Today, 08:46 AM
গর্ভাধান (২)
গোটা কলেজ জানে আমি আর সালমা অন্তরঙ্গ বন্ধু। কিন্তু আমাদের দুজনের মধ্যে যে একটা অদৃশ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে তা কেউ জানে না। এই অদৃশ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রে আছে আরিফ। সালমা আরিফকে চায় এবং আরিফও সালমার প্রতি কিছুটা দুর্বল তা আমি জানি। কিন্তু আমি যে আরিফের প্রতি দুর্বল এটা শুধু সালমা জানে। কীভাবে জানে আমি জানি না তবে ওর হাবেভাবে বুঝতে পারি ও জানে। তবে আমার মনের ইচ্ছা আমি মনেই রেখেছি। কাউকে কিছু বলিনি, আরিফকেও না।
এই বছর ফেস্টে ডোলা রে ডোলা গানের সঙ্গে আমি আর সালমা একসঙ্গে নেচেছিলাম। গানটি দেবদাস সিনেমার একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হিন্দি গান। সিনেমায় ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন এবং মাধুরী দীক্ষিতের অসাধারণ নাচ সবাইকে মুগ্ধ করেছিল। আমাদের দুজনের নাচ হয়তো ওদের মতো হয়নি কিন্তু ওই নাচের পর গোটা কলেজে আমরা বিখ্যাত হয়ে গেছিলাম। আমরা দুজনে নাচবার সময় যে নিজেদের উজাড় করে দিয়েছিলাম তার নেপথ্যে দেবদাসের ভূমিকা পালন করেছিল আরিফ।
অনুষ্ঠান শেষে প্রিন্সিপাল কলেজের গাড়িতে বাড়ি পৌঁছে দেবার কথা বলেছিলেন। কলেজের গাড়ি অসীম স্যারকে ছাড়তে গেছে। তাকে ছেড়ে গাড়ি ফিরে এলেই আমাকে পৌঁছে দেবে। কিন্তু অসীম স্যার বেহালায় থাকেন। তাঁকে ছেড়ে আসতে অনেক দেরি হবে। প্রিন্সিপাল স্যারকে বললাম স্যার আমি তো নাগের বাজার যাব। বাসে করে চলে যাব। উনি সম্মতি দিলেন।
বাসের জন্য অপেক্ষা করছি। ঘণ মেঘের কারণে আকাশে কোনো তারা নেই। ভাবছি কলেজের গাড়ির জন্য অপেক্ষা করলেই ভালো হত। ঠিক তখনই বাইকে করে আরিফ এসে দাঁড়াল, “সুহানি, বাড়ি যাবে তো, এস আমি পৌঁছে দিচ্ছি।”
ভাবা যায়! আমার সামনে আমার ক্রাশ! চোখে মুগ্ধ দৃষ্টি। পক্ষীরাজ ঘোড়ার পিঠে চড়ে এসেছে আমাকে নিয়ে যাবে বলে। আমার বুকের ভিতর কী হচ্ছে বলে বোঝাতে পারব না। আরিফ কি কিছু বুঝতে পারছে?
কোনো কথা না বলে বাইকের পেছনে উঠে বসলাম। হাওয়ায় আরিফের চুল উড়ছে। নাকে আসছে ডিওডোরেন্টের সঙ্গে আরিফের শরীরের পুরুষালি গন্ধ। একটা ছোট্ট ঝাঁকুনিতে আমার বুক তার পিঠে লেগে গেল। আমি ইচ্ছে করে এরকম করিনি। অজান্তেই ঘটেছিল ব্যাপারটা। কিন্তু এর পর আমি আরও ঝাঁকুনির জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। মসৃণ রাস্তায় ঝাঁকুনির কোনো জায়গা নেই। আরিফের স্পর্শে আমার শরীরের ভিতরে ঝর্ণা ধারার মতো কিছু ঝরে পড়ছিল। আর তখনই শুরু হল অঝোরে বৃষ্টি। আমি কীকরে যে এত নির্লজ্জ হয়ে উঠলাম জানি না। ইচ্ছে করে ওর পিঠে বুক ঠেকিয়ে দুই হাতে ওকে আঁকড়ে ধরলাম। ন্যাকামি করে বললাম,"একটু আস্তে চালা প্লিজ।"
আরিফ এমন কিছু জোরে চালাচ্ছিল না। তবুও আমার কথায় গতি কমাল। আমি কিন্তু তখনও ওকে আঁকড়েই রইলাম।
চিড়িয়ামোড় থেকে নাগের বাজার বাইকে পাঁচ মিনিটের পথ। জ্যাম থাকলে কতক্ষণ লাগবে কেউ জানে না। এই রাস্তায় সারাদিন জ্যাম থাকে। তা বলে রাত এগারোটার সময় জ্যাম থাকার কথা নয়। কিন্তু এখন যেন আমার জন্যেই দমদম ব্রিজের নিচে তুমুল জ্যাম। মনে মনে চাইছিলাম এই জ্যাম যেন কখনো শেষ না হয়। পরম নির্ভরতায় আরিফের পিঠ আঁকড়ে ঘুমিয়ে পড়তে মন চাইছিল। ওর কাঁধে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে দিয়েছিলাম।
জ্যাম যতই জমাট হোক এক সময় শেষ হবেই। বাড়ি পৌঁছালাম।
বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে আরিফ বলল, “আজ তোমার নাচ খুব সুন্দর হয়েছে।"
আমি বললাম,"সালমাও কিন্তু দুর্দান্ত নেচেছে!"
