পর্বসংখ্যা:৩
লেখনীতে :প্রিয়াংশি চৌধুরীসারাদুপুর অনেকটা সময় কাটিয়ে ছেলে-মেয়ের হাত ধরে ধীরে ধীরে বাড়ির পথে রওনা দিলো প্রীষান। চলে যাওয়ার সেই মুহূর্তেও কায়রার নজর সরেনি তার থেকে। পুরোটা সময় স্থির হয়ে দেখে গেছে মানুষটাকে। প্রীষান যেতে যেতে যত দূর চোখ যায়, যতক্ষণ দৃষ্টিসীমা তাকে ধারণ করে রাখতে পারে, ততক্ষণই তাকিয়ে থাকলো কায়রা। তারপর যখন প্রীষান আর বাচ্চাদের ছায়া দৃষ্টির বাইরে মিলিয়ে গেল, তখন কায়রা দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস ফেলল। এরপর হাতে ধরা গ্লাসের জুসটুকু শেষ করে বিল মিটিয়ে নিঃশব্দ পায়ে বাড়ির পথে হাঁটা ধরল।
————
বিকেল হয়ে এসেছে। সূর্যের তাপ সরে গিয়ে দিনটা আরেকটু স্নিগ্ধ হয়েছে। বাড়ির দরজা পার হয়ে ভেতরে আসতে না আসতেই কায়রার দিকে দৌড়ে আসে ছোট্ট কায়ান। তিন বছরের গোলগাল ছেলেটার মুখে ভাতের দানা লেগে আছে, গালে ঝোলের হালকা দাগ। কায়রা হাসিমুখে তাকে কোলে তুলে নিতেই কায়ান আধো আধো সুরে বলল,
“তুমি দেলি কলেছো কেন? আমি বোসে চিলাম একা একা…”কায়রার হৃদয়টা নরম হয়ে গেল। কায়ানকে বুকে চেপে ধরে গালে চুমু দিয়ে বলল,
“সরি সোনা… আর দেরি করব না, ঠিক আছে? এখন থেকে তাড়াতাড়ি চলে আসব।”কায়ান ফোকলা দাঁত বের করে হেসে দিল। কায়রা ব্যাগ থেকে টিস্যু বের করে তার মুখটা আলতো করে মুছিয়ে দিতে লাগল। এমন সময় পাশের ঘর থেকে ভাত ভর্তি ছোট্ট প্লেট হাতে নিয়ে হেঁটে আসে কায়েশী। কায়েশী হলো কায়রার ভাবী। এমপি কায়রাভ তাজওয়ার খানের স্ত্রী সে, কায়েশী ফারিয়াহ। কায়েশী বাড়ির বড় বউয়ের দায়িত্ব নিয়েছে এই চার-বছর হলো। না চাইতেও সংসার করছে সে, করতে হচ্ছে। যদিও সেও কায়রার সমবয়সী। তবে কায়রার মতো জীবনযাপন তার নয়। সংসার নামক মায়াজাল তাকে আষ্টেপৃষ্টে আটকে রেখেছে। তার কাঁধে অনেক দায়িত্ব, সংসারের দায়িত্ব। আর এই গোলুমোলু বাচ্চাটি হলো কায়রাভ আর কায়েশীর ছেলে কায়ান তাজফিন খান।
আর কায়রার জীবন সম্পর্কে বলতে গেলে তা শুধুই নিষ্ঠুর অতীতের স্মৃতিচারণ। তার জীবন সেদিনই বদলে গিয়েছিল যেদিন সাত বছরের ছোট্ট মেয়েটি প্রথমবার মৃত্যু নামে এক ভয়ংকর শব্দের অর্থ বুঝেছিল বাবার গুলিবিদ্ধ নিথর দেহের সামনে দাঁড়িয়ে। ইমতিয়াজ খান, যে ছিলো তাদের ভাইবোনদের একমাত্র আশ্রয়। নিজের করা একটি ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয়ে চলে যাওয়ার পর ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেলেও সবচেয়ে গভীর নিস্তব্ধতা নেমে এসেছিল কায়রাভের চোখে। মাত্র ষোলো বছরের ছেলে ছিলো কায়রাভ। বাস্তবতার বোঝ পুরোপুরি ছিলো না তার, কেও ছিলো না তার পাশে। অথচ সেই দিনের পর কায়রাভ এক লাফে বড় হয়ে উঠেছিল। নিকষ কালো চোখের ভেতর দায়িত্বের কঠিন রেখা খোদাই হয়ে গিয়েছিল সেদিনই।
