গল্প: চলোনা আজ এ রূপকথা‌ তোমাকে শোনাই(০৫)

লেখনীতে:প্রিয়াংশি চৌধুরী

পর্বসংখ্যা_৫

সামনে নির্বাচন। ক্ষমতার আবেশে ভারী হয়ে আছে বাতাস। কায়রাভ তাজওয়ার খান বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রচুর দৌড়াদৌড়ির ওপরে আছে। বর্তমানে তুমুল ব্যস্ততায় কাটছে তার দিন। নির্বাচন মানে শুধু গণভোট নয়, তার বাঁচামরার লড়াই। তার সম্মান আর অস্তিত্বের প্রশ্ন। এমপি পদে টিকে থাকতে হলে জনগণের ভোট দরকার সাথে তাদের ভালোবাসা। এমপি হিসেবে যদিও কায়রাভের জেতার সম্ভাবনা বেশি তবুও কায়রাভ রিস্ক নিতে চাচ্ছে না। তাই কায়রাভের দলবল উঠে পড়ে লেগেছে, একদম আদাজল খেয়ে। কায়রাভের বিপক্ষে লড়ছে আলতাফ মির্জাসহ আরও অনেকে। তবে আলতাফ মির্জা বেশ শক্তিশালী পার্টি। সে ওত পেতেই আছে কায়রাভের ক্ষতি করার। আজকে কায়রাভের সমাবেশের খবর সে আগেই পেয়েছে এবং সেই অনুযায়ী তার পরিকল্পনা কায়রাভ তাজওয়ার খানকে শেষ করে দেওয়া। রাজনীতির ময়দান থেকে কায়রাভ তাজওয়ার খানের সমাপ্তিই তার উদ্দেশ্য। কারণ এই কায়রাভ ছাড়া তাকে তার চালে মাত দিতে কেও পারবে না।

কাল রাতে আলতাফ মির্জা নিজের ঘরেই ছিলো।
মধ্যবয়স ছুঁই ছুঁই আলতাফ মির্জা গম্ভীর হয়ে সোফায় আধশোয়া হয়ে বসে আছে। সোফার মাথার পাশে এক হাত রেখে, অন্য হাতে সিগারেটটা এমনভাবে ধরেছে যেন সেটাই তার ক্ষমতার সিম্বল। সামনের চুলগুলোও সামান্য উঠে আসছে। যতই হোক বয়স তো বাড়ছে। সেটা তো কমানো যাবে না। বয়সের দাবীকে কেউ অস্বীকার করতে পারে না, কিন্তু আলতাফ তা মেনে নিতে শিখেনি। বয়স বাড়ছে, তবুও নিজের পুরুষত্বের অহংকার তাকে ঘিরে রেখেছে।

আটচল্লিশ ছুঁয়েছে তার বয়স, কিন্তু বিয়ে করেননি।
সে বিয়ে নামে কোনো বাঁধনে নিজেকে আবদ্ধ করতে চায় না। কারণ সে জানে, স্ত্রী, সংসার, প্রতিজ্ঞা—এসব তার মতো লোকের কাছে নিষ্প্রয়োজন শেকল। পরিবার, পরিজন কিছুই নেই তার। তার মতে মানুষের দূর্বলতা বানানোই উচিত নয়, আর মানুষের সবচেয়ে বড় দূর্বলতা এই পরিবার।

অবশ্য তার রাতের কাজকর্ম অব্যাহত থাকে না। তার রাতগুলো উন্মুক্ত, নোংরা, পাপের মতোই মুক্ত।নিত্যনতুন মুখ, নতুন শরীর, নতুন নারীসঙ্গে তার দিন কাটে। তবে সবকিছু নিভৃতে ঘটে, সবকিছু লুকানো পর্দার আড়ালে। আলতাফ মির্জা তার অন্ধকার ভিতরটাকে লুকিয়ে রেখেছে, যা সমাজের কেউ দেখতে পাবে না আর দেখতে পেলেও বলার সাহস পাবে না। জনগণের সামনে সে এক মুখোশ পরে উন্নয়নমুখী, সদালাপী, লোকদরদী মানুষের। মাথা নুইয়ে সালাম দেয়, হাসি বিলায়, প্রতিশ্রুতি ছড়ায়। কিন্তু ব্যক্তিজীবনে সে সম্পূর্ণ বিপরীত। এক ভয়ংকর চরিত্র, যার আসল রূপ রাতের অন্ধকারে রাখে।