আরিফ বলল,"সত্যিই দুর্দান্ত। কিন্তু কিন্তু তোমার চোখের মধ্যে যে পাখির নীড়ের মতো নিবিড়তা লুকিয়ে আছে তা ওর চোখে নেই।”
খুব সুন্দর কথা বলে তো ছেলেটা! আবার দুর্দান্ত ক্রিকেটও খেলে। একই সঙ্গে কবি ও ক্রিকেটার!
বাড়ি ঢুকেই দেখি রাহুল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। মুখে রাগ, “এত দেরি কেন?”
ও যেন আমার ছোট ভাই নয়, আমার অভিভাবক। ওর এই গার্জেনগিরি আমার পছন্দ নয়। ভাবলাম উত্তর দেব না। কিন্তু ওর চোখে দুশ্চিন্তা দেখতে পেলাম। সত্যি কথাই বললাম,"কলেজে ফেস্ট ছিল।"
রাহুল বলল,"মাকে জানিয়ে রাখা উচিত ছিল। সন্ধ্যা থেকে মা একবার ঘর আর একবার বারান্দা করছে! আবার ফোনটাও অফ করে রেখেছিস!"
নাচের আগে ফোনটা অফ করে ব্যাগে রেখেছিলাম। তারপর আর অন করা হয়নি। মিথ্যা বললাম,"চার্জ ফুরিয়ে নিজেই অফ হয়ে গেছিল।"
মা তোয়ালে আগিয়ে দিলেন “ইসস একদম ভিজে গেছিস। মুছে নে। চা করছি।"
রাতে হোয়াটসঅ্যাপে আরিফের মেসেজ এল: সুহানি, ঘুমিয়ে পড়েছ?
- না। তুমিও তো ঘুমোওনি।
- ঘুম আসছে না।
- কেন? ঘুম আসছে না কেন?
- মনে হচ্ছে এখনও তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরে রয়েছ, পিঠে তোমার নরম ছোঁয়া!
আমি ঘরে একা। তবুও লজ্জায় কান গরম হয়ে গেল। লজ্জায় মুখ ঢাকার একটা ইমোজি পাঠালাম ।
- লজ্জা পাও কেন সোনা?
আমি যদি সত্যি কথা বলি, তাহলে বলতে হয় আমি ইচ্ছে করে তোমার কাঁধে মাথা রেখেছিলাম আরিফ। তোমার পিঠে নিজের স্তন দুটো চেপে ধরে তোমার ঘাড়ে নাক ঘষে ঘষে তোমার গন্ধ নিচ্ছিলাম। কিন্তু সে কথা বলতে এত লজ্জা লাগছে যে বলা সম্ভব নয়। খুউব লজ্জা পেয়েছি বোঝাতে আমি এবার পাঁচটি লজ্জায় মুখ ঢাকা ইমোজি পাঠালাম।
- ও আমার লজ্জাবতী লতা এবার ঘুমিয়ে পড়। শুভরাত্রি।
আমার ইচ্ছা করছে আরো একটু কথা বলতে। আরো একটু দুষ্টুমি করতে। কিন্তু ওর বোধহয় ঘুম পাচ্ছে। তাই লিখলাম - শুভরাত্রি।
সেই থেকে টেক্সটিং শুরু। হোয়াটসঅ্যাপে আরিফ লিখল, “সুহানি, আমার মন ভালো নেই। তোমার হাসি মুখের সেলফি পাঠাও এক্ষুনি।"
পাগল ছেলে একটা। কখন মন খারাপ হয় কখন ভালো হয় ভগবানও জানেন না। দেরি না করে আমি সেলফি পাঠাই।
আরিফ দশটা স্পন্দিত হৃদয়ের ইমোজি পাঠায়, সঙ্গে লেখে,"তুমি অলৌকিক রকমের সুন্দর সুহানি। তোমার হাসি দেখলে, আমার মনে হয় যেন পৃথিবীটা হেসে উঠল। মন ভালো হয়ে গেল আমার!"
