিন্তু এই মুডি বয় রসকষহীন মানবের মনে প্রেম জাগেনি কখনো। সব সময় নিজের স্বপ্ন পূরণ করার চেষ্টায় থেকেছে। প্রেম, ভালোবাসা, বিয়ে , মেয়ে এই সবের প্রতি কোনো আগ্রহ ছিল না ইমরানের। ওর কথা প্রেম, ভালোবাসা , বিয়ে , মেয়ে এসব বড় একটা ঝামেলা। আর এই ঝামেলা কোনো দিন নিজের জীবনে টেনে আনবে না , জায়গা দেবে না নিজের জীবনে। সারা জীবন একা একাই পাড় করে দেবে। বেঁচে থাকলে বিয়ে করতেই হবে এরকম কিছু না। তাহলে কেনো শুধু শুধু এসব করতে যাবে ? একা একা কত সুখে আছে , বিন্দাস লাইফ, কোনো ঝামেলা নেই , প্যারা নেই। 
ইমরানের এই কথা গুলো প্লে বয় ফ্লাটিং মাস্টার লিয়াম যখন শুনতো তখন নিজের মতো করে ইমরানকে বোঝানোর চেষ্টা করতো। কিন্তু ইমরান বুঝতো না কিছু। ওর মাথায় ও অনেক বুদ্ধি আছে। কেনো শুধু শুধু নিজের জীবনে ঝামেলা টেনে নিয়ে আসবে ? 

ইমরান লিয়াম অনেক টা সময় ধরে গল্প করে। তারপর লিয়াম চলে যায় নিজের ফ্ল্যাটে। আগামী কাল থেকে হসপিটালে জয়েন করবে ইমরান। আজকে লিয়াম এর সাপ্তাহিক ছুটি ছিল। আগামী কাল লিয়াম নিজেও হসপিটালে জয়েন করবে। 
__________________

মাঝ খানে অনেক গুলো দিন পেরিয়ে যায়। 

ইমরান নিজের কাজ নিজে করে। তুলির কাজ তুলি নিজে করে। দুজন একসাথে কখনোই কিচেনে রান্না করতে যায় না। ইমরান রোজ ভোরে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে আগে রান্না করে।
তুলি ঘুম থেকে দেরি করে ওঠে। রান্না করে ইমরান চলে যাওয়ার পর। 
একে অপরের সাথে দেখা হয় ইমরান হসপিটাল থেকে ফিরে আসলে। সকাল বেলা খুব একটা দেখা হয় না দুজনের। আর দুপুরে ইমরান ফ্ল্যাটে আসে না।
এর মধ্যে প্রায় সময় সন্ধ্যার পর লিয়াম ওদের ফ্ল্যাটে আসে। তুলির সাথে বেশ বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। দুজনের সাথে গল্প স্বল্প করে চলে যায়। 

এখন সন্ধ্যা সাত টা বাজে। আজকে এখনো ফেরেনি ইমরান। অন্য দিন এর আগেই চলে আসে। 

তুলি  কিচেনে এগিয়ে যায় রান্না করার জন্য। 
ফ্রিজ থেকে মাছ মাংস বের করে ভিজিয়ে রাখে। চাল ধুয়ে চুলায় বসিয়ে দেয়। রান্নার জন্য পেঁয়াজ মরিচ কুচি করতে শুরু করে। 

এর মধ্যে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে ইমরান। তুলি কিচেন থেকে উঁকি দিয়ে দেখে ইমরান কে। কিন্তু মুখ দেখতে পায় না তুলি,  ইমরান নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুত।

তুলি পুনরায় রান্নায় মনোযোগ দেয়। 
তুলি একবার তরকারি রান্না করে দুদিন খায়। শুধু ভাত প্রত্যেক দিন দুবার রান্না করে। 

ঘণ্টা খানিক পর ফ্রেশ হয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে ইমরান। কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা কিচেনে চলে আসে। তুলিকে দেখে কপাল ভ্রু কুঁচকে যায়। তুলি একবার ইমরানের দিকে তাকিয়ে নিজের কাজে মনোযোগ দেয়। 

_ তুমি এখন কেনো কিচেনে ?

_ রান্না করতে।

_ সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি। এখন আমি রান্না করবো জানো না ? বিকেলে কি করেছো যে রান্না করো নি তখন ! 

_ ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। 

_ এত ঘুম কোথায় থাকে তোমার ?

তুলি চোখ দুটো বড় বড় করে ইমরানকে দেখিয়ে বলে ,

_ এখানে।

_ বের হও এখান থেকে।

_ আর দশ মিনিট।

তুলি একটু থেমে আবার বলে ,

_ আমি বেশি করে রান্না করেছি আজ তুমি চাইলে আমার রান্না করা খাবার খেতে পারো। 

ইমরান গম্ভীর গলায় বলে,

_ নো নিড।

তুলি চোখ উল্টে , মুখ ভেংচি কে/টে , ঢং করে শরীর দুদিকে নাড়িয়ে বলে,

_ নো নিড। 

বিরক্ত হয় ইমরান। তবে মুখে কিছু বলল না। 
তুলি দ্রুত নিজের কাজ শেষ করে কিচেন থেকে বেরিয়ে আসে। ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজিয়ে রেখে রুমে চলে যায় হাত মুখ ধোয়ার জন্য। ঘামে চিটচিটে হয়ে গেছে হাত মুখ শরীর। 

হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে ড্রইং রুমে আসতেই কলিং বেল বেজে ওঠে। তুলি জানে নিশ্চই লিয়াম এসেছে। 
লিয়াম জবের সূত্রে অটোয়া শহরে থাকে। ওর পুরো ফ্যামিলি থাকে টরন্টো শহরে। এখানে ওর ক্লোজ ফ্রেন্ড ইমরান। ইমরান আর লিয়াম এর পার্সোনালিটি আলাদা হলেও দুজনের মধ্যে ভালো সম্পর্ক। সময় পেলে লিয়াম ইমরানের সাথেই সময় কা/টায়। তবে আগে ইমরানের ফ্ল্যাটে আসতো খুবই কম। বাইরেই ঘুরতে যেতো বেশি। তবে তুলি আসার পর থেকে বাইরে ঘুরতে বের হয় না বোধহয়। সময় পেলে ইমরানের ফ্ল্যাটে চলে আসে। 

ডোর খুলে দিতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে লিয়াম এর হাস্যোজ্বল চেহারা। ছেলে টা কি সুন্দর করে যে হাসে। সৌজন্য মূলক তুলিও হাসে। 

_ কেমন আছো ?

_ আলহামদুলিল্লাহ ভালো, আপনি কেমন আছেন ?

_ ভালো। 

 সাইট হয়ে দাঁড়ায় তুলি। ভেতরে প্রবেশ করে লিয়াম। 
সোজা গিয়ে বসে সোফায়। ইমরান কিচেন থেকেই দেখে লিয়াম এসেছে। নিজের নুডুলস রান্নায় মনোযোগ দেয়। চিকেন নুডুলস রান্না করছে। 

তুলি এসে পাশের সোফায় বসে। 

_ ইমরান কোথায় ?

