Thread Rating:
  • 1 Vote(s) - 5 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5

The Barter System (By:andygarfield)
#14

নবম পরিচ্ছেদ: অলিখিত রূপকথা



৯.১. শনিবারের অলস প্রহর

শনিবারের বেলা তখন খানিকটা গড়িয়েছে। বাইরের পৃথিবীতে ব্যস্ততার পারদ চড়লেও, ইন্দিরা সেনের স্টাডি রুমটিতে সময় যেন এক অদ্ভুত, মন্থর ছন্দে থমকে আছে। ঘরের প্রতিটি কোণায় বইয়ের সারি, আর জানলার ভারী পর্দার ফাঁক দিয়ে ঠিকরে আসা শরতের উজ্জ্বল রোদের তির্যক রেখা মেঝের কার্পেটে এক মায়াবী আলপনা এঁকেছে। বাতাসে পুরনো কাগজের সোঁদা গন্ধের সাথে মিশে আছে ইন্দিরার সদ্য শেষ হওয়া ব্ল্যাক কফির তীব্র সুবাস। ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন তিনি, চোখে রিডিং গ্লাস। চোখের পাতা প্রায় পড়ছেই না। স্ক্রিনে ভাসছে মুঘল স্থাপত্যের ওপর লেখা এক তরুণ স্কলারের একটি জটিল গবেষণাপত্র। ইন্দিরার ভুরু সামান্য কুঁচকানো, পেশাদারিত্বের এক নিশ্ছিদ্র বর্মে তিনি এখন সম্পূর্ণ আচ্ছাদিত। চারপাশের জগতের সমস্ত শব্দ, সমস্ত কোলাহল তাঁর এই গভীর মনোনিবেশের কাছে হার মেনেছে।

হঠাৎই, কোনো আগাম শব্দ ছাড়াই, দুটো উষ্ণ, পরিচিত হাত তাঁর কাঁধের ওপর আলতো করে এসে বসল।

ইন্দিরার শরীরটা যেন এক লহমায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলো। এক তীব্র চমকে তিনি প্রায় চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠছিলেন, হাত থেকে কফির খালি মগটা উলটে যেতে যেতেও কোনোরকমে বেঁচে গেল। বুকটা ধড়ফড় করে উঠল এক আদিম ত্রাসে।

"উফ্! মা, সরি... সরি! আমি একদমই তোমাকে ভয় পাইয়ে দিতে চাইনি।"

পেছন ফিরে তাকাতেই ইন্দিরা দেখলেন, তাঁর সেই অতি পরিচিত, অবাধ্য ছেলেটি দাঁড়িয়ে আছে। রাহুলের পরনে একটা কলার দেয়া টিশার্ট আর জিনস। ছেলেটার মুখে এক গাল নিষ্পাপ, লজ্জিত হাসি।

ইন্দিরা কয়েক সেকেন্ড সময় নিলেন নিজের শ্বাসটাকে স্বাভাবিক করতে। বুকের ভেতরের ধুকপুকানিটা একটু শান্ত হতেই তাঁর পেশাদারি গাম্ভীর্য গলে গিয়ে সেখানে এক চিরচেনা মাতৃরূপ জায়গা করে নিল। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক প্রশ্রয়ের হাসি। তিনি চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রাখলেন।

"তোর জন্য সত্যিই একদিন আমার হার্ট অ্যাটাক হবে দেখিস" তিনি কৃত্রিম বিরক্তির সাথে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "দরজায় অন্তত একটা নক তো করতে পারিস! আমি এতটা কনসেন্ট্রেট করে পড়ছিলাম..."

"সরি গো মা," রাহুল আরেকটু এগিয়ে এসে টেবিলের পাশে দাঁড়াল। "আমি আর অত খেয়াল করিনি। যাই হোক, তোমার দেওয়া লিস্টটা আমি ব্লিনকিটে অর্ডার করে দিয়েছি।"

ইন্দিরা পুরোপুরি চেয়ারটা ঘুরিয়ে ছেলের দিকে ফিরলেন। তাঁর চোখদুটো স্বয়ংক্রিয়ভাবেই রাহুলের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত একবার স্ক্যান করে নিল—মায়ের সেই চিরাচরিত অভ্যাস।

"সবকটা সবজিই পেয়েছিস? আর মাছগুলো? আর আমার ওষুধটা?"

"হ্যাঁ, বললাম না তোমায়, ওখানে সবই পাওয়া যায়। দ্যাখো না, মিনিট দশেকের মধ্যে দিয়ে যাবে। আর টাকাও অ্যাপেই দিয়ে দিয়েছি, তোমায় কিছু করতে হবে না।"

"ওহ, দাঁড়া দাঁড়া, তাহলে তোকে টাকাটা দিয়ে দিই। কত পড়ল রে?"

"আরে বাবা, এত ব্যস্ত হয়ো না তো! পরে দিয়ো খন। তুমি শুধু কল্লোল স্যারের টাকাটা দাও।"

"ও হ্যাঁ তাই তো..." ইন্দিরা আঙুল দিয়ে নির্দেশ করে বললেন, "ওই সেকেন্ড ড্রয়ারটা খোল, ভেতরে একটা সাদা খাম রাখা আছে। ওটা দিয়ে দিস।"

রাহুল ড্রয়ার খুলে সাদা খামটা বের করে নিজের ব্যাগের ভেতর ঢুকিয়ে দিল। ইন্দিরা হঠাৎ বলে উঠলেন, "ওই, আজকে তোর অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেয়ার কথা না? গত সপ্তাহে তো স্যার অ্যাসাইনমেন্ট দিয়েছিলেন..."

