09-05-2026, 08:59 AM
"হ্যাঁ রে... আসলে... জামাকাপড় পরে কি আর ভালো করে আদর হয়?"
ইন্দিরার কপাল থেকে ঘাম চুইয়ে পড়তে লাগল। তাঁর শরীরটা এবার প্রবলভাবে কাঁপতে শুরু করেছে। তিনি ডানদিক থেকে বাঁ-দিকে পাশ ফিরলেন। সাইড বালিশটাকে দুই হাত দিয়ে সজোরে বুকের সাথে চেপে ধরলেন।
দুঃস্বপ্নটা এবার তার দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশ করল। ফ্রেমগুলো আরও অস্পষ্ট, আরও অন্ধকার, কিন্তু শব্দগুলো অনেক বেশি তীক্ষ্ণ, অনেক বেশি বন্য।
মেঝে... মেঝের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে কাপড়...
সাদা টি-শার্ট... নীল জিনস... মেটালিক ব্লাউজ... খয়েরি শাড়ি...
সব মেঝের ওপর লুটিয়ে আছে!
বিছানাটা... বিছানাটা কাঁপছে... একটা একটানা, ছন্দোবদ্ধ 'ক্যাঁচ... ক্যাঁচ' শব্দ...
দুটো শরীর... না, দুটো অনাবৃত, নগ্ন শরীর...
দুটো শরীরের মাঝে এক সুতোরও ব্যবধান নেই... তারা একে অপরের সাথে একাকার হয়ে গেছে... একটা বন্য, আদিম ছন্দে...
![[Image: CbA2yua.png]](https://iili.io/CbA2yua.png)
শব্দ... কিছু ভিজে, স্যাঁতসেঁতে, অস্পষ্ট শব্দ...
"আআহ্... আন্টি... ওহ্ আন্টি..." রাহুলের গলা! রাহুলের রুদ্ধশ্বাস, তৃপ্তির গোঙানি!
ইন্দিরা ঘুমের মধ্যেই মাথাটা এপাশ-ওপাশ করতে লাগলেন। তাঁর চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। "না... না..." তিনি অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করছেন।
"আআহ্... হ্যাঁ রাহুল... আরও... আরও জোরে..." দেবলীনার সেই জঘন্য, নোংরা গলাটা এবার এক চরম তৃপ্তির গোঙানিতে ফেটে পড়ছে। "আমি তোকে আগেই বলেছিলাম আমার বাড়িতে আসতে... আমি তোকে কত কিছু দিতে পারি রাহুল... কত কিছু..."
"হ্যাঁ আন্টি... তুমি... তুমি সত্যিই বেস্ট..."
রাহুলের গলার ওই স্বরটা, ওই নেশাগ্রস্ত আর্তিটা তো শুধু ইন্দিরার জন্য ছিল! শুধু তাঁর জন্য!
"না... আমাকে আর আন্টি বলিস না রাহুল..." দেবলীনার গলাটা এবার এক চূড়ান্ত, পৈশাচিক অধিকারবোধে মেতে উঠল। "...একবার... জাস্ট একবার... আমাকে একটু 'মা' বলে ডাক..."
"ওহ্... আহ্... হ্যাঁ... ওহ্... 'মা'..."
"নাআআআআআআআআ!!!"