_ কিচেনে।

_ এখন কিচেনে কি করে ?

_ রান্না।

লিয়াম ভ্রু কুঁচকে কিচেনের দিকে তাকায়। কিছু একটা ভেবে বলে ,

_ তোমরা আলাদা আলাদা খাবার রান্না করে খাও নাকি ?

_ হুম। 

_ হাসবেন্ড ওয়াইফ হয়ে , এক ফ্ল্যাটে থেকেও আলাদা আলাদা খাও ?

_ হুম । 

_ তুমি বাঙ্গালী খাবার খাও ?

_ হ্যাঁ। 

_ ইমরানকে তো কখনো বাঙ্গালী খাবার রান্না করে খেতে দেখিনি। আমাদের মতই ঘাস পাতা আর নুডুলস রান্না করে খায় সব সময়। মাঝে মধ্যে রেস্টুরেন্টে বাঙ্গালী খাবার খেতে দেখেছি। 

তুলি চুপ করে শোনে লিয়াম এর কথা। মনে মনে বলে,

_ বাঙ্গালী হয়েও বাঙ্গালী দের খাবার রান্না করে খাওয়ার মুরোদ নেই। 

লিয়াম আগ্রহের সাথে জিজ্ঞেস করে,

_ কি কি রান্না করলে তুমি ?

_ মাছ ভাজা, মাংস ভুনা, আর চিংড়ি মাছের ঝোল। সাথে গরম গরম ভাত। 

_ ইমরান এসব খায় না কেনো ? তোমার রান্নাই তো খেতে পারে, তাহলে আর হসপিটাল থেকে ফিরে কষ্ট করে রান্না করতে হয় না। 

তুলি লিয়াম এর দিকে একটু ঝুঁকে গিয়ে বলে,

_ আপনার ফ্রেন্ড একজন মুডি বয় , ইগো ওয়ালা সেটা তো জানেন নিশ্চই !

_ হুম।

_ তার এই মুড আর ইগোর জন্য খায় না। 

_ ওওও। 

তুলি কিছু একটা ভেবে বলে,

_ আপনি কখনো বাঙ্গালী খাবার খেয়েছেন ?

_ ইমরানের সাথে একবার খেয়েছিলাম ভালো লাগেনি তাই আর পরবর্তীতে খাইনি কখনো। 

_ আজকে আমার রান্না খেয়ে দেখেন কেমন হয়েছে। 

তুলির অফার শুনে চুপ করে রইলো লিয়াম। লিয়াম এর মুখের ভাব ভঙ্গি দেখে তুলি আবার বলে,

_ টেস্ট করে দেখতে পারেন আগে। ভালো লাগলে খাবেন , না লাগলে খাবেন না। 

_ ওকে।

যেহেতু তুলি রান্না করেছে সেহেতু খাওয়াই যায়। অন্য কেউ অফার করলে জীবনেও খেতো না। 
লিয়াম সব সময় বাইরের খাবার খায়। নিজে রান্না করে খায় না কখনোই। ইমরান খাওয়ার অফার করলেও খায় না। 

তুলি লিয়ামকে নিয়ে ডাইনিং টেবিলের কাছে এগিয়ে যায়। তখনই নুডুলসের বাটি নিয়ে কিচেন থেকে বেরিয়ে আসে ইমরান। বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে কপালে। তুলির পাশে লিয়ামকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সরু চোখে তাকায় ইমরান। 
নুডুলসের বাটি টা টেবিলের উপর রেখে টিস্যু পেপার দিয়ে মুখ মুছে নেয়। তারপর চেয়ার টেনে বসে। তুলি একটা প্লেটে মাংস আর চিংড়ি তুলে দেয় একটু একটু করে। দাঁড়িয়ে থেকেই চামচের সাহায্যে প্লেট থেকে   এক পিস মাংস মুখে পুরে চিবুতেই চোখ বন্ধ করে নেয়। আহা কী স্বাদ। 
একটু সময়ের মধ্যে প্লেট ফাঁকা করে লিয়াম। তুলির দিকে তাকিয়ে হাস্যোজ্বল মুখে বলে ,

_ তুমি তো দারুন রান্না করো তুলি। অসম্ভব ভালো হয়েছে তোমার রান্না। 

_ আপনি একটু বেশি বেশিই বলেছেন ভাইয়া। 

_ একদম না, আমি ঠিকই বলছি। অনেক দিন পর এমন রান্না খেলাম। সত্যিই অনেক ভালো রান্না করো তুমি। 

_ ধন্যবাদ। ভাত দিয়ে খান আরো ভালো লাগবে। 

লিয়াম এর খেতে ইচ্ছে করলো। তাই আর না করলো না। একটা চেয়ার টেনে বসে। তুলি নিজেও একটা চেয়ার টেনে বসে। দুটো প্লেটে ভাত বেড়ে নেয়। ইমরানের দিকে তাকিয়ে বলে,

_ নুডুলস আর কত খাবে ? আমাদের সাথে ভাত খাও।

_ এমন ভাবে বলছো যেনো আমি শত বছর ধরে ভাত খাই না। যাকে খাওয়াতে বসেছো তাকেই খাওয়াও আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না। 

তুলি আর ইমরান বাংলায় কথা বলায় লিয়াম কিছুই বুঝতে পারে না। ইমরানের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,

_ ইমরান ভাত খাও , রান্না টা অনেক ভালো হয়েছে। 

_ তুমি খাও আমি খাবো না। 

লিয়াম ও আর কিছু বলে না। 
তিন জনেই খাওয়া শুরু করে। ইমরান চুপ চাপ খেলেও তুলি আর লিয়াম কথা বলতে থাকে। ইমরানের রাগ হলেও চুপ করে থাকে। খাওয়ার সময় কেনো এত কথা বলতে হবে ? চুপ চাপ খাওয়া যায় না ? কোনো দিকে না তাকিয়ে বাটির দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে খেয়ে যায় এক মনে। তারপর মনে মনে বলে,

_ চা কফি বাদে অন্য কিছু খেতে বললে তো খায় না। আর এখন তুলি রান্না করে খেতে বলেছে অনমি গপগপ করে গিলছে শুধু। রা/ক্ষ/স একটা বেশি বেশি খা তেল মসলা দেওয়া খাবার । তারপর খেয়ে খেয়ে অল্প দিনেই ভুরি বড় কর। 

বির বির করে নিজের সামনে বসে থাকা দুজনের দিকে তাকায়। দুজন এখনো হেঁসে হেঁসে কথা বলছে। 
 
Reply
#9

Part:09
 ইমরানের মুখ ভঙ্গি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গম্ভীর হয়ে থাকে। তুলির সাথে কোনো কথাই বলে না। তুলি কখনো কথা বলতে গেলেও বলে না, ইগনোর করে চলে যায়। 
তুলিও তাই আজ কাল আর কথা বলার চেষ্টা করে না। 
ভালো মন্দ কিছু জিজ্ঞেসও করে না আর। এক ফ্ল্যাটে দুজন থাকলেও মনে হয় এখানে একজন ব্যতীত দ্বিতীয় কেউ নেই। সপ্তাহ খানেক আগে লিয়াম টরন্টো শহরে গেছে নিজের ফ্যামিলির কাছে। 
তুলির এখন ফোন ছাড়া সামনাসামনি কথা বলার মতো কেউ নেই। সারা দিন চুপ চাপ কে/টে যায়। বাংলাদেশ থেকে কেউ কল করলে কথা বলে , না করলে বলে না। চঞ্চল তুলি শান্ত হয়ে গেছে। মনের ভেতর পাহাড় সমান কথা জমা হয়ে থাকলেও বলার মতো কাউকে খুঁজে পায় না। 

