গল্প: ইশক- এ মামনুন (০১)

Written by- ibn imtiaj

পর্ব:০১

ম্যামের স্বামী মারা গেছে আজ প্রায় তিনদিন হল। এর মাঝেই ম্যাম আজকে রাতে আমাকে তাঁর বাসায় ডিনারে ডেকেছেন। সাথে আনতে বলেছেন কিছু চকলেট। অনেক অদ্ভুত বিষয়টা। তারচেয়েও অদ্ভুত বিষয় হল, গত সপ্তাহে ফাঁকা একটা জায়গায় ম্যামের সাথে দেখা হয়ে যাওয়ার পরে হাত নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। সেদিন ম্যাম নরম চোখে তাকানো ব্যাতিত আর কিছুই বলেনি। উনি যদি কড়া ভাষায় কথাও বলতেন কিছু, মনে নিতাম না আমি।

ফোনে কথার ফাঁকেই জিজ্ঞেস করেছিলাম,বাসায় আর কে কে আসবে ? উত্তরে তিনি বলেন , কেও না। তাছাড়া বাসায় নেই কেউ। মা আর বাবা চলে গেছেন। শুধু তুমি আসবে। কিন্তু দয়া করে সেই প্লেবয় পারফিউম দিয়ে এসোনা। অ্যারিজোনার চকলেট টা মেখে আসবে। বাসায় আসলে আমি তোমাকে টাকা দিয়ে দিব। সিল দেখে কিনবে।‌ নকল যেন না‌ কেনা হয়।

সব কিছু আমাকে অবাক করে দিচ্ছিল আমাকে। একবার ভাবলাম মাইকেলকে ফোন দিয়ে বলা দরকার সব। কিন্তু কথার মাঝে ম্যাম একবার বলে দিয়েছেন যে, তুমি যে আমার বাসায় আসবে, এটা কাওকে বলার দরকার নেই।

সন্ধা শেষ হওয়ার আগেই রওয়ানা হয়ে যাই ম্যামের বাসার দিকে। ম্যাম বেলিফুল পছন্দ করেন। এটা অনেক আগে চার্চে থাকতে জানতে পেরেছিলাম। তাঁর এমন কোন পছন্দ নেই যা আমার অজানা। বাড়তে থাকা বয়স একটা ভয়ানক জিনিস। এই বয়স বাড়ার সাথে, কেন যেন ওনার উপরেই দুর্বল হয়ে পড়েছি। নিজেকে হাজার বার বুঝিয়েও পিছু হটাতে পারিনি। সেদিন তো নিজেকে একটু বেশী দুরেই নিয়ে ফেললাম। সাহস করে উনার পিঠে হাত দিয়ে ফেলেছি। এই সম্পূর্ণ কুবুদ্ধি মাইকেল দিয়েছিল আমাকে। আমি জানতাম উনি এই সময় এই ফাঁকা রাস্তা দিয়েই যাবেন। অদ্ভুত ভাবে তিনি কিছুই বলেনি।

এর পরে উনার সাথে আর দেখা নেই। কিন্তু সেই দিনের মুহূর্তটা আমাকে ঘিরে রাখত সব সময়। মনের ভেতরে তাকে নিয়ে একটা অনুশোচনায় ভুগতাম। এই কাজটি আমি না করলেও পারতাম হয়ত। তবে সেদিনের পরে নিজের ভেতরের কল্পনা গাঢ় হয়ে যায়। নিজেকে কল্পনায় ডুবিয়ে দিতাম তাঁর বুকের মাঝে। ম্যাম কে নিয়ে আমি ছাড়া আর কেও ভাবত কিনা জানিনা। অনেকেই জানত যে, লেনা ম্যামকে আমি কতটা পছন্দ করতাম। সবাই হয়ত পছন্দ পর্যন্তই জানত মাইকেল ছাড়া।

বাসায় এসেছিলাম ওনার স্বামীর বিদায়ের দিনে। শেষকৃত্যতে এসে বাসাটা চিনে গেছি। তবে জানতাম না যে, এই চিনে যাওয়াটা কাজে লাগবে।