"উফফ মা, তোমার দেখছি সব মনে থাকে। আমার বহু আগেই অ্যাসাইনমেন্ট করা হয়ে গেছে, তুমি জাস্ট টেনশন করা বন্ধ করো তো।" রাহুল একটু হাসল।

"আমি টেনশন করব না তো কে করবে শুনি? তুই যা ভুলো মনের ছেলে!" ইন্দিরা মৃদু ধমক দিলেন। "আর শোন, সাবধানে যাবি। ক্লাস শেষ হয়ে গেলে বেরিয়ে বন্ধুদের সাথে আবার এদিক-ওদিক আড্ডা মারতে চলে যাস না। সোজা বাড়ি ফিরবি, বুঝলি?"

"হ্যাঁ গো আমার রিংমাস্টার মা, একদম সোজা বাড়ি ফিরব," রাহুল হাসতে হাসতে বলল।

তারপর, কোনো ভূমিকা ছাড়াই, রাহুল একটু ঝুঁকে এসে পেছন থেকে দু-হাত দিয়ে ইন্দিরার গলা আর কাঁধ জড়িয়ে ধরল। ওর চিবুকটা এসে ঠেকল ইন্দিরার কাঁধের ওপর।

এই আচমকা, নিবিড় আলিঙ্গনে ইন্দিরার মেরুদণ্ড বেয়ে এক অদ্ভুত শিহরণ খেলে গেল। কিন্তু একই সাথে তাঁর সচেতন মগজটা সজাগ হয়ে উঠল। তাঁর তীক্ষ্ণ শ্রবণশক্তিতে ততক্ষণে ধরা পড়েছে করিডোরের ওপারের শব্দটা।

"উমম... সোনা..." ইন্দিরা খুব নিচু গলায়, প্রায় ফিসফিস করে বললেন, শরীরটা সামান্য আড়ষ্ট হয়ে এসেছে তাঁর। "গঙ্গা মাসি কিন্তু ঠিক ওই সামনের বাথরুমটাই পরিষ্কার করছে..."

চারপাশের পরিবেশটা যেন মুহূর্তের মধ্যে এক স্নায়বিক চাপে ভারী হয়ে উঠল। স্টাডি রুমের খোলা দরজা দিয়ে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে করিডোর সংলগ্ন বাথরুমের ভেতরের শব্দ—জলের ঝপঝপ আওয়াজ, ফ্লোরে প্লাস্টিকের ঝাড়ু ঘষার একটানা খসখস শব্দ, আর তার সাথে মিশে আছে লাইসলের সেই তীব্র, ঝাঁঝালো গন্ধ, যা পুরো করিডোরটাকে ভরিয়ে তুলেছে। যেকোনো মুহূর্তে গঙ্গা মাসি বাথরুম থেকে বেরিয়ে এই খোলা দরজার সামনে দিয়ে হেঁটে যেতে পারে।

"মা... মাসি তো নিজের কাজে বিজি... দেখতে পাবে না..." রাহুল ওঁর কাঁধের ওপর মাথাটা রেখেই ফিসফিস করে বলল, ওর গলার স্বরে এক অদ্ভুত, অবাধ্য আদুরেপনা। "জাস্ট একটুক্ষণ... আমি তোমাকে সারাটা দুপুর বড্ড মিস করব মা..."

ইন্দিরার চোখদুটো কপালে উঠল। তিনি এক কৃত্রিম বিরক্তি আর লোকলজ্জার ভয়ে চোখ পাকিয়ে নিজের হাতটা দিয়ে রাহুলের জড়িয়ে থাকা হাতের ওপর একটা হালকা চড় কষালেন।

"উফ্, রাহুল! ছাড় বলছি..." তিনি এমন একটা ফিসফিসানিতে ধমক দিলেন যা গঙ্গা মাসির কান অব্দি পৌঁছানোর কোনো সম্ভাবনাই নেই, "তুই একটা আস্ত ড্রামাবাজ জানিস তো? সারা দুপুর মিস করবি? একটুও লজ্জা করে না এসব বলতে, হুমম? কাল সারারাত ধরে মা তোকে বুকে জড়িয়ে আদর দিয়ে দিয়ে তোকে একদম মাথায় তুলে বাঁদর করে দিয়েছে, যা বুঝতে পারছি... তাই এখন টিউশন যাওয়ার আগেও সেই বাঁদরামি চলছে..."

রাহুল মায়ের এই ধমককে বিন্দুমাত্র পাত্তা দিল না। বরং ওর ঠোঁটের কোণে এক চতুর, দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।

"হ্যাঁ, আমি বাঁদরই তো। তোমার নিজের বাঁদর ছেলে," রাহুল ফিসফিস করে বলে ওর আলিঙ্গনটা আরও একটু শক্ত করল। ইন্দিরার গায়ের সাথে নিজেকে আরও গভীরভাবে লেপ্টে দিয়ে ও সরাসরি ইন্দিরার ফর্সা গালে একটা উষ্ণ, গাঢ় চুমু এঁকে দিল।

ইন্দিরার বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত ত্রাস আর রোমাঞ্চে কেঁপে উঠল। তিনি দ্রুত ঘাড় ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকালেন।

"উফ্ সোনা... পাগল হলি নাকি? ছাড়... মাসি ঠিক ওখানেই আছে... যদি হঠাৎ করে দরজার সামনে চলে আসে, কী ভাববে বল তো? একটা ধেড়ে ছেলে তার মায়ের ঘাড়ে এভাবে ঝুলে আছে... ছাড় সোনা, প্লিজ..."

