10-20-2026, 09:09 AM
১. ছারপোকা আসছে:
কমলাপুর রেল স্টেশনের পাবলিক বেঞ্চে বসে আছি কতক্ষণ হলো তার হিসাব নেই, অথচ ট্রেনের আসার কোনো নামগন্ধ নেই। শালা জীবনটাই একটা যন্ত্রণা। আবাসিক কলেজে বিছানায় ছারপোকার কামড়ে যেমন বিশ্রী জ্বালা হয়, ঠিক তেমনই একটা খিটখিটে যন্ত্রণা হচ্ছে মনের ভিতর।
আমি রানা। নাখালপাড়ার একটা আবাসিক কলেজের একাদশ কেলাসের ছাত্র। আমি পড়ালেখায় খুব ভালো—তাই এই আবাসিকে থাকি, এ কথা ভাবলে কিন্তু ভুল করবেন। আসল কথা হলো, আমার আব্বা ক্লাস টেনে উঠে বখে গিয়েছিলেন। তাই আর মেট্রিক দেওয়া হয় নাই। সেই জেদের ঠেলায় উনি আমাকে নবম কেলাসে ওঠার পরই জোর করে এই ঢাকার আবাসিকে এনে রেখে গেছেন।
তবে আজকের ব্যাপারটা অন্যরকম। পকেটে হাত দিয়ে দেখি বাড়ি যাওয়ার পর্যাপ্ত টাকা ভালোভাবে আছে। সালটা ২০১০, আমার হাতে আব্বার কুয়েত থেকে পাঠানো এক বন্ধু দিয়ে যাওয়া একটা নোকিয়া E5 মোবাইল। আব্বা কুয়েত থেকে টাকা আর এই মোবাইলটা পাঠিয়েছিলেন বাড়ি যাওয়ার জন্য। সামনেই কোরবানির ঈদের ছুটি, কলেজ একেবারে ১৫ দিনের বন্ধ। অনেক দিন পর এই বন্দিশালার কড়া নিয়ম আর রুটিনের চাপ থেকে মুক্তি পেয়ে সোজা খুলনার গ্রামের বাড়ির দিকে যাচ্ছি।
কোরবানির ঈদের ছুটির কারণে ট্রেনের ভেতরটা ছিল একেবারে গাদাগাদি মানুষে ঠাসা। জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়ের অসহ্য ভ্যাপসা গরম, তার ওপর কামরার ভেতর ফ্যান ঘুরলেও বের হচ্ছিল আগুনের মতো বাতাস। গায়ের জামাকাপড় ঘামে ভিজে একদম চটচটে হয়ে শরীরের সাথে সেঁটে ছিল। পকেটে হাত দিয়ে নোকিয়া E5 সেটটা বের করলাম। এর কোয়ার্টি কিপ্যাডে আঙুল চালিয়ে বারবার সময় দেখছিলাম আর স্নেক গেম খেলে মন ভুলানোর চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু অতিরিক্ত গরমে মাথার রগ ফুলে যেন বমি আসার মতো অবস্থা হচ্ছিল।
ট্রেনটা যখন ঈশ্বরদী জংশনে এসে অন্তত মিনিট ১৫-এর মতো থামল, তখন আর সহ্য করতে না পেরে একটু ফ্রেশ বাতাসের আশায় নোকিয়া E5-টা পকেটে পুরে ট্রেন থেকে নিচে নেমে এলাম। প্ল্যাটফর্মে নেমেই দেখি এক লোক খাঁচাভর্তি ডাব নিয়ে বসে আছে। গলার ছাতি একদম কাঠ হয়ে আসছিল। পকেট থেকে টাকা বের করে একটা ডাব কাটতে বললাম। ডাবওয়ালা দা দিয়ে কোপ মেরে কচি ডাবের পানিশুদ্ধ হাতে দিতেই এক নিঃশ্বাসে তা গিলে খেলাম। পেটের ভেতর ঠাণ্ডা পানিটা পৌঁছাতেই যেন শরীরে প্রাণ ফিরে এলো।
তারপর ট্রেনে উঠে বাকি বিচ্ছিরি জার্নিটা কোনোমতে সহ্য করে অবশেষে যখন খুলনা রেলওয়ে স্টেশনে এসে পৌঁছালাম, তখন ক্লান্তি যেন ভেঙে পড়ছিল। ট্রেন থেকে নেমে হুলস্থুল ভিড় ঠেলে স্টেশন চত্বরে এসে পৌঁছালাম। প্ল্যাটফর্মে এসে পকেট থেকে নোকিয়া E5 বের করে মায়ের নম্বরে কল করলাম।
ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে মায়ের হাঁপ ধরা গলায় বলে উঠলেন, "ও রানারে! নেমে গেছিস বাপ? আমার তো চিন্তা হতে হতে বুক শুকিয়ে যাচ্ছিল! কতবার যে তোর আব্বারে কুয়েতে ফোন দিয়ে বলতিছিলাম, ছেলেটা রওনা হলো কি না খোঁজ নাও! রাস্তাঘাটে ভিড় কেমন? কিছু খাইছিস বাপ?"
