Thread Rating:
  • 1 Vote(s) - 5 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5

The Barter System (By:andygarfield)
#1
Tongue 

(06-24-2026, 08:32 PM) Wrote:  
a Novel

প্রথম পরিচ্ছেদ: বিকেলের সোনাঝুরি আলো

বিকেলের পড়ন্ত সোনাঝুরি রোদ রান্নাঘরের জানলার শার্শি গলে মেঝেতে এক চিলতে তির্যক আলপনা এঁকেছে। কড়াইয়ের ফুটন্ত কারি থেকে ওঠা মশলাদার বাষ্পটুকু সেই ঘন সোনালি আলোয় মিশে এক অদ্ভুত মায়াবী রূপ নিয়েছে।

চুল্লির পাশে দাঁড়িয়ে ইন্দিরা সেন। দীর্ঘদিনের অভ্যাসে আর নিখুঁত অনুশাসনে তাঁর প্রতিটি নড়াচড়ায় জড়িয়ে আছে এক সহজাত আভিজাত্য। কাঠের হাতা দিয়ে তরকারি নাড়া, আঁচ কমানোর জন্য কবজির আলতো মোচড়, কিংবা ছন্দ না হারিয়ে কানের পেছনে অবাধ্য চুলের গোছা গুঁজে দেওয়া—সবকিছুতেই তাঁর এক অদ্ভুত পরিমিতিবোধ। পরনে গাঢ় মেরুন রঙের সিল্কের শাড়ি, যার সরু সোনালি পাড়টি নিখুঁতভাবে বিন্যস্ত; রান্নাঘরের ভ্যাপসা গরমেও শাড়ির ভাঁজে বিন্দুমাত্র অবহেলার ছাপ নেই। বাইরের পৃথিবীতে তিনি ঠিক যেমন—আত্মনিয়ন্ত্রিত, লালিত্যময়ী এবং এক প্রাজ্ঞ অধ্যাপকের শান্ত কর্তৃত্ব নিয়ে বিচরণ করেন, এই রান্নাঘরের সীমিত পরিসরেও তিনি ঠিক তেমনই।

বাতাসে তখন জিরে আর ধনের পরিচিত সুবাস, তার সাথে মিশেছে আদা আর কাঁচা লঙ্কার ঝাঁঝ। গরম তেলে একমুঠো কারিপাতা ছাড়তেই ছ্যাঁত করে একটা শব্দ হলো, মুহূর্তেই চারপাশটা এক তীব্র, পার্থিব গন্ধে ভরে উঠল। বুক ভরে সেই ঘ্রাণ নিলেন ইন্দিরা। নিজেকে এই সামান্য আনন্দের মুখোমুখি হওয়ার অনুমতি দিলেন। আজ ইউনিভার্সিটিতে একটু তাড়াতাড়িই ছুটি হয়ে গেছে—কিছু ক্লান্তিকর অডিট মিটিং ছিল, যেগুলো অ্যাডমিন স্টাফদের জন্য জরুরি হলেও প্রফেসরদের জন্য নেহাতই সময় নষ্ট। ফলে, আচমকাই তিনি কিছুটা উপরি সময় পেয়ে গেছেন। প্রথমে ভেবেছিলেন পিএইচডি-র ছেলেমেয়েদের পাঠানো চ্যাপ্টারগুলো একটু চোখ বুলিয়ে নেবেন, কিংবা মুঘল দরবারের স্থাপত্যের ওপর তাঁর যে পাণ্ডুলিপিটা মাসের পর মাস ধরে অসমাপ্ত পড়ে আছে, সেটা নিয়ে বসবেন। কিন্তু শেষমেশ এই ধীরস্থির রান্নার কাজটাকেই বেছে নিলেন তিনি।

আজকাল শেষ বিকেলে বাড়িটাকে এভাবে সম্পূর্ণ নিজের মতো করে পাওয়া একরকম বিলাসিতা, প্রায় এক নিষিদ্ধ তৃপ্তি। সুব্রত যথারীতি সাতটার মধ্যে ফিরবে, হাতে থাকবে চুক্তিপত্র আর নানা প্রজেক্টে ভারী হয়ে থাকা ব্রিফকেসটা। রাহুল অন্তত সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত কলেজেই থাকবে, আগামী শুক্রবার থেকে শুরু হতে যাওয়া সেমিস্টারের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। মেইন রোড থেকে ভেসে আসা গাড়ির দূরবর্তী গুঞ্জন আর উঠোনের নিমগাছ থেকে একটা কাকের ডাক ছাড়া চারপাশ একেবারে নিস্তব্ধ।

সদর দরজাটা যে কখন খুলেছে, তা তিনি টেরই পাননি।

পেছন থেকে দুটো হাত আচমকা তাঁর কোমর জড়িয়ে ধরতে ইন্দিরা চমকে উঠলেন। একটা উষ্ণ, সুগঠিত বুক এসে ঠেকল তাঁর পিঠে। মুখ থেকে একটা অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এল তাঁর, হাতের কাঠের হাতাটা কেঁপে উঠল বিপজ্জনকভাবে। গরম তেল কড়াইয়ের কিনারা উপচে কয়েক ফোঁটা প্রায় তাঁর কবজিতে পড়তে পড়তে বেঁচে গেল।

"ওহ্ রাহুল! কী হচ্ছে কী? ভয় পাইয়ে দিয়েছিলি তো!" কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে, অর্ধেক বকুনি আর অর্ধেক হাঁপানোর সুরে বেরিয়ে এল। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা তখনো ধড়ফড় করছে। তাড়াহুড়ো করে হাতাটা নামিয়ে তিনি অন্য হাত দিয়ে চুল্লির আঁচটা কমিয়ে দিলেন। "গরম তেলটা ছিটকে গায়ে পড়লে কী হতো বল তো?"

কিন্তু কথা বলতে বলতেই তিনি অনুভব করলেন, রাহুল তাঁর কাঁধে মুখ গুঁজে হাসছে। তার চিবুকটা স্থির হয়েছে ইন্দিরার ঘাড় ও কলারবোনের ঠিক মাঝখানে। কোমরের বাঁধনটা আরও একটু শক্ত হলো, কোনো জোর খাটানো নয়, বরং এক সহজ অধিকারবোধে। ইন্দিরার শ্বাস থমকে গেল, তবে ভয়ের কারণে নয়, অন্য এক অনুভবে।

"ভাবিনি আজ তুমি এত তাড়াতাড়ি ফিরবে, মা," রাহুলের গলাটা শাড়ির কাপড়ে সামান্য চাপা, কিন্তু তাতে লেপ্টে আছে এক অদ্ভুত ওম আর খুনসুটি। "ভাবলাম তুমি বোধহয় এখনো ইউনিভার্সিটিতেই আছ। সুলতানি আমল নিয়ে অসম্ভব সব প্রশ্ন করে ছেলেপিলেদের জান কয়লা করছ।"

ইন্দিরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের হৃদস্পন্দন শান্ত করার চেষ্টা করলেন। কাউন্টারে হাতাটা নামিয়ে রেখে তিনি রাহুলের আলিঙ্গনের মধ্যেই সামান্য ঘুরলেন। মুখটা এতটাই কাছে যে, রাহুলের চোয়ালে সদ্য গজানো দাড়ি-গোঁফের হালকা ছায়া আর হাসার সময় চোখের কোণের ভাঁজগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। উনিশটা বছর পার হয়ে গেল! কবে যে এত বড় হয়ে গেল ছেলেটা? এই তো সেদিনের কথা মনে হয়, যখন কোলে তুলে নেওয়া যেত, গোলগাল নরম হাত দুটো দিয়ে মায়ের মুখ ছুঁয়ে দিত, আর ওর খিলখিল হাসি ঘরময় ছড়িয়ে পড়ত।

"আজ তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে গেছে," ইন্দিরা নিজের চিরচেনা গাম্ভীর্য কিছুটা ফিরিয়ে এনে বললেন। "অডিট মিটিং ছিল। আর রাহুল—" তিনি আলতো করে ছেলের হাত দুটো কোমর থেকে সরানোর চেষ্টা করলেন, যদিও পুরোপুরি জোর দিলেন না। "—একদম এসব করবি না। তোর বাবা এক্ষুনি চলে আসবে।"

বছরের পর বছর ধরে তিনি নিজের চারপাশে যে গণ্ডি টেনে রেখেছেন, এটা যেন তারই এক অবচেতন প্রতিক্রিয়া। সুব্রতর সামনে তিনি রাহুলের সাথে সবসময় একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব আর গাম্ভীর্য বজায় রাখেন—একজন অধ্যাপকের পরিমিত আচরণ। স্নেহ অবশ্যই আছে, তবে তা প্রকাশ পায় ছেলের রেজাল্টের প্রশংসায়, পিঠে আলতো চাপড় দেওয়ায়, কিংবা ওর পড়াশোনার ওপর কড়া নজরদারিতে। রান্নাঘরে এভাবে জড়িয়ে ধরা বা এই ধরণের ছেলেমানুষি শারীরিক নৈকট্য, যা রাহুল সবসময় একটু বেশিই পছন্দ করে, তা ইন্দিরার চেনা স্বভাবের একেবারে পরিপন্থী।

কিন্তু রাহুল বরাবরের মতোই নাছোড়বান্দা। পিছিয়ে যাওয়ার বদলে সে আরও একটু এগিয়ে এল, চিবুকটা মায়ের কাঁধে আরও শক্ত করে চেপে ধরে বলল, "আহা মা, একটু জড়িয়ে ধরেছি তো! সারাক্ষণ এত নিয়মকানুন মেনে চলতে হবে কেন? বাবা তো এখন নেই।"

ইন্দিরা চোখ কপালে তুললেন, যদিও রাহুল তা দেখতে পেল না। নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে একটা প্রশ্রয়ের হাসি ফুটে উঠল তাঁর। এই ছেলেটা—না, এই তরুণটি—সবসময় এমনই। একগুঁয়ে, স্নেহপরায়ণ, আর মায়ের এই নিয়মের বেড়াজাল ভাঙতে ওর বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই। ইন্দিরা মনে মনে স্বীকার করলেন, ছেলের এই রূপটাই তিনি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন, যদিও মুখে তা কোনোদিন উচ্চারণ করবেন না।

"তুই মাঝে মাঝে বড্ড বাড়াবাড়ি করিস, রাহুল," ইন্দিরার গলার শাসনটুকু সামান্য আলগা হয়ে এক প্রশ্রয়ের সুরে রূপ নিল।

তিনি আবার চুল্লির দিকে ফিরলেন, যেন কড়াইয়ের তরকারিটা পরীক্ষা করছেন, কিন্তু আসলে নিজেকে কিছুটা সামলে নেওয়ার জন্য সময় নিচ্ছিলেন। রাহুলের হাত দুটো তখনও আলগাভাবে তাঁর কোমর জড়িয়ে আছে, আর পিঠে ওর নিয়মিত শ্বাসপ্রশ্বাসের স্পন্দন টের পাচ্ছিলেন তিনি। এটা... মনঃসংযোগ নষ্ট করে ঠিকই, আবার একই সাথে এক গভীর স্বস্তিও দেয়। সমাজ বা বয়সের অঙ্কে এই আচরণ হয়তো বেমানান ঠেকতে পারে, কিন্তু ইন্দিরা এই মুহূর্তে তাকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার মতো কাঠিন্য দেখাতে পারলেন না। অন্তত এখনই নয়।

"কলেজ কেমন হলো?" তিনি স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করলেন। "আজ তোদের কেমিস্ট্রি প্র্যাক্টিকাল ছিল না?"

রাহুল মৃদু একটা গোঙানির মতো শব্দ করে মায়ের ওপর আরও একটু ভর দিয়ে দাঁড়াল। "হ্যাঁ, ভালোই। তবে বড্ড একঘেয়ে। টানা দু-ঘণ্টা ধরে শুধু টাইট্রেশন করতে হলো। মনে হচ্ছে এখন ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও ওটা নিখুঁত করে দিতে পারব।"

"হুম," ইন্দিরা সংক্ষেপে বললেন। তরকারিটা নাড়তে নাড়তে দেখলেন ঘন ঝোলটা ফুটছে। "তার মানে প্রস্তুতি ঠিকঠাক। আর সেমিস্টার তো শুক্রবার থেকে, তাই না? প্রিপারেশন কমপ্লিট?"

"মা," রাহুল শব্দটাকে একটু টেনে উচ্চারণ করল, যেন মায়ের এই প্রশ্নটা নেহাতই অপ্রয়োজনীয়। "আমি কত সপ্তাহ ধরে রেডি হয়ে আছি বলো তো! তুমি কি আর আমায় ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ রেখেছ?"

"আত্মবিশ্বাস ভালো, কিন্তু ওভার-কনফিডেন্স ভালো নয়। বিশেষ করে যখন এমসিকিউ থাকবে। একটা সিলি মিসটেক আর—"

"জানি গো জানি," রাহুল মাঝপথেই মাকে থামিয়ে দিল, গলায় স্পষ্ট হাসির আভাস। "তুমি একশো বার বলেছ। প্রশ্ন মন দিয়ে পড়বে। তাড়াহুড়ো করবে না। খাতা জমা দেওয়ার আগে রিভাইজ করবে।"

"তাহলে আমাকে বারবার একই কথা বলতে হয় কেন?" ইন্দিরা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন।

"কারণ তুমি একজন প্রফেসর," রাহুল সহজ গলায় বলল। "একই কথা বারবার বলা তো তোমাদের রক্তে।"

নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও ইন্দিরা হেসে ফেললেন। পেছনে হাত বাড়িয়ে রাহুলের বাহুতে হালকা একটা চড় কষালেন, যদিও তাতে কোনো জোর ছিল না।

"পাকা ছেলে কোথাকার!" তিনি মাথা নেড়ে বললেন।

"তা হতে পারি," রাহুল বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত না হয়ে বলল। "কিন্তু তুমি তো তাও আমাকে ভালোবাসো।"

'বাসি,' ইন্দিরা ভাবলেন, আর এই অনুভূতিটা এক গভীর সত্যের মতো তাঁর মন ছুঁয়ে গেল। 'হয়তো প্রয়োজনের চেয়ে একটু বেশিই বাসি।'

কয়েক মুহূর্ত দুজনে শান্ত নীরবতায় দাঁড়িয়ে রইল। রান্নাঘরটি রান্নার শব্দ আর সুবাসে ম ম করছে। ইন্দিরা তরকারিতে এক চিমটে গরম মশলা ছড়িয়ে দিয়ে কড়াইটা ঢাকা দিলেন, আঁচটা একদম নিভিয়ে দিলেন। রাহুলের হাত দুটো তখনও তাঁর কোমর জড়িয়ে। তিনি নিজেকে বোঝালেন, এইটুকু সময় ওকে দেওয়াই যায়। একটু পরেই তো ও নিজে থেকেই বোর হয়ে পড়তে চলে যাবে।

কিন্তু তার বদলে, রাহুল একটু নড়েচড়ল। মায়ের কোমর পেঁচিয়ে থাকা হাত দুটো আরেকটু শক্ত হলো, চিবুকটা কাঁধ থেকে তুলে নিল সে।

"মা," ওর গলায় এবার সেই অতিপরিচিত আবদারের সুর, যা ইন্দিরা খুব ভালো করেই চেনেন। "তোমার তো রান্না শেষ... আর বাবা ফিরতেও আরও অন্তত আধঘণ্টা দেরি... আমরা কি একটু আমার ঘরে যেতে পারি? অল্প সময়ের জন্য?"

ইন্দিরার শরীরটা সামান্য শক্ত হয়ে গেল, কাউন্টারের ওপর তাঁর হাত দুটো স্থির। "তোর ঘরে যাব?" তিনি প্রতিধ্বনি করলেন, গলার স্বর সাবধানে নিরপেক্ষ রেখে। "ঠিক কী কারণে, জানতে পারি?"

"এই... একটু... বুঝতেই তো পারছ। একটু শোব। দুজনে একটু গল্প করব, একটু জড়িয়ে ধরে থাকা আর কী।"

শব্দটা বাতাসে যেন ঝুলে রইল—একই সাথে অদ্ভুত, নিষ্পাপ এবং কোথাও একটা অস্বস্তির আলোড়ন তোলা। ইন্দিরা এবার রাহুলের বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে পুরোপুরি মুক্ত করে ওর মুখোমুখি দাঁড়ালেন। বুকের ওপর হাত দুটো আড়াআড়িভাবে বেঁধে ছেলের দিকে সেই কড়া দৃষ্টিতে তাকালেন, যা তিনি সাধারণত ফাঁকিবাজ স্টুডেন্টদের দিকে হানেন।

"জড়িয়ে ধরে থাকা!" তিনি সোজাসুজি বললেন। "তুই চাস আমি তোর সাথে গিয়ে এখন ওইসব করি? ধেড়ে ছেলে!"

রাহুল কিছুটা অপ্রস্তুত হলো, কিন্তু চোখে তখনো আশার আলো। "মানে... হ্যাঁ? কলেজে আজ খুব ধকল গেছে। তোমারও নিশ্চয়ই মিটিংয়ে ক্লান্তি লেগেছে। আমরা দুজনে একটু... রিল্যাক্স করতে পারি। বাবা আসার আগে।"

ইন্দিরা ক্ষণিকের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন। ছেলের এই দাবির দুঃসাহস দেখে মনে মনে তিনি চমৎকৃত না হয়ে পারলেন না। মুখ খুললেন, আবার বন্ধ করলেন।

"রাহুল," তিনি এমন এক সুরে ধীরে ধীরে বললেন, যেন কোনো আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ছাত্রকে জটিল থিয়োরি বোঝাচ্ছেন, "তোর বয়স উনিশ বছর। তুই আর কচি খোকা নোস। এই বয়সে কোনো ছেলে মায়ের সাথে ওভাবে শুয়ে গল্প করে না। এটা অদ্ভুত।"

"একদম অদ্ভুত নয়," রাহুল আন্তরিকভাবে প্রতিবাদ জানাল। "ভালোবাসলে এসব কোনো ব্যাপারই নয়। আর তুমি সবসময় এত নিয়ম মেনে চলো কেন মা? আমরা যখন একা থাকি, তখনও। আমরা কি নিজেদের মধ্যে একটু সহজ হতে পারি না?"

ওর গলায় এমন একটা আকুতি ছিল—এক নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ—যা ইন্দিরার দীর্ঘদিনের কঠিন প্রতিজ্ঞাকে এক নিমেষে টলিয়ে দিল। তিনি ছেলের মুখের দিকে তাকালেন; ওর চোয়ালের দৃঢ়তা আর চোখের সেই আশার আলোটা খুঁটিয়ে দেখলেন। এই বয়সে ও দেখতে ঠিক সুব্রতর মতোই হয়েছে, কিন্তু ওর মধ্যে ইন্দিরার নিজেরও একটা অংশ রয়ে গেছে—সেই একগুঁয়ে জেদ, কোনো কিছুতেই 'না' মেনে না নেওয়ার প্রবৃত্তি।

"সব পাগলামি," তিনি নিজের মনেই বিড়বিড় করলেন, রাহুলের উদ্দেশ্যে নয়। "একেবারে পাগলামি।"

"তার মানে তুমি রাজি?" রাহুলের মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

"আমি একদমই—" ইন্দিরা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু রাহুল ততক্ষণে তাঁর হাত ধরে ফেলেছে, ওর আঙুলগুলো মায়ের হাতের ওপর উষ্ণ ও দৃঢ়।

"আসো না মা," ও আলতো করে টানল। "মাত্র কুড়ি মিনিট। প্রমিস করছি, রাতে এটার উশুল তুলতে আরও বেশি সময় ধরে পড়াশোনা করব।"

ইন্দিরা একটা দীর্ঘ, ক্লান্ত শ্বাস ফেললেন, যা যেন তাঁর আত্মার গভীর থেকে উঠে এল। তিনি প্রথমে তাঁদের জোড়া হাতের দিকে তাকালেন, তারপর আবার ছেলের মুখের দিকে। তাঁর মস্তিষ্কের যৌক্তিক অংশটা—যে অংশটার জোরে তিনি ডক্টরেট করেছেন, অ্যাকাডেমিক মহলে দাপটের সাথে ঘুরে বেড়ান—চিৎকার করে বলছিল যে এটা অনুচিত, নিজের গণ্ডি বজায় রাখা উচিত, ওকে এখনই পড়তে পাঠিয়ে নিজের কাজে মন দেওয়া উচিত।

কিন্তু তাঁর ভেতরের অন্য এক সত্তা, যা অনেক শান্ত কিন্তু ততটাই তীব্র, ফিসফিসিয়ে বলল: 'এতে ক্ষতি কী? ও তো তোরই ছেলে। তোকে ভালোবাসে। আর তুই... তুইও তো ওকে ভালোবাসিস। সবকিছুর চেয়ে বেশি।'

"ঠিক আছে," তিনি শেষে মেনেই নিলেন, যদিও পরক্ষণেই মনে হলো কথাটি ফিরিয়ে নিলে ভালো হতো। "তবে শুধু তোর বাবা আসা পর্যন্ত। যেই মুহূর্তে গ্যারেজে গাড়ির আওয়াজ পাব, ব্যস, ওখানেই শেষ। মনে থাকবে?"

রাহুলের মুখে এমন এক চওড়া আর আন্তরিক হাসি ফুটে উঠল যে ইন্দিরার বুকের ভেতরটা কেমন যেন এক অদ্ভুত সুখে সংকুচিত হয়ে গেল। "একদম মনে থাকবে," ও দ্রুত বলল, ততক্ষণে মাকে করিডোরের দিকে টানতে শুরু করেছে। "থ্যাঙ্ক ইউ মা। ইউ আর দ্য বেস্ট।"

"আমি একটা আস্ত বোকা," ইন্দিরা নিজেকে ছেলের টানে সঁপে দিয়ে হাসলেন। "আর তুই, তুই জাস্ট একটা বাঁদর।"

"জানি তো," রাহুল ঘাড় ঘুরিয়ে চমৎকার হেসে বলল। "কিন্তু তুমি তো তাও আমাকে ভালোবাসো।"

'বাসি,' ইন্দিরা আবার ভাবলেন, এবং করিডোর ধরে ছেলের ঘরের দিকে ওর পিছু পিছু হাঁটতে লাগলেন। 'ঈশ্বর জানেন, আমি বাসি।'
Reply
#2

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: একটি শর্তের রূপরেখা

রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে করিডোর ধরে রাহুলের ঘরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে ইন্দিরার মনে হলো, তিনি যেন তাঁর পরিচিত পৃথিবীর খুব চেনা কোনো নিয়ম ভাঙতে চলেছেন। মাত্র কুড়ি মিনিটের ব্যাপার, তবু বুকের ভেতর একটা অচেনা ধুকপুকানি। সুব্রতর তৈরি করা এই বাড়ির অদৃশ্য, কঠোর নিয়মের বেড়াজাল ডিঙিয়ে ছেলের সাথে এইটুকু সময় কাটানো যেন এক গোপন বিদ্রোহ।

রাহুলের ঘরটা ঠিক তেমনই গোছানো, যেমনটা ইন্দিরা সপ্তাহ দুয়েক আগে দেখেছিলেন। এতদিন ছেলের ঘরে উঁকি না দেওয়ার সামান্য একটা অপরাধবোধ তাঁর মন ছুঁয়ে গেল। জানলার হালকা পর্দা ফুঁড়ে আসা বিকেলের রোদ কাঠের মেঝেতে নরম, তির্যক আলপনা এঁকেছে। ঘরের একদিকের দেওয়ালে ওর পড়ার টেবিল; সেখানে ছড়ানো-ছেটানো খাতা, কলম আর পাঠ্যবইয়ের মাঝেও এক ধরনের সুশৃঙ্খল বিশৃঙ্খলা রয়েছে। কেমিস্ট্রি ম্যানুয়ালের ঠিক পাশেই মুঘল স্থাপত্যের ওপর ইন্দিরার নিজের লেখা বইটার খোলা পাতা দেখে তাঁর বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত ওমে ভরে উঠল।

তাঁরা একসাথে ঘরে ঢুকতেই ইন্দিরা নিজের ভেতরের অস্বস্তিটা ঢাকার জন্য তাঁর চেনা মাতৃসুলভ কঠোরতার বর্মটা আবার পরে নিলেন। "ঘর তো দেখছি বেশ পরিষ্কার," চারপাশটা খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে তিনি গলাটা ইচ্ছে করেই একটু হালকা, অথচ কর্তৃত্বপূর্ণ রাখলেন। "আমি তো ভাবছিলাম তোর টেবিলের ধুলো নিয়ে আজ একপ্রস্ত লেকচার দেব।"

"কাল রাতেই গুছিয়েছি," রাহুল মায়ের হাত ছেড়ে বিছানার দিকে ইশারা করে একটু চোরের মতো হাসল। "জানতাম, অগোছালো রাখলে তোমার স্ক্যানার-চোখ ঠিক ধরে ফেলবে।"

"ধরা তো উচিত," ইন্দিরা বিড়বিড় করলেন, ঠোঁটের কোণের হাসিটা আর লুকাতে পারলেন না।

ঘরের ঠিক মাঝখানে একটা সাধারণ ডাবল বেড। ধবধবে সাদা চাদরের ওপর গাঢ় নীল রঙের বেডকভারটা ইন্দিরা নিজেই পছন্দ করে কিনেছিলেন। পড়ন্ত রোদের আলোয় বিছানাটাকে আজ বড্ড বেশি আরামদায়ক আর আমন্ত্রণকারী মনে হচ্ছে। বিছানার পাশে এসে তিনি ক্ষণিকের জন্য থমকে দাঁড়ালেন, এক অদ্ভুত দ্বিধা গ্রাস করল তাঁকে। আস্ত একটা পাগলামি! তিনি একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসাঁইটে অধ্যাপক, একজন মা—অথচ নিজের ছেলের বিছানায় বসতে গিয়ে একজন নার্ভাস আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ছাত্রীর মতো ইতস্তত করছেন!

'নিজেকে সামলাও, ইন্দিরা,' তিনি মনে মনে নিজেকে ধমক দিলেন। 'মাত্র তো কুড়ি মিনিট। একটু জিরিয়ে নেওয়া আর কী।'

যতটা সম্ভব নিজের রাশভারী আভিজাত্য বজায় রেখে ইন্দিরা বিছানায় বসলেন, তারপর পা দুটো সোজা ছড়িয়ে দিয়ে বালিশে হেলান দিলেন। মেরুদণ্ডটা এমন টানটান রাখলেন যেন কোনো ফ্যাকাল্টি মিটিংয়ে বসেছেন, ছেলের সাথে গল্প করতে নয়। হাতের তালুর নিচে বেডকভারের নরম স্পর্শ পাচ্ছিলেন; পরিস্থিতির এই অদ্ভুত অস্বস্তি থেকে মন সরাতে তিনি কাপড়ের বুননটা অনুভব করার চেষ্টা করতে লাগলেন।

রাহুল ওঁর পাশে উঠে এসে কাত হয়ে শুলো, যাতে মায়ের মুখের দিকে তাকানো যায়। সে প্রথমেই খুব কাছে ঘেঁষে এল না; সম্ভবত বুঝতে পারছিল মায়ের এই পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে একটু সময় লাগবে। এক হাতের ওপর ভর দিয়ে সে কেবল মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, কালো চোখ দুটোতে এক গভীর প্রশ্রয়।

"তোমাকে খুব আড়ষ্ট দেখাচ্ছে মা," রাহুল মৃদু হেসে বলল। "তুমি তো এখানে রিল্যাক্স করতে এসেছ।"

"আমি যথেষ্ট রিল্যাক্সড," ইন্দিরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে উত্তর দিলেন, যদিও নিজের গলার স্বরের জড়তা তাঁর নিজের কানেই ঠেকল। গলাটা একটু পরিষ্কার করে নিয়ে তিনি সচেতনভাবেই কাঁধ দুটো আলগা করলেন। "আমি একদম ঠিক আছি।"

"তুমি এমনভাবে বসে আছ যেন এক্ষুনি কোনো সেমিনারে পেপার প্রেজেন্ট করবে," রাহুল ঠোঁট টিপে হাসল। "আহা মা, একটু ঠিকঠাক হয়ে শোও না।"

ইন্দিরা এমন এক দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকালেন যা দেখলে তাঁর পিএইচডি-র ছাত্ররা ভয়ে কুঁকড়ে যেত, কিন্তু রাহুল বিন্দুমাত্র না দমে কেবল হাসল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে—যার মধ্যে বিরক্তি আর আত্মসমর্পণ দুই-ই মিশে ছিল—ইন্দিরা নিজের অবস্থান পাল্টালেন। তিনি একটু হেলে শুয়ে বালিশে মাথা রাখলেন। সিলিংয়ের এক কোণে একটা ছোট ফাটল ছাড়া বাকিটা ধবধবে সাদা।

"এবার ঠিক আছে?" তিনি শুকনো গলায় জিজ্ঞেস করলেন।

"হুম, অনেক বেটার," রাহুল বলল। এবং ইন্দিরা কিছু বলার আগেই সে আরও কাছে সরে এসে মায়ের পাশে লেপ্টে গেল, মাথাটা রাখল তাঁর কাঁধে। একটা হাত খুব সহজ ও চেনা অধিকারে জড়িয়ে ধরল মায়ের কোমর, যেন এটাই ওদের প্রতিদিনের অভ্যাস।

ইন্দিরা মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন, শ্বাস আটকে গেল বুকের ভেতর। তাঁর শরীরের সাথে লেপ্টে থাকা ছেলের এই শরীরের ভর—উষ্ণ, সুগঠিত এবং কোথাও যেন বড্ড অচেনা। ছেলেটা কবে এত বড় হয়ে গেল? শাড়ির ওপর দিয়ে ওর গায়ের ওম এসে লাগছিল, আর নিজের হৃদস্পন্দনের শব্দটা ইন্দিরার নিজের কানেই খুব স্পষ্ট হয়ে বাজছিল।

"রাহুল," ইন্দিরা কিছুটা খসখসে গলায় বলতে চাইলেন, "এটা কিন্তু—"

"খুব আরামের," রাহুল মায়ের কাঁধেই মুখ গুঁজে কথা শেষ করল। "খুব শান্তির। একটু শান্ত হও না মা, প্লিজ?"

ইন্দিরা চোখ বন্ধ করলেন, নিজেকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করলেন। ধীরে ধীরে, একটু একটু করে তাঁর পেশির জড়তা কাটতে শুরু করল। যে হাতটা এতক্ষণ শূন্যে ইতস্তত করছিল, তা অবশেষে রাহুলের পিঠের ওপর আলতো করে থিতু হলো। মনে মনে স্বীকার করলেন, অনুভূতিটা... মোটেও খারাপ নয়। এই ওম, এই সান্নিধ্য—শেষ কবে তিনি নিজেকে এই পরম তৃপ্তিটুকু নেওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন? সুব্রতর সাথে তাঁর সম্পর্ক তো বহু বছর আগেই একটা হিমশীতল অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সেখানে কোনো উত্তাপ নেই, আছে শুধু রুটিন আর দায়িত্ব। এই মুহূর্তে রাহুলের এই নিষ্পাপ, উষ্ণ সান্নিধ্য তাঁর ভেতরের কোনো এক গভীর, অবদমিত তৃষ্ণাকে যেন শান্ত করছিল।

কিন্তু পুরনো অভ্যাস সহজে যায় না। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর মনে হলো এই নীরবতাকে কোনো দরকারি আলোচনা দিয়ে পূরণ করা দরকার।

"তা," তিনি নিজের চেম্বারে ছাত্রদের সাথে কথা বলার মতো চটপটে গলায় বললেন, "শুক্রবার তো তোর সেমিস্টারের শেষ পরীক্ষা। মানে হাতে আর মোটে তিন দিন। আমি যে প্র্যাক্টিস পেপারগুলো দিয়েছিলাম, শেষ করেছিস?"

পিঠে রাহুলের মৃদু হাসির কম্পন টের পেলেন ইন্দিরা। "হ্যাঁ মা। সব কটা শেষ। দু-বার রিভিশনও হয়ে গেছে।"

"গুড। আর অর্গানিক কেমিস্ট্রির মেকানিজমগুলো?"

"ওগুলো এখন জলভাত," রাহুল আশ্বস্ত করল। "কাল টানা চার ঘণ্টা শুধু ওটাই প্র্যাক্টিস করেছি।"

"চার ঘণ্টা ভালো, কিন্তু কন্টিনিউটি রাখতে হবে," ইন্দিরা নিজের চেনা ছকে ঢুকে গিয়ে বলতে লাগলেন। "এমসিকিউ-তে ভালো করার আসল চাবিকাঠি হলো প্যাটার্ন চেনা, যার জন্য—"

"মা," রাহুল মৃদু হেসে মাঝপথেই থামিয়ে দিল তাঁকে। "আমরা এখানে একটু গল্প করতে আর জড়িয়ে ধরে শুতে এসেছি, পড়াশোনার লেকচার শুনতে নয়।"

ইন্দিরা চোখের পলক ফেললেন, সাময়িকভাবে খেই হারিয়ে। "আমি... হ্যাঁ। ঠিকই তো।"

"আমি জানি," রাহুল বলল, গলায় তখন প্রশ্রয়ের হাসি। "তুমি নিজেকে আটকাতে পারো না। তোমার এই স্বভাবটাই আমার সবচেয়ে কিউট লাগে।"

ছেলের কথায় ইন্দিরার গাল দুটো কেমন যেন সামান্য গরম হয়ে উঠল। তিনি গলা খাঁকারি দিয়ে তাঁদের মধ্যকার সেই শিক্ষক-ছাত্রের ব্যালেন্সটা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু তার আগেই রাহুল ওঁর কোমরের বাঁধনটা আরেকটু শক্ত করে নিল।

"মা," ওর গলার স্বর এবার একটু চিন্তিত, একটু দ্বিধাগ্রস্ত শোনাল। "আমি একটা কথা ভাবছিলাম..."

"ভাবাটা তোর স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর," ইন্দিরা ঠাট্টার সুরে বললেন, তবে তাতে কোনো কঠোরতা ছিল না।

"আমি সিরিয়াস," রাহুল বলল। "আমি ভাবছিলাম... এই যে আমরা এভাবে আছি, বেশ ভালো লাগছে, তাই না?"

রাহুলের পিঠে ইন্দিরার হাতটা স্থির হয়ে গেল। "রাহুল—"

"উফ, শোনো না আগে পুরোটা," রাহুল বলল। ওর গলার স্বরটা হঠাৎ করেই খুব গভীর হয়ে গেল। "আমি ভাবছিলাম... শুক্রবার বিকেল পাঁচটায় তো আমার পরীক্ষা শেষ। আর বাবা সেদিন সন্ধেবেলাই তো বিজনেস ট্রিপে যাচ্ছে, তাই না? ওই সাড়ে ছটা নাগাদ?"

"হ্যাঁ," ইন্দিরা ধীরে ধীরে বললেন, ও কোন দিকে এগোচ্ছে বুঝতে না পেরে। "চার দিনের জন্য বাইরে যাচ্ছে। সিঙ্গাপুরে কনফারেন্স আছে।"

"ঠিক। তাহলে..." রাহুল থামল, ইন্দিরা ওর শরীরের টানটান ভাবটা অনুভব করতে পারছিলেন, যেন ও নিজের সমস্ত সাহস সঞ্চয় করছে। "বাবা চলে যাওয়ার পর... ঘর যখন ফাঁকা থাকবে... আমরা কি এটা আবার করতে পারি? তবে একটু বেশি সময়ের জন্য? মানে... সারা রাত?"

কয়েক মুহূর্তের জন্য ইন্দিরার মনে হলো তিনি বোধহয় ভুল শুনেছেন। মাথাটা সামান্য ঘুরিয়ে ওর মুখটা দেখার চেষ্টা করলেন, কিন্তু রাহুল ওঁর কাঁধে মুখ লুকিয়ে নিজেকে আড়াল করে রেখেছে।

"সারা রাত!" তিনি সোজাসুজি প্রতিধ্বনি করলেন। তাঁর কণ্ঠস্বরে বিস্ময় আর কঠোরতার এক অদ্ভুত মিশ্রণ। "কী বলছিস যা তা? তুই চাস আমি সারা রাত তোর সাথে এভাবে শুয়ে কাটাই?"

"হ্যাঁ," রাহুল মুখ না তুলেই দৃঢ় গলায় বলল। "শুধু... তুমি আর আমি। কোনো বাধা থাকবে না। বাবার হঠাৎ চলে আসার টেনশন থাকবে না। আমরা শুধু... একসাথে থাকব।"

ইন্দিরা সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন, তাঁর মাথা তখন কাজ করছে না। এই দাবির দুঃসাহস দেখে তিনি স্তম্ভিত। মুখ খুললেন ওকে কড়া ভাষায় ধমক দেওয়ার জন্য।

কিন্তু তাঁর মুখ থেকে বেরোলো: "আস্ত একটা পাগল তুই!"

রাহুলের শরীরটা শক্ত হয়ে গেল, তবে সে সরে গেল না। "পাগলামির কী আছে এতে?"

"কী আছে মানে—" ইন্দিরা ক্ষণিকের জন্য নির্বাক। তিনি কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে নিজেকে একটু তুললেন, রাহুলের মাথাটা কাঁধ থেকে সরিয়ে ওর চোখের দিকে তাকালেন। "রাহুল, তোর বয়স উনিশ বছর। তুই আর ছোট বাচ্চা নোস। তোর কি সত্যিই মনে হয় যে একটা উনিশ বছরের ধেড়ে ছেলের সাথে জড়িয়ে ধরে থাকা ছাড়া আমার আর কোনো কাজ নেই?"

রাহুল সোজা মায়ের চোখের দিকে তাকাল। সেখানে পিছু হঠার কোনো লক্ষণ নেই। "তোমার খাতা দেখার কাজ আছে, জানি। রিসার্চের কাজ আছে। কিন্তু মা... ওগুলো কি একটা রাতের জন্য পজ করা যায় না? আমি তো রোজ রোজ এই আবদার করছি না।"

"সেটা আসল কথা নয়," ইন্দিরা বললেন, নিজের ভেতরের প্রবল মানসিক দ্বন্দ্বটাকে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। "আসল কথা হলো এটা... এটা অনুচিত।"

"অনুচিত কেন?" রাহুল শান্তভাবে পাল্টা প্রশ্ন করল। "এটা কি ভালোবাসা নয়? নিজের ছেলের সাথে সময় কাটানো কি ভুল?"

"তুই খুব ভালো করেই জানিস আমি কী বলতে চাইছি।" তিনি ছেলের থেকে চোখ সরিয়ে বুকশেলফটার দিকে তাকালেন। "এটা... স্বাভাবিক নয়। কোনো মা তাঁর এত বড় ছেলের সাথে এমন করে না।"

"কেন করে না মা?" রাহুল এবার একটু মরিয়া হয়ে উঠল। ওর কণ্ঠস্বরে এক অদ্ভুত আর্তি। "মা, আমি তো কোনো অন্যায় আবদার করছি না। তুমি সারাদিন ইউনিভার্সিটির কাজে ব্যস্ত থাকো। বাবা যখন থাকে, তুমি কেমন যেন গুটিয়ে থাকো, একটা খোলসের ভেতর ঢুকে যাও। আমার চেনা মা-টাকে আমি তখন পাই না। আমি শুধু একটু তোমার কাছে থাকতে চাই। এতে কি খুব অপরাধ?"

ছেলের এই কথাগুলো ইন্দিরার বুকে তীরের মতো বিঁধল। তাঁর সমস্ত যুক্তি, সমাজের সমস্ত নিয়মকানুন যেন এক নিমেষে অর্থহীন হয়ে গেল।

'কী ভাবছিস তুই, ইন্দিরা?' ওঁর ভেতরের একটা মন চিৎকার করে উঠল। 'এ কীরকম অদ্ভুত আবদার... এসব তোকে মানায়? তুই ইন্দিরা সেন, প্রফেসর ইন্দিরা সেন... তোর একটা ইমেজ রয়েছে। নিজের ছেলের সাথে এইভাবে সারা রাত কাটানো... এটা তো চরম পাগলামি!'

কিন্তু অন্য একটা মন ফিসফিসিয়ে বলল: 'ক্ষতি কী? ও তো তোরই ছেলে। আর এই বাড়িটায় তুই কতটা একা, সেটা তুই ছাড়া আর কে জানে? এইটুকু ভালোবাসা কি তোর নিজেরও দরকার নেই? তুইও তো তোর ছেলেটাকে কাছে পাস না। সারাক্ষণ নিজের কাজে আর বইয়ে মুখ গুঁজে থাকিস। সুব্রতর সামনে নিজের ছেলেকে একবার জড়িয়ে পর্যন্ত ধরিস না, তোর এই সফিস্টিকেটেড ইমেজের জন্য। ছেলেটা তো একটু ভালোবাসা চাইছে, আর তুইও তো ভেতরে ভেতরে এটাই চাস!'

তবু, তিনি নিজেকে এত সহজে ভাঙতে দিতে পারলেন না। "রাহুল, আবেগ দিয়ে সবকিছু বিচার হয় না। তুই বড় হচ্ছিস, তোর নিজস্ব একটা জগৎ থাকা উচিত। মাকে এভাবে আঁকড়ে ধরে থাকাটা—"

"এটা আমাকে সাংঘাতিক মোটিভেট করবে মা," রাহুল এবার অন্য পথ ধরল, ওর গলায় এক নতুন আত্মবিশ্বাস। "তুমি ভেবে দেখো। আমি যদি জানি যে শুক্রবার পরীক্ষা শেষের পর আমার জন্য এমন একটা স্পেশাল সময় ওয়েট করছে... যে পরীক্ষা শেষ হলেই আমি সারা রাত তোমায় পাব... তাহলে আমার পড়ার স্পিড আর জেদ দুটোই দশগুণ বেড়ে যাবে।"

"পড়াশোনার মোটিভেশন ভেতর থেকে আসা উচিত," ইন্দিরা অবলীলায় তাঁর শিক্ষকসুলভ চেনা বুলি আউড়ে গেলেন, যদিও তাঁর গলার জোর আগের চেয়ে অনেক কমে এসেছে। "কোনো... রিওয়ার্ডের লোভ থেকে নয়।"

"কিন্তু রিওয়ার্ড তো কাজ করে," রাহুল নাছোড়বান্দা। "তুমি নিজেই তো ক্লাসে লেকচার দাও—ইনসেনটিভ স্ট্রাকচার, পজিটিভ রিইনফোর্সমেন্ট নিয়ে! তাহলে আমার ক্ষেত্রে সেটা অ্যাপ্লাই করতে দোষ কী?"

ইন্দিরা চোখ খুলে ওকে কড়া চোখে দেখলেন। "আমি পেডাগজিক্যাল থিওরি নিয়ে লেকচার দিই, ছাত্রদের মাকে জড়িয়ে ধরার টোপ দেওয়া শেখাই না। ফাজিল ছেলে!"

"এটা টোপ নয় মা," রাহুল এবার মায়ের একটা হাত নিজের দুহাতের মুঠোয় নিয়ে নিল। ওর গলার স্বর একেবারে নরম, খাদে নামানো। "অন্য ছেলেদের মতো দামি বাইক, নতুন আইফোন বা বিদেশ ঘোরার শখ আমার নেই। তুমি আমাকে ওসব দিলেও আমি খুশি হবো না। আমি শুধু তোমাকে চাই। তোমার সময়। কারণ আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি।"

ইন্দিরা অন্যদিকে তাকিয়ে ভাবুক মুখ করে বসে রইলেন। রাহুল কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলো, "কী হল মা, কী ভাবছো?"    

"আমি ভাবছি..." ইন্দিরা ধীরে ধীরে, মেপে মেপে বলতে শুরু করলেন। তিনি রাহুলের দিকে তাকালেন, তার চোখের আশার আলো আর চোয়ালের হালকা চাপটুকু লক্ষ করলেন। "আমি ভাবছি যে এটা একটা জঘন্য আইডিয়া।"

রাহুলের মুখটা মুহূর্তে চুপসে গেল। ওর মুঠোটা সামান্য আলগা হয়ে এল, আর চোখ থেকে আশার আলোটা নিভে গিয়ে সেখানে একটা জমাট বাঁধা হতাশা নামল। অভিমানে ও অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল, ঠোঁট দুটো একটু ফুলে উঠেছে।

ইন্দিরা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তাঁর দৃষ্টি রাহুলের মুখ থেকে সরে গিয়ে পড়ল টেবিলের ওপর। সেখানে কেমিস্ট্রি ম্যানুয়ালের ঠিক পাশেই অর্ধেক খোলা অবস্থায় পড়ে আছে মুঘল স্থাপত্যের ওপর তাঁর নিজের লেখা বইটা। একটা সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ডের ছেলে, যার তিন দিন পর ফাইনাল পরীক্ষা, সে কিনা ইতিহাস আর স্থাপত্যের মতো একটা নিরস বিষয়ের বই পড়ছে? কেন? উত্তরটা বড্ড সোজা। কারণ বইটা তাঁর লেখা। ওর মায়ের লেখা। শুধু মায়ের কাছাকাছি থাকার জন্য, মাকে একটু বোঝার জন্য ছেলেটা নিজের পড়ার ফাঁকেও এই বইটা নিয়ে বসে।

এই ছোট্ট উপলব্ধিটা ইন্দিরার ভেতরের সমস্ত কাঠিন্যকে মোমের মতো গলিয়ে দিল। তিনি একটা নকল বিরক্তির ভান করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

"উফ্, এই ছেলেটাকে নিয়ে যে আমি কী করি!" তিনি কপট রাগে বললেন। "সবসময় নিজের জেদ বজায় রাখা চাই। আচ্ছা বাবা, শুনছি তোর কথা। তবে..."

রাহুল এক ঝটকায় আবার মায়ের দিকে তাকাল।

"...তবে তুই যদি তোর শুক্রবারের শেষ পরীক্ষায় একটা ফাটাফাটি রেজাল্ট করতে পারিস, তাহলেই আমি ভেবে দেখতে পারি।"

রাহুলের মুখটা এক নিমেষে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। "ফাটাফাটি মানে? কেমন রেজাল্ট মা?"