বাসার সামনে এসে দেখি দোতলায় লাইট জ্বলছে। ভেতরের পাতলা সাদা পর্দাটা বাতাসের টানে মাঝে মাঝে বাহিরে চলে আসছে। পকেট থেকে ফোন বের করে একটা রিং দিলাম ম্যামকে। অপর দিকে রিসিভ করতেই ম্যামকে একটু গম্ভীর কণ্ঠে বললাম,” আপনার জন্য আপনার বাসার সামনে চলে এসেছি।” কিন্তু আমি যে এই সন্ধার আলোতে দাঁড়িয়ে আমার সামনে এমন একটা দৃশ্য দেখব, সেটা কল্পনা করতে পারিনি।

মারাকেশিয়ান ক্রস একজন জার্মানি মেয়ে লেনা ম্যাম। পর্দা সরিয়ে বাহিরে তাকিয়েছে আমাকে খুঁজতে। এখন তাঁর পরনে লাল রঙের কাফতান। কান আর গলা ভর্তি গহনা। এটা এখানে দাঁড়িয়ে থেকেই বুঝা যাচ্ছে। তার এমন দর্শনে মুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে বললাম, এখান থেকে দেখতেই এত সুন্দর লাগছে। সামনে দেখলে মরে যাবো নাতো?

নরম কন্ঠ সেদিক থেকে ভেসে আসে,”মেরে ফেলার জন্যই ডেকেছি। সেখানে দাঁড়িয়ে না থেকে কাছে এসে দেখ। চলে আসো উপরে।”

দরজা খোলাই ছিল আমার জন্য। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকার পরেই ফুল লক হয়ে যায় সেটা। সিঁড়িতে যখন পা দিব, তখন দেখি যে, সিঁড়িতে গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে আছে। এটা আমাকে আরও অবাক করে দেয়। কি হয়েছে আজকে ম্যামের? এসব কি আমার জন্যই করা হয়েছে? নাকি অন্য কোন কারণ আছে ? হয়ত সেটা সামনে গেলেই জানতে পারব।

সিঁড়ি পেরিয়ে আনমনে যখন দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকতেই যাব, সেই সময়ে আচমকা ম্যাম অরেঞ্জ জুস হাতে নিয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে যায়। ধাক্কা লেগে জুস কিছুটা পরে যায় আমার শার্টে। ম্যাম জিহ্বা কামড়ে বলে,” ইশ একদম খেয়াল করিনি আমি। পরক্ষনেই তার চোখটা যেন আঁটকে যায় আমার উপরে। উনি তখন বিস্ময়কর কণ্ঠে আমাকে বলে, “ বাহ রেনাস, তোমাকে আজকে দেখতে একজন সুপুরুষ লাগছে। ভেতরে এসো এখন, লম্বা সময় ধরে তোমাকে দেখা যাবে।”

ভেতরে ঢুকে নতুন করে আর অবাক হলাম না। কারণ দিনের শুরুটাই হয়েছে অবাক করা বিষয় নিয়ে। সুতরাং ভেতরটা আমাকে আর অবাক করবেনা। মোমবাতির আলোতে ঘড়টা আরও আলকিত লাগছে।

সোফাতে বসতেই ম্যাম তাঁর হাতের জুস আমাকে দেয়। আমি হাতে নিয়ে যখন এক চুমুক দিব, ঠিক তখন ম্যাম বলে,” তুমি এতটা ভদ্র, তাতো জানতাম না।”

আমি কোন জবাব দিতে পারলাম না। শুধু এই কথার মানে খুঁজতে থাকলাম। সামনেই বসে উনি এক হাঁটুর উপরে আর এক হাঁটু তুলে। নিজেকে অতটা গুছাচ্ছেনা এখন তিনি আমার সামনে। আমি জুস পান করেই চলেছি। ধীরে ধীরে মুহূর্তটা যেন নিরব হয়ে গেল।
আমি নিরবতা ভেঙ্গে জিজ্ঞেস করলাম,” ম্যাম, আজকে এভাবে ডাকার কারণ কি ?”

