By: Ra-bby
(১)
পানকড় উচ্চ বিদ্যালয়ে আজ এক কেলেঙ্কারির দিন। শিক্ষককক্ষে আমরা তেরো জন শিক্ষক বসে আছি। সবার চোখে-মুখে টানটান উত্তেজনা। অধীর আগ্রহে বসে আছে, কখন আমি মুখ খুলব। দুই ঘণ্টা ধরে বিচারকাজ চলছে। মেয়ের মা এলাকার প্রভাবশালীর স্ত্রী। ভদ্রলোক আসেননি, স্ত্রীকে পাঠিয়েছেন। উনার একটাই কথা—“আমি থানায় যাব। এই নোংরা লোককে জেলের ভাত খাওয়াব। মেয়ের বয়সী বাচ্চার দিকে কীভাবে নোংরা হাত বাড়াতে পারে? এর শিক্ষা আমি দিয়েই ছাড়ব।”
ভদ্রমহিলা ভালোই চেঁচাচ্ছেন। চেঁচানোটা স্বাভাবিক। এইটুকুন এক বাচ্চা মেয়ে। বাচ্চা মেয়েই তো। অথচ এই বাচ্চা মেয়ের দিকে কলেজের একজন পিয়ন হাত বাড়িয়েছে। এই নোংরা হাত যে-কেউ ভেঙে দিতে চাইবে। এতক্ষণ যে ভাঙেনি, সেটা ওর ভাগ্য ভালো। ভাগ্য তো নয়, আমার জন্যই বেঁচে গেছে। আমিই ভদ্রমহিলাকে আটকে রেখেছি। আশ্বাস দিয়েছি, “আমি ব্যাপারটা দেখছি, আমার হাতে ছেড়ে দিন।”
হেডমাস্টার হয়ে আসা বেশি দিন হয়নি আমার এই কলেজে। তাতেই যত ঘটনা আমার চোখের সামনে দেখেছি, কোনো এক পতিতালয়ে যে এসে পড়লাম, আল্লাহ মালুম। কিন্তু শেষে এসে এমন এক ঘটনার সাক্ষী হব ভাবিনি।
“স্যার, আপনি কিছু বলছেন না কেন? নাকি আমি স্বামীকে ডাকব? থানায় যাব?” ভদ্রমহিলা আর তার মেয়ে তানিয়াকে আমার পাশেই বসিয়েছি। উনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন। আমি উনার দিকে ভালো করে তাকাতেও পারছি না। মহিলা বুকের উপর ওড়না লম্বা করে ফেলে রেখেছেন। দুধের সাইজ সম্পূর্ণরূপে বোঝা যাচ্ছে। উনার দিকে তাকালেই উনার দুধের দিকে অটোমেটিক নজর চলে যায়। মেয়েও হয়েছে একই স্বভাবের। আর এই ধামড়ি মেয়ে, দুধ তো কাকে দিয়ে যেন বড় করে ফেলেছে, অথচ কলেজ ড্রেসেই চলে আসে। কোনো * পরে না।
“ভাবি, একটু শান্ত হোন। ভরসা রাখুন।” আমি আস্তে করে তানিয়ার মাকে বললাম।
ঘটনা এখন সবার জানা। সবাই আমার উপর বিচার ছেড়ে দিয়েছে। আমি যা করব, সেটাই। কারণ আমি প্রধান এখানকার। বয়সে আমার থেকে প্রায় সবারই বেশি। একমাত্র আমিই যে কম বয়সী, অথচ সবার প্রধান। সামনে মুরাব্বি টাইপের সব শিক্ষক বসে আছেন। উনারা উনাদের জীবনে সব ব্যাপারে অভিজ্ঞ লোক। সেখানে আমি কীভাবেই বা এমন একটা কাজে রায় দেব? বিচার করব? এই বিচার মানবে তো সবাই?
মনে সাহস সঞ্চয় করে মুজাহিদকে ডাকলাম আমার পাশে। তাকে দেখেও মায়া লাগছে। এমন মায়াবী চেহারার লোকের ভেতর এমন চরিত্র ঢুকে আছে, অবিশ্বাস্য।
মুজাহিদ এল। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কী করতে যাচ্ছি, সবাই তা দেখার জন্যই বসে আছে। আমি মুজাহিদকে পাশে ডেকে বললাম, “শোনো মুজাহিদ, তুমি যে ভুলটা করেছ, স্বীকার করছ তো?”
“জ্বি স্যার।” মুজাহিদ মুখ নিচু করে উত্তর দিল।
“এখন তাহলে তোমার কী করা উচিত?”
“স্যার, আমাকে যে শাস্তি দেবেন, আমি মেনে নেব। আমি ভুল করে ফেলেছি। আমি অন্যায় করেছি।” মুজাহিদ অকপটে উত্তর দিল। যেন নেই কোনো ভয়।
“তোমার হাতে দুটো অপশন—এক, তুমি আপার সামনে কান ধরে দশবার উঠবস করবে, আর বলবে তুমি যা করেছ ভুল করেছ, আর জীবনে এই ভুল হবে না। দুই, আপা তোমার গালে দুটো চড় মারবে। কোনটায় তুমি রাজি, বলো?”
মুজাহিদ তড়িৎ আমার দিকে তাকাল। সে ভাবতেই পারেনি হয়তো, এমন বিচার আমি করব। আর না করলেও উপায় নেই। ভদ্রমহিলার রক্তের ও টাকার গরম আছে। এরা যা খুশিই করতে পারে।
মুজাহিদের চোখে পানি ছলছল করছে। জানি না কেন, বারবার মনে হচ্ছে মুজাহিদ নির্দোষ।
“স্যার, আপনারা যেটা করবেন, আমি সেটাই মেনে নেব।”
আমি তানিয়ার মায়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, “আপা, কোনটা করলে এর সঠিক বিচার হবে, বলেন তো?”
“আপনিই করেন, আমি জানি না।” তানিয়ার মা কথাটা এমনভাবে বলল যেন এই বিচার তার পছন্দই না।
“আপা, আপনি ওকে দুটো চড় দিন। উচিত শিক্ষা হোক।”
“না না স্যার, আমি এই নোংরার গায়ে হাত দেব না।”
“তাহলে কী, কান ধরে উঠবস করাব?”
