পর্ব :০৩
লেখিকা:নুসরাত জাহান তীব্রতা
[ কপি করা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ]
শিতুল আয়নার মধ্যে দিয়ে অন্ধকারেও ঝাপসা দেখতে পেল তার পিছনে ছায়ার মতো কেউ দাঁড়িয়ে আছে। শিতুল ভয়ে জমে যায়। আরেকবার চিৎকার দিয়েই যাবে তখনই কেউ এসে তার মুখ চেপে ধরে। শিতুল এবার প্রাণ যায় যায় অবস্থা। ছাড়া পাওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কিন্তু ওপাশের বলিষ্ঠ দেহের শক্তির সাথে কিছুতেই পেরে উঠছে না। শিতুলের মুখে একহাত রেখে আরেক হাত শিতুলের পেটে রেখে শিতুলকে উঁচু করে ধরে রেখেছে।
শিতুলের ছটফটানির মধ্যে হিমাদ্র গলা গম্ভীর করে কঠোর কন্ঠস্বরে বলে,
— এই মেয়ে তুমি আমার রুমে কি করছো? তোমাকে বলি নাই এ কোন রুমে যেন আর না দেখি।
— উম উম “
— কিসের উম উম? কথা বলছো না কেন? এই পাগল ছাগলের দল কোথা থেকে আসে খোদা?”
শিতুল এবার রেগে গিয়ে হিমাদ্রর হাঁটু বরাবর জোরে একটা লাথি দেয় পা দিয়ে। হিমাদ্র হঠাৎ আক্রমণে একটু বিভ্রান্ত হয়ে হাত আলগা হতেই শিতুল উল্টে পরে যায় ফ্লোরের মধ্যে। ততক্ষণাৎ ব্যাথায় ছটফটিয়ে উঠে শিতুল। বেখেয়ালি পরায় যেন ব্যাথা একটু বেশিই পেল নয়তো এতটুকু থেকে ব্যাথা পাওয়ার কথা নয়।
শিতুলের চিৎকার শুনে হিমাদ্র এবার বিরক্ত হয় যা তার কপালের কিঞ্চিত ভাঁজ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। শিতুলকে ধমকে বলে,
— এতটুকুতেই এরকম নাটক করছো যেন সাত তলা বিল্ডিং থেকে নিচে পরছো? যত্তসব লুজারের দল।”
কথাটা বলে একহাতে শিতুলের জামার পিছন সাইডের কলার ধরে উপুড় থেকে সোজা করে বসিয়ে দেয়।
শিতুল উঠে বসতে চেয়েও পারে না। তবে হিমাদ্রর কথার বিপরীতে সে হেরে যাবে এরকম মেয়ে সে না। কোমড় ধরে বসে ঝাঁঝ নিয়ে বলে,
— প্রথম থেকে আসি। আপনি আমার মুখ চেপে ধরে বলছিলেন আমি কেন উম উম করছি? ওই ব্যাটা আপনি মুখ চেপে ধরলে আমি কি তাহলে হিমাদ্র হিমাদ্র করবো। লিসেন মিস্টার বঙ্গোপসাগরে হিমেল হাওয়া, আমি আপনার গার্লফ্রেন্ড নই বুঝেছেন। আপনার প্রতি আমার কোন ইন্টারেস্ট নেই। দ্বিতীয়ত আমি পাগল না আপনি পাগল। আপনার প্রেমিকা পাগল। আপনি সাতচুন্না, ছাগল,ইতর, জাওড়া,বয়রা, ব্রেন হীন, কানা,মেছো ভুত, ইস্টিশনের মেন্টাল।
তৃতীয়ত আমি এতটুকুতে ব্যাথা পেয়েছি নাকি পাইনি সেটা আমি জানি। আপনার তো দামড়া শরীর।ব্যাথা কাকে বলে জানেন? আপনাকে ২৪ তলা থেকে ফেলে দিলেও তো আপনার কিছু হবে না অথচ দেখবেন ঠিকই মাটি ভেঙে ভিতরে চলে গেছে। আপনি যে আমাকে ফেলে দিলেন আপনার তো কোন সমস্যা নাই কিন্তু আমার অনেক সমস্যা আছে! আমার কোমড় ভেঙে গেলে আমাকে আর কেউ বিয়ে করবে না। আমি আর তখন সুন্দর সুন্দর জামাই পাবো না। আপনার তো কোন সমস্যা নেই আপনার তো পেত্নীমার্কা গার্লফ্রেন্ড আছে। আমার কি হবে ইয়া আল্লাহ? আল্লাহ গো তুমি এই বঙ্গোপসাগরে হিমেল হাওয়ার গায়ে একটা গরম গরম ঠাডা ফালাইয়ো। আমীন,সুম্মা আমীন। আল্লাহ তোমার দরবারে বিচার দিলাম। সম্ভব হলে থানায় যাবো তাও বিচার চাই,বিচার চাই। দরকার পরলে রাজপথে নেমে মিছিল…….
