আপডেট ৩
(ক)
ক্লাস শুরুর আগে রুমটা প্রায় ফাঁকা। কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী এসেছে। কেউ ফোন দেখছে, কেউ হেডফোন গলায় দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছে। বুশরা সামনের সারির একদম মাঝখানের সিটে বসে। খাতা খুলে লেকচার নোট পড়ছে। চোখের নিচে হালকা কালি পড়েছে। গত কয়েকদিন বাসায় মেহমান ছিল। মামা-মামি আর তাদের দুই ছেলে। ঘরটা ভরে গিয়েছিল। রাতে দেরি করে ঘুমাতে হয়েছে, সকালেও উঠতে হয়েছে তাড়াতাড়ি। পড়াশোনা প্রায় হয়নি। সামনে মিডটার্ম। ইংরেজি সাহিত্যের একটা পেপার। নোটগুলো আবার নতুন করে পড়তে হচ্ছে। মনটা একদম সেট হচ্ছে না। মাথায় হালকা বেইজ রঙের স্কার্ফ। আজ সালোয়ার কামিজ পরেছে। কালো সালোয়ার, সাদা কামিজ। কামিজের হাতা কনুই পর্যন্ত। গলাটা একটু খোলা। স্কার্ফটা ঘাড়ের দুই পাশ দিয়ে ঝুলে আছে। মুখে কোনো মেকআপ নেই। শুধু চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ।
দরজার কাছে হঠাৎ জোরে কথা শোনা গেল। নোমান আর তার দুই বন্ধু। রাফি আর তানভির। তিনজনে হাসতে হাসতে দাঁড়িয়ে আছে। রাফি কিছু একটা বলছে, তানভির জোরে হাসছে। নোমানও হাসছে। শব্দটা পুরো রুমে ছড়িয়ে পড়ছে।
বুশরা মাথা তুলে তাকাল। বিরক্তি চোখে ফুটে উঠল। সে খাতার পাতায় আঙুল রেখে বলল,
“একটু চুপ করে থাকতে পারো? অনেকে পড়ছে।”
রাফি ঘুরে তাকাল। মুখটা কেমন যেন টান হয়ে গেল।
“কী মনে করে নিজেকে? ক্লাসের মালিক নাকি?”
তানভিরও বলল,
“এত রাগ কেন তোমার? আমরা তো গান গাইছি না। চিৎকার করছি না”
নোমান কিছু বলল না। শুধু রাফি আর তানভিরের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বলল,
“থাক। চুপ কর। কিছু মানুষ নিজেকে বেশি ইম্পোর্টেন্ট ভাবে”
তারপর সে বুশরার দিকে একবার তাকাল। খুব তাড়াতাড়ি না। একটু সময় নিয়ে। স্কার্ফ, সাদা কামিজ, কালো সালোয়ার। গলার কাছে হালকা ফাঁকা জায়গা। ক্লান্ত মুখ। তবুও চেহারাটা পরিষ্কার। নোমানের মনে হলো, মেয়েটা আজ একটু অন্যরকম লাগছে। স্কার্ফ শুধু। আগের মতো ঘন করে মাথা ঢাকা নেই। সে বন্ধুদের বলল,
“চল। করিডোরে গিয়ে দাঁড়াই। স্যার আসার আগে।”
তিনজনে বেরিয়ে গেল। করিডোরে দাঁড়িয়ে নোমান সিগারেট না ধরিয়েই বলল, “ঐ মেয়েটা কে রে? বুশরা না নাম? ডিবেট ক্লাবেও আছে।”
রাফি বলল, “জানি। ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের। খুব সিরিয়াস টাইপ।”
নোমান জিজ্ঞেস করল, “প্রেম করে নাকি কেউ?”