“করান।”
“মুজাহিদ, সামনে যাও, সবার সামনে দশবার কান ধরে উঠবস করো। আর বলো যে তুমি যেই ভুল করেছ, আর করবে না।”
মুজাহিদ বিনাবাক্যে তাই করল।
“আচ্ছা, এবার যাও। এরপর যেন এমন ভুল না দেখি। নয়তো তোমার চাকরি শেষ।”
“জ্বি স্যার।”
মুজাহিদ চলে গেল। তানিয়ার মাও উঠতে যাচ্ছিল, আমি বললাম, “আপা, আমার অফিসকক্ষে আসুন, হালকা নাস্তা করে যান।”
“না স্যার, তানিয়ার আব্বু চিন্তা করবে দেরি হয়ে যাচ্ছে। ওকে আমি জানাইনি এসব ঘটনা। উনি জানলে সব তছনছ করে ফেলবে।”
“আপনাকে ধন্যবাদ আপা, আপনি বুদ্ধিমানের কাজ করেছেন। ভাইয়াকে জানাননি। আপা আসুন, অন্তত এক কাপ চা খাবেন।”
আমি সব শিক্ষককে যে যার ক্লাসে যেতে বললাম। আমি নিজেও আমার অফিসরুমে চললাম। তানিয়াকে বললাম, “তোমার আম্মুকে নিয়ে আসো অফিসে, তানিয়া।”
আমার অফিসে এসে মুজাহিদকে মেসেজ দিলাম, “ম্যাডাম আর আমার জন্য বাইরে থেকে সিঙ্গাড়া আর চায়ের ব্যবস্থা করো জলদি। আর তুমি নিয়ে এসো না। কাউকে দিয়ে পাঠিও।”
আমি আমার চেয়ারে বসলাম। আমার পাশের সোফায় তানিয়া আর ওর মাকে বসতে বললাম।
“তা আপা, বলেন, ভাইয়া কেমন আছে? ভাইয়া এখন বাসায়ই আছে নাকি?”
“জ্বি স্যার, কাল বাসায় এসেছে। তিন দিনের ছুটি। কাল চলে যাবে।”
তানিয়ার দিকে তাকিয়ে বললাম, “তানিয়া, তোমার আর কমাস পরেই তো ফাইনাল এক্সাম। পড়ছ কেমন?”
“জ্বি স্যার, ভালো।”
“তোমার কোনো কিছু ক্লাসে বুঝতে সমস্যা হলে আমাকে বলবা, আমি উক্ত ক্লাসের শিক্ষক চেঞ্জ করে দেব। আমি চাই তোমাদের এই ব্যাচটা ভালো রেজাল্ট করুক। তোমাদের উপর অনেক আশা আমাদের। বুঝেছ?”
“জ্বি স্যার।”
তানিয়া ভদ্র মেয়ের মতো জ্বি স্যার জ্বি স্যার করছে। পড়ায় যে মাথামোটা, সেটা কলেজের সব স্যার জানে। বড়লোক বাপের বেটি, তাই কেউ কিছুই বলে না। গ্রামের কলেজ। বাপ প্রভাবশালী। কলেজের ম্যানেজিং কমিটিতে ওর বাপের নাম আছে। এদের সন্তানেরা পড়া পারুক বা না পারুক, সবার নজরে ভালো।
একটু পর এক ছেলের হাতে মুজাহিদ নাস্তা পাঠাল।
আমরা তিনজনে নাস্তা-চা খেলাম। অনেক গল্পই হলো। তানিয়ার মায়ের মনটা হালকা করার চেষ্টা করলাম। এদের যত পাম্পাট্রি দেওয়া যাবে, এরা তত খুশি।
বিদায় মুহূর্তে তানিয়ার মায়ের বাকা ঠোঁটের মুচকি হাসিটা বেশ ছিল। আমিও বলেছিলাম, “আপা, আসবেন মাঝে মাঝে কলেজে।”
তানিয়ার মা চলে গেলে মুজাহিদকে ফোন করে অফিসে ডাকলাম।
“রাগ করেছ?”
মুজাহিদ সরাসরি বলল, “তুমি জানো না ভাই, এই মেয়ে খুব খারাপ। আমার সাথেই কথা বলার জন্য লটরপটর করে। আমিই পাত্তা দিতাম না। পাত্তা না পেয়ে এই কাণ্ড করল।”
“বড়লোক বাপের মেয়ে ভাই। কিচ্ছুই করার নেই। অন্তত সাবধানে চলো। এদের থেকে পারলে দশ হাত দূরেই থাকো।”
“বাল পাকনা মেয়ে, কলেজে আসলেই আমাকে টাকা দিয়ে এটা-সেটা আনতে পাঠাবে। মাঝে মাঝে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে দেবে, আর নেবে না। আরও ম্যালা কিছু। ভাগ্যিস করি পিয়নের চাকরি। তাই মুখ বন্ধ।”
“ভাই, এদিকে তাকাও। যে যেমন, আল্লাহ তার বিচার করবে। বাদ দাও এসব। যাও, ব্যাগে টিফিন আছে, খেয়ে নাও।”
“আমার আর ক্ষুধা নেই ভাই।”
“বোকামি কোরো না। বরং শোকর আদায় করো, ও মহিলা থানায় যায়নি।”
“গেলে যেত। বালের এসব ভয় পাই না।”
“মুজাহিদ, এটা বাসা নয়। অফিস।” আমি রাগ দেখিয়ে বললাম।
“সরি। আমি খাব না ভাই। তুমি খেয়ে নাও।”
“তোমার বউকে ফোন দেব? তুমি মন খারাপ করে আছ, খাচ্ছ না?” মুচকি হেসে বললাম।
“কী দরকার ভাই, এসবে নারীদের টানা। একেতো নারীর কেলেঙ্কারিতে মান-সম্মান সব গেছে।”
“আচ্ছা, বলব না। যাও, খেয়ে নাও।”
“তুমি খাবে না?”
