Thread Rating:
  • 1 Vote(s) - 5 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5

The Barter System (By:andygarfield)
#16

দশম পরিচ্ছেদ: মুখোশের অন্তরাল এবং এক আদিম জলের চুক্তি


১০.১. রুটিনের আবর্তে প্রত্যাবর্তন ও স্বাভাবিকতার নিখুঁত মুখোশ

সুব্রত সেনের ফিরে আসার পর থেকেই সেন বাড়ির রুটিন আবার তার নিজস্ব চিরচেনা, সুশৃঙ্খল কক্ষপথে ফিরে গিয়েছিল। গত শুক্রবার রাতের আর শনিবার সন্ধ্যার সেই অলৌকিক, নিষিদ্ধ এবং আদিম ঘোরের ছিটেফোঁটা প্রমাণও আর এই বাড়ির কোথাও অবশিষ্ট নেই। সদর দরজা দিয়ে সুব্রত যখন তাঁর চামড়ার ভারী স্যুটকেস হাতে প্রবেশ করেছিলেন, তখন থেকেই পুরো বাড়ির রসায়নটা এক লহমায় বদলে গিয়েছিল। যে দেওয়ালগুলো ওই দু'দিন ধরে মা এবং ছেলের এক পরম, গোপন চুক্তির সাক্ষী ছিল, সেই দেওয়ালগুলোই যেন মুহূর্তে এক অদৃশ্য সামাজিক বর্মে নিজেদের ঢেকে ফেলেছিল।

ইন্দিরা তাঁর সেই প্রাজ্ঞ, রাশভারী এবং নিখুঁত স্ত্রীর চরিত্রটিতে ফিরে যেতে এক সেকেন্ডও সময় নেননি। সুব্রত ফিরে আসার পর থেকে তিনি তাঁর সেই চিরচেনা রূপটিই বজায় রেখেছেন। ডাইনিং টেবিলে বসে কফিতে চুমুক দেওয়ার সময় তাঁর সেই মেপে মেপে কথা বলা, খবরের কাগজের পাতা উল্টানোর সেই আভিজাত্যপূর্ণ শব্দ, কিংবা সুব্রতর সাথে ইউনিভার্সিটির পলিটিক্স নিয়ে আলোচনার সময় তাঁর গলার সেই তীক্ষ্ণ, আত্মবিশ্বাসী স্বর—সবকিছুই প্রমাণ করছিল যে তিনি কতটা নিখুঁতভাবে নিজের চারপাশের গণ্ডিটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। সুব্রতর সামনে তিনি রাহুলের সাথে সেই পুরোনো, পরিমিত দূরত্বটাই বজায় রেখে চলেছেন। ছেলের পড়াশোনার খোঁজ নেওয়া, সেমিস্টারের পরীক্ষা নিয়ে গম্ভীরভাবে আলোচনা করা, কিংবা কোনো ভুল করলে সেই চেনা কড়া নজরে তাকানো—কোথাও বিন্দুমাত্র ফাঁক নেই। সুব্রতর চোখে, তাঁর স্ত্রী এবং ছেলের সম্পর্কটা ঠিক ততটাই শৃঙ্খলাপরায়ণ ও স্বাস্থ্যকর, যতটা তিনি নিজে বিশ্বাস করেন।

কিন্তু এই নিখুঁত স্বাভাবিকতার মুখোশের আড়ালেই চলছিল এক অন্য মনস্তাত্ত্বিক খেলা। যখনই সুব্রত বাড়িতে থাকতেন না, বা নিজের ঘরে ল্যাপটপ নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মিটিংয়ে ব্যস্ত থাকতেন, তখন সেই ভারী, গম্ভীর মুখোশে সূক্ষ্ম ফাটল ধরত। শুধুমাত্র রাহুলের সামনে, যখন তারা সম্পূর্ণ একা, ইন্দিরার সেই আভিজাত্যের বর্মটা সামান্য হলেও গলে গিয়ে সেখানে এক প্রশ্রয়, এক প্রচ্ছন্ন চপলতা উঁকি দিত। করিডোর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় হঠাৎ করে কেউ না দেখতে পেলে রাহুলের চুলে একটা হালকা, আদুরে টান দেওয়া, কিংবা ডাইনিং টেবিলে বসে হঠাৎ করেই ছেলের গালটা আলতো করে টিপে দিয়ে ফিসফিস করে "পাকা ছেলে" বলা—এই ছোট ছোট, কিন্তু নিবিড় মুহূর্তগুলোই গত কয়েকটা দিনে রাহুলের একমাত্র অক্সিজেন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ইন্দিরার এই দ্বৈত রূপ—বাইরে এক কঠোর, মাপা শাসন এবং ভেতরে এক স্নেহময়ী মায়ের প্রশ্রয়—রাহুলের কাছে এক নেশার মতো হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ওর জন্য এটুকুই যথেষ্ট ছিল না। গত শুক্র ও শনিবারের সেই চরম, বাধাহীন সমর্পণের পর, এই ছোটখাটো স্পর্শগুলো ওর অবাধ্য, তৃষ্ণার্ত মনকে শান্ত করতে পারছিল না।


দেখতে দেখতে ছ'টা দিন কেটে গেল। শুক্রবারের সন্ধে। সুব্রত নিজের ঘরে দরজা ভেজিয়ে কোনো এক ক্লায়েন্টের সাথে দীর্ঘ ভার্চুয়াল মিটিং-এ ব্যস্ত। পুরো বাড়িটা একটা অদ্ভুত, ভারী নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। ড্রয়িংরুমের বিশাল ঘড়িটার টিকটিক শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই।

ইন্দিরা এবং রাহুল এখন রান্নাঘরে। রান্নার মাসি একটু আগেই কাজ শেষ করে চলে গেছে। সিঙ্কের ওপর জমে থাকা ডিনারের কিছু এঁটো বাসন পরিষ্কার করার কাজে হাত লাগিয়েছেন ইন্দিরা, আর রাহুল একটা শুকনো সুতির কাপড় দিয়ে সেই ধোয়া বাসনগুলো পরম নিপুণতায় মুছে শেলফে সাজিয়ে রাখছে। রান্নাঘরের সাদা, উজ্জ্বল এলইডি আলো ইন্দিরার ফর্সা, তীক্ষ্ণ মুখমন্ডলের ওপর এসে পড়েছে। তাঁর পরনে একটা হালকা নীল রঙের সুতির শাড়ি, আঁচলটা কোমরে গোঁজা। জলের কলের সেই একটানা, মৃদু শব্দটার আড়ালেই চলছিল তাদের নীরব কথাপোকথন।