ইন্দিরা একটা ভ্রু তুললেন, ঠোঁটে এক চিমটে চ্যালেঞ্জিং হাসি। "পরীক্ষায় নব্বই শতাংশের ওপর নম্বর পেতে হবে। কোনো এক্সকিউজ শুনব না কিন্তু। তুই যদি প্রমাণ করতে পারিস যে তুই পড়াশোনা নিয়ে সিরিয়াস, তাহলে হয়তো আমি শুক্রবারের রাতটা তোর সাথে কাটাব।"

"নব্বইয়ের ওপর?" রাহুলের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। "এটা তো... এটা তো বড্ড উঁচুতে বেঁধে দিলে মা!"

"উঁচুতেই তো বাঁধার কথা," ইন্দিরা সংক্ষেপে বললেন। "এটাকে একটা ইনসেনটিভ হিসেবে ধরে নে। তুই চাস আমি সারা রাত তোর সাথে থাকি? তাহলে সেটা তোকে অর্জন করতে হবে।"

তিনি দেখলেন রাহুল মনে মনে হিসাবটা কষছে, তার বিস্ময় কেটে গিয়ে সেখানে একটা তীব্র উত্তেজনা দানা বাঁধছে। তার চোখ দুটো চকচক করে উঠল, মুখে এক চওড়া হাসি।

"তাহলে আমি যদি নব্বইয়ের ওপর পাই," ও ধীরে ধীরে বলল, শব্দগুলোর স্বাদ যেন জিভ দিয়ে চেখে দেখছে, "তাহলে আমি তোমাকে পাচ্ছি। সারা রাতের জন্য।"

"এটা কীরকম কথা বলার ছিরি রাহুল? অসভ্য ছেলে!" ইন্দিরা চোখ পাকিয়ে ধমক দিলেন।

রাহুল একটু ঘাবড়ে গিয়ে মায়ের দিকে তাকাল, ওর চোখে স্পষ্ট বিভ্রান্তি। বুঝতে পারল না সে কী এমন ভুল বলেছে।

ছেলের এই অপ্রস্তুত মুখটা দেখে ইন্দিরার রাগটা মুহূর্তে জল হয়ে গেল। ও হয়তো অতো ভেবেচিন্তে বলেনি। তবে ওর কথার ধরনে ইন্দিরার গাল দুটো আবার সামান্য গরম হয়ে উঠেছিল। তিনি একটু শান্ত হয়ে বললেন, "ইয়ে মানে...হ্যাঁ, তুই যেটা বললি ওটাই।"

"এটা তো একদম বার্টার সিস্টেম," রাহুল উৎসাহিত হয়ে বলল। "আমি তোমাকে আমার পরিশ্রম আর সাকসেস দেব... আর তুমি আমাকে দেবে... তোমাকে।"

"তুই তো দেখছি আমাকে একটা কেনাবেচার জিনিস বানিয়ে দিচ্ছিস," ইন্দিরা কৃত্রিম আপত্তি জানালেন, যদিও ঠোঁটের কোণের হাসিটা চেপে রাখতে পারলেন গুরুগম্ভীর থাকতে পারলেন না। "যেন কোনো প্রোডাক্ট!"

"প্রোডাক্ট নয়," রাহুল দ্রুত শুধরে নিল। "যা নিজের যোগ্যতা দিয়ে অর্জন করা যায়, এমন একটা প্রাইজ। দুটোর মধ্যে তফাত আছে। আর তুমি কোনো জিনিস নও মা। তুমি... তুমি হলে আমার প্রাইজ। এই পৃথিবীর সবচেয়ে দামি জিনিস।"

ওর গলার আন্তরিকতা ইন্দিরার সমস্ত আত্মরক্ষার দেওয়ালকে এক নিমেষে গুঁড়িয়ে দিল। তিনি একটা দীর্ঘ, ক্লান্ত অথচ প্রশ্রয়ের শ্বাস ফেললেন।

"তুই আমাকে মেরেই ফেলবি," তিনি হাত বাড়িয়ে রাহুলের গালটা আলতো করে ছুঁলেন।

"তার মানে তুমি রাজি?" রাহুলের গলায় শ্বাসরুদ্ধকর প্রতীক্ষা।

"ওই যে বললাম... শর্তটা ভুলে যাস না রাহুল, ওটাই আসল," ইন্দিরা একটু রাশভারী গলায় বললেন। "যদি তুই পরীক্ষায় নব্বই শতাংশের ওপর নম্বর পাস, তবেই আমি শুক্রবারের রাতটা তোর সাথে কাটাব। সারা রাত। কোনো ল্যাপটপ নয়, কোনো কাজ নয়। শুধু আমরা দুজন।"

রাহুলের মুখে এমন এক বিশুদ্ধ, অকৃত্রিম আনন্দের জোয়ার বয়ে গেল যে ইন্দিরার বুকের ভেতরটা সুখে সংকুচিত হয়ে এল। ও আরও কাছে এসে ওঁর কোমর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁধে মুখ গুঁজল। "থ্যাঙ্ক ইউ মা। থ্যাঙ্ক ইউ, থ্যাঙ্ক ইউ, থ্যাঙ্ক ইউ। আমি তোমাকে হতাশ করব না। প্রমিস।"

"আমি জানি তুই করবি না," ইন্দিরা ওর চুলে হাত বুলিয়ে ফিসফিসিয়ে বললেন।

"কিন্তু এখন আমার একটু ভয়ও করছে," রাহুলের গলা শাড়ির কাপড়ে চাপা শোনাল। "যদি পরীক্ষাটা খুব কঠিন হয়, আর এমসিকিউ-তে যদি কয়েকটা সিলি মিস্টেক করে ফেলি—"

"তুই ভুল করবি না," ইন্দিরা ওকে সামান্য সরিয়ে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে বললেন। "একদম করবি না। তুই বুদ্ধিমান, পরিশ্রমী—আর তুই আমার ছেলে। আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে তুই নব্বইয়ের ওপর পাবি।"

মায়ের এই অগাধ বিশ্বাস রাহুলের ভয় দূর করে দিল, সে আবার ওঁর গায়ে লেপ্টে গেল। "সত্যি বলছ?"

"আমি জানি," ইন্দিরা বললেন। "তুই কত সপ্তাহ ধরে খাটছিস। শুধু মাথা ঠাণ্ডা রাখবি, প্রতিটি প্রশ্ন মন দিয়ে পড়বি। তুই পারবি রাহুল। আমার তোর ওপর ভরসা আছে।"

রাহুলের চোখ দুটো চকচক করে উঠল, বোধহয় খুশিতে জল এসে গিয়েছিল, যা সে দ্রুত পলক ফেলে আড়াল করল। 

"আস্ত পাগল একটা, পুরো উন্মাদ।"  ইন্দিরা হালকা হেসে ওর কপালে একটা আলতো চুমু খেয়ে বললেন। "এবার আর চিন্তা করিস না। আমাদের হাতে কিন্তু আর..." তিনি বেডসাইড টেবিলের ঘড়ির দিকে তাকালেন। "...আর মোটে পনেরো মিনিট আছে তোর বাবা ফেরার।"

"পনেরো মিনিট," রাহুল একটা তৃপ্তির শ্বাস ফেলে আবার ওঁর গায়ে এলিয়ে পড়ল। "ইশ, আর একটু বেশি যদি হতো!"

"পরীক্ষায় ফাটাফাটি রেজাল্ট করলে তো সারা রাত পাবি," ইন্দিরা শুকনো গলায় মনে করিয়ে দিলেন। "তোর যা যা প্ল্যান আছে, তার জন্য তো সেই সময়টা যথেষ্ট হওয়ার কথা।"

রাহুল ওঁর কাঁধে মুখ রেখে হাসল। "আমি তোমাকে এত চুমু খাব না মা! আর আমরা শুধু শুয়ে শুয়ে গল্প করব আর জড়িয়ে ধরে থাকব যতক্ষণ না ঘুম আসে। জাস্ট পারফেক্ট হবে রাতটা।"

ইন্দিরা চোখ কপালে তুললেন, তবে তাতে কোনো বিরক্তি ছিল না। "তুই তো দেখছি সব ছক কষে রেখেছিস!"

"অবশ্যই," রাহুল বলল। "কতদিন ধরে ভাবছি এটা নিয়ে। ও হ্যাঁ মা—তুমি কিন্তু তোমার রিমাইন্ডারে ওটা নোট করে নিও। শুক্রবার বিকেলের মধ্যে সব কাজ শেষ। কোনো খাতা দেখা নয়, কোনো ইউনিভার্সিটির কাজ নয়। শুধু... আমরা।"

"তুই এখন আমাকে নির্দেশ দিচ্ছিস?" ইন্দিরা একটা ভ্রু তুললেন। "বড্ড বাড় বেড়েছে তোর!"

"আমি শুধু মনে করিয়ে দিচ্ছি যাতে তুমি ভুলে না যাও," রাহুল একটু বাচ্চাদের মতো মুখ করে বলল। "তুমি তো সবসময় এত ব্যস্ত থাকো। হয়তো দেখা গেল আমি পরীক্ষা দিয়ে এসে দেখছি তুমি ল্যাপটপ খুলে বসে আছ। ভুল করে অন্য কোনো কাজ শিডিউল করে না বসো!"

ইন্দিরা একটা কৃত্রিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওর কপালে হালকা টোকা দিলেন। "উফ্, তুই কি ভাবিস আমি অ্যালঝাইমার্সে ভুগছি? যে কথা দিয়ে ভুলে যাব?"

"তবু, একবার কনফার্ম করে নেওয়া ভালো," রাহুল ঘাড় গুঁজে একটু লাজুক হাসল।

"ঠিক আছে বাবা," ইন্দিরা কপট বিরক্তির সুরে বললেন, "তোর ওই 'জড়িয়ে ধরে থাকার রাত'-এর কথা আমি একেবারে ক্যালেন্ডারে লাল কালি দিয়ে দাগিয়ে রাখব। এমনকি ফোনের রিমাইন্ডারেও দিয়ে রাখব। হলো তো? এবার শান্তি?"

রাহুল হাসল, কিন্তু পরক্ষণেই ওর চোখমুখের উচ্ছ্বাসটা একটু শান্ত হয়ে এল। একটু ইতস্তত করে বলল, "মা?"

"কী হলো আবার? আরও কোনো শর্ত চাপানোর বাকি আছে নাকি?"

"শুক্রবার রাতে যখন আমরা একসাথে থাকব... ওটা কিন্তু শুধু জড়িয়ে ধরে থাকার জন্য নয়।" ও একটু বোকা বোকা ভাবে শব্দগুলো হাতড়ে বলল, "মানে, ওটা তো আছেই, কিন্তু শুধু ওটার জন্যই নয়।"

ইন্দিরা একটু অবাক হয়ে ওর দিকে তাকালেন। "তাহলে?"

"আমি আসলে তোমার সাথে ভালো করে সময় কাটাতে চাই মা, ভালো করে গল্প করতে চাই। তুমি তো সারাদিন ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্টদের সাথে বকবক করো, আমার সাথে তো ঠিক করে সময়ই পাও না," রাহুল খুব সহজ, অভিমানী গলায় বলল। "তাই ওটাকে শুধু ‘জড়িয়ে ধরে থাকার রাত’ বোলো না। বলবে ‘আমার সাথে কাটানোর রাত’। কারণ আসল তো তুমি। কাজটা নয়।"

ছেলের এই অপ্রত্যাশিত, সহজ কথাগুলো ইন্দিরার বুকে গিয়ে বড় শক্তভাবে ধাক্কা মারল। এই ১৯ বছরের ছেলেটা মাঝে মাঝে এমন ছেলেমানুষি অথচ গভীর কথা বলে, যা ওঁর মতো একজন ডাকসাঁইটে অধ্যাপককেও নিরুত্তর করে দেয়। তিনি নিজের অজান্তেই হেসে ফেললেন, যদিও সেই হাসিতে প্রশ্রয়ের মাত্রাটাই বেশি।

"তোর সাথে সত্যিই পারা দায়," তিনি রাহুলের নাকটা হালকা করে টিপে দিয়ে বললেন। "এত পাকা পাকা কথা কোত্থেকে শিখিস বল তো তুই? কোন সিনেমার ডায়লগ মুখস্ত করে মা কে শোনানো হচ্ছে, অ‍্যাঁ?           "

"কোথাও শিখিনি," রাহুল মায়ের বুকের কাছে আরও একটু সেঁধিয়ে গিয়ে একদম বাচ্চাদের মতো গলায় বলল। "আমি তো শুধু সত্যি কথাটা বললাম। তুমি সবসময় কেমন দূরে দূরে থাকো তো, তাই কাছে পেলে আমার মাথা থেকে এমনিই এসব কথা বেরিয়ে আসে। আর তুমি যতই আমাকে বকো না কেন, আমি জানি আমার এই পাকা কথাগুলো শুনতে তোমার খুব ভালো লাগে।"

ইন্দিরা ওর কথা শুনে আর নিজেকে রাশভারী রাখতে পারলেন না। ওঁর আঙুলগুলো খুব স্বাভাবিক ছন্দেই রাহুলের চুলে বিলি কেটে দিতে লাগল। "সব বুঝি আমি," তিনি একটা হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিসফিসিয়ে বললেন। "তোর এই ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল, এই মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে নিজের কাজ হাসিল করা—সব বুঝি। কিন্তু মুশকিল হলো, জেনেবুঝেও আমি তোর ফাঁদেই পা দিই। বড্ড লাই দিয়ে ফেলেছি তোকে।"

"লাই দাওনি মা," রাহুল চোখ বন্ধ করেই আদুরে গলায় বলল। "তুমি তো এমনিতে খুব কড়া। কিন্তু আমি তো তোমার ছেলে, একটু তো ছাড় পাবোই, তাই না?"

তাঁরা আরও কয়েক মিনিট সেই আরামদায়ক নীরবতায় শুয়ে রইলেন। বিকেলের সোনাঝুরি আলো ততক্ষণে মরে গিয়ে ঘরের ভেতর একটা নরম, আবছা অন্ধকার নেমে এসেছে। জানলার পর্দাগুলো বাতাসে সামান্য দুলছে। ঘরের ভেতর শুধু শোনা যাচ্ছে দূরবর্তী রাস্তার গাড়ির অস্পষ্ট শব্দ আর ওদের দুজনের নিয়মিত শ্বাসপ্রশ্বাসের ছন্দ। এই কয়েকটা মিনিট যেন পৃথিবীর বাকি সবকিছু থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন একটা দ্বীপ। সুব্রতর গম্ভীর চোখরাঙানি, বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্স, সমাজের হাজারো নিয়ম—সব যেন এই বন্ধ ঘরের দরজার বাইরে থমকে আছে। ইন্দিরার মনে হলো, এই মুহূর্তটা যদি এখানেই অনন্তকাল স্থির হয়ে যেত!

ঠিক তখনই দূর থেকে গ্যারেজে একটা গাড়ির চাকার আওয়াজ পাওয়া গেল।

মুহূর্তের মধ্যে সেই শান্ত, মায়াবী দ্বীপটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। ইন্দিরার শরীরটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শক্ত হয়ে উঠল, তিনি রাহুলের বাঁধন থেকে নিজেকে দ্রুত অথচ আলতো করে মুক্ত করে নিলেন।

"তোর বাবা এসে গেছে," তিনি তড়িঘড়ি উঠে বসে শাড়িটা ঠিক করতে করতে বললেন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তাঁর অবয়ব থেকে সমস্ত প্রশ্রয় আর কোমলতা উধাও হয়ে গেল। মুখটা আবার সেই আগের মতো গম্ভীর।

রাহুল একটা অসন্তোষের শব্দ করল, তবে কোনো আপত্তি না জানিয়ে চিত হয়ে শুয়ে শরীরটা এলিয়ে দিল। "জানি, জানি।"

ইন্দিরা উঠে দাঁড়ালেন। নিজেকে পুরোপুরি গুছিয়ে নেওয়ার পর যখন তিনি রাহুলের দিকে তাকালেন, ওঁর মুখে আবার সেই প্রাজ্ঞ, গাম্ভীর্যপূর্ণ শিক্ষকের রূপ।

"এবার বইয়ে মন দে," তিনি তাঁর সেই চেনা, মাপা প্রফেশনাল গলায় বললেন। "আর কোনো ফাঁকিবাজি নয়। তোকে পরীক্ষায় নব্বইয়ের ওপর পেতে হবে, মনে আছে তো? শর্ত কিন্তু শর্তই। তোর ওই... স্পেশাল ইনসেনটিভ পেতে গেলে কিন্তু তোকে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে। বিন্দুমাত্র ছাড় পাবি না।"

রাহুল বিছানা থেকে ওঁর দিকে তাকিয়ে হাসল, তার চোখে তখন আগামী দিনের তীব্র প্রতীক্ষা আর চ্যালেঞ্জ জয়ের জেদ। "আমি ঠিক প্রমাণ করব মা। প্রমিস।"

ইন্দিরা মাথা নাড়লেন, ওঁর সেই কঠোর রূপের আড়ালে একটা সূক্ষ্ম, প্রায় অদৃশ্য হাসি খেলা করে গেল। "আমি জানি তুই পারবি। এবার পড়। আর রাহুল?"

"বলো মা?"

"আমার মুখ উজ্জ্বল করিস।"

"সবসময়," রাহুল নরম গলায় বলল।

তিনি ঘুরে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন এবং দরজাটা আলতো করে ভেজিয়ে দিলেন। করিডোর বেয়ে ড্রয়িংরুমের দিকে যাওয়ার সময় তিনি শুনতে পেলেন সদর দরজায় সুব্রতর কলিং বেল বাজানোর আওয়াজ।

এত কিছুর পরেও—এইমাত্র তিনি যে চরম অসম্ভবের পক্ষে সম্মতি দিয়ে এসেছেন তা জানা সত্ত্বেও, ওঁর ভেতরের যুক্তিবাদী মন এটাকে উন্মাদনা বলে চিৎকার করা সত্ত্বেও—ইন্দিরা সেনের ঠোঁটের কোণে একটা চোরা হাসি ফুটে উঠল।

'শুক্রবার রাত,' তিনি মনে মনে ভাবলেন। 'ঈশ্বর সহায় হোন। শুক্রবার রাত।'
Reply
#3

তৃতীয় পরিচ্ছেদ: প্রতীক্ষার অবসান


৩.১. সকালের আশীর্বাদ

শুক্রবার সকালের সূর্যটা যেন এক দ্বিধাগ্রস্ত মায়া নিয়ে উদিত হলো। ইন্দিরার শোওয়ার ঘরের পাতলা পর্দা ফুঁড়ে আসা ফ্যাকাশে সোনালি আলো রেশমি ফিতের মতো মেঝেতে এসে পড়েছে। বাগান থেকে ভেসে আসা কোকিলের দূরবর্তী ডাক আর হাতের খবরের কাগজের খসখস শব্দ ছাড়া ঘরটা একেবারে নিস্তব্ধ।

বিছানার হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে বসে আছেন ইন্দিরা; পরনে হালকা ঘিয়ে রঙের একটা সাধারণ আটপৌরে সুতির শাড়ি। শাড়ির আঁচলটা একটু আলগা হয়ে কাঁধের ওপর লটপট করছে। বাইরের সেই পরিপাটি রূপের বদলে বাড়িতে পরার এই অতি সাধারণ সুতির শাড়িতেও ওঁর স্বভাবসিদ্ধ আভিজাত্যটুকু স্পষ্ট। নাকের ডগায় রিডিং গ্লাসটা আটকে তিনি ‘দ্য * ’ পত্রিকার সম্পাদকীয় পাতায় চোখ বোলাচ্ছিলেন। বেডসাইড টেবিলে রাখা চায়ের কাপটা ততক্ষণে জুড়িয়ে এসেছে, ওপরে সরের একটা পাতলা আস্তরণ; চুমুক দেওয়ার আগে চামচ দিয়ে ওটা সরিয়ে নিতে হবে।

রোজকার অভ্যাসমতো সাড়ে পাঁচটাতেই ঘুম ভেঙে গেছে ওঁর, যদিও আজ আর বিছানা ছেড়ে নিত্যদিনের রুটিনে ঢুকতে ইচ্ছে করছিল না। এই বিশেষ শুক্রবারের সকালটায় কেন যেন নিজের ঘরের এই শান্ত নির্জনতার মধ্যে আরও কিছুটা সময় আঁকড়ে থাকার এক গোপন আকুলতা কাজ করছিল ওঁর মনে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে যে অনিবার্য ঘটনাগুলো একে একে ঘটবে, সেগুলোকে যেন অবচেতনভাবেই কিছুটা পিছিয়ে দিতে চাইছিলেন তিনি। রাহুলের পরীক্ষা। সুব্রতর চলে যাওয়া। আর তারপর...

তিনি জোর করে ভাবনাটাকে মন থেকে ঝেড়ে ফেললেন। হাম্পির সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারের ওপর একটা আর্টিকেলে মন দেওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু অক্ষরের সারিগুলো চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে আসছিল, মন আজ কিছুতেই ওঁর নির্দেশ মানতে রাজি নয়।

দরজায় মৃদু টোকা ওঁর ভাবনায় ছেদ টানল।

"মা?" কাঠের দরজার ওপার থেকে রাহুলের গলা ভেসে এল, বড্ড মৃদু আর দ্বিধামিশ্রিত। "ঘুম ভেঙেছে তোমার?"

ইন্দিরা খবরের কাগজটা পাশে সরিয়ে চশমাটা ভাঁজ করা পাতার ওপর রাখলেন। "আয়, ভেতরে আয়।"

দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে গেল। রাহুল ঘরে ঢুকল। পরনে রাতের পাজামা আর একটা মলিন টি-শার্ট—কয়েক বছর আগে রাহুলের জন্মদিনের দিন ইন্দিরা কিনে দিয়েছিলেন, তখন রঙটা এতটা মলিন ছিল না। ঘুমের ঘোরে মাথার চুলগুলো অবাধ্যভাবে খাড়া হয়ে আছে, দেখতে বেশ নিষ্পাপ লাগছে ছেলেটাকে। কিন্তু ওর চোখদুটো সম্পূর্ণ সজাগ; সেখানে এক অদ্ভুত ভীতি আর অন্য এক অনুভূতির সংমিশ্রণ—হয়তো এক তীব্র প্রতীক্ষা, অথবা এক অনমনীয় জেদ।

সে দরজাটা ভেজিয়ে বিছানার দিকে এগিয়ে এল। ওর প্রতিটি পদক্ষেপে এমন এক গভীর ধীরতা ছিল, যা দেখে ইন্দিরার বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। তিনি জানতেন এরপর কী হতে চলেছে। এই আচার, এই ঐতিহ্য—কোনো বড় কাজের আগে গুরুজনদের আশীর্বাদ নেওয়া, বিনম্র শ্রদ্ধায় পা ছুঁয়ে প্রণাম করা—এই ধারা ইন্দিরা পেয়েছিলেন তাঁর নিজের মায়ের কাছ থেকে, আর রাহুল এটা আত্মস্থ করেছে ইন্দিরার থেকে। রাহুলের ছোটবেলা থেকেই এই অলিখিত নিয়মটা অবলীলায় চলে আসছে।

বিছানার পাশে এসে রাহুল কোনো কথা বলল না। লম্বা শরীরটা নিয়ে সে ঘরের ঠাণ্ডা মার্বেল মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসল। পরম কুশলতায় সামনের দিকে ঝুঁকে সুতির শাড়িটার নিচ থেকে বেরিয়ে আসা ইন্দিরার পা দুটো নিজের দু-হাত দিয়ে ছুঁল সে।

"মা," রাহুল ওর হাতটা নিজের কপালে ঠেকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, "প্রণাম।"

ইন্দিরার গলাটা মুহূর্তের জন্য বুজে এল। কতবার তিনি এই দৃশ্য দেখেছেন! রাহুলের কত শত সকাল শুরু হয়েছে এভাবে—কলেজে যাওয়ার আগে, পরীক্ষার আগে, জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ও এভাবেই মায়ের আশীর্বাদ চেয়েছে। কিন্তু আজকের এই মুহূর্তটা কেন যেন মনে হচ্ছে খানিকটা আলাদা। এর পেছনে লুকিয়ে থাকা অর্থটা যেন নিছক ঐতিহ্যের গণ্ডি বা শ্রদ্ধার আদান-প্রদানকে ছাপিয়ে আরও গভীরে চলে গেছে।

তিনি সামনের দিকে একটু ঝুঁকলেন, তাঁর হাতটা স্থির হলো রাহুলের মাথায়। আঙুলগুলো দিয়ে ওর এলোমেলো চুলগুলো আলতো করে গুছিয়ে দিতে দিতে নরম গলায় বললেন, "ওঠ সোনা। এখানে এসে বোস।"

রাহুল মাথা তুলল, ওর চোখ জোড়া মায়ের চোখের ওপর স্থির হলো। ইন্দিরা সেই চোখে এক অদ্ভুত অসহায়তা দেখতে পেলেন—সেই ছোট্ট ছেলেটি, যে আজ এক তরুণের রূপ নিলেও ভেতরে এখনও অবোধই রয়ে গেছে। সে মেঝের ওপর থেকে উঠে বিছানার কিনারায় এসে বসল। এতটাই কাছে যে ওর চোখের নিচের হালকা কালচে ছায়া ইন্দিরার নজরে এল—রাত জেগে পড়ার স্পষ্ট প্রমাণ, যদিও ইন্দিরা ওকে পর্যাপ্ত ঘুমানোর কড়া নির্দেশ দিয়েছিলেন।

"কাল রাতে তুই ঠিক করে ঘুমোসনি," ওঁর গলার স্বরে হালকা শাসনের সুর।

"খুব ভালো ঘুম হয়েছে," রাহুল প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলেও গালের সামান্য লালচে ভাব ওর মিথ্যেটা ধরিয়ে দিল। "আমি আসলে... শুয়ে শুয়ে মনে মনে ফর্মুলাগুলো জাস্ট রিভাইজ করছিলাম। সব ঠিকঠাক মনে আছে কি না দেখছিলাম।"

ইন্দিরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওর গালটা হাতের তালুতে নিলেন। "তোকে বলেছিলাম না রেস্ট নিতে? ক্লান্ত মস্তিষ্ক সবসময় সিলি মিস্টেক করে বসে।"

"জানি, জানি।" রাহুল মায়ের হাতের ছোঁয়ায় চোখদুটো আলতো বন্ধ করে একটু ঝুঁকে এল। "কিন্তু আমি নিজেকে আটকাতে পারছিলাম না। শুধু... সবকিছুর কথা মনে আসছিল।"

"পরীক্ষার কথা?" ইন্দিরা জিজ্ঞেস করলেন, যদিও উত্তরটা ওঁর জানা ছিল।

রাহুল চোখ খুলল। ওর চোখে আবার সেই চেনা স্ফুলিঙ্গ—এক তীব্র, উদগ্র আলো যা ওকে একই সাথে খুব ছোট আর অনেক পরিণত দেখাচ্ছিল। "হ্যাঁ, পরীক্ষার কথা," সে স্বীকার করল। "আর... তার পরের কথা।"

ইন্দিরা নিজের অজান্তেই টের পেলেন ওঁর নাড়ির গতি বেড়ে গেছে। তিনি হাতটা সরিয়ে নিয়ে চায়ের কাপটা তুলে নিলেন, নিজেকে সামলানোর জন্য এক চুমুক দিলেন। চা ততক্ষণে জুড়িয়ে জল, স্বাদটাও সামান্য তেতো ঠেকছিল, তবুও তিনি গিলে নিলেন।

"তুই ‘পরের’ বিষয়টার ওপর বড্ড বেশি ফোকাস করছিস," ওঁর গলার স্বর সাবধানে স্বাভাবিক রাখা। "তোর এখন শুধু পরীক্ষাটা নিয়েই ভাবা উচিত।"

"আমি পরীক্ষা নিয়েও ভাবছি মা," রাহুল দ্রুত বলল। "সেইজন্যই তো ঘুমাতে পারিনি। আচ্ছা মা, যদি আমি নার্ভাস হয়ে যাই? যদি বোকার মতো কোনো ভুল করে ফেলি? এমসিকিউ-তে তো কোনো পারশিয়াল মার্কস নেই। একটা অপশন ভুল দাগালেই সব শেষ—"

"রাহুল।" ইন্দিরা চায়ের কাপটা টেবিলে নামিয়ে রেখে পুরোপুরি ওর মুখোমুখি হলেন। নিজের দু-হাত দিয়ে রাহুলের হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরলেন। "আমার কথা শোন। তুই কোনো বোকা ভুল করবি না। আমি বলছি, করবি না। জানিস কেন?"

রাহুল নিঃশব্দে মাথা নাড়ল, তার চোখ মায়ের মুখে নিবদ্ধ।

"কারণ তুই অত্যন্ত মেধাবী," ইন্দিরার কণ্ঠস্বর নিচু হলেও তাতে এক অমোঘ দৃঢ়তা ছিল। "কারণ আমি আজ পর্যন্ত যত স্টুডেন্ট দেখেছি—আর বিশ্বাস কর, আমি প্রচুর স্টুডেন্ট দেখেছি ... প্রায় কুড়ি বছর তো হতে চললো—তাদের মধ্যে তোর মতো হার্ডওয়ার্কিং আমি কাউকেই দেখিনি। তুই নিখুঁত, তুই সাবধানী, আর তুই যখন কোনো কাজে মন দিস, তখন নিজের সবটুকু উজাড় করে দিস।" তিনি ওর হাত দুটোতে মৃদু চাপ দিলেন। "আর সবচেয়ে বড় কথা, তুই আমার ছেলে। আমার ছেলে কখনো হেরে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়নি।"

রাহুলের এই ব্যাখ্যাটা ঠিক যেন মনে ধরলো না, বড্ড দায়সারা গোছের জেনেরিক একটা মন ভোলানো কথা মনে হল। রাহুলের মুখে একটা হালকা, ঈষৎ ব্যাঙ্গাত্মক কম্পিত হাসি ফুটে উঠল। "ওঃ তাহলে তো মিটেই গেল, তার মানে তুমি বলছো কোনো প্রেশারই নেই!"

"প্রচণ্ড প্রেশার আছে," ইন্দিরা সংশোধন করে দিলেন, কিন্তু ওঁর চোখে তখন মায়ার আলো। "কিন্তু এই প্রেশার সামলানোর ক্ষমতা তোর আছে। তুই এই জন্যই তৈরি হয়েছিস।" তিনি একটা হাত মুক্ত করে ওর কপালের ওপর থেকে চুলের গোছাটা সরিয়ে দিলেন। "তুই সব জানিস সোনা। খুঁটিনাটি সব তোর তৈরি। ভেবে দেখ, তুই এর আগেও এই ধরনের কঠিন এমসিকিউ পরীক্ষা দিয়েছিস আর প্রত্যেকটাতেই ফাটাফাটি রেজাল্ট করেছিস। আমার স্পষ্ট মনে আছে, সেই পরীক্ষাগুলোর আগেও তুই ঠিক এভাবেই নার্ভাস হয়ে পড়তিস। তারপর পরীক্ষা দেওয়ার পর বাড়ি ফিরে হাসতে হাসতে তুই নিজেই তো বলতিস যে অযথাই এত টেনশন করছিলি, মনে আছে? আমি সবসময় আমার স্টুডেন্টদের একটা কথা বলি—পরীক্ষার আগে একটু-আধটু টেনশন থাকাটা ভালো। এতে প্রমাণ হয় যে স্টুডেন্ট তার পড়াশোনা নিয়ে সিরিয়াস। কিন্তু অতিরিক্ত টেনশন একদম ভালো নয়, ওতে জানা জিনিসও গুলিয়ে যায়। তোকে শুধু পরীক্ষার হলে ঢুকতে হবে, একটা বুকভরে শ্বাস নিতে হবে, আর নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে।"

"আর যদি আমি নব্বইয়ের ওপর না পাই?" প্রশ্নটা হঠাৎ করেই করে বসল রাহুল, ওর গলায় প্রায় এক শিশুর মতো শোনাল। হয়তো এই প্রশ্নটাই ওর মাথার মধ্যে এতক্ষন ঘুরছিলো।

ইন্দিরার মুখের কঠিন ভাবটা গলে জল হয়ে গেল। "তুই পাবি। অবশ্যই পাবি। আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে তুই নব্বইয়ের অনেক ওপরে পাবি।" তিনি একটু থামলেন, তারপর ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বললেন, "আর যদি কোনো কারণে নাও পাস, তাও আমি তোকে নিয়ে ঠিক ততটাই গর্বিত থাকব। তুই সেটা জানিস তো?"

রাহুলের চোখ দুটো সামান্য বড় বড় হয়ে গেল। "কিন্তু... আমাদের সেই শর্তটা—"

"শর্ত শর্তের জায়গাতেই আছে," ইন্দিরা নরম গলায় ওর কথা থামিয়ে দিলেন। "আমি তোকে পিছলে যাওয়ার পথ করে দিচ্ছি না। আমি শুধু তোকে মনে করিয়ে দিচ্ছি যে তোকে নিয়ে আমার গর্ব, বা তোর প্রতি আমার ভালোবাসা—কোনো নম্বরের ওপর নির্ভর করে না। কোনোদিন করেনি।"

তিনি দেখলেন রাহুল ধীরে ধীরে এই পরম সত্যটাকে নিজের মধ্যে গ্রহণ করছে, ওর কাঁধের আড়ষ্ট ভাবটা কিছুটা শিথিল হলো। সে মাথা নেড়ে একটা গভীর শ্বাস নিল।

"ঠিক আছে," ও বলল। "ঠিক আছে। আমি পারব।"

"এই তো, বাবুসোনাটা আমার। তুই পারবি, ঠিক পারবি" ইন্দিরা নিশ্চিত করলেন। "এবার বল, পরীক্ষার টাইমিংটা কী? কখন শেষ হচ্ছে?"

"বিকেল পাঁচটায়," রাহুলের গলার স্বর এখন অনেক বেশি স্থির। "সাড়ে পাঁচটার মধ্যে বাড়ি ফিরে আসা উচিত, খুব জোর পৌনে ছটা। আর বাবার ফ্লাইট তো রাত দশটায়, তার মানে বাবা সাড়ে ছটা নাগাদ বেরিয়ে যাবে, তাই তো?"

"হ্যাঁ, ঠিকই হিসেব করেছিস," ইন্দিরার কণ্ঠে এবার প্রশ্রয়ের হাসি। "তোর বাবা সাড়ে ছটাতেই বেরোবে। আর আমরা দুজনেই বাড়িতে থাকব ওকে টাটা করার জন্য।" তিনি একটা ভ্রু সামান্য তুললেন। "কেন রে? তুই কি এখন থেকেই পাঁচটা বাজার মিনিট গুনছিস?"

রাহুলের গাল দুটো মুহূর্তের মধ্যে টকটকে লাল হয়ে উঠল, সে চোখ সরিয়ে নিয়ে বিছানার চাদরের নকশার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। "মা..."

"তোর হাবভাব বড্ড স্পষ্ট রে বোকা ছেলে," ঠোঁটের কোণের হাসিটা এবার আর চেপে রাখতে পারলেন না ইন্দিরা। তিনি হাত বাড়িয়ে ওর চিবুকটা আলতো করে ধরে মুখটা নিজের দিকে ফেরালেন। "তোর মনের কথা বর্ষার মেঘের মতো পরিষ্কার দেখা যায়।"

"আমি কী করব বলো," রাহুল আমতা আমতা করল, তার লালচে ভাব তখনো কমেনি। "সারা সপ্তাহ ধরে আমি শুধু এটা নিয়েই ভাবছি। তোমার সাথে থাকার কথা... শুধু আমরা দুজন। কোনো বাধা থাকবে না, বাবার হঠাৎ ঘরে ঢুকে পড়ার কোনো টেনশন থাকবে না, কোনো—"

"মন দে," ইন্দিরা ওর কথা থামিয়ে দিলেন, তবে গলায় কোনো কাঠিন্য ছিল না, ছিল পরম উষ্ণতা। "এই মুহূর্তে তোর মাথায় শুধু কেমিস্ট্রি থাকা উচিত। বাকি সবকিছু—সবকিছু—তার পরে আসবে। বুঝেছিস?"

"বুঝেছি," রাহুল বলল, যদিও তার চোখের উজ্জ্বলতা বলছিল মন তখনো সেই ‘পরের’ বুদবুদেই ভাসছে।

ইন্দিরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্নেহের বিরত্তিতে মাথা নাড়লেন। "তুই আমাকে সত্যিই পাগল করে ছাড়বি, জানিস তো?"

"তুমি তো সবসময় ওই এক কথাই বলো," রাহুল ঠোঁট টিপে হাসল। "কিন্তু তুমি তো তাও নরমালই আছো, পাগল হয়ে যাওনি তো।"

"সব আমার পূর্বজন্মের কর্মফল," ইন্দিরা বিড়বিড় করলেন। সামনের দিকে ঝুঁকে ওর কপালে একটা গভীর চুমু খেলেন—এক পরম আশীর্বাদ, এক পবিত্র প্রতিশ্রুতি। "যা। রেডি হয়ে নে। ভালো করে ব্রেকফাস্ট করবি। আর রাহুল?"

"বলো মা?"

"আমি যা বলেছি মনে রাখিস। তুই প্রিপেয়ার্ড। যখন পরীক্ষার হল থেকে বেরোবি, তখন যেন তোর মনে হয় তুই তোর সেরাটা দিয়েছিস। আমার মুখ উজ্জ্বল করিস সোনা।"

"সবসময়," রাহুল ফিসফিসিয়ে বলল। উঠে দাঁড়াল ও, ঘর থেকে বেরোতে ইচ্ছা করছিল না, কিন্তু যেতেই হবে। দরজার কাছে গিয়ে সে একবার পিছন ফিরে তাকাল। "তোমাকে খুব ভালোবাসি, মা।"

"আমিও," ইন্দিরা নরম গলায় বললেন। "এবার যা।"

দরজাটা মৃদু শব্দে বন্ধ হয়ে গেল। ইন্দিরা আবার একা হয়ে গেলেন—সেই সকালের আলো, জুড়িয়ে যাওয়া চায়ের কাপ আর খবরের কাগজটার মাঝে।

'পাঁচটা,' তিনি মনে মনে ভাবলেন। 'আর তারপর সাড়ে ছটা। আর তারপর...'

তিনি চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘ, নিয়ন্ত্রিত শ্বাস নিলেন।

মায়ের ঘর থেকে বেরিয়ে রাহুল নিজের দিনের পরিচিত রুটিনে ঢুকে পড়ল। ডাইনিং টেবিলে বসে চুপচাপ ব্রেকফাস্টটা সেরে নিয়েই সে আবার নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকল। পরীক্ষার আগে এই শেষ কয়েকটা ঘণ্টা বড্ড দামি। টানা দু-ঘণ্টা বইয়ে মুখ গুঁজে আরও একবার শেষবারের মতো চোখ বুলিয়ে নিল সব ফর্মুলায়। এরপর স্নান সেরে, তাড়াহুড়ো করে লাঞ্চটা গিলে নিয়ে ও পরীক্ষার জন্য তৈরি হতে শুরু করল। বেরোনোর ঠিক আগে ও কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়াল ঘরের দেওয়ালে ঝোলানো কৃষ্ণের ছবিটার সামনে। চোখ বন্ধ করে হাত জোড় করে মনে মনে প্রার্থনা করল, 'ঠাকুর, আর কিছু চাই না, শুধু এমসিকিউ-তে যেন নব্বইয়ের ওপরে পাই। জাস্ট নব্বইয়ের ওপর।' ছবিটার উদ্দেশ্যে ভক্তিভরে প্রণাম করে, একটা গভীর শ্বাস নিয়ে সে কাঁধে ব্যাগটা তুলে নিল।



৩.২. পরীক্ষার হল

পরীক্ষার হল থেকে ফ্লোর-ওয়াক্স আর তীব্র উৎকণ্ঠার একটা অদ্ভুত গন্ধ আসছিল। সাতচল্লিশ নম্বর টেবিলে বসেছিল রাহুল; অ্যাডমিট কার্ডটা ডানদিকের কোণে নিখুঁতভাবে রাখা, আর ওএমআর শিটের পাশে পেনসিলগুলো সারিবদ্ধভাবে সাজানো। চারপাশে আরও প্রায় দুশো ছাত্র-ছাত্রী খসখস শব্দ করছিল আর নড়েচড়ে বসছিল; ঘরের সেই সম্মিলিত স্নায়বিক উত্তেজনা যেন বাতাসে হাত দিয়ে ছোঁয়া যাচ্ছিল। হল ইনভিজিলেটর—কড়কড়ে ইস্ত্রি করা শাড়ি পরা এক গম্ভীর নারী—সারির মাঝখান দিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছিলেন, টালির মেঝেতে তাঁর হিল জুতোর খটখট শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।

"তোমাদের হাতে তিন ঘণ্টা সময় আছে," ওঁর কণ্ঠস্বর ঘরের গুঞ্জনকে ছাপিয়ে গেল। "তোমরা শুরু করতে পারো।"

শুকনো পাতায় হঠাৎ হাওয়া লাগলে যেমন শব্দ হয়, ঠিক তেমনই প্রশ্নপত্র খোলার এক সম্মিলিত শব্দে হলটা গমগম করে উঠল। রাহুল প্রথম পাতার দিকে তাকিয়ে রইল, অক্ষরের সারিগুলো ক্ষণিকের জন্য চোখের সামনে ভাসছিল। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা কামারের হাতুড়ির মতো পিটছিল, এসি ঘর হওয়া সত্ত্বেও হাতের তালু ঘেমে উঠেছিল ওর।

প্রশ্ন ১: S_N2 বিক্রিয়ায় নিচের কোন অ্যালকাইল হ্যালাইডটি সবচেয়ে দ্রুত সাড়া দেয়?

খুব সহজ। বেসিক অর্গানিক কেমিস্ট্রি। ও এটা জানে। এই ধরনের মেকানিজম ও একশো বার, হাজার বার প্র্যাক্টিস করেছে। অথচ উত্তরগুলোর ওপর তার হাতটা ইতস্তত করছিল, মনের ভেতর ভোরের কুয়াশার মতো সন্দেহ দানা বাঁধছিল।

'যদি আমি প্রশ্নটা ভুল পড়ে থাকি? যদি এমন কোনো ট্রিক থাকে যা আমি খেয়াল করিনি?'

সে চোখ বন্ধ করে একটা ধীর শ্বাস নিল। আর আচমকাই, সে তার মায়ের কণ্ঠস্বর শুনতে পেল, ঠিক যেন তিনি ওর পাশেই বসে আছেন: *'নিজের ওপর বিশ্বাস রাখ। বিশ্বাস রাখ তোর প্রস্তুতির ওপর।'*

চোখ খুলতেই উত্তরটা জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল। অপশন সি: মিথাইল ক্লোরাইড। সে খুব স্থির হাতে বৃত্তটি ভরাট করল, তারপর পরের প্রশ্নের দিকে এগিয়ে গেল।

প্রথম এক ঘণ্টা কাটল এক গভীর মনোযোগের মধ্য দিয়ে। কিছু প্রশ্ন খুব সহজেই মিলে যাচ্ছিল, অন্যগুলোর জন্য একটু চিন্তার প্রয়োজন ছিল—ভুল অপশনগুলোকে বাদ দেওয়া, মনের ভেতরের হিসাবগুলোকে দু-বার করে মিলিয়ে নেওয়া। সে সময়ের গতি সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন ছিল; চারপাশের পেনসিলের মৃদু খসখস শব্দ আর হল পরিদর্শকের পায়ের আওয়াজে প্রতিটা মিনিট যেন মেপে মেপে কাটছিল।

প্রশ্ন ২৩: অ্যাসিট্যালডিহাইডকে লঘু ক্ষারের উপস্থিতিতে উত্তপ্ত করলে যে বিক্রিয়াটি ঘটে, তার মেকানিজম অনুযায়ী চূড়ান্ত উৎপাদটি কী হবে?

রাহুল চোখের পলক ফেলল, সাময়িকভাবে একটু হকচকিয়ে গেল। অ্যালডল কনডেনসেশনের একটা বেশ জটিল ও ঘোরানো প্রশ্ন। উত্তরের অপশনগুলো এত কাছাকাছি যে সামান্য ভুল হলেই নম্বর কাটা যাবে। ও পেনসিলটা ঠোঁটে ঠেকিয়ে ভাবতে লাগল, মাথার ভেতর বিক্রিয়ার ধাপগুলো যেন জট পাকিয়ে যাচ্ছিল। একটা মুহূর্তের জন্য ওর মনে হলো, হয়তো এই প্রশ্নটাই ওর নব্বই পার হওয়ার স্বপ্নটা ভেঙে দেবে।

ঠিক তখনই সকালের সেই দৃশ্যটা ওর মনের পর্দায় ভেসে উঠল। বিছানার কিনারায় বসে থাকা মা, তাঁর চোখে-মুখে এক অদ্ভুত কোমলতা। ওর চুলে বিলি কেটে দেওয়া মায়ের সেই উষ্ণ হাতের স্পর্শটা রাহুল যেন এই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসেও অনুভব করতে পারল। মায়ের সেই দীপ্ত, আত্মবিশ্বাসী মুখটা ওর চোখের সামনে ভাসল।

*'তুই নিখুঁত, তুই সাবধানী, আর তুই যখন কোনো কাজে মন দিস, তখন নিজের সবটুকু উজাড় করে দিস... তুই আমার ছেলে। আমার ছেলে কখনো হেরে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়নি।'*

স্মৃতিটা ওকে এক অদ্ভুত মানসিক স্থিরতা দিল। মায়ের সেই গর্বিত হাসি আর ওর প্রতি অগাধ বিশ্বাসটুকু জাদুমন্ত্রের মতো কাজ করল। ও একটা গভীর শ্বাস নিয়ে নতুন করে প্রশ্নটার দিকে তাকাল। জট পাকানো ধাপগুলো এবার একে একে পরিষ্কার হতে শুরু করল ওর মাথায়। বিন্দুমাত্র না ভেবেই ও এবার সঠিক উত্তরটা চিনে নিল। অপশন বি।

দ্বিতীয় ঘণ্টার মধ্যে সে নিজের ছন্দ খুঁজে পেয়েছিল। ভেতরের সমস্ত ভয় উবে গিয়ে সেখানে এক শান্ত একাগ্রতা দানা বেঁধেছিল। তার হাত উত্তরপত্রের ওপর খুব নিশ্চিতভাবে নড়ছিল, বৃত্ত ভরাট করা, পরের প্রশ্নে যাওয়া, কাজ মিলিয়ে নেওয়া—সবকিছু চলছিল এক ছন্দে। ফর্মুলাগুলো কোনো চেষ্টা ছাড়াই তার মনের গভীর থেকে ভেসে উঠছিল, ঠিক যেমন শান্ত জলের বুক চিরে মাছ ওপরে ভেসে ওঠে।

তৃতীয় ঘণ্টাটা ছিল সময়ের বিরুদ্ধে এক লড়াই, কিন্তু সে জানত এই লড়াইয়ে সে জিতছে। কুড়ি মিনিট বাকি থাকতেই শেষ প্রশ্নটা সমাধান করে ফেলল ও, তারপর আবার প্রথম থেকে শুরু করে প্রতিটি উত্তর পদ্ধতিগতভাবে মিলিয়ে দেখতে লাগল। সে দুটো সিলি মিস্টেক খুঁজে পেল, যা তার নম্বর কেটে নিতে পারত। মায়ের সেই ‘রিভাইজ করার’ কড়া নির্দেশের প্রতি এক গভীর কৃতজ্ঞতায় সে ওগুলো শুধরে নিল।

ইনভিজিলেটর যখন সময় শেষের কথা ঘোষণা করলেন, রাহুল এক পরম তৃপ্তিতে পেনসিলটা টেবিলে নামিয়ে রাখল। সে পেরেছে। নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছে ও।

কিন্তু এটা কি যথেষ্ট ছিল?

