Thread Rating:
  • 0 Vote(s) - 0 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5

দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin)
#21

২১

ফ্রেশ হয়ে, দাঁত মেজে আমি যখন ড্রয়িংরুমে এলাম, তখন ফ্ল্যাটটা একদম নিস্তব্ধ। আমি কিচেনে গেলাম। ব্যাচেলরদের একটা মহৎ গুণ হলো, তারা যেকোনো কিচেনে গিয়েই কিছু না কিছু একটা বানিয়ে ফেলতে পারে। আমি দেখলাম ফ্রিজে ডিম আছে। আমি চুলায় পানি বসিয়ে চারটা ডিম সেদ্ধ করতে দিলাম। তারপর চায়ের পানি বসালাম। ডিম সেদ্ধ হওয়াটা এক ধরনের ফিলোসফিক্যাল প্রসেস। গরম পানিতে ডিমগুলো যখন লাফাতে থাকে, তখন মনে হয় মানুষের জীবনটাও ওই ডিমের মতোই। পরিস্থিতি যত গরম হয়, মানুষ ভেতর থেকে তত শক্ত হতে শুরু করে। আমি দুটো ডিম ছিলে, একটু লবণ আর গোলমরিচ দিয়ে গিলে ফেললাম। সাথে এক মগ কড়া ব্ল্যাক কফি। আনিকার জন্য দুটো ডিম সেদ্ধ করে খোলস সমেত একটা বাটিতে রেখে দিলাম, যাতে গরম থাকে। খাওয়া শেষ করে আমি গেস্ট রুমে গেলাম।

গতকাল আড়ং থেকে আনিকা আমার জন্য যে শার্টগুলো কিনেছিলেন, সেখান থেকে একটা ছাই রঙের, খুব সুন্দর ফেব্রিকের সেমি-ফর্মাল শার্ট বের করলাম। সাথে একটা কালো ট্রাউজার। কাপড়গুলো গায়ে জড়ানোর পর আমি আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। অবিশ্বাস্য! কাপড়ে যে মানুষের ব্যক্তিত্ব এতটা পাল্টে যায়, সেটা আমি আজ বুঝলাম। আড়াই হাজার টাকা দামের এই শার্টটা আমার গায়ের সাথে এমনভাবে ফিটিং হয়েছে যে, আমাকে আর মিরপুরের মেসের রাশেদ মনে হচ্ছে না। আমাকে দেখে মনে হচ্ছে কোনো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির এক্সিকিউটিভ। আনিকা নাওহারের চয়েস আছে বলতে হবে!

আমি মানিব্যাগ, ফোন আর চশমা নিয়ে রেডি হলাম। ঠিক সোয়া নয়টা বাজে। আমি ফ্ল্যাটের মেইন দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। দরজার হাতল ধরেছি, জাস্ট ঘুরিয়ে বেরিয়ে যাব, ঠিক সেই মুহূর্তে মাস্টার বেডরুমের ভেতর থেকে একটা ঘুম-জড়ানো, কিন্তু খুব স্পষ্ট ডাক এল।

"রাশেদ... অফিসে যাচ্ছ?"

আমি থমকে দাঁড়ালাম। দরজার হাতল ছেড়ে দিলাম।

আমি ধীর পায়ে আবার করিডোর ধরে মাস্টার বেডরুমের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। দরজা খোলাই ছিল। আনিকা বিছানায় উঠে বসেছেন। উনার পরনে উনার সেই মেরুন রঙের স্লিপিং গাউন। গাউনটার গলার দিকটা বেশ ঢিলা হয়ে আছে, যার ভেতর দিয়ে উনার ফর্সা বক্ষদেশের একাংশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। চুলগুলো চরম এলোমেলো। চোখ কচলাচ্ছেন। "হ্যাঁ, আপনি উঠেছেন?" আমি দরজার ফ্রেম ধরে দাঁড়িয়ে বললাম। "আমি তো ভাবলাম আপনি ঘুমাচ্ছেন, তাই আর ডাকিনি। কিচেনে আপনার জন্য দুটো ডিম সেদ্ধ করে রেখেছি। চা বানিয়ে নেবেন। আমি যাই, অফিসে লেট হয়ে যাচ্ছে।" আমি কথাটা বলে আবার ঘোরার উপক্রম করলাম।

"দাঁড়াও!" আনিকা হঠাৎ একটু তীক্ষ্ণ গলায় বললেন। আমি দাঁড়ালাম। "কী হলো?"

আনিকা উনার ঘুম-ঘুম চোখ দুটো একটু বড় করে আমার দিকে তাকালেন। উনার দৃষ্টি আমার পা থেকে শুরু করে মাথা পর্যন্ত একবার স্ক্যান করল। "নতুন শার্ট কেমন লাগছে, সেটা আমাকে না দেখিয়েই তুমি চলে যাচ্ছ?" আনিকা একটু অভিমান আর জেদ মেশানো গলায় বললেন। "আমি এত শখ করে কিনে দিলাম, আর তুমি আমাকে একটা প্রিভিউ না দিয়েই দরজার বাইরে চলে যাচ্ছিলে?" 

আমি একটু হাসলাম। "এই তো, দেখলেন তো! খুব সুন্দর ফিটিং হয়েছে। একদম পারফেক্ট। আপনাকে থ্যাংকস। এবার আমি যাই?"
"উঁহু। এত দূর থেকে দেখা যায় নাকি? আমি তো চোখে ঘুম নিয়ে ঘোলা ঘোলা দেখছি। কাছে আসো।"

আমি আমার জুতো দুটো খুললাম। খালি পায়ে কার্পেটের ওপর দিয়ে হেঁটে বিছানার একদম কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। "এই যে, দেখুন," আমি দুই হাত একটু দুই পাশে ছড়িয়ে দিয়ে একটা মডেলিং টাইপ পোজ দিলাম। "খুশি?" আনিকা বিছানার কিনারে বসে ছিলেন। উনি মুখটা একটু নিচু করে আমার শার্টের বোতামগুলোর দিকে তাকালেন। উনার মুখে একটা খুব অদ্ভুত, দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই, আনিকা হঠাৎ বিদ্যুৎগতিতে উনার ডান হাতটা বাড়িয়ে আমার শার্টের কলারের ঠিক নিচটায় শক্ত করে খামচে ধরলেন।

"অ্যাই! কী করছেন..."

আমার বাক্যটা শেষ হওয়ার আগেই উনি এমন একটা প্রবল শক্তিতে আমাকে নিজের দিকে টান মারলেন যে, আমি আমার ব্যালেন্স ধরে রাখতে পারলাম না। আমি আক্ষরিক অর্থেই শূন্যে ভেসে সোজা বিছানার ওপর, আনিকার গায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। আমি ব্যালেন্স সামলাতে সামলাতে দেখলাম, আনিকা আমাকে উনার নিচে ফেলে দিয়েছেন। উনি এখন আমার বুকের ওপর চেপে বসে আছেন। উনার মেরুন গাউনের ভেতর দিয়ে উনার সেই ভরাট, মোহনীয় শরীরটা আমার শার্ট পরা বুকের ওপর সরাসরি চাপ দিচ্ছে। উনার চুলগুলো আমার মুখের ওপর এসে পড়েছে। "আনিকা... এ কী পাগলামি!অফিস যেতে হবে " আমি অবাক হয়ে, প্রায় আর্তনাদ করে উঠলাম।

আনিকা উনার মুখটা আমার মুখের একদম কাছে নিয়ে এলেন। উনার নিঃশ্বাসের উষ্ণতা আমার ঠোঁটে এসে লাগছে। উনার সেই বাদামি চোখ দুটো এখন আর ঘুম-জড়ানো নেই, সেখানে জ্বলছে এক বন্য, সর্বগ্রাসী কামনার আগুন। "কাল রাতের পাওনা আদায় না করেই অফিসে যাচ্ছ সোনা?" আনিকা ফিসফিস করে, একটা সাপের মতো হিসহিস করে বললেন। "তা তো হবে না। এই ফ্ল্যাট থেকে আমার পাওনা না মিটিয়ে তুমি এক পা-ও বাইরে ফেলতে পারবে না।"

"কাল রাতের পাওনা মানে? কাল রাতে তো আমরা..."

আমার কথা শেষ হওয়ার কোনো সুযোগই আনিকা দিলেন না। উনি উনার দুই হাত দিয়ে আমার মাথাটা শক্ত করে ধরলেন এবং উনার ঠোঁট দুটো আমার ঠোঁটের ওপর একটা প্রচণ্ড, বন্য আক্রোশে চেপে ধরলেন। আমি মুহূর্তের মধ্যে যেন একটা টর্নেডোর ভেতরে ঢুকে পড়লাম। আনিকা উনার দাঁত দিয়ে আমার নিচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরলেন, তারপর উনার জিভটা একটা তপ্ত শলার মতো আমার মুখের ভেতর ঢুকিয়ে দিলেন। আমি চমকে গিয়েছিলাম, কিন্তু আমার ভেতরের পুরুষালি রিফ্লেক্স আমাকে সাথে সাথে রেসপন্স করতে বাধ্য করল। আমি আমার দুই হাত দিয়ে উনার কোমরটা জড়িয়ে ধরলাম। উনার জিভের সাথে আমার জিভের এক আদিম, বন্য যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। উনার মুখের ভেতরের লালার মিষ্টতা, উনার সকালবেলার ঘুম-ভাঙা নিঃশ্বাসের গন্ধ আমাকে এক চরম উন্মাদনার দিকে ঠেলে দিল।

আমি অফিসে যাওয়ার জন্য যে ফিটফাট বাবুটি হয়েছিলাম, তা নিমেষের মধ্যে তছনছ হয়ে গেল। আনিকা আমাকে চুমু খাচ্ছেন, আর উনার দুই হাত পাগলের মতো আমার শরীরের ওপর দিয়ে ঘুরছে। উনি চুমুর মাঝখানেই হঠাৎ আমার শার্টের কলার ধরে একটা হ্যাঁচকা টান দিলেন। "কট... কট... কট..."

আড়াই হাজার টাকা দামের আড়ংয়ের শার্টের ওপরের দিকের তিনটা বোতাম ছিঁড়ে গিয়ে বিছানার এদিক-ওদিক ছিটকে পড়ল। আমি আঁতকে উঠে বললাম, "আনিকা! শার্টটা তো ছিঁড়লে"

"ছিঁড়ুক! চুলোয় যাক তোমার শার্ট!" আনিকা একটা বন্য গোঙানি দিয়ে আমার কানের লতি কামড়ে ধরলেন। কথা বলতে বলতেই আমার শার্টের বাকি বোতামগুলো একপ্রকার টেনে-হিঁচড়ে খুলে ফেললেন। আমার বুকটা উন্মুক্ত হয়ে গেল। উনি উনার মুখটা আমার ঠোঁট থেকে সরিয়ে নিয়ে আমার গলা, আমার উন্মুক্ত বুক, এবং আমার কলারবোনের ওপর পাগলের মতো চুমু খেতে শুরু করলেন। উনার ঠোঁটের স্পর্শ, উনার দাঁতের হালকা কামড় আমার শরীরের প্রতিটি স্নায়ুতে একটা ইলেকট্রিক শক তৈরি করছিল। আমি আমার হাত দিয়ে উনার মেরুন গাউনটার ফিতে ধরে টান দিলাম।

গাউনটা উনার ফর্সা কাঁধ থেকে খসে পড়ল। আনিকা এক সেকেন্ডের জন্য আমার ওপর থেকে উঠে বসলেন। উনি উনার গাউনটা শরীর থেকে সম্পূর্ণ খুলে বিছানার নিচে ছুঁড়ে ফেললেন। সকালের নরম আলোয় উনার সেই সম্পূর্ণ নগ্ন, নিখুঁত, ছত্রিশ বছর বয়সী শরীরটা আমার চোখের সামনে আরেকবার উন্মোচিত হলো। উনার সেই ভরাট, উদ্ধত স্তনযুগল এখন আমার মুখের ঠিক ওপরে। উনার নাভির গভীরতা আর উনার মসৃণ, ফর্সা উরুগুলো আমাকে যেন ডাকছে। আনিকা আবার আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। এবার আমি আর প্যাসিভ রইলাম না। আমি উনাকে জড়িয়ে ধরে বিছানায় উল্টে দিলাম। এখন উনি নিচে, আর আমি উনার ওপরে। আমি আমার মুখটা উনার গলার ওপর নামিয়ে আনলাম। আমি উনার ঘাড়ে, উনার থুতনিতে, উনার গলার সেই ফর্সা ভাঁজে আমার জিভ দিয়ে লেহন করতে শুরু করলাম। আনিকা দুই হাত দিয়ে আমার পিঠ খামচে ধরেছেন। উনার নখগুলো আমার চামড়ায় বসে যাচ্ছে।

"রাশেদ... উমমম... আমাকে পাগল করে দাও... আমাকে ছিঁড়ে ফেলো..." আনিকা প্রলাপ বকতে শুরু করলেন। আমি উনার ঠোঁটে আবার একটা দীর্ঘ, শ্বাসরুদ্ধকর চুমু খেলাম। এই চুমুর গভীরতা এতই তীব্র ছিল যে আমার মনে হলো আমি উনার আত্মাকে শুষে নিচ্ছি। আমার হাত চলে গেল উনার সেই ভরাট বক্ষদেশের ওপর। আমি আমার হাতের তালু দিয়ে উনার স্তনদুটোকে সজোরে চেপে ধরলাম। উনার বক্ষচূড়াগুলো উত্তেজনায় পাথরের মতো শক্ত হয়ে আমার হাতের তালুতে ঘষা খাচ্ছিল।

আনিকা আমার শার্টটা যেটা অর্ধেক খোলা অবস্থায় আমার গায়ে ঝুলছিল, সেটাকে আমার শরীর থেকে একপ্রকার টেনে খুলে ফেলে দিলেন। তারপর উনার হাত চলে গেল আমার প্যান্টের বেল্টের ওপর। আনিকা চরম অস্থিরতার সাথে আমার বেল্টটা আনলক করে জিপারটা নামিয়ে দিলেন।

"তুমি খুব বেশি কাপড় পরে আছো রাশেদ... আমি এগুলো সহ্য করতে পারছি না..." আনিকা হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন। উনি নিজেই আমার প্যান্ট আর আন্ডারওয়্যার ধরে এক টানে আমার হাঁটু পর্যন্ত নামিয়ে দিলেন। আমি পা ছুঁড়ে সেগুলো শরীর থেকে লাথি মেরে ফেলে দিলাম।

এবার আমরা দুজনই সম্পূর্ণ নগ্ন।  আমি আনিকার পুরো শরীরে আমার ঠোঁট আর জিভের রাজত্ব কায়েম করলাম। আমি উনার স্তনের বোঁটাগুলো আমার ঠোঁটের ভেতর নিয়ে বন্যভাবে চুষতে শুরু করলাম। আনিকা বিছানায় পিঠ বাঁকিয়ে এমনভাবে ছটফট করতে লাগলেন যেন উনার শরীরে কেউ আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। "আহহহ... রাশেদ... ইসসস... আর পারছি না..." আনিকার গলা দিয়ে অনর্গল গোঙানি বের হতে লাগল।

আমি উনার স্তন থেকে নেমে উনার সমতল পেটে, উনার নাভিতে আমার জিভ বোলাতে লাগলাম। উনার শরীরের সেই শ্যাম্পু আর ঘামের গন্ধটা আমার মস্তিষ্কে একটা ড্রাগের মতো কাজ করছিল। আনিকা আমাকে আর নিচে নামতে দিলেন না। উনি আমার দুই কাঁধ ধরে আমাকে ওপরে টেনে তুললেন। "আমাকে চুমু খাও... আমার ঠোঁটে চুমু খাও..." উনি পাগলের মতো বলতে লাগলেন। আমি আবার উনার ঠোঁটে ফিরে গেলাম। উনার মুখটা আমি দুই হাতে আজলা করে ধরে উনার ঠোঁট, উনার গাল, উনার চোখ— সব জায়গায় অজস্র চুমু দিতে লাগলাম। আনিকাও উনার দুই হাত দিয়ে আমার মুখটা টেনে ধরে আমার পুরো মুখে, আমার কপালে, আমার গালে পাগলের মতো চুমু খেতে লাগলেন।

আমাদের এই চুমু খাওয়ার কোনো ব্যাকরণ ছিল না, কোনো ছন্দ ছিল না। এটা ছিল শুধু একটা আক্রোশ, একটা না-পাওয়াকে পাওয়ার বন্য উল্লাস। উনার ঠোঁট বেয়ে আমার গলার কাছে নেমে এল। উনি আমার গলার রগ, আমার বুকের লোমগুলোর ওপর উনার জিভ বুলিয়ে দিতে লাগলেন। উনার ঠোঁটের সেই উষ্ণ স্পর্শ আমার শরীরের রোমকূপগুলোকে জাগিয়ে তুলছিল। উনি উনার দুই হাত দিয়ে আমার পিঠ, আমার কোমর এবং আমার নিতম্বের ওপর দিয়ে একটা জাদুকরী সুড়সুড়ি দিয়ে যাচ্ছিলেন। আমার পুরুষাঙ্গ তখন চরম উত্তেজনায় কাঁপছে। ওটা আনিকার ফর্সা উরুর সাথে ঘষা খাচ্ছে। আমি উনার শরীরটাকে আমার শরীরের নিচে পুরোপুরি পিষ্ট করে ফেললাম। আমার বুকের সাথে উনার বুক, আমার পেটের সাথে উনার পেট। স্কিন-টু-স্কিন কন্টাক্ট। চামড়ার সাথে চামড়ার এই ঘর্ষণে যে কী পরিমাণ তাপ উৎপন্ন হচ্ছিল, তা শুধু আমরা দুজনই অনুভব করতে পারছিলাম।

আমি উনার ঠোঁটে আবার একটা গভীর চুমু খেলাম। এই চুমুর মধ্যে আমরা যেন একে অপরের শ্বাস-প্রশ্বাস বিনিময় করছিলাম। উনার জিভ আমার জিভের সাথে জড়িয়ে একটা অদ্ভুত নৃত্য করছিল। "রাশেদ... আমার ভেতরে এসো... প্লিজ..." আনিকা আমার ঠোঁটের সাথে ঠোঁট লাগিয়েই ফিসফিস করে বললেন। উনার পা দুটো আমার কোমর পেঁচিয়ে ধরল। আমি উনার সেই মধুভাণ্ডারের প্রবেশপথে আমার অস্তিত্বটাকে স্থাপন করলাম। উনার জায়গাটা কামনার রসে ভিজে পিচ্ছিল হয়ে ছিল। আমি এক প্রবল ধাক্কায় উনার শরীরের একদম গভীরে প্রবেশ করলাম। "আহহহহহ!" আনিকা একটা তীক্ষ্ণ, দীর্ঘ চিৎকার দিয়ে আমার পিঠ খামচে ধরলেন।

আমি উনার ঠোঁটে আবার চুমু খেলাম, যাতে উনার চিৎকারটা আমার মুখের ভেতরেই হারিয়ে যায়। আমি উনার ভেতরে আমার বন্য, আদিম ধাক্কাগুলো শুরু করলাম। আমাদের শরীরের ঘর্ষণে বিছানাটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে কাঁপতে শুরু করল। সকালের আলোয় আনিকার সেই ঘর্মাক্ত, নগ্ন শরীরটা আমার নিচে আছড়ে পড়ছে। উনার স্তনদুটো বুনো ছন্দে দুলছে। আমি আমার প্রতিটা ধাক্কার সাথে সাথে উনার ঠোঁটে, উনার ঘাড়ে, উনার বুকে চুমু খেয়ে যাচ্ছিলাম। আনিকা আমাকে উনার সমস্ত সত্তা দিয়ে জড়িয়ে ধরেছিলেন। উনার ভেতরের পেশিগুলো আমাকে আষ্টেপৃষ্টে চেপে ধরেছিল।

এই অনন্ত চুমু আর বন্য ঘর্ষণের মাঝে আমার মনে হলো, পৃথিবীটা যদি এখন ধ্বংসও হয়ে যায়, আমার আর কোনো আফসোস থাকবে না। আমার পঁচিশ হাজার টাকার চাকরি চুলোয় যাক। এহসান ভাইয়ের অ্যাসাইনমেন্ট চুলোয় যাক। আমার মিরপুরের মেস আর দশ হাজার টাকার ডিকশনারি সব গোল্লায় যাক। আমার পৃথিবী এখন এই বিছানা, এই শরীর এবং এই অনন্ত চুম্বনের ভেতরেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। আমি আনিকাকে চুমু খেতে লাগলাম। চুমু চলতেই লাগল। যেন অনন্তকাল ধরে আমরা একে অপরকে কেবল চুমুই খেয়ে যাব। পুরুষ মানুষের ইগো জিনিসটা খুব অদ্ভুত। সমাজ আমাদের শিখিয়েছে, বিছানায় পুরুষই হবে রাজা। পুরুষই সব উদ্যোগ নেবে, পুরুষই নিয়ন্ত্রণ করবে, আর নারী হবে বশংবদ এক সমর্পিত সত্তা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একজন বুদ্ধিমতী এবং আত্মবিশ্বাসী নারী যখন এই হাজার বছরের প্রাচীন সমীকরণটা এক ঝটকায় উল্টে দেন, তখন পুরুষের সেই রাজকীয় ইগো একটা অসহায়, সুতো-কাটা ঘুড়ির মতো মুখ থুবড়ে পড়ে। এবং আশ্চর্যের বিষয় হলো, পুরুষ সেই পতনটা চরমভাবে উপভোগ করে।

আমাদের সেই দীর্ঘ, অন্তহীন, এবং বন্য চুম্বনের পর্ব একসময় শেষ হলো। আমার ফুসফুস তখন অক্সিজেনের জন্য হাহাকার করছে। আমি হাঁপাচ্ছি। হঠাৎ আনিকা আমাকে খুব হালকা একটা ধাক্কা দিলেন। উনার গায়ে অসম্ভব শক্তি না থাকলেও, আমার তখন কোনো প্রতিরোধ করার ক্ষমতাই ছিল না। আমি একটা আছাড়-খাওয়া গাছের মতো বিছানায় চিৎ হয়ে পড়ে গেলাম। আনিকা আমার ওপর উঠে বসলেন। উনার সেই এলোমেলো চুল, ঘামে ভেজা ফর্সা শরীর আর চোখেমুখে এক অদ্ভুত, খেলাুড়ে এবং শিকারি দৃষ্টি। উনি এখন পুরোপুরি চালকের আসনে। আমি কেবল একজন অসহায় যাত্রী, যার গন্তব্য উনার মর্জিমাফিক নির্ধারিত হবে।

উনি আমার বুকের ওপর দুই হাত রেখে খুব ধীরে নিচে নামতে শুরু করলেন। উনার ভেজা, উষ্ণ ঠোঁট আমার গলা থেকে শুরু করে নিচে নামতে লাগল। আমার কলারবোনের খাঁজ, আমার বুকের পেশি, এবং পেটের সমতল অংশের ওপর দিয়ে উনার ঠোঁট আর জিভের এক জাদুকরী, সুড়সুড়িময় পদযাত্রা চলল। উনার চুলগুলো আমার শরীরের ওপর একটা রেশমি চাদরের মতো বুলিয়ে যাচ্ছিল। উনার প্রতিটি চুমু, প্রতিটি আলতো কামড় আমার শরীরের রোমকূপগুলোকে যেন বিদ্যুতের শকের মতো জাগিয়ে দিচ্ছিল।

আমি চোখ বন্ধ করে বিছানার চাদর খামচে ধরে রইলাম। উনার ঠোঁট আমার নাভির কাছে এসে কিছুক্ষণ খেলা করল। তারপর উনি আরও নিচে নামলেন। উনার সেই উষ্ণ, পেলব মুখমণ্ডল এখন আমার শরীরের সেই চরম উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুর ঠিক ওপরে। আমি বুঝতে পারলাম, উনি এখন কী করতে যাচ্ছেন। আমার পুরো শরীরটা ধনুকের মতো টানটান হয়ে গেল। এরপর শুরু হলো সেই অভাবনীয়, ঐশ্বরিক মুহূর্ত। আনিকা উনার নরম ঠোঁট আর জিভ দিয়ে আমার পৌরুষকে এমন এক নিপুণ এবং বন্য আদরে বরণ করে নিলেন, যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো কোনো শব্দ আমার ডিকশনারিতে নেই। উনার লেহনের ভঙ্গি, উনার জিভের উষ্ণতা আর উনার শ্বাসের ওঠানামা আমাকে আক্ষরিক অর্থেই মহাশূন্যে ভাসিয়ে দিল। আমি একজন অনুবাদক হিসেবে সবসময় মনে করতাম, পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো ভাষা। কিন্তু আজ বুঝলাম, জিভের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যবহার কথা বলায় নয়, বরং এমন এক আদিম নীরবতায়, যা মানুষের আত্মাকে শরীর থেকে আলাদা করে দেয়। আমি উত্তেজনায় ছটফট করতে লাগলাম। আমার মুখ দিয়ে অস্ফুট গোঙানি বের হতে লাগল।

"আনিকা... আহহহ... উমমম..."

আমি খাদের একদম কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছি। আমার মনে হচ্ছে, আর কয়েক সেকেন্ড। তারপরই আমার শরীরের সমস্ত জমানো লাভা আগ্নেয়গিরির মুখ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসবে। কিন্তু...

মহিলাদের সাইকোলজি আসলে কোন বিধাতা তৈরি করেছেন, সেটা একটা গবেষণার বিষয়। তারা জানে ঠিক কোন মুহূর্তে সুতোয় টান দিলে পুরুষ নামক ঘুড়িটা আকাশ থেকে সোজা মাটিতে এসে পড়বে। ঠিক যখন আমি চরম পরিণতির এক চুল দূরত্বে, আনিকা হঠাৎ করে উনার মুখটা সরিয়ে নিলেন। আমার শরীরের ভেতর দিয়ে যেন একটা সাইক্লোন বয়ে গেল। একশো মাইল বেগে চলা একটা গাড়িতে ইমার্জেন্সি ব্রেক কষলে যা হয়, আমার ঠিক সেই অবস্থা হলো। আমি ধড়ফড় করে চোখ মেলে তাকালাম।

আনিকা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছেন। উনার ঠোঁটের কোণে সেই চেনা, ঘাতক, এবং রহস্যময় হাসি। "আজ আবার সিনেমা হলের মতো তোমাকে শাস্তি দেব," আনিকা খুব শান্ত, ফিসফিস করা গলায় বললেন। আমার বুকের ভেতর একটা হাহাকার তৈরি হলো। সিনেমা হলের সেই 'ব্লু বলস'-এর তীব্র যন্ত্রণার কথা মনে পড়তেই আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। "কী বলছেন!" আমি প্রায় আর্তনাদ করে উঠলাম। "আজকেও মাঝরাস্তায় ছেড়ে দেবেন? এত নিষ্ঠুর কী করে হন আপনি? আমি তো মরে যাব আনিকা!"

আনিকা উনার ডান হাতের তর্জনী দিয়ে আমার বুকের ওপর একটা অদৃশ্য নকশা আঁকতে আঁকতে বললেন, "নিষ্ঠুর হচ্ছি না তো। আমি তোমাকে সুখের স্বর্গে নিয়ে যেতে রাজি আছি। কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে।" শর্ত! এই চরম মুহূর্তে এসে শর্ত! এই নারী কি আইটি ফার্মের সিইও নাকি কোনো ডিটেকটিভ এজেন্সির বস?

