গল্প: ম্যাচ মেকার (০২)

লেখিকা: জান্নাত রাহমানের হৃদি

পর্ব:০২

কলেজ থেকে ফিরেছি সেই দুটো বাজে। এসে গোসল ছাড়াই ডাইনিং টেবিলে বসে গপাগপ গিলে তুষার ভাইয়ের বাসায় গিয়েছিলাম তার সন্ধানে। আমার টাকা সে এমনি এমনি খেয়ে নিবে? এই মানসীর টাকা খাওয়া এত সহজ? সেটা যদি তুষার ভাই ভেবে থাকেন। তবে খুব-ই ভুল ভেবেছেন। রাগে গজগজ করতে করতে তার বাসায় ঢুকলাম। কিন্তু তুষার ভাইকে বাসায় পাওয়া গেলো না। আন্টি বললেন তুষার ভায়ইয়ের মাথায় নাকি নতুন ব্যবসার আইডিয়া এসেছে। সেটা পূরণ করতেই তিনি ভরদুপুরে বাসা থেকে বেরিয়েছেন। এখনো ঘরমুখো হননি।

আমি মনে মনে মুখ ভেঙচালাম। ‘লোকটার মাথায় আর কি ব্যবসার আইডিয়া আসতে পারে ঐ ঘটকালি আইডিয়া ছাড়া? ধান্দাবাজ লোক কোথাকার।’ মনের কথা মনে চেপে মেকি হেসে আন্টিকে বিদায় জানিয়ে বাসায় চলে আসতে নিলাম আমি। আন্টি পিছু ডাকলেন। বললেন, ‘আরে মানসী, চলে যাচ্ছো যে? বসো কিছুক্ষন। গল্প করি।’

‘এখন না আন্টি। পরে আসবো।’ বলেই তুষার ভাইদের বাসা থেকে চলে এলাম আমি। এরপর রুমের বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে বাঁজপাখির মতো দৃষ্টি রাখলাম রাস্তার দিকে। তুষার ভাই আসলেই সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে যেনো তার টুটি চেপে ধরতে পারি।

তুষার ভাইয়ের দেখা পাওয়া গেলো ঠিক সন্ধ্যেবেলা। আমি তাকে দেখেই ভো দৌড়ে ছুটে এলাম রাস্তায়। গেইটের সামনে থেকে একটা আধলা কুড়িয়ে নিয়ে হেঁটে গিয়ে দাঁড়ালাম তার সামনে। তুষার ভাই তখন ভ্যান থেকে এক ঝুড়ি ভর্তি মুরগির বাচ্চা নামিয়ে রেখে ভ্যানওয়ালাকে বিদায় করছেন। মুরগির বাচ্চা গুলো একাধারে চিচি করে ডাকছে। যাই হোক, তার মুরগির বাচ্চা দিয়ে আমার কাজ নেই কোনো। তাই ওসবে গুরুত্ব না দিয়ে তুষার ভাইকে সোজাসোজি বললাম, ‘তুষার ভাই আমার টাকাটা ফেরত দিয়ে দিন।’

তুষার ভাই টাকার কথা শুনে যেনো আকাশ থেকে পড়লেন। অবাক স্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘কোন টাকা? কিসের টাকা? আমাকে টাকা দিয়েছিলি নাকি? কই মনে পড়ছে না তো।’ তুষার ভাই দাঁড়িতে হাত চেপে মনে করার চেষ্টা করলেন।

আমি ক্রুদ্ধ চোখে তাকালাম তার দিকে। পিছনে ইট ধরে রাখা হাতটা সামনে আনলাম। হাতটা একেবারে উচু করে তার মাথার দিকে ধরে বললাম, ‘মনে নেই? বারি মারবো মাথায়? বারি মারলেই স্মৃতি শক্তি ফিরে আসবে।’

তুষার ভাই ভয়াতুর চোখে তাকালেন। বললেন, ‘কি সর্বনাশ! মাএ দু’টো হাজার টাকার জন্য তুই দিনে দুপুরে মানুষ খুন করতে চাচ্ছিস?’