— ঠাস!!!!!
শিতুলের এতো কথা সহ্য করতে না পেরে ঠাস করে থাপ্পর মেরে দিয়েছে শিতুলের গালে। শিতুল গালে হাত দিয়ে কতক্ষন চুপ করে হিমাদ্রর মুখের দিকে তাকিয়ে এমন জোরে এক চিৎকার দেয় শশুর আব্বা বলে যে ততক্ষণাৎ একজুতা পায়ে পরে আরেক জুতা বগলের নিচে নিচে একহাতে লুঙ্গি সামলাতে সামলাতে দৌড়ে এসেছে।শশুরকে দেখে শিতুল আরো জোরে জোরে কান্না করে দেয় ইচ্ছা করে। এদিকে হিমাদ্র এখনও ঘোরের মধ্যে আছে। শিতুল এতো জোরে চিৎকার দিয়েছে যে তার মাথা এখনও ঘুরছে।
দেলোয়ার খন্দকার মেঝেতে শিতুলকে পরে থাকতে দেখে হরবড়িয়ে জিজ্ঞেস করে,
— কি হয়েছে শিতুল মা?বলো আমাকে কি হয়েছে?”
শিতুল তবুও কিছু বলে না। কান্না করেই যাচ্ছে। হিমাদ্র বোবার ন্যায় একবার শিতুলকে দেখছে তো একবার তার বাবাকে। হিমাদ্রর মনে হচ্ছে শিতুল তার পুরো ১৫ বছরের সব শক্তি আজকে খাটিয়ে এতো জোরে চিৎকার দিয়েছে।
দেলোয়ার খন্দকার আবার বলেন,
— কি হয়েছে একবার শুধু বলো তারপর দেখো আমি তার অবস্থা কি করি।”
শিতুল এবার কান্না থামিয়ে হিমাদ্রর দিকে তাকায়। মুখটা দুঃখী দুঃখী ভাব করে কাঁদতে কাঁদতে বলে,
— ও শশুর আব্বাগো আপনার বঙ্গোপসাগরের হিমেল হাওয়া মানে আপনার ছেলে আমাকে অনেক মেরেছে গো। আমার হাড্ডি গোড্ডি সব ভেঙ্গে গেছে। আমি তো ঠিকমতো কথাই বলতে পারছি না। আমারে বেল্ট দিয়ে পিটিয়েছে। খাটে থেকে আছাড় মেরে এখানে ফেলে দিয়েছে। আমার গলা চেপে ধরে এক্ষুনি মে*রে ফেলতে চেয়েছে। আমি মনে হয় মা*রা যাচ্ছি। আমি মা*রা গেলে সম্পূর্ণ দায়ভার আপনাদের আর আপনাদের হিমেল হাওয়ার। দাঁড়ান এটা আমি লিখে দিচ্ছি।” কথাটা বলে শিতুল সত্যি সত্যি কথাটা কাগজে লিখে।
হিমাদ্র আর হিমাদ্রর বাবা হতবাকের ন্যায় তাকিয়ে আছে। অবাকতা কাটাতে না পেরে দেলোয়ার খন্দকার জিজ্ঞেস করেই ফেলেন,
— এগুলো কি সত্যিই করেছে হিমাদ্র?”
শ্বশুরমশাই তাকে বিশ্বাস করছে না দেখে শিতুল আরো জোরে জোরে কাঁদতে কাঁদতে বলে,
— আপনি বিশ্বাস করছেন না তো আমাকে। বেশ । এই দেখুন বলে গলায় হাতের ছাপ দেখায়। তারপর বলে,
– আপনার বিশ্বাস করা লাগবে না। আমি বাবাকে সব বলে পুলিশে মামলা করতে বলবো। আমার পিঠেও কিন্তু বেল্টের মারের দাগ আছে। সব কিন্তু পুলিশকে দেখাবো।”
দেলোয়ার খন্দকার তাড়াহুড়ো করে বলে,
— না না শিতুল মা , আমি তোমাকে বিশ্বাস করি। দয়া করে এসব তোমার বাবাকে বা পুলিশকে বলো না কেমন? আসো আমি তোমাকে এখনি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাচ্ছি।
শিতুল চমকে উঠে বলে,
— না না না। ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে অসুখ ভালো হবে না ।”
— তাহলে কীভাবে?”