লোকজন হয়তো ভেবেছিল সময়ের সাথে সব ঠিক হয়ে যাবে, কিন্তু কায়রাভের জন্য সবঠিক হয়ে যাওয়া মানে ছিল নিজের ছোট্ট বোনটাকে আগলে রাখা, নিজেদের একটি শক্তপোক্ত অবস্থান গড়া। যেভাবে বাবা আগলে রাখতেন, সেভাবেই। তার বাবা যেমনই হোক না কেন, সন্তানদের কাছ ছাড়া করেননি। কিন্তু একটি ভুল সব শেষ করে দিয়েছিলো, সব।
সময় যত গড়িয়েছে, কায়রার বুকে জমে থাকা অভিমান, অনাথ হয়ে যাওয়ার শূন্যতা, সবটাই ধীরে ধীরে মিশে গেছে কায়রাভ নামক ভাইয়ের এক অদ্ভুত শক্তিশালী আশ্রয়ে। এক কঠিন মানবী হয়ে গিয়েছিলো সে, ভাইয়ের মতোই। কেউ বুঝতে না পারলেও কায়রা জানে, তার ভাই নিজের শৈশবটুকু বন্ধক রেখেছিল, তার এখনকার হাসির আড়ালেই লুকিয়ে আছে তার পাহাড়সম ত্যাগের গল্প। দুনিয়ার সবকিছুর আগে সে জানে তার ভাই শুধু ভাই নয়, তার প্রথম নিরাপত্তা, প্রথম বন্ধু,প্রথম ভরসা। আর বাবাহীন পৃথিবীতে তার একমাত্র অবলম্বন। এভাবেই কায়রার বড় হয়ে ওঠার প্রতিটি পাতায় লেগে আছে কায়রাভের মমতা, ভালোবাসা। ইমতিয়াজ খানের রক্ত পেলেও তারা বড় হয়েছে সৎ আদর্শে। কায়রার ভাবনার মাঝে নরম স্বরে কায়েশী জিজ্ঞেস করে,
“এত দেরি হলো আজ? কোথায় ছিলে?”মায়ের গলা শুনতেই কায়ান কায়রার পেছনে লুকিয়ে পড়ল। কারণ সে ঠিক করেছে, ভাত খাবেই না! তাকে জোর করে খাওয়াচ্ছে তার মা। কায়রা হেসে কায়ানকে কোলে তুলে ভাবীর পাশে এগিয়ে গিয়ে বলল,
“ওই বন্ধুদের সাথে ছিলাম, ভাবী… সময়টা এত তারাতাড়ি চলে গেল টেরই পাইনি।”কায়েশী হালকা হাসলো। তারপর কায়ানকে নিজের কোলে তুলে টেবিলে বসিয়ে খাওয়ানো শুরু করলেন। আর কায়রাকে বলল,
“আচ্ছা, ফ্রেশ হয়ে নিচে এসো। আজ সিঙারা আর পকোরা করেছি।”উপরে নিজের ঘরে যেতে যেতে কায়রা উত্তর দিল,
“আচ্ছা ভাবী, দু’মিনিটে আসছি।”কায়েশী মাথা নেড়ে আবার কায়ানের দিকে মন দিলো। এক লোকমা মুখে দিতে গেলে কায়ান মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে ফেলল। তা দেখে কায়েশী খানিক রাগী রাগী চোখে তাকিয়ে বলল,
“এটা কী হচ্ছে, বাবা? মুখ ঘুরিয়ে নিলে কেন?”কায়ান হাত সামনে দিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলে,
“আল কাবো না…”কায়েশী এবার কায়ানের হাত সরিয়ে একটু জোর করেই এক লোকমা খাইয়ে দিলো। এরপর বলল,
“খাবে না কেন? না খেলে শক্তি পাবে কোথায়? মানুষ বলবে তুমি পঁচা? ভালো ছেলেরা মায়েদের কথা শুনে চলে।”পরের লোকমাটায় কায়ান আবার ঠোঁট উল্টে দিল। কায়েশী হাসি চেপে রাখতে পারল না বাচ্চাটার রাগ দেখে। তাই কায়েশী মৃদু হেসে বলল,