"কী শর্ত? বলুন, আমি সব শর্ত মানতে রাজি আছি। প্লিজ আনিকা..." আমি একটা অসহায়, তৃষ্ণার্ত পশুর মতো বললাম। আনিকা উনার মুখটা আমার মুখের খুব কাছে নিয়ে এলেন। উনার চোখের দৃষ্টি এখন একদম স্থির। "তোমাকে আজ থেকে আমায় 'তুমি' করে বলতে হবে। এই মুহূর্তে বলতে হবে। বলো 'তুমি'।"

আমি থমকে গেলাম। 'আপনি' থেকে 'তুমি'। আমাদের মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজে কাউকে 'আপনি' থেকে 'তুমি' করে বলাটা একটা বিশাল মনস্তাত্ত্বিক ধাপ। আমি উনাকে গত এক সপ্তাহ ধরে 'আপনি' বলে আসছি। এই 'আপনি' সম্বোধনের ভেতর একটা সম্মান ছিল, একটা দূরত্ব ছিল, একটা মেকি ভদ্রতা ছিল। আনিকা সেই দেয়ালটা পুরোপুরি ভেঙে ফেলতে চাইছেন। উনি চাইছেন, আমি যেন উনাকে আমার একদম নিজস্ব, একান্ত সম্পত্তি হিসেবে স্বীকার করে নিই।

কিন্তু আমার মতো মানুষের জিব এত দ্রুত বদলায় না। অভ্যাসের দাসত্ব বড়ই কঠিন। "আরে, এভাবে কি আচমকা 'তুমি' আসে বলেন?" আমি আমতা আমতা করে বললাম। "একটা অভ্যাসের ব্যাপার আছে তো!" আনিকা উনার ভ্রু জোড়া ওপরের দিকে তুললেন। "বলেন নয়, বলো। বলো!" উনার গলায় এবার একটা স্পষ্ট, আদেশসূচক জেদ।

"প্লিজ আনিকা... কাজটা শেষ করেন। আমি পরে প্র্যাকটিস করে নেব," আমি করুণ সুরে বললাম। আমার শরীরের ভেতরের ওই অসমাপ্ত উত্তেজনা আমাকে পাগল করে দিচ্ছিল। "উঁহু। করব না," আনিকা খুব অবলীলায় মাথা নেড়ে দিলেন। "আগে বলো। তারপর সব হবে।"

আমি বুঝতে পারলাম, এই নারী কোনোভাবেই ছাড় দেবেন না। উনি আমার ইগো, আমার ভদ্রতা, আমার সমস্ত অভ্যাসকে আজ এই বিছানায় কবর দিয়ে তবেই ছাড়বেন। এবং সত্যি কথা বলতে কী, উনার এই জেদের সামনে আমার নিজেরও আর প্রতিরোধ করার কোনো ইচ্ছাশক্তি অবশিষ্ট ছিল না। আমার শরীরের দাবি তখন আমার সামাজিক অভ্যাসের চেয়ে কয়েক হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী।

আমি একটা গভীর শ্বাস নিলাম। উনার চোখের দিকে সরাসরি তাকালাম। আমার কণ্ঠস্বর খাদে নামিয়ে, সমস্ত জড়তা ঝেড়ে ফেলে আমি উচ্চারণ করলাম— "শোনা আমার... প্লিজ, কাজটা শেষ করো।"

'শোনা আমার' এবং 'করো'। এই দুটো শব্দের ভেতর যে কী পরিমাণ জাদু লুকিয়ে ছিল, সেটা আমি পরের কয়েক সেকেন্ডে বুঝতে পারলাম। আমার মুখে 'তুমি' সম্বোধন এবং ওই অধিকার-মাখানো ডাকটা শোনার সাথে সাথেই আনিকার চোখের দৃষ্টি পুরোপুরি বদলে গেল। উনার ভেতরের সেই দর্পিত, জেদি নারীটা মুহূর্তের মধ্যে যেন গলে জল হয়ে গেল। উনার চোখে এক অদ্ভুত, বন্য তৃপ্তি ফুটে উঠল।

উনি আর এক সেকেন্ডও দেরি করলেন না। উনি একটা বুনো গোঙানি দিয়ে আবার আমার সেই চরম সংবেদনশীল কেন্দ্রবিন্দুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। উনার লেহন এবার আগের চেয়েও হাজার গুণ বেশি তীব্র, বেশি আদিম এবং বেশি পাগল-করা। উনি যেন আমাকে পুরোপুরি নিঃশেষ করে দিতে চাইছিলেন। উনার ঠোঁট, উনার জিভ, উনার শ্বাসের উত্তাপ আমাকে মহাশূন্যের এমন এক জায়গায় নিয়ে গেল, যেখানে পৃথিবীর কোনো গ্র্যাভিটি কাজ করে না।

"আনিকা... আহহহহ... তুমি... ইসসস..." আমি এবার অবলীলায় উনাকে 'তুমি' বলে প্রলাপ বকতে শুরু করলাম।

আমার পুরো শরীর ধনুকের মতো বেঁকে গেল। আমার হাতের মুঠি বিছানার চাদরটাকে ছিঁড়ে ফেলার উপক্রম করল। আমি বুঝতে পারলাম, বাঁধ ভেঙে গেছে। এবং সেই মুহূর্তেই, এক প্রচণ্ড, মহাজাগতিক বিস্ফোরণের মতো আমার শরীরের সমস্ত জমানো উত্তেজনা, সমস্ত না-পাওয়া, সমস্ত তৃষ্ণা একটা উষ্ণ স্রোত হয়ে প্রবল বেগে ছিটকে বেরিয়ে এল। আমার মুখ দিয়ে একটা দীর্ঘ, স্বস্তির চিৎকার বেরিয়ে এল। আমি অনুভব করলাম, আমার সেই চরম স্খলনের তরল উষ্ণতা আনিকার মুখে, উনার গালে গিয়ে আছড়ে পড়ছে। উনি বিন্দুমাত্র সরে গেলেন না, বিন্দুমাত্র বিরক্তি প্রকাশ করলেন না। উনি বরং আমার সেই চরম তৃপ্তির মুহূর্তটাকে উনার সমস্ত সত্তা দিয়ে গ্রহণ করলেন। কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমার মস্তিষ্ক পুরোপুরি শূন্য হয়ে গেল। কোনো চিন্তা নেই, কোনো দর্শন নেই। কেবল এক পরম, অপার্থিব প্রশান্তি। আমি নিস্তেজ হয়ে বিছানায় পড়ে রইলাম। আমার শ্বাস-প্রশ্বাস তখনো স্বাভাবিক হয়নি।

আনিকা আমার ওপর থেকে মুখ তুললেন। উনার গালে, উনার ঠোঁটের কোণে আমার সেই চূড়ান্ত আদিমতার চিহ্ন লেগে আছে। উনি একটা খুব মিষ্টি, দুষ্টু এবং বিজয়ী হাসি দিয়ে বললেন, "বাপরে! একদম জলের কল ছেড়ে দিয়েছ দেখি!" আমি লজ্জায় এবং ক্লান্তিতে চোখ বন্ধ করে ফেললাম।
Reply
#22

২২

আনিকা বিছানা থেকে নামলেন। ড্রেসিং টেবিলের পাশ থেকে টিস্যু পেপারের বক্সটা হাতে নিলেন। কয়েকটা টিস্যু টেনে নিয়ে উনি খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উনার গাল এবং ঠোঁট পরিষ্কার করলেন। তারপর বাথরুমের দিকে এগিয়ে গিয়ে দরজার পাশের ডাস্টবিনে টিস্যুগুলো ফেলে দিলেন এবং মুখে জমে থাকা বাকি লালাটুকু থুতু করে ফেলে দিয়ে বেসিনে পানি দিয়ে মুখটা ধুয়ে নিলেন। মুখ মুছে আনিকা আবার বিছানায় ফিরে এলেন।
 
আমি তখনো একটা মৃত মাছের মতো বিছানায় চিৎ হয়ে পড়ে আছি। আমার শরীরের সমস্ত শক্তি যেন কেউ শুষে নিয়েছে। আনিকা বিছানায় উঠে আমার পাশে এসে বসলেন। উনি উনার ফর্সা, মসৃণ হাতটা আমার পেটের ওপর রাখলেন। তারপর উনার দৃষ্টি নেমে গেল আমার শরীরের নিচের দিকে। একটু আগে যে জিনিসটা কুতুব মিনারের মতো আকাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে ছিল, সেটা এখন চরম স্খলনের পর সম্পূর্ণ নিস্তেজ হয়ে, মাথা নিচু করে নিরীহভাবে পড়ে আছে। আনিকা উনার ঠোঁটের কোণে একটা খুব বাঁকা, আবেদনময়ী হাসি ফুটিয়ে তুললেন। উনি উনার আঙুল দিয়ে আমার সেই নিস্তেজ পৌরুষের ওপর খুব আলতো একটা টোকা দিয়ে বললেন—
 
"একি! একেবারে নেতিয়ে পড়েছ যে?"
 
আমি ক্লান্ত গলায় বললাম, "আর কোনো শক্তি নেই আমার। আমি এখন কোমায় চলে যাব।"
 
আনিকা আমার বুকের ওপর ঝুঁকে পড়লেন। উনার ভেজা চুলগুলো আমার মুখে এসে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। উনার চোখে সেই পুরোনো, ঘাতক আর বন্য আগুনটা আবার জ্বলতে শুরু করেছে। আনিকা আমার কানের লতিতে একটা হালকা কামড় দিয়ে ফিসফিস করে বললেন, "কোমায় যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই মিস্টার । আমি মাত্র খেলা শুরু করেছি। দাঁড়াও, এক্ষুনি আবার দাঁড় করাচ্ছি।"
 
আমার মেরুদণ্ড বেয়ে আবার একটা শিহরণ বয়ে গেল। এই নারী আসলে একটা আস্ত আগ্নেয়গিরি, যার অগ্ন্যুৎপাত কখনো শেষ হয় না। মানুষের অভিজ্ঞতা বড়ই অদ্ভুত একটা জিনিস। আপনি যখন কোনো কাজে নতুন হন, তখন আপনার ভেতর এক ধরনের ভীতি কাজ করে, আর যখন আপনি সেই কাজে অভিজ্ঞ হয়ে যান, তখন আপনার ভেতর কাজ করে এক ধরনের রাজকীয় আত্মবিশ্বাস। আমি বিছানায় সম্পূর্ণ নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছি। আমার পেশিগুলো এখনো আগের সেই প্রচণ্ড স্খলনের রেশ কাটিয়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু আমার মাথার ভেতর তখনো এক ধরনের দার্শনিক বিশ্লেষণ চলছে।

আমার পাশে যিনি শুয়ে আছেন, সেই আনিকা নাওহার একজন বিবাহিত নারী। শুধু বিবাহিতই নন, তিনি এমন এক জগতের বাসিন্দা, যে জগতের সাথে আমার এই ছাপোষা, পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের জীবনের কোনো মিল নেই। উনি লন্ডনে থাকেন। উনার বয়স ছত্রিশ। এই বয়সে এবং এমন একটা স্বাধীন পরিবেশে থাকার কারণে উনার শারীরিক এবং মানসিক অভিজ্ঞতার ক্যানভাসটা যে কতটা বিশাল, সেটা আমি এই বিছানায় শুয়ে খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারছি।

উনি একজন ‘পাকা খেলোয়াড়’। এই শব্দটা আমি কোনো নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার করছি না। এটা একটা মুগ্ধতা। যে নারী এত নিখুঁত প্ল্যান করে, ধাপে ধাপে আমাকে উনার শরীরের নেশায় ফেলেছেন, প্রথম দিন থেকে শুরু করে আজ রাত পর্যন্ত আমাকে যেভাবে মনস্তাত্ত্বিক আর শারীরিকভাবে ড্রাইভ করেছেন— সেটা কোনো আনাড়ি মেয়ের পক্ষে সম্ভব নয়। উনার এই খেলা খুব ভালো করে জানা আছে। আমি মনে মনে ভাবছিলাম, ইংল্যান্ডের ওই স্বাধীন জীবনে উনি হয়তো অনেক কিছুই এক্সপ্লোর করেছেন। কে জানে, হয়তো কোনো সুঠামদেহী, নীল চোখের শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ পুরুষের সাথে উনি উনার এই মধুভাণ্ডারের তৃষ্ণা মিটিয়েছেন। কিংবা হয়তো কোনো আফ্রিকান-ইংলিশ, সিক্স প্যাক অ্যাবসওয়ালা টগবগে নিগ্রো পুরুষের বন্যতার স্বাদও উনি নিয়েছেন। আধুনিক বিশ্বে এগুলো খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। উনার মতো একজন স্বাধীন, রূপবতী এবং ক্ষমতাবান নারী নিজের শরীরের চাহিদা মেটাতে কার কাছে গেছেন বা যাননি, সেটা নিয়ে জাজমেন্টাল হওয়ার মতো বোকামি আমি করছি না। বরং এই চিন্তাগুলো আমার ভেতরে কোনো ঈর্ষা তৈরি করছিল না, উল্টো আমার ভেতরে এক অদ্ভুত, বিকৃত আদিম উত্তেজনা তৈরি করছিল। এত অভিজ্ঞ, এত মাস্টারপিস একজন নারী আজ আমার বিছানায়, আমার মতো এক সাধারণ অনুবাদকের শরীরের সাথে খেলছেন— এর চেয়ে বড় বিজয় আর কী হতে পারে?

আমার এই দার্শনিক চিন্তার মাঝখানেই আনিকা উনার খেলা শুরু করে দিলেন। উনি আমার নিস্তেজ শরীরের ওপর এসে ঝুঁকলেন। প্রথমে উনার সেই উষ্ণ, ভেজা ঠোঁট জোড়া আমার গালে, থুতনিতে এবং ঠোঁটে খুব হালকা, পালকের মতো ছুঁইয়ে দিলেন। কোনো আগ্রাসন নেই, শুধু একটা সুড়সুড়ি জাগানো আদর। তারপর উনি উনার শরীরটা একটু ওপরে তুললেন। উনার সেই ভরাট, ফর্সা, নিখুঁত স্তনযুগল এখন ঠিক আমার চোখের সামনে। উনি ইচ্ছে করেই উনার স্তনদুটোকে আমার মুখের সামনে একটা পেন্ডুলামের মতো নাড়াতে লাগলেন। উনার বক্ষচূড়াগুলো আমার নাক আর ঠোঁটে এসে আলতো করে ঘষা খাচ্ছিল। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেই দৃশ্য দেখছিলাম।

এরপর উনি উনার দুই হাত দিয়ে নিজের স্তনদুটো চেপে ধরে একসাথে করে আমার মুখের ওপর আরও একটু নামিয়ে আনলেন। উনার শরীরের সেই শ্যানেল আর ঘামের মাতাল করা গন্ধটা আমাকে আবার নেশাগ্রস্ত করে তুলল। আমি হাঁ করে উনার বক্ষচূড়ায় একটা চুমু খেলাম। আনিকা হাসলেন। সেই ঘাতক হাসি। উনি উনার ডান হাতটা নিচে নামিয়ে নিয়ে গেলেন। যে জিনিসটা একটু আগে চরম স্খলনের পর সম্পূর্ণ নেতিয়ে পড়েছিল, আনিকার হাতের স্পর্শ পাওয়ামাত্রই সেটার ভেতর যেন আবার প্রাণসঞ্চার হলো। আনিকা উনার নরম, জাদুকরী আঙুলগুলো দিয়ে আমার সেই নিস্তেজ পৌরুষটাকে জাস্ট দুই থেকে তিনবার ওপর-নিচ করলেন।

অবিশ্বাস্য! ম্যাজিক!

মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে আমার সেই মৃতপ্রায় পুরুষাঙ্গটি আবার ফুঁসে উঠল। রক্ত চলাচলের গতি তিনগুণ বেড়ে গিয়ে সেটা আবার একটা শক্ত, দণ্ডায়মান ‘কুতুব মিনার’-এ পরিণত হলো। একজন অভিজ্ঞ নারী ঠিক জানেন, পুরুষের শরীরের কোন বোতামটা চাপলে ইঞ্জিন আবার স্টার্ট নেয়। আমি কিছু বলার বা করার সুযোগই পেলাম না। আনিকা আমাকে কোনো উদ্যোগ নিতে দিলেন না।
উনি আমার দুই উরুর মাঝখানে এসে বসলেন। তারপর খুব সাবলীল এবং বুনো একটা ভঙ্গিতে, উনার সেই কামনায় ভেজা, পিচ্ছিল মধুভাণ্ডার বা যোনিপথের ঠিক মুখে আমার পুরুষাঙ্গের শীর্ষদেশটা স্থাপন করলেন।

এবং এক নিখুঁত, মসৃণ চাপে উনি আমার পুরো পৌরুষটাকে উনার শরীরের একদম গভীর পর্যন্ত গ্রহণ করে নিলেন। কাউগার্ল পজিশন। আনিকা এখন আমার ওপর সওয়ার হয়েছেন। উনার শরীরের ভার আর ভেতরের সেই উষ্ণ, পিচ্ছিল গহ্বরের চাপ আমাকে এক চরম আরামের স্বর্গে পাঠিয়ে দিল। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। আনিকা নিজেই প্রথমে দুই-একবার খুব ধীর লয়ে ওঠা-নামা করলেন। উনার স্তনদুটো উনার ছন্দের সাথে সাথে দুলছে।

তারপর উনি হঠাৎ থমকে গেলেন। উনার ডান হাতটা তুলে উনি আমার গালে খুব হালকা, আদুরে একটা চড় মারলেন। "কী দেখছ এভাবে বোকার মতো?" আনিকা উনার চোখ দুটো সরু করে, ঠোঁট কামড়ে ধরে বললেন। "আমি একা কত খেলব? তুমিও খেলো জান।"

'জান!' শব্দটা আমার কানের পর্দায় একটা পারমাণবিক বোমার মতো ফাটল। আনিকা নাওহার আমাকে 'জান' বলে ডাকছেন! আমার ভেতরের পুরুষালি অহংকার আর বন্যতা এবার সমস্ত শেকল ছিঁড়ে বেরিয়ে এল। আমি ঠিক এই কথাটার অপেক্ষাতেই ছিলাম। আমি আমার দুই হাত বাড়িয়ে আনিকার সরু কোমরটা প্রচণ্ড শক্তিতে খামচে ধরলাম। উনাকে আমার মুখের দিকে টেনে এনে আমি নিচের দিক থেকে দ্রুত গতিতে থাপ দেওয়া বা ধাক্কা মারা শুরু করলাম।  আমি আমার কোমরটাকে একটা নির্দিষ্ট, ধীর ছন্দে ওপরের দিকে ছুঁড়ছি। আমার দুই হাত আনিকার কোমরে শক্ত হয়ে বসে আছে, আমি উনাকে ব্যালেন্স করছি। আমি উনার চোখের দিকে তাকিয়ে আছি। প্রতিটা ধাক্কায় আমি উনার ভেতরের গভীরতা মাপার চেষ্টা করছি। আমার পুরুষাঙ্গ উনার যোনির প্রতিটি ভাঁজে ঘষা খাচ্ছে। আনিকা মাথাটা পেছনের দিকে হেলিয়ে দিয়েছেন। উনার দুই হাত আমার বুকের ওপর ভর দেওয়া। আমাদের দুজনের শরীর এই নতুন পজিশনের সাথে মানিয়ে নিচ্ছে। আনিকার গলা দিয়ে খুব মৃদু, একটানা "উমমম... আহহহ..." শব্দ বের হচ্ছে। আমার স্নায়ুগুলো নতুন করে উত্তেজিত হতে শুরু করেছে। ঘরের ভেতর শুধু আমাদের ত্বকের ঘর্ষণ আর ভেজা শব্দের একটা রিনিঝিনি সিম্ফনি বাজছে।

আমি আমার থাপের গতি এবার বাড়িয়ে দিলাম। আনিকার কোমর ধরে আমি উনাকে আমার বুকের ওপর আরও শক্ত করে চেপে ধরলাম। আমি এখন আর শুধু নিচে থেকে ধাক্কা দিচ্ছি না, আমি উনার স্তনদুটোকে আমার মুখের কাছে টেনে এনে পাগলের মতো লেহন করছি। উনার শরীরের গন্ধ আমাকে বন্য করে দিচ্ছে। আনিকা এখন আমার গতির সাথে তাল মেলাচ্ছেন। উনি আমার কাঁধ খামচে ধরেছেন। আমি যখন নিচ থেকে ধাক্কা দিচ্ছি, উনি ওপর থেকে উনার সমস্ত ভার নিয়ে আমার ওপর আছড়ে পড়ছেন।ঘর্ষণের তীব্রতা এখন অনেক বেশি। আনিকার যোনির ভেতরের পেশিগুলো আমাকে আষ্টেপৃষ্টে চেপে ধরছে। আমাদের দুজনের ঘাম মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। আনিকার গোঙানি এখন আর মৃদু নেই, সেটা এখন স্পষ্ট চিৎকারে রূপ নিতে শুরু করেছে। "রাশেদ... ইয়েস... আহহহ!"

আমাদের মধ্যে এখন আর কোনো ভদ্রতা বা আড়াল নেই। আমি আমার দুই হাত আনিকার কোমর থেকে সরিয়ে উনার দুই নিতম্বের পাহাড়দুটো খামচে ধরলাম। আমি উনাকে শূন্যে তুলে আবার প্রচণ্ড শক্তিতে আমার ওপর আছড়ে ফেলছি। আমার থাপগুলো এখন দীর্ঘ, গভীর এবং পশুর মতো বন্য। আনিকা উনার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছেন। উনার মাথা এদিক-ওদিক দুলছে। চুলগুলো আমার মুখের ওপর আছড়ে পড়ছে। উনি উনার নখ দিয়ে আমার পিঠ আর বুক খামচে ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছেন। বিছানার স্প্রিংগুলো এখন ক্যাঁচক্যাঁচ করে আর্তনাদ করছে। মনে হচ্ছে যেন একটা ভূমিকম্প হচ্ছে। আনিকার মধুভাণ্ডার থেকে কামনার রস উপচে পড়ে আমার উরু আর পেট ভিজিয়ে দিচ্ছে। আমাদের দুজনের শ্বাস-প্রশ্বাস এখন ঝড়ের মতো শোনাচ্ছে।

আমরা দুজনেই বুঝতে পারছি, আমরা বিস্ফোরণের একদম দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছি। আমার চোখ এখন ঘোলাটে হয়ে আসছে। আমি আমার সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে, বিরতিহীনভাবে উনার ভেতরে আঘাত করে যাচ্ছি। আমি উনার ঘাড়, উনার কলারবোন কামড়ে ধরছি। আনিকার শরীরটা ধনুকের মতো টানটান হয়ে গেছে। উনার ভেতরের পেশিগুলো এমনভাবে আমাকে চিপে ধরছে যে আমার মনে হচ্ছে আমার পুরুষাঙ্গটা ছিঁড়ে যাবে। উনি পাগলের মতো চিৎকার করছেন, "জান... আমাকে শেষ করে দাও... আমাকে মেরে ফেলো... আহহহহহ!" মনস্তাত্ত্বিকভাবে আমরা এখন পৃথিবীর বাইরে। কোনো চিন্তা নেই, শুধু ঘর্ষণ, তাপ আর একটা চূড়ান্ত মুক্তির অপেক্ষা।

এবং তারপর সেই মুহূর্তটা এল। আনিকা হঠাৎ করে উনার দুই পা দিয়ে আমার কোমরটা সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরলেন। উনার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। উনি একটা আকাশ-ফাটানো, তীক্ষ্ণ এবং দীর্ঘ চিৎকার দিয়ে উঠলেন।

"আহহহহহহহহহহ!"

আর সেই চিৎকারের সাথেই ঘটল সেই অভাবনীয় ঘটনা। আনিকার শরীর প্রচণ্ডভাবে কেঁপে উঠল এবং উনার যোনিপথ থেকে এক উষ্ণ, স্বচ্ছ তরলের ফোয়ারা প্রবল বেগে আছড়ে পড়ল আমার তলপেট আর উরুর ওপর। স্কোয়ার্টিং! চরম এবং বন্য তৃপ্তির ফলে একজন নারীর শরীর থেকে বেরিয়ে আসা এক মহাজাগতিক বন্যা। সেই গরম তরল আমার শরীর ভিজিয়ে দিল। উনার এই স্কোয়ার্ট করা এবং উনার ভেতরের সেই চরম সঙ্কোচন আমার ভেতরের শেষ বাঁধটুকুও চুরমার করে দিল। আমিও আর এক সেকেন্ড ধরে রাখতে পারলাম না। আমি আমার কোমরটাকে উঁচিয়ে ধরে আনিকার শরীরের একদম গভীরতম অংশে শেষ তিনটে প্রচণ্ড থাপ মারলাম। এবং আমার মুখ দিয়ে একটা পশুর মতো হুঙ্কার বেরিয়ে এল।

আমার শরীরের সমস্ত জমানো লাভা, সমস্ত পবিত্র বীর্য একটা আগ্নেয়গিরির মতো বিস্ফোরিত হয়ে আনিকার মধুভাণ্ডারের একদম গভীরে প্রবল বেগে আছড়ে পড়ল। আমি উনার ভেতরে নিজেকে সম্পূর্ণ খালি করে দিলাম। স্খলনের সেই চরম, অন্ধ করা সুখের মুহূর্তে আমরা দুজন যেন মহাশূন্যে ভাসতে ভাসতে একে অপরের ভেতর বিলীন হয়ে গেলাম। আনিকার শরীরটা তখনো ছোট ছোট স্প্যাজমে বা কাঁপুনিতে কাঁপছে। উনি সম্পূর্ণ নিস্তেজ হয়ে, একটা কাটা গাছের মতো আমার বুকের ওপর ধপ করে লুটিয়ে পড়লেন। আমি আমার দুই হাত দিয়ে উনার ঘর্মাক্ত, ভেজা শরীরটাকে আমার বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। উনার মুখটা আমার ঘাড়ের কাছে লুকানো। আমি উনার পিঠে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। আমার হৃৎপিণ্ড আর উনার হৃৎপিণ্ড এখন একই ছন্দে ধুকপুক করছে।

পুরো ঘরটা এখন নিস্তব্ধ। শুধু আমাদের দুজনের ভারী শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ আর এসির মৃদু গুঞ্জন। আমার বুকের ওপর এখন ঘুমিয়ে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে বন্য নারী। আমি উনাকে আমার দুই হাতের বেষ্টনীতে আটকে রেখে চোখ বন্ধ করলাম।
Reply
#23

২৩

সময় ব্যাপারটা বড়ই অদ্ভুত। মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় ধাঁধা হলো এই সময়। বিজ্ঞানীরা, দার্শনিকরা, এবং কবিরা হাজার হাজার বছর ধরে এই একটা জিনিস নিয়ে মাথা ঘামিয়ে গেছেন, কিন্তু কেউ এর কোনো সুনির্দিষ্ট, সর্বজনীন সংজ্ঞা দাঁড় করাতে পারেননি। 

কেউ কেউ বলেন, সময় হলো চতুর্থ মাত্রা বা ফোর্থ ডাইমেনশন। আমরা যেমন দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর উচ্চতার ভেতর দিয়ে ডানে-বাঁয়ে, ওপরে-নিচে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারি, সময়ের ভেতর দিয়ে আমরা সেভাবে পারি না। সময় আমাদেরকে ঘাড় ধরে, একমুখী একটা রাস্তা দিয়ে কেবল সামনের দিকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যায়। পেছনে ফেরার কোনো সুযোগ নেই।

আবার আরেক দল দার্শনিক বলেন, সময় বলতে আসলে মহাবিশ্বে কিচ্ছু নেই। এটা একটা সম্পূর্ণ অলীক ধারণা। মানুষের তৈরি করা একটা মেটাফোর বা রূপক মাত্র। প্রকৃতিতে শুধু ‘পরিবর্তন’ ঘটে। সূর্য ওঠে, সূর্য ডোবে, ঋতু বদলায়, মানুষের চামড়ায় ভাঁজ পড়ে। এই পরিবর্তনগুলোকে একটা হিসেবে বাঁধার জন্য মানুষ ঘড়ি বানিয়েছে, ক্যালেন্ডার বানিয়েছে, আর তার নাম দিয়েছে ‘সময়’।

তবে সময়ের সবচেয়ে সুন্দর এবং বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যাটা দিয়েছেন আলবার্ট আইনস্টাইন। তিনি বলেছেন, সময় হলো আপেক্ষিক (Relative)। এর কোনো নির্দিষ্ট গতি নেই। পর্যবেক্ষকের মানসিক এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে সময়ের গতি নির্ধারিত হয়। আইনস্টাইন সাহেব খুব মজার একটা উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়েছিলেন— "আপনি যদি একটা জ্বলন্ত চুলার ওপর এক মিনিট বসে থাকেন, আপনার মনে হবে এক ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। আর আপনি যদি একজন সুন্দরী রমণীর পাশে এক ঘণ্টা বসে থাকেন, আপনার মনে হবে মাত্র এক মিনিট পার হয়েছে। দ্যাট ইজ রিলেটিভিটি!"

এই অদ্ভুত এবং ভারী থিওরিগুলো আমার মাথার ভেতর এল খুব বাস্তব একটা অভিজ্ঞতার কারণে। আমি নিজের জীবনের সাথে সময়ের এই আপেক্ষিকতা আর ফ্ল্যাট সার্কেল থিওরিটা মিলিয়ে দেখলাম। এই ধরুন, আনিকা নাওহারের সাথে আমার সেই চরম শারীরিক মিলনের মুহূর্তগুলো। একটা মিলনের অ্যাভারেজ বা গড় সময় কতক্ষণ হয়? পেনিট্রেশন শুরু হওয়ার পর থেকে চরম স্খলন বা ক্লাইম্যাক্স পর্যন্ত হয়তো ৫ থেকে ৭ মিনিট। খুব বেশি হলে ১০ মিনিট। কিন্তু ওই ৫-৭ মিনিটের সময়টুকু আমার কাছে কেমন মনে হয়েছিল? মনে হয়েছিল অনন্তকাল! আমার মনে হয়েছিল আমি যেন একটা মহাশূন্যের ভেতর ভাসছি, যেখানে ঘড়ির কাঁটা পুরোপুরি থেমে গেছে। আনিকার শরীরের ভেতরে আমার সেই আদিম ভ্রমণের প্রতিটা সেকেন্ড আমার মস্তিষ্কে এমনভাবে রেকর্ড হয়েছে যে, ফ্ল্যাট সার্কেল থিওরির মতো— আমার মনে হয় ধানমন্ডির ওই ষোলো তলা বিল্ডিংয়ের সাত তলার ফ্ল্যাটের বিছানায়, বা বাথটাবের পানিতে, আমাদের ওই মিলনের মুহূর্তটা মহাবিশ্বের বুকে একটা অনন্তকালের লুপ হয়ে আটকে গেছে। আজ থেকে এক হাজার বছর পরও হয়তো ওই নির্দিষ্ট স্থান-কালে আমরা দুজন এভাবেই একে অপরের ভেতর বিলীন হতে থাকব।

অন্যদিকে, আমার অফিসের সেই ছুটিটা! আমি এহসান ভাইয়ের সাথে যুদ্ধ করে এক সপ্তাহের ছুটি আদায় করেছিলাম। আমার প্ল্যান ছিল, এই সাতটা দিন আমি আনিকার সাথে কাটাব। সাত দিন মানে ১৬৮ ঘণ্টা। ১০,০৮০ মিনিট। কিন্তু আইনস্টাইনের রিলেটিভিটি থিওরি অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণ করে দিয়ে, আমার সেই ছুটির পাঁচ-সাতটা দিন রকেটের মতো উড়ে চলে গেল! আমার মনে হলো, আমি জাস্ট চোখ বন্ধ করলাম আর খুললাম, আর এর মধ্যেই পাঁচটা দিন শেষ! একটা সুন্দর, মাদকতাময় ঘোরের ভেতর দিয়ে পাঁচটা দিন যেন পাঁচ মিনিটের মতো পার হয়ে গেল।

এই পাঁচটা দিন আমরা ফ্ল্যাটের বাইরে পা রাখিনি। পৃথিবীর কোনো খবর, কোনো যুদ্ধ, কোনো রাজনীতি আমাদের ছুঁতে পারেনি। আমাদের পৃথিবীটা সীমাবদ্ধ ছিল ওই চার হাজার স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাট, সেন্ট্রাল এসি, ফুডপান্ডার খাবার আর একটা বিশাল কিং-সাইজ বিছানার ভেতরে। এই পাঁচ দিনে আমরা যেন নববিবাহিত কোনো দম্পতির মতো একে অপরকে নতুন করে আবিষ্কার করলাম।

আমাদের দিন শুরু হতো দুপুরে, আর রাত শেষ হতো ভোরবেলায়। আনিকা আর আমার মধ্যে কোনো আড়াল, কোনো লজ্জা বা কোনো জড়তা অবশিষ্ট ছিল না। আমরা একে অপরের শরীরটাকে একটা ম্যাপের মতো তন্নতন্ন করে পড়েছি। আনিকার শরীরের এমন কোনো অংশ, এমন কোনো ভাঁজ, এমন কোনো গোপন তিল বাকি রইল না, যেখানে আমার ঠোঁট, আমার জিভ, অথবা আমার আদরের আঘাত লাগেনি। উনার সেই ৩৬-২৮-৩৬-এর নিখুঁত জ্যামিতির প্রতিটি ইঞ্চি আমার মুখস্থ হয়ে গেল।

উল্টোভাবে, আমার শরীরেরও এমন কোনো অংশ বাকি রইল না, যেখানে আনিকার সেই জাদুকরী স্পর্শ, উনার নখের আঁচড়, অথবা উনার বন্য কামড় লাগেনি। আমরা দুজন যেন একটা প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছিলাম— কে কাকে কতটা মুগ্ধ করতে পারে, কে কাকে কতটা চরম সুখের স্বর্গে পৌঁছে দিতে পারে। 

আমরা সারা দিন বিছানায়, সোফায়, এমনকি কিচেনের মার্বেল টপের ওপর বসেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করতাম। আনিকা উনার লন্ডনের জীবনের কথা বলতেন, উনার আইটি ফার্মের ক্লায়েন্টদের কথা বলতেন। আর আমি বলতাম আমার অনুবাদক জীবনের হতাশা, মিরপুরের মেসের দারোয়ান মফিজের কথা। আমরা হাসতাম, আমরা কফি খেতাম, আর হঠাৎ করেই কথার মাঝখানে একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বন্যতায় মেতে উঠতাম।

কী অদ্ভুত এক মোহ! কী ভয়ংকর এক নেশা!