"ভাবলে ভাববে," রাহুল বিন্দুমাত্র না দমে আরেকবার ওঁর ঘাড়ের কাছে মুখ ঘষল।

"তোর সাথে সত্যিই পারা যায় না!" ইন্দিরা এবার সত্যিই একটু জোর করে ওকে নিজের গা থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেন। "আহ্, সোনা... তোর এবার সত্যিই দেরি হয়ে যাবে। আর আমাকে একটু শান্তিতে এই পেপারটা শেষ করতে দে, প্লিজ। তুই তো মায়ের বাধ্য ছেলে, তাই না? লক্ষ্মীটি, এবার যা..."

রাহুল অবশেষে ওঁর পিঠ থেকে নিজেকে একটু আলগা করল। কিন্তু ওর চোখের সেই নিবিড়, নির্ভরশীল চাউনিটা ইন্দিরার মুখের ওপরই স্থির রইল।

"ঠিক আছে মা, যাচ্ছি," ও খুব মিষ্টি করে হাসল।

ইন্দিরা কয়েক সেকেন্ড ওর ওই মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর তাঁর চোখ আবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছুটে গেল খোলা দরজার দিকে। করিডোরে লাইসলের গন্ধটা এখনও তীব্র, জলের শব্দটাও আসছে। তিনি আবার রাহুলের দিকে তাকালেন। তাঁর ভেতরের সেই কঠোর অধ্যাপক রূপটি আবার একবার পরাস্ত হলো সেই অন্ধ মাতৃত্বের কাছে।

"রাহুল, দাঁড়া..." ইন্দিরা খুব স্বাভাবিক, শান্ত গলায় ডাকলেন। তারপর হাত দিয়ে ইশারা করে বললেন, "এদিকে একটু মুখটা নিচু কর তো।"

রাহুল কিছুটা অবাক হয়ে গেল। ও ভাবল, হয়তো ওর চুলে কোনো ধুলো আটকে আছে, বা গালে কিছু লেগে আছে যা মায়ের ওই তীক্ষ্ণ চোখে ধরা পড়েছে।

"কী হলো মা? চুলে কিছু আটকে আছে নাকি? না মুখে কিছু লেগে আছে?" কৌতূহলী চোখে প্রশ্ন করতে করতে রাহুল বাধ্য ছেলের মতো চেয়ারে বসে থাকা মায়ের দিকে সামান্য ঝুঁকে এল।

ইন্দিরার ঠোঁটের কোণে এক মায়াবী, প্রশ্রয়ের হাসি ফুটে উঠল। তিনি কোনো উত্তর দিলেন না, কোনো ধুলোও ঝাড়লেন না। তার বদলে তিনি তাঁর ডান হাতটা বাড়িয়ে রাহুলের গালটা পরম মমতায় আলতো করে ধরলেন। তারপর সামান্য মাথা উঁচু করে রাহুলের গালে একটা নরম, দীর্ঘ ও গভীর চুমু এঁকে দিলেন।

চুমুর পর রাহুল একটু অপ্রস্তুত অথচ লাজুক মুখে হাসল। "উফফ মা! তুমিও না! আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে, আমি ভাবলাম মুখটুখ বোধহয় নোংরা হয়ে আছে।"

ইন্দিরা একগাল হেসে ওর নাকে আলতো করে একটা চিমটি কাটলেন। "কেন? আমার ছেলেকে আমি চুমু খেতে পারি না? নাকি বড্ড বড় হয়ে গেছিস? তোর মতো একটা বাঁদর ছেলে আমাকে আদর করে যাবে আর আমি কিছু বলব না, তা তো হয় না।"

রাহুল খিলখিল করে হেসে উঠল।

ঠোঁটের কোণে এক প্রশ্রয়ের, মায়াবী হাসি ফুটিয়ে তিনি খুব নিচু স্বরে বললেন, "ওকে... এবার শান্তি হয়েছে তোর? আমার অ্যাটেনশন-সিকার, আহ্লাদি বাবুটার পেট ভরেছে? এবার যা... আর একটাও কথা নয়। সোজা পড়তে যা।" তিনি ওর বুকে একটা হালকা, আদুরে ধাক্কা দিলেন।

রাহুল একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাসল, চোখে তখন এক অদ্ভুত ঘোর। "মা... আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি।"

ইন্দিরা চোখ উলটে এক চরম নাটকীয় ভঙ্গিতে শ্বাস ফেললেন, যেন এই ছেলের আদিখ্যেতায় তিনি চূড়ান্ত বিরক্ত, যদিও তাঁর ঠোঁটের কোণের হাসিটা অন্য কথা বলছিল। "হয়েছে, আর মাখন লাগাতে হবে না। যা এবার।"

রাহুল ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই ইন্দিরা আবার নিজের ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে ঘুরলেন। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ তাঁর চোখ স্ক্রিনের অক্ষরে ফোকাস করতে পারল না। বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত, সংজ্ঞাহীন দোলাচলে কাঁপছিল তাঁর।