“আচ্ছা, আর দু-লোকমা খেয়ে নাও। তারপর আর বলব না খেতে। নাও হা করো? তারাতাড়ি খেয়ে নিলে আজকে বড় একটা চকলেট দিব। একদম ইয়াম্মি ইয়াম্মি খেতে!”চকলেটের নাম শুনতেই কায়ানের চোখ গোল হয়ে গেল। সন্দেহের নজরে বলল,
“চত্যি তো?”কায়েশী মাথা নেড়ে হ্যাঁ করতেই কায়ান বিন্দুমাত্র শব্দ না করে, পা দোলাতে দোলাতে সব খেয়ে নিল।কায়েশীও সুযোগ বুঝে খাইয়ে দিল। খাওয়া শেষে কায়ানকে কোলে করে বসার ঘরের সোফায় বসিয়ে টিভি অন করলেন। কার্টুনে অগির গান বেজে উঠতেই কায়ান হাততালি দিয়ে বলে,
“মা, দেকো? অগি মারচে ককরোচদের!”কায়েশী ছেলের মাথায় চুমু দিয়ে বললো,
“তুমি দেখো বাবা… মা একটু পরে আসছি।”কায়ান বাধ্য ছেলের মতো মাথা নেড়ে টিভির দিকে মন দিল। মাকে আর একটুও বিরক্ত করলো না সে। আর কায়েশী এই ফাঁকে পকোরা আর সিঙ্গারার প্লেটগুলো টেবিলে সাজানোর সঙ্গে সঙ্গেই কায়রা চলে এলো। এসেই কায়েশীকে পাশ থেকে জড়িয়ে ধরল। চার বছরের বন্ধুত্ব এত গভীর হয়ে গেছে যে, ভাবী হলেও তারা একে অপরের সমস্ত কথা ভাগাভাগি করে নিত। কায়রা সব মন খুলে বললেও, কায়েশী চাপা স্বভাবের, তবু প্রয়োজন মতোই উত্তর দিত। কায়রার আচমকা এমন কান্ড দেখে কায়েশী মৃদু হেসে বলল,
“এত আহ্লাদ কিসের, হুম?”কায়রা প্লেট থেকে সিঙ্গারা তুলে খেতে খেতে আনন্দে বলল,
“জানো ভাবী, আজ প্রীষান স্যারের ছানাপোনাদের দেখলাম। দে আর রিয়েলি কিউট! স্যারের মেয়েটাকে প্রথমবার দেখলাম, একদম প্রাণবন্ত। ঠিক আমার মতো। আর মেয়েটা স্যারের ছবি তুলছিলেন স্টাইলিশ পোজ দিয়ে! ভাবো একবার! অবশ্য হ্যান্ডসা*ম এন্ড ড্যা*শিং পাপা তাদের! “শেষ কথাটা বলে নিজেও মৃদু লজ্জা পেলো। কায়েশী কায়রার কথায় বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ছানাপো’না বলতে? কয় বাচ্চা তার?”কায়রা বাম হাতে মাথা চুলকে বলল,
“দুইটা মাত্র। এমন ভাবে জিজ্ঞেস করছো যেন না জানি কতগুলো!”কায়েশী গভীর শ্বাস ফেলে বলল,
“তোমার কি মনে হচ্ছে না এসব পাগলামি? এবার বন্ধ করা উচিত।”কায়রা সিঙ্গারা শেষ করে আরও একটি পকোরা তুলে নিয়ে বলল,
“পাগলামি বলতে যেমন তেমন পাগলামি নয়। এইটা বিয়ে করার মতো পাগলামি।”কায়েশী বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,
“এসব আবেগ থেকে বের হও, বাস্তবটা এক নয়। আর তুমি বাচ্চা নও যে চাইলেই পেয়ে যাবে ওনাকে!”কায়রা হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলল,
“আমার না আফসোস হয়, কেন যে ছেলে হলাম না! তাহলে এত চিন্তাভাবনা না করে ভালোবাসার মানুষটাকে সোজা তুলে আনতাম! “এই কথায় কায়েশীর চোখে অদ্ভুত এক জ্বলন্ত রাগান্বিত দৃষ্টি ফুটে ওঠেছে। কায়রা হুট করে বলে ফেলা কথায় নিজের ভুল বুঝতে পেরে কায়েশীকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“স’রিইইই!”কায়েশী খানিকটা রেগে মাথা নেড়ে ক্ষুদ্ধ স্বরেই বলল,
