গল্প: ম্যাচ মেকার (০৩)

লেখিকা:জান্নাত রাহমান হৃদি

পর্ব:০৩

গল্প টা পড়ে ভালো লাগলো কমেন্ট করে আর রেটিং দিয়ে জানাবেন নিচে অপশন আছে।

( ধন্যবাদ সবাইকে)

শরতের আকাশে ধূসর মেঘেরা হুটোপুটি খাচ্ছে। আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে মেঘগুলোকে কল্পনায় বিশাল বিশাল রাজ্য বানাচ্ছি। মেঘের পাহাড়ের উপর একটা কালো কুচ্ছিত পরী ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে। ছাঁদের উপর খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কল্পনায় এসব বানাচ্ছি আর পায়চারী করছি। হঠাৎ নরম কিছুর উপর পা পড়তেই তীব্র চিৎকারে কান বন্ধ হয়ে যাওয়ার যোগাড় হলো আমার। কোনো জ্বিন-টিনের উপর পা দিয়ে বসিনি তো আমি? ভাবতে ভাবতেই জিনিসটা দেখার চেষ্টা করলাম। তুষার ভাই পেট চেপে ধরে বসে আছেন। তার মানে আমি যেটা জ্বিনের শরীর ভেবেছি সেটা আসলে তুষার ভাইয়ের পেট? একটা ব্যাটা মানুষের পেট এত নরম হতে পারে? আশ্চর্য হলাম আমি। তুষার ভাইয়ের পাশে বসে প্রশ্ন করলাম, ‘আপনি এই ভরদুপুরে আমাদের ছাঁদে এভাবে শুয়ে ছিলেন কেনো তুষার ভাই? আমাকে পুরো ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন। বুঝেছি কোনো জ্বীনের গায়ে পা দিয়ে ফেলেছি আমি। এই বুঝি রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে জ্বীন ব্যাটা আমার উপর ভর করলো।

তুষার ভাই আমার কথার জবাব না দিয়ে মুখ ঝামটিয়ে বললেন,‘তোর সমস্যা কি মানসী? দু’টো হাজার টাকার জন্য তুই কি ভেবেছিস আমাকে মেরেই ফেলবি? গতকাল মাথা ফাটিয়েছিস। আজ হাতির মতো শরীর নিয়ে আমার গায়ের উপর পাড়া দিচ্ছিস। তুই যে এত ছোট মনের মানুষ জীবনেও ভাবতে পারিনি আমি।’

তুষার ভাইয়ের কথায় তেতে উঠলাম আমি। ‘আপনি আমাকে ছোট মনের মানুষ বলছেন তুষার ভাই? একে তো আমার দু হাজার টাকা খেয়ে দিয়েছেন। তার উপর আবার আমার সঙ্গেই রাগ দেখাচ্ছেন? দেখুন গতকাল আপনার মাথাটা রাগের বশে ফাটিয়ে দিলেও, পাড়া টা আমি ইচ্ছেকৃত ভাবে দিই নি। আমি তো মেঘেদের রাজ্য বানাচ্ছিলাম। আপনি কেনো আমাদের ছাঁদে এসে ভেটকি মাছের মতো শুয়ে ছিলেন?’

তুষার ভাই উঠে রেলিংয়ের সঙ্গে ঠেশ দিয়ে বসলেন। এরপর গম্ভীর মুখে বললেন, ‘নেশা করছিলাম আমি।’

আমি কপাল গোঁছালাম। প্রশ্ন করলাম, ‘ভর দুপুরে রোদে শুকানো কোন ধরনের নেশা তুষার ভাই?’

‘তুই জানবি না। গতকাল একটা সিরিজ দেখছিলাম। খালি গায়ে রোদে শুয়ে থাকলে নাকি নেশা হয়। এটার নাম হোতেন।’

‘ এ্যাহ যেমন বিচ্ছীরি নাম। তেমন বিচ্ছীরি এই নেশার প্রসেস। আর সিরিজে আবল তাবল যা কিছু দেখবেন সেসব আমল করতে হবে?’

‘হবে না? আমার ইচ্ছে জীবনে সব কিছুর এক্সপেরিমেন্ট করার।’

তো আপনার এই নেশা করার জন্য আর কোনো ছাঁদ পেলেন না? আমাদের ছাঁদ-ই কেনো?’

‘আমাদের ছাঁদে করতে গেলে মনযোগ পাওয়া যেতো না। কাল কতগুলো মুরগির বাচ্চা উঠিয়েছি। সেগুলো সারাক্ষণ চিচি করছে।’

আমি জারি দিয়ে বললাম, ‘আপনার মুরগির বাচ্চা যা খুশি করুক। আপনার নেশা করতে ইচ্ছে হলে আপনার বাসায় বসে করবেন। আমাদের ছাঁদ আপনার নেশা করার জন্য বানানো হয়নি।’

‘করলে কি হবে? ছাঁদের গায়ে পাপ লাগবে?’