পরীক্ষার হল থেকে যখন সে শেষ বিকেলের রোদে বেরিয়ে এল, সংশয়টা আবার তার মনে উঁকি দিল। যে প্রশ্নগুলো পরীক্ষার খাতার পাতায় এত পরিষ্কার মনে হচ্ছিল, এখন স্মৃতির পাতায় সেগুলো কেমন যেন ঝাপসা ঠেকছিল। পনেরো নম্বরের উত্তরটা কি সত্যিই ঠিক হয়েছে? আর আটত্রিশ নম্বরটা?

তবে এই সংশয়ে ওকে বেশিক্ষণ ভুগতে হবে না। ইউনিভার্সিটির নিয়ম অনুযায়ী, স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য পরীক্ষা শেষ হওয়ার পনেরো মিনিটের মধ্যেই তাদের অফিশিয়াল পোর্টালে এমসিকিউ-এর অ্যানসার-কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপলোড হয়ে যায়। অটোস্ট্যান্ডের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় রাহুল পকেট থেকে ফোনটা বের করল। বাড়ি ফেরার পথেই সে নিজের ভাগ্যটা মিলিয়ে নিতে পারবে।

'নব্বইয়ের ওপর,' সে ভাবল, ফোনের স্ক্রিনে ইউনিভার্সিটির ওয়েবসাইটটা খুলতে খুলতে। 'আমার নব্বইয়ের ওপর চাই-ই চাই।'

শহরের কোলাহল আর রঙের মেলা ওর চোখের সামনে দিয়ে পার হয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু রাহুল তার কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। তার মন ততক্ষণে অনেক দূর এগিয়ে গেছে—বাড়ির দিকে, মায়ের দিকে, আর সেই রাতের দিকে যা ওঁর জন্য অপেক্ষা করছে... যদি ও তা অর্জন করতে পেরে থাকে।

(...continued in the next post)
Reply
#4

৩.৩. সত্য প্রকাশ

বাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে পৌনে ছটা বেজে গেল। সদর দরজার সামনে দাঁড়াতেই অটোর ইঞ্জিনের শব্দটা দূরে মিলিয়ে গেল। সূর্যটা আকাশের নিচে ঝুলে আছে, বাড়ির দেওয়ালে চুনী আর পান্নার রঙ মেখে দিচ্ছে। ড্রয়িংরুমে আলো জ্বলছিল, খোলা জানলা দিয়ে টিভির খবরের মৃদু আওয়াজ ভেসে আসছিল।

বাবা বাড়ি ফিরে এসেছে। মা তখনও আসেননি।

রাহুল ভেতরে ঢুকে ব্যাগটা দরজার পাশে নামিয়ে রাখল। বাড়ির সেই অতি পরিচিত সুবাস ওকে জড়িয়ে ধরল—সকালের পুজো থেকে ভেসে আসা চন্দনের গন্ধ, দুপুরের খাবারের অবশিষ্ট সুবাস, আর মায়ের স্টাডি রুম থেকে আসা পুরনো বইয়ের হালকা সোঁদা গন্ধ।

"রাহুল? এসেছিস?" ওপর থেকে বাবার গলা পাওয়া গেল।

"হ্যাঁ বাবা," রাহুল জুতো জোড়া খুলে দরজার পাশে গুছিয়ে রেখে উত্তর দিল।

সুব্রত সেন সিঁড়ির মাথায় এসে দাঁড়ালেন; পরনে ক্যাজুয়াল ট্রাউজার্স আর অর্ধেক বোতাম খোলা শার্ট, রিডিং চশমাটা কপালের ওপর তুলে রাখা। বয়স পঞ্চান্নর কোঠায়, মাথার সামনেটা টাক, পেছনের চুলগুলোয় সামান্য পাক ধরেছে, মুখে ব্যবসা আর ঘন ঘন রাত জেগে ফরেন ক্লায়েন্টের সাথে অনলাইন মিটিংয়ের ক্লান্তির রেখা স্পষ্ট। কিন্তু আজকে কোনো কারণে তাঁর চোখদুটো ছিল অন্য দিনের থেকে বেশি দয়ালু, আর যখন তিনি ছেলের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসলেন, সেখানে এক স্নেহের ছাপ ছিল।

"পরীক্ষা কেমন হলো?" সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে তিনি জিজ্ঞেস করলেন।

রাহুল টের পেল তার হৃদস্পন্দন আবার বেড়ে গেছে। "ভালোই... হয়েছে। মানে, রেজাল্ট না বেরোনো পর্যন্ত তো নিশ্চিতভাবে বলা যায় না, তবে—"

"তবে তোর মনে হচ্ছে ভালো হয়েছে?" সুব্রত সিঁড়ির নিচে এসে রাহুলের কাঁধে হাত রাখলেন।

"আমি... হ্যাঁ। আমার মনে হয় ভালো হয়েছে।" রাহুল একটু ইতস্তত করে যোগ করল, "আসলে বাবা, আমি আসার পথে অনলাইনে অ্যানসার-কি টা মিলিয়ে নিয়েছি। পরীক্ষা শেষ হতেই ওরা ওয়েবসাইটে আপলোড করে দিয়েছিল।"

সুব্রতর ভ্রু দুটো ওপরে উঠল। "তারপর?"

"আর আমি পেয়েছি..." রাহুল একটু থামল, নিজের স্নায়বিক উত্তেজনা সত্ত্বেও এই মুহূর্তটার আনন্দ উপভোগ করতে চাইল সে। "আমি ফুল মার্কস পেয়েছি বাবা। একশোর মধ্যে একশো।"

কয়েক মুহূর্তের জন্য সুব্রত শুধু ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। মানুষটা স্বভাবতই গম্ভীর এবং আবেগ প্রকাশের ক্ষেত্রে ভীষণ সংযত—তাঁর এই কড়া স্বভাবের জন্যই তো বাড়িতে সবসময় একটা অদৃশ্য নিয়মের বেড়াজাল বজায় থাকে। কিন্তু এই মুহূর্তে ওঁর সেই রাশভারী মুখের রেখাগুলো একেবারে নরম হয়ে এল। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল একটা তৃপ্তির হাসি। তিনি রাহুলকে আলিঙ্গন করলেন না ঠিকই, তবে এগিয়ে এসে ওর কাঁধে একটা বেশ শক্ত, প্রশংসাসূচক চাপড় দিলেন।

"একশোর মধ্যে একশো!" সুব্রতর গলায় চাপা উচ্ছ্বাস, যা তাঁর স্বভাবের পক্ষে যথেষ্ট বিরল। "রাহুল, এ তো অসাধারণ। রিয়েলি প্রাউড অফ ইউ।" তিনি আবার একটা হালকা চাপড় দিলেন ছেলের পিঠে। "তোর মা শুনলে খুব খুশি হবে।"

'সেটা তো আমার চেয়ে ভালো কেউ জানে না,' রাহুল মনে মনে ভাবল, কিন্তু মুখে শুধু হেসে মাথা নাড়ল। "থ্যাঙ্ক ইউ বাবা।"

"শোন, আমার প্যাকিং-এর খানিকটা বাকি আছে, আমি ওটা সেরে ফেলি ঝপাঝপ," সুব্রত সিঁড়ির দিকে ইশারা করলেন। "দশটায় ফ্লাইট, তাই সাড়ে ছটার মধ্যে আমাকে যেভাবেই হোক বেরোতে হবে। শুক্রবার সন্ধেবেলা এয়ারপোর্টের জ্যাম মানে তো যমের দক্ষিণদুয়ার।" তিনি একটু থামলেন। "তোর মা-ও বোধহয় এখনই চলে আসবে। একটু আগে টেক্সট করেছিল যে ইউনিভার্সিটি থেকে বেরোচ্ছে।"

ঠিক যেন ওঁর কথার রেশ ধরেই গ্যারেজে একটা গাড়ির আওয়াজ পাওয়া গেল, সেই ইঞ্জিনের চেনা গুঞ্জন যা রাহুল বহু বছর ধরে চেনে। ওর নাড়ির গতি আবার চড়ল, হাতের তালু হঠাৎ ঘেমে উঠল।

"ওই তো এসে গেছে ও," সুব্রত সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালেন। "আমি প্যাকিংটা সেরে নিচে আসছি, ডিনার করে নেবো।"

রাহুল ড্রয়িংরুমে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। গাড়ির দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ, ড্রাইভওয়েতে হিল জুতো চলার খটখট আওয়াজ, চাবির রিংয়ের ঝনঝনানি—সবকিছু ওর কানে আসছিল। সদর দরজাটা খুলল, আর মা ভেতরে ঢুকলেন।

ইন্দিরাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। রাহুলের প্রথম অনুভূতি এটাই ছিল। ওঁর শাড়িটা—আজ একটা গাঢ় সবুজ রঙের সিল্ক পরেছিলেন—সামান্য কুঁচকে গেছে, আর চোখের নিচের কালিগুলো বলছিল যে আজ দীর্ঘ লেকচার আর অ্যাডমিন কাজের এক ক্লান্তিকর ধকল গেছে ওঁর ওপর। চুলগুলো, যা সাধারণত নিখুঁতভাবে বাঁধা থাকে, তার কয়েকটা গোছা ঘাড়ের কাছে খোঁপা থেকে আলগা হয়ে বেরিয়ে এসেছে।

কিন্তু যখন ওঁর চোখ রাহুলের চোখের ওপর পড়ল, মুখের অভিব্যক্তি এক নিমেষে বদলে গেল। ক্লান্তিটা পুরোপুরি মুছে গেল না ঠিকই, কিন্তু সেখানে অন্য এক অনুভূতির ছোঁয়া লাগল—এক উষ্ণতা, এক কোমলতা, এক নীরব প্রশ্ন।

"রাহুল," তিনি নিচু স্বরে বললেন, ওঁর ব্যাগটা রাহুলের ব্যাগের পাশে রাখতে রাখতে। "ফিরেছিস। তোকে তো ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না, মনে হয় সাইলেন্ট-টা অফ করতে ভুলে গেছিস হল থেকে বেরিয়ে। কেমন হলো—"

"ও একশোর মধ্যে একশো পেয়েছে!" সুব্রতর গম্ভীর গলা ওঁর প্রশ্নটাকে মাঝপথেই থামিয়ে দিল। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতেই বললেন "ফুল মার্কস। ভাবা যায়?"

ইন্দিরার চোখ দুটো সামান্য বড় হয়ে গেল, রাহুল দেখল ওঁর ঠোঁট দুটো বিস্ময়ে কিছুটা আলগা হয়েছে। কিন্তু ওঁর প্রতিক্রিয়া যখন এল, তা ছিল অত্যন্ত পরিমিত ও নিয়ন্ত্রিত—সেই চেনা অধ্যাপক, সেই গম্ভীর স্ত্রী, যে নারী স্বামীর সামনে নিজের আবেগের রাশ কোনোদিন আলগা হতে দেন না।

"তাই নাকি?" তিনি শান্ত ও সমাহিত গলায় বললেন। তিনি রাহুলের দিকে তাকালেন, আর রাহুল ওঁর চোখে সেই সুপ্ত কিন্তু নিশ্চিত গর্বের আভাস দেখতে পেল। "খুব ভালো, রাহুল। এটা সত্যিই একটা বড় অ্যাচিভমেন্ট।"

"বড় অ্যাচিভমেন্ট মানে?" সুব্রত হাসলেন। "ইন্দিরা, এ তো অসাধারণ ব্যাপার। আমাদের ছেলে বছরের অন্যতম কঠিন পরীক্ষায় সব কটা উত্তর নিখুঁত করে এসেছে।"

"আমি জানি," ইন্দিরা শুকনো গলায় বললেন, কিন্তু ওঁর ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু হাসির রেখা দেখা দিল। তিনি রাহুলকে পাশ কাটিয়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন। "শুনছো, তোমার ব্যাগ গোছানো কদ্দুর? খাবারটা রেডি করছি, একসাথে তিনজন খেয়ে নিই।"

"হ্যাঁ, একটু বাকি আছে, আমি একেবারে ব্যাগ নিয়ে নিচে নামবো।" সুব্রত উপরে ওঁর ঘরে চলে গেলেন ।

রাহুল-ও চেঞ্জ করার জন্য ব্যাগ নিয়ে চুপচাপ নিজের ঘরের দিকে হাঁটা দিল, বুকের ভেতরটা তখনো কাঁপছে। মা জানেন। মা জেনে গেছেন যে ও পেরেছে, ও নিজের শর্ত পূরণ করেছে। আর আজ রাতে...

'এখনই ভাবিস না ওসব,' সে নিজেকে ধমক দিল। 'এখনই নয়। অন্তত বাবা চলে যাওয়া পর্যন্ত তো নয়ই।'

ডিনারটা বেশ শান্ত পরিবেশেই কাটল। ডাইনিং টেবিলের সেই চিরচেনা বিন্যাসে তাঁরা তিনজন বসেছিলেন—মাথায় সুব্রত, তাঁর ডানদিকে ইন্দিরা, আর ওঁর মুখোমুখি রাহুল। খাবারটা সাধারণ ছিল: ডাল, ভাত, একটা তরকারি যা রান্নার মাসি চলে যাওয়ার আগে তৈরি করে রেখে গিয়েছিল, আর গরম রুটি যা ইন্দিরা এত ক্লান্তির পরেও কীভাবে যেন তৈরি করে ফেলেছিলেন।

তাঁরা কয়েক মিনিট এক শান্ত নীরবতায় খেলেন, প্লেটে চামচের মৃদু আওয়াজ ছাড়া আর কোনো শব্দ ছিল না। তারপর সুব্রত একটু গলা পরিষ্কার করলেন।

"তা রাহুল," তিনি আর একটা রুটি নেওয়ার জন্য হাত বাড়িয়ে বললেন, "ফুল মার্কস। খুব ভালো প্রিপারেশন নিয়েছিলি, যা বুঝতে পারছি।"

"হ্যাঁ," রাহুল নিশ্চিত করল, সাবধানে মায়ের দিকে চোখ না ফিরিয়ে। "আমি... আমার সেরাটা দিতে চেয়েছিলাম।"

"তা তুই দিয়েছিস।" সুব্রত ইন্দিরার দিকে ফিরলেন। "তুমি নিশ্চয়ই টাইম টু টাইম ওকে মনিটর করেছো। ওর পড়াশোনার ব্যাপারে তুমি কতটা সিরিয়াস, তা তো আমি জানি।"

"ওই আর কি," ইন্দিরা নিরপেক্ষ গলায় বললেন। "পরিশ্রমটা সম্পূর্ণ রাহুলের নিজস্ব। ও খুব সিনসিয়ার স্টুডেন্ট।"

"সেটা ও তোমার থেকেই পেয়েছে," সুব্রত উষ্ণ গলায় বললেন। "এই নিষ্ঠা, এই ডিসিপ্লিন। এর ক্রেডিট আমি অন্তত নিতে পারি না।" সুব্রতর মেজাজ আজকে বেশ ফুরফুরে।

"তুমি বড্ড বিনয়ী," ইন্দিরা উত্তর দিলেন, তবে ওঁর গলার স্বরে এমন এক সূক্ষ্ম সুর ছিল যা কেবল রাহুলই ধরতে পারল। "রাহুলের মধ্যে তোমারও অনেক গুণ আছে।"

রাহুল নিজের খাবারে মন দিল, প্লেটের ভাতগুলো চামচ দিয়ে এদিক-ওদিক সরাতে লাগল। ওঁর মুখোমুখি বসে সে মায়ের উপস্থিতি এক শারীরিক ভরের মতো অনুভব করতে পারছিল; সুব্রতর সামনে ওঁর এই গম্ভীর রূপের আড়ালেও মা যে প্রতি মুহূর্তে ওর সম্পর্কে সচেতন, তা সে স্পষ্ট টের পাচ্ছিল। এই অভিনয়, সুব্রত সামনে থাকলে তাঁদের এই মেপে মেপে চলা—সবকিছু যেন ওর ধৈর্য কেড়ে নিচ্ছিল।

"আমার ফিরতে ফিরতে রবিবার দুপুর হয়ে যাবে," সুব্রত ওঁর ঘড়ি দেখে বলছিলেন। "তোমরা দুজনে এখানে একা সামলে নিতে পারবে তো?"

"আমরা সামলে নেব," ইন্দিরা শুকনো গলায় বললেন। "আমরা কেউ বাচ্চা নই, সুব্রত।"

"আমি জানি, আমি জানি," সুব্রত হাসলেন। "আমি শুধু কনফার্ম হচ্ছিলাম। আর রাহুল—তুই কিন্তু তোর মাকে সাহায্য করিস যদি ওঁর কিছু প্রয়োজন হয়। সারা উইকেন্ড জুড়ে শুধু নিজের ঘরে বসে থাকবি না কিন্তু!"

"আমি শুধু ঘরে বসে থাকি না বাবা," রাহুল ধরিয়ে দিল।

"আহা, তুই যা-ই করিস না কেন। বই পড়া, পড়াশোনা করা, বা যা হোক।" সুব্রত হাত নাড়লেন। "শুধু নিশ্চিত করিস তোর মা ডাকলে যেন তোকে পাওয়া যায়।"

'ওহ, আমাকে খুব ভালোভাবেই পাওয়া যাবে,' রাহুল মনে মনে ভাবল এবং নিজের ভেতরের এক অদ্ভুত হাসি চেপে রাখার চেষ্টা করল। সে টেবিলের ওপার থেকে মায়ের চোখের দিকে তাকাল এবং দেখল ওঁর চোখেও এক ক্ষণস্থায়ী আমোদের আভাস ফুটে উঠে আবার মিলিয়ে গেল।

"হুম, নিশ্চই," সে মুখে শুধু এটুকুই বলল, গলার স্বর স্থির রেখে।

তাঁরা সুব্রতর কনফারেন্স, ইন্দিরার আগামী লেকচার সিরিজ আর বাড়ির টুকটাক সাধারণ বিষয় নিয়ে কথা বলতে বলতে খাওয়া শেষ করলেন। এই পুরো সময়টা জুড়ে রাহুল দেওয়াল ঘড়ির দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছিল, যার কাঁটা দুটো বড্ড ধীর গতিতে সাড়ে ছটার দিকে এগোচ্ছিল।

অবশেষে, সুব্রত টেবিল থেকে উঠে দাঁড়ালেন, আরও একবার ঘড়ি দেখলেন। "এবার আমাকে বেরোতে হবে। রাস্তায় জ্যাম থাকবে ভালোই।"

তাঁরা সবাই উঠলেন, সুব্রত যখন ওপরের ঘর থেকে নিজের ব্লেজারটা আনতে গেলেন, ইন্দিরা প্লেটগুলো গোছাতে শুরু করলেন। রাহুল থালাবাসনগুলো রান্নাঘরে নিয়ে যেতে মাকে সাহায্য করল, আর কিছুক্ষণের জন্য তাঁরা দুজনে একা হলেন।

"মা—" সে নিচু স্বরে শুরু করল।

"এখনই নয়," তিনি ওর দিকে না তাকিয়েই ফিসফিসিয়ে বললেন। "অপেক্ষা কর।"

কথাটা ওর মেরুদণ্ড বেয়ে এক রোমাঞ্চের স্রোত বইয়ে দিল। অপেক্ষা। কিন্তু এই অপেক্ষার তো আর মাত্র কয়েকটা মুহূর্ত বাকি।

সুব্রত তাঁর ব্লেজার পরে নেমে এলেন, সুটকেস আর ল্যাপটপ ব্যাগটা হাতে নিয়ে ফোন খুলে ড্রাইভারকে ফোন করলেন। ড্রাইভার এসে গেছে। 

তাঁরা তিনজন সদর দরজার কাছে এসে দাঁড়ালেন—একটি পারিবারিক দৃশ্য যা গত বহু বছরে বহুবার অভিনীত হয়েছে। 

"শরীরটার খেয়াল রেখো, বেশি রাত টাত জেগো না" তিনি বললেন।

"চেষ্টা করব," ইন্দিরা উত্তর দিলেন, ওঁর গলায় উষ্ণতা থাকলেও তা গভীর ছিল না। "এয়ারপোর্টে পৌঁছে সিকিউরিটি চেক হয়ে যাওয়ার পর একটা মেসেজ করে দিয়ো।"

তারপর রাহুলের পালা এল। সুব্রত ওকে আবার পিঠে একটা শক্ত চাপড় দিলেন।

"তোকে নিয়ে আজ খুব গর্ব হচ্ছে রে," তিনি নিচু স্বরে বললেন। "একশোর মধ্যে একশো পাওয়া সত্যিই একটা স্পেশাল ব্যাপার।"

"থ্যাঙ্ক ইউ বাবা," রাহুল কোনোমতে বলল, তার গলাটা হঠাৎ কেমন যেন ভারী হয়ে এসেছিল।

সুব্রত ওকে ছেড়ে দিলেন, ব্যাগগুলো তুলে নিয়ে ড্রাইভওয়েতে অপেক্ষা করা গাড়িটার দিকে এগিয়ে গেলেন—কোম্পানির গাড়ি, ড্রাইভার সিটে বসে আছে। গেটের কাছে গিয়ে তিনি একবার পিছন ফিরে হাত নাড়লেন, ওরাও হাত নাড়ল।

তারপর গাড়িটা স্টার্ট নিল, তার পিছনের লাল আলো দুটো রাতের অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল।

বেশ কিছুক্ষণ রাহুল বা ইন্দিরা কেউ নড়লেন না। তাঁরা সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন, সেই শূন্য রাস্তার দিকে তাকিয়ে, রাতের চেনা শব্দগুলো শুনছিলেন—দূরে কোনো ফেরিওয়ালার ডাক, কুকুরের ডাক, আর মেইন রোড থেকে ভেসে আসা গাড়ির গুঞ্জন।

তারপর, খুব ধীরে ধীরে, ইন্দিরা ওর দিকে মুখ ফেরালেন।


আর এক নিমেষে, চারপাশের সবকিছু বদলে গেল।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ: চুক্তির আড়ালে সমর্পণ

৪.১. দরজা বন্ধ হওয়ার সেই মুহূর্ত

রূপান্তরটা ঘটল চোখের পলকে, একেবারে আকস্মিকভাবে। সারা সন্ধে ধরে—ডিনার টেবিল থেকে শুরু করে সুব্রতর বিদায় পর্যন্ত—ইন্দিরা যে নিখুঁত মুখোশটা পরেছিলেন, তা যেন মুহূর্তের মধ্যে গলে জল হয়ে গেল। সেই গম্ভীর অধ্যাপক, আনুষ্ঠানিক স্ত্রী আর মেপে চলা মায়ের রূপটা এক লহমায় মিলিয়ে গেল, ঠিক যেমন ভোরের কুয়াশা হঠাৎ সূর্যের আলোয় বাষ্প হয়ে যায়। এতক্ষণ যে কাঁধ দুটো এক কঠোর সামাজিক মর্যাদার আড়ষ্টতায় টানটান হয়ে ছিল, তা এক ধাক্কায় শিথিল হয়ে নিচে নেমে এল। তাঁর ঠোঁটের কঠিন রেখাটা গলে গিয়ে সেখানে এক পরম আন্তরিক ও উষ্ণ আস্তরণ দেখা দিল। এমনকি তাঁর চোখজোড়াও বদলে গেল; এতক্ষণের সেই মেপে চলা দৃষ্টির দেওয়াল ভেঙে সেখানে এমন এক নিবিড় মায়া জেগে উঠল যা দেখে রাহুলের বুকটা কেঁপে উঠল।

তিনি এক পা এগিয়ে এলেন ছেলের দিকে। তাঁদের মাঝখানের দূরত্বটুকু মুছে দেওয়ার মধ্যে এমন এক ধীরতা ছিল যা দেখতে কোনো পবিত্র আচারের মতো ঠেকে। খোলা দরজা দিয়ে আসা বিকেলের ম্লান আলোটা ওঁর শাড়ির সোনালি পাড়ে লেগে এক মায়াবী দ্যুতির সৃষ্টি করছিল। যখন তিনি রাহুলের একদম সামনে এসে থামলেন, রাহুল ওঁর গায়ের সেই অতি পরিচিত গন্ধটা পেল—সকালের পুজোর চন্দনের সুবাস, চুলে মাখা জুঁই তেলের মৃদু গন্ধ, আর সেই সবকিছুর নিচে ওঁর নিজস্ব এক চেনা ঘ্রাণ, যা ওকে এক লহমায় আচ্ছন্ন করে ফেলে।

"তা হলে," ওঁর গলার স্বরও ততক্ষণে বদলে গেছে; আনুষ্ঠানিকতার সেই ধারালো ভাবটা মুছে গিয়ে তা এখন অনেক বেশি নরম, অনেক বেশি নিবিড়। "আজ দেখছি কেউ একজন বড্ড ফাটাফাটি পারফর্ম করে ফেলেছে!"

তাঁর ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু হাসি ফুটে উঠল, যার মধ্যে সমপরিমাণে মিশে ছিল গর্ব, স্নেহ আর অন্য এক প্রশ্রয়—যা রাহুলের নাড়ির গতিকে এক ধাক্কায় বাড়িয়ে দিল।

"ফুল মার্কস," তিনি হাত বাড়িয়ে রাহুলের কপালের ওপর থেকে অবাধ্য চুলের গোছাটা সরিয়ে দিতে দিতে বললেন, ওঁর আঙুলগুলো আলতো করে ছুঁয়ে রইল ওর ত্বক। "একশোর মধ্যে একশো। সত্যিই আনবিলিভেবল সোনা।"

রাহুল নিজের গালে উষ্ণতার আভাস পেল। "আমি বড্ড নার্ভাস ছিলাম মা," সে প্রায় ফিসফিসিয়ে স্বীকার করল। "পরীক্ষা চলার সময় বারবার মনে হচ্ছিল এই হয়তো ভুল করে ফেললাম। কিন্তু তখনই আমার তোমার সকালের কথাটা মনে পড়ল—তুমি বলেছিলে আমি যা-ই পাই না কেন, তুমি আমাকে নিয়ে প্রাউড ফিল করবে। আর ঠিক তখনই... সবকিছু কেমন যেন সহজ হয়ে গেল। মনে হচ্ছিল তুমি আমার পাশেই বসে আছ।"

ইন্দিরার চোখের চাউনি আরও নরম হয়ে এল, মুখের অবয়বে এক পরম মমতা আর এক অদ্ভুত অসহায়তা ফুটে উঠল। তিনি দু-হাত বাড়িয়ে রাহুলের মুখটা আলতো করে নিজের হাতের তালুতে নিলেন, বুড়ো আঙুল দুটো ওর চিবুক ছুঁয়ে রইল।

"তোকে নিয়ে যে আমি সবসময় গর্বিত থাকি রে সোনা," তিনি বিড়বিড় করলেন। "সবসময়।"

তিনি হাতটা নামিয়ে রাহুলের গালে পরম স্নেহে একবার হাত বুলিয়ে দিলেন। "তুই যে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে কী অমানুষিক খাটুনি খেটেছিস, তা আমি নিজের চোখে দেখেছি। তোর বাবাও আজ খুব ইমপ্রেসড। উনি তো সাধারণত চট করে কারও প্রশংসা করেন না, কিন্তু আজ তোকে নিয়ে কতটা গর্ববোধ করছিলেন, তা তো তুই ডাইনিং টেবিলেই দেখলি।"

রাহুল মাথা নাড়ল। ওর চোখে তখন এক অদ্ভুত অস্থিরতা। ও যেন অন্য কিছুর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। "হ্যাঁ, বাবা খুশি হয়েছেন। কিন্তু মা..."

"কিন্তু কী?" ইন্দিরা ইচ্ছে করেই কপট না-বোঝার ভান করলেন। "তোর পরীক্ষা তো শেষ। একটা দুর্দান্ত রেজাল্টও করেছিস। এবার তো পুরো উইকেন্ড শুধু রিল্যাক্স করবি। সিনেমা দেখবি, অঘোরে ঘুমোবি, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিবি।"

রাহুলের মুখটা মুহূর্তে একটু চুপসে গেল। "সিনেমা? আড্ডা? মা, তুমি কি কিছু ভুলে যাচ্ছ?"

"ভুলে যাচ্ছি?" ইন্দিরা কপালে ভাঁজ ফেলে এমন একটা ভান করলেন যেন তিনি খুব গভীরভাবে কিছু মনে করার চেষ্টা করছেন। "কী বল তো? ওহ হ্যাঁ, কাল সকালে তোকে বাজারটা করে আনতে হবে। ওটাই বলছিস তো?"

"মা!" রাহুল এবার প্রায় আহত গলায় বলে উঠল। ওর চোখে একরাশ অভিমান জমতে শুরু করেছে। "তুমি ইচ্ছে করে এসব বলছ, তাই না? তুমি খুব ভালো করেই জানো আমি কীসের কথা বলছি।"

ছেলের এই অভিমানী মুখটা দেখে ইন্দিরা আর নিজের হাসিটা চেপে রাখতে পারলেন না। ওঁর কপট গাম্ভীর্যের দেওয়ালটা পুরোপুরি ভেঙে পড়ল। চোখের সেই প্রাজ্ঞ, চেনা দৃষ্টির জায়গায় এক নিবিড় প্রশ্রয় আর চপলতা খেলা করে গেল। তিনি জানেন ছেলেটা সারাদিন ধরে, বলা ভালো সারা সপ্তাহ ধরে এই মুহূর্তটার জন্যই প্রহর গুনেছে। ওকে আর উত্ত্যক্ত করা ঠিক হবে না।

তিনি একটু থামলেন, চোখ দুটো রাহুলের চোখের গভীরতা মেপে নেওয়ার চেষ্টা করল। "আজ রাতে তুই সত্যিই তোর প্রাইজটা জিতে নিয়েছিস, যার জন্য তুই এত চাতকের মতো বসেছিলি।"

‘প্রাইজ’ বা পুরস্কার শব্দটা তাঁদের মাঝখানের বাতাসে এক অমোঘ প্রতিশ্রুতির মতো ঝুলে রইল। রাহুলের চোখদুটো সামান্য বড় হয়ে গেল; আশা, ব্যাকুলতা আর এক তীব্র অবিশ্বাস যেন ওর মনের ভেতর একসাথে যুদ্ধ করতে লাগল।

"তুমি এবারও বলবে না তো যে তোমার খাতা দেখার আছে?" ওর গলার স্বর সামান্য কাঁপছিল। "কিংবা ইউনিভার্সিটির অ্যাসাইনমেন্ট গ্রেড করতে হবে? তুমি সত্যিই... তুমি আমাকে..."

সে নিজের কথা শেষ করতে পারল না, কিন্তু ইন্দিরা বুঝে গেলেন। তিনি তো সবসময়ই বোঝেন।

"কোনো এক্সকিউজ নয়," তিনি নিশ্চিত করলেন, কণ্ঠে কোনো দ্বিধা ছিল না। "আজ রাতে অন্তত নয়। আমাদের চুক্তির প্রতিটা শর্ত তুই নিজের যোগ্যতায় জিতে নিয়েছিস।" তিনি সামান্য ঝুঁকে এলেন ওর দিকে, ওঁর উষ্ণ শ্বাস রাহুলের কপালে এসে লাগল এবং তিনি সেখানে ওঁর ওষ্ঠাধর ছোঁয়ালেন—এক পরম আশীর্বাদ, এক অমোঘ অঙ্গীকার। "আজ রাতে আমি শুধু তোর, সোনা। পুরো রাতটা তোর।"

৪.২. সিঁড়ি বেয়ে ওপরে

কয়েক মুহূর্তের জন্য রাহুল শুধু ওঁর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, ঠিক যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না সে। তারপর, হঠাৎই এক তীব্র উল্লাসে সে ইন্দিরার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নিল—যা দেখে ইন্দিরা নিজের হাসি চেপে রাখতে পারলেন না।

"তা হলে চলো," রাহুল ইতিমধ্যেই ওকে সিঁড়ির দিকে আলতো করে টানতে শুরু করেছে। "আমার ঘরে। এক্ষুনি।"

ইন্দিরা এক ঝটকায় পা দুটো মেঝেতে স্থির করে দাঁড়ালেন। "এক্ষুনি মানে? পাগল নাকি তুই?" তিনি রাহুলের টানের বিপরীতে সামান্য জোর খাটিয়ে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে বললেন। "সারাদিন পর ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরেছি। গায়ে একগাদা ঘাম আর ধুলো। আমাকে অন্তত একটু ফ্রেশ হতে দে। আর এই ভারী শাড়িটা ছেড়ে বাড়ির একটা হালকা কোনো শাড়ি পরে নিই। এভাবে কি কেউ রিল্যাক্স করতে পারে?"

রাহুল একটুও দমল না। মায়ের একটা হাত তখনও ওর মুঠোয় শক্ত করে ধরা। "না মা, কিচ্ছু ছাড়তে হবে না। তুমি যেমন আছ তেমনই ঠিক আছ। ঘাম টাম কিচ্ছু হয়নি তোমার।"

"উফফ, কী ঘ্যানঘ্যানানি!" ইন্দিরা কপট বিরক্তি দেখালেন। "দাঁড়া না বাবা, মোটে তো দশটা মিনিট লাগবে। আমি জাস্ট মুখটা ধুয়ে, শাড়িটা পালটে আসছি। তারপর সারারাত তো তোরই।"

"সেই দশ মিনিটও আমি আর ওয়েট করতে পারব না," রাহুল প্রায় বাচ্চাদের মতো জেদ ধরে বসল। "এমনিতেই বাবা বেরোবে বলে কতক্ষণ ড্রয়িংরুমে মেপে মেপে কথা বলতে হলো! আমার এমনিই অনেক সময় নষ্ট হয়ে গেছে। আর এক মিনিটও ওয়েট করব না। আসো তো তুমি!"

ইন্দিরা চোখ পাকিয়ে ওকে ভর্ৎসনা করার চেষ্টা করলেন। "তুই দিন দিন বড্ড অবাধ্য আর একগুঁয়ে হয়ে উঠছিস, সত্যি। একদম একটা বাঁদর।"

"কী আর করবে বলো" রাহুল কাঁধের ওপর দিয়ে পিছন ফিরে ওঁর দিকে তাকিয়ে চওড়া হাসল। "এই বাঁদরটার পাশেই তোমায় আজ সারারাত শুতে হবে|"

"ধ্যাৎ!" ইন্দিরা ফিক করে হাসলেন। "তুই না, একদম...."

শেষমেশ ছেলের এই নাছোড়বান্দা জেদের কাছে হার মানতেই হলো তাঁকে। নিজেকে ওর টানে সঁপে দিয়ে তিনি সিঁড়ির দিকে এগোতে লাগলেন।

তাঁরা একসাথে হাত ধরে বাড়ির ভেতরের করিডোর দিয়ে এগোতে লাগলেন। ইন্দিরার মনে হলো চারপাশের চিরচেনা দেওয়ালগুলো যেন আজ একটু অন্যরকম লাগছে। যে ঘর, যে বারান্দা দিয়ে তিনি হাজার বার হেঁটে গেছেন, আজ সেগুলো কেমন যেন এক নীরব প্রতীক্ষায় স্থির। ড্রয়িংরুমের সেই সাজানো আসবাবপত্র আর সাইড টেবিলে স্তূপ করে রাখা ওঁর বইগুলো যেন তাঁদের পার হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে অন্ধকারের গভীরে মিলিয়ে যাচ্ছিল। যে ডাইনিং টেবিলে মাত্র এক ঘণ্টা আগে তাঁরা সুব্রতর সাথে বসেছিলেন, তা এখন অন্য কোনো জন্মের এক ঝাপসা স্মৃতি বলে মনে হচ্ছিল।

সিঁড়ির দিকের করিডোরটা এখন বেশ অন্ধকার, বিকেলের আলো নিভে গিয়ে সন্ধের মায়া চারপাশকে গ্রাস করেছে। মেঝের কার্পেটের কারণে তাঁদের পায়ের শব্দ আসছিল না, যা এই মুহূর্তটিকে আরও বেশি নিভৃত করে তুলছিল। ইন্দিরা নিজের সামান্য দ্রুত হয়ে আসা শ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলেন, আর শুনতে পাচ্ছিলেন রাহুলের পিছনে পিছনে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় ওঁর শাড়ির মৃদু খসখস আওয়াজ।

সিঁড়ির মাথায় পৌঁছে তাঁরা বাঁদিকের করিডোর দিয়ে রাহুলের ঘরের দিকে এগোলেন। দরজাটা সামান্য ভেজানো ছিল, ঘরের ভেতরের টেবিল ল্যাম্পের উষ্ণ হলুদ আলো একটা আয়তাকার রেখার মতো করিডোরে এসে পড়েছে। রাহুল দরজাটা পুরোপুরি ঠেলে খুলে পাশে সরে দাঁড়াল, ওঁর জন্য পথ ছেড়ে দেওয়ার মধ্যে এক অদ্ভুত রাজকীয় বিনম্রতা ছিল।

ইন্দিরা দরজার চৌকাঠের ওপর এসে থমকে দাঁড়ালেন।

সেটা ছিল মাত্র কয়েক মুহূর্তের বিরতি। কিন্তু এই সামান্য থমকে যাওয়ার মধ্যেই এক অদ্ভুত দ্বিধা তাঁকে গ্রাস করল। একজন মা হয়ে নিজের এত বড়, উনিশ বছরের ধেড়ে ছেলের সাথে পুরো রাত বিছানায় জড়িয়ে ধরে শুয়ে কাটাবেন? গল্প করবেন? ব্যাপারটা ওঁর কাছে একেবারেই অভাবনীয়। জীবনে কোনোদিন তিনি এমন কিছু করেননি। সুব্রতর সেই কড়া অনুশাসনের সংসারে এমনটা তো কখনো ভাবাই যায় না।

কিন্তু পরক্ষণেই তিনি নিজেকে বোঝালেন। 'এতে এত অদ্ভুত লাগার কী আছে? ও তো আমারই ছেলে। অন্য কেউ তো নয়। নিজের ছেলের সাথে একটু সময় কাটানো, ওকে একটু আদর করা—এর মধ্যে তো কোনো দোষ নেই। আমি তো রোজ সারাদিন নিজের কাজে ব্যস্ত থাকি, ওর থেকে দূরে দূরেই থাকি। আজ না হয় মা আর ছেলে একসাথে শুয়ে একটু গল্পই করব। এতে এত অস্বস্তির কী আছে?'

এই ভাবনাটা ওঁর মনের জড়তাটাকে অনেকটাই কাটিয়ে দিল। তিনি রাহুলের দিকে তাকালেন। দরজার হাতলে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ও, ওর চোখে এক তীব্র আশা, আকুলতা আর ভালোবাসা—এতটাই ভালোবাসা যে ওঁর বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত মমতায় ভরে উঠল। তিনি ভাবলেন: 'কীভাবে আমরা এইখানে এসে পৌঁছলাম? আমার সেই ছোট্ট ছেলেটা কখন এমন এক তরুণে পরিণত হলো, যে আজ আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন আমার কাছেই ওর জীবনের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে?'

কিন্তু উত্তরটা তিনি নিজেই জানতেন। বছরের পর বছর ধরে তাঁদের এই নিবিড়তা গড়ে উঠেছে। রাত জেগে পড়াশোনা করার সেই সেশনগুলো কখন যেন জীবনের গভীরতম ভালো লাগা আর মন্দ লাগার গল্পে রূপ নিয়েছিল, তা তাঁরা নিজেরাও টের পাননি। রাহুলের যখনই মন খারাপ হতো, সে ওঁর কাছেই ছুটে আসত। আবার ইন্দিরাও যখন ইউনিভার্সিটি বা নিজের রিসার্চের চাপে হাঁপিয়ে উঠতেন, তখন রাহুলের এই নিষ্পাপ আবদারগুলোই তাঁকে স্বস্তি দিত। কেমিস্ট্রি আর হিস্ট্রি—দুটো সম্পূর্ণ আলাদা জগতের মানুষ হলেও, তাঁদের মাঝখানের আবেগের দেওয়ালগুলো এত সূক্ষ্মভাবে ক্ষয়ে গেছে যে পুরোপুরি ভেঙে যাওয়ার আগে পর্যন্ত তাঁরা তা টেরই পাননি।

আর আজ তাঁরা এখানে দাঁড়িয়ে।

ইন্দিরা একটা দীর্ঘশ্বাস নিলেন, নিজের কাঁধ সোজা করলেন এবং সমস্ত সাময়িক দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে ছেলের ঘরের চৌকাঠ পার হলেন।

পিছনে দরজাটা একটা মৃদু শব্দে বন্ধ হয়ে গেল।


৪.৩. আনুষ্ঠানিক চুক্তি

রাহুল ঘরের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল। এখন সত্যি সত্যি তাঁরা এখানে, এই নিভৃত ঘরে একা—এই সত্যটা অনুধাবন করতেই ওর নড়াচড়ার মধ্যে এক ধরনের স্নায়বিক আড়ষ্টতা দেখা দিল। সে ওঁর দিকে মুখ ফেরাল; ইন্দিরা দেখলেন ও এক ঢোক গিলে নিজের সমস্ত সাহস সঞ্চয় করার চেষ্টা করছে।

"মা," ওর গলার স্বরে এক কৃত্রিম আনুষ্ঠানিকতা, যা এই মুহূর্তের নিবিড়তার সাথে ঠিক মানাচ্ছিল না। "আমরা... আমরা শুরু করার আগে, আমার মনে হয় আমাদের এটা খুব নিয়ম মেনে করা উচিত। একদম ফর্মালি।"

ইন্দিরা কৌতুকে একটা ভ্রু তুললেন। "ফর্মালি?"

"হ্যাঁ।" রাহুল নিজের পড়ার টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল, সেখান থেকে একটা কাগজ আর পেন নিয়ে কাগজের ওপর খস খস করে কিসব লিখতে শুরু করল। ইন্দিরা একটু ঝুঁকে দেখলেন, রাহুল সেই কাগজে পরীক্ষার বিষয়, তার নিজের নাম, রোল নম্বর, টোটাল নম্বর, আর তার প্রাপ্ত নম্বর লিখছে, ঠিক যেন একটা আনওফিশিয়াল মার্কশীট। "আমাদের এটা একটা বার্টার সিস্টেম, তাই না? একটা ট্রানজ্যাকশন। আর যেকোনো ট্রানজ্যাকশনের প্রপার ডকুমেন্টেশন থাকা দরকার।"

ইন্দিরার ঠোঁটের কোণে একটা প্রশ্রয়ের হাসি ফুটে উঠল। এত বড় ছেলের সাথে সারা রাত বিছানায় শুয়ে গল্প করা আর ওকে জড়িয়ে ধরে থাকাটা ওঁর কাছে এখনও বেশ অভাবনীয় আর অস্বস্তিকর ঠেকছে ঠিকই, কিন্তু ওঁর এই প্রাজ্ঞ, নিয়মনিষ্ঠ ছেলেটা যে মাতৃস্নেহের এই সহজ আবদারটাকেও একটা আনুষ্ঠানিক চুক্তির মোড়কে বাঁধতে চাইছে, সেটা দেখে ওঁর ভারি মজা লাগল। এটা অবিকল রাহুলের স্বভাব—আর ওঁর নিজেরও বটে, মনে মনে তিনি তা স্বীকার করলেন—খুব সাধারণ, আবেগঘন একটা মুহূর্তকেও একটা সুশৃঙ্খল, কেতাদুরস্ত কাঠামোর মধ্যে বেঁধে ফেলার এই প্রয়াস।

"খুব ভালো," তিনি বললেন এবং অত্যন্ত মার্জিত ভঙ্গিতে ওর বিছানার কিনারায় এসে বসলেন। "আপনার ডকুমেন্টস পেশ করুন, মিস্টার সেন।"

রাহুল এক কৃত্রিম গম্ভীরতার সাথে ওঁর দিকে এগিয়ে এল, মার্কশিটটা ওঁর দিকে বাড়িয়ে দিল যেন কোনো পবিত্র উপহার। "এই যে আমার তরফের ট্রানজ্যাকশন ডকুমেন্ট," সে ঘোষণা করল। "একটি পরীক্ষা, যা শতভাগ নির্ভুলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। একশো নম্বরের মধ্যে প্রাপ্ত নম্বর একশো। আমাদের পূর্ববর্তী চুক্তি অনুযায়ী, নব্বইয়ের বেশি।"

ইন্দিরা কাগজটা হাতে নিলেন, খুব মনোযোগ দিয়ে দেখার একটা ভান করলেন—যদিও ডিনার টেবিলে সুব্রতর মুখে শোনা মাত্রই ওঁর বুকের ভেতর গর্বের বন্যা বয়ে গিয়েছিল। কাগজটার ওপর, প্রাপ্ত নম্বরের জায়গাটায় বড় বড় করে লেখা সেই সংখ্যাটা যা ওকে আজকের এই রাতটা এনে দিয়েছে: ১০০/১০০।

"হুম," তিনি বিড়বিড় করলেন, কাগজের ওপর আঙুল বোলাতে বোলাতে। "ফুল মার্কস।" তিনি মুখ তুলে ওর দিকে তাকালেন, চোখে তখন কৌতুক আর এক তীব্র উষ্ণতার ছোঁয়া। "ইউ হ্যাভ সাকসেসফুলি ফুলফিলড ইয়োর সাইড অফ দ্য বারগেন, মিস্টার সেন। সত্যিই প্রশংসনীয়।"

তিনি মার্কশিটটা বেডসাইড টেবিলে রেখে দিলেন, তারপর নিজে টেবিলটার দিকে ঝুঁকে পেনটা আর আরেকটা সাদা কাগজ নিয়ে নিলেন।

"আর এবার," তিনি রাহুলের দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বললেন, "আমার তরফের বার্টার।"

রাহুল মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখতে লাগল ওঁর লিখে যাওয়া। ওঁর হাতের লেখা ছিল অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর; প্রতিটা অক্ষর ওঁর সেই দীর্ঘদিনের অভ্যাসের কথা বলছিল যা তিনি হাজার হাজার খাতা দেখার সময় ব্যবহার করেছেন। তিনি খুব ধীরে, সাবধানে লিখছিলেন, মাঝে মাঝে সঠিক শব্দ চয়নের জন্য একটু থামছিলেন, তারপর আবার লিখতে শুরু করছিলেন।

লেখা শেষ হলে, তিনি পেনটা পাশে রেখে কাগজটা উঁচিয়ে ধরে উচ্চস্বরে পড়তে লাগলেন:

"প্রাপক: রাহুল সেন।

এমসিকিউ পরীক্ষায় ১০০-এর মধ্যে ১০০ নম্বর অর্জন করে রাহুল সেন তার তরফের চুক্তি সফলভাবে পূরণ করেছে। এর বিনিময়ে, ইন্দিরা সেন (রাহুল সেনের মাতা, বসবাসকারী..." তিনি একটু থামলেন তাঁদের পুরো ঠিকানাটা পড়ার জন্য, যা শুনে রাহুল না হেসে পারল না, "...এতদ্বারা নিম্নলিখিত বিষয়গুলি প্রদানে সম্মত হচ্ছেন:

১. এক সম্পূর্ণ রাত (রাত ১১টা থেকে সকাল ৮টা) কেবলই ওর পাশে শুয়ে থাকা, আদর করা এবং ওর সমস্ত গল্প শোনা।

২. কোনো প্রকার বাধা থাকবে না (বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ, খাতা দেখা বা অন্য কোনো দায়িত্ব এই সময়ের জন্য বাতিল)।

এই চুক্তি চিরস্থায়ী—একবার শুরু হওয়ার পর এই চুক্তি কোনোভাবেই বাতিল বা প্রত্যাহার করা যাবে না।

স্বাক্ষরকারী: ইন্দিরা সেন (মাতা, ইতিহাসবিদ এবং উক্ত পুরস্কারের একমাত্র প্রদানকারী)।"

তিনি মুখ তুলে রাহুলের দিকে তাকালেন, মুখের অভিব্যক্তি তখন কৌতুক আর এক গভীর গাম্ভীর্যের মিশ্রণ। "এই টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনস কি আপনার অ্যাপ্রুভাল পেল, মিস্টার সেন?"