ইন্দিরা এক তীব্র, গগনভেদী চিৎকারে বিছানার ওপর আছড়ে উঠে বসলেন।
তাঁর পুরো শরীরটা যেন একটা জেনারেটরের মতো থরথর করে কাঁপছে। বুকের ভেতরটা হাতুড়ির মতো আছড়ে পড়ছে পাঁজরে। তাঁর কপাল, ঘাড়, গলা—সবকিছু ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। তিনি পাগলের মতো হাঁপাচ্ছেন, চোখের তারা দুটো অন্ধকারের মধ্যে স্থির, বিস্ফারিত।
তাঁর এই হঠাৎ আর্তনাদে পাশে শুয়ে থাকা সুব্রতর ঘুম এক লহমায় ছুটে গেল।
"কী হলো ইন্দিরা? কী হয়েছে? হোয়াটস্ রং?" সুব্রত অত্যন্ত উদ্বিগ্ন গলায় চেঁচিয়ে উঠে ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসলেন।
তিনি দ্রুত হাত বাড়িয়ে বেডসাইড ল্যাম্পের সুইচটা অন করে দিলেন। ঘরের ওই নরম আলোয় ইন্দিরার বিধ্বস্ত, ঘর্মাক্ত মুখটা দেখে সুব্রত নিজেও ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি জগ থেকে গ্লাসে জল ঢেলে দ্রুত ইন্দিরার ঠোঁটের কাছে ধরলেন।
"জলটা খাও। একটু জল খেয়ে নাও আগে।"
ইন্দিরা কাঁপাকাঁপা হাতে গ্লাসটা ধরে ঢকঢক করে কয়েক ঢোঁক জল গিলে নিলেন। গলার ওই শুষ্ক, কাঠ হয়ে থাকা ভাবটা একটু কমল। তিনি একটা দীর্ঘ, কাঁপানো শ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলেন।
"ইট ওয়াজ আ ব্যাড ড্রিম, সুব্রত... একটা বড্ড খারাপ স্বপ্ন দেখলাম..." ইন্দিরার গলার স্বরটা এখনও কাঁপছে।
"খারাপ? এটাকে শুধু খারাপ বলে না ইন্দিরা! দিস মাস্ট হ্যাভ বিন আ টেরিবল নাইটমেয়ার!" সুব্রত গ্লাসটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখে, অত্যন্ত চিন্তিত মুখে বললেন। "আমি তোমাকে জীবনে কোনোদিন এভাবে কাঁপতে দেখিনি। কী এমন স্বপ্ন দেখছিলে তুমি?"
ইন্দিরা ঢোক গিললেন। তাঁর মগজটা এখনও ওই নোংরা, বীভৎস দৃশ্যগুলোর ঘোর থেকে পুরোপুরি বেরোতে পারেনি। তিনি অত্যন্ত সতর্কভাবে, শব্দের জাল বুনে কথাটা বললেন:
"আসলে... ওটা রাহুলকে নিয়ে ছিল... খুব খারাপ কিছু একটা... ওর সাথে ঘটছিল... মানে, কেউ একজন... কেউ একজন ওর খুব বড় কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা করছিল..."
সুব্রত এই কথাটা শুনে একটা গভীর শ্বাস ফেললেন। তিনি তাঁর স্বভাববিরুদ্ধভাবে, অত্যন্ত নরম এবং সহানুভূতির সাথে নিজের একটা হাত ইন্দিরার ঘর্মাক্ত কাঁধের ওপর রাখলেন।
"ওহ্ ইন্দিরা... তুমি ছেলেটাকে নিয়ে বড্ড বেশি ওভারথিঙ্ক করো, জানো? সারাক্ষণ শুধু ওর পড়াশোনা, ওর কেরিয়ার, ওর ফিউচার নিয়ে টেনশন করো তুমি। আর জানোই তো, সাইকোলজি কী বলে? অতিরিক্ত চিন্তা থেকেই মনের ভেতরে নেগেটিভ থটস্ জন্ম নেয়। আর সেই নেগেটিভ চিন্তাগুলোই অবচেতন মনে এই ধরনের নাইটমেয়ার হয়ে ফিরে আসে।"
সুব্রত একটু থেমে, অত্যন্ত ভরসার সুরে বললেন, "তুমি এত চিন্তা কোরো না, ইন্দিরা। রাহুল একদম ঠিক আছে। কেউ ওর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। তুমি আছ তো, তাই না? যতদিন তুমি ওর পাশে আছ, ওকে গাইড করার জন্য, ওকে প্রটেক্ট করার জন্য... পৃথিবীর কার সাধ্য আছে ওর গায়ে একটা আঁচড় কাটে?"