"অলৌকিক রকমের সুন্দর" কথাটা আমার চমৎকার মনে হয়। সত্যিই দুর্ধর্ষ বোলার ছেলেটির মনে একটা কবি লুকিয়ে আছে। আমি ঠোঁটে চুমুর ভঙ্গিতে একটি সেলফি পাঠাই।
আরিফ লেখে,"উফফ্! তুমি কি আমাকে মেরে ফেলতে চাও ডার্লিং?"
আমি একটা হাসির ইমোজি পাঠাই সঙ্গে লিখি,"নতুন স্টাইলে সুন্দর বলার পুরস্কার হিসেবে সেলফিটা পাঠিয়েছি।
আরিফ লেখে,"আমি তোমাকে শুধু সুন্দর বলতে চাই না, আমি তোমাকে বুঝতে চাই সুহানি।”
কয়েক মাস পর এক ছুটির দিন। সকালটা বেশ নিরীহভাবেই শুরু হয়েছিল। মা রান্নাঘরে, আমি বারান্দায় চা হাতে ফেসবুক স্ক্রল করছি। হঠাৎই ফেসবুকের নোটিফিকেশন। আরিফ একটা কবিতা পোষ্ট করে আমাকে মেনশন করেছে:
"সুহানি তুমি হাঁটলে কলেজের পথ
নিজেই হয়ে যায় কবিতা।
তোমার হাসিতে ভেঙে যায়
অপরিচয়ের দেয়াল,
শব্দরা লজ্জা পেয়ে হয়ে ওঠে নিঃশব্দ।"
পোস্টটা পড়ে আমার হৃদস্পন্দন দ্রুত হল। আরিফ কবিতা লেখে, সেটা জানতাম। লাইক-কমেন্ট বাড়ছে। কেউ হার্ট, কেউ ফায়ার ইমোজি।
ঠিক তখনই পেছন থেকে রাহুলের গলা-
“এটা কী?”
চমকে ঘুরে তাকাই। রাহুল। ফোনটা আমার হাত থেকে টেনে নেয়। চোখ বুলিয়েই মুখ শক্ত।
“এটা তুই এনকারেজ করছিস?”
আমি বিরক্ত হলাম। “এটা আমার ফেসবুক। কেউ কবিতা লিখেছে—তাতে তোর কী?”
রাহুল ফোনটা টেবিলে ঠাস করে রাখল।
“এইসবের মানে আমি বুঝি না! আমি কি বাচ্চা?"
“কী বুঝিস তুই?” আমার গলাও চড়ে গেল। “আমি কলেজে পড়ি। কেউ আমাকে ভালো লাগে বলেছে, সেটা কি অপরাধ?”
"না সেটা অপরাধ নয়। কিন্তু এই ছেলেটি .। আমরা ', তা কি ভুলে গেছিস?"
আমি হাসব না কাঁদব বুঝতে পারলাম না,"একটা কথা জেনে রাখ রাহুল, আমি ধর্ম নিয়ে মাথা ঘামাই না, আরিফও ধর্ম নিয়ে মাথা ঘামায় না।"
রাহুলের চোখে রাগের চেয়েও বেশি ঘৃণা দেখলাম,"* মেয়েদের এইভাবেই ওরা ফাঁদে ফেলে।"
কথাটা শুনে আমার রাগটা যেন আরও বেড়ে গেল। “আমার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আমি তোর সঙ্গে আর কথা বলতে চাই না।
এরপর থেকে আরিফের সঙ্গে মেলামেশার ক্ষেত্রে আমি সতর্ক হয়ে গেলাম। ভাই বা কলেজের কেউ যেন আমাদের সম্পর্কের বিষয়ে আর কিছু না জানতে পারে।
দেখতে দেখতে সেকেন্ড ইয়ারের ফাইনাল পরীক্ষার সময় এসে গেল। আরিফ আমার দুই বছরের সিনিয়র। এটাই ওর কলেজের শেষ বছর। এই দুবছরে আরিফের সঙ্গে আমার সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। আরিফ খুব সভ্য ছেলে। মুভি দেখতে গিয়ে মাল্টিপ্লেক্সের অন্ধকারে চুমু খাওয়া, দুধ মুঠোয় নিয়ে টেপা ছাড়া ও আর কিছু করেনি। তাও কয়েকবার মাত্র। আমাদের বেশিরভাগ কথা হয় হোয়াটসঅ্যাপে। এই দীর্ঘ সময়ে আমাদের সম্পর্কের মাঝে কাঁটার মতো বিঁধে আছে সালমা। আরিফ কি ওর সঙ্গেও হোয়াটসঅ্যাপে চ্যাট করে? মাল্টিপ্লেক্সের অন্ধকারে ওকেও চুমু খায়? ওরও স্তন মুঠোয় নিয়ে মোচড় দেয়?
