Thread Rating:
  • 1 Vote(s) - 5 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5

The Barter System (By:andygarfield)
#25

(continuation...)


দরজার ওপার থেকে ভেসে এল গঙ্গা মাসির সেই চেনা, হিন্দি মেশানো গলা।
"ম্যাডাম জি... আপ আন্দর হ্যায় ক্যায়া?"
ইন্দিরা নিজের চোখদুটো ভয়ে বড় বড় করে রাহুলের দিকে তাকালেন। তাঁর পুরো শরীরটা তখন একটা প্রবল প্যানিক অ্যাটাকে কাঁপছে। তিনি একটা ঢোক গিলে, নিজের গলাটা পরিষ্কার করে, যতটা সম্ভব স্বাভাবিক এবং শান্ত শোনানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে বললেন:
"হ্যাঁ... হ্যাঁ গঙ্গা। আমি তো ভেতরেই আছি। কী হলো?"
গঙ্গা মাসির গলাটা দরজার ওপার থেকে একটু চিন্তিত শোনাল। "ওহ... কুছ নহী ম্যাডাম জি। আপনে রাহুল বাবা কো দেখা হ্যায় ক্যায়া কঁহী?"
ইন্দিরার বুকটা ধক করে উঠল। তিনি রাহুলের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত চাপা, কাঁপা গলায় বললেন, "না তো। আমি তো ওকে দেখিনি। কেন? কী হয়েছে?"
গঙ্গা মাসি ওপার থেকে জানাল, "আরে, থোড়ি দের পেহলে বাবা নে মুঝসে চায়ে মাঙ্গা থা। ম্যায়নে বোলা কি পোছা খতম করকে বানা দুঙ্গী। আভি চায়ে বানাকে উনকে কামরে মে গ্যয়ি, তো দেখা কি বাবা তো আন্দর হ্যায় হি নহী। পুরা ঘর ঢুঁড় লিয়া, কঁহী নহী মিলে।"
এই কথাটা শোনার পর ইন্দিরা এবং রাহুল দুজনেরই চোখ কপালে উঠল। রাহুলের মনে পড়ে গেল, সত্যিই তো! ও মাসিকে এক কাপ চা করে দিতে বলেছিল। কিন্তু মাসি ফ্লোর মুছতে এত দেরি করছিল, আর ঠিক সেই সময়েই বাবা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় ও এতটাই এক্সাইটেড হয়ে পড়েছিল যে চায়ের কথা বেমালুম ভুলে সোজা মায়ের ঘরে চলে এসেছিল।
ইন্দিরা রাহুলের দিকে তাকিয়ে একটা কৃত্রিম, শাসন-মেশানো বিরক্তির দৃষ্টি হানলেন। কিন্তু গঙ্গা মাসিকে তো কিছু একটা বলতে হবে। তিনি অত্যন্ত চতুরতার সাথে গলার স্বরটা পালটে বললেন:
"ওহ, আচ্ছা। তুই চিন্তা করিস না গঙ্গা। ও বাড়িতেই কোথাও আছে, হয়তো ব্যালকনিটার দিকে গেছে বা কিছু। তুই এক কাজ কর, নিচে গিয়ে ওর চা টা ডাইনিং টেবিলে ঢাকা দিয়ে রাখ। আমি ওকে টেক্সট করে দিচ্ছি যে ওর চা রেডি।"
"ঠিক হ্যায় ম্যাডাম জি," গঙ্গা মাসি বলল। তারপর স্পষ্ট শোনা গেল ওর পায়ের চটির শব্দটা সিঁড়ি দিয়ে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে।
পায়ের শব্দটা পুরোপুরি মিলিয়ে যাওয়ার পর, ঘরের ভেতরের ওই বদ্ধ বাতাসে একটা দীর্ঘ, রুদ্ধশ্বাস স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার শব্দ শোনা গেল। দুজনেই যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার মতো করে হাঁপাতে শুরু করল।