চোখের সামনে ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে ওঠছে। আলতাফ ধোঁয়া ছাড়ে দীর্ঘ শ্বাসে। আগামী দিনের নোংরা পরিকল্পনার আগে তার মস্তিষ্কের পরিকল্পনা সম্পর্কে আরও ভেবে নিতে চায়। তার চোখদুটোতে ক্লান্তি আছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও শিয়ালসুলভ বুদ্ধি তীক্ষ্ণ, ধারাল। সে হা করে ধোঁয়া ছাড়ছে। ধোঁয়ার মোটা অংশগুলো ছড়িয়ে পড়ে ঘরের কোনায়, অশুভ কোনো সংকেতের মতো। অবশ্য সে মানুষটাই অশুভ।

“ইমতিয়াজের পোলা বহুত বাড়তেছে রে… ওরে সরাইতে হবো রাস্তা থেকে। নাহলে আমার চালেই আমারে মাত দিব।”

আলতাফের কণ্ঠে ভারিক্কি ভাব। সামনে বসা দুটো ছেলের চোখে তখন আগুনের মতো জ্বলন্ত উচ্ছ্বাস। বলল,
“তাইলে কি করমু, বস? ওড়াই দেই?”

আলতাফ খ্যাক খ্যাক করে হাসে।
“শা*লা! উড়াবি ওরে? এতই সোজা? শত্রুরে দুর্বল ভাবা মারাত্মক ভুল। কায়রাভরে সহজভাবে নেওয়া ঠিক হবো না। ওয় বহুত চালাক। আগের বার কি করছিলো ভুলে গেছস?”

দুটো ছেলে পরস্পরের দিকে তাকায়, আগ্রহ আরও বেড়ে যায়।
“তাইলে কন, করমু কি? এভাবে হাত-পা গুটায়া বইসা থাকলে কি লাভ! ”

আলতাফ ধীরে ধীরে আধখাওয়া সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে, আর একটি মারাত্মক সিদ্ধান্ত সিলমোহর করছে মস্তিষ্কে। তারপর ঘাড় বাকিয়ে বলল,
“কাল ভাসানীর পাশে সমাবেশ ওদের দলের। নিরিবিলি জায়গা না। ভিড় থাকবে, বিশৃঙ্খলা থাকবে। ওইখানেই মোক্ষম সুযোগ, কাজে লাগাতে হবে।”

সে সোফা থেকে দাঁড়িয়ে আঙ্গুল তুলে ঘরের সব ছেলেপেলের উদ্দেশ্যে প্রতিধ্বনির মতো বলে ওঠে,
“দুইজনে রেডি থাকবি। আর কোনো পোলাপান নিবি না অযথা। তারপর তাক করে… সোজা শুট!হাহাহা!”

খানিকটা বদ্ধ উন্মাদ হাসিতে ভরে উঠে ঘর।পরিকল্পনা পাকাপোক্ত হয়েছে। এবার শুধু প্রয়োগ করা বাকি। এই আলতাফ হলো কায়রাভের জাত শত্রু। রাজনীতির মাঠে, সেই শুরু থেকেই।


অন্য প্রান্তে, কায়রাভ তাজওয়ার খানের সকালটা অদ্ভুত শান্ত। কায়রাভ বেরোবে সমাবেশে, একটু পরই। বেরোনোর আগে ঘড়ির বেল্টটা সামান্য টেনে ঠিক করতে করতে খানিক গম্ভীর গলায় ডাকে,
“কায়েশী… আমার কোটটা দাও।”

কায়েশী নিঃশব্দে এগিয়ে আসে। হাতে কোট নিয়ে। চোখ নামানো তার। ঠিক তখনই কায়রাভ অনায়াস ভঙ্গিতে তার কব্জিটা ধরেই কাছে টেনে আনে। এইটা তার নিত্যদিনের কাজ। দু’জনের মাঝের অদৃশ্য দূরত্বটুকু এক নিঃশ্বাসে মিলিয়ে দেয় সে। কোটটা গায়ে তুলতে তুলতে মোলায়েম দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
“মুখটা এমন বেজার করে থেকো না সবসময়। মানুষের কখন কি হয় বলা যায় না৷ প্রতিদিনের মতো আজও যাচ্ছি কাজে। এমন হলো, নাও ফিরতে পারি!”