রাহুলের চোখদুটো বড় বড় হয়ে গিয়েছিল, ঠোঁট দুটো সামান্য আলগা। "তুমি সত্যিই এটা লিখলে? একদম আসল কন্ট্রাক্টের মতো!"

"তুই-ই তো ফর্মালি করতে বলেছিলি," ইন্দিরা মনে করিয়ে দিলেন। "আমি শুধু তোর ইচ্ছের মর্যাদা দিচ্ছি।" তিনি কাগজটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিলেন। "তবে আমার এখনও একটু কাজ বাকি আছে।"

কাগজটা ওর হাতে দেওয়ার আগে, তিনি কলমটা নিয়ে নিচে আরও তিনটি পুনশ্চ (P.S.) যোগ করলেন খুব ছোট হাতের লেখায়:

"পুনশ্চ ১: সারা রাত ধরে একগুঁয়ে বাঁদরের মতো ঘ্যানঘ্যান করা চলবে না, মায়ের কথার সামান্য অবাধ্য হলে চুক্তি তৎক্ষণাৎ বাতিল।

পুনশ্চ ২: আগামীকাল সকাল ৮টার পর মিস্টার রাহুল সেনকে আবার একজন বাধ্য ছাত্র এবং সুবোধ সন্তান হিসেবে আচরণ করতে হবে—যেমনটা সে সাধারণত করে থাকে।

পুনশ্চ ৩: এই কাগজের কথা যদি অন্য কোনো জীবিত বা মৃত ব্যক্তি জানতে পারে, তবে ইতিহাস বিভাগের প্রধান ডক্টর ইন্দিরা সেন তাঁর সমস্ত ডিপ্লোমেটিক পাওয়ার ব্যবহার করে এই চুক্তির অস্তিত্ব সম্পূর্ণ অস্বীকার করবেন।"

রাহুল চুক্তিপত্রটা ওঁর হাত থেকে নিল, ওঁর হাতের লেখার ওপর আঙুল বোলাতে বোলাতে ওর মুখে এক চওড়া হাসি ফুটে উঠল। ওটা পড়তে পড়তে বুকটা এক অদ্ভুত আনন্দে ভরে উঠছিল ওর।

"তা হলে," সে ওঁর দিকে ফিরে তাকাল, চোখে তখন একই সাথে স্নায়বিক উত্তেজনা আর তীব্র উচ্ছ্বাস। "আমাদের কন্ট্রাক্ট এখন অফিশিয়াল?"

"একদম অফিশিয়াল," ইন্দিরা ঘড়ির দিকে চোখ বুলিয়ে নিশ্চিত করলেন। "যদিও আমাদের চুক্তির অফিশিয়াল সময় অর্থাৎ রাত এগারোটা বাজতে এখনও বেশ কয়েক ঘণ্টা বাকি আছে।"

"তা হলে... এখন তো আর কোনো বাধা নেই," রাহুল একটু ইতস্তত করে, বড্ড আদুরে গলায় বলল। "এবার কি আমি তোমার কাছে আসতে পারি?"

ইন্দিরা কপট বিরক্তি আর স্নেহের মিশেলে হাসলেন। "আর বাবুকে কে আটকে রেখেছে? আয়, মায়ের কাছে আয়। তুই তো আমাকে ঘাম মুছে একটু ফ্রেশটুকুও হতে দিলি না। এবার এই ভারী শাড়ি আর সাজগোজ করা অবস্থাতেই আমাকে তোর ওই 'জড়িয়ে ধরার' প্রজেক্ট শুরু করতে হবে। আয়, শুয়ে পড় দিকি।"

(rest of the chapter continued in the next post)
Reply
#5

(rest of Chapter 4)

৪.৪. প্রথম শারীরিক নিবিড়তা ও অ্যাকাডেমিক কথোপকথন



রাহুল তখনই বসলো না। ইন্দিরা দেখতে লাগলেন ও কীভাবে নিজের টি-শার্টের নিচের অংশটা ধরে এক ঝটকায় মাথা গলিয়ে ওটা খুলে ফেলল। কাপড়টা ক্ষণিকের জন্য ওর চুলে আটকে গিয়েছিল, তারপর আলগা হতেই সে ওটা অবহেলায় পড়ার টেবিলের চেয়ারটার ওপর ছুঁড়ে দিল।

ওকে এভাবে দেখে ইন্দিরার শ্বাস যেন ক্ষণিকের জন্য আটকে গেল। ওর কাঁধ দুটো কবে এত চওড়া হলো? ওর ছোটবেলার সেই নরম গোলগাল শরীরটা কবে এই টানটান, পেশীবহুল অবয়বে রূপ নিল? ও এখনও পাতলা গড়নের, এখনও হাঁটাচলার মধ্যে সেই কৈশোরের সামান্য আড়ষ্টতা লুকিয়ে আছে, কিন্তু এই সত্যটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে ও আর অবোধ শিশুটি নেই—ও এখন এক পূর্ণ যুবক।

"বড্ড গরম," রাহুল বলল, ওঁর এই একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা দেখে ওর গালে আবার লালচে আভা দেখা দিল। "আমি ভাবলাম... আদরের সময়... এটা বেশি কমফোর্টেবল হবে।"

"অবশ্যই," ইন্দিরা কোনোমতে নিজের গলার স্বর স্বাভাবিক রেখে বললেন। তিনি একটু গলা পরিষ্কার করে নিলেন, নিজেকে সামলানোর এক আপ্রাণ চেষ্টা। "খুবই প্র্যাকটিক্যাল চিন্তা।"

রাহুল বিছানায় উঠে এল, ওঁর মুখোমুখি হয়ে একপাশে কাত হয়ে বসল। সামান্য একটু দ্বিধার পর ইন্দিরাও নিজের পজিশন পাল্টালেন, বালিশে পিঠ ঠেকিয়ে আধশোয়া হলেন এবং ছেলেকে আরও কাছে আসার সুযোগ করে দিলেন। সে ওঁর একদম গা ঘেঁষে বসল, মাথাটা রাখল ওঁর কাঁধের ওপর; ওর অনাবৃত বুকটা ওঁর শাড়ির ওপর এক তীব্র উষ্ণতার ছোঁয়া দিচ্ছিল।

কয়েক মুহূর্তের জন্য তাঁরা দুজনেও একদম চুপ করে রইলেন, এই নতুন নিবিড়তার সাথে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন—কাপড়ের ওপর ত্বকের সেই ছোঁয়া, দুজনের উষ্ণ শ্বাস ঘরের এই সামান্য দূরত্বের মধ্যে মিশে যাচ্ছিল। ইন্দিরা পাঁজরের নিচে রাহুলের হৃদস্পন্দনের সেই নিয়মিত গতি অনুভব করতে পারছিলেন, ওঁর নাকে আসছিল ওর গায়ের ডিওডোরেন্টের সুবাস আর ত্বকের সেই নিজস্ব তীব্র ওম।

এই অনুভূতিটা একই সাথে যেমন ওঁর সমস্ত সত্তাকে গ্রাস করে নিচ্ছিল, তেমনই এক অদ্ভুত মানসিক শান্তিও দিচ্ছিল।

"মা?" রাহুলের গলার স্বর খুব নরম, প্রায় দ্বিধামিশ্রিত।

"উঁ?"

"খুব ভালো লাগছে।"

বুকের ভেতরের সেই ভয়ের কাঁপন সত্ত্বেও ইন্দিরার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। "আমারও," তিনি স্বীকার করলেন। "যদিও আমার এখনও মনে হয় তুই এই জিনিসের বায়না ধরার জন্য আস্ত একটা পাগল।"

"হতে পারি," রাহুল একমত হলো। "তবে এটা একটা বেশ ভালো পাগলামি।"

তাঁরা আবার নীরবতায় ডুবে গেলেন। আর ঠিক তখনই, ইন্দিরা নিজের স্বভাবসুলভ উপায়ে এই তীব্র ইমোশন থেকে বাঁচার জন্য ওঁর সেই অতি পরিচিত অ্যাকাডেমিক জগতে আশ্রয় নিলেন—যা তিনি সবসময়ই করে থাকেন।

"আচ্ছা রাহুল," তিনি শুরু করলেন, গলার স্বরে এখন সেই চেনা ক্লাসরুমের গাম্ভীর্য, "তোর এই সেমিস্টারে তো একটা স্পেশাল পেপার আছে, তাই না? ভারতের রসায়নবিদদের ইতিহাস আর তাঁদের অবদান।"

তিনি অনুভব করলেন গায়ের ওপর রাখা রাহুলের বুকটা হাসির ছোঁয়ায় সামান্য কেঁপে উঠল। "এই অবস্থার মধ্যেও তুমি আমাকে পড়ানোর কথা ভাবছ, মা?"

"আমি পড়াচ্ছি না," ইন্দিরা প্রতিবাদ করলেন, যদিও তিনি জানতেন এটা ডাঁহা মিথ্যে। "আমি শুধু... তোর নলেজটা একটু ঝালিয়ে নিচ্ছিলাম। একজন ইতিহাসের প্রফেসর হিসেবে এই বিষয়গুলো নিয়ে তো আমি আলোচনা করতেই পারি।"

তিনি বলতে শুরু করলেন। আঙুলগুলো ওর মাথার চুলে এক আরামদায়ক ও শান্ত ছন্দ তৈরি করছিল। "রসায়ন শাস্ত্রে ভারতীয় বিজ্ঞানীদের অবদান কিন্তু কোনো অংশে কম নয়! যেমন ধর আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। —তাঁকে বলা হয় ভারতীয় রসায়ন চর্চার জনক..."

রাহুল কোনো উত্তর দিল না, বরং ওঁর ঘাড়ের কাছে মুখ গুঁজে আরও একটু সেঁধিয়ে এল। ওর উষ্ণ শ্বাস ইন্দিরার গলার কাছের উন্মুক্ত ত্বকে লাগতেই তিনি সামান্য শিউরে উঠলেন।

"উফ্, রাহুল!" ইন্দিরা একটু বিরক্তির সুরেই বলে উঠলেন, শরীরটা সামান্য সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। "আমি একটা সিরিয়াস কথা বলছি, আর তুই সুড়সুড়ি দিচ্ছিস? একটু সোজা হয়ে শোন্ দিকি।"

"আমি তো শুনছি মা, তুমি বলো না," রাহুল চোখ বন্ধ করেই আদুরে গলায় বলল। সরে যাওয়ার বদলে ওঁর কাঁধের উন্মুক্ত অংশে ওর ঠোঁট জোড়া আলতো করে ছুঁইয়ে দিল সে।

"আহ্... ফাজিল ছেলে কোথাকার..." ইন্দিরার গলার স্বরের শাসনটা এবার অনেকটাই আলগা হয়ে এল। তিনি বুঝতে পারছিলেন তাঁর কপট রাগটা গলে যাচ্ছে। জোর করে মনটাকে ইতিহাসে ফেরানোর চেষ্টা করে তিনি আবার বলতে শুরু করলেন, "যেটা বলছিলাম...আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের কথাই ধর..."

রাহুল এবার ওর মুখটা ইন্দিরার কলারবোনের কাছে নিয়ে গিয়ে সেখানে নাক ঘষতে লাগল। ওর চুলের অবাধ্য গোছাগুলো ইন্দিরার চিবুকে সুড়সুড়ি দিচ্ছিল।

"শুধু একজন বিজ্ঞানী হিসেবে নয়..." ইন্দিরার গলাটা সামান্য কেঁপে গেল। তাঁর নিজের অজান্তেই একটা হাত উঠে এসে রাহুলের চুলে বিলি কাটতে শুরু করেছে, অবচেতনভাবেই তিনি এই উষ্ণ সান্নিধ্যটাকে মেনে নিতে শুরু করেছেন। "...একজন শিল্পোদ্যোগী হিসেবেও তাঁর অবদান অপরিসীম। তিনি বেঙ্গল কেমিক্যালস অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালস প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।"

রাহুলের ঠোঁট এবার কলারবোন থেকে উঠে এল ওঁর কানের ঠিক পেছনের অত্যন্ত সংবেদনশীল ত্বকে। সেখানে ওর ওষ্ঠাধরের নরম, উষ্ণ ছোঁয়া লাগতেই ইন্দিরার মেরুদণ্ড বেয়ে এক তীব্র শিহরণ বয়ে গেল।

"উমম..." ইন্দিরার চোখ দুটো আপনাআপনিই বুজে এল, তাঁর অ্যাকাডেমিক বর্মটা এবার সত্যিই ফাটতে শুরু করেছে। গলার স্বরটা এখন আর প্রফেসরের মতো নেই, বরং এক পরম তৃপ্ত মায়ের মতো শোনাচ্ছে। "...তাঁর লেখা... 'এ হিস্ট্রি অফ *  কেমিস্ট্রি' বইটা... উমম, রাহুল... সত্যি বড্ড সুড়সুড়ি লাগছে রে..."

"কিন্তু তোমার তো ভালোও লাগছে, তাই না?" রাহুল ফিসফিস করে বলল, ওর গলার স্বরে এক অদ্ভুত প্রশ্রয়।

ইন্দিরা এর কোনো প্রতিবাদ করলেন না। তিনি এখন পুরোপুরি এই স্নেহের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। রাহুলের ঠোঁট এবার নেমে এল তাঁর কণ্ঠনালীর পাশ বেয়ে, ঠিক যেখানে নাড়ির স্পন্দন ধুকপুক করছে। সেখানে ওর গাঢ়, উষ্ণ চুমুগুলো ইন্দিরার সমস্ত ইন্দ্রিয়কে আচ্ছন্ন করে ফেলল।

"আহ্, সোনা... হ্যাঁ ওখানে..." তিনি একটা গভীর শ্বাস নিয়ে ফিসফিস করে উঠলেন, ওঁর আঙুলগুলো রাহুলের চুলে আরও শক্ত হয়ে বসল। কথা বলার খেই হারিয়ে ফেললেও, তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করে চললেন লেকচারটা চালিয়ে যাওয়ার। "...তো, তিনি দেখিয়েছিলেন যে... প্রাচীন কালেও ধাতুবিদ্যা বা মেটালার্জিতে আমাদের দেশ কতটা... কতটা উন্নত ছিল..."

রাহুল এবার ওর গালটা মায়ের নরম কাঁধে গভীরভাবে চেপে ধরল, ওর হাতের বাঁধনটা ইন্দিরার কোমরে আরও একটু শক্ত হলো।

"...আহ্ সোনা একটু আস্তে... উমম..." ইন্দিরার গলার স্বর এখন পুরোপুরি অবাধ্য আর শ্বাসরুদ্ধ হয়ে উঠেছে। "...এই যে প্রাচীন রসায়ন আর আধুনিক বিজ্ঞানের মেলবন্ধন... আহ্... এটা বোঝাটা খুব জরুরি... কারণ বিজ্ঞানের ইতিহাসও আসলে মানুষেরই ইতিহাস..."

রাহুলের প্রতিটি স্পর্শের সাথে তাঁর লেকচার ক্রমশ আরও বেশি অসংলগ্ন হয়ে উঠছিল। মুখের সেই অ্যাকাডেমিক শব্দগুলো যেন তাঁদের এই ক্রমশ বেড়ে চলা নিবিড়তার একটা সেফটি নেট মাত্র ছিল, কিন্তু আসল সত্যটা ছিল এই পরম উপভোগ আর তৃপ্তি, যা ইন্দিরা নিজের সমস্ত সত্তা দিয়ে অনুভব করছিলেন।

প্রায় মিনিট দশেক চলল তাদের এই আদরে মাখা পড়ানো। অবশেষে রাহুল সামান্য পিছিয়ে এল, কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে ওঁর দিকে তাকিয়ে সোজা হয়ে বসল। ওর চোখদুটো উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল, গাল দুটো লালচে।

"দেখলে তো?" ওর গলার স্বরে এক হালকা আদুরে টিজিং। "আমাদের এই পার্সোনাল টাইমের মধ্যেও তুমি ঠিক আমাকে পড়ানোর স্কোপ খুঁজে বের করলে। তুমি পড়াশোনার বাইরে কিছু ভাবতেই পারো না।"

ইন্দিরা চোখ খুললেন, ওর চোখের দিকে তাকালেন। "তুই এমনভাবে বলছিস যেন এটা খুব খারাপ কিছু, সোনা," গলার স্বরে এক গভীর মায়া ও উষ্ণতা—যা ওঁর দৈনন্দিন কঠিন ব্যক্তিত্বের সম্পূর্ণ বিপরীত। "সত্যি বলতে, আমি নিজেকে আটকাতে পারি না। আমার জীবনের বেশিরভাগ সময়ই আমি পড়িয়ে কাটিয়েছি। এটা আমার রক্তে মিশে গেছে।"

তিনি হাত বাড়িয়ে ওর চুলগুলো স্নেহের সাথে এলোমেলো করে দিলেন, তারপর হাতটা নামিয়ে ওর গালে রাখলেন—পরম নরম আর অতি পরিচিত এক অনুভূতি।

"আর তা ছাড়া..." ওঁর বুড়ো আঙুল ওর গালের হাড় স্পর্শ করল। "...তোকে পড়াতে আমার খুব ভালো লাগে।"

রাহুলের মুখের ভাব আরও নরম হয়ে এল, সেখানে এক পরম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ফুটে উঠল। "তুমি আমার সবচেয়ে ফেভারিট টিচার, মা।"

"আর তুই আমার সবচেয়ে প্রিয় ছাত্র," ইন্দিরা নিজের অজান্তেই বলে ফেললেন কথাটা।

রাহুল একগাল হেসে বলল, "তুমি আমাকে এত ভালোবাসলে, আমি তো একদম মাথায় উঠে বসে বাঁদরামো শুরু করব, মা।"

"মিথ্যেবাদী," ইন্দিরা ওর কপালে আলতো করে একটা টোকা দিয়ে বললেন। "তুই তো এমনিতেই একটা স্পয়েলড বাঁদর।"

ছেলের এই আদুরে কথায় ইন্দিরার মনটা এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে উঠল। তাঁরা আবারও একে অপরকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরলেন। রাহুলের মাথাটা আবার ওঁর বুকে আশ্রয় নিল, আর ইন্দিরার আঙুলগুলো পরম মমতায় ওর পিঠে বুলিয়ে দিতে লাগল। কিছুক্ষণ এই মায়াবী নৈঃশব্দ্যের মধ্যেই কাটল। ঘরের স্তব্ধতায় শুধু শোনা যাচ্ছিল দেওয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দ আর ওদের দুজনের প্রশান্ত শ্বাসপ্রশ্বাসের ছন্দ।

কিন্তু একটু পরেই ইন্দিরা খেয়াল করলেন, রাহুল যেন ঠিকমতো রিল্যাক্স করতে পারছে না। প্রথমে ও সামান্য নড়েচড়ে উঠল, তারপর ওর হাতের বাঁধনটা একটু আলগা করে শরীরটাকে এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে স্বস্তি খোঁজার চেষ্টা করল। ইন্দিরা প্রথমে ব্যাপারটা এড়িয়ে গেলেন, ভাবলেন হয়তো শোয়ার পজিশন ঠিক করছে। কিন্তু যখন রাহুল তৃতীয়বারের মতো উসখুস করে ওর গালটা শাড়ির ওপর থেকে সামান্য তুলে নিল, তখন তিনি আর চুপ থাকতে পারলেন না।

"কী রে, কী হলো? এমন উসখুস করছিস কেন?" ইন্দিরা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন। "সেই কখন থেকে দেখছি ছটফট করছিস। এক জায়গায় শান্ত হয়ে শুতে পারছিস না?"

রাহুল একটু ইতস্তত করে বলল, "তোমার শাড়ির পাড়ের এই জরিটা স্কিনে লাগছে মা... কেমন একটু খসখসে আর কুটকুট করছে।"

ইন্দিরা চোখ পাকিয়ে একটা কপট বিরক্তির ভান করলেন। "সব তোর নিজের দোষে, বাঁদর ছেলে! আমি তো আগেই বললাম একটু দাঁড়া, আমি ফ্রেশ হয়ে বাড়ির নরম সুতির শাড়ি বা নাইটি পরে আসি, তা তো তুই শুনলি না! দশটা মিনিট তর সইল না তোর, আমাকে জোর করে টেনে নিয়ে এলি। এখন বোঝ ঠেলা, নিজে ভুক্তভোগী হ!"

"কিন্তু আমি তো তোমার গন্ধটা মিস করতে চাইনি," রাহুল একটু অভিমানী গলায় বলল, "আর আদর করতে তো ভালোই লাগছে মা, শুধু এই শাড়ির পাড়টা একটু কুটকুট করছে বলে পুরোপুরি রিল্যাক্স করতে পারছি না।"

ছেলের এই অবস্থা আর আদুরে যুক্তি শুনে ইন্দিরার রাগ জল হয়ে গেল। তিনি একটা হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "দাঁড়া, দেখছি কী করা যায়।"

তিনি সামান্য উঠে বসে নিজের কাঁধ থেকে শাড়ির আঁচলটা সরিয়ে দিলেন। ভারী পাড়ওয়ালা কাপড়টা ওর বুকের মাঝখান থেকে সরিয়ে আলতো করে বিছানার অন্য পাশে ফেলে দিলেন, যাতে জরির অংশটা কোনোভাবেই ওর অনাবৃত ত্বকে আর না লাগে। এখন রাহুলের মাথা আর বুকের মাঝখানে রইল শুধু ইন্দিরার সিল্কের ব্লাউজটা।

"নে, এবার ঠিক আছে? নাকি আরও কোনো আবদার আছে মিস্টার সেনের?" ইন্দিরা একটু হেসে জিজ্ঞেস করলেন।

রাহুল একগাল হেসে আবার মায়ের বুকে মাথা রাখল, এবার ওর গালটা সরাসরি ব্লাউজের কাপড়ের ওপর বসল। "হ্যাঁ, এখন অনেক বেটার।" ও দু-হাত দিয়ে মাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

ইন্দিরা আবার শুয়ে পড়ে ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। "উফ্, সত্যি, তোকে নিয়ে যে আমি কী করব! এত বড় ছেলে, অথচ স্বভাবগুলো একদম পাঁচ বছরের বাচ্চার মতো রয়ে গেছে।"

"তাতে তোমার কোনো আপত্তি আছে?" রাহুল মুখ না তুলেই আদুরে গলায় প্রশ্ন করল।

"আপত্তি থাকলেও কি তুই শুনবি?" ইন্দিরা মৃদু হেসে ওর পিঠে হালকা চাপড় দিলেন। "তোর ওই একগুঁয়ে জেদের কাছে তো আমাকে সারাজীবন হার মেনেই চলতে হলো।"

"আমি জানি তুমি ইচ্ছে করেই হার মানো, মা," রাহুল ফিসফিস করে বলল। "কারণ তুমি আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসো।"

ইন্দিরা কোনো উত্তর দিলেন না, শুধু একটা গভীর তৃপ্তির শ্বাস ফেলে ওকে নিজের আরও কাছে টেনে নিলেন। বেশ কয়েক মিনিট তাঁরা এভাবেই শান্তিতে শুয়ে রইলেন। এবার যেন সত্যিই সব ঠিকঠাক, কোনো বাধা নেই।

কিন্তু কিছুক্ষণ পেরোনোর পর, ইন্দিরা আবারও একটা সূক্ষ্ম অস্বস্তি টের পেলেন। রাহুল এবার পুরোপুরি উসখুস করছে না ঠিকই, কিন্তু ও বারবার ওর বুকটা সামান্য সরিয়ে নিচ্ছে, আবার একটু পরে চেপে ধরছে। ওর গালটাও ব্লাউজের কাপড়ের ওপর সামান্য ঘষা খাচ্ছে।

"আবার কী হলো?" ইন্দিরা এবার সত্যিই অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন। "এবার তো শাড়ির পাড় সরিয়ে দিয়েছি। এখন আবার কীসের প্রবলেম?"

রাহুল মুখটা সামান্য তুলে একটু আমতা আমতা করে বলল, "মা... শাড়ির পাড়টা তো সরেছে, কিন্তু... তোমার এই ব্লাউজটাও তো খসখসে। এটা তো সুতির নয়, তাই না?"

ইন্দিরা এবার সত্যিকারের মজা পেলেন। "বড্ড পাকা ছেলে তো তুই! এটা তো দিব্যি নরম সিল্কের কাপড়, এর আবার খসখসে কী?"

"একদম না," রাহুল মাথা নেড়ে প্রতিবাদ করল। ও হাত দিয়ে ব্লাউজের কাপড়টা একবার ছুঁয়ে দেখাল। "সিল্ক হলেও এর ভেতরে একটা অন্যরকম সুতোর কাজ আছে। আমার স্কিনে ঘষা লেগে কেমন কুটকুট করছে। তুমি বাড়িতে যেসব সুতির ব্লাউজ পরো, সেগুলো তো দেখতে অনেক নরম লাগে। এটা এমন কুটকুট করছে কেন?"

ইন্দিরা আর পারলেন না, খিলখিল করে হেসে ফেললেন। "ওরে বাবা! তুই এত কিছু নোটিস করিস নাকি? মা বাড়িতে কীরকম ব্লাউজ পরে, সেটাও তোর নজর এড়ায় না দেখছি! বড্ড পেকেছিস তুই।"

রাহুল একটু লাজুক হাসল, কিন্তু ওর অস্বস্তিটা পুরোপুরি গেল না। আরও কিছুক্ষণ এভাবেই কাটল। রাহুল এবার সত্যিই একটু অসহায় বোধ করছিল, কারণ সে সত্যিই মায়ের আদরটা পুরোপুরি উপভোগ করতে চাইছিল, কিন্তু এই কাপড়ের ঘর্ষণটা বারবার মনঃসংযোগ নষ্ট করে দিচ্ছিল।

হঠাৎ রাহুল একটু আমতা আমতা করে, বেশ ভয়ে ভয়ে বলল, "মা... এটা সত্যিই বড্ড আনকমফোর্টেবল... তুমি কি... মানে... ব্লাউজটা খুলে ফেলতে পারো?"

কথাটা শোনার সাথে সাথে ইন্দিরার মুখের সমস্ত হাসি উবে গেল। মুহূর্তের মধ্যে তিনি তাঁর প্রফেশনাল আর রাশভারী মায়ের রূপে ফিরে গেলেন। শরীরটা শক্ত হয়ে গেল ওঁর।

"কী বলছিস তুই এসব?" তিনি কড়া গলায় ধমক দিয়ে উঠলেন। "তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে রাহুল? একটা উনিশ বছরের ধেড়ে ছেলে তার মাকে এই ধরণের কথা বলে? বড্ড বাড় বেড়ে গেছে তোর!"

তিনি এক ঝটকায় বিছানা থেকে উঠে বসলেন, নিজের শাড়িটা ঠিক করে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম করলেন। "আমি যাচ্ছি।"

রাহুল এবার সত্যিই ভয় পেয়ে গেল। ও তড়িঘড়ি উঠে বসে মায়ের একটা হাত শক্ত করে চেপে ধরল। "না না মা, প্লিজ যেয়ো না! প্লিজ প্লিজ প্লিজ... সরি মা... আমি জাস্ট ইয়ার্কি করছিলাম! না না... কিচ্ছু খুলতে হবে না, তুমি প্লিজ আবার শুয়ে পড়ো। সরি মা!" ওর ঠোঁট দুটো ফুলে উঠল, চোখদুটোতে এক করুন আর্তি।

ছেলের এই করুণ মুখটা দেখে ইন্দিরার ভেতরের রাগটা আর বেশিক্ষণ টিকল না। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও আবার বিছানায় গা এলিয়ে দিলেন।

রাহুল এবার প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। "তুমি বড্ড ভালো মা... আই লাভ ইউ সো মাচ... তুমি আমার পৃথিবীর সেরা মা..."

ইন্দিরা ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ যাওয়ার পর তিনি খেয়াল করলেন, রাহুল মুখে যাই বলুক না কেন, ওর অনাবৃত বুকে সিল্কের কাপড়টা সত্যিই ঘষা খাচ্ছে আর ও সেটাকে জোর করে সহ্য করার চেষ্টা করছে। মায়ের মন তো, ছেলের এই ছোট কষ্টটুকুও তাঁর নজর এড়াল না।

তিনি খুব নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন, "তোর কি সত্যিই খুব লাগছে কাপড়টাতে?"

রাহুল নিষ্পাপভাবে মাথা নাড়ল। "হ্যাঁ... কিন্তু বাদ দাও, এভাবেই ঠিক আছে। তুমি শুধু আমার কাছে থাকো।"

ইন্দিরা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে ভাবলেন। তারপর একটা মৃদু হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে বললেন, "ঠিক আছে... তুই কষ্ট পাবি, সেটা আমি চাই না। আমি হয়তো ব্লাউজটা খোলার কথা ভাবতে পারি... তবে সেটা তোকে অর্জন করতে হবে।"

রাহুলের চোখদুটো আনন্দে বড় বড় হয়ে গেল। "অর্জন করতে হবে? মা... এটা তো আবার সেই বার্টার সিস্টেমের মতো শোনাচ্ছে!"

"হ্যাঁ," ইন্দিরা প্রশ্রয়ের গলায় বললেন, "এটা আরেকটা বার্টার সিস্টেম।"

"কী করতে হবে আমাকে?" রাহুলের গলায় তখন তীব্র উত্তেজনা।

"আমি তোকে এতক্ষণ ভারতীয় রসায়নবিদদের ইতিহাস নিয়ে যা পড়ালাম," ইন্দিরা শান্ত গলায় বললেন, "সেখান থেকে আমি তোর মৌখিক টেস্ট নেব।"


৪.৫. নতুন চুক্তি ও বার্টার সিস্টেম

রাহুলের চোখদুটো অবিশ্বাসে বড় বড় হয়ে গেল। "মৌখিক টেস্ট? এই আদরের সময়ের মধ্যে?"

ইন্দিরার ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু, কৌতুকী হাসি ফুটে উঠল। "এটাকে তুই আদর-সংলগ্ন শিক্ষণপদ্ধতি বা ‘কাডল-এম্বেডেড পেডাগজি’ হিসেবে ধরে নিতে পারিস। স্নেহ আর শিক্ষার এক অপূর্ব কম্বিনেশন। তুই একটা নতুন আবদার করেছিস, তাই শর্তও নতুন হবে।"

"মা!" রাহুল সামান্য সোজা হয়ে বসে প্রতিবাদ জানাল। "এটা তো আমাকে আরও একটা পরীক্ষা দিতে বাধ্য করা! আমি আজকেই একটা পরীক্ষা দিয়ে এলাম!"

"এবং তুই সেটা ফাটাফাটিভাবে শেষ করেছিস," ইন্দিরার গলার স্বর উষ্ণ হলেও বেশ দৃঢ় শোনাল। "আর ঠিক সেই কারণেই আমি জানি যে তুই ভারতের রসায়নবিদদের ইতিহাস নিয়ে আমি এতক্ষণ যা বললাম, তার ওপর কিছু সাধারণ প্রশ্নের উত্তর খুব সহজেই দিতে পারবি। বল, রাজি?"

রাহুল ক্ষণিকের জন্য চুপ করে রইল, ওর মুখে এক গভীর চিন্তার রেখা ফুটে উঠল। ও বুঝতে পারছিল মায়ের এই সিল্কের খসখসে ভাবটা না সরালে ও কিছুতেই শান্তিতে মাকে জড়িয়ে ধরে শুতে পারবে না। ওর চোখদুটো সেই চেনা জেদ আর সংকল্পের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

"ঠিক আছে, আমি রাজি," সে বলল। "কিন্তু এটা যেহেতু একটা সম্পূর্ণ নতুন শর্ত, তাই আমি চাই এরও একটা অফিশিয়াল কন্ট্রাক্ট হোক। একদম আগেরটার মতো।"

ইন্দিরা একটা ভ্রু তুললেন। এই ছেলেটা—এই অত্যন্ত মেধাবী, দুঃসাহসী ছেলেটা—আজ ওঁর সাথেই দরকষাকষি করছে! 

"বেশ," তিনি বালিশে পিঠ ঠেকিয়ে আরাম করে বসলেন এবং বেডসাইড টেবিলে রাখা সাদা কাগজ আর কলমটার দিকে হাত বাড়ালেন। "ডিমান্ডগুলো যেহেতু তোর তরফ থেকে আসছে, তাই টার্মসগুলো ঠিক করার দায়িত্ব আমার।"

তিনি নোটবুকের একটা নতুন ফাঁকা পাতা বের করলেন; রাহুল তৎক্ষণাৎ গুটিসুটি মেরে ওঁর একদম পাশে এসে বসল এবং ওঁর লিখে যাওয়া দেখতে লাগল।

"তুই একদিন আমাকে পাগল করে ছাড়বি," পাতা জুড়ে কলম চালানোর সময় তিনি বিড়বিড় করে বললেন। "বড্ড লোভী আর একগুঁয়ে একটা বাঁদর, তাই না তুই?"

"আমি তো আমার সেরা টিচারের কাছ থেকেই শিখেছি," রাহুল বেশ প্রফুল্ল কণ্ঠে বলল, আর ইন্দিরা নিজের অজান্তেই আবার হেসে ফেললেন।

লেখা শেষ করে তিনি কাগজের পাতাটা উঁচিয়ে ধরলেন এবং উচ্চস্বরে পড়তে লাগলেন:

"শর্তাবলী:

রাহুল সেনকে ইতিহাস বিভাগের প্রধান ডক্টর ইন্দিরা সেনের দ্বারা নির্ধারিত 'ভারতের রসায়নবিদদের ইতিহাস'-এর ওপর তিনটি মৌখিক প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে হবে। কেবল এই পরীক্ষা সফলভাবে কমপ্লিট হলেই 'স্বাচ্ছন্দ্য সমন্বয়' (Comfort Adjustment) নামক ক্লজটি অ্যাক্টিভ করা হবে।

এই 'স্বাচ্ছন্দ্য সমন্বয়'-এর অধীনে, কাপড়ের খসখসে ভাব দূর করার উদ্দেশ্যে এবং মিউচুয়াল কমফোর্টের জন্য ইন্দিরা সেন তাঁর সিল্কের ব্লাউজটি খুলে ফেলবেন।

এর ঠিক পরেই মা ও ছেলের নিবিড় সান্নিধ্য বা কাডলিং পুনরায় শুরু করা হবে।

স্বাক্ষরকারী: ইন্দিরা সেন।"

তিনি একটু থামলেন, তারপর রাহুল কাগজটা হাত বাড়িয়ে নেওয়ার আগেই ওটা আবার নিজের দিকে টেনে নিলেন এবং দ্রুত ও সুনির্দিষ্ট টানে আরও দুটো পুনশ্চ (P.S.) যোগ করলেন:

"পুনশ্চ ১: একটা প্রশ্নের উত্তরও যদি ভুল হয়, তবে এই কন্ট্রাক্ট সম্পূর্ণ বাতিল বলে গণ্য হবে এবং তোকে এক্ষুনি তোর পড়ার টেবিলে গিয়ে একা পড়াশোনা শুরু করতে হবে।

পুনশ্চ ২: মনে রাখিস—আমি তোর মা। আমাদের এই পার্সোনাল টাইম, বা মা'র কাছে আজ রাতে কতটা আদর খেলি — এগুলো কেবলই আমাদের দুজনের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। এই ধরনের অদ্ভুত চুক্তির কথা কোনো বন্ধু বা ক্লাসমেটের কাছে যেন ঘুণাক্ষরেও লিক না হয়, বিশেষ করে মায়ের ব্লাউজ খোলার এই শর্ত নিয়ে তো এক্কেবারেই নয়! এটি অত্যন্ত সিরিয়াস এবং কঠোর গোপনীয়তার বিষয়!"

তিনি এক নাটকীয় গম্ভীরতার সাথে কাগজটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিলেন। "এই নে। এবার তোর মনঃপূত হয়েছে, মিস্টার সেন?"

রাহুল অত্যন্ত মন দিয়ে কন্ট্রাক্টটা পড়তে লাগল; যখন সে ব্লাউজ খোলার উল্লেখ থাকা অংশটায় পৌঁছাল, ওর মুখে এক চওড়া হাসি ফুটে উঠল।

"মা, তুমি সত্যিই এই কথাটা কন্ট্রাক্টে লিখে দিলে?" সে খিলখিল করে হেসে উঠল, চোখদুটো কৌতুক আর আনন্দে নাচছে। "মানে, ব্লাউজ খোলার ব্যাপারটা? কেউ দেখলে কী ভাববে!"

"তুই-ই তো ফর্মাল ডকুমেন্টের কথা বললি," ইন্দিরা কপট গাম্ভীর্যের সাথে বললেন, যদিও তাঁর ঠোঁটের কোণে হাসি লুকিয়ে ছিল। "আর তা ছাড়া, তোকে তো আমি খুব ভালো করেই চিনি। একটু পরেই হয়তো তুই অন্য কোনো বাহানা খুঁজতিস, বলতিস যে শোয়ার পজিশন ঠিক হচ্ছে না বা আরও কিছু। স্টুডেন্টরা যাতে কন্ট্রাক্টের ফাঁকফোকর দিয়ে নতুন কোনো আবদার না জুড়ে বসতে পারে, সেই জন্যই একজন প্রফেসর হিসেবে আমি সবকিছুর একদম স্পষ্ট ডকুমেন্টেশন রাখতেই পছন্দ করি। এটাই তোর আজকের রাতের শেষ আবদার, এরপর আর কোনো ঘ্যানঘ্যানানি চলবে না, বুঝেছিস?"

রাহুল হাসতে হাসতে মায়ের কাঁধে মাথা ঘষল। "উফ্ মা, তুমি জাস্ট জিনিয়াস। না না, আমি আর কোনো আবদার করব না, প্রমিস।"

ইন্দিরা ওর মাথায় হালকা চাঁটি মারলেন। "আগে তো প্রশ্নের উত্তরগুলো দে, তারপর প্রমিসের কথা ভাবা যাবে।"

কিন্তু কন্ট্রাক্টের শেষ পুনশ্চ—অর্থাৎ গোপনীয়তার অংশটুকু পড়ার সময় রাহুলের মুখের সেই চপল কৌতুকটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গিয়ে এক ধরনের গাম্ভীর্য দানা বাঁধল।

"তোমার এই শেষ অংশটা না লিখলেও চলত," সে খুব নিচু স্বরে বলল, কাগজটা বিছানায় নামিয়ে রেখে মায়ের দিকে চোখ তুলে তাকাল। "আমি তো কাউকেই কোনোদিন কিচ্ছু বলব না, মা। এটা তো শুধু আমাদের ব্যাপার।"

"আমি জানি তুই বলবি না," ইন্দিরা ওর কপালের ওপর থেকে চুলটা সরিয়ে দিয়ে নরম গলায় বললেন। "তবু, সাবধানের মার নেই। তুই তো জানিস তোর বাবা বা বাইরের কেউ এই ধরনের ইমোশনাল ব্যাপারগুলো কতটা বাঁকা চোখে দেখে।"

রাহুল একটুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ইতস্তত করে বলল, "কিন্তু মা... তোমার কি মনে হয়, আমার বন্ধুদের মায়েরাও কি তাদের ছেলেদের সাথে এই ধরণের কোনো... কন্ট্রাক্ট করে?"

ইন্দিরা ওর চোখের দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকালেন। "কেন বল তো?"

"মানে..." রাহুল শব্দ হাতড়াতে লাগল, ওর গলার স্বরটা এখন পুরোপুরি একজন লাজুক, সাধারণ কলেজ-পড়ুয়ার মতো। "অন্য ছেলেরাও কি তাদের মায়েদের সাথে এরকম... মানে এতক্ষণ ধরে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকে? এই যে তুমি আমাকে তোমার গায়ের ওপর শুতে দিচ্ছ, আমার সব আবদার শুনছ, এত আদর করছ... এরকম কি সবার মা করে?"

প্রশ্নটা এতটাই সরল, এতটাই নিষ্পাপ কৌতুকে ভরা ছিল যে ইন্দিরার বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত যন্ত্রণায় মোচড় দিয়ে উঠল। তিনি হাত বাড়িয়ে রাহুলের দু-হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিলেন, তারপর নিজের দুটো হাতের তালুতে ওর মুখটা পরম স্নেহে আগলে ধরলেন।

"না, সোনা," তিনি অত্যন্ত নরম গলায় বললেন, ওঁর কণ্ঠে এমন এক নিবিড় মায়া ঝরে পড়ল যা ওঁর নিজের ভেতরকেও চমকে দিল। "আমার মনে হয় না তোর কোনো বন্ধুর মা তাদের ছেলেদের সাথে ঠিক এই ধরণের কোনো কন্ট্রাক্ট বা অ্যারেঞ্জমেন্ট করে থাকেন।"

তিনি ওর গালে বুড়ো আঙুল বুলিয়ে দিলেন। "বেশিরভাগ ছেলেই তো তোর বয়সে এসে নিজেদের একটা আলাদা জগৎ তৈরি করে নেয়। তারা তখন বন্ধুদের সাথে ঘোরে, নিজেদের মতো থাকে, আর মায়ের আঁচল ধরে বসে থাকতে চায় না। আর মায়েদেরও তো সংসার, কাজ নিয়ে হাজারটা ব্যস্ততা থাকে। এই যে তুই এত বড় হয়ে যাওয়ার পরও আমার বুকে এমনভাবে লেপ্টে আছিস, আমার গায়ের গন্ধ খুঁজছিস, আর আমি তোকে পুরো রাত এভাবে বুকে জড়িয়ে আদর করব বলেছি ... সত্যি বলতে, এটা খুব রেয়ার। মায়েরা সাধারণত এত বড় ছেলেদের এতটা কাছে টানে না।"

রাহুল চোখ বন্ধ করে মায়ের হাতের স্পর্শটা অনুভব করল। কয়েক মুহূর্তের নীরবতা। তারপর ও চোখ খুলে হালকা হেসে বলল, "তার মানে আমি খুব লাকি, তাই না?"

"নাকি আমি লাকি?" ইন্দিরা ফিসফিস করে বললেন, ওঁর চোখে এক অদ্ভুত চিকচিকে আভা। "তোর মতো এমন একটা ধেড়ে, ঘ্যানঘ্যানে আর একগুঁয়ে বাঁদর পেয়েছি বলে!"