রাহুল আর পারছিল না। গত ছয়দিনের এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতি ওর ভেতরের সমস্ত ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে দিচ্ছিল। সে হাতের প্লেটটা একটু বেশি শব্দ করে কাউন্টারের ওপর নামিয়ে রাখল।

"মা, আমি আর জাস্ট পারছি না," রাহুল ফিসফিস করে বলল, গলার স্বরে এক তীব্র, চাপা অভিযোগ। "তুমি একদম পালটে গেছ। বাবা ফেরার পর থেকে তুমি আমার সাথে জাস্ট একটা রোবটের মতো বিহেভ করছ। ওই শনিবার রাতের পর থেকে তুমি আমাকে একবারের জন্যও কাছে ডাকলে না। জাস্ট একটা হাগ করতেও দিলে না!"

ইন্দিরা সিঙ্কের ওপর ঝুঁকে একটা কাঁচের বাটি মাজছিলেন। ছেলের এই অভিযোগ শুনে তিনি সাবান মাখা হাতদুটো সিঙ্কের ভেতরেই রেখে ঘাড় ঘুরিয়ে ওর দিকে তাকালেন। চোখের দৃষ্টিতে এক মাতৃসুলভ বিরক্তি, কিন্তু ঠোঁটের কোণে লুকিয়ে থাকা সেই চেনা প্রশ্রয়ের হাসিটা তিনি আড়াল করতে পারলেন না।

"উফ্, আবার সেই ঘ্যানঘ্যান শুরু করলি?" ইন্দিরা একটা কৃত্রিম, দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিসফিস করে ধমকে উঠলেন। "একবার নিজের দিকে তাকিয়ে দেখ তো! এত এত আদর, এত স্পেশাল ট্রিটমেন্ট দিলাম তোকে, আর কিছু দিন যেতে না যেতেই তোর মুখে এইসব কথা? তোর মতো এমন ঘ্যানঘ্যানে বাঁদরকে আর কোন মা এত সহ্য করে রে? আমাকে জাস্ট একটা অন্য মায়ের নাম বল তো, যে নিজের ছেলের ফালতু আবদার মেটাতে এত কিছু করে?"

রাহুল বিন্দুমাত্র দমে না গিয়ে হাতের কাপড়টা দিয়ে আরেকটা প্লেট মুছতে মুছতে বাঁকা হাসল। "আমি কী করে বলব মা? আমি তো আর অন্য মায়েদের অত কাছ থেকে চিনি না। অন্য মায়েরা তাদের ছেলেদেরকে কতটা আদর করে, বা কী কী করে, সেটা তো আমার জানার কথা নয়।"

ইন্দিরা এবার একগাল সাবানের ফেনা নিয়ে রাহুলের গায়ে ছিটিয়ে দেওয়ার একটা মিথ্যা ভঙ্গি করলেন। চোখ দুটো বড় বড় করে এক আদুরে রাগে বললেন, "খালি পাকা পাকা কথা! অন্য মায়েদের কথা তোর জানতে হবে না! তুই নিজে কতটা ডিমান্ডিং আর অকৃতজ্ঞ, সেটা বুঝলেই হবে। আমি তোকে যতটা মাথায় তুলে রাখি, আমি তোকে যতটা প্যাম্পার করি... পৃথিবীর আর কোনো মা তার এত বড় ধেড়ে ছেলেকে এত লাই দেয় না। বড্ড স্পয়েল্ড হয়ে গেছিস তুই, রাহুল। মাথায় চড়ে বসেছিস আদরে আদরে।"

"সত্যি? আমি স্পয়েল্ড?" রাহুল এবার একটু ঘাড় বাঁকিয়ে, অভিমানী সুরে ফিসফিস করল। "আমি হচ্ছি সেই ছেলে, যাকে সবসময় নিজের মায়ের এই মেকি, রাশভারী, গম্ভীর মুখোশটা সহ্য করতে হয়। আমি তো তোমার আসল রূপটা, তোমার এই নরম, আদুরে দিকটা শুধু তখনই দেখতে পাই যখন কাছাকাছি কেউ থাকে না! যেমন এখন। অন্য মায়েরা তো তাদের ছেলেদের সবসময় আদর করে। ওই তো, বরুণের মায়ের কথাই ধরো না... যখনই বরুণকে নিয়ে শপিং মলে যায় বা পাড়ার রাস্তায় হাঁটে, কেমন ওর হাতটা শক্ত করে ধরে থাকে। আমি তো কতদিন দেখেছি রাস্তায় সবার সামনেই বরুণকে কেমন জড়িয়ে ধরে..."

বরুণের মায়ের প্রসঙ্গটা উঠতেই ইন্দিরার মুখের রেখাগুলো এক লহমায় কঠিন হয়ে গেল। তাঁর সেই প্রচ্ছন্ন হাসির আভা মুছে গিয়ে সেখানে এক অভিজাত, বুদ্ধিজীবী নারীর অহংকার ফুটে উঠল। তিনি ভুরু দুটো কুঁচকে কলটা বন্ধ করলেন। একটা তোয়ালেতে হাত মুছতে মুছতে অত্যন্ত প্রখর, ফিসফিস স্বরে বললেন:

"উফ্, আবার ওই বরুণের মা? তোকে বারণ করেছি না বাইরের লোকের পার্সোনাল ব্যাপার নিয়ে কথা না বলতে? আর প্লিজ রাহুল, আমাকে ওইসব লোকদেখানো আদিখ্যেতার সাথে কমপেয়ার করবি না। আমি তোকে ওরকম ন্যাতাক্যাতা করে আদর করি না কারণ আমি চাই তুই একজন দায়িত্বশীল, স্বাবলম্বী পুরুষ হয়ে ওঠ। আমি তোকে ওরকম একটা 'মাম্মিজ বয়' বানাতে চাই না, বুঝতে পেরেছিস?"