শিতুল ভাবাব ন্যায় থুতনিতে আঙ্গুল দিয়ে বলে,
— আপনার ছেলের আমাকে সেবা করতে হবে! আমি যতক্ষন না ঠিক হচ্ছি ততক্ষণ। আপনার ছেলের বঙ্গোপসাগরের হিমেল হাওয়া যেহেতু এগুলো করেছে তাই সেই এগুলো ঠিক করবে। নয়তো…
— না না ঠিক আছে। কিন্তু একটা কথা মামুনি, এই বঙ্গোপসাগরের হিমেল হাওয়া এটা আবার কি গো?”
শিতুল চোখ কোণা করে তাকিয়ে বলে,
— আপনার ছেলে।
— হিমাদ্র.. ” গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠে দেলোয়ার খন্দকার।
— কি হয়েছে?”
— শিতুল মামুনির কথা তো তুমি শুনতে পেয়েছ তাই না। আমার আর কিছু বলা লাগবে না। শিতুল মামুনির সমস্ত সেবা করবে তুমি। আমার যাতে এ বিষয়ে আর কিছু না বলা লাগে।”
— অসম্ভব বাবা!”
— আমি কিছু শুনতে চাই না। যা বলেছি করো।”
— আমি পারবো না।
— তুমি যদি না করো তাহলে আমি তোমাকে তায্য পুত্র করবো। এই বলে রাখলাম।” কথাটা শেষ করে আর এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে থাকেন না তিনি। হন্তদন্ত পায়ে চলে যান। তবে যাওয়ার সময় বগলের নিচে রাখা জুতাটা খালি পায়ে পরে নেন।
হিমাদ্রর মাথা রাগে ফেটে যাচ্ছে।এই পুঁচকে মেয়ে তাকে গোল খাইয়ে এখন দাঁত কেলিয়ে হাসছে। রাগ দমন করতে না পেরে দেয়ালে একটা জোরে ঘুষি মা*রে। সাথে সাথে শিতুল চিৎকার দেয়,
— শশুর আব্বাআআআ।
— এই ননসেন্স মেয়ে সমস্যা কি? আরেকবার বাবাকে ডাকলে দেওয়ালের জায়গায় তুমি থাকবে।”
শিতুল এবার ভয় পেয়ে যায়। তবে বেশি একটা প্রকাশ করে না।হিমাদ্রর উদ্দেশ্য বলে,
— আমাকে কোলে নিন বঙ্গোপসাগরের দূষিত হিমেল বাতাস।
— কিহ। এই দেড় ব্যাটারির বাচ্চা তুই কি জেগে জেগে স্বপ্ন দেখিস? তোরে আমি ম*রে গেলেও কোলে নিবো না।”
— শশুর আব্বা। ও শশুর আব্বা।”
— আব্বে হালা কোলে নিচ্ছি তো এরকম কথায় কথায় বাবাকে ডাকিস ক্যান? তুই তো আমার একমাত্র বউ তোরে কোলে নিতাম না তো কি তোর বাপরে কোলে নিমু। আমি বাইচ্চা থাকতেই তোরে কোলে নিমু বইন । “
রাগে দাঁতে দাঁত চেপে কোলে তুলে নেয় শিতুলকে।
— তো এখন কি তোরে কোলে নিয়ে সারা ঘর হেঁটে হেঁটে ঘুম পাড়াবো?” দাঁতে দাঁত চেপে বলে হিমাদ্র।
— আইডিয়াটা মন্দ না। এক কাজ করুন শুরু করে ফেলুন।”
— আল্লাহ নাহহ!”
শিতুল মিটিমিটি হেসে বলে,
— কি হলো করছেন না কেন? শশুর আব্বাকে ডাক দিবো?”
— আরে বাচ্চা এরকম করে না। আমি তো করছি। দরকার পরলে একটা ফিটার এনেও খাইয়ে দিবো তুমি রাজি থাকলে।”
— না না আপনার দেওয়া ফিটার আমার লাগবে না। আপনি খেয়েই শক্তি বাড়ান।
— আমাকে বিছানায় নামান!”