সুব্রতর এই অত্যন্ত সাধারণ, স্বামীসুলভ ভরসার কথাগুলো ইন্দিরার কানের ভেতর দিয়ে গিয়ে তাঁর বিবেকে এক অদ্ভুত, তীক্ষ্ণ খোঁচা মারল। তিনি সুব্রতর দিকে তাকিয়ে, একটা শূন্য, ফাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন:
"তোমার... তোমার সত্যিই তাই মনে হয়?"
"অফকোর্স, আমি সিওর।" সুব্রত অত্যন্ত কনফিডেন্ট গলায় বললেন। "এবার এসব ফালতু চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো। রাত আড়াইটে বাজে। শুয়ে পড়ো এবার, কাল আবার সকালে উঠতে হবে।"
সুব্রত ল্যাম্পের সুইচটা অফ করে দিলেন। ঘরটা আবার সেই নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ডুবে গেল। তিনি পাশ ফিরে শুয়ে, নিজের গায়ের ওপর চাদরটা টেনে নিয়ে আবার ঘুমের প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন।
ইন্দিরাও নিজের বালিশের ওপর মাথা রেখে শুয়ে পড়লেন। কিন্তু তাঁর চোখের পাতা অত সহজে এক হলো না।
অন্ধকার ছাদের দিকে তাকিয়ে তাঁর মগজটা এবার এক গভীর, অতলস্পর্শী বিশ্লেষণে ডুব দিল।
কেন? কেন তিনি এমন একটা জঘন্য, বিকৃত স্বপ্ন দেখলেন? তাঁর মতো একজন যুক্তিবাদী, মার্জিত এবং উচ্চশিক্ষিতা নারী তাঁর পুরো জীবনেও তো কোনোদিন এমন নিচ, এমন নোংরা স্তরের স্বপ্ন দেখেননি। সুব্রত যে বলল তিনি রাহুলকে নিয়ে ওভারথিঙ্ক করেন... না, সুব্রত কিছুই জানে না। এটা কোনো সাধারণ মায়ের ওভারথিঙ্কিং নয়। এটা তার চেয়েও অনেক, অনেক বেশি কিছু।
এটা এক চরম, আদিম ঈর্ষা। একটা বন্য, সর্বগ্রাসী পজেসিভনেস।
কিন্তু কেন? তিনি কার প্রতি ঈর্ষাকাতর? দেবলীনার প্রতি? কিন্তু দেবলীনা এমন কী করেছে? হ্যাঁ, মহিলা হয়তো একটু বেশি গায়ে-পড়া, একটু বেশি লাউড, কিন্তু তাই বলে তিনি তো আর কোনো অপরাধ করেননি। তিনি তো শুধু রাহুলের চেহারার প্রশংসা করেছিলেন, ওর হাত ধরেছিলেন, আর ওকে নিজের বাড়িতে ইনভাইট করেছিলেন। একজন সাধারণ মায়ের তো এতে খুশি হওয়ার কথা যে অন্য একজন মানুষ তার ছেলেকে এতটা আপন করে নিচ্ছে।
কিন্তু ইন্দিরা খুশি হননি। তিনি খুশি হওয়ার বদলে, ওই সামান্য একটা ইনভিটেশনকে নিজের অবচেতন মনে এমন একটা বিকৃত, অসম্ভব আর বীভৎস রূপ দিয়েছেন যে, তিনি স্বপ্নে দেখেছেন ওই মহিলা তাঁর ছেলেকে...
