Thread Rating:
  • 1 Vote(s) - 5 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5

The Barter System (By:andygarfield)
#28

চতুর্দশ পরিচ্ছেদ: দূরত্বের মেঘ এবং সীমানার শেষ প্রহর


১৪.১. অবরুদ্ধ শ্রাবণ






আগস্ট মাসের শেষ দিক। তিলোত্তমা কলকাতার আকাশ তখন বর্ষার দীর্ঘস্থায়ী কান্নার শেষে এক ক্ষণস্থায়ী, সিক্ত স্নিগ্ধতায় জিরিয়ে নিচ্ছে। শ্রাবণের সেই একটানা, প্রলয়ঙ্করী বর্ষণ বিদায় নিলেও, ভাদ্রের খেয়ালি মেঘেরা মাঝে মাঝেই ঝেঁপে বৃষ্টি নামিয়ে শহরের পিচগলা রাস্তাগুলোকে ধুয়ে দিয়ে যাচ্ছে। ৩০শে আগস্ট, রবিবার। আইআইটি মাদ্রাজের দীর্ঘ তিন মাসের কঠোর, মেধানিঙড়ানো সামার প্রজেক্টের সফল সমাপ্তি ঘটিয়ে রাহুল আজ তার চিরচেনা শহরের বুকে, নিজের চেনা আশ্রয়ে ফিরে আসছে। কলকাতা এয়ারপোর্ট থেকে বেরোনোর পর গাড়ির কাঁচ দিয়ে বাইরের এই সদ্যস্নাত, ধূলিহীন, সতেজ শহরটাকে দেখতে দেখতে ওর মনে হচ্ছিল, ওর নিজের ভেতরের জমানো তিন মাসের অপেক্ষার ধুলোবালিও যেন ওই বৃষ্টির জলেই ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেছে।
দীর্ঘ নব্বই দিনের বিরহ।
কলকাতার এই সিক্ত, মাতাল করা বাতাসের মতোই রাহুলের বুকের ভেতরটা আজ এক অমেয়, দুর্বিনীত উচ্ছ্বাসে স্পন্দিত হচ্ছে। তিন মাস পর ও আবার ওর মাকে কাছে পাবে। মায়ের সেই চেনা সুবাস, সেই উষ্ণতা, সেই স্পর্শ—সবকিছুই আজ ওর হাতের মুঠোয় ধরা দেবে। ওর স্মৃতির ক্যানভাসে বারবার ফিরে আসছিল সপ্তাহদুয়েক আগের সেই বিশেষ দিনটার কথা। সেই দিন, যেদিন মা ওকে হোয়াটসঅ্যাপে ওই ছবিটা পাঠিয়েছিল—শিক্ষিত মার্জিত রুচিশীল অধ্যাপিকার বসনে মোড়া, অথচ পবিত্র বক্ষবৃন্ত উদ্ভাসিত করা সেই দিব্য দেবীরূপ। সেই ছবির সাথে জুড়ে থাকা মায়ের সেই কথাগুলো—"তুই-ই মায়ের সব, মায়ের গোটা পৃথিবী", "ঠিক ওইভাবেও চুমু খাচ্ছে সোনা... জিভ দিয়ে", "তুই ওটাতেও তোর ঠোঁট ছোঁয়াবি, জিভ দিয়ে চাটবি, যেভাবে খুশি আদর করবি", আর সবশেষে সেই অমোঘ, নেশাতুর প্রতিশ্রুতি..."তোকে খাওয়াব... মায়ের ঠিক ওইখান থেকে"— প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য ওর মগজে ছোটবেলায় মুখস্থ করা নামতার মতোই চিরস্থায়ীভাবে খোদাই হয়ে গেছে।
চেন্নাইয়ের হস্টেলের সেই দীর্ঘ, একাকী রাতগুলোতে, যখন ওর রুমমেট উদয়ন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকত, রাহুল নিজের মাথার ওপর চাদরটা টেনে নিয়ে এক নিভৃত, অন্ধকার ঘেরাটোপ তৈরি করত। সেই ঘেরাটোপের ভেতর, ফোনের স্ক্রিনে ফুটে ওঠা মায়ের ওই দেবীর মতো রূপের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকতে থাকতে ওর শরীর আর মন এক অপার্থিব তৃষ্ণায় হাহাকার করে উঠত। মাঝে মাঝে, যখন আইআইটি ক্যাম্পাসের বিশাল, ছায়াঘেরা রাস্তা দিয়ে ও একা হাঁটত, অথবা ক্যান্টিনের এক কোণে বসে আনমনে টিফিন খেত, তখন মায়ের ওই মেসেজের টুকরো টুকরো শব্দগুলো ওর শিরায় শিরায় আগুন ধরিয়ে দিত। কিছু কিছু রাতে, যখন ছবির সেই ঐশ্বরিক সৌন্দর্য এবং মেসেজের ওই সর্বগ্রাসী সমর্পণের ভাষা ওর সহনশীলতার সমস্ত বাঁধ ভেঙে দিত, রাহুল তখন চাদরের অন্ধকারে নিজের সেই অবাধ্য, স্ফীত পৌরুষটিকে হাতের মুঠোয় ধারণ করত। চোখ বন্ধ করে মায়ের সেই উষ্ণ, মসৃণ ত্বকের কল্পনা করতে করতে ও নিজের ভেতরের সেই উদ্বেলিত, আদিম লাভাস্রোতকে মুক্ত করে দিত—ঠিক যেন নিজের আরাধ্যা দেবীর চরণে এক পরম, খাঁটি এবং পবিত্র অর্ঘ্য নিবেদন করছে। এই শেষ দু'সপ্তাহ ও এভাবেই বেঁচে ছিল।
