Thread Rating:
  • 0 Vote(s) - 0 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5

লাভ এন্ড লাস্ট ইন ঢাকা (লেখক: কাদের সাইমুন)
#1


ঢাকা পৃথিবীর অন্যতম বড় মহানগরী। প্রায় দুই কোটির উপর মানুষ বাস করে এই শহরে। এই শহরে মানুষের ভীড়ে লুকিয়ে আছে অজস্র কামের গল্প। এইজন্য এই সিরিজটা খুলছি। এটা আসলে কিছু বড় গল্পের সংকলন হবে। আগের অঘটন ঘটন পটীয়সী লিখতে গিয়ে টের পেয়েছি খুব বড় প্লটের গল্প লিখতে গেলে প্রচুর সময় দিতে হয়। তাই সেটা এড়িয়ে এখানে ছোট প্লটের বড় গল্প লিখছি। আর উপন্যাস হয়তো লিখব না। নানা কাজের ফাকে আর অঘটন ঘটন পটীয়সী লেখার মাঝে মাঝে এই গল্প গুলোর কিছু খসড়া করে রেখেছিলাম। এখন এই গল্প গুলোর খসড়া গুলো কে আস্তে আস্তে গল্পে পরিণত করব। ব্যস্ত ঢাকা শহরের পটভূমিতে এই গল্প গুলো গড়ে  উঠবে। সমাজের উচ্চবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত, নিন্মবিত্ত সবার গল্প আসবে এখানে। এই গল্প গুলোর প্লট আপনাদের পরিচিত। আপনাদের আসে পাশের মানুষদের নিয়ে লিখা। যে কোন মহানগরে বড় হলে বা বসবাস করলে এইসব মানুষদের আপনি দেখেছেন, তাদের সাথে গল্প করেছেন। কে জানে আপনি হয়তো তাদের একজন। এখন এই মানুষদের সাথে মিলে গল্পে যাত্রা শুরু করুন। পড়তে থাকুন ঢাকার প্রেমের এবং কামের গল্প। 

 


 
সূচনা লিস্ট 
----------------
Reply
#2

ধানী লংকা
-
আপডেট :০১
-

ধানী লংকা = বাংলা অভিধানের মত ধানী লংকা ছোট মরিচ কে বুঝায়। প্রচলিত অর্থে এই মরিচ গুলোর ঝালের মাত্রা বেশি হয় এবং অনেক সময় কথ্য ভাষায় ছোট খাট মেজাজি মানুষদের ধানী লংকা বলে।


আপডেট ১

২০২৫ সালের শরৎকাল। ঢাকার বসুন্ধরায় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস সকালবেলা একটু অন্যরকম লাগে। গরমটা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। রোদ উঠেছে, কিন্তু হালকা বাতাস আছে। প্লাজার ওপর দিয়ে হেঁটে গেলে গাছের ছায়া পড়ে। নর্থ অ্যাকাডেমিক বিল্ডিং আর সাউথ অ্যাকাডেমিক বিল্ডিংয়ের মাঝখানের ওপেন স্পেসটায় ছেলেমেয়েরা ভিড় জমায়। কেউ কফি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কেউ ফোনে কথা বলছে, কেউ দৌড়ে ক্লাসে যাচ্ছে। বাতাসে একটা হালকা গরমের গন্ধ। দূরে কোথাও কনস্ট্রাকশনের শব্দ ভেসে আসছে।
নোমান এসে পৌঁছাল সাড়ে নয়টার দিকে। তার গাড়িটা পার্কিংয়ে রেখে লিফটের দিকে যায়নি। সিঁড়ি বেয়ে উঠেছে। পাঁচ ফুট নয় ইঞ্চি লম্বা ছেলে। কাঁধ চওড়া, চুল একটু লম্বা করে রাখে। আজ সাদা টি-শার্ট পরেছে, কালো জিন্স। ঘড়িটা দামি। ফোন হাতে নিয়ে সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে মেসেজ চেক করছে। তার হাঁটার ধরনটায় একটা আত্মবিশ্বাস আছে। যেন ক্যাম্পাসটা তার নিজের জায়গা।



নোমান ঢাকায় বড় হয়েছে। ধানমন্ডিতে। ছোটবেলা থেকে এই শহরের গরম, যানজট, বৃষ্টির জলজমাট রাস্তা সব তার চেনা। কলেজে পড়ার সময় থেকেই বন্ধুদের সাথে ঘুরে বেড়িয়েছে। কলেজ জীবনে আরও খোলামেলা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে সে নিজেকে আরও মুক্ত মনে করে। নিয়ম তার কাছে বোরিং। যে মেয়েরা সবসময় নিয়ম মেনে চলে, ভালো রেজাল্ট নিয়ে ঘুরে, তাদের প্রতি তার কোনো বিশেষ দুর্বলতা নেই। সে বরং এমন মেয়ে পছন্দ করে যারা একটু হাসে, একটু সাহস দেখায়, একটু নিয়ম ভাঙে। তার মনে হয় জীবনটা একটু হালকা হওয়া উচিত। ভারী হলে দম বন্ধ হয়ে যায়। ডিবেট ক্লাবে সে অ্যাকটিভ। কথা বলে ভালো। মঞ্চে দাঁড়ালে লোক শোনে। সিড়ির গোড়ায় দুইটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একজনের নাম বুশরা আরেকজনের নামটা ঠিক জানে না। কয়েকটা কোর্সে বুশরার সাথে একই ক্লাসে পড়েছে। জেনারেল এডুকেশন আর একটা এলেকটিভ। বুশরাকে সে চেনে। হি-জাব পরা, ছোটখাটো, সবসময় সামনের সারিতে বসে, নোট নেয়। টিচাররা প্রশংসা করে। নোমানের কাছে এসব মেয়ে একরকম। গুড গার্ল। নিয়ম আর রেজাল্ট নিয়ে মাথায় অহংকার। সে ওদের দিকে খুব একটা তাকায় না। তাকালেও মনে হয় ওরা অন্য গ্রহের মানুষ।


তার ফ্রেন্ড রাফি ফোন করেছিল সকালে।
“আজ বিকেলে বাস্কেটবল আছে। আসবি?”
নোমান উত্তর দিয়েছিল, “আসব। কিন্তু আগে একটু দেখি কে আছে।”
রাফি হেসে বলেছিল, “তুই তো সবসময় দেখতে থাকিস কে আছে।”
নোমান হাসল। হাসলে তার দাঁতগুলো সাদা দেখায়। মেয়েরা এই হাসিটা পছন্দ করে। সে জানে।
ক্লাস ছিল বিজনেস স্টাডিজের। নোমানের মেজর মার্কেটিং। পড়াশোনায় এভারেজ। সিজিপিএ তিনের কাছাকাছি ওঠানামা করে। কিন্তু ক্যাম্পাসে সবাই চেনে। গেমস অ্যান্ড স্পোর্টস ক্লাবের অ্যাকটিভ মেম্বার। বাস্কেটবল খেলে ভালো। ফুটবলও খেলে। সিনে অ্যান্ড ড্রামা ক্লাবেও মাঝে মাঝে যায়। ডিবেট ক্লাবে নিয়মিত যায়। কোনো অনুষ্ঠান হলে মঞ্চে দাঁড়ায়। কথা বলে সাবলীলভাবে। মেয়েদের সাথে কথা বলতে তার কোনো দ্বিধা নেই। সে জানে কখন হাসতে হয়, কখন চোখ রাখতে হয়, কখন একটু কাছে যেতে হয়।
ক্লাসে ঢুকে পেছনের বেঞ্চে বসল। সামনে দুইজন মেয়ে বসেছিল। একজন পেছন ফিরে তাকাল। নোমান চোখ তুলে হাসল। মেয়েটি মুখ ঘুরিয়ে নিল, কিন্তু একটু হাসল। নোমান জানে এই হাসির মানে।
লেকচার চলছে। প্রফেসর কিছু বলছেন। নোমান খাতা খুলেছে, কিন্তু লিখছে না। ফোনটা টেবিলের নিচে রেখে মেসেজ দেখছে। এক মেয়ে রাত্রে মেসেজ দিয়েছিল। “আজ রাতটা কেমন কাটালে?” নোমান উত্তর দেয়নি। উত্তর দিতে চায় না সবসময়। কিছু মেয়েকে একটু অপেক্ষা করাতে হয়। তাহলে তারা আরও আগ্রহী হয়।
ক্লাস শেষ হলে করিডোরে বেরিয়ে এল। বাতাসটা একটু গরম। লাইব্রেরির দিকে যায়নি। সরাসরি স্টুডেন্ট লাউঞ্জের দিকে গেল। বয়েজ লাউঞ্জ সাউথ অ্যাকাডেমিক বিল্ডিংয়ের প্রথম তলায়। সেখানে টিভি চলছে। কয়েকজন ছেলে গেম খেলছে। নোমান একটা সোফায় বসল। পা তুলে দিয়ে ফোন হাতে নিল।
তার ফ্রেন্ড তানভির এসে বসল পাশে।
“কাল রাতের মেয়েটা কেমন ছিল?”
নোমান চোখ না তুলে বলল, “ঠিক আছে। খুব বেশি কথা বলে।”
তানভির হাসল। “তুই তো সবসময় এমনই বলিস।”


নোমান মাথা নাড়ল। সে জানে তার সম্পর্কে কী ধারণা ক্যাম্পাসে। প্লেবয়। অনেকের সাথে ডেটে যায়। শারীরিক সম্পর্কও হয়। কিন্তু প্রেম নেই। প্রেম মানে দায়িত্ব। দায়িত্ব সে নিতে চায় না এখন। বাবা-মা চায় সে ভালো সিজিপিএ নিয়ে গ্রাজুয়েশন শেষ করুক। তারপর চাকরি। তারপর বিয়ে। নোমান এই সব ঠিকঠাক মানতে চায় না। জীবনটা একটু অন্যরকম হতে চায়। সে চায় প্রতিদিন নতুন কিছু। একই জিনিস বারবার করলে বিরক্ত লাগে।
তানভির বলল, “ডিবেট ক্লাবে ঐ যে *ওয়ালি মেয়েটা। বুশরা। তোর সাথে কয়েকটা ক্লাসে ছিল না?”
নোমান কাঁধ ঝাঁকাল। “ছিল। সামনের সারিতে বসে। নোট নেয়। টিচাররা প্রশংসা করে। গুড গার্ল টাইপ। নিয়ম আর রেজাল্ট নিয়ে মাথায় অহংকার। আমার দরকার নেই।”
তানভির হাসল। “তবুও ডিবেটে ও ভালো বলে।”
নোমান বলল, “বলুক। এসব মেয়েদের সাথে সময় নষ্ট করার দরকার নেই।”



বুশরা ক্যাম্পাসে আসে সকাল সাড়ে আটটার আগে। বাসা থেকে বেরোয় সাতটায়। নামাজ পড়ে, নাস্তা করে, * পরে বেরোয়। পাঁচ ফুটের একটু কম উচ্চতা। ছোটখাটো শরীর। ফর্সা চেহারা। চোখ কালো, বড়। *টা সাদা বা হালকা রঙের পরে। আজ হালকা নীল রঙের * পরেছে। কালো আবায়া। হাতে একটা বড় ব্যাগ। সব মিলিয়ে ওর সাথে ভাল মানিয়েছে। বুশরার ফ্যাশন সেন্স ভাল। ব্যাগের ভেতরে বই, খাতা, পানির বোতল, নামাজের জায়নামাজ। ছোট একটা জায়নামায সব সময় সাথে রাখে যদি কখনো বাইরে দরকার হয়। নাময সহজে কাজা করতে চায় না বুশরা।
বুশরাও ঢাকায় বড় হয়েছে। উত্তরায়। ছোটবেলা থেকেই শহরের ব্যস্ততা তার চেনা। কলেজে পড়ার সময় থেকেই সে নিয়ম মেনে চলেছে। বাবা-মা চেয়েছেন সে ভালো রেজাল্ট করুক। সে করেছে। কলেজেও। এখন বিশ্ববিদ্যালয়েও। তার সিজিপিএ সাড়ে তিনের ওপরে। টিচাররা তাকে চেনেন। প্রশংসা করেন। বুশরা এই প্রশংসাগুলো চুপচাপ নেয়। কিন্তু ভেতরে একটা তৃপ্তি থাকে। সে জানে সে অনেকের চেয়ে ভালো। নিয়ম মেনে চলে বলেই এই অবস্থান। যারা নিয়ম ভাঙে, তাদের সে একটু হালকা চোখে দেখে। তার মনে হয় নিয়ম না থাকলে জীবনটা এলোমেলো হয়ে যায়। মানুষ আর পশুর মাঝে পার্থক্য ডিসিপ্লিনে।
ডিবেট ক্লাবে সে নিয়মিত যায়। কথা বলে পরিষ্কার। আর্গুমেন্ট সাজায় ভালো। কয়েকটা কোর্সে নোমানের সাথে একই ক্লাসে পড়েছে। নোমানকে সে চেনে। পেছনের বেঞ্চে বসে, ফোন দেখে, মাঝে মাঝে হালকা কমেন্ট করে। পড়াশোনায় এভারেজ। কিন্তু ডিবেটে ভালো। মেয়েরা চেষ্টা করে নোমানের সাথে কথা বলবার। ওর পশ চলাফেরার ধাচ বা নায়োকচিত চেহারা অন্য মেয়েদের আকর্ষণ করে তবে বুশরা পাত্তা দেয় না। বুশরার কাছে এসব ছেলে একরকম। সময় নষ্ট করে, নিয়ম মানে না, তারপরও ক্যাম্পাসে নামডাক থাকে। কেন? একটু ভাল ডিবেট করে সেজন্য? ভাল বাস্কেটবল খেলে সে জন্য? পড়াশুনায় যারা গুরুত্ব দেয় না। ডিসিপ্লিনে যাদের আগ্রহ নেই সে ওদের দিকে খুব একটা গুরুত্ব দেয় না।



নর্থ অ্যাকাডেমিক বিল্ডিংয়ের দিকে যায়। তার ক্লাসগুলো বেশিরভাগ এখানেই। সে ইংরেজি সাহিত্য পড়ে। পড়াশোনায় ভালো। ক্লাসে প্রশ্ন করলে উত্তর দেয়। অ্যাসাইনমেন্ট সময়মতো জমা দেয়। কখনো লেট হয় না।
ক্লাস শুরুর আগে লাইব্রেরিতে যায়। লাইব্রেরি ক্যাম্পাসের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে। বড় জায়গা। ছয় তলা। শান্ত পরিবেশ। বুশরা উপরের তলায় একটা জায়গায় বসে। বই খুলে পড়তে থাকে। চারপাশে কেউ কথা বলে না। শুধু পাতা ওল্টানোর শব্দ। জানালা দিয়ে রোদ ঢুকছে। ধুলোবালি আলোয় ভেসে বেড়াচ্ছে। তার ফ্রেন্ড সাদিয়া এসে বসল পাশে। সাদিয়াও * পরে। দুজনের বন্ধুত্ব কয়েক সেমিস্টারের। তবে এর মাঝে বন্ধুত্ব জমে উঠেছে। সাদিয়াও ঢাকায় বড় হয়েছে। মিরপুরে। বুশরার চেয়ে একটু খোলামেলা। মাঝে মাঝে দুষ্টমি করে। ওদের ভিন্ন চরিত্র বন্ধুত্বে বাধা হয় নি কারণ সাদিয়া ঠিক উশৃংখল নয়। সাদিয়া হয়ত চঞ্চল, হালকা পাতলা দুষ্টমি করছি, টীজ করে হয়তো দুই একটা যৌন সুড়সুড়ি মূলক কথা বলছে তবে দিন শেষে সাদিয়াও নিয়ম মেনে চলা মেয়ে। বুশরার বাসায় যায় মাঝে মাঝে। বুশরা কে তাই অন্য অনেকের থেকে ভাল চিনে সাদিয়া। সাদিয়া ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে বলল, “তোর আজকের আবায়াটা কেমন টাইট মনে হচ্ছে।”
বুশরা চোখ তুলে তাকাল। “কী বলছিস?”
সাদিয়া মুচকি হেসে বলল, “বলছি তোর ফিগারটা লুকানো যায় না একেবারে। আবায়ার নিচেও বোঝা যায়। বিশেষ করে কোমরের দিকটা।”
বুশরা গাল গরম হয়ে গেল। “এসব কথা বলিস না।”
সাদিয়া আরও কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, “আমি তো তোর বাসায় গিয়েছি। জানি তোর শরীর কেমন। ছোটখাটো হলেও... মন্দ না। কোমরটা সরু, তারপর নিচের দিকটা একটু গোল। আর উপরে... বুবস দুটো ছোট না। আবায়া পরলেও চাপা পড়ে না। অনেকে * পরে লুকিয়ে রাখে, কিন্তু তোরটা লুকানো শক্ত। বিশেষ করে যখন তুই একটু হেলে দাঁড়াস বা হাঁটার সময়।”
বুশরা বইয়ের পাতায় চোখ নামিয়ে নিল। গাল আরও গরম হয়ে গেল। “সাদিয়া, যথেষ্ট হয়েছে।”
সাদিয়া হাসল। “রাগ করিস না। আমি তো বন্ধু। তোকে টিজ করতেই পারি। আবিদ জানে? তোর শরীরের ব্যাপারটা?”
বুশরা মাথা নাড়ল। “এসব বিষয় নিয়ে কথা হয় না। হওয়ারও দরকার নেই।”
সাদিয়া বলল, “হওয়া উচিত। আমাদের শরীর কি আমাদের অংশ না? তুই তো এমনিতেই কনজারভেটিভ। সবাই ভাবে তুই শুধু পড়াশোনা আর ধর্মকর্ম। কিন্তু আমি জানি তোর শরীরটা... ভালোই আছে। ছোট উচ্চতার মেয়েদের মধ্যে তোর গড়নটা আলাদা। কোমর সরু, হিপস একটু ভরা, আর বুকের দিকটাও ফাঁকা না। আবায়ার নিচে লুকিয়ে রাখলেও চোখ থাকলে ধরা পড়ে।” এইসব বলতে বলতে মুচকি হাসে সাদিয়া। লজ্জায় লাল হয় বুশরার কান। বুশরা আর কিছু বলল না। ভেতরে একটা অস্বস্তি কাজ করছিল। সাদিয়া মাঝে মাঝে এমন করে। বুশরা জানে তার শরীর ছোটখাটো হলেও গড়ন আছে। কিন্তু সে সেটা নিয়ে ভাবে না। ভাবতে চায় না। নিয়ম মেনে চললে এসব বিষয় গুরুত্ব পায় না। তার পরিচয় তার পড়াশোনা, তার নিয়ম, তার নামাজ। শরীর নয়।
সাদিয়া আবার বলল, “আবিদ আজ আসবে?”
বুশরা মাথা নাড়ল। “দুপুরে আসবে। লাঞ্চ করব।”
সাদিয়া হাসল। “তুই আর আবিদ দেখলে মনে হয় দুজন বিয়ে করে ফেলেছ। এত নিয়মনিষ্ঠ দুজন।”
বুশরা মুচকি হাসল। কিছু বলল না।
দুপুরে আবিদ এল। লাইব্রেরির বাইরে অপেক্ষা করছিল। বুশরা দেখে হাসল। আবিদ কাছে এসে বলল, “ক্লান্ত লাগছে?”
বুশরা বলল, “একটু। চলো নাস্তা করি।”
তারা ক্যাফেটেরিয়ার দিকে গেল। ভিড় কম। একটা টেবিলে বসল। আবিদ বুশরার জন্য স্যান্ডউইচ আর জুস নিল। নিজেও খেল। কথা হচ্ছিল আস্তে আস্তে।
আবিদ একটু চুপ করে থেকে বলল,