ইমরানকে এক বার বলেছিল ওকে বাইরে হাঁটতে নিয়ে যেতে। ইমরান নিয়েও গিয়েছিল। তবে তুলির মনে হচ্ছিল ও ওর হাসবেন্ডের সাথে আসেনি। অপরিচিত কোনো পুরুষের পাশে হাঁটছে। 
মাজ রাস্তায় ইমরানকে রেখেই ফ্ল্যাটে ফিরে এসেছিল তুলি। 
এখানে এসেছে তিন টা মাস পেরিয়ে গেছে। এর মধ্যে তিন বার এই ফ্ল্যাটের বাইরে গিয়েছিল। তুলির মাঝে মধ্যে মনে হয় , ও কোনো ফ্ল্যাটে নয় জেলখানায় আছে।  জেলখানায় ও বোধহয় কথা বলার মতো কেউ থাকে, তুলি সঠিক জানে না। 

বিষন্ন হয়ে বেডে চিৎ হয়ে শুয়ে ফোন স্ক্রল করছে তুলি। বিকেল চার টা পেরিয়ে গেছে অথচ এখনো দুপুরের খাবার খায়নি। ভালো লাগে না দম বন্ধ হয়ে আসে। কোনো কারণ ছাড়াই কান্না পায়। মায়ের কাছে ছুটে চলে যেতে ইচ্ছে করে। ফোনে কথা বলতে গেলে কান্নারা বেরিয়ে আসতে চায় তাই ফোনে কথা বলে না বেশি। কান্নারা বেরিয়ে আসার আগেই কল কে/টে দেয়। 
সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে ভেবেই এই অব্দি , কিন্তু ঠিক কোথায় হচ্ছে ? দিন দিন যেন দূরত্ব বেড়েই চলেছে। 
আগে যাও একটু একটু কথা হতো এখন তাও হয় না। 

শোয়া থেকে উঠে বসে। ফোন টা পাশে রেখে ঝিম ধরে ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে থাকে। এক মনে ভাবে অনেক কিছু। এর মধ্যে ফোনে রিং টোন বেজে ওঠে। ফোনের স্ক্রিনে দৃষ্টি আকর্ষণ করে, মিসেস ইরানী কল করেছেন। 
তুলি চোখের পানি মুছে কল কে/টে দেয়।  তারপর অডিও কল করে। ভিডিও কলে কথা বলতে গেলে বেশি কান্না পায়। 

_ কেমন আছিস তুলি ?

_ এইতো আলহামদুলিল্লাহ , তুমি কেমন আছো ?

_ আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি, তোর গলার স্বর এমন শোনাচ্ছে কেনো ? কি হয়েছে ?

_ আমি বাংলাদেশে ফিরে যাবো।

_ কেনো কি হয়েছে ?

_ আমি এখানে আর থাকতে চাই না। 

_ কেনো সেটা তো বল। ইমরান কিছু বলেছে ? 

_ বললে তো হতোই, তোমার ছেলে তো বলেই না কিছু। লাস্ট পনেরো দিনে তোমার ছেলে আমার সাথে টু শব্দ অব্দি করেনি। আমি কথা বলতে গেলে আমাকে ইগনোর করে চলে যায়। আমি ড্রইং রুমে থাকলে তোমার ছেলে ড্রইং রুমে আসতে চায় না। এক ফ্ল্যাটে দুজন থাকলেও আমার মনে হয় আমি একা একটা পৃথিবীতে বাস করি। এখানে আসার পর থেকে তোমার ছেলে এক রুমে আমি অন্য রুমে। তোমার ছেলের দিকে এক হাত আগালে তোমার ছেলে দশ হাত পিছিয়ে যায়। এভাবে সংসার হয় ? আমি আর থাকতে পারবো না এখানে, আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। এভাবে আর কিছু দিন থাকলে আমি ম/রেই যাবো। দুদিনের মধ্যে আমি বাংলাদেশে ফিরে যেতে চাই। ব্যবস্থা করো তোমারা , আর না হয় টাকা পাঠাও, আমার কাছে টাকা নেই। 

কথা গুলো অনেক কষ্টে শেষ করে তুলি। দুই চোখ বেয়ে অশ্রু ধারা বয়ে চলেছে। গলার স্বর জড়িয়ে আসছে। 
তুলির সব কথা শুনে চুপ হয়ে রয়েছেন মিসেস ইরানী। 
ইমরান এখনো এমন রয়ে গেছে বুঝতে পারেননি তিনি। এত দিন তুলির সাথে কথা বললে তুলি বলতো সব কিছু ঠিক আছে। ইমরান ও তাই বলতো। কিন্তু দিন দিন যে দুজনের মাঝে দূরত্ব বেড়ে গেছে তিনি বুঝতে পারেননি। কিছু বলার মতো খুঁজে পেলেন না, দোষ টা তো তাদের নিজেরই। 

_ কথা বলছো না কেনো ? 

_ মাফ করে দে তুলি মা , আমরা তোর জীবন টা গোছাতে চেয়েও আরো বেশি অগোছালো করে দিলাম। 

_ দোষ তো তোমাদের না , দোষ আমার কপালের। কপালে তো সুখের সংসার লেখাই নেই বোধহয় , তাহলে সুখের সংসার হবে কিভাবে ? উল্টো তো আমার মাফ চাওয়া উচিৎ তোমাদের সকলের কাছে। আমার জন্য তোমাদের ছেলের সুন্দর গোছালো জীবন এলোমেলো অগোছালো হয়ে গেছে। রাখছি ভালো থেকো। 

বলেই কল কে/টে দেয় তুলি। আর কথা বলতে পারবে না। অনেক বলে ফেলেছে আজ। 
বিয়ের প্রথম দিন গুলোতে ইমরানকে ওর পছন্দ ছিল না। আগে ভয় কাজ করতো , তারপর থেকে বিরক্ত লাগতো। কিন্তু আস্তে আস্তে ইমরানের প্রতি একটা টান জন্ম হয়েছে , মায়া জন্মেছে , ভালোবেসে ফেলেছে। অথচ ইমরান এই সবের ধারে কাছেও নেই। সব সময় ওর থেকে দূরে দূরে থাকে। এভাবে সংসার হয় নাকি ? 
এক ছাদের নিচে দুজন থাকলেই সংসার হয় না। দুজনের মধ্যে মিল মহব্বত, ভালোবাসাও থাকতে হয়। 
তুলি থাকবে না আর এখানে। এভাবে থাকলে খুব শীগ্রই মানসিক রোগীতে পরিণত হতে হবে। 