রাহুল বাসন মোছার কাপড়টা কাউন্টারে নামিয়ে রেখে ইন্দিরার দিকে একদম সোজা তাকাল। চোখের দৃষ্টিতে এক তীক্ষ্ণ, ধূর্ত প্রশ্ন। "তাই নাকি? তুমি কি সত্যিই মনে করো... যে আমি মাম্মিজ বয় নই?"

ইন্দিরা তাঁর হাতের তোয়ালেটা কাউন্টারের ওপর একটা মৃদু 'ঠপ' শব্দ করে নামিয়ে রাখলেন। তারপর কিচেন কাউন্টারের মার্বেলের স্লাবে একটু হেলান দিয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর ফর্সা মুখে এখন এক ব্যঙ্গাত্মক, কিন্তু একই সাথে স্নেহমাখা দৃষ্টি। তিনি রাহুলের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত ধীরে, চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন:

"অন্তত বরুণের মতো ওরকম অপদার্থ 'মাম্মিজ বয়' তুই নোস। ওই ছেলেটার তো নিজের নাকটা মুছতেও মায়ের পারমিশন লাগে! তুই ওর চেয়ে অনেক বেশি সেলফ-সাফিসিয়েন্ট, নিজের কাজ নিজে করতে পারিস। তুই শুধু... তুই জাস্ট বড্ড বেশি ডিমান্ডিং... আর মাঝে মাঝে এতটাই ঘ্যানঘ্যান করিস যে আমার তোর কান মূলে দিতে ইচ্ছে করে।"

"মা! তুমিই বললে বাইরের লোকের ব্যাপারে কমেন্ট না করতে, আর সেই তুমিই দুম করে বরুণকে অপদার্থ-টপদার্থ বলে কত কী না বলতে লাগলে! "

নিজের বলা কথাগুলোর জন্য এক ধরণের অস্বস্তি বোধ করলেন ইন্দিরা। কারোর নামে কুৎসা করা তাঁর স্বভাবে নেই, অথচ তিনি সেটাই করলেন। কেন এমন করলেন তিনি? রাহুল বরুণের মায়ের সাথে তাঁর তুলনা টানতেই কি ওঁর মাতৃত্ব ও নারীত্বের ইগোতে আঘাত লাগল?

রাহুল লক্ষ করল, তার মা কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে কী সব ভেবে চলেছেন। রাহুলের আর এই প্রসঙ্গে ইন্দিরাকে বিব্রত করতে ইচ্ছে করল না। ও এক পা এগিয়ে গিয়ে ইন্দিরার ডান হাতটা নিজের দুহাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে ফেলল। ওর চোখের সেই চপলতা মুছে গিয়ে সেখানে এক আর্তি ফুটে উঠেছে।

"মা... ওসব বাদ দাও... বলছি যে... চলো না..." রাহুল একদম ফিসফিস করে, প্রায় অনুনয়ের সুরে বলল, "চলো না আমার ঘরে... জাস্ট একটুক্ষণের জন্য... পাঁচ মিনিটের জন্য হলেও একটু আদর করবে চলো না... প্লিজ মা।"

রাহুলের এই আচমকা শারীরিক স্পর্শ আর প্রস্তাবে ইন্দিরার শরীরটা যেন একটা তীব্র ইলেকট্রিক শকের মতো কেঁপে উঠল। তিনি এক ঝটকায় নিজের হাতটা রাহুলের মুঠো থেকে ছাড়িয়ে নিলেন। তাঁর ফর্সা গালদুটো মুহূর্তের মধ্যে লজ্জায় আর এক অদ্ভুত নার্ভাসনেসে টকটকে লাল হয়ে গেল। তিনি এমন একটা ভান করলেন যেন অত্যন্ত কেলেঙ্কারির কিছু একটা ঘটে গেছে, কিন্তু তাঁর এই ভানটার মধ্যে কোনো আসল রাগ ছিল না, পুরোটাই ছিল একজন মায়ের অবচেতন আত্মরক্ষা। তাঁর বড় বড়, সন্ত্রস্ত চোখদুটো রান্নাঘরের দরজা পেরিয়ে উপরের করিডোরের দিকে চলে গেল, যেখান থেকে সোজা তাঁর ঘরের আলোটা দেখা যাচ্ছে, যেখানে সুব্রত বসে জুম মিটিং সারছেন ।

"রাহুল!" ইন্দিরা দাঁতে দাঁত চেপে এক তীব্র, শ্বাসরুদ্ধকর ফিসফিসানিতে ধমকে উঠলেন। "তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? তোর বাবা এখন বাড়িতে, আর তুই এখানে দাঁড়িয়ে এসব ফালতু কথা বলছিস?"

"আহা মা, বাবা তো নিজের কাজের মধ্যে একদম ডুবে আছে," রাহুল বিন্দুমাত্র না দমে যুক্তি দিল। "এই শোনো শোনো, একটু কান খাড়া করলেই বাবার বকবক করার শব্দ শোনা যাচ্ছে। বাবা কোনোমতেই বেরোবে না এখন।"

ইন্দিরা দুশ্চিন্তায় নিজের নাকের ওপরের অংশটা দুই আঙুল দিয়ে চেপে ধরলেন। তাঁর বুকের ভেতরটা তখন ধড়ফড় করছে। "ওসব কনফারেন্স কল আমি খুব ভালো করে চিনি, রাহুল। যেকোনো মুহূর্তে তোর বাবা ঘর থেকে বেরিয়ে জল খেতে আসতে পারে, বা অন্য কোনো ব্যাপারে আমার খোঁজ করতে পারে। না না রাহুল, এটা খুব রিস্কি হয়ে যাবে। তুই জানিস আমাদের কতটা সাবধানে থাকতে হবে সোনা। আমরা ওরম হুটহাট যা খুশি তাই করতে পারি না। উই হ্যাভ টু বি ডিসক্রিট!"