আজ আরিফের জন্মদিন। ছুটির পর কলেজের কমনরুমে কেক কাটা হল। বন্ধুরাই সব আয়োজন করেছে। কেক কাটার পর আরিফ প্রথমে একটা টুকরো আমার মুখে গুঁজে দিল। সালমা নীরবে দাঁড়িয়ে দেখল। আমি জানি এখন ওর ভিতরে কী হচ্ছে। ওর যা হচ্ছে আমার হচ্ছে তার বিপরীত। জয়ের আনন্দে আমি হাওয়ায় ভাসছি। ও ঈর্ষার আগুনে জ্বলছে।
এক টুকরো কেক আমি আরিফের মুখে গুঁজে দিলাম। আমার হাত ধরে আরিফ আমার আঙ্গুল থেকে ক্রিম চেটে খেল।
পুরো কমনরুম হাততালির শব্দে মুখরিত হয়ে উঠল। অদ্ভুত একটা অনুভূতি আমাকে ঘিরে ধরেছে। কে একজন শিস দিল। একজন বলল সুহানির ঠোঁটেও ক্রিম লেগে আছে তো!
আরিফ দুই হাতে আমার মুখ ধরে নিজের মুখটা আমার মুখের দিকে নামিয়ে আনছে। আমি বুঝতে পারছি এরপর কী হতে চলেছে। আমার চোখ বন্ধ হয়ে গেছে। ঠোঁটে আরিফের জিভের স্পর্শ পেলাম। ওর মুখের চেনা গন্ধ নাকে লাগল। সবাই উচ্ছ্বাসে চিৎকার করে উঠল।
আর কি চাই আমার?
রাগের ভান করে আরিফকে ঠেলা দিয়ে সরিয়ে দিলাম। যেন খুব লজ্জা পেয়েছি এমন ভাব দেখিয়ে ওর বুকে আলতো করে ঘুষি মারলাম, "বদমাশ!"
সবাই হা হা করে হেসে উঠল। আমিও হাসিতে যোগ দিলাম।
এই দিন সালমা জেনে গেল আরিফ শুধু আমার। বান্ধবীরাও জেনে গেল আমার ক্রাশের নাম আরিফ ইকবাল। গোটা কলেজ জেনে গেল ওদের ক্রিকেট টিমের ক্যাপ্টেন শুধু আমার।
সেদিন রাত বারোটায় মোবাইলে রিংটোন বেজে উঠল। সালমার ফোন। আমি জেগেই ছিলাম, হয়তো এই ফোনটার জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম।
-"হ্যালো!"