ওর মাঝে মধ্যে মনে হয় , ইমরানের হয়তো গার্লফ্রেন্ড আছে। তাই ওকে মেনে নেয় না বা নিতে পারে না। যদিও ইমরান এরকম কিছু কখনো বলেনি। কিন্তু তুলির এখন এটাই মনে হয়। 
ইমরানকে সব কিছু থেকে মুক্তি দিয়ে খুব শীগ্রই চলে যাবে তুলি। 

মিসেস ইরানী ইমরানের ফোনে কল করেন। অনেক বার রিং হওয়ার পরেও রিসিভ হয় না। ইমরান হয়তো ব্যস্ত আছে। তাই ম্যাসেজ দিয়ে রাখেন পড়ে যেন ওনাকে কল করে। 
,
,
সন্ধ্যার পর পরই ফ্ল্যাটে ফেরে ইমরান। তুলি তখন সোফায় বসে টিভি দেখছিল। ঘাড় ঘুরিয়ে ইমরানের দিকে তাকায়। ভীষণ ক্লান্ত দেখাচ্ছে ইমরানকে , চোখ মুখ ও কেমন যেন হয়ে আছে। কি হয়েছে ? অসুস্থ নাকি ? ইমরান তুলির দিকে একবার তাকিয়ে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যায়। 

ঢুলু ঢুলু পায়ে ভেতরে প্রবেশ ড্রেস নিয়ে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে আগে।  জ্বর আসবে বোধহয় , ভীষণ মাথা ব্যাথা করছে। অল্প সময়ের মধ্যে শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে আসে। টিশার্ট গায়ে জড়িয়েই বেডে শুয়ে পড়ে। 
খিদেও পেয়েছে ভীষণ , সকালে দুটো সিদ্ধ ডিম খেয়েছিল শুধু। সারা দিন আর পেটে কিছু পরেনি। কিছু খেয়েই মেডিসিন খেতে হবে। কিন্তু এখন আর রান্না করার মতো শক্তি নেই। বাইরের খাবার ও খেতে ইচ্ছে করছে না। কোনো খাবারই খেতে ইচ্ছে করছে না। 
ব্ল্যাঙ্কেট জড়িয়ে চুপ চাপ শুয়ে রইলো। শরীর ঝাঁকিয়ে জ্বর উঠছে। 

টিভি অফ করে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায় তুলি। ইমরানের সাথে কথা বলতে হবে। ও কি চাইছে সেটা ক্লিয়ার করে বলতে হবে আজ। একসাথে থাকার ইচ্ছে না থাকলে মুখ ফুটে বলুক। মুক্তি চাইলে তুলি নিজেই ডি/ভো/র্স দিয়ে চলে যাবে। এভাবে একটা সম্পর্কের মধ্যে ঝুলে থাকার কোনো মানে হয় না। 

ধীর পায়ে এগিয়ে যায় ইমরানের রুমের দিকে। ডোর নক করে তবে ভেতর থেকে সাড়া শব্দ আসে না। আর নক না করে ডোর ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে। ব্ল্যাঙ্কেট জড়িয়ে শুয়ে থাকতে দেখে কপাল ভ্রু কুঁচকে যায়। পরমুহুর্তেই দ্রুত এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় ইমরানের শিয়রে। তখন ইমরানকে কেমন যেন লাগছিল। 

_ কি হয়েছে তোমার ? 

ইমরান চোখ খুলে তুলির দিকে তাকায়। ওর দুটো লাল লাল হয়ে আছে। চেহারা ফ্যাকাশে। 

_ তুমি এখানে কেনো ?

_ কথা আছে তোমার সাথে। 

_ বলো কি বলবে। 

_ তোমার কি হয়েছে সেটা আগে বলো। ব্ল্যাঙ্কেট জড়িয়ে শুয়ে আছো কেনো এভাবে ?

_ কিছু হয়নি কি বলবে বলো।

তুলি ইমরানের কপালে হাত রাখে। ইমরান মুখ ঘুরিয়ে নেয়। 
তুলি বির বির করে বলে,

_ অসুস্থ্য হয়ে ম/রবে তবুও তেজ কমবে না সাহেবের। 

তারপর মুখ ফুটে বলে,

_ তোমার তো দেখছি অনেক জ্বর হয়েছে। মেডিসিন খেয়েছো ?

_ না। 

_ এখনো মেডিসিন খাওনি কেন? 

_ কথা বলতে ভালো লাগছে না যাও তো এখান থেকে। 

_ খাবার খেয়েছো ?

_ না।

আর কিছু না বলে রুম থেকে বেরিয়ে যায় তুলি। ইমরান ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে তুলি চলে গেছে। 

একটু পরেই প্লেট আর পানির জগ হাতে রুমে প্রবেশ করে তুলি। তুলির উপস্থিতি টের পেয়ে আবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় ইমরান। প্লেট হাতে এগিয়ে আসতে দেখে ব্লাঙ্কেটের নিচে মাথা ঢুকিয়ে দেয়। 
তুলি দেখে ইমরানের কান্ড। পানির জগ আর খাবারের প্লেট সেন্টার টেবিলের উপর রাখে। গ্লাসে পানি ঢেলে ইমরানকে ডাকে ,

_ ওঠো খাবার খেয়ে মেডিসিন খাও।

নিশ্চুপ ইমরান।

_ কি হলো ? খাবার খেয়ে মেডিসিন খেয়ে ঘুমাও ভালো লাগবে। 

_ খাবো না আমি।

_ জেদ না করে উঠে খাও।

_ বলছি তো খাবো না, তোমার খাবার তুমি খাও। 

_ তেজ না দেখিয়ে ওঠো। অসুস্থ হয়ে ম/রে গেলে তেজ দেখাবে কার উপর ? তেজ দেখাতে হলেও তো বেঁচে থাকতে হবে, আর বেঁচে থাকতে হলে খেয়ে সুস্থ্য হতে হবে। তাই তেজ আর জেদ না দেখিয়ে উঠে খাও।

ইমরান ব্ল্যাঙ্কেটের ভেতর থেকে মাথা বের করে তুলির দিকে তাকিয়ে কিড়মিড় করে বলে,

_ তোর সাহস তো কম না, তুই আমাকে এসব কথা বলছিস !

ইমরানের উপর থেকে ব্ল্যাঙ্কেট টেনে সরিয়ে নেয় তুলি। হাত টেনে ধরে তোলার চেষ্টা করে বলে,

_ ওঠো।

_ তুই আমার উপর জোর খাটাচ্ছিস ?

_ এটাকে জোর খাটানো বল ?