“তুমি খাও, আমার একটু কাজ আছে। পরে খাচ্ছি।”
মুজাহিদ খেতে লাগল। বেচারাকে দেখে সত্যিই মায়া লাগছে।
সোনিয়া কল করেছে। কী হলো আবার তার? মুজাহিদ বাসায় বলে দিয়েছে নাকি?
ফোন ধরলাম, “হ্যাঁ, বল।”
“ভাই, তোর দুলাভাই কই?”
“খাচ্ছে, কেন?”
“বদমাশটা আরাম করে খাচ্ছে, আর আমি দুই ঘণ্টা ধরে ফোন দিচ্ছি, ফোন ধরে না। আসুক সে আজ বাসায়।”
“ব্যস্ত ছিল হয়তো। খেয়েই ফোন দেবে।”
“ফোন দিক, ফোন আর ধরব না। থাক। তুই খেয়েছিস?”
“না রে। খাব। তোরা খেয়েছিস?”
“আমি আগেই খেয়েছি। মা আর ভাবি খাচ্ছে এখন।”
“মার শরীর এখন কেমন?”
“জ্বর আর নেই। তবে বলছে শরীর খুব দুর্বল হয়ে গেছে।”
“ফলগুলো কেটে দিস।”
“আচ্ছা।”
“নে, থাক। বিকালে দেখা হবে।”
“আচ্ছা। আর বান্দরটাকে বলিস না যে আমি তোকে ফোন দিয়েছিলাম।”
“আচ্ছা, বাই।”
সোনিয়া আমার বোন। যমজ ভাই-বোন আমরা। দেখতে নব্বই ভাগ একই আমরা। মুজাহিদ আমার বোনজামাই। বয়সে আমার থেকে তিন-চার বছর বড় হবে খুবজোর। এই কলেজে বহুদিন পিয়নের কাজ করে মুজাহিদ। আমার বাড়ির পাশেই কলেজ, তাই এদেরকে আমাদের বাসায়ই রেখে দিয়েছি। বোন আর বোনজামাই আমাদের সাথেই থাকে।
আমার পরিবারে পুরুষ বলতে আমরা এই দুজনই। আমি আর মুজাহিদ। আব্বা পাঁচ বছর হলো দুনিয়ায় নেই। মা আর বউ নিয়েই চলছে আমাদের সংসার। সোনিয়া আর মুজাহিদ পরিবারের এখন পার্মানেন্ট সদস্য। এই পাঁচজনের মিনি পরিবার আমাদের।
(২)
কলেজ ছুটির সময় মুজাহিদকে বললাম, “আজ আমার গাড়িয়ে বাসা যেও।”
“না ভাই থাক। তখন কেউ দেখে ফেলে কিনা।”
“তুমি বাইরে কলেজ গেইটের পরের মোড়ে দাড়াবা। আমি তোমাকে ওখান থেকে তুলে নিব। কেউ দেখবেনা।”
“তুমি যাও, আমি আসছি। সমস্যা নাই।”
“আবার কথা বলো। যা বলছি করো।” বলেই আমি গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেলাম। ড্রাইভারকে বললাম মোড়ে একটু দাড়াতে।
মুজাহিদ আমার সাথে কলেজ যাতায়াত করেনা। অবশ্য সে নিজেই এই কাজটা করেনা। সে চাইনা মানুষ জানুক যে মুজাহিদ আমার পরিবারের সদস্য। শালা হেড টিচার, আর দুলাভাই পিয়ন এটা সমাজের চোখেই নাকি খারাপ লাগবে। আমি অবশ্য অনেকবার জোড় করেছি। শুনেনি সে। সমাজের দৃষ্টির কথা ভেবে শুনেনি নাকি নিজের মান সম্মানের কথা ভেবে, কিজানি।
গাড়ির আয়নায় দেখতে পাচ্ছি সে আসছে। আমি জায়গা করে দিলাম। মুজাহিদ গাড়িতে উঠলো।
আজ মুজাহিদকে সাথেই আনার কারণ, আজকের ঘটনা। আমার নিজের ই মায়া লাগছে তার সাথে এমন কান্ড ঘটানোর পর। কিন্তু উপায় ছিলোনা।
আমি জানি মুজাহিদ নির্দোশ। তানিয়া বড়লোকের বখে যাওয়া মেয়ে। এরা মনে যা আসে তাই করে। মনের মত কিছু না হলে এরা কাউকে শান্তিতে থাকতে দেইনা।
“চাচা, সেলিম হোটেলের সামনে একবার দাড় করিও।” ড্রাইভারকে জানিয়ে দিলাম।
“আচ্ছা।”
মুজাহিদকে বললাম, “বাসায় কথা হয়েছে?”
“সোনিয়া অনেকবার ফোন দিয়েছিলো। ধরতে পারিনি। বিচারে ছিলাম। পরে ফোন দিচ্ছি, ধরেনা।”
“এক কাজ করো, সেলিম হোটেল থেকে কিছু ভাজাপুরা কিনে নিও। মেয়ে মানুষ, অল্পতেই রাগ।”
‘“আমিও সেটাই ভাবছিলাম, যাবার সময় কিছু একটা কিনে নিয়ে যাবো। তোমরা দুই ভাই বোন জমজ ঠিকাছে, কিন্তু স্বভাবে দুজন দুই পৃথিবী। তুমি যেমন শান্ত স্বভাব, তোমার বোন তার উলটো। ভাই একটা মেয়ের এতো জেদ!!!!বাপ্রেহ।”
“হা হা হা। আব্বা বেচে থাকতে কি বলতো জানো?”
“কি?”
“সনু, তোর যে জামাই হবে তার কপাল আজীবনভর পুড়বে আর পুড়বে। হা হা হা।”
“হা হা হা। শ্বশুর আব্বা ঠিকই বলতেন ভাই। গত রাইতে কি হয়েছে শুনো তাহলে, সোনিয়ার হঠাৎই মন চাইছে কেক ভাবে। কে খাবে সেটা ভালো কথা। কিন্তু তখনি খাবে। তখন রাত ২টা বাজে ভাই। ভাবা যায়!!!! আমি তখন রাকিবের বাড়ি গিয়ে তাকে তুলে এনে দোকান খুলিয়ে কেকে আনি। কি ভয়ংকর জেদ ভাবো!”