-“সুহানি, একটা কথা জেনে রাখ আরিফ শুধু আমার।”
আমি শান্ত গলায় বললাম, “সালমা তুই আমার বন্ধু। তোকে দুঃখ দিতে আমার খারাপ লাগছে। আরিফ হয়তো কখনো তোর ছিল। কিন্তু সেটা অতীতকাল। আরিফ সত্যিই কার আজ তা নিশ্চয়ই জেনে গেছিস।"
প্রায় ফিসফিস করে সালমা বলল,"আই হেট ইউ।"
কেউ ভালোবাসবে কেউ ঘৃণা করবে এটাই জীবনের নিয়ম। সালমা আমাকে ঘৃণা করার সিদ্ধান্ত নিলে আমার কিছু করার নেই। বললাম,"থ্যাঙ্ক ইউ
অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও সালমার কোনো প্রত্যুত্তর পেলাম না। আমি জানি ওর আর কিছু বলবার নেই। কলটা কেটে দিলাম।
গোটা কলেজ জানে আমি আর সালমা অন্তরঙ্গ বন্ধু। কিন্তু আমাদের দুজনের মধ্যে যে একটা অদৃশ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে তা কেউ জানে না। এই অদৃশ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রে আছে আরিফ। সালমা আরিফকে চায় এবং আরিফও সালমার প্রতি কিছুটা দুর্বল তা আমি জানি। কিন্তু আমি যে আরিফের প্রতি দুর্বল এটা শুধু সালমা জানে। কীভাবে জানে আমি জানি না তবে ওর হাবেভাবে বুঝতে পারি ও জানে। তবে আমার মনের ইচ্ছা আমি মনেই রেখেছি। কাউকে কিছু বলিনি, আরিফকেও না।
এই বছর ফেস্টে ডোলা রে ডোলা গানের সঙ্গে আমি আর সালমা একসঙ্গে নেচেছিলাম। গানটি দেবদাস সিনেমার একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হিন্দি গান। সিনেমায় ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন এবং মাধুরী দীক্ষিতের অসাধারণ নাচ সবাইকে মুগ্ধ করেছিল। আমাদের দুজনের নাচ হয়তো ওদের মতো হয়নি কিন্তু ওই নাচের পর গোটা কলেজে আমরা বিখ্যাত হয়ে গেছিলাম। আমরা দুজনে নাচবার সময় যে নিজেদের উজাড় করে দিয়েছিলাম তার নেপথ্যে দেবদাসের ভূমিকা পালন করেছিল আরিফ।
অনুষ্ঠান শেষে প্রিন্সিপাল কলেজের গাড়িতে বাড়ি পৌঁছে দেবার কথা বলেছিলেন। কলেজের গাড়ি অসীম স্যারকে ছাড়তে গেছে। তাকে ছেড়ে গাড়ি ফিরে এলেই আমাকে পৌঁছে দেবে। কিন্তু অসীম স্যার বেহালায় থাকেন। তাঁকে ছেড়ে আসতে অনেক দেরি হবে। প্রিন্সিপাল স্যারকে বললাম স্যার আমি তো নাগের বাজার যাব। বাসে করে চলে যাব। উনি সম্মতি দিলেন।
বাসের জন্য অপেক্ষা করছি। ঘণ মেঘের কারণে আকাশে কোনো তারা নেই। ভাবছি কলেজের গাড়ির জন্য অপেক্ষা করলেই ভালো হত। ঠিক তখনই বাইকে করে আরিফ এসে দাঁড়াল, “সুহানি, বাড়ি যাবে তো, এস আমি পৌঁছে দিচ্ছি।”
ভাবা যায়! আমার সামনে আমার ক্রাশ! চোখে মুগ্ধ দৃষ্টি। পক্ষীরাজ ঘোড়ার পিঠে চড়ে এসেছে আমাকে নিয়ে যাবে বলে। আমার বুকের ভিতর কী হচ্ছে বলে বোঝাতে পারব না। আরিফ কি কিছু বুঝতে পারছে?
কোনো কথা না বলে বাইকের পেছনে উঠে বসলাম। হাওয়ায় আরিফের চুল উড়ছে। নাকে আসছে ডিওডোরেন্টের সঙ্গে আরিফের শরীরের পুরুষালি গন্ধ। একটা ছোট্ট ঝাঁকুনিতে আমার বুক তার পিঠে লেগে গেল। আমি ইচ্ছে করে এরকম করিনি। অজান্তেই ঘটেছিল ব্যাপারটা। কিন্তু এর পর আমি আরও ঝাঁকুনির জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। মসৃণ রাস্তায় ঝাঁকুনির কোনো জায়গা নেই। আরিফের স্পর্শে আমার শরীরের ভিতরে ঝর্ণা ধারার মতো কিছু ঝরে পড়ছিল। আর তখনই শুরু হল অঝোরে বৃষ্টি। আমি কীকরে যে এত নির্লজ্জ হয়ে উঠলাম জানি না। ইচ্ছে করে ওর পিঠে বুক ঠেকিয়ে দুই হাতে ওকে আঁকড়ে ধরলাম। ন্যাকামি করে বললাম,"একটু আস্তে চালা প্লিজ।"
আরিফ এমন কিছু জোরে চালাচ্ছিল না। তবুও আমার কথায় গতি কমাল। আমি কিন্তু তখনও ওকে আঁকড়েই রইলাম।
চিড়িয়ামোড় থেকে নাগের বাজার বাইকে পাঁচ মিনিটের পথ। জ্যাম থাকলে কতক্ষণ লাগবে কেউ জানে না। এই রাস্তায় সারাদিন জ্যাম থাকে। তা বলে রাত এগারোটার সময় জ্যাম থাকার কথা নয়। কিন্তু এখন যেন আমার জন্যেই দমদম ব্রিজের নিচে তুমুল জ্যাম। মনে মনে চাইছিলাম এই জ্যাম যেন কখনো শেষ না হয়। পরম নির্ভরতায় আরিফের পিঠ আঁকড়ে ঘুমিয়ে পড়তে মন চাইছিল। ওর কাঁধে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে দিয়েছিলাম।
জ্যাম যতই জমাট হোক এক সময় শেষ হবেই। বাড়ি পৌঁছালাম।
বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে আরিফ বলল, “আজ তোমার নাচ খুব সুন্দর হয়েছে।"
আমি বললাম,"সালমাও কিন্তু দুর্দান্ত নেচেছে!"