_ অবশ্যই।

_ তাহলে তাই করছি, ওঠো এখন। 

তুলির টানাটানিতে শোয়া থেকে উঠে বেডের সাথে হেলান দিয়ে বসে ইমরান। মাথা ব্যাথার কারণে মাথা সোজা করতে পারছে না। জড়সড় হয়ে বসে বলে,

_ ব্ল্যাঙ্কেট দে দ্রুত শীতে ম/র/লাম।  

ইমরানের গায়ের উপর ব্ল্যাঙ্কেট টেনে দেয় তুলি। গলা অব্দি ঢেকে ঘাড় কাত করে বসে রইলো। 

_ হাত ধুয়ে খাবার খাও। 

ইমরান বলে না কিছু। 

_ খাবার খাও মেডিসিন খেতে হবে। 

ইমরান একবার তুলির দিকে তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে বসে রইলো। ওর এখন মোটেও হাত দিয়ে খেতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু খিদের কারণে পেটে আগুন ধরে গেছে। 
তুলি ইমরানের দিকে কতক্ষন তাকিয়ে থেকে নিজেই হাত ধুয়ে নেয়। খাবারের প্লেট হাতে নিয়ে ইমরানের সামনে বেডে উঠে বসে। 
ভাত মাখাতে মাখাতে বলে ,

_ হাত দিয়ে খেতে না পারলেও গিলতে তো পারবে ! তাহলে তাই করো। 

ইমরান তবুও কিছু বললো না। তুলি ভাত মাখিয়ে মুখের সামনে ধরে। চুপ চাপ মুখে নেয় ইমরান। ইমরানের গরম ওষ্ঠ দয়ের ছোঁয়া লাগে তুলির হাতে। কেঁপে ওঠে হাত টা। ইমরান খাবার চিবুতেই বুঝতে পারে দারুন হয়েছে রান্না। তুলি খাইয়ে দেয় চোখ বন্ধ করে খায় ইমরান। তুলির মুখের দিকে তাকায় না একবারও। তবে তুলি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে যায়। ওর মধ্যে কোনো দোষ আছে ? কমতি আছে ? ইমরানের যোগ্য না ? তাহলে মেনে নিতে এত সমস্যা কোথায় ? মুখ ফুটে বলেও না তো কিছু। ভালো না লাগলে , একসাথে থাকতে না চাইলে ডি/ভো/র্স দিয়ে দিলেই হয়। এভাবে ঝুলিয়ে রাখার মানে কি ? তুলি কিছু বলতে গেলেও ওর কথা শোনে না। না শুনলে কিভাবে বলবে ? 
দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে ভেতর থেকে। 
প্লেটের খাবার শেষ হয়ে যায়।

_ ভাত নিয়ে আসবো আরো ?

ইমরান চোখ মেলে তাকায়। খাবার ভালো লাগছে, পেটেও জায়গা আছে। খেতেও ইচ্ছে করছে কিন্তু বসে থাকতে ইচ্ছে করছে না। চোখ বন্ধ করে নেয় পুনরায় তারপর বলে ,

_ খাবো না আর। 

হাত ধুয়ে প্লেট রেখে দেয়। মেডিসিনের বক্স খুঁজে বের করে  মেডিসিন খাইয়ে দেয়। 

_ বেড থেকে নামো।

_ কেনো ?

_ মাথায় পানি ঢাললে দ্রুত জ্বর নেমে যাবে।

_ লাগবে না।

_ জেদ না করলে ভালো লাগে না নাকি তোমার ? 

হাত ধরে টেনেই বেড থেকে নামিয়ে ওয়াশরুমে নিয়ে আসে। পায়ের উপর ভর করে বসে ইমরান। হ্যান্ড শাওয়ার দিয়ে মাথায় পানি দিয়ে দিতে শুরু করে তুলি। পানি ঢালার ফাঁকে ফাঁকে চুলে হাত বুলিয়ে দেয়। ভালো লাগছে ইমরানের,  আরম পাচ্ছে এখন। 

বেশ অনেক টা সময় নিয়ে মাথায় পানি দিয়ে দেয়। বসে থাকতে থাকতে ইমরানের পা ব্যাথা হয়ে গেছে। মাথা ব্যাথা কমাতে গিয়ে পায়ের ব্যাথা বেড়ে গেছে। 
টাওয়েল দিয়ে চুল গুলো মুছে দেয় তুলি। 

_ বের হও এখান থেকে।

_ কেনো ?

_ পি করবো , দেখবে নাকি তাকিয়ে তাকিয়ে ? 

তুলি দ্রুত ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে। 
ফ্রেশ হয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েই বেডে গিয়ে শুয়ে পড়ে। মাথা ব্যাথা একটু কমলেও জ্বর কমেনি এখনো। 

তুলি টাওয়েল টা ভিজিয়ে নিয়ে আসে। দাঁড়ায় বেডের পাশে। ইমরানের গায়ের উপর থেকে টেনে ব্ল্যাঙ্কেট সরিয়ে নেয় আবার। বিরক্ত হয় ইমরান। কপাল ভ্রু কুঁচকে বিরক্তির স্বরে বলে,

_ কি সমস্যা ? জালাচ্ছিস কেনো এভাবে ? 

কিছু না বলে ইমরানের গায়ের টিশার্ট টেনে উপরের দিকে তুলে ভেজা টাওয়েল চেপে ধরে গায়ে। ছ্যাত করে ওঠে ইমরানের শরীর। সাথে সাথেই গায়ের প্রত্যেক টা লোম খাড়া হয়ে যায়। জোর করেই ইমরানের পুরো শরীর মুছিয়ে দেয় তুলি। তারপর টিশার্ট আর ব্ল্যাঙ্কেট ঠিক ঠাক করে দিয়ে বলে ,

_ এখন ঘুমাও আরামের ঘুম। 

_ লাইট টা অফ করে দে।

তুলি ইমরানের ভেজা ড্রেস আর টাওয়েল বেলকনিতে মেলে দিয়ে আসে। শাওয়ার নিয়ে ড্রেস শুকিয়েও দেয়নি আজকে। 

বেলকনি থেকে এসে দাঁড়ায় ইমরানের ড্রেসিং টেবিলের সামনে। কিছু একটা খোঁজে কিন্তু পায় না। তারপর নিজের রুমে চলে আসে। ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে তেলের বোতল টা নিয়ে হাতের তালুতে তেল ঢেলে নিয়ে ইমরানের রুমে ফিরে আসে। ইমরানের শিয়রে বসে হাতের সব টুকু তেল ইমরানের মাথায় দিয়ে মালিশ করতে শুরু করে। আরাম লাগছে তাই আর কিছু বলে না ইমরান। তুলি মালিশ করতে করতে বলে ,

_  দু'দিনের মধ্যে আমি বাংলাদেশে ফিরে যেতে চাই।

_ কেন?

_ থাকবো না এখানে।

_ কেন?

_ শুধু কেনো কেন কেন , থাকবো না এখানে। আমি বাংলাদেশে ফিরে যাবো। যত দ্রুত সম্ভব ডিভোর্স দিয়ে দেবে আমাকে। তোমার লাইফে ঝামেলা করতে আসবো না আর। আমার এই মুখও আর কোনো দিন দেখতে হবে না তোমাকে। নিজের পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করে সুখে সংসার করো। 

চুপ করে তুলির কথা গুলো শোনে ইমরান। তুলির চোখ টলমল করছে। তুলির হাত তখনো ইমরানের চুলের ফাঁকে ফাঁকে বিচরণ করছে। তুলি নাক টেনে ধরা গলায় বলে,

_ দু'দিনের মধ্যে বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেবে তুমি। 

ইমরান ছোট করে বলে,

_ হুম। 
 
Reply
#10

Part:10

_ হুম হুম না করে ভালো ভাবে বলো যে দু’দিনের মধ্যে বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেবে কি না ? 