রাহুল এবার একটু মুখটা ফুলিয়ে, ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, "হুম... আমি তো সিওর বরুণের মা নিশ্চয়ই বরুণকে ওদের ড্রয়িংরুমে, ওর বাবার সামনে বসেই বুকে জড়িয়ে আদর করে। ওদের তো কোনো ডিসক্রিট হওয়ার ব্যাপার নেই।"

ইন্দিরা এবার সত্যিই বিরক্ত হলেন। ওই বারবার একই তুলনা তাঁর ইগোতে মারাত্মক আঘাত করছিল। তিনি চোখদুটো ছোট ছোট করে অত্যন্ত বিরক্তির সাথে ফিসফিস করে বললেন, "উফ্, ভগবান! আবার ওই বরুণ! শোন রাহুল, ওরা ওরকম করতে পারে কারণ ওদের কোনো ফিল্টার নেই। ওরা বড্ড বেশি ক্যাজুয়াল। তুই আর আমি... আমরা ওদের মতো নই।"

রাহুল এবার ওর সেই ধূর্ত হাসিটা হাসল। ও জানে ওর মায়ের এই বিশাল অহংকারটাকে কীভাবে নিজের কাজে লাগাতে হয়। "ওহ্, আচ্ছা! আসল কথা হলো তুমি বরুণের মায়ের মতো নও... রাইট? কারণ তুমি তো হলে 'দ্য ইন্দিরা সেন'।"

ছেলের মুখে নিজের এই উপাধিটা শুনে ইন্দিরার ঠোঁটের কোণে একটা অবাধ্য হাসি উঁকি দিল, কিন্তু তিনি সেটাকে জোর করে চেপে রাখলেন। তিনি নিজের শাড়ির আঁচলটা একটু ঠিক করে নিয়ে এক নাটকীয় এবং রাজকীয় ভঙ্গিতে ঘাড়টা একটু সোজা করে দাঁড়ালেন।

"হ্যাঁ, দ্য ইন্দিরা সেন," তিনি অত্যন্ত গর্বের সাথে ফিসফিস করলেন। "এবং হ্যাঁ, আমার একটা নিজস্ব ডেকোরাম আছে। আমি অন্তত বরুণের মায়ের মতো সবার সামনে খোলা খাতার মতো নিজেকে মেলে ধরি না। আমার একটা স্ট্যান্ডার্ড আছে। আমার ক্লাস আছে।"

রাহুল এবার একদম মোক্ষম চালটা চালল। একটু ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল, "তাই? তা ক্লাসওয়ালা মায়েরা কি তাদের ছেলেদের আদর করে না?"

ইন্দিরা আত্মরক্ষার খাতিরে নিজের বুকের ওপর হাতদুটো আড়াআড়িভাবে বেঁধে ফেললেন। "আমার কথার উলটোপালটা মানে করবি না তুই। অবশ্যই ক্লাসওয়ালা মায়েরা তাদের ছেলেদের আদর করে। কিন্তু তাই বলে বরুণের মায়ের মতো... সবার সামনে... ওইভাবে নয়।"

রাহুল ওর চোখদুটো দুষ্টুমিতে ভরিয়ে তুলে বলল, "ওহ আচ্ছা... তার মানে ক্লাসওয়ালা মায়েরা শুধু তখনই তাদের ছেলেদের আদর করে, যখন তাদের হাসব্যান্ড বিজনেস ট্যুরে যায়... তাই তো?"

রাহুলের মুখের এই কথাগুলো শোনার পর ইন্দিরার শরীরটা যেন বরফ হয়ে গেল। তাঁর সেই নিখুঁত, রাজকীয় অহংকারের মুখোশটা এক সেকেন্ডে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। তাঁর চোখদুটো বিস্ময়ে আর চরম লজ্জায় এতটাই বড় হয়ে গেল যে মনে হলো ঠিকরে বেরিয়ে আসবে। ফর্সা গাল, গলা, এমনকি কান পর্যন্ত এক গাঢ় লাল রঙে রাঙা হয়ে গেল। তিনি কয়েক মুহূর্ত কোনো কথাই বলতে পারলেন না, শুধু খাবি খেলেন। তারপর এক চরম বিভ্রান্ত, লজ্জামাখা এবং প্রচ্ছন্ন হাসিতে ফেটে পড়ে তিনি ফিসফিস করে হিসহিসিয়ে উঠলেন:

"রাহুল! তোর... তোর একটুও লজ্জা করে না নিজের মায়ের মুখের ওপর এত নির্লজ্জের মতো কথা বলতে? তুই একটা আস্ত অসভ্য, ইনসাফারেবল বাঁদর! ভাগ্যিস তোর বাবা জানে না আমি তোকে কতটা স্পয়েল করি... আর এসবের জন্য কে দায়ী শুনি? তুই! তুই তোর ওই ফালতু, ধূর্ত 'বার্টার সিস্টেম' দিয়ে আমাকে এসব করতে বাধ্য করেছিস!"

রাহুল চোখ উলটে, একদম নাটুকে ভঙ্গিতে নিজের ডিফেন্স শুরু করল। "ওহ, এখন আমি ধূর্ত হয়ে গেলাম? তুমি আমাকে প্রতিটা ধাপে খাটিয়ে খাটিয়ে সব আদায় করতে বাধ্য করেছ, মা! মনে নেই? আমাকে প্রতিটা ধাপে প্রুভ করতে হয়েছে নিজেকে! ওই বিশ্রী কঠিন এমসিকিউ এক্সামে ফুল মার্কস পেতে হয়েছিল শুধু একটা রাতের জন্য তোমাকে জড়িয়ে ধরার পারমিশন পেতে! তারপর ওই বিছানায় শুয়ে তুমি আবার আমার কেমিস্ট্রির ভাইভা নিলে... কারণ তোমার ব্লাউজের কাপড় আমার গায়ে খসখস করছিল শুনেও এমনি তুমি ওটা খুলতে চাইছিলে না! আর তারপর... ওই মাঝরাতে আমাকে রান্নাঘরে পাঠিয়ে এঁটো বাসন মাজিয়েছ, তবে গিয়ে তুমি আমাকে...."