তিনি অন্য দিক থেকে চোখ নিয়ে আসে আমার দিকে। নরম কণ্ঠে বলে, এখনি জানতে হবে ? রাত এখন লম্বা হয়ে গেছে। তোমার তো যাওয়ার কোন তাড়া নেই।

না আসলে, আমি এভাবে কখনও এর আগে কারো আমন্ত্রণ পাইনি। আর আপনি যেহেতু এতো খাস করে ডেকেছেন। তাই ভাবলাম, হয়ত কোন কারণ আছে।

তেমন কিছুনা, একা লাগছিল। তাই ভাবলাম, তোমাকে পাশে নিয়ে আজকের সময়টা পার করি। সময়টা কাটতে চাইছেনা।

এমন কথা শুনে আজকের অবাক করা বিষয় গুলো মুছে গেল। কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিত কথা শুনে আমার নিশ্বাস টা একটু ধীরগতি হয়ে গেছে। তিনি কিনা আমাকে ডেকেছেন একা লাগছে তাই! “তো সেই ক্ষেত্রে আমি কেন ?”

ম্যাম তখন সামনের সোফা থেকে উঠে আমার দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে থাকে। পাশে এসে বসে অনেকটা গা ঘেঁষে। ধীর কণ্ঠে তিনি আমাকে বলেন, আমি বিশ্বাস করি তোমাকে। তবে কেন করছি বা করি জানিনা সেটা। কিন্তু তুমি এভাবে চুপসে যাচ্ছ কেন? সেদিন তোমাকে দেখে ভেবেছিলাম , তুমি একটু আলাদা সবার থেকে। তোমার সাহস অতুলনীয়।

সেদিনের কথা আমি ঠিক বলতে পারবোনা। কিন্তু এখন সত্যি আমি অনেক নার্ভাস ফিল করছি।

ম্যাম আস্তে করে ঊরুর উপরে হাত রেখে বলে, কারণ ?

সেটাও অজানা।

কত টাকা লেগেছে ফারমিউমের?

আপনার কি এটাই পছন্দ ?

ম্যাম চোখ বন্ধ করে কোটের উপরে নাক নিয়ে নরম কণ্ঠে বলেন, “ভীষণ।” যেটা বহু দিন আগে আমার প্রেমিকের শরীরে পেয়েছিলাম।

আপনার প্রেমিকও ছিল ?

বিশ্বাস হচ্ছেনা?

একটু কষ্ট হচ্ছে।

এই ঘ্রাণ পাওয়ার পরে কোলে মাথা গুঁজে হাতের স্পর্শ পেতে ইচ্ছে করে মাথায়। তবে মনে হচ্ছেনা বেশী কিছু আশা করা সম্ভব কারো থেকে। যাইহোক, কি খেতে পছন্দ কর তুমি ?

ম্যাম আমাকে এখন যেই পরিস্থিতিতে আছড়ে ফেলে দিলেন। পুরুষ হলে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা একদম কঠিন। সাহস করে ম্যামের হাত টেনে নিয়ে বললাম,”আমি মাথায় ভাল করে হাত বুলিয়ে দিতে পারি। আপনার পছন্দ হতে পারে।”

এখন কিছু খাবেনা?

মুখে আমার এক ভিন্ন রকম কথা এসেছিল। কিন্তু সেটা গিলে নিয়েছি। ভিন্ন উত্তরে তাঁকে বললাম,” এটা বলে দেরি করার দরকার নেই।” দুই হাত দুই দিকে প্রসারিত করে বললাম,” বুকে আসবেন নাকি ঊরুতে মাথা রাখবেন ?”