ইন্দিরা অন্ধকারের মধ্যেই নিজের দুটো হাত দিয়ে নিজের মুখটা শক্ত করে ঢেকে ফেললেন। তাঁর নিজের ওপরই নিজের তীব্র ঘৃণা আর লজ্জা হতে লাগল। তিনি কী করে ভাবতে পারলেন যে দেবলীনা ওরকম কিছু করতে পারে? তাঁর অবচেতন মন এতটা নোংরা, এতটা কলুষিত হয়ে গেছে? তাঁর নিজেরই এখন ডুকরে কেঁদে উঠতে ইচ্ছে করছিল।
তিনি কেন এমনটা ভাবলেন?
তাঁর শিরদাঁড়া দিয়ে হঠাৎ এক হিমশীতল, বরফের মতো ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল।
কারণটা দেবলীনা নয়। দেবলীনার সাথে এর কোনো সম্পর্কই নেই। দেবলীনা তো শুধু তাঁর নিজের অবচেতন মনের একটা ক্যানভাস মাত্র, একটা প্রজেকশন।
আসল কারণটা হলো ইন্দিরা নিজে। তাঁর নিজের ভেতরের অনুভূতি।
গত বেশ কিছুদিন ধরে রাহুলকে নিজের মতো করে কাছে না পাওয়ার ওই যে দমবন্ধ করা ফ্রাস্ট্রেশন, বুকের ভেতরের ওই যে খামচে ধরা শূন্যতা আর হাহাকার—সেগুলোই তো তাঁকে তিলে তিলে পাগল করে দিচ্ছে। তিনি যে তাঁর ছেলেটাকে একটু শান্তিতে ছুঁতে পারছেন না, একটু আদর করতে পারছেন না... সেই না-পাওয়ার আগুনটাই তো আজ এই জঘন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে ফেটে পড়েছে।
ওই স্বপ্নটা... ওই স্বপ্নটা দেবলীনার কোনো বিকৃত কামনার প্রতিফলন ছিল না।
ওটা ছিল ইন্দিরার নিজেরই এক গোপন, অবদমিত কামনার প্রতিফলন। ওটা ছিল তিনি নিজে কী চান, তারই এক উলঙ্গ, বীভৎস প্রকাশ।
তিনি ঠিক কী চান?
তিনি কি তাঁর ছেলেটাকে নিজের কাছে পেতে চান?... হ্যাঁ, সে তো বটেই, প্রচণ্ডভাবে চান।
তাঁর পাশে, একদম গা ঘেঁষে রাখতে চান?... হ্যাঁ, সেটাও তো চান, বিন্দুমাত্র দ্বিধা ছাড়া।
তাঁর গায়ের ওপর লেপ্টে শুয়ে থাকা অবস্থায় চান?... হুমম... হ্যাঁ, সেটাও... কিন্তু আরও...
স্কিন-টু-স্কিন হয়ে জড়িয়ে ধরে আদর করতে চান?... হুমম... কিন্তু... আরও...
মুখে মুখ লাগিয়ে চুমু খেতে চান?... হুমম... কিন্তু... আরও... আরও কিছু...
নিজের বুকে মুখ দিয়ে ছেলেকে খাওয়াতে চান?... হুমম... কিন্তু... আরও...
আরও...
আরও...
আরও...
স্বপ্নের সেই শেষ দৃশ্যটা—মেঝের ওপর লুটিয়ে থাকা কাপড়, বিছানার সেই বন্য, ছন্দোবদ্ধ কম্পন, আর সেই রুদ্ধশ্বাস, স্যাঁতসেঁতে গোঙানি—সবকিছু ক্ষণিকের জন্য ইন্দিরার চোখের সামনে আবার একটা জ্বলন্ত ফ্ল্যাশের মতো ফুটে উঠল।
তাঁর শ্বাসটা বুকের ভেতর জট পাকিয়ে গেল। হৃৎপিণ্ডের গতিটা হঠাৎ করেই স্তব্ধ হয়ে গেল বলে মনে হলো।
তবে কি...
তিনি... তাঁর নিজের ছেলেকে...
তাঁর ভিতরে চান?