_ হু।

_ আবার হু, মুখ ফুটে ভালোভাবে বলো। 

ইমরানের আর কোনো সাড়া শব্দ আসে না। 

_ কথা বলছো না কেন? কি হলো? 

তবুও চুপ করে থাকতে দেখে একটু উচু হয়ে ঝুঁকে ইমরানের মুখের দিকে তাকায়। বজ্জাত ব্যাটা ঘুমিয়ে গেছে। ওর কথা গুলো শুনেছে কি ? নাকি ভালো ভাবে না শুনেই ঘুমিয়ে গেছে ? ঘুমের ঘোরেই হু হা করলো ?
রাগ হয় তুলির। চুল গুলো ধরে টেনে ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে,  কিন্তু ছিঁড়ল না। অসুস্থ মানুষ তাই বেঁচে গেলো। নিজে তো ঠিকই গিললো অথচ একটা বার জিজ্ঞেস করলো না তুলি দুপুরে খেয়েছে কিনা ? 

হাত বাড়িয়ে ইমরানের কপালে হাত রাখে আবার তাপমাত্রা চেক করার জন্য। জ্বর নেমে গেছে, গা ঠান্ডা হয়ে গেছে এখন। শুধু মাথার তালু গরম রয়েছে। 
আরো কিছুক্ষন মাথায় মালিশ করতে থাকে। 

নয়টা বাজতেই ইমরানের রুম থেকে বেরিয়ে ড্রইং রুমে চলে আসে। গিয়ে বসে ডাইনিং টেবিলে। ওরো ভীষণ খিদে পেয়েছে, দুপুরে খায়নি রাগে জেদে। এখন না খেলেই নয়। 

খাবার খেয়ে নিজের রুমে চলে আসে। ফ্রেশ হয়ে এসে বেডে শুতেই ইমরানের কথা স্মরণ হয়। কিন্তু যাবে না আর ওই রুমে। জেদ ধরে শুয়ে পড়ে বেডে। চোখ বন্ধ করতেই ইমরানের অসুস্থ মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। রাতে যদি ইমরানের আবার জ্বর ওঠে ! যদি কিছুর প্রয়োজন হয় ? শুয়েও আবার উঠে বসে। মন মস্তিষ্কের সাথে যুদ্ধ করতে করতে ইমরানের রুমে চলে আসে। ড্রিম লাইটের আলোয় দেখা যাচ্ছে চিৎ হয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে আছে ইমরান। 

তুলি সিঙ্গেল সোফায় গিয়ে গা এলিয়ে বসে রইলো। ঘুম আসছে না এখন। ঘাড় কাত করে বেডে শুয়ে থাকা ইমরানের দিকে তাকায়। 
______________________

এলার্ম এর শব্দে ঘুম ভাঙ্গে ইমরানের। বেডের পাশে রাখা এলার্ম ঘড়িটার এলার্ম বন্ধ করে কাত হয়ে শোয়। দৃষ্টি যায় সোফায় এলোমেলো হয়ে ঘুমিয়ে থাকা তুলির দিকে। দ্রুত চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড পর আবার তাকায়। না সত্যি সত্যিই তো তুলি বসে আছে। এটা ওর ভ্রম নয়। স্মরণ হয় রাতের কথা। জ্বর এসেছিল তারপর তুলি কি কি করেছে সব মনে পড়ে। এখানে এভাবে ঘুমিয়ে আছে কেন ? সারা রাত এখানেই ছিল ? 
স্থির দৃষ্টিতে সোফায় ঘুমিয়ে থাকা তুলির দিকে তাকিয়ে রইলো। এর আগেও বহু বার জ্বর এসেছিল, গত কালের চেয়েও খারাপ অবস্থা হয়েছে। না খেয়ে থেকেছে , খালি পেটে মেডিসিন খেয়েছে। খাবার অর্ডার করলেও সেসব ফ্ল্যাটে পরেই নষ্ট হয়েছে। 
একবার জ্বর উঠলে সহজে নামতো না। ইমরানের জ্বর ইমরানের মতোই ঘাড় ত্যাড়া জেদী। একবার আসলে সহজে যেতে চায় না। 

এখন আবার জ্বর উঠেছে। মাথা ব্যাথা কমলেও মাথা ঝিমঝিম করছে। 
আগামী তিন দিন হসপিটালে যেতে হবে না। দুদিনের ছুটি নিয়ে এসেছে আর একদিন ডে অফ। 

শোয়া থেকে উঠে বসে। ওয়াশরুমের চাপ দিয়েছে। 
বেড থেকে নেমে ধীরে ধীরে তুলির সামনে এসে দাঁড়ায়। 

_ তুলি , তুলি।

তুলি চোখ মেলে তাকায়। ইমরানকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দ্রুত সোজা হয়ে বসে। ঘুম ঘুম চোখের পাতা টেনে তুলে বলে ,

_ এখন কেমন লাগছে ? 

_ ভালো লাগছে , তুমি বেডে গিয়ে ঘুমাও। এখানে এভাবে বসে ছিলে কেন ? 

_ জ্বর উঠেছে আবার ? 

_ একটু একটু। তুমি বেডে গিয়ে ঘুমাও। 

_ অসুস্থ্য শরীর নিয়ে উঠেছো কেন ?

_ ফ্রেশ হবো। 

বলেই ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে যায়। তুলি বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। ফোন টা হাতে নিয়ে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যায়। 

দ্রুত ফ্রেশ হয়ে রান্না করার জন্য কিচেনে যায়। যা রান্না করা ছিল আগের , সে সব রাতেই শেষ হয়েছে। 
ইমরানের পছন্দের সব কিছু রান্না করতে শুরু করে। 

ইমরান ফ্রেশ হয়ে এসে বেডে বসে হেলান দিয়ে। ফোন হাতে নিয়ে খাবার অর্ডার করতে নেয়। কি মনে করে আবার অর্ডার না করেই ফোন রেখে দেয়। 
বেড থেকে নেমে দুলতে দুলতে রুম থেকে বেরিয়ে আসে। এগিয়ে যায় কিচেনের দিকে। 

_ তুমি এখানে কেন ?