এখানে না। বারান্দায় চলো।

ম্যাম পাশে থেকে উঠে গেলেন। একটা ছায়ার মত তিনি সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। তবে এই ছায়ার একটি ঘ্রাণ আছে। সেটা আমি তাঁর পেছনে পেছনে যেতেই বুঝতে পারছিলাম।

বাড়ির অন্য একটা দিক এটা। সামনে একটা বাগান, তারপরে শহরের রাস্তা। বাগানটা বেশ বড়। খোলা বারান্দা থেকে এই বাগানটা দেখতে এতটাই সুন্দর লাগছিল অন্ধকারের ভিতরে , যা বর্ণনা করার মত নয়। এই সাময়িক মুহূর্তের সাথে যেন বারান্দার আবহাওয়াটা বেশ খাপ খাওয়া।
একটা গদির চেয়ার এগিয়ে দিয়ে আমাকে বসতে বলেন তিনি। লম্বা আছে বেশ এটা। আমি গা ছেড়ে বসতেই ম্যাম মুহূর্তেই তাঁর শরীর এলিয়ে দিয়ে অধিকারী একজন মানুষের মত আমার বুকে মাথা রেখে নিজেকে ছেড়ে দেয়। অনুভুতিও যে এমন হয় জানা ছিল না আমার।

শরীরটা কেঁপে ওঠে আমার কিছুটা। মাথার চুল কিছুটা সরিয়ে তাঁর চোখ দুটো বের করলাম। ম্যাম তখন বুকের মাঝে আরও ঠেলে দেয় তার মুখ। যেন সে এই ঘ্রানের ভেতরে নিজেকে ডুবিয়ে দিচ্ছে। ঠিক কি বলব আমি খুঁজে পাচ্ছিলাম না।

ম্যাম তখন জিজ্ঞেস করে, এর আগে কাওকে এভাবে বুকে রেখেছ?

আমি খুব অগোছালোভাবেই উত্তর দিলাম,”না।” কিন্তু আজকে আপনার এমন আচরণ আমার কাছে বেশ অনাকাঙ্ক্ষিত লাগছে।

সেসব পরে শুনব। কিছু কি অনুভব হচ্ছে?

আমি তাঁকে উত্তর না দিয়ে কথার প্রসঙ্গ বদলে ফেললাম। এমন মুহূর্তে আমার গলা শুঁকিয়ে আসছিল। আমি তখন বললাম, “জুস কি আর আছে নাকি সব শেষ ?”

এই মুহূর্তে জুস কেন লাগছে তোমার ?

গলা শুঁকিয়ে গেছে।

আমি ভিজিয়ে দিব কি ভিন্ন ভাবে?

কথাটা শুনে যেন শরীরটা একটু কেঁপে উঠল। আমি তখন বললাম, জুসটা পেলে তারপরে দিবেন না হয়?

ম্যাম বুক থেকে উঠে গিয়ে দাঁড়ায়। দাঁড়ানোর পরে উনি আমাকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলে, এই মন যেন না বদলে যায়। আমি নিয়ে আসছি জুস।

ম্যাম তড়িৎ গতিতে সামনে থেকে হাওয়া হয়ে যায়। আমি তখন পকেটে মোবাইলের ভাইব্রেশন বুঝতে পারলাম। ইচ্ছে করছিল না এই মুহূর্তে মোবাইল দেখতে। তবুও কেন যেন মোবাইলটা বের করলাম। বিকেল থেকে এ পর্যন্ত মোবাইলটা আমার দেখা হয়নি। তখন মনে পড়ল, ম্যামের জন্য চকলেটও এনেছি। এখনও দেওয়া হয়নি উনাকে। পকেটেই রেখে দিয়েছি। সেটা বের করে পাশে রেখে ,মোবাইলের স্ক্রিন অন করলাম। কিন্তু মেসেজ দিয়েছে মাইকেল। মাইকেল সাধারণত কখনও মেসেজ দেয়না। আমি যখন মাইকেলের মেসেজ টা অন করলাম, আমার হাত কাঁপতে শুরু করল। ঠাণ্ডা পরিবেশেও যেন কপালটা ঘেমে উঠল আমার। নিজের চোখেও আমি এই মেসেজটা পড়ার পরে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। ” রেনাস, লেনা ম্যাম এক্সিডেন্ট করেছে । সকাল থেকে তোকে কল দিতে চেষ্টা করছি। কল ঢুকছেনা। সন্ধার আগেই মেডিকেলে আয়। ময়নাতদন্তের দায়িত্ব আমরা পেয়েছি।”

চলবে….

Leave a Comment