আজ, গাড়ির নরম সিটে মাথা এলিয়ে দিয়ে, জানলার কাঁচ ভেদ করে বৃষ্টির জলে স্নান করা তিলোত্তমার দিকে তাকিয়ে থাকা রাহুলের মনের ভেতরের পুঞ্জীভূত সমস্ত ক্লান্তি, দীর্ঘ বিরহের হাহাকার আর সেই পুরনো, অহেতুক অপরাধবোধের শেষ চিহ্নটুকুও আর নেই। অনুভূতির আকাশ এখন মেঘহীন নীলের মতো পরিষ্কার, আর ওর লক্ষ্য স্ফটিকের চেয়েও স্বচ্ছ। এই তিনটে মাসের অবদমিত দহন, একাকীত্ব আর হাজারো বিনিদ্র রজনী ওকে একটা পরম সত্য শিখিয়েছে—সমাজের কোনো নিয়ম বা সংস্কারের চেয়ে ওর ভালোবাসা অনেক বেশি সত্যি। এখন আর কোনো সংশয় বা পিছিয়ে আসার জায়গা নেই ওর মনে। বাড়ি ফিরে সে শুধু একটা জিনিসই চায়। 
সে তার সত্তার শেষ বিন্দুটি নিংড়ে ঢেলে দিতে চায় মায়ের পরম উত্তাপের গভীরে।
গাড়িটা যখন সেন বাড়ির ড্রাইভওয়েতে এসে ঢুকল, রাহুলের হৃৎপিণ্ডটা গলার কাছে লাফিয়ে উঠল। সদর দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলেন সুব্রত এবং ইন্দিরা।
ইন্দিরার পরনে আজ একটা চাপা, ছাইরঙা সুতির শাড়ি। চোখেমুখে এক প্রচ্ছন্ন, আভিজাত্যপূর্ণ গাম্ভীর্য, যা তিনি সবসময় সুব্রতর সামনে পরিধান করে থাকেন। গাড়ি থেকে নেমে রাহুল যখন এগিয়ে গেল, ওর চোখ দুটো শুধু একটা মানুষের দিকেই স্থির ছিল। ইন্দিরার চোখের কোণে এক ক্ষণিক, বিদ্যুতের মতো খেলে যাওয়া আর্দ্রতা রাহুল স্পষ্ট দেখতে পেল, কিন্তু পরক্ষণেই তা নিখুঁতভাবে ঢেকে গেল এক সাধারণ, মেপে চলা মাতৃসুলভ হাসিতে।
"কেমন আছিস, রাহুল? ফ্লাইটে কোনো প্রবলেম হয়নি তো?" সুব্রত এগিয়ে এসে ছেলের পিঠে একটা সন্তোষজনক, পুরুষালি চাপড় দিলেন।
"না না, কোনো প্রবলেম হয় নি। ফ্লাইট একদম অন টাইম ছিল," রাহুল একটা কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে উত্তর দিল। ওর মনটা তখন হাহাকার করছে মাকে একবার শক্ত করে জড়িয়ে ধরার জন্য। কিন্তু সুব্রতর উপস্থিতিতে সেই সহজ আবেগটুকু প্রকাশ করার কোনো উপায় এই সেন পরিবারে নেই।
ইন্দিরা একটু এগিয়ে এসে অত্যন্ত সাধারণ, পরিমিত ভঙ্গিতে রাহুলের কাঁধে হাত রাখলেন। "খুব ক্লান্ত লাগছে তোকে। ভেতরে আয়, ফ্রেশ হয়ে নে।" তাঁর স্পর্শটা ছিল কয়েক সেকেন্ডের, কিন্তু ওই সামান্য সময়ের মধ্যেই তাঁর আঙুলগুলো রাহুলের কাঁধের পেশিতে যে একটা সূক্ষ্ম, গোপন চাপ দিয়ে গেল, তাতেই রাহুলের সারা শরীরে এক শিহরণ বয়ে গেল।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নামল। ডাইনিং টেবিলে এলাহি আয়োজন। সুব্রতর উপস্থিতির কারণে বাড়ির আবহাওয়া সেই চিরচেনা, শুষ্ক শৃঙ্খলায় মোড়া। খাবার টেবিলে বসে মূলত সুব্রত এবং রাহুলের মধ্যেই কথাবার্তা চলছিল, আর ইন্দিরা শুধু প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছিলেন এবং মাঝে মাঝে দু-একটা কথা যোগ করছিলেন।
"তোর অ্যাডভাইজারের মেইল পেয়েছিলাম আমি," সুব্রত একটা মাছের টুকরো কাঁটা থেকে ছাড়াতে ছাড়াতে বেশ গর্বিত গলায় বললেন। "উনি তোর পারফরম্যান্সে ভীষণ ইমপ্রেসড। একজন সেকেন্ড ইয়ার আন্ডারগ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট হিসেবে তুই যে লেভেলের ডেডিকেশন দেখিয়েছিস, সেটা সত্যিই প্রশংসনীয়। সামনের বুধবার থেকে তো আবার থার্ড ইয়ারের ক্লাস শুরু, তাই না?"