কিন্তু ছুটির দিনগুলোর একটা খুব খারাপ স্বভাব হলো, এগুলো খুব দ্রুত শেষ হয়ে যায়। ষষ্ঠ দিনের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আমি বুঝলাম, আমার ছুটি শেষ। আমাকে আবার কারওয়ান বাজারের বাস্তবতায় ফিরে যেতে হবে। আমি যখন গোসল করে, আনিকার কিনে দেওয়া আড়ংয়ের সেই দামি শার্ট আর ট্রাউজার পরে ড্রয়িংরুমে এলাম, আনিকা তখন সোফায় বসে কফি খাচ্ছিলেন। উনার পরনে একটা খুব পাতলা, সিল্কের নাইটি।

"অফিসে যাচ্ছ?" আনিকা কফির মগে চুমুক দিয়ে খুব ক্যাজুয়াল গলায় জিজ্ঞেস করলেন।

"হ্যাঁ। ছুটি শেষ। এখন যদি অফিসে না যাই, এহসান ভাই আমাকে ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক থেকে সোজা বঙ্গোপসাগরে ট্রান্সফার করে দেবেন," আমি ঘড়ি পরতে পরতে বললাম।

আনিকা উঠে এসে আমার শার্টের কলারটা একটু ঠিক করে দিলেন। উনার হাতটা আমার বুকে আলতো করে ছুঁয়ে গেল। "তাড়াতাড়ি ফিরবে কিন্তু। আমি ওয়েট করব।" আমি উনার কপালে একটা চুমু খেয়ে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে এলাম। লিফটে করে নিচে নামার সময় আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে আমার একটা খুব অদ্ভুত, মিশ্র অনুভূতি হলো।

আমার মনে হলো, আমি যেন কোনো 'ঘরজামাই'!

ঘরজামাইদের সাইকোলজি কেমন হয়, সেটা আমি আগে কখনো বুঝিনি। কিন্তু আজ বুঝতে পারলাম। আমি থাকি আমার ‘স্ত্রীর’ (যদিও আনিকা আমার স্ত্রী নন, কিন্তু সম্পর্কটা তো তেমনই) ফ্ল্যাটে। উনার কেনা দামি শার্ট পরে আমি অফিসে যাচ্ছি। অফিস শেষ করে আমি আবার উনারই ফ্ল্যাটে ফিরে আসব, উনারই টাকায় অর্ডার করা ফুডপান্ডার খাবার খাব। আমার নিজের কোনো স্বাধীনতা নেই, নিজের কোনো মেস নেই। আমি পুরোপুরি একজন ক্ষমতাশালী, বিলিয়নিয়ার নারীর আশ্রয়ে থাকা এক পালিত পুরুষ!

আমাদের মধ্যবিত্ত বাঙালি পুরুষদের জন্য এই 'ঘরজামাই' ফিলিংটা খুব ইগো-হার্ট করা একটা বিষয়। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, আমার কোনো ইগো হার্ট হচ্ছিল না। বরং আমি এই পরজীবী জীবনটাকে, এই আনিকা নাওহারের ছায়াতলে থাকাটাকে চরমভাবে উপভোগ করছিলাম।

অফিসে ঢুকতেই এহসান ভাই আমার দিকে চোখ সরু করে তাকালেন। "কী ব্যাপার রাশেদ? এক সপ্তাহের ছুটি কাটিয়ে এলে, কিন্তু তোমার চেহারায় তো রোগীর মতো কোনো ছাপ দেখছি না! উল্টো তো মনে হচ্ছে গ্যালন গ্যালন ফ্রেশ রক্ত শরীরে ঢুকিয়ে এসেছ। চেহারায় এত গ্লেজ কেন?"

আমি একটু আমতা আমতা করে বললাম, "আরে ভাই, রেস্ট নিলে তো মানুষের চেহারা একটু ভালো হবেই। তাছাড়া ওই আত্মীয়ের স্ট্রোকের ধকলটা কেটে গেছে, তাই একটু রিল্যাক্সড।" মামুন আমার দিকে চাকাওয়ালা চেয়ারটা ঠেলে এগিয়ে এল। "রাশেদ ভাই, শার্টটা তো জখ্কাস! আড়ংয়ের মনে হচ্ছে। এক সপ্তাহের ছুটিতে কি বিয়ে-শাদি করে ফেললেন নাকি ভাই? ভাবি কি বড়লোকের মাইয়া?" মামুন চোখ টিপে বলল।
আমি ল্যাপটপ অন করতে করতে বললাম, "মামুন, তুমি অনুবাদ করো, গোয়েন্দাগিরি না। তোমার ওই স্পেনের নিউজের কী অবস্থা?"

মামুন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "ভাই, নিউজ তো একটা সেই লেভেলের পেয়েছি। আমেরিকার টেক্সাসে এক লোক একটা রোবটকে বিয়ে করেছে। রোবটটার নাম ‘অ্যালিস’। লোকটা দাবি করছে, অ্যালিস নাকি সাধারণ মেয়েদের চেয়ে অনেক ভালো। সে কখনো ঝগড়া করে না, শপিংয়ে যাওয়ার জন্য বায়না ধরে না, আর মেকআপের পেছনে টাকা উড়ায় না।"

আমি হাসলাম। "তো তুমি কী হেডলাইন দিচ্ছ?"

"আমি দিয়েছি— ‘টেক্সাসে যন্ত্রমানবীর গলায় বরমাল্য, প্রেমের নতুন দিগন্ত’।"

"মামুন, তুমি আবার বরমাল্যতে ফিরে গেছ! তুমি হেডলাইন দাও— ‘টেক্সাসে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সাথে মানুষের বিয়ে: প্রযুক্তির নতুন প্রভাব’।"

অফিস চলছে তার নিজস্ব গতিতে। কিন্তু আমার মাথার ভেতর, আমার শরীরের প্রতিটা কোষে তখন শুধু একটাই নাম— আনিকা। আমি কি-বোর্ডে টাইপ করছি সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের কথা, আর আমার মনে পড়ছে আনিকার সেই নগ্ন পিঠের কথা। আমি অনুবাদ করছি আমেরিকার নির্বাচনের খবর, আর আমার কানে বাজছে আনিকার সেই চরম মুহূর্তের বন্য গোঙানি।

অফিস শেষ করে আমি আর মিরপুরের বাসে উঠলাম না। আমি উবার ডেকে সোজা চলে গেলাম ধানমন্ডিতে। 

এভাবেই আমার নতুন একটা রুটিন শুরু হয়ে গেল। সকালে আনিকার ফ্ল্যাট থেকে বের হওয়া, সারাদিন অফিসে ডিউটি করা, আর রাতে ফিরে এসে আনিকার সাথে বিছানায় ডিউটি করা। আমার মনে আছে, আনিকা আমাকে বলেছিলেন উনি দেশে আর আট-নয় দিন আছেন। উনার ইংল্যান্ডের ফ্লাইট ছিল। কিন্তু দেখতে দেখতে আট দিন, নয় দিন, বিশ দিন পার হয়ে গেল। আনিকার ইংল্যান্ডে ফেরার কোনো লক্ষণ দেখলাম না।

আমি একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, "তোমার না ফ্লাইট ছিল?" (হ্যাঁ, আমি এখন উনাকে তুমি করেই বলি, আর উনিও আমাকে তুমি বলেন। সম্পর্কের এই পর্যায়ে এসে আপনি-আজ্ঞে করাটা একটা চরম ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছুই নয়)। আনিকা খুব ক্যাজুয়াল গলায় বলেছিলেন, "ফ্লাইটের ডেট পিছিয়ে দিয়েছি। লন্ডনে এখন বেশ ঠান্ডা। আর আইটি ফার্মের কাজগুলো তো আমি ল্যাপটপেই রিমোটলি ম্যানেজ করে নিচ্ছি। বেলালও কয়েক দিনের জন্য একটা কনফারেন্সে জার্মানি গেছে। আমার এখনই ফেরার এত তাড়া নেই।" আমি আর কথা বাড়াইনি। আমি তো এটাই চাইছিলাম। এই স্বপ্নটা যত দীর্ঘ হয়, ততই ভালো।

দেখতে দেখতে এভাবে ২২-২৩ দিন পার হয়ে গেল। আজ মার্চ মাসের ২৪ তারিখ। ফেব্রুয়ারির সেই মিষ্টি, ঠান্ডা ভাবটা ঢাকা শহর থেকে বিদায় নিয়েছে। মার্চ মাসের শেষ দিক মানেই ঢাকায় একটা ভ্যাপসা, খরতাপের শুরু। বাইরে বের হলেই রোদের তাপে পিঠ পুড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। রাস্তার পিচ গলে যাওয়ার মতো গরম। চারদিকে ধুলাবালি আর ঘামের গন্ধ।

কিন্তু আনিকার সেই ষোলো তলার ফ্ল্যাটে গরমের কোনো অস্তিত্ব নেই। সেন্ট্রাল এসি চব্বিশ ঘণ্টা চলছে। ফ্ল্যাটের ভেতরটা সবসময় বাইশ বা তেইশ ডিগ্রিতে স্থির। এই ২২-২৩ দিনে আমাদের সম্পর্কের ডাইনামিক্সে একটা খুব সূক্ষ্ম, কিন্তু স্বাভাবিক পরিবর্তন এল। প্রথম যে পাঁচ-সাত দিন আমরা একসাথে ছিলাম, তখন আমাদের অবস্থা ছিল খাঁচায় বন্দি দুটো ক্ষুধার্ত পশুর মতো। আমাদের কোনো হুশ ছিল না। দিনে তিনবার, চারবার, এমনকি পাঁচবারও আমরা একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তাম। শরীরের প্রতিটি শক্তি নিংড়ে নিয়ে আমরা একে অপরকে ভোগ করতাম। মনে হতো, আমাদের চামড়ার নিচে রক্ত নয়, কোনো তরল আগুন বইছে।

কিন্তু মানুষের শরীর তো আর মেশিন না। আর মানুষের উত্তেজনাও একটা নির্দিষ্ট গ্রাফ মেনে চলে। আস্তে আস্তে আমাদের সেই বন্য, পাগলাটে রেগুলারিটি বা ফ্রিকোয়েন্সি একটু কমে আসতে শুরু করল। অফিস শুরু হওয়ার পর, দিনে তিন-চারবারের সেই রুটিনটা নেমে এল দিনে দুই বা তিনবারে। আমি অফিস থেকে ফিরে ফ্রেশ হওয়ার আগেই হয়তো আনিকা আমাকে জড়িয়ে ধরতেন, তারপর রাতে ঘুমানোর আগে আরেকবার।

আর এখন, এই মার্চ মাসের ২৪ তারিখে এসে, আমাদের রুটিনটা আরও একটু স্থির হয়েছে। এখন শুধু রাতের বেলা একবার। কিন্তু এই ‘একবার’ মানে এই নয় যে আমাদের ভালোবাসা বা আকর্ষণ কমে গেছে। বরং, এই কমার ভেতরে একটা অদ্ভুত মানসিক গভীরতা তৈরি হয়েছে।

প্রথম দিকের সেই পাগলামিটা ছিল শুধুই লোলুপতা, একটা নতুন শরীরকে আবিষ্কার করার উত্তেজনা। কিন্তু এখন, এই ২২ দিন পর, আনিকার শরীরটা আমার কাছে আর নতুন কোনো মহাদেশ নেই। উনার শরীরের কোন জায়গায় স্পর্শ করলে উনি শিউরে ওঠেন, উনার স্তনের কোন পাশটায় কামড় দিলে উনি বন্য হয়ে ওঠেন, উনার মধুভাণ্ডারের কতটা গভীরে গেলে উনি স্কোয়ার্ট করেন— এই সব কিছু এখন আমার একদম মুখস্থ। আমি যেন উনার শরীরের একজন সার্টিফাইড মেকানিক হয়ে গেছি।

ঠিক তেমনি, আনিকাও আমার শরীরের সমস্ত সুইচ চিনে গেছেন। উনি জানেন আমার পুরুষাঙ্গের কোথায় উনার জিভের স্পর্শ লাগলে আমি পাগল হয়ে যাই, উনি জানেন আমার পিঠের ঠিক কোন জায়গায় নখ বসালে আমি পশুর মতো থাপ দেওয়া শুরু করি। এখন আমাদের রাতের ওই ‘একবার’-এর মিলনটা হয় খুব গভীর, খুব দীর্ঘ এবং খুব ইনটেন্স। এখন আর কোনো তাড়াহুড়ো থাকে না। আমরা অনেক সময় নিয়ে একে অপরকে আদর করি। অনেকক্ষণ ধরে ফোরপ্লে চলে। আমরা এখন একে অপরের শরীরের সাথে একটা আত্মিক যোগাযোগ স্থাপন করে ফেলি। এই মিলনটা এখন আর শুধু যৌনতা নয়, এটা এখন আমাদের সারাদিনের ক্লান্তি দূর করার একটা থেরাপি। এটা এখন আমাদের জীবনের একটা অবিচ্ছেদ্য অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটা নেশার মতো।

২৪শে মার্চ রাত এগারোটা।

আমরা ডাইনিং টেবিলে বসে রাতের খাবার শেষ করেছি। আজ আনিকা নিজের হাতে রান্না করেছেন। হ্যাঁ, এই ২২ দিনে উনার ভেতরেও কিছু পরিবর্তন এসেছে। যেই নারী জীবনেও কিচেনে যেতেন না, তিনি ইউটিউব দেখে দেখে আমার জন্য চিকেন স্টেক আর পাস্তা বানানো শিখে গেছেন। খাওয়া শেষ করে আমরা বারান্দায় এসে বসেছি। বাইরে ঢাকা শহরে একটা গুমোট গরম। কিন্তু বারান্দায় যেহেতু বাতাস আছে, তাই খুব একটা খারাপ লাগছে না। আমি একটা সিগারেট ধরালাম। আনিকা উনার একটা হাত আমার হাঁটুর ওপর রেখে আমার কাঁধে মাথা এলিয়ে দিয়েছেন। উনার পরনে একটা পাতলা, সুতির নাইটি। আমার পরনে শুধু একটা শর্টস। আমি সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে আকাশের দিকে তাকালাম। আকাশে কোনো তারা নেই। ঢাকা শহরের আকাশে তারা থাকে না।

"আনিকা," আমি খুব শান্ত গলায় ডাকলাম।

"হুম?" উনি চোখ বন্ধ করেই উত্তর দিলেন।

"একটা কথা জিজ্ঞেস করি?"

"বলো।"

"তুমি ব্যাক করবা কবে? মানে... ইংল্যান্ডে।"

প্রশ্নটা শোনার পর আনিকা কয়েক সেকেন্ড কোনো নড়াচড়া করলেন না। উনার শ্বাস-প্রশ্বাসের গতিটাও যেন একটু থমকে গেল। আমি বুঝতে পারলাম, আমি এমন একটা ঢিল ছুঁড়েছি, যেটা আমাদের এই মায়াবী ফ্ল্যাট সার্কেলের শান্ত পুকুরে একটা বড় ঢেউ তৈরি করেছে। আনিকা আস্তে করে উনার মাথাটা আমার কাঁধ থেকে তুললেন। উনার সেই বাদামি চোখ দুটো দিয়ে আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকালেন।

উনার চোখে এখন কোনো আভিজাত্য নেই, কোনো সিইও-র কাঠিন্য নেই। সেখানে এখন এক অদ্ভুত, অসহায় মায়া। "যেতে তো হবেই রাশেদ," আনিকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে খুব নিচু গলায় বললেন। "আমার ওখানে একটা সেটেলড লাইফ আছে। আমার ব্যবসা আছে, আমার লিগ্যাল স্ট্যাটাস আছে... বেলাল আছে।"

‘বেলাল’ নামটা শোনার পর আমার বুকের ভেতর একটা সুই বিঁধল। গত ২২ দিনে এই নামটা আমাদের মাঝখানে একবারও উচ্চারিত হয়নি। আমরা যেন সচেতনভাবেই এই নামটাকে আমাদের ফ্ল্যাটের বাইরে নির্বাসন দিয়ে রেখেছিলাম। "তাহলে যাচ্ছ কবে?" আমি আমার গলার স্বর স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে বললাম।

আনিকা উনার হাতটা আমার গালের ওপর রাখলেন। উনার আঙুলগুলো খুব আলতো করে আমার চিবুকে বিলি কাটতে শুরু করল। "আমি টিকিট কনফার্ম করেছি। সামনের মাসের ১৪ তারিখ," আনিকা বললেন। আমার বুকের ভেতর একটা বিশাল পাথর যেন ধপ করে পড়ে গেল। ১৪ এপ্রিল। মানে আর মাত্র কয়েকটা দিন। তারপর এই স্বপ্ন, এই রূপকথার জীবন শেষ। আমাকে আবার সেই মিরপুর দশ নাম্বারের মেসে ফিরে যেতে হবে।

"কিন্তু জানো রাশেদ," আনিকা উনার মুখটা আমার আরও কাছে নিয়ে এলেন। উনার চোখ দুটো পানিতে টলটল করছে। "আমার একদম যেতে ইচ্ছে করছে না। তোমাকে ছেড়ে, এই আনন্দ, এই পাগলামি, এই অদ্ভুত সুখ ছেড়ে আমার ওই যান্ত্রিক লন্ডনে ফিরে যেতে একটুও মন চাইছে না। আমি জানি না তুমি আমাকে কী জাদু করেছ, কিন্তু আমি তোমার শরীরের, তোমার এই আদরের একটা মারাত্মক নেশায় পড়ে গেছি। মনে হচ্ছে, আমি যদি আর কিছুদিন এখানে থাকি, আমি হয়তো আর কোনোদিনই ফিরে যেতে পারব না।"

কথাগুলো আনিকা খুব ভেঙে ভেঙে, একটা চরম অসহায়ত্বের সাথে বললেন। আমি উনার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমি জানি, উনি সত্যি কথা বলছেন। এই নারী আমার প্রেমে পড়েননি, উনি আমার শরীরের প্রেমে পড়েছেন। উনি আমাদের এই বন্য, আদিম যৌনতার প্রেমে পড়েছেন। কিন্তু একটা পর্যায়ে এসে শরীরের প্রেম আর আত্মার প্রেমের মাঝখানের দেয়ালটা খুব পাতলা হয়ে যায়। আমি হাতের সিগারেটটা বারান্দার গ্রিলের বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম। তারপর আমার দুই হাত দিয়ে আনিকার কোমর জড়িয়ে ধরে উনাকে একেবারে আমার কোলে তুলে নিলাম। "যতদিন আছ, ততদিন এই নেশাটা উপভোগ করো আনিকা," আমি উনার ঠোঁটের একদম কাছে ফিসফিস করে বললাম। "লন্ডনের ওই ঠান্ডা শহরে ফিরে গেলে এই ঢাকা শহরের ঘাম আর আগুনের কথা তোমার খুব মনে পড়বে।"

আনিকা একটা চাপা গোঙানি দিয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরলেন। উনার ঠোঁট আমার ঠোঁটের ওপর প্রবল আক্রোশে আছড়ে পড়ল। আমি উনাকে কোলে নিয়েই বারান্দা থেকে বেডরুমের দিকে পা বাড়ালাম। 

জীবন চলছে তার নিজস্ব নিয়মে। একটা অদ্ভুত, ফ্ল্যাট সার্কেলের মতো। প্রতিদিন সকালে অফিস, আর রাতে এই বিশাল বিছানায় এক অনন্তযাত্রা।

কী অদ্ভুত এক সুখ! কী অদ্ভুত এক আনন্দ! আর কী অদ্ভুত এক ধ্বংসাত্মক নেশা!

মানুষের জীবনে কিছু কিছু পরিবর্তন আসে খুব নিঃশব্দে। আপনি টেরও পাবেন না কখন আপনার চারপাশের পরিবেশ, মানুষের দৃষ্টি, এবং আপনার নিজের মনস্তত্ত্ব পুরোপুরি বদলে গেছে। দেখতে দেখতে আরও একটা সপ্তাহ কেটে গেল। 

আজ এপ্রিল মাসের ২ তারিখ।

সকালবেলা আমি আনিকার ফ্ল্যাট থেকে বের হয়ে যখন অফিসের দিকে যাচ্ছি, তখন বিল্ডিংয়ের মেইন গেটে দাঁড়ানো সিকিউরিটি গার্ড আমাকে দেখে খুব স্মার্ট একটা স্যালুট দিল। আমি একটু থমকে দাঁড়ালাম। এই সেই দারোয়ান, যে প্রথম দিন আনিকার সাথে আমাকে এই বিল্ডিংয়ে ঢুকতে দেখে খুব সন্দেহজনক এবং তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল। তার চোখে তখন একটা স্পষ্ট প্রশ্ন ছিল— "এই ছ্যাঁচড়া, ম্যাড়ম্যাড়ে চেহারার লোকটা এই ভিআইপি বিল্ডিংয়ে কী মনে করে ঢুকছে?"

আর আজ? আজ সেই লোক আমাকে স্যালুট দিচ্ছে! শুধু সিকিউরিটি গার্ডই নয়, এই বিল্ডিংয়ের আশেপাশের টং দোকানের চা-ওয়ালা, মুদি দোকানের ছেলেটা— সবাই এখন আমাকে চেনে। আমি যখন রাস্তা দিয়ে হাঁটি, চা-ওয়ালা দূর থেকেই মুচকি হেসে বলে, "স্যার, আইজকা কি অফিসে যাইবার টাইমে চা খাইয়া যাইবেন?" শুরুতে এই ধানমন্ডির হাই-সোসাইটি, কোটিপতিদের এলাকায় নিজেকে আমার ভীষণ অনাহূত, বেমানান এবং উটকো অতিথি বলে মনে হতো। আমার মনে হতো, যেকোনো সময় কেউ এসে আমার কলার চেপে ধরে বলবে, "অ্যাই ব্যাটা! তুই তো মিরপুরের মেসের পাবলিক। তুই এইখানে কী করস? ভাগ এইখান থেকে!"

কিন্তু আজ, এই এক মাসের কাছাকাছি সময়ে এসে, আমার ভেতরে সেই হীনম্মন্যতা আর নেই। আমার এখন মনে হয়, আমি এখানকারই লোক। আমি এই ধানমন্ডির ফ্ল্যাট, এই সেন্ট্রাল এসি, এই আড়ংয়ের দামি শার্ট— এগুলোর জন্যই জন্মেছি। মানুষের অ্যাডাপটেশন বা মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা সত্যিই মারাত্মক। একটা কুকুরকে যদি আপনি ড্রেন থেকে তুলে এনে রাজপ্রাসাদের সোফায় বসিয়ে দেন, দেখবেন দুই দিন পর সে এমন ভাব করবে যেন ওই সোফাটা তার বাপ-দাদার সম্পত্তি! আমার অবস্থাও অনেকটা সেই কুকুরের মতোই।
Reply
#24

২৪


অফিসের দিকে হাঁটতে হাঁটতে আমি জীবনের একটা খুব পুরোনো কিন্তু জটিল ফিলোসফি নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম।


মানুষ ভাবে এক, আর সৃষ্টিকর্তা করেন আরেক। ইংরেজিতে একটা খুব জনপ্রিয় থিওরি আছে— 'বাটারফ্লাই ইফেক্ট' (Butterfly Effect)। ক্যাওস থিওরির একটা অংশ। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, পৃথিবীর এক প্রান্তে একটা প্রজাপতি যদি তার ডানা ঝাপটায়, তবে সেই ডানা ঝাপটানোর ফলে বাতাসে যে অতি সূক্ষ্ম পরিবর্তন তৈরি হয়, তার চেইন রিঅ্যাকশনে পৃথিবীর আরেক প্রান্তে একটা ভয়াবহ টর্নেডো বা ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হতে পারে। আমার নিজের জীবনের দিকে তাকালেই এই বাটারফ্লাই ইফেক্টের প্রমাণ পাওয়া যায়।

কোথায় চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীর মতিন সাহেব আমাকে দিয়ে আনিকা নাওহারের একটা কবিতার বইয়ের প্রুফরিডিং করালেন। সেই প্রুফরিডিংয়ের সূত্র ধরে আমাকে বইয়ের মোড়ক উন্মোচনে দাওয়াত দেওয়া হলো। আমি সেখানে গিয়ে আনিকা নাওহারের কবিতার শূন্যতা নিয়ে দুটো গালভরা বুলি ছাড়লাম। আনিকা ইমপ্রেসড হয়ে আমাকে উনার উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি দেখার জন্য নাম্বার দিলেন। তারপর বইমেলা, তারপর রবীন্দ্র সরোবর, আর তারপর সোজা এই ধানমন্ডির ফ্ল্যাটের বেডরুম!

মতিন সাহেব যদি আমাকে দিয়ে ওই কবিতার বইয়ের প্রুফ না দেখাতেন, তাহলে আজ আমি কোথায় থাকতাম? সেই মিরপুর দশ নাম্বারের মেসে, সকালবেলা বাথরুমের লাইনে দাঁড়িয়ে তুহিনের আইইএলটিএস-এর স্পিকিং শুনতাম!

কোথাকার কোন প্রজাপতি কোথায় ডানা ঝাপটালো, আর আমার জীবনে এমন একটা সাইক্লোন বয়ে গেল, যার ঘূর্ণিতে আমি আমার সমস্ত অস্তিত্ব, নীতি আর পঁচিশ হাজার টাকার অনুবাদক সত্তাকে হারিয়ে ফেলে এক বিলিয়নিয়ার নারীর শয্যাসঙ্গী হয়ে গেলাম!

২রা এপ্রিল।
অফিসে সারাদিন কাজ করলেও আমার মাথার ভেতর শুধু ঘুরছে, আনিকা আর মাত্র কয়েকদিনের অথিতি, আর কয়েক দিন পরেই আমার এই রাজকীয় জীবনের অবসান। আমাকে আবার সেই পুরোনো রুটিনে ফিরে যেতে হবে। 

রাতে ফ্ল্যাটে ফেরার পরেও আমার ভেতরে সেই বিষণ্ণতার ছায়া যেন লেপটে আছে। হয়তো আনিকাও এই ভেবে কিছুটা বিষণ্ণ। আনিকা খুব চুপচাপ ছিলেন। আমরা একসাথে ডিনার করলাম। তারপর অন্যান্য রাতের মতোই আমরা বেডরুমে গেলাম।

আনিকা চলে যাবেন এই ভেবেই হয়তো আমার মধ্যে এক ধরনের মরিয়া ভাব ছিল। আমরা একে অপরকে এমনভাবে আদর করলাম যেন কাল সকালে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। আমাদের শরীর, আমাদের ঘাম, আমাদের লালা সব একাকার হয়ে গেল। আমরা একে অপরের শরীরে অর্গাজমের এমন বন্যা বইয়ে দিলাম যে, মনে হলো আমাদের শরীরের শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত আমরা নিংড়ে নিয়েছি।

পরম তৃপ্তি আর চরম ক্লান্তির পর আমরা দুজন একসাথে বাথরুমে গিয়ে শাওয়ার নিলাম। গরম পানির নিচে দাঁড়িয়ে আনিকা আমাকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদলেন। আমি উনার ভেজা চুলে চুমু খেয়ে উনাকে শান্ত করার চেষ্টা করলাম।

শাওয়ার শেষে আমরা বিছানায় এসে শুয়ে পড়লাম। একে অপরের বাহুডোরে বন্দী হয়ে আমরা কখন যে গভীর, নিশ্ছিদ্র ঘুমে তলিয়ে গেলাম, টেরই পেলাম না।


ঘুম ভাঙল। তবে আমার সেই বিখ্যাত, বেইমান বায়োলজিক্যাল অ্যালার্মের কারণে নয়। আমার ঘুম ভাঙল একটা খুব তীক্ষ্ণ, একটানা এবং কর্কশ শব্দের কারণে।

টিং ডং... টিং ডং... টিং ডং... কলিংবেল বাজছে।

আমি ধড়ফড় করে চোখ মেলে তাকালাম। আমার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। বেডরুমের পর্দা টানা, ঘরটা অন্ধকার। আমি হাতড়ে হাতড়ে বালিশের পাশ থেকে আমার ফোনটা নিলাম।

স্ক্রিন অন করে টাইম চেক করলাম। সকাল ৬টা ৩০ মিনিট!