রাহুল খিলখিল করে হেসে ফেলল। ও মায়ের হাত দুটো নিজের গাল থেকে নামিয়ে সেখানে আলতো করে চুমু খেল। "তুমি একদম লাকি নও মা। তুমি তো আমার ঘ্যানঘ্যানানি শুনতে শুনতে পাগল হয়ে গেলে। কিন্তু আমি সত্যিই খুব লাকি। কারণ আমার মা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে ভালো, আর সবচেয়ে... কড়া প্রফেসর।"

ইন্দিরা হাসলেন, এক গভীর তৃপ্তির হাসি। এই ছেলেটা জানে কীভাবে ঠিক ওঁর মনটা গলিয়ে দিতে হয়।

"তোর এই মাখন লাগানো কথাগুলো শুনতে আমার খুব ভালো লাগে, জানিস?" ইন্দিরা ওর নাকটা হালকা করে টিপে দিয়ে বললেন। "কিন্তু তুই ভাবিস না যে এই মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে পার পেয়ে যাবি। আমি তোকে এত সহজে ছাড়ব না।"

তিনি একটু থামলেন, তারপর ওঁর গলার স্বরে সেই চেনা শিক্ষিকার কাঠিন্য ফিরিয়ে এনে বললেন, "নিজেকে বড্ড বেশি এগিয়ে নিয়ে যাস না, সোনা। মনে রাখিস, তোর ওই 'স্বাচ্ছন্দ্য' পাওয়ার আগে তোকে প্রথমে ওই তিনটে প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে হবে। একদম নির্ভুলভাবে। তিনটের মধ্যে তিনটেই।"

রাহুল মাথা নাড়ল, ওর চোখে তখন তীব্র প্রতীক্ষা আর জেদের এক অদ্ভুত মিশ্রণ। "আমি পারব। আমি তোমাকে প্রমিস করছি।"

ইন্দিরা একটা মৃদু হাসি হাসলেন, তারপর আবার বালিশে পিঠ ঠেকিয়ে বসলেন। ওঁর মুখের অবয়ব এবার সম্পূর্ণ বদলে গেল; সেখানে সেই চিরচেনা প্রাজ্ঞ, গম্ভীর ও কঠোর অধ্যাপকের রূপটি ফিরে এল—যা ইউনিভার্সিটির বড় বড় সেমিনার বা লেকচার হলের ছাত্রছাত্রীরা দেখে অভ্যস্ত।

"তা হলে," তিনি বললেন, ওঁর গলার স্বরে এখন এক মাপা, সুশৃঙ্খল ছন্দ। "আমরা কি আমাদের পরীক্ষা শুরু করতে পারি, মিস্টার সেন?"
Reply
#6

পঞ্চম পরিচ্ছেদ: স্মৃতির নদী ও চেনা ওম


৫.১. পরীক্ষা এবং শর্তপূরণ

ভারতের রসায়নবিদদের ইতিহাস এবং প্রাচীন রসায়নচর্চার ওপর করা ওই তিনটে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় রাহুলের গলার স্বর একবারের জন্যও কাঁপেনি। বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় ইন্দিরার কঠিন, তীক্ষ্ণ চাউনি যখন ওর মুখের ওপর স্থির, সে তখন নিজের সমস্ত মনোযোগ একত্র করে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে প্রতিটি ঐতিহাসিক তথ্য আর বিজ্ঞানীদের অবদানের কথা বিশ্লেষণ করছিল। প্রথম প্রশ্নটা ছিল আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের ‘মারকিউরাস নাইট্রাইট’ আবিষ্কারের প্রেক্ষাপট নিয়ে; দ্বিতীয়টা ছিল প্রাচীন ভারতের ধাতুবিদ্যা বা মেটালার্জি—বিশেষ করে দিল্লির লৌহস্তম্ভের রাসায়নিক গঠন নিয়ে; আর শেষ প্রশ্নটা ছিল নাগার্জুনের 'রসরত্নাকর' গ্রন্থের মূল নির্যাস সম্পর্কে।

ওঁর সেই প্রাজ্ঞ, অধ্যাপকোচিত মুখোশের আড়ালে যে একটা তীব্র কৌতূহল ও মুগ্ধতা লুকিয়ে ছিল, রাহুল তা স্পষ্ট টের পাচ্ছিল। তৃতীয় প্রশ্নের উত্তরের শেষ বাক্যটা যখন সে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে শেষ করল, ঘরে তখন কয়েক মুহূর্তের এক পিনপতন নীরবতা নেমে এল।

ইন্দিরা নিজের মনে মনে তৈরি করা প্রশ্নপত্রের এই নিখুঁত উত্তর শুনে ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তারপর, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শূন্যে একটা অদৃশ্য নোটবুক বন্ধ করার ভান করে হাতটা বেডসাইড টেবিলে রাখলেন। ওঁর মুখের সেই কড়া শিক্ষিকার ভাবটা এক লহমায় গলে গিয়ে সেখানে এক প্রচ্ছন্ন পরাজয়ের, কিন্তু পরম গর্বের হাসি ফুটে উঠল।

"একদম ঠিক," তিনি মাথাটা সামান্য দোলালেন, কণ্ঠে এক কৃত্রিম বিরক্তির ছোঁয়া। "তুই সত্যিই বড্ড জেদি, রাহুল। একটা তথ্যেও ভুল করলি না! আমি তো আশা করেছিলাম অন্তত নাগার্জুনের বইটার ব্যাপারে বলতে গিয়ে তুই একটু হোঁচট খাবি, আর আমি তোকে সোজা তোর পড়ার টেবিলে পাঠিয়ে দিতে পারব।"

"আমি তোমাকে কথা দিয়েছিলাম মা," রাহুল বিছানায় আরেকটু সোজা হয়ে বসে বলল, চোখে তখন এক অদম্য জয়ের আনন্দ। "বলেছিলাম আমি সব পারব। আর এখন... আমাদের নতুন চুক্তি অনুযায়ী..."

"জানি, জানি," ইন্দিরা হাত তুলে ওকে থামিয়ে দিলেন, মুখে তখন সেই চেনা কৃত্রিম রাগ যা তিনি এই অবাধ্য ছাত্রটির সামনে প্রায়শই প্রকাশ করে থাকেন। "আই অ্যাম আ ওম্যান অফ মাই ওয়ার্ড। ডক্টর ইন্দিরা সেন নিজের সই করা কন্ট্রাক্ট কোনোদিন ব্রেক করেন না। কিন্তু খবরদার! এটা নিয়ে পরে যদি একটাও ইয়ার্কির কথা শুনেছি..."

কথাটা শেষ না করেই তিনি বিছানায় সামান্য সোজা হয়ে বসলেন। শাড়ির ভারী আঁচলটা তো আগেই সরিয়ে রাখা ছিল। ওঁর নড়াচড়ার মধ্যে এক ধরনের ধীরতা ছিল, যা এই নিষিদ্ধ মুহূর্তের তীব্রতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল। তিনি হাত বাড়িয়ে সিল্কের ব্লাউজের বোতামগুলো একে একে আলগা করতে লাগলেন। প্রতিটি বোতাম খোলার মৃদু শব্দ যেন এই শান্ত ঘরের বাতাসে এক গভীর প্রতিধ্বনির মতো শোনাল।

ব্লাউজটি শরীর থেকে সরিয়ে বিছানার পাশে রাখতেই ওঁর ফর্সা, মসৃণ কাঁধ এবং পিঠের উপরিভাগ টেবিল ল্যাম্পের উষ্ণ হলুদ আলোয় এক মায়াবী রূপ ধারণ করল। সিল্কের আবরণের নিচে থাকা গাঢ় রঙের, সূক্ষ্ম লেইস ও সুতোর ভারী কাজ করা অন্তর্বাসটি এখন সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। সেই স্বল্প আবরণে তাঁকে এক অদ্ভুত, স্নিগ্ধ অথচ রাজকীয় দেখাচ্ছিল। রাহুলের চোখদুটো স্থির হয়ে গেল। সে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল মায়ের এই অপরূপ সৌন্দর্যের দিকে। এই প্রাজ্ঞ, গম্ভীর নারী—যাঁকে ইউনিভার্সিটির করিডোরে দেখলে সবাই সম্ভ্রমে পথ ছেড়ে দেয়—তিনি আজ কেবলই তার আবদার মেটানোর জন্য নিজের সামাজিক বর্মটুকু খুলে ফেলেছেন। টেবিল ল্যাম্পের আলো ইন্দিরার গলার খাঁজে, কলারবোনে, উন্মুক্ত কাঁধে এবং অন্তর্বাসের লেইসের ওপর একটা নরম, সোনালি আভা তৈরি করেছিল। রাহুলের দৃষ্টিতে কোনো কুণ্ঠা ছিল না, ছিল কেবল এক গভীর, পবিত্র শ্রদ্ধা এবং তীব্র ভালোবাসা।

"কী রে? ওভাবে কী দেখছিস? আয়," ইন্দিরা নরম গলায় বললেন।

রাহুল আর সময় নষ্ট না করে আবার ওঁর দিকে এগিয়ে এল এবং নিজের অনাবৃত বুকটা নিয়ে ওঁর বুকে লেপ্টে শুয়ে পড়ল। ওঁর কাঁধের চেনা খাঁজে মুখ গুঁজে দিয়ে গভীর একটা শ্বাস নিল সে।

কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পেরোতেই রাহুলের কপালে আবার একটা সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল। অস্বস্তিটা যায়নি, বরং যেন আরও বেড়ে গেছে। সিল্কের ব্লাউজটা সরে যাওয়ার পর এখন ওর খালি বুকের ত্বক সরাসরি ঘষা খাচ্ছে ইন্দিরার অন্তর্বাসের সাথে। সুতোর ভারী কাজ করা, লেইস দেওয়া এই অন্তর্বাসটি ব্লাউজের চেয়েও অনেক বেশি খসখসে। রাহুলের নরম ত্বকে সেটা রীতিমতো কুটকুট করে বিঁধছে।

রাহুলের বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। 'এখন কী করব?' সে মনে মনে ভাবল। 'ব্লাউজটা খোলার জন্য তো তাও একটা পরীক্ষা দিলাম, কিন্তু এখন যদি আমি এই ব্রা-টাও খোলার কথা বলি, মা নির্ঘাত আমাকে ঘর থেকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবে। এটা বড্ড বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। তার চেয়ে বরং আমি সহ্য করে নিই। মা যে এতক্ষণ আমাকে বুকে জড়িয়ে শুয়ে আছে, এটাই তো আমার অনেক বড় ভাগ্য।'

সে একটু নড়েচড়ে শুয়ে কষ্টটা মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু ঘর্ষণটা অস্বস্তিকর।

"মা?" রাহুল খুব নিচু, দ্বিধাগ্রস্ত গলায় ডাকল।

"হুম? কী হলো?" ইন্দিরা ওর চুলে হাত বোলাতে বোলাতেই সাড়া দিলেন।

রাহুল এক ঢোক গিলল। "না... মানে..." সে একটু চুপ করে থেকে বলল, "না, কিছু না।"

ইন্দিরার হাত বোলানো একটু ধীর হলো। তিনি রাহুলের মাথার ওপর নিজের থুতনিটা সামান্য ঠেকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "কী হলো রে সোনা? বল?"

"নেভারমাইন্ড, কিছু না..." রাহুল জোর করে একটা হাসির ভান করে বলল, "জাস্ট বলছিলাম... আমার যে কী ভালো লাগছে এখন... আমি খুব হ্যাপি মা। তোমাকে বোঝাতে পারব না।"

ইন্দিরা হাসলেন, কিন্তু ওঁর মনের ভেতর একটা সূক্ষ্ম খটকা কাজ করতে শুরু করল। ছেলেটা বারবার নড়াচড়া করছে কেন? শরীরটা কি খারাপ লাগছে ওর? সারাদিন পরীক্ষার একটা ধকল গেছে, হয়তো কোনো মাসল ক্র্যাম্প বা কিছু? তিনি খুব সন্তর্পণে রাহুলের শ্বাসপ্রশ্বাস এবং নড়াচড়া খেয়াল করতে লাগলেন।

অস্বস্তিটা ঢাকার জন্য রাহুল এবার বকবক করতে শুরু করল। "জানো মা, আজ পরীক্ষার আগে আমি খুব নার্ভাস ছিলাম। তারপর হঠাৎ করে দাসগুপ্ত স্যারের কথা মনে পড়ল। মানে আমাদের কেমিস্ট্রির দাসগুপ্ত স্যার, তুমি তো চেনো..."

ইন্দিরার মন তখন অন্য জায়গায়। তিনি নিজের বুকের কাছে রাহুলের বারবার সামান্য সরে যাওয়া আর চেপে বসার ধরনটা নোটিস করছিলেন। হঠাৎ তাঁর মাথায় বিদ্যুৎঝলকের মতো সত্যিটা আছড়ে পড়ল। 'ব্লাউজটা খোলার পর তো এখন শুধু অন্তর্বাসটাই আছে। আর সেটার লেইসগুলো তো সিল্কের চেয়েও অনেক বেশি খসখসে। ও কি... ও কি ওটার জন্যই কষ্ট পাচ্ছে?'

ইন্দিরার বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। ছেলেটা কষ্ট পাচ্ছে, কিন্তু মায়ের কাছে আর কোনো আবদার করতে সাহস পাচ্ছে না ভেবে মুখ বুজে সহ্য করে যাচ্ছে! তিনি কী করবেন এখন? একজন উনিশ বছরের ছেলের সামনে নিজের অন্তর্বাস খুলে ফেলা? এটা কি ঠিক হবে? সমাজ, সংস্কার, একজন প্রফেসরের গাম্ভীর্য—সবকিছু যেন ওঁর মনের ভেতর তুমুল আলোড়ন তুলতে শুরু করল।

ওঁর দৃষ্টি ঘরের দেওয়ালের দিকে ঘুরে গেল। সেখানে ঠিক টেবিল ল্যাম্পের আলোর সীমানার বাইরে ঝুলছে শ্রীকৃষ্ণের একটি বাঁধানো ছবি। ছবির ফ্রেমের ওপর হালকা আলোর ছটা এসে পড়েছে। ইন্দিরা সেই ছবির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। তিনি যেন জাগতিক জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে হারিয়ে গেলেন।

আর এদিকে রাহুল নিজের অস্বস্তিটা ভুলতে একটানা কথা বলে চলেছে। "...দাসগুপ্ত স্যার তো সেদিন ল্যাবে ঢুকেই ভীষণ রেগে গেলেন। কেউ একজন নাকি বিকার ঠিক করে ধোয়নি। উনি এমনভাবে চেল্লাতে শুরু করলেন যে পুরো ল্যাবরেটরিতে একদম সাইলেন্স নেমে এল..."

"হুম..." ইন্দিরা ছবির দিকে তাকিয়েই যন্ত্রের মতো উত্তর দিলেন।

"...তারপর আমি দেখলাম যে ওটা আসলে আমার পেছনের বেঞ্চের ছেলেটার কাজ ছিল। কিন্তু স্যার তো শুনবেনই না। আমি ভাবলাম বুঝি প্র্যাক্টিকালে জিরো বসিয়ে দেবেন..."

"হ্যাঁ..."

"...মা, তুমি কি শুনছ?" রাহুল হঠাৎ একটু মুখ তুলে জিজ্ঞেস করল।

ইন্দিরা এক লহমায় বাস্তবে ফিরে এলেন। ছবির দিক থেকে চোখ সরিয়ে একটু চমকে উঠে বললেন, "অ্যাঁ? হ্যাঁ হ্যাঁ, শুনছি তো। তারপর কী হলো দাসগুপ্ত স্যারের?"

"তারপর আর কী, অনেক কষ্টে স্যারকে বোঝানো গেল..." রাহুল আবার বলতে শুরু করল, আর ইন্দিরা আবার সেই কৃষ্ণের ছবির দিকে তাকিয়ে নিজের ভাবনায় তলিয়ে গেলেন।

'ও তো আমার নিজের নাড়িছেঁড়া ধন,' ইন্দিরার ভেতরের মাতৃত্ব যেন সমাজের সমস্ত নিয়মকে চ্যালেঞ্জ করে বসল। 'ও কষ্ট পাচ্ছে, আর আমি এখানে সংস্কার নিয়ে বসে আছি? কিসের সংস্কার? কার জন্য? এই তো আমার সেই ছোট্ট রাহুল, যে একটু আগেও আমার বুকে মাথা ঘষে আদর খাচ্ছিল। ওর কাছে আমার আবার কিসের লুকোছাপা?'

হঠাৎ করেই ইন্দিরার সমস্ত দ্বন্দ্ব কেটে গেল। এক গভীর, শর্তহীন এবং অনন্ত মাতৃস্নেহ তাঁর সমস্ত আড়ষ্টতাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। তিনি মাঝপথেই রাহুলের কথা থামিয়ে দিয়ে ডাকলেন, "রাহুল?"

"কী মা?" রাহুল কথা থামিয়ে ওঁর গলার দিকে মুখ রেখে জিজ্ঞেস করল।

"একটু উঠে বোস তো সোনা।"

রাহুল এবার সত্যিই বেশ ঘাবড়ে গেল। ওঁর কথায় কোনো রাগ ছিল না ঠিকই, কিন্তু এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য ছিল। সে বাধ্য ছাত্রের মতো ধড়ফড় করে সোজা হয়ে বসল। "কী হলো মা? এনিথিং রং? তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে?"

ইন্দিরাও পিঠ থেকে বালিশটা সরিয়ে বিছানায় সোজা হয়ে বসলেন। তিনি রাহুলের চোখের দিকে তাকালেন। ওঁর সেই সুন্দর, প্রাজ্ঞ চোখদুটো আজ কোনো শিক্ষিকার চোখ নয়—সেগুলো এখন আবেগে, মমতায় এবং এক অসীম ভালোবাসায় টলটল করছে। সেই চোখের গভীরে এমন এক সর্বগ্রাসী মাতৃত্বের রূপ ছিল যা দেখে রাহুলের বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত শ্রদ্ধায় ও ভালোবাসায় কেঁপে উঠল। পরিস্থিতিটা এতটাই ভারী আর সূক্ষ্ম হয়ে উঠেছে যে ঘরের নীরবতা যেন কানে তালা লাগিয়ে দিচ্ছিল।

"মা? কী হয়েছে?" রাহুল আবারও জিজ্ঞেস করল, ওর গলার স্বর এবার সত্যিই চিন্তিত।

ইন্দিরা একদৃষ্টে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর অত্যন্ত নিবিড়, প্রায় ফিসফিস করা একটা অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে বললেন, "তোর কোনো কষ্ট মা দেখতে পারে না রে সোনা..."

কথাটা এতটাই আস্তে বলা হয়েছিল যে রাহুল পুরোপুরি শুনতেও পেল না। "কী বললে মা? আমি ঠিক শুনতে পেলাম না।" সে প্রশ্ন করতে যাবে, ঠিক তখনই সে দেখল ইন্দিরা তাঁর দুই হাত নিজের পিঠের দিকে নিয়ে গেলেন।

রাহুলের চোখের সামনেই, অত্যন্ত ধীর এবং সাবলীল ভঙ্গিতে ইন্দিরার আঙুলগুলো তাঁর অন্তর্বাসের হুকগুলো খুঁজে নিল। একটা মৃদু 'ক্লিক' শব্দ হলো, আর পিঠের ওপর আটকে থাকা ইলাস্টিকের টানটা এক মুহূর্তে আলগা হয়ে গেল। তিনি কাঁধ থেকে সরু ফিতে দুটো নামিয়ে দিলেন, এবং রেশমি সুতোর সেই আবরণটি ওঁর শরীর থেকে খসে বিছানার ওপর লুটিয়ে পড়ল।

রাহুল স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। ওর চোখদুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেছে, বুকের ভেতর হৃৎস্পন্দনের গতি এত তীব্র যে ও নিজের কানের কাছে সেই আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিল। ও ওঁর দিকে তাকাল—লজ্জা, বিস্ময় আর পরম শ্রদ্ধার এক অদ্ভুত মিশ্রণ ওর চোখে। এই প্রথম সে ওঁর এই রূপটা দেখছে। সে ওঁর ছেলে, ওঁর শরীরেরই এক অংশ, কিন্তু আজ এই যুবকের চোখে ইন্দিরা কেবলই একজন জননী নন—তিনি এক পরম রূপবতী নারী, এক সর্বংসহা মা, যিনি নিজের সমস্ত সামাজিক বর্ম ও লজ্জা খুলে আজ কেবলই ছেলের সামান্যতম কষ্ট দূর করার জন্য নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করেছেন। ওঁর অনাবৃত বক্ষ আর সুডৌল শরীরের এই নিভৃত সৌন্দর্য রাহুলকে এক গভীর ঘোরের মধ্যে ঠেলে দিল।

ওর এই আড়ষ্টতা দেখে ইন্দিরার মুখের সেই সামান্য গাম্ভীর্যটুকু মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে গেল। ওঁর চোখজোড়া আরও নরম হয়ে এল, সেখানে এক পরম আশ্বাস আর স্নেহের নদী বয়ে গেল। তিনি নিজেই একটু এগিয়ে এলেন ওর দিকে, অনাবৃত হাত বাড়িয়ে ওর থতমত খেয়ে যাওয়া গাল দুটো আলতো করে ছুঁলেন।

"কী হলো, সোনা?" তিনি অত্যন্ত মৃদু, নিচু স্বরে বললেন, গলার স্বর যেন এক শীতল প্রলেপের মতো ওর সমস্ত স্নায়বিক উত্তেজনাকে জুড়িয়ে দিল। "এতক্ষণ তো কত কথা বলছিলিস... এখন এভাবে কাঠের পুতুলের মতো জমে গেলি কেন? ভয় পাচ্ছিস?"

রাহুল এক ঢোক গিলল। "আমি... আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, মা। তুমি... তোমাকে বড্ড অন্যরকম লাগছে।"

"ধুর পাগল," ইন্দিরা আলতো করে ওর গালে একটা টোকা দিলেন, ওঁর সত্তার গভীর থেকে এক চেনা মাতৃত্বের ওম তখন পুরো অবয়বে ছড়িয়ে পড়েছে। "অন্যরকম কেন লাগবে? এটা তো আমি... তোর মা। এই শরীরের ভেতরেই তো তুই নটা মাস ছিলি, মনে নেই? আমার থেকে লজ্জা পাওয়ার বা আমাকে দেখে ভয় পাওয়ার তো কিছু নেই, সোনা। আয়।"


৫.২. একাত্ম হওয়া ও হারানো স্মৃতির খোঁজ

কথাটা বলে ইন্দিরা বিছানার মাঝখানে আরেকটু পিছিয়ে গেলেন এবং বালিশ দুটো টেনে নিয়ে ধীর ভঙ্গিতে শুয়ে পড়লেন। ওঁর অনাবৃত পিঠ আর কাঁধ বিছানার চাদরের নরম স্পর্শ পেল। তিনি এক হাত বাড়িয়ে রাহুলকে ওঁর পাশে শুয়ে পড়ার ইশারা করলেন।

রাহুল আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে ওঁর ঠিক পাশে, একদম সমান্তরালে শুয়ে পড়ল। ইন্দিরা আলতো করে একপাশে কাত হলেন, ওঁর পুরো শরীরটাকে রাহুলের দিকে ফিরিয়ে দিলেন, আর রাহুলও ওঁর দিকে ঘুরে ওঁর আরও কাছাকাছি এগিয়ে এল। তাঁদের মাঝখানের সামান্য দূরত্বটুকুও মুছে গেল যখন রাহুল নিজের অনাবৃত বুকটা ওঁর নরম, উষ্ণ স্তন ও উদরের ওপর পুরোপুরি সঁপে দিল। সে কোমরের ওপর এক হাত জড়িয়ে ধরে ওঁর অনাবৃত পিঠটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল, আর নিজের মুখটা গুঁজে দিল ওঁর কাঁধের চেনা ভাঁজে। ইন্দিরাও ওঁর অন্য হাতটি দিয়ে রাহুলের মাথাটা নিজের বুকের সাথে আরও নিবিড়ভাবে চেপে ধরলেন।

পরম মুহূর্ত।

এক সম্পূর্ণ অন্যরকম অনুভূতিতে রাহুলের চোখদুটো বন্ধ হয়ে এল। ওঁর মসৃণ, উষ্ণ ত্বকের সাথে ওর নিজের ত্বকের এই নিবিড় সংযোগ—এই শারীরিক ছোঁয়াটা ওর মনের ভেতরের সমস্ত সংশয় আর সামাজিক নিষেধের দেওয়ালকে এক তুড়িতে গুঁড়িয়ে দিল। অন্তর্বাসের সেই খসখসে লেইসের কোনো অস্তিত্ব আর নেই; এখন কেবলই এক তুলনাহীন, রেশমি মসৃণ উষ্ণতা। ওঁর গায়ের সেই পরিচিত সুবাস—যা এখন আরও অনেক বেশি তীব্র, অনেক বেশি মাদকীয়—ওকে এক পরম শান্তির জগতে নিয়ে গেল।

"মা..." রাহুল প্রায় ফিসফিসিয়ে উঠল, গলার স্বর আবেগে বুজে আসছিল। "এই ফিলিংসটা... এই ছোঁয়াটা যে কতটা অদ্ভুত সুন্দর, আমি তোমাকে বোঝাতে পারব না। আমার জীবনে এর আগে কোনোদিন এমন ফিল হয়নি। মনে হচ্ছে... মনে হচ্ছে আজ সত্যি সত্যি আমি আমার মায়ের পুরো ভালোবাসাটা পাচ্ছি। একদম নিজের করে।"

ইন্দিরা হাত দুটো ওর পিঠের ওপর বোলাতে লাগলেন, আঙুলগুলো ওর শিরদাঁড়ার ওপর এক শান্ত ছন্দ তৈরি করছিল। ওঁর নিজের বুকের ভেতরটাও এক মাতৃত্বের আদিম আকুলতায় ভারী হয়ে উঠেছিল।

"পাগল ছেলে একটা," তিনি ওর চুলে নিজের মুখ ঘষতে ঘষতে বললেন, বিছানার উষ্ণতায় তাঁদের এই জড়িয়ে থাকা এখন আরও বেশি আরামদায়ক ঠেকছে। "'অদ্ভুত সুন্দর' নাকি! নিজের মা কেই তো জড়াচ্ছিস, এতে অদ্ভুত তো কিছু নেই সোনা। আর লজ্জা পাওয়ারই বা কী আছে? তুই যখন একদম ছোট্ট একটা পুঁচকে ছিলি, তখন তো তুই সারাদিন এভাবেই আমার বুকের ওপর শুয়ে থাকতিস। তুই যখন খুব কাঁদতিস, ডাক্তারবাবু বলতেন তোকে জামাকাপড় ছাড়া আমার এই খোলা বুকে শুইয়ে রাখতে—যাতে তুই আমার হার্টবিট শুনতে পাস। তুই আমার এই বুক থেকেই তোর জীবনের প্রথম খাবার পেয়েছিস, সোনা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তুই এভাবেই আমার গায়ের সাথে গা লাগিয়ে ঘুমিয়ে থাকতিস।"

রাহুল ওঁর বুকের সেই নরম ওমে নিজের মুখটা আরও একটু চেপে ধরল, ওঁর গলার কণ্ঠনালীর পাশে ওর উষ্ণ শ্বাস আছড়ে পড়ছিল। "কিন্তু আমার তো সেইসব দিনের কোনো মেমোরি নেই, মা। আমার মনে পড়ে না যে আমি তোমার বুক থেকে দুধ খেয়েছি, বা তোমার এই গায়ের ওম পেয়েছি। সেই জন্যই বোধহয়... আজ যখন এভাবে তোমাকে ছুঁলাম, এটা বড্ড নতুন লাগছে। একটু অদ্ভুত, কিন্তু বড্ড চেনা একটা শান্তি।"

ইন্দিরা একটা হালকা খিলখিল করে হেসে উঠলেন—এক পরম তৃপ্তির হাসি। "কিসব ভারী ভারী কথা বলতে শিখে গেছে আমার ছোট্ট রাহুলটা!" একটু থেমে বললেন, "আরে বাবা তা তো বটেই! মেমোরি থাকবে কী করে? তখন তো তোর মাথায় শুধু একটাই চিন্তা ছিল—কখন খিদে পাবে আর কখন মায়ের বুকে মুখ দিবি! এতো পরীক্ষা, এতো অ্যাসাইনমেন্ট, এতো চাপ তো তখন তোর মাথায় ঘুরত না!"

ওর পিঠের ওপর হাত বোলানো আরও যেন আদুরে হয়ে এল, ওঁর চোখদুটো যেন অনেক বছর পেছনের এক হারিয়ে যাওয়া সোনালি সময়ে ফিরে গেল। ওঁর কোল জুড়ে থাকা সেই ছোট্ট রাহুলটার মুখ চোখের সামনে ভেসে উঠল।

"জানিস রাহুল," ইন্দিরা সেই নিবিড় আলিঙ্গনে আবদ্ধ থেকেই স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে বলতে লাগলেন, গলার স্বর এক রূপকথার গল্পের মতো শোনাল, "তুই যখন বড্ড ছোট ছিলি, তখন তোকে সামলানো যে কী কঠিন ছিল! বিশেষ করে ওই খাওয়ানোর সময়টা। তুই কিছুতেই শান্ত হয়ে বসতিস না। আমার শাড়ির আঁচলটা ধরে টানতিস, তোর ওই ছোট্ট ছোট্ট হাত দুটো দিয়ে আমার বুকে কিল-চড় মারতিস। আর যখন তোর পেট ভরে যেত, তুই আমার এই বুকের ওপরেই মুখ রেখে এত সুন্দর করে একটা তৃপ্তির হাসি দিতিস... আমার সারাদিনের সব ক্লান্তি এক লহমায় মুছে যেত।"

রাহুল চুপচাপ শুনছিল কথাগুলো, ওঁর প্রতিটি শব্দ মনের ভেতর এক অদ্ভুত মায়ার জাল বুনছিল।

"শুধু খাওয়ানোর সময়ই নয়," ইন্দিরা একটু মুচকি হেসে যোগ করলেন, আঙুলগুলো ওর কানের লতি ছুঁয়ে গেল। "আরও একটা সময় ছিল যখন আমরা এভাবেই একদম গায়ে গা লাগিয়ে থাকতাম... যখন আমি তোকে স্নান করাতাম।"

রাহুল বুক থেকে মাথাটা সামান্য তুলল, ওর চোখে এক তীব্র কৌতূহল আর বিভ্রান্তি। "স্নান করানোর সময়? কিন্তু তখন তুমি কেন এভাবে থাকতে, মা? তুমি কি নিজের ড্রেস খুলে আমাকে স্নান করাতে?"

ইন্দিরা ওর এই বোকা বোকা প্রশ্নটা শুনে ওর নাকে আলতো করে একটা চিমটি কেটে দিলেন। "ওরে আমার বোকা বিজ্ঞানী! তোর কি মনে হয় আমি শখ করে ওরম করতাম? তুই তখন এতটাই ছোট ছিলি যে একা একা বসতেও পারতিস না। আর তাছাড়া..." তিনি একটু থামলেন, চোখদুটো যেন অতীতের কোনো সুতীব্র অনুভূতির কথা মনে করে আনমনা হয়ে গেল। "তোর জন্মের পর আমার এক অদ্ভুত প্যানিক ডিসঅর্ডার বা ওই ধরনের কিছু একটা শুরু হয়েছিল, জানিস? আমি তোকে এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করতে পারতাম না। আমার সারাক্ষণ মনে হতো, এই বুঝি তোর কিছু একটা হয়ে যাবে।"

রাহুল অবাক হয়ে বলল, "সত্যি? তুমি এত ভয় পেতে?"

"ভয় মানে? সাংঘাতিক ভয়! তোর বাবার তো ব্যবসার হাজারটা কাজ, আর আমাকেও সকাল সকাল রেডি হয়ে ইউনিভার্সিটিতে লেকচার দিতে ছুটতে হতো। তোর দেখাশোনার জন্য আমরা একটা খুব ভালো আয়া রেখেছিলাম ঠিকই, কিন্তু আমি যতক্ষণ বাড়িতে থাকতাম, ওকে তোর ধারেকাছেও ঘেঁষতে দিতাম না। ইউনিভার্সিটিতে থাকার সময়টুকু বাধ্য হয়েই ওকে তোর দায়িত্ব দিতাম, কিন্তু বাড়িতে থাকলে তোর সব কাজ—তোর খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো, স্নান করানো—সব আমি নিজের হাতে করতাম। আমার কিছুতেই ওই আয়ার ওপর ভরসা হতো না। মনে হতো, যদি ও তোকে স্নান করাতে গিয়ে পিছলে ফেলে দেয়? যদি ওর অবহেলায় তোর নাকে-মুখে জল ঢুকে যায়?"

"বাব্বা! ডক্টর সেনের এত পজেসিভনেস!" রাহুল খিলখিল করে হেসে উঠে মায়ের অনাবৃত বুকে নিজের নাকটা ঘষে দিল।

ইন্দিরা ওর চুলে একটা কৃত্রিম ধমকের সুরে হালকা টান দিলেন। "পজেসিভনেস নয় রে বাঁদর, ওটা হলো মায়ের চিন্তা। তা তোকে স্নান করানোর ওই সময়টা ছিল আমার সারাদিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে আমার ইউনিভার্সিটিতে যাওয়ার তাড়া, নিজে স্নান করে রেডি হতে হবে; অন্যদিকে তোকেও স্নান করাতে হবে। তোকে গামলায় বসিয়ে আমি যদি অন্য ঘরে স্নান করতে যেতাম, আমার হার্টবিট বেড়ে যেত এই ভেবে যে তুই উল্টে পড়ে গেলি কি না। আবার তোকে স্নান করিয়ে তারপর নিজে স্নান করতে গেলে বড্ড দেরি হয়ে যেত।"

"তা হলে এই সমস্যার কী লজিক্যাল সমাধান বের করেছিলেন আমাদের হিস্ট্রি প্রফেসর?" রাহুল মায়ের কাঁধের ভাঁজে মুখ রেখে আদুরে গলায় জানতে চাইল।

"সমাধান একটাই ছিল—দুজনের একসাথে স্নান," ইন্দিরা প্রশ্রয়ের হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে বললেন। "আমি বাথরুমে ঢুকেই আগে নিজের জামাকাপড় সব খুলে ফেলতাম। তারপর তোকে আমার এই খালি কোলের ওপর বসিয়ে জল ঢালতাম। তুই সাবান মাখা গায়ে আমার গা বেয়ে ব্যাঙের মতো পিছলে যেতে চাইতিস, আর আমি তোকে শক্ত করে ধরে নিজের গায়ের সাথে চেপে রাখতাম। আমরা দুজনেই একসাথে স্নান করতাম। তুই জল নিয়ে দু-হাত দিয়ে ছপছপ করে মারতিস, আর সেই জল ছিটকে এসে আমার চোখে-মুখে লাগত... আর তুই সেটা দেখে খিলখিল করে হাসতিস।"

রাহুলের মুখের বিভ্রান্তি কেটে গিয়ে সেখানে এক পরম মুগ্ধতা ফুটে উঠল। সে কল্পনা করার চেষ্টা করল—এক তরুণী ইন্দিরা, সম্পূর্ণ বিবস্ত্র অবস্থায় বাথরুমের মেঝের ওপর বসে আছেন, আর ওঁর কোলে সেই ছোট্ট পুঁচকে রাহুলটা জলের মধ্যে খেলা করছে। মায়ের শরীর আর সন্তানের শরীর এক হয়ে গেছে জলের ধারায়। মায়ের এই যুক্তি আর সীমাহীন ভালোবাসার কাছে সে যেন চিরতরে হেরে গেল।

"তুমি সত্যিই বড্ড ভালো মা," রাহুল এক গভীর আবেগে বলে উঠল। ওর বুকের ভেতরের সেই অবরুদ্ধ ভালোবাসা যেন বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইল। সে আবার ওঁর গলার কাছে নিজের মুখটা ফিরিয়ে নিয়ে গেল এবং ওঁর ডান গালে একটা গভীর চুমু খেল।

"থ্যাঙ্ক ইউ মা," সে বলল এবং ওঁর অন্য গালে আর একটা চুমু খেল। "আজকে এই রাতটা আমাকে দেওয়ার জন্য... থ্যাঙ্ক ইউ।" সে ওঁর কপালে, চিবুকে, গলার সেই নরম ত্বকে পরপর বেশ কয়েকবার আলতো করে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। প্রতিটি চুমু ছিল এক পরম কৃতজ্ঞতা আর এক অবাধ্য ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।

"আহ্, রাহুল! কী করছিস? ছাড়!" ইন্দিরা নিজের মুখটা সামান্য সরিয়ে নেওয়ার ভান করলেন, কণ্ঠে সেই চিরচেনা কৃত্রিম বিরক্তি। "তুই তো দেখছি একদম ল্যাম্পপোস্টের মতো আমার ওপর চেপে বসলি! বড্ড বেশি লাই পেয়ে গেছিস তো, মাথা চড়ে গেছে একদম!"

কিন্তু এই মুখের কথার সাথে ওঁর শরীরের কোনো মিল ছিল না। ওঁর হাত দুটো রাহুলের পিঠকে আরও জোরে, আরও শক্ত করে নিজের অনাবৃত বুকের সাথে চেপে ধরল। ওঁর স্তনজোড়া রাহুলের বুকের পেশিতে আরও গভীরভাবে লেপ্টে গেল। দুই শরীরের দুইজোড়া বৃন্ত একে ওপরের সংস্পর্শে এসে তা দুই আত্মার গভীরে এক অনির্বচনীয় ও পরম পবিত্র শিহরণের স্ফুরণ ঘটাল। ইন্দিরা চোখদুটো বন্ধ করে রাহুলের এই অবাধ্য আদরগুলোকে পরম তৃপ্তিতে নিজের শরীরে গ্রহণ করতে লাগলেন। ভেতরের সেই কঠোর অধ্যাপক আজ ছেলের এই নিবিড় আলিঙ্গনের গভীরে সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছেন।

"আমি তো তোমার সেই ছোট্ট সোনাটাই আছি, মা," রাহুল গলার খাঁজে মুখ গুঁজে একদম শিশুর মতো করে আবদারের সুরে ফিসফিসিয়ে বলল। "আজকের পুরো রাতটা আমি এভাবেই তোমার গায়ের ওম নিয়ে তোমার বুকে লেপ্টে থাকব। তুমি কিন্তু একদম দূরে সরে যেতে পারবে না, এটা আমাদের অফিশিয়াল কন্ট্রাক্ট!"

ইন্দিরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন—যার মধ্যে মিশে ছিল এক অদ্ভুত আত্মসমর্পণ আর অগাধ স্নেহ। তিনি ওর চুলে পরম মমতায় হাত বোলাতে বোলাতে ওকে বুকের সাথে আরও একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন।

"কপালে আমার আস্ত একটা একগুঁয়ে বাঁদর জুটেছে," তিনি কৃত্রিম আক্ষেপের সুরে বললেন, অথচ গলার স্বর তখন মায়ায় বুজে এসেছে। সামান্য ঝুঁকে তিনি ওর কপালে ওঁর ঠোঁট দীর্ঘক্ষণ ছুঁইয়ে রাখলেন, তারপর অত্যন্ত নিবিড় ও ভালোবাসাময় স্বরে ফিসফিস করে বললেন, "চুক্তি যখন করেছি, তখন তো আর পালানোর উপায় নেই রে। তুই যেমনটি চাস ঠিক তেমনটিই হবে, সোনা—আমি আজ সারারাত এভাবেই তোকে আগলে রাখব।"

৫.৩. কালান্তরের আলাপন

গল্পে, কথায় আর আদরে কখন যে সময় হারিয়ে গেল, ওরা দু’জন টেরটিও পেল না। এর মাঝে সুব্রত কলকাতা এয়ারপোর্টে সিকিউরিটি চেক হবার পর ঠিক ইন্দিরাকে মেসেজ পাঠিয়েছিলেন, ফ্লাইট ছাড়ার সময়তেও মেসেজ করেছিলেন। দুটো মেসেজই হোয়াটসঅ্যাপে আনসিন অবস্থায় পড়ে আছে। রাত তখন এগারোটার সীমানা ছুঁয়েছে। দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দটা এই নিস্তব্ধ ঘরে আর কোনো যান্ত্রিক ঘোষণা নয়, বরং এক অদৃশ্য নদীর বয়ে যাওয়ার মতো শোনাচ্ছে। ঘরের কোণের টেবিল ল্যাম্পের হলুদ আলোটা বিছানার একপাশে এসে থমকে গেছে, আর বাকি ঘরটা ডুবে আছে এক মখমলি অন্ধকারে। রাহুল আর ইন্দিরা—দুজনে তখন একে অপরের সাথে এমনভাবে জড়িয়ে আছেন, যেন কোনো এক প্রাচীন ভাস্কর্য। রাহুলের পেশিবহুল খালি বুকটা ইন্দিরার মসৃণ, উষ্ণ স্তন ও উদরের ওপর পুরোপুরি সঁপে দেওয়া। ওঁর একটি হাত রাহুলের পিঠের শিরদাঁড়া বেয়ে নামছে, আর অন্য হাতটি ওর চুলে এক শান্ত, নিরবচ্ছিন্ন ছন্দ তৈরি করছিল।

"মা...দেখেছ? এগারোটা বাজতে চলল" রাহুল খুব নিচু স্বরে, প্রায় ফিসফিস করে বলল। ওর কণ্ঠস্বরে এক গভীর, অবাধ্য আরাম। "গত কয়েকটা ঘণ্টা কীভাবে কেটে গেল, আমি টেরই পেলাম না। মনে হচ্ছে যেন একটা ঘোরের মধ্যে আছি। সব ক্লান্তি, সব টেনশন যেন কোথায় উড়ে পালিয়ে গেছে। এখানে তোমার বুকের কাছে এসে মনে হচ্ছে, আমি পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গায় আছি। আমার আর কিচ্ছু চাই না।"

ইন্দিরা অন্ধকার ঘরের ছাদের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। ওঁর অনাবৃত কাঁধে রাহুলের উষ্ণ শ্বাসের ছোঁয়া লাগছিল। তিনি একটু হাসলেন, বুকের ভেতরটা এক মাতৃত্বের আদিম ওমে ভরে উঠল। হাতটা ওর চুলে আরেকটু বিলি কেটে দিল।

"হুমম..." তিনি একটা হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, অত্যন্ত নরম অথচ প্রাজ্ঞ গলায় স্বীকার করলেন। "আমারও অনেকদিন পর খুব রিল্যাক্সড লাগছে রে সোনা। সারাদিন ওই কোলাহল, রুটিন আর দায়িত্বের ঘেরাটোপের বাইরেও যে এরকম একটা শান্ত জগৎ থাকতে পারে, তা তোকে এভাবে কাছে না পেলে আমি হয়তো ভুলেই গিয়েছিলাম।"

রাহুল ওঁর বুকের সেই নরম আশ্রয় থেকে মুখটা সামান্য তুলল। চিবুকের নিচে নিজের মুখটা এনে একটা ছোট বাচ্চার মতো ঠোঁট ফুলিয়ে ওঁর দিকে তাকাল। চোখে তখন এক মৃদু অভিমান আর গভীর কৌতূহল।

"তা হলে একটা কথা বলো তো মা?" ও গলার খাঁজে আঙুল দিয়ে আলতো করে একটা অদৃশ্য বৃত্ত আঁকতে আঁকতে বলল। "যদি এটা এতটাই সুন্দর হয়, তবে তুমি এতদিন কেন এটা করলে না? কেন সবকিছু এমন একটা অদ্ভুত, ঘুরপথে হতে হলো? মানে... ভাবো একবার, প্রথমে আমি এই একসাথে শোয়ার আইডিয়াটা দিলাম... তুমি একদম সটান না করে দিলে... তারপর সেই বার্টার সিস্টেমের খেলা... বাবা ট্যুরে গেল... তুমি আবার এই বিছানাতেই একটা ভাইভা নিয়ে নিলে... তারপর আবার একটা নতুন কন্ট্রাক্ট... আর এখন এই খালি গায়ে আমার কাছে এসে এত সুন্দর করে আদর করছ! এতদিন কেন এই দূরত্বটা ধরে রেখেছিলে, মা?"

ইন্দিরা চোখ ফিরিয়ে ছাদের দিকে তাকালেন। ওঁর মনের ভেতর শিক্ষকতার সেই সুশৃঙ্খল যুক্তি আর মাতৃত্বের এক অদ্ভুত সংজ্ঞাহীন নদী একসাথে ধাক্কা খেল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি, যা রাহুলের কপালে এসে আছড়ে পড়ল।

"তুই যেভাবে বলছিস, শুনলে মনে হবে আমি বুঝি কোনো গোলটেবিল বৈঠক করে, বসে বসে প্ল্যান করে এসব করেছি," ইন্দিরা একটু ম্লান হাসলেন, গলায় এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য ও আর্তি। "কিন্তু তুই তো বুঝবি না রে পাগল... বিষয়গুলো বড্ড জটিল। আমি এতদিন এটা করিনি কারণ..."

"কারণ কী, মা?" রাহুল আরেকটু চেপে বসল ওঁর শরীরের সাথে।

"কারণ... আমি তোর ‘মা’, রাহুল," তিনি অত্যন্ত নিবিড় ও কোমল স্বরে বললেন, আঙুলগুলো ওর কানের লতি ছুঁয়ে গেল। "সমাজ, সংসার আর চারপাশ—সবকিছুই মায়েদের একটা নির্দিষ্ট ছাঁচে দেখতে অভ্যস্ত। মায়েদের শক্ত হতে হয়, নিখুঁত হতে হয়। মাঝেমধ্যে একটা দূরত্ব বজায় রাখতে হয়, যাতে সন্তানেরা শাসনের দেওয়ালটা দেখতে পায়। সেই দেওয়ালটাই তো ডিসিপ্লিন আর স্নেহের ব্যালেন্সটা ধরে রাখে।"

রাহুল ওঁর অনাবৃত পিঠের ওপর নিজের হাতটা আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। "হুম... আর তার ওপর... বাবা..." ওর গলার স্বর সামান্য নিভে গেল।

ইন্দিরা বুঝতে পারলেন ওর মনের ভেতরের সেই সূক্ষ্ম ছায়াটা। সুব্রতর উল্লেখ আসতেই ঘরের ভেতরের বাতাস যেন ক্ষণিকের জন্য একটু ভারী হয়ে উঠল। তিনি অন্য হাতটা দিয়ে রাহুলের কাঁধটা আরেকটু ওপরে টেনে নিলেন, নিজের বুকের সাথে ওকে আরও নিবিড়ভাবে মিশিয়ে দিলেন।

"তোর বাবার সামনে আমি নিজের ভেতরের এই নরম দিকটা দেখাতে পারি না রে। ওঁর একটা নির্দিষ্ট জীবনদর্শন আছে—ওঁর মনে হয় বড্ড বেশি আদর বা প্রশ্রয় মানুষকে নরম করে দেয়। ওঁর ধারণা, জীবনযুদ্ধে লড়তে গেলে একটা কঠোর বর্ম লাগে। আমি বছরের পর বছর ধরে ওঁর সেই বিশ্বাসের সাথে একটা আপস করে চলেছি। ওঁর সামনে আমিও একজন শক্ত, মেপে চলা মা হওয়ার অ্যাক্টিং করেছি। আমি শুধু চেয়েছিলাম তোর বাবার মতো করে একটা ব্যালেন্স রাখতে।"

রাহুল এবার অন্ধকারেই একটু চওড়া হাসল, ওর স্বভাবসুলভ সেই চপল কৌতুকটা আবার ফিরে এল। "তুমি বাবার মতো হতে চেয়েছিলে? নাকি উনি তোমার মতো হতে চান? মা, তুমি হলে ‘দ্য ইন্দিরা সেন’। ইউনিভার্সিটির বড় বড় স্কলার থেকে শুরু করে আমাদের পাড়ার লোকজন—সবাই তোমাকে ওই গম্ভীর, রাশভারী পার্সোনালিটির জন্য কেমন একটা ভয় মেশানো শ্রদ্ধা করে।"

ইন্দিরা নিজের অবাধ্য হাসিটা চেপে রাখতে পারলেন না। হাতটা বাড়িয়ে ওঁর এই বড় হয়ে যাওয়া ছেলেটার নাকে আলতো করে একটা চিমটি কাটলেন।

"ওরে আমার বড় বড় কথার ওস্তাদ! সবাই আমাকে ভয় পায়? এটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেল না? আমি মোটেও তেমন কোনো ভয়ংকর হিটলার নই। আমি জাস্ট... সিরিয়াস। আমি নিজের কাজ, রেসপনসিবিলিটি, আর রুচিবোধ নিয়ে কোনো আপোষ করি না। সেইটার ছাপ হয়তো আমার কথাবার্তায় মাঝেমধ্যে পড়ে...সবাই ভাবে এই ভদ্রমহিলা খুব গম্ভীর।"

রাহুল ওঁর বুকের ওপর চিবুকটা ঠেকিয়ে ওঁর চোখের দিকে তাকাল, চোখে তখন এক দুষ্টুমির আলো। "আচ্ছা? তা সেই গম্ভীর, সিরিয়াস প্রফেসর মানুষটি এখন এই মাঝরাতে ঠিক কী করছেন?"