কায়েশী চমকে তাকায়। চোখদুটি দপ করে ওঠে। অস্থির হলেও নিজেকে সামলায়। তবুও সামনের মানুষটাকে বুঝতে না দিয়ে এক ধরনের ঠান্ডা বিদ্রূপ কন্ঠে বলে,
“তাহলে আমার থেকে বেশি খু’শি কেউ হবে না।”

কায়রাভ থেমে যায়। অতপর ধীরভঙ্গিতে খুব আস্তে, কায়েশীর মুখ দু’হাতের আজলায় তুলে নেয়। মেয়েটার অস্থিরতা টের পায় কায়রাভ, মুখে বলে না। মেয়েটার কপালে নিরবে আলতো করে চু’মু একে দেয়। মলিন হেসে বলে,
“আমি মরে গেলে খুশি হবে?”

কায়েশী ঠোঁট বাঁকিয়ে ত্রস্ত বেগে তাকিয়ে বলে,
“শয়তান*রা এত তারাতাড়ি ম’রে না।”

কায়রাভ এবার সত্যিই জোরে হেসে ফেলে। তবে হাসির কিনারায় একরকম ভার জমে আছে। মুখে বলল,
“না মরলেই ভালো… যদিও মরতে আমার ভয় নেই। ভয়টা অন্য জায়গায়। বোনটাকে নিয়ে, ছোট বাচ্চাটাকে নিয়ে আর সবচেয়ে বেশি তোমাকে নিয়ে।আমি এই ভেবে ভেবে অস্থি’র হই যে আমি মরলে তোমায় এত ভালোবাসবে কে, কায়েশী?”

কায়েশী শ্বাস ফেলে ক্লান্ত ভঙ্গিমায়৷ তারপর কণ্ঠে খাদ নামিয়ে বলে ফেলে,
“চাই না এমন ভালোবাসা, চাই না। “

এই বলেই সে ঘুরে দাঁড়ায়। দরজার দিকে হাঁটার সময় এই বুঝি কেউ দেখে ফেলবে ভেবে মাথা নিচু রাখে, নয়তো ভেঙে যাবে। তবু… চোখ বেয়ে নেমে আসে এক ফোটা অশ্রুবিন্দু। দ্রুত, খুব দ্রুত আঙুলের ডগায় মুছে ফেলে। কেও দেখতে পায় না সেটা, কায়রাভও না।

আর পেছনে দাঁড়িয়ে কায়রাভ কেবল তাকিয়ে থাকে।
একটা মানুষের চলে যাওয়ার পায়ের শব্দে কীভাবে নিজের বুকের ভেতরকার নিঃশব্দ ভাঙনটা স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে সে কথা সে-ই শুধু জানে। কায়রাভ তার বউ-বাচ্চার কাছে, তার পরিবারের কাছে সত্যি খুব দূর্বল।

আর দেরি না করে গাড়ি করে রওনা দিয়েছে সমাবেশের উদ্দেশ্যে। গাড়ির জানালায় ভাসতে থাকা শহরের দৃশ্য দেখে মনে পড়ছে বাবার কথা। এই রাজনীতি তার বাবার রক্তের স্রোত বেয়ে তার শিরায় ঢুকে গেছে। তার বাবার জীবনের একাংশ সময় এই রাজনীতিতেই কেটেছে। সেও নেতা ছিলেন একসময়। কিন্তু একটা ভুলে সব শেষ হয়েছিলো। এই ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলল কায়রাভ।