আমার মস্তিষ্ক দ্রুত কাজ করতে শুরু করল। সকাল সাড়ে ছয়টায় এই ফ্ল্যাটের কলিংবেল বাজানোর মতো কে থাকতে পারে? এই ফ্ল্যাটে যে কাজের মেয়েটা আসে, সে আসে দুপুর বারোটার দিকে। আমি গত পঁচিশ দিন ধরে এই ফ্ল্যাটে আছি, আমি তার রুটিন খুব ভালো করেই জানি। সে এত সকালে জীবনেও আসবে না।

তাহলে কে?

পত্রিকাওয়ালা? পত্রিকাওয়ালা তো পত্রিকা দরজার নিচ দিয়ে গলিয়ে দেয় বা পাপোশের ওপর রেখে যায়। সে তো কলিংবেল চেপে বাড়ির মানুষকে ঘুম থেকে ডেকে তোলে না।

পানি বা গ্যাসের বিল দিতে এসেছে কেউ? এত সকালে বিলওয়ালারা আসে না। আমার মাথার ভেতর একটা বিরক্তি তৈরি হলো। ঢাকা শহরের মানুষগুলোর কমনসেন্স বলে কিছু নেই। সকাল সাড়ে ছয়টায় কারো বাসার কলিংবেল এভাবে একটানা চেপে ধরে রাখাটা কোন ধরনের অভদ্রতা!

আনিকা আমার বুকের ওপর মাথা রেখে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কাল রাতের ধকলের পর উনার এখন কোমাতে থাকার কথা। কলিংবেলের শব্দে উনি শুধু একটু উসখুস করলেন, কিন্তু উনার ঘুম ভাঙল না।

আমি খুব সাবধানে উনার মাথাটা বালিশে নামিয়ে রেখে বিছানা থেকে উঠলাম। আমার পরনে কিছুই নেই। আমি দ্রুত আড়ংয়ের কেনা সেই ট্রাউজারটা গলালাম, আর গায়ে একটা ক্যাজুয়াল টি-শার্ট চাপালাম। চুলটা হাত দিয়ে একটু ঠিক করে নিলাম।

"দাঁড়ান ভাই, আসছি! এত বেল চাপার কী হলো!" আমি বিড়বিড় করে বকতে বকতে ড্রয়িংরুম পেরিয়ে মেইন দরজার কাছে গেলাম।

আমি দরজার লকটা ঘুরিয়ে হাতল টান দিলাম। দরজাটা খুলতেই আমার চোখের সামনে যে দৃশ্যটা উন্মোচিত হলো, তার জন্য আমি, আমার অনুবাদক সত্তা, আমার ফিলোসফি, এমনকি স্বয়ং আইনস্টাইন বা সিগমুন্ড ফ্রয়েডও প্রস্তুত ছিলেন না।

দরজার ঠিক ওপাশে একজন অপরিচিত লোক দাঁড়িয়ে আছেন। লোকটার বয়স অনুমানিক আটত্রিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে। বেশ সুঠাম, স্বাস্থ্যবান শরীর। গায়ের রঙ ফর্সা। অত্যন্ত সুদর্শন এবং শার্প ফিচারস। চোখে একটা দামি, রিমলেস চশমা। পরনে একটা খুব সফিস্টিকেটেড ব্র্যান্ডের পোলো শার্ট আর জিন্স।

কিন্তু আমার চোখ লোকটার চেহারার চেয়ে বেশি আটকে গেল তার পাশে রাখা জিনিসটার ওপর। লোকটার ঠিক পাশেই একটা বিশাল, দামি লেদার ট্রলি লাগেজ রাখা। সাথে একটা কেবিন ব্যাগ। লাগেজ!

এই সকাল সাড়ে ছয়টায়, একজন সুদর্শন, অভিজাত চেহারার পুরুষ লাগেজ নিয়ে আনিকা নাওহারের ফ্ল্যাটের দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন! আমার পায়ের নিচ থেকে ধানমন্ডির এই ষোলো তলা বিল্ডিংয়ের ভিত যেন এক সেকেন্ডে সরে গেল। আমার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা হিমশীতল, বরফগলা স্রোত নিচে নেমে গেল।

লোকটার চেহারার সাথে আমি আনিকার বলা একটা বর্ণনার মিল খুঁজতে শুরু করলাম। হ্যাঁ, আনিকা বলেছিল, তার স্বামী বেশ লম্বা, চওড়া এবং ভারিক্কি চেহারার।

লোকটাও আমাকে দেখে কম চমকালেন না। বরং উনার চমকানোর মাত্রাটা আমার চেয়েও বেশি। লোকটার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। উনি উনার চশমার ভেতর দিয়ে আমাকে আপাদমস্তক একবার স্ক্যান করলেন।

"ত্রাহি মধুসূদন!" আমার ভেতরের আত্মাটা ডুকরে কেঁদে উঠল। সর্বনাশ! সর্বনাশ হয়ে গেছে! এটা তো আনিকার হাসব্যান্ড, বেলাল!

আনিকা বলেছিল বেলাল জার্মানিতে একটা কনফারেন্সে গেছে। সেখান থেকে কি লোকটা সোজা ঢাকা চলে এসেছে বউকে সারপ্রাইজ দিতে? শালার সারপ্রাইজ! বউকে সারপ্রাইজ দিতে এসে বেচারা নিজেই এমন এক সারপ্রাইজ খেল যে, এই ধাক্কা সামলাতে উনার বাকি জীবন পার হয়ে যাবে!

আমার হাত-পা কাঁপতে শুরু করেছে। আমি বুঝতে পারছি না আমার এখন কী করা উচিত। যেকোনো সাধারণ চোর বা প্রেমিক এই অবস্থায় পড়লে হয়তো দরজা মুখের ওপর বন্ধ করে দিয়ে ভেতরে গিয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু করত। অথবা জানালা দিয়ে পাইপ বেয়ে নিচে নামার চেষ্টা করত (ষোলো তলা বিল্ডিংয়ে যেটা অসম্ভব)।

কিন্তু আমার মস্তিষ্ক শর্টসার্কিট হয়ে এক অদ্ভুত, পরাবাস্তব রিফ্লেক্স তৈরি করল। আমি একটা চরম গাধার মতো, অত্যন্ত বিনীত এবং ভদ্র গলায় লোকটাকে জিজ্ঞেস করে বসলাম— "আপনি... আপনি কাকে চাচ্ছেন?"

প্রশ্নটা এতটাই ইডিয়টিক ছিল যে, লোকটা কয়েক সেকেন্ড কোনো কথাই বলতে পারলেন না। উনি উনার লাগেজটা এক হাতে ধরে, আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন আমি কোনো ভিনগ্রহের প্রাণী।

"আমি কাকে চাচ্ছি মানে?" লোকটার গলায় একটা কনফিউশন আর রাগ মেশানো স্বর। উনি একবার দরজার ওপরের ফ্ল্যাট নাম্বারের দিকে তাকালেন। "আপনি কে ভাই? এই ফ্ল্যাট কি..."

আমি আর লোকটাকে উনার বাক্য শেষ করার সুযোগ দিলাম না। আমার স্নায়ু তখন পুরোপুরি ফেল করেছে। আমি কী বলছি, আমি নিজেই জানি না। আমার মুখ দিয়ে অনর্গল কিছু অদ্ভুত শব্দ বেরিয়ে এল।

"ওহ! আপনি আনিকার কাছে এসেছেন? আনিকা তো ঘুমাচ্ছে। আপনি আসুন, ভেতরে আসুন। বসুন।" কথাটা বলে আমি দরজাটা পুরোটা খুলে দিয়ে, এক পাশে সরে গিয়ে উনাকে ভেতরে ঢোকার রাস্তা করে দিলাম!

বেলাল সাহেব (বা যিনিই হোন) চরম কনফিউজড এবং হতভম্ব হয়ে আমার কথা মতো ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমে পা রাখলেন। উনার এক হাতে লাগেজের হাতল। উনি ড্রয়িংরুমের ভেতর ঢুকে চারদিকে তাকাচ্ছেন।

আর এই সুযোগটাই আমি কাজে লাগালাম। আমি ড্রয়িংরুমে উনাকে দাঁড় করিয়ে রেখে এক দৌড়ে মাস্টার বেডরুমের দিকে গেলাম।

আনিকা তখনো বিছানায় অঘোরে ঘুমাচ্ছে। উনার ফর্সা, নগ্ন পিঠটা কমফোর্টারের বাইরে বেরিয়ে আছে। আমি আনিকাকে ডাকার, বা উনাকে জাগিয়ে পরিস্থিতি বোঝানোর কোনো বিন্দুমাত্র চেষ্টাই করলাম না। আমার তখন নিজের প্রাণ বাঁচানোর তাগিদ। 'চাচা আপন প্রাণ বাঁচা' প্রবাদটার মর্মার্থ আমি জীবনে এত তীব্রভাবে আগে কখনো অনুভব করিনি।

আমি বেডসাইড টেবিল থেকে ছোঁ মেরে আমার মানিব্যাগ আর মোবাইল ফোনটা পকেটে ঢোকালাম। আমার জুতোজোড়া ড্রয়িংরুমের এক কোণায় ছিল।

আমি বেডরুম থেকে বেরিয়ে, ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে থাকা সেই হতভম্ব লোকটার দিকে একবারও না তাকিয়ে, জুতোজোড়া হাতে নিয়ে আক্ষরিক অর্থেই ফ্ল্যাট থেকে দৌড়ে বেরিয়ে গেলাম!

আমি লিফটের জন্য অপেক্ষা করার সাহস পেলাম না। লিফট আসতে যদি এক মিনিটও লাগে, তার মধ্যে যদি লোকটা বুঝে ফেলে ঘটনা কী, তাহলে সে এসে আমাকে এই ষোলো তলা থেকে নিচে ফেলে দেবে।

আমি ইমার্জেন্সি সিঁড়ির দরজা খুলে পাগলের মতো নিচে নামতে শুরু করলাম। সাত তলা থেকে আমি কীভাবে দৌড়ে, লাফিয়ে, হোঁচট খেয়ে নিচে নামলাম, সেটা আমার মনে নেই। আমি যখন বিল্ডিংয়ের মেইন গেট দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে এলাম, তখন আমার বুকটা এমনভাবে ধড়ফড় করছে যেন সেটা বুকের পাঁজর ভেঙে বাইরে বেরিয়ে আসবে। আমার পায়ে তখনো জুতো নেই। আমি মোজা পরা পায়ে জুতো হাতে নিয়ে ধানমন্ডির রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি। 

সকাল ৭টা বাজে। রাস্তায় মানুষজন কম। প্রাতঃভ্রমণে বের হওয়া দুই-একজন লোক আমার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমি কোনোমতে জুতো জোড়া পায়ে গলিয়ে একটা গলির ভেতরে ঢুকে পড়লাম।

আমার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে। আমার মাথায় কোনো রক্ত নেই, সব রক্ত মনে হচ্ছে পায়ে নেমে গেছে। আমি গলির মোড়ে একটা টং দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। দোকানটা মাত্র খুলছে। "মামা, এক প্যাকেট বেনসন দেন তো," আমি কাঁপাকাঁপা গলায় বললাম।

দোকানদার আমাকে প্যাকেটটা দিল। আমি লাইটার জ্বালিয়ে একটা সিগারেট ধরালাম। একটা টান। দুইটা টান। তিনটা টান। আমি আক্ষরিক অর্থেই টানা তিন-চারটে সিগারেট এক বসায় শেষ করে ফেললাম।

সকালবেলা খালি পেটে, গত রাতের শারীরিক ধকলের পর, এভাবে টানা নিকোটিন ভেতরে যাওয়ায় আমার শরীরে একটা ভয়াবহ রিঅ্যাকশন হলো।

আমার মাথাটা বোঁ করে ঘুরে উঠল। পেটের ভেতর থেকে একটা তীব্র বমি বমি ভাব গলার কাছে উঠে এল। আমি ড্রেনের কাছে গিয়ে উবু হয়ে বসলাম, কিন্তু বমি হলো না। শুধু কয়েকবার শুকনো ওক তুললাম। আমার চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে আসছে।

"মামা, এক বোতল পানি দেন," আমি হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম। পানিটা নিয়ে আমি ঢকঢক করে কয়েক ঢোঁক খেলাম। একটু ধাতস্থ হওয়ার পর আমি ফুটপাতের একটা ভাঙা ইটের ওপর বসে পড়লাম।

কী করলাম আমি?

আমি আনিকাকে ওই অবস্থার মধ্যে ফেলে রেখে পালিয়ে এলাম? একজন ঘুমন্ত, নগ্ন নারীকে তার স্বামীর সামনে অরক্ষিত অবস্থায় রেখে আমি নিজের প্রাণ বাঁচাতে দৌড় দিলাম? আমি কি মানুষ, নাকি একটা কাপুরুষের চূড়ান্ত রূপ?

কিন্তু আমার তো আর কোনো উপায়ও ছিল না! আমি যদি সেখানে দাঁড়াতাম, লোকটা যদি আমাকে জিজ্ঞেস করত আমি কে, আমি কী উত্তর দিতাম? আমি কি বলতাম, "ভাই, আমি রাশেদ। আমি আপনার বউয়ের একজন কলিগ, গত ২২ দিন ধরে আমি আপনার বিছানায় ঘুমাচ্ছি!" আমার হাত তখনো কাঁপছে। আমি পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলাম।

কী হচ্ছে এখন ওই সাত তলার ফ্ল্যাটে? লোকটা কি আনিকাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলেছে? আনিকাকে ওই অবস্থায় দেখে লোকটার রিঅ্যাকশন কী হয়েছে? লোকটা কি আনিকাকে পেটাচ্ছে? খুন করে ফেলছে না তো?

আমার মাথার ভেতর শত শত ক্রাইম থ্রিলারের দৃশ্য ভাসতে শুরু করল। স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন! ধানমন্ডির বিলাসবহুল ফ্ল্যাট থেকে তরুণীর লাশ উদ্ধার!

আমি আর নিজেকে আটকাতে পারলাম না। আমার আঙুল আনিকার নাম্বারে ডায়াল করে ফেলল। রিং হচ্ছে। একবার, দুইবার, তিনবার।

আমার বুকটা ধড়ফড় করছে। ফোনটা কে ধরবে? আনিকা? নাকি ওই লোকটা? চারবারের মাথায় ফোনটা রিসিভ হলো। "হ্যালো?"

ওপাশ থেকে আনিকার ঘুম-জড়ানো, ভারী, এবং চরম বিরক্তিকর একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এল। "রাশেদ? কী ব্যাপার? তুমি কি অফিসে চলে গেছ এত সকালে? আমাকে না বলেই?"

উনার গলা শুনে মনে হলো, উনার পৃথিবীতে এখনো কোনো ভূমিকম্প হয়নি। উনি এখনো বিছানায় শুয়ে আছেন, এবং হয়তো ড্রয়িংরুমে বসা উনার হাসব্যান্ডকে উনি এখনো দেখেননি।

আমি ঢোঁক গিলে, আমার জীবনের সবচেয়ে কাঁপাকাঁপা এবং আতঙ্কিত গলায় বললাম— "অফিস! কিসের অফিস আনিকা! সর্বনাশ হয়ে গেছে! তোমার ফ্ল্যাটের বসার ঘরে তোমার হাসব্যান্ড! উনি লাগেজ নিয়ে এসেছেন। আমি উনাকে ভেতরে ঢুকতে দিয়ে নিচে পালিয়ে এসেছি। কী করব আমি বুঝতে পারছিলাম না আনিকা..."

আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই... খট। লাইনটা কেটে গেল।

আমি হ্যালো হ্যালো করতে থাকলাম, কিন্তু ওপাশে শুধু ডেড টোন। আনিকা ফোনটা সাথে সাথে কেটে দিয়েছেন। আমি ফুটপাতের ওপর বসে পাথরের মতো জমে গেলাম।

কী হচ্ছে এখন ওই ফ্ল্যাটে?

আনিকা কি ফোনটা রেখেই লাফ দিয়ে উঠেছেন? ড্রয়িংরুমে গিয়ে উনার স্বামীর মুখোমুখি হয়েছেন? বেলাল সাহেব কি উনাকে জিজ্ঞেস করেছেন, "এই ছেলেটা কে ছিল, যে আমার দরজা খুলে দিল?" আনিকা কী জবাব দিচ্ছেন?

কী হচ্ছে ওখানে? ঝগড়া? মারামারি? রক্তারক্তি? খুনাখুনি হয়ে যাবে না তো?
ওহ গড! আমি কী করব এখন? আমি কি পুলিশে কল দেব? নাকি দৌড়ে আবার ওই সাত তলায় যাব আনিকাকে বাঁচাতে? কিন্তু আমি যদি যাই, বেলাল সাহেব তো আমাকেই আগে খুন করবে!

আমি, রাশেদ আহমেদ, একজন পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের নিরীহ অনুবাদক, আজ সকালে ধানমন্ডির ফুটপাতে বসে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে ভয়াবহ থ্রিলারের ক্লাইম্যাক্সের মুখোমুখি হয়ে সম্পূর্ণ দিশেহারা হয়ে গেলাম।

আমার চারপাশের পৃথিবীটা মনে হচ্ছে একটা বিশাল ব্ল্যাকহোলের মতো ঘুরছে।

সময় ব্যাপারটা যে কতটা আপেক্ষিক, তা আমি ফুটপাতের ওই ভাঙা ইটটার ওপর বসে হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছিলাম। ঘড়ির কাঁটা বলছে, আমি আনিকার ফ্ল্যাট থেকে দৌড়ে নিচে নেমেছি মাত্র ত্রিশ থেকে চল্লিশ মিনিট আগে। কিন্তু আমার স্নায়ু, আমার হৃৎপিণ্ড আর আমার মাথার ভেতরের সাইকোলজিক্যাল ঘড়ি বলছে— কয়েকটা শতাব্দী, বা কয়েক আলোকবর্ষ পার হয়ে গেছে।

এই চল্লিশ মিনিটে আমি আমার মাথার ভেতর কম করে হলেও একশটা থ্রিলার সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখে ফেলেছি। উপরে এখন কী হচ্ছে? বেলাল সাহেব কি ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে আনিকাকে জেরা করছেন? আনিকা কি কান্নাকাটি করছেন? নাকি বেলাল সাহেব রাগের মাথায় কিচেন থেকে ছুরি এনে আনিকাকে জবাই করে দিয়েছেন?

আর আনিকাই বা কী লজিক দাঁড় করাচ্ছেন? উনি কি বলছেন— "ওহ, ওই ছেলেটা? ওইটা তো আমার বইয়ের প্রুফরিডার। সকাল ছয়টায় ওর হঠাৎ মনে হলো আমার উপন্যাসের তৃতীয় অধ্যায়ের একটা কমা ভুল আছে, তাই সে খালি পায়ে, উসকোখুস্কো চুলে সেটা ঠিক করতে এসেছিল!"

না, বেলাল সাহেব তো আর গাধা নন। এত বড় ইঞ্জিনিয়ার মানুষ, উনি কি এই গাঁজাখুরি গল্প বিশ্বাস করবেন? নিশ্চয়ই উনি এখন আনিকার ফোন চেক করছেন। একটু পরেই হয়তো পুলিশ কল করবেন। বাংলাদেশের পত্রিকাগুলোর হেডলাইন আমার চোখের সামনে ভাসতে লাগল— "ধানমন্ডিতে পরকীয়ার জেরে প্রুফরিডার খুন! স্যুটকেস থেকে অনুবাদকের লাশ উদ্ধার!"

ভয়ে আমার পেটের ভেতরটা গুলিয়ে উঠল। মধ্যবিত্ত মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো পুলিশ আর পাবলিক স্ক্যান্ডাল। আমি যদি এখন মরেও যাই, আমার বাবা নওগাঁর ভুসিমালের দোকানে বসে যখন শুনবেন তার গুণধর ছেলে অন্যের বউয়ের বিছানায় শুতে গিয়ে খুন হয়েছে, তখন বেচারা স্ট্রোক করে ওখানেই মারা যাবেন।

আমার ভাবনার এই ভয়াবহ সাইক্লোনের মাঝখানেই হঠাৎ আমার প্যান্টের পকেটে মোবাইলটা ভাইব্রেট করে উঠল। আমি চমকে উঠলাম। কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা বের করলাম। হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ এসেছে।

স্ক্রিনে নাম জ্বলজ্বল করছে— 'Anika Nawhar'। মেসেজটা খুব ছোট। মাত্র চারটা শব্দ। "উপরে আসো। সমস্যা নেই।"

আমি মেসেজটার দিকে একদৃষ্টে অন্তত দুই মিনিট তাকিয়ে রইলাম। আমার চোখের তারা বড় হয়ে গেছে। কী করব আমি? উপরে যাব? এই মেসেজ কি সত্যিই আনিকা পাঠিয়েছে? নাকি উনার স্বামী বেলাল সাহেব আনিকার ফোনটা কেড়ে নিয়ে আমাকে ফাঁদে ফেলার জন্য এই মেসেজ টাইপ করেছেন? আমি উপরে গেলেই কি বেলাল সাহেব দরজা আটকে দিয়ে আমাকে রামধোলাই দেওয়া শুরু করবেন?

আমার ভেতরের লজিক বলছে— "রাশেদ, পালাও! যেদিকে দুই চোখ যায় দৌড়াও! কারওয়ান বাজারের অফিসে গিয়ে ল্যাপটপের নিচে লুকিয়ে থাকো। জীবনে আর ধানমন্ডির ছায়াও মাড়াবে না।"

কিন্তু ওই যে, মানুষের একটা অবচেতন কৌতূহল থাকে। তাছাড়া, আমার শার্ট, প্যান্ট, জুতো— সব তো ওই ফ্ল্যাটেই। আমি এই একটা টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরে খালি পায়ে তো আর সারা জীবন ঢাকা শহরে ঘুরতে পারব না। আর তার চেয়েও বড় কথা, আনিকা নামের ওই রহস্যময়ী নারীটির ওপর আমার এক অদ্ভুত, অন্ধ বিশ্বাস জন্মে গেছে। আমার মনে হলো, আনিকা যখন বলেছে 'সমস্যা নেই', তার মানে হয়তো সত্যিই সে কোনো না কোনোভাবে পরিস্থিতি সামলে নিয়েছে।

অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্ব, অনেক দোয়া-দরুদ আর নিজের বোকামিকে গালি দিতে দিতে আমি উঠে দাঁড়ালাম।
Reply
#25

২৫


আবার বিল্ডিংয়ের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। লিফটে করে আমি আবার সাত তলায় উঠলাম। আমার হার্টবিট তখন প্রতি মিনিটে হয়তো দুইশো। আমি কাঁপাকাঁপা হাতে কলিংবেল বাজালাম। কয়েক সেকেন্ড পর দরজা খুলল।

দরজার ওপাশে আনিকা নাওহার দাঁড়িয়ে আছেন। উনার পরনে তখনো সেই মেরুন রঙের স্লিপিং গাউন। উনার মুখে কোনো ভয়, কোনো কান্না বা কোনো আতঙ্কের চিহ্নমাত্র নেই। উল্টো উনার চেহারায় একটা চরম বিরক্তি।

আমাকে দেখে আনিকা খুব নিচু কিন্তু ঝাঁঝালো গলায় বললেন, "এভাবে রকেটের মতো পালানোর কী আছে রাশেদ? তুমি কি বাচ্চা ছেলে?" কথাটা শুনে আমার আক্ষরিক অর্থেই ভিরমি খাওয়ার জোগাড় হলো। আমি মনে মনে বললাম— "কী বলে এই মহিলা! আমি আপনার সাথে গত এক মাস ধরে রঙ্গরস করে বেড়াচ্ছি, আপনার বিছানায় ঘুমাচ্ছি, আর এই অবস্থায় আপনার স্বামীর কাছে আমি হাতেনাতে ধরা পড়েছি! আমি পালাব না তো কী করব? ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে কি আমি মুজরা নাচ নাচব? নাকি আপনার স্বামীকে বলব, 'আসেন ভাই, হ্যান্ডশেক করি। আমি আপনার শিফট পার্টনার'!"

আমি কোনো কথা না বলে মাথা নিচু করে ফ্ল্যাটের ভেতর ঢুকলাম। ড্রয়িংরুম পেরিয়ে ডাইনিং স্পেসে ঢোকার পর আমার বিস্ময়ের মাত্রা দশের স্কেল ছাড়িয়ে গেল। ডাইনিং টেবিলের এক প্রান্তে বসে আছেন বেলাল সাহেব। উনার সামনে এক মগ ধোঁয়া ওঠা ব্ল্যাক কফি। আমাকে দেখেই মুখ তুলে তাকালেন। উনার ঠোঁটের কোণে একটা খুব ভদ্র, পরিশীলিত এবং অমায়িক হাসি।

"কী ব্যাপার রাশেদ সাহেব!" বেলাল সাহেব খুব ক্যাজুয়াল গলায় বললেন। "যেভাবে দৌড়ে গেলেন, আমি তো ভাবলাম আপনি হয়তো সকালের নাশতা আনতে নিচে গেছেন। আসুন, বসুন।"

আমি ডাইনিং টেবিলের একটা চেয়ার ধরে পাথরের মতো জমে গেলাম। কী হচ্ছে এসব? এই লোকটা কি পাগল? নাকি আস্ত একটা আহাম্মক? তার অনুপস্থিতিতে তার নিজের ফ্ল্যাটে, তার নিজের বিছানায়, তার স্ত্রীকে আমি আক্ষরিক অর্থেই ভোগ করেছি। তার পুরো সংসারটাকে আমি একটা প্লেটের মতো চেটেপুটে খেয়েছি। আর সেই লোকটা আমাকে দেখে হাসিমুখে বলছে— 'ভাবলাম নাশতা আনতে গেছেন'!

আমি একটা বড়সড় ঢোঁক গিললাম। আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। "না... মানে... আসলে একটা ইমার্জেন্সি..." আমি আমতা আমতা করে কিছু একটা বলার চেষ্টা করলাম।

"আরে ঠিক আছে, ইটস ওকে। আনিকা আমাকে সব বলেছে," বেলাল সাহেব কফিতে চুমুক দিয়ে খুব শান্ত গলায় বললেন।

আনিকা সব বলেছে! কী বলেছে আনিকা? আমি আড়চোখে আনিকার দিকে তাকালাম। আনিকা ততক্ষণে কিচেন থেকে আমার জন্য এক মগ কফি নিয়ে এসেছেন। উনি কফির মগটা আমার সামনে রেখে আমার পাশের চেয়ারটায় বসলেন। উনার চোখেমুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। আমি জানি না এই নারী উনার স্বামীকে কী গাঁজাখুরি গল্প বুঝিয়েছেন। হয়তো বলেছেন, "ও হচ্ছে রাশেদ। আমার প্রুফরিডার। ওর মেসে কাল রাতে ডাকাতি হয়েছে, তাই বেচারা ভয়ে আমার এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছিল।" কিংবা হয়তো এমন কোনো হাই-লেভেলের সাইকোলজিক্যাল মিথ্যা বলেছেন, যেটা ধরার মতো ক্ষমতা বেলাল সাহেবের এই ইঞ্জিনিয়ারিং মস্তিষ্কের নেই।

আমরা তিনজন একটা ডাইনিং টেবিলে বসে কফি খাচ্ছি। দৃশ্যটা যদি কেউ দূর থেকে দেখত, তার মনে হতো এটা খুব সাধারণ একটা পারিবারিক আড্ডা। কিন্তু আমার কাছে এই নীরবতাটা ছিল একটা ইলেকট্রিক চেয়ারে বসে থাকার মতো। কফির মগে চামচ নাড়ার 'টুং টাং' শব্দটা আমার কানের ভেতর বোমার মতো ফাটছিল। আমি গরম কফিটা প্রায় এক নিশ্বাসে গিলে ফেললাম। আমার জিহ্বা পুড়ে গেল, কিন্তু আমি কোনো রিঅ্যাকশন দেখালাম না।

কফি শেষ হতেই বেলাল সাহেব আনিকার দিকে তাকিয়ে খুব নরম গলায় বললেন, "অনেক টায়ার্ড লাগছে আনিকা। জার্নিটা খুব হেকটিক ছিল। চলো, একটু রেস্ট নিই।" আনিকা উনার দিকে তাকিয়ে সেই মোহনীয় হাসিটা দিলেন। "চলো।"

তারপর আনিকা আমার দিকে ফিরলেন। "রাশেদ, তুমি গেস্ট রুমে গিয়ে রেস্ট নাও। পরে কথা হবে।" আমি একটা ঘোরের মধ্যে মাথা নাড়লাম। আমার চোখের সামনেই, আনিকা নাওহার উনার স্বামী বেলাল সাহেবের হাত ধরে মাস্টার বেডরুমের দিকে পা বাড়ালেন।

উনারা বেডরুমে ঢুকলেন। দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। এবার আর ভেজানো নয়, খুব স্পষ্ট একটা 'ক্লিক' শব্দ করে দরজাটা ভেতর থেকে লক হলো। আমি ডাইনিং টেবিলে একা বসে রইলাম। হঠাৎ করে আমার বুকের ভেতর এমন একটা প্রচণ্ড, তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা মোচড় দিয়ে উঠল, যার জন্য আমি একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না।

আমি ধীর পায়ে উঠে গেস্ট রুমের দিকে গেলাম। এই সেই গেস্ট রুম, যেখানে গত ২২ দিন আমি আনিকার কিনে দেওয়া জামাকাপড় রাখতাম। কিন্তু আজ এই ঘরটা আমার কাছে একদম অচেনা, ভিনগ্রহের কোনো জায়গার মতো মনে হচ্ছে। একইসঙ্গে এক অদ্ভুত বিভ্রান্তি। এই ভদ্রলোক কিভাবে আমার উপস্থিতি এতো সহজে মেনে নিলেন। আনিকা তাঁকে কি বুঝিয়েছে। এরকম শান্তশিষ্ট গোবেচারা স্বামী পাতি বাংলা উপন্যাসে দেখা যায়! বাস্তবে হয় নাকি।