মায়ের সেই একঘেয়ে চিন্তার ঝুড়ি খুলে বসা কথাগুলো শুনে বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে এলো। আমি রিকশায় বসেই হাসিমুখে বললাম, "সব ঠিক আছে মা, ঈশ্বরদীতে নেমে ডাব খেয়েছিলাম, পেট ভরা আছে। তুমি ভাবিও না, আর আধা ঘণ্টার মধ্যে আমি বাড়ি পৌঁছে যাচ্ছি।"
ওপাশ থেকে মায়ের তৃপ্তির একটা দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল, "আচ্ছা বাপ, সাবধানে আয়। তোর জন্য তোর পছন্দের হাঁসের মাংসটা আর গরম ভাত রান্না কইরা রাখছি। আসার সময় রাস্তার মোড় থেকে মিষ্টি বা অন্য কিছু কেনা লাগবে না, সোজা বাড়ি চলে আয়।"
ফোনটা কেটে নোকিয়া E5-টা পকেটে রেখে স্টেশন পার হয়ে সোজা চলে এলাম নিরালার মোড়ে। নিরালার সামনে বেশ কিছু ব্যাটারিচালিত রিকশা দাঁড়িয়ে ছিল। এক চালকের সাথে দরদাম করে একটা রিকশায় ব্যাগটা তুলে উঠে বসলাম। রিকশাটা যখন নিরালার পিচঢালা পথ ছাড়িয়ে গ্রামের মেঠো রাস্তা আর খালের ধার ঘেঁষে এগোতে লাগল, তখন সাঁঝের খোলা বাতাস সরাসরি এসে গায়ে লাগল। দুপাশের সবুজ ধানক্ষেত আর মেঠো গন্ধ পেরিয়ে রিকশা আমাকে বাড়ির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। পকেটে রাখা নোকিয়া E5-এ কিছু ছবি তুলে রাখলাম এই সুন্দর প্রকৃতির। কানে হেডফোন লাগিয়ে গুরুর "তেরো নদী - সাত সমুদ্দুর" গান ছেড়ে দিয়ে শান্ত হয়ে বসলাম। ঢাকার কড়া নিয়ম আর ট্রেনের সেই নারকীয় জার্নি পেছনে ফেলে অবশেষে নিজের গ্রামে পৌঁছানোর আনন্দটা যে কী, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
আমাদের পরিবারের সদস্য সংখ্যা বাবা, মা, আমি, ভাই আর বোনসহ মোট ৫ জন। আমি সবার বড়—নাম রানা। আমার চেয়ে ছোট ভাই রাজু, সে এখন গ্রামে ক্লাস ফোর এ পড়ে, আর সবার ছোট বোন রুমা, তার বয়স মাত্র দুই বছর। আমার আব্বুরা চার ভাই ও চার বোন, সবাই বিবাহিত। তবে আমি ছোটবেলা থেকে জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই দেখে আসছি আমরা সবাই যার যার মতো আলাদা, একদম একক পরিবার। দাদা-দাদি দুজনই অনেক আগে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। আমার বাবা ছিলেন দাদার ৬ নম্বর সন্তান।
আমরা একই ভিটায় থাকি বটে, তবে চার ভাইয়ের সংসার সম্পূর্ণ আলাদা। উঠানটা একটাই হলেও চাল-ডাল আর হাঁড়ি-পাতিল একদম ভিন্ন। বাড়িতে মোট চারটে আলাদা রান্নাঘর। তবে গ্রামের মানুষগুলো এখনও বেশ সহজ-সরল আর ধার্মিক, আধুনিকতার হাওয়া আমাদের চালচলনে খুব একটা লাগেনি। আমাদের দাদার আমলের মূল বাড়িটি বেড়া আর দোতলা বিশিষ্ট টিনের চাল দিয়ে তৈরি। সেই ভিটার জমিটাই চার ভাগ করে একেকজন দুটো করে ঘর নিয়ে থাকেন।
বাড়ির একদম সামনের দিকে থাকেন বড় জেঠা, তাঁর পরেই মেঝো জেঠা, তারপর সেজো জেঠা, আর সবার শেষে গিয়ে আমাদের বসতি। আমাদের ঘর আর রান্নাঘরটা ঠিক বাড়ির একদম শেষ সীমানায়, প্রায় বাঁশঝাড় আর ঘন জঙ্গলঘেঁষা জায়গায়। পেছনে জঙ্গল বলে দিনের বেলাতেও ওদিকটায় বেশ ঠাণ্ডা একধরনের ছায়া পড়ে থাকে। তবে আব্বার দূরদর্শিতায় আর মায়ের দিনরাত এক করা পরিশ্রমে আমাদের অংশের সুবিধা অনেক। ঘরের সাথেই রয়েছে নিজস্ব চাপকল আর পাকা বাথরুম, ফলে রাতের বেলা বা দরকারের সময় বাড়ির বাইরে অন্ধকার জঙ্গলের দিকে বা অন্যের ভিটায় যেতে হয় না।
আজ আমাদের এই গুছানো রূপটা কিন্তু একদিনে হয়নি। একসময় আব্বার দেশে যা আয় ছিল, তা দিয়ে সংসারের খরচ আর আমাদের পড়ালেখা চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। বাধ্য হয়েই আজ থেকে প্রায় সাত বছর আগে আব্বা কুয়েতের পথ ধরেন। বাবা যখন প্রথম বিদেশে যান, তখন আমার বয়স মাত্র ১১ বছর আর ছোট ভাই রাজুর বয়স ছিল ৪ বছর। সেই থেকে আব্বা টানা পরবাস খাটছেন—প্রতি দুই বছর পর পর মাত্র দুই মাসের ছুটি নিয়ে দেশে আসেন।