আরিফ বলল,"সত্যিই দুর্দান্ত। কিন্তু কিন্তু তোমার চোখের মধ্যে যে পাখির নীড়ের মতো নিবিড়তা লুকিয়ে আছে তা ওর চোখে নেই।”
খুব সুন্দর কথা বলে তো ছেলেটা! আবার দুর্দান্ত ক্রিকেটও খেলে। একই সঙ্গে কবি ও ক্রিকেটার!
বাড়ি ঢুকেই দেখি রাহুল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। মুখে রাগ, “এত দেরি কেন?”
ও যেন আমার ছোট ভাই নয়, আমার অভিভাবক। ওর এই গার্জেনগিরি আমার পছন্দ নয়। ভাবলাম উত্তর দেব না। কিন্তু ওর চোখে দুশ্চিন্তা দেখতে পেলাম। সত্যি কথাই বললাম,"কলেজে ফেস্ট ছিল।"
রাহুল বলল,"মাকে জানিয়ে রাখা উচিত ছিল। সন্ধ্যা থেকে মা একবার ঘর আর একবার বারান্দা করছে! আবার ফোনটাও অফ করে রেখেছিস!"
নাচের আগে ফোনটা অফ করে ব্যাগে রেখেছিলাম। তারপর আর অন করা হয়নি। মিথ্যা বললাম,"চার্জ ফুরিয়ে নিজেই অফ হয়ে গেছিল।"
মা তোয়ালে আগিয়ে দিলেন “ইসস একদম ভিজে গেছিস। মুছে নে। চা করছি।"
রাতে হোয়াটসঅ্যাপে আরিফের মেসেজ এল: সুহানি, ঘুমিয়ে পড়েছ?
- না। তুমিও তো ঘুমোওনি।
- ঘুম আসছে না।
- কেন? ঘুম আসছে না কেন?
- মনে হচ্ছে এখনও তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরে রয়েছ, পিঠে তোমার নরম ছোঁয়া!
আমি ঘরে একা। তবুও লজ্জায় কান গরম হয়ে গেল। লজ্জায় মুখ ঢাকার একটা ইমোজি পাঠালাম ।
- লজ্জা পাও কেন সোনা?
আমি যদি সত্যি কথা বলি, তাহলে বলতে হয় আমি ইচ্ছে করে তোমার কাঁধে মাথা রেখেছিলাম আরিফ। তোমার পিঠে নিজের স্তন দুটো চেপে ধরে তোমার ঘাড়ে নাক ঘষে ঘষে তোমার গন্ধ নিচ্ছিলাম। কিন্তু সে কথা বলতে এত লজ্জা লাগছে যে বলা সম্ভব নয়। খুউব লজ্জা পেয়েছি বোঝাতে আমি এবার পাঁচটি লজ্জায় মুখ ঢাকা ইমোজি পাঠালাম।
- ও আমার লজ্জাবতী লতা এবার ঘুমিয়ে পড়। শুভরাত্রি।
আমার ইচ্ছা করছে আরো একটু কথা বলতে। আরো একটু দুষ্টুমি করতে। কিন্তু ওর বোধহয় ঘুম পাচ্ছে। তাই লিখলাম - শুভরাত্রি।
সেই থেকে টেক্সটিং শুরু। হোয়াটসঅ্যাপে আরিফ লিখল, “সুহানি, আমার মন ভালো নেই। তোমার হাসি মুখের সেলফি পাঠাও এক্ষুনি।"
পাগল ছেলে একটা। কখন মন খারাপ হয় কখন ভালো হয় ভগবানও জানেন না। দেরি না করে আমি সেলফি পাঠাই।
আরিফ দশটা স্পন্দিত হৃদয়ের ইমোজি পাঠায়, সঙ্গে লেখে,"তুমি অলৌকিক রকমের সুন্দর সুহানি। তোমার হাসি দেখলে, আমার মনে হয় যেন পৃথিবীটা হেসে উঠল। মন ভালো হয়ে গেল আমার!"