ইন্দিরা এবার অন্য হাত দিয়ে ওর পিঠে একটা মৃদু চাপড় মারলেন, ঠোঁটের কোণে তখন এক পরম আত্মপ্রকাশের প্রশ্রয়। "এখন? এই মুহূর্তে সেই পরম গম্ভীর শিক্ষিকা তাঁর এই বড্ড বেশি বড় হয়ে যাওয়া, একগুঁয়ে, ধেড়ে ছাত্রটির সাথে জামাকাপড় ছাড়া বিছানায় শুয়ে আছেন... এবং তার সমস্ত ফালতু আবদার সহ্য করছেন। এবার খুশি তো, মিস্টার সেন?"

(rest of Chapter 5 is in the next post...)
Reply
#7

(...rest of Chapter 5)


রাহুল ভ্রু কুঁচকে একটু আপত্তি জানাল। "জামাকাপড় ছাড়া কেন বলছ মা? তুমি তো শুধু তোমার ব্লাউজ আর ওই... ভেতরের জিনিসটা খুলেছ। শাড়ি তো এখনও পরা আছে!"

ইন্দিরা ওর এই খুঁতখুঁতে স্বভাব দেখে খিলখিল করে হেসে উঠলেন। "ও আচ্ছা! মিস্টার পারফেকশনিস্ট! ঠিক আছে বাবা, মেনে নিলাম। কিন্তু..." ওঁর চোখে এবার এক দারুণ দুষ্টুমির ঝিলিক দেখা দিল। তিনি ওর চিবুকটা আলতো করে ধরে বললেন, "ওই 'ভেতরের জিনিসটা' আবার কী রে? তুই কি এত বড় একটা সায়েন্সের স্টুডেন্ট হয়ে ওইটুকু একটা কাপড়ের টুকরোর নাম জানিস না?"

রাহুলের গাল দুটো অন্ধকারেও লাল হয়ে উঠল। সে লজ্জায় একটু উসখুস করে বলল, "মা! তুমি ইচ্ছে করে আমাকে টিজ করছ!"

"টিজ করব কেন?" ইন্দিরা ওকে আরও একটু চেপে ধরে কপট গাম্ভীর্যের সাথে বললেন। "আমি তো জাস্ট তোর জেনারেল নলেজটা টেস্ট করছি। এতক্ষণ ধরে ভারতের রসায়নবিদদের ইতিহাস গড়গড় করে বলে গেলি, আর এখন এই সামান্য জিনিসের নাম বলতে পারছিস না? বল দিকি ওটার নাম কী?"

"ধ্যাত! আমি বলব না।" রাহুল মায়ের বুকের খাঁজে মুখ লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করল।

"বলতেই হবে। কন্ট্রাক্টে তো কোনো লুকোছাপা ছিল না।" ইন্দিরা নাছোড়বান্দা। "বল, নইলে কিন্তু আমি এক্ষুনি উঠে শাড়ি-ব্লাউজ পরে নেব।"

রাহুল বুঝল মায়ের হাত থেকে রেহাই নেই। সে মুখ না তুলেই, অত্যন্ত নিচু ও লাজুক গলায় বিড়বিড় করে বলল, "...ব্রা..."

ইন্দিরা আর পারলেন না, একগাল হাসিতে ভেঙে পড়লেন। "ওরে বাবা! এইটুকু একটা শব্দ উচ্চারণ করতে এত লজ্জা! এতক্ষণ ধরে বুকের ওপর শুয়ে আদর খাচ্ছে, অথচ নাম বলতে গিয়ে জিব আটকে যাচ্ছে ছেলেটার!"

রাহুলও এবার মায়ের হাসিতে যোগ দিল। দুজনেই হাসতে হাসতে একে অপরের সাথে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে গেল, আর ঘরের পরিবেশটা এক অভাবনীয় আনন্দে ভরে উঠল।

হাসির রেশটা একটু কমতে রাহুল ওঁর গলার নরম ত্বকে নিজের ঠোঁটটা আলতো করে ঘষতে ঘষতে বলল, "যাই হোক, যেটা বলছিলাম মা... আমার আসল পয়েন্টটা কিন্তু অন্য জায়গায়। এই যে আজ আমরা এখানে এভাবে শুয়ে আছি, এত গল্প করছি—সবকিছুই কিন্তু পসিবল হয়েছে কারণ আমি আজকে পরীক্ষায় ফুল মার্কসটা পেয়েছি। ভাবো একবার, আমি যদি ওই একশোয় একশো না পেতাম, তা হলে এই মাঝরাতে আমি হয়তো নিজের ঘরে একা বসে ল্যাপটপে বন্ধুদের সাথে ফালতু চ্যাট করতাম। আর তুমি তোমার রিডিং রুমে চশমা চোখে দিয়ে কোনো বোরিং হিস্ট্রি জার্নালের প্রুফ দেখতে।"

ইন্দিরা এই সরল কিন্তু অমোঘ সত্যটা শুনে দু-হাত দিয়ে ওকে আরও একটু শক্ত করে নিজের শরীরের সাথে লেপ্টে নিলেন। ঠোঁটের কোণে এক পরম অহংকার ও স্নেহের মিশ্রণ দেখা দিল।

"তোর কেরিয়ার সবসময় আমার ফার্স্ট প্রায়োরিটি। আমি চাই তুই জীবনে এমন একটা জায়গায় পৌঁছবি, যেখানে গেলে আমার এই বুকটা গর্বে ফুলে উঠবে। আমি তোকে শুধু একজন সাধারণ স্টুডেন্ট হিসেবে দেখতে চাই রে সোনা, আমি চাই তুই বড় হয়ে বিশাল কিছু একটা করবি।"

রাহুল ওঁর বুকের উষ্ণতায় নিজের মুখটা আরও একটু ডুবিয়ে দিয়ে বলল, "আমি কি কোনোদিন তোমার সেই ভরসা ভেঙেছি, মা? আমি কি কোনোদিন তোমাকে ছোট করেছি?"

"কোনোদিন না," ইন্দিরা অত্যন্ত সরল কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বললেন। "তুই আমাকে কোনোদিন হতাশ করিসনি, সোনা।"

"জানো মা," রাহুলের গলার স্বরে এক অদ্ভুত গর্বের ছোঁয়া লাগল, "আমি যখন বাইরে বেরোই... কলেজের করিডোর দিয়ে বা রাস্তার মোড় দিয়ে যাই... অনেকে যখন আড়ালে ফিসফিস করে বলে—‘ওই দেখ, প্রফেসর ইন্দিরা সেনের ছেলে যাচ্ছে’... তখন আমার ভেতরটা কেমন যেন একটা শান্তিতে ভরে যায়।"

ইন্দিরা হাত বোলানো থামিয়ে ক্ষণিকের জন্য ওর মুখের দিকে তাকালেন। চোখে এক অদ্ভুত কৌতূহল। "সত্যি বলছিস, সোনা? তোর ওরম শুনতে ভালো লাগে?"

"না, মা... ভালো লাগা নয়, এটা আমার অহংকার," রাহুল চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে বলল, চোখে তখন কোনো চপলতা নেই, কেবল এক গভীর, খাঁটি সত্য। "এই পৃথিবীর কার অতবড় ভাগ্য আছে বলো, যে বুক ফুলিয়ে বলতে পারে সে ‘ইন্দিরা সেনের ছেলে’? আমি যে তোমার শরীর থেকে জন্মেছি, এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সার্টিফিকেট।"

ইন্দিরা চোখের কোণে একটা হালকা জলের আভাস টের পেলেন, কিন্তু তা জোর করে চেপে রাখলেন। তিনি ওকে নিজের বুকের সাথে এতটাই জোরে জড়িয়ে ধরলেন যেন ওঁর শরীরের অনাবৃত ত্বক রাহুলের পেশিবহুল বুকের সাথে একাকার হয়ে যেতে চায়। ওঁর ঠোঁট দুটো ওর চুলে বারবার পরম মমতায় আদর করতে লাগল।

"তুই আমার গর্ব, রাহুল। তুই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ," তিনি বুজে আসা গলায় ফিসফিস করে বললেন। "তোর মতো ছেলে পাওয়া যেকোনো মায়ের পরম ভাগ্য..." একটু থেমে তিনি চেনা খুনসুটির সুরে যোগ করলেন, "যদিও তুই মাঝে মাঝে বড্ড বেশি পাকা পাকা কথা বলিস, আস্ত একটা স্মার্ট-অ্যাস!"

রাহুল অন্ধকার ঘরটা কাঁপিয়ে এক হালকা শিশুর মতো খিলখিল করে হেসে উঠল। ওর সেই নিষ্পাপ, চপল হাসির ছোঁয়া ইন্দিরার বুকেও এক তীব্র তরঙ্গের সৃষ্টি করল।

"আমার বড্ড স্পেশাল ফিল হয়, মা," রাহুল ওঁর বুকের ওপর নিজের হাতটা আরেকটু ছড়িয়ে দিয়ে বলল। "এই যে এই বিশাল মহাবিশ্ব... কত কোটি কোটি মানুষ... তার মধ্যে আমি ঠিক তোমার থেকেই জন্মালাম। তুমিই আমাকে প্রথম নিজের দুধ খাওয়ালে... আর আজ এই মাঝরাতে, আমি তোমার সাথে এভাবে খালি গায়ে....এভাবে শুয়ে হাসছি... গল্প করছি... এটা ভাবলেই আমার কেমন যেন একটা ম্যাজিকের মতো মনে হয়।"

ইন্দিরা ওর এই চরম সরলতা শুনে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। ভেতরের সেই সমস্ত সামাজিক বর্ম, কঠিন আভিজাত্য মুহূর্তের মধ্যে বাষ্প হয়ে গেল। এক পরম, আদিম মাতৃত্বের জোয়ার ওঁর পুরো সত্তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। তিনি ওর মাথাটা নিজের দুই হাতের তালুতে নিয়ে কপালে দীর্ঘ, গভীর এক আশীর্বাদের চুমু আঁকলেন।

"পাগল ছেলে, লক্ষ্মী ছেলে আমার," গলার স্বর আবেগে কাঁপছে ওঁর। "তুই স্পেশাল কারণ তুই আমার। তুই আমার ছেলে, আমার ছোট্ট সোনা... আমার সব।"


৫.৪. রূপোলি তিল ও দুটি ওষ্ঠাধর

কিছুক্ষণ এই নিবিড় নীরবতায় কাটার পর, রাহুলের চোখ হঠাৎ ওঁর বাঁ কাঁধের ঠিক নিচে, বুকের ওপরের দিকের নরম ত্বকের ওপর গিয়ে স্থির হলো। টেবিল ল্যাম্পের সেই আবছা আলোয় সে ওঁর ফর্সা ত্বকের ওপর একটা ছোট, কুচকুচে কালো তিল দেখতে পেল। সে এর আগে কোনোদিন ওঁর এই অংশটি দেখেনি, কারণ স্বাভাবিকভাবেই রাহুল বড় হয়ে যাবার পর ওঁর মা ওর সামনে কোনোদিন এভাবে পোশাক আলগা করেননি।

সে তর্জনী বাড়িয়ে সেই তিলটার ওপর আলতো করে ছুঁল।

"মা! তোমার এখানে একটা তিল আছে? আমি তো কোনোদিন দেখিনি!" রাহুল বেশ চমকে গিয়ে বলল।

ইন্দিরা ওর আঙুলের ছোঁয়ায় নিজের শরীরের ভেতর একটা সূক্ষ্ম শিহরণ টের পেলেন। একটু মাথা নিচু করে নিজের কাঁধের নিচের অংশটা দেখার চেষ্টা করলেন। "হ্যাঁ রে... এটা তো আমার জন্মদাগ। ব্লাউজ আর শাড়ির নিচে ঢাকা থাকে বলে তুই কোনোদিন দেখিসনি।"

"কিন্তু মা, একটা মারাত্মক জিনিস দেখবে?" রাহুল এক তীব্র উত্তেজনায় বিছানায় আরেকটু সোজা হয়ে বসল। নিজের বাঁ কাঁধের ঠিক নিচের অংশটা ওঁর চোখের সামনে এগিয়ে নিয়ে এল ও। "এই দেখো! একদম সেম টু সেম স্পটে! আমারও ঠিক এখানেই একটা কালো তিল আছে!"

ইন্দিরা এবার সত্যিই অবাক হলেন। শরীরটা সামান্য তুলে রাহুলের কাঁধের নিচের সেই নির্দিষ্ট দাগটার দিকে তাকালেন। সুন্দর হাতের আঙুলগুলো ওর সেই তিলটার ওপর এসে স্থির হলো। পরম মমতায় আঙুল দিয়ে ওর তিলটা ঘষতে লাগলেন তিনি। নখের মৃদু স্পর্শে রাহুলের সারা শরীরে এক অদ্ভুত কাঁপন বয়ে গেল।

"তাই তো রে!" ইন্দিরা এক পরম বিস্ময় ও আমোদের সাথে হেসে উঠলেন। "একদম হুবহু একই জায়গায়! লাইক মাদার, লাইক সন। এটাকে বলে জেনেটিক্সের খেলা। আমার শরীরের ছাঁচটাই যে তুই পেয়েছিস, এটা তারই প্রমাণ।"

রাহুল ওঁর এই আঙুল ঘষার শান্ত ছোঁয়ায় এতটাই আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল যে সে নিজের অবচেতন টানেই ওঁর দিকে আরেকটু ঝুঁকে এল। সে ওঁর বাঁ কাঁধের নিচের সেই সুন্দর, নরম ত্বকে থাকা তিলটার ওপর নিজের ঠোঁট ঠেকিয়ে একটা গভীর, নরম চুমু খেল।

ইন্দিরা নিজের শরীরের এই সংবেদনশীল জায়গায় রাহুলের ঠোঁটের উষ্ণ ছোঁয়া পেতেই এক ধাক্কায় সামান্য কেঁপে উঠলেন। মুখ দিয়ে একটা হালকা আদুরে আওয়াজ বের হলো ওঁর।

"আহ্ সোনা! ওটা কী করছিস? বড্ড সুড়সুড়ি লাগছে রে!" তিনি হাসতে হাসতে ওর মাথাটা সামান্য সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেন।

"সরিয়ে দিও না মা," রাহুল গলার কাছে মুখ রেখেই ফিসফিস করে আবদার করল। "এটা দেখতে বড্ড কিউট লাগছে। একদম ম্যাচিং-ম্যাচিং। লাইক মাদার, লাইক সন।"

ইন্দিরা ওর এই অদ্ভুত আবদারে হেসে ফেললেন। "কী যে করি তোকে নিয়ে, আস্ত একটা হোপলেস ছেলে! এত কিছু থাকতে শেষে নিজের মায়ের তিলে চুমু খাচ্ছিস! হে ভগবান... আমি একটা বদ্ধ পাগল জন্ম দিয়েছি..."

"আমি পাগল নই মা," রাহুল ওর ঠোঁটটা ওঁর ত্বকে আরেকটু ঘষে দিয়ে হাসল। "আমি জাস্ট আমাদের এই স্পেশাল জেনেটিক কানেকশনটাকে একটু সেলিব্রেট করছি। তাছাড়া, আমার মায়ের তিলটা যে সত্যিই খুব কিউট!"

"কিউট!" ইন্দিরা কপালে চোখ তুললেন, যদিও ওঁর ঠোঁটের কোণে প্রশ্রয়ের হাসি। "একটা ধেড়ে ছেলে তার মায়ের কাঁধের নিচে তিল দেখে কিউট বলছে! কেউ শুনলে কী ভাববে বল তো?"

"কেউ তো শুনছে না," রাহুল বিন্দুমাত্র না দমে বলল। "আর শুনলেও আমার বয়েই গেল। তুমি আমার মা, এটা আমার মায়ের তিল, এতে অন্য লোকের কী দরকার! আর তাছাড়া, তুমিই তো একটু আগে বললে আমাদের শরীরের ছাঁচ এক... তাহলে আমি তো একরকমভাবে নিজের তিলটাকেই চুমু খাচ্ছি, তাই না?"

ছেলের এই অকাট্য অথচ বোকা বোকা যুক্তির কাছে ইন্দিরা আবারও হেরে গেলেন। ভেতরের সেই শাসন করার ক্ষমতাটুকু যেন এই রাতের অন্ধকারে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। তিনি কাঁধটা আরেকটু আলগা করে দিলেন, অনুমতি দিলেন ওঁর সেই গোপন দাগটিকে স্পর্শ করার। রাহুল এবার আরও একটু সময় নিয়ে, পরম যত্নে ওঁর সেই তিলটার ওপর নিজের ঠোঁটদুটো গভীরভাবে চেপে ধরল।

রাহুলের ঠোঁটের সেই কোমল, উষ্ণ স্পর্শ যখন ইন্দিরার অনাবৃত ত্বকের ওই নির্দিষ্ট বিন্দুটিতে দীর্ঘক্ষণ বসে রইল, তখন ইন্দিরার চোখের পাতাজোড়া এক গভীর আবেশে আপনাআপনিই বন্ধ হয়ে এল। ওঁর মসৃণ বুক রাহুলের এই নিবিড় আদরে আরেকটু দ্রুত ওঠানামা করতে লাগল। ঘরজোড়া স্তব্ধতার মাঝে ওঁর গলা থেকে বেরিয়ে এল এক অস্ফুট, প্রশান্তির শব্দ—"উমম... আহ্, সোনা..." তিনি নিজের একটা হাত দিয়ে রাহুলের মাথাটা পরম মমতায় নিজের বুকের সাথে আরও একটু চেপে ধরলেন। "তুই সত্যিই বড্ড বেশি দুষ্টু হয়েছিস। তোর মাথায় সারাক্ষণ শুধু এই ফন্দি ঘোরে, তাই না? কীভাবে মাকে নিজের বশে রাখা যায়, কীভাবে একটু বেশি আদর আদায় করা যায়?"

"আমি তো কিছুই করছি না মা," রাহুল ঠোঁটটা ওঁর ত্বকেই ছুঁইয়ে রেখে অত্যন্ত আদুরে গলায় ফিসফিস করল, "আমি শুধু আমার প্রিয় জায়গাটার একটু যত্ন নিচ্ছি। এতেও তোমার আপত্তি? তুমিই তো বললে আমি তোমার সব..."

"উফ্! কথায় কেউ পারতে পারবে না তোর সাথে..." ইন্দিরা স্নেহের বশবর্তী হয়ে ওর চুলে আঙুল ডুবিয়ে দিলেন। "সবসময় একটা না একটা যুক্তি খাড়া করে ছাড়বি।"

চুমু খাওয়া শেষ করে রাহুল যখন মুখ তুলল, ওঁর ঠোঁটে তখন এক মায়াবী হাসি। তিনি আর নিজের স্নেহকে আটকে রাখতে পারলেন না। তিনি নিজেই এবার একটু ঝুঁকে এলেন রাহুলের দিকে, নিজের ওষ্ঠাধর নিয়ে গেলেন রাহুলের বাঁ কাঁধের সেই একই জায়গায় থাকা তিলটার ওপর। খুব ধীরে, সাবধানে ওর সেই তিলটার ওপর নিজের ঠোঁটের এক পরম উষ্ণ ও নরম ছোঁয়া দিলেন—এক জননীর তরফ থেকে তাঁর সন্তানের প্রতি সমস্ত ভালোবাসা আর সমর্পণের সিলমোহর।

চুমুর রেশ কাটতেই রাহুল একগাল দুষ্টুমি মেশানো হাসি হাসল। "কী? দেখলে তো? তুমিও তো শেষমেশ ওই তিলের লোভ সামলাতে পারলে না!"

ইন্দিরা চোখ পাকিয়ে ওর চুলে আলতো করে একটা টান দিলেন। "একদম পাকামো করবি না! আমি জাস্ট তোর ওই বোকা বোকা থিয়োরিটাকে একটু সম্মান জানালাম, এই যা। একে বলে অ্যাকাডেমিক কার্টেসী।"

"অ্যাকাডেমিক কার্টেসী! বাপরে!" রাহুল খিলখিল করে হেসে উঠল, ওর খালি বুকটা ইন্দিরার বুকের সাথে ঘষে গেল। "মানতে দোষ কী মা, যে আমার কাঁধটা তোমার ওই মোটা মোটা হিস্ট্রি বইগুলোর চেয়ে অনেক বেশি ইন্টারেস্টিং?"

"বড্ড অহংকার তোর, না রে?" ইন্দিরা ওর নাকে আলতো করে একটা টোকা দিলেন, কিন্তু গলার স্বরে ঝরে পড়ল এক পরম প্রশ্রয়। "আমার মুঘল আর্কিটেকচারের বইগুলো অন্তত তোর মতো বকবক করে না। আর এত বাঁদরামোও করে না।"

"কিন্তু হিস্ট্রি বইগুলো তো তোমাকে এমন শক্ত করে জড়িয়েও ধরে না, মা," রাহুল ওর দুটো হাত দিয়ে ওঁকে আরও নিবিড়ভাবে পেঁচিয়ে ধরল। "বলো, ধরে?"

ইন্দিরার মুখের কৃত্রিম বিরক্তিটা এক নিমিষে গলে গিয়ে সেখানে এক পরম মায়া আর গভীর মাতৃত্বের ছাপ পড়ল। তিনি ওর গালে দুখানা নরম চুমু এঁকে দিলেন। "না রে পাগল। তা ধরে না। তোর মতো এমন আদর করতে এই পৃথিবীতে আর কেউ পারে না।"

রাহুলের মনে হলো ও যেন এক অসীম শূন্যতায় ভেসে চলেছে, যেখানে সমাজ নেই, নিয়ম নেই—আছে কেবল এক পরম স্বর্গীয় ওম।

৫.৫. বাইরের পৃথিবীর ছায়া

তারা আবার একে অপরকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ল। এখন আর তাদের নড়াচড়ার মধ্যে কোনো আড়ষ্টতা নেই, তারা যেন একে অপরের শরীরের সাথে পুরোপুরি খাপ খেয়ে গেছে। তাদের গলাগুলো এখন ক্রমশ আরও নরম, আরও ঝাপসা হয়ে আসছে, ঠিক যেমন ঘুমের দেশে যাওয়ার আগের মুহূর্তগুলো হয়।

"মা..." রাহুল ওঁর বুকে গাল ঘষতে ঘষতে বলল, "এই ফিলিংসটা এতটাই ন্যাচারাল, এতটাই নরমাল... আমার তো মনে হয় পৃথিবীর প্রতিটা মা আর ছেলেরই এইভাবে খালি গায়ে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে শোওয়া উচিত। এটা বড্ড শান্তি দেয়।"

ইন্দিরা ওর এই চরম সরলতা শুনে মনে মনে একটু হাসলেন, কিন্তু একই সাথে ভেতরের সেই বাস্তববাদী, সমাজসচেতন নারীটি আবার সতর্ক হয়ে উঠল। তিনি হাতটা ওর পিঠের ওপর আরেকটু শক্ত করে চেপে ধরলেন, গলার স্বরে এক মৃদু কিন্তু গম্ভীর সাবধানবাণী।

"তুই যেভাবে ভাবছিস সোনা, বাইরের পৃথিবীটা কিন্তু অতটা সিম্পল নয়," তিনি ওর কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করলেন। "তোর এই ফিলিংসটা... বা আমাদের এই স্পেশাল বন্ডিংটা কেবলই আমাদের দুজনের। বাইরের মানুষ এই নিবিড়তা কোনোদিন বুঝবে না। তুই তো দুনিয়াটা সেরম দেখিসনি। ইন ফ্যাক্ট, তারা এটাকে হয়তো অপরাধ বা বিকৃতি বলে দাগিয়ে দেবে। তাই তোকে কিন্তু নিজের প্রমিসটা মনে রাখতে হবে। তুই আমার সাথে একটা অফিশিয়াল কন্ট্রাক্ট সই করেছিস, রাহুল। এই ঘরের ভেতরের একটা কথাও যেন কোনোদিন ওই দরজার বাইরে না যায়।"

"আমি জানি মা, আমি তো অলরেডি প্রমিস করেছি," রাহুল বুকে মাথা রেখেই বলল। "আমি কাউকে কিচ্ছু বলব না।"

একটু থেমে রাহুল হঠাৎ মুচকি হাসল, মনে এক নতুন চিন্তার উদয় হলো। "আচ্ছা মা, তুমি আমাদের ওই পাশের বাড়ির বরুণ আর ওর মাকে দেখেছ তো?"

"হুম, দেখেছি। কেন রে?"

"ওর মা কিন্তু একদম তোমার অপোজিট," রাহুল একটু আক্ষেপ ও কৌতুকের সুরে বলতে লাগল। "তুমি বাবার সামনে বা বাইরে আমার সাথে যতটা গম্ভীর থাকো, বরুণের মা ঠিক উল্টো। উনি যখনই বরুণকে নিয়ে রাস্তায় বেরোন, সবসময় ওর হাত ধরে ধরে হাঁটেন। পাড়ার সবার সামনে ওঁর একটাই গল্প—‘আমার ছেলে এই করেছে... আমার ছেলে ওই করেছে...’ আর সবচেয়ে বেশি ক্রিঞ্জ ব্যাপারটা কী জানো মা? বরুণ যখন সকালে কলেজ বাসে উঠতে যায়, ওর মা বারান্দা থেকে ওকে লক্ষ্য করে বড় বড় ফ্লাইং কিস ছোঁড়েন! উফ্, দেখতে এতটাই অদ্ভুত লাগে আমার!"

ইন্দিরা বড় ছেলের মুখে বরুণের মায়ের এই বিবরণ শুনে নিজের হাসি চেপে রাখতে পারলেন না। ওঁর প্রাজ্ঞ আভিজাত্য এবার একটু কৌতুকের ছলে আত্মপ্রকাশ করল।

"তুই বড্ড বেশি লোকজনকে নোটিস করিস," তিনি মৃদু হেসে বললেন। "তবে হ্যাঁ, আমি দেবলীনাদি, মানে বরুনের মাকে চিনি। ওঁর এক্সপ্রেস করার স্টাইলটা একটু অন্যরকম... ওঁর হয়তো ওভাবেই নিজের স্নেহ দেখাতে ভালো লাগে।" একটু থেমে তিনি স্বভাবসুলভ গম্ভীর ভঙ্গিতে যোগ করলেন, "ওয়েল, ইটস নান অফ আওয়ার বিজনেস। ওটা ওদের পার্সোনাল ব্যাপার।"

রাহুল এবার বুকে মাথা রেখেই অনাবৃত শরীরের সাথে নিজেকে আরও জড়িয়ে নিল, চোখে এক তীব্র, অপ্রাসঙ্গিক কৌতুহল। "আচ্ছা মা... তোমার কি মনে হয়? বরুণ কি ওর মায়ের সাথে ঠিক এইরকম কোনো স্কোপ পায়? মানে... এই মাঝরাতে, এরকম একা... এরকম গায়ে গা লাগিয়ে জড়িয়ে ধরার চান্স ও পায়?"

ইন্দিরা এবার সত্যিই বড্ড চমকে গেলেন। চোখের পাতাজোড়া বড় বড় হয়ে গেল, হাত বোলানোর ছন্দটা ক্ষণিকের জন্য থমকে গেল। মুখে এক তীব্র কৃত্রিম রাগ আর বিস্ময়।

"রাহুল! এ আবার কী ধরনের প্রশ্ন করছিস তুই?" তিনি গলার স্বর আরেকটু চড়া করলেন, যদিও তার মধ্যে কোনো কঠোরতা ছিল না। "তুই বরুণ আর ওর মায়ের পার্সোনাল লাইফ নিয়ে এই মাঝরাতে কেন মাথা ঘামাচ্ছিস, শুনি? ওটা সম্পূর্ণ ওদের ব্যাপার, বললাম তো তোকে!"

"ধুর মা, রাগ করছ কেন?" রাহুল শরীরের সাথে নিজেকে আরও বেশি লেপ্টে দিয়ে ওঁর রাগ কমানোর চেষ্টা করল। "আমি তো জাস্ট নরমাল একটা র‌্যান্ডম থট থেকে বললাম... মানে, বাইরে ওদের অত টাচি-ফিলি আচরণ দেখে আমার মনে হলো, যারা বাইরে অত দেখায়, তারা হয়তো ঘরের ভেতরে এর চেয়ে দশ গুণ বেশি কিছু করে।"

"তুই নিজের লিমিট ক্রস করছিস কিন্তু এবার," ইন্দিরা ওর চুলে আরেকটা মৃদু টান দিয়ে শাসন করলেন, কণ্ঠে তখন এক প্রচ্ছন্ন ঈর্ষা ও তীব্র অধিকারবোধ। "ওরা ঘরের ভেতরে কী করে না করে, তা নিয়ে ইন্দিরা সেনের ছেলের এত মাথাব্যথার কী দরকার? তোর নিজের মা এখন নিজের ব্লাউজ, ব্রা, সব খুলে তোর পাশে শুয়ে আছে, তুই নিজের যোগ্যতায় জেতা এত বড় একটা প্রাইজ আজ নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে আছিস... আর তুই কি না এই মাঝরাতে পাশের বাড়ির আন্টির কথা ভাবছিস? ঘাড় মটকে দেব একদম! অসভ্য বদমাইশ ছেলে কোথাকার!"

রাহুল ওঁর এই হালকা জেলাসি মেশানো বকুনিটা বড্ড উপভোগ করল। সে গলার খাঁজে মুখটা আরও গভীরভাবে চেপে ধরে নিজের হাত দুটো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

"আই অ্যাম সরি, মা... আই অ্যাম সো সরি," সে এক পরম আদুরে সুরে ওঁর রাগ ভাঙাতে ভাঙাতে বলল। "আমি আর কোনোদিন ওসব কথা বলব না। আমার তো শুধু তোমাকেই চাই। তুমিই আমার সব।"

ইন্দিরা মুখটা সামান্য ঘুরিয়ে নিলেন, ওঁর অভিমান তখনও পুরোপুরি কাটেনি। "তোর যদি এতই অন্য কাউকে নিয়ে ভাবার শখ থাকে, তাহলে আমিই বরং উঠে নিজের ঘরে চলে যাচ্ছি। তুই একা শুয়ে শুয়ে ওইসব ভাব।"

রাহুল তড়িঘড়ি একটু ওপরে উঠে এল, দু-হাত দিয়ে মায়ের মুখটা নিজের দিকে ফেরাল। "প্লিজ মা, যেয়ো না, রাগ কোরো না। আমি তো জাস্ট না ভেবেই একটা ফালতু কথা বলে ফেলেছি। প্লিজ ভেবো না যে আমি তোমার সাথে অন্য কারও তুলনা করছি।" ও মায়ের গালে একটা হালকা চুমু খেল। "তুমি জানো তুমি কতটা সুন্দর? বরুণের মা বা পৃথিবীর কোনো নারী তোমার এই রূপ, তোমার এই গুণের ধারেকাছেও আসতে পারবে না। পৃথিবীর কারও সাথেই তোমার তুলনা হয় না, মা। এই যে তোমাকে এভাবে এত কাছ থেকে জড়িয়ে ধরে আছি, তোমার এই গায়ের গন্ধ, তোমার এই আদর—এটাই তো আমার কাছে পৃথিবীর সেরা প্রাইজ। আমি কি এতই বোকা যে অন্য কারোর কথা ভেবে নিজের এই পারফেক্ট মোমেন্টটা নষ্ট করব?"

রাহুল ওঁর গলার কাছে মুখ ঘষে আরও আদুরে গলায় ফিসফিস করল, "সরি মা... আমার বড্ড ভুল হয়ে গেছে। তোমার এই পাগল ছেলেটাকে মাফ করে দাও না, প্লিজ? তুমি রাগ করে থাকলে আমার একদম ভালো লাগছে না। প্রমিস, আর কোনোদিন বাইরের কারোর কথা আমাদের মাঝে আনব না। শুধু তুমি আর আমি।"

ইন্দিরা ওর এই আত্মসমর্পণের পর আর নিজের গাম্ভীর্য ধরে রাখতে পারলেন না। দীর্ঘদিনের সেই কঠিন শিক্ষিকা রূপটি আবার সমর্পিত নারীত্বের কাছে হেরে গেল। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওর মাথাটা বুকের ওপর আরেকটু চেপে ধরলেন।

"কিন্তু... তুই যদি সত্যিই আমার পার্সোনাল ওপিনিয়ন চাস," তিনি অত্যন্ত নিচু, আত্মবিশ্বাসী ও গম্ভীর স্বরে বললেন, চোখে তখন এক অনন্য আভিজাত্যের দ্যুতি, "আমার মনে হয় তারা কোনোদিনও তা করে না, যা আজ আমরা এখানে করছি।"

"কেন মা?" রাহুল খুব নরম গলায় জানতে চাইল।

"কারণ, ওদের ওই বন্ডিংটা বড্ড বেশি লোকদেখানো, বড্ড বেশি শো-অফ। দেবলীনাদি এই গোটা দুনিয়াকে চিৎকার করে দেখাতে ভালোবাসেন যে তিনি ওঁর ছেলেকে কতটা ভালোবাসেন। ওই প্রদর্শনের আড়ালে এক ধরনের কৃত্রিমতা লুকিয়ে থাকে। কিন্তু আমার তো তেমন কোনো শো-অফের দরকার নেই, সোনা। আমি বাইরে তোকে শাসন করি, আমি বাইরে একটা গম্ভীর দেওয়াল ধরে রাখি... কারণ আমি জানি, আমার সেই ভেতরের আসল রূপটা, আমার সেই ভালোবাসার সম্পূর্ণ গভীরতাটুকু কেবলই তোর জন্য তোলা আছে। আই ডোন্ট হ্যাভ টু শো দ্য ওয়ার্ল্ড। আমি মনে মনে খুব ভালো করেই জানি, আমি আমার এই অবাধ্য ছেলেটাকে কতটা ভালোবাসি।"

রাহুল এই গভীর, মনস্তাত্ত্বিক সত্যটা শুনে এক পরম মুগ্ধতায় ওঁর চোখের দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে এক হালকা, খেলার ছলে বলা প্রশ্ন।

"কতটা ভালোবাসো, মা? একটু বলো না?"

ইন্দিরা সুন্দর চোখদুটো দিয়ে রাহুলের চোখের গভীরতা মেপে নিলেন। ঠোঁটের কোণে তখন এক মায়াবী, অনন্য হাসির রেখা। তিনি কোনো উত্তর দিলেন না।

মুখটা নামিয়ে নিয়ে এলেন রাহুলের বাঁ কাঁধের নিচের নির্দিষ্ট কালো তিলটার ওপর। ওঁর বুক রাহুলের বুকের সাথে আরও গভীরভাবে লেপ্টে গেল, আর তিনি ওর সেই তিলটার ওপর মুখটা ঘষতে ঘষতে এক দীর্ঘ, তীব্র ও পরম ভালোবাসাময় চুমু আঁকলেন। ঠোঁটের সেই দীর্ঘস্থায়ী স্পর্শ যেন রাহুলের সারা শরীরে এক বিদ্যুতের মতো শিহরণ বইয়ে দিল।

চুমু শেষ করে তিনি মুখ তুললেন, চোখে তখন এক পরম তৃপ্তির আলো।

"ঠিক এই এতটা," তিনি ফিসফিস করে বললেন।

রাহুল একগাল দুষ্টুমি মেশানো হাসি হাসল। "শুধু এতটা? আমার তো মনে হয় তুমি আমাকে এর চেয়েও অনেক বেশি ভালোবাসো। জাস্ট তোমার ওই প্রফেসরের ইগো বলে স্বীকার করতে চাইছ না।"

ইন্দিরার চোখদুটো কৃত্রিম বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল। তিনি আলতো করে রাহুলের কানটা টেনে ধরলেন। "পাকা ছেলে! মায়ের ইগো নিয়ে কথা হচ্ছে? তোকে যে এই মাঝরাতে নিজের গায়ের ওম দিয়ে এত লাই দিচ্ছি, সেটাই তোর হজম হচ্ছে না! আর আদর দেব না তোকে, যা ওদিকে ঘুরে শো।"

রাহুল কোনো উত্তর না দিয়ে ওঁর শরীরের সাথে নিজেকে আরও শক্ত করে লেপ্টে নিল, মুখটা গুঁজে দিল ওঁর গলার কাছে। "না না, একদম না! কন্ট্রাক্ট মনে নেই? সারারাত আমাকে আগলে রাখতে হবে। আমি তো তোমার ওই তিলটার মতোই তোমার গায়ে সেঁটে থাকব।"

ইন্দিরা এক হালকা, খিলখিল হাসিতে ভেঙে পড়লেন। ছেলের এই অকাট্য যুক্তির কাছে তিনি সত্যিই বড় অসহায়।

"আর তুমি বড্ড ভালো করে ভালোবাসতে পারো, মা," রাহুল অত্যন্ত নরম স্বরে ফিসফিস করল।

ইন্দিরা পরম মমতায় ওর কপালে একটা চুমু এঁকে দিলেন। "হ্যাঁ, আর সেই ভালোবাসার সুযোগ নিয়েই তো তুই আমার মাথায় চড়ে বসেছিস, আস্ত একটা বাঁদর! এবার একটু চুপ করে আদর খা তো।"

রাহুল এক তীব্র আনন্দে ওঁর শরীরের সাথে নিজেকে একবার পুরোপুরি সঁপে দিল। তারা দুজনেই এক গভীর, নিভৃত হাসিতে মেতে উঠল এবং একে অপরকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরল যেন পৃথিবীর কোনো শক্তিই তাদের আলাদা করতে পারবে না।

ঘরের সেই নিঝুম নিস্তব্ধতা ভেঙে তখন শুধু শোনা যেতে লাগল ওদের দুজনের একে অপরের গায়ে আদর করার মৃদু, মাদকীয় শব্দ। "উমম...", "আহ্, মা..."—এইরকম অস্ফুট স্বরের সাথে মিশে গেল ত্বকের ওপর ঠোঁট ছোঁয়ানোর সেই ভিজে, উষ্ণ শব্দগুলো। রাহুল পরম মমতায় মায়ের কপালে, গালে আর গলার নরম খাঁজে বারবার চুমু খেতে লাগল, আর তার উত্তরে ইন্দিরাও ছেলের কানের লতিতে, চিবুকে আর চুলে নিজের ওষ্ঠাধর বুলিয়ে দিলেন। চুমুর সেই মৃদু, ছন্দবদ্ধ শব্দগুলো—মুয়াহ্, উমম, আহ্—রাতের অন্ধকারের সাথে মিশে ঘরের পরিবেশকে এক অসীম মায়ায় আচ্ছন্ন করে দিল।

ঠিক যেন ওদেরই মতো, দেয়ালঘড়ির কাঁটা দুটিও তখন পরস্পরের বুকে একাকার হয়ে নিঃশব্দে জানিয়ে দিল—এখন নিঝুম মধ্যরাত।
Reply
#8

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ: নিশীথ-চুক্তি ও একটি আদিম নদীর উৎস

৬.১. বাহুমূলের অরণ্য ও লঘু কৌতুক

রাহুল ইন্দিরার বুকের সেই অনাবৃত, উত্তপ্ত খাঁজে চিবুকটা ঠেকিয়ে এক পরম শান্তিতে চোখ বুজে ছিল। হঠাৎ ওর খেয়াল হলো, ইন্দিরার ফর্সা, মসৃণ ত্বকের ওপর বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। ওঁর কলারবোন আর বুকের খাঁজে চিকচিক করছে ঘামের সূক্ষ্ম রেখা।

"মা," রাহুল মুখটা সামান্য তুলে বলল, "তোমার কি খুব গরম লাগছে? তুমি তো ঘেমে যাচ্ছ।"

ইন্দিরা একটা হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শাড়ির আঁচল দিয়ে কপালটা একটু মুছে নিলেন। "গরম তো একটু লাগছেই রে সোনা। এমনিতেও বাইরে আজ বেশ গুমোট ওয়েদার।"

হঠাৎ রাহুলের মাথায় বিদ্যুৎ খেলে গেল। ও ধড়ফড় করে সামান্য উঠে বসল। "ওহ শিট! মা, আমি তো এসির সুইচটাই অন করিনি! গঙ্গামাসি তো বিকেলবেলায় মশা ঢুকবে বলে সব জানলা-দরজা বন্ধ করে পর্দা টেনে দিয়ে যায়। আর আমি এতক্ষণ এই সব কিছুর মধ্যে এসি অন করার কথাই বেমালুম ভুলে গেছি! বন্ধ ঘরে শুধু ফ্যান চালিয়ে শুয়ে আছি... থ্যাঙ্ক গড তোমার এখনও ক্লস্ট্রোফোবিক ফিল হয়নি!"

ছেলের এই আকস্মিক অপরাধবোধ দেখে ইন্দিরা খিলখিল করে হেসে উঠলেন। "তোর যা কাণ্ড না! আমারও খেয়াল ছিল না জানিস। তা এখন যখন মনে পড়েছে, যা বাবা, একটু অন করে দে। বড্ড ঘাম হচ্ছে সত্যিই।"

রাহুল এক লাফে বিছানা থেকে নেমে পড়ল। এসির মেইন সুইচটা ঘরের একদম উল্টো দিকের দেওয়ালে। সে খালি গায়েই হেঁটে গিয়ে সুইচটা অন করল। এসির মৃদু গুঞ্জন শুরু হতেই সে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, "আমি কিন্তু এসি চালালে সবসময় হাতের কাছে একটা ব্ল্যাঙ্কেট রাখি মা। কারণ এসি অনেকক্ষণ চললে আবার বড্ড ঠান্ডা হয়ে যায় ঘরটা, তখন আবার কাঁপাকাঁপি শুরু হবে।"

ইন্দিরা বিছানায় আধশোয়া হয়ে মুগ্ধ দৃষ্টিতে নিজের ছেলেটাকে দেখছিলেন। ওর চওড়া কাঁধ, পেশিবহুল পিঠ—ছেলেটা সত্যিই দেখতে দেখতে কত বড় হয়ে গেছে!

রাহুল ঘরের কোণের ওয়ারড্রোবটা খুলে একটা ভাঁজ করা নরম ব্ল্যাঙ্কেট বের করে আনল এবং সেটা বিছানার পায়ের দিকের অংশে সযত্নে রেখে দিল। তারপর সে যখন আবার বিছানায় ওঠার জন্য মায়ের দিকে ফিরল, ওর নজর পড়ল ইন্দিরার বাঁ কাঁধের ওপর। তিনি ডান হাত দিয়ে ঠিক ওই তিলটার ওপরের অংশটা আলতো করে চুলকোচ্ছেন।

"কী হলো মা?" রাহুল চিন্তিত মুখে কাছে এগিয়ে এল। "চুলকোচ্ছে নাকি ওখানে?"

ইন্দিরা ওর দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসলেন। ঠোঁটের কোণে এক চপল, কৌতুকী হাসি। "একটু একটু... আসলে, ওই জায়গাটায় তো সচরাচর অত আদর বা চুমু জোটে না কিনা... তাই হঠাৎ করে এত স্পেশাল ট্রিটমেন্ট পেয়ে স্কিন বোধহয় একটু ঘাবড়ে গেছে!"