৯.২. হোয়াটসঅ্যাপের নীরব বিস্ফোরণ

দুপুরের কড়া রোদ তখন একটু একটু করে ম্লান হতে শুরু করেছে। ঘড়ির কাঁটা চারটে ছুঁয়েছে। ইন্দিরার ল্যাপটপের পাশে রাখা ফোনটা স্ক্রিন অফ অবস্থাতেই পড়ে আছে। তাঁর ভেতরের সেই মাতৃসত্তাটা ক্রমশ একটু অস্থির হয়ে উঠছিল। রাহুলের তো এতক্ষণে বাড়ি ফিরে আসার কথা।

আর থাকতে না পেরে ইন্দিরা ফোনটা হাতে তুলে নিলেন। হোয়াটসঅ্যাপ খুলে রাহুলের চ্যাটবক্সে গিয়ে দ্রুত টাইপ করলেন:

"রাহুল, তোর কি এখনও ক্লাস শেষ হয়নি? চারটে বাজে তো!"

মেসেজটা পাঠানোর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ব্লু-টিক হয়ে গেল। স্ক্রিনের ওপরে ভেসে উঠল ‘টাইপিং...’।

একটু পরেই রাহুলের মেসেজ এল, পরপর কয়েকটা রাগী আর কান্নার ইমোজি দিয়ে:

"না মা! ক্লাস শেষ হয়নি। উলটে আরও ক্লাস চাপিয়ে দিয়েছেন! ??"

ইন্দিরা একটু অবাক হয়ে লিখলেন:

"মানে? এক্সট্রা ক্লাস?"

রাহুলের রিপ্লাই এল:

"আরে আগের সপ্তাহে স্যার ছিলেন না বলে দুটো ক্লাস অফ হয়েছিল না? তাই সিলেবাস শেষ হবে না বলে স্যার আজ এক্সট্রা ক্লাস নিচ্ছেন। উফফ, জাস্ট ফ্রাস্ট্রেটিং লাগছে! আমার বাড়ি ফিরতে ফিরতে সেই সাড়ে ছ'টা বেজে যাবে, একদম ডিনারের সময়। জাস্ট জঘন্য একটা দিন!"

ইন্দিরা বুঝতে পারলেন ছেলেটার মেজাজ কতটা খারাপ হয়ে আছে। তিনি অত্যন্ত শান্ত, মাতৃসুলভ ভঙ্গিতে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন:

"আহা রাহুল, রাগ করে না। এটা তো হতেই পারে। নরমাল ব্যাপার। এই ক্লাসটাই তো গত সপ্তাহে হওয়ার কথা ছিল, তার জায়গায় না হয় আজকে হচ্ছে, কি হয়েছে তাতে? তুই তো জানিস, আমাকেও কত দিন সিলেবাস কভার করার জন্য ইউনিভার্সিটিতে এক্সট্রা লেকচার দিতে হয়। মন দিয়ে ক্লাসটা কর, মেজাজ খারাপ করিস না।"

রাহুলের তরফ থেকে একটুক্ষণ কোনো মেসেজ এল না। তারপর একটা ছোট্ট মেসেজ ঢুকল:

"হুম। তা তোমার কী খবর ওদিকে? পেপারটা শেষ হলো?"

ইন্দিরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে টাইপ করলেন:

"আর বলিস না। কাজের তো কোনো শেষ নেই। এখনও সেই পেপারটা নিয়েই পড়ে আছি, মাথা ধরে গেছে একদম। একটানা বসে ঘাড়টাও বড্ড ব্যথা করছে। বড্ড টায়ার্ড লাগছে।"

মেসেজটা পড়ার পর রাহুলের রিপ্লাই এল বেশ দ্রুত, একরাশ উদ্বেগের সাথে:

"ইশশ... খুব মাথা ধরেছে? তুমি একটু রেস্ট নাও না মা। আমি তোমায় বলেছিলাম না এতক্ষণ টানা ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে বসবে না! এক কাজ করো, চোখ বন্ধ করে একটু শুয়ে থাকো।"

ছেলের এই উদ্বেগ দেখে ইন্দিরার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। তিনি দ্রুত টাইপ করলেন:

"রেস্ট নেওয়ার উপায় নেই রে সোনা। এই পেপারটা আজকেই সাবমিট করতে হবে। তার ওপর কাল তোর বাবা ফিরবে, তার আগে সব গুছিয়ে রাখতে হবে।"

স্ক্রিনে আবার ‘টাইপিং...’ ভেসে উঠল। রাহুল লিখল:

"আচ্ছা, তুমি একদম চিন্তা কোরো না। আমি তো সাড়ে ছটায় ফিরছি। ফিরে আমি তোমার ঘাড় আর মাথা টিপে দেব। দেখবে, একদম ম্যাজিকের মতো ব্যথা গায়েব হয়ে যাবে।"

ছেলের এই মিষ্টি আবদার আর যত্ন নেওয়ার কথা পড়ে ইন্দিরার বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত মমতায় ভরে গেল। তিনি মুচকি হেসে টাইপ করলেন:

"ওরে বাবা! আমার ছেলের কত খেয়াল মায়ের জন্য! তোর আর মাথা টিপে দিতে হবে না, তুই সাবধানে ক্লাস শেষ করে বাড়ি ফিরলেই আমার শান্তি।"

রাহুল যেন নাছোড়বান্দা, ওর পরের মেসেজ এল:

"না মা, আমি সিরিয়াস। আমি বাড়ি ফিরে তোমার সব ক্লান্তি, সব স্ট্রেস দূর করে দেব। তুমি জাস্ট রিল্যাক্স করবে।"

ইন্দিরা এবার বেশ মজাই পেলেন। ছেলেটা বড় হয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু মায়ের খেয়াল রাখার একটা অদ্ভুত চেষ্টা ওর মধ্যে সবসময় থাকে। তিনি প্রশ্রয়ের সুরে লিখলেন:

"আচ্ছা বাবা, দেখা যাবে তোর কত ম্যাজিক। এখন এসব কথা রাখ, স্যারের লেকচারে মন দে।"

কয়েক মুহূর্ত পর রাহুলের দিক থেকে মেসেজ এল:

"কিন্তু আমার তো একটা কন্ডিশন আছে..."