আমি ভাবনায় ছেদ পড়ল মোবাইলের ভাইব্রেশনে। আনিকার মেসেজ। "কোনো ঝামেলা নেই। আমি আপাতত সামাল দিয়ে দিয়েছি। বেলাল ভেবেছে তুমি আমার আইটি ফার্মের ঢাকার লোকাল রেপ্রেজেন্টেটিভ, কাল রাত পর্যন্ত আমার সাথে মিটিং করে এখানেই ঘুমিয়ে পড়েছিলে। তবে তোমার আর এখানে থাকার দরকার নেই। আমি কিছুক্ষণ পর আমার রুম থেকে তোমার যা যা জিনিস আছে, সব একটা ব্যাগে ভরে দরজার বাইরে রেখে দিচ্ছি। তুমি বাকি জিনিসপত্র নিয়ে আস্তে করে কেটে পড়ো। বাকি প্ল্যান-পরিকল্পনা আমরা পরে দুজনে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেব।"

আমি মেসেজটা পড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।  কী নিখুঁত, কী নিপুণ, কী কর্পোরেট একটা মেসেজ! তবুও আমার অস্বস্তিটা গেলো না। বেলাল সাহবে দেখেছেন আমি তাঁর বেডরুমের থেকে নিজের মানিব্যাগ ও ফোন নিয়ে বের হইছি। রাত হয়ে গেছে বলে যদি বাসায় থেকেও যাই, তাহলে থাকব গেস্টরুমে। বেডরুমে থাকব কেমনে! এই বিষয়টা আনিকার তাঁর স্বামীকে কি করে বুঝলো! কী বলে বুঝ দিল। দূর, আমার মাথা কাজ করছে না।

"আস্তে করে কেটে পড়ো।" এই একটা বাক্য আমাকে আমার আসল অবস্থানটা পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিল। আমি আসলে কে? আমি একজন খেলনা। আমি একজন সাবস্টিটিউট। মেইন প্লেয়ার যখন মাঠে থাকে না, তখন আমি ওয়ার্ম-আপ করি। আর মেইন প্লেয়ার মাঠে ফিরলেই আমাকে আবার সেই সাইডলাইনে, রিজার্ভ বেঞ্চে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

আমি খুব দ্রুত নিজেকে রেডি করলাম। আমার নিজের শার্ট, প্যান্ট পরলাম। আনিকার কিনে দেওয়া আড়ংয়ের জামাকাপড়গুলো গোছাতে শুরু করলাম। প্রায় পনেরো মিনিট পর।

আমি আমার ব্যাগটা নিয়ে গেস্ট রুম থেকে বের হলাম। মাস্টার বেডরুমের দরজার সামনে গিয়ে দেখলাম, আনিকা সত্যিই একটা শপিং ব্যাগে আমার শেভিং কিট, আমার ঘড়ি আর কয়েকটা ছোটখাটো জিনিস ভরে দরজার বাইরে রেখে দিয়েছেন।

আমি ব্যাগটা হাতে নিলাম। আমি এখন এই ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে যাব। ঠিক সেই মুহূর্তে... মাস্টার বেডরুমের ওই বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে একটা শব্দ আমার কানে এল।

থপ... থপ... থপ... শব্দটা খুব রিদমিক। একটা ভারী, মাংসল শব্দ। আমার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল। আমার চোখের সামনে যেন একটা কালো পর্দা নেমে এল। এই শব্দটা আমার খুব চেনা। গত ২২ দিন ধরে আমি এই শব্দটা খুব কাছ থেকে শুনেছি। যখন মিশনারি পজিশনে (Missionary Position) আনিকা নাওহারের সেই নরম, ফর্সা উরু দুটো ফাঁক করে আমি আমার শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে উনার গভীরে আঘাত করতাম, তখন ঠিক এই শব্দটাই হতো। উনার নিতম্বের সাথে আমার শরীরের ঘর্ষণে এই থপ... থপ... শব্দটা তৈরি হতো। আমি পাথরের মতো জমে গেলাম।

দরজার ওপাশ থেকে এবার আনিকার একটা খুব মৃদু, চাপা গোঙানির শব্দ এল। "উমমম... বেলাল... ইয়েস..." আমার মনে হলো, কেউ যেন আমার বুকের খাঁচাটা হাত দিয়ে চিরে আমার হৃৎপিণ্ডটা বের করে এনে সেটাকে একটা নোংরা ড্রেনে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে।

হায় রে কপাল! আমার বউ, আমার রানী, আমার প্রেমিকা, আমার স্বর্গ— আজ অন্য কোনো পুরুষ লুট করে নিয়ে যাচ্ছে! আমার চোখের সামনে, মাত্র একটা কাঠের দরজার ওপাশে, আমার সেই অপ্সরী নারীর শরীরটাকে অন্য কেউ ভোগ করছে।

আমার ভেতরে এক চরম, অন্ধ ঈর্ষা আর ক্ষোভ ফুঁসে উঠল। আমার ইচ্ছে করল, আমি ওই দরজাটা লাথি মেরে ভেঙে ফেলি। ভেতরে ঢুকে ওই বেলাল সাহেবের কলার চেপে ধরে বলি, "খবরদার! ওই শরীরে হাত দিবি না। ওই শরীরটা আমার। ওই শরীরের প্রতিটি ইঞ্চিতে আমার অধিকার!"

কিন্তু... পরক্ষণেই একটা চরম, নগ্ন এবং নিষ্ঠুর সত্য আমার মুখের ওপর একটা চড় কষিয়ে দিল। অন্য পুরুষ লুট করছে? না তো। অন্য পুরুষ নয়। সেই লোকটাই তো আনিকার আসল পুরুষ। সে-ই তো আনিকার স্বামী, তার লিগ্যাল পার্টনার। এই বিছানা তার, এই ফ্ল্যাট তার, এই নারীও তার।

আমি কে? আমি তো একজন অনাহূত অতিথি। আমি তো একটা চোর, যে মালিকের অনুপস্থিতিতে তার ঘরে ঢুকে চুরি করে খাচ্ছিলাম। আজ মালিক ফিরে এসেছে, আর চোরকে তার পাততাড়ি গুটিয়ে পালাতে হচ্ছে। লুট তো বেলাল সাহেব করছেন না, লুট তো আমি করছিলাম!

এই সত্যটা উপলব্ধি করার পর আমার ভেতরের সমস্ত রাগ, সমস্ত ইগো এক মুহূর্তে ধুলোয় মিশে গেল। তার জায়গা নিল এক চরম, প্যাথলজিক্যাল হাহাকার আর একটা তীব্র অপমানবোধ। আমি আর এক সেকেন্ডও ওই দরজার সামনে দাঁড়ালাম না।

আমি আমার পরাজিত, লজ্জিত আর পরিত্যক্ত সত্তাটাকে দুটো শপিং ব্যাগের ভেতর ভরে ফ্ল্যাটের মেইন দরজা খুলে বেরিয়ে এলাম। দরজাটা খুব সাবধানে, নিঃশব্দে টেনে বন্ধ করে দিলাম। নিচে নেমে একটা উবার কার ডাকলাম। গাড়িতে উঠে যখন বসলাম, তখন সকাল ৯টা ২০ মিনিট বাজে।

গাড়ির এসি চলছে। আমি কাঁচের জানালার বাইরে তাকালাম। ঢাকা শহর তার চেনা ব্যস্ততায় জেগে উঠেছে। মানুষজন ছুটছে। রিকশা, বাস, সিএনজি— সব কিছু আগের মতোই আছে। শুধু আমার ভেতরের পৃথিবীটা একটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে গেছে।

আমি পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে এহসান ভাইকে একটা মেসেজ টাইপ করলাম। "এহসান ভাই, আজকে অফিসে আসতে ঘণ্টা দুয়েক দেরি হবে। জ্যামে আটকা পড়েছি। আমি এক্সট্রা টাইম করে আমার কাজ পুষিয়ে দেব।" মেসেজটা সেন্ড করে আমি ফোনটা সিটের ওপর ফেলে রাখলাম।

উবারের গাড়িতে বসে আছি। বাইরে কড়া রোদ, কিন্তু আমার চোখে শুধু ঘুটঘুটে অন্ধকার। কী হচ্ছে আমার জীবনে? কী হবে এরপর? আনিকা কি আর কোনোদিন আমার সাথে যোগাযোগ করবে? আমি কি এই ফ্ল্যাট সার্কেলের ঘোর থেকে বের হতে পারব? নাকি এই অপমানের বোঝা নিয়ে আমাকে বাকি জীবন পার করতে হবে?
আমি কিচ্ছু জানি না। আমার মাথার ভেতর শুধু একটা শব্দ ইকো হচ্ছে— থপ... থপ... থপ...

মিরপুরের মেসে যখন এসে পৌঁছালাম, ঘড়িতে তখন সকাল নয়টা বেজে পঞ্চাশ মিনিট। পঁচিশ দিন পর নিজের চেনা ডেরায় ফিরে আসার অনুভূতিটা কেমন হওয়া উচিত? একজন স্বাভাবিক মানুষের মনে হওয়ার কথা— ‘যাক, অবশেষে নিজের ঠিকানায় ফেরা গেল। কী শান্তি!’

কিন্তু আমার সেরকম কিছুই মনে হলো না। মেসের লোহায় জং ধরা বিশাল গেট, সিঁড়ির কোণায় জমে থাকা পানের পিক, আর বাতাসে ভাসা একটা স্যাঁতস্যাঁতে, গুমোট গন্ধ আমাকে যেন উপহাস করতে লাগল। মনে হলো, আমি যেন কোনো রাজপ্রাসাদ থেকে নির্বাসিত হয়ে আবার আস্তাকুঁড়ে এসে পড়েছি।

দরজায় টোকা দিতেই দরজা খুলে দিল তুহিন। আমাকে দেখে তার চোখের তারা আক্ষরিক অর্থেই কপালে উঠে গেল। সে এমন একটা লাফ দিল যেন সে কোনো জ্যান্ত ভূত দেখেছে। "রাশেদ ভাই! আপনি! আপনি জিন্দা আছেন?" তুহিন প্রায় চিৎকার করে উঠল।

তার চিৎকারে রাজুও রুম থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এল। তার হাতে বাংলাদেশ বিষয়াবলির একটা গাইড বই। আমাকে দেখে সেও হাঁ হয়ে গেল। "ভাই, আপনি শেষমেশ আসলেন? কই ছিলেন এই এক মাস? আমরা তো ভাবছিলাম আপনি নির্ঘাত গুম হয়ে গেছেন, অথবা কোনো বড়লোকের মাইয়া বিয়া করে বিদেশে সেটেল হয়ে গেছেন!"

আমি ওদের কথার কোনো জবাব দিলাম না। আমার মাথায় তখনো ধানমন্ডির সেই ষোলো তলা ফ্ল্যাটের দৃশ্যগুলো একটা ভাঙা রেকর্ডের মতো বাজছে। বেলাল সাহেবের সেই কফি খাওয়ার দৃশ্য, আর মাস্টার বেডরুমের বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে আসা সেই ‘থপ... থপ...’ শব্দ।

"ভাই, কথা কন না ক্যান? ঘটনা কী?" তুহিন নাছোড়বান্দা।

আমি খুব ক্লান্ত, বিরক্ত গলায় বললাম, "তুহিন, আমি খুব টায়ার্ড। আমাকে একটু ফ্রেশ হতে দে।"

আমি আমার রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলাম। রুমের ভেতরে ধুলোর আস্তরণ জমে আছে। আমি একটা গামছা নিয়ে সোজা বাথরুমে চলে গেলাম। মিরপুরের মেসের বাথরুম। বালতিতে জমানো ঠান্ডা পানি। মগে করে সেই পানি মাথায় ঢালার সময় আমার মনে পড়ল আনিকার সেই রেইন-শাওয়ার আর বাথটাবের কথা। কোথায় সেই গরম পানির আরামদায়ক স্পর্শ, আর কোথায় এই কনকনে ঠান্ডা পানি! বাস্তবতার এই রূঢ় পতন মেনে নেওয়াটা খুব কঠিন।

গোসল শেষ করে, নিজের একটা পুরনো, সুতির শার্ট আর প্যান্ট পরে আমি মেস থেকে বের হলাম। রাস্তার মোড়ে ‘বিসমিল্লাহ হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট’। সেখানে বসে একটা প্লাস্টিকের প্লেটে ডালভাজি আর দুটো তেলচিটচিটে পরোটা খেলাম। গত পঁচিশ দিন আমি আনিকার সাথে কী খেয়েছি? ফুডপান্ডার চিকেন স্টেক, মাটন বিরিয়ানি, পিৎজা! আর আজ এই ডালভাজির স্বাদ যেন আমার মুখে ছাইয়ের মতো লাগছিল।

খাওয়া শেষ করে, বাসে ঝুলে ঝুলে যখন কারওয়ান বাজারের অফিসে পৌঁছালাম, তখন ঘড়িতে এগারোটা ছেচল্লিশ। এহসান ভাই আমার দিকে তাকিয়ে একটা বাঁকা হাসি দিলেন। "কী ব্যাপার রাশেদ? আজকে কি হাফ ডে লিভ নাকি? এগারোটা ছেচল্লিশে অফিসে আসছ!"

"জ্যাম ছিল ভাই। রাস্তায় খুব জ্যাম," আমি একটা রেডিমেড মিথ্যা বলে আমার ডেস্কে গিয়ে বসলাম।

ল্যাপটপটা ওপেন করেই আমি আমার পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলাম। আমার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত যন্ত্রণা কাজ করছে। আনিকা কী করছে এখন? বেলাল সাহেব কি আনিকাকে সন্দেহ করছেন? আনিকা কি বিপদে আছে?

আমি হোয়াটসঅ্যাপ ওপেন করে আনিকাকে একটা মেসেজ টাইপ করলাম: "কী হয়, কী হচ্ছে, আমাকে জানিও। তোমার জন্য খুব টেনশন হচ্ছে আনিকা।"

মেসেজটা পাঠিয়ে আমি ল্যাপটপে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করলাম। আমেরিকার পলিটিক্স, জো বাইডেন, ইউক্রেন যুদ্ধ— সবকিছু আমার চোখের সামনে ভাসছে, কিন্তু আমার মস্তিষ্ক সেগুলো প্রসেস করতে পারছে না।

প্রায় আধঘণ্টা পর, একটা নিউজ শেষ করে আমি একটা সিগারেট খাওয়ার জন্য অফিসের স্মোকিং লাউঞ্জে গেলাম। লাউঞ্জে কেউ নেই। আমি সিগারেট ধরিয়ে পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলাম। হোয়াটসঅ্যাপে নোটিফিকেশন এসেছে। আনিকার রিপ্লাই।

আমি দ্রুত মেসেজটা ওপেন করলাম। এবং মেসেজটা পড়ার সাথে সাথে আমার হাতের সিগারেটটা প্রায় ছিটকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। আনিকা লিখেছেন: "কী আর করব, তুমি নাই তাই নিজের আঙুল দিয়ে গুদ শান্ত করি।"

আমার চোখ কপালে উঠে গেছে। কী বলছে এই মহিলা? এই মহিলা কি আস্ত পাগল? আজ সকালে উনার হাসব্যান্ড ইংল্যান্ড থেকে এসে হাজির হয়েছেন। আমি কোনোমতে জান নিয়ে পালিয়ে এসেছি। উনার হাসব্যান্ড হয়তো পাশের রুমে বা ড্রয়িংরুমেই বসে আছেন। আর এই অবস্থায়, এই ভরদুপুরে উনি আমাকে এই লেভেলের একটা স্ল্যাং, একটা চরম নোংরা এবং উত্তেজক মেসেজ পাঠাচ্ছেন!

আমি মেসেজটার দিকে তাকিয়ে হতভম্ব হয়ে রইলাম। কী রিপ্লাই দেব আমি? আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই, আনিকা উনার পাগলামির চূড়ান্ত রূপটা দেখালেন। হোয়াটসঅ্যাপে আরেকটা নোটিফিকেশন এল। একটা ছবি। আমি কাঁপাকাঁপা হাতে ছবিটা ডাউনলোড করলাম। ছবিটা একটা মিরর সেলফি। আনিকার সেই ধানমন্ডির ফ্ল্যাটের মাস্টার বাথরুমের বিশাল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তোলা। আনিকা সম্পূর্ণ নগ্ন। উনার এক হাত উনার সেই ভরাট বক্ষদেশের একটা স্তন খামচে ধরে আছে, আর অন্য হাতে ফোন ধরে উনি আয়নায় ছবি তুলছেন। উনার পা দুটো সামান্য ফাঁকা করা। উনার চোখদুটো কামনায় আধবোজা।

আমি স্মোকিং লাউঞ্জের কাঁচের দরজার দিকে তাকালাম। কেউ আসছে কি না। আমার শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হয়ে গেছে। আমি দ্রুত টাইপ করলাম: "কী শুরু করলে এসব আনিকা? তুমি কি পাগল হয়ে গেছ? ভুলে গেছ আজ সকালে কী হয়েছে? তোমার স্বামী তো বাসায়!"

এক সেকেন্ডের মধ্যেই আনিকার রিপ্লাই এল: "বাদ দাও তো। শুয়োরটা দেশে আসার আর কোনো সময় পেল না!"

আমি পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। 'শুয়োরটা!' নিজের স্বামীকে একজন নারী এভাবে বলছে! এই আনিকা নাওহার কি কোনো সাইকোপ্যাথ? উনার কি কোনো ইমোশন, কোনো অপরাধবোধ, কোনো ভয়ভীতি নেই? উনার কাছে কি উনার স্বামী স্রেফ একটা বিরক্তিকর আপদ, যে উনার আর আমার আদিম খেলায় বাধা দিতে এসেছে?

আমি সত্যিই ভেবে পেলাম না কী বলব। আমি ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে দ্রুত লাউঞ্জ থেকে বেরিয়ে এলাম। এভাবে কেটে গেল দুটো দিন। ৩রা এপ্রিল আর ৪থা এপ্রিল। এই দুটো দিন ছিল আমার জীবনের অন্যতম ভয়াবহ মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতনের দিন। আনিকা আমাকে যতভাবে সম্ভব, ততভাবে হর্নি (horny) বা উত্তেজিত করার চেষ্টা চালিয়ে গেলেন।

উনার স্বামী হয়তো ড্রয়িংরুমে টিভি দেখছেন, আর উনি বাথরুমে ঢুকে আমাকে উনার স্তনের ছবি পাঠাচ্ছেন। মাঝে মাঝে পাঠাতেন ভয়েস নোট। আমি অফিসে বসে ইয়ারফোন কানে দিয়ে সেই ভয়েস নোটগুলো শুনতাম আর আমার শরীরের রক্ত মাথায় উঠে যেত।

ভয়েস নোটে উনার গলাটা থাকত চরম সেক্সুয়াল , ভেজা এবং হাঁপানো।"রাশেদ... উমমম... তোমার কথা খুব মনে পড়ছে। তোমার ওই শক্ত জিনিসটা ছাড়া আমার এক মুহূর্তও ভালো লাগছে না। আমার সারা শরীর তোমার জন্য পুড়ে যাচ্ছে জান। কাল রাতে বেলাল আমাকে ছুঁতে এসেছিল, আমি ওকে সরিয়ে দিয়েছি। আমার শরীরটা শুধু তোমার... উমমম... ইসসস..."

এই ধরনের ভয়েস নোট আর মেসেজগুলো আমাকে আক্ষরিক অর্থেই পাগল করে দিচ্ছিল। আমি মিরপুরের মেসে রাতে শুয়ে শুয়ে উনার ওই ছবিগুলো দেখতাম আর যন্ত্রণায় ছটফট করতাম। কিন্তু যখনই আমি উনাকে জিজ্ঞেস করতাম— "বাসার কী অবস্থা? তোমার স্বামীকে কীভাবে ম্যানেজ করলে? উনি কি কিছু সন্দেহ করছেন?"

আনিকা অত্যন্ত কৌশলে এড়িয়ে যেতেন। উনি বলতেন, "আরে ওসব নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। আমি ম্যানেজ করে নিয়েছি। তুমি শুধু বলো, আমাকে তোমার কতটা মনে পড়ছে।" উনার এই এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখে আমি শেষে বিরক্ত হয়ে উনাকে উনার স্বামীর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করাই বাদ দিলাম। আমি বুঝতে পারলাম, এই নারী শুধু বর্তমানের উত্তেজনাটা উপভোগ করতে চান।

৫ই এপ্রিল। বিকেলবেলা।

অফিসে বসে আমি একটা নিউজ এডিট করছি। ঘড়িতে তখন বিকেল তিনটে বেজে পঞ্চাশ মিনিট। হঠাৎ আনিকার মেসেজ এল। "আমি আর বেলাল বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্সে আসছি। তুমি চার তলার বাথরুমের আশেপাশে এসে একটু লুকিয়ে থাকো। আমাকে দেখলে মেসেজ দেবে।"

মেসেজটা পড়ার পর আমার ব্রেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য ব্ল্যাঙ্ক হয়ে গেল। বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্স! চার তলার বাথরুম! তার মানে আনিকা সেখানে আমার সাথে দেখা করতে চান? তাও আবার উনার স্বামীর উপস্থিতিতে? আমি বুঝে গেলাম আনিকা কী চাইছেন। উনার ওই বন্য, আদিম মাথাটায় এখন একটা চরম উত্তেজনাকর ফ্যান্টাসি ঘুরছে। উনি চান উনার স্বামী শপিং মলের কোথাও ব্যস্ত থাকুক, আর উনি বাথরুমে ঢুকে আমার সাথে...

ভাবতেই আমার শরীরের প্রতিটি রোমকূপ খাড়া হয়ে গেল। এটা পাগলামির চূড়ান্ত পর্যায়। ধরা পড়লে আজ বসুন্ধরা সিটির ফ্লোরে আমাকে আর আনিকাকে গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলা হবে। কিন্তু মানুষের কামনার কাছে ভয় সবসময় হেরে যায়।

আমি ল্যাপটপটা শাটডাউন করলাম। এহসান ভাই তখন ডেস্কে নেই, বাথরুমে গেছেন হয়তো। আমি উনাকে কিছু না বলেই, ব্যাগটা ঘাড়ে ঝুলিয়ে অফিস থেকে আক্ষরিক অর্থেই চোরের মতো পালিয়ে গেলাম। নিচে নেমে একটা সিএনজি নিলাম।

"মামা, বসুন্ধরা সিটি। জলদি চলেন।"
Reply
#26

২৬



বিকেল চারটা বিশ মিনিট। ঢাকা শহরের অন্যতম ব্যস্ত এবং কোলাহলপূর্ণ জায়গা বসুন্ধরা সিটি শপিং মল। আমি চার তলায় এসে পৌঁছালাম। শপিং মলের এই ফ্লোরটার একটা নিজস্ব সাইকোলজি বা মনস্তত্ত্ব আছে। চার তলাটা মহিলাদের পোশাক, শাড়ি, থ্রিপিস, জুয়েলারি জন্য বিখ্যাত। এই ফ্লোরে এলে মনে হয়, ঢাকা শহরের সমস্ত রঙিন প্রজাপতিরা যেন একটা বিশাল কাঁচের বাক্সে এসে জড়ো হয়েছে। এখানে সবসময় মানুষের একটা উপচে পড়া ভিড় থাকে। কেউ কেনাকাটা করতে আসে, কেউ খেতে আসে, আর একটা বড় অংশের মানুষ আসে স্রেফ অন্যের কেনাকাটা এবং অন্যদের দেখতে।

আমি চার তলার একদম শেষ মাথায় চলে এলাম। জায়গাটা তুলনামূলক একটু নিরিবিলি। এখানে লেডিস এবং জেন্টস ওয়াশরুম পাশাপাশি । ওয়াশরুমের ঠিক কাছাকাছি একটা পিলারের আড়ালে গিয়ে দাঁড়ালাম আমি। এই জায়গাটা থেকে পুরো ফ্লোরের একটা বড় অংশ খুব পরিষ্কারভাবে দেখা যায়, কিন্তু পিলারের কারণে আমাকে কেউ সহজে খেয়াল করতে পারবে না।

মিনিট বিশেক আমি এদিক-সেদিক তাকালাম। ঢাকা শহরের একটা শপিং মলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলে বোঝা যায়, মানুষের রুচি, ফ্যাশন আর মনস্তত্ত্বের কত বৈচিত্র্য। আমার চোখের সামনে দিয়ে কত শত নারী হেঁটে যাচ্ছে। মানুষের ফ্যাশন সেন্স আসলে তার ভেতরের অবচেতন মনেরই একটা প্রতিচ্ছবি। কেউ একদম কালো *য় আপাদমস্তক ঢাকা, শুধু চোখদুটো দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সেই সামান্য উন্মুক্ত চোখের দৃষ্টিতেও কাজল আর আইলাইনারের এমন একটা অদ্ভুত, রহস্যময় আবেদন ফুটে আছে, যা দেখে যে কোনো পুরুষের বুক ছ্যাঁত করে উঠবে। কেউ আবার খুব ছিমছাম, হালকা মেকআপে, সুতির সালোয়ার কামিজ পরা— দেখলে মনে হয় কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্রী। আবার কেউ কেউ একদম ওয়েস্টার্ন স্টাইলে— শর্ট টপস, স্কিন-টাইট ডেনিম জিন্স, খোলা চুল, আর ঠোঁটে কড়া লাল লিপস্টিক মেখে আত্মবিশ্বাসের সাথে হেঁটে যাচ্ছে।

আমি একজন পুরুষ। একজন স্বাভাবিক, উনত্রিশ বছর বয়সী, সুস্থ পুরুষ। আমার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মেয়েগুলোর বডি ফিটনেস, তাদের স্তনের গঠন, তাদের নিতম্বের বাঁক, তাদের হাঁটার ছন্দ— সবকিছুই অত্যন্ত আকর্ষণীয়। সাধারণ কোনো দিন হলে, বা সাধারণ অবস্থায় থাকলে আমি হয়তো এই চমৎকার দৃশ্যগুলো দেখে মনে মনে একটু হলেও ফ্যান্টাসাইজ করতাম। একজন অনুবাদক হিসেবে আমার কল্পনাশক্তির তো কোনো অভাব নেই। হয়তো ভাবতাম, ওই নীল টপস পরা মেয়েটার হাসিটা কত সুন্দর, বা ওই শাড়ি পরা মেয়েটার কলারবোনের খাঁজটা কত নিপুণ!

কিন্তু আজ... আজ আমার চোখে এই শত শত রূপবতী নারী সম্পূর্ণ অদৃশ্য মনে হচ্ছে। তারা আমার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু আমার রেটিনায় তাদের কোনো ছবি রেজিস্টার হচ্ছে না। আমার চোখে কিছুই জুতছে না, কোথাও দৃষ্টি এক সেকেন্ডের জন্যও আটকে থাকছে না। কারণ আমার চোখ, আমার মন, আমার পুরো অস্তিত্ব এখন শুধু একটা নির্দিষ্ট মানুষকে খুঁজছে। আনিকা নাওহার।

মানুষ যখন একটা নির্দিষ্ট নেশায় আটকে যায়, তখন পৃথিবীর বাকি সব নেশা, বাকি সব আকর্ষণ তার কাছে পানসে মনে হয়। আনিকার সেই ৩৬-২৮-৩৬-এর নিখুঁত, ঐশ্বরিক জ্যামিতি, উনার শরীরের সেই শ্যানেল পারফিউমের মাতাল করা ঘ্রাণ, উনার সেই বন্য, ঘাতক হাসি আর বাথটাবের নিচের সেই আদিম বন্যতার স্মৃতির কাছে— এই শপিং মলের সমস্ত সুন্দরীরা আমার কাছে প্লাস্টিকের ম্যানিকুইন ছাড়া আর কিছুই মনে হচ্ছিল না। আমার শুধু মনে হচ্ছিল, এরা সবাই নিষ্প্রাণ পুতুল, আর পৃথিবীতে জীবন্ত নারী বলতে কেবল একজনই আছেন।

হঠাৎ...