আজ সমাবেশ মওলানা ভাসানীর কাছে। পথজুড়ে পোস্টার, ব্যানার, শ্লোগান, মানুষের ভিড়। কায়রাভের গাড়ি যখন সামনে এসে থামে, তখন চারপাশটা এক রোমাঞ্চকর উত্তেজনায় থরথর করছে।

দেহরক্ষীরা তার চারপাশ ঘিরে ধরে। গাড়ির দরজা খুলতেই কায়রাভ নামে। কোর্ট-প্যান্টে অদ্ভুত এক রাজকীয় স্থিরতা। মনে হচ্ছে, যুদ্ধক্ষেত্রে নামা কোনো বংশীয় যোদ্ধা। মানুষ হাত নেড়ে চিৎকার করছে,
“কায়রাভ ভাই! আমাদের নেতা!”

কায়রাভ হাত নাড়াতে নাড়াতে যায় স্টেজে। আসার সময় কিছু মানুষের সাথে কুশল বিনিময় করে, তাদের খোজখবর নেয়। সৎ থেকে যতটা কাজ করা যায় করে কায়রাভ, তবে কিছু ক্ষেত্রে ক্ষমতার প্রয়োগ করতেই হয়। সকলের কাছে জনপ্রিয় কায়রাভ। তার সুনাম যেমন আছে তেমন আছে ভালোবাসাও। কারণ সে জায়গার অনেক উন্নয়ন করেছে, সাধারণ জনগণের সুবিধা-অসুবিধা দেখেছে, ন্যায্য বিচার করেছে। কে না চাইবে এমন নেতা!

স্টেজ তৈরি। প্ল্যাকার্ড সাজানো। মাইকে ফিডব্যাকের শব্দ। কায়রাভ স্টেজে উঠে স্বভাবসুলভ হেসে চেয়ারে বসে পা তুলে রাখে। কোনো রাজা যেভাবে নিজের সিংহাসনে বসেছে এমন ভঙ্গিতে। দেহরক্ষীরা সতর্ক দৃষ্টিতে জনতার দিকে তাকিয়ে আছে। পাখির মতো শিকার খুঁজে বেড়ানো ওই দুই আততায়ীও ভিড়ের মধ্যে মিশে আছে কিনা, তা কেউ জানে না। আজকের আকাশে রাজনীতি, হুমকি আর গোপন ষড়যন্ত্রের ঘন কালো মেঘ জমে আছে। কিন্তু কায়রাভ, অদ্ভুতভাবে স্থির। তার চোখের গভীরে লুকিয়ে থাকে আগুন। যেই আগুন না থাকলে রাজনীতির মাঠে টিকে থাকা দায়।


এবার কায়রাভের বক্তব্যের পালা। কায়রাভ সামনে এলেই ভিড়টা নিজে থেকেই স্থির হয়ে যায়। বাতাসে ছিলো একটা অদৃশ্য টান, সবাই অপেক্ষা করছে তাদের প্রানপ্রিয় নেতার বক্তব্য শোনার জন্য। চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ, দোকানের সামনে দাঁড়ানো তরুণেরা, কাজ থামিয়ে দূর থেকে তাকিয়ে থাকা সকলে, চুপ করে। কায়রাভ মাইকের সামনে দাঁড়াল। চোখে সেই পরিচিত দৃঢ়তা, কণ্ঠে এক অদ্ভুত শান্ত শক্তি। মৃদু হেসে ধীরে বলতে লাগলেন,
“ভাইয়েরা আমার! আমি আপনাদেরই এলাকার ছেলে, চেনেন নিশ্চয়ই? আজ আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে যে কথা বলছি, সেটা রাজনীতির উদ্দেশ্যে কোনো কথা নয়। এটা আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার কথা।”