ইন্দিরা ভুরু কুঁচকে একটু অবাক হলেন। আবার কীসের কন্ডিশন? তিনি টাইপ করলেন:

"আবার কন্ডিশন? কীসের কন্ডিশন?"

স্ক্রিনে কয়েক সেকেন্ড ধরে ‘টাইপিং...’ চলল। তারপর রাহুলের যে মেসেজটা স্ক্রিনে ফুটে উঠল, তা ইন্দিরার চোখের সামনে যেন এক টুকরো বোমার মতো ফাটল।

"আমি তোমার মাথা টিপে দেব, তোমার সব স্ট্রেস দূর করব, কিন্তু তার বদলে... বাড়ি ফেরার পর... কাল রাতের মতো... আমাকে একটু আদর করতে দেবে প্লিজ?"

শব্দগুলো পড়ার সাথে সাথে ইন্দিরার বুকের ভেতরটা যেন এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে গেল। হাতের তালু দুটো মুহূর্তের মধ্যে ঘেমে উঠল। হৃৎপিণ্ডটা এক আদিম, বন্য ত্রাসে এমনভাবে আছড়ে পড়তে লাগল যে তাঁর মনে হলো বুকের পাঁজরে কেউ হাতুড়ি পেটাচ্ছে। তিনি বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে রাহুল টিউশনের মতো একটা পাবলিক স্পেসে বসে হোয়াটসঅ্যাপে এরকম একটা মেসেজ টাইপ করার সাহস দেখিয়েছে!

কাঁপাকাঁপা হাতে, এক চরম প্যানিক আর রাগের মিশ্রণে তিনি দ্রুত টাইপ করতে শুরু করলেন:

"রাহুল! তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? তুই পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছিস? তুই এখন কোথায় বসে আছিস? ক্লাসের মধ্যে? তোর চারপাশে তো স্টুডেন্টরা গিজগিজ করছে! যদি কেউ তোর ফোনের স্ক্রিনে উঁকি মারে? যদি কেউ তোর এই মেসেজটা পড়ে নেয়? তুই বুঝতেই পারছিস তুই কী সর্বনাশ করছিস? তুই এসব কী লিখছিস চ্যাটে!"

মেসেজটা সেন্ড করেই তিনি রুদ্ধশ্বাসে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

ওপাশ থেকে রাহুলের রিপ্লাই এল খুব দ্রুত, যেন সে পরিস্থিতিটাকে একদম হালকা করতে চাইছে:

"মা... উফফ, তুমি জাস্ট রিল্যাক্স করো! আমি ক্লাসরুমে নেই। নেক্সট ক্লাস শুরুর আগে স্যার ব্রেক দিয়েছেন, আমি এখন টিউশন সেন্টারের বাইরে একটা ফাঁকা জায়গায় বসে মেসেজ করছি। আমার ধারেকাছে একটাও লোক নেই। তুমি প্লিজ একটু শান্ত হবে? তুমি এমনভাবে রিয়্যাক্ট করছ যেন আমি কোনো ইললিগাল বা ক্রিমিনাল কিছু করে বসেছি! আমার জাস্ট এখানে আসার পর মনটা খারাপ লাগছিল, তাই ভাবলাম মায়ের কাছে একটু আদর চাইব... বাড়ি ফিরে একটু আদর করব মাকে। এতে প্রবলেমটা কীসের, মা?"

ইন্দিরার কপালে তখন বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। এই ছেলেটার এই চরম অবাধ্যতা আর পরিস্থিতি না বোঝার ক্ষমতা তাঁকে পাগল করে দিচ্ছিল। তিনি টাইপ করলেন:

"প্রবলেমটা কীসের? তুই বুঝতে পারছিস না প্রবলেমটা কোথায়? তুই এখন পড়াশোনা করতে গেছিস, রাহুল! ওই পরিবেশে বসে তোর মাথায় এইসব চিন্তা আসছে কী করে? তোর এখন শুধু ক্লাসের পড়ায় ফোকাস করা উচিত। আর এইসব ফালতু কথা চ্যাটে লেখা এক্ষুনি বন্ধ কর। এটা হোয়াটসঅ্যাপ! তোর যদি খুব বলার ইচ্ছেই ছিল, তুই বাড়ি ফিরে তো আমাকে সামনাসামনি বলতে পারতিস! চ্যাটে এসব কেন লিখছিস?"