"হ্যাঁ বাবা," রাহুল মাথা নেড়ে বলল। ওর চোখ প্লেটের ওপর নিবদ্ধ থাকলেও, ইন্দিরার প্রতিটি চালচলন ও ঠিক মেপে নিচ্ছিল। "প্রজেক্টটা সত্যিই খুব হেকটিক ছিল। লাস্ট কয়েকটা দিন তো ল্যাব থেকে বেরোনোরই সময় পাইনি।"
"সে তো তোর মুখ দেখেই বুঝতে পারছি," সুব্রত একটু হাসলেন। "চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। এই ক'টা দিন অন্তত বইখাতা একদম ছুঁয়েও দেখবি না।"
রাহুল একটু অবাক হলো। বাবার মুখে এমন 'বই না ছোঁয়ার' নির্দেশ সত্যিই বিরল। ও একটু স্বস্তির হাসি হেসে বলল, "আমিও সেটাই ভাবছিলাম বাবা। জাস্ট কাল আর পরশু—সোমবার আর মঙ্গলবার—এই দুটো দিনই তো ছুটি। একটু রিল্যাক্স করব এই দু'দিন।"
ইন্দিরা জলের গ্লাসটা রাহুলের দিকে এগিয়ে দেওয়ার সময় ক্ষণিকের জন্য ওর চোখের দিকে তাকালেন। দীর্ঘ তিনটে মাস পর নিজের নাড়ি-ছেঁড়া ধনকে এত কাছ থেকে দেখতে পেয়ে তাঁর বুকের ভেতরটা এক অনাবিল, মাতাল করা আনন্দে উথলে উঠছিল। তাঁর খুব ইচ্ছে করছিল ডাইনিং টেবিলের এই সমস্ত শুষ্ক রীতিনীতি, সুব্রতর ওই রাশভারী উপস্থিতির তোয়াক্কা না করে এক্ষুনি ছেলেটাকে দু-হাতে নিজের বুকের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরতে; ওর ওই ক্লান্ত, শ্রান্ত মুখটায় অজস্র চুমু এঁকে দিয়ে নিজের সেই চেনা, আদুরে গলায় বলতে—"আমার বাবুটা, বড্ড মিস করেছি রে তোকে!" কিন্তু এই নিয়ন্ত্রিত, শৃঙ্খলাপরায়ণ আবহাওয়ায় নিজের সেই স্নেহময়ী রূপটিকে প্রকাশ করার বিন্দুমাত্র কোনো উপায় তাঁর নেই। গ্লাসটা হাতবদল হওয়ার ওই সামান্য ভগ্নাংশ সেকেন্ডে রাহুলের চোখদুটো যখন তাঁর চোখের সাথে মিলল, ইন্দিরার সেই গভীর, কাজল-কালো দৃষ্টিতে ফুটে উঠল এক বোবা হাহাকার আর অসীম ভালোবাসার এক গোপন প্রলেপ। চোখের ওই এক লহমার চাউনিতেই তিনি যেন নিঃশব্দে উজাড় করে দিলেন তাঁর গত নব্বই দিনের জমে থাকা সমস্ত তৃষ্ণা, আর ঠিক এই মুহূর্তে ছেলেকে নিজের মতো করে কাছে টানতে না পারার এক বুক-ফাটা অসহায়তা। মায়ের ওই নীরব, সজল চোখের ভাষাটা পড়তে রাহুলের একটুও ভুল হলো না, আর সাথে সাথেই ওর বুকের ভেতর এক উষ্ণ, বিষণ্ণ স্পন্দন ডানা ঝাপটে উঠল।
"হ্যাঁ, তুই ফুল রেস্ট নে," সুব্রত জলের গ্লাসে চুমুক দিয়ে গলাটা পরিষ্কার করলেন। "আর শোন, তোর থার্ড ইয়ারের ক্লাস শুরু হওয়ার আগে কী কী লাগবে আমাকে একটা লিস্ট দিস তো। নতুন বই, রেফারেন্স মেটেরিয়াল, ফাইলস, মার্কার—যা যা দরকার..."
কথা বলতে বলতেই তিনি একটু থামলেন। কিছু একটা ভেবে মত পালটে বললেন, "না দাঁড়া, লিস্ট দিয়ে আর কী হবে! তুই বরং এক কাজ কর... তুই নিজেই আমার সাথে চল না কলেজ স্ট্রিটে। ওখানে গিয়ে নিজেই দেখে-বেছে তোর যা যা প্রয়োজন সব কিনে নিবি। কী বলিস? কবে যাবি? কাল সোমবার... না না, কাল সোমবারটা তুই বরং বাড়িতে ঘুমিয়েই কাটাস, তোর রেস্ট নেওয়াটা খুব দরকার। আমরা বরং মঙ্গলবার বেরোতে পারি। তুই আমাকে বলিস কখন বেরোতে চাস, আমি তো বাড়িতেই থাকব।"
সুব্রতর এই শেষ কথাটা রাহুলের কানের পর্দা ভেদ করে মগজে ঢুকতেই ওর মাথার ভেতর যেন একটা বিশাল ঘণ্টা বেজে উঠল।
রাহুলের হাত থেকে চামচটা প্রায় খসে পড়তে যাচ্ছিল। ও খাওয়া থামিয়ে, একটু ভ্রু কুঁচকে, অস্পষ্ট, ঘোরের গলায় জিজ্ঞেস করল, "ওয়েট... বাবা, তুমি... তুমি বাড়িতে থাকবে? কিন্তু... তোমার তো সোমবার আর মঙ্গলবার অফিসে যাওয়ার কথা, তাই না?"
সুব্রত একটা রুটির টুকরো মুখে পুরে অত্যন্ত স্বাভাবিক, নির্লিপ্ত গলায় বোমাটা ফাটালেন।
"ওহ্, তোকে বলা হয়নি বুঝি? না না, আমি আগামী বেশ কিছুদিন অফিস যাচ্ছি না। আসলে আমার অফিসের ওই ফ্লোরটাতে একটা মেজর রেনোভেশনের কাজ শুরু হয়েছে। পুরো ইন্টারিয়র চেঞ্জ হচ্ছে। ওই কাজটা শেষ হতে অন্তত পক্ষে দু'সপ্তাহ তো লাগবেই। তাই আগামী কয়েকদিন আমি ওয়ার্ক-ফ্রম-হোম করছি। তবে চিন্তা করিস না, যেহেতু বাড়িতেই থাকব, আমার শিডিউল এখন অনেকটাই ফ্লেক্সিবল। তুই মঙ্গলবার যখনই বলবি, আমি মিটিং অ্যাডজাস্ট করে তোর সাথে বেরিয়ে যাব।"
রাহুলের মনে হলো ওর পায়ের তলা থেকে কেউ যেন ডাইনিং রুমের পুরো মেঝেটা এক হ্যাঁচকায় টেনে সরিয়ে নিয়েছে।
ও একটা স্বয়ংক্রিয় পুতুলের মতো শুধু মাথাটা ওপর-নিচ করল, "ওকে বাবা... আমি... আমি জানাব।"
কিন্তু ওর বুকের ভেতর তখন যে প্রলয়ঙ্করী সুনামিটা শুরু হয়েছে, তার কোনো শব্দ বাইরের কেউ শুনতে পেল না। ওর নিশ্বাস আটকে আসছিল।
দুই সপ্তাহ? চোদ্দোটা দিন?