রাহুল মায়ের এই দুষ্টুমি ভরা কথায় হো হো করে হেসে উঠল। "তুমি না মা! আচ্ছা দাঁড়াও, আমি দেখছি।" সে নিজের পড়ার টেবিলের ড্রয়ারটা টেনে একটা বোরোলিনের টিউব বের করল। "আমার কাছে বোরোলিন আছে। লাগিয়ে দিচ্ছি, এক্ষুনি আরাম পাবে।"

বোরোলিন হাতে নিয়ে সিরিয়াস মুখে এগিয়ে আসা ছেলেটাকে দেখে ইন্দিরার বুকের ভেতরটা এক অনাবিল মমতায় ভরে উঠল। এই তো ওর ছেলে—মায়ের সামান্যতম অস্বস্তিতেও যে এতটা ব্যাকুল হয়ে ওঠে। রাহুল বিছানার একেবারে কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে, ওর চোখ মায়ের কাঁধের দিকে নিবদ্ধ।

ও বিছানায় ওঠার আগেই ইন্দিরা হঠাৎ এক অদ্ভুত স্নেহের বশবর্তী হয়ে ওর ডান হাতটা ধরে আলতো করে নিজের দিকে টান দিলেন।

অপ্রস্তুত রাহুল টাল সামলাতে না পেরে সরাসরি ইন্দিরার অনাবৃত শরীরের ওপর এসে পড়ল। ওর চওড়া বুকের ভার ওঁর নরম স্তন আর পেটের ওপর পড়তেই ইন্দিরার মুখ থেকে একটা অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এল, "আহ্!" কিন্তু পরক্ষণেই তিনি দু-হাত দিয়ে ছেলেকে পরম স্নেহে জড়িয়ে ধরলেন।

"মা! কী করছ? ব্যথা পেলে তো!" রাহুল ব্যস্ত হয়ে নিজের ভরটা দু-হাতের ওপর ছেড়ে একটু ওঠার চেষ্টা করল।

"একদম উঠবি না," ইন্দিরা ওকে আরও শক্ত করে নিজের সাথে লেপ্টে ধরলেন। "কোথাও ব্যথা পাইনি আমি। তুই এভাবেই থাক। বড্ড ভালো লাগছে তোকে এভাবে জড়িয়ে ধরতে।"

রাহুল হাসল, ওর চোখদুটো মায়ের চোখের একদম কাছে। "এবার তো তুমিই বাচ্চাদের মতন করছ দেখছি।"

"কারণ তুই পেকে বুড়ো হয়ে যাচ্ছিস," ইন্দিরা ওর চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন। "এবার দে, কী লাগানোর লাগিয়ে দে।"

রাহুল এক হাতে ভর দিয়ে অন্য হাতে বোরোলিনের টিউব থেকে সামান্য একটু ক্রিম নিজের আঙুলে নিল। তারপর খুব সাবধানে, পরম মমতায় ইন্দিরার বাঁ কাঁধের নিচের সেই কালো তিলটার চারপাশে আলতো করে বুলিয়ে দিতে লাগল। ওর আঙুলের সেই শীতল, স্নেহমাখা স্পর্শে ইন্দিরার চোখদুটো আপনাআপনিই বুজে এল।

"আরাম লাগছে, মা?" রাহুল ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।

"উমম... খুব," ইন্দিরা একটা তৃপ্তির শ্বাস ফেললেন। "তোর আঙুলের ছোঁয়াগুলো বড্ড নরম রে সোনা।"

রাহুল মলমটা লাগিয়ে দিয়ে বোরোলিনের টিউবটা সাইড টেবিলে রেখে দিল এবং আবার নিজের চিবুকটা ওঁর বুকের সেই অনাবৃত খাঁজে ঠেকিয়ে চোখ বুজে শুল। ওঁর নিটোল স্তনযুগলের মৃদু ওঠানামা ওর গাল ও কপালে এক অবাধ্য ছন্দ তৈরি করছিল।

ইন্দিরা ওঁর ডান হাতের আঙুলগুলো ওর চুলে বিলি কাটতে কাটতে একটা মৃদু তৃপ্তির শ্বাস ফেললেন। চোখের কোণে তখন এক অদ্ভুত মায়াবী আলো।

"আমি না, যত ভাবছি, তত অবাক হয়ে যাচ্ছি... আমাদের দুজনের সেম জায়গায় তিল..." ইন্দিরা তাঁর সেই চিরচেনা গম্ভীর অথচ মখমলি গলায় বললেন, "প্রকৃতির এই নকশাগুলো কত নিখুঁত হয়। তুই যে আমারই একটা অংশ, আমারই শরীর থেকে নেওয়া এক টুকরো প্রাণ—এই তিলটা যেন তারই এক সিলমোহর।"

রাহুল একটু চোখ খুলে ওঁর থুতনির দিকে তাকাল। "হুম... শুধু এই তিলটাই? আর কিছু তোমার মতো পাইনি, মা?"

"পাসনি আবার?" ইন্দিরা এবার একটু মুচকি হাসলেন, চোখে এক অদ্ভুত প্রশ্রয় আর মাতৃত্বের মিশ্রিত অহংকার। "তুই বুদ্ধিতে একদম আমার মতো তীক্ষ্ণ, পড়াশোনায় আমারই মতো সিনসিয়ার, জেদ-এ আমারই মতো একগুঁয়ে... আর..." তিনি অন্ধকারের মধ্যেই ওর দিকে তাকিয়ে আলতো করে একটা চোখ টিপলেন, "আর দেখতেও ঠিক আমারই মতো সুন্দর। এবার খুশি তো, মিস্টার সেন?"

রাহুল ওঁর এই বিরল চপলতা দেখে একগাল হাসল। বুকের ওপর হাতটা আরেকটু ছড়িয়ে দিয়ে শরীরের আরও উপরে সরে এল ও।

ইন্দিরা এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দু-হাত মাথার ওপরে তুলে শরীরটাকে একটু স্ট্রেচ করলেন। ওঁর রোজকার ঘুমোনোর সময় অনেকক্ষণ পার হয়ে গেছে। শরীর ক্লান্ত হলেও মনের ভেতর এক অদ্ভুত সতেজতা। কিন্তু তিনি যখন অনাবৃত হাতদুটো মাথার ওপরে তুললেন, টেবিল ল্যাম্পের সেই আবছা হলুদ আলোটা ওঁর বাঁ দিকের বগলের ওপর এসে পড়ল। ব্লাউজ আর ব্রা না থাকায় ওঁর সেই ফর্সা, মসৃণ বগলের নিচের অংশটি রাহুলের চোখের সামনে একদম স্পষ্ট হয়ে উঠল। সেখানে হালকা, পরিচ্ছন্ন কিছু কালো চুলের রেখা।

রাহুল ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে সেই দিকে তাকিয়ে রইল। ওর চোখে তখন কোনো কুটিলতা ছিল না, ছিল এক চরম নিষ্পাপ ও চপল কৌতূহল। সে হুট করেই একটু ফিসফিস করে বলে উঠল, "মা! আরও একটা জিনিস দেখো... আমাদের আরও একটা মিল আছে!"

"আবার কী মিল খুঁজে পেলি, সোনা?" ইন্দিরা হাতদুটো ওভাবেই ওপরে রেখে ওর দিকে তাকালেন।

"আমাদের আন্ডারআর্মস-টাও একদম সেম টু সেম! এই দেখো, তোমার ওখানেও কেমন সুন্দর হালকা চুল রয়েছে, আর আমারও আছে!" রাহুল অত্যন্ত সরল গলায় বলল, যেন সে কোনো নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার করে ফেলেছে।

ইন্দিরা ওর এই অদ্ভুত, অভাবনীয় কথাটি শুনে কয়েক মুহূর্তের জন্য সম্পূর্ণ বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। তাঁর মতো একজন রাশভারী, মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর নিজের ছেলের মুখে বগলের চুলের এই ধরনের তুলনা শুনবেন—এটা ওঁর কল্পনারও বাইরে ছিল। বুঝতে পারলেন না এখন রাগ করা উচিত, নাকি হাসা উচিত। ফর্সা গালদুটো অন্ধকারের মধ্যেই লজ্জায় আর এক অদ্ভুত আমোদে লাল হয়ে উঠল। তিনি একটা হালকা হাসির তোড় সামলাতে সামলাতে ওর কপালে হাত দিয়ে মৃদু ধাক্কা দিলেন।

"তুই সত্যিই একটা বদ্ধ উন্মাদ, রাহুল! ইউ আর জাস্ট ইমপসিবল!" ইন্দিরা হাসতে হাসতেই ভুরু দুটো কুঁচকে এক কৃত্রিম শাসনের সুর আনলেন। "তুই এই মাঝরাতে শুয়ে নিজের মায়ের বগলের দিকে নজর দিচ্ছিস? লজ্জা করে না তোর, বাঁদর ছেলে?"

"আহা মা, এতে লজ্জার কী আছে?" রাহুল একদম দমে না গিয়ে বিছানায় সোজা হয়ে বসল। সে নিজেই ওঁর সামনে দু-হাত মাথার ওপরে তুলে ধরল। "আমি তো জাস্ট ন্যাচারাল মিলটা দেখাচ্ছিলাম। এই দেখো আমারটা..." সে চোখের সামনে নিজের বগল এগিয়ে নিয়ে এল। "ওহ্ আচ্ছা... দাঁড়াও, না না, আমার চুলগুলো অনেক বেশি ঘন। তোমারটা বড্ড নরম আর হালকা। তার মানে পুরোপুরি এক নয়।"

ইন্দিরা এবার দুই চোখ কপালে তুললেন। ঠোঁটের কোণে মুক্তোর মতো হাসি ছিটকে বেরোলো। তিনি ওর গালটা ধরে বেশ শক্ত করেই একটা চিমটি কেটে দিলেন।

"সেটা তো হবেই, ওরে আমার মহাজ্ঞানী বিজ্ঞানী! কারণ আমি একজন নারী, আর তুই একজন পুরুষ। পুরুষদের শরীরে হরমোনের কারণে এই ধরনের চুল অনেক বেশি ঘন আর রুক্ষ হয়। মেয়েদের শরীর তেমন হয় না। তোকে কি এখন এই মাঝরাতে আমাকে অ্যানাটমি আর বায়োলজি শেখাতে হবে?"

"আমি তো জাস্ট কম্পেয়ার করছিলাম মা," রাহুল আবার বুকের ওপর মাথাটা নামিয়ে এনে শুয়ে পড়ল। কিন্তু এবার ওর পজিশনটা এমন হলো যে ওর নাক আর মুখটা একদম সেই অনাবৃত, সুবাসিত বগলের খুব কাছাকাছি চলে এল।

ওখান থেকে এক অদ্ভুত, মাদকতাময় মৃদু গন্ধ ওর নাকে আসছিল। শরীরের নিজস্ব উত্তাপ আর এক দামি ফ্রেঞ্চ পারফিউমের হালকা রেশ মিলেমিশে এক অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছিল ওখানটায়।

রাহুল একটা গভীর শ্বাস নিয়ে চোখ বুজে খুব আলতো করে বলল, "মা... একটা কথা বলব? রাগ করবে না তো?"

"আবার কী বলবি? তোর একেকটা কথা শুনলে আমার বুকটা দুরুদুরু করে রে সোনা," তিনি হাতটা আবার ওর চুলে বোলাতে লাগলেন।

"মা, এখান থেকে বড্ড সুন্দর একটা গন্ধ বেরোচ্ছে। খুব চেনা, অথচ কেমন অন্যরকম একটা স্মেল।"

ইন্দিরা এবার আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারলেন না। অন্য হাতটা দিয়ে নিজের মুখটা ঢাকলেন তিনি, পুরো শরীরটা হাসির চোটে কাঁপতে লাগল। "রাহুল! তুই... তুই কী রে? তুই এখন আমার...বগলের গন্ধ শুঁকছিস? আই কান্ট বিলিভ দিস!" তিনি নিজেকে একটু সামলে নিয়ে সেই গম্ভীর, শিক্ষিকার রূপটা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলেন। "শোন সোনা, এটা কিন্তু...দিস ইস টু মাচ। ওটা একটা অত্যন্ত পার্সোনাল জায়গা। ওভাবে কেউ মায়ের..."

"কিন্তু মা, আমি তো সত্যি কথাই বলছি," রাহুল সেই অনাবৃত ত্বকে নিজের নাকটা আরেকটু ছুঁইয়ে দিয়ে বলল। "মিথ্যে তো বলিনি। সত্যিই বড্ড ভালো গন্ধ।"

ইন্দিরা এবার একটু গর্বের সাথে চিবুকটা ওপরে তুললেন। ভেতরের সেই অভিজাত নারীর অহংকারটুকু জেগে উঠল। "ভালো গন্ধ হবে না কেন, শুনি? ইন্দিরা সেন নিজেকে সবসময় কতটা মেনটেইন করে চলে, তুই জানিস না? আমি প্রতিদিন কত নিয়ম মেনে স্কিন কেয়ার করি, কত দামি সাবান আর পারফিউম ইউজ করি... সুগন্ধ তো বেরোবেই।"

রাহুল ওঁর এই আত্মাভিমানিনী, সুন্দর মুখের দিকে কয়েক মুহূর্ত অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। টেবিল ল্যাম্পের আলোয় অনাবৃত বাহুমূলের ত্বকটা যেন এক রূপোলি নদীর মতো চকচক করছিল। ওর ভেতরের সেই অবাধ্য, নিষ্পাপ মনটা আবার জেগে উঠল। সে চোখের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু, কাঁপানো স্বরে বলল:

"মা... আমার না... ওখানটায় একটা ছোট চুমু খেতে ইচ্ছে করছে। প্লিজ, মা?"

৬.২. নিষিদ্ধ আদর ও সুড়সুড়ির হিল্লোল

ইন্দিরা এবার সত্যিই আকাশ থেকে পড়লেন। চোখের মণি দুটো বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল। তিনি কয়েক মুহূর্তের জন্য বিশ্বাসই করতে পারলেন না যে নিজের সন্তান সামনে শুয়ে বগলে চুমু খাওয়ার আবদার করছে। এটা যেমন অদ্ভুত, তেমনই এক চরম সোশ্যাল ট্যাবু। ভেতরের সেই যুক্তিবাদী মনটা চিৎকার করে উঠল, কিন্তু চোখের সামনে থাকা রাহুলের ওই নিষ্পাপ, আকুল চোখের চাউনি ওঁর সমস্ত যুক্তিকে ভেদ করে ওঁর চেতনাকে যেন এক অদ্ভুত মায়ায় আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলল।

"রাহুল! হোয়াট অন আর্থ আর ইউ সেয়িং?!" ইন্দিরা গলার স্বর যতটা সম্ভব শক্ত করে বললেন, যদিও বুকের ভেতরের কম্পন গলার কাঁপনেই ধরা পড়ে যাচ্ছিল। "তুই... তুই আমার বগলে চুমু খাবি? এটা একদম অ্যাবসার্ড! রিডিকিউলাস! তুই কি নিজের সব সেন্স হারিয়ে ফেলেছিস, সোনা? আমি তোর মা হই!"

"আমি তো জানি তুমি আমার মা," রাহুল অনাবৃত কাঁধে হাতটা দিয়ে আলতো করে চাপ দিল। "আমি তো অন্য কারও মাকে বলছি না। আমার নিজের মায়ের শরীর, আমার নিজের মায়ের এত সুন্দর একটা সুগন্ধ... আমি একটু আদর করলে তাতে কার কী ক্ষতি হবে, মা? প্লিজ... জাস্ট একটা ছোট্ট চুমু।"

"না, রাহুল। একদম না," ইন্দিরা মুখটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেন, কিন্তু শরীরের সমস্ত বর্ম যেন এই মাঝরাতের অন্ধকারে একে একে খসে পড়ছিল। "আমি তোকে অনেক লাই দিয়েছি আজ। তুই পরীক্ষায় ভালো করেছিস বলে আমি তোকে জড়িয়ে ধরে শুয়েছি, নিজের ব্লাউজ খুলে তোকে...যাই হোক, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তুই যা চাইবি, আমি সব মেনে নেব। দেয়ার হ্যাজ টু বি আ লাইন, সোনা।"

রাহুল এবার সেই চিরচেনা ও অমোঘ অস্ত্রটি ব্যবহার করল। সে চিবুকটা নিজের হাত দিয়ে খুব আলতো করে নিজের দিকে ঘুরিয়ে আনল এবং চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের ঠোঁটদুটোকে একদম ছোট বাচ্চাদের মতো ফুলিয়ে এক করুণ, অনুনয় ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

ইন্দিরা ওই মুখের দিকে তাকিয়ে অনুভব করলেন, নিজের ভেতরের সমস্ত কঠোরতা যেন মুহূর্তের মধ্যে গলে জল হয়ে যাচ্ছে। ওঁর মনে হলো, এই ছেলেটার এই একগুঁয়ে অথচ নিষ্পাপ জেদের কাছে তিনি আজীবন হেরে যেতে রাজি। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি। মুখভঙ্গিতে এক চরম অসহায়তা আর প্রশ্রয়ের মিশ্রণ।

"তুই... তুই একটা আস্ত ব্ল্যাকমেইলার, রাহুল," তিনি অত্যন্ত নিচু, হেরে যাওয়া স্বরে বললেন। "ঠিক আছে... যা খুশি কর। তোর এই পাগলামি আমি আর সামলাতে পারছি না।"

অনুমতি পেতেই রাহুলের চোখে এক স্বর্গীয় আনন্দ খেলে গেল। সে খুব ধীরে, অত্যন্ত সাবধানে নিজের মুখটা সেই বাঁ দিকের বগলের নরম, সুবাসিত ত্বকের ওপর নামিয়ে নিয়ে এল। তারপর হালকা চুলের রেখাগুলোর ওপর ঠোঁট দিয়ে এক গভীর, নরম ও উষ্ণ চুমু খেল।

রাহুলের ঠোঁটের সেই আর্দ্র ও উষ্ণ ছোঁয়া ওই চরম সংবেদনশীল জায়গায় লাগতেই ইন্দিরা আর নিজের শরীরকে স্থির রাখতে পারলেন না। তিনি খিলখিল করে হেসে উঠলেন এবং পুরো শরীরটা এক তীব্র সুড়সুড়ির চোটে কাঁপতে লাগল।

"আহ্... উফ্ সোনা! ছাড়... বড্ড সুড়সুড়ি লাগছে রে! ওহ্ গড, আই অ্যাম সো টিকলিশ দেয়ার!" তিনি হাসতে হাসতে ছটফট করতে লাগলেন, অনাবৃত স্তনযুগল রাহুলের বুকের সাথে ঘষা খেয়ে এক তীব্র আলোড়ন তৈরি করল।

রাহুল কিন্তু ছাড়ল না। সে ওঁর সেই ছটফটানিকে নিজের হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে আরও একটা চুমু খেল ওখানটায়, এবার আরেকটু সময় নিয়ে।

"উফ্ রাহুল... প্লিজ স্টপ ইট, সোনা! আমি আর পারছি না... ওহ্ তুই কী অবাধ্য ছেলে রে!" ইন্দিরা এবার ছাদের জ্বলন্ত সিলিং ফ্যানটার দিকে তাকিয়ে এক চরম কৃত্রিম বিরক্তি আর বিস্ময়ের সাথে নিজের কপালে হাত দিলেন। মুখভঙ্গিতে তখন এক অদ্ভুত অহংকার আর আত্মসমর্পণ।

"হে ভগবান! আজ আমার কী দিন দেখতে হচ্ছে!" তিনি ছাদের দিকে তাকিয়েই বলতে লাগলেন, যেন সরাসরি উপরে থাকা ঈশ্বরের কাছে নালিশ করছেন। "এই নাকি রাহুল সেন... ওর কলেজের সমস্ত প্রফেসররা বলেন ও নাকি বড্ড ভদ্র, বড্ড শান্ত, ক্লাসের সবচেয়ে ব্রিলিয়ান্ট আর সিনসিয়ার স্টুডেন্ট! আর সেই ছেলে এখন মাঝরাতে দরজা বন্ধ করে নিজের মায়ের বগলে চুমু খাচ্ছে! আমি নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছি না... আহ্... আস্তে সোনা... বড্ড কাতুকুতু লাগছে তোকে বললাম না! একটু আস্তে..."

রাহুল ওই কৃত্রিম শাসনের বাণীগুলো শুনতে শুনতে পরম তৃপ্তিতে আরও কয়েকবার সেই সুগন্ধী ত্বকে নিজের ঠোঁট ঘষল। গায়ের সেই সুবাস যেন ওর পুরো সত্তাকে এক মায়াবী ঘুমে আচ্ছন্ন করে দিচ্ছিল।

কিছুক্ষণ পর রাহুল যখন মুখ তুলল, ঠোঁটের কোণে এক বিজয়ী শিশুর নিষ্পাপ হাসি। ও চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।

ইন্দিরা কাঁপতে থাকা শরীরটাকে একটু শান্ত করে একটা গভীর শ্বাস নিলেন। চুলগুলো বিছানায় এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। তিনি ওর দিকে তাকিয়ে সুন্দর হাত দিয়ে ওর গালটা আলতো করে টিপে দিলেন।

"এবার খুশি তো, অবাধ্য দুষ্টু ছেলে কোথাকার!" ইন্দিরা চেনা আভিজাত্য মেশানো সুরে বললেন।

রাহুল মাথা নেড়ে সায় দিল, "হ্যাঁ মা। বড্ড খুশি।"

কিন্তু ইন্দিরা লক্ষ্য করলেন, রাহুল ওঁর দিকে তাকিয়ে কথা বলার সময় ওর মুখের ভেতর কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে। ও নিজের জিভ দিয়ে ঠোঁটের কোণটা কেমন যেন পরিষ্কার করার চেষ্টা করছে।

"কী হলো রে, সোনা? অমন করছিস কেন?" ইন্দিরা ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন।

"কী জানি মা... কেমন যেন একটা কুটকুট করছে মুখের ভেতর," রাহুল একটু আমতা আমতা করল।

ইন্দিরা মুহূর্তের মধ্যে পুরো বিষয়টা বুঝতে পারলেন। ঠোঁটের কোণে এক পরম মায়াবী ও কৌতুকী হাসি দেখা দিল। "হাঁ কর তো দেখি, সোনা। হাঁ কর।"

রাহুল বাধ্য ছেলের মতো ওঁর সামনে মুখটা বড় করে হাঁ করল। ইন্দিরা নিজের ডান হাতের দুটো সুন্দর, নরম আঙুল ওর মুখের ভেতরে ঢোকালেন। তারপর দাঁতের মাড়ি আর ঠোঁটের মধ্যেকার ফাঁক থেকে আর জিভের ওপর থেকে বগলের দুটো ছোট কালো চুল, যা চুমু খাওয়ার সময় মুখের ভেতর আটকে গিয়েছিল, খুব সাবধানে টেনে বের করে আনলেন।

"দেখেছিস তো? তোকে বললাম বড্ড সুড়সুড়ি লাগছে, আমি জানতাম চুলগুলো মুখে ঢুকে যাবে... তুই তো কথা শুনবি না," ইন্দিরা ওই আঙুলদুটো নিজের শাড়ির আঁচলে মুছতে মুছতে এক চরম কৃত্রিম বিরক্তির সাথে বললেন, "তুই একটা আস্ত বোকা, বুঝলি তো?"

রাহুল লজ্জায় একটু হেসে বুকের ভেতর নিজের মুখটা লুকিয়ে ফেলল।

কিছুক্ষণ পর, সেই উষ্ণ ওমের ভেতর থেকে মুখটা সামান্য তুলে সে একটু লাজুক, অথচ প্রচ্ছন্ন দুষ্টুমির হাসিতে চোখ কুঁচকে বলল, "মা... তোমার কি এখন একটু বোরোলিন লাগবে?"

ইন্দিরা ভুরু কুঁচকে ওর দিকে অবাক হয়ে তাকালেন। "বোরোলিন? আবার বোরোলিন কেন সোনা?"

রাহুল ওর সেই স্বভাবসুলভ, চরম নিষ্পাপ মুখটা করে বলল, "না মানে... ওই যে, একটু আগে আমি তোমার তিলে চুমু খাওয়ার পর তোমার ওখানটা কেমন মিশমিশ করছিল বলে আমি বোরোলিন লাগিয়ে দিলাম... তাই ভাবছিলাম, এখন তো আমি তোমার বগলেও চুমু খেলাম, যদি আবার তোমার ওখানেও চুলকোতে শুরু করে! বলা তো যায় না, আগেভাগেই লাগিয়ে দেবো নাকি একটু?"

এই চরম ফাজলামো মেশানো লজিকটা শুনে ইন্দিরার চোখদুটো বিস্ময়ে আর চরম আমোদে বড় বড় হয়ে গেল। পরক্ষণেই তিনি একরাশ মুক্তো ঝরা হাসিতে ফেটে পড়লেন। হাসির চোটে ওঁর শরীরটা রাহুলের বুকের সাথে আবার ঘষা খেতে লাগল। তিনি হাত বাড়িয়ে ওর নাকটা বেশ জোরেই টেনে দিলেন।

"অসভ্য! ফাজিল ছেলে কোথাকার!" ইন্দিরা হাসতে হাসতে কপট রাগে শাসন করলেন। "বড্ড মুখে মুখে তর্ক করা আর পাকা পাকা কথা বলা শিখেছিস, তাই না? তোর ওই 'বোরোলিন থিওরি' তুই নিজের কাছেই রাখ! আমার আর কোথাও মিশমিশ করছে না। আর যদি করেও, তোর ওই উটকো ট্রিটমেন্ট আমার আর চাই না!"

রাহুল খিলখিল করে হাসতে হাসতে মায়ের গলায় মুখ ঘষল। "আহা মা, আমি তো শুধু তোমার কেয়ার করছিলাম! নিজের মায়ের জন্য একদম ফ্রি অফ কস্ট স্কিনকেয়ার সার্ভিস দিচ্ছি, আর তুমি উল্টে রাগ করছ!"

"সার্ভিস! ওরে আমার সমাজসেবক রে!" ইন্দিরা ওর চুলগুলো আঙুল দিয়ে এলোমেলো করে দিয়ে এক চরম প্রশ্রয়ের সুরে বললেন। "বেশি পাকা পাকা কথা বললে না, আমি কিন্তু তোকে খাট থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেব। তখন বুঝবি ঠেলা!"

"পারবে না," রাহুল চরম আত্মবিশ্বাসের সাথে ওঁর শরীরের সাথে নিজেকে একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিল। "কারণ তুমি আমাকে ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে পারবে না।"

"বড্ড অহংকার তোর, না?" ইন্দিরা অত্যন্ত আদুরে গলায় বলে ওকে আরও শক্ত করে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে ধরলেন।

দুজনেই আবার একে অপরকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল। অন্ধকার ঘরে তখন কেবলই শোনা যেতে লাগল দুটি হৃদয়ের এক হয়ে যাওয়া স্পন্দন, আদরে মাখামাখি হওয়া অস্ফুট কিছু শব্দ—"উমম...", "পাগল ছেলে..."—আর তার সাথে মিশে থাকা চাপা, মখমলি হাসির রেশ।



৬.৩. প্রাচীন স্মৃতি ও একটি অবাধ্য আবদার

ঘরের ভেতরের নীরবতা আবার ফিরে এল, কিন্তু এবার সেই নীরবতার মধ্যে এক গভীর স্মৃতিকাতরতা মিশে ছিল। ইন্দিরার হাতটা তখন রাহুলের পিঠের ওপর এক শান্ত ছন্দ তৈরি করছিল। মনটা হঠাৎ করেই বর্তমানের এই গোপন দেওয়ালগুলো ভেঙে অনেক অনেক বছর পিছিয়ে গেল—যখন রাহুল এই বিশাল রাজপুত্রের মতো পেশিবহুল যুবক ছিল না, যখন সে ছিল ওঁর কোলের এক মুঠো নরম মাংসের টুকরো।

"জানিস রাহুল," ইন্দিরা খুব নিচু, এক অদ্ভুত মাতৃত্বের ওমে ভরা গলায় বলতে লাগলেন, চোখদুটো তখন অতীতের কোনো এক রূপোলি ক্যানভাসে আটকে গেছে। "আজ তোকে এভাবে জড়িয়ে ধরে থাকতে থাকতে আমার খালি তোর ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে।"

"কোন সময়ের কথা, মা?" রাহুল বুকের সেই অনাবৃত ওমে মুখ রেখেই জিজ্ঞেস করল।

"ওই যে তোকে সন্ধ্যের দিকে বলছিলাম, তোর একদম বাচ্চাবেলার কথা..." ইন্দিরা একটু হাসলেন, গলার স্বর বড্ড নরম শোনাল। "যখন তোর এই অবাধ্য হাত-পাগুলো অত বড় হয়নি। তুই যখন আমার কোলে বসে দুধ খেতিস... তুই তখন ওভাবে শান্ত হয়ে শুয়ে থাকতে পারতিস না। তোর ওইটুকুনি ছোট্ট ফর্সা মুখটা তুই আমার এই বুকের ওপর শক্ত করে চেপে ধরতিস। আর তোর ওই ছোট্ট ছোট্ট কচি আঙুলগুলো দিয়ে তুই আমার এই হাতদুটোকে এমনভাবে খাবলে ধরে রাখতিস, যেন আমি তোকে ছেড়ে কোথাও চলে যাব। দুধ খেতে খেতে তুই তোর ওই তুলতুলে নরম গালদুটো আমার এই স্কিনের ওপর এমনভাবে ঘষতিস... যেন ওটাই এই পৃথিবীর সবচেয়ে নরম আর সেফ জায়গা।"

রাহুল কথাগুলো শুনতে শুনতে গভীর কোনো এক চিন্তায় ডুবে গেল। অনাবৃত বুকের যে অংশটিতে ও নিজের মুখ ঠেকিয়ে আছে, সেখান থেকে ওঁর হৃদপিণ্ডের ধুকপুক শব্দটা ও স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল। ওর মনের ভেতরের সেই আদিম মনস্তাত্ত্বিক নদীটা হঠাৎ করেই এক তীব্র জোয়ারে মেতে উঠল।

সে মুখটা সামান্য তুলে মায়ের চিবুকের দিকে তাকাল। "আচ্ছা মা, তখন তোমার কেমন লাগত? মানে... ওই ফিলিংসটা তোমার কাছে ঠিক কেমন ছিল?"

ইন্দিরা ওর চুলে আলতো করে বিলি কেটে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "কেমন আবার! বড্ড শান্তির, বড্ড তৃপ্তির। একজন মায়ের কাছে তার সন্তানকে নিজের শরীর থেকে পুষ্টি দেওয়ার চেয়ে সুন্দর অনুভূতি আর কিছু হতে পারে না, সোনা। তুই যখন ছোট্ট একটা তুলোর বলের মতো আমার বুকের সাথে লেপ্টে থাকতিস, আমার সারাদিনের ইউনিভার্সিটির ক্লান্তি, তোর বাবার ব্যবসার টেনশন—সব যেন ম্যাজিকের মতো উধাও হয়ে যেত।"

রাহুল ওঁর গলার কাছে নিজের আঙুল দিয়ে খুব আলতো করে তুলির মতো বুলিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করল, "আমি কি তোমায় খুব জ্বালাতাম তখন? মানে... দুধ খাওয়ার সময় ব্যথা দিতাম খুব?"

ইন্দিরা এবার একটু শব্দ করেই হাসলেন। "জ্বালাতিস না মানে? দাঁত ওঠার সময় মাঝে মাঝেই তো কামড়ে দিতিস! আমি তো ব্যথায় ককিয়ে উঠতাম। কিন্তু জানিস, তুই যখন পেট ভরে খাওয়ার পর তৃপ্ত হয়ে চোখদুটো বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়তিস, আর তোর ঠোঁটের কোণে একটুখানি দুধ লেগে থাকত... তখন সেই মুখটা দেখে আমি নিজের সব কষ্ট ভুলে যেতাম। মনে হতো, তোর জন্য আমি পৃথিবীর সব ব্যথা সহ্য করতে পারি।"

রাহুল কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। ওর চোখদুটো মায়ের অনাবৃত বক্ষের দিকে স্থির। "আমার কিছুই মনে নেই, মা। ভাবলেই কেমন অদ্ভুত লাগে না? যে আমি তোমার শরীর থেকে বেড়ে ওঠার খাবার পেয়েছি, অথচ আমার ব্রেনে তার কোনো মেমোরি নেই। কিচ্ছু মনে পড়ে না আমার।"

"তাতে কী হয়েছে?" ইন্দিরা ওকে সান্ত্বনা দেওয়ার সুরে ওর পিঠটা আরেকটু কাছে টেনে নিলেন, বুঝতে পারলেন না ছেলের মনের ভেতর কী চলছে। "স্মৃতি না থাকলেও টান তো আছে। তাই তো এত বড় হওয়ার পরও তুই মায়ের কাছে এসে এভাবে শান্তি পাস।"

"হতে পারে," রাহুল খুব ধীর গলায় বলল। ওর গলার স্বরে এখন এক অদ্ভুত, সম্মোহনী আর্তি। "কিন্তু মা... আমার না ওই ফিলিংসটা এক্সপেরিয়েন্স করতে বড্ড ইচ্ছে করে। এই যে তুমি এত সুন্দর করে বললে, আমি তোমার স্কিনের ওপর মুখ ঘষতাম, তোমার বুকে মুখ দিয়ে থাকতাম... এটা শুনতেই আমার এতটা শান্তি লাগছে। আমার খুব আফসোস হয় জানো, যে আমার জীবনের সবচেয়ে পিসফুল মেমোরিটাই আমার ব্রেন থেকে ইরেজ হয়ে গেছে।"

ইন্দিরা এবার প্রশ্রয়ের সুরে হেসে উঠলেন। "ধুর পাগল! এতে আফসোসের কী আছে? পৃথিবীর সব বাচ্চারাই তো ওই বয়সের কথা ভুলে যায়। তুই কি এখন ওইসব কথা ভেবে কষ্ট পাচ্ছিস নাকি? চাস তো কাল সকালে তোকে তোর ছোটবেলার অ্যালবামের ছবিগুলো বের করে দেখাব। দেখবি তুই কেমন বাঁদরের মতো আমার কোলে ঝুলে থাকতিস।"

"ছবি দেখে তো আর ফিলিংসটা বোঝা যাবে না, মা," রাহুল এবার মুখটা আরেকটু তুলে সরাসরি ইন্দিরার চোখের দিকে তাকাল। ওর কণ্ঠস্বর এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি নিচু, অনেক বেশি সিরিয়াস। "ফিলিংসটা তো শুধু রিয়েল এক্সপেরিয়েন্স থেকেই আসে। তাই ভাবছিলাম..."

"কী ভাবছিলিস?" ইন্দিরা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন।

রাহুল ওঁর অনাবৃত বুকের ঠিক ওপরে নিজের চিবুকটা ঠেকিয়ে খুব শান্ত, অথচ একটা নিষিদ্ধ প্রস্তাব দেওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তের উত্তেজনা নিয়ে বলল, "ভাবছিলাম... যদি আমি একটা নতুন মেমোরি তৈরি করি?"

"নতুন মেমোরি?" ইন্দিরা কিছুই বুঝতে না পেরে অবাক হয়ে বললেন। "মানে?"

রাহুল এবার একটা ঢোক গিলল। ওর চোখের মণি দুটো কাঁপছে, কিন্তু সংকল্পে স্থির। "মা... আচ্ছা... আমি যদি ওটা... আর একবার করতে চাই... সেটা কি... বড্ড খারাপ কিছু হবে?"

ইন্দিরা প্রথমে কথার অর্থটা ঠিক ধরতে পারলেন না। ভুরু দুটো সামান্য কুঁচকে গেল। "কী করতে চাস, সোনা? কোনটা খারাপ হবে?"

রাহুল অনাবৃত স্তনযুগলের দিকে একবার তাকাল, তারপর চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে এক অদ্ভুত মায়াবী জড়তা নিয়ে মড়মড় করে বলল, "ওই যে... তুমি যেটা বললে... তোমার ওই বুক থেকে... আর একবার... দুধ খাওয়া?"

রাহুল বাক্যটি শেষ করতেই ঘরের ভেতরের সমস্ত বাতাস যেন এক সেকেন্ডের জন্য জমে বরফ হয়ে গেল। ইন্দিরার পুরো শরীরটা এক তীব্র বৈদ্যুতিক শকের মতো কেঁপে উঠল। চোখের মণি দুটো বিস্ময়ে আর এক চরম অপার্থিব আঘাতে এতটা বড় হয়ে গেল যে মুখ দিয়ে কোনো শব্দই বেরোল না। ওঁর প্রাজ্ঞ, বুদ্ধিজীবী মনটা এই চরম নিষিদ্ধ ও অবিশ্বাস্য আবদারটি গ্রহণ করতেই পারল না।

"তুই... তুই এটা কী বলছিস, রাহুল?!!" ইন্দিরা শরীরটা সামান্য পিছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেন, কণ্ঠে তখন এক তীব্র অবিশ্বাস আর কম্পন। "তুই... তুই আমার বুক থেকে...  ইউ মিন... ইউ ওয়ান্ট মি টু... হোয়াট???"

রাহুল এক পরম অপরাধবোধ অথচ চরম জেদ নিয়ে চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের মাথাটা নাড়ল। হ্যাঁ, সে এটাই চায়।

"দিস ইজ... দিস ইজ সো রিডিকিউলাস, রাহুল!!" ইন্দিরা এবার বিছানায় উঠে বসার উপক্রম করলেন, মুখে রাগ আর শাসনের কঠোরতা ফুটে উঠল। "তোর বয়স কত মনে আছে তোর? ইউ আর নাইনটিন ইয়ার্স ওল্ড! তুই উনিশ বছরের একটা জোয়ান ছেলে! এই বয়সে একটা ছেলে ওর মায়ের বুকে বাচ্চার মতো মুখ দিয়ে দুধ খাওয়ার আবদার করছে—হোয়াট ইস দিস ননসেন্স? তুই কি নিজের সব মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিস? আর তা ছাড়া... লুক... আমি অলরেডি তোকে বড্ড বেশি প্রশ্রয় দিয়ে ফেলেছি আজ। আমি তোর জন্য এমন অনেক কিছু করেছি যা কোনো মা ওঁর ছেলের সাথে কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবে না!"

"কী করেছ, মা?" রাহুল একটু অবাক হওয়ার ভান করে বলল।

ইন্দিরা এবার সত্যিই বড্ড রেগে গেলেন, ফর্সা মুখটা রাগে আর লজ্জায় একদম লাল হয়ে উঠল। গলার স্বর এক তীব্র আভিজাত্যপূর্ণ শাসনে ফেটে পড়ল। "কী করেছি মানে? তোর এই কথা বলার সাহস হয় কী করে? আফটার অল দিস... লজ্জা করে না তোর আমাকে এই কথা বলতে?" তিনি নিজের অনাবৃত শরীরের দিকে ইশারা করে বলতে লাগলেন, "তোর জন্য আমি নিজের ব্লাউজ আর ব্রা খুলে ফেলেছি... আমি এখন তোর সামনে একদম জামাকাপড় ছাড়া শুয়ে আছি, ঠিক যেমন তুই শুয়ে আছিস! এই পৃথিবীর কোন মা তার এই উনিশ বছরের সাবালক ছেলের সামনে এভাবে নিজের বুক খুলে শুয়ে থাকে, বলবি আমাকে?"

রাহুল চুপ করে রইল।

"আমি তোকে এত... কাছে আসতে দিয়েছি," ইন্দিরা শ্বাস দ্রুত হতে হতে বলতে লাগলেন, "তোকে খালি গায়ে আমার নিজের স্কিনের সাথে লেপ্টে রেখে শুতে দিয়েছি। তোকে একটা ছোট বাচ্চার মতো আমার বুকে জড়িয়ে ধরে রেখেছি। তোকে আমার...ওহ গড.... তোকে আমার তিলে চুমু খেতে দিয়েছি, এমনকি আমার এই...এই.... বগলেও তুই চুমু খেয়েছিস এতক্ষণ! তাও আবার এমন পাগলের মতো যে বগলের চুলগুলো পর্যন্ত তোর মুখে গিয়ে আটকাল! আর এখন... তোর লোভ এত বেড়ে গেছে যে তুই আমার বুকে.... মুখ দিতে চাস? তুই এবার সব লিমিট ক্রস করে যাচ্ছিস। ছিঃ, ছিঃ রাহুল! দিস ইস ডিসগাস্টিং!"

ওঁর শেষ কথাগুলো বড্ড শুষ্ক আর চূড়ান্ত শোনাল।

(rest of the Chapter continued in the next post...)
Reply
#9

(....rest of Chapter 6)

৬.৪. শর্তাধীন স্নেহের চুক্তি


রাহুল মায়ের এই তীব্র শাসনের সুর শুনেও দমে গেল না। সে চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে খুব শান্ত অথচ জেদি গলায় বলল, "আমি লিমিট ক্রস করছি, মা?"

কথাটা শোনার সাথে সাথে ইন্দিরার ভেতরের সেই কড়া, রাশভারী মায়ের সত্তাটা যেন বারুদের মতো জ্বলে উঠল। ওঁর চোখদুটো রাগে দপদপ করতে লাগল। নিজের উনিশ বছরের ছেলে ওঁর মুখের ওপর এমন একটা চরম ট্যাবু, এমন একটা নিষিদ্ধ আবদার করার পরও কীভাবে এত শান্তভাবে তর্ক করতে পারে?

"তোর এত বড় সাহস!"

ইন্দিরা এক ঝটকায় উঠে বসলেন। আর কোনো চিন্তাভাবনা করার আগেই ওঁর ডান হাতটা তীব্র বেগে বাতাসে উঠে এল।

ঠাস!

এক চরম নিস্তব্ধতার মধ্যে ইন্দিরার ফর্সা হাতের তালু রাহুলের বাঁ গালে সজোরে আছড়ে পড়ল। চড়ের শব্দটা ঘরের বদ্ধ বাতাসে একটা তীক্ষ্ণ প্রতিধ্বনির মতো বাজল।

রাহুলের মাথাটা সামান্য একদিকে ঘুরে গেল। ও কোনো চিৎকার করল না, ওর চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জলও বেরোল না। ও শুধু কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তারপর নিজের হাত দিয়ে গালটা একবার আলতো করে ছুঁল। ওর মুখে কোনো রাগ ছিল না, শুধু এক গভীর, জমাট বাঁধা অভিমান। সে মায়ের চোখের দিকে আর তাকাল না। অত্যন্ত ধীর গতিতে, কোনো শব্দ না করে সে ইন্দিরার অনাবৃত শরীরের ওপর থেকে নিজেকে সরিয়ে নিল। তারপর বিছানার ঠিক অন্য পাশে, ইন্দিরার দিকে পিঠ করে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল।

হাতের তালুতে চড়ের সেই তীব্র জ্বলুনিটা টের পেয়ে ইন্দিরার নিজেরই বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। উনি কী করলেন এটা? এত বড় ছেলেকে এভাবে গায়ে হাত তুললেন? কিন্তু ভেতরের সেই প্রফেসরের ডিসিপ্লিন আর কড়া মায়ের সত্তা তাঁকে পিছু হঠতে দিল না। নিজের কাজটাকে জাস্টিফাই করার জন্য তিনি রাগী গলায় বকতে শুরু করলেন, যদিও গলার স্বরের সেই তীক্ষ্ণতা সামান্য কমে এসেছিল।

"অমন ভিকটিম সাজার চেষ্টা করবি না, রাহুল! একদম না!" ইন্দিরা পিঠ করে শুয়ে থাকা ছেলের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বললেন। "তুই যা বলেছিস, তার জন্য ওই চড়টাই তোর পাওনা ছিল। একটা ধেড়ে ছেলে... তুই কি ভাবিস তুই যা খুশি আবদার করবি আর আমি সব মেনে নেব? সবকিছুর একটা লিমিট থাকে। তুই সেটা এতক্ষণ ধরে বারবার পার করার চেষ্টা করেছিস, আমি সেটা মেনেও নিয়েছি, কিন্তু এবার জাস্ট... সবকিছু ক্রস করে গেছিস।"

রাহুল ওভাবেই দেওয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে রইল। কোনো নড়াচড়া করল না। তারপর অত্যন্ত নিচু, অভিমানী স্বরে ফিসফিস করে বলল, "আমি তো শুধু তোমার কাছে একটু শান্তি খুঁজছিলাম, মা। ছোটবেলার সেই ফিলিংসটা... তুমি নিজেই তো বললে তখন আমার জন্য তোমার বুকের চেয়ে সেফ জায়গা আর কিছু ছিল না। নিজের মায়ের কাছে আদর খাওয়াটা কবে থেকে অপরাধ হয়ে গেল?"

"আদর খাওয়ার একটা বয়স থাকে, রাহুল," ইন্দিরা একটু নরম হলেন, কিন্তু গলার কাঠিন্য বজায় রাখলেন। "তুই যেটা চাইছিস সেটা পাগলামি। সেটা বিকৃতি। তুই বুঝতে পারছিস না তুই কী বলছিস। আমি একজন মা, আমি তোকে জন্ম দিয়েছি ঠিকই, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তুই তোর এই বয়সে এসে..." তিনি আর কথাটা শেষ করতে পারলেন না।

"তুমি আমাকে জন্ম দিয়েছ বলেই তো আমি এই অধিকারটা চাইছি," রাহুল না ঘুরেই নরম গলায় উত্তর দিল। "তুমি যদি আমাকে মারতেও চাও, মারতে পারো। কিন্তু আমার ফিলিংসটা তো মিথ্যে হয়ে যাবে না।"

ছেলের এই শান্ত অথচ আহত গলাটা ইন্দিরার বুকের ভেতর তীরের মতো বিঁধল। তাঁর রাগটা ধীরে ধীরে গলে গিয়ে এক ধরনের চরম অসহায়তায় রূপ নিল। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

"রাহুল... এদিকে ঘুরে শো," তিনি বললেন।

রাহুল নড়ল না।

ইন্দিরার গলাটা এবার আরও একটু শান্ত, আরও একটু নরম হয়ে এল। "রাহুল... এদিকে তাকা আমার দিকে। কথা বলছি আমি।"

এবার রাহুল ধীরে ধীরে নিজের শরীরটা ঘোরাল। ওর গালে তখনো ইন্দিরার পাঁচ আঙুলের হালকা লালচে দাগ স্পষ্ট হয়ে আছে। সেটা দেখে ইন্দিরার বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল।

"তুই বড্ড বিগড়ে যাচ্ছিস দিন দিন," ইন্দিরা ওর দিকে তাকিয়ে বললেন, তবে গলায় আর আগের মতো সেই রাগের আগুন নেই, আছে এক ধরনের কড়া যুক্তি। "তুই একবার ভাব তো, বাইরের মানুষ যদি কোনোদিন জানতে পারে যে আমার এই উনিশ বছরের অ্যাডাল্ট ছেলে... আমার এই সো কল্ড ব্রিলিয়ান্ট ছেলে... নিজের মায়ের বুকে মুখ দেওয়ার জন্য এভাবে...এভাবে ভিক্ষে করছে... লোকে কী ভাববে, বল তো? তারা এটাকে নোংরামি ছাড়া আর কিছু ভাববে না।"

"বাইরের লোক জানবে কী করে, মা?" রাহুল চোখের দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল। "আমি তো অলরেডি প্রমিস করেছি, আর আমাদের অফিশিয়াল কন্ট্রাক্ট-ও আছে। আমি কাউকেই কিচ্ছু বলব না। এটা তো শুধু আমার আর তোমার মাঝখানের একটা সিক্রেট। একটা পবিত্র সিক্রেট।"

"বাইরের লোক জানবে না বলেই কি একটা জিনিস যেটা সম্পূর্ণ আনন্যাচারাল... সম্পূর্ণ আনকনভেনশনাল... সেটা করা ঠিক?" ইন্দিরা ওর কানের লতিতে আঙুল দিয়ে হালকা করে একটা টান দিলেন, যাতে ওর সেরম ব্যথা না লাগে। "নিজের ওই টেকনিক্যাল লজিক দিয়ে আমাকে হারাতে আসিস না তো? স্টপ ট্রায়িং টু আউটউইট মি।"

"মা, আমি কোনো লজিক দিচ্ছি না," রাহুল এবার বিছানায় সামান্য উঠে এসে মায়ের আরেকটু কাছে ঘেঁষল। ওর গলার স্বরে এক তীব্র আকুতি। "আমি তো কোনো অন্যায় করিনি। আমি শুধু চাই সেই পুরোনো মেমোরিটা ফিরে পেতে। তুমি তো আমার কাছে এই পৃথিবীর সবচেয়ে প্রেশাস মানুষ। তোমার ওই ওমটা, ওইভাবে তোমার বুকে মুখ গুঁজে থাকার অধিকারটা তো শুধুই আমার ছিল একসময়, তাই না? সেটা আর একবার ফিল করলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে? আমি তো শুধু একটু শান্তি চাইছি। তুমি ছাড়া আমাকে এই শান্তি কে দেবে, মা?"