ইন্দিরার অবস্থা তখন দেখার মতো। একদিকে সুব্রত শুনতে পাবে সেই চরম আতঙ্ক, অন্যদিকে রাহুলের এই ঠোঁটকাটা সত্যি কথাগুলো তাঁকে এক অদ্ভুত অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে। তিনি প্রায় প্যানিক করতে করতে হাত নেড়ে ফিসফিস করে ধমকাতে লাগলেন:

"আস্তে! আস্তে কথা বল, রাহুল! উফ্, তুই এত লাউডলি কথা বলছিস কেন? তোর বাবা শুনতে পেয়ে যাবে তো! আর আমি তোকে বারণ করছি, ওই প্রাইভেট ডিটেইলসগুলো এভাবে মুখের ওপর বলবি না আমাকে! তোকে নিয়ে পারা যায় না সত্যি!"

ইন্দিরার এই ধমকের মধ্যে কোনো সত্যিকারের রাগ ছিল না, পুরোটাই ছিল এক লজ্জামিশ্রিত অসহায়তা। রাহুল সেটা খুব ভালো করেই বুঝতে পারল। ও এবার আর তর্কে গেল না। ও এক পা এগিয়ে গিয়ে ইন্দিরার হাতদুটো খুব নরম করে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিল। ওর গলার স্বর এবার একদম বদলে গিয়ে এক গভীর, আর্দ্র এবং তীব্র ভালোবাসার সুরে নেমে এল।

"মা..." রাহুল ফিসফিস করে বলল, ওর চোখের দৃষ্টিতে এক আকুল তৃষ্ণা। "বাবা ফেরার পর থেকে আমি তোমাকে একবারও ভালো করে জড়িয়ে ধরতে পারিনি। একবারও না। তুমি আমাকে বলো... গত শুক্রবার রাতে যেভাবে আমি তোমার বুকে ছিলাম... যে আরামটা পেয়েছিলাম... তার পর আমি কী করে এখন তোমার এই দূরে দূরে থাকাটা মেনে নিই? আমার যে বুকের ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে মা..."

রাহুল একটু থামল, তারপর ওর গলাটা আবেগে বুজে এল, "আর... আর ওই শনিবারের রাতটা... শনিবারের রাতটা..."

ছেলের এই আকুলতা দেখে ইন্দিরার ভেতরের সমস্ত যুক্তির প্রাচীর, সমস্ত সামাজিক ভয় ততক্ষণে গলতে শুরু করেছে। তিনি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলেন, তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই যুবক ছেলেটার মধ্যে লুকিয়ে থাকা সেই তৃষ্ণার্ত শিশুটিকে। তাঁর গলাটাও বড্ড নরম শোনাল, "শনিবার রাতে কী... কী হয়েছিল, সোনা?"

রাহুল ওর চোখ দুটো নামিয়ে নিল, একটু তোতলাতে তোতলাতে বলল, "তোমার মনে নেই মা... আমি যে... তোমার..."

ইন্দিরার ফর্সা গালদুটো লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। তিনি মুখটা সামান্য অন্যদিকে ঘুরিয়ে অত্যন্ত নরম, মাতৃসুলভ ফিসফিসানিতে বললেন, "হ্যাঁ... আমার ওই তিলটা নিয়ে তোর ওই বোকা বোকা পাগলামি... উফ্ রাহুল... একদম একটা ক্রেজি বাচ্চার মতো... তুই... তুই ওটা..." শব্দটা উচ্চারণ করতে তাঁর নিজেরই কেমন একটা আড়ষ্ট লাগছিল, কিন্তু চোখ সরিয়েই তিনি বললেন, "...ওটা চাটছিলিস... আমি এখনও বুঝি না, সোনা, তোর যে কী হয়..."

"হ্যাঁ মা, কিন্তু শুধু তো ওটা নয়," রাহুল এবার একদম বিড়বিড় করে বলতে শুরু করল, কথাগুলো গুছিয়ে বলতে ওর খুব কষ্ট হচ্ছিল। "তুমি আমাকে দিয়েছিলে... আরও একটা জিনিস... মা... ইয়ে মানে... তোমার... তোমার ঠোঁটদুটো..."

ইন্দিরা বুঝতে পারলেন ছেলে কোন দিকে যাচ্ছে। তাঁর শ্বাসটা একটু ভারী হয়ে এল। তিনি অত্যন্ত ইতস্তত করে, প্রায় অসংলগ্নভাবে বললেন, "সোনা... ওই ব্যাপারটা... আমি তো ওটা একদমই করতে চাইনি... তুই এমন একটা বাচ্চাদের মতো জেদ ধরেছিলি... তবে তারপরে তো সব ঠিকঠাক ভাবেই মিটে গেছিল... আই গেস ইট ওয়াজ ওকে..." ইন্দিরার নিজেরও যেন বাক্য গঠন করতে কষ্ট হচ্ছিল এই চরম অস্বস্তিকর আর নিষিদ্ধ প্রসঙ্গটায়।

রাহুল তখন এক ঘোরের মধ্যে। "ইট ওয়াজ... মা, আমি বলে বোঝাতে পারব না আমার ঠিক কেমন ফিল হচ্ছিল..."

ইন্দিরা একটু নার্ভাস হয়ে বললেন, "কেন সোনা... আমার তো মনে আছে, ওরপর আমাদের একটু কথাও হলো... তোর বাবার ফিরে আসা নিয়ে... তারপর তুই গুডনাইট বলে চলে গেলি... সবই তো ঠিক ছিল, তাই না? তোর কি... তোর কি খুব অদ্ভুত লাগছিল?"

রাহুল মাথা নিচু করে, প্রায় অস্পষ্ট আর জড়ানো স্বরে বিড়বিড় করল, "মা, ওটা আমার ফার্স্ট টাইম ছিল... কারোর ঠোঁটে কিস করা... আর সেটাও... সেটাও..." ও একটু থামল, একটা ঢোক গিলল। "মা, আমি ওই রাতে অনেকক্ষণ ঘুমোতেই পারিনি... আমার ভেতরে সারাক্ষণ ওই ফিলিংসটা ঘুরপাক খাচ্ছিল... এমনকি যখন ঘুমিয়ে পড়লাম... আমার স্বপ্নে... আমি ওটাই বারবার দেখছিলাম... তুমি ছিলে... আমি ছিলাম... তুমি আমার গালদুটো ধরেছিলে... আর তারপর তুমি..."