আমি দাঁতে দাঁত পিষে বললাম। ‘এমা, মারার আগেই স্মৃতি শক্তি ফিরে এলো? যাইহোক মনে পড়েছে যখন সোজাসোজি টাকা টা দিয়ে দিন।’

তুষার ভাই নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বললেন, ‘ টাকা ফেরত চাইছিস কোন যুক্তিতে? মানছি আমি তোর প্রেম ঘটকালিতে সফল হতে পারিনি। তাই বলে তুই টাকা ফেরত চাইবি? এটা অমানবিকতা হয়ে গেলো না? জানিস ঐ ছেলের পিছন পিছন হাঁটতে হাঁটতে আমার জুতোর তলি ক্ষয়ে গেছে।’

‘আপনি হেঁটেছেন না দৌড়েছেন তা আমি ভালো করেই জানি। দেখুন তুষার ভাই আমি এমনিতেই রেগে আছি খুব। ভালোয় ভালোয় আমার টাকাটা দিয়ে দিন। আর না দিলে..’

‘আর না দিলে? কি করবি? হুমকি দিচ্ছিস তুই? দুই দিনের মেয়ে আমাকে হুমকি দেস? তোর তো বহুত সাহস বেড়েছে রে মানসী।’

‘আমার সাহসের কিছুই এখনো অব্দি আপনাকে দেখাই নি আমি।’

তুষার ভাই বিদ্রুপ করে বললেন, ‘দেখা তাহলে? আমিও দেখি তোর কতটা সাহস আছে।’

তুষার ভাই কথাটা শেষ করতে পারলেন না। তার আগেই আমি তার কপাল বরাবর আধলা টা দিয়ে ঠাশ করে বারি মারলাম। আমি তখন নিজের মধ্যে নেই। রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছি যেনো। তুষার ভাই হয়তো ভাবতে পারেন নি আমি তাকে আক্রমন করতে পারি। তিনি কপাল চেপে ধরে হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইলেন। আমি উনার দিকে তাকিয়েও দেখলাম না। নিজের কার্য সম্পাদন করেই ধপাধপ পায়ে চলে এসেছি বাসায়।

.
সামনেই আমার এইচএসসি পরীক্ষা। তাই এ বাসার হোম মিনিষ্টার আমার জন্য আইন তৈরী করেছেন সন্ধ্যা থেকে রাত এগারোটা অব্দি আমি না ফোনে হাত লাগাতে পারবো। আর না টিভির রিমোটে। আমি যদি এহেন কাজ করে থাকি এবং হোম মিনিষ্টারের হাতে ধরা পড়ি। তবে শাস্তি হিসেবে আমার থেকে ফোন কেড়ে নেওয়া হবে। এবং টিভির রিমোট ভাঙা হবে। আম্মুর ভয়ে আমরা সর্বদা তটস্থ থাকি। আমি আর কি চুনোপুটি? আমার বাপ অব্দি এই দজ্জাল মহিলার ভয়ে সারাক্ষন ঘাপটি মেরে থাকেন। তাই মনের ভুলেও তার আদেশ উপেক্ষা করার চিন্তা করিনা আমি। একবার করার চেষ্টা করেছিলাম। ফল বিশেষ একটা ভালো হয়নি। সেই থেকেই আর ওসব চিন্তা ভাবনা আর মাথায় আনি না।

সন্ধ্যা থেকে একাধারে বই পড়লাম আমি। দেয়াল ঘড়ির ঘন্টার কাটা টা যখনি এগারোর ঘরে পদার্পন করলো তখনি বই বন্ধ করে উঠে পড়লাম টেবিল ছেড়ে। আম্মুর কাছে বন্ধক রাখা ফোনটা ছাড়িয়ে এনে বিছানায় আয়েশ করে শুয়ে ফেসবুকে ঢুকলাম। আর ঢুকতেই তুষার ভাইয়ের একটা পোষ্ট সামনে পড়লো আমার। সেটা এমন ছিল যে,
‘প্রিয় ফেসবুকবাসী। আপনারা সবাই জানেন আমি একটা বিজনেস করি। তো ইদানিং আমার কিছু অকৃতজ্ঞ গ্রাহক জুটেছে। যার প্রেম সফল করতে গিয়ে আমার জুতোর তলি ক্ষয়েছে। বৃষ্টিতে ভিজেছি, ঘামে ভিজেছি। অসুখ বাধিয়েছি। সেই অসুখে উক্ত গ্রাহকের দেওয়া দু হাজার টাকা দিয়ে আমার ঔষধ কিনে খেতে হয়েছে। এখন উক্ত গ্রাহকের প্রেম সফল না হলে সে দায়ভার আমার? এখন আমার কাছে টাকা ফেরত চাইতে আসাটা অমানবিক কাজ না? কিন্তু কি আর বলবো। সেই অমানুষ টা আমি টাকা ফেরত না দেওয়ায় দেখুন আমার কপাল কিভাবে ফাটিয়ে দিয়েছে। এর বিচার আপনারাই করুন।’