“আর এক সেমিস্টার বাকি। তারপর আমি বাসায় তোর কথা বলব।”
বুশরা চোখ তুলে তাকাল।


“তোর বাবা-মা কী বলবে?”
আবিদ হালকা হাসল।


“আমার বাবা-মা খুব একটা কড়া না। লিবারেল টাইপ। আমার বড় আপুও রিলেশন করেই বিয়ে করেছে। ওরা আপত্তি করবে না মনে হয়। বরং খুশিই হবে। আমার বাবা বলেছে, যতক্ষণ ভালো মেয়ে হয়, বাকিটা পরে দেখা যাবে।”
বুশরা একটু চুপ করে রইল। তারপর বলল,


“আমার বাবা একটু কড়া তবে মা অতটা না। তবে ওরা সবসময় আমার কথা শোনে। আমার দুই কাজিনও সম্প্রতি প্রেমের বিয়ে করেছে। বাবা কিছু বলেনি। তাই আশা করি সমস্যা হবে না। মা তো আগে থেকেই জানে আমাদের সম্পর্কের কথা। বাবাকে এখনো পুরোপুরি বলা হয়নি।”
আবিদ মাথা নাড়ল।


“ সমস্যা হবে না। আমি জানি। আমি নিজে গিয়ে কথা বলব।” আবিদ বলে। কিছুক্ষণ চুপচাপ। তারপর আবিদ বলল,


“গ্রাজুয়েশন শেষে আমি কোনো ভালো কর্পোরেটে জব করতে চাই। মার্কেটিং বা ফিন্যান্স সাইডে। বেতন ভালো হলে বাসা ভাড়া করে উঠব। তারপর একটু স্ট্যাবল হলে…”
বুশরা সম্পূর্ণ করে দিল,


“বিয়ে।”
দুজনেই হাসল।
আবিদ বলল,


“হ্যাঁ। তারপর একটা সুন্দর বাসায় থাকব। খুব বড় কিছু না, কিন্তু নিজেদের মতো করে সাজানো। বুকশেলফ থাকবে, ছোট একটা বারান্দা থাকবে। মাঝে মাঝে দেশের বাইরে ঘুরতে যাব। তোর কী ইচ্ছা?”
বুশরা একটু ভেবে বলল,


“আমি Teach for Bangladesh বা ব্র্যাকের মতো কোনো জায়গায় কাজ করতে চাই। সোশ্যাল সাইডে। টাকা কম হলেও কাজটা ভালো লাগবে। মানুষের জন্য কিছু করতে পারলে ভালো লাগে। হয়তো পরে মাস্টার্সও করব।”
আবিদ গম্ভীর হয়ে বলল,


“আমি সাপোর্ট করব। তুই যা করতে চাস। আমি চাই না তুই শুধু আমার জন্য কিছু ছাড়িস।” বুশরা তার দিকে তাকাল। বুশরার স্থির চোখে একটা শান্তি ছিল। সঠিক মানুষ কে খুজে পাবার নির্ভরতা ছিল। 


“তুই থাকলে সব সহজ মনে হয়।”
আবিদ শুধু হাসল। আর কিছু বলল না। দুজনে আবার আস্তে আস্তে খেতে লাগল। বাইরে রোদ একটু হেলে পড়ছে। ক্যাফেটেরিয়ার জানালা দিয়ে আলো ঢুকছে।
Reply
#3

আপডেট -০২
বিকেলে নোমান বাস্কেটবল খেলে এসেছে। ঘাম ঝরছে। শরীরটা ভালো লাগছে। ঝরনায় গোসল করে বেরিয়ে এল। চুল ভেজা। টি-শার্ট বদলেছে। রাফি আর তানভিরের সাথে প্লাজার একপাশে বেঞ্চিতে বসল। সামনে দিয়ে মেয়েরা যাচ্ছে আসছে। নানা রকম ড্রেসের বাহার। কেউ * পরে, কেউ টাইট জিন্স, কেউ সালোয়ার কামিজ, কেউ শাড়ি, কেউ স্কার্ট। ড্রেসের শেষ নেই। কপালের ঘাম মুছতে মুছতে চোখ বুলায় নোমান। পাশে রাফি পা তুলে দিয়ে বলল,


“দ্যাখ, ওই যে হলুদ টপওয়ালি মেয়েটা। বুবসগুলো কীভাবে ফুলে আছে দেখেছিস? একেবারে টানটান।”
তানভির হেসে বলল,


“দেখেছি ভাই। জিন্সের ভেতর থেকে পাছাটাও ফাটাফাটি দেখা যাচ্ছে। চলার স্টাইলটাই যেন বলছে—আমাকে দেখো। এমন পাছা পেলে রাতটা কাটানো যায়।”
নোমান চোখ না সরিয়ে বলল,


“মাল তো মালই। কিন্তু ওর মুখটা একটু নামিয়ে রাখে। হাঁটার সময় এত জোর করে পাছা দুলিয়ে কী লাভ? জানে যে তাকিয়ে আছি।”
রাফি বলল,


“লাভ আছে ভাই। আমাদের মতো লোকদের তাকিয়ে থাকার জন্যই তো এসব করে। দেখ, আবার পেছন ফিরে তাকাচ্ছে। হাসিও দিছে।”
একটা মেয়ে কালো লেগিংস পরে হেঁটে যাচ্ছিল। তানভির শিস দিয়ে বলল,


“উফফ… পাছাটা তো একেবারে গোল। দুই ভাগ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। এমন পাছা পেলে এক রাতও কম মনে হবে। ধরে রাখলে ছাড়তে ইচ্ছা করবে না।”
রাফি হাত দিয়ে বুকের সামনে গোল করে দেখিয়ে বলল,


“আর ওই যে নীল *ওয়ালিটা। আবায়ার নিচেও বুবসগুলো চাপা পড়ে না। কোমর সরু, তারপর নিচে একটু ভরা। এমন ফিগার লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করলেও লুকানো যায় না। চলার সময় একটু দুলছে দেখেছ?”
নোমান হাসল।


“তুই তো *ওয়ালিদেরও বাদ দিস না।”
রাফি বলল,


“বাদ দিই কেন? * পরলেই কি শরীর চলে যায়? অনেকেই আবায়ার নিচে সেক্সি জিনিস পরে আসে। তুই খেয়াল করিসনি? গত সপ্তাহে একটা মেয়ে দেখেছিলাম। আবায়া পরেও বুবস দুটো এতটাই ভারী যে হাঁটার সময় আলাদা করে দুলছিল।”
তানভির বলল,


“সত্যি কথা। গতকাল একটা মেয়ে দেখেছিলাম। আবায়া পরেও চলার সময় বুবস দুটো আলাদা করে দুলছিল। মনে হচ্ছিল ভেতরে ব্রা ঠিকমতো পরে নাই। কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে একটু ঢিলে পরেছে।”
রাফি জোরে হাসল।


“ভাই, তোর চোখ তো একেবারে এক্স-রে হয়ে গেছে। তুই তো আবায়ার ভেতরটাও দেখে ফেলছিস।”
নোমান পাশের একটা মেয়ের দিকে ইশারা করে বলল,


“ওই যে লম্বাটা। কালো জিন্স আর সাদা শার্ট। বুবস দুটো বেশ বড়। চলার সময় কাঁধ দুটো একটু পেছন দিকে রাখে যাতে আরও বেশি দেখা যায়। জানে যে দেখা যাচ্ছে।”
তানভির বলল,


“এসব মেয়েরা জানে ওরা কী করছে। আমরা তাকিয়ে আছি জেনেও তাকায়। তারপর মুখ ঘুরিয়ে নেয় যেন কিছু হয়নি। অথচ হাঁটার স্টাইলটাই বলে দিচ্ছে সব।”
রাফি একটা সিগারেট ধরাল। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল,


“গত পরশু একটা মেয়ের সাথে কথা হইছিল। ফিগারটা তো একেবারে পর্নস্টার লেভেল। বুবস, কোমর, পাছা—সবকিছু পারফেক্ট। কিন্তু কথা বলতে শুরু করলে মনে হয় একেবারে বোকা। শুধু শরীর নিয়েই ভালো। রাতেও শুধু শরীরের কথাই ভাবা যায়।”
নোমান বলল,


“শরীর ভালো থাকলেই হয়। কথাবার্তা পরে দেখা যাবে। প্রথমে চোখে পড়ে বুবস আর পাছা। তারপর বাকি সব।”
তানভির হেসে বলল,


“তুই তো সবসময় এই লজিক দিস। মেয়ে দেখলে আগে ফিগার, তারপর মুখ, তারপর কথা।”
রাফি বলল,


“এটাই তো ন্যাচারাল। কেউ কি আগে মেয়ের সিজিপিএ দেখে প্রেম করে? আগে চোখে পড়ে বুবস আর পাছা। তারপর বাকি সব। সিজিপিএ তো অফলাইন থাকে তখন।”
একটা মেয়ে খুব কাছ দিয়ে হেঁটে গেল। তিনজনেই চুপ করে তাকিয়ে রইল। মেয়েটার জিন্স খুব টাইট ছিল। পাছা দুটো হাঁটার সাথে সাথে আলাদা হয়ে যাচ্ছিল। মেয়েটা চলে যাওয়ার পর রাফি বলল,


“দ্যাখ, পাছাটা কীভাবে দুই ভাগ হয়ে হাঁটছিল। এমন পাছা পেলে রাতভর ধরে রাখা যায়। ছাড়তে ইচ্ছা করবে না।”
তানভির বলল,


“আর বুবস দুটোও কম না। একটু ভারী। এমন মেয়েকে যদি একবার পেয়ে যাই… সারা রাত নামব না।”
নোমান তার কথা কেটে বলল,


“পেয়ে গেলেও এক সপ্তাহের বেশি টিকবে না। তোর সবসময় নতুন নতুন লাগে। একটার সাথে ঘর করলে অন্যগুলোর কথা মনে পড়ে।”
রাফি হাসল।


“সত্যি কথা। একটার সাথে ঘর করলে অন্যগুলোকে কীভাবে মিস করব? এত সেক্সি মাল ক্যাম্পাসে, আর আমি একটার সাথে বসে থাকব?”
তিনজনেই হেসে উঠল। সামনে দিয়ে আবার কয়েকটা মেয়ে গেল। তারা আবার তাকাতে লাগল। কেউ কারো বুবসের সাইজ নিয়ে মন্তব্য করছে, কেউ পাছার আকৃতি নিয়ে, কেউ হাঁটার স্টাইল নিয়ে। রাফি মাঝে মাঝে হাত দিয়ে মাপ দেখাচ্ছে। তানভির শিস দিচ্ছে। নোমান চুপচাপ দেখছে, মাঝে মাঝে হাসছে।
রাফি শেষে বলল,


“ভাই, এই ক্যাম্পাসটাই আমাদের জন্য যথেষ্ট। এত সেক্সি মাল এক জায়গায় আর কোথায় পাবি? প্রতিদিন নতুন নতুন ফিগার। তবে ভাই তোর কথা আলাদা। আমরা অনেক চাই কিন্তু পাই না। তুই না চাইতেও কত পাস”
নোমান মাথা নাড়ল। কিছু বলল না। শুধু চোখ দিয়ে মেয়েদের ফিগার আগলে রাখল। তার মনে হচ্ছিল আজকের দিনটাও অন্য দিনগুলোর মতোই কেটে যাচ্ছে। শুধু একটা জিনিস আলাদা। দুপুরের সেই ছোটখাটো *ওয়ালি মেয়েটার কথা মাঝে মাঝে মনে পড়ছে।

পরের দিন বিকেলের দিকে ডিবেট ক্লাবের মিটিং ছিল। সিনডিকেট হলে। বুশরা সময়মতো পৌঁছাল। নোমানও এল। একটু দেরি করে। হাতে ফোন। হাসতে হাসতে বন্ধুদের সাথে ঢুকল।
মিটিং চলছিল। টপিক নিয়ে আলোচনা। বুশরা তার পয়েন্ট রাখল পরিষ্কার করে। নোমানও বলল। তার বক্তব্যে একটা হালকা ঠাট্টা ছিল। কয়েকজন হাসল। বুশরা চোখ তুলে তাকাল। নোমানের দিকে। নোমানও তাকাল। চোখ মিলল। নোমান হাসল। বুশরা হাসেনি। তার চোখে একটা কঠোরতা ছিল।
মিটিং শেষে সবাই বেরিয়ে আসছিল। নোমান করিডোরে দাঁড়িয়ে বন্ধুদের সাথে কথা বলছিল। জোরে। হাসছিল। বুশরা পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। শব্দটা তার কানে বাজছিল। তার মনে হচ্ছিল এরা ইচ্ছাকৃতভাবে জোরে কথা বলছে।
সে থেমে গেল। ঘুরে দাঁড়াল।
“এখানে এত জোরে কথা বলার দরকার নেই। অনেকে এখনো ভেতরে আছে।”
নোমান ঘুরে তাকাল। মেয়েটাকে চিনল। বুশরা। ডিবেট ক্লাবের। কয়েকটা ক্লাসে একসাথে পড়া। *, ছোটখাটো, চোখে কঠোরতা।
সে হাসল। “আমরা তো খুব জোরে বলছি না।”
বুশরা বলল, “বলছেন। আর আপনি ডিবেট ক্লাবে আছেন। নিয়মটা একটু মানলে ভালো হয়।”
নোমান একটু এগিয়ে এল। “আপনি তো সবসময় নিয়ম নিয়ে ব্যস্ত। ক্লাসেও, ডিবেটেও। রেজাল্ট ভালো, নিয়ম মেনে চলেন—এসব নিয়ে একটু অহংকার আছে মনে হয়।”
বুশরা চোখ তুলে তাকাল। “অহংকার না। সত্যি। যারা সময় নষ্ট করে না, তারা এগিয়ে থাকে। ফালতু কাজের সময় আমার নেই। আর লোক দেখানোর জন্য বা ফোন স্ক্রল করার জন্য আমি ডিবেটে আসি না। তারপরও ডিবেটে এসে কথা বলেন।”
নোমানের বন্ধুরা হাসল। নোমানও হাসল। “ফোন দেখা আর কী। জীবনটা শুধু পড়াশোনা আর নিয়ম নিয়ে নয়। এত কড়া হলে মজা থাকে না। আর ডিবেট তো কথার খেলা। এখানে এসে কথা না বললে কোথায় বলব?” নোমানের উত্তরে হেসে উঠে ওর বন্ধুরা।
বুশরা বলল, “মজা দরকার নেই সবার। কারো কারো দরকার নিয়ন্ত্রণ।”
নোমান কাঁধ ঝাঁকাল। “ঠিক আছে। আপনার নিয়ন্ত্রণ থাকুক। আমরা যাচ্ছি।”
সে ঘুরে দাঁড়াল। তারপর আবার পেছন ফিরে বলল, “তবে একটা কথা। ডিবেটে আপনি ভালো বলেন। সেটা মানতেই হয়।”
বুশরা কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল। নোমান হেসে চলে গেল বন্ধুদের সাথে। তার হাসিটা বুশরার কানে বাজতে থাকল।
সাদিয়া একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিল। বুশরার কাছে এসে বলল, “কে এটা? চিনলি?”
বুশরা বলল, “চিনি। কয়েকটা ক্লাসে একসাথে ছিল। ডিবেট ক্লাবেও আছে। পড়াশুনা করে না। মেয়েদের সাথে লাইন মারা, খেলাধূলা করা এইসব কাজ। তারপরে নিজেকে অনেক বড় কিছু ভাবে।”
সাদিয়া বলল, “চেহারা মন্দ না। লম্বা। আর তোর সাথে কথা বলার সময় হাসছিল। তোর দিকে তাকিয়েই হাসছিল।”
বুশরা বিরক্ত হয়ে বলল, “হাসুক। যে নিয়ম মানে না, পড়াশোনায় মন দেয় না আমার কাছে তার দাম নেই। রেজাল্ট দিয়ে প্রমাণ হয় কে কতটা সিরিয়াস।”
সাদিয়া হাসল। “তুই তো সবসময় এমনই। নিজের রেজাল্ট আর নিয়ম নিয়ে এত গর্ব। ওই ছেলেটা তোকে একটু খোঁচা দিল বলেই এত রাগ?”
বুশরা বলল, “রাগ না। বিরক্তি। এসব ছেলেরা মনে করে জীবন মানে শুধু মজা। পরে বুঝবে।”

সন্ধ্যায় বুশরা বাসায় ফিরল। সাদিয়া সাথে ছিল একটুক্ষণ। সাদিয়া আবার টিজ করতে শুরু করল।
“ঐ ছেলেটার দিকে তোর রাগ দেখে মনে হচ্ছিল তুই ওকে চিনিস ভালো করে।”
বুশরা বলল, “চিনি। কয়েকটা ক্লাসে একসাথে। ডিবেট ক্লাবেও। আর চিনতেও চাই না বেশি।”
সাদিয়া বলল, “তবুও তোর রাগটা একটু বেশি ছিল। তুই যখন রেগে যাস, তখন তোর চোখগুলো... অন্যরকম লাগে। আর আবায়াটা আজকেরটা একটু বেশি ফিট ছিল মনে হয়। ওই ছেলেটা যদি খেয়াল করত তোর কোমর আর...”
বুশরা থামিয়ে দিল। “সাদিয়া, যথেষ্ট। থাম”
সাদিয়া হেসে উঠল। “ঠিক আছে। আর বলব না। তুই তো কনজারভেটিভ। কেউ বুঝবেও না তোর শরীর কেমন। শুধু আমি জানি। কারণ আমি তোর ঘরে গিয়েছি। ছোটখাটো হলেও গড়ন আছে তোর। কোমর সরু, হিপস ভরা, বুকও খারাপ না।”
বুশরা চুপ করে রইল। ভেতরে একটা অস্বস্তি। সাদিয়ার কথাগুলো মনে আটকে থাকল।
আবিদ রাতে কল করল। আবিদের সাথে দিনের শেষে সব কথা শেয়ার করে বুশরা। ডিবেট ক্লাবের সামনের কথা কাটাকাটির ঘটনাটা বলল। কিভাবে নিয়ম না মেনে অসভ্যের মত জোরে জোরে চিতকার করে কথা বলছিল সব। আর থামতে বলতে কথার ফুলঝড়ি। এইসব বললেও সাদিয়ার খোচা গুলো বলল না বুশরা।
আবিদ বলল, “তুই ঠিক করেছিস। এমন লোকদের কিছু বলা উচিত।”
বুশরা মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ।”
কল শেষে সে বিছানায় শুয়ে রইল। ওই ছেলেটার হাসি মনে পড়ল। “এত কড়া হলে মজা থাকে না।” বুশরা চোখ বন্ধ করল। মজা দরকার নেই তার। দরকার শান্তি। দরকার নিয়ন্ত্রণ।
কিন্তু মনে একটা খচখচানি রয়ে গেল। প্রথমবারের মতো কেউ তার নিয়ম মেনে চলার অহংকারকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছে। হেসে। হালকাভাবে। যেন তার গর্বটাই একটা মজার ব্যাপার। এই জিনিসটা মেনে  নিতে পারছে না বুশরা। গলায় কাটা বিধে থাকার মত খচখচ করতে থাকতে মনটা।