ইন্দিরা ভেবেছিলেন এই কড়া ধমকে রাহুল একটু শান্ত হবে বা ভয় পাবে। কিন্তু তার বদলে রাহুলের পরের মেসেজটা পড়ে ইন্দিরার মুখটা অপমানে আর এক অদ্ভুত লজ্জায় লাল হয়ে গেল।

"ওহ আচ্ছা! তার মানে আমি যদি বাড়ি ফিরে সামনাসামনি তোমাকে এই কথাটা বলতাম, তাহলে তুমি আমাকে আদর করতে দিতে? তাহলে ডিল ডান?" সাথে একটা চোখ-টেপা ইমোজি।

ইন্দিরার রাগে সারা শরীর রি-রি করে উঠল। এই ধূর্ত, পাকা ছেলেটা তাঁরই কথার ফাঁদ দিয়ে তাঁকেই আটকাচ্ছে! কাল রাতের ওই নিবিড় আদরের পর থেকে ছেলেটার আবদার আর আদুরেপনা যেন সমস্ত সীমানা, সমস্ত যুক্তির দেওয়াল ভেঙে ফেলতে চাইছে। মায়ের একটুখানি প্রশ্রয় পেয়ে ছেলেটা যেন একদম পাগল হয়ে গেছে। তিনি আর এক মুহূর্তও এই চ্যাট কন্টিনিউ করতে চাইলেন না।

পরপর কয়েকটা লাল রঙের রাগী ইমোজি সিলেক্ট করে তিনি সেন্ড করলেন, তারপর লিখলেন:

"রাহুল, দিস ইস এনাফ! আমি আর তোর সাথে একটাও কথা বলতে চাই না এখন। আমার অনেক কাজ আছে, আমি কাজে ফিরে যাচ্ছি। তুই ক্লাস কর।"

মেসেজটা পাঠিয়েই তিনি ধপ করে ফোনটা টেবিলের ওপর উলটে রাখলেন। বুকের ভেতরটা তখনও হাঁপাচ্ছে। তিনি চোখ বন্ধ করে চেয়ারে হেলান দিলেন।


৯.৩. এক হিমশীতল বাস্তবতা

সূর্য ততক্ষণে দিগন্তের ওপারে হারিয়ে গেছে। কলকাতার রাস্তায় জ্বলে উঠেছে নিয়ন আলো। ঘড়ির কাঁটা সাড়ে ছ'টা ছুঁইছুঁই।

রাহুল অত্যন্ত ক্লান্ত শরীরে লিফট থেকে নেমে নিজের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। সারাটা দিন ওই একঘেয়ে ক্লাসে ওর মগজ রীতিমতো শুকিয়ে গেছে। কিন্তু বাড়ি ফেরার পথে ওর মনের ভেতর একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল—মা। কাল রাতের সেই অলৌকিক, স্বর্গীয় নৈকট্যটা ওর মগজে এক নেশার মতো গেঁথে আছে। ও ভেবেছিল বাড়ি ফিরলেই হয়তো মা দরজা খুলবে, আর ও সোজা গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরবে।

ও কলিং বেলটা বাজাল।

কয়েক সেকেন্ড পর দরজার লক খোলার শব্দ হলো। কিন্তু দরজাটা খুলতেই রাহুলের বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত প্রত্যাশা এক লহমায় ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।

দরজায় দাঁড়িয়ে আছে গঙ্গা মাসি।

"আরে রাহুল বাবা, আ গয়ে আপ? বড়ে থকে হুয়ে লগ রহে হো!" গঙ্গা মাসি একগাল হেসে হিন্দিতে অভ্যর্থনা জানাল।

রাহুল এক মুহূর্তের জন্য যেন পাথর হয়ে গেল। ওর মাথা থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে গিয়েছিল যে গঙ্গা মাসি আগামী কয়েকদিন ওদের বাড়িতেই থাকছে! মাসির স্বামী কী একটা কাজে অন্য শহরে গেছে, তাই মা-ই মাসিকে বলে দিয়েছেন রাতে কদিন এখানে থেকে যেতে। কাল সন্ধেবেলা মাসি ছিল না, তাই বাড়িটা ফাঁকা ছিল। কিন্তু আজ...

বাস্তবের এই হিমশীতল ধাক্কাটা রাহুলের মগজে আছড়ে পড়তেই ওর মনের ভেতরের সেই কল্পনার রঙিন মহলটা ধসে পড়ল।

"মা কোথায় মাসি?" রাহুল জুতো খুলতে খুলতে অত্যন্ত নিস্পৃহ গলায় জিজ্ঞেস করল।

"আরে ম্যাডাম জি তো একদম বিজি হ্যায় বাবা!" গঙ্গা মাসি দরজায় ছিটকিনি তুলে দিতে দিতে বলল, "সারা দিন অপনে উস কামরে মে ল্যাপটপ লে কর বঠী হ্যায়। ম্যায়নে তো উনকা খানা ভি কামরে মে দে দিয়া। উনহোনে বোলা কি উনকো একদম ডিস্টার্ব না কিয়া যায়ে। আপ হাত-মুঁহ ধো লো, ম্যায় আপকা খানা লাগা দেতী হুঁ।"

রাহুলের বুকের ভেতরটা এক তীব্র অপমানে আর অভিমানে ভরে উঠল। মা এত ব্যস্ত যে ওর সাথে দেখা করতেও এল না? কিন্তু এমনটা তো আগে কোনোদিন হয়নি! মা বাড়িতে থাকলে যত কাজের চাপই থাকুক না কেন, নিজের হাতে রাহুলকে ডিনার সার্ভ করবেই, আর ওরা সবসময় একসাথেই খায়। এমনকি বাবা যখন বাড়িতে থাকে, মায়ের সেই রাশভারী আর মেপে চলা আচরণের মধ্যেও অন্তত ডিনার টেবিলটায় মায়ের মুখোমুখি বসে খাওয়ার সুযোগটুকু রাহুল পেত। বাবার সামনে মায়ের ওই দূরত্বটুকুও রাহুল মুখ বুজে মেনে নিত, কারণ ওই ডিনারের সময়টুকুই ওর মনের ক্লান্তি দূর করে দিত। কিন্তু আজ? দুপুরবেলায় হোয়াটসঅ্যাপে ওই ধমক দেওয়ার পর থেকে মা ওর সাথে কোনো যোগাযোগ তো করেইনি, উল্টে আজ রাতে ওর সাথে ডিনার করাটাও এড়িয়ে গেল? মাসিকে দিয়ে ওর খাবার সার্ভ করাচ্ছে?