_ কফি খাবো। 

_ সোফায় গিয়ে বসো আমি নিয়ে আসছি। 

_ চিনি বেশি দিও।

_ আচ্ছা।

ভদ্র ছেলের মতো চুপ চাপ কিচেন থেকে বেরিয়ে যায় ইমরান। ওর যাওয়ার পথে তাকিয়ে রইলো তুলি। এই লোক এতো ভালো হলো কবে ?  এক কথায় কিচেন থেকে বেরিয়ে চলে গেলো ? জ্বর হয়ে মাথার তার ছিঁড়ে গেলো নাকি ? একা একা কথা বলতে বলতে কফির জন্য পানি গরম বসায় সসপ্যানে। 

কয়েক মিনিট পর কফি বানিয়ে কিচেন থেকে বেরিয়ে আসে তুলি। সোফায় বসে থাকা ইমরানের হাতে কফির মগ টা দিয়ে আবার কিচেনে ফিরে আসে। 

সাত টার পর পর রান্না শেষ হয়ে যায়। সব কিছু ডাইনিং টেবিলে সাজিয়ে হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে আসে। 

_ চলো খাবার খাবে। 

চুপ চাপ উঠে দাঁড়ায় ইমরান। তুলির আগে আগে গিয়ে চেয়ার টেনে বসে। অবাকের উপর অবাক হচ্ছে তুলি। ভেবেছিল খাবার খেতে বলার পর বরাবরের মতোই নাক মুখ কুঁচকে বলবে ,

_ তোমার খাবার তুমি খাও। 

অবাকের রেশ ধরে রেখেই নিজেও একটা  চেয়ার টেনে বসে। দুজনের জন্যই খাবার বেড়ে নেয় দুটো প্লেটে। 
চুপ চাপ খাওয়া শুরু করে দুজন। তুলি একটু পর পর ইমরানের মুখের দিকে তাকায়। ইমরান প্লেটের দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে খাচ্ছে। 
তুলি মুখের খাবার শেষ করে বলে,

_ তোমাকে রাতে কি বলেছিলাম মনে আছে ?

ইমরান প্লেট থেকে চোখ সরিয়ে তুলির মুখের দিকে তাকায়। 

_ কি ?

_ আমি বাংলাদেশে ফিরে যাবো।

_ যাবে।

_ আগামী কালকের মধ্যেই সব কিছু ব্যবস্থা করে দেবে তুমি। 

ইমরান খেতে খেতে বলে ,

_ টাকা নেই আমার কাছে। 

তুলি চোখ দুটো বড় বড় করে অবাক হয়ে বলে ,

_ তোমার কাছে টাকা নেই ?

_ নাহ্।

_ তুমি যে রাতে বললে আগামী দুদিনের মধ্যে বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেবে। 

_ এই কথা আমি বলেছি ? 

_ হ্যাঁ।

_ মনে নেই আমার। জ্বরের ঘোরে বোধহয় উল্টা পাল্টা বলেছি। 

_ তুমি জ্বরের ঘোরে কিছুই বলোনি, সব সজ্ঞানেই বলেছিলে।

_ সজ্ঞানে বললে মনে থাকতো আমার। ঘুমের ঘোরে বলেছি তাহলে।

_ যেভাবেই বলো না কেন , আগামী কালকের মধ্যে ব্যবস্থা করবে তুমি। 

_ বলছি তো টাকা নেই।

_ তোমার কাছে টাকা নেই সেটা আমাকে বিশ্বাস করতে হবে ? 

_ করা না করা তোমার ব্যাপার, আমার কাছে টাকা নেই এটাই সত্যি কথা। 

_ অত শত বুঝি না আমি। যেভাবে পারবে সেভাবেই ব্যবস্থা করে দেবে। 

_ এক মাস ওয়েট করতে হবে। 

_ বাড়ি থেকে টাকা পাঠাতে বলো।

_ তোমার প্রয়োজন তুমি বলো। 

_ আমি বলেছি।

_ তাহলে তো হয়েছেই।

_ তুমি টাকা দিতে নিষেধ করেছো কেন ?

_ জানিনা। 

মেজাজ গরম হতে শুরু করে তুলির। রাগী স্বরে বলে,

_ তুমি কি চাইছো খোলাশা করে বলবে একটু ? 

_ আপাতত পেট ভরে খেতে চাইছি। 

_ আমি থাকবো না এখানে।

_ তাহলে রুমে গিয়ে শুয়ে থাকো। 

_ এই দেশে থাকবো না।

_ এটা তো তোমার বাংলাদেশ না যে বললাম আর ফুড়ুৎ করে উড়ে চলে গেলাম। 
,
,
খাওয়া শেষ করে মেডিসিন খায়। তারপর শুয়ে পড়ে বেডে। কল করে মায়ের ফোনে। রিং হওয়ার কয়েক সেকেন্ড পরেই রিসিভ হয়। 

_ আসসালামু আলাইকুম।

_ ওয়ালাইকুম আসসালাম , কেমন আছিস ইমরান ?

_ আলহামদুলিল্লাহ ভালো , তুমি কেমন আছো ?

_ আলহামদুলিল্লাহ, কি করিস ?

_ বসে আছি।

_ হসপিটাল নেই ?

_ ছুটি নিয়েছি। 

_ ওহ , তুলি কি করে ?

_ টিভি দেখে। 

_ সকালে খেয়েছিস ?

_ হুম। আচ্ছা আম্মু আমি এই বার বাংলাদেশে যাওয়ার পর রান্না কে করতো ? 

_ কেন ?

_ না এমনি , রান্না গুলো অনেক ভালো হতো। তুমি রান্না করতে নাকি রাবেয়া আন্টি করতো ?

_ সকালে আমি করতাম দুপুরে আর বিকেলে তুলি করতো। 

চুপ হয়ে যায় ইমরান। মিসেস ইরানী বলেন ,

_ তুই বিয়ে টা না মানলেও তুলি হয়তো আগেই মেনে নিয়েছিল। বিয়ের কয়েক দিন পর থেকে তুলি নিজের হাতে তোর পছন্দের সব কিছু রান্না করতো রোজ। 

_ আব্বু কোথায় ? বাড়ি ফেরেনি এখনো ?

মিসেস ইরানী বুঝতে পারেন ছেলে কথা ঘোরানোর চেষ্টা করছে। 

_ তোর আব্বু একটু পর ফিরবে। তুলিকে মেনে নে না বাপ। তুলির মধ্যে কোনো দোষ আছে ? কোনো কমতি আছে ? তুলির স্বভাব চরিত্র ভালো না ? ওকে মেনে নিতে এতো কিসের সমস্যা ? আল্লাহ তায়ালা চেয়েছেন বলেই তোদের বিয়ে টা হয়েছিল। 

_ পরে কল করছি ভালো থেকো।

বলেই কল কে/টে দেয়। 
গত কাল সন্ধ্যায় কথা হয়েছিল। মিসেস ইরানী নিজের সাধ্যমত ইমরানকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এই ছেলে বরাবরের মতোই পরে কথা বলছি বলে কল কে/টে দিয়েছিল। 

মিসেস ইরানী ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেললেন। তার ছেলে টা কি কোনো দিন বুঝবে না ? বিয়ে টা মেনে নিতে কিসের এতো সমস্যা কেউ বুঝতে পারে না। নির্দিষ্ট কোনো কারণ তো বলতে হবে , দেখাতে হবে। সেরকম কোনো কারণ বলতেও পারে না, দেখাতেই পারে না। অদ্ভুত একটা মানুষ। 

____________________

সন্ধ্যার পর পর ফিরে আসে লিয়াম। ফ্রেশ হয়ে আটটা নাগাদ ইমরানের ফ্ল্যাটে নক করে। 
ইমরান তুলি দুজনেই একে অপরের মুখের দিকে তাকায়। দুজন মতোই রাতের খাবার খেয়ে সোফায় বসেছে। 
কে আসলো এখন  ? 
তুলি সোফা ছেড়ে উঠতে নিলে ইমরান ওকে থামিয়ে নিজেই ডোরের দিকে এগিয়ে যায়। 
ডোর খুলে সামনে লিয়ামকে হাঁসি মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পায়। 

_ কেমন আছো এখন ?