নোমান সেদিন রাতে এক মেয়ের সাথে দেখা করতে গেল। গুলশানে। মেয়েটা হাসিখুশি। কথা বলে অনেক। ইস্ট ওয়েস্টে পড়ে। হিঞ্জে পরিচয় হয়েছে। নোমান তার সাথে সময় কাটাল। কিন্তু মাঝে মাঝে মনে পড়ল বিকেলের সেই ছোটখাটো মেয়েটার কথা। চোখে রাগ নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। নিয়ম শেখাচ্ছিল। মেয়েটার কথায় বিরক্ত হলেও তর্কে ভাল বলে সেটাও মানতে হয়েছিল। নোমান হাসল নিজে নিজে। এসব মেয়ে তার দুনিয়ার মানুষ না। তার দুনিয়ায় থাকে অন্য মেয়েরা। যারা হাসে, যারা সায় দেয়, যারা নিয়ম ভাঙে। তবুও সেই মেয়েটার কণ্ঠস্বর একবার মনে পড়ল। শান্ত। কিন্তু ভেতরে জোরালো। আর চোখের দৃষ্টি। যেন সে প্রমাণ করতে চাইছে সে ঠিক জায়গায় আছে।



দুইজন মানুষ। একই ক্যাম্পাস। একই শহর। দুজনেই ঢাকায় বড় হয়েছে। কয়েকটা ক্লাসে একসাথে পড়েছে। একই ডিবেট ক্লাবের মেম্বার। একজন নিয়ম আঁকড়ে ধরে আছে অহংকার নিয়ে। আরেকজন নিয়মকে হালকা করে দেখে হাসি দিয়ে। তাদের পথ আজ প্রথমবার সত্যিকার অর্থে ছেদ করেছে। এখনো কিছু হয়নি। শুধু একটা বিরক্তি। একটা অস্বস্তি। একটা মনে রাখার মতো মুহূর্ত।
Reply
#4

আপডেট ৩


(ক)
ক্লাস শুরুর আগে রুমটা প্রায় ফাঁকা। কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী এসেছে। কেউ ফোন দেখছে, কেউ হেডফোন গলায় দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছে। বুশরা সামনের সারির একদম মাঝখানের সিটে বসে। খাতা খুলে লেকচার নোট পড়ছে। চোখের নিচে হালকা কালি পড়েছে। গত কয়েকদিন বাসায় মেহমান ছিল। মামা-মামি আর তাদের দুই ছেলে। ঘরটা ভরে গিয়েছিল। রাতে দেরি করে ঘুমাতে হয়েছে, সকালেও উঠতে হয়েছে তাড়াতাড়ি। পড়াশোনা প্রায় হয়নি। সামনে মিডটার্ম। ইংরেজি সাহিত্যের একটা পেপার। নোটগুলো আবার নতুন করে পড়তে হচ্ছে। মনটা একদম সেট হচ্ছে না। মাথায় হালকা বেইজ রঙের স্কার্ফ। আজ সালোয়ার কামিজ পরেছে। কালো সালোয়ার, সাদা কামিজ। কামিজের হাতা কনুই পর্যন্ত। গলাটা একটু খোলা। স্কার্ফটা ঘাড়ের দুই পাশ দিয়ে ঝুলে আছে। মুখে কোনো মেকআপ নেই। শুধু চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ।
দরজার কাছে হঠাৎ জোরে কথা শোনা গেল। নোমান আর তার দুই বন্ধু। রাফি আর তানভির। তিনজনে হাসতে হাসতে দাঁড়িয়ে আছে। রাফি কিছু একটা বলছে, তানভির জোরে হাসছে। নোমানও হাসছে। শব্দটা পুরো রুমে ছড়িয়ে পড়ছে।
বুশরা মাথা তুলে তাকাল। বিরক্তি চোখে ফুটে উঠল। সে খাতার পাতায় আঙুল রেখে বলল,


“একটু চুপ করে থাকতে পারো? অনেকে পড়ছে।”
রাফি ঘুরে তাকাল। মুখটা কেমন যেন টান হয়ে গেল।


“কী মনে করে নিজেকে? ক্লাসের মালিক নাকি?”
তানভিরও বলল,


“এত রাগ কেন তোমার? আমরা তো গান গাইছি না। চিৎকার করছি না”
নোমান কিছু বলল না। শুধু রাফি আর তানভিরের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বলল,


“থাক। চুপ কর। কিছু মানুষ নিজেকে বেশি ইম্পোর্টেন্ট ভাবে”
তারপর সে বুশরার দিকে একবার তাকাল। খুব তাড়াতাড়ি না। একটু সময় নিয়ে। স্কার্ফ, সাদা কামিজ, কালো সালোয়ার। গলার কাছে হালকা ফাঁকা জায়গা। ক্লান্ত মুখ। তবুও চেহারাটা পরিষ্কার। নোমানের মনে হলো, মেয়েটা আজ একটু অন্যরকম লাগছে। স্কার্ফ শুধু। আগের মতো ঘন করে মাথা ঢাকা নেই। সে বন্ধুদের বলল,


“চল। করিডোরে গিয়ে দাঁড়াই। স্যার আসার আগে।”
তিনজনে বেরিয়ে গেল। করিডোরে দাঁড়িয়ে নোমান সিগারেট না ধরিয়েই বলল, “ঐ মেয়েটা কে রে? বুশরা না নাম? ডিবেট ক্লাবেও আছে।”
রাফি বলল, “জানি। ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের। খুব সিরিয়াস টাইপ।”
নোমান জিজ্ঞেস করল, “প্রেম করে নাকি কেউ?”
তানভির কাঁধ ঝাঁকাল।“মাঝে মাঝে একটা ছেলের সাথে ঘুরতে দেখি। সিএসসি ডিপার্টমেন্টের। আমাদের ব্যাচেরই। প্রেম করে কিনা ঠিক জানি না। তবে একসাথেই দেখা যায় প্রায়।”
নোমান মাথা নাড়ল। কথাটা মনে রাখল। আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।



(খ)

দুপুরের দিকে নর্থ বিল্ডিং আর সাউথ বিল্ডিংয়ের মাঝের ওপেন স্পেসটা ভরে গিয়েছিল। বাস্কেটবল ম্যাচ শেষ হয়েছে। নোমানের টিম জিতেছে। ছেলেরা চিৎকার করছে। কয়েকজন মেয়েও হাততালি দিচ্ছে। নোমান মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। বাস্কেটবল জার্সি গায়ে, কালো শর্টস। সারা গা ঘামে ভিজে আছে। চুল এলোমেলো। মাথায় কালো হেডব্যান্ড দিয়ে চুল আটকানো। ঘাম চুইয়ে পড়ছে গাল বেয়ে। কাঁধ আর হাতের মাসলগুলো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। জার্সিটা শরীরের সাথে লেগে আছে। পেটের দিকটা যখন একটু উঠে যাচ্ছে, তখন অ্যাবসগুলো টানটান দেখা যাচ্ছে।
দূরে, প্লাজার একপাশে তিনজন মেয়ে দাঁড়িয়েছিল। বুশরা, সাদিয়া আর কাশফিয়া।
বুশরা মুখটা কঠিন করে বলল,


“এত হৈচৈ কেন? যেন বিশ্বকাপ জিতেছে।”
সাদিয়া হাসল।


“বিরক্ত হবার কী আছে? খেলাধুলা তো ভার্সিটির এক্সট্রা কারিকুলারের পার্ট। নোমান সেখানে ভালো করছে। সবাইকে তো আর পড়াশোনায় ফার্স্ট হতে হবে না।”
কাশফিয়া চোখ না সরিয়ে বলল,


“ঘামে ভেজা অবস্থায় কিন্তু দারুণ লাগছে ওকে। মাসলগুলো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে পেটের দিকটা।”
সাদিয়া মুচকি হেসে কাশফিয়ার দিকে তাকাল।


“দেখেছিস? অ্যাবসগুলো কত শক্ত। এবস এত প্রমিনেন্ট হলে বুঝতে হয় কোমরে জোর আছে।”
কাশফিয়া মাথা নাড়ল।


“হ্যাঁ। ছেলেদের অ্যাবস যদি এভাবে শক্ত আর পরিষ্কার দেখা যায়, তার মানে ওদের কোমরে প্রচণ্ড শক্তি থাকে।”
বুশরা বলল “ হঠাত করে কোমড় নিয়ে এত আগ্রহ কেন তোদের?”
সাদিয়া আস্তে করে বলল, কিন্তু হাসি চাপতে না পেরে,


“কোমরে জোর থাকা মানে কিন্তু অন্য জায়গাতেও জোর থাকে জানো তো? সেক্সে ভালো হয় এদের।”
কাশফিয়া মুখ চাপা দিয়ে হেসে ফেলল।


“সাদিয়া! তুই একেবারে…”
সাদিয়া কাঁধ ঝাঁকাল।


“কী? সত্যি কথা। যারা রেগুলার খেলে, মাসল তৈরি করে, তাদের স্টামিনাও বেশি হয়। ঘাম দেখেই বোঝা যায় কতটা প্রেশার নিতে পারে।”
বুশরা বিরক্ত হয়ে বলল,


“একটা ছেলে ঘামে ভিজে আছে দেখে বিশ্রী লাগছে। এতে এত আনন্দ কেন তোদের? ঘাম মানে ঘাম। নোংরা।”
সাদিয়া এবার পুরোপুরি ঘুরে বুশরার দিকে তাকাল। চোখে দুষ্টুমি।


“বিশ্রী? তুই কিছু জানিস না। ঘাম হচ্ছে ফেরোমোন। ছেলেদের ঘামে এমন কিছু থাকে যা মেয়েদের শরীরে কাজ করে। যৌন ঔষধের মতো। বিজ্ঞানের কথা। ঘামে ভেজা ছেলে দেখলে অনেকেরই ভেতরে একটা রেসপন্স হয়। তুই শুধু স্বীকার করিস না।”
কাশফিয়া হাসতে হাসতে বলল,


“সত্যি কথা। আমি তো স্বীকার করি। ওর ঘামে ভেজা গলা আর কাঁধের দিকটা দেখেই ভালো লাগছে।”
সাদিয়া আবার বলল,


“আর হেডব্যান্ডটা দেখেছিস? চুল এলোমেলো করে আরও বেশি লাগছে। মাসল, ঘাম, হেডব্যান্ড—সব মিলিয়ে একদম…”
বুশরা আর উত্তর দিল না। কান দুটো লাল হয়ে গিয়েছিল। সে স্কার্ফটা একটু টেনে গলা বন্ধ করার চেষ্টা করল। চোখ অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিল। মনে মনে বলল, এসব কথা শোনার দরকার নেই। অশ্লীল। অপ্রয়োজনীয়। তবুও সাদিয়া আর কাশফিয়ার হাসি তার কানে বাজতে থাকল।




(গ)

বিকেলের দিকে ক্যাফেটেরিয়ার বাইরে একটা বেঞ্চিতে তিনজন বসেছিল। আবিদ, তার বন্ধু সাজিদ, আর নোমান। সাজিদ দুজনেরই কমন ফ্রেন্ড।  আগে কোনো গল্পে আসেনি।
সাজিদ নোমানকে দেখিয়ে বলল,


“এই যে আবিদ, নোমান। নোমান, আবিদ। দুজনকেই চিনতাম, কিন্তু একসাথে পরিচয় করাইনি।”
নোমান উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দিল। হাসিমুখে।


“কেমন আছো ভাই?”
আবিদ একটু দ্বিধা করে হাত মিলিয়ে বলল,


“ভালো। তুমি?”
নোমান বসল। পা তুলে বেঞ্চির ওপর রাখল।


“আমি তো সবসময় ভালো। আজকে আরও ভালো। সকালে এক প্রফেসরকে বললাম, স্যার আপনার লেকচার এত নীরস কেন? উনি বললেন, কারণ তোমরা এত নির্বোধ। আমি বললাম, স্যার তাহলে আপনি তো আমাদের সাথে ম্যাচিং করছেন।”
সাজিদ হেসে উঠল। আবিদও হালকা হাসল। আবিদ জিজ্ঞেস করলো “ তুমি স্যত্যি স্যার কে এটা বলেছ?”
সাজিদ বললো “ উফ আবিদ! নোমানের সাথে কিছুদিন কথা বললে বুঝবি ও কেমন দুষ্ট।”
নোমান আবার বলল, “আর গতকাল এক মেয়ে আমাকে বলল, তুমি কি সবসময় এত কনফিডেন্ট থাকো? আমি বললাম, না। শুধু যখন আয়নায় নিজেকে দেখি।”
এবার সাজিদ জোরে হাসল। আবিদও মুচকি হেসে মাথা নাড়ল। নোমানের কথাবার্তায় কোনো ভারীপনা নেই। হালকা। সহজ।
এদিকে কথা ঘুরতে ঘুরতে রাজনীতিতে গেল। সাজিদ আবিদকে বলল,


“ইরান-ইসরায়েল টেনশনটা আবার বাড়ছে। তুই কী মনে করিস?”
আবিদ একটু গম্ভীর হয়ে বলল,


“জটিল ব্যাপার। ইরানের নিউক্লিয়ার প্রোগ্রাম আর ইসরায়েলের সিকিউরিটি কনসার্ন দুটোই আছে। আমেরিকা যদি সরাসরি না নামে, তাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।”
নোমান হঠাৎ কথায় ঢুকল।


“আসলে মূল সমস্যা হলো ডিটারেন্স। ইরান চায় নিউক্লিয়ার ক্যাপাবিলিটি অর্জন করে রিজিওনাল পাওয়ার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে। ইসরায়েল সেটা হতে দিতে চায় না, কারণ একবার ইরানের হাতে নিউক্লিয়ার এলে পুরো মিডল ইস্টের ব্যালেন্স চেঞ্জ হয়ে যাবে। আর আমেরিকার পজিশন হলো ইরানকে আটকে রাখো, কিন্তু ফুল স্কেল ওয়ারে যেয়ো না। কারণ ওয়ার শুরু হলে তেলের দাম আকাশছোঁয়া হবে, গ্লোবাল ইকোনমি কাঁপবে। তাই সবাই প্রক্সি ওয়ার আর সাইবার অ্যাটাক দিয়ে খেলছে। ডিরেক্ট কনফ্রন্টেশন কেউ চায় না।” আবিদ নোমানের দিকে তাকাল। একটু অবাক হয়ে। নোমানের বিশ্লেষণটা পরিষ্কার এবং যথেষ্ট একুরেট ছিল। হালকা কথাবার্তার ছেলেটা হঠাৎ গম্ভীর বিষয়ে এতটা ধারালো মন্তব্য করবে ভাবেনি।


সাজিদ বলল,


“দেখ, নোমান শুধু বাস্কেটবল আর ডিবেটই পারে না। পলিটিক্সও পারে।”
নোমান হাসল।


“পারি না। শুধু খবর দেখি আর একটু আবোল তাবোল ভাবি। তোমরা সিরিয়াস লোক। আমি তো হালকা।”
আবিদ মাথা নাড়ল। ভেতরে একটু ইম্প্রেসড হয়েছিল। ছেলেটা হাসিখুশি, রসিক, অথচ বিষয় বুঝে কথা বলে। তার ভালো লাগল।
কথাগুলো আরও কিছুক্ষণ চলল। কেউ কারো ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কিছু জানল না। আবিদ জানল না যে কয়েকদিন আগে বুশরা যে ছেলেটার কথা বলেছিল, সে এই নোমান। নোমানও জানল না যে আবিদ বুশরার বয়ফ্রেন্ড। শুধু একটা সাধারণ পরিচয় হলো। হাসির সাথে। সহজে। আর একটু সম্মানের সাথে।



(ঘ)

রাত প্রায় সাড়ে দশটা। বুশরা বিছানায় শুয়ে ফোন কানে দিয়েছে। আবিদ লাইনে। সাধারণত সারাদিন শেষে রাতে ঘুমানোর আগে দুইজন একবার কথা বলে। সারাদিনের হাইলাইটস দেয় দুইজন দুইজন কে। কথা শেয়ার করার যে আনন্দটা এটার জন্য অপেক্ষা করে থাকে দুইজন। জানে আর কেউ না শুনতে চাইলেও সারাদিনের বোরিং কাজের গল্প গুলো খালি ওরা নিজেদের মাঝেই শেয়ার করতে পারে।
“আজকের দিন কেমন কাটল?” আবিদ জিজ্ঞেস করল। সারাদিন এমনিতে খারাপ যায় নি, তবে সকালে ক্লাসে ঐ ছেলে গুলোর সাথে কথা কাটাকাটি মনে একটা কাটা হয়ে আছে। বুশরা বলল,


“পড়াশোনা নিয়ে একটু টেনশনে আছি। মেহমানদের জন্য গত কয়েকদিন পড়া হয়নি। মিডটার্ম আসছে। সকালে ক্লাসে বসে নোট পড়ছিলাম, কিছু ছেলে এসে জোরে কথা বলছিল। বিরক্ত লাগছিল।”
আবিদ বলল,


“তুই চুপ করতে বলিস নি ওদের?”
“হ্যাঁ। একটু বলেছি। তারপর আর কিছু হয়নি।”
আবিদ একটু চুপ থেকে বলল,


“আমার আজ একটা নতুন পরিচয় হলো। সাজিদের সাথে একটা ছেলে ছিল। নোমান। খুব হাসিখুশি। কথা বলে ভালো। সহজে মিশে যায়। একটা জোকস বলল, হাসলাম। তারপর ইরান ওয়ার নিয়ে কথা হচ্ছিল, ও খুব পরিষ্কার করে বিশ্লেষণ করল। প্রথম কথা বলার সময় ওর জোক্স শুনে ভাল লাগলেও মনে হয়েছিল একটু শ্যালো ছেলে তবে পরে দেখি ইরান ওয়ার নিয়ে খুব ভাল এনালাইসিস দিল। ভাল সারপ্রাইজড হয়েছি তখন। ভালো লাগল ওকে। সাজিদও ওর প্রসংগে অনেক ভাল কথা বলল”
বুশরা কানে ফোন চেপে টেবিলে বই গোছাচ্ছিল। নোমান, নামটা শুনে একটু থতমত খেল। কিন্তু আবিদের কণ্ঠস্বর থেকে বোঝা গেল সে কোনো বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে না। শুধু একটা সাধারণ পরিচয়ের কথা বলছে। বুশরা আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। মনে মনে বলল, নাম মিলে গেলেও হয়তো অন্য কেউ। ক্যাম্পাসে নোমান নামে একজনের বেশি থাকতে পারে।
আবিদ বলল,


“তুই পড়াশোনায় মন দিস। টেনশন করিস না। পারবি তুই।”
বুশরা আস্তে বলল,


“চেষ্টা করছি।”
কল শেষ হলো। বুশরা ফোনটা বালিশের পাশে রাখল। চোখ বন্ধ করল। মনে মনে আজকের তিনটা ছবি ভেসে উঠল। ক্লাসের দরজার কাছে জোরে কথা বলা ছেলেটা। ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে মাঠে দাঁড়ানো ছেলেটা। আর আবিদের মুখে নতুন পরিচয়ের নামটা।
তিনজন মানুষ। নিজেদের অজান্তেই একে অপরের বৃত্তে ঢুকে পড়ছে। ধীরে ধীরে। কোনো আভাস ছাড়াই।
Reply
#5

(ঙ)

আবিদ প্রথমবার বুশরাকে দেখেছিল লাইব্রেরির তৃতীয় তলায়। সেদিন বিকেলের রোদ জানালা দিয়ে এসে পড়েছিল টেবিলের ওপর। ধুলোর কণাগুলো আলোর মধ্যে ভেসে বেড়াচ্ছিল। আবিদ একটা রেফারেন্স বই খুঁজছিল। ব্যবসায় প্রশাসনের একটা কেস স্টাডির জন্য। তাকের সামনে দাঁড়িয়ে বইয়ের নামগুলো দেখছিল। হঠাৎ পাশের টেবিল থেকে একটা পাতা ওল্টানোর শব্দ শুনতে পেল।