"অলৌকিক রকমের সুন্দর" কথাটা আমার চমৎকার মনে হয়। সত্যিই দুর্ধর্ষ বোলার ছেলেটির মনে একটা কবি লুকিয়ে আছে। আমি ঠোঁটে চুমুর ভঙ্গিতে একটি সেলফি পাঠাই।
আরিফ লেখে,"উফফ্! তুমি কি আমাকে মেরে ফেলতে চাও ডার্লিং?"
আমি একটা হাসির ইমোজি পাঠাই সঙ্গে লিখি,"নতুন স্টাইলে সুন্দর বলার পুরস্কার হিসেবে সেলফিটা পাঠিয়েছি।
আরিফ লেখে,"আমি তোমাকে শুধু সুন্দর বলতে চাই না, আমি তোমাকে বুঝতে চাই সুহানি।”
কয়েক মাস পর এক ছুটির দিন। সকালটা বেশ নিরীহভাবেই শুরু হয়েছিল। মা রান্নাঘরে, আমি বারান্দায় চা হাতে ফেসবুক স্ক্রল করছি। হঠাৎই ফেসবুকের নোটিফিকেশন। আরিফ একটা কবিতা পোষ্ট করে আমাকে মেনশন করেছে:
"সুহানি তুমি হাঁটলে কলেজের পথ
নিজেই হয়ে যায় কবিতা।
তোমার হাসিতে ভেঙে যায়
অপরিচয়ের দেয়াল,
শব্দরা লজ্জা পেয়ে হয়ে ওঠে নিঃশব্দ।"
পোস্টটা পড়ে আমার হৃদস্পন্দন দ্রুত হল। আরিফ কবিতা লেখে, সেটা জানতাম। লাইক-কমেন্ট বাড়ছে। কেউ হার্ট, কেউ ফায়ার ইমোজি।
ঠিক তখনই পেছন থেকে রাহুলের গলা-
“এটা কী?”
চমকে ঘুরে তাকাই। রাহুল। ফোনটা আমার হাত থেকে টেনে নেয়। চোখ বুলিয়েই মুখ শক্ত।
“এটা তুই এনকারেজ করছিস?”
আমি বিরক্ত হলাম। “এটা আমার ফেসবুক। কেউ কবিতা লিখেছে—তাতে তোর কী?”
রাহুল ফোনটা টেবিলে ঠাস করে রাখল।
“এইসবের মানে আমি বুঝি না! আমি কি বাচ্চা?"
“কী বুঝিস তুই?” আমার গলাও চড়ে গেল। “আমি কলেজে পড়ি। কেউ আমাকে ভালো লাগে বলেছে, সেটা কি অপরাধ?”
"না সেটা অপরাধ নয়। কিন্তু এই ছেলেটি .। আমরা ', তা কি ভুলে গেছিস?"
আমি হাসব না কাঁদব বুঝতে পারলাম না,"একটা কথা জেনে রাখ রাহুল, আমি ধর্ম নিয়ে মাথা ঘামাই না, আরিফও ধর্ম নিয়ে মাথা ঘামায় না।"
রাহুলের চোখে রাগের চেয়েও বেশি ঘৃণা দেখলাম,"* মেয়েদের এইভাবেই ওরা ফাঁদে ফেলে।"
কথাটা শুনে আমার রাগটা যেন আরও বেড়ে গেল। “আমার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আমি তোর সঙ্গে আর কথা বলতে চাই না।
এরপর থেকে আরিফের সঙ্গে মেলামেশার ক্ষেত্রে আমি সতর্ক হয়ে গেলাম। ভাই বা কলেজের কেউ যেন আমাদের সম্পর্কের বিষয়ে আর কিছু না জানতে পারে।
দেখতে দেখতে সেকেন্ড ইয়ারের ফাইনাল পরীক্ষার সময় এসে গেল। আরিফ আমার দুই বছরের সিনিয়র। এটাই ওর কলেজের শেষ বছর। এই দুবছরে আরিফের সঙ্গে আমার সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। আরিফ খুব সভ্য ছেলে। মুভি দেখতে গিয়ে মাল্টিপ্লেক্সের অন্ধকারে চুমু খাওয়া, দুধ মুঠোয় নিয়ে টেপা ছাড়া ও আর কিছু করেনি। তাও কয়েকবার মাত্র। আমাদের বেশিরভাগ কথা হয় হোয়াটসঅ্যাপে। এই দীর্ঘ সময়ে আমাদের সম্পর্কের মাঝে কাঁটার মতো বিঁধে আছে সালমা। আরিফ কি ওর সঙ্গেও হোয়াটসঅ্যাপে চ্যাট করে? মাল্টিপ্লেক্সের অন্ধকারে ওকেও চুমু খায়? ওরও স্তন মুঠোয় নিয়ে মোচড় দেয়?