ইন্দিরা এক ঝটকায় রাহুলের নাকটা নিজের দুই আঙুল দিয়ে বেশ জোরেই টিপে ধরলেন।
"আস্ত একটা গাধা তুই!" তিনি ফিসফিস করে, দাঁতে দাঁত চেপে ধমকে উঠলেন। "তোর মনে ছিল না যে তুই ওকে চা বানাতে বলেছিস? আর সেই অবস্থাতেই তুই আমার ঘরে এসে... "
রাহুল নিজের নাকটা ছাড়িয়ে নিয়ে বড্ড অপরাধী, কাঁচুমাচু মুখে বলল, "আই অ্যাম সো সো সরি মা... আমার সত্যিই মাথা থেকে একদম বেরিয়ে গেছিল। বাবা যেই বাজার করতে বেরোল, আমার মাথায় আর কিচ্ছু কাজ করছিল না... আমি সোজা তোমার ঘরে চলে এসেছিলাম।"
ইন্দিরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের কপালে হাত দিলেন। "উফ্... তোকে নিয়ে কী করব বল তো? তোকে আমি কতবার বলেছি এসব জিনিস কতটা রিস্কি... তুই কি সত্যিই একদিন আমার হার্ট অ্যাটাক করিয়ে তবে শান্তি পাবি?"
রাহুল মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে অত্যন্ত আদুরে, তোতলানো গলায় বলল, "ওহ মা, প্লিজ... ওরম উল্টোপাল্টা কথা বলতে বারণ করেছি না তোমায়? সবকিছু তো ঠিকঠাকই মিটে গেল। মাসি তো নিচেই চলে গেছে।"
ইন্দিরা ওকে নিজের কোল থেকে একটু ঠেলে সরানোর চেষ্টা করে বললেন, "এবার তুইও নিচে যা। তোর চা জুড়িয়ে জল হয়ে যাবে।"
রাহুল একটুও না নড়ে, মায়ের চোখের দিকে এক চরম তৃপ্ত, নেশাগ্রস্ত হাসি হেসে বলল, "ঠিক আছে মা... তবে... আমার আর এখন চা না খেলেও চলবে... তোমাকে চুমু খেয়ে নিয়েছি... আমার পেট এমনিতেই ভরে গেছে... আর আমার কিচ্ছু খাওয়ার দরকার নেই।"
ছেলের এই নির্লজ্জ, অথচ ভালোবাসায় মাখানো কথাটা শুনে ইন্দিরার গালদুটো আবার লাল হয়ে উঠল। তিনি ওর কাঁধের ওপর একটা মৃদু, আদুরে চড় কষিয়ে বললেন, "থাম তো... অসভ্য, দুষ্টু ছেলে কোথাকার! মার সাথে খালি দুষ্টুমি, না?"
রাহুল কিন্তু সাথে সাথে উঠল না। রিভলভিং চেয়ারের ওপর মায়ের কোলে বসে থাকা অবস্থাতেই ও আরও কয়েক মুহূর্ত ইন্দিরার ওই আরক্তিম, মায়াবী মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। ওর দু'চোখে তখন এক গভীর, অতলস্পর্শী তৃপ্তির নেশা, যা গত কয়েক সপ্তাহের সমস্ত যন্ত্রণাকে ভুলিয়ে দিয়েছে। ও নিজের ডান হাতটা তুলে খুব আলতো করে ইন্দিরার উষ্ণ গালটা ছুঁল। ওর বুড়ো আঙুলটা অত্যন্ত মমতায় ইন্দিরার একটু আগের সেই লালাসিক্ত, স্ফীত ঠোঁটের কোণটা স্পর্শ করল। তারপর এক ঘোরের বশে, বুক-চেরা স্বস্তির সাথে ফিসফিস করে বলল:
"থ্যাঙ্ক ইউ, মা... থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ। তুমি জানো না, ঠিক এভাবেই তোমাকে আবার কাছে পাওয়ার জন্য, তোমার ওই স্বাদটা আবার ফিল করার জন্য এই ক'টা দিন আমি কী পাগলের মতো ওয়েট করেছি! আমার যে কী ভালো লেগেছে মা... আমি বলে বোঝাতে পারব না। তুমি আমাকে জাস্ট বাঁচিয়ে দিলে।"