মেয়েটা বসেছিল জানালার পাশে। মাথায় হালকা স্কার্ফ। সাদা রঙের। চুলগুলো স্কার্ফের নিচে ঢাকা, কিন্তু কয়েকটা পাতলা চুল বেরিয়ে এসে গালের ওপর পড়েছিল। মুখখানা ফর্সা। চোখ কালো, বড়। নাক ছোট, সোজা। ঠোঁট পাতলা। কোনো মেকআপ নেই। শুধু একটা হালকা গোলাপি ভাব ঠোঁটে। সে খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ছিল। খাতায় মাঝে মাঝে কিছু লিখছিল। হাতের আঙুলগুলো লম্বা, পরিষ্কার। কলমটা ধরার ভঙ্গিটাও সাজানো। আবিদের মনে হয়েছিল, মেয়েটা যেন আলোর ভেতর থেকেই তৈরি। কোনো উচ্চস্বরে হাসি নেই, কোনো অস্থিরতা নেই। শুধু একটা শান্ত উপস্থিতি। যেন পুরো লাইব্রেরির শব্দহীনতা তার চারপাশে জড়ো হয়েছে।


সে দিন আবিদ কিছু বলেনি। শুধু একবার চোখ পড়েছিল। তারপর নিজের কাজ করে চলে গিয়েছিল। দ্বিতীয়বার দেখা হয়েছিল জেনারেল এডুকেশনের একটা ক্লাসে। বুশরা সামনের সারিতে বসত। আবিদ মাঝখানে। প্রফেসর যখন প্রশ্ন করতেন, বুশরা উত্তর দিত পরিষ্কার গলায়। কোনো দ্বিধা নেই। কোনো অতিরিক্ত কথা নেই। ঠিক যতটুকু দরকার, ততটুকু। আবিদের ভালো লেগেছিল। মেয়েটার মধ্যে একটা শৃঙ্খলা আছে। যে শৃঙ্খলা আবিদ নিজেও পছন্দ করত। একদিন ক্লাসের পর করিডোরে দেখা হয়ে গেল। আবিদ বই নিয়ে যাচ্ছিল। বুশরাও একই দিকে। আবিদ একটু থেমে বলল, “আপনি গতকালের প্রশ্নের উত্তরটা খুব ভালো দিয়েছিলেন।” বুশরা ঘুরে তাকাল। চোখে কোনো অতিরিক্ত কৌতূহল নেই। শুধু একটা শান্ত দৃষ্টি।


“ধন্যবাদ।”
আবিদ একটু দ্বিধা করে বলল,


“আমি আবিদ। বিবিএ।”
বুশরা মাথা নাড়ল।


“বুশরা। ইংলিশ।”


সেই পরিচয়। খুব সাধারণ। কোনো নাটকীয়তা নেই। কিন্তু আবিদের মনে হয়েছিল, মেয়েটার নামটাও তার মতোই পরিষ্কার। বুশরা।
তারপর আরও কয়েকবার দেখা হয়েছিল। লাইব্রেরিতে, ক্যাফেটেরিয়ায়, কখনো কখনো ক্যাম্পাসের প্লাজায়। আবিদ কখনোই জোর করে কথা বাড়াত না। শুধু যখন সুযোগ হত, তখন একটা-দুটো কথা বলত। বুশরাও জবাব দিত। সংক্ষেপে। কিন্তু অসভ্য না।
একদিন বৃষ্টি হচ্ছিল। ক্যাম্পাসের ওপেন স্পেস দিয়ে যাওয়ার সময় দুজনেই ভিজে গিয়েছিল। আবিদের কাছে একটা ছাতা ছিল। সে বুশরার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,


“নিয়ে নিন। আমার বাসা কাছে।”
বুশরা একটু দ্বিধা করেছিল। তারপর ছাতাটা নিয়েছিল।


“ধন্যবাদ। আমি পরে ফেরত দিয়ে দেব।”
আবিদ হাসল।


“কোনো তাড়া নেই।”
সেই ছাতা ফেরত দিতে গিয়ে তাদের মধ্যে প্রথমবার লম্বা কথা হয়েছিল। ক্যাফেটেরিয়ার এক কোণায় বসে। আবিদ জিজ্ঞেস করেছিল তার পড়াশোনা নিয়ে। বুশরা বলেছিল ইংরেজি সাহিত্য কেন পছন্দ। আবিদ বলেছিল সে কর্পোরেট জগতে যেতে চায়। স্থির। পরিকল্পনা করে। বুশরা বলেছিল সে সামাজিক কাজে আগ্রহী। Teach for Bangladesh বা এমন কিছু। আবিদ মাথা নেড়েছিল। কোনো বিদ্রূপ নেই। কোনো হালকা মন্তব্য নেই। শুধু শুনেছিল।



বুশরার চোখে আবিদ প্রথম থেকেই আলাদা লেগেছিল। অন্য ছেলেরা কথা বলার সময় চোখ ঘোরায়। হাসে অতিরিক্ত। কখনো কখনো কথায় একটা চাপ থাকে। আবিদের তা নেই। সে কথা বলে কম। কিন্তু যা বলে, তা মাপজোখ করে। মেয়েদের দিকে তাকানোর সময় তার চোখে কোনো অশালীনতা থাকে না। সম্মান থাকে। বুশরা সেটা লক্ষ করেছিল। আবিদ যখন কথা বলত, পুরোপুরি মনোযোগ দিত। ফোন দেখত না। অন্যদিকে তাকাত না। যেন সামনের মানুষটাই সেই মুহূর্তের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।


আবিদের চেহারা নাটকীয়ভাবে সুন্দর নয়। কিন্তু পরিষ্কার। চোখ শান্ত। কথা বলার ভঙ্গিটা দায়িত্বশীল। বুশরার মনে হয়েছিল, এই ছেলেটা জীবনকে সিরিয়াসলি নেয়। ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবে। পরিবারের কথা বলে সম্মানের সাথে। কোনো অতিরিক্ত আবেগ দেখায় না। কোনো নাটক করে না। একদিন ক্লাসে গ্রুপ প্রেজেন্টেশন ছিল। বুশরা তার অংশটা বলেছিল খুব পরিষ্কারভাবে। কোনো হকচকানি নেই। আবিদ পরে করিডোরে বলেছিল,


“তোমার কথা বলার ধরনটা খুব লজিক্যাল। শুনতে ভালো লাগে। এতটা গুছিয়ে কথা বলতে পারা সহজ নয়।”
বুশরা সেদিন একটু হেসেছিল।


“আপনিও খুব মনোযোগ দিয়ে শোনেন।”
আবিদ বলেছিল,


“মনোযোগ দেওয়া উচিত। কেউ যখন কষ্ট করে কিছু বলে, তখন শোনাটাই সম্মান দেখানো।”
বুশরার মনে সেই কথাটা থেকে গিয়েছিল। সম্মান। আবিদ সেই শব্দটা বুঝত।
তাদের মধ্যে কথা বাড়তে শুরু করল ধীরে ধীরে। সাপ্তাহে দুবার-তিনবার। কখনো লাইব্রেরিতে, কখনো ক্যাফেটেরিয়ায়। আবিদ কখনোই প্রথম উদ্যোগ নিত না কোনো অতিরিক্ত কিছুর জন্য। বুশরা যখন কথা বাড়াত, তখন সে সাড়া দিত। বুশরা যখন চুপ থাকত, তখন সেও চুপ থাকত।
একদিন বুশরা অসুস্থ ছিল। ক্লাসে আসেনি। আবিদ খবর পেয়ে সাদিয়ার মাধ্যমে জানতে পেরেছিল। সন্ধ্যায় একটা মেসেজ করেছিল।


“শুনলাম অসুস্থ। তাড়াতাড়ি সুস্থ হোন। কোন দরকার লাগলে বলবেন।”
বুশরা উত্তর দিয়েছিল,


“ধন্যবাদ। অসুবিধা নেই।”
কিন্তু সেই মেসেজটা তার ভালো লেগেছিল। কোনো অতিরিক্ত আবেগ নেই। কোনো নাটক নেই। শুধু খোঁজ।
আবিদের চোখে বুশরার প্রতি আবেগ দিনে দিনে আরও পরিষ্কার হয়ে উঠছিল।
মেয়েটার হাঁটার ধরনটা শান্ত। কোনো অতিরিক্ত ভাঁজ নেই। স্কার্ফ পরেও তার মুখখানা আলোর মতো ফুটে থাকে। যখন সে পড়াশোনার কথা বলে, চোখে একটা জ্বলজ্বলে ভাব আসে। যখন কেউ নিয়ম ভাঙে, তার কপালে হালকা ভাঁজ পড়ে। আবিদের মনে হত, বুশরা যেন নিজের জীবনকে একটা পরিষ্কার কাঠামোর মধ্যে রেখে চলে। সেই কাঠামোটাই তার সৌন্দর্য। শরীরের রেখাগুলো কোমল। কাঁধ ছোট, সরু। হাঁটার সময় স্কার্ফের দুই প্রান্ত হালকা দোলে। গলার রেখাটা পরিষ্কার। আবিদ কখনোই সেই সৌন্দর্যকে নোংরা চোখে দেখেনি। দেখেছে একটা শান্ত ছবির মতো। যেন কেউ খুব যত্ন করে আঁকা একটি প্রতিকৃতি।



বুশরাও আবিদকে দেখতে শুরু করেছিল অন্যভাবে। ছেলেটা দায়িত্বশীল। কথা দিলে রাখে। সময়ের প্রতি খেয়াল রাখে। মেয়েদের সাথে কথা বলার সময় কোনো হালকা মন্তব্য করে না। ক্যারিয়ার নিয়ে পরিষ্কার পরিকল্পনা আছে। পরিবারের প্রতি সম্মান আছে। বুশরার মনে হয়েছিল, এই ছেলেটার সাথে কথা বললে মনটা অস্থির হয় না। বরং শান্ত হয়। যেন কেউ পাশে থেকে বলছে, সবকিছু ঠিকঠাক চলবে।
তাদের মধ্যে প্রথমবার হাত ধরাধরি হয়েছিল অনেক পরে। একদিন ক্যাম্পাসের বাইরে একটা বইমেলায়। ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ মানুষজন ধাক্কা দিয়েছিল। আবিদ বুশরার হাতটা ধরে নিয়েছিল। শক্ত করে না। শুধু যাতে সে হারিয়ে না যায়। বুশরা হাত ছাড়ায়নি। আবিদের হাতটা উষ্ণ ছিল। নিরাপদ।
সেই রাতে বুশরা নিজে থেকে মেসেজ করেছিল।


“আজকের জন্য ধন্যবাদ।”
আবিদ উত্তর দিয়েছিল,


“আমি ছিলাম বলেই ধন্যবাদ দিতে হবে এমন কোনো কথা নেই।”
বুশরা সেই মেসেজটা বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখেছিল।
তাদের সম্পর্কটা ঘোষণা করে হয়নি। একদিন আবিদ বলেছিল,


“আমি তোমার সাথে সময় কাটাতে ভালোবাসি। যদি তোমারও তাই লাগে, তাহলে আমরা এটাকে একটা নাম দিতে পারি।”
বুশরা চুপ করে ছিল কিছুক্ষণ। তারপর বলেছিল,


“আমারও ভালো লাগে।”



সেই ভালোলাগাটাই তাদের সম্পর্ক। কোনো ঝড়ো রাত নয়। কোনো অশ্রু নয়। শুধু দুজন মানুষের শান্ত সম্মতি। আবিদ বুশরাকে কখনো জোর করেনি। কোনো সীমা অতিক্রম করেনি। চুমু খেয়েছিল অনেক পরে। দুইবার। খুব সংক্ষেপে। কপালে। বুশরা সেই মুহূর্তগুলোতে চোখ বন্ধ করেছিল। ভয় পায়নি। কারণ আবিদের স্পর্শে কোনো লোভ ছিল না। শুধু একটা নরম অনুভূতি। বুশরার চোখে আবিদ হয়ে উঠেছিল সেই মানুষ, যার পাশে দাঁড়ালে নিজেকে নিরাপদ মনে হয়। যে মেয়েদের সম্মান করতে জানে। যে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবে। যে কথা দিলে রাখে।


আবিদের চোখে বুশরা হয়ে উঠেছিল সেই মেয়ে, যার উপস্থিতি শান্ত। যার চোখে লক্ষ্য আছে। যার সৌন্দর্য চিৎকার করে না, কিন্তু থেকে যায়। স্কার্ফের নিচে লুকানো চুলগুলো, ফর্সা মুখ, শান্ত হাঁটা সবকিছু মিলে একটা পরিচ্ছন্ন ছবি। তারা দুজনই জানত, তাদের সম্পর্কটা দ্রুতগতির নয়। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা। যেন কেউ ইটের পর ইট সাজিয়ে একটা বাড়ি তৈরি করছে। তাড়াহুড়ো নেই। শুধু নিশ্চিত পদক্ষেপ। আজ যখন আবিদ বুশরার সাথে কথা বলে, তখনও সেই একই শান্তি থাকে। আর বুশরা যখন আবিদের কথা শোনে, তখনও মনে হয়, এই ছেলেটা তাকে সম্মান করে। তাকে বোঝে। তাকে তাড়া করে না। তাদের ভালোবাসাটা এমনই। জোরালো শব্দে না বরং নিঃশব্দে নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ দেয় নিজেদের ভিতরে।
Reply
#6

(চ)

নোমানের কাছে সেক্স মানে মুক্তি। বাঁধন নয়। দায়িত্ব নয়। ভবিষ্যৎ নয়। শুধু সেই মুহূর্তের কাঁচা ক্ষুধা। যে ক্ষুধা মেটাতে গেলে শরীরটাকে পুরোপুরি খুলে দিতে হয়। কোনো লজ্জা নেই, কোনো হিসাব নেই। শুধু চামড়ায় চামড়া, ঘামে ঘাম, আর সেই গভীর, ভারী আনন্দ যেটা শরীরের ভেতর থেকে উথলে ওঠে। সে বিয়ের কথা ভাবে না। অন্তত আগামী পাঁচ-ছয় বছর নয়। চাকরি, ফ্ল্যাট, সংসার এসব পরে। এখন শুধু নতুন নতুন শরীর, নতুন নতুন গন্ধ, নতুন নতুন আর্তনাদ। যে মেয়ে একবার তার বিছানায় আসে, সে জানে নোমান তাকে ভালোবাসবে না। শুধু নেবে। ভালোভাবে নেবে। আর যখন নেওয়া শেষ, তখন হাসিমুখে বিদায় দেবে। তার ফ্রেন্ডস উইথ বেনিফিটদের মধ্যে একজন হলো রিমা।



রিমা পশ। গুলশানের মেয়ে। বাবা বড় ব্যবসায়ী। নিজে ফ্যাশন ডিজাইন পড়ে। উচ্চতা পাঁচ ফুট ছয়। শরীরটা যেন ভাস্কর্য। লম্বা পা, সরু কোমর, আর হিপস এতটাই গোল ও ভরা যে জিন্স পরলেও পাছার দুই ভাগ আলাদা করে দুলতে থাকে। বুক দুটো ভারী। থ্রি-ফোরথ ব্রায়ের ওপর দিয়েও চাপ ছাড়ে। গলা লম্বা, ক্লিভেজ গভীর। চুল কালো, ঢেউ খেলানো, প্রায় কোমর পর্যন্ত। মুখখানা তীক্ষ্ণ সুন্দর বড় চোখ, উঁচু গাল, পুরু ঠোঁট। সে জানে নিজের শরীরের দাম। আর সেই শরীর দিয়েই নোমানকে আটকে রাখতে চায়। কিন্তু নোমান আটকায় না।


রিমার ফ্ল্যাটে ঢুকেই নোমান দরজা বন্ধ করল। রিমার বাবা মা দেশের বাইরে। রিমা একা এই ফ্লাটে। শাওয়ার সেরে বেরিয়েছে। গায়ে শুধু একটা ছোট সিল্কের রোব। ভেতরে কিছু নেই। রোবটা খোলাই ছিল প্রায়। বুকের ফাঁক দিয়ে সাদা ত্বক চকচক করছে। রিমা এগিয়ে এসে নোমানের গলায় হাত জড়িয়ে বলল,


“তুই আজ অনেক দেরি করলি। আমি অপেক্ষা করছিলাম।”
নোমান তার ঠোঁটে একটা হালকা চুমু দিয়ে বলল,


“ট্রাফিক। তোর শরীর গরম আছে নাকি?”
রিমা হাসল।


“তোর জন্যই গরম। তুই জানিস তো আমি তোর ওপর কতটা দুর্বল। তবুও তুই আমাকে শুধু... এইটুকুনি দেস।”
নোমান তার চিবুক ছুঁয়ে মুখটা তুলে ধরল।


“রিমা, আমরা কথা বলেছি। আমি বাঁধনে বিশ্বাস করি না। তুই চাইলে থামতে পারিস। আমি জোর করব না।”
রিমার চোখে একটা ছায়া নামল। তারপর সে মাথা নাড়ল।


“না। থামতে চাই না। তোর শরীর ছাড়া থাকতে পারি না। তুই যতই দূরে থাক, আমি তোর কাছেই ফিরে আসি।”


নোমান আর কথা বাড়াল না। সে রিমার রোবের ফিতা খুলে দিল। রোবটা মেঝেতে পড়ল। রিমা সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।নোমানের চোখ ধীরে ধীরে নামল। বুক দুটো ভারী, গোল, বড়। বোঁটা দুটো ইতিমধ্যে শক্ত হয়ে উঁচু। গোলাপি রঙ। কোমর সরু। তার নিচে পেট সমান। আর তারও নিচে পুসিটা পরিষ্কার কামানো। ফোলা, গোলাপি, একটু ভিজে। দুই পায়ের মাঝে সেই নরম ফাঁকটা যেন ডাকছে। পাছা দুটো গোল, শক্ত, চাপলে আঙুল ডুবে যাবে এমন।
নোমান বলল, গলা একটু ভারী হয়ে,


“তোর পুসি আজ অনেক সুন্দর লাগছে। ফোলা ফোলা। আর পাছা... উফ, এত গোল পাছা আমি কম দেখেছি।”
রিমা লজ্জায় নয়, উত্তেজনায় একটু কেঁপে উঠল।


“তুই শুধু দেখবি নাকি? ছুঁয়ে দে।”
নোমান তার কাছে গেল। দুই হাত দিয়ে বুক দুটো মুঠোয় নিল। ভারী। নরম। আঙুল দিয়ে বোঁটা দুটো চেপে ধরল। রিমা “আহহ...” করে উঠল। নোমান এক বোঁটা মুখে নিয়ে চুষতে শুরু করল। জিভ দিয়ে ঘষল, দাঁত দিয়ে হালকা কামড় দিল। রিমার হাত তার চুলে গিয়ে আটকে গেল।
“উম্মম্ম... নোমান... আরও জোরে...”
নোমান অন্য বুকটাও একইভাবে নিল। দুই হাত দিয়ে পাছা দুটো চেপে ধরে উপরে তুলল। রিমার পা দুটো তার কোমরে জড়িয়ে গেল। নোমান তাকে নিয়ে বিছানার দিকে এগোল। শুইয়ে দিল।
রিমার পা দুটো খুলে দিল। পুসিটা এখন পুরোপুরি খোলা। গোলাপি মাংস ফোলা, একটু চকচকে। নোমান হাঁটু গেড়ে বসল। মুখটা নামিয়ে প্রথমে জিভ দিয়ে হালকা স্পর্শ করল। রিমা কেঁপে উঠল।
“আহহহ... নোমান...”
নোমান জিভ বের করে পুরোপুরি পুসিটা চাটতে শুরু করল। উপর থেকে নিচ পর্যন্ত। ক্লিটোরিক্সটা খুঁজে পেয়ে চুষতে লাগল। জোরে। ছন্দে। মাঝে মাঝে দাঁত দিয়ে হালকা কামড়। রিমার কোমর উঠে আসছিল। দুই হাত দিয়ে নোমানের মাথা চেপে ধরেছিল।
“উফফফ... চুষে খা... আরও... আহহহ... নোমান আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি...”
নোমান দুই আঙুল ঢুকিয়ে দিল। ভেতরটা গরম, ভিজে, টানটান। আঙুল দিয়ে দ্রুত নাড়তে লাগল আর মুখ দিয়ে ক্লিট চুষতে লাগল। রিমা এখন চিৎকার করে উঠছে।
“ফাক... উম্মম্ম... আমি আসতে যাচ্ছি... থামিস না... চুষে খা আমাকে...”
নোমান থামল না। আরও জোরে চুষল। রিমার শরীরটা তখন কেঁপে উঠল। পা দুটো তেড়ে গেল। একটা লম্বা, ভাঙা আওয়াজ বেরিয়ে এল গলা থেকে। “আহহহহহহ... নোমান...” স্কোয়ার্ট হয়ে নোমানের মুখে লেগে গেল। নোমান সেটাও চেটে খেল।
রিমা হাঁপাচ্ছে। নোমান উঠে দাঁড়াল। প্যান্ট খুলে ফেলল। আন্ডারওয়্যারও। তার পেনিস বেরিয়ে এল।
রিমার চোখ বড় হয়ে গেল। যতবার দেখে, ততবার একই প্রতিক্রিয়া।