‘হু লাগবে।’

‘কেন তোদের ছাঁদ কি গঙ্গার পানি দিয়ে ধোয়া?’

‘মনে করেন সেরকম-ই।’

তুষার ভাই এবার শব্দ করে হেসে উঠে বললেন, ‘গঙ্গার পানি দিয়ে ধোঁয়া হলে এখানে বসে নেশা করতে সমস্য নাই। জমজম কূপের পানি দিয়ে ধোঁয়া হলে আলাদা কথা ছিল।’

তুষার ভাইয়ের কথা শুনে আমার অসহ্য লাগছে। এই লোকটা সবসময় কথাই বলেন অসহ্যমার্কা। তার কর্মকান্ডও অসহ্য। সোজা কথা বলতে সে মানুষটাই পুরো অসহ্য। আর ইদানিং তো তাকে আমার আরো বেশি অসহ্য লাগছে। তাকে দেখলেই আমার চোখের পাতায় ভেসে উঠে আমার সেই কচকচে হাজার টাকার নোট দুখানা। আমি মুখ গোমড়া করে এপাশে চলে এলাম। মনযোগ দিলাম পুনরায় স্বচ্ছ নিল আকাশটায়। তুষার ভাই একটু পরে আমাদের ছাঁদ থেকে লাফিয়ে তাদের ছাঁদে চলে গেলেন। আমিও চলে এলাম নিচে।

.
আজ ইচ্ছে করে কলেজ কামাই করেছিলাম। হোম মিনিষ্টর কে বলেছিলাম আজ স্কুল অফ। বিকেলের কোচিং ও অফ। কিন্তু বিকেলে কোথ থেকে জানি সাদিয়ার আগমন ঘটলো বাড়িতে। সম্পর্কে ও একদিকে আমার ফুপাতো বোন হয়। আরেকদিকে আমার ক্লাসমেট। সাদিয়া বাসা থেকে ফিটফাট হয়ে এসে আমার খোঁজ করলো আম্মুর কাছে। আম্মু ওকে দেখে জানতে চাইলেন, ‘কোথাও যাওয়ার প্লান আছে তোমাদের?’

সাদিয়া উত্তর দিলো, “কোথাও যাওয়ার প্লান থাকবে কেনো? কোচিং আছে তো। সনাতন স্যার আজ কোচিং এ টেষ্ট পরীক্ষা নিবেন।’

সাদিয়ার উক্ত কথাটা শুনেই হোম মিনিষ্টরের মেজাজ সপ্ত আসমানে উঠলো। তার মেয়ে তাকে মিথ্যে বলে ধোঁকা দিচ্ছে? এটা যেনো মানতে কষ্ট হলো তার। আমি তখন সবে রুম থেকে বেরিয়েছি। এরিমধ্যে সাদিয়াকে দেখে পিলে চমকে উঠলো আমার। এই শাঁকচুন্নি সব সময় আমাকে মারা খাওয়ানোর জন্য কোথ থেকে হাজির হয়? আমার ভাবাভাবির মাঝেই আম্মু জুতো নিয়ে দাওয়া করলেন আমায়। আমি তার হাত থেকে বাঁচার জন্য দৌড়ে রাস্তায় নামলাম। আম্মু শেষ সিঁড়িতে বসেই আমার গায়ে জুতো ফিকে মারলেন। জুতোটা এসে পড়লো একদম আমার নাক বরাবর। আম্মুর এমন জুতোর মার কত খেয়েছি সেসব নিয়ে আমার আফসোস নেই। কিন্তু আজ? আজ রাস্তার অপর সাইডে দাঁড়ানো ব্যক্তিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে লজ্জায় আমার মাথা কাটা গেলো। ওাপশের ব্যক্তিটি আর কেউ নয়। আমার এক তরফা ভালোবাসা, আমার ক্রাশ। ওয়াহিদের ঠোঁটে হাসি লেপ্টে আছে। আমি লজ্জায় এক হাত ঘোমটা টেনে দিলাম দৌড়। আমাকে আচানক দৌড়াতে দেখে ওয়াহিদ আমার পিছু নিলো। দৌড়ে এসে পথ আগলালো আমার। আমার হাতখানা চেপে ধরে বলল, ‘চলো তোমার সঙ্গে কথা আছে আমার।’

ওয়াহিদকে আমি পছন্দ করি ঠিক, কিন্তু বিনে অনুমতিতে তার এভাবে আমার হাত চেপে ধরাটা অসহ্য ঠেকলো আমার কাছে। থমথমে কন্ঠে বললাম,‘হাত ছেড়ে দিয়ে কথাগুলো বলা যায় না? না মানে আমার সুবিধা হতো তাহলে।’

ওয়াহিদের ও যেনো খেয়াল এলো। আমার হাত খানা চট করে ছেড়ে দিয়ে বলল, স্যরি!‘বসা যাবে কোথাও?’