রাহুল আর একটা কথাও বলল না। সে নিজের ঘরে গিয়ে ব্যাগটা ছুঁড়ে ফেলল বিছানায়। বাথরুমে গিয়ে মুখে চোখে জল দিয়ে সোজা এসে বসল ডাইনিং টেবিলে। বিশাল ওই ডাইনিং টেবিলটায় ও একা বসে গঙ্গা মাসির দেওয়া ডিনারটা গিলতে লাগল। খাবারগুলো যেন ওর গলায় আটকে যাচ্ছিল। নিঃশব্দে খাওয়া শেষ করে ও সোজা নিজের ঘরে চলে গেল। দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়ে ও নিজের স্টাডি টেবিলে বসল। বইখাতা বের করে এক রোবটের মতো ডুবে গেল আগামী সোমবারের অ্যাসাইনমেন্টগুলোর মধ্যে। ওর মনে হলো, ঠিক আছে, মা যখন ব্যস্ততা দেখাচ্ছে, তখন ও-ও কাউকে ডিস্টার্ব করবে না।

রাত এগোতে লাগল। ঘড়ির কাঁটা দশটা পেরিয়ে এগারোটার ঘরে পৌঁছাল। পুরো ফ্ল্যাট নিস্তব্ধ। গঙ্গা মাসি নিজের ঘরে শুতে চলে গেছে।

রাহুল হঠাৎ চেয়ার ছেড়ে উঠল। ওর ভেতরের অভিমানটা এবার একটা চরম বিন্দুতে পৌঁছেছে। ও সোজা হেঁটে গেল ইন্দিরার স্টাডি রুমের দিকে। দরজাটা ভেজানো ছিল। ও টোকা দিল।

"কাম ইন," ভেতর থেকে ইন্দিরার গম্ভীর, ক্লান্ত গলা ভেসে এল।

রাহুল দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।

ইন্দিরা ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে ওর দিকে তাকালেন। আর তাকানো মাত্রই তাঁর চোখের দৃষ্টি এক চরম মাতৃসুলভ ক্রোধে জ্বলে উঠল।

"রাহুল! তুই একবার নিজের ফোনটা চেক করেছিস?" ইন্দিরার গলার স্বর রীতিমতো ফুঁসছিল। তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। "আমি তোকে ঠিক ক'বার কল করেছি, তুই বলতে পারিস? তুই সেই সাড়ে ছ'টায় বাড়ি ফিরেছিস, ডিনার করে নিজের ঘরে ঢুকে গেছিস, আর আমাকে একবার জানানোর প্রয়োজনও বোধ করিসনি যে তুই ফিরেছিস? তুই কি ভুলে গেছিস যে তোর একটা মা আছে, যে তোর জন্য চিন্তা করতে পারে? নাকি তোর কাছে মায়ের চিন্তার কোনো দামই নেই?"

ইন্দিরা টেবিলের ওপর থেকে নিজের ফোনটা তুলে নিলেন, তাঁর হাত সামান্য কাঁপছে রাগে। "আমি এখানে বসে বসে পাগল হয়ে যাচ্ছি! আমি ভাবছি ছেলেটা এখনও ফিরল না কেন, রাস্তায় কোনো বিপদ হলো কি না! থ্যাঙ্ক গড গঙ্গা মাসি ছিল। ও এসে আমাকে বলল যে তুই ফিরেছিস, খেয়ে নিজের ঘরে পড়াশোনা করতে ঢুকে গেছিস। তোর কি একবারও মনে হলো না যে স্টাডি রুমের দরজাটা একটু নক করে মাকে মুখটা দেখিয়ে যাই? ইউ হ্যাভ বিকাম সো ইনসেনসিটিভ, রাহুল!"

রাহুল মায়ের এই দীর্ঘ, রাগী মনোলগটা শুনে প্রথমে একটু চমকে গেল। ও পকেট থেকে ফোনটা বের করে দেখল। সত্যিই মায়ের তিনটে মিসড কল।

"আমার ফোনটা সাইলেন্ট করা ছিল, মা," রাহুল অত্যন্ত নিস্পৃহ, ঠান্ডা গলায় বলল। "ক্লাসের সময় সাইলেন্ট করেছিলাম, তারপর আর অন করা হয়নি। আর আমি বাড়ি ফিরেই সোজা পড়তে বসে গেছি। সামনে সপ্তাহে অনেক অ্যাসাইনমেন্ট আছে, সেগুলোর স্ট্রেস ছিল।"

ইন্দিরা এক মুহূর্ত থমকালেন। ছেলের এই নির্বিকার উত্তর তাঁকে আরও রাগিয়ে দিল। "স্ট্রেস ছিল? স্ট্রেস থাকলে মাকে একবার বলা যায় না যে আমি বাড়ি ফিরেছি?"

