পর্ব:- ৫
লেখিকা:নুসরাত জাহান তীব্রতা
প্রকৃতির নিয়ম মেনেই আবার একটি ভোর হলো। সূর্যের কিরণ চারদিকে ছড়িয়ে পরেছে। ভোর ঠিক সাড়ে পাঁচটা। হিমাদ্র বাগানে কতক্ষন এক্সারসাইজ করে ঘাম মাখা শরীর নিয়ে রুমে এসে দেখে শিতুল এখনও অগোছালোভাবে ঘুমিয়ে আছে। সারা দুনিয়ার সব চিন্তা দূর করে কি শান্তিতেই না ঘুমিয়ে আছে। অথচ শিতুল যেদিন থেকে এ বাড়িতে এসেছে হিমাদ্রর ঘুম কর্পূরের মতো উড়ে গেছে। টেনশন,রাগ, দুশ্চিন্তা, বিরক্তি সবকিছু নিয়ে হিমাদ্র স্বাভাবিক থাকতে পারছে না। শিতুল এখনও অনেক ছোট। বিয়ে মানে কি সেটাই বোঝে না। সেখানে সে বুঝদার হয়ে কীভাবে রাগ দেখাবে শিতুলের উপর। তবুও মেয়েটাকে দেখলে রাগে তার শরীর রি রি করে। মন চায় এক্ষুনি বন্দুকের দুইটা গুলি শিতুলের মাথা বরাবর ঢুকিয়ে দিতে। কিন্তু তা আর পারছে কই? মুসকান আবার কান্নাকাটি করে। একসময় বলে হিমাদ্র তুমি ওর সাথে রাগ দেখিও না। “ও তো এখনও ছোট। বিয়ে মানে কি ওইটাই বোঝে না। ” আবার শিতুলের জন্যই কেঁদে বুক ভাসায়। যতই হোক মেয়ে মানুষ তো। নিজের প্রিয় মানুষের সাথে অন্য নারীকে দেখার সহ্য ক্ষমতা কারোর নেই। হিমাদ্র বোঝে নিজের প্রেয়সীর হাহাকার। কিন্তু তারই বা কি করার আছে? মাঝে মাঝে মনে হয় তারই সব দোষ। সে যদি বিয়েটা না করতো? কিন্তু সেটা তো সম্ভব ছিল না। কোন সন্তানই চায় না তাদের কারণে তাদের বাবা-মার ম**রা মুখ দেখতে তাও সেটা নিজের কারণে। হিমাদ্রও ব্যাতিক্রম নয়। সেও নিজের কারণে বাবাকে মৃ*ত্য শয্যায় দেখতে চায় নি তাইতো দাঁতে দাঁত চেপে বিয়েটা করেছে। তার বাবা যে এক কথার মানুষ সেটা হিমাদ্র ভালোকরে জানে।
হিমাদ্রর ভাবনার মধ্যেই শিতুল নড়েচড়ে পাশ ফিরে ঘুমায়। যার ফলে পেট অনেকটা উন্মুক হয়ে উকি দিচ্ছে। কাঁধের দিকের টিশার্ট অনেকটা নিচে নেমে বুকের খাঁজ দেখা যাচ্ছে। কমর্ফোটারটা কোমর পর্যন্ত এলোমেলো ভাবে পরে আছে। হিমাদ্রর দৃষ্টিতে কড়া বিরক্তি।তার এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে একটা তিন বছরের বাচ্চাও এরচেয়ে ভালোভাবে ঘুমায়।
আলমারি থেকে কাপড় নিয়ে একদম সোজা ওয়াশ রুমে ঢুকে শাওয়ার নেওয়ার জন্য। ঠাস করে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে টানা বিশ মিনিট ঠান্ডা পানির নিচে দাড়িয়ে থাকে। আধা ঘন্টা পর দরজা খুলে বের হয় হিমাদ্র। পরনে একটা সাদা টিশার্ট আর হাঁটু সমান হাফ প্যান্ট। হিমাদ্র মাথা মুছতে মুছতে বের হয়ে দেখে এখনও শিতুল সেভাবেই ঘুমাচ্ছে। মনে মনে ভাবে এ নাকি করবে আবার স্বামী সেবা। মহাশয়া ঘুম থেকে উঠতে উঠতে বেচারার স্বামী কাজ থেকে এসে পরবে। পরক্ষণেই আবার ভাবে তার কি? সে তো মেয়েটাকে ডিভোর্স দিয়ে দিবে। তারপর যা হয় সেটা তার ব্যাপার না। আপাতত শিতুলের ১৮ বছর হওয়ার অপেক্ষা করতে হবে।রাগে কটমট করতে করতে নিচে যায় হিমাদ্র।
এককাপ কফি নিয়ে এসে কোনদিকে না তাকিয়ে ল্যাপটপ নিয়ে সোজা বারান্দায় চলে যায় হিমাদ্র।
শিতুল ঘুম থেকে উঠতে উঠতে হিমাদ্র সত্যি সত্যি ডিপার্টমেন্টের উদ্দেশ্য চলে গেছে। হাই তুলতে তুলতে উঠে কতক্ষন থম মে*রে বসে থেকে বোঝার চেষ্টা করলো সে কোথায়? মনে পরতেই এদিক ওদিক তাকিয়ে হিমাদ্রর খোঁজ চালায়? কিন্তু উদ্দেশ্য বিফল।তাই টলতে টলতে ওয়াশ রুমে যায়। মুক্তার কথামতো গোসল করে নেয়।
তবে আজকে আর শাড়ি পরে না। একটা হাঁটু সমান টিশার্ট আর প্লাজু পরে নিচে নামে। হিমাদ্রর মা একবার আগাগোড়া পর্যবেক্ষণ করে নিজের কাজে ব্যাস্ত হয়ে পরে।
___
— হিমাদ্র তোমার সৎ চাচাতো বোন মানে যার সাথে তোমার জোর করে বিয়ে হয়েছে তার বয়স কত?”