পোষ্টের নিচে কপাল থেকে ধরধর করে রক্ত ঝরছে তার একটা ছবি তুলে প্রমান হিসবে আপলোড ও করে দিয়েছেন তিনি। আমি ছবিটা জুম করে দেখলাম। বেশ ভালো রকমের-ই ফেটেছে কপালটা। মনে মনে গিল্টি ফিল করলাম এক মূহুর্তের জন্য।
পরমূহুর্তেই মনে হলো যা করছি বেশ করেছি। লোকটা ক্ষেপিয়ে না দিলে তো আমি তাকে আঘাত করতাম না। তার বড্ড সখ হয়েছিল আমার সাহস দেখার। দেখিয়েছি ব্যস। কিন্তু আমি অবাক হচ্ছি এই ভেবে যে, গর্দভ লোকটার শরীরে কি ব্যথা টেথা নেই নাকি? ড্রেসিং করা রেখে ফেসবুকে ছবি তুলে আপলোড দিচ্ছে? কত বড় অপদার্থ হলে এটা করতে পারে আপনারাই চিন্তা করুন একবার।

আমি কমেন্ট সেকশনে ঢুকলাম এবার। দেখলাম অনেক মানুষ তাকে সহমর্মিতা জানাচ্ছে। বলছে, ‘ইশ ভালোর কোনো জামানাই নাই আজকাল। তার উপর দু হাজার টাকার জন্য যে মাথা ফাটিয়ে দিতে পারে। সে মানুষ ও খুন করতে পারে।’

এই ধরনের কমেন্ট দেখেই মুখ বিকৃত করলাম আমি। আাচে তুষার ভাইয়ের চামচারা। তারা কি জানে? ঐ দু হাজার টাকা কত কষ্ট করে বাপের পকেট থেকে মারতে হয়েছিল আমার।’

আমি একে একে সব কমেন্ট পড়লাম ভালো কমেন্টের থেকে খারাপ কমেন্ট-ই বেশি দেখলাম। কেউ কেউ লিখেছেন, ‘যেই করেছে ভালোই করেছে। মানুষ ঠকানো ব্যবসা করলে এইরকম মার-ই কপালে জোটে।’

তুষার ভাই সেই কমেন্টে এংরি রিয়েক্ট দিয়ে লিখেছেন। ‘মানুষ ঠকানো ব্যবসা হলো কি করে? এ কাজ গুলো করতে আমার পরিশ্রম করতে হয় না? নিজেদের তো একা একা গার্লফ্রেন্ড জুটানোর ক্ষমতা নেই। মেয়ে পটানোর জন্য তো আমার কাছেই আসিস তোরা। এখন আবার পরনিন্দা করছিস? নাম গুলো দেখে রাখলাম আমি।’

তাদের এসব তর্ক বিতর্কের মধ্যে আমিও বা হাত ঢুকালাম। যারাই তুষার ভাইকে ব্যাড কমেন্ট করছেন, তাদের কমেন্টেই গিয়ে আমি রিপ্লাই দিচ্ছি ‘জ্বী জনাব ঠিক বলেছেন। ঠিক, একদম ঠিক।’

তুষার ভাই এতগুলো মানুষের প্রতিবাদ একসঙ্গে করতে পারলেন না। তাই দুই মিনিটের মধ্যেই দেখলাম পোষ্ট গায়েব। গায়েব হওয়ার-ই কথা। তার ব্যবসা নিয়ে মানুষ নিন্দে করছে যে। নিজের নামে বদনাম শুনতে কার-ই ভালো লাগে বলুন?’ সে যাই হোক! আমি এদিকে ভাবছি। লোকটা আমাকে অমানুষ বলে পোষ্ট দিয়েছে। এর মজা তো আমি উঠাবোই। হুট করেই মাথায় একটা জবরদাস্ত বুূ্দ্ধি চলে এলো। লোকটার ব্যবসায় লাল বাত্তি জ্বালানোর বুদ্ধি। আহা ভাবতেই কেমন পৈশাচিক আনন্দ হচ্ছে। না জানি কাজটা করার পর কতটা আনন্দ বোধ হবে।

চলবে..

0 0 votes
Article Rating
Loading spinner
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x