বিদেশে আব্বার যেমন হাড়ভাঙা খাটুনি, ঠিক তেমনই দেশে তিনটে সন্তানকে একা হাতে সামলানো আর সংসার গুছিয়ে রাখার পেছনে মায়ের পরিশ্রমটাও কম ছিল না। আব্বা প্রবাসে যাওয়ার পর থেকে মা একাই সংসারের সব ঝড়ঝাপটা সামলেছেন। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত হাঁস-মুরগি পোষা, রান্নাবান্না, ছোট দুটো ভাই-বোনকে সামলানো আর আমার পড়াশোনার দেখভাল—সব মা এক হাতেই করে গেছেন। আব্বা কুয়েত থেকে যে টাকা পাঠাতেন, মা তা তিল তিল করে জমিয়ে আর হিসাব করে খরচ করে সংসারের রূপটাই বদলে দিয়েছেন।
আজ আমাদের ঘরে যেটুকু স্বাচ্ছন্দ্য দেখছেন, তার সবটুকুই আব্বার গায়ের ঘাম রক্ত পানি করা কষ্ট আর মায়ের এই নিঃশব্দ ত্যাগের ফসল। কুয়েত থেকে পাঠানো টাকা দিয়ে মা নিজ তদারকিতে ঘরটা শক্তপোক্ত করিয়েছেন, সাথেই চাপকল আর বাথরুম বসিয়েছেন। এমনকি আমাদের বাড়িতে এখন সরকারি বিদ্যুৎ সংযোগও আছে। গ্রামের দিকে হরহামেশাই লোডশেডিং হয় বলে আব্বা দেশে এসে চালের ওপর একটা সুন্দর সৌর বিদ্যুতের (সোলার প্যানেল) ব্যাটারিসহ সেটআপও বসিয়ে দিয়ে গেছেন, যা মা প্রতিদিন পরম যত্নে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাখেন। ফলে কারেন্ট চলে গেলেও আমাদের ঘরে এমার্জেন্সি লাইট আর ফ্যান ঠিকই চলে, অন্ধকার নেমে আসে না।
আজ এত বছর পর, সেই কুয়েতের রোজগারে কেনা নোকিয়া E5 মোবাইলটা পকেটে নিয়ে যখন নিরালার মোড় থেকে রিকশায় চেপে বাঁশবাগান আর মেঠো পথ ধরে বাড়ির দিকে এগোচ্ছি, তখন মনে হচ্ছিল—আব্বার দূরদেশের রক্ত পানি করা কষ্ট আর মায়ের এই পরম মমতাময় সংসার সামলানোর ত্যাগের কারণেই আজ আমি এমন একটা নিবিড়, আলোকিত ও শান্তির নীড়ে ফিরে যেতে পারছি।
রিকশা থেকে বাড়ির উঠানে পা রাখতেই চারপাশের চেনা ঘ্রাণ আর মেঠো হাওয়া যেন আমাকে জড়িয়ে ধরল। কুয়েতের টাকা আর মায়ের পরিশ্রমে গড়ে তোলা আমাদের সেই ছোট্ট গুছানো ঘরের দাওয়ায় পা দিতেই মা দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। এতদিন পর মায়ের সেই পরম মমতাময় পরশ পেয়ে বুকের ভেতরের সব ক্লান্তি আর ঢাকার কড়া নিয়মের যন্ত্রণা এক লহমায় উধাও হয়ে গেল।
পায়ের শব্দ শুনে ঘর থেকে ছুটে এলো ছোট ভাই রাজু আর পিছু পিছু হেঁটে এলো দুই বছরের ছোট বোন রুমা। রাজু ক্লাস টু-তে পড়ে, আমার এই হঠাৎ বাড়ি ফেরায় তার আনন্দের যেন সীমা নেই! সে একগাল হেসে ব্যাগ ধরে টানাটানি শুরু করে দিল। আর ছোট বোন রুমা প্রথমে একটু লাজুক চোখে দূরে মায়ের শাড়ি ধরে দাঁড়িয়ে তোতলা মুখে চেয়ে রইল—যেন ঢাকা থেকে কোনো নতুন অচেনা মেহমান এসেছে!
হাত-মুখ ধুয়ে রান্নাঘরের পাশে গিয়ে বসতেই মা প্লেটে গরম ভাত আর আমার প্রিয় হাঁসের মাংস বেড়ে দিলেন। কতদিন পর যে এমন পেট পুরে তৃপ্তি নিয়ে খেলাম, তা বলে বোঝানো যাবে না। খাওয়ার সময় পাশে বসে রাজু একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছিল—ঢাকা শহর কেমন, আবাসিক কলেজে কী খেলা হয়, আর তার জন্য কী এনেছি! রাজুর কথা শুনে রুমাও মিষ্টি হেসে তোতলা মুখে কী যেন বলার চেষ্টা করছিল।
খাওয়া-দাওয়া শেষ করে মা বললেন, "বাপ, এবার জেঠা-জেঠীদের সালাম করে আয়। বাড়ি ফিরেছিস, দেখা দিয়ে আসা ভালো।"