“হা হা হা। তুমি যে শান্ত, তাই বউ পাইসো অশান্ত। হা হা হা।”
“কেন ভাই, তুমিও তো শান্ত, তাহলে ভাবি কেন অশান্ত হলোনা।”
“সবার কপাল তো তোমার মত পুড়া হয়না। হা হা হা।”
সেলিমের দোকানের কাছে এসে গেছি। মুজাহিদকে টাকা দিয়ে নামিয়ে দিলাম। বললাম, যা যা ভালো লাগে কিনে আনো।
মুজাহিদ আমার বন্ধুর মত। সারাক্ষণ আমরা মজা করি। বিশেষ করে আমরা ৫বান্দা যতক্ষণ বাসায় থাকি, হাসি আড্ডা চলতেই থাকে। পুরো বাড়িটা হাসিতে ভরে থাকে। আজ মুজাহিদের উপর যা ঘটেছে, আমার নিজেরই তখন থেকে খারাপ লাগছে। তার মন ভালো করতেই নিজ গাড়িতেই তাকে নিয়ে নিলাম।
কিন্তু সে তো বাচ্চা মানুষ না যে একটু হাসিখুশি সময় পেলেই পুর্বের দু:খ ভুলে যাবে। আজকের ঘটনা মুজাহিদের জীবনে এক কালো দাগ টেনে দিয়েছে। আমি চাইলেই বিচারটাকে খেয়ে নিতে পারতাম। কিন্তু হীতে আরো বড় কিছু হতেও পারতো। তখন সেটা সামলানো যেতোনা। তাই ঘরের খবর ঘরেই মিটিয়ে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ ছিলো। তাছারা কলেজ এখনো জানেইনা যে, মুজাহিদ আমারই বোন-জামাই। জানলে ঘটনার জল অন্য কোথাও ও গড়তে পারতো।
জুনাইদ এক হাত ভর্তি ভাজাপুরা কিনেছে। সাথে আইস্কিম ও কিনেছে ৫টা।
“শুনো ভাই, আমি তোমাকে বাড়ির একটু আগেই নামিয়ে দিব। তুমি এগুলো নিয়ে আগে বাসায় যাবা। ওদের দিয়ে ওদের মন ভালো করবা। তারপর আমি ঢুকবো।”
“আচ্ছা ভাই।”
বাড়ির একটু পাশেই মুজাহিদকে নামিয়ে দিলাম। মুজাহিদ চলে গেলো।
চাচাকে বললাম, “ঘাটের কাছে চলেন।”
ঘাটের কাছে গিয়ে একটা ফলের দোকান থেকে হাজারটাকার কিছু ফল কিনলাম। গাড়িতে উঠেই ফোন বের করলাম। কন্টাক্ট নাম্বার থেকে সার্চ করলাম “সিমা” নামের কন্টাক্টটি। কল দিলাম।
সাথে সাথে কল রিসিভ হলো, “হ্যা বলো। ভালো আছো?”
“হ্যা আছি। তামিমকে একটু নিচে নামাও।” বলেই ফোন কেটে দিলাম।
চাচাকে বললাম, “বেলির মোড় হয়ে চলেন।”
বেলির মোড়ের কাছে গিয়ে রাস্তার পাশের দোতলা বাড়িটার সামনে চাচা গাড়ি দাড় করালেন। সাথে সাথেই একটা বাচ্চা ছেলে আসলো। আমি দরজা খুলেই ফলের ব্যাগটা তার হাতে দিলেই সে ব্যাগ পেয়েই দিলো এক দৌড়। তার দৌড় দেখে হাসি পেলো। কোনো দিন ও একটা টু শব্দও করবেনা। আমি ডাকলে, আসবে, এসেই যা দিব নিয়েই এক দৌড়।
আমার ফোনে কল আসলো।
“হ্যা, তামিমকে কিছু ফল দিলাম বাসায় রাখো।”
“তুমি আসবানা ভেতরে?”
“আমি এখন আর যাবোনা। কলেজ ছুটি হয়ে এখনো বাসায় যায়নি। পরে আসবোনি। থাকো।”
“আচ্ছা। মনে করে এসো একবার। কথা আছে।”
“আচ্ছা। রাখছি।”
ফোন কেটে দিলাম। চাচাকে বললাম, “বাড়ি চলেন।”
বাসায় ঢুকেই দেখি মহোৎসব চলছে। ওরা ৪জনই ডাইনিং টেবিলে বসে গল্প করছে। আমাকে দেখে তিথি এগিয়ে আসলো। বললো, “ভাইয়া আমাদের সবার জন্য কি এনেছে দেখো! ম্যালা গুলা ভাজাপুরা, সাথে আইস্ক্রিম।”
মুজাহিদ আমার দিকে তাকালো। তাকিয়েই মুখ ঘুরিয়ে নিল। আমি তিথিকে ফোন আর ব্যাগটা দিয়ে বললাম, “গোসল করবো।”
“আচ্ছা, তুমি চেঞ্জ হও। আমি ব্যবস্থা করছি।”
মায়ের কাছে গেলাম, “এখন কেমন আছো মা?”
মায়ের আগে সোনিয়া উত্তর দিলো, “তোর চিন্তায় মরছে মা। কখন আমার বেটা আসবে, এখনো আসছেনা কেন, কি হলো আমার বেটার, তোরা একটু ফোন দে আমার বেটাকে……ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। নাও মা, এবার তোমার বেটা এসেছে। চোখ ভরে দেখো। বাচিনা বাপু, মনে হচ্ছে আমরা বন্যার জলে ভেসে আসছি। খালি বেটা আর বেটা। হুহ।”
সোনিয়া এমন ঢংগি স্টাইলে কথাগুলো বললো, আমরা সবাই হেসে দিয়েছি। মা পাশ থেকে সোনিয়ার মাথায় একটা চটকানি দিয়ে বললো, “বুড়ি হয়ে গেলি তবুও ঢংগি বন্ধ হলোনা তোর।”
আমি মায়ের কপালে হাত দিলাম। নাহ জ্বর আর নাই।
“এখন খেতে পাচ্ছো মা?”