তানভির কাঁধ ঝাঁকাল।“মাঝে মাঝে একটা ছেলের সাথে ঘুরতে দেখি। সিএসসি ডিপার্টমেন্টের। আমাদের ব্যাচেরই। প্রেম করে কিনা ঠিক জানি না। তবে একসাথেই দেখা যায় প্রায়।”
নোমান মাথা নাড়ল। কথাটা মনে রাখল। আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
(খ)
দুপুরের দিকে নর্থ বিল্ডিং আর সাউথ বিল্ডিংয়ের মাঝের ওপেন স্পেসটা ভরে গিয়েছিল। বাস্কেটবল ম্যাচ শেষ হয়েছে। নোমানের টিম জিতেছে। ছেলেরা চিৎকার করছে। কয়েকজন মেয়েও হাততালি দিচ্ছে। নোমান মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। বাস্কেটবল জার্সি গায়ে, কালো শর্টস। সারা গা ঘামে ভিজে আছে। চুল এলোমেলো। মাথায় কালো হেডব্যান্ড দিয়ে চুল আটকানো। ঘাম চুইয়ে পড়ছে গাল বেয়ে। কাঁধ আর হাতের মাসলগুলো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। জার্সিটা শরীরের সাথে লেগে আছে। পেটের দিকটা যখন একটু উঠে যাচ্ছে, তখন অ্যাবসগুলো টানটান দেখা যাচ্ছে।
দূরে, প্লাজার একপাশে তিনজন মেয়ে দাঁড়িয়েছিল। বুশরা, সাদিয়া আর কাশফিয়া।
বুশরা মুখটা কঠিন করে বলল,
“এত হৈচৈ কেন? যেন বিশ্বকাপ জিতেছে।”
সাদিয়া হাসল।
“বিরক্ত হবার কী আছে? খেলাধুলা তো ভার্সিটির এক্সট্রা কারিকুলারের পার্ট। নোমান সেখানে ভালো করছে। সবাইকে তো আর পড়াশোনায় ফার্স্ট হতে হবে না।”
কাশফিয়া চোখ না সরিয়ে বলল,
“ঘামে ভেজা অবস্থায় কিন্তু দারুণ লাগছে ওকে। মাসলগুলো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে পেটের দিকটা।”
সাদিয়া মুচকি হেসে কাশফিয়ার দিকে তাকাল।
“দেখেছিস? অ্যাবসগুলো কত শক্ত। এবস এত প্রমিনেন্ট হলে বুঝতে হয় কোমরে জোর আছে।”
কাশফিয়া মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ। ছেলেদের অ্যাবস যদি এভাবে শক্ত আর পরিষ্কার দেখা যায়, তার মানে ওদের কোমরে প্রচণ্ড শক্তি থাকে।”
বুশরা বলল “ হঠাত করে কোমড় নিয়ে এত আগ্রহ কেন তোদের?”
সাদিয়া আস্তে করে বলল, কিন্তু হাসি চাপতে না পেরে,
“কোমরে জোর থাকা মানে কিন্তু অন্য জায়গাতেও জোর থাকে জানো তো? সেক্সে ভালো হয় এদের।”
কাশফিয়া মুখ চাপা দিয়ে হেসে ফেলল।
“সাদিয়া! তুই একেবারে…”
সাদিয়া কাঁধ ঝাঁকাল।
“কী? সত্যি কথা। যারা রেগুলার খেলে, মাসল তৈরি করে, তাদের স্টামিনাও বেশি হয়। ঘাম দেখেই বোঝা যায় কতটা প্রেশার নিতে পারে।”
বুশরা বিরক্ত হয়ে বলল,
“একটা ছেলে ঘামে ভিজে আছে দেখে বিশ্রী লাগছে। এতে এত আনন্দ কেন তোদের? ঘাম মানে ঘাম। নোংরা।”
সাদিয়া এবার পুরোপুরি ঘুরে বুশরার দিকে তাকাল। চোখে দুষ্টুমি।
“বিশ্রী? তুই কিছু জানিস না। ঘাম হচ্ছে ফেরোমোন। ছেলেদের ঘামে এমন কিছু থাকে যা মেয়েদের শরীরে কাজ করে। যৌন ঔষধের মতো। বিজ্ঞানের কথা। ঘামে ভেজা ছেলে দেখলে অনেকেরই ভেতরে একটা রেসপন্স হয়। তুই শুধু স্বীকার করিস না।”
কাশফিয়া হাসতে হাসতে বলল,
“সত্যি কথা। আমি তো স্বীকার করি। ওর ঘামে ভেজা গলা আর কাঁধের দিকটা দেখেই ভালো লাগছে।”
সাদিয়া আবার বলল,
“আর হেডব্যান্ডটা দেখেছিস? চুল এলোমেলো করে আরও বেশি লাগছে। মাসল, ঘাম, হেডব্যান্ড—সব মিলিয়ে একদম…”
বুশরা আর উত্তর দিল না। কান দুটো লাল হয়ে গিয়েছিল। সে স্কার্ফটা একটু টেনে গলা বন্ধ করার চেষ্টা করল। চোখ অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিল। মনে মনে বলল, এসব কথা শোনার দরকার নেই। অশ্লীল। অপ্রয়োজনীয়। তবুও সাদিয়া আর কাশফিয়ার হাসি তার কানে বাজতে থাকল।
(গ)
বিকেলের দিকে ক্যাফেটেরিয়ার বাইরে একটা বেঞ্চিতে তিনজন বসেছিল। আবিদ, তার বন্ধু সাজিদ, আর নোমান। সাজিদ দুজনেরই কমন ফ্রেন্ড। আগে কোনো গল্পে আসেনি।
সাজিদ নোমানকে দেখিয়ে বলল,
“এই যে আবিদ, নোমান। নোমান, আবিদ। দুজনকেই চিনতাম, কিন্তু একসাথে পরিচয় করাইনি।”
নোমান উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দিল। হাসিমুখে।
“কেমন আছো ভাই?”