মুসকানের করা প্রশ্নে হাতে থাকা কফির মগে চুমুক দিতে গিয়েও থেমে যায় হিমাদ্র। ভ্রুকুটি করে বলে,
— হবে হয়তো ১৫/১৬
— কিহহহ?” মুসকান সামান্য চেঁচিয়ে উঠে।
— কি হলো?”
— ও এতো ছোট? আমি তো ভাবছিলাম ১৮ হবে হয়তো।”
— কি জানি?
— তোমার বোন তুমি জানতে না।”
— লিসেন মুসকান। সে আমার সৎ চাচাতো বোন আপন নয়। আর না তারা আমাদের বাড়িতে আসতো আর না আমরা যেতাম তাহলে জানার প্রশ্ন আসছে কোথায়?”
— তাই বলে?”
— হেন ত্যান না করে কি হয়েছে বলো।” হিমাদ্র গম্ভীর গলায় বলে।
মুসকান একটু নড়েচড়ে বসে বলে,
— ওর তো ১৮ বছর হয় নি তাহলে ডিভোর্স কিভাবে দিবে? তাছাড়া যদি কোনভাবে তোমার ডিপার্টমেন্টের লোকেরা জানতে পারে তুমি ১৫ বছর বয়সী মেয়েকে বিয়ে করেছ তাহলে তো তোমার ক্যারিয়ার শেষ।”
হিমাদ্রকে একটু ভাবনাত্মক দেখালো। সেভাবেই সিরিয়াস কন্ঠে বলে,
— আমিও এ বিষয়ে ভেবেছি। আপাতত একটাই রাস্তা আছে ওই মেয়ের ১৮ বছর হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এছাড়া কোন উপায় নেই।”
— এতো দিন!” মুসকান মলিন গলায় বলে।
— এছাড়া আর কোন উপায় আছে?”
— জানা নেই!”
— আচ্ছা সমস্যা নেই। আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করবো। আমি চাইনা তোমার ক্যারিয়ারের কোন ক্ষতি হোক। তবে একটা কথা আমাকে অপেক্ষা করাতে করাতে তুমি আবার ওই মেয়েকে ভালোবেসে ফেলো না। আজকাল তো..
— লিসেন মুসকান, আমাকে তোমার ওই ধরনের ছেলে মনে হয়।
— না হিমাদ্র। কিন্তু মনের উপর কখনো জোর খাটে না। আমি তোমাকে বিশ্বাস করি বলেই এখনো অপেক্ষা করছি নয়তো বিয়ে করে নিতাম।
— মুসকান।( ধমক দিয়ে)
— আরে বাবা মজা করেছি।
হিমাদ্রর কৌণিক দৃষ্টি দেখে মুসকান ফিক করে হেসে দেয়। সেটা দেখে হিমাদ্রও হেসে ওঠে।
_____
— আম্মু আমি চট্টগ্রাম যাবো ট্রেনিংয়ের জন্য।
— কোথায় যাবা যাও তবে সাথে তোমার বউকে নিয়ে যাও।” জেরিন তালুকদার কাঠকাঠ গলায় বলেন।
— মা তুমি কি পাগল? আমি ট্রেনিং এ যাচ্ছি সেখানে ঘুরতে না।” হিমাদ্র রাগী গলায় বলে।রাগ দমন করতে জেরিন তালুকদারের রুমে পায়চারি করে। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
— মা তুমি কোন আঙ্কেলে এই কথা বলছো? এমনিতেই ওই মেয়েকে আমার সহ্য হয় না তারউপর আবার সেখানে নিয়ে যেতে বলছো।”
— হিমাদ্র আমি যা বলার বলে দিয়েছি?”
— কিন্তু..