খুশিতে আত্মহারা হয়ে হিমাদ্র তাড়াতাড়ি করে শিতুলকে বিছানায় নামিয়ে দেয়। উৎফুল্ল হয়ে বলে,
— আমার শাস্তি শেষ। আমার আর কিছু করা লাগবে না।”
— আজ্ঞে না মহাশয়।”
হিমাদ্রর মুখটা ততক্ষণাৎ কালো হয়ে যায়। ব্যার্থ সৈনিকের মতো করে বলে,
— তাহলে?”
— আমি পায়ে ব্যাথা পেয়েছি মালিশ করে দেন।”
— কিহহহ
— শশুর আব্বা।
— করছি তো।”
হিমাদ্র শিতুলের পা টাচ করতেই যেন শিতুলের গায়ে কারেন্টের ঝটকা লাগে। তড়িৎ বেগে দূরে সরে যায়। হিমাদ্র এক ভ্রু উঁচু করে শিতুলের দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
— কি হয়েছে?”
— ক..কি ক..কিছুনা?”
— আর লাগবে না মালিশ? একি তুমি কাপছো কেন আর তুতলাচ্ছোই বা কেন?”হিমাদ্র বাঁকা হেসে বলে।
— কিছুনা। আমি ঘুমাবো। আমার ঘুম পাচ্ছে।” কথাটা বলেই সোজা সটান হয়ে শুয়ে কমর্ফোটার দিয়ে সম্পূর্ণ শ*রীর ঢেকে নেয়।
হিমাদ্র সেদিকে চেয়ে ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসে।
__
চিৎকারের শব্দে ঘুম ভেঙে গেছে হিমাদ্রর।হুরমুরিয়ে সোফা থেকে উঠে সামনে তাকিয়ে যা দেখলো তাতে মনে হয় তা চোখ কপাল থেকে খুলে বাইরে চলে আসবে।
মেঝেতে শিতুল উল্টো হয়ে পরে আছে। শিতুলের শ’রীর সহ আশেপাশে দুই হাত জায়গা পর্যন্ত শাড়ী ছড়িয়ে আছে। আর আঁচলটাতো পুরো ওয়াশরুমের ভিতরে পর্যন্ত বিস্তৃত।এক পা শাড়ি দিয়ে ঢেকে আছে আর আরেক পা অর্ধেক উন্মুক্ত অবস্থায় আছে। হিমাদ্র সেদিকে থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। শাড়ি কুঁচকে যা তা অবস্থা। কোনমতে মনে হয় এক প্যাঁচ দিয়েছিল। আর সেটাই সামলাতে পারে নি। হিমাদ্র কপাল চাপড়ালো। বামহাতে শিতুলের হাত ধরে একটানে শোয়া থেকে দাঁড় করিয়ে দেয়। আর সাথে সাথে মেরুন রঙা জামদানি শাড়িটা সম্পূর্ণ খুলে নিচে পরে যায়।হিমাদ্র বোকার মতো হা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এরকম কিছু হবে সে ভাবতেও পারে নাই। গলা খাঁকারি দিয়ে অন্য দিকে ফিরে তাকায়।
কন্ঠস্বর যথাসম্ভব কড়া করে বলে,
— ননসেন্স মেয়ে সকাল বেলাই তোমার তামশা শুরু হয়ে গেছে। তোর জন্য কি শান্তিমতো ঘুমাতেও পারবো না। যত্তসব।”
শিতুল কিছু বলে না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।শাড়ি এখনও নিচে পরে আছে। হিমাদ্র ধমকে বলে,
— আমার সামনে এভাবে দাড়িয়ে আছিস কেন ননসেন্স।”
— আমি কী করবো? আমি কি শাড়ি পরতে পারি নাকি?”
— তো পরেছিস কেন? আমাকে ইমপ্রেস করার জন্য। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে শুনে রাখ এসবে করে কোন লাভ হবে না। শেমলেস মেয়ে মানুষ।”
— আরে আজব তো মশাই। আমি কেন আপনাকে ইমপ্রেস করতে যাবো? আপনি কী জাপানের প্রেসিডেন্ট নাকি?”
— কেন কেন? জাপানের প্রেসিডেন্ট হলে করতি নাকি?”
— আপনি তো ভারী আজব ভাই!”
— আমি তো আজবই। ” কথাটা বলে বড়বড় কদম ফেলে চলেই যাচ্ছিলো তখন শিতুলের কন্ঠস্বর শুনতে পায়,
— আমাকে শাড়ি পরিয়ে দেন বঙ্গোপসাগরের হিমেল হাওয়া।
চলবে….!!