ছেলের এই সরাসরি, বুক-খোলা কৃতজ্ঞতা আর তীব্র ভালোবাসার অভিব্যক্তিতে ইন্দিরার ভেতরের শেষ কৃত্রিম বিরক্তিটুকুও গলে গেল। তাঁর চোখদুটো অসীম প্রশ্রয়ে আর এক গোপন ভালোলাগায় নরম হয়ে এল। তিনি রাহুলের ওই হাতের ওপর নিজের হাতটা রেখে, একটা গভীর, স্নেহমাখা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিসফিস করলেন, "পাগল ছেলে আমার... এত সুন্দর সুন্দর করে কথা বলতে কোত্থেকে শিখলি বল দেখি? যাই হোক, এবার যা... আর দেরি করিস না, মাসি আবার খুঁজতে আসবে।"
মায়ের এই নরম সম্মতির পর, রাহুল বাধ্য ছেলের মতো রিভলভিং চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। ওর শরীর তখন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে। রাহুল নিজের টি-শার্টটা একটু ঠিক করে নিয়ে বলল, "আমি মাসিকে বলে দেব যে আমি বাথরুমে ছিলাম, পটি করছিলাম... তাই শুনতে পাইনি।"
ইন্দিরা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন।
হঠাৎ রাহুলের মাথায় একটা কথা খেলে গেল। "ওহ বাই দ্য ওয়ে, তুমি তো মাসিকে বললে যে তুমি জামাকাপড় পালটাচ্ছ... মাসি তো ভাবল তুমি বাইরে কোথাও বেরোবে। এখন কি হবে?"
ইন্দিরা একগাল প্রশ্রয়ের হাসি হেসে নিজের শাড়ির আঁচলটা ঠিক করতে করতে বললেন, "ওহ, ওসব নিয়ে তোকে মাথা ঘামাতে হবে না। আমি ঠিক ম্যানেজ করে নেব। আমি গিয়ে বলব যে আমার ওষুধের স্ট্রিপটা খুঁজে পাচ্ছিলাম না বলে বেরোনোর জন্য রেডি হচ্ছিলাম ফার্মেসিতে যাব বলে, কিন্তু পরে ড্রয়ারের ভেতর পেয়ে গেছি, তাই আর যাইনি।"
রাহুল মুগ্ধ চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। "বাপ রে! সো স্মার্ট মা... তুমি তো দেখছি লজিক বানাতে একদম ওস্তাদ!"
ইন্দিরা হাসলেন। তারপর রাহুল যখন দরজার দিকে এগোচ্ছে, তিনি একটু গম্ভীর, অথচ প্রচ্ছন্ন হাসির সুরে বললেন:
"আর শোন রাহুল... নিচে গিয়ে গঙ্গা মাসিকে বলবি আমার জন্য এক কাপ কফি বানিয়ে দিতে। তবে এখন নয়, ঠিক পনেরো মিনিট পর ওপরে দিয়ে যেতে বলবি। বুঝতে পেরেছিস?"
রাহুল একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "কেন মা, ওকে বললে ও তো এখনই দিয়ে যাবে..."
ইন্দিরা ওর চোখের দিকে এক অদ্ভুত, রহস্যময় এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল দৃষ্টিতে তাকালেন। তাঁর গলার স্বরটা এবার এক গভীর, মাদকতাময় ফিসফিসানিতে নেমে এল।
"না সোনা, পনেরো মিনিট পরে দিতে বলিস... একটু বাথরুমে যেতে হবে এখন..."
রাহুলের একটা ঢোক গিলে মাথা নেড়ে বলল, "ওকে মা... আমি বলে দিচ্ছি..."