রাহুল কয়েক সেকেন্ডের জন্য ব্ল্যাঙ্ক হয়ে গেল। বাবা বাড়িতে থাকবে... সব সময়! এই কথাটা ওর মগজে হাতুড়ির মতো আছড়ে পড়তে লাগল। সকালবেলা ও যখন কলেজে যাবে, বাবা বাড়িতে। বিকেলে যখন ফিরে আসবে, বাবা বাড়িতে। সন্ধেবেলা, রাতে—সব সময় বাবা এই বাড়ির ভেতরে উপস্থিত থাকবে! তার মানে... তার মানে ও ওর মায়ের সাথে এক সেকেন্ডের জন্যও একা হতে পারবে না!
ওর সাজানো, রঙিন, স্বপ্নময় প্রাসাদটা এক নিমেষে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। তিনটে মাস... নব্বইটা দিন ও একটা মাত্র আশায় বুক বেঁধে কাটিয়েছে—বাড়ি ফিরে মাকে দু-হাত দিয়ে বুকের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরবে। আর এখন? মা ওর সামনে বসে আছে, মাত্র কয়েক ফুট দূরে, অথচ ও মায়ের হাতটা পর্যন্ত ধরতে পারবে না।
কবে সে মাকে আবার নিজের মতো করে কাছে টানতে পারবে? কবে সে মাকে চুমু খেতে পারবে? কবে মিলবে মায়ের ওই নরম, ফর্সা ত্বকের উষ্ণতায় নিজেকে বিলীন করে দেওয়ার সুযোগ? আর বাথরুমের শাওয়ারের নিচের সেই আদিম, রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তগুলো—সেগুলো তো এখন প্রায় অলীক কল্পনার মতো ঠেকছে। কবে হবে? দু'সপ্তাহ পর? এই তৃষ্ণার্ত, হাহাকার করা বুকের কাছে আগামী চোদ্দোটা দিন যে আক্ষরিক অর্থেই দু'বছরের চেয়েও দীর্ঘ আর যন্ত্রণাদায়ক। এই না-পাওয়ার দমবন্ধ করা অপেক্ষাটাই তো ওকে তিলে তিলে শেষ করে দেবে। ওর অবস্থা এখন সেই তৃষ্ণার্ত চাতক পাখির মতো, যে সামনে টলটলে জলের সরোবর দেখতে পাচ্ছে, কিন্তু তার এক ফোঁটাও পান করার অধিকার তার নেই।
রাহুল অত্যন্ত ধীর, যন্ত্রণাকাতর দৃষ্টিতে ইন্দিরার দিকে তাকাল।
ইন্দিরাও ওর দিকেই তাকিয়ে ছিলেন। তাঁর চোখের গভীরে এক জমাট বাঁধা, ধূসর বিষণ্ণতা লুকিয়ে আছে, যা সুব্রতর চোখে ধরা না পড়লেও রাহুলের কাছে সেই মুহূর্তে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। রাহুল বুঝতে পারল, মা-ও ওর মতোই ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়েছে। ওই চোখের দিকে তাকিয়ে রাহুল এক নির্বাক, মরিয়া আর্জি জানাল—'মা... প্লিজ কোনো একটা রাস্তা বের করো... তুমি তো সবসময় পারো।'
ছোটবেলা থেকে জীবনে যখনই কোনো বড় সমস্যা বা জটিল বিপদে পড়েছে রাহুল, ওর মা ঠিক কোনো না কোনো জাদুমন্ত্রে তাকে সেই সংকট থেকে উদ্ধার করেছেন। মায়ের আঁচলের তলায় ওর জীবনের সব সমস্যার সমাধান লুকিয়ে থাকে। কিন্তু ভাগ্যের কী নিষ্ঠুর পরিহাস, আজকের এই সন্ধ্যায় এবং আগামী দিনগুলোতে, 'মাকে মায়ের মতো করে কাছে পাওয়াটাই' যেন রাহুলের জীবনের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে অসম্ভব এক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাকি দিনটা এক ধরনের ঘোলাটে, দমবন্ধ করা কুয়াশার মধ্যে দিয়ে কাটল।
রাহুল নিজের ব্যাগপত্তর নিয়ে ঘরে ফিরে গেল। পরে রাতে ডিনার করার সময় ওর মনে হচ্ছিল, প্লেটের খাবারগুলো যেন ওর গলায় কাঁটার মতো বিঁধছে। ও বারবার আড়চোখে মায়ের দিকে তাকাচ্ছিল। ইন্দিরাকে আজ যেন আরও বেশি সুন্দর, আরও বেশি স্নিগ্ধ আর মাতৃসুলভ দেখাচ্ছিল, কিন্তু সেই সৌন্দর্য ওর ভেতরের যন্ত্রণাকে কমানোর বদলে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল ওর কাছে পৃথিবীর সব চেয়ে দামি রত্নটা আছে, অথচ আসলে ওর কাছে কিছুই নেই।
ও কি ওর বাবার ওপর রেগে আছে? না, ঠিক তা নয়। বাবা তো আর ইচ্ছে করে বাড়িতে থাকছে না, অফিসের রেনোভেশনের জন্যই থাকছে। এতে বাবার তো কোনো দোষ নেই। কিন্তু... পরক্ষণেই ওর মগজের অন্য একটা কোণ থেকে এক বিদ্রোহী যুক্তি মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। হ্যাঁ, একদিক থেকে দেখলে দোষ তো বাবারই! বাবা এই বাড়ির পরিবেশটাকে এমন একটা মিলিটারি ক্যাম্প বানিয়ে রেখেছে যে, মা নিজের ছেলের সাথে একটু স্বাভাবিকভাবে, খোলাখুলিভাবে আদর করতেও ভয় পায়। বাবা যদি আর পাঁচটা সাধারণ, বন্ধুসুলভ বাবার মতো হতো, তাহলে মাকে তো আর এভাবে দুটো আলাদা রূপ নিয়ে বাঁচতে হতো না!