রাহুলের কথার মাঝপথেই ইন্দিরার পুরো মুখমণ্ডল এক চরম লজ্জায় আর অদ্ভুত, গোপন এক আতঙ্কে টকটকে লাল হয়ে উঠল। তিনি তড়িঘড়ি ওর হাতদুটো চেপে ধরে, এক চাপা প্যানিকের সুরে ওকে থামিয়ে দিলেন, "থাক রাহুল... বাদ দে... তোকে আর বলতে হবে না..."

রাহুল এবার ওর সেই আর্দ্র, তৃষ্ণার্ত চোখদুটো তুলে মায়ের দিকে তাকাল। "মা... প্লিজ... এই মুহূর্তে আমার যে শুধু তোমাকেই বড্ড দরকার মা... জাস্ট একটুখানি সময়ের জন্য... দেবে না একটু?"

রাহুলের এই গলার স্বর, এই চোখের চাউনি ইন্দিরার ভেতরের সমস্ত অবশিষ্ট প্রতিরক্ষাকে এক নিমেষে গুঁড়িয়ে দিল। তাঁর নিজের বুকের ভেতরেও যে গত ছ'দিন ধরে এক অদ্ভুত হাহাকার চলছিল, তা আজ আর অস্বীকার করার উপায় রইল না। তিনি হার মানলেন। এক দীর্ঘ, পরাস্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি রাহুলের হাতের ওপর নিজের হাতটা রাখলেন।

"তুই... তুই একটা আস্ত একগুঁয়ে বাঁদর," তিনি ফিসফিস করে বললেন, গলার স্বরে এক চরম মাতৃত্বের আত্মসমর্পণ। "ঠিক আছে... চল। কিন্তু একদম কোনো আওয়াজ করবি না, আর খুব তাড়াতাড়ি... মনে থাকে যেন।"

রাহুলের মুখটা এক লহমায় হাজার ওয়াটের আলোর মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

ইন্দিরা খুব সাবধানে রান্নাঘরের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলেন। তাঁর বুকের ভেতরটা তখন ধড়ফড় করছে। টেনশন আর নার্ভাসনেসে তাঁর মগজটা ঠিকমতো কাজ করছিল না। তিনি রাহুলের হাতটা শক্ত করে ধরে সামনের দিকে এগোতে লাগলেন। কিন্তু এই চরম প্যানিকের ঘোরে তাঁর অবচেতন মন এক মারাত্মক ভুল করে বসল। তিনি রাহুলকে টেনে নিয়ে সোজা এগোতে লাগলেন বসার ঘরের বড় সোফাটার দিকে।

রাহুল অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। "মা! তুমি কী করছ? তুমি কি পাগল হয়ে গেলে? লিভিং রুমে? পুরো ওপেন স্পেসে?"

ইন্দিরা চমকে উঠলেন। তাঁর ধ্যান ভাঙল। তিনি এদিক-ওদিক তাকিয়ে বুঝতে পারলেন তিনি কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন। এক চরম আতঙ্কে তাঁর চোখদুটো বড় বড় হয়ে গেল, তিনি নিজের হাত দিয়ে নিজের মুখটা চেপে ধরলেন। তাঁর ফর্সা গালদুটো লজ্জায় একদম লাল হয়ে গেল। তিনি নিজেকে এক ঝটকায় সামলে নিয়ে এক চরম ফিসফিসানিতে ধমকে উঠলেন, "তুই আমাকে কী ধরনের মা ভাবিস, হ্যাঁ? লিভিং রুমে? ইমপসিবল!"

কিন্তু টেনশনে তাঁর মুখ দিয়ে চরম ভুল শব্দটা বেরিয়ে এল, "আমার ঘর। এক্ষুনি চল।"

রাহুল এবার আরও জোরে ফিসফিস করে উঠল, "মা! তোমার ঘরেই তো বাবা বসে আছে!!! তুমি কি সত্যিই পাগল হয়ে গেলে আজ?"

ইন্দিরা এবার নিজের কপালে নিজেই একটা হাত চাপড়ালেন। নিজের এই বোকা বোকা ভুলে তাঁর নিজেরই চরম বিরক্তি আর লজ্জা লাগছিল। তিনি চোখ উলটে, দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বললেন, "উফ্! আমার ঘর না, তোর ঘর, আমি তোর ঘরের কথা বলতে চাইছিলাম! তোর এই ফালতু প্রপোজাল আমাকে এত নার্ভাস করে দিয়েছে যে আমি উলটোপালটা বকছি! চল শিগগির!"

তিনি আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ালেন না। রাহুলের কবজিটা শক্ত করে খামচে ধরে তিনি প্রায় ওকে টানতে টানতে উপরে উঠে গেলেন এবং ওর বেডরুমের ভেতর ওকে একরকম ঠেলেই ঢুকিয়ে দিলেন।

ভেতরে ঢুকেই তিনি অত্যন্ত দ্রুত হাতে দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। বন্ধ দরজার গায়ে নিজের পিঠটা ঠেকিয়ে তিনি একটা দীর্ঘ, হাঁপানো শ্বাস ফেললেন। তাঁর চোখদুটো বন্ধ, বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে। ঠিক যেন কোনো টিনএজ মেয়ে কোনো গোপন প্রেমিকের সাথে লুকিয়ে দেখা করতে এসে নার্ভাস হয়ে পড়েছে। তিনি বিড়বিড় করে ফিসফিস করলেন, "হে ভগবান... এই ছেলেটা একদিন আমার হার্ট অ্যাটাক করিয়েই ছাড়বে!"