_ আলহামদুলিল্লাহ ভালো,তুমি কেমন আছো ?

_ অনেক ভালো। 

ভ্রু কুঁচকায় ইমরান। ইমরানকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে লিয়াম। ইমরান ডোর লক করে লিয়াম এর পেছন পেছন এসে সোফায় বসে। 

_ হেই তুলি কেমন আছো ?

_ জ্বি আলহামদুলিল্লাহ ভালো, আপনি কেমন আছেন ?

_ আমিও অনেক ভালো আছি।

নিজের হাতে থাকা বড় বড় চকলেটের প্যাকেট দুটো তুলির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে,

_ তোমার জন্য।

_ এসব কেন এনেছেন আবার ?

_ তুমি খাবে সেজন্য এনেছি। এগুলো খেতে অনেক ভালো , খেয়ে দেখো। 

তুলি প্যাকেট দুটোর দিকে তাকায়। এই চকলেট দুটো আগে খায়নি কখনো , দেখেও নি। 
লিয়াম এর জোরাজুরিতে একটা প্যাকেট খুলে একটু ভেঙে মুখে দেয়। আসলেই খেতে অনেক ভালো। 
একটু ভেঙে লিয়াম এর দিকে বাড়িয়ে দেয়।

_ তুমি খাও।

_ খাচ্ছি তো আপনিও একটু খান।

হাতে নেয় লিয়াম। 
তুলি আরো কিছুটা ভেঙে ইমরানের দিকে বাড়িয়ে দেয়।

_ খাবো না।

_ একটু খেয়ে দেখো ভালো লাগবে।

_ বলছি তো খাবো না। 

তুলি ইমরানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। সারা দিন তো ভালোই ছিল , এখন আবার কি হলো ? 
বেশি কিছু না ভেবে নিজেই খেতে শুরু করে। এই মুডি বয়ের মুড চেঞ্জ হতে সময় লাগে নাকি ? 

তুলি আর লিয়াম কথা জুড়ে বসে। ইমরান চুপ চাপ দেখছে আর ফুলছে। নিজে ভালোবাসবে না , ধরবে না, ছুবে না , অন্য কারো সাথে কথা বললে সেটাও সহ্য হবে না। বদ লোক একটা। 

ইমরান সোফা থেকে উঠে নিজের রুমে চলে যায় মেডিসিন খাওয়ার জন্য।

তুলি একটা ফ্যান্টাসি হরর থ্রিলার হলিউড মুভি প্লে করে। মুভি টা দেখেই লিয়াম এর ঠোঁটে হাসি ফুটে ওঠে।

_ এই মুভি টা আমার অনেক পছন্দের। অনেক বার দেখেছি কিন্তু তার পরেও ভালো লাগে দেখতে।

_ আমিও কয়েক বার দেখেছিলাম। 

_ আজকে তাহলে মুভি টা দেখা যাক। 

_ হুম অবশ্যই। 

_ আমার ফ্ল্যাটে পপকর্ন আর চিপস্ আছে। আমি ওগুলো নিয়ে আসছি এক্ষনি। 

বলেই সোফা ছেড়ে উঠে নিজের ফ্ল্যাটের দিকে এগিয়ে যায়। 

কয়েক মিনিট পরেই দুই হাত ভর্তি করে পপকর্ন,  চিপস্ আর সফ্ট ড্রিংস নিয়ে ফিরে আসে। 

_ এতো কিছু  ?

_ মুভির রান টাইম অনেক। মুভি অর্ধেক শেষ হতে হতে এগুলো শেষ হয়ে যাবে। 

লিয়াম এর বলার ধরণ দেখে মুচকি হাসে তুলি। 
দুজনেই সোফায় বসে। 
ইমরান জগ হাতে রুম থেকে বেরিয়ে আসে। জ্বর অনেক কমে এসেছে। আগের চেয়ে অনেক ভালোও লাগছে। 
ইমরানকে দেখে লিয়াম বলে ,

_ ইমরান আসো মুভি দেখি। 

ইমরান গম্ভীর গলায় বলে,

_ আমার ভালো লাগছে না তোমরা দেখো। 

লিয়াম আর কিছু বলে না। ইমরান কিচেন চলে যায় পানি নেওয়ার জন্য। জগ ভর্তি করে ড্রইং রুম ক্রস করার সময় আড়চোখে তুলির দিকে তাকায়। তুলি টিভির দিকে তাকিয়ে আছে। 

রুমে এসে লাইট অফ করে ডোর খোলা রেখেই বেডে শুয়ে পড়ে। 

একটু পরেই ড্রইং রুমের লাইট অফ হয়ে যায়। 
কয়েক মিনিট অতিবাহিত হতেই দুজনের হু হা করে হাসার শব্দ ভেসে আসে। আবার ভয় পেয়ে চিৎকার ও করছে একটু পর পর। 
ত্রিশ মিনিটের মতো চলে এরকম। 
আবার হো হো করে হেঁসে উঠতেই শোয়া থেকে লাফিয়ে উঠে বসে ইমরান। বুকের ভেতর এমন করছে কেন ? আর সহ্য হচ্ছে না। অস্থির অস্থির লাগছে। 
বেড থেকে নেমে ড্রইং রুমে এসে দাঁড়ায়। 
দুজন পূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে টিভির বড় স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে। ভয়ংকর সিন আসতেই দুজন এক সাথে আআআআ করে সোফার সাথে চিপকে যায়। কয়েক সেকেন্ড পরেই আবার হো হো করে হেঁসে ওঠে দুজন। 
হাই ফাইভ করে দুজন। হাই ফাইভ করার শব্দ ইমরান শুনেছে বেশ কয়েক বার। 
দ্রুত এগিয়ে গিয়ে দুজনের মাঝখানে বসে পড়ে রোবটিক ভঙ্গিমায়। 
দুজনেই অবাক হয়ে ইমরানের মুখের দিকে তাকায়। 
তুলি অবাক হয়েই বলে,

_ তুমি এখনো ঘুমাও নি ?

_ এভাবে চিৎকার করলে ঘুম আসে ?

লিয়াম বলে, 

_ উঠে আসল কেন ইমরান ? 

_ তোমাদের সাথে মুভি দেখবো। 

লিয়াম খুশি হয়ে বলে,

_ তাহলে তো আরো মজা হবে। 

_ হুম। 

তুলি বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে রইলো ইমরানের মুখের দিকে।

_ এভাবে তাকিয়ে কি দেখছো ?

তুলি দুদিকে মাথা নাড়ায়। কিছু দেখছে না। 
এই বললো ভালো লাগছে না,  চলে গেলো রুমে। আবার ফিরে আসলো বললো চিৎকার করার কারণে ঘুমোতে পারছে না। এখন আবার বলছে মুভি দেখতে এসেছে। এক মুখে কয় কথা বলে এই লোক ?  
Reply


Forum Jump:


Users browsing this thread: 1 Guest(s)