ওর চিন্তার সুতোটা ছিঁড়ে গেল পকেটে ফোনটা বেজে ওঠায়। একটা মেসেজ এসেছে। ও ফোনটা বের করে দেখল, কোনো একটা ইনস্যুরেন্স কোম্পানির প্রমোশনাল মেসেজ। মেসেজের নিচে 'কোট অফ দ্য ডে' বলে লেখা: "Everything happens for a reason."
রাহুলের মেজাজ এমনিতেই সপ্তমে চড়ে ছিল। এই জ্ঞানগর্ভ বাণীটা পড়ে ওর পিত্তি জ্বলে গেল। ও মেসেজটা পুরো না পড়েই ডিলিট করে দিল। তারপর খাওয়া শেষ করে নিজের ঘরে গিয়ে সোজা বিছানায় আছড়ে পড়ল। শরীর এবং মন—দুটোই আজ চরম অবসাদে ডুবে আছে। ও আর কিছু না ভেবেই চোখ বুজল এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই এক গভীর, অন্ধকার ঘুমে তলিয়ে গেল।
পরদিন সকাল। ৫:৩০ মিনিট।
রাহুলের ঘুমটা ভেঙে গেল। গত রাতে অত্যন্ত ক্লান্তিতে বড্ড তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছিল ও, তাই আজ সকালে এত ভোরেই ওর চোখ খুলে গেছে। রাহুলের পরনে কেবল একটা কালো রঙের শর্টস, ওপরের দিকটা অনাবৃত। এমনিতে এভাবেই খালি গায়ে ঘুমোনোই ওর রোজকার অভ্যাস। ও চোখ কচলে পাশ থেকে ফোনটা তুলে নিল। হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকেই দেখল গত সন্ধ্যার কয়েকটা আনরিড মেসেজ জমে আছে। কাল ওর রিপ্লাই দেওয়ার মতো কোনো মানসিক অবস্থাই ছিল না। একটা বন্ধু জিজ্ঞেস করেছে ও চেন্নাই থেকে ফিরেছে কি না, আরেকজন জানতে চেয়েছে সামনের সেমিস্টারে ও কী কী ইলেকটিভ কোর্স নিচ্ছে। অত্যন্ত যান্ত্রিকভাবে, ছোট ছোট রিপ্লাই দিয়ে কাজ সেরে, ও ফেসবুক খুলল। উদ্দেশ্যহীনভাবে স্ক্রল করে কিছু রিলস আর পোস্ট দেখছিল, মগজটা তখন একটা শূন্যতায় ভাসছে।
ঠিক তখনই, ওর ঘরের বন্ধ দরজায় একটা অত্যন্ত মৃদু, প্রায় নিঃশব্দ টোকা পড়ার শব্দ হলো।
রাহুল ফোন থেকে চোখ তুলে দরজার দিকে তাকাল। ওর হৃৎপিণ্ডটা এক লহমায় থমকে গেল।
দরজার নবটা খুব ধীরে ধীরে ঘুরল। তারপর দরজাটা সামান্য ফাঁক করে, নিঃশব্দ পায়ে ঘরের ভেতর প্রবেশ করলেন ইন্দিরা।
রাহুল চরম বিস্ময়ে আর এক বুক-ধকধক করা ঘোরে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। ও কি স্বপ্ন দেখছে? ও দ্রুত দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকাল। সাড়ে পাঁচটা বাজে! এই কাকভোরে মা ওর ঘরে কী করছে?
ইন্দিরা খুব সাবধানে, যাতে একটুও শব্দ না হয়, দরজার ছিটকিনিটা তুলে দিলেন। 'ক্লিক' করে একটা অত্যন্ত ক্ষীণ শব্দ হলো। তারপর তিনি ধীর, ক্লান্ত পায়ে এগিয়ে এলেন রাহুলের বিছানার দিকে।
রাহুল বিছানায় একটু উঠে বসে পিঠটা হেডবোর্ডে ঠেকিয়ে বসল। ইন্দিরার পরনে একটা খুব সাধারণ, আরামদায়ক নীল আর সাদা প্রিন্টের সুতির শাড়ি। তাঁর চুলগুলো এলোমেলো, অবিন্যস্ত। আর তাঁর ফর্সা, তীক্ষ্ণ মুখে এক গভীর, অতলস্পর্শী ক্লান্তির ছাপ।
ইন্দিরা বিছানার একপাশে এসে বসলেন। তাঁর চোখদুটো রাহুলের মুখের ওপর স্থির।
"সোনা," তাঁর গলার স্বরটা বড্ড নিচু, ভারী, আর একটু ভাঙা ভাঙা। "আমি দেখলাম তুই হোয়াটসঅ্যাপে অনলাইন আছিস... তাই ভাবলাম একবার আসি... তুই এত সকালে জেগে কেন রে বাবু? এখনও তো ভোর..."
রাহুল একটা ঢোক গিলল। ওর গলাটা শুকিয়ে আসছিল। "মা, আমি কাল সাড়ে ন'টার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম... তাই ঘুমটা ভেঙে গেল... এনিওয়ে, কিন্তু তুমি এত সকালে উঠে পড়েছ কেন মা? আর তোমাকে এত টায়ার্ড দেখাচ্ছে কেন? তুমি কি রাতে ঠিক করে ঘুমোওনি?"
ইন্দিরা এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি শুধু ওই ক্লান্ত, কিন্তু অসীম ভালোবাসায় ভেজা চোখদুটো দিয়ে ওর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন।
রাহুল বিছানায় আরও একটু সোজা হয়ে বসে, উদ্বিগ্ন গলায় বলল, "তার মানে... তুমি সারা রাত ঘুমোওনি..."