মায়ের কথা মতো উঠান পার হয়ে একে একে বড় জেঠা, মেঝো জেঠা আর সেজো জেঠার ঘরে গেলাম। বড় জেঠা মাথায় হাত রেখে দোয়া করে দিলেন, জেঠীরাও খোঁজখবর নিলেন—পড়াশোনা কেমন চলছে, ঢাকার কড়া নিয়মে কোনো কষ্ট হচ্ছে কি না। সবার ঘর ঘুরে, সালাম ঠুকে আর কিছুক্ষণ টুকটাক কথা বলে আবার আমাদের ঘরের দিকে ফিরে এলাম। ঘরে ঢুকে খাটে পা ছড়িয়ে বসতেই রাজু আর রুমা আবার এসে আমাকে ঘিরে ধরল। রুমা সব লজ্জা ভুলে আমার কোলজুড়ে এসে বসল আর রাজু খাটে পা তুলে বসে বায়না ধরল গল্প শোনার।
এবারে বাগ থেকে ওদের জন্যে আমার বন্ধুর নিয়ে আসা সব কিছু এক এক করে খুলে দিলাম। রাজুর জন্যে কয়েকটা জমা, রুমার জন্যেও। আর কিছু সাবান শ্যাম্পু, লোশন। মা বললো " তোর আব্বা ৫০ হাজার টাকা পথাইসে। ২০ হাজার কোরবানির জন্যে, তোর বড় জেঠারে দিয়ে দিসি। সংসারের হবে ১৫ হাজার আর তোদের সবার জন্যে ৫ হাজার করে ঈদের বাজার করতে বলসে।" আমি বললাম "তাইলে আপনের জন্যে?" মা একটা হাসি দিয়া বললো "আরে কুরবানির ঈদে আমি আর কি কিনমু?" আমি "না তাইলে আমিও কিছু কিনুম না", মা আবার হাসি দিয়া বললো "আচ্ছা দেখা যাক।"
সন্ধ্যা নেমে আসতে আমাদের টিনের চালে থাকা সৌর বিদ্যুতের আলোটা পুরো ঘরকে বেশ সুন্দর উজ্জ্বল করে তুলল। পকেট থেকে আব্বার কুয়েত থেকে পাঠানো সেই নোকিয়া E5 সেটটা বের করে নকিয়ার গেমটা চালু করতেই রাজু আর রুমা দুজনই মন্ত্রমুগ্ধের মতো ফোনের রঙিন ডিসপ্লের দিকে চেয়ে রইল।
বাঁশঝাড়ের পাশ থেকে ঠান্ডা বাতাস ঘরে আসছে। আব্বার দূরদেশের কষ্ট আর মায়ের দিনরাত এক করা পরিশ্রমে গড়ে ওঠা এই শান্ত নীড়ে ছোট ভাই-বোনের এমন নিষ্পাপ হাসি দেখে মনে হলো—ঢাকার কড়া নিয়ম আর ট্রেনের সেই নারকীয় জার্নির সব ক্লান্তি যেন মুহূর্তেই ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার হয়ে গেল।
আমি বোনকে কোলে তুলে নিলাম। দু’বছরের রুমা ছোট্ট নরম দুটো হাত দিয়ে আমার গলাটা জড়িয়ে ধরে কাঁধে গালটা ঠেকাল। এতক্ষণ যে অচেনা ভাবটা ছিল, আমার বুকের ওমে এসে সেটা যেন এক নিমেষে গলে জল হয়ে গেল। ওর গা থেকে একটা মিষ্টি ছোট বাচ্চার ঘ্রাণ আসছিল।
আমি খাটে বসে রুমাকে কোলে চেপে ধরে একহাতে পকেট থেকে নোকিয়া E5 ফোনটা বের করলাম। লাল-নীল কোয়ার্টি কিপ্যাডের আলো জ্বলতেই রাজু কাছে সরে এসে আমার উরুতে চড়ে বসল।
"ভাইয়া, এই মোবাইলটা আব্বা পাঠাইছে না? এতে কি গেম আছে?"—রাজুর চোখে যেন কৌতূহলের ফোয়ারা ফুটল।
আমি ফোনের মেনু খুলে স্নেক গেমটা চালু করে রাজুর হাতে দিলাম। ৯ বছরের রাজু একদম মনোযোগ দিয়ে বাটন টিপে সাপটাকে খাবার খাওয়াতে লাগল, আর কোলে বসা রুমা ছোট ছোট আঙুল বাড়িয়ে ফোনের স্ক্রিনটা ছুঁতে গিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল।
বাইরে তখন বাঁশঝাড় বেয়ে সাঁঝের অন্ধকার নেমে এসেছে। কিন্তু আমাদের ঘরে টিনের চালে থাকা সৌর বিদ্যুতের ডাবল টিউবলাইটটা জ্বলতেই চারপাশটা আলোয় ঝলমল করে উঠল। গ্রামের অন্য সব ঘরে কারেন্ট চলে গেলে যখন অন্ধকার বা কুপি বাতি জ্বলত, তখন আব্বার কুয়েত থেকে পাঠানো টাকায় বসানো এই সোলার প্যানেলটার বদৌলতে আমাদের ঘরটা এমন উজ্জ্বল হয়ে থাকত।
মা রান্নাঘর থেকে কাজ শেষ করে ঘরে ঢুকে এই দৃশ্য দেখে মৃদু হেসে বললেন, "তিন ভাই-বোনের মেলবন্ধন তো ভালোই জমেছে! রানা, সারাদিনের ধকলে তুই ক্লান্ত, ভাই-বোনকে নিয়ে বেশি রাত করিস নে, তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়িস।"
ছোট দুটি ভাই-বোনের এই অনাবিল আনন্দ আর সোলারের আলোয় আলোকিত শান্ত ঘরটার দিকে তাকিয়ে আমার মনটা এক গভীর তৃপ্তিতে ভরে গেল। মনে হলো—ঢাকার বন্দিশালা, ট্রেনের সেই দুর্বিসহ ধকল আর সারা রাস্তার সব ক্লান্তি যেন এই দুটি নিষ্পাপ মুখ আর ঘরের উষ্ণ আলোয় হারিয়ে গেল।