রাহুল চোখের দৃষ্টিটা স্থির রেখে বলল, "মা, তুমি তো জানতে আমার সাড়ে ছটায় ফেরার কথা। তুমি তো একবার নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দেখতে পারতে! তুমি তো একবারও নিজে থেকে আমার খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন মনে করোনি।"

ইন্দিরার ভেতরের রাগটা এবার যেন বারুদের মতো জ্বলে উঠল। তিনি টেবিলের ওপর হাত দুটো ভর দিয়ে সামান্য সামনের দিকে ঝুঁকে এক কড়া, তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, "খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন মনে করিনি? তোর কি মনে হয় এটা আমার দায়িত্ব যে তুই বাড়ি ফিরেছিস কি না সেটা বাড়ি ঘুরে ঘুরে তদন্ত করে বেড়াব? তুই কি ছোট বাচ্চা? এটা তোর বেসিক কার্টেসি যে বাড়ি ফিরে মাকে জানাবি! আর হ্যাঁ, আমি ইচ্ছে করেই তোর কাছে যাইনি! আই ইনটেনশনালি ডিডনট কাম টু ইউ! তোকে একটা লেসন দেওয়ার দরকার ছিল।"

রাহুল চুপ করে রইল, কিন্তু ওর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।

"তুই দুপুরে হোয়াটসঅ্যাপে যা করেছিলিস," ইন্দিরা ফুঁসতে ফুঁসতে বলতে লাগলেন, "তোর ওই স্পর্ধার জন্যই আমি ইচ্ছে করে নিজের ঘরে বসেছিলাম। আমি দেখতে চাইছিলাম তোর নিজের দায়িত্ববোধ বলে কিছু আছে কি না! কিন্তু তুই প্রমাণ করে দিলি তোর কাছে নিজের জেদটাই সব! বাড়ি ফিরেছি - শুধু এই কথাটুকু মাকে বলতে আসতে পারলি না।"

"কিন্তু বলে কী লাভ হতো, মা?" রাহুলের গলার স্বরে এবার এক তীব্র, জমাট বাঁধা অভিমান ফুটে উঠল। ও সোজা মায়ের চোখের দিকে তাকাল। "আমার বাড়ি ফেরা না-ফেরাতে তোমার কী-ই বা এসে যায়? আমি তো টিউশনে সারাদিন পড়াশোনাই করছিলাম, আর বাড়ি ফিরেও সেই পড়াশোনাই করছি। ডিফারেন্সটা কোথায়?"

ইন্দিরা অবাক হয়ে গেলেন। তাঁর ভ্রু কুঁচকে গেল। "মানে? তুই এসব কী বলছিস, রাহুল?"

"হ্যাঁ তো, ঠিকই তো বলছি," রাহুল একটু ঘাড় বাঁকিয়ে, এক চরম উপেক্ষার সুরে বলল। "তুমি তো আজকে সারাটা দিন বড্ড বিজি। দুপুরে তো মেসেজে পরিষ্কার বুঝিয়ে দিলে যে আমাকে তোমার দরকার নেই। আর এখন বলছ তুমি ইচ্ছে করেই আমার কাছে আসোনি। তা আমি ভাবলাম, কেন আমি শুধু শুধু তোমাকে ডিস্টার্ব করব? আমি আমার কাজটাই করি। তাই আমি সোমবারের সমস্ত অ্যাসাইনমেন্ট, সমস্ত হোমওয়ার্ক কমপ্লিট করে ফেলেছি। যাতে তোমার ওই মহামূল্যবান সময় আমি একটুও নষ্ট না করি।"

ইন্দিরা স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তাঁর ভেতরের রাগটা এক লহমায় কোথায় যেন উধাও হয়ে গেল। "তুই সোমবারের সব হোমওয়ার্ক শেষ করে ফেলেছিস? দ্যাটস... দ্যাটস ভেরি গুড, রাহুল..." তাঁর গলার স্বর এখন অনেক নরম, কিন্তু ভেতরে এক অদ্ভুত অস্বস্তি।

"হ্যাঁ, হোয়াটএভার," রাহুল কাঁধ ঝাঁকাল। ওর মুখের ভাষায় এক চরম ডিটাচমেন্ট। "যাই হোক... আমি আর তোমাকে ডিস্টার্ব করতে চাই না। তোমার পেপার রিভিশন এমনিতেই অনেক ডিলে হয়ে গেছে আমার জন্য। আমি যাই, গিয়ে আরও একটু পড়ি।"

কথাটা বলেই রাহুল ঘুরে দরজার দিকে পা বাড়াল।

"রাহুল... দাঁড়া।"

(rest of the Chapter continued in the next post...)
Reply


Messages In This Thread
The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-01-2026, 01:31 PM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 05:46 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 05:47 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 05:48 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 05:54 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 05:55 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 05:57 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 05:58 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 05:59 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 08:43 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 08:49 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 08:51 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 08:54 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 08:55 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 08:56 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 08:57 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 08:58 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 08:59 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 09:00 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 09:01 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 09:04 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 09:05 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 09:06 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-05-2026, 06:02 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-05-2026, 06:02 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-05-2026, 06:04 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-05-2026, 06:04 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-05-2026, 08:55 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-05-2026, 08:55 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-05-2026, 08:57 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-05-2026, 08:59 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-05-2026, 08:59 AM

Forum Jump:


Users browsing this thread: 1 Guest(s)