“জামাই ভাজাপুরা এনেছিলো। সেটাই অল্প খেলাম। মুখ এখনো তিতো হয়েই আছে।”
“খেতে থাকো, ঠিক হয়ে যাবে। খাওয়া ছারবেনা। লাগুক তিতো। তবুও খাবা।”
“যা গোসল সেরে নে। তারপর খেয়ে নে। জামাই ও খাইনি। তোরা দুজনেই খেয়ে নে এক সাথে।”
আমি মুজাহিদকে বললাম, “তুমি বসে আছো কেন? খেয়ে নাও। আমি খাচ্ছি।”
“যাও গোসল করে নাও। ভাজাপুরা তো খেলাম। এক সাথেই খাবো। তুমি যাও।”
আমি রুমে গেলাম। তিথি বাথরুমে হয়তো। আমার জন্য পানি রেডি করছে। ট্রাংকির মত হেব্বি গরম থাকে। মটারের পানি তুলছে।
আমি সার্ট খুললাম। প্যান্ট খুলে লুঙ্গি খুজছি। নিচে একটা জাঙ্গিয়া পড়ে আছি। এরই মধ্যে তিথি বাথ থেকে বেরিয়ে গেছে।
“এমায়ায়ায়ায়া ছিইইইইহ। এমন করে আছো কেন???? তোমার লুঙ্গি কই???? লজ্জা শরম সব গেছে নাকিইইইই???” তিথি চোখ ঢেকে ফেলেছে লজ্জাই। অথচ আমি তার স্বামি। ৮ বছর ধরে সংসার করছি আমরা। অথচ তার ভেতরের লজ্জাই পরিপূর্ণ।
“লুঙ্গিই তো খুজছি আমি। কোথায় রেখেছো?”
“যেখানে রাখি সেখানেই আছে। ন্যাংটো হয়ে উল্টোপাল্টা জায়গায় খুজলে কি পাবে?”
“কই দাও।”
তিথি ওভাবেই চোখ আলতো করে ঢেকে আলনার উপর থেকে লুঙ্গি বের করে দিলো।
“তুমি শিক্ষক মানুষ, আর ল্যাংটো হয়ে ঘুরে বেরাচ্ছো। হি হি হি। ছিইইইইইহ ভাবতেই কেমন লাগছে।”
তিথির ন্যাকামি আর মানা গেলোনা। সাথে সাথে গিয়ে তিথিকে বুকে টেনে নিলাম।
“এই ছারো বলছি।”
“না ছারবোনা।”
“এই নেংটু ছারো। হি হি হি। আমি বাইরে গিয়ে বলি তুমি নেংটু ঘুরে বেরোচ্ছো। হি হি হি।”
“হ্যা যাও বলো। আর সবাই ভাবুক, তিথির স্বামি পাগল হয়ে গেছে।”
“যাও ছারো। গোসলে যাও। আমি তোমার খাবার রেডি করছি।”
“একটু থাকি না তোমার বুকে। সারাদিন তো বাইরেই ছিলাম।”
“এখন না সোনা। রাতে। সারা রাত তোমাকে বুকে নিয়ে রাখবো। হয়েছে? এবার যাও গোসল করে নাও।”
“তুমি না বড্ড ভালো না। খালিই দূরে সরিয়ে দাও।”
“হি হি হি, কি বলছো এসব তুমি। বড্ড ভালো না, হি হি হি। শিক্ষক মানুষের কথার ছিরি!”
“দেখি মুখ উপরে তুলো, একটা চুমু খাই।”
“নায়ায়াহ। আগে গোসল। পরে এসব।” তিথি বুকেই মুখ চেপে আমাকে জড়িয়ে আছে।
আমি তিথির মাথাতেই একটা চুমু দিলাম।
“আচ্ছা থাকো। গোসল করে নিই।”
আমি তিথিকে ছেরে দিলাম। বাথে ঢুকে গোসল করে নিলাম। সারাদিন মনের উপর দিয়ে খুব ধকল গেছে। গোসল সেরে কিছুটা আরাম লাগছে। আচ্ছা, আমার নাহয় গোসলেই ধকল কেটে গেলো, কিন্তু মুজাহিদের? সে মনে মনে আবার আমার উপরই রাগ করে বসে আছে নাতো? কথাবার্তায় মনে তো হচ্ছেনা। এমনিতেই মুজাহিদ অনেক ভালো মনের ছেলে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তানিয়া তাকে ফাসিয়েছে। মুজাহিদ চেহারায় বেশ ভালই দেখতে। শার্ট প্যান্ট পড়ে যখন বাইরে যাই, ৩৫ বছরের কেউ বলবেইনা। বলবে খুব্জোর অনার্স শেষ করেছে।
বড়লোকের বখে যাওয়া মেয়ে তানিয়ার হয়তো মুজাহিদকে ভালো লাগসে। আর মুজাহিদ থেকে রিজেক্ট হইসে বিধায় এই প্রতিশোধ। এখন পর্যন্ত মুজাহিদের চরিত্রে কোনো খারাপ কিছু পাইনি।
গতবার তিথি ঢাকা গেলো চাকরির পরিক্ষা দিতে। সাথে মুজাহিদকেই পাঠিয়েছিলাম। তার ছুটি আমিই মঞ্জুর করেছিলাম কলেজ থেকে।
এখন পর্যন্ত মুজাহিদের নামে কোনো খারাপ রিপোর্ট শুনিনি। ইভেন তার সাথে রাতের পর রাত কোনো মেয়ে মানুষ থাকলেও তার উপর আমার পুর্ণ ভরসা আছে যে, মুজাহিদ কারো হক নস্ট করবেনা। অথচ আজ সেই মুজাহিদকেই চরিত্রহীনার কালো দাগ মাখতে হলো। বিষয়টা যত ভাবি ততই খারাপ লাগে।
(৩)