আমার বুকের ভেতরটা একটা বিশাল লাফ দিল। মনে হলো হৃৎপিণ্ডটা বুকের খাঁচায় সজোরে একটা ধাক্কা খেয়ে গলার কাছে উঠে এল। আমার চোখ স্থির হয়ে গেছে। প্রায় বিশ ফুট দূরে, একটা দামি, এক্সক্লুসিভ শাড়ির শোরুমের কাঁচের দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এলেন আনিকা নাওহার। আনিকা দেখার সাথে সাথে আমার শ্বাস-প্রশ্বাস কয়েক সেকেন্ডের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেল। যেনো প্রথমবার দেখছি। কি অদ্ভুত এক নেশা, কি অদ্ভুত এক আকর্ষণ এই নারীর। আমি পিলারের আড়াল থেকে একদৃষ্টে উনার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

আনিকার পরনে কোনো শাড়ি নেই, কোনো ওয়েস্টার্ন টপসও নেই। উনার পরনে একটা গাঢ়, কালচে-মেরুন রঙের ডিজাইনার সালোয়ার কামিজ। পোশাকটা প্রথম দেখায় খুব শালীন এবং সাধারণ মনে হলেও, একটু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেই বোঝা যায় এই পোশাকের কাটিং এবং ফিটিং কোনো সাধারণ দর্জির হাতের কাজ নয়। এটা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যা আনিকার শরীরের প্রতিটি বাঁককে, প্রতিটি ভাঁজকে এক অকল্পনীয়, আদিম এবং সম্মোহনী রূপে ফুটিয়ে তুলেছে।

কামিজের ফেব্রিকটা সম্ভবত পিওর সিল্ক বা জর্জেটের মতো কোনো নরম উপাদান, যা উনার ফর্সা, মসৃণ ত্বকের সাথে একদম লেপ্টে আছে। কামিজের গলার ডিজাইনটা একটু ডিপ, ভি-শেপের। সেই ভি-শেপের ফাঁক দিয়ে উনার ফর্সা, নিটোল বক্ষদেশের উপরিভাগের সামান্য একটু অংশ এবং দুই স্তনের মাঝখানের সেই গভীর, রহস্যময় উপত্যকার একটা সূক্ষ্ম রেখা উঁকি দিচ্ছে। কামিজটা উনার বুকের কাছে এতটাই আঁটসাঁট যে, উনার সেই তরমুজের মতো বিশাল, ভরাট এবং উদ্ধত স্তনযুগলের পুরো আকৃতিটা কাপড়ের ওপর দিয়ে একেবারে খোদাই করা ভাস্কর্যের মতো বোঝা যাচ্ছে। উনার প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে কামিজের ওই অংশটা যখন ওঠানামা করছে, আমার মনে হচ্ছে আমার স্নায়ুতন্ত্রে কেউ ইলেকট্রিক শক দিচ্ছে।

কামিজটা কোমরের কাছে এসে একদম সরু হয়ে উনার সেই মেদহীন, ছিপছিপে কোমরটাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরেছে। এবং তার ঠিক নিচ থেকেই শুরু হয়েছে উনার নিতম্বের সেই অবিশ্বাস্য, ঐশ্বরিক বিস্তার। সালোয়ার কামিজ পরলেও, কাপড়ের ফিটিংয়ের কারণে উনার সেই দুই পাহাড়ের মতো সুডৌল, ভারী নিতম্বের বাঁক এত নিখুঁতভাবে বোঝা যাচ্ছে যে, যে কোনো পুরুষের পক্ষেই ওই দৃশ্য দেখে স্থির থাকা অসম্ভব। উনার হাঁটার প্রতিটি কদমের সাথে উনার নিতম্বের সেই ছন্দময়, রাজকীয় দুলুনি আমার চোখের সামনে একটা হ্যালুসিনেশন তৈরি করে দিল।

উনার কাঁধের একপাশ দিয়ে ওড়নাটা খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে, সামান্য অবহেলায় ফেলে রাখা। উনার খোলা, রেশমি কালো চুলগুলো কাঁধের ওপর দিয়ে সামনে এসে পড়েছে, যা উনার ফর্সা গলার কনট্রাস্টে একটা অদ্ভুত মায়া তৈরি করেছে। উনার চোখে একটা বড়, ওভারসাইজড কালো সানগ্লাস। ঠোঁটে হালকা ন্যুড শেডের লিপস্টিক। উনার হাঁটার মধ্যে সেই পরিচিত, রাজকীয়, ডন্ট-কেয়ার একটা ছন্দ। পুরো শপিং মলের শত শত নারীর ভিড়ে উনাকে মনে হচ্ছে কোনো ভিনগ্রহের মহারানী, যিনি ভুল করে পৃথিবীতে নেমে এসেছেন।

আমি পিলারের আড়াল থেকে উনার শরীরের এই রূপসুধা পান করছিলাম, আর আমার শরীরের ভেতরে একটা বন্য, আদিম আগুন দাউদাউ করে জ্বলে উঠছিল। আমার হাত কাঁপছে, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। আমার প্যান্টের ভেতরে আমার পুরুষাঙ্গটি উনাকে দেখার সাথে সাথেই যেন একটা বৈদ্যুতিক সিগন্যাল পেয়ে জেগে উঠতে শুরু করেছে। কিন্তু আমার এই চরম উত্তেজনার পারদে হঠাৎ করেই এক বালতি বরফজল এসে পড়ল, যখন আমি আনিকার ঠিক পাশেই লোকটাকে দেখলাম। বেলাল সাহেব। উনার স্বামী।

বেলাল সাহেব আনিকার ঠিক গা ঘেঁষেই হাঁটছেন। উনার পরনে একটা ক্যাজুয়াল পলো শার্ট আর জিন্স। লোকটার দুই হাতে তিন-চারটে শপিং ব্যাগ। দৃশ্যটা দেখে আমার ভেতরে এক অদ্ভুত, সাইকোলজিক্যাল কমপ্লেক্সিটি বা মানসিক জটিলতা কাজ করতে শুরু করল। ঈর্ষা, রাগ, অহংকার এবং চরম একটা বিকৃত আনন্দ— সবকিছু মিলেমিশে একাকার।

আমার মনে হলো, ওই লোকটা, ওই বেলাল সাহেব, এত বড় একজন ইঞ্জিনিয়ার হয়ে, কোটিপতি হয়ে, এতগুলো শপিং ব্যাগ হাতে নিয়ে একটা কুলির মতো উনার বউয়ের পেছনে পেছনে হাঁটছেন। লোকটা জানেনই না, উনার এই অপরূপা, ড্রিম-গার্ল বউটার শরীরের প্রতিটি ইঞ্চি, প্রতিটি গোপন খাঁজ, প্রতিটি তিল আমি আমার জিভ দিয়ে, আমার ঠোঁট দিয়ে মুখস্থ করে ফেলেছি। লোকটা জানেনই না, উনার এই অহংকারী বউটা আমার নিচে শুয়ে একটা রাস্তার সাধারণ মেয়ের মতো গোঙিয়েছে, আমাকে 'প্রভু' বলে ডেকেছে!

এই চিন্তাটা আমার পুরুষালি ইগোকে এমন একটা চরম তৃপ্তি দিল যে, আমার বুকটা গর্বে ফুলে উঠল। বেলাল সাহেবের জন্য আমার এক ধরনের করুণাই হলো। লোকটা শপিং মলে বউকে নিয়ে ঘুরছে, কিন্তু বউয়ের মাথার ভেতর, বউয়ের শরীরের কোষে কোষে এখন আমি, রাশেদ আহমেদ, একজন সামান্য অনুবাদক রাজত্ব করছি!

আমি পিলারের আড়ালে নিজেকে আরও একটু লুকিয়ে নিলাম। আমার হাত কাঁপছে। উত্তেজনায়, এবং একই সাথে একটা ভয়ংকর, রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চারের নেশায়। আমি দ্রুত পকেট থেকে আমার পুরনো শাওমি ফোনটা বের করলাম। হোয়াটসঅ্যাপ ওপেন করে আনিকার নামের ওপর ক্লিক করলাম। আমার আঙুলগুলো স্ক্রিনের ওপর দ্রুত চলতে লাগল। "আমি চার তলার বাথরুমের সামনে। পিলারের আড়ালে।" মেসেজটা সেন্ড বাটনে ক্লিক করলাম।

মেসেজটা ডেলিভারড হওয়ার ডাবল টিক উঠল। এখন শুরু হলো স্নায়ুর যুদ্ধ। দশ সেকেন্ড। এই দশটা সেকেন্ড আমার কাছে দশ বছরের মতো মনে হলো। আমি পিলারের আড়াল থেকে একদৃষ্টে আনিকার দিকে তাকিয়ে আছি।

মেসেজটা সেন্ড হওয়ার ঠিক দশ সেকেন্ডের মাথায় আমি দেখলাম, আনিকা হাঁটতে হাঁটতেই উনার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে উনার আইফোনটা বের করলেন। উনি স্ক্রিনের দিকে একবার তাকালেন। উনার হাঁটার গতি একটুও কমল না। উনার বডি ল্যাঙ্গুয়েজে বিন্দুমাত্র কোনো চমক, কোনো জড়তা বা কোনো অস্বাভাবিকতা প্রকাশ পেল না। উনার চোখে বড় সানগ্লাস থাকার কারণে আমি উনার চোখের দৃষ্টি বুঝতে পারছিলাম না, কিন্তু উনার ঠোঁটের কোণে যে একটা খুব সূক্ষ্ম, বাঁকা এবং ভয়ংকর আবেদনময়ী হাসি ফুটে উঠল, সেটা আমার চোখ এড়াল না। উনি ফোনটা আবার ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখলেন।

তারপর উনি উনার স্বামী বেলাল সাহেবের দিকে ঘুরে কিছু একটা বললেন। আমি এত দূর থেকে শব্দের কোনো বিন্দুও শুনতে পেলাম না। কিন্তু উনাদের হাবভাব দেখে মনে হলো, আনিকা খুব ক্যাজুয়াল কোনো কথা বলেছেন। বেলাল সাহেব মাথা নাড়লেন। উনার মুখে কোনো সন্দেহের ছিটেফোঁটাও নেই। উনি আনিকাকে কিছু একটা বলে পাশের একটা বিশাল, উজ্জ্বল আলোর জুয়েলারির দোকানে ঢুকে গেলেন। বেলাল সাহেব জুয়েলারির দোকানে ঢোকার সাথে সাথেই, পুরো দৃশ্যপট যেন একটা সিনেমাটিক টার্ন নিল।

আনিকা সোজা হাঁটা ধরলেন বাথরুমের করিডোরের দিকে। উনার হাঁটার ভঙ্গিটা এখন আর আগের মতো সেই ক্যাজুয়াল, বিবাহিত নারীর মতো নেই। সেখানে এখন একটা শিকারি, বন্য টান চলে এসেছে। উনার প্রতিটি কদমে, উনার নিতম্বের প্রতিটি দুলুনিতে এখন একটা স্পষ্ট সিগন্যাল— একটা আদিম, অপ্রতিরোধ্য আহ্বান। উনার ওই গাঢ় মেরুন কামিজের ভেতর উনার শরীরটা যেন একটা ফুটন্ত লাভার মতো টগবগ করছে, যা যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরিত হতে চায়।

আমি আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালাম না। আমার হার্টবিট তখন প্রতি মিনিটে দুশো। আমি দ্রুত, প্রায় দৌড়ানোর মতো করে জেন্টস ওয়াশরুমের (পুরুষদের বাথরুম) দিকে পা বাড়ালাম। বাথরুমের মেইন দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম। বাথরুমের ভেতরটা বেশ বড় এবং পরিষ্কার। সাদা টাইলস করা দেওয়াল। একটা হালকা, সস্তা লেমন ফ্লেভারের এয়ার ফ্রেশনারের গন্ধ ভাসছে বাতাসে। আমি ভেতরে ঢুকে দ্রুত চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম।

ভাগ্যিস! এই মুহূর্তে বাথরুমের ভেতর কোনো মানুষ নেই। বেসিনগুলো একদম ফাঁকা। ইউরিনালগুলোতেও কেউ দাঁড়িয়ে নেই। ঢাকা শহরের মতো এত ব্যস্ত একটা শপিং মলে, বিকেলবেলা পুরুষদের বাথরুম এরকম জনশূন্য পাওয়াটা আক্ষরিক অর্থেই একটা মিরাকেল। ঈশ্বর বোধহয় আজ আমার এই পাপ, এই পাগলামিকে পূর্ণতা দেওয়ার জন্যই এমন একটা সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন।

আমি দ্রুত বাথরুমের কিউবিকল দিকে তাকালাম। সারিবদ্ধভাবে বেশ কয়েকটা দরজা। আমি গুনে গুনে ৬ নম্বর কিউবিকলটার দরজা খুললাম। ৬ নম্বর। কেন ৬ নম্বর বাছলাম জানি না, হয়তো অবচেতন মনে ভেবেছি একদম শেষের দিকের কিউবিকল হলে ঝুঁকি একটু কম। আমি ভেতরে ঢুকে দরজাটা ভেজিয়ে রাখলাম। লক করলাম না বা ছিটকিনি তুললাম না। শুধু এমনভাবে টেনে রাখলাম যেন বাইরে থেকে মনে হয় দরজাটা বন্ধ, কিন্তু একটু টান দিলেই খুলে যাবে।

কিউবিকলটা লম্বায় আর চওড়ায় খুব ছোট। আড়াই বা তিন ফুট হবে। একটা কমোড, একটা টিস্যু পেপার হোল্ডার, আর একটু দাঁড়ানোর জায়গা। আমি পকেট থেকে ফোন বের করে আনিকাকে লাস্ট মেসেজটা দিলাম: "জেন্টস ওয়াশরুম। ৬ নম্বর কিউবিকল।" মেসেজটা সেন্ড করে আমি কমোডের ঢাকনাটা নামিয়ে তার ওপর বসে পড়লাম।

আমার হৃৎপিণ্ডটা এখন গলার কাছে এসে লাফাচ্ছে। আমি জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছি। আমার পুরো শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছে। আমি কী করলাম এটা? আমি কি সত্যিই আনিকা নাওহারকে 'জেন্টস ওয়াশরুম'-এ আসতে বললাম? পুরুষদের বাথরুম! এখানে যেকোনো সময় কোনো লোক ঢুকে পড়তে পারে। কেউ প্রক্ষালন করতে আসতে পারে। আর একটা মেয়ে, তাও আবার আনিকা নাওহারের মতো একজন হাই-সোসাইটির, অভিজাত, বিলিয়নিয়ার নারী, যার স্বামী মাত্র কয়েক ফুট দূরে একটা জুয়েলারির দোকানে দাঁড়িয়ে আছে— সে কি সত্যিই এই পাবলিক পুরুষদের বাথরুমে ঢুকবে?

আমার মস্তিষ্ক আমাকে বলতে শুরু করল— "রাশেদ, তুই একটা চরম গাধা। তুই একটা সাইকোপ্যাথ। যেকোনো সাধারণ নারী হলে সে এই মেসেজ দেখে তোকে গালি দিয়ে ব্লক করে দিত। সে হয়তো সিকিউরিটি ডেকে তোকে পুলিশে ধরিয়ে দিত।" কিন্তু পরক্ষণেই আমার আরেকটা সত্তা জবাব দিল— "কিন্তু আনিকা নাওহার তো কোনো সাধারণ নারী নন। উনি তো কোনো সাধারণ ছাঁচে গড়া মানুষ নন।"

আমি খুব ভালো করেই জানি, এই নারীর কাছে অসম্ভব বলে কিছু নেই। এই নারী উনার ফ্যান্টাসি, উনার আদিম ক্ষুধা পূরণ করার জন্য যেকোনো কিছু করতে পারেন। উনার কাছে এই ডেঞ্জার, এই রিস্ক, ধরা পড়ার এই ভয়টাই হয়তো সবচেয়ে বড় আফ্রোডিসিয়াক বা কামোদ্দীপক। এই যে উনার স্বামী বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, আর উনি পুরুষদের বাথরুমে ঢুকে আরেকজন পুরুষের সাথে সঙ্গম করবেন— এই চিন্তাই হয়তো উনাকে পাগল করে তুলেছে।

আমি রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করতে লাগলাম। বাথরুমের ভেতরে পিনপতন নিস্তব্ধতা। শুধু এসি চলার একটা খুব মৃদু, শোঁ শোঁ শব্দ। আমার চোখ কিউবিকলের ভেজানো দরজার ফাঁক দিয়ে বাইরের ফ্লোরের দিকে স্থির হয়ে আছে।

দশ সেকেন্ড।

বিশ সেকেন্ড।

তিরিশ সেকেন্ড।
 
হঠাৎ...

বাথরুমের মেইন দরজা খোলার একটা হালকা 'ক্যাঁচ' শব্দ হলো। আমার বুকের ভেতর একটা বিশাল ড্রাম বাজতে শুরু করল। ঢিপ! ঢিপ! ঢিপ! কেউ একজন বাথরুমের ভেতর ঢুকেছে। সে কি কোনো সাধারণ মানুষ, যে প্রক্ষালন করতে বা হাত ধুতে এসেছে? নাকি কোনো ক্লিনার? নাকি... আমি ৬ নম্বর কিউবিকলের ভেজানো দরজার ফাঁক দিয়ে, নিচু হয়ে বাইরের ফ্লোরের দিকে তাকালাম।

মার্বেল পাথরের ফ্লোরে এক জোড়া পা এসে দাঁড়াল। আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। আমার চোখের তারা অবিশ্বাসে বড় বড় হয়ে গেল। পায়ের জুতো জোড়া কোনো পুরুষের স্নিকার্স বা স্যান্ডেল নয়। সেটা এক জোড়া কালো রঙের, অত্যন্ত দামি ডিজাইনার হাইহিল। আর সেই হাইহিলের ঠিক ওপরেই লেপ্টে আছে একটা গাঢ়, কালচে-মেরুন রঙের কাপড়ের নিচের অংশ।

আনিকার সেই সালোয়ার কামিজের সালোয়ারের অংশ! ঈশ্বর! আনিকা নাওহার সত্যিই পুরুষদের বাথরুমে ঢুকে পড়েছেন! উনি সত্যিই এসেছেন! হাইহিলের 'খট... খট... খট...' শব্দটা বাথরুমের নিস্তব্ধতায় একটা হাতুড়ির মতো বাজতে শুরু করল। শব্দটা খুব ধীর, কিন্তু অত্যন্ত কনফিডেন্ট। কোনো লুকোচুরি নেই, কোনো চোরের মতো পা টিপে টিপে হাঁটা নেই। একদম রাজকীয়, বন্য গতিতে শব্দটা আমার ৬ নম্বর কিউবিকলের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।

আমি চোখ বন্ধ করে একটা গভীর, দীর্ঘ শ্বাস নিলাম। আমার শরীরের প্রতিটি স্নায়ু, প্রতিটি কোষ এখন চরম উত্তেজনায় কাঁপছে। আমার প্যান্টের ভেতরে আমার পৌরুষ এখন পাথরের মতো শক্ত হয়ে ফেটে পড়ার উপক্রম হয়েছে। বসুন্ধরা সিটির চার তলার এই পুরুষদের বাথরুমের ছোট্ট, তিন ফুট বাই তিন ফুটের একটা কিউবিকলের ভেতর, আজ এমন একটা পাগলামি, এমন একটা বন্যতা হতে যাচ্ছে, যা পৃথিবীর কোনো থ্রিলার সিনেমাতেও কখনো দেখানো হয়নি।

শব্দটা আমার কিউবিকলের ঠিক সামনে এসে থেমে গেল। দরজার ওপর একটা আলতো চাপ পড়ল। ভেজানো দরজাটা সামান্য ফাঁক হলো। আমি আর এক সেকেন্ডও অপেক্ষা করলাম না, একটানে আনিকাকে ভিতরে টেনে নিয়ে, দরজা লাগিয়ে দিলাম। 
 
'খট!'

ছিটকিনি লাগানোর শব্দ হলো। এই ছোট, মেটালিক শব্দটা বাথরুমের টাইলস করা দেয়ালে একটা অদ্ভুত প্রতিধ্বনি তুলল। আমার কাছে মনে হলো, এই 'খট' শব্দটা শুধু একটা দরজার লক করার শব্দ নয়। এই শব্দটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে ভয়ংকর এবং সবচেয়ে আদিম জুয়া খেলার শুরুর ঘণ্টা। আমার মনে হলো, এই ছিটকিনিটা আমি বাথরুমের দরজায় লাগাইনি, লাগিয়েছি আমার এতদিন ধরে সযত্নে লালন করা ভদ্রতার, সভ্যতার এবং মধ্যবিত্ত নৈতিকতার কফিনে। এখন এই তিন ফুট বাই তিন ফুট অন্ধকূপে শুধু আমরা দুজন। আর কোনো পৃথিবী নেই, কোনো বেলাল সাহেব নেই, কোনো সমাজ নেই। এখন শুধু আগুন আর লাভার বিস্ফোরণ বাকি।
Reply
#27

২৭



ভয় এবং উত্তেজনা— মানব মস্তিষ্কের এই দুটো অনুভূতির মধ্যে খুব সূক্ষ্ম একটা সম্পর্ক আছে। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষ যখন চরম ভয়ের মধ্যে থাকে, তখন তার শরীরে প্রচুর পরিমাণে অ্যাড্রেনালিন হরমোন ক্ষরিত হয়। এই অ্যাড্রেনালিনের কারণে মানুষের হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায়, চোখের মণি বড় হয়ে যায়, আর স্নায়ুগুলো টানটান হয়ে থাকে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, চরম যৌন উত্তেজনার সময়ও মানুষের শরীরে ঠিক একই রকম বায়োলজিক্যাল রিঅ্যাকশন হয়।

এই কারণেই হয়তো বিপদের গন্ধ যেখানে থাকে, সেখানে কামনার আগুন সবচেয়ে বেশি দাউদাউ করে জ্বলে। নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি মানুষের যে আদিম টান, সেটা মূলত এই ভয় আর উত্তেজনার ককটেল থেকেই তৈরি হয়।


"আনিকা... আপনি সত্যিই চলে এলেন?" আমি কাঁপা কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বললাম। আনিকার ঠোঁটে সেই চিরচেনা, ঘাতক আর বন্য হাসি। "আমি তো তোমাকে আগেই বলেছি রাশেদ, আমি যা চাই, তা আমি পাই। এখানে ভয় পাওয়ার কী আছে?" আনিকা একদম ফিসফিস করে বললেন।  উনার কণ্ঠস্বরটা বাথরুমের এই তিন ফুট বাই চার ফুট জায়গায় একটা অদ্ভুত ইকো তৈরি করল।

আমি উঠে দাঁড়ালাম। এই কিউবিকলটা এতই ছোট যে, দুজন মানুষ দাঁড়ালে একে অপরের শরীরের সাথে আক্ষরিক অর্থেই লেগে থাকতে হয়। আনিকার শ্যানেল পারফিউমের ঘ্রাণ আর বাথরুমের লেমন এয়ার ফ্রেশনারের গন্ধ মিলেমিশে একটা নেশাধরা পরিবেশ তৈরি করেছে। আমি উনার এই অসীম সাহসে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। আমি খুব ধীরে আমার হাত দুটো বাড়িয়ে উনার কোমরটা জড়িয়ে ধরলাম। আমার প্ল্যান ছিল, এই অল্প সময়ের ভেতরেও আমি উনাকে আমার সমস্ত ভালোবাসা, সমস্ত আদর নিংড়ে দেব। আমি উনার কানের কাছে মুখ নিয়ে উনার গলার সেই ফর্সা, উন্মুক্ত অংশে খুব আলতো করে আমার ঠোঁট ছোঁয়ালাম। আমি চাইছিলাম, ধানমন্ডির ফ্ল্যাটের সেই বিশাল বিছানার মতো এখানেও একটা ফোরপ্লের আবহ তৈরি হোক। আমি উনার সালোয়ার কামিজের ওপর দিয়েই উনার পিঠে, উনার ঘাড়ে আমার জিভের একটা মায়াবী আল্পনা আঁকার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।

কিন্তু আনিকা আমাকে থামিয়ে দিলেন। উনি আমার শার্টের কলারটা দুই হাতে খামচে ধরে আমাকে উনার চোখের সামনে টেনে আনলেন। উনার চোখে এখন আর কোনো রোমান্স বা সাহিত্যের মায়া নেই; সেখানে এখন কেবলই এক আদিম, ক্ষুধার্ত পশুর দৃষ্টি।

আমি আমার দুই হাত দিয়ে আনিকার কোমরটা প্রবল শক্তিতে খামচে ধরলাম। উনাকে এক ঝটকায় টেনে আমার শরীরের সাথে মিশিয়ে নিলাম। আমার ফর্মাল শার্টের বোতামগুলো উনার সিল্কের কামিজের সাথে ঘষা খাচ্ছিল। আমি আমার মুখটা নিচে নামিয়ে উনার ঠোঁট দুটো পাগলের মতো কামড়ে ধরলাম।

এটা কোনো আদুরে চুমু ছিল না। এটা ছিল একটা ক্ষুধার্ত আক্রমণ। আনিকাও উনার মুখটা একটু হাঁ করে উনার জিভটা আমার মুখের ভেতর চালান করে দিলেন। আমাদের দুই জিভের মধ্যে একটা বন্য, ছন্দহীন যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। উনার মুখের ভেতরের স্বাদ, উনার লালার উষ্ণতা আমাকে পাগল করে দিচ্ছিল।

আমি চুমু খেতে খেতেই আমার এক হাত উনার কামিজের ওপর দিয়ে উনার বক্ষদেশের ওপর রাখলাম। সিল্কের কাপড়ের ওপর দিয়েই উনার সেই ভরাট স্তনযুগল আমি সজোরে চেপে ধরলাম। আনিকা একটা চাপা গোঙানি দিয়ে উঠলেন। উনার গোঙানির শব্দটা যাতে বাথরুমের বাইরে না যায়, সেটার জন্য উনি আমার শার্টের কলারটা কামড়ে ধরলেন। আমার অন্য হাতটা উনার সালোয়ারের ওপর দিয়ে উনার নিতম্বের সেই ভারী, সুডৌল পাহাড়দুটো খামচে ধরল।

"রাশেদ, একদম সময় নেই," আনিকা উনার দাঁতে দাঁত চেপে, চরম উত্তেজনায় ফিসফিস করে বললেন। " কোনো আদর-টাদর না, আমাকে পাগল কোরো না। যা করার এখনই করো। ফাস্ট!"

কথাটা শোনার পর আমার ভেতরের পুরুষালি ইগো আর উত্তেজনা দুটোই যেন রকেটের বেগে আকাশে উঠে গেল। একজন নারী যখন তার সমস্ত আভিজাত্য আর ভব্যতা দূরে সরিয়ে রেখে একজন পুরুষের কাছে এমন নগ্নভাবে তার আদিম তৃষ্ণার কথা প্রকাশ করে, তখন সেই পুরুষের আর কোনো লজিক কাজ করে না।

আমি আর এক সেকেন্ডও দেরি করলাম না। আনিকাকে দুই হাতে ধরে কিউবিকলের প্লাস্টিক-বোর্ডের দেয়ালের সাথে সজোরে চেপে ধরলাম। আনিকার পিঠটা দেয়ালের সাথে ধাক্কা খেল, কিন্তু উনি কোনো প্রতিবাদ করলেন না; বরং একটা বন্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে উনার দুই হাত আমার গলার পেছনে জড়িয়ে ধরলেন।

আমার ফর্মাল প্যান্টের জিপারটা খুলতে আমার কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল। বেল্টের বাকল খোলার মেটালিক 'ক্লিক' শব্দটা এই নিস্তব্ধতায় অনেক বেশি লাউড মনে হলো। আনিকা উনার সালোয়ার কামিজের নিচের অংশটা অত্যন্ত নিপুণ হাতে একটু ওপরে তুলে দিলেন। উনার সেই ফর্সা, মসৃণ উরু দুটো আমার ফর্মাল প্যান্টের খসখসে ফেব্রিকের সাথে ঘষা খেল। এখানে কোনো বিছানা নেই, কোনো আরামদায়ক ম্যাট্রেস নেই। আমরা দাঁড়িয়ে আছি একটা পাবলিক টয়লেটের টাইলস করা ফ্লোরে।

আমি আনিকার কোমরটাকে আমার দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরলাম। উনার শরীরটা দেয়ালের সাথে পিন করা। আমি আমার শরীরের সেই চরম উত্তেজনার দণ্ডটিকে উনার সেই কাঙ্ক্ষিত, উষ্ণ এবং ভিজে থাকা কেন্দ্রের ঠিক মুখে স্থাপন করলাম। আমাদের দুজনের চোখ একে অপরের দিকে স্থির। আনিকার চোখে এক অদ্ভুত আর্তি।

আমি এক প্রবল , বন্য ধাক্কায় উনার শরীরের একদম গভীরে প্রবেশ করলাম। "উমমমম!" আনিকা উনার মুখটা আমার কাঁধের ওপর গুঁজে দিয়ে একটা চাপা, তীব্র গোঙানি দিলেন। উনার দাঁতগুলো আমার ফর্মাল শার্টের ওপর দিয়ে আমার কাঁধের মাংসে বসে গেল। আমি উনার ভেতরের সেই পরিচিত, উষ্ণ এবং পিচ্ছিল আলিঙ্গনটা অনুভব করলাম। ধানমন্ডির ফ্ল্যাটের সেই বিশাল বিছানায় আমাদের মিলন ছিল একটা ধীর লয়ের সিম্ফনির মতো। সেখানে আমাদের হাতে অফুরন্ত সময় ছিল। আমরা একে অপরকে অনুভব করার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করতাম।

কিন্তু এখানে? এই চার তলার বাথরুমে? এখানে কোনো সিম্ফনি নেই। এখানে চলছে একটা উদ্দাম, বন্য রক-মিউজিকের বিট। এখানে আছে শুধু তাড়া, আর ধরা পড়ার এক ভয়াবহ, নিষিদ্ধ রোমাঞ্চ। আমি দেয়ালের সাথে উনাকে চেপে ধরে আমার থাপের গতি বাড়াতে শুরু করলাম।

এক... দুই... তিন...

আমার প্রতিটা থাপের সাথে উনার শরীরটা দেয়ালের সাথে একটা মৃদু ঘর্ষণ খাচ্ছে। উনার সালোয়ার কামিজের সিল্কের কাপড়টা আমার ফর্মাল শার্টের সাথে ঘষা খেয়ে একটা অদ্ভুত  'খসখস' শব্দ তৈরি করছে।"রাশেদ... আরও... উমমম... হ্যাঁ..." আনিকা আমার কানের কাছে উনার গরম নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে ফিসফিস করছেন।

আমি আমার দুই হাত দিয়ে উনার নিতম্বের নিচের দিকটা ধরে উনাকে সামান্য একটু ওপরে তুলে ধরলাম, যাতে আমার প্রতিটা আঘাত উনার শরীরের একদম গভীরতম বিন্দুতে গিয়ে পৌঁছায়। 

হঠাৎ বাথরুমের মেইন দরজা খোলার শব্দ হলো!

ক্যাঁচ!

আমার শরীরের সমস্ত রক্ত যেন এক মুহূর্তে জমে বরফ হয়ে গেল। আনিকার শরীরটাও আমার বাহুডোরে পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। আমরা দুজন নিঃশ্বাস বন্ধ করে স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। বাইরে কেউ একজন ঢুকেছে। বেসিনের কল ছাড়ার শব্দ হলো। কেউ হয়তো হাত ধুচ্ছে বা আয়নায় নিজেকে দেখছে।

আমাদের কিউবিকল থেকে ওই লোকটার দূরত্ব মাত্র কয়েক ফুট। সে যদি এখন দরজার নিচে দিয়ে তাকায়, সে দেখতে পাবে দুটো পা— একটা পুরুষের ফর্মাল প্যান্ট আর কালো জুতো, আর তার ঠিক পাশেই আরেক জোড়া পা, যে পায়ে মেয়েদের হাইহিল!