রাতে আমরা সবাই এক খাটেই ঘুমালাম। মা দেখি একটু পাশ ফিরে বোনকে বুকের দুধ দিতেসে। মার শরীরটা বেশ হইসে। আমার মনে পড়ে গেল আমার তখন অল্প বয়স, আব্বা কুয়েতে কোলে গেছে মাত্র। তখনও রাজু মার দুধ খায়। এক রাতে আমি বায়না ধরি আমিও দুধ খামু। মা হাসতে হাসতে মরে গেলো। কিন্তু আমি ছিলাম নাছোড়... কান্নাকাটি করতে লাগলাম।
কমলাপুর রেল স্টেশনের পাবলিক বেঞ্চে বসে আছি কতক্ষণ হলো তার হিসাব নেই, অথচ ট্রেনের আসার কোনো নামগন্ধ নেই। শালা জীবনটাই একটা যন্ত্রণা। আবাসিক কলেজে বিছানায় ছারপোকার কামড়ে যেমন বিশ্রী জ্বালা হয়, ঠিক তেমনই একটা খিটখিটে যন্ত্রণা হচ্ছে মনের ভিতর।
আমি রানা। নাখালপাড়ার একটা আবাসিক কলেজের একাদশ কেলাসের ছাত্র। আমি পড়ালেখায় খুব ভালো—তাই এই আবাসিকে থাকি, এ কথা ভাবলে কিন্তু ভুল করবেন। আসল কথা হলো, আমার আব্বা ক্লাস টেনে উঠে বখে গিয়েছিলেন। তাই আর মেট্রিক দেওয়া হয় নাই। সেই জেদের ঠেলায় উনি আমাকে নবম কেলাসে ওঠার পরই জোর করে এই ঢাকার আবাসিকে এনে রেখে গেছেন।
তবে আজকের ব্যাপারটা অন্যরকম। পকেটে হাত দিয়ে দেখি বাড়ি যাওয়ার পর্যাপ্ত টাকা ভালোভাবে আছে। সালটা ২০১০, আমার হাতে আব্বার কুয়েত থেকে পাঠানো এক বন্ধু দিয়ে যাওয়া একটা নোকিয়া E5 মোবাইল। আব্বা কুয়েত থেকে টাকা আর এই মোবাইলটা পাঠিয়েছিলেন বাড়ি যাওয়ার জন্য। সামনেই কোরবানির ঈদের ছুটি, কলেজ একেবারে ১৫ দিনের বন্ধ। অনেক দিন পর এই বন্দিশালার কড়া নিয়ম আর রুটিনের চাপ থেকে মুক্তি পেয়ে সোজা খুলনার গ্রামের বাড়ির দিকে যাচ্ছি।
কোরবানির ঈদের ছুটির কারণে ট্রেনের ভেতরটা ছিল একেবারে গাদাগাদি মানুষে ঠাসা। জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়ের অসহ্য ভ্যাপসা গরম, তার ওপর কামরার ভেতর ফ্যান ঘুরলেও বের হচ্ছিল আগুনের মতো বাতাস। গায়ের জামাকাপড় ঘামে ভিজে একদম চটচটে হয়ে শরীরের সাথে সেঁটে ছিল। পকেটে হাত দিয়ে নোকিয়া E5 সেটটা বের করলাম। এর কোয়ার্টি কিপ্যাডে আঙুল চালিয়ে বারবার সময় দেখছিলাম আর স্নেক গেম খেলে মন ভুলানোর চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু অতিরিক্ত গরমে মাথার রগ ফুলে যেন বমি আসার মতো অবস্থা হচ্ছিল।
ট্রেনটা যখন ঈশ্বরদী জংশনে এসে অন্তত মিনিট ১৫-এর মতো থামল, তখন আর সহ্য করতে না পেরে একটু ফ্রেশ বাতাসের আশায় নোকিয়া E5-টা পকেটে পুরে ট্রেন থেকে নিচে নেমে এলাম। প্ল্যাটফর্মে নেমেই দেখি এক লোক খাঁচাভর্তি ডাব নিয়ে বসে আছে। গলার ছাতি একদম কাঠ হয়ে আসছিল। পকেট থেকে টাকা বের করে একটা ডাব কাটতে বললাম। ডাবওয়ালা দা দিয়ে কোপ মেরে কচি ডাবের পানিশুদ্ধ হাতে দিতেই এক নিঃশ্বাসে তা গিলে খেলাম। পেটের ভেতর ঠাণ্ডা পানিটা পৌঁছাতেই যেন শরীরে প্রাণ ফিরে এলো।
তারপর ট্রেনে উঠে বাকি বিচ্ছিরি জার্নিটা কোনোমতে সহ্য করে অবশেষে যখন খুলনা রেলওয়ে স্টেশনে এসে পৌঁছালাম, তখন ক্লান্তি যেন ভেঙে পড়ছিল। ট্রেন থেকে নেমে হুলস্থুল ভিড় ঠেলে স্টেশন চত্বরে এসে পৌঁছালাম। প্ল্যাটফর্মে এসে পকেট থেকে নোকিয়া E5 বের করে মায়ের নম্বরে কল করলাম।
ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে মায়ের হাঁপ ধরা গলায় বলে উঠলেন, "ও রানারে! নেমে গেছিস বাপ? আমার তো চিন্তা হতে হতে বুক শুকিয়ে যাচ্ছিল! কতবার যে তোর আব্বারে কুয়েতে ফোন দিয়ে বলতিছিলাম, ছেলেটা রওনা হলো কি না খোঁজ নাও! রাস্তাঘাটে ভিড় কেমন? কিছু খাইছিস বাপ?"