লম্বা। প্রায় সাত ইঞ্চির ওপর। মোটা। ফুলে ফুলে টানটান। গাঢ় গোলাপি আগাটা মিসাইলের মতো চোখা। শিরাগুলো স্পষ্ট, ফুলে আছে, গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত জালের মতো ছড়ানো। বল দুটো ভারী, ঝুলে আছে। পুরো পেনিসটা তাজা, রক্তে ভরা, একটু উপরে উঠে আছে।
রিমা হাঁটু গেড়ে বসল। দুই হাত দিয়ে ধরল।


“এত বড়... এত মোটা... প্রতিবারই মনে হয় আমাকে ফাটিয়ে দেবে।”
সে জিভ দিয়ে আগাটা চাটল। তারপর মুখের ভেতর ঢুকিয়ে নিল। নোমানের হাত তার মাথায় গিয়ে পড়ল। রিমা চোষা শুরু করল। গভীর করে। গলা পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে আটকে রাখল। নোমানের কোমর সামনে সামনে করছিল।
“এভাবেই চুস... ভালো করে... উফফ...”
রিমা দুই হাত দিয়ে বল দুটো চেপে ধরে মুখ দিয়ে দ্রুত চোষাচ্ছিলেন। লালা গড়িয়ে পাছায় পড়ছিল। নোমান হঠাৎ তার চুল ধরে মুখ থেকে বের করে আনল।
“যথেষ্ট। এখন আমি নেব।”
রিমাকে উল্টে হাঁটু-কনুইয়ের ওপর তুলে দিল। পাছা উঁচু। পুসিটা পেছন থেকে পুরোপুরি খোলা, ভিজে, ফোলা। নোমান এক হাত দিয়ে পাছা দুটো আলাদা করে ধরল। অন্য হাত দিয়ে পেনিসের আগাটা পুসির ফাঁকে লাগাল। এক ঠেলায় ভেতর পর্যন্ত ঢুকিয়ে দিল।
রিমা চিৎকার করে উঠল।


“আহহহহ... ফাক... এত বড়... আস্তে...”
নোমান আস্তে করল না। দুই হাত দিয়ে কোমর চেপে ধরে জোরে ধাক্কা দিতে শুরু করল। পাছায় থাপ্পড় লাগাল। একবার। দুবার। লাল হয়ে গেল চামড়া।
“টেক ইট, বিচ। আমার মাগী। নে চোদা খা।”
রিমা মুখ বালিশে গুঁজে চিৎকার করছিল।


“ফাক মি নোমান... আমাকে মেরে ফেল... চোদ আমাকে... মেইক মি ইউর হোর... উফফফ... আহহহ... জোরে... আরও জোরে...”
নোমান তার চুল ধরে মাথা পেছনে টানল। কানে কানে গরম নিঃশ্বাস ফেলে বলল,


“টেল মি হু ইজ ইউর ড্যাডি।”
রিমা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,


“তুই... তুই আমার ড্যাডি...”
নোমান পাছায় আরেকটা শক্ত থাপ্পড় দিল।


“আরও জোরে বল। টেল মি হু ওন ইউ।”
রিমা কাতরাতে কাতরাতে চিৎকার করে উঠল,


“তুই... ইউ ওন মি নোমান... আমি তোর... শুধু তোর... আহহহহ...”
নোমান তার কোমর আরও শক্ত করে ধরল। পেনিস পুরো বের করে আবার শক্ত করে ঢোকাল। প্রতিবারই গোড়া পর্যন্ত।


“আবার বল। হু ইজ ইউর ড্যাডি?”
রিমা এখন প্রায় কেঁদে ফেলছে উত্তেজনায়।


“তুই আমার ড্যাডি... তুই আমার মালিক... আমাকে চোদ... আমাকে তোর বানিয়ে ফেল... উফফফ...”
নোমান এক হাত এগিয়ে দিয়ে গুদের চামড়া ঘষতে লাগল। অন্য হাত দিয়ে পাছায় থাপ্পড় দিতে থাকল।


“গুড গার্ল। আমার ভালো মাগী। নে, আরও খেয়ে নে।”
রিমা একেবারে পাগল হয়ে গেল। শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠছে।


“ফাক মি নোমান... আমাকে মেরে ফেল... চোদ আমাকে... মেইক মি ইউর হোর... আমি তোর হোর... শুধু তোর... আহহহহ... উম্মম্ম...”
নোমান রিমাকে উল্টে শুইয়ে দিল। পা দুটো কাঁধে তুলে আবার ঢুকিয়ে দিল। এবার আরও গভীর। রিমার চোখ উপরে উল্টে যাচ্ছিল। মুখ খোলা। লালা গড়াচ্ছে। নোমান তার বুক দুটো চেপে ধরে জোরে ধাক্কা দিচ্ছিল। বিছানা কেঁপে যাচ্ছে।
“টেল মি অ্যাগেইন। হু ওন দিস পুসি?”
রিমা কাতরাতে কাতরাতে বলল,


“তুই... তুই ওন করিস... আমার পুসি তোর... আমার শরীর তোর... আমি তোর... সম্পূর্ণ তোর... ফাক... আহহহ...”
নোমান তার গলা হালকা চেপে ধরল। চোখে চোখ রেখে বলল,


“তুই আমার মাগী। আমার হোর। বল।”
রিমা চোখ বুজে চিৎকার করে উঠল,


“আমি তোর মাগী... তোর হোর... তুই আমার ড্যাডি... আমাকে চোদ... আমাকে ভেঙে দে... উফফফফ...”
নোমানের গতি বাড়ল। শরীরের ঘাম রিমার শরীরে পড়ছে। পেনিসটা এখন আরও মোটা মনে হচ্ছে। শিরাগুলো ফুলে ফুলে টানটান। রিমা দুই হাত দিয়ে নোমানের পিঠ চেঁচে ধরল। নখ বসিয়ে দিল।
নোমান হঠাৎ থামল। পেনিস বের করে রিমার মুখের সামনে ধরল।


“মুখে নে। শেষটা মুখে খেয়ে নে। আর বল, হু ইজ ইউর ড্যাডি?”
রিমা মুখ খুলে নিল। নোমান কয়েকটা শক্ত ধাক্কা দিল গলায়। রিমা গলায় পেনিস নিয়েই বলার চেষ্টা করল,


“তুই... তুই আমার ড্যাডি...”
নোমানের শরীর তখন শক্ত হয়ে গেল। গনগনে তরল পেনিস থেকে বেরিয়ে রিমার জিভে, গলায়, ঠোঁটে ছড়িয়ে পড়ল। রিমা গিলে খেল। কিছুটা ঠোঁটের কোণ দিয়ে গড়িয়ে বুকে পড়ল। নোমান তার চুলে হাত বুলিয়ে বলল,


“গুড গার্ল। তুই ভালো চুষেছিস।”
দুজনে হাঁপাতে হাঁপাতে পাশাপাশি শুয়ে রইল। ঘামে ভিজে বিছানা। বাতাসে শুধু যৌনতার গন্ধ।
রিমা একটু পরে নোমানের বুকে হাত রেখে বলল, খুব আস্তে, “আমি জানি তুই আমাকে ভালোবাসিস না। তবুও আমি তোর শরীর দিয়ে দিই। প্রতিবার আশা করি হয়তো কোনোদিন তুই বলবি, থাক আমার সাথে। কিন্তু তুই বলিস না। আর আমিও যেতে পারি না।”
নোমান চুপ করে ছিল। তার মনের ভেতর পরিষ্কার কথাগুলো ঘুরছিল সে কোনো বাঁধনে জড়াতে চায় না। এমন উদ্যাম যৌনতা, নতুন নতুন শরীর, নতুন নতুন আর্তনাদ এটাই তার চাই। অন্তত আর পাঁচ-ছয় বছর। বিয়ে, সংসার, দায়িত্ব সব পরে। এখন শুধু এই কাঁচা, বুনো ক্ষুধা। যে ক্ষুধা মেটাতে গেলে কাউকে ভালোবাসতে হয় না। শুধু নিতে হয়। আর রিমা দিয়ে যায়। বারবার।




নোমান তার কপালে একটা চুমু দিয়ে বলল, “তুই ভালো মেয়ে, রিমা। কিন্তু আমি ভালো মানুষ নই। তুই জানিস।” রিমা চোখ বন্ধ করে নোমানের বুকে মুখ লুকোল। বাইরে রাত গভীর হয়ে এসেছে। আর ভেতরে দুজন মানুষ। একজন দিচ্ছে সব, আরেকজন নিচ্ছে শুধু শরীর। কোনো প্রতিশ্রুতি ছাড়াই।
Reply
#7

আপডেট ৪

(ক)

বুশরার সকাল শুরু হয় অনেক আগে। আজানের আওয়াজ শুনে চোখ খোলে। বিছানা থেকে উঠে ওজু করে নামাজ পড়ে। তারপর একটু সময় নিয়ে বসে থাকে। জানালা দিয়ে বাইরের আলো ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকতে থাকে। উত্তরার এই ফ্ল্যাটটা ছোট। দুই রুমের। বাবা-মা অন্য রুমে। বুশরা নিজের রুমেই সব করে। পড়ার টেবিলটা জানালার পাশে। বইগুলো গুছানো। খাতাগুলো সাজানো। কোনো জিনিস এলোমেলো থাকে না। নাশতা করে ক্যাম্পাসের দিকে বেরোয়। রাস্তায় গাড়ির ভিড়। রিকশাওয়ালারা চিৎকার করে। বুশরা হেডফোন লাগায় না। বাইরের শব্দ শুনতে শুনতে যায়। মনে মনে আজকের কাজগুলো সাজায়। কোন ক্লাসে কোন টপিক, কোন অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে হবে, লাইব্রেরিতে কতক্ষণ বসবে। সবকিছু মাথায় গুছানো থাকে।

ক্যাম্পাসে ঢুকলেই তার হাঁটার গতি একটু বদলে যায়। আরও পরিপাটি। স্কার্ফ ঠিক করে নেয়। ব্যাগ কাঁধে নিয়ে সোজা ক্লাসের দিকে যায়। সামনের সারিতে বসে। নোট নেয়। প্রফেসরের চোখের দিকে তাকায়। কেউ পাশে কথা বললে বিরক্ত হয়। মনে হয় সময় নষ্ট হচ্ছে। পড়াশোনা তার কাছে শুধু নম্বরের ব্যাপার না। এটা তার নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণের প্রমাণ। যে নিয়ম মানে, সে এগিয়ে থাকে। যে মানে না, সে পিছিয়ে পড়ে। এই বিশ্বাসটা তার ভেতর গভীরভাবে গেঁথে আছে।


লাইব্রেরিতে বসলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়। চারপাশের মানুষগুলো তার কাছে অস্পষ্ট হয়ে যায়। শুধু বইয়ের পাতা আর নিজের খাতা। মাঝে মাঝে চোখ তুলে দেখে কেউ চেনা মুখ আছে কিনা। সাদিয়া এলে একটু কথা হয়। কিন্তু বেশি নয়। পড়া শেষ না হলে উঠতে চায় না।


বাসায় ফিরে আবার পড়া। রাতের নামাজ। তারপর আবিদের ফোন। প্রতিদিন প্রায় একই সময়। কথাগুলো শান্ত। কোনো অতিরিক্ত আবেগ নেই। কোনো জোরে হাসি নেই। শুধু দিনের কাজকর্ম শেয়ার। আবিদ তার কথাগুলো মন দিয়ে শোনে। বুশরাও শোনে। এই নিয়মিত কথাটা তার দিনের শেষের একটা স্থির বিন্দু। যেন সবকিছু ঠিকঠাক জায়গায় আছে। বুশরার জীবনটা এমনই। পরিষ্কার রেখায় আঁকা। কোনো বাঁক নেই। কোনো হঠাৎ করে বদলে যাওয়ার জায়গা নেই। সে নিজেও চায় না। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ তার কাছে স্বাধীনতার চেয়ে বড়।

নোমানের সকাল অন্যরকম। ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়। ক্লাস না থাকলে অনেক সময় দুপুর পর্যন্ত ঘুমায়। ফোনের ভাইব্রেশন বা বন্ধুদের কল তাকে তোলে। চোখ খুলেই প্রথমে মেসেজ চেক করে। কেউ রাতের কথা মনে করাচ্ছে, কেউ আজকের প্ল্যান জিজ্ঞেস করছে। উঠে গিয়ে গোসল করে। আয়নার সামনে দাঁড়ায়। চুল ঠিক করে। শার্ট বেছে নেয়। সে জানে কোন পোশাকে কেমন দেখায়। ফ্যাশন তার কাছে শখের ব্যাপার না। এটা তার পরিচয়ের একটা অংশ।


ক্যাম্পাসে এসে সোজা কোনো এক জায়গায় বসে যায়। কখনো বয়েজ লাউঞ্জ, কখনো প্লাজার বেঞ্চি। ক্লাসে যায় মাঝে মাঝে। যে ক্লাসগুলোতে অ্যাটেনডেন্স বাধ্যতামূলক, সেগুলোতে যায়। বাকিগুলোতে যায় না। পড়াশোনা তার কাছে বাধ্যবাধকতা। ভালো রেজাল্টের কোনো তাগিদ নেই। সিজিপিএ তিনের কাছাকাছি থাকলেই চলে। বাবা-মা রাগ করে। সে শোনে, মাথা নাড়ে, তারপর নিজের মতো করে চলে।


বিকেল হলে খেলার মাঠে যায়। বাস্কেটবল। শরীর যখন ঘামে ভিজে যায়, তখন মনে হয় জীবনটা হালকা। মাঠে কেউ তাকে প্রশ্ন করে না পড়াশোনা নিয়ে। কেউ বলে না তুমি আরও ভালো করতে পারো। শুধু খেলা। জেতা বা হারা। তারপর গোসল। বন্ধুদের সাথে গল্প। মেয়েদের দিকে তাকানো। কেউ তাকালে হাসি। কেউ এগিয়ে এলে কথা।
রাতের বেলা তার সময় অন্যরকম কাটে। কখনো বন্ধুদের সাথে ঘোরা। কখনো কারো ফ্ল্যাটে। কখনো একা। রিমার সাথে দেখা হলে রাত দীর্ঘ হয়। শরীরের ক্ষুধা মেটানো। কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। কোনো আগামীকালের কথা নেই। শুধু সেই মুহূর্ত। যখন শরীরগুলো একে অপরের কাছাকাছি আসে, তখন আর কিছু ভাবতে হয় না। পরে ঘুমিয়ে পড়ে। সকালে উঠে আবার একই চক্র।


নোমানের জীবনে কোনো কঠিন রেখা নেই। সবকিছুই একটু এদিক ওদিক। নিয়ম ভাঙা তার কাছে দোষের কিছু না। বরং নিয়ম মানলে মনে হয় বন্দি হয়ে যাচ্ছে। সে চায় প্রতিদিন একটু অন্যরকম কাটুক। নতুন মুখ, নতুন গল্প, নতুন স্পর্শ। ভালোবাসা তাকে ভয় দেখায়। কারণ ভালোবাসা মানে দায়িত্ব। দায়িত্ব মানে বাঁধন। আর বাঁধন সে এখনো চায় না।

দুজন মানুষ। একই ক্যাম্পাস। একই শহর। একজন নিয়মের মাঝে জীবন কে সাজাতে ভালোবাসে। অন্যজন মুক্তির মাঝে জীবনের আনন্দ খুজে। একজন ভবিষ্যৎকে পরিষ্কার দেখতে চায়। অন্যজন বর্তমানকেই যথেষ্ট মনে করে। বুশরা যখন রাতে আবিদের সাথে কথা বলে, তখন তার মনে হয় সবকিছু জায়গামতো আছে। তার জীবনের গতিপথ সঠিক রাস্তায় আছে। নোমান যখন রাতে কারো সাথে শুয়ে থাকে, তখন তার মনে হয় তার জীবটা সঠিক পথে আছে। তার এমন জীবন চাই। যেখানে আনন্দ আছে, উপভোগ আছে কিন্তু দ্বায়িত্ব নেই।  দুজনেরই নিজস্ব বলয় আছে। নিজস্ব বলয়ে তারা সুখী। কিন্তু আসলে কি তাদের জীবনে কিছুর অভাব নেই? এই দুই বৃত্ত কি কখনো পরষ্পর কে স্পর্শ করবে? হয়তো নিজেদের অজান্তে বুশরা নোমানের বৃত্ত ক্যাম্পাসের সংকীর্ণ গন্ডিতে কাছে চলে আসছে।
Reply
#8

(খ)

সন্ধ্যা নেমে এসেছে। আকাশটা ধূসর। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাইরে, ক্যাম্পাস থেকে একটু দূরে একটা সড়কের মোড়ে আলো কম। গাড়ি কম চলছে। আবিদ একা হাঁটছিল। হাতে ফোন। বাসায় যাওয়ার কথা। মাথায় পড়াশোনার চিন্তা। আজকের ক্লাসগুলো মনে মনে গুছিয়ে নিচ্ছিল।


হঠাৎ সামনে থেকে কয়েকজন এসে দাঁড়াল। চারজন। ছিনতাইকারী? নাহ। হিজড়া। ছিনতাইকারী হলে যেন আর বেশি খুশি হত আবিদ। রাস্তায় হিজড়াদের নিয়ে ওর এক ধরনের ভীতি আছে। একবার ওর এক বন্ধু কে নাকি অন্ডকোষ ধরে চাপ দিয়েছিল সবার সামনে। এরপর সেই বন্ধুর নাম হয়ে গিয়েছিল হিজড়া। সেই পুরাতন শোনা কাহিনী মনে পড়ে শীতল একটা স্রোত বয়ে গেল এর মেরুদন্ড দিয়ে। হিজড়াদের একজন লম্বা, চিকন গলার স্বর। চিকন গলার স্বরে জিজ্ঞেস করলো, কিরে ভয় পেলি নাকি বাপের ব্যাটা। অন্যরা হেসে উঠল।  আরেকজন ছোটখাটো, মুখে ভাঙা হাসি। সে হাত তালি দিয়ে বলল ছেলেটা সুন্দর আছে। বাকি দুজন পাশে দাঁড়িয়ে, তারা হাসল। আবিদকে ঘিরে দাড়িয়েছে সবাই। ভড়কে গেছে আবিদ। চারজনের দুইজন শাড়ি পড়া আর দুইজন শার্ট প্যান্ট পড়া। তবে সবার মাথায় লম্বা বেণি করা। আবিদ নির্বিবাদি ভদ্রলোক। সহজে মানুষের সাথে কথা কাটাকাটি হবে এমন ঘটনায় জড়ায় না। আজকে হঠাত করে রাস্তার মাঝে হিজড়াদের সামনে পড়ে যাবায় একদম হকচকিয়ে গেছে। কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। আর আবিদের নিরুত্তর ভাব ভংগি চারজন কে রাগিয়ে দিল। হিজড়ারা সমাজের মানুষের অবহেলা পেয়ে পেয়ে বড় হয়ে উঠেছে। তাই মানুষের অবহেলা তাদের সবচেয়ে বেশি রাগিয়ে দেয়।