মুজাহিদ সত্যিই খুব শান্ত স্বভাবের। আমার মতই অনেকটা। ধরতে গেলে এই পরিবারের সবাই শান্ত স্বভাবের, শুধু সোনিয়া, আমার বোন বাদে। এইটা একটা জলজ্যান্ত আগুন। মুখ চলে রোবটের মত। এতো যে বকতে পারে, পুরো বাড়ি একাই মাথায় তুলে রাখে।
রাতের খাবার খেয়ে মায়ের রুমে সবাই বসে আছি। সবাই না। তিথি থালাবাসুন ধুচ্ছে। আব্বা গত হওয়ার পর থেকে এইটা আমাদের সবার একটা রুটিন----রাতে খাবার খেয়ে মায়ের রুমে বসে কিছুক্ষণ আড্ডা। যখন মায়ের ঘুম ঘুম পাবে তখন আমরা চলে আসবো।
আমি মাঝে মাঝে মুজাহিদের দিকে তাকাচ্ছি, বেচারার চেহারা আসলেই কিছুটা চেঞ্জ হয়ে গেছে। যেন নিজেকে লুকিয়া রাখছে। আজ কথাও বলছে কম। আমার দিকে তাকাচ্ছেও কম।
সবার নজরে মুজাহিদের পরিবর্তনটা না গেলেও আমি তো জানি ঘটনার পেছনের ঘটনা, তাই বুঝতে পাচ্ছি।
আমি সোনিয়াকে বললাম, “সোনু, চল একদিন সবাই মিলে পতেঙ্গা বীচ থেকে ঘুরে আসি। অনেকদিন বাইরে কোথাও যাওয়া হয়নি।”
যেই বলসি, সোনিয়া যেন লাফ দিয়ে উঠেছে।
দুই হাত উপরে তুলে ছোট বাচ্চাদের মত করছে সোনিয়া, “চল চল চল। কখন যাবি বল। এখন যেতে চাইলে এখনি যাবো।”
“বাচাল, যাবো একদিন বললাম, এখন না।”
“অহ। কখন যাবি ঠিক নাই, এখন বলে আমার মনটাই খারাপ করে দিলি।”
আমি মাকে বললাম, “মা, কখন যাবা বলো?”
“আমার এসব ঘুরতে টুরতে ভালো লাগেনা বেটা। তোরাই যা ঘুরে আই।”
সোনিয়া বললো, “চলো না মা, তুমি না গেলে দাদা নিয়ে যাবেনা আমাদের।”
সোনিয়া জমজ হলেও আমাকে দাদা বলে দাদা। আমি দুনিয়ার মুখ ওর আগেই দেখেছি তাই। আমি বাচালটাকে অনেকবার বলেছি তাও, তুই আমাকে দাদা ডাকিস কেন? ভাই কিংবা ভাইয়া ডাকতে পারিস না?
কে শোনে কার কথা! সে দাদা ই ডাকবে। আমি আর সোনিয়া শারীরিক গঠণে, যাস্ট মেয়েলি ব্যাপারটা বাদ দিলে, সব এক। হাইট, ওয়েট,গায়ের রঙ, নাকের ডগাই তীল, হাসলে গালে টোল, প্রায় সব।
জমজ ছেলে আর মেয়ে কিভাবে এতটা মিল হয়, নিজেদের না দেখলে বুঝতাম না।
আমাদের ছোট কালের সব ছবিই যেকেউ দেখলে বলবে, আমরা জমজ দুই ভাই। সোনিয়ার শরীরে মেয়েলী গঠন আসার আগ পর্যন্ত আমরা আসলেই দেখতেও জমজ ছিলাম।
আমরা কলেজ পর্যন্ত এক সাথেই পড়েছি। রোল থাকতো দুজনের কাছাকাছি। কিন্তু ইন্টার পর সোনিয়ার বিয়ের সম্মন্ধ আসে, আব্বা কোনো কথা না শুনেই বিয়ে দিয়ে দেন। ছেলে ছিলো ব্যাংকার। বাবা ধনসম্পদে প্রভাবশালী। সব ই ঠিক ছিলো, কিন্তু ছেলের নারী সঙ্গ বেশি। এতটাই বেশি ছিলো যে, নারী কেলেংকারিতে ব্যাংকের চাকরিটা পর্যন্ত চলে যাই। এরপর আব্বা নিজেই জোর করে ওর ছেলের থেকে সোনিয়াকে ছারিয়ে নিয়ে চলে এসেছে।
তারপর কয়েক বছর চলে গেছে সোনিয়া আর বিয়েই করতে চাইনি। শেষমেশ আব্বা মরার আগের বছর মুজাহিদের সাথে বিয়ে হয়। মুজাহিদকে বিয়ে করে সোনিয়া বেশ হাসি খুশিই আছে। কখনো তাদের মাঝে ঝগড়া ঝামেলা দেখিনি।
সোনিয়া এতো যে বাচাল, তবুও তাদের মাঝে মনোমালিন্য দেখিনি। নিশ্চিত এটাতে মুজাহিদের অবদান আছে।
“শুনছো, একটু শুনে যেও তো।” তিথি ঘরের বাইরে থেকে আমাকে ডাক দিচ্ছে।
আমি সবাইকে “আসছি” বলে রুম থেকে বের হলাম।
তিথি আম্মার ঘরের একদম বাইরে দাঁড়িয়ে। আমার ফোন তার হাতে।
“ছোট মা মেসেজ দিয়েছে।” ফিসফিস করে বলেই তিথি আমাকে ফোনটা এগিয়ে দিলো।
আমি ফোনটা নিয়েই চেক করলাম। সিমা নামের নাম্বার থেকে একটা মেসেজ এসেছে----- “তামিম বারবার বলছে কোথায় একবার ঘুরতে যাবে।”
যাস্ট এটুকুই মেসেজ। মেসেজ পড়ে তিথির দিকে তাকালাম। তিথিও আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
দুজনের চোখের ভাষা এক। দুজনই মুচকি হাসলাম।
বললাম, “তামিম চাচ্ছে, নাকি ছোট মা ই চাচ্ছে?”