মায়ের সেই একঘেয়ে চিন্তার ঝুড়ি খুলে বসা কথাগুলো শুনে বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে এলো। আমি রিকশায় বসেই হাসিমুখে বললাম, "সব ঠিক আছে মা, ঈশ্বরদীতে নেমে ডাব খেয়েছিলাম, পেট ভরা আছে। তুমি ভাবিও না, আর আধা ঘণ্টার মধ্যে আমি বাড়ি পৌঁছে যাচ্ছি।"
ওপাশ থেকে মায়ের তৃপ্তির একটা দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল, "আচ্ছা বাপ, সাবধানে আয়। তোর জন্য তোর পছন্দের হাঁসের মাংসটা আর গরম ভাত রান্না কইরা রাখছি। আসার সময় রাস্তার মোড় থেকে মিষ্টি বা অন্য কিছু কেনা লাগবে না, সোজা বাড়ি চলে আয়।"
ফোনটা কেটে নোকিয়া E5-টা পকেটে রেখে স্টেশন পার হয়ে সোজা চলে এলাম নিরালার মোড়ে। নিরালার সামনে বেশ কিছু ব্যাটারিচালিত রিকশা দাঁড়িয়ে ছিল। এক চালকের সাথে দরদাম করে একটা রিকশায় ব্যাগটা তুলে উঠে বসলাম। রিকশাটা যখন নিরালার পিচঢালা পথ ছাড়িয়ে গ্রামের মেঠো রাস্তা আর খালের ধার ঘেঁষে এগোতে লাগল, তখন সাঁঝের খোলা বাতাস সরাসরি এসে গায়ে লাগল। দুপাশের সবুজ ধানক্ষেত আর মেঠো গন্ধ পেরিয়ে রিকশা আমাকে বাড়ির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। পকেটে রাখা নোকিয়া E5-এ কিছু ছবি তুলে রাখলাম এই সুন্দর প্রকৃতির। কানে হেডফোন লাগিয়ে গুরুর "তেরো নদী - সাত সমুদ্দুর" গান ছেড়ে দিয়ে শান্ত হয়ে বসলাম। ঢাকার কড়া নিয়ম আর ট্রেনের সেই নারকীয় জার্নি পেছনে ফেলে অবশেষে নিজের গ্রামে পৌঁছানোর আনন্দটা যে কী, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
আমাদের পরিবারের সদস্য সংখ্যা বাবা, মা, আমি, ভাই আর বোনসহ মোট ৫ জন। আমি সবার বড়—নাম রানা। আমার চেয়ে ছোট ভাই রাজু, সে এখন গ্রামে ক্লাস ফোর এ পড়ে, আর সবার ছোট বোন রুমা, তার বয়স মাত্র দুই বছর। আমার আব্বুরা চার ভাই ও চার বোন, সবাই বিবাহিত। তবে আমি ছোটবেলা থেকে জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই দেখে আসছি আমরা সবাই যার যার মতো আলাদা, একদম একক পরিবার। দাদা-দাদি দুজনই অনেক আগে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। আমার বাবা ছিলেন দাদার ৬ নম্বর সন্তান।
আমরা একই ভিটায় থাকি বটে, তবে চার ভাইয়ের সংসার সম্পূর্ণ আলাদা। উঠানটা একটাই হলেও চাল-ডাল আর হাঁড়ি-পাতিল একদম ভিন্ন। বাড়িতে মোট চারটে আলাদা রান্নাঘর। তবে গ্রামের মানুষগুলো এখনও বেশ সহজ-সরল আর ধার্মিক, আধুনিকতার হাওয়া আমাদের চালচলনে খুব একটা লাগেনি। আমাদের দাদার আমলের মূল বাড়িটি বেড়া আর দোতলা বিশিষ্ট টিনের চাল দিয়ে তৈরি। সেই ভিটার জমিটাই চার ভাগ করে একেকজন দুটো করে ঘর নিয়ে থাকেন।
বাড়ির একদম সামনের দিকে থাকেন বড় জেঠা, তাঁর পরেই মেঝো জেঠা, তারপর সেজো জেঠা, আর সবার শেষে গিয়ে আমাদের বসতি। আমাদের ঘর আর রান্নাঘরটা ঠিক বাড়ির একদম শেষ সীমানায়, প্রায় বাঁশঝাড় আর ঘন জঙ্গলঘেঁষা জায়গায়। পেছনে জঙ্গল বলে দিনের বেলাতেও ওদিকটায় বেশ ঠাণ্ডা একধরনের ছায়া পড়ে থাকে। তবে আব্বার দূরদর্শিতায় আর মায়ের দিনরাত এক করা পরিশ্রমে আমাদের অংশের সুবিধা অনেক। ঘরের সাথেই রয়েছে নিজস্ব চাপকল আর পাকা বাথরুম, ফলে রাতের বেলা বা দরকারের সময় বাড়ির বাইরে অন্ধকার জঙ্গলের দিকে বা অন্যের ভিটায় যেতে হয় না।
আজ আমাদের এই গুছানো রূপটা কিন্তু একদিনে হয়নি। একসময় আব্বার দেশে যা আয় ছিল, তা দিয়ে সংসারের খরচ আর আমাদের পড়ালেখা চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। বাধ্য হয়েই আজ থেকে প্রায় সাত বছর আগে আব্বা কুয়েতের পথ ধরেন। বাবা যখন প্রথম বিদেশে যান, তখন আমার বয়স মাত্র ১১ বছর আর ছোট ভাই রাজুর বয়স ছিল ৪ বছর। সেই থেকে আব্বা টানা পরবাস খাটছেন—প্রতি দুই বছর পর পর মাত্র দুই মাসের ছুটি নিয়ে দেশে আসেন।