"আমার কথা ছাড় সোনা," ইন্দিরা একটা দীর্ঘ, কাঁপানো শ্বাস ফেলে ওর কথায় বাধা দিলেন। "আমি ঘুমিয়েছিলাম... কিন্তু ঘুমটা বারবার ভেঙে যাচ্ছিল..."
রাহুল কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ইন্দিরা ওকে হাত তুলে থামিয়ে দিলেন। তাঁর গলার স্বর এবার এক অদ্ভুত, গাঢ় আবেগে বুজে এল।
"আমি... আমি কাল তোকে দেখছিলাম, রাহুল। ডাইনিং টেবিলে বসে তোর বাবা যখন বলল যে ও আগামী দু'সপ্তাহ বাড়িতেই থাকবে... আমি তোর মুখের ওই এক্সপ্রেশনটা দেখেছি, সোনা। দ্যাখ, নিজের বাবার বাড়িতে থাকা নিয়ে একজন ছেলের এমন কষ্ট পাওয়াটা যতই অনুচিত হোক না কেন... আমি খুব ভালো করেই জানি তোর বুকের ভেতরটা কেন ওরম করছিল। আর তোর কষ্ট হলে, তোর বুক ফাটলে, তোর মায়ের বুকের ভেতরটা যে তার চেয়েও দ্বিগুণ জোরে ভাঙে রে সোনা... তুই সেটা জানিস তো?"
রাহুল মন্ত্রমুগ্ধের মতো মায়ের ওই আর্দ্র চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে রইল।
"আমি... আমি সারা রাত শুধু এটাই ভেবেছি..." ইন্দিরা ফিসফিস করে বলতে লাগলেন, তাঁর আঙুলগুলো শাড়ির আঁচলটা মুচড়ে ধরে আছে। "মাঝরাতে বারবার আমার ঘুম ভেঙে যাচ্ছিল... ভোরের দিকে যখন আবার ঘুম ভাঙল, আমি ফোনটা তুলে একটু অন্য কিছু দেখার চেষ্টা করছিলাম, মনটা ডাইভার্ট করার জন্য। আর তখনই দেখলাম তুই অনলাইন। তোর বাবা তখন অঘোরে ঘুমোচ্ছে, নাক ডাকছে। তাই... তাই আমি আর নিজেকে আটকাতে পারলাম না রে সোনা... আমি চলে এলাম তোর কাছে..."
রাহুলের মুখের ওই মেঘলা বিষণ্ণতাটা এক নিমিষে কেটে গিয়ে সেখানে একটা অত্যন্ত নরম, স্নিগ্ধ হাসি ফুটে উঠল।
ইন্দিরা নিজের দুটো ফর্সা, নরম হাত রাহুলের চওড়া, অনাবৃত কাঁধের ওপর রাখলেন। তিনি ওভাবেই ওর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন।
"তুমি... তুমি ওভাবে কী দেখছ, মা?" রাহুল বড্ড মোলায়েম, ফিসফিস করা গলায় জিজ্ঞেস করল।
"তোকে..." ইন্দিরার গলার স্বরটা যেন কোনো এক গভীর গুহা থেকে ভেসে এল।
রাহুল একটু লাজুক হয়ে, ঘাড়টা সামান্য একপাশে হেলিয়ে বলল, "কিন্তু তুমি তো আমাকে এর আগেও কত হাজারবার দেখেছ..."
"কিন্তু গত তিন মাস তো দেখিনি রে সোনা..." ইন্দিরার কণ্ঠস্বর এবার কেঁপে উঠল।
"ওয়েল, তুমি তো আমাকে কালকেই দেখলে, তাই না?"
"হ্যাঁ, দেখেছি," ইন্দিরা মাথা নাড়লেন। তাঁর চোখদুটো ছলছল করে উঠল। "কিন্তু আমি আমার ছেলেটার ওই মুখটা মনে রাখতে চাই না। কাল রাতের ওই আহত, ভেঙে-পড়া, বিষণ্ণ মুখটা আমি মনে রাখতে চাই না। আমি এই মুখটা দেখতে চাই... আমার ছেলেটার এই হাসিখুশি, সুন্দর, মিষ্টি, আর... আর এত হ্যান্ডসাম মুখটা..."
কথাগুলো বলতে বলতেই ইন্দিরার হাতদুটো রাহুলের কাঁধ থেকে পিছলে উঠে এল ওর গালে। তাঁর ফর্সা, নরম আঙুলগুলো রাহুলের চোয়াল আর গালের ওপর এক পরম মমতায় বুলিয়ে যেতে লাগল।
রাহুল মায়ের এই জাদুকরী স্পর্শে চোখ বুজে ফেলল। "মা... চেন্নাই থেকে বেরোনোর পর থেকে আমি শুধু এই মুহূর্তটার জন্যই ছটফট করছিলাম... কবে বাড়ি ফিরব, আর কবে তোমার সাথে একটু সময় কাটাব... জাস্ট তুমি আর আমি..."
"আমিও রে সোনা..." ইন্দিরার গলার স্বর এবার ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। তাঁর গাল বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। "তোর কোনো আইডিয়া নেই আমি তোকে কতটা মিস করেছি... কতটা..."
"ওহ্ মা..."