ছেলের এই কথাগুলো ইন্দিরার ভেতরের সমস্ত দেওয়াল যেন একে একে ধসিয়ে দিচ্ছিল। তিনি বুঝতে পারছিলেন ওর এই চাওয়ার মধ্যে কোনো কলুষতা নেই, আছে কেবল এক শিশুর মতো অধিকারবোধ। কিন্তু তবুও, ওঁর সেই যৌক্তিক মনটা শেষবারের মতো একটা বিশাল বাধা খাড়া করার চেষ্টা করল। তিনি অত্যন্ত দ্বিধাগ্রস্তভাবে, যেন একটা হাইপোথেটিক্যাল পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলছেন, এমন সুরে বললেন:

"তুই কি সত্যিই পাগল হয়ে গেছিস, রাহুল? তুই তো সাইন্সের স্টুডেন্ট। তুই জানিস না... ইভেন ইফ... মানে কোনোভাবে যদি তোর এই অদ্ভুত জেদ আমি মেনেও নিই... এটা তো বায়োলজিক্যালি ইমপসিবল! আমার তো এখন আর বুকে দুধ নেই রে বোকা। একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর মেয়েদের শরীর তো আর মিল্ক প্রোডিউস করে না, সেটা তো শুকিয়ে যায়। তুই খাবিটা কী?"

রাহুল এই কথাটা শুনে একটুও দমল না। ওর চোখে তখন এক অসীম ভালোবাসার আলো। সে মায়ের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, "আমার দুধ চাই না, মা। আমার শুধু ফিলিংসটা চাই। তোমার বুকে মুখ দিয়ে ওই শান্তিটা ফিল করতে চাই। শুধু ওটুকুই। তুমি আমাকে তোমার বুকে একটু জায়গা দাও না, প্লিজ?"

ইন্দিরা এই নিরেট, নিঃশর্ত আবেগের কাছে পুরোপুরি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। এই ছেলেটা সত্যিই ওঁর সমস্ত অহংকার, সমস্ত শাসনকে কীভাবে যেন এক মুহূর্তে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। তিনি একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ঘরের ভেতরের বাতাস তখন ওঁর উত্তরের অপেক্ষায় থমকে আছে। রাহুল আবার সেই চেনা অমোঘ ঠোঁট ফোলানো ফেসটা তৈরি করল। সে এমন এক করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল যেন তাকে এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শাস্তি দেওয়া হয়েছে।

ইন্দিরা বুঝতে পারলেন এই অবাধ্য ছেলের জেদের কাছে তাঁর আর কোনো পালানোর পথ নেই। মনের ভেতরের সেই কঠিন শিক্ষিকা রূপটি এবার এক নতুন চাল চালল। কথা বলার ঠিক আগে ওঁর ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত, রহস্যময় হাসির হালকা আভাস দেখা দিল।

"...ঠিক আছে..." ইন্দিরা অত্যন্ত ধীর, রহস্যময় স্বরে বললেন। "...হতে পারে... যদি... যদি তুই সেটা পাওয়ার যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারিস।"

রাহুলের চোখদুটো মুহূর্তের মধ্যে কোটি কোটি নক্ষত্রের মতো জ্বলে উঠল। সে বিছানায় লাফিয়ে ওঠার মতো সোজা হয়ে বসল। "মা! তার মানে তুমি আবার সেই....আবার সেই বার্টার সিস্টেমের কথা বলছ? আই গেট টু ইনভোক দ্য বার্টার সিস্টেম?"

ইন্দিরা অনাবৃত বুকটা বালিশের ওপর আরেকটু এলিয়ে দিয়ে মাথা নাড়লেন। "আই গেস সো... হ্যাঁ, তাই।"

রাহুল দুটো হাত নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে বলল, "বলো মা, আমাকে কী করতে হবে? তুমি যা বলবে আমি তাই করব। আমি অলরেডি রিটেন পরীক্ষায় একশোয় একশো পেয়েছি, তারপর তুমি বিছানায় যে কঠিন ওরাল টেস্ট নিলে, তারও সব কটা উত্তর আমি একদম ঠিক দিয়েছি। সো, আমি তোমার কোনো নতুন চ্যালেঞ্জকে ভয় পাই না।"

ইন্দিরা ওর এই আত্মবিশ্বাস আর তীব্র জেদ দেখে নিজের ঠোঁটের কোণের সেই প্রশ্রয়মাখা হাসিটা আর আটকে রাখতে পারলেন না। গলার স্বরটা বড্ড নরম আর মায়াবী শোনাল।

"হুমম... ওকে, রাহুল। তুই যখন তোর বাবার বিজনেস ট্রিপে যাওয়ার পর আমার সাথে এই... জড়াজড়ির সেশন শুরু করার জন্য বড্ড বেশি ডেসপারেট হয়ে পড়েছিলি... তোর ওই উত্তেজনার চক্করে আমি রাতের ডিনারের পর রান্নাঘরের সিঙ্কে সমস্ত বাসনকোসন ধুতে ভুলে গেছি। সেগুলো ওভাবেই পড়ে আছে।"

রাহুল একটু ভুরু কুঁচকে বলল, "ওকে... সো?"

"সো," ইন্দিরা এক হালকা ও মধুর হাসির হিল্লোল তুলে বললেন, "আমি এই মুহূর্তে বড্ড টায়ার্ড... আর তুই তো দেখতেই পাচ্ছিস, আমি এখন যে অবস্থায় আছি, এই অবস্থায় আমার পক্ষে রান্নাঘরে গিয়ে বাসন মাজা সম্ভব নয়। কিন্তু ওগুলো তো পরিষ্কার করতে হবে। সো... কেমন হয় যদি কাজটা তুই করিস?"

রাহুল এই অদ্ভুত শর্ত শুনে নিজের চোখ কপালে তুলল। "তুমি চাও আমি এই মাঝরাতে, এখন প্রায় একটা বাজতে চলল, এখন রান্নাঘরে গিয়ে সব বাসন মাজি?"

"হ্যাঁ, মিস্টার সেন। আমি ঠিক সেটাই চাইছি," ইন্দিরা সুন্দর চোখদুটো দিয়ে ওকে শাসন করার ভঙ্গিতে বললেন। "তুই এক্ষুনি রান্নাঘরে যাবি এবং সিঙ্কের প্রতিটা বাসন একদম নিখুঁতভাবে পরিষ্কার করবি।"

"আর তুমি এখানে থাকবে?"

"আমি সারাদিনের ধকলের পর এখন আরাম করে শুয়ে আছি, আমার এখন ওঠার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই," ইন্দিরা অনাবৃত কাঁধটা আরেকটু দোলালেন। "তবে হ্যাঁ, এখানে আরেকটা ব্যাপার আছে। তুই যখন সব কটা বাসন মেজে শেষ করবি, তোর ফোনে ওগুলোর একটা ক্লিয়ার ছবি তুলবি, আর আমাকে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাবি। আমি সেই ছবি দেখে অ্যাপ্রুভ করব যে বাসনগুলো আদৌ ঠিকঠাক পরিষ্কার হয়েছে কি না। যদি আমার পছন্দ হয়... তবেই..." কণ্ঠস্বর এবার এক তীব্র উত্তেজক ফিসফিসানিতে নেমে এল, "তবেই তুই তোর সেই কাঙ্ক্ষিত প্রাইজটা পাবি।"

রাহুল এই অদ্ভুত অথচ নিশ্চিত চালটা দেখে মনে মনে হাসল। সে চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "ওকে, ডান। কিন্তু... তার আগে তোমাকে এই পুরো বিষয়টাও একটা কাগজে অফিশিয়াল কন্ট্রাক্ট হিসেবে লিখে দিতে হবে... ঠিক যেমন আমরা আগের দুটো সিচুয়েশনে করেছিলাম।"

ইন্দিরা এই একগুঁয়েমি আর আইনের প্রতি অন্ধ ভক্তি দেখে সুন্দর চোখদুটো ঘোরালেন। মনে মনে এক ধরনের গোপন শ্রদ্ধা আর আমোদ জাগল ওর এই জেদ দেখে। ঠোঁটে এক মৃদু হাসি ফুটে উঠল।

"ঠিক আছে বাবা, ঠিক আছে," তিনি এক নাটকীয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন। "তোর যখন এতই কন্ট্রাক্টের শখ... আমি একটা কাগজে আমাদের এই নতুন শর্তগুলো লিখে দিচ্ছি। আর তুই সেখানে সাইন করবি।"

তিনি খাটের পাশের টেবিল থেকে একটা সাদা কাগজ আর পেন টেনে নিলেন। ওঁর অনাবৃত বুকটা টেবিল ল্যাম্পের আলোয় আরও একবার চকচক করে উঠল, যখন তিনি নিচু হয়ে সেই সুন্দর, সুশৃঙ্খল হাতের লেখায় নতুন চুক্তিপত্রটি ড্রাফট করতে লাগলেন:

শর্তাধীন স্নেহের চুক্তিপত্র

এই চুক্তিপত্রটি ডক্টর ইন্দিরা সেন (মা) এবং রাহুল সেন (সন্তান)—এর মধ্যে পারস্পরিক সম্মতিতে সম্পাদিত হলো।

শর্তাবলী:

১. রাহুলের দায়িত্ব: রাহুলকে এই মুহূর্তে রান্নাঘরের সিঙ্কে থাকা সমস্ত নোংরা বাসনকোসন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মেজে পরিষ্কার করতে হবে, যাতে কোনো প্রকার ময়লা বা দাগ না থাকে।

২. প্রমাণের বাধ্যবাধকতা: বাসন মাজা শেষ হওয়ার পর রাহুল ওর মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সেই পরিষ্কার বাসনের ছবি তুলে মায়ের পরিদর্শনের জন্য হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাবে এবং মায়ের অনুমোদন গ্রহণ করবে।

৩. অনুমোদনের পর পুরস্কার: ইন্দিরা যদি রাহুলের কাজে সন্তুষ্ট হয়ে অনুমোদন প্রদান করেন, তবে তিনি রাহুলকে পুনরায় ওঁর সাথে খালি গায়ে শোওয়ার অনুমতি দেবেন, যার মধ্যে মায়ের দ্বারা 'নার্সিং' (Nursing) পাওয়ার অধিকারও অন্তর্ভুক্ত থাকবে (যার সময়সীমা সম্পূর্ণভাবে ইন্দিরা নির্ধারণ করবেন)।

৪. গোপনীয়তার নীতি: এই চুক্তিপত্র এবং এর ভেতরের সমস্ত বিষয়াদি সম্পূর্ণভাবে ইন্দিরা ও রাহুলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। কোনো তৃতীয় পক্ষকে এটা জানানো যাবে না।

৫. চুক্তিভঙ্গ: কোনো একটি শর্ত পালনে ব্যর্থ হলে রাহুল তার সমস্ত সুযোগ-সুবিধা তৎক্ষণাৎ হারাবে।

স্বাক্ষরসমূহ:

ইন্দিরা সেন

রাহুল সেন

ইন্দিরা লেখা শেষ করে কাগজটা রাহুলের দিকে এগিয়ে দিলেন। ঠোঁটের কোণে এক বিজয়ী ও প্রচ্ছন্ন স্মাগ হাসি। "কী রে? পছন্দ হয়েছে? এবার সাইন করবি?"

রাহুল কাগজটা হাতে নিয়ে খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ল। ওর ভুরু দুটো ক্রমশ কুঁচকে গেল। সে মাথা নেড়ে বলল, "না মা, এই চুক্তির লেখাটা ঠিক...কিরম যেন...ঠিক ক্লিয়ার নয়। এই যেমন তিন নম্বর পয়েন্টে লিখেছ—‘নার্সিং’ পাওয়ার অধিকার... কিন্তু এই ‘নার্সিং’ শব্দটা বড্ড ভেগ (vague)। এর তো অনেক রকম মানে হতে পারে। কেউ অসুস্থ হলে সেবা করাকেও তো নার্সিং বলে! আর আমরা তো অলরেডি খালি গায়ে জড়িয়ে ধরে শুয়েই আছি, সো ওটার মধ্যে নতুন কোনো রিওয়ার্ড নেই।  তুমি আরেকটু পরিষ্কার করে লেখো প্লিজ... বিশেষ করে ওই জায়গাটা... মানে... আমি তোমায় বোঝাতে পারছি তো?"

ইন্দিরা এবার সত্যিই এক চরম নাটকীয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথাটা নাড়লেন। ছেলের এই অদ্ভুত উকিল-সুলভ বুদ্ধি দেখে তিনি একদিকে যেমন বিরক্ত হচ্ছিলেন, অন্য দিকে ওঁর ভেতরটা এক চরম আমোদে ভরে উঠছিল।

"তুই... তুই একটা আস্ত বজ্জাত ছেলে, রাহুল!" ইন্দিরা গলার স্বর আরেকটু নিচু করে আদুরে সুরে বললেন। ঠোঁটদুটো ক্ষণিকের জন্য চেপে রইল, মনের ভেতর সঠিক শব্দগুলো সাজিয়ে নেওয়ার জন্য। তিনি আবার কাগজটা টেনে নিয়ে কলমটা চালালেন। "ঠিক আছে, ওরে আমার আইনের লর্ড! আমি এটাকে এতটাই স্পেসিফিক করে লিখছি যাতে তোর ওই ধূর্ত মগজে কোনো খটকা না থাকে।"

লেখার মাঝে মাঝেই উনি থামছিলেন, এবং খানিকক্ষণ ভেবে নিয়ে আবার লিখছিলেন। রাহুল ভাবছিলো, মায়ের এত সময় কেন লাগছে, মোটামুটি একটা ড্রাফট তো করাই ছিল। অবশেষে ইন্দিরা লেখা শেষ করে কাগজটা হাতে দিলেন। রাহুল লেখাটা পড়ার পর ওর হাতটা হালকা কেঁপে উঠল।  

শর্তাধীন স্নেহের চুক্তিপত্র (সংশোধিত ও চূড়ান্ত)

এই চুক্তিপত্রটি ডক্টর ইন্দিরা সেন (মা) এবং রাহুল সেন (সন্তান)—এর মধ্যে পারস্পরিক সম্মতিতে সম্পাদিত হলো।

শর্তাবলী:

১. রাহুলের দায়িত্ব: রাহুলকে এই মুহূর্তে রান্নাঘরের সিঙ্কে থাকা সমস্ত নোংরা বাসনকোসন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মেজে পরিষ্কার করতে হবে, যাতে কোনো প্রকার ময়লা বা দাগ না থাকে।

২. প্রমাণের বাধ্যবাধকতা: বাসন মাজা শেষ হওয়ার পর রাহুল ওর মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সেই পরিষ্কার বাসনের ছবি তুলে মায়ের পরিদর্শনের জন্য হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাবে এবং মায়ের অনুমোদন গ্রহণ করবে।

৩. অনুমোদনের পর পুরস্কার: ইন্দিরা যদি রাহুলের কাজে সন্তুষ্ট হয়ে অনুমোদন প্রদান করেন, তবে তিনি রাহুলকে পুনরায় ওঁর সাথে খালি গায়ে শোওয়ার অনুমতি দেবেন, যার মধ্যে মায়ের স্তনবৃন্তে মুখ দিয়ে খাওয়ার অধিকারও অন্তর্ভুক্ত থাকবে (যার সময়সীমা সম্পূর্ণভাবে ইন্দিরা নির্ধারণ করবেন)।

৪. গোপনীয়তার নীতি: এই চুক্তিপত্র এবং এর ভেতরের সমস্ত বিষয়াদি সম্পূর্ণভাবে ইন্দিরা ও রাহুলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। কোনো তৃতীয় পক্ষকে এটা জানানো যাবে না।

৫. চুক্তিভঙ্গ: কোনো একটি শর্ত পালনে ব্যর্থ হলে রাহুল তার সমস্ত সুযোগ-সুবিধা তৎক্ষণাৎ হারাবে।

স্বাক্ষরসমূহ:

ইন্দিরা সেন

রাহুল সেন

রাহুল নিজেকে সামলে অবশেষে মায়ের কাছ থেকে কলমটা নিল এবং সেই সুন্দর স্বাক্ষরের নিচে নিজের সইটা বসিয়ে দিল।

"বেশ" ইন্দিরা কাগজটা ওর হাত থেকে টেনে নিয়ে ড্রয়ারে রাখতে রাখতে গম্ভীর সুরে বললেন, "এখন এটা অফিশিয়াল। সো? এখনো এখানে এভাবে বসে আছিস কেন, মিস্টার সেন? গো অ্যান্ড ওয়াশ দোজ ডিশেস, রাহুল! আর একদম ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করবি না—আমি কিন্তু সবকটা বাসনের ছবি খুঁটিয়ে চেক করব।"

তিনি ওর কাঁধে একটা হালকা, চপল ও আদুরে ধাক্কা দিলেন।

"যা এবার... যত তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করবি, তত তাড়াতাড়ি তুই তোর..." তিনি ক্ষণিকের জন্য থামলেন, ওষ্ঠাধরে এক পরম মায়াবী হাসি খেলে গেল। নিজের বুকে আস্তে করে হাত বোলালেন তিনি; তাঁর আঙুলগুলো যেন এক অলস ছন্দে, একের পর এক তাঁর স্তনবৃন্ত ছুঁয়ে আলতো করে বয়ে গেল। "...তত তাড়াতাড়ি তুই মায়ের.... এইটা খেতে পারবি।"

রাহুল আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করল না। সে বিছানা থেকে নেমে এক লাফে ঘরের দরজা খুলে সোজা রান্নাঘরের দিকে দৌড় দিল।

ইন্দিরা বিছানায় ওভাবেই অনাবৃত বক্ষে আধশোয়া হয়ে রইলেন। এলোমেলো চুল, ফর্সা ত্বকের ওপর টেবিল ল্যাম্পের আলো আর বুকের ভেতরের সেই আদিম মাতৃত্বের আলোড়ন—সবকিছু মিলিয়ে ঘরটা যেন এক পরম নিষিদ্ধ স্বর্গে পরিণত হয়েছিল। তিনি দেয়ালে থাকা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেই সুন্দর ছবিটার দিকে তাকালেন, চোখের পাতাদুটো সামান্য বুজে এল এবং তিনি এক দীর্ঘ, তৃপ্তির শ্বাস ফেলে ফিসফিস করে বললেন:

"ওহ্ ঈশ্বর... আমি এই পাগল, অবাধ্য, একগুঁয়ে ছেলেটাকে নিয়ে এখন ঠিক কী করি বল তো..."
Reply
#10

সপ্তম পরিচ্ছেদ: অমৃতের উৎস ও একটি অলৌকিক জাগরণ



৭.১. শর্তপূরণ এবং ফেরা

রান্নাঘরের স্টিলের সিঙ্কে কাঁচ আর চিনামাটির বাসনগুলোর ওপর যখন তরল সাবানের ফেনা উঠছিল, রাহুলের তখন মনে হচ্ছিল সে কোনো যজ্ঞের প্রস্তুতি সারছে। জলের ধারা ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছিল ডিনারের শেষ অবশিষ্টাংশ। রাত তখন একটা বেজে দশ মিনিট। চারপাশ এতটাই নিস্তব্ধ যে, জলের প্রতিটি ফোঁটার পতনে মনে হচ্ছিল একেকটা প্রহর খসে পড়ছে। কাজটা সে করল অত্যন্ত দ্রুত, কিন্তু নিখুঁতভাবে। মায়ের সেই তীব্র, তীক্ষ্ণ চোখের অবয়বটা ওর মগজে ভাসছিল—যে চোখ কোনো ফাঁকি বরদাস্ত করে না।

কাজ শেষ করে পকেট থেকে ফোনটা বের করল সে। সিঙ্কের পাশে রাখা চকচকে ইস্পাত আর পরিচ্ছন্ন বাসনের স্তূপের দু-তিনটে ছবি তুলে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দিল মায়ের নম্বরে।

সেকেন্ড কয়েকের অপেক্ষা। স্ক্রিনের নীল টিকমার্ক দুটো জ্বলে উঠতেই ওপাশ থেকে উত্তর এল। ছোট, সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তাতে এক অধিকারবোধের ওম মাখানো:

"খুব ভালো হয়েছে। এবার চলে আয়। রান্নাঘরের আলোটা নেভাতে ভুলিস না কিন্তু।"

রাহুল ফোনটা পকেটে পুরে আলোটা নিভিয়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে নিচের তলাটা নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ডুবে গেল। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার সময় ওর বুকের ভেতর একটা অচেনা মাদল বাজছিল। করিডোরের আবছা আলো পেরিয়ে সে যখন নিজের ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল, দেখল দরজাটা হালকা খোলাই আছে, নিচে যাওয়ার সময় তাড়াহুড়োতে ভালো করে ভেজানো হয়নি। 

ঘরের ভেতরের পরিবেশটা যেন কোনো থিয়েটারের অন্তিম দৃশ্য। টেবিল ল্যাম্পের সেই মায়াবী হলুদ আলোটা বিছানার একপাশে এসে পড়েছে। ইন্দিরা সেখানে আধশোয়া হয়ে আছেন, তাঁর শরীরটা বালিশের ওপর এলিয়ে দেওয়া, যা কোনো ব্লাউজ বা ব্রা-এর বাঁধনে নেই। ওঁর ফর্সা ত্বকে আলোর আলপনা। রাহুল খুব ধীর পায়ে ওঁর দিকে এগিয়ে গেল। ওর গলার স্বর বড্ড নিচু আর কিছুটা কাঁপানো:

"ঠিকঠাক হয়েছে তো, মা?"

ইন্দিরা গভীর, অন্ধকার চোখদুটো তুলে ওর দিকে তাকালেন। ওঁর মুখে এক অদ্ভুত প্রশ্রয় আর ক্লান্তির মিশ্রণ। তিনি সামান্য মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন।

"খুব ভালো করেছিস সোনা। এবার মায়ের কাছে আয়।"

রাহুল আর দ্বিধা করল না। সে বিছানায় উঠে ওঁর সেই খোলা বুকের ওমের মধ্যে নিজেকে সঁপে দিল। ইন্দিরা মুহূর্তের মধ্যে একটা হাত ওর কোমরের চারপাশে জড়িয়ে ধরলেন, যেন এক পরম আশ্লেষে নিজের তৈরি করা প্রাণটাকে আবার নিজের শরীরের সাথে লেপ্টে নিলেন। রাহুলের মাথাটা এসে পড়ল স্তনযুগলের ঠিক মাঝখানের সেই নরম, উষ্ণ উপত্যকায়। ওঁর ডান হাতের আঙুলগুলো খুব আলতো করে ওর চুলে বিলি কাটতে শুরু করল।

ইন্দিরা একটা গভীর, তৃপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ওঁর বুকের খাঁচায় সেই শ্বাসের ওঠানামা রাহুল নিজের গালে অনুভব করতে পারছিল।

"এই তো..." ইন্দিরা ওঁর চেনা মখমলি গলায় ফিসফিস করে উঠলেন, "আমার বাবুটার ঠিক যেখানে থাকার কথা, সেখানে আবার চলে এসেছে। মাত্র দশ বারো মিনিটের জন্য তুই নিচে গেছিলি, তাতেই তোকে বড্ড মিস করছিলাম রে, আমার এই অবাধ্য বাঁদর ছেলেটা..."

রাহুল ওঁর বুকের সেই সুগন্ধী ওমের মধ্যে মুখ গুঁজে চুপ করে রইল। কিন্তু ওর ভেতরের ছটফটানিটা কমছিল না। সে চোখের দিকে তাকানোর জন্য মাথাটা একটু ওপরে তুলল। ওর চোখে এক তীব্র প্রতীক্ষা, এক অবাধ্য সিগন্যালের অপেক্ষা।

ইন্দিরা ওর সেই আকুল চোখের চাউনি দেখে নিজের চোখদুটো একটু ঘোরালেন। ঠোঁটের কোণে সেই চেনা, কৃত্রিম বিরক্তির মৃদু হাসি।

"কী অধৈর্য ছেলে রে বাবা... ঠিক আছে, সোনা। যা চাওয়ার... চেয়ে নে।"

রাহুল ওঁর সেই মায়াবী মুখের দিকে তাকিয়ে বড্ড সরল, নিষ্পাপ গলায় বলল, "মা...ওইতো... তুমি যেটা চুক্তিতে লিখেছিলে...ওইটা..."

ইন্দিরা কিছু বলে ওঠার আগে রাহুল আবার নরম সুরে বলে উঠল, "ওটা তুমি আর একবার বলবে, প্লিজ?"

ইন্দিরার ফর্সা গালে এক ঝটকায় একটা লাজুক আভা ছড়িয়ে পড়ল। তিনি সামান্য মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে কপট বিরক্তির ভান করে বললেন, "উফ্, কী ফালতু আবদার! কাগজে তো স্পষ্ট লেখাই আছে, ওটা আবার নতুন করে মুখে উচ্চারণ করে বলার কী আছে? বোকা ছেলে!"

"না মা, তুমি নিজের মুখে না বললে কন্ট্রাক্ট অ্যাক্টিভেট হবে না," রাহুল ওঁর গলায় চিবুক ঘষে একটা আদুরে হাসি হাসল। "প্লিজ বলো না..."

ইন্দিরা এক প্রকার রাহুলকে একটু ভেঙিয়েই বললেন, "না বললে কন্ট্রাক্ট অ্যাক্টিভেট হবে না... যা খুশি তাই বললেই হলো না? বড্ড ঘ্যানঘ্যান করিস তুই।" এই বলে তিনি ওর চুলে একটা হালকা টান দিলেন। "আমি ওসব বলতে-টলতে পারব না। তোর যা পাওনা তুই নিজে বুঝে নে, আমাকে দিয়ে আবার বলাবি কেন? ফাজিল কোথাকার!"

"তুমি লজ্জা পাচ্ছ, তাই না মা? ডক্টর সেন নিজের ছেলের কাছে লজ্জা পাচ্ছেন!" রাহুল চোখ কুঁচকে দুষ্টুমি করে বলল।

"লজ্জা! আমি আবার লজ্জা পাব কেন!" ইন্দিরা তড়িঘড়ি প্রতিবাদ করলেন, যদিও তাঁর গলার স্বরের হালকা কাঁপন আর লালচে গালদুটো অন্য কথাই বলছিল। "ফাজলামো হচ্ছে? এইটুকু একটা কথার আবার লজ্জা কীসের?"

"তাহলে বলো। একবার জাস্ট নিজের মুখে বলো তুমি কী লিখেছিলে।"

ইন্দিরার বুকের ভেতরের শ্বাসটা ক্ষণিকের জন্য থমকে গেল। ফর্সা গালদুটোতে আবার সেই লজ্জার রক্তিমাভা ফুটে উঠল। তিনি একটা হালকা, কৃত্রিম ক্ষোভের শ্বাস ফেলে ওর দিকে তাকালেন, কিন্তু গলায় কোনো রাগ ছিল না, ছিল এক আদিম মাতৃত্বের কোমলতা। আঙুলগুলো ওর চোয়ালের রেখা বেয়ে নেমে এসে বুড়ো আঙুলটা দিয়ে ওর নিচের ঠোঁটটা আলতো করে ছুঁয়ে দিল।

"তুই... তুই পারিসও বটে, রাহুল। ঠিক আছে, তুই চাইলে... বুকে... মুখ দিতে পারিস।"

এক মুহূর্তের স্তব্ধতা। তারপর তিনি মুখটা সামান্য ঝুঁকিয়ে রাহুলের কানের পাশে খুব আলতো করে একটা আদুরে চুমু খেলেন।

"এবার খুশি তো, সোনা?"

রাহুল কৌতুকী চোখের দিকে তাকিয়ে আরও একটু দুষ্টুমি মেশানো সরলতায় বলল, "কার বুকে মুখ দেব, মা? কার কথা বলছ?"

ইন্দিরা এবার একটা আদুরে হুঙ্কার ছাড়লেন। ঠোঁটের কোণের সেই প্রচ্ছন্ন স্মাগ হাসিটা আর লুকোতে পারলেন না। আঙুলগুলো ওর চুলে আরেকটু শক্ত করে বিলি কাটতে লাগল।

"ন্যাকামো করিস না তো," গলার স্বর এবার এক অদ্ভুত গোপন ফিসফিসানিতে নেমে এল, চোখদুটো আলোর নিচে চকচক করছিল। "তুই খুব ভালো করেই জানিস কার বুকের কথা বলা হচ্ছে এখানে। নাকি সেটাও আমাকে বানান করে বুঝিয়ে দিতে হবে, শুনি?"

"প্লিজ মা, আর একবার একটু ক্লিয়ার করে বলো না..." রাহুল বুকের ওপর নিজের চিবুকটা ঘষতে ঘষতে আবদার করল।

ইন্দিরা এই অবাধ্য আহ্লাদ দেখে মনে মনে সম্পূর্ণ হেরে গেলেন। চোখের মণি দুটো স্নেহে আর্দ্র হয়ে উঠল। তিনি ওর কানের খুব কাছে নিজের ঠোঁটদুটো নিয়ে গেলেন, উষ্ণ শ্বাস ওর কানে লাগছিল। এক অদ্ভুত, নিবিড় তীব্রতায় ওঁর গলার স্বর সামান্য কাঁপল:

"মা... তোর এই মায়ের বুকটার কথা বলছি, সোনা..." ওঁর গলার স্বর এক অবাধ্য আবেগে ভারী হয়ে এল, "খা... আমার বুক থেকে খা।"

কথাটা শেষ করেই তিনি হাত দিয়ে ওর মাথাটা আলতো করে চেপে একটু নিচের দিকে নামিয়ে দিলেন, যেখানে ওঁর বাঁ স্তনের নিটোল, শ্বেত কান্তি আলোর নিচে কোনো এক অলৌকিক ফলের মতো উদ্ভাসিত হয়ে ছিল। আঙুলগুলো আবার ওর চুলে বোলাতে লাগলেন তিনি।

রাহুল সেই সুডৌল স্তনের একদম কাছাকাছি নিজের মুখটা নিয়ে এল। ওর ঠোঁটদুটো ওখানকার উত্তাপ অনুভব করতে পারছিল। সে খুব নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল, "এইখানটায়, মা?"

"হ্যাঁ, সোনা... ঠিক এইখানটায়..." ইন্দিরা নিজের অন্য হাতটা তুলে স্তনের নিচের অংশটি আলতো করে ধরলেন, যেন তিনি নিজের শরীরের সেই পরম সম্পদটি সন্তানের তৃপ্তির জন্য উৎসর্গ করছেন। গলার স্বর বড্ড বেশি ভারী আর বুঁদ হয়ে আসছিল ওঁর।

এক সেকেন্ডের নীরবতা। তারপর আরও নিচু, এক পরম প্রশ্রয় ও স্নেহের চাদরে মোড়ানো ফিসফিসানি ভেসে এল ওঁর ঠোঁট থেকে:

"শুরু কর, সোনা... ঠিক এই বোঁটাটাতে মুখ দে..."

কথাটি উচ্চারণ করার সাথে সাথেই, এক অজানা, আদিম ও গোপন শিহরণে তাঁর নিটোল শ্বেতপদ্মসম স্তনের সেই গাঢ় বাদামি বৃন্তটি ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠল, যেন এক দীর্ঘ প্রতীক্ষিত তৃষ্ণার নিবারণ করতে সে নিজেই এক অলৌকিক আকাঙ্ক্ষায় সগর্বে জেগে উঠেছে।


৭.২. অমৃতের স্বাদ ও তীব্রতার জোয়ার

টেবিল ল্যাম্পের স্নিগ্ধ আলোয় ইন্দিরার সেই উন্মুক্ত স্তন যেন শ্বেতপাথরে খোদাই করা কোনো প্রাচীন ভাস্কর্যের মতো অপূর্ব দেখাচ্ছিল। তার ঠিক কেন্দ্রে, গাঢ় বাদামি রঙের বৃন্তটি এক নিটোল, নিখুঁত শিল্পিত কুঁড়ির মতো রূপ নিয়েছে। মাতৃত্বের আদিম পবিত্রতা আর এক নারীসত্তার সলজ্জ সৌন্দর্যের এমন অপূর্ব মেলবন্ধন যেন রাহুলের চোখদুটোকে মোহাবিষ্ট করে ফেলল। সেই সুডৌল, সুবাসিত ত্বকের প্রতিটি রোমকূপ যেন এক অমোঘ আকর্ষণে তাকে ডাকছিল।

রাহুল আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। সে ফর্সা, মসৃণ স্তনের অগ্রভাগটি নিজের ঠোঁটের উষ্ণ আবেষ্টনীতে টেনে নিল।

সেই সুগন্ধী, নরম ত্বকটি যখন রাহুলের মুখের ভেতরে প্রবেশ করল, ইন্দিরার ঠোঁট থেকে এক দীর্ঘ, শান্ত স্বস্তির শ্বাস ছিটকে বেরোলো। হাতের আঙুলগুলো খুব স্বাভাবিকভাবেই ওর চুলের মধ্যে ঢুকে গেল। ওঁর ছোঁয়াটা তখন সম্পূর্ণ মাতৃত্বের গভীর স্নেহে মাখানো। তিনি ওপর থেকে নিজের অর্ধনিমীলিত চোখে, এক আবেশিত দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে রইলেন। চোখের চাউনিটা এক অদ্ভুত তন্দ্রাচ্ছন্নতায় আচ্ছন্ন, ঠোঁটের কোণে এক পরম তৃপ্তির হাসি।

"উমম... হ্যাঁ, আমার সোনা ছেলে... আহ্... আমার লক্ষ্মী সোনা..." গলা দিয়ে এক অদ্ভুত অস্ফুট শব্দ বেরোলো।

রাহুল সেই স্তনবৃত্তের পুরোটা মুখের ভেতরে পুরে নিয়ে পরম তৃপ্তিতে চুষতে শুরু করল। ওর জিভ আর ঠোঁটের সেই আর্দ্র, উষ্ণ ছোঁয়ায় স্তনের সংবেদনশীল ত্বকটা সাড়া দিচ্ছিল।

ওর মুখের ভেতর থেকে একটা অস্ফুট শব্দ বেরোলো, "উমমম... মা..."

ইন্দিরার আঙুলগুলো ওর চুলের মধ্যে আরেকটু শক্ত করে চেপে বসল, কিন্তু সেই চাপের মধ্যেও কোনো রুক্ষতা ছিল না, ছিল এক চরম ভালোবাসা। গলার স্বর তখন এক অদ্ভুত উষ্ণতায় ভারী।

"ঠিক এইভাবে, উফ্... আমার মিষ্টি সোনা..." তিনি ফিসফিস করে বলতে লাগলেন, শ্বাস ক্রমশ দ্রুত হচ্ছিল। "আমার আদরের ছেলে... উমম... আমার সোনা... আহ্... আমার লক্ষ্মী সোনা... আমার বড্ড মিষ্টি বাবুটা..." ওঁর গলা দিয়ে এক অদ্ভুত অস্ফুট শব্দ বেরোলো, যেন তিনি কোনো এক ঘোর থেকে কথা বলছেন। "আমার পুঁচকে সোনা... আহ্... মা-র একদম নিজের টুকরোটা... উমম... আহ্, আমার রাজপুত্তুর... সোনা রে... ওহ্... কী মিষ্টি তুই... উমমম... আমার আদরের মাণিক, আহ্... আমার ছোট্ট প্রাণপাখি... উফ্... আহ্হ্হ..." ওঁর মুখ থেকে একে একে বেরোতে লাগল ওঁর ভেতরের সমস্ত অবদমিত স্নেহের বাণী, যা এতদিন কোনো এক নিভৃত কোণে জমে ছিল।

বেশ কিছুক্ষণ ধরে রাহুল ওভাবে বুক থেকে সেই অদৃশ্য সুধা পান করতে লাগল। ঘরের ভেতরের পরিবেশটা তখন এক চরম মনস্তাত্ত্বিক আদিমতায় আচ্ছন্ন। কিছুক্ষণ পর রাহুল ক্ষণিকের জন্য স্তনটি নিজের মুখ থেকে আলতো করে ছেড়ে দিল। ওঁর ভিজে, চকচকে বৃন্তটি আলোর নিচে আরও বেশি মোহময় লাগছিল। রাহুল চোখের দিকে তাকিয়ে খুব সরল, নিষ্পাপ মুখে বলল:

"সো, মা... এইরকম ফিলিং হয়? যখন কোনো মা তার সন্তানকে খাওয়ায়?"

রাহুলের মুখটি সরে যেতেই ইন্দিরার হৃদপিণ্ডটা যেন এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল। ঠোঁটের কোণে এক পরম মায়াবী হাসি খেলে গেল। সুন্দর হাত দিয়ে তিনি ওর চোয়ালের রেখাগুলো আলতো করে ছুঁয়ে দিলেন।

"হ্যাঁ রে সোনা, ঠিক এইরকমই ফিলিং হয়," গলার স্বর বড্ড নরম আর কাঁপা শোনাল। "এভাবেই একটা মা... তার নিজের সন্তানকে আগলে রাখে, খিদে মেটায়। তোর ভাল লাগছে তো?"

রাহুল মুগ্ধ হয়ে ওঁর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল।

তিনি স্তনটার দিকে একবার তাকালেন, তারপর আবার এক পরম স্নেহের হাসি নিয়ে ওর দিকে তাকালেন, "যদিও আমার বুকে এখন আর সেই আসল দুধ নেই... কিন্তু শরীরটা তো ওটাই আছে রে সোনা, তোর মায়ের এই বুকদুটো তো বদলায়নি। এটাই এখনও তোর পুষ্টি, তোর আসল আশ্রয়।"

হাত দিয়ে তিনি স্তনটিকে আরেকটু ওপরে তুলে ওর মুখের আরও কাছে এগিয়ে নিয়ে এলেন, এক আদিম মাতৃত্বের তাড়নায় শরীর যেন নিজে থেকেই ওকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছিল।

রাহুল এবার আরেকটু বেশি তীব্রতা নিয়ে, আরেকটু শক্ত করে স্তনটি মুখের ভেতর টেনে নিল। সে এবার অনেক বেশি জোরে আর গভীরভাবে চুষতে শুরু করল।

রাহুলের ঠোঁট ও জিভের সেই আচমকা, ছন্দবদ্ধ এবং তীব্র চাপ লাগতেই ইন্দিরার ভেতরের এক অচেনা, সুপ্ত মহাসমুদ্র যেন মুহূর্তের মধ্যে উথলে উঠল। আঙুলগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ওর চুলগুলোকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। ঘরের নীরবতা ভেঙে ওঁর ঠোঁট থেকে চুইয়ে পড়তে লাগল কেবলই কিছু অসংলগ্ন, আদুরে আর্তি।

"আহ্... সোনা... উমম... আমার রাজপুত্র..." স্তনের সেই সংবেদনশীল স্নায়ুগুলোতে রাহুলের উষ্ণ লেহন ওঁর শিরদাঁড়া বেয়ে এক অদ্ভুত বিদ্যুৎপ্রবাহ ছড়িয়ে দিচ্ছিল। ওঁর পুরো শরীরটা যেন একটা আবেশের হাওয়ায় ভাসতে শুরু করেছে। "উফ্... আমার লক্ষ্মী ছেলে... বড্ড ভালো লাগছে রে... উমম..."

রাহুলের মুখের সেই অবিরাম, আদিম টান ওঁর ভেতরের সমস্ত মাতৃত্ব আর নারীত্বকে যেন এক করে গুলিয়ে দিচ্ছিল। একটা অদ্ভুত আনন্দ, এক চরম তৃপ্তি ওঁর প্রতিটি কোষে ছড়িয়ে পড়ছিল। তিনি নিজেকে আর কিছুতেই ধরে রাখতে পারছিলেন না।

"আহ... ঠিক এইভাবে..." ঠোঁট থেকে এক হালকা হিসহিস শব্দ বেরোলো, "চোষ, সোনা... আহ্... তুই বড্ড ভালো করছিস... উমম... একদম নিজের সবটুকু তৃপ্তি নিয়ে চোষ... উফ্... আমার সবটা তো তোরই রে, নিয়ে নে.... আহ্... মায়ের কাছ থেকে... বাধ্য ছেলের মতো.... উমমম... নিয়ে নে.... ঊমমম..."

রাহুল এই প্রশ্রয় পেয়ে স্তনটিকে আরও জোরে, আরও তীব্রভাবে চুষতে লাগল। ওর জিভ আর ঠোঁটের অবাধ্য নড়াচড়া ওঁর বোঁটার গভীরে এক তীব্র আলোড়ন তৈরি করছিল। সেই আদিম ঘোরের মাঝেই রাহুলের একটা হাত নিজের থেকেই ওপরে উঠে এল এবং ইন্দিরার উন্মুক্ত, অপেক্ষারত ডান স্তনটিকে নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নিয়ে পরম আদরে আর একটু শক্ত করে দলন করতে শুরু করল।

ইন্দিরা এবার আর নিজের শ্বাস ধরে রাখতে পারলেন না। মুখ দিয়ে এক তীক্ষ্ণ ‘উফ্ফ্ফ’ শব্দ বেরোলো। হাতের আঙুলগুলো ওর চুলের মূলে প্রায় বসে যাচ্ছিল। অন্য হাতটা নিজে থেকেই উঠে এসে রাহুলের মাথার পেছনটা শক্ত করে ধরে ফেলল। তিনি ওকে শরীর থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন না, বরং ওই খোলা বুকের সাথে আরও শক্ত করে চেপে ধরছেন, যেন ওর এই তীব্রতা নিজের শরীরের গভীরে এক অদ্ভুত ঝড় তুলছিল।

"সোনা..." গলার স্বর এবার কিছুটা রুক্ষ, কিছুটা ভারী শোনাল—যেন তিনি একাধারে শাসন আর আত্মসমর্পণের এক দোলাচলে দুলছেন। "আস্তে... একটু আস্তে কর, বাবা... প্লিজ..."

কিন্তু হাতের আঙুলগুলো যেভাবে ওর মাথাটাকে নিজের স্তনের ওপর আরও বেশি করে চেপে ধরছিল, তা মুখের কথার সম্পূর্ণ বিরোধিতা করছিল। অবচেতন মন যেন এই তীব্রতা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে চাইছিল না।

"একটু... একটু আস্তে কর সোনা..." তিনি ফিসফিস করে উঠলেন।

রাহুল তখন এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে ডুবে গেছে। শৈশবের সেই আদিম নদীর স্রোত ওর মগজকে সম্পূর্ণ অবশ করে দিয়েছিল। সে এই মৃদু বাধা শোনার মতো অবস্থায় ছিল না। সে স্তন চোষণ আর সাথে সাথে লেহনের তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দিল।

ইন্দিরার শ্বাস এবার পুরোপুরি আটকে গেল। মাথাটা বালিশের ওপর সামান্য পেছনের দিকে হেলে পড়ল, সুন্দর চোখদুটো ক্ষণিকের জন্য বুজে এল। ওর মাথার পেছনে থাকা হাতটা এক পরম আকুলতায় আরেকটু শক্ত হলো, যেন তিনি কোনো এক অতল গভীরে তলিয়ে যাচ্ছেন—কিন্তু পরক্ষণেই তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে আঙুলগুলোর গ্রিপ সামান্য আলতো করলেন।

চোখদুটো মেলে তিনি ওর দিকে তাকালেন। চিরকাল শান্ত, গম্ভীর চোখদুটো এখন এক অদ্ভুত তীব্র কামনায় বা এক পরম অসহায়তায় অন্যরকম রূপ নিয়েছে।

"আহ্... সোনা..." মুখ থেকে এক কাঁপা দীর্ঘশ্বাস ছিটকে বেরোলো, "উফ্... তুই বড্ড বেশি জোরে করছিস... আহ্... উমম... একটু আস্তে সোনা... উফ্... প্লিজ... আমি—" ওঁর শেষ শব্দটা এক অদ্ভুত কাঁপানো শ্বাসের সাথে মিলিয়ে গেল।

রাহুল ওর পুরো শক্তি দিয়ে বোঁটার শেষ কণাটুকু যেন চুষে নিতে চাইল। ইন্দিরার হাতের মুঠো ওর চুলে এবার বড্ড শক্ত হয়ে বসল। বুকটা রাহুলের মুখের নিচে এক তীব্র ঝড়ের গতিতে ওঠানামা করছিল, ফর্সা ত্বকটা তখন এক অদ্ভুত জ্বরে লাল হয়ে উঠেছে।

"আহ্... উফ্... থাম..." গলা দিয়ে এক ভাঙা, কাঁপা ফিসফিসানি বেরোলো, "আহ্হ্... রাহুল... উমম... উফ্... তুই... তুই আমাকে বড্ড বেশি... আহ্... উফ্ফ্..."

কিন্তু আঙুলগুলো ওর চুল ছাড়ল না। এক পরম ঘোরের মধ্যে রাহুল স্তন চুষতেই থাকল... ঠিক তখনই... ঘরের ভেতরের বাতাস এক অলৌকিক কাঁপনে স্তব্ধ হয়ে গেল... রাহুল মায়ের মুখ থেকে এক অদ্ভুত চিৎকার শুনতে পেল... এটা কোনো ব্যথার চিৎকার ছিল না... এটা ছিল সম্পূর্ণ অন্য কিছুর...

(rest of the chapter continued in the next post...)
Reply


Forum Jump:


Users browsing this thread: 1 Guest(s)