রাহুল দরজা খুলে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল। আর ইন্দিরা সেই শূন্য ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে, নিজের ফর্সা হাতের আঙুলগুলো দিয়ে নিজের জ্বলন্ত গালদুটো ছুঁয়ে, এক দীর্ঘ, গভীর তৃপ্তির শ্বাস নিলেন।
চেন্নাই পাড়ি দেওয়ার ঠিক আগে, মে মাসের শেষ সপ্তাহটা যেন এক অদ্ভুত, দমবন্ধ করা ব্যাকুলতায় কেটেছিল। বড় কোনো সুযোগ নেই, দীর্ঘ কোনো সময় নেই। শুধু এখানে-ওখানে ছড়িয়ে থাকা কয়েকটা পলক-ফেলা গোপন ক্ষণ।
ক্ষণিকের চাউনি। একটুখানি ছোঁয়া। একটা অসম্পূর্ণ দীর্ঘশ্বাস।
বাবার খবরের কাগজের আড়ালে ডাইনিং টেবিলে বসে থাকার সময়, ইন্দিরা যখন জলের গ্লাসটা রাহুলের দিকে এগিয়ে দিতেন, তখন তাঁদের আঙুলগুলো কয়েক সেকেন্ডের জন্য একে অপরকে ছুঁয়ে থাকত। আঙুলের ডগায় ওই সামান্য ঘর্ষণ। আর তাতেই যেন হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ খেলে যেত দুজনের শিরায় শিরায়। বিকেলে সুব্রত যখন নিজের ঘরে, রান্নাঘরের দরজার আড়ালে চা ছাঁকার সময় রাহুল হয়তো আচমকা একদম পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়ত। নিশ্বাসের দূরত্ব। শাড়ির আঁচলটা লাগত ওর কাঁধে; আর ইন্দিরার হাতটা অজান্তেই কেঁপে উঠত এক নেশাতুর আবেশে।
কখনও বা করিডোর দিয়ে পাশাপাশি হেঁটে যাওয়ার সময়, যখন কেউ কোথাও নেই, রাহুল চকিতে মায়ের ঘাড়ের কাছে একটা উষ্ণ, দ্রুত চুমু এঁকে দিয়েই নিজের ঘরে পালিয়ে যেত। পেছনে রেখে যেত ইন্দিরার একগাল আরক্তিম লজ্জার হাসি। গলার কাছে জমে থাকা এক মিষ্টি উত্তাপ। গভীর রাতে, যখন পুরো বাড়ি ঘুমে আচ্ছন্ন, জল খাওয়ার নাম করে ডাইনিং স্পেসের আবছা আলোয় দুজনের আচমকা দেখা। কোনো কথা না বলে শুধু একে অপরের হাতটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য শক্ত করে ধরে রাখা। চোখের তারায় জমে থাকা অনেক না-বলা কথা। একটা নীরব প্রতিশ্রুতি।
কখনও আবার ব্যালকনিতে কাপড় মেলার সময়, রোদ ঝলমলে দুপুরে রাহুলের একটা দুষ্টু, আদুরে চাহনি ইন্দিরার সমস্ত গাম্ভীর্যকে এক নিমেষে ধুলোয় মিশিয়ে দিত। এই ছোট ছোট, খণ্ডিত মুহূর্তগুলোই ছিল তাদের ওই বিশাল, গোপন ক্যানভাসের একেকটা উজ্জ্বল তুলির টান। এই চুরি করা সময়গুলোই যেন চেন্নাইয়ের ওই দীর্ঘ তিন মাসের বিরহের প্রস্তুতি হিসেবে তাদের দুজনের হৃদয়ের গভীরে এক চিরস্থায়ী, অলঙ্ঘনীয় মোহরের মতো খোদাই হয়ে গিয়েছিল।
১৩.২. ছায়ার অবগুণ্ঠনে এক শাশ্বত অর্ঘ্য