রাহুল আর একটা শব্দও খরচ করল না। ও দুই হাত বাড়িয়ে ইন্দিরাকে নিজের বুকের সাথে এক প্রবল, বন্য, এবং রুদ্ধশ্বাস আলিঙ্গনে টেনে নিল। ইন্দিরাও নিজের দুই হাত দিয়ে রাহুলের পিঠটাকে এমনভাবে পেঁচিয়ে ধরলেন, যেন ওকে নিজের শরীরের সাথে মিশিয়ে দেবেন। নব্বই দিনের জমে থাকা সমস্ত বিরহ, সমস্ত শূন্যতা, আর সমস্ত অবদমিত তৃষ্ণা যেন এই একটা আলিঙ্গনের তীব্রতায় ফেটে পড়ল।
ঘরের ওই আধো-অন্ধকার নিস্তব্ধতায় শুধু শোনা যেতে লাগল দুটো মানুষের ভারী, দ্রুত শ্বাসের শব্দ। রাহুলের খালি, উষ্ণ বুকের সাথে ইন্দিরার নরম শরীরটা একেবারে পিষ্ট হয়ে যাচ্ছিল।
"উমম... মা..." রাহুলের গলা থেকে এক অস্ফুট, ঘোরে-থাকা গোঙানি বেরিয়ে এল। ও মায়ের চুলের সুবাসে নাক ডুবিয়ে গভীর শ্বাস নিতে লাগল।
ইন্দিরা ওর ঘাড়ের কাছে মুখ গুঁজে ফিসফিস করতে লাগলেন, "আমার বাবুটা... আমার সোনা... আমার মনা..."
রাহুল মাকে নিজের বুকের সাথে আরও একটু শক্ত করে পিষে ধরে, ভারী নিঃশ্বাসের মাঝে ফিসফিস করে বলল, "তুমি জানো না মা... শেষ দু'সপ্তাহে হস্টেলে রোজ রাতে আমি চাদরের তলায় লুকিয়ে শুধু তোমার ওই ছবিটা দেখতাম... আর ভাবতাম..."
ইন্দিরার হাত দুটো রাহুলের পিঠে আরও নিবিড়ভাবে চেপে বসল। তাঁর উষ্ণ নিঃশ্বাস রাহুলের ঘাড়ে আছড়ে পড়ছে। "কী ভাবতিস, সোনা? মায়ের কথা বড্ড মনে পড়ত?"
"মনে পড়ত মানে? আমার তো মনে হতো ঠিক যেন কোনো দেবী... আমার নিজের স্বর্গের দেবী আমার দিকে তাকিয়ে আছে... আমার জাস্ট পাগল পাগল লাগত মা..."
ছেলের এই আকুল, পূজারির মতো কথায় ইন্দিরার বুকের ভেতরটা এক অসীম, আদিম আদরে উথলে উঠল। তিনি রাহুলকে এক রুদ্ধশ্বাস বাহুপাশে নিজের সাথে আরও নিবিড়ভাবে লেপ্টে নিলেন। তাঁর ঠোঁটদুটো রাহুলের ঘাড়ের ত্বকে এলোমেলোভাবে ঘষা খাচ্ছিল। "ওহ্, আমার সোনা ছেলেটা... আমার পাগল বাবু... উমম... মা-ও তোকে ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারেনি রে... আহ্..."
তাদের এই অবিচ্ছেদ্য, দমবন্ধ করা আলিঙ্গনে কেবলই শোনা যেতে লাগল দুটো মানুষের ভারী, তৃষ্ণার্ত শ্বাস, আর ত্বকের সাথে ত্বক পিষ্ট হওয়ার একটা স্যাঁতস্যাঁতে, নেশাতুর শব্দ। বেশ কিছুক্ষণ এই রুদ্ধশ্বাস, ঘাম-ভেজা আলিঙ্গনে আবদ্ধ থাকার পর, যখন রাহুলের বুকের সাথে ইন্দিরার নরম শরীরটা একেবারে খাপে খাপে মিশে গেছে, ঠিক তখনই তিনি অত্যন্ত নিচু, কাঁপানো, এবং এক নেশাগ্রস্ত ফিসফিসানিতে বলে উঠলেন:
"সোনা... ব্লাউজের হুকগুলো একটু খুলে দিবি?"
রাহুলের শরীরের ভেতর দিয়ে যেন হাজার ভোল্টের একটা কারেন্ট বয়ে গেল। ও উত্তেজনার চোটে এক সেকেন্ডের জন্য একদম জমে বরফ হয়ে গেল। তারপর, মাকে ওই আলিঙ্গনের মধ্যেই ধরে রেখে, ওর কাঁপতে থাকা আঙুলগুলো খুব সাবধানে, অত্যন্ত ধীর ছন্দে ইন্দিরার পিঠের ওপর নেমে গেল। একটা একটা করে ব্লাউজের হুক খুলতে শুরু করল ও। প্রতিটি 'ক্লিক' শব্দ যেন এই ভোরের নিস্তব্ধতায় এক একটা নতুন, নিষিদ্ধ জগতের দরজা খুলে দিচ্ছিল।
হুকগুলো খোলা হয়ে গেলে, রাহুল আলিঙ্গনটা সামান্য আলগা করে ইন্দিরাকে একটু সোজা হতে সাহায্য করল। তারপর খুব সন্তর্পণে, পরম শ্রদ্ধায় তাঁর কাঁধ থেকে ব্লাউজটা নামিয়ে দিল।
ইন্দিরার শরীরের ওপরের অংশে আজ কোনো ব্রা নেই।
রাহুলের চোখদুটো বিস্ময়ে, মুগ্ধতায় আর এক পূজারির দৃষ্টিতে স্থির হয়ে গেল। তিনটে মাস পর ও আবার ওর মায়ের এই ঐশ্বরিক রূপ দেখছে। ভোরের সেই ম্লান, নীলচে আলোয় ইন্দিরার সেই ফর্সা, পরিপুষ্ট এবং সুডৌল স্তনযুগল যেন শ্বেতপাথরে খোদাই করা কোনো প্রাচীন, নিখুঁত ভাস্কর্যের মতো উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। মাতৃত্বের এক চরম পবিত্রতা এবং নারীত্বের এক নিবিড় পূর্ণতার মিশেল যেন ওই অবয়বে থমকে আছে। তাঁর স্তনের সেই মসৃণ, পেলব ঢাল আর তার কেন্দ্রে ফুটে থাকা ওই গাঢ় বাদামি, সংবেদনশীল বৃন্ত দুটি রাহুলের মগজকে সম্পূর্ণ অবশ করে দিল।
রাহুলের হাতটা অবচেতনভাবেই একটু সামনের দিকে এগিয়ে গেল ওই ঐশ্বরিক সৌন্দর্যকে স্পর্শ করার জন্য, কিন্তু পরক্ষণেই এক অদ্ভুত, আড়ষ্ট দ্বিধায় হাতটা মাঝপথেই থমকে গেল।
ইন্দিরা ওর এই দ্বিধাটা বুঝতে পারলেন। তাঁর মুখে এক প্রশ্রয়ের, উষ্ণ হাসি ফুটে উঠল। তিনি অত্যন্ত নরম, গাঢ় স্বরে ফিসফিস করলেন:
"ভয় পাস না সোনা... ছুঁয়ে দেখ... কয়েক মাস আগেই তো তুই এখান থেকেই খেয়েছিলি, মনে নেই? মায়ের কাছে এখন আবার কিসের এত লজ্জা রে বাবু?"