লম্বা জন এগিয়ে এসে বলল,

“কী রে সোনা? একা একা যাচ্ছিস? আমাদের একটু দে কিছু। পয়সা দে।”

আবিদ থেমে গেল। চোখ তুলে তাকাল। অস্বস্তি হলো। সে একটু সরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল।

“আমার কাছে এখন তেমন কিছু নেই।” একটু তোতলাচ্ছে আবিদ।

ছোটখাটজন হেসে উঠল। হাত বাড়িয়ে আবিদের হাত ধরল।

“নেই মানে? পকেটে তো ফোন আছে। আর তোর মুখ দেখেই মনে হয় টাকা আছে। দে না একটু। আমরা গরিব মানুষ। কি নরম হাত রে তোর। ধরলে আর ছাড়তে ইচ্ছা করে না। পয়সা না দিলে কি প্রেম দিবি?” হাসির রোল উঠল গ্রুপে।


আরেকজন পেছন থেকে এসে কাঁধে হাত রেখে প্রায় জড়িয়ে ধরল আবিদ কে। আবিদের শরীর শক্ত হয়ে গেল। সরে যাবার চেষ্টা করল। তবে টের পেলে ওর থেকে শক্তি অনেক বেশি যে জড়িয়ে ধরেছে তার।


“আমাকে ছেড়ে দাও। আমার কাছে কিছু নেই।” একটু গলা চড়িয়ে নিজের কথায় জোর প্রকাশের চেষ্টা করে আবিদ। তবে গলা কাপছে। কাপা কাপা গলায় বলা জোরে কথা ঠিক কতৃত্ব প্রকাশ করে না বরং ভিতরের ভয়টা প্রকাশ করে।

লম্বাটা আরও কাছে এসে গলায় সুর চাড়িয়ে বলল,

“রেগে গেলি নাকি রে ব্যাটা? এত রাগ কেন সোনা? তোর মতো সুন্দর ছেলেদের তো আমরা ভালোবাসি। একটু হাস না। হাস। পয়সা দিলে আমরা আশীর্বাদ করব। সুন্দর বউ হবে তোর”
জড়িয়ে যে ছিল সে আরও কাছে ঘেঁষে এল। একজন আবিদের বুকের দিকে হাত বাড়াল। আরেকজন তার হাত ধরে টানল। আবিদের মুখ লাল হয়ে গেল। একসাথে ভয় আর রাগ হবার অনুভূতি এই প্রথম ওর।


“আমাকে টাচ করো না! সরে যাও!”
হিজড়াগুলো হেসে উঠল। জোরে।


“ও মাইরি! রেগে গেছে দেখ। পুরুষমানুষ সেজেছো কিন্তু গলা কাঁপছে। এত কিপটে কেন? দুইশো টাকা দিলেই তো হয়। না দিলে আমরা তোর সাথেই যাব। আজকে তোর বাসায় থাকাব আর ফূর্তি করব”
একজন আবার তার হাত ধরল। কাঁধে হাত রেখেছে যে সে বলল,


“এত ছটফট করছিস কেন রে ছেলে? একটু নরম হ না। তোর মতো ছেলেদের আমরা চিনি। ভেতরে অন্যরকম হয়।”
আবিদের কান পর্যন্ত লাল হয়ে গেল। সে জোরে হাত ছাড়িয়ে নিল। কথা বলতে গিয়ে গলা বসে গেল।


“আমি পুলিশ ডাকব।”
হিজড়াগুলো আরও হাসল।


“ডাক না। আমরা তো কিছু করিনি। শুধু পয়সা চেয়েছি। তুই এত রাগ করছো কেন? লজ্জা পাচ্ছিস নাকি?” পুলিশ ডাকার কথায় আর আবিদের কাজকর্মে মজা পেয়ে গেছে চারজন। রাস্তায় যে এক দুইজন পথচারী যাচ্ছে তারা আবিদ আর চারজন কে এড়িয়ে চলে যাচ্ছে। কেউ ঝামেলায় পড়তে চায় না।

রাস্তার উলটো দিকে একটা চায়ের দোকানের সামনে বসে ছিল নোমান। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলো। রাফি, তানভীর ওর সাথে গল্প করছিল। কাজ আছে বলে ওরা উঠে গেল। নোমান উঠে যেত তবে কি মনে করে একটা সিগারেট ধরালো। খুব বেশি সিগারেট খায় নোমান এমন না। তবে বিকাল বাস্কেটবল শেষে আড্ডা দিয়ে একটা সিগারেট ধরালে একটা শান্তি লাগে। এটা না খেলে বুঝানো যাবে না। সামনেই ওর রায়াল এনফিল্ড বাইকটা পার্ক করা। পরিবারের ছোট সন্তান বলে যা চায় তাই পাবার অভ্যাস নোমানের। তাই মা একটু গাই গুই করলেও বাবা আর বাসার বাকিদের কারণে মায়ের কথা টিকল না। নোমানের বাবার কথা হচ্ছে ছেলেরা একটু ড্যাশিং না হলে কিভাবে হবে। সিগারেট খেতে খেতে রাস্তার উলটা দিকে চোখ পড়ে। একটা  ছেলে কে চারজন হিজড়া ঘিরে দাড়িয়েছে। হাসল নোমান। বেচারা। টাকা খসবে তার উপর একটু টিজ খাবে। সিগারেটে টান দিতে দিতে ঘটনা দেখছিল দূর থেকে। ছেলেটার গায়ে হিজড়ারা হাত দিতে একদম সিউড়ে যাচ্ছে ছেলেটা। মাথা নাড়ল নোমান। এইসব দেখলে হিজড়ারা ক্ষেপে যায় জানে নোমান। খুব স্বাভাবিক হয়ে কথা চালাতে হয়। দরকার হলে কিছু টাকা দিতে হয়। কথার মাঝে ছেলেটার মুখ একবার তার দিকে হলো। আরে এটা আবিদ না? ঐদিন আড্ডা দিয়ে ভাল লেগেছিল ছেলেটাকে। যদিও তার পুরো বিপরীত তবে ভাল ছেলে। নোমান সব সময় সব ধরনের মানুষের সাথে পরিচয় রাখতে পছন্দ করে। তার উপর কথায় কথায় বুঝা গিয়েছিল ভাল ছাত্র আবিদ কিন্তু সেটা নিয়ে কথায় কোন রকম অহংকার ছিল না। তাই ছেলেটাকে ভাল নজরে দেখেছে নোমান। সিগারেটটা ফেলে দেয় রাস্তায় নোমান। চায়ের দোকানের দিকে তাকিয়ে বলে, মামা বাইকটার দিকে একটু নজর রাইখো। আমি আসতেছি পাচ মিনিট। এই বলে ব্যস্ত রাস্তা পের হয়।
আবিদ রাস্তার মাঝে হিজড়াদের আচরণে একদম হতচকিত হয়ে গেছে। কি বলবে বুঝতে পারছে না। যে দুই একটা কথা বলছে সেগুলো নিয়ে এমন ভাবে হাসি ঠাট্টা করছে যাতে আর বিব্রত হয়ে যাচ্ছে আবিদ। এমন সময় রাস্তার অন্য দিক থেকে কেউ এসে দাঁড়াল। নোমান। হাতে ফোন। চোখে একটা শান্ত ভাব। যত অল্প পরিচিত হোক না কেন এই সময় একটা পরিচিত মুখ সামনে দেখে যেন জীবন ফিরে পেল আবিদ। নোমান পরিস্থিতিটা এক নজরে দেখে নিল। তারপর হাসিমুখে এগিয়ে এল।
“কী হয়েছে এখানে?”
হিজড়াগুলো ঘুরে তাকাল। নোমানকে দেখে একটু থতমত খেল। লম্বাটা বলল,


“কিছু না ভাই। এই ছেলেটার কাছে একটু পয়সা চাইছিলাম। এতে রাগ করছে।”
নোমান আবিদের দিকে একবার তাকাল। আবিদের মুখ লজ্জায় ও রাগে লাল। তারপর হিজড়াদের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল,


“আচ্ছা। কত লাগবে?”
লম্বাটা একটু অবাক হয়ে বলল,


“দুইশো টাকা দিলেই হয় ভাই।”
নোমান পকেট থেকে একশো টাকার একটা নোট বের করে দিল।


“নাও। এখন যাও। আর কাউকে জ্বালাতন কোরো না।”
হিজড়াগুলো একশ টাকার নোট দেখে খুশি হল। তবে লম্বাটা নোমানের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আমরা তো ২০০ টাকা চাইছিলাম”
নোমান বলে,
“আমরা ছাত্র মানুষ ভাই। ২০০ টাকা অনেক টাকা। আজকে ১০০ টাকা নাও, পরে চাকরি পাইলে বেশি টাকা নিয়ে নিও রাস্তায় ধইরা।” এই বলে হাসি দেয় নোমান।

নোমানের হাসিতে তাল মিলায় হিজড়া চারজন। ছোট জন আবিদ কে বলে,


“দেখ সোনা, এই ছেলেটা কত ভালো। সুন্দরও। তোর মতো কিপটে না। তুই শিখ। এমন ছেলে হও। আর ব্যবহার কত ভাল”
লম্বাজন বলল,


“সত্যি। এই ভাইয়ের মতো হলে কেউ রাগ করত না।”
তারা হাসতে হাসতে সরে গেল। একজন পেছন ফিরে আবার বলল,


“ভাই তুমি ভালো থেকো। আশীর্বাদ রইল। তুই ভাল মেয়ে পাবি।” আর আবিদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“এইভাবে কিপটামি করলে আর খারাপ ব্যবহার করলে তুই মেয়ে পাবি না। হিজড়ার অভিশাপ কিন্তু বড় অভিশাপ।”
নোমান কিছু বলল না। শুধু মাথা নাড়ল। তারপর আবিদের দিকে তাকাল।
আবিদ দাঁড়িয়েছিল। মাথা নিচু করে। কান দুটো এখনো লাল। সে মুখ তুলে নোমানের দিকে তাকাল। গলায় স্বর কম।


“ধন্যবাদ। তুমি না আসলে... জানি না কী হতো ভাই।”
নোমান কাঁধ ঝাঁকাল। আবিদের কাধে হাত দিয়ে আশ্বাস দিল,


“কিছু না। এসব হয়। চল, একটু সামনে যাই।”
তারা পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল। আবিদ কথা বলছিল না। মনে মনে সেই কথাগুলো ঘুরছিল। “কিপটে”, “পুরুষমানুষ সেজেছো”, “ভেতরে অন্যরকম”। হিজড়াগুলোর হাসি তার কানে বাজছিল। লজ্জায় বুকটা কেমন করে উঠছিল। নোমান তার পাশে হাঁটছে। শান্ত। কোনো প্রশ্ন করছে না। কোনো মজাও করছে না। এটাই আবিদের আরও লজ্জা বাড়াচ্ছিল।
একটু পর নোমান বলল,


“তুমি বাসায় যাচ্ছ?”
আবিদ মাথা নাড়ল।


“হ্যাঁ।”
“তাহলে ঠিক আছে। আমি অন্য দিকে যাব।”
আবিদ থেমে দাঁড়াল।


“আবারও ধন্যবাদ। সত্যিই। আজকে তুমি না থাকলে বিপদে পড়তাম।”
নোমান হাসল। হালকা।


“থাক। কোনো ব্যাপার না। আমরা বন্ধু মানুষ। আর বন্ধু কে বন্ধু হেল্প না করলে কে করবে বল।” এত সহজে বন্ধু বলায় আবিদ অবাক হলো তবে খুশি হলো। ছোট বেলা থেকে আবিদ সহজে বন্ধু বানাতে পারে না। তাই এত সহজে কেউ তাকে বন্ধু বলছে এতে খুশি হল। আবিদের ইতস্তত দেখে নোমান বলল,

“চিন্তা করো না। রাস্তায় এমন দুই একবার হিজড়াদের পাল্লায় পরে নি খুব কম মানুষ আছে। ভেবো না।”

আবিদ বলল,
“ আমি ভড়কে গিয়েছিলাম। তুমি কেমন শান্ত ভাবে সব হ্যান্ডেল করলে।”

নোমান একটু হেসে বলল,

“ আরে ওদের ভয় পাবার কিছু নেই। ওরাও মানুষ। সহজে কোথায় কাজ পায় না। তাই এইসব করে খেতে হয়।”

আবিদ  নোমানের হিজড়াদের প্রতি সহানুভূতি দেখে অবাক হয়। নোমান কে যতটা শ্যালো ভেবেছিল তার থেকে অন্যরকম নোমান। সেদিনের ইরান যুদ্ধের আলোচনা আজকের হিজড়াদের হ্যান্ডল করা আবার ঠিক তার পরে তাদের প্রতি সহানূভূতি। মনে মনে ভাবে ডোন্ট জাজ এ বুক বাই ইটস কভার।

আবিদ এইবার পকেট থেকে একশ টাকা বের করে নোমান কে দিতে যায়। নোমান না না করে। বলে এরপর আরেকদিন ক্যাম্পাসে ওকে লাঞ্চ খাবাতে হবে। আর সেদিন আরেক দফা আড্ডা হবে। আবিদ জোর করে তবু টাকা নিতে নারাজ নোমান। আবিদের অসস্তি দেখে নোমান বলে ধরে নাও এইটা আমাদের বন্ধুত্বের প্রথম বিনিয়োগ। পরে তুমি খাওয়াবা আমাকে। শোধ হয়ে যাবে। হেসে উঠে দুইজন। নোমান বলে ওকে যেত হবে। আবিদ বলে আজকের ঘটনাটা কাউকে বলো না। আবিদের ইতস্তত বোধ দেখে নোমান বুঝে আবিদ এখনো লজ্জা কাটাতে পারে নি। নোমান বলে চিন্তা করো না। ইউর সিক্রেট ইজ সেফ উইথ মি।
তারপর সে অন্য দিকে ঘুরে হাঁটতে শুরু করল। আবিদ তাকে যেতে দেখল। মনে মনে একটা কৃতজ্ঞতা জমা হয়ে রইল। কিন্তু তার সাথে মিশে ছিল লজ্জা। তীব্র লজ্জা। হিজড়াগুলো তাকে টিজ করেছে। তার পুরুষত্ব নিয়ে কথা বলেছে। আর নোমান সেটা দেখেছে। এটা সে কাউকে বলতে পারবে না।

রাত সাড়ে দশটা। বুশরার ফোন এল। আবিদ বিছানায় শুয়ে ফোন ধরল।
“আজকের দিন কেমন কাটল?” বুশরা জিজ্ঞেস করল।
আবিদ একটু চুপ থেকে বলল,


“স্বাভাবিক। ক্লাস হয়েছে। একটু পড়াশোনা করেছি।”
বুশরা বলল,


“কিছু হয়েছে আজকে? বলার মতো কিছু?”
আবিদের বুকে একটা চাপ অনুভব হলো। হিজড়াগুলোর মুখ চোখের সামনে ভেসে উঠল। নোমানের মুখও। সে গলা পরিষ্কার করে বলল,


“না। কিছু না। সব ঠিক আছে।”
বুশরা একটু চুপ করে থাকল। তারপর বলল,


“ঠিক আছে। তুই ক্লান্ত মনে হচ্ছে। ঘুমা।”
আবিদ বলল,


“তুইও ঘুমা।”
কল কেটে গেল। আবিদ ফোনটা বালিশের পাশে রাখল। ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে নোমানের কথা ঘুরছিল। সে টাকা দিয়ে পরিস্থিতি সামলেছে। কোনো হট্টগোল করেনি। কোনো অপমান করেনি। শুধু একশ টাকা দিয়ে সব শেষ করেছে। আর হিজড়াগুলো তাকে প্রশংসা করে গেছে। আবিদকে কিপটে বলেছে।
আবিদের মনে হলো, সে নোমানের কাছে ছোট হয়ে গেছে। লজ্জায়। অথচ নোমান তাকে বিপদ থেকে বের করে এনেছে। এই কৃতজ্ঞতাটা সে কাউকে বলতে পারবে না। বুশরাকেও না। কারণ বলতে গেলে পুরো ঘটনাটা বলতে হবে। আর সেটা বললে তার নিজেরই লজ্জা বাড়বে। সে চোখ বন্ধ করল। মনে মনে শুধু একটা কথা বলল, নোমানকে ধন্যবাদ। সত্যিই ধন্যবাদ। কিন্তু এ কথা সে কারো কাছে উচ্চারণ করবে না।
Reply
#9

(গ)

ডিবেট ক্লাবের মিটিং রুমটা সেদিন একটু বেশি গরম লাগছিল। এসি চলছিল ঠিকই, কিন্তু মানুষের ভিড়ে বাতাস ভারী হয়ে গিয়েছিল। টেবিলের চারপাশে সাত-আটজন বসে। কেউ নোটবুক খুলেছে, কেউ ফোনে কিছু দেখছে। সামনের দেয়ালে হোয়াইটবোর্ডে লেখা Club Day Committee. বুশরা এসেছিল সময়মতো। সামনের দিকের চেয়ারে বসল। খাতা খুলে রাখল। কলম হাতে। মুখে কোনো বিশেষ অভিব্যক্তি নেই। শুধু মনোযোগ। নোমান এল একটু দেরি করে। দরজা দিয়ে ঢুকেই একটা চেয়ারে বসল। পা তুলে আরেকটা চেয়ারের ওপর রাখল। কেউ কিছু বলল না।


সভাপতি বলল, ক্লাব ডে-তে ডিবেট ক্লাবের বুথ কেমন হবে, কী কী লাগবে, কে কী দায়িত্ব নেবে এসব ঠিক করতে হবে। সবাই একটু একটু করে মতামত দিতে লাগল। কেউ বলল পোস্টার লাগবে বেশি। কেউ বলল ফ্রেশারদের জন্য ছোট ছোট ডিবেট গেম রাখা যেতে পারে। কেউ বলল স্যুভেনির দিলে ভালো হয়। বুশরা মাথা নিচু করে নোট নিচ্ছিল। মাঝে মাঝে চোখ তুলে শুনছিল। তার মনে হচ্ছিল সবকিছু গুছোনো দরকার। কোনো কাজই এলোমেলো হওয়া উচিত না। সে একসময় বলল, বুথের ডিজাইন আগে ফাইনাল করা দরকার। তারপর দায়িত্ব ভাগ করা। নাহলে শেষ মুহূর্তে গোলমাল হবে। নোমান তখন ফোন থেকে চোখ তুলে বলল, ডিজাইন নিয়ে এত টেনশনের দরকার নেই। আগের বছর যেভাবে হয়েছিল, সেভাবেই চলবে। বেশি কিছু নতুন করার দরকার নেই। ফ্রেশাররা এলে কথা বলে টানলেই হয়।