“তোমরা ভাই-বোনেরা আর পারো’টা কি বলোতো? পারো শুধু মানুষকে জো’রজবরদস্তি করতে, আর তোমাদের মর্জিতে রাজি না হলে তু’লে নিয়ে আসতে!”এই বলে কায়েশী বাসনগুলো নিয়ে রান্নাঘরের দিকে এগোতেই হঠাৎ গম্ভীর এক কণ্ঠে আওয়াজ শোনা গেল,
“কাকে তুলে আনার কথা হচ্ছিলো, শুনি?”পার্টি অফিস থেকে বাড়িতে ঢোকার সময় শেষের কিছু কথা কর্নগোচর হতেই কায়রাভ প্রশ্ন ছুড়ে দিল ননদ-ভাবীর দিকে। কায়রাও কিছু মুহূর্ত থমকে রইল নিজের ভাইয়ের হটাৎ আগমনে। কিন্তু কায়েশী এক পলক তাকিয়ে বিন্দুমাত্র না থেমে ধুপধাপ পা ফেলে রান্নাঘরে চলে গেল। আপাতত এখানে থাকতে ইচ্ছুক নয় সে।
কায়রাভ দু’হাত পেছনে ভাজ করে কায়রার দিকে এসে ধিমি আওয়াজে বলল,
“ম্যাডাম কি আজ রেগে আছেন নাকি?”কায়রা মুচকি হেসে বলল,
“তোমার বউ তোমাকে দেখলে এমনিতেই রেগে যায়, ভাইজান। এবার তুমিই সামলাও। আর আমি একটু কফি বানিয়ে নিয়ে আসি।”কায়রাভ নিজেও হেসে মাথা নেড়ে কায়রার পেছনে পা বাড়াল। কায়রা ঝটপট রান্নাঘর থেকে কফি বানিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল।
এখন রান্নাঘরে শুধু কায়রাভ এবং কায়েশী। কায়রাভ স্থির হয়ে বুকে হাত ভাজ করে দাঁড়িয়ে রইল দরজার সামনে হেলান দিয়ে, আর কায়েশীর প্রতিটি পদক্ষেপ লক্ষ্য করছিলো প্রখ’র দৃষ্টিতে।
কায়েশী বাসন ধুয়ে শেষ করে পেছনে তাকাল। চোখে পড়ে কায়রাভ দুই হাত ভাজ করে সরাসরি তার দিকে চেয়ে আছে। অমন চাহনিতে কায়েশী এলোমেলোভাবে আশেপাশে তাকাতে লাগল। হঠাৎ এমন দৃষ্টির মানে কী! অস্থির হয়ে উঠল চিত্ত। এই লোকের হেয়ালির খেলা আজও কায়েশীর বোধশক্তির বাইরে। নীরবতা ভাঙল কায়রাভের গলায়। গভীর ও গম্ভীর স্বরে প্রশ্ন ছোড়ে,
“নাকফুল কই তোমার?”কায়েশী মেঝেতে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেই বলল,
“খুলে রেখেছি।”কায়রাভ ধীরে ধীরে এগোতে লাগল, কায়েশীর খুব কাছে এসে দাঁড়াল। এতটাই কাছে যেখানে দুজনের হৃদস্পন্দন একে অপরের সঙ্গে মিশেছে। কায়রাভের উ’ষ্ণ শ্বা’স রমনীর মুখের কাছে এসে আঁচড়ে পড়ছে। কায়েশী পিছিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু কায়রাভ তার হাত টেনে ধরে একদম বুকের কাছে এনে ফেলল। আর বলল,
“নাকফুল কোনো অবস্থাতেই খোলা যাবে না। কারণ, এটা ছাড়া তোমাকে বউ বউ লাগে না।”কায়েশী তাচ্ছিল্যভরে হেসে বলল,
“ঘরে গিয়ে পরে থাকব।”কায়রাভ হঠাৎ করেই আবেগী হয়ে বলল,
“আমার প্রতি ঘৃনা কবে কমবে?”কায়েশী এবার কায়রাভের চোখে চোখ রেখেই তেজস্বী স্বরে বলে,
“এইজীবনে নাহ! “*****************