অনুমতি পেয়ে রাহুলের হাতদুটো আর স্থির থাকতে পারল না। ওর আঙুলগুলো গিয়ে অত্যন্ত আলতো করে, যেন কোনো ভঙ্গুর কাঁচের জিনিস ধরছে, ইন্দিরার ওই ফর্সা, নরম স্তনযুগলকে স্পর্শ করল। ত্বকের ওই উষ্ণ, তুলতুলে স্পর্শ রাহুলের আঙুলের ডগা দিয়ে ওর শিরায় শিরায় এক বন্য মাদকতা ছড়িয়ে দিল। ও খুব ধীরে ধীরে, এক ছন্দোবদ্ধ মমতায় স্তনদুটিকে নিজের হাতের তালুতে তুলে নিয়ে আদর করতে শুরু করল।
"আআহ্..." ইন্দিরার গলা চিরে একটা দীর্ঘ, স্বস্তির নিশ্বাস বেরিয়ে এল। তাঁর চোখদুটো আপনা থেকেই বুজে গেল। "হ্যাঁ... সোনা... ঠিক ওভাবেই... উমম..."
রাহুল এক ঘোরের মধ্যে বিড়বিড় করতে লাগল, "মা... তুমি এত সুন্দর... এত নরম... আমার জাস্ট পাগল পাগল লাগছে মা..." ওর আঙুলগুলো এবার স্তনবৃন্তগুলোকে আলতো করে ছুঁতে শুরু করল, আর সেই স্পর্শে সেগুলো ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে উঠতে লাগল।
"উফ্... আমার সোনা বাবুটা..." ইন্দিরার মাথাটা পেছনের দিকে সামান্য হেলে গেল, তাঁর আঙুলগুলো রাহুলের বিছানার চাদরটাকে শক্ত করে খামচে ধরল। "তোর এই হাতের ছোঁয়াটা... আমি বড্ড মিস করছিলাম রে... আহ্... কর সোনা... আদর কর মাকে..."
রাহুল এবার দুই হাত দিয়ে মাতৃবক্ষের সেই স্নিগ্ধ, ভারী পেলবতাকে আরও গভীরভাবে আপন করে নিল। ওর হাতের তালুর উষ্ণ, অবাধ্য সঞ্চালন ইন্দিরার স্নায়ুগুলোকে এক মাদকতাময় আবেশে আচ্ছন্ন করে দিচ্ছিল। স্তনবৃন্তগুলো রাহুলের আঙুলের ঈষৎ রুক্ষ, অথচ পরম যত্নশীল ঘর্ষণে আরও কঠিন ও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। ইন্দিরার গলা চিরে বেরিয়ে আসতে লাগল রুদ্ধশ্বাস, এলোমেলো গোঙানি— "আআহ্... উমম... সোনা... একটু জোরে... উফ্... হ্যাঁ... ঠিক ওভাবেই... আহ্হ্হ্..."
ছেলের হাতের এই বন্য, অথচ মায়াবী নিপীড়ন ইন্দিরার শরীর থেকে সমস্ত ভারসাম্য কেড়ে নিচ্ছিল। তাঁর হাঁটু দুটো কাঁপতে শুরু করল, আর পেশিগুলো এই অদম্য অনুভূতির তোড়ে শিথিল হয়ে এল। তিনি আর সোজা হয়ে বসে থাকতে পারলেন না। এক আচ্ছন্ন আবেশে তিনি বিছানার ওপর চিত হয়ে লুটিয়ে পড়লেন, আর রাহুলও ওর শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে সোজা গিয়ে পড়ল ইন্দিরার শরীরের ওপর।
ইন্দিরা সাথে সাথে নিজের দুই হাত দিয়ে রাহুলকে নিজের ওপর শক্ত করে চেপে ধরলেন।
[Image: CbA3fat.png]
রাহুল মায়ের মুখের খুব কাছে নিজের মুখটা নিয়ে গিয়ে, অত্যন্ত আর্দ্র, নেশাতুর গলায় ফিসফিস করে বলল, "মা... খুব চুমু খেতে ইচ্ছে করছে..." ও ওর ঠোঁটদুটো ইন্দিরার ঠোঁটের দিকে নামিয়ে আনতে গেল।
Reply


Messages In This Thread
The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-01-2026, 01:31 PM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 05:46 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 05:47 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 05:48 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 05:54 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 05:55 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 05:57 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 05:58 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 05:59 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 08:43 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 08:49 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 08:51 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 08:54 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 08:55 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 08:56 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 08:57 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 08:58 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 08:59 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 09:00 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 09:01 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 09:04 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 09:05 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 09:06 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-05-2026, 06:02 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-05-2026, 06:02 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-05-2026, 06:04 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-05-2026, 06:04 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-05-2026, 08:55 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-05-2026, 08:55 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-05-2026, 08:57 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-05-2026, 08:59 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-05-2026, 08:59 AM

Forum Jump:


Users browsing this thread: 1 Guest(s)