তিথি ইশারা দিয়ে আমাকে আসতে কথা বলতে ইঙ্গিত দিলো।
আমি তিথিকে নিয়ে আমাদের রুমে চললাম। রুমে গিয়েই তিথি বললো, “এসব কথা জোড়ে বলছো কেন? ওরা যদি শুনে ফেলে?”
“কি করা যায় বলো তো?”
“চলো আমরা একবার কোথায় ঘুরে আসি। প্রায় মাস হয়ে এলো আমাকেও ওখানে আর নিয়ে যাওনা। ছোট মা একা একা কিভাবে থাকছে, বলতে পারো? আমি হলে তো হাফর ফাফর লেগে মারা যেতাম।”
“সময় আর কই পাচ্ছি গো। প্রতিদিন সকালে কলেজ যাচ্ছি। আসতে আসতে সন্ধ্যা।”
“একদিন হাফ ডে নিয়ে নাও। দিয়ে চলো কোথাও এক বেলা ঘুরে আসি। ছোট মার ও ভালো লাগবে।”
“দেখি, আমাকে ভাবতে হবে।”
“ওকে ভাবতে থাকো, আমি থালাবাসুন গুলো গুছিয়ে রেখে আসি। আজ কিন্তু আমাদের কথা আছে। ভুলে যেওনা যেন।” তিথি এ কথা বলেই মুচকি একটা হাসি দিলো। দেন রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।
আজ আমাদের কথা আছে মানে —- আজ তিথির মাসিকের শেষ দিন। লাস্ট ৭দিন আমরা সেক্স করতে পারিনি। পরশু থেকে আমার মানসিক অবস্থা তিথি বুঝতে পেরে সে নিজেই বলে আসছে, আগামি পরশু দিন তোমার ইচ্ছা পুরন করবো সোনা। আরেকটু ধৌর্য ধরো। আর আজ সেই পরশু দিন।
তিথি এমন মেয়ে, যেমন আমি চেয়েছিলাম। যেন এক চুল কম ও না, আবার বেশিও না। আমার ছোট মায়ের ব্যাপারটা শুধুই তিথি জানে। আর কেউ জানেনা।
আব্বা মারা যাবার ৩দিন আগে আমাকে সিমা সম্পর্কে সব বলে গেসে। এক্সিডেন্টের ১০ দিনের মাথায় আব্বা বুঝেই গেছিলেন উনি আর বাচবেন না। সেদিন আমাকে ডেকে আমাকেই শুধু, সিমা সম্পর্কে সব বলেছে। তিনি অনেক অনুরোধ করে গেছেন আমাকে----- যদি পারিস মেয়েটার একটা বিয়ে দেবার ব্যবস্থা করিস। মেয়েটার কপাল পুরা। দুনিয়ায় আসার পর বাবা মাকে হারিয়েছে। চাচার কাছে মানুষ। কখনো ভালোবাসস পাইনি। অল্প বয়সেই চাচা বিয়ে দিয়ে ঝামেলা মুক্ত হয়েছিলো। চাচা একবারো ভাবেনি যার সাথে বিয়ে দিচ্ছি ছেলেটা কেমন? বিয়ের পর গাজাখোর গরিব স্বামির ঘরে বেশিদিন ঘর করতে পারেনি। কোলে এক বাচ্চা নিয়ে স্বামির ঘর ছেরে মানুষের বাড়িতে কাজ করে খেতো। লোভি নস্ট সমাজ এমন সুন্দর চেহারাই মেয়ে পেয়ে, সবার কুনজর থাকতো সিমার উপর। তার সাথে আমার পরিচয় আমার দোকানেই। মেয়েটা প্রায় দিন কোলের বাচ্চা নিয়ে আমার দোকানে আসতো বাচ্চার জন্য এটা সেটা কিনতে। কিন্তু টাকা দিতে পারতোনা। একদিন জিজ্ঞেসা করলে তখন সে সব খুলে বলে।
আমি বোধায় আর বাচবোনা, যদি মারা যাই সিমা তোর ছোট মা হয়, মেডিক্যালের আমি যেই বেডে সুয়ে আছি, বের হলেই দেখবি রুমের বাইরেই একজন কম বয়সি মেয়ে বাচ্চা কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে। ঐটাই সিমা। দুনিয়ায় আর কেউ জানেনা। তোর মাকে বলিস না। আমি মারা গেলে তার একটা বিয়ে দিয়ে দিস। মেয়েটা জীবনে সুখের মুখ দেখতে পেলোনা।”
সিমার ব্যাপারে আব্বার এটুকুই ছিলো আমার সাথে শেষ কথা। আমি অবশ্য আব্বার কথা অনুযায়ী সব করতে পারিনি। ছোট মার থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করতে পারলেও উনি আর বিয়ে করবেন না বলে বিয়ে দিতে পারিনি।
তিথিকে নিয়ে গিয়েও অনেক করে বুঝিয়েছি, কথা শুনেনি। সে নাকি আমার মরহুম আব্বাকে স্মৃতি থেকে মুচতে চাইনা। এই স্মৃতি নিয়েই বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে চাই। এরপর আমিও আর বিয়ের ব্যাপারে কথা তুলিনি।
প্রতি মাসেই তার বিকাশে টাকা পাঠিয়ে দিই মাসিক খরচের। আর মাঝে মাঝে আমিই ওখানে যায় কিছু কেনাকাটা করে। আমার সময়ে অসময়ে যাওয়াটা তিথি জানেনা। কলেজ ফেরত সময়ে কিংবা সন্ধ্যা পর কোনো বাহানায় বাইরে যাওয়ার নামে সিমার কাছ থেকে ঘুরে আসি। সিমা আমার থেকে কম করে হলেও ১২ বছরের ছোট হবে। তাই আমি তাকে তুমি করেই ডাকি। সে আমাকে আপনি করে ডাকে। লাস্টবার এতোবার বললাম, “ছোট মা, আমি তো তোমার ছেলে হই, আমাকে আপনি বলো কেন?”