ভয়ে আমার বুকটা ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলো। আমি আনিকার চোখের দিকে তাকালাম। উনার চোখেও ভয়, কিন্তু সেই ভয়ের চেয়েও বেশি জ্বলজ্বল করছে এক চরম, সাইকোপ্যাথিক উত্তেজনা। পাবলিক বাথরুমে, বাইরের অপরিচিত মানুষের উপস্থিতিতে এই যে ধরা পড়ার ভয়— এই ভয়টাই আমাদের শরীরের ভেতরের আগুনটাকে যেন আরও কয়েক হাজার গুণ বাড়িয়ে দিল।

লোকটা কল বন্ধ করল। তারপর একটা পেপার টাওয়েল টেনে নিয়ে হাত মুছে বাথরুম থেকে বেরিয়ে গেল। মেইন দরজাটা আবার বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো। লোকটা বেরিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই আনিকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমার ঠোঁটের ওপর উনার ঠোঁটটা প্রবল আক্রোশে চেপে ধরলেন।

উনার এই চুম্বনটা ছিল একটা বন্য পশুর কামড়ের মতো। উনি যেন আমাকে গিলে খেতে চাইছিলেন। আমি উনার ঠোঁটটাকে সমান আক্রোশে প্রতিদান দিলাম। "রাশেদ... বসে পড়ো... কমোডের ওপর বসো..." আনিকা চুমুর মাঝখানেই হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন।

আমি উনার নির্দেশ পালন করলাম। আমি কিউবিকলের সেই হাই-কমোডের ঢাকনাটার ওপর বসলাম। আনিকা উনার সালোয়ারটা আরও নিচে নামিয়ে আমার দুই পায়ের দুই পাশে উনার পা রেখে, সরাসরি আমার কোলের ওপর এসে বসলেন।

এই বসার ভঙ্গিটা এতটাই অন্তরঙ্গ আর এত বেশি উত্তেজনাকর ছিল যে, আমার মনে হলো আমার মস্তিষ্ক আর কাজ করছে না। আনিকার পুরো শরীরের ওজনটা এখন আমার ওপর। উনার সালোয়ার কামিজের সিল্কের কাপড়টা একটা তাঁবুর মতো আমার কোলের ওপর ছড়িয়ে পড়েছে, যা আমাদের শরীরের সেই আদিম সংযোগস্থলটাকে ঢেকে রেখেছে।

আমি আমার দুই হাত উনার কোমরের দুই পাশে রাখলাম। আনিকা এবার নিজেই উনার কোমরটাকে ওপরে তুলে আবার সজোরে নিচে নামাতে শুরু করলেন। কমোডের ওপর বসে থাকা অবস্থায় এই রাইডিং বা কাউগার্ল পজিশনটার ইমপ্যাক্ট ছিল ভয়াবহ। আনিকা উনার শরীরের পুরো ভর দিয়ে যখন নিচে নামছিলেন, আমি আমার পুরুষাঙ্গের একদম শেষ প্রান্ত পর্যন্ত উনার ভেতরের সেই উষ্ণ স্পর্শ অনুভব করছিলাম। "রাশেদ... উমমম... ইয়েস..." আনিকা উনার মাথাটা পেছনের দিকে হেলিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে উঠলেন। উনার চোখ দুটো কামনায় বুজে আছে। উনার গলা আর কলারবোনের ফর্সা চামড়াটা এসির ঠান্ডার মধ্যেও ঘামে চিকচিক করছে। আমি নিচ থেকে উনার গতির সাথে তাল মিলিয়ে আমার কোমরটাকে ওপরে তুলছিলাম।

আমাদের শরীরের ভেতরের সেই ভেজা, পিচ্ছিল শব্দটা বাথরুমের এই ছোট জায়গায় খুব স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। আমি ভয়ে ছিলাম, আবার কেউ ঢুকে পড়ে কি না! কিন্তু এই নিষিদ্ধ ভয়ের কারণেই আমার পুরুষাঙ্গটা আজ অন্য যেকোনো দিনের চেয়ে অনেক বেশি শক্ত আর সংবেদনশীল হয়ে আছে। আমি আমার হাতটা আনিকার সালোয়ার কামিজের নিচ দিয়ে ঢুকিয়ে উনার ফর্সা, মসৃণ পিঠের ওপর বুলিয়ে দিলাম। উনার মেরুদণ্ডের খাঁজ ধরে আমার হাতটা উনার ঘাড়ের কাছে পৌঁছাল। আমি উনার ঘাড়টা ধরে উনাকে আমার মুখের কাছে টেনে আনলাম। "আনিকা... আমি আর পারছি না... আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি..." আমি উনার কানের কাছে ফিসফিস করে বললাম।

আনিকা আমার কাঁধটা শক্ত করে খামচে ধরলেন। উনার নখগুলো আমার ফর্মাল শার্ট ভেদ করে আমার চামড়ায় বসে যাচ্ছিল। "হ্যাঁ... রাশেদ... আমার ভেতরেই... আমাকে ভরিয়ে দাও... আমি আসছি... আমি..."

আনিকার থাপের গতি এখন একটা পাগল করা ছন্দে পৌঁছেছে। উনি উনার শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে আমার ওপর ওঠানামা করছেন। উনার শ্বাস-প্রশ্বাস এখন একটা একটানা গোঙানিতে পরিণত হয়েছে। উনি চিৎকার করতে চাইছেন, কিন্তু ধরা পড়ার ভয়ে উনি উনার মুখটা আমার কাঁধের ওপর চেপে ধরে, আমার শার্টের কাপড়টা আক্ষরিক অর্থেই কামড়ে ধরলেন।

আমি বুঝতে পারলাম, উনি উনার চরম শিখরে পৌঁছে গেছেন। উনার শরীরটা হঠাৎ করে একটা ধনুকের মতো সোজা হয়ে গেল। উনার ভেতরের পেশিগুলো আমাকে এমন এক প্রবল, পাগলাটে শক্তিতে চেপে ধরল যে আমার মনে হলো আমার শরীর থেকে প্রাণটা বেরিয়ে আসবে। আনিকা উনার দাঁত দিয়ে আমার কাঁধ কামড়ে ধরে একটা নীরব, দীর্ঘ এবং স্বর্গীয় আর্তনাদ করলেন। উনার সারা শরীর থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। উনার সেই উষ্ণ, পিচ্ছিল তরল আমার পুরুষাঙ্গকে সম্পূর্ণ ভিজিয়ে দিল।

উনার এই বন্য, চরম স্খলন আমাকেও আর আটকে রাখতে পারল না। আমি নিচ থেকে উনার কোমরটা প্রাণপণ শক্তিতে চেপে ধরে, আমার শরীরের সমস্ত জমানো লাভা, সমস্ত উত্তেজনা আর সমস্ত তৃষ্ণাকে একটা প্রচণ্ড ধাক্কায় উনার শরীরের একদম গভীরে আছড়ে ফেললাম।

আমার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না, কিন্তু আমার সারা শরীর একটা বৈদ্যুতিক শকের মতো কেঁপে উঠল। আমার মনে হলো, আমার শরীরের প্রতিটি রক্তবিন্দু, প্রতিটি সেল যেন শূন্যে বিস্ফোরিত হয়ে আবার আমার ভেতরে ফিরে এসেছে। আমরা দুজন সেই কমোডের ওপর একে অপরকে জড়িয়ে ধরে একটা নিশ্চল ভাস্কর্যের মতো বসে রইলাম।

বাথরুমের এই নিস্তব্ধতায় শুধু আমাদের দুজনের প্রচণ্ড ভারী শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। আনিকার মুখটা এখনো আমার কাঁধে গোঁজা। উনার সালোয়ার কামিজের সামনের অংশটা আমার ঘামে ভেজা ফর্মাল শার্টের সাথে লেপ্টে আছে। আমার দুই হাত উনার পিঠের ওপর স্থির হয়ে আছে। আমার হৃৎপিণ্ডটা এমনভাবে ধুকপুক করছে যেন সেটা কোনো ম্যারাথন দৌড় শেষ করেছে।

কয়েক সেকেন্ড পর আনিকা খুব আস্তে করে উনার মুখটা আমার কাঁধ থেকে তুললেন। উনার চোখের দিকে তাকালাম। উনার চুলগুলো এলোমেলো আর ঠোঁটের লিপস্টিক প্রায় পুরোটাই মুছে গেছে। কিন্তু উনার চোখেমুখে এখন এক অদ্ভুত, অপার্থিব প্রশান্তি। উনি আমার দিকে তাকিয়ে একটা খুব গভীর, তৃপ্ত এবং বিজয়ী হাসি হাসলেন। উনার সেই হাসিতে কোনো আভিজাত্য বা সিইও-র অহংকার ছিল না; ছিল শুধু এক পরিপূর্ণ নারীর আদিম পরিতৃপ্তি।

আমিও উনার দিকে তাকিয়ে একটা স্বস্তির হাসি দিলাম। আমরা দুজনেই জানি, আজ এই বসুন্ধরা সিটির চার তলার বাথরুমে আমরা যে পাগলামিটা করলাম, সেটা আমাদের দুজনের জীবনেরই সবচেয়ে দুঃসাহসিক এবং ভয়াবহ একটা অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে। আমরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছি। আমাদের শরীরের ভেতরের আগুনটা শান্ত হয়ে এসেছে, কিন্তু ভালোবাসার রেশটা তখনো আমাদের আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে।

ঠিক সেই স্বর্গীয় এবং নিশ্চল মুহূর্তটিতেই...

ভুররর... ভুররর... ভুররর...

বাথরুমের নিস্তব্ধতা ভেঙে একটা যান্ত্রিক কম্পনের শব্দ হলো।

আমি চমকে উঠলাম। শব্দটা আনিকার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে আসছে। আনিকার মোবাইল ফোনটা ভাইব্রেট করছে। আনিকা উনার চোখ দুটো একটু বড় করে আমার দিকে তাকালেন। উনার সেই তৃপ্তির হাসিটা মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে গিয়ে সেখানে একটা চরম বাস্তবতার শঙ্কা ফুটে উঠল। আমরা দুজনেই জানি ওই ফোনের ওপাশে কে থাকতে পারে।

বেলাল সাহেব।

সময় শেষ। আমাদের এই নিষিদ্ধ স্বর্গের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার অ্যালার্ম বেজে উঠেছে।
Reply
#28

২৮



ভুররর... ভুররর... ভুররর... ভাইব্রেশন। আনিকার মোবাইল ফোন বাজছে।

 আনিকা উনার মাথাটা আমার কাঁধ থেকে তুললেন। উনার চোখে একটু আগের সেই বন্য, আদিম কামনার ঘোরটা মুহূর্তের মধ্যে কেটে গিয়ে একটা চরম বাস্তবতার সতর্ক দৃষ্টি ফুটে উঠল। আমরা দুজনেই জানি, এই অসময়ে, শপিং মলে ঘোরার মাঝখানে কে ফোন করতে পারে।

আনিকা কোনো কথা না বলে উনার হাতটা বাড়িয়ে ভ্যানিটি ব্যাগের চেইন খুলে ফোনটা বের করলেন। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে উনি আমার দিকে একটা অর্থপূর্ণ দৃষ্টি দিলেন। উনার চোখের ইশারায় লেখা ছিল— "বেলাল।" এই তিন ফুট বাই তিন ফুট কিউবিকলে, আমি আনিকার শরীরের ভেতর অর্ধেক প্রবেশ করে বসে আছি, আর এই অবস্থায় উনার স্বামী উনাকে ফোন দিচ্ছে! এর চেয়ে পরাবাস্তব, নার্ভ-কাঁপানো আর ভয়াবহ পরিস্থিতি কোনো মানুষের জীবনে আসতে পারে বলে আমার জানা নেই।

আনিকা একটুও প্যানিক করলেন না।  গলাটা একবার হালকা পরিষ্কার করে নিয়ে, ফোনের গ্রিন বাটনটা স্লাইড করে ফোনটা কানে ধরলেন। আমরা দুজন এত কাছাকাছি বসে আছি যে, ফোনের ইয়ারপিস থেকে আসা ওপারের শব্দগুলো আমি খুব স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম।

"হ্যালো?"


ওপাশ থেকে বেলাল সাহেবের ভরাট গলা শোনা গেল। "কই তুমি? আমার কাজ তো শেষ। চলো, বাসায় ফিরি। অনেকক্ষণ তো ঘোরা হলো।"

আনিকা উনার ডান হাত দিয়ে আমার ঘাড়ের পেছনের চুলগুলো আলতো করে বিলি কাটতে কাটতে, অত্যন্ত ক্যাজুয়াল, বিরক্তহীন গলায় বললেন, "ওহ, তোমার কাজ শেষ? আচ্ছা, আমি পাঁচ মিনিট আসতেছি। আমি দুই তলায় আছি। একটা বুটিকে একটু কাজ ছিল। তুমি গ্রাউন্ড ফ্লোরে যাও। আমি মেইন গেটে আসতেছি।"


"আচ্ছা, আমি নিচে যাচ্ছি। তুমি তাড়াতাড়ি এসো," বেলাল সাহেব বললেন।
"ওকে। আসছি।" কল কেটে গেল। আনিকা ফোনটা আবার ব্যাগে রেখে দিলেন।

আমি পাথরের মতো বসে আছি। এই তিন ফুট বাই তিন ফুট কিউবিকলটা লম্বায় আর চওড়ায় মেরেকেটে সত্যিই তিন ফুট বাই তিন ফুট হবে। একটা মানুষ কোনোমতে ভেতরে ঢুকে দরজা আটকে কমোডে বসতে পারে। এই ছোট্ট, আবদ্ধ জায়গার ভেতরে একটু আগে যে মাত্রার একটা প্রলয়ঙ্করী, বন্য এবং পারমাণবিক মিলন ঘটে গেছে, তা ভাবলে বিজ্ঞানের স্থান-কালের সূত্রও হয়তো লজ্জায় মুখ লুকাবে।

উদ্দাম মিলনের সমাপ্তি ঘটেছে। আমাদের দুজনের শরীর থেকেই ঘাম ঝরছে। বাথরুমের এই ছোট্ট কিউবিকলের ভেতর এখন লেমন ফ্লেভারের এয়ার ফ্রেশনারের গন্ধকে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করে রাজত্ব করছে এক তীব্র, উগ্র, আদিম নারী-পুরুষের শরীরের ঘ্রাণ। কামনার ঘাম আর স্খলনের যে একটা নিজস্ব বন্য গন্ধ থাকে, সেই গন্ধে কিউবিকলের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠেছে।

মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, আপনি স্বর্গে বেশিক্ষণ থাকতে পারবেন না। আপনাকে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসতেই হবে। চরম মিলনের পর যখন মানুষের হুঁশ ফেরে, যখন রক্তের তেজ কমে গিয়ে স্নায়ুগুলো ঠান্ডা হতে শুরু করে, তখন মানুষের মনে পড়ে সমাজ, সংসার, ইজ্জত আর আশেপাশের বাস্তবতার কথা।

আমরা দুজনেই এখন সেই স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে ফিরে আসার রুক্ষ প্রক্রিয়ায় আছি। এই তিন ফুট বাই তিন ফুট জায়গার ভেতর দুজন মানুষের আবার কাপড় ঠিক করাটা একটা আস্ত সার্কাস ছাড়া আর কিছুই নয়। আমি আনিকার কোমর থেকে আমার হাত সরিয়ে নিলাম। উনি খুব সাবধানে আমার ওপর থেকে উঠে দাঁড়ালেন। এইটুকু জায়গায় দাঁড়াতে গিয়ে উনার পিঠ বাথরুমের প্লাস্টিকের দরজার সাথে ঘষা খেল।
আমি কমোড থেকে উঠে দাঁড়ালাম। আমার প্যান্টটা তখনো হাঁটুর কাছে নামানো। আমি খুব কসরত করে, বাথরুমের নোংরা দেয়ালে যেন শরীর না লাগে সেই চেষ্টা করতে করতে আমার প্যান্টটা ওপরে তুললাম। জিপারটা টানার সময় আমার হাত কাঁপছিল।

আনিকা উনার সালোয়ার কামিজের ভেতরের অন্তর্বাস ঠিক করে, কামিজটা টেনে নিচে নামালেন। উনার বুকের ওপর ওড়নাটা খুব পরিপাটি করে গুছিয়ে নিলেন। অন্ধকারে তোয়ালে বা টিস্যু ছাড়া কোনোমতে নিজেদের শরীরকে একটু ভদ্রস্থ করা— সে এক ভয়াবহ, নোংরা এবং বিরক্তিকর কসরত।

কাপড় ঠিক করার পর আনিকা উনার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটা ছোট আয়না আর লিপস্টিক বের করলেন। আয়নায় নিজের মুখটা দেখে, এলোমেলো হয়ে যাওয়া চুলগুলো হাত দিয়ে একটু পরিপাটি করে নিলেন। মুছে যাওয়া লিপস্টিকটা আবার একবার আলতো করে ঠোঁটে বুলিয়ে নিলেন।

উনার চোখেমুখে একটা অদ্ভুত তৃপ্তি, কিন্তু একই সাথে চরম প্র্যাকটিক্যাল একটা ভাব। একটু আগের সেই কামনায় পাগলিনী নারীটার কোনো চিহ্ন উনার চেহারায় অবশিষ্ট নেই। উনি এখন সম্পূর্ণ একজন কর্পোরেট নারী। উনি উনার ব্যাগ থেকে একটা টিস্যু পেপার বের করে কপালের ঘামটা হালকা মুছে নিয়ে খুব নিচু, ফিসফিস করা গলায় বললেন, "প্রথমে তুমি বের হও রাশেদ। খুব সাবধানে বের হইয়ো। কেউ যেন সন্দেহ না করে।"

কথাটা শোনার সাথে সাথেই আমার বুকের ভেতর একটা তীব্র, তিতকুটে বিরক্তি আর অভিমান ফুঁসে উঠল। আমি অবাক হয়ে উনার দিকে তাকালাম। এই নারী আসলে কী? একটু আগে এই কিউবিকলের ভেতর সে একটা বন্য পশুর মতো আমার নিচে ছটফট করেছে। আমার কাঁধে উনার দাঁতের দাগ বসে গেছে, আমার নখের আঁচড় উনার পিঠে বসে গেছে। আমরা একে অপরের লালা আর ঘাম খেয়েছি। আর এখন, জাস্ট দুই মিনিটের ব্যবধানে উনি সম্পূর্ণ কর্পোরেট, প্র্যাকটিক্যাল একজন সিইও হয়ে গেছেন!

উনার চোখেমুখে কোনো রোমান্টিক ঘোর নেই, কোনো বিকার নেই। উনি আমাকে বলছেন— 'সাবধানে বের হও'! যেন আমি উনার কোনো গোপন মাদক ডিলার, যার সাথে ডিল শেষ, মাল ডেলিভারি হয়ে গেছে, এবার মালকড়ির হিসাব চুকিয়ে কেটে পড়ার পালা! আমার ভেতরের পুরুষালি ইগো চরমভাবে আহত হলো। বাঙালি মধ্যবিত্ত পুরুষরা প্রেমের ক্ষেত্রে একটু ন্যাকামি পছন্দ করে। তারা চায় চরম মিলনের পর নারী তার বুকে মাথা রেখে একটু কাঁদবে, একটু ভালোবাসার কথা বলবে, বলবে— "আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না।" কিন্তু এই নারী আমাকে ডিরেক্ট বলছে— 'বের হও'!

আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। "এভাবে হয় নাকি আনিকা?" আমি একটু ঝাঁঝালো, ফিসফিস করা গলায় বললাম। আমার গলার স্বরে ক্ষোভ স্পষ্ট। "তোমার এই একটুখানি আদরের জন্য আমি গত কয়েকদিন ধরে পাগল হয়ে ছিলাম। তুমি আমাকে যেভাবে তড়পাচ্ছিলে, মেসেজ দিয়ে, ছবি দিয়ে... আমি মরে যাচ্ছিলাম। আর এখন কাজ শেষ, তুমি বলছ বেরিয়ে যাও? এভাবে কয়দিন চলবে? কী করবে তুমি এখন? তুমি কি ওই বেলালের সাথে আবার ওই লন্ডনে চলে যাবে? আর তোমার এই স্বামীকে তুমি সামাল দিলেই বা কেমনে?" আমার কথাগুলো একটা ক্ষোভের মালার মতো উনার ওপর ছুঁড়ে দিলাম। আমি জানতাম, এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর উনার কাছে নেই।

কিন্তু আমি ভুলে গিয়েছিলাম, আনিকা নাওহারের ডিকশনারিতে 'উত্তর নেই' বলে কিছু নেই। "চুপ!" আনিকা একটা ছোট্ট, সাপের মতো হিসহিসে ধমক দিলেন। আর তার পরের মুহূর্তেই উনি উনার দুই হাত বাড়িয়ে আমার শার্টের কলারটা প্রবল শক্তিতে খামচে ধরলেন। আমাকে এক হ্যাঁচকা টানে উনার মুখের একদম কাছে টেনে নিলেন। উনি উনার মুখটা আমার মুখের ওপর নামিয়ে আনলেন এবং একটা উন্মাদ, সর্বগ্রাসী চুম্বনে আমার ঠোঁট দুটোকে আক্ষরিক অর্থেই গিলে ফেললেন।

এটা কোনো সাধারণ বিদায়ী বা রোমান্টিক চুম্বন ছিল না। এটা ছিল আমার সমস্ত ক্ষোভ, সমস্ত অভিমানকে গলা টিপে হত্যা করার একটা বন্য, আদিম প্রক্রিয়া। উনার ঠোঁট আমার ঠোঁটের ওপর এমন আক্রোশে চেপে বসল যে, আমার দাঁতের সাথে উনার দাঁতের সজোরে সংঘর্ষ হলো। আমি একটা অস্ফুট শব্দ করতে গেলাম, কিন্তু উনি উনার উষ্ণ, ভেজা জিভটা একটা তপ্ত শলার মতো আমার মুখের ভেতর ঢুকিয়ে দিলেন।

আমার মুখের ভেতর উনার জিভটা এক আদিম তাণ্ডব শুরু করল। আমার জিভের সাথে উনার জিভের এক অদ্ভুত, স্যাঁতস্যাঁতে এবং বন্য লড়াই চলতে লাগল। উনার মুখের ভেতরের লালার মিষ্টতা, লিপস্টিকের হালকা স্বাদ, এবং একটু আগের সেই চরম উত্তেজনার ঘ্রাণ— সবকিছু মিলে আমার মস্তিষ্ককে আবার অচল করে দিল। আমি আমার দুই হাত দিয়ে উনার কোমরটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। উনি উনার মুখের লালা আমার মুখের ভেতর ট্রান্সফার করে দিচ্ছিলেন, আর আমার লালা উনি শুষে নিচ্ছিলেন। এই তিন ফুট বাই তিন ফুট কিউবিকলে, কমোডের পাশে দাঁড়িয়ে, একজন বিবাহিত নারীর এই লালা-বিনিময় করা, শ্বাসরুদ্ধকর চুম্বনের কাছে আমার সমস্ত রাগ, সমস্ত লজিক, সমস্ত ইগো ধুলোয় মিশে গেল। আমি উনাকে ছাড়া আর কিচ্ছু ভাবতে পারছিলাম না।

প্রায় এক মিনিট পর আনিকা উনার ঠোঁটটা আমার ঠোঁট থেকে একটা তীক্ষ্ণ 'পপ' শব্দ করে ছাড়িয়ে নিলেন। আমরা দুজনেই হাঁপাচ্ছি। আমাদের দুজনের ঠোঁটই ভিজে চকচক করছে। আনিকা উনার ডান হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে আমার ঠোঁটের কোণ থেকে উনার লেগে থাকা লালাটুকু পরম আদরে, খুব মায়াবী একটা ভঙ্গিতে মুছে দিলেন। উনার চোখে এখন একটা ঘাতক, রহস্যময় হাসি।

"সাবধানে বের হও," আনিকা আবার সেই ফিসফিসে গলায় বললেন। তবে এবার উনার গলায় কোনো কর্পোরেট কাঠিন্য নেই, সেখানে একটা অদ্ভুত মায়া ঝরে পড়ছে। "শেষে দুজনে একসাথে বের হতে গিয়ে ধরা পড়ে একটা কেলেঙ্কারি হবে। আমি চাই না আমার বা তোমার কোনো ক্ষতি হোক। আমি তোমাকে ছাড়ছি না। যাও।" আমি আর কোনো কথা বলার শক্তি খুঁজে পেলাম না। এই নারী জানে কীভাবে একটা পুরুষকে কথার জাদুতে, আর শরীরের জাদুতে পুরোপুরি পঙ্গু করে দিতে হয়। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো মাথা নাড়লাম। 

আমি কিউবিকলের দরজার লকটা খুব সাবধানে, নিঃশব্দে খুললাম।একটু ফাঁক করে বাইরে উঁকি দিলাম। বাথরুমের বেসিনের কাছে কেউ নেই। ভাগ্য আজ পুরোপুরি আমাদের সহায়। দ্রুত কিউবিকল থেকে বেরিয়ে এলাম। বেসিনের আয়নায় একবার নিজের দিকে তাকালাম। চুল উসকোখুস্কো, চোখ লাল, শার্টের কলার এলোমেলো। আমি দ্রুত চোখেমুখে একটু পানি ছিটিয়ে নিলাম। চুলটা হাত দিয়ে আঁচড়ে ঠিক করলাম। তারপর একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলাম।

বসুন্ধরা সিটির চার তলার করিডোরে এসে আমি একটা বড় শ্বাস নিলাম। চারপাশের মানুষজন শপিং ব্যাগ হাতে ঘুরছে, হাসছে, কথা বলছে। কেউ জানে না, এইমাত্র ওই পুরুষদের বাথরুমের ভেতর কী একটা পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটে গেছে। আমি বাথরুম থেকে একটু দূরে, একটা বিশাল কাঁচের শোরুমের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। শোরুমটার নাম সম্ভবত 'দেশি দশ' বা ওইরকম কিছু হবে। আমি আড়চোখে বাথরুমের দরজার দিকে নজর রাখলাম। মিনিট তিনেক পর। পুরুষদের বাথরুমের দরজা ঠেলে অত্যন্ত স্বাভাবিক, ধীর এবং কনফিডেন্ট ভঙ্গিতে বেরিয়ে এলেন আনিকা নাওহার।

উনার কাঁধে ভ্যানিটি ব্যাগ, চোখে সেই বিশাল সানগ্লাস। উনি উনার হাতের একটা টিস্যু পেপার দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বের হলেন, এমন একটা ভাব যেন উনি ভুল করে পুরুষদের বাথরুমে ঢুকে গিয়েছিলেন, অথবা জাস্ট বেসিনে হাত ধুতে গিয়েছিলেন! উনার হাঁটার মধ্যে কোনো আড়ষ্টতা নেই, কোনো ভয় নেই। উনি একবারও এদিক-ওদিক তাকালেন না। সোজা হেঁটে এস্কেলেটরের দিকে চলে গেলেন এবং ভিড়ের মাঝে কোথায় যেন হারিয়ে গেলেন।

আমি অবাক বিস্ময়ে উনার চলে যাওয়া দেখলাম। একটা মানুষ কতটা পারফেক্ট অভিনেতা হলে, এতটা স্নায়ুর চাপ সামলে এমন একটা কাণ্ড করার পর এভাবে র্যাম্প মডেলের মতো হেঁটে যেতে পারে! হঠাৎ আমার পকেটে মোবাইলটা ভাইব্রেট করল। আমি দ্রুত ফোন বের করে দেখলাম। হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ। আনিকা।

"আমার মাথায় একটা প্ল্যান আছে। আমাদের কেউ আলাদা করতে পারবে না। আমি শীঘ্রই তোমাকে বিস্তারিত জানাব।"

মেসেজটা পড়ে আমার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত আশা আর ভয়ের মিশ্রণ তৈরি হলো। প্ল্যান! কিসের প্ল্যান? উনি কি বেলালের সাথে ডিভোর্স নেবেন? উনি কি আমাকে নিয়ে ইংল্যান্ডে চলে যাবেন? নাকি আমাকে এই ধানমন্ডির ফ্ল্যাটেই উনার পারমানেন্ট 'সিক্রেট লাভার' হিসেবে রেখে দেবেন?

"আমাদের কেউ আলাদা করতে পারবে না।" এই একটা বাক্য আমাকে যেন একটা নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখাল। আমি বসুন্ধরা সিটি থেকে নিচে নেমে এলাম। মেইন রোডের পাশে দাঁড়িয়ে একটা বেনসন ধরালাম। ধোঁয়াটা ফুসফুসের একদম গভীর পর্যন্ত টেনে নিলাম। আমার হাতের আঙুলে তখনো আনিকার শরীরের সেই বন্য সুবাস লেগে আছে।

আমি একটা সিএনজি নিয়ে অফিসে ফিরলাম। অফিসে ঢুকতেই এহসান ভাই আমার দিকে চোখ কপালে তুলে তাকালেন। "রাশেদ! তুমি ছিলে কোথায়? আমি তোমাকে চারটা থেকে খুঁজছি! ল্যাপটপ অন, মানুষ নাই!" এহসান ভাই প্রায় ফেটে পড়লেন। আমি খুব করুণ এবং বিধ্বস্ত একটা মুখ করে বললাম, "ভাই, পেটটা হঠাৎ করে এমন খারাপ হলো! আমি তো ফার্মেসিতে দৌড়েছিলাম ওষুধ আনতে। তারপর একটু শুয়ে ছিলাম লাউঞ্জে। খুব অবস্থা খারাপ ভাই।" বাঙালি বসরা আর যাই হোক, পেট খারাপের কথা শুনলে একটু নরম হয়। কারণ এই দেশে গ্যাস্ট্রিক আর পেট খারাপ হলো জাতীয় ব্যাধি।

"পেট খারাপ! তো আমাকে একটা মেসেজ দিবা না? যাও, জলদি নিউজগুলো ক্লিয়ার করো। আমেরিকার ইলেকশনের আপডেটগুলো পড়ে আছে।" আমি ডেস্কে বসে নিউজ করতে লাগলাম ঠিকই, কিন্তু আমার ল্যাপটপের কি-বোর্ডে আমি জো বাইডেন বা পুতিনের নাম টাইপ করছিলাম না, আমি মনে মনে শুধু আনিকার নাম টাইপ করছিলাম।

অফিস শেষ করে রাত নয়টার দিকে আমি মিরপুরের মেসে ফিরলাম।

মেসের সেই চিরচেনা গুমোট পরিবেশ। রাজু আর তুহিন মিলে ডাইনিংয়ে ডিম ভাজি দিয়ে ভাত খাচ্ছে। আমি কোনোমতে একটু খেয়ে নিজের রুমে এসে দরজা বন্ধ করে দিলাম। বিছানায় শুয়ে আমি মোবাইলটা হাতে নিলাম। রাত দশটা। আনিকার কোনো মেসেজ নেই।

সাড়ে এগারোটা। আনিকার কোনো মেসেজ নেই। বারোটা। আনিকার লাস্ট সিন দেখাচ্ছে সন্ধ্যা সাতটায়।

আমার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত, চিনচিনে অস্থিরতা শুরু হলো। উনি তো বলেছিলেন প্ল্যান জানাবেন। তাহলে মেসেজ দিচ্ছেন না কেন? বেলাল সাহেব কি উনার ফোন চেক করছেন? নাকি উনি বেলালের সাথে এখন কোনো রেস্টুরেন্টে ক্যান্ডেল লাইট ডিনার করছেন?