সময়ের আরও এক নিজস্ব প্রবহমান ধর্ম আছে; সে কারও অনুভূতির তীব্রতার কাছে থমকে দাঁড়ায় না। দেখতে দেখতে চোখের পলকে আগস্ট মাস এসে গেল। কলকাতার আর্দ্র, ভ্যাপসা গরমের স্মৃতি পেছনে ফেলে রাহুল তখন আইআইটি মাদ্রাজের নিজস্ব এক যান্ত্রিক, সুশৃঙ্খল এবং ঈষৎ রুক্ষ প্রাত্যহিকতায় সম্পূর্ণভাবে নিজেকে সঁপে দিয়েছে। ওর সেই চিরচেনা, অধ্যবসায়ী মগজটা এখন দিনরাত এক করে ল্যাবরেটরির ডেটা, অ্যালগরিদম আর প্রজেক্টের জটিল সমীকরণের গভীরে ডুব সাঁতার কাটছে। ওর সুপারভাইজার ওর কাজের নিষ্ঠা দেখে মুগ্ধ। কিন্তু ওই বড়সড়, একঘেয়ে হস্টেলের ঘরে, কিংবা ল্যাবের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বদ্ধ বাতাসে ওর অন্তরাত্মা প্রতিনিয়ত এক অমেয়, তৃষ্ণার্ত হাহাকারে পুড়ে খাক হচ্ছিল।
রাহুল ওর মাকে পাগলের মতো মিস করছিল। প্রতিদিন নিয়ম করে অন্তত দু'বার সে বাড়িতে ফোন করে। কিন্তু সেই ফোনকলগুলো বেশিরভাগ সময়ই এমন এক রুটিন-বাঁধা সময়ে হয়, যখন সুব্রত সেন বাড়িতে উপস্থিত থাকেন। ফলে সেই কথোপকথনের ব্যাকরণটাও হয়ে দাঁড়ায় অত্যন্ত মেপে মেপে বলা, যান্ত্রিক কিছু শব্দের আদানপ্রদান। "কী খেয়েছিস?", "প্রজেক্ট কতদূর এগোল?", "রাতে ঠিকমতো ঘুমোচ্ছিস তো?"—এর বাইরে মা ও ছেলের সেই একান্ত নিজস্ব, গোপন, এবং নিবিড় পৃথিবীর কোনো ছোঁয়াই ওই ফোনকলগুলোতে থাকে না। রাহুলের কানটা তৃষ্ণার্ত চাতকের মতো শুধু একটুখানি ওই আদুরে, ফিসফিস করা ডাক শোনার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকে, কিন্তু তা আর হয়ে ওঠে না।
অন্যদিকে, ডক্টর ইন্দিরা সেনের অবস্থাও কিছুমাত্র ভিন্ন ছিল না। বাইরে থেকে দেখলে তিনি সেই একই প্রাজ্ঞ, রাশভারী, এবং নিখুঁত নারী। ইউনিভার্সিটির লেকচার, পিএইচডি স্কলারদের মিটিং, আর বাড়িতে সংসার সামলানোর মাঝে তাঁর মুখমণ্ডলে কোনো ক্লান্তি বা অভাববোধের ছাপ নেই। তিনি একজন অত্যন্ত পরিণতমনস্কা নারী; তিনি খুব ভালো করেই জানেন, তাঁর এই সাময়িক বিরহ বা মানসিক অস্থিরতার কথা ঘুণাক্ষরেও রাহুলকে বুঝতে দেওয়া চলবে না। ছেলেটা ওর জীবনের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ একটা সুযোগ পেয়েছে। সেখানে দাঁড়িয়ে মায়ের কান্নাকাটি বা দুর্বলতা যদি ছেলেটার ফোকাস নষ্ট করে দেয়, তবে একজন মা হিসেবে তাঁর চেয়ে বড় অপরাধী আর কেউ হবে না। তাই, যখনই রাহুলের সাথে ফোনে বা হোয়াটসঅ্যাপে কথা হয়, ইন্দিরা সব সময় একটা চনমনে, উৎসাহব্যঞ্জক মুখোশ পরে থাকেন। তিনি প্রতিনিয়ত ওকে উদ্বুদ্ধ করেন, বলেন, "আর তো ক'টা দিন সোনা, খুব ভালো করে, মন দিয়ে কাজ কর..."