প্রীতিষা আজ স্কুটি নিয়ে ভার্সিটিতে যেতে পারেনি। তাই স্বাভাবিকভাবেই হেঁটে যাচ্ছিল বাড়ির দিক। সে খুশি কারণ কাবির কথামতো টাকা বিকাশে দিয়ে দিয়েছে, কোনো গাইগুই করেনি। আজ একটা টিউশন আছে, দেরি হয়েছে বিধায় ইচ্ছে করেই শর্টকাট নিলো, যাতে বাজারের রাস্তায় দ্রুত অগ্রসর হতে পারে। সামনের গলির মোড় ধরে হেঁটে চলার সময় হঠাৎ কানে এলো কিছু ছেলেপেলের নোংরা, অশ্লীল কথাবার্তা। প্রীতিষার কান ঝা ঝা করে ওঠে। পাশের দিকে তাকিয়ে দেখে তিন-চারজন ছেলেপেলে দাঁড়িয়ে আছে, তার দিকে তাকিয়েই। জনবহুল হলে হয়তো চড়-থাপ্পড় দিয়ে আসতো, কিন্তু আশেপাশে কেউ নেই। তাই, অচেনা ভয় ঘিরে ধরে তাকে।
প্রতীক্ষণ, ছেলেগুলো দ্রুত এসে তার পথরোধ করে। চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলল। আতঙ্কিত প্রীতিষা পেছনে সরে যাওয়ার চেষ্টা করল। হঠাৎ একজন ছেলে নিজের দাঁড়িতে হাত বুলিয়ে অপ্রীতিকরভাবে তাকিয়ে বলল,
“তা বুলবুলি, এলাকায় নতুন নাকি?”প্রীতিষা কণ্ঠ কিছুটা কেঁপে উঠলেও বলল,
“ সরে দাঁড়ান। আমাকে যেতে দিন।”আরেকজন ছেলে পাশ থেকে বলল,
“ওসব বাদ দাও। আগে আসো, পরিচিত হই। তারপর না হয়……”কিন্তু তার পরের কথা বলা হলো না। এক ঝটকায় মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে গেল সেই ছেলে। এমন কান্ডে হতবুদ্ধি সবাই। এ আর কেউ নয়- কাবির। বাকিরা পাশের দিকে তাকিয়ে মুহূর্তেই ভয় পেয়ে জমে গেল। কাবির ঘাড় বাকিয়ে বাঁকা হেসে হেসে বলল,
“কি বে, আমারে চিনোস তো! নাকি পরিচয় লাগবো?”প্রীতিষা এদিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। দেবদূতের মতো হাজির হলো লোকটা যদিও এলোমেলো বেশে। আর ছেলেগুলোও বুঝতে পারল, এই বুনো ষাড়ের সামনে কেউ মারামারি তো দূর, দাঁড়াতেও সাহস পাবে না। প্রানের ভয় আছে তাদের। পেছনের দু’জন পালিয়ে গেলেও বাকি-দুজনকে কাবির দু’হাতে কলার ধরে নিচে ফেলে হাত মুষ্ঠি করে মারতে শুরু করলো। কাবিরের ক্রমাগত আঘাত করা থামছে না, অবস্থা ক্রমে আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। পরিবেশের বেগতিকভাব বুঝে প্রীতিষা ভিতু কণ্ঠে বলল,
“ছেড়ে দিন, আর মারবেন না।”কাবির তখনও আঘাত করছিল, কিন্তু প্রীতিষার কথা শুনে হাত থেমে গেল। ছেলেগুলোও খুড়িয়ে খুড়িয়ে কোনোমতে প্রানে বেঁচে পালালো। কাবির প্রীতিষাকে সামনে দেখে ধমক দিয়ে বলল,
“এই বেডি! আক্কেল নাই নাকি! চিপা গলি দিয়া কেও যাতায়াত করে? তার ওপর মাইয়া মানুষের বিপদ-আপদ বইলা কইয়া আসে নি!”প্রীতিষা ভুল করেছে বুঝতে পেরে মাথা নিচু করে মিনমিন গলায় বলল,
“আসলে আমি বুঝতে পারিনি। বাজারে যেতে শর্টকাট নিয়েছিলাম, তাই এখানে দিয়েই যাচ্ছিলাম।”কাবির মাথা নেড়ে বলল,