এক মুহূর্ত থেমে তিনি মানুষের দিকে তাকালেন, প্রতিটি মুখ চিনে নিচ্ছেন।
“প্রথমেই বলছি রাজনৈতিক নেতা হওয়ার দরুন আপনাদের কথাই সবার আগে গ্রহনযোগ্য। আমরা আপনাদের জন্যই নির্বাচিত হই। তাই, আগে আপনাদের উন্নয়নের কথা বলি, সেটা শুধু রাস্তা-ড্রেন বা আলোর নয়। উন্নয়ন মানে মানুষের হৃদয়ে বিশ্বাস জাগানো। বিশ্বাস যে, একজন মানুষ আছে, যে আপনাদের কথা ভাববে, আপনাদের পাশে দাঁড়াবে।”

মহিলারা, বৃদ্ধরা, দোকানদার সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনছে। কায়রাভ আবার বলল,
“আমি কায়রাভ তাজওয়ার খান… ক্ষমতার লোভে নয়, মানুষের কাছে দায়বদ্ধ হয়ে এই মঞ্চে দাঁড়িয়েছি। আজ পাশে যে সরকারি ভবন তৈরি হচ্ছে, ওটা শুধু ইট-সিমেন্টের দেয়াল নয়, ওটা হলো আপনাদের স্বপ্নেরই প্রতিচ্ছবি। এখানে যারা কাজ করছে, এরা আমাদের সমাজের প্রকৃত ভিত্তি। এই মাটির সাথে এদের ঘাম মিশে আছে, আর সেই ঘামই আমাদের এলাকার ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবে।”

জমে থাকা মানুষের ভিড়ে প্রশংসার গুঞ্জন উঠল।
কায়রাভ হাত তুললেন, গলা আরও দৃঢ় হলো,
“আমি চাই, আপনাদের প্রতিটি ছেলে-মেয়ে শিক্ষিত হোক। আপনাদের প্রতিটি ঘর যেন আলোয় ভরে থাকে। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি- নেতা হিসেবে নয়, আপনাদের একজন সন্তান হিসেবে যে কোনো অভাব, যে কোনো সমস্যায় আমার দরজা সবসময় খোলা আপনাদের জন্য।”

একজন মধ্যবয়স্ক লোক চোখ মুছে ফিসফিস করলেন,
“আমাদের কায়রাভ আলাদা, সে সত্যি যোগ্য নেতা হওয়ার জন্য।”

কায়রাভ আবার সকলের দিকে তাকালেন। এবার তার কণ্ঠ যেন আরও কোমল, কিন্তু প্রভাব আরও গভীর।
“আপনারা আমাকে বিশ্বাস করেছেন… আর সেই বিশ্বাসের সম্মান রাখাই আমার কর্তব্য। আমি চাই, একদিন আপনারাও যেন গর্ব করে বলতে পারেন, আমাদের নেতা কায়রাভ তাজওয়ার খান, যে নিজের কথা রেখেছে। আজ আমি এও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি,
স্বপ্ন দেখব আমরা সবাই এবং স্বপ্ন পূরণও করবো একসাথে। আমরা সেই বাংলাদেশ গড়বো, যেখানে শিশুর হাসি হবে আমাদের দেশের পরিচয়, যেখানে মায়ের চোখে জল থাকবে শুধু আনন্দের, যেখানে রাত পোহালেই কাজের নতুন ভোর জাগবে,কর্মসংস্থানের শহর, যুবকদের জন্য প্রশিক্ষণ, নারীদের জন্য সুযোগ,
বৃদ্ধদের জন্য নিশ্চয়তা এবং সবশেষে সকলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা নিবেদিত থাকব।”

চতুর্দিকে তালি পড়ে গেল। কাবিরের চোখে হালকা প্রশান্তির ঝলক। সে জানে, জনগণের তার প্রতি ভালোবাসা কতটুকু আছে।


কাবির এবং তার দল আজ ততথাকথিত বিল্ডিংয়ের কাজে এসেছিল। আজ জমি দেখে আসবে, মাপঝোঁকেরও ব্যাপার আছে। এরপর থেকেই কাজ শুরু। তার সঙ্গে ছিল জিহাদ, দিপ্র, প্রকাশ এবং আরও কয়েকজন সহকর্মী। জমির দিকে এগোতে গেলে হঠাৎ তাদের চোখে পড়ল ভাসানীর পাশে কায়রাভের সমাবেশ। মানুষের ভিড়, উত্তাল ভাষণ, আর স্টেজে উজ্জ্বল আলো। সবই এক নতুন আহ্বান শুনাচ্ছিল।