বুশরার কলম এক মুহূর্ত থেমে গেল। সে মাথা তুলে নোমানের দিকে তাকাল। চোখে বিরক্তি। কিন্তু কিছু বলল না। সভাপতি আরেকজনের কথা শুনতে লাগল। বুশরা আবার নোট নিতে শুরু করল। কলমের চাপ একটু বেড়ে গিয়েছিল। পাতায় দাগ কাটাকাটি হচ্ছিল। মিটিং চলতে থাকল। দায়িত্ব ভাগ হতে লাগল। কেউ পোস্টার দেখবে, কেউ স্যুভেনির আনবে, কেউ বুথ সাজাবে। নোমানের নাম উঠল বুথ ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে। বুশরার নাম উঠল কনটেন্ট আর প্রমোশনাল ম্যাটেরিয়ালের দায়িত্বে। দুজনের কাজ আলাদা। কিন্তু মিটিংয়ের মাঝে মাঝেই তাদের মতের অমিল বেরিয়ে আসছিল।


নোমান বলল, ফ্রেশারদের জন্য খুব সিরিয়াস কিছু রাখার দরকার নেই। হালকা মজার ডিবেট টপিক রাখা ভালো। বুশরা মনে মনে বলল, ডিবেট ক্লাব মানেই তো সিরিয়াসনেস। মজা করতে করতে ক্লাবের মান নামিয়ে আনার দরকার নেই। কিন্তু সে মুখ খুলল না। শুধু খাতায় লিখে রাখলটপিক সিলেকশন নিয়ে পরে কথা বলতে হবে।


মিটিং শেষ হতে হতে বুশরার মুখটা শক্ত হয়ে গিয়েছিল। সে ব্যাগ গুছিয়ে উঠল। নোমানের দিকে আর তাকাল না। করিডোরে বেরিয়ে হালকা নিঃশ্বাস ফেলল। মনে মনে রাগটা জমাট বাঁধছিল। ছেলেটা সবসময় এমনই। কোনো কিছুকেই সিরিয়াসলি নেয় না। আগের বছর যা হয়েছে তাই হবেএসব কথা সহজে বলে। অথচ ক্লাবের নামে যে দায়িত্ব, সেটা তার কাছে হালকা মনে হয়।


বুশরা সেদিন আর কাউকে কিছু বলল না। বাসায় গিয়েও মনে মনে সেই মিটিংটা ঘুরছিল। নোমানের পা তুলে বসা, ফোন দেখা, হালকা করে কথা বলা সবকিছু বুশরা কে ইরেটেট করছিল। ক্লাবের সবার সাথে নোমানের ভাল সম্পর্ক। তার উপর স্টার বাস্কেটবল প্লেয়ার হবার কারণে একটা আলাদা ট্রিটমেন্ট পায় নোমান। বুশরার এটা ভাল লাগে না। এটা ডিবেট ক্লাব। এখানে যদি কেউ আলাদা ট্রিটমেন্ট পায় সেটা পেতে পারে খালি ডিবেট পারফরমেন্সের জন্য। খেলার জন্য আলাদা ক্লাব তো আছে। তবে বুশরা জানে সবার সামনে কিছু বলা ঠিক হবে না। তাই রাগটা ভেতরে পুষে রাখল।

ক্লাব ডে-র দিন সকাল থেকেই ক্যাম্পাসের ওপেন স্পেসটা ভরে গিয়েছিল। নর্থ বিল্ডিং আর সাউথ বিল্ডিংয়ের মাঝখানের জায়গায় সারি সারি বুথ। রঙিন কাপড়, পোস্টার, ব্যানার। ফ্রেশারদের ভিড়। কেউ বুথ ঘুরে দেখছে, কেউ ফর্ম তুলছে, কেউ ছবি তুলছে। মাইকে ঘোষণা হচ্ছে। গানের শব্দ ভাসছে। বাতাসে ধুলো আর ঘামের গন্ধ। রোদটা একটু একটু করে তীব্র হচ্ছিল।


ডিবেট ক্লাবের বুথটা মাঝামাঝি জায়গায়। সাদা-কালো থিম। পোস্টারে বড় করে লেখা Speak. Think. Lead. টেবিলের ওপর ক্লাবের পুরনো ট্রফিগুলো সাজানো। ফ্রেশারদের জন্য একটা ছোট রেজিস্ট্রেশন ফর্ম। পাশে কয়েকটা চেয়ার। বুথের সামনে একটা ছোট স্পেস খালি রাখা হয়েছিল, যাতে দু-একজন দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারে।

ক্লাব ফেস্টের দিন বুশরা এসেছিল হালকা পেস্তা রঙের সালোয়ার কামিজ পরে। কামিজটা হাঁটুর একটু ওপর পর্যন্ত, হাতা কনুই পর্যন্ত। গলাটা সামান্য খোলা। মাথায় সাদা স্কার্ফ, ঘাড়ের দুই পাশ দিয়ে আলগা করে ছেড়ে দেওয়া। কোনো গয়না নেই। শুধু কানে ছোট দুল। মুখে মেকআপ নেই। চোখে শুধু একটু ক্লান্তি আর মনোযোগ। নোমান তাকে দেখে একবার থেমে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল মেয়েটা সাধারণ পোশাকেও পরিপাটি লাগে। কোনো চটক নেই। তবে পোশাকের থেকে যেটা সবচেয়ে বেশি চোখে লাগে সেটা হলো বুশরার কনফিডেন্স। এতদিন দূর থেকে যেটাকে এরোগেন্স মনে হয়েছে আজকে সামনে থেকে সেটাকে কনফিডেন্স মনে হচ্ছে নোমানের। মনে মনে নোট করে নিল পয়েন্টটা।


আর নোমান সেদিন পরেছিল কালো স্লিম-ফিট জিন্স আর সাদা পোলো শার্ট। শার্টের হাতা একটু ভাঁজ করা। কব্জিতে কালো ঘড়ি। চুল আগের মতোই এলোমেলো, কিন্তু ইচ্ছে করে এমনই রাখা। জুতো পরিষ্কার। গায়ে হালকা পারফিউম। বুশরা তাকে দেখেছিল চোখের কোণ দিয়ে। মনে হয়েছিল শার্টটা তার গায়ে মানিয়েছে। কালো আর সাদার কনট্রাস্ট ভালো লাগছে। কিন্তু ক্লাব ডে-তে এতটা ক্যাজুয়াল কেন? একটু ফরমাল কিছু পরলেই পারত। মনে হয় সবকিছুকেই এত হালকা করে দেখে। গুরুত্ব দেয় না কোনো অনুষ্ঠানকে। সে চোখ সরিয়ে নিয়েছিল দ্রুত। কিন্তু ভাবটা মনে থেকে গিয়েছিল।

বুশরা সকাল থেকেই বুথে ছিল। পোস্টার ঠিক করে দিয়েছে। ফর্মগুলো গুছিয়ে রেখেছে। কেউ এলে হাসতে হাসতে কথা বলছে। ক্লাবের ব্যাপারে বলছে। তার কণ্ঠস্বর পরিষ্কার। কোনো অতিরিক্ত উত্তেজনা নেই। শুধু দায়িত্ব। মাঝে মাঝে ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল। সবকিছু সময়মতো চলছে কিনা দেখছিল।
নোমান এল একটু পরে। হাতে কফি। চুল এলোমেলো। সে বুথের একপাশে দাঁড়াল। ফ্রেশারদের সাথে কথা বলতে শুরু করল। সহজে। হাসতে হাসতে। কেউ প্রশ্ন করলে উত্তর দিল। কেউ দ্বিধা করলে উৎসাহ দিল। বুশরা মাঝে মাঝে চোখের কোণ দিয়ে দেখছিল। ছেলেটা কথা বলতে পারে। মানুষ টানতে পারে। এটা সে অস্বীকার করতে পারছিল না। তবুও মনে মনে বলছিল, কথা বলা আর দায়িত্ব পালন করা এক কথা না।
দুপুরের দিকে প্রথম সমস্যাটা হলো। বুথের ব্যানারটা হঠাৎ কেউ ঠেলে দেওয়ায় একদিক দিয়ে খুলে গেল। হাওয়ায় উড়তে শুরু করল। দুইজন জুনিয়র ধরার চেষ্টা করল। পারল না। ব্যানারটা আরও খুলে যাচ্ছিল। আশেপাশের বুথ থেকে লোকজন তাকিয়ে দেখছিল। একটু গোলমাল পাকতে যাচ্ছিল। কেউ কেউ হাসছিল। কেউ ফোন বের করে ভিডিও তোলার ভান করছিল। তবে ঠিক হেল্প করছিল না কেউ।  বুশরা এগিয়ে গেল। কিন্তু কী করবে বুঝতে পারছিল না। টেপ কোথায় রাখা আছে মনে করতে পারছিল না। জুনিয়ররা হাতপাখা করছিল। অন্য ক্লাবের একজন পাশ থেকে টিপ্পনি কেটে বলছিল, ডিবেটের ব্যানার তর্কের জোরে হারিয়ে গেল মনে হয়। একটা হাসির রোল উঠল ভীড়ে।


নোমান তখন কফি রেখে এগিয়ে এল। কোনো তাড়াহুড়ো নেই। সে ব্যানারটার খুলে যাওয়া অংশটা ধরল। চারপাশ দেখল। তারপর বুথের পেছন থেকে একটা চেয়ার টেনে আনল। চেয়ারের ওপর উঠে ব্যানারটার উপরের অংশটা আবার আটকানোর চেষ্টা করল। হাতের কাছে যে টেপটা পড়েছিল, সেটা তুলে নিল। দ্রুত কিন্তু পরিপাটিভাবে আটকে দিল। তারপর নেমে এসে ব্যানারটার নিচের অংশটাও ঠিক করে দিল। পুরো কাজটা পাঁচ মিনিটের মধ্যে শেষ। কোনো অতিরিক্ত কথা নেই। কোনো অভিযোগ নেই।


ফ্রেশাররা হাততালি দিল। জুনিয়ররাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। নোমান শুধু কাঁধ ঝাঁকাল। আবার কফি হাতে নিল। বুথের একপাশে গিয়ে দাঁড়াল। যেন কিছুই হয়নি। বুশরা দাঁড়িয়ে দেখছিল। তার মুখে কোনো হাসি আসেনি। কিন্তু চোখে একটা অবাক ভাব ছিল। ছেলেটা এতক্ষণ হালকা কথা বলছিল। মনে হচ্ছিল কোনো কিছুতেই মন নেই। অথচ সমস্যা হতেই সে শান্তভাবে সামলে নিল। কোনো হট্টগোল করেনি। কোনো অভিযোগ করেনি। শুধু কাজটা করেছে। ভালোভাবে করেছে। রাগটা একটু কমল। পুরোপুরি না। কিন্তু একটু।

বেশ কিছুক্ষণ পর দ্বিতীয় সমস্যাটা এল। একদল ফ্রেশার বুথের সামনে জড়ো হয়েছিল। তারা ডিবেট ক্লাবে নাম লেখাতে আগ্রহী। কিন্তু রেজিস্ট্রেশন ফর্মের প্রিন্টেড কপি ফুরিয়ে গিয়েছিল। ক্লাবের জুনিয়ররা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিল। কেউ বলছিল ল্যাপটপ থেকে নতুন করে প্রিন্ট নিতে হবে। কেউ বলছিল অফিসে গিয়ে কপি আনতে হবে। ভিড় বাড়ছিল। কয়েকজন ফ্রেশার অপেক্ষা করতে করতে বিরক্ত হচ্ছিল। কেউ কেউ অন্য বুথের দিকে পা বাড়াচ্ছিল।


বুশরা তখন অন্য একদলকে ক্লাবের ব্যাপারে বলছিল। সে দিকে মনোযোগ দিতে পারছিল না। জুনিয়ররা তার দিকে তাকিয়ে ছিল। সাহায্য চাইছিল। কিন্তু বুশরা তখন ব্যস্ত। নোমান আবার এগিয়ে এল। সে জুনিয়রদের একজনকে বলল ল্যাপটপ খুলে দিতে। তারপর নিজের ফোন থেকে হটস্পট চালু করল। দ্রুত একটা গুগল ফর্ম খুলে ফেলল। আগের ফর্মের প্রশ্নগুলো মনে করে মোটামুটি তুলে দিল। লিংকটা বের করে একজন জুনিয়রকে দিল। বলল, এই লিংকটা সবাইকে স্ক্যান করে দাও। যারা নাম লেখাতে চায়, এখনই লিখে ফেলতে পারবে। পরে প্রিন্টেড কপি এলে মিলিয়ে নেওয়া যাবে। জুনিয়ররা তাড়াতাড়ি কিউআর কোড বের করল। ফ্রেশাররা ফোন বের করে স্ক্যান করতে লাগল। ভিড়টা আবার শান্ত হলো। কেউ আর চলে গেল না। কয়েকজন তো তখনই নাম লিখে ফেলল।


নোমান আবার পেছনে সরে গেল। কোনো কৃতিত্ব নেওয়ার ভান নেই। শুধু কাজটা হয়ে গেছে দেখে নিশ্চিন্ত। বুশরা এবার পুরোপুরি দেখছিল। প্রথমবার ব্যানার ঠিক করার সময় সে অবাক হয়েছিল। এবার আরও বেশি। ছেলেটা শুধু শারীরিক কাজই পারে না। মাথাও খাটায়। সমস্যা দেখলে পথ বের করে। কোনো নাটক করে না। কোনো বড় বড় কথা বলে না। শুধু করে। তার মনে হলো, হয়তো ছেলেটা পুরোপুরি অকাজের না। দায়িত্ব পেলে পারে। শুধু চায় না সবসময় দায়িত্ব নিতে। এই চিন্তাটা তার রাগটাকে আরও একটু কমিয়ে দিয়েছিল। পুরোপুরি মুছে যায়নি। কিন্তু ধারটা কমে গিয়েছিল।

বেশিক্ষণ পর নোমান বুথের একপাশে দাঁড়িয়ে ফ্রেশারদের দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ তার নজর গেল বুশরার দিকে। বুশরা তখন তিনজন ফ্রেশার মেয়ের সাথে কথা বলছিল। গলা খুব জোরে না। কিন্তু পরিষ্কার। সে শুধু ক্লাবের কথা বলছিল না। শুনছিলও। মেয়েরা যখন দ্বিধা করছিল, বুশরা তাড়াহুড়ো করছিল না। ধীরে ধীরে বুঝিয়ে বলছিল কেন ডিবেট ক্লাবে থাকাটা কাজে লাগে। শুধু প্রতিযোগিতা না। কথা বলার সাহস, লজিক্যালি চিন্তা করা, মানুষের সামনে দাঁড়ানো এসবের কথা বলছিল। মেয়েগুলো মন দিয়ে শুনছিল। একসময় তারা হাসল। নাম লেখানোর কথা বলল।


নোমানের মনে হলো, মেয়েটা শুধু পড়াশোনায় ভালো এটাই তার আগের ধারণা ছিল। ভালো রেজাল্ট, নিয়মকানুন, সিরিয়াস ফেস। এসব দেখেই সে ভেবেছিল বুশরারা শুধু বইয়ের পৃথিবীতে থাকে। মানুষের সাথে মেশা, টানা, সাজানো এসব তাদের কাজ না। কিন্তু এখন দেখছিল অন্য ছবি। বুশরা বুথের টেবিলটা নিজে গুছিয়ে দিয়েছিল। ট্রফিগুলো এমনভাবে সাজিয়েছিল যাতে সামনে থেকে সুন্দর দেখায়। পোস্টারের একটা কোণ উল্টে গিয়েছিল, সে নিজে গিয়ে ঠিক করে এসেছিল। ফ্রেশারদের সাথে কথা বলার সময় কোনো কৃত্রিম উত্তেজনা নেই। অথচ মানুষ থেমে যাচ্ছে। শুনছে।


নোমান একটু অবাক হলো। তার ধারণাটা ভুল ছিল হয়তো। ভালো ছাত্রী মানেই শুধু পড়াশোনাএ টা সবসময় ঠিক না। মেয়েটার মধ্যে একটা অন্যরকম দক্ষতা আছে। মানুষকে বোঝানোর। জায়গাটাকে পরিপাটি রাখার। কথা বলে টানার। সে কফি থেকে চোখ না সরিয়েই ভাবল, এতদিন শুধু বিরক্তিই দেখেছে মেয়েটার মধ্যে। নিয়ম নিয়ে কথা, রাগ, কঠোর মুখ। অথচ আজ অন্য কিছুও দেখা যাচ্ছে। এই অবাক হওয়াটা তার কাছে অচেনা লেগেছিল। সে সাধারণত ভালো ছাত্রীদের দিকে বেশি খেয়াল করে না। করেও না। কিন্তু আজ খেয়াল করতে হয়েছিল। বুশরা তখন আরেকদল ফ্রেশারের সাথে কথা বলছিল। নোমান আর তাকিয়ে রইল না। মুখ অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিল। কিন্তু মনে মনে কথাটা থেকে গেল মেয়েটা শুধু পড়াশোনায় ভালো না। অন্য কিছুও পারে।

সেদিন আবিদের আসার কথা ছিল। সকালে মেসেজ করেছিল। ক্লাব ডে দেখতে যাবে। দুপুরের দিকে আরেকটা মেসেজ এল। বাসায় একটা জরুরি কাজ পড়েছে। মায়ের সাথে বাইরে যেতে হবে। আসতে পারবে না। বুশরা মেসেজটা পড়ে শুধু লিখল ঠিক আছে।


আর কিছু বলল না। মনে মনে একটু খারাপ লাগল। আবিদ থাকলে ভালো লাগত। কিন্তু সে জানত আবিদ এমনিতেই দায়িত্বশীল। বাসার কাজ থাকলে আগে সেটাই করবে। যদিও আবিদ না আসায় একটু হতাশ হয়েছে তবে আবিদের এই দ্বায়িত্বশীলতা বুশরার পছন্দ।


নরমালি যারা থার্ড ইয়ারে থাকে তাদের দ্বায়িত্ব বেশি থাকে ক্লাব ডে তে। ফাইনাল ইয়ারের লোকজন একটু ইজি থাকে। জুনিয়ররা ঠিক সব বুঝে উঠতে পারে না। ফলে সেদিন বুথের সামনে বুশরা আর নোমানই বেশিক্ষণ ছিল। আবিদ আসেনি। তিনজনের একসাথে দেখা হয়নি। শুধু দুজন। পাশাপাশি। একই বুথে। একই ক্লাবের দায়িত্বে। অথচ তাদের মধ্যে এখনো একটা অদৃশ্য দূরত্ব। রাগ আর অবাক হওয়ার মিশেল। দুজনের দিক থেকেই।সন্ধ্যা নামার আগে বুথ গুছোনো শুরু হলো। নোমান চেয়ার সরিয়ে দিচ্ছিল। বুশরা ফর্মগুলো গুছিয়ে ব্যাগে রাখছিল। দুজনে কথা বলছিল না। শুধু কাজ করছিল। মাঝে মাঝে চোখ পড়ছিল একে অপরের দিকে। তারপর সরে যাচ্ছিল।


বুশরার মনে সেদিনের কয়েকটা ছবি থেকে গেল। একটা মিটিং রুমে নোমানের হালকা মনোভাব। আরেকটা ব্যানার ঠিক করার সময় তার শান্ত দক্ষতা। তৃতীয়টা ফর্ম ফুরিয়ে গেলে হটস্পট ধরিয়ে গুগল ফর্ম বানিয়ে দেওয়া। তিনটে ছবি পাশাপাশি। মিলছে না সহজে। অথচ তিনটেই সত্যি। নোমানের মনেও কয়েকটা ছবি থেকে গেল। বুশরা ফ্রেশারদের সাথে কথা বলছে। বুথ সাজাচ্ছে। পোস্টার ঠিক করছে। মানুষ থামিয়ে রাখছে। তার আগের ধারণাটা একটু কেঁপে গিয়েছিল। সে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে এল। পেছনে নোমান এখনো বুথ গুছাচ্ছিল। বুশরা আর ফিরে তাকাল না। কিন্তু মনে মনে একটা কথা বলল ছেলেটা অকাজের না হয়তো। শুধু অন্যরকম। আর সেই অন্যরকমটাই তার কাছে এখনো বিরক্তিকর। আর একটু অবাক করার মতোও বটে। নোমানও পেছন ফিরে তাকাল না। কিন্তু মনে মনে বলল মেয়েটা শুধু পড়াশোনায় ভালো না। অন্য কিছুও পারে। এটা সে আগে ভাবেনি।