১০.২. শয়নকক্ষের অভয়ারণ্য

বন্ধ দরজার ভেতরের পরিবেশটা বাইরের করিডোরের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে কোনো ভয়ের ছায়া নেই, আছে কেবল এক উষ্ণ এবং নিভৃত অভয়ারণ্য। জানলার ভারী পর্দাগুলো টানা, ঘরের ভেতর একটা আবছা, মখমলি অন্ধকার।

রাহুল এক লাফে নিজের বিছানায় গিয়ে উঠল। ওর চোখেমুখে এক অদ্ভুত, নিষ্পাপ এবং শিশুর মতো উত্তেজনা। ও হাত বাড়িয়ে ফিসফিস করে ডাকল, "মা... আসো না... প্লিজ জলদি আসো।"

ইন্দিরা দরজার ওপর থেকে পিঠ সরিয়ে একটা গভীর, স্নেহমাখা এবং কৌতুকী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর ঠোঁটের কোণে এক পরম প্রশ্রয়ের হাসি। তিনি ধীর পায়ে বিছানার কাছে এগিয়ে গেলেন।

আর যেই মুহূর্তে তিনি বিছানায় এসে রাহুলের পাশে শুলেন, রাহুলও দেরি না করে নিজের দুহাত দিয়ে ইন্দিরার কোমর এবং পিঠ শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল। ইন্দিরাও নিজের হাতদুটো দিয়ে ওর পিঠটাকে পরম আশ্লেষে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে ধরলেন। গত ছয় দিনের সেই দীর্ঘ, তৃষ্ণার্ত শূন্যতা যেন এই একটা আলিঙ্গনেই অনেকটা পূর্ণ হয়ে গেল।

"উফ্... মা..." রাহুল ওঁর গলার কাছে মুখ গুঁজে ফিসফিস করে বলতে লাগল, গলার স্বর আবেগে বুজে আসছে। "ফাইনালি... এতগুলো লম্বা দিন পর... আমি তোমাকে এভাবে ছুঁতে পারলাম। আমার যে কী শান্তি লাগছে মা, আমি তোমাকে বোঝাতে পারব না..."

ইন্দিরার আঙুলগুলো রাহুলের চুলে পরম মমতায় বিলি কাটতে লাগল। "আমি জানি সোনা... আমি জানি... মা এখানেই আছে..."

রাহুল বুকের সাথে আরও একটু লেপ্টে গিয়ে খুব নিচু, অনুনয়ের সুরে বলল, "মা... আজকে অন্তত একটু... একটু স্কিন-টু-স্কিন করি না প্লিজ?"

ইন্দিরার পিঠের ওপর হাত বোলানো আঙুলগুলো মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তাঁর বুকের ভেতরটা একটা অজানা শিহরণে কেঁপে উঠল। তিনি একটা গভীর শ্বাস নিয়ে অত্যন্ত নরম, কিন্তু দৃঢ় ফিসফিসানিতে বললেন:

"না সোনা... একদম না। প্রচন্ড রিস্কি এটা, প্লিজ বোঝার চেষ্টা কর বাবু। তোর বাবা যেকোনো মুহূর্তে আমার খোঁজ করতে পারে। প্লিজ... জাস্ট এভাবেই আমাকে জড়িয়ে ধরে রাখ।"

রাহুল ওঁর বুকের সাথে নিজেকে আরও একটু শক্ত করে চেপে ধরল। "আমি তোমাকে বড্ড ভালোবাসি, মা..."

ইন্দিরা নিজের মুখটা রাহুলের গলার খাঁজে গুঁজে দিলেন। তাঁর হাতের আঙুলগুলো রাহুলের শার্টের কাপড়টাকে শক্ত করে খামচে ধরল। তিনি এক চরম, আদুরে ফিসফিসানিতে বললেন, "তুই একদিন ঠিক আমাকে কোনো সাংঘাতিক বিপদে ফেলবি। সেদিন যে কি হবে আমি জানি না।"

"বিপদ টিপদের কথা এখন না বললেই নয়? বাদ দাও না মা, প্লিজ..."

"আচ্ছা বাবা, আচ্ছা"—বলে ইন্দিরা রাহুলের ঘাড়ে আর কাঁধে চুমু খেতে লাগলেন। মায়ের ঠোঁটের ছোঁয়ায় রাহুলের সারা শরীরে একটা মায়াবী শিহরণ জাগল।

কয়েক মুহূর্ত এই নিবিড় স্তব্ধতায় কাটার পর, রাহুল একটু উঠে বসে বলল: "মা, অন্তত আমার জামাটা খুলব? বড্ড গরম লাগছে। আর চিন্তা করো না মা, বাবা যদি ডাকে আমি সঙ্গে সঙ্গে পরে নেবো, আমার পরতে দু'সেকেন্ডও লাগবে না।"

ইন্দিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৃদু হেসে বললেন, "উফফ এই ছেলেটা না... যা করবি কর, ওইসব গরম লাগার অজুহাত দিতে হবে না মাকে।"

রাহুল হাসিমুখে সঙ্গে সঙ্গে ওর জামাটা খুলে বিছানার পাশের চেয়ারে ছুঁড়ে দিল। "আঃ, অনেক আরাম লাগছে এবার।"

রাহুল খালি গায়ে মায়ের বুকের কাছে আরও একটু লেপ্টে এল। কিছুক্ষণ এই উষ্ণতায় চুপচাপ শুয়ে থাকার পর, রাহুল খুব আদুরে, অস্পষ্ট গলায় ফিসফিস করে বলল, "মা... আমার না তোমাকে খুব চুমু খেতে ইচ্ছে করছে..."

ইন্দিরা একটু হেসে বললেন, "এতে আবার জিজ্ঞেস করার কী আছে?" তিনি নিজের ফর্সা ডান গালটা রাহুলের দিকে এগিয়ে দিলেন।

রাহুল মুখটা সামান্য সরিয়ে নিয়ে তোতলামির সুরে বলল, "না মা... ওখানে না... ওই যে... গত শনিবারের মতো..."

ইন্দিরার শরীরের পেশিগুলো এক লহমায় শক্ত হয়ে গেল। তিনি একটু পিছিয়ে গিয়ে চরম দ্বিধাগ্রস্ত, আড়ষ্ট গলায় বললেন, "না না সোনা, ওটা একদম ঠিক নয়। আমি তোকে আগেই বলেছি, গত শনিবার... যা হয়ে গেছে, হয়ে গেছে... ওটা ওখানেই শেষ।"

রাহুল মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত আর্দ্র, ঘোরে-থাকা গলায় বলল, "মা... আমি তোমায় কিচেনে বলছিলাম না যে তারপর আমার কেমন ফিল হয়েছিল... তুমি তো আমাকে শেষ করতেই দিলে না... মা, স্বপ্নে... আমি দেখলাম তুমি আর আমি ঠিক এভাবেই শুয়ে আছি... আমার বিছানায়... আর তুমি আমাকে... ওটা করতে দিলে..."