জিহাদ হাঁটা থামিয়ে কাবিরের পাশ থেকে বলে,
“খাড়া কাবির, আগেই যাইস না! শুইনা যাই কথাগুলা। ভালোই লাগে।”

কাবির কোনও উত্তর দেয়নি। সেও থেমে দাঁড়ালো। তীক্ষ দৃষ্টি রেখেছিল সোজা স্টেজের দিকে। যেখানে কায়রাভ মানুষের মধ্যে আছড়ে পড়ছিল, কথা বলছিল – শক্তি, তেজ, আর অনুরাগের সঙ্গে। কাবির মৃদু হাসলো।

এদিকে তাদের দলের প্রকাশ তার উচ্ছ্বাস ছিপে রাখতে পারল না, উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,
“দেখিস, নেতা তো এই লোকেই হইবো! মিলায়া নিস। দেখ তো তেজ কি! এক্কেরে জ্বলন্ত আগুন!”

জিহাদও মাথা নাড়লো। বলল,
“আবার জিগায়! হেতিই তো আগে আমাগো এমপি আছিলো। এইবারও হইবো, দেখিস!”

কাবিরও স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে রইল, মনে মনে কায়রাভের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি কথাকে শুনলো যতক্ষন ছিলো। শেষে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এরপর কাবির সবার দিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে বলল,
“হইছে, তগো শুনা! এইগুলা সারাদিন চলবো। কয়দিন পরপরই দেখবিনি, নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ক্যাচা’ল হইবো। এখন আয়, আমাগো কাম আছে তো ভুইলা যাস? এত ইচ্ছা থাকলে তরা থাক, আমি যাইগা।”

জিহাদ মুখে হাসি নিয়ে বলল,
“আইচ্ছা, দাঁড়া বাপ! রাগিস না। ওই তোরা আয় এহন।”

তারা সবাই ধীরে ধীরে পা বাড়াতে গেলে আকস্মিক পরপর দুটি গুলির আওয়াজ শুনতে পায়। কাবির পাশ ফিরে তাকালে তার চোখ ঝাপসা হয়ে উঠে। স্টেজের দিকে তাকিয়ে দেখল, কায়রাভের বাহুতে পরপর গুলি লেগেছে। রক্ত ঝরে পড়ছে সাদা পাঞ্জাবির ওপর, কায়রাভ হাত দিয়ে অপর বাহু চেপে ধরে আছে চোখ মুখ খিচে। এরই মধ্যে সমাবেশে ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেলো। সব স্তব্ধ হয়ে গেছে মুহুর্তেই। কাবির ইতিমধ্যেই হিমশীতল হয়ে গেছে। ভেতর থেকে সব রক্ত ফ্রেম হয়ে জমে গেছে হিমে। কিন্তু ভয়, আতঙ্ক, এবং ক্রোধ সবই একসাথে জেগে উঠল। কাবির নিজেকে সামলাতে পারল না আর। মানুষটার এত বড় ক্ষতি চোখের সামনে দেখবে কিভাবে? সব ভুলে হাত বাড়িয়ে সামনের দিকে ছুটে চিৎকার করে উঠল,
“ভা’ই’জা’ন!!”

গলা কাঁপলো, অসহায় লাগলো তবু ভেতরে এক অদম্য শক্তি জেগে উঠল। এই মুহূর্তে কাবিরের বোধশক্তি লোপ পেয়েছে। কাবিরের চিত্কার সমাবেশের ভিড়েও প্রতিধ্বনিত হলো। তার হৃদয়ে শুধু ব্যথা নয়, এক অদম্য অগ্নি জ্বলে উঠল, যা তাকে কোনো বাধা মানতে দেয় না। এক ছুটে ভিড়ের ভেতর ঢুকে পড়ে সবাইকে ঠেলেই এগিয়ে যেতে লাগলো সামনে।

চলমান…….

[ কেমন লাগছে পর্ব জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]

Leave a Comment