আবিদ একটু দ্বিধা করে হাত মিলিয়ে বলল,
“ভালো। তুমি?”
নোমান বসল। পা তুলে বেঞ্চির ওপর রাখল।
“আমি তো সবসময় ভালো। আজকে আরও ভালো। সকালে এক প্রফেসরকে বললাম, স্যার আপনার লেকচার এত নীরস কেন? উনি বললেন, কারণ তোমরা এত নির্বোধ। আমি বললাম, স্যার তাহলে আপনি তো আমাদের সাথে ম্যাচিং করছেন।”
সাজিদ হেসে উঠল। আবিদও হালকা হাসল। আবিদ জিজ্ঞেস করলো “ তুমি স্যত্যি স্যার কে এটা বলেছ?”
সাজিদ বললো “ উফ আবিদ! নোমানের সাথে কিছুদিন কথা বললে বুঝবি ও কেমন দুষ্ট।”
নোমান আবার বলল, “আর গতকাল এক মেয়ে আমাকে বলল, তুমি কি সবসময় এত কনফিডেন্ট থাকো? আমি বললাম, না। শুধু যখন আয়নায় নিজেকে দেখি।”
এবার সাজিদ জোরে হাসল। আবিদও মুচকি হেসে মাথা নাড়ল। নোমানের কথাবার্তায় কোনো ভারীপনা নেই। হালকা। সহজ।
এদিকে কথা ঘুরতে ঘুরতে রাজনীতিতে গেল। সাজিদ আবিদকে বলল,
“ইরান-ইসরায়েল টেনশনটা আবার বাড়ছে। তুই কী মনে করিস?”
আবিদ একটু গম্ভীর হয়ে বলল,
“জটিল ব্যাপার। ইরানের নিউক্লিয়ার প্রোগ্রাম আর ইসরায়েলের সিকিউরিটি কনসার্ন দুটোই আছে। আমেরিকা যদি সরাসরি না নামে, তাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।”
নোমান হঠাৎ কথায় ঢুকল।
“আসলে মূল সমস্যা হলো ডিটারেন্স। ইরান চায় নিউক্লিয়ার ক্যাপাবিলিটি অর্জন করে রিজিওনাল পাওয়ার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে। ইসরায়েল সেটা হতে দিতে চায় না, কারণ একবার ইরানের হাতে নিউক্লিয়ার এলে পুরো মিডল ইস্টের ব্যালেন্স চেঞ্জ হয়ে যাবে। আর আমেরিকার পজিশন হলো ইরানকে আটকে রাখো, কিন্তু ফুল স্কেল ওয়ারে যেয়ো না। কারণ ওয়ার শুরু হলে তেলের দাম আকাশছোঁয়া হবে, গ্লোবাল ইকোনমি কাঁপবে। তাই সবাই প্রক্সি ওয়ার আর সাইবার অ্যাটাক দিয়ে খেলছে। ডিরেক্ট কনফ্রন্টেশন কেউ চায় না।” আবিদ নোমানের দিকে তাকাল। একটু অবাক হয়ে। নোমানের বিশ্লেষণটা পরিষ্কার এবং যথেষ্ট একুরেট ছিল। হালকা কথাবার্তার ছেলেটা হঠাৎ গম্ভীর বিষয়ে এতটা ধারালো মন্তব্য করবে ভাবেনি।
সাজিদ বলল,
“দেখ, নোমান শুধু বাস্কেটবল আর ডিবেটই পারে না। পলিটিক্সও পারে।”
নোমান হাসল।
“পারি না। শুধু খবর দেখি আর একটু আবোল তাবোল ভাবি। তোমরা সিরিয়াস লোক। আমি তো হালকা।”
আবিদ মাথা নাড়ল। ভেতরে একটু ইম্প্রেসড হয়েছিল। ছেলেটা হাসিখুশি, রসিক, অথচ বিষয় বুঝে কথা বলে। তার ভালো লাগল।
কথাগুলো আরও কিছুক্ষণ চলল। কেউ কারো ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কিছু জানল না। আবিদ জানল না যে কয়েকদিন আগে বুশরা যে ছেলেটার কথা বলেছিল, সে এই নোমান। নোমানও জানল না যে আবিদ বুশরার বয়ফ্রেন্ড। শুধু একটা সাধারণ পরিচয় হলো। হাসির সাথে। সহজে। আর একটু সম্মানের সাথে।