কিন্তু এই মেকি আত্মবিশ্বাসের আড়ালে, তাঁর বুকের বাঁ দিকের খাঁচাটা যেন প্রতিনিয়ত এক অব্যক্ত যন্ত্রণায় ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছিল। এই বিচ্ছেদ তাঁকে রাহুলের চেয়েও অনেক বেশি গভীরে গিয়ে আঘাত করেছিল। যখন পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ হয়ে যেত, সুব্রত যখন নিজের কাজে মগ্ন, তখন তিনি রাহুলের ফেলে যাওয়া ঘরের দরজার কাছে গিয়ে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকতেন। ওর বিছানার চাদরে, ওর পড়ার টেবিলে তিনি হয়ত নিজের অজান্তেই খুঁজে বেড়াতেন সেই ফেলে আসা এপ্রিল মাসের মাদকতাময় স্মৃতিগুলোকে। নিজের ল্যাপটপের ফোল্ডারে থাকা রাহুলের কিছু ছবি তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা একদৃষ্টে চেয়ে দেখতেন। হয়তো কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠানে তোলা ছবি, কিংবা কলেজ যাওয়ার আগে ক্যাজুয়াল টি-শার্ট পরা মুহূর্ত। কিন্তু ওই নিতান্তই সাধারণ ছবিগুলোতে ওর চওড়া কাঁধ আর অবাধ্য চোখের চাউনি দেখলেই ইন্দিরার স্মৃতির পর্দায় ভেসে উঠত সেই বন্য সমর্পণের রাতে ছেলেটার ওই ঘর্মাক্ত, তৃপ্ত মুখচ্ছবি। সাধারণ ছবির আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই নিবিড়, গোপন স্মৃতিগুলো তাঁর স্নায়ুতন্ত্রে এক অমোঘ, জ্বলন্ত লাভার মতো প্রবাহিত হতো। তাঁর নিজেরই শরীরের প্রতিটি রোমকূপ, প্রতিটি শিরা-উপশিরা যেন ওর সেই উষ্ণ, পুরুষালি, অথচ এক অন্ধ, তৃষ্ণার্ত সমর্পণে ভরা স্পর্শের জন্য হাহাকার করত।
মাঝে মাঝে, মধ্যরাতের নিস্তব্ধ প্রহরে, যখন শোবার ঘরের দেওয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দ ছাড়া আর কোনো স্পন্দন শোনা যেত না, ইন্দিরার ঘুম ভেঙে যেত। তিনি অত্যন্ত সন্তর্পণে, নিঃশব্দে পাশ ফিরে দেখতেন সুব্রত গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন কি না। তাঁর নাক ডাকার একটানা শব্দটা নিশ্চিত করলে, ইন্দিরা খুব সাবধানে বিছানা থেকে নামতেন। পায়ের পাতায় ভর দিয়ে, অন্ধকারের বুক চিরে তিনি এগিয়ে যেতেন নিজের ব্যক্তিগত বাথরুমটির দিকে।
বাথরুমের দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে তিনি যখন ভেতরে ঢুকতেন, সেই পরিচিত টাইলস আর শাওয়ার কিউবিকলটার দিকে তাকালেই তাঁর মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে যেত এক প্রবল, অপ্রতিরোধ্য শিহরণ। তিনি শাওয়ারের কাঁচের পার্টিশনটায় হাত রাখতেন। তাঁর মনে পড়ত সেই চরম বিকেলের কথা। ওই তো ওইখানটায়... ওই জায়গাতেই তো রাহুল ওর সেই স্পন্দনশীল, অনিয়ন্ত্রিত পৌরুষ নিয়ে তাঁর ফর্সা, সাবান-মাখা হাতের তালুতে এক উষ্ণ, আঠালো অমৃতের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল। ইন্দিরা চোখ বন্ধ করে সেই অদৃশ্য, বাতাসে মিলিয়ে যাওয়া গন্ধটা, সেই উত্তাপটা অনুভব করার আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। নিজের অজান্তেই তাঁর হাত চলে যেত নিজের শরীরের সেই গোপন, সংবেদনশীল উপত্যকায়; যেখানে তাঁর নারীসত্তা এবং মাতৃসত্তা মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল।