“আমি জন্মের পর কাউরে তুমি বলিনা। সবাইরে আপনিই ডাকি।”
সিমা কিন্তু চঞ্চল স্বভাবের। কিন্তু আমার সামনে কথা কম বলে। যখন বলতে লাগে, বলতেই থাকে। কিন্তু কখনোই আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলে না। আসলেই আমার দিকে তাকাই ই না।
আমি তাকে কখনোই তুমি কিংবা আপনি টাইপ কোনো সম্পর্কে ডাকিনা। আসলেই তার সামনে গিয়ে আমি যে কিভাবে কথা বলি সেটা নিজেও জানিনা। বলতে গেলে আমিও তার সামনে তেমন কথা বলিনা। তামিমের সাথেই দুচারটা কথা বলে চলে আসি।
যেমন গত শুক্রবার সিমার বাসা গেছিলাম মুড়ির প্যাকেট আর চানাচুর নিয়ে। মেসেজ পাঠিয়েছিলো, তামিম নাকি মুড়ি খাবে বলছে।
আসলেই সিমার মানে ছোট মার যদি কখনো কিছু খেতে বা সাংসারিক কিছু দরকার পড়ে, তখন তামিমের নামে বলে। সেদিন আমি সেখানে গিয়ে তার মুখের দিকে তাকানোই হয়নি। চা বিস্কিত দিলো, আর তামিমের সাথে বসে বসে কথা বললাম দুচারটা। মাঝখানে সিমাকে একবার বললাম, সংসারে সব আছে, না লাগবে কিছু? আমি সিমার চেহারা এখন পর্যন্ত ক্লিয়ার দেখিনি। হয়তো বাইরে কোথাও হঠাৎ দেখা হলে চিনবোইনা।
যখন তিথিকে সেখানে নিয়ে যায়, তখন সিমা খুউউব খুউব কথা বলে। যেন পেটের সব কথা উজার করে দেই এক নিমিষেই। সিমা যেন নতুন প্রাণ ফিরে পাই।
আমার একবার মনে আছে, তিথিকে দিয়ে যখন প্রথম বলিয়েছিলাম যে সে বিয়ে করবে কিনা তখন সিমার যে কি কান্না!!! বাপরেহ। জীবনে বেচে থাকতে অন্য পুরুষের ঘরে সে আর যাবেনা। তার জীবনে আমার আব্বাই শেষ স্বামি। দেদিন শুধু একটা কথাই বলেছিলো, উনার কোনো ছবি থাকলে বেধে আমাকে একটা দিয়ে যায়েন।
তিথি আর আমি পরেরদিন আব্বার একটা ছবি সিমাকে দিয়ে গেছিলাম।
“কি গো, কি ভাবলে?” তিথি রুমে আসলো।
“হলো তোমার?”
“হ্যা। ভাইয়ারাও রুমে চলে গেলো। সবাই ঘুমাবে বোধায়।”
“মাকে একবার দেখে আসলেনা অসুধ খেলো কিনা?”
“গেছিলাম। খেয়েছে।”
“ওকে নাও ফ্রেস হয়ে নাও। সুয়ে পড়বো।”
“চলো তুমি ফ্রেস হবানা?”
“হ্যা। ঢুকো আসছি।”
তিথি পোশাক নিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেলো। আমরা প্রায় রাতেই গোসল করে ঘুমাতে যায়। চুলে পানি দিইনা। গা ধুই। এতে শান্তিতে ঘুম আসে।
আমিও একটু পর বাথরুমে ঢুকলাম। তিথি গোসল করছে। হাত উচু করে মাথায় পানি ঢালছে। পানিতে ভিজে দুধের অবায়ব বুঝা যাচ্ছে। গলা থেকে দুধের ভাজ থেকে জায়গাটা এতোটাই ফকফকে সাদা লাগছে দেখার মত। আমার বিশ্বাস অবিবাহিত যুবক এই জায়গা টুকু দেখলেই আগামি ১মাস এটা ভেবেই হাত মারবে।
সেখানে আমার সামনে এমন জলজ্যান্ত রুপ, নেই কোনো নতুন ফিলিংশ। বিয়ের পর নারী পুরুষের বেসিক আগ্র ও আকর্ষণটা ধিরে ধিরে কমে যায়।
সত্যিই কমে নাকি শুধুই স্বামি স্ত্রী নামক দুজনের মধ্যেই কমে? আমি আমার নিজের কথাই যদি ভাবি, ক্লাশের কোনো মেয়েকে যখন পড়া ধরার জন্য কাছাকাছি যায়, কারো কারো ফেস আছে এমন, দেখলেই আকর্ষণ কাজ করে। ভাল্লাগে।
সেদিনই তো, সিফা নামের একজন মেয়ে। বাড়ির কাজ দিয়েছি, করে আনেনি। দাঁড়িয়ে থাকতে বললাম। ক্লাশের পড়া ধরলাম, সেটাও পারলোনা। চেয়ার থেকে উঠে ভাবলাম দুটো দিয়ে আসি।
কাছে গিয়ে মারতে যাবো, মেয়েটার চেহারা দেখে আর মারতে পারলাম না। নাকের ডগায় ঘাম, ভয়ে কাপছে, নাকের নিচে লোম গুলো স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। ঠোট জোড়া মারাত্মক রকমের টানছিলো আমাকে। দেখেই মনের ভেতর এমন এক ভালো লাগা কাজ করলো মেয়েটাকে মারতেই পারলাম না। ক্লাশ পর অফিসে এসে ও অনেকক্ষণ মেয়েটার ফেসটা মাথা থেকে যায়নি। এখনো মনে পড়লে বুকের ভেতর কেমন করে।
অথচ আমার বউ তিথির থেকে সে কোনো অংশেই সুন্দর না।
“কি হলো কখন থেকে বলছি উলটো ঘুরো। চেঞ্জ করবো।” তিথির ডাকে বাস্তবে ফিরলাম।
“আমি পর নাকি যে মুখ উল্টো ফিরতে হবে তোমার পোশাক পাল্টাতে?”
“না পর না। তবুও উলটো ফিরো।”
আশ্চর্য নারির মন। একটু পরেই কাপড় খুলে দেহ ভোগ করতে দিবে, অথচ এখন ঐ লোকের সামনে কাপড় চেঞ্জ করতে শরম পাচ্ছে।