(ঘ)
রাত প্রায় সাড়ে দশটা। বুশরা বিছানায় শুয়ে ফোন কানে দিয়েছে। আবিদ লাইনে। সাধারণত সারাদিন শেষে রাতে ঘুমানোর আগে দুইজন একবার কথা বলে। সারাদিনের হাইলাইটস দেয় দুইজন দুইজন কে। কথা শেয়ার করার যে আনন্দটা এটার জন্য অপেক্ষা করে থাকে দুইজন। জানে আর কেউ না শুনতে চাইলেও সারাদিনের বোরিং কাজের গল্প গুলো খালি ওরা নিজেদের মাঝেই শেয়ার করতে পারে।
“আজকের দিন কেমন কাটল?” আবিদ জিজ্ঞেস করল। সারাদিন এমনিতে খারাপ যায় নি, তবে সকালে ক্লাসে ঐ ছেলে গুলোর সাথে কথা কাটাকাটি মনে একটা কাটা হয়ে আছে। বুশরা বলল,
“পড়াশোনা নিয়ে একটু টেনশনে আছি। মেহমানদের জন্য গত কয়েকদিন পড়া হয়নি। মিডটার্ম আসছে। সকালে ক্লাসে বসে নোট পড়ছিলাম, কিছু ছেলে এসে জোরে কথা বলছিল। বিরক্ত লাগছিল।”
আবিদ বলল,
“তুই চুপ করতে বলিস নি ওদের?”
“হ্যাঁ। একটু বলেছি। তারপর আর কিছু হয়নি।”
আবিদ একটু চুপ থেকে বলল,
“আমার আজ একটা নতুন পরিচয় হলো। সাজিদের সাথে একটা ছেলে ছিল। নোমান। খুব হাসিখুশি। কথা বলে ভালো। সহজে মিশে যায়। একটা জোকস বলল, হাসলাম। তারপর ইরান ওয়ার নিয়ে কথা হচ্ছিল, ও খুব পরিষ্কার করে বিশ্লেষণ করল। প্রথম কথা বলার সময় ওর জোক্স শুনে ভাল লাগলেও মনে হয়েছিল একটু শ্যালো ছেলে তবে পরে দেখি ইরান ওয়ার নিয়ে খুব ভাল এনালাইসিস দিল। ভাল সারপ্রাইজড হয়েছি তখন। ভালো লাগল ওকে। সাজিদও ওর প্রসংগে অনেক ভাল কথা বলল”
বুশরা কানে ফোন চেপে টেবিলে বই গোছাচ্ছিল। নোমান, নামটা শুনে একটু থতমত খেল। কিন্তু আবিদের কণ্ঠস্বর থেকে বোঝা গেল সে কোনো বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে না। শুধু একটা সাধারণ পরিচয়ের কথা বলছে। বুশরা আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। মনে মনে বলল, নাম মিলে গেলেও হয়তো অন্য কেউ। ক্যাম্পাসে নোমান নামে একজনের বেশি থাকতে পারে।
আবিদ বলল,
“তুই পড়াশোনায় মন দিস। টেনশন করিস না। পারবি তুই।”
বুশরা আস্তে বলল,
“চেষ্টা করছি।”
কল শেষ হলো। বুশরা ফোনটা বালিশের পাশে রাখল। চোখ বন্ধ করল। মনে মনে আজকের তিনটা ছবি ভেসে উঠল। ক্লাসের দরজার কাছে জোরে কথা বলা ছেলেটা। ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে মাঠে দাঁড়ানো ছেলেটা। আর আবিদের মুখে নতুন পরিচয়ের নামটা।
তিনজন মানুষ। নিজেদের অজান্তেই একে অপরের বৃত্তে ঢুকে পড়ছে। ধীরে ধীরে। কোনো আভাস ছাড়াই।