এমনই এক রাতে, ইন্দিরার সেই অবচেতন তীর্থযাত্রার মাঝপথে হঠাৎ করেই সুব্রতর ঘুম ভেঙে গেল। আধো-ঘুমে, তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখে তিনি হাত বাড়িয়ে দেখলেন পাশের জায়গাটা খালি। বিছানার চাদরটা ঠান্ডা। সুব্রত চোখ কচলালেল, তবে ওঠার চেষ্টা করলেন না, শরীরটা বড্ড ক্লান্ত ছিল তাঁর। কিন্তু চোখটা সামান্য খুলতেই তিনি দেখলেন, বেডরুমের দরজাটা খুব সামান্য একটু ফাঁক করা, আর সেই ফাঁক দিয়ে করিডোরের ওপার থেকে, ইন্দিরার বাথরুমের দরজা গলে একটা অত্যন্ত ক্ষীণ, হলদেটে আলোর রেখা ঘরের মেঝের ওপর এসে পড়েছে।
সুব্রত ওভাবেই পাশ ফিরে শুয়ে রইলেন। মিনিট দশেক পর, পায়ের অত্যন্ত মৃদু, প্রায় নিঃশব্দ আওয়াজ তুলে ইন্দিরা ঘরে ঢুকলেন। তাঁর শ্বাস তখন সামান্য ভারী, আর বুকের ওঠানামাটা অন্ধকারের মধ্যেও একটু বেশিই স্পষ্ট। তিনি খুব সাবধানে বিছানায় উঠতে যাবেন, ঠিক তখনই সুব্রতর তন্দ্রালু, ঈষৎ ঘড়ঘড়ে গলাটা নীরবতা চিরে দিল:
"কী হলো গো ইন্দিরা? মাঝরাতে হঠাৎ উঠলে যে? শরীর ঠিক আছে তো?"
হঠাৎ এই প্রশ্নে ইন্দিরার হৃৎপিণ্ডটা যেন এক লহমায় গলার কাছে ছিটকে উঠে এল। তাঁর শিরদাঁড়া দিয়ে এক বরফ-শীতল আতঙ্কের স্রোত নেমে গেল। তিনি এক সেকেন্ডের জন্য জমে পাথর হয়ে গেলেন। কিন্তু তাঁর সেই প্রখর, তীক্ষ্ণ মগজটা পরিস্থিতি সামাল দিতে একটুও সময় নিল না।
"ওহ্... তুমি জেগে আছ?" ইন্দিরা নিজের গলার স্বরটাকে যতটা সম্ভব শান্ত এবং স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে বললেন, "তেমন কিছু না... ওই একটু গ্যাসের প্রবলেম হচ্ছিল মনে হয়। পেটটা কেমন ভারী ভারী লাগছিল, তাই একটু বাথরুমে গেলাম। এখন ঠিক আছে।"
তিনি খুব সাবধানে সুব্রতর পাশে এসে শুয়ে পড়লেন এবং নিজের গায়ের ওপর চাদরটা টেনে নিলেন। সুব্রত চোখ না খুলেই, অন্ধকারের মধ্যে কয়েকবার গভীরভাবে নাক টেনে বাতাস শুঁকলেন। তাঁর ভুরুদুটো সামান্য কুঁচকে গেল।
"তুমি কি এই মাঝরাতে ডিওডোরেন্ট বা পারফিউম মেখেছ নাকি? কেমন একটা ভাল গন্ধ পাচ্ছি..." সুব্রত ঘুমের ঘোরেই একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
গন্ধটা তাঁর কোনো পারফিউমের নয়, গন্ধটা আসলে ওই লেবুর সুবাস দেওয়া রুম ফ্রেশনারের। বাথরুমের ওই তীব্র স্মৃতির ঘোরে নিজের শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর, তাঁর নারীশরীরের কোনো গোপন, অবাধ্য গন্ধ যাতে বদ্ধ বাতাসে টিকে না থাকে, তার জন্য তিনি সেই এপ্রিলের দুপুরের মতোই অভ্যাসবশত ওই রুম ফ্রেশনারটা স্প্রে করেছিলেন। সেই চড়া, লেবুর গন্ধটাই এখন সুব্রতর নাকে পৌঁছে গেছে। তিনি নিজের ডান হাতের আঙুলগুলো চাদরের নিচে শক্ত করে মুঠো করলেন।
"পারফিউম? ধুর! এই মাঝরাতে আমি পারফিউম মাখতে যাব কোন দুঃখে!" ইন্দিরা অত্যন্ত মসৃণভাবে, একটা চাপা বিরক্তির ভান করে বিড়বিড় করলেন, "জানোই তো... গ্যাসের প্রবলেম হলে বাথরুমের অবস্থাটা বড্ড... মানে, একটু আনপ্লেজেন্ট হয়ে যায়। ওই বিশ্রী গন্ধটা ঢাকতে আমি একটু এয়ার ফ্রেশনার স্প্রে করে দিলাম আর কী।"
সুব্রত তাঁর এই কথাটায় ঘুমের ঘোরেই একটু শব্দ করে হেসে উঠলেন। হাসির দমকে তাঁর বুকের ওপর রাখা হাতটা কেঁপে উঠল। "তা বটে... গ্যাস তো আর লোক বুঝে গন্ধ ছড়ায় না। ঠিকই করেছ।"
তিনি আর কোনো প্রশ্ন না করে পাশ ফিরে, নিজের কোলবালিশটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আবার ঘুমের অতলে তলিয়ে গেলেন।