আজ আরিফের জন্মদিন। ছুটির পর কলেজের কমনরুমে কেক কাটা হল। বন্ধুরাই সব আয়োজন করেছে। কেক কাটার পর আরিফ প্রথমে একটা টুকরো আমার মুখে গুঁজে দিল। সালমা নীরবে দাঁড়িয়ে দেখল। আমি জানি এখন ওর ভিতরে কী হচ্ছে। ওর যা হচ্ছে আমার হচ্ছে তার বিপরীত। জয়ের আনন্দে আমি হাওয়ায় ভাসছি। ও ঈর্ষার আগুনে জ্বলছে।
এক টুকরো কেক আমি আরিফের মুখে গুঁজে দিলাম। আমার হাত ধরে আরিফ আমার আঙ্গুল থেকে ক্রিম চেটে খেল।
পুরো কমনরুম হাততালির শব্দে মুখরিত হয়ে উঠল। অদ্ভুত একটা অনুভূতি আমাকে ঘিরে ধরেছে। কে একজন শিস দিল। একজন বলল সুহানির ঠোঁটেও ক্রিম লেগে আছে তো!
আরিফ দুই হাতে আমার মুখ ধরে নিজের মুখটা আমার মুখের দিকে নামিয়ে আনছে। আমি বুঝতে পারছি এরপর কী হতে চলেছে। আমার চোখ বন্ধ হয়ে গেছে। ঠোঁটে আরিফের জিভের স্পর্শ পেলাম। ওর মুখের চেনা গন্ধ নাকে লাগল। সবাই উচ্ছ্বাসে চিৎকার করে উঠল।
আর কি চাই আমার?
রাগের ভান করে আরিফকে ঠেলা দিয়ে সরিয়ে দিলাম। যেন খুব লজ্জা পেয়েছি এমন ভাব দেখিয়ে ওর বুকে আলতো করে ঘুষি মারলাম, "বদমাশ!"
সবাই হা হা করে হেসে উঠল। আমিও হাসিতে যোগ দিলাম।
এই দিন সালমা জেনে গেল আরিফ শুধু আমার। বান্ধবীরাও জেনে গেল আমার ক্রাশের নাম আরিফ ইকবাল। গোটা কলেজ জেনে গেল ওদের ক্রিকেট টিমের ক্যাপ্টেন শুধু আমার।
সেদিন রাত বারোটায় মোবাইলে রিংটোন বেজে উঠল। সালমার ফোন। আমি জেগেই ছিলাম, হয়তো এই ফোনটার জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম।
-"হ্যালো!"
-“সুহানি, একটা কথা জেনে রাখ আরিফ শুধু আমার।”
আমি শান্ত গলায় বললাম, “সালমা তুই আমার বন্ধু। তোকে দুঃখ দিতে আমার খারাপ লাগছে। আরিফ হয়তো কখনো তোর ছিল। কিন্তু সেটা অতীতকাল। আরিফ সত্যিই কার আজ তা নিশ্চয়ই জেনে গেছিস।"
প্রায় ফিসফিস করে সালমা বলল,"আই হেট ইউ।"
কেউ ভালোবাসবে কেউ ঘৃণা করবে এটাই জীবনের নিয়ম। সালমা আমাকে ঘৃণা করার সিদ্ধান্ত নিলে আমার কিছু করার নেই। বললাম,"থ্যাঙ্ক ইউ
অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও সালমার কোনো প্রত্যুত্তর পেলাম না। আমি জানি ওর আর কিছু বলবার নেই। কলটা কেটে দিলাম।