বিদেশে আব্বার যেমন হাড়ভাঙা খাটুনি, ঠিক তেমনই দেশে তিনটে সন্তানকে একা হাতে সামলানো আর সংসার গুছিয়ে রাখার পেছনে মায়ের পরিশ্রমটাও কম ছিল না। আব্বা প্রবাসে যাওয়ার পর থেকে মা একাই সংসারের সব ঝড়ঝাপটা সামলেছেন। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত হাঁস-মুরগি পোষা, রান্নাবান্না, ছোট দুটো ভাই-বোনকে সামলানো আর আমার পড়াশোনার দেখভাল—সব মা এক হাতেই করে গেছেন। আব্বা কুয়েত থেকে যে টাকা পাঠাতেন, মা তা তিল তিল করে জমিয়ে আর হিসাব করে খরচ করে সংসারের রূপটাই বদলে দিয়েছেন।
আজ আমাদের ঘরে যেটুকু স্বাচ্ছন্দ্য দেখছেন, তার সবটুকুই আব্বার গায়ের ঘাম রক্ত পানি করা কষ্ট আর মায়ের এই নিঃশব্দ ত্যাগের ফসল। কুয়েত থেকে পাঠানো টাকা দিয়ে মা নিজ তদারকিতে ঘরটা শক্তপোক্ত করিয়েছেন, সাথেই চাপকল আর বাথরুম বসিয়েছেন। এমনকি আমাদের বাড়িতে এখন সরকারি বিদ্যুৎ সংযোগও আছে। গ্রামের দিকে হরহামেশাই লোডশেডিং হয় বলে আব্বা দেশে এসে চালের ওপর একটা সুন্দর সৌর বিদ্যুতের (সোলার প্যানেল) ব্যাটারিসহ সেটআপও বসিয়ে দিয়ে গেছেন, যা মা প্রতিদিন পরম যত্নে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাখেন। ফলে কারেন্ট চলে গেলেও আমাদের ঘরে এমার্জেন্সি লাইট আর ফ্যান ঠিকই চলে, অন্ধকার নেমে আসে না।
আজ এত বছর পর, সেই কুয়েতের রোজগারে কেনা নোকিয়া E5 মোবাইলটা পকেটে নিয়ে যখন নিরালার মোড় থেকে রিকশায় চেপে বাঁশবাগান আর মেঠো পথ ধরে বাড়ির দিকে এগোচ্ছি, তখন মনে হচ্ছিল—আব্বার দূরদেশের রক্ত পানি করা কষ্ট আর মায়ের এই পরম মমতাময় সংসার সামলানোর ত্যাগের কারণেই আজ আমি এমন একটা নিবিড়, আলোকিত ও শান্তির নীড়ে ফিরে যেতে পারছি।
রিকশা থেকে বাড়ির উঠানে পা রাখতেই চারপাশের চেনা ঘ্রাণ আর মেঠো হাওয়া যেন আমাকে জড়িয়ে ধরল। কুয়েতের টাকা আর মায়ের পরিশ্রমে গড়ে তোলা আমাদের সেই ছোট্ট গুছানো ঘরের দাওয়ায় পা দিতেই মা দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। এতদিন পর মায়ের সেই পরম মমতাময় পরশ পেয়ে বুকের ভেতরের সব ক্লান্তি আর ঢাকার কড়া নিয়মের যন্ত্রণা এক লহমায় উধাও হয়ে গেল।
পায়ের শব্দ শুনে ঘর থেকে ছুটে এলো ছোট ভাই রাজু আর পিছু পিছু হেঁটে এলো দুই বছরের ছোট বোন রুমা। রাজু ক্লাস টু-তে পড়ে, আমার এই হঠাৎ বাড়ি ফেরায় তার আনন্দের যেন সীমা নেই! সে একগাল হেসে ব্যাগ ধরে টানাটানি শুরু করে দিল। আর ছোট বোন রুমা প্রথমে একটু লাজুক চোখে দূরে মায়ের শাড়ি ধরে দাঁড়িয়ে তোতলা মুখে চেয়ে রইল—যেন ঢাকা থেকে কোনো নতুন অচেনা মেহমান এসেছে!
হাত-মুখ ধুয়ে রান্নাঘরের পাশে গিয়ে বসতেই মা প্লেটে গরম ভাত আর আমার প্রিয় হাঁসের মাংস বেড়ে দিলেন। কতদিন পর যে এমন পেট পুরে তৃপ্তি নিয়ে খেলাম, তা বলে বোঝানো যাবে না। খাওয়ার সময় পাশে বসে রাজু একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছিল—ঢাকা শহর কেমন, আবাসিক কলেজে কী খেলা হয়, আর তার জন্য কী এনেছি! রাজুর কথা শুনে রুমাও মিষ্টি হেসে তোতলা মুখে কী যেন বলার চেষ্টা করছিল।
খাওয়া-দাওয়া শেষ করে মা বললেন, "বাপ, এবার জেঠা-জেঠীদের সালাম করে আয়। বাড়ি ফিরেছিস, দেখা দিয়ে আসা ভালো।"
মায়ের কথা মতো উঠান পার হয়ে একে একে বড় জেঠা, মেঝো জেঠা আর সেজো জেঠার ঘরে গেলাম। বড় জেঠা মাথায় হাত রেখে দোয়া করে দিলেন, জেঠীরাও খোঁজখবর নিলেন—পড়াশোনা কেমন চলছে, ঢাকার কড়া নিয়মে কোনো কষ্ট হচ্ছে কি না। সবার ঘর ঘুরে, সালাম ঠুকে আর কিছুক্ষণ টুকটাক কথা বলে আবার আমাদের ঘরের দিকে ফিরে এলাম। ঘরে ঢুকে খাটে পা ছড়িয়ে বসতেই রাজু আর রুমা আবার এসে আমাকে ঘিরে ধরল। রুমা সব লজ্জা ভুলে আমার কোলজুড়ে এসে বসল আর রাজু খাটে পা তুলে বসে বায়না ধরল গল্প শোনার।