“আইচ্ছা, বুজছি। এইরকম বলদামি কইরো না আর। সবসময় আমি থাকমু না বাঁচাইতে। দেখতে আমার ছোটো লাগো তাই তুমি কইরাই কইলাম, আমি আবার ছোটো মানুষগো সম্মান দিতে পারি না। যাইহোক, টাকা কিন্তু বিকাশে পাঠায় দিছি, পাইছ?”প্রীতিষা মাথা ঝাঁকিয়ে উত্তর দিল। অর্থাৎ,সে পেয়েছে।
আজকের ঘটনার পর প্রীতিষা হঠাৎ অদ্ভুত চিন্তা করে বসলো। মুহূর্তের মধ্যে তার মনে প্রশান্তি আর বিস্ময়ের বর্ষন হলো। লোকটার সম্মন্ধে জানার ইচ্ছেও বাড়লো যেন। তাছাড়া আজ কাবিরের হিরোর মতো আগমন তার জন্য অনাকাঙ্ক্ষিত ছিলো। কিশোরীদের মতো আবেগপ্রবণ হয়ে ভাবলো একদম হিরোদের মতো তাকে বাঁচালো! এতক্ষন মাথা নিচু করে থাকা প্রীতিষার চোখ এক মুহূর্তের জন্য মুগ্ধ-বিমোহিত নজরে কাবিরকে দেখলো অজান্তেই, বেখেয়ালে। হুট করেই চোখ দুটো ড্যাবড্যাব করে কাবিরকে দেখা শুরু করলো।অকস্মাৎভাবে কাবিরও লক্ষ করে তার চোখের মুগ্ধতা। এমন দৃষ্টির ভাব-সাব ভালো লাগলো না কাবিরের। তাই সেই মুগ্ধ দৃষ্টির গভীরতা বুঝতে পেরে কাবির চটচটিয়ে বলল,
“এই মেয়ে! চোখ নামাও…নামাও কইতাছি! এমনে তাকায় থাইকা লাভ নাই। জানি পিছলা খাইছ আমার ওপর। ওইযে ছোটবেলায় দেখতাম, সিনামায় নায়করা বাঁচাইলে নায়িকারা পিছলা খাইয়া জড়ায় ধরে। সেই চিন্তা করতাছো নি? তাইলে আগেই সাবধান কইলাম- ওইভাবে জড়ায় ধরতে আইলে এক থাব’ড়া দিমু! আমি কিন্তু ভালো পো’লা!”হঠাৎ এমন কথায় ভরকালো প্রীতিষা। কাবির তার মনের কথা কিভাবে বুঝলো! যদিও কখনো জড়িয়ে ধরতো না তবে নায়ক-নায়িকার কল্পনা করাটা মিথ্যে নয়। তবে শুধু শুধু ষাড়টার সাথে অনর্থক কথা না বাড়িয়ে প্রসঙ্গ এড়িয়ে কাবিরকে প্রশ্ন করল,
“মোটেও জড়িয়ে ধরার কথা ভাবিনি, বেশি বুঝেন! আচ্ছা বাদ দিন, আগে এটা বলুন আপনি হঠাৎ এই স’রু গলিতে কি করতে এসেছিলেন? আমাকে তো ঠিকি বকলেন!”কাবির মিছে হাই দিয়ে স্বাভাবিকভাবে উত্তর দিল,
“মু’ত’তে।”প্রীতিষা চোখ বড় করে তাকাল এমন কথায়। ভাবলো, কি সহজভাবে বললো এমন কথা! এই বুনো ষাড়টা কি আদৌ মানুষ? এই ব্যাপারে সন্দেহ হলো প্রীতিষার। তাই বিরক্তিতে নাক-মুখ কুচকে বলল,
“ছি:! আপনি মানুষ ভালো হলেও আপনার ভাষা ভালো নয়।”কাবির উচ্চস্বরে হেসে হেসে বলল,
“এইডা কি কথা, ভাষা খারাপের কি হইলো? সত্যি কইলেও দোষ দেখা যায়! আমি তো মুততে’ই আইছিলাম।”প্রীতিষা এবার চিৎকার করে কান চেপে বলল,
“হয়েছে হয়েছে, চু’প করুন এবার। আল্লাহ, আপনি কি দিয়ে গ’ড়া!”চলমান…….
[ আপনাদের রেসপন্স না পেলে লিখব না আর, এখানেই থামিয়ে দেব। তাই যারা পড়বেন তারা মন্তব্য করবেন। নাহলে বুঝবো কিভাবে গল্পটা কেমন লাগছে?
সবার গঠনমুলক মন্তব্য আশা করছি। লেখার ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]