ইন্দিরার ফর্সা গালদুটো লজ্জায় টকটকে লাল হয়ে উঠল। তিনি নিজের চোখদুটো সরিয়ে নিয়ে অত্যন্ত অসংলগ্ন, কাঁপা ফিসফিসানিতে বললেন, "কিন্তু... সোনা... ওটা তো সত্যি ছিল না... ওটা একটা স্বপ্ন ছিল মাত্র... এটা তো... এটা তো ঠিক নয় রে... মা আর ছেলে... আমি তোকে আগেই বলেছি..."

রাহুল অনুনয় করতে লাগল। "কিন্তু আমার যে বড্ড ভালো লেগেছিল মা... আমি তোমাকে বোঝাতে পারব না... প্লিজ মা... তোমার ঠোঁটদুটো... এত সুন্দর... এত নরম..."

ইন্দিরার বুকের ভেতরটা এক চরম নিষিদ্ধ আবেগে তোলপাড় করে উঠল। তিনি লজ্জায় চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে ধমক দিলেন, "নিজের মাকে এসব কথা বলিস না, সোনা..."

রাহুল ওঁর গলার কাছে মুখ গুঁজে ফিসফিস করল, "আমি সত্যি বলছি মা... তুমিই... তুমিই আমার সবকিছু... আমি তোমাকে বড্ড ভালোবাসি মা..."

ইন্দিরার নিশ্বাস ভারী হয়ে এসেছে। "না না সোনা... প্লিজ, এটা....এটা পসিবল নয়....আমরা করতে পারি না এটা সোনা... অমন করে না বাবু, প্লিজ বোঝার চেষ্টা কর..."

রাহুলের গলার স্বরে এবার এক তীব্র অভিমান আর আর্জি, "মা... গত শনিবার তো তুমি এতটা 'না' করোনি... আজ কেন এত বাধা দিচ্ছ..."

ইন্দিরা প্রায় অসংলগ্ন, ঘোরের ঘোরে বিড়বিড় করলেন, "সোনা... প্লিজ মায়ের সাথে তর্ক করিস না... মায়ের সাথে এমন করিস না... আমি জাস্ট...আমার মাথা কাজ করছে না... আমি ঠিকমতো চিন্তা করতে পারছি না..."

রাহুল ফিসফিস করে বলল, "তাহলে চিন্তা কোরো না, মা..."

ইন্দিরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, চোখ তুলে এক চরম অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, "কেন... তুই কেন আমার ঠোঁটেই চুমু খেতে চাস, সোনা... তুই তো আমার থুতনিতে চুমু খেতে পারিস... ডিফারেন্সটা কোথায়?"

রাহুল অত্যন্ত ধূর্ত, অথচ নেশাগ্রস্ত গলায় ফিসফিস করল, "একজ্যাক্টলি... থুতনি, ঠোঁট... যদি কোনো ডিফারেন্স না-ই থাকে, তাহলে ঠোঁটে নয় কেন, মা?"

ইন্দিরার আবেগতাড়িত চোখে তখন সবে জল এসেছে, কিন্তু তার মধ্যে নিজের ছেলের এই কথাটা শুনে না হেসেও পারলেন না। এক অদ্ভুত, অশ্রুসজল হাসিতে তাঁর মুখটা ভরে উঠল।

"উফ্ রাহুল... তুই সবসময় এত স্মার্টঅ্যাস কেন রে? আমার জ্ঞানী ছেলেটা..." তিনি ঘোরের বশবর্তী হয়ে নিজের মুখটা রাহুলের মুখের আরও একটু কাছে নিয়ে এলেন। তাঁর গলার স্বর এবার একদম অসংলগ্ন, ভাঙা ভাঙা। "তুই তোর মাকে এত ভালোবাসিস, সোনা? কেন... কেন আমাকে এত ভালোবাসিস তুই?"

রাহুল একদৃষ্টে মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "তুমি এত কঠিন প্রশ্ন কেন করো মা... আমি জানি না... আমি শুধু এটুকু জানি যে আমি তোমাকে পৃথিবীর অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসি... আর আমার মনের ভেতর তুমি ছাড়া আর কেউ নেই মা..."

ইন্দিরার চোখের কোণ থেকে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। তিনি এক চরম ইমোশনাল ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে ফিসফিস করলেন, "ওহ আমার সোনা... আমার বাবু..."

কয়েক মুহূর্তের এক ভারী, স্তব্ধ নীরবতা। তারপর, অত্যন্ত নিচু, প্রায় শোনা যায় না এমন এক কাঁপানো ফিসফিসানিতে তিনি বললেন, "সোনা... ঠোঁটদুটো... কাছে নিয়ে আয়..."

রাহুল যেন এক অলৌকিক ঘোরের মধ্যে মন্ত্রমুগ্ধের মতো নিজের মুখটা এগিয়ে নিয়ে গেল। আর ইন্দিরা নিজেই সামান্য এগিয়ে এসে সেই বাকি দূরত্বটুকু ঘুচিয়ে দিলেন।

(rest of the Chapter in the next post...)
Reply


Messages In This Thread
The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-01-2026, 01:31 PM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 05:46 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 05:47 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 05:48 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 05:54 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 05:55 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 05:57 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 05:58 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 05:59 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 08:43 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 08:49 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 08:51 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 08:54 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 08:55 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 08:56 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 08:57 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 08:58 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 08:59 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 09:00 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 09:01 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 09:04 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 09:05 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-02-2026, 09:06 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-05-2026, 06:02 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-05-2026, 06:02 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-05-2026, 06:04 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-05-2026, 06:04 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-05-2026, 08:55 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-05-2026, 08:55 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-05-2026, 08:57 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-05-2026, 08:59 AM
RE: The Barter System (By:andygarfield) - by Bad Boy - 09-05-2026, 08:59 AM

Forum Jump:


Users browsing this thread: 1 Guest(s)