এবারে বাগ থেকে ওদের জন্যে আমার বন্ধুর নিয়ে আসা সব কিছু এক এক করে খুলে দিলাম। রাজুর জন্যে কয়েকটা জমা, রুমার জন্যেও। আর কিছু সাবান শ্যাম্পু, লোশন। মা বললো " তোর আব্বা ৫০ হাজার টাকা পথাইসে। ২০ হাজার কোরবানির জন্যে, তোর বড় জেঠারে দিয়ে দিসি। সংসারের হবে ১৫ হাজার আর তোদের সবার জন্যে ৫ হাজার করে ঈদের বাজার করতে বলসে।" আমি বললাম "তাইলে আপনের জন্যে?" মা একটা হাসি দিয়া বললো "আরে কুরবানির ঈদে আমি আর কি কিনমু?" আমি "না তাইলে আমিও কিছু কিনুম না", মা আবার হাসি দিয়া বললো "আচ্ছা দেখা যাক।"
সন্ধ্যা নেমে আসতে আমাদের টিনের চালে থাকা সৌর বিদ্যুতের আলোটা পুরো ঘরকে বেশ সুন্দর উজ্জ্বল করে তুলল। পকেট থেকে আব্বার কুয়েত থেকে পাঠানো সেই নোকিয়া E5 সেটটা বের করে নকিয়ার গেমটা চালু করতেই রাজু আর রুমা দুজনই মন্ত্রমুগ্ধের মতো ফোনের রঙিন ডিসপ্লের দিকে চেয়ে রইল।
বাঁশঝাড়ের পাশ থেকে ঠান্ডা বাতাস ঘরে আসছে। আব্বার দূরদেশের কষ্ট আর মায়ের দিনরাত এক করা পরিশ্রমে গড়ে ওঠা এই শান্ত নীড়ে ছোট ভাই-বোনের এমন নিষ্পাপ হাসি দেখে মনে হলো—ঢাকার কড়া নিয়ম আর ট্রেনের সেই নারকীয় জার্নির সব ক্লান্তি যেন মুহূর্তেই ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার হয়ে গেল।
আমি বোনকে কোলে তুলে নিলাম। দু’বছরের রুমা ছোট্ট নরম দুটো হাত দিয়ে আমার গলাটা জড়িয়ে ধরে কাঁধে গালটা ঠেকাল। এতক্ষণ যে অচেনা ভাবটা ছিল, আমার বুকের ওমে এসে সেটা যেন এক নিমেষে গলে জল হয়ে গেল। ওর গা থেকে একটা মিষ্টি ছোট বাচ্চার ঘ্রাণ আসছিল।
আমি খাটে বসে রুমাকে কোলে চেপে ধরে একহাতে পকেট থেকে নোকিয়া E5 ফোনটা বের করলাম। লাল-নীল কোয়ার্টি কিপ্যাডের আলো জ্বলতেই রাজু কাছে সরে এসে আমার উরুতে চড়ে বসল।
"ভাইয়া, এই মোবাইলটা আব্বা পাঠাইছে না? এতে কি গেম আছে?"—রাজুর চোখে যেন কৌতূহলের ফোয়ারা ফুটল।
আমি ফোনের মেনু খুলে স্নেক গেমটা চালু করে রাজুর হাতে দিলাম। ৯ বছরের রাজু একদম মনোযোগ দিয়ে বাটন টিপে সাপটাকে খাবার খাওয়াতে লাগল, আর কোলে বসা রুমা ছোট ছোট আঙুল বাড়িয়ে ফোনের স্ক্রিনটা ছুঁতে গিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল।
বাইরে তখন বাঁশঝাড় বেয়ে সাঁঝের অন্ধকার নেমে এসেছে। কিন্তু আমাদের ঘরে টিনের চালে থাকা সৌর বিদ্যুতের ডাবল টিউবলাইটটা জ্বলতেই চারপাশটা আলোয় ঝলমল করে উঠল। গ্রামের অন্য সব ঘরে কারেন্ট চলে গেলে যখন অন্ধকার বা কুপি বাতি জ্বলত, তখন আব্বার কুয়েত থেকে পাঠানো টাকায় বসানো এই সোলার প্যানেলটার বদৌলতে আমাদের ঘরটা এমন উজ্জ্বল হয়ে থাকত।
মা রান্নাঘর থেকে কাজ শেষ করে ঘরে ঢুকে এই দৃশ্য দেখে মৃদু হেসে বললেন, "তিন ভাই-বোনের মেলবন্ধন তো ভালোই জমেছে! রানা, সারাদিনের ধকলে তুই ক্লান্ত, ভাই-বোনকে নিয়ে বেশি রাত করিস নে, তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়িস।"
ছোট দুটি ভাই-বোনের এই অনাবিল আনন্দ আর সোলারের আলোয় আলোকিত শান্ত ঘরটার দিকে তাকিয়ে আমার মনটা এক গভীর তৃপ্তিতে ভরে গেল। মনে হলো—ঢাকার বন্দিশালা, ট্রেনের সেই দুর্বিসহ ধকল আর সারা রাস্তার সব ক্লান্তি যেন এই দুটি নিষ্পাপ মুখ আর ঘরের উষ্ণ আলোয় হারিয়ে গেল।
রাতে আমরা সবাই এক খাটেই ঘুমালাম। মা দেখি একটু পাশ ফিরে বোনকে বুকের দুধ দিতেসে। মার শরীরটা বেশ হইসে। আমার মনে পড়ে গেল আমার তখন অল্প বয়স, আব্বা কুয়েতে কোলে গেছে মাত্র। তখনও রাজু মার দুধ খায়। এক রাতে আমি বায়না ধরি আমিও দুধ খামু। মা হাসতে হাসতে মরে গেলো। কিন্তু আমি ছিলাম নাছোড়... কান্নাকাটি করতে লাগলাম।