— কোন কিন্তু না সেখানে গিয়ে তো সেই ফ্ল্যাটেই থাকবে তুমি। তাহলে ওকে নিয়ে যেতে সমস্যা কি? তাছাড়া চট্টগ্রাম তোমার নানুর বাড়ি সেখানেও থাকতে পারো। দেখ হিমাদ্র শিতুল তোমার বউ। তুমি বিয়ে মানো বা না মানো সেটা তোমার ব্যাপার। তবে শিতুলের প্রতি তোমার দায়িত্ব আছে। তুমি চাইলেই সেগুলো এড়িয়ে যেতে পারো না। বিয়ে মানুষের একবারই হয়। তাই আগে যা হয়েছে সেসব ভুলে বর্তমান মেনে নাও। আশা করি আমার কথা তুমি বুঝতে পেরেছ?”
— কিন্তু মা ওই মেয়েকে নিয়ে গিয়ে আমি কি করবো? আমি তো থাকবোই না বাসায়।”
— তোমার মামার বাসায় রেখে এসো ওকে তাহলে।”
— দেখা যাবে? ওই মেয়েকে তো আমি নিয়েই যাবো না।” বিরবির করে কথাটা বলে আর দাঁড়ায় না। সোজা নিজের রুমে চলে যায়।
ডিউটি শেষে মুসকানের সাথে দেখা করে সোজা মায়ের সাথে দেখা করতে এসেছিল হিমাদ্র। ভেবেছিল চট্টগ্রাম গিয়ে এসব থেকে দূরে থাকবে। কিন্তু তার আশায় পানি ঢেলে যার জন্য চট্টগ্রাম যেতে চেয়েছিল তাকেই এখন সঙ্গে করে নিয়ে যেতে বলছে তার মা।
রাগে কটমট করতে করতে রুমে ঢুকে শিতুলকে তার আলমারি হাতাতে দেখে রাগটা যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। কোন কিছুর পরোয়া না করে ঠাস করে একটা থাপ্পর মে’রে দেয় গালে। শিতুল আকস্মিক আক্রমনে গালে হাত দিয়ে কান্না চোখে তাকিয়ে আছে। হিমাদ্র শিতুলকে ধাক্কা মে’রে সরিয়ে দিয়ে মুখের উপর আলমারি লাগিয়ে দেয়।শিতুলের কাঁধ দুই হাতে চেপে ধরে চেঁচিয়ে বলে উঠে,
— কোন সাহসে তুই আলমারিতে হাত দিয়েছিস? আমার জীবনটাকে নরক বানিয়ে এখন আমার রুমেও নিজের আধিপত্য বিস্তার করছিস? শুনে রাখ আমি তোকে পছন্দ করি না শুধু ঘৃণা করি। প্রচন্ড ঘৃণা করি।আমার জীবনে তুই এখনও আছিস কেন? চলে যেতে পারিস না। তুই চলে গেলে আমি একটু শান্তিতে বাঁচতে পারবো। তোর উপস্থিতি আমার অসহ্য লাগে। লজ্জা করে না একটা মেয়ে হয়ে অন্য একটা মেয়ের অধিকার কেড়ে নিস? অবশ্য তোর আবার লজ্জা কিসের? তোর মতো মেয়ের আবার লজ্জা আছে নাকি? নির্লজ্জ চরিত্রহীন মেয়ে কোথাকার? “
শিতুল এবার মুখ খুলে বলে,
— ওহ আচ্ছা। যে পুরুষ ঘরে বউ রেখে বাইরে অন্য মেয়ের সাথে প*র*কী*য়া করে তার কাছে থেকে আমার চরিত্রবানের সংঙ্গা শিখতে হবে। ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং তোহ।”
কথাটা বলার সাথে সাথেই শিতুলের গালে আবার শক্তপোক্ত হাতের একটা থাপ্পর এসে পরে। শিতুলের ঠোঁটের কোণে থেকে র*ক্ত বের হচ্ছে। চোখ বেয়ে পানি পরছে।
— গেট আউট। আই সে গেট আউট। গেট আউট শিতুল নয়তো এক্ষুনি তোকে খু*ন করে ফেলবো।” হিমাদ্র চিৎকার করে উঠে।
শিতুল ছলছল চোখে তাকিয়ে রইল হিমাদ্রর দিকে। কান্না আটকে কোনমতে বলে,
— আপনি একদিন খুব আফসোস করবেন। খুব আফসোস করবেন। কথাটা মাথায় রাখবেন।” কথাটা বলেই শিতুল রুম থেকে দৌড়ে বেরিয়ে যায়।
এরপর যা হলো তা ছিল খুবই অপ্রত্যাশিত ঘটনা। জেরিন তালুকদার মাথা চাপড়ানো ছাড়া আর কিছু করতে পারলেন না।
চলবে???
অসুস্থ ছিলাম।
[ বেশি বেশি রেসপন্স কইরো তাহলে প্রত্যেকদিন দিবো গল্প। ]