ইন্দিরা ওভাবেই চিৎ হয়ে শুয়ে রইলেন বেশ কিছুক্ষণ। তাঁর বুকের ভেতরটা তখন হাতুড়ির মতো পিটছে। তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারলেন তাঁর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। তিনি খুব সন্তর্পণে নিজের শাড়ির আঁচলটা তুলে কপালের সেই হিমশীতল ঘামটা মুছে নিলেন। একটা গভীর, রুদ্ধশ্বাস স্বস্তির নিশ্বাস তাঁর ঠোঁট চিরে বেরিয়ে এল। একটা চরম বিপদের হাত থেকে তিনি এযাত্রা বেঁচে গেছেন। শরীরের সেই গোপন, উদ্দাম মুক্তির শেষে স্নায়ু বেয়ে নেমে আসা এক অনিবার্য, মন্থর ক্লান্তি, ভয়, আর এক অদ্ভুত লুকোচুরি খেলার অবর্ণনীয় তৃপ্তিতে তাঁর শরীরটা অবশেষে ঘুমের কোলে ঢলে পড়ল।
(rest of the Chapter in the next post...)
Reply


Messages In This Thread
The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-01-2026, 01:31 PM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 05:46 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 05:47 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 05:48 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 05:54 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 05:55 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 05:57 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 05:58 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 05:59 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 08:43 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 08:49 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 08:51 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 08:54 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 08:55 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 08:56 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 08:57 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 08:58 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 08:59 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 09:00 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 09:01 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 09:04 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 09:05 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 09:06 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-05-2026, 06:02 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-05-2026, 06:02 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-05-2026, 06:04 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-05-2026, 06:04 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-05-2026, 08:55 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-05-2026, 08:55 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-05-2026, 08:57 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-05-2026, 08:59 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-05-2026, 08:59 AM

Forum Jump:


Users browsing this thread: 1 Guest(s)