দুজনেরই মনে সেদিন একটু করে ছবি বদলেছিল। খুব বেশি না। শুধু একটু।
Reply
#10
Music 

আপডেট ৫
(ক)

হিজড়াদের হাত থেকে আবিদকে উদ্ধার করার সেই সন্ধ্যার পর থেকে নোমান আর আবিদের সম্পর্কটা ধীরে ধীরে একটা নতুন রূপ নিয়েছে। আগে তারা শুধু চেনা ছিল। সাজিদের মাধ্যমে একবার পরিচয় হয়েছিল, কয়েকটা কথা হয়েছিল। কিন্তু সেদিনের পর থেকে সম্পর্কটা অন্য জায়গায় চলে গেছে। ক্যাম্পাসে দেখা হলে এখন আর শুধু মাথা নাড়ায় না। করিডোরে হলে একটু থেমে যায়। প্লাজার বেঞ্চির কাছে হলে কয়েকটা কথা হয়। লাইব্রেরির সামনে হলে একটু দাঁড়ায়। কথাগুলো গভীর কিছু না। আবহাওয়া, ক্লাসের প্রেসার, কোনো ফুটবল ম্যাচের রেজাল্ট এমন সাধারণ বিষয়। কিন্তু কথা হওয়ার মধ্যে একটা হৃদত্যা এসেছে। আবিদ এখন নোমানকে দেখলে আর অস্বস্তিতে পাশ কেটে যায় না। নোমানও আবিদকে দেখলে হালকা হাসিতে থামে। তাদের কমন ফ্রেন্ড সাজিদের সাথে তিনজনে মিলে কয়েকবার আড্ডা হয়েছে। একবার ক্যাফেটেরিয়ায়, একবার প্লাজার সিঁড়িতে, আরেকবার ক্যাম্পাসের বাইরে চায়ের দোকানে। সেই আড্ডাগুলোতে কোনো বড় কথা হয়নি। কিন্তু কথার  ধরনটা বদলেছে। আগে যেমন শুধু ভদ্রতা ছিল, এখন সেখানে আন্তরিকতা যোগ হয়েছে। হঠাৎ দেখা হলেও জোর করে কথা বলে ভদ্রতা মেন্টেন করার আর কোনো বিড়ম্বনা নেই। সম্পর্কটা আস্তে আস্তে একটা সহজ, বন্ধুত্বপূর্ণ জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। কেউ কাউকে জোর করে কাছে টানছে না। শুধু সময় আর ছোটখাটো দেখা সাক্ষাৎ দুজনকে একে অপরের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।

একদিন বিকেলের দিকে তিনজন বসেছিল প্লাজার এক কোণে। সাজিদ, আবিদ আর নোমান। সামনে তিনটা চায়ের কাপ। রোদটা হেলে পড়ছে। চারপাশে ছেলেমেয়েরা আড্ডা দিচ্ছে, কেউ ফোন দেখছে, কেউ হেঁটে যাচ্ছে। কথা শুরু হয়েছিল ইউরোপিয়ান ফুটবল নিয়ে।
সাজিদ বলছিল,


“আর্সেনাল এবার অবশ্যই কিছু একটা করবে। রাইস আর ওডেগার্ড যদি ফর্ম ধরে রাখে”
আবিদ মাথা নাড়ল।


“রাখবে না। সিটির সামনে টিকতে পারবে না।”
নোমান হেসে বলল,


“তোমরা দুজনই ভুল। সিটি আর আর্সেনাল দুইটাই ইপিএলে বাঘ আর বাইরে  বিড়াল। রিয়াল মাদ্রিদ চ্যাম্পিয়নস লীগের ফাইনালে থাকবে। চ্যাম্পিয়নস লিগে ওদের অভ্যাস আছে।”
সাজিদ বলল,


“অভ্যাস আর সামর্থ্য এক কথা না।”
এভাবে কথা চলছিল কিছুক্ষণ। কেউ কারো কথা পুরোপুরি মানছিল না। কিন্তু মানার দরকারও ছিল না। শুধু কথা বলার আনন্দ। একসময় ফুটবলের আলোচনা থেমে গেল। চায়ের কাপে চুমুক পড়ছিল। নীরবতা একটু ভারী হয়ে এল।
সাজিদ হঠাৎ বলল,


“ফুটবল ঠিক আছে। কিন্তু মানুষের জীবনে শুধু খেলা তো আর চলে না। প্রেমছাড়া জীবনটা কেমন যেন ফাকা লাগে।”
আবিদ মুচকি হাসল।


“তুই এখনো সিঙ্গেল। তাই এত কথা।”
সাজিদ কাঁধ ঝাঁকাল।


“তাই তো। আমি প্রেম করতে চাই। একজনকে খুঁজে পেতে চাই। যেন কেউ থাকে। কথা বলার জন্য, সময় কাটানোর জন্য। আমার মনে হয় প্রেম মানেই পাশে কেউ থাকা। একা একা সবকিছু সহ্য করতে হয় না।”
আবিদ একটু গম্ভীর হয়ে বলল,


“প্রেম শুধু পাশে থাকা না। এটা আরও বড় কিছু। আমার কাছে প্রেম একটা স্বর্গীয় ব্যাপার। যেন দুইজন মানুষ একে অপরের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পায়। শান্তি পায়। নিরাপত্তা পায়। পৃথিবীটা একটু কম একা মনে হয়।”
নোমান তখনো চুপ করে চা খাচ্ছিল। কিছু বলছিল না। চোখ দিয়ে দূরের মাঠের দিকে তাকিয়েছিল। সাজিদ তার দিকে তাকিয়ে বলল,


“তুই এত চুপ কেন? তোর কী মত?”
আবিদও বলল,


“হ্যাঁ, বল না। তোমার তো অনেক অভিজ্ঞতা আছে এই ব্যাপারে।”
নোমান একটু ইতস্তত করল। কাপটা নিচে রাখল। আঙুল দিয়ে কাপের কিনার ঘষছিল।


“আমার মতটা তোমাদের মতের সাথে মিলবে না মনে হয়।”
সাজিদ হাসল।


“তাই বলে চুপ করে থাকবি? বল। আমরা শুনব।”
আবিদও মাথা নাড়ল।


“বল। কৌতূহল হচ্ছে।”
নোমান একটু চুপ থেকে বলল,


“আমার কাছে প্রেম কোনো দীর্ঘস্থায়ী ব্যাপার না। হ্যাঁ, প্রেমে পড়েছি কয়েকবার। কিন্তু সবসময় ক্ষণস্থায়ী। জীবন একটাই। এখানে একজনের প্রেমে পড়ে সারাজীবন থাকা সম্ভব বলে আমার মনে হয় না। একজন মানুষ কি আরেকজন মানুষের সব অভাব পূরণ করতে পারে? পারে না। তাহলে কীভাবে একজনের প্রেমে সারাজীবন থাকা যায়?”
সাজিদ আর আবিদ দুজনেই একটু হকচকিয়ে গেল। সাজিদ বলল,


“মানে তুই বিশ্বাস করিস না কেউ সারাজীবন একসাথে থাকতে পারে?”
নোমান মাথা নাড়ল।


“পারে হয়তো। কেউ কেউ পারে। কিন্তু আমার কাছে সেটা স্বাভাবিক মনে হয় না। মানুষ বদলায়। চাওয়া বদলায়। অভ্যাস বদলায়। তাই আমি দীর্ঘস্থায়ী কিছু ভাবি না। যেটা আছে, সেটা উপভোগ করি। শেষ হলে শেষ।”
আবিদ এবার জিজ্ঞেস করল,


“তাহলে বিয়ে, সংসার, সন্তান ভবিষ্যৎ নিয়ে কী ভাবো?”
নোমান হেসে ফেলল। হাসিতে একটু বিদ্রূপ ছিল না। শুধু সহজ অস্বীকৃতি।


“অনেক দূরের ব্যাপার। অন্তত আগামী পাঁচ-ছয় বছর এর ধারেকাছেও যাচ্ছি না। এখন যেটা আছে, সেটাই ভালো। ভবিষ্যৎ নিয়ে টেনশন করলে বর্তমান নষ্ট হয়।”
সাজিদ একটু এগিয়ে নোমানের এই আনকনভেনশনাল মত ভাল করে বুঝার জন্য আরেকটা প্রশ্ন করল,


“প্রেমে শারীরিক সম্পর্ককে তুই কেমন করে দেখিস?”
নোমান এবার সোজা তাকাল। চোখে একটা গম্ভীর ভাব।


“সত্যি কথা বলব?”
দুজনে মাথা নাড়ল।
নোমান বলল,


“নারীদেহ আমাকে উন্মত্ত করে। পাগল করে। প্রেম শুধু মনের ব্যাপার না। শরীরের সাথেও হয়। শরীর ছাড়া যে প্রেম, সেটা আমি বুঝি না। যখন ত্বক ত্বকে লাগে, যখন শ্বাস গরম হয়, যখন কেউ তোমার কাছে সম্পূর্ণ খুলে যায় সেই মুহূর্তগুলোই আমার কাছে সত্যি। বাকিটা কথা। সুন্দর কথা। কিন্তু কথা।”
আবিদ মাথা নাড়ল। গলায় একটু চাপ এল। নোমানের এমন খোলামেলা কথায় অভ্যস্ত না আবিদ। যে সাজিদ নোমান কে আগে থেকে চেনে সে পর্যন্ত একটু অবাক হয়েছে এমন কনফেশনে। আবিদ নোমানের কথার প্রতিউত্তর দিতে চায়, নিজের মোরাল গ্রাউন্ডের পিছনে উদাহারণ সহ যুক্তি দাড় করাতে চায়,


“এটা সত্যি না। আমার গার্লফ্রেন্ডের সাথে আমার সম্পর্কে কাম নেই। শুধু ভালোবাসা আছে। সম্মান আছে। শান্তি আছে। শরীরের ক্ষুধা দিয়ে সব মাপা যায় না।”
নোমান আবিদের দিকে তাকিয়ে বলল,


“মাই ফ্রেন্ড, আই অ্যাগ্রি টু ডিসঅ্যাগ্রি। শরীর ছাড়া যেটা থাকে, সেটাকে আমি ভালোবাসা বলতে পারি না। কী বলব জানি না। কিন্তু ভালোবাসা না।”
সাজিদ আর আবিদ দুজনেই চুপ করে গেল একমুহূর্ত। তারপর সাজিদ জিজ্ঞেস করল,


“তোর এই এক্সট্রিম মতামতের কারণ কী ভাই?”
আবিদও বলল,


“হ্যাঁ। কেন এতটা একরোখা মত এই বিষয়ে তোমার?”
নোমান চায়ের কাপে চোখ রাখল। একটু চুপ করে থাকল। তারপর মাথা তুলে বলল,


“ সেইম প্রশ্ন আমি তোমাদের দুইজন কে করতে পারি? তোমরা কেন ভাবছ তোমাদের মতামত টা সত্য?”

আবিদ এবার উত্তর দিল,
“কারণ সমাজের অধিকাংশ মানুষ এটা ভাবে। কামের অস্তিত্ব আছে আমি অস্বীকার করছি না। আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের পৃথিবীতে আনার জন্য কামের দরকার আছে তবে সব সময় ভালবাসা আর কাম কে এক করে ফেলা ঠিক নয়।”

নোমান সংগে সংগে উত্তর দেয়,
“মাই ফ্রেন্ড অধিকাংশ মানুষ একটা কথা বললে সেটা সত্য হয়ে যায় না। আর আমার মনে হয় অনেক সময় মানুষ তার গোপন অভিব্যক্তি লুকিয়ে রাখে। মানুষের অনেক হিপক্রেসি আছে এর মাঝে একটা হলো সেক্স কে অচ্ছুত করে রাখে প্রকাশ্যে কিন্তু গোপনে তার কামনা করে। আমি বলছি না তুমি তাদের মত। তবে অনেক সময় চারপাশে সবাই কে একটা জিনিস করতে দেখে অনেকে কনফিউজড হয়ে যায়। অন্যদের হিপক্রেসি কে নর্ম ভেবে নিজে সেটা চর্চা করতে থাকে নিয়ম হিসেবে।”

আবিদ কি যুক্তি দিবে বুঝে উঠতে পারে না, তাই বলে,

“ তুমি ভালবাসা কে ছোট করছ। কামের মত জিনিসের সাথে এটাকে গুলিয়ে ফেলছ।”

নোমান মুচকি হাসে, বলে,


“নাহ, গুলিয়ে ফেলছি না কারণ শরীর আমাদের একটা অংশ। আমাদের অস্তিত্বের একটা অংশ। সেই অংশকে বাদ দিয়ে যদি আমরা ভালোবাসার কথা ভাবি, তাহলে সেটা অসম্পূর্ণ। তুমি কি নিজের হাত পা বাদ দিয়ে নিজেকে সম্পূর্ণ ভাবতে পারো? পারো না। তাহলে শরীরকে বাদ দিয়ে ভালোবাসা কী করে সম্পূর্ণ হয়? যে প্রেমিকা কে তুমি ভালবাস তার শরীর কে বাদ দিয়ে ভালবাসা তো তার অস্তিত্ব কে অস্বীকার করা।”
আবিদ আর সাজিদ দুজনেই একটু আটকে গেল। যুক্তিটা সহজ। অস্বীকার করা কঠিন। কিন্তু মানতেও ইচ্ছে করছিল না। আবিদ বলল,


“মানতে পারলাম না নোমান।”
নোমান কাঁধ ঝাঁকাল।


“মানা না মানা তোমার ব্যাপার। আমি যা অনুভব করি, তাই বললাম।”
আবিদ একটু চুপ করে থাকল। তারপর গলা নামিয়ে বলল,


“আমার গার্লফ্রেন্ডকে দেখলে এখনো বুকে একটা অদ্ভুত কম্পন হয়। পালপিটেশন। এতদিন হয়েছে। অথচ এখনো হয়। সে কাছে এলে মনে হয় পৃথিবীটা একটু থেমে গেছে। একটা শান্তি নেমে আসে। আবার তার সাথেই একটা উত্তেজনাও থাকে। যেন কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। কিন্তু ঘটে না। শুধু অনুভূতিটা থেকে যায়। তার হাসি, তার কথা বলার ধরন, চুপ করে বসে থাকার ভঙ্গি সবকিছু মিলে একটা পরিপূর্ণতা তৈরি করে। আমি যখন তার সাথে থাকি, তখন আর কিছু চাই না। শরীরের ক্ষুধা তখন গৌণ হয়ে যায়। শুধু তার উপস্থিতিই যথেষ্ট।”
নোমান শুনছিল। শেষ পর্যন্ত হেসে ফেলল।


“মাই সিলি বয়। এইগুলা তোমার ফিজিক্যাল রিঅ্যাকশন। তুমি চাপিয়ে রাখছো তোমার শরীর কে। ইউ নিড এ গুড সেক্স। ইউর বডি ইজ টেলিং ইউ দ্যাট। ইউর ফিলিংস অফ পালপিটেশন ইজ দ্য ম্যানিফেস্টেশন অফ ইউর ফিজিক্যাল নিড।”
আবিদের কান লাল হয়ে গেল। মুখটাও গরম লাগল। নোমান আবার বলল,


“তুমি কখনো কামার্তভাবে তোমার জিএফকে টাচ করোনি?”
আবিদ একটু রেগে উঠল।


“কী বাজে বলছো!”
নোমান হাত তুলে বলল,


“আই অ্যাম জাস্ট আস্কিং। অনলি ফর দ্য সেক অফ আর্গুমেন্ট।”
আবিদ একটু চুপ করে থাকল। তারপর গলা নামিয়ে বলল,


“শুধু দুইবার কপালে চুমু খেয়েছি। তাও কাম থেকে না ভালবাসা থেকে।”
নোমান জোরে হেসে উঠল।


“ম্যান, ইউ গাইজ আর ডুয়িং সিক্সটিস প্রেম অ্যাট ২০২৬।”
সাজিদও হেসে ফেলল। আবিদও একটু হাসল, যদিও লজ্জায় মুখ লাল। তারপর আবিদ বলল,


“আমি গর্বিত আমার প্রেম নিয়ে। আর শারীরিক সম্পর্ককে আমি তো একদম বাদ দিচ্ছি না। বিয়ের পর সব হবে। হালাল মতে।”
নোমান এবার টিজ করে বলল,


“হর্নি গাই। সব ভাবে, শুধু সাহস করে না করার। বিয়ে করিয়ে দিলেই ঠিক গার্লফ্রেন্ডের উপর ঝাপিয়ে পড়বে।”
আবিদের মুখ আরও লাল হয়ে গেল। সাজিদ হাসতে হাসতে বলল,


“বাস। এবার থাম। আবিদকে আর লজ্জা দিস না।”
এভাবেই তাদের আড্ডা শেষ হলো। উঠে দাঁড়ানোর আগে সাজিদ বলল,


“জানো, প্রকৃত বন্ধুত্ব হলো সেটাই—যেখানে ভিন্ন ভিন্ন মতের মানুষ একসাথে সুন্দর সময় কাটাতে পারে। বিপদে একে অন্যকে সাহায্য করতে পারে।”
আবিদ আর নোমান দুজনেই মাথা নাড়ল। একমত। সাজিদ হাসতে হাসতে আবিদের দিকে তাকিয়ে বলল,


“তুই হলি লাভার বয়।”
আবিদ নোমানের দিকে তাকিয়ে বলল,


“আর তুমি প্লেবয়।”
তিনজনেই হেসে উঠল। কঠিন বিষয় নিয়ে এই আলোচনা তাদের মাঝের হৃদ্যতা আর বাড়িয়ে দিয়েছে কিছু সময়ে।

বাড়ি ফেরার পথে আবিদ একা হাঁটছিল। রাস্তার আলোগুলো জ্বলে উঠেছে। মনে মনে নোমানের কথাগুলো ঘুরছিল। শরীর ছাড়া প্রেম কি সত্যিই অসম্পূর্ণ? তাহলে তার আর তার গার্লফ্রেন্ডের প্রেম কি পূর্ণ নয়? যে শান্তি সে পায়, যে কম্পন এখনো বুকে হয় সেগুলো কি শুধু শরীরের অতৃপ্ত ক্ষুধা? নোমানের কথাগুলো মানতে ইচ্ছে করছিল না। অথচ যুক্তিটা সহজ ছিল। আবিদ মাথা নাড়ল। উত্তর পেল না।
অন্যদিকে নোমান বাইকে করে যাচ্ছিল। হেলমেটের ভেতর বাতাস ঢুকছিল। তারও মনে পড়ছিল আবিদের কথা। সত্যিকারের প্রেম বলে কি কিছু আছে? নাকি সবই মোহ? যদি মোহ হয়, তাহলে শারীরিক স্পর্শ ছাড়া কীভাবে আবিদের প্রেম এতদিন টিকে আছে? মেয়েটাকে শুধু কপালে চুমু খেয়ে কী করে এতটা প্রশান্তি পায় সে?
দুইজন ভিন্ন মানুষ। দুইটা ভিন্ন কৌতূহল। তবে আগ্রহ এক জায়গায়।
Reply


Forum Jump:


Users browsing this thread: 1 Guest(s)