‘কোথায় বসবো?’

‘কোনো রেষ্টুরেন্টে বসি?’

‘এই অবস্থায় রেষ্টুরেন্টে বসবো? আমার অবস্থা দেখেছেন আপনি? পুরো পাগলের মতো।’

ওয়াহিদ মৃদু হেসে বলল, ‘উহু তুমি একটু বেশিই ভেবে ফেলছো। পাগলের মতো মোটেই লাগছে না। একটু এলোমেলো লাগছে যদিও,তবে সেটা পাগল পাগল একদম-ই নয়। ন্যাচারাল সুন্দর লাগছে।’

তার এহেন কমপ্লিমেন্ট পেয়ে লজ্জায় আড়ষ্ট হলাম আমি। গাল দুখানা টমেটোর মতো লাল হয়ে উঠলো। কথা ঘোড়াতে বললাম, ‘সামনের পার্কে গিয়ে বসি চলুন।’

ওয়াহিদ আমার কথা মেনে নিয়ে সামনের পার্কটাতেই এলো। সবুজ ঘাসের উপর সামনাসামনি বসলাম দুজন। ওয়াহিদ আমাকে সোজাসাপ্টা প্রশ্ন করলো, ‘তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?’

আমি চুপ করে রইলাম। আশে পাশে বাচ্চারা খেলছে। দৃষ্টি দিলাম তাদের দিকে। আমার মৌনতা দেখে ওয়াহিদ এবার কোমল কন্ঠে বলল, ‘লজ্জা পাচ্ছো তাইনা? আমি জানি তুমি আমাকে পছন্দ করো। আমিও তোমাকে পছন্দ করি। তাই লজ্জার কিছু নেই। বলতে পারো তুমি।’

এবার তার দিকে তাকিয়ে বললাম,‘আপনার গান পছন্দ আমার। আপনার কন্ঠটা শুনলে ঘোর লাগে। ইচ্ছে করে সারাক্ষন আপনার গান শুনি।’

ওয়াহিদ আকষ্মিক বলে বসলো, ‘গার্লফ্রেন্ড হবে আমার? প্রতিদিন গান শুনাবো।’

ওয়াহিদ আমাকে প্রপোজ করেছো? ইশ আনন্দে আমার মনে শত শত প্রজাপতি উড়ে গেলো। মাথা নাড়িয়ে বললাম, ‘হ্যা হবো।’

ওয়াহিদ কি সুন্দর করে হেসে আমার হাত চেপে ধরলো। এবার আর খারাপ লাগলো না। আমাকে গান ও শোনালো একটা। গানটার অরজিনাল গায়কের নাম বোধহয় তানজিব সরোয়ার। ঐ যে আমি গোপনে ভালোবেসেছি, বাড়ি ফেরা পিছিয়েছি। সেই গানটা।

ওয়াহিদের সঙ্গে বিকেল টা আমার বেশ কাটলো। এরপর সন্ধ্যার দিকে তাকে বিদায় জানিয়ে বাড়িতে চলে এলাম আমি। এতকিছুর মাঝে একবারো খেয়াল করলাম না আমি এতক্ষন যাবত খালি পায়ে ছিলাম। মায়ের দৌড়ানি খেয়ে জুতো পরার মতো সময় টা পাইনি আর আমি। খালি পায়েই ওয়াহিদের সঙ্গে ওতদূর হেঁটে এসেছি। বাসায় ঢুকে সাদিয়ার মুখোমখি হলাম। শাঁকচুন্নি টা যায়নি এখনো। সোফায় বসে টিভি দেখছে আর দাঁত কেলিয়ে হাসছে। আমি গিয়ে ওর এক গোছা চুল টেনে ধরলাম। ক্ষীপ্ত স্বরে বললাম, ‘শাঁকচুন্নির বাচ্চা,বার বার আমাকে বাশ খাওয়াতে কোথ থেকে আসিস? আজ থেকে তোকে আমি আমার বান্ধবীর পদ থেকে বরখাস্ত করলাম।

চলবে…

[এই ধরনের নেশা টেশা করতে যাবেন না আবার কেউ। আর এই জিনিসটার নাম আমি জেনেছিলাম ব্যাচেলর পয়েন্ট নাটক দেখে। নাম টা ফানি ফানি। তাই ফানি সিনের জন্যই এডযাষ্ট করেছি এটা।]

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Author: Safier Rahman

Super next part.

1
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x