আমার মাথার ভেতর ঈর্ষার পোকাটা আবার কামড়াতে শুরু করল। আমি আর থাকতে পারলাম না। রাত সাড়ে বারোটার দিকে আমি নিজেই কয়েকটা মেসেজ টাইপ করা শুরু করলাম। আমার ভেতরের সেই আদিম, সেক্সুয়াল ক্ষুধাটা তখনো পুরোপুরি মেটেনি। আমি লিখলাম: "আনিকা... বাথরুমের ওই কিউবিকলের গন্ধটা এখনো আমার গায়ে লেগে আছে। তুমি আমাকে পাগল করে দিয়েছ।"

কোনো রিপ্লাই নেই। সিঙ্গেল টিক। আমি আবার লিখলাম: "আমার হাত এখনো তোমার শরীরের ওই ভাঁজগুলো খুঁজছে। ইচ্ছে করছে এখনই গিয়ে তোমাকে আবার ওই বাথটাবের পানিতে ডুবিয়ে..."

মেসেজটা ডেলিভারড হলো, ডাবল টিক হলো। কিন্তু ব্লু টিক হলো না। আনিকা অনলাইনে নেই। আমি এক চরম ডেসপারেট এবং করুণ অবস্থায় চলে গেলাম। আমি লিখলাম: "তুমি কি ঘুমাচ্ছ? নাকি বেলালের সাথে... প্লিজ আনিকা, আমাকে পাগল করো না। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। আমাকে একটা রিপ্লাই দাও।"

রাত একটা বাজল। দুইটা বাজল। আনিকা সিন তো দূরের কথা, মেসেজগুলো ডেলিভারড হয়েই পড়ে রইল। আমার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত, বিশাল একাকিত্ব ভর করল। আমার মনে হতে লাগল, আমার বউকে কেউ যেন আমার চোখের সামনে থেকে কেড়ে নিয়ে গেছে! এই গত পঁচিশ দিনে আনিকা নাওহার নামের এই বিবাহিত নারীটির প্রতি আমার কী এক ভয়ংকর ভালোবাসা, কী এক তীব্র আকর্ষণ জন্মেছে, সেটা আমি আজ এই মিরপুরের মেসে একা শুয়ে বুঝতে পারছি।

আমার মাথার ভেতর একটা সাইকোপ্যাথিক চিন্তা ঘুরপাক খেতে লাগল। ইচ্ছে করছে, একটা ধারালো চাকু নিয়ে সোজা ধানমন্ডির ওই ষোলো তলা বিল্ডিংয়ে যাই। কলিংবেল বাজাই। বেলাল সাহেব দরজা খুললে সোজা চাকুটা উনার পেটের ভেতর ঢুকিয়ে দিই। বেলালকে খুন করে আনিকাকে নিজের করে নিই!

কিন্তু আমি জানি, এসব মধ্যবিত্তের ফ্যান্টাসি। মধ্যবিত্ত পুরুষরা মনে মনে হাজারটা খুন করে, কিন্তু বাস্তবে মশা মারতেও তাদের হাত কাঁপে। আমি বেলালকে খুন করতে পারব না। আমাকে এই মেসের অন্ধকার ঘরে শুয়ে শুয়ে শুধু যন্ত্রণায় ছটফট করতে হবে।

হায়, আমার কী হবে!

আমি অন্ধকারে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলাম। একজন পরিণত পুরুষ, যে কিনা আজ সকালেই একটা নারীর সাথে মহাকাব্যিক সঙ্গম করেছে, সে এখন একটা খেলনা হারানো শিশুর মতো কাঁদছে। আমার চোখের সামনে আনিকার সেই ঐশ্বরিক শরীরটা ভাসতে লাগল।

আমি কি আর কোনোদিন উনার সেই ডালিমের দানার মতো লালচে, রসালো ঠোঁটে আমার ঠোঁট ছোঁয়াতে পারব না? আমি কি আর কোনোদিন উনার সেই তরমুজের মতো বিশাল, ভরাট স্তনের মাঝে আমার মুখ লুকাতে পারব না? উনার সেই কুলবরইয়ের মতো শক্ত, উদ্ধত বোঁটাগুলো কি আর আমার জিভের স্পর্শ পাবে না? আমার চোখের সামনে ভাসছে উনার সেই গোলাপের পাপড়ির মতো নরম, রহস্যময় যোনিপথ, যেখান থেকে আমি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সুধা পান করেছি।

আমি কি আর কোনোদিন উনার ওই দুই পাহাড়ের মতো সুডৌল, নিখুঁত পাছা এবং তার মাঝখানের সেই গভীর গিরিখাতের স্বাদ নিতে পারব না? ওই শরীরটা তো এখন বেলালের দখলে! বেলাল হয়তো এখন ওই তরমুজের মতো স্তনগুলোতে হাত রাখছে, ওই ডালিমের দানার মতো ঠোঁটে চুমু খাচ্ছে! বেলাল হয়তো এখন উনার সেই গোলাপের পাপড়ির মতো নরম স্বর্গে তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করছে!

"আমার কী হবে! আমার কী হবে!"

আমি বালিশে মুখ গুঁজে একটা আহত, পরাজিত পশুর মতো গোঙাতে লাগলাম। আমার নখগুলো বিছানার চাদর ছিঁড়ে ফেলার উপক্রম করছে। আমার পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের জীবন, আমার অনুবাদক সত্তা, আমার ফিলোসফি— সবকিছু আজ আনিকা নাওহারের ওই গোলাপের পাপড়ির মতো যোনি আর দুই পাহাড়ের মতো পাছার কাছে চরমভাবে হেরে গেছে।

এই সীমাহীন তৃষ্ণা, এই ধ্বংসাত্মক ঈর্ষা আর এই তীব্র হাহাকার নিয়েই আমি একসময় একটা ক্লান্ত, যন্ত্রণাদায়ক ঘুমের অতলে তলিয়ে গেলাম।
Reply
#29

২৯


মানুষের জীবনে অপেক্ষার চেয়ে ভয়ংকর কোনো শাস্তি পৃথিবীতে নেই। বিশেষ করে সেই অপেক্ষা যদি হয় অনিশ্চয়তার, আর তার সাথে যদি মিশে থাকে চরম আতঙ্ক। গ্রিক পুরাণে প্রমিথিউসের একটা গল্প আছে। তাকে পাহাড়ে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল, আর প্রতিদিন একটা ঈগল এসে তার কলিজা ঠুকরে খেত। রাতে সেই কলিজা আবার জোড়া লাগত, পরদিন আবার ঈগল আসত। আমার মনে হয়, প্রমিথিউসের এই শাস্তিটা নেহাতই ছেলেখেলা। তাকে যদি বলা হতো— "ভাই প্রমিথিউস, তোমার প্রেমিকার মোবাইল বন্ধ, সে কোথায় আছে তুমি জানো না, আর তার স্বামী হয়তো তাকে খুন করে স্যুটকেসে ভরে ফেলেছে"— তাহলে প্রমিথিউস বলত, "তার চেয়ে বরং ঈগলকে পাঠাও, কলিজা খাওয়াটাই আরামের।"

বসুন্ধরা সিটির সেই বাথরুমের উদ্দাম মিলনের পর কেটে গেছে পাক্কা আটচল্লিশ ঘণ্টা। দুটো দিন এবং দুটো রাত। এই দুই দিনে আমার অবস্থা আক্ষরিক অর্থেই পাগলপ্রায়। আমি মোবাইল হাতে নিয়ে বসে থাকি। হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠাই। 

"আনিকা, তুমি ঠিক আছো?"
"আনিকা, প্লিজ একটা রিপ্লাই দাও।"
"তোমার কি কোনো বিপদ হয়েছে? আমি কি আসব?"

গত দুই দিনে আমি আনিকাকে অন্তত একশোটা মেসেজ দিয়েছি। একটা মেসেজও সিন হয়নি। ডাবল টিক পড়ে না, শুধু একটা সিঙ্গেল টিক হয়ে খঞ্জরের মতো আমার বুকের ভেতর বিঁধে থাকে। হোয়াটসঅ্যাপে অসংখ্যবার অডিও এবং ভিডিও কল দিয়েছি। স্ক্রিনে শুধু 'Calling...' লেখাটা ওঠে, 'Ringing...' হয় না। এর মানে খুব পরিষ্কার— উনার ফোনে ইন্টারনেট কানেকশন নেই।

শেষে আমি ডিরেক্ট সেলুলার নেটওয়ার্কে কল দিয়েছি। ওপাশ থেকে একটা যান্ত্রিক নারী কণ্ঠ নির্লিপ্তভাবে বলেছে, "দুঃখিত, আপনার ডায়ালকৃত নাম্বারটি এই মুহূর্তে বন্ধ আছে।" আমি কারওয়ান বাজারের অফিসে ল্যাপটপের সামনে বসে থাকি একটা জ্যান্ত লাশের মতো। আমি যন্ত্রের মতো আন্তর্জাতিক খবর অনুবাদ করছি। 'পুতিনের নতুন পারমাণবিক হুমকি', 'গাজায় বোমা হামলা'— এসব টাইপ করছি, কিন্তু আমার মাথার ভেতর চলছে অন্য একটা থ্রিলার সিনেমা।

আমার মনে প্রচণ্ড ভয়। আনিকার কী হলো!

সেদিন বসুন্ধরা সিটির বাথরুমের সেই তীব্র, পারমাণবিক মিলনের খবর কি বেলাল সাহেব কোনোভাবে বুঝে গিয়েছিলেন? আমরা যখন বের হচ্ছিলাম, তখন কি উনি আমাদের দেখে ফেলেছিলেন? নাকি আনিকা যখন বাথরুম থেকে বেরিয়ে উনার স্বামীর কাছে গিয়েছিলেন, তখন বেলাল সাহেব উনার স্ত্রীর শরীরের ওই বন্য ঘ্রাণ, ওই এলোমেলো অবস্থা দেখে কিছু সন্দেহ করেছিলেন? পুরুষ মানুষের ইনস্টিংক্ট খুব মারাত্মক হয়। নিজের স্ত্রীর শরীরে অন্য পুরুষের আঁচড় পড়লে সেটা স্বামীরা ঠিকই টের পায়।

বেলাল সাহেব কি আনিকাকে ধানমন্ডির ওই ফ্ল্যাটে বন্দি করে ফেলেছেন? উনার ফোন কি কেড়ে নিয়েছেন? নাকি... নাকি... ওহ গড! এই চিন্তাটা আমি কল্পনাতেও আনতে চাই না। কিন্তু মানুষের মস্তিষ্ক একটা আস্ত শয়তান। সে সবচেয়ে খারাপ জিনিসটাই সবার আগে আপনাকে দেখাবে।

আমার চোখের সামনে ভাসতে শুরু করল, বেলাল সাহেব রাগের মাথায় কিচেন থেকে ছুরি এনে আনিকাকে জবাই করে দিয়েছেন। উনার সেই ডালিমের দানার মতো ঠোঁট, তরমুজের মতো স্তন, আর ওই নিখুঁত ৩৬-২৮-৩৬-এর শরীরটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। বেলাল সাহেব লাশটা টুকরো টুকরো করে উনার ওই বিশাল লাগেজে ভরছেন।

আমি শিউরে উঠে চোখ খুলি। আমি এখন কী করব? এই দুই দিন ধরে আনিকার সাথে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। মেয়েটা বেঁচে আছে, নাকি মরে গেছে, নাকি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে পড়ে আছে— কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। আমার কি পুলিশে যাওয়া উচিত? কিন্তু পুলিশে গিয়ে আমি কী বলব? "হ্যালো ওসি সাহেব, আমি রাশেদ। আমি পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের একজন অনুবাদক। আমি গত এক মাস ধরে এক লন্ডনপ্রবাসী বিলিয়নিয়ার ইঞ্জিনিয়ারের বউয়ের সাথে শুয়েছি। এখন তার বউকে পাওয়া যাচ্ছে না, একটু খুঁজে দেবেন?"

পুলিশ আমাকে আনিকাকে খোঁজার আগে রিমান্ডে নিয়ে বাঁশডলা দেবে। আমি কি ওই ধানমন্ডির ফ্ল্যাটে গিয়ে চেক করে আসব? কিন্তু সেখানে গেলে যদি বেলাল সাহেব দরজা খোলেন? উনি যদি আমাকে দেখেই চিনে ফেলেন, আর আমাকে ফ্ল্যাটের ভেতর টেনে নিয়ে আমারও কোনো ক্ষতি করেন? আমি তো বডিবিল্ডার না যে উনার সাথে মারামারি করে জিতব। আমি তো দুই থাপ্পড় খেলেই অজ্ঞান হয়ে যাব।
এই সীমাহীন দোটানা, আতঙ্ক আর একাকিত্বের মাঝে আমি না পারছি খেতে, না পারছি ঘুমাতে। মিরপুরের মেসে আমি একটা পাগলা কুকুরের মতো এপাশ-ওপাশ করি। আমার চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে।

তৃতীয় দিন। দুপুরবেলা।

আমি অফিসে বসে একটা নিউজ এডিট করছি, আমার চোখ লাল হয়ে আছে। ঠিক দুপুর একটার সময় আমার ফোনটা স্ক্রিনে একটা ভাইব্রেশন দিল। আমি ছোঁ মেরে ফোনটা তুললাম। হোয়াটসঅ্যাপের নোটিফিকেশন। এবং নামটা— 'Anika Nawhar'! আমার শ্বাস আটকে গেল। আমি দ্রুত মেসেজটা ওপেন করলাম।

"তুমি কি অফিসে? একটা ঝামেলা হয়েছে। তোমার সাথে কথা বলা প্রয়োজন। ধানমন্ডির গ্লোরিয়া জিন্স কফিতে আসো। কুইক।"

মেসেজটা পড়ার পর আমার বুক থেকে যেন এক টন ওজনের একটা পাথর নেমে গেল। আনিকা বেঁচে আছে! আমার অপ্সরী বেঁচে আছে! কিন্তু পরক্ষণেই আরেকটা ভয় এসে চেপে বসল। "একটা ঝামেলা হয়েছে!" কী ঝামেলা? বেলাল সাহেব কি সব জেনে গেছেন? উনি কি ডিভোর্স পেপার পাঠিয়েছেন? আমি আর এক সেকেন্ডও অপেক্ষা না করে সরাসরি হোয়াটসঅ্যাপে কল দিলাম। রিং হলো। কিন্তু আনিকা কলটা সাথে সাথে কেটে দিলেন। একটু পরেই আরেকটা মেসেজ এল: "কল দিও না। তুমি আসো। সব খুলে বলব।"

আমি ল্যাপটপটা ধাপ করে বন্ধ করে দিলাম। এহসান ভাই একটু দূরে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিলেন, আমি উনার দিকে একবারও না তাকিয়ে, কাউকে কিছু না বলে, ব্যাগটা ঘাড়ে ঝুলিয়ে অফিস থেকে পাগলের মতো ছুটে বেরিয়ে এলাম। রাস্তায় নেমে একটা উবার মোটো নিলাম। "মামা, ধানমন্ডি গ্লোরিয়া জিন্স। যত জোরে পারেন টানেন।" কারওয়ান বাজার থেকে ধানমন্ডি যাওয়ার এই পথটুকুতে আমার মনে হলো আমার আয়ু দশ বছর কমে গেছে।

গ্লোরিয়া জিন্সের কাঁচের দরজা ঠেলে যখন আমি ভেতরে ঢুকলাম, তখন দুপুর পৌনে দুইটা। কফিশপটার ভেতরটা বেশ শান্ত, এসি চলছে, সুন্দর একটা কফির অ্যারোমা ভাসছে বাতাসে। আমি এদিক-সেদিক তাকালাম। এবং আমি উনাকে দেখলাম। কফিশপের একদম কর্নারের একটা টেবিলে, জানালার পাশে বসে আছেন আনিকা নাওহার।

উনাকে দেখে আমি আক্ষরিক অর্থেই বোকা বনে গেলাম। আমি গত দুই দিন ধরে ভেবেছি, উনি হয়তো নির্যাতিতা, বিধ্বস্ত, মুখ-চোখ ফোলা অবস্থায় বসে থাকবেন। কিন্তু আমার সামনে যিনি বসে আছেন, তিনি যেন সদ্য পার্লার থেকে বের হওয়া কোনো রানীর মতো। উনার পরনে একটা খুব এলিগ্যান্ট, হালকা পেস্তা রঙের সালোয়ার কামিজ। চুলগুলো খুব সুন্দর করে ব্লো-ড্রাই করা। চোখে হালকা আইলাইনার, ঠোঁটে ন্যুড লিপস্টিক। উনার চেহারায় বিন্দুমাত্র কোনো উত্তেজনা নেই, কোনো উদ্বেগ নেই, কোনো পাগলামি নেই। একদম স্নিগ্ধ, অপরূপ এবং নিখুঁত একটা রূপ নিয়ে উনি কফির মগ হাতে বসে আছেন।

আর আমার নিজের অবস্থা? আমি গত তিন দিন ধরে ঠিকমতো শেভ করিনি, চুল উসকোখুস্কো, চোখের নিচে ডার্ক সার্কেল, শার্টটা কুঁচকে আছে। আমাকে দেখে মনে হচ্ছে আমি রিফিউজি ক্যাম্প থেকে পালিয়ে আসা কোনো লোক, আর উনি কোনো ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য। আমি হনহন করে হেঁটে উনার টেবিলের সামনে গিয়ে দপ করে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়লাম। আমার ভেতরে তখন রাগের একটা আগ্নেয়গিরি ফুটছে।

"হোয়াট দ্য হেল ইজ দিস আনিকা!" আমি প্রায় হিসহিস করে, চাপা রাগে ফেটে পড়ে বললাম। "এই দুই দিন তুমি কই ছিলে? তোমার ফোন বন্ধ কেন?" আনিকা উনার কফির মগটা খুব শান্তভাবে টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখলেন। উনার চোখের দৃষ্টিতে কোনো অপরাধবোধ নেই, বরং এক ধরনের অদ্ভুত কাঠিন্য।

"চুপ।" আনিকা খুব নিচু, কিন্তু অত্যন্ত কড়া গলায় বললেন। "কোনো কথা না। আমি সব বলব তো বলেছি।"

"সব খুলে বলবে! সব খুলে বলবে তো করছ গত কয়েকদিন ধরে!" আমি রাগে গরগর করতে করতে বললাম। "কিন্তু কিছুই তো বলছ না। এই সাসপেন্সের মানে কী? তুমি কি সাইকোপ্যাথ? এই দুই দিনে আমার মাথা খারাপ হওয়ার অবস্থা!"

আনিকা উনার ডান হাতের তর্জনী দিয়ে উনার কফির মগের কিনারাটা খুব আলতো করে ঘষতে লাগলেন। উনার ঠোঁটের কোণে একটা খুব সূক্ষ্ম, বাঁকা এবং ঘাতক হাসি ফুটে উঠল। উনি একটু সামনের দিকে ঝুঁকে এলেন। উনার সেই মোহনীয়, ফিসফিস করা গলায়, একদম সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন—"মাথা নাকি বাঁড়া? কোনটা পাগলপ্রায়?"

কথাটা শোনার পর আমার মনে হলো গ্লোরিয়া জিন্সের ছাদটা আমার মাথার ওপর ভেঙে পড়ল। এই চরম সিরিয়াস, ক্রাইসিস একটা মুহূর্তে, একটা পাবলিক কফিশপে বসে এই নারী আমাকে এই লেভেলের একটা স্ল্যাং, একটা চূড়ান্ত সেক্সুয়াল এবং উসকানিমূলক কথা বলতে পারল! আমি রাগে, অপমানে এবং একই সাথে এক অদ্ভুত উত্তেজনায় গরগর করতে লাগলাম। আমি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু আমার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। আনিকা উনার হাসিটা আরেকটু চওড়া করলেন।

"আচ্ছা ঠিক আছে বাবা, রাগ কোরো না," আনিকা খুব আদুরে গলায় বললেন। "আমি আদর করে আমার পাগলকে সুস্থ করে দেব। একটু অপেক্ষা করো।"

আমি জ্বলন্ত চোখে উনার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আনিকা উনার হাত তুলে ওয়েটারকে ইশারা করলেন। এক মিনিটের মধ্যে ওয়েটার এসে দুটো কফি আর এক প্লেট স্টিমড ওনথন( Wonton) দিয়ে গেল। "নাও, খাও। খেতে খেতে শোনো," আনিকা একটা ওনথন কাঁটাচামচে গেঁথে মুখে দিতে দিতে বলা শুরু করলেন।

"সেদিন বসুন্ধরা সিটি থেকে ফেরার পর আমার রিয়েলাইজেশন হলো," আনিকা খুব শান্ত গলায়, যেন কোনো সিনেমার রিভিউ দিচ্ছেন, এমনভাবে বললেন। "আমি বুঝতে পারলাম, আমার আর বেলালের সম্পর্কটা আসলে ডেড। এই মরা সম্পর্কটা টেনে নিয়ে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। আমি ডিসাইড করলাম, আমি আজ রাতেই বেলালকে সব খুলে বলব। আমি ওকে বলব যে আমি ডিভোর্স চাই।"

আমি অবাক হয়ে উনার দিকে তাকালাম। "তুমি বেলাল সাহেবকে সব বলে দিতে চেয়েছিলে?"

"হ্যাঁ। আমি চেয়েছিলাম সবকিছু ক্লিয়ার করে দিতে। কিন্তু সেই বলার সুযোগটা আর হলো না।"

"কেন?" আমি ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলাম।

আনিকা কফিতে একটা চুমুক দিয়ে একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "আমরা যখন ডিনার করছিলাম, রাত আটটার দিকে, তখন বেলালের ফোনে একটা কল আসে। ও ফোনটা ধরে একটু ড্রয়িংরুমের দিকে যায়। তারপর ফিরে এসে বলে, ওর একটা খুব ইমার্জেন্সি কাজ পড়েছে, ওকে একটু বের হতে হবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম কোথায় যাচ্ছে, ও শুধু বলল— 'আমি এক ঘণ্টার মধ্যে আসছি'। তারপর ও বেরিয়ে যায়।" আনিকা একটু থামলেন। উনার চোখের দৃষ্টিটা এবার একটু গম্ভীর হলো।

"এরপর আর ও বাসায় ফিরে আসেনি রাশেদ। আজ তিন দিন হতে চলল, বেলাল নিখোঁজ।"

"হোয়াট!" আমি প্রায় চিৎকার করে উঠতে গিয়ে নিজেকে সামলে নিলাম। আমি চারদিকে তাকিয়ে গলার স্বর নামিয়ে বললাম, "বলছ কী এসব? নিখোঁজ মানে কী? কী হয়েছে উনার?"

আনিকা একটা চরম বিরক্তিকর মুখ করে আমার দিকে তাকালেন। "আরে, আমি জানলে কি আর এখানে বসে কফি খেতাম? আমি যতোভাবে যোগাযোগ করা যায় করার চেষ্টা করেছি। ওর ফোন বন্ধ। ওর আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব— সবাইকে কল করেছি। কেউ কিচ্ছু জানে না। ওর লন্ডনের কলিগদেরও ফোন করেছি, তারা ভেবেছে ও আমার সাথেই আছে।"

আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। বেলাল সাহেব নিখোঁজ! ঢাকা শহরের মতো জায়গায় একজন লন্ডনপ্রবাসী ইঞ্জিনিয়ার নিখোঁজ হয়ে গেল! "তাহলে... তাহলে এখন কী হবে?" আমি আমতা আমতা করে বললাম।

"আজ সকালে বেলালের ভার্সিটি লাইফের দুই বন্ধুকে ডেকে এনেছিলাম। ওদের সাথে নিয়ে ধানমন্ডি থানায় গিয়েছিলাম। বেলালের নামে একটা মিসিং রিপোর্ট বা জিডি ফাইল করে এসেছি।" আনিকা খুব শান্তভাবে কথাটা বললেন। আমার মাথার ভেতর তখন হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।

"এক মিনিট দাঁড়াও," আমি হঠাৎ একটা খুব লজিক্যাল প্রশ্ন করে বসলাম। "বেলাল সাহেব যদি নিখোঁজ হয়ে থাকেন, তুমি যদি টেনশনে থাকো, তাহলে গত দুই দিন ধরে তোমার ফোন বন্ধ দেখাচ্ছিল কেন? তুমি আমাকে একটা মেসেজও দিলে না কেন?" আনিকা আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন আমি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গাধা। "আরে বুদ্ধু!" আনিকা উনার কাঁটাচামচটা টেবিলে রেখে বললেন। "তুমি কি আসলেই এত বোকা, নাকি বোকা সাজার ভান করো? তুমি যে নাম্বারে আমাকে ফোন দাও, সেটা আমার সেকেন্ড নাম্বার। ওই নাম্বারটা আমি শুধু তোমার সাথে যোগাযোগ করার জন্যই কিনেছিলাম। আমার ফ্যামিলি, ফ্রেন্ডস, আর অফিশিয়াল কাজের জন্য আমার মেইন নাম্বার আলাদা, যেটা সবসময় খোলা থাকে।"

আমার চোখ কপালে উঠে গেল। একটা নারী কতটা ধূর্ত, কতটা ক্যালকুলেটিভ হলে পরকীয়া করার জন্য আলাদা একটা বার্নার সিম ব্যবহার করতে পারে!"আর তুমি আমাকে মেসেজ দিতে বলছ?" আনিকা একটু ঝাঁঝালো গলায় বললেন। "আমার স্বামী নিখোঁজ! আমি থানায় দৌড়াচ্ছি, বেলালের বন্ধুদের সাথে কথা বলছি। এই অবস্থায় আমি যদি ওই ফোনটা অন রাখতাম, আর তুমি যদি অনবরত আমাকে কল করতে থাকতে, তাহলে ব্যাপারটা কেমন হতো? যদি বেলালের কোনো বন্ধু বা পুলিশ আমার সেকেন্ড ফোনটা দেখে ফেলত? স্বামীর নিখোঁজের সময় একজন নারী তার গোপন প্রেমিকের সাথে চ্যাটিং করছে— এটা দেখলে পুলিশের সন্দেহ সবার আগে কার ওপর পড়ত, বুঝতে পারছ না?"

আমি আনিকার এই সাইকোলজিক্যাল আর লজিক্যাল ব্যাখ্যার সামনে একদম বোবা হয়ে গেলাম। উনার কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু উনার এই নিখুঁত, কোল্ড-ব্লাডেড হিসাব-নিকাশ আমাকে মানসিকভাবে প্রচণ্ড একটা ধাক্কা দিল। "কিন্তু আনিকা," আমি একটু রুক্ষ গলায় বললাম, "তুমি থানায় গেলে, বেলালের বন্ধুরা তোমার ফ্ল্যাটে এল। আমি তো গত পঁচিশ দিন ধরে ওই ফ্ল্যাটে ছিলাম। বিল্ডিংয়ের দারোয়ান মফিজ থেকে শুরু করে আশেপাশের দোকানদার— সবাই তো আমাকে চেনে। পুলিশ বা বেলালের বন্ধুরা যদি দারোয়ানকে জেরা করে, দারোয়ান তো আমার কথা বলে দেবে। তখন কী হবে?"

আনিকা একটা খুব তৃপ্তির হাসি হাসলেন। উনার চোখে একটা শয়তানি ঝিলিক। "আমি কি এতটা কাঁচা কাজ করতে পারি রাশেদ? আমি জানি দারোয়ান তোমাকে চেনে। তাই আমি থানায় তোমার কথা লুকাইনি। আমি নিজেই পুলিশের কাছে তোমার কথা বলেছি।"

"কী!" আমি প্রায় লাফিয়ে উঠলাম। "তুমি পুলিশকে আমার কথা বলেছ? তুমি কি আমাকে ফাঁসাচ্ছ আনিকা?"

"আহ! চিল্লাচ্ছ কেন?" আনিকা আমাকে ইশারা করে বসতে বললেন। "শোনো আমি পুলিশকে কী বলেছি। আমি বলেছি, তুমি আমার ছোট ভাইয়ের মতো। তুমি একজন অনুবাদক আর প্রুফরিডার। আমার নতুন উপন্যাসের কাজে আমাকে হেল্প করার জন্য তুমি গত কয়েকদিন আমার বাসায় গেস্ট হিসেবে ছিলে। বেলাল দেশে আসার পর তুমি চলে গেছ। ব্যাস! এতে সন্দেহের কী আছে?"

আমি আনিকার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম। আমি উনার ছোট ভাই! যে নারীর যোনির প্রতিটি ভাঁজ আমার জিভের স্পর্শে ভিজেছে, যে নারীর স্তন আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা চুষেছি, যে নারীর সাথে আমি বাথরুম থেকে শুরু করে বেডরুম পর্যন্ত আদিম পশুর মতো সঙ্গম করেছি— সেই নারী এখন আমাকে বানিয়েছে উনার ছোট ভাই!

আমার বুকের ভেতর একটা প্রচণ্ড কালো রসবোধ বা ডার্ক হিউমার জেগে উঠল। "আমি তোমার ছোট ভাই?" আমি একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বললাম। "তুমি কি আমাকে গেম অফ থ্রোনস-এর গল্প শোনাচ্ছ? তুমি কে? তুমি সার্সেই ল্যানিস্টার, আর আমি জেমি ল্যানিস্টার? ভাই-বোনের এই পবিত্র ইনসেস্ট কি ঢাকা শহরের পুলিশ বিশ্বাস করবে?"

আনিকা আমার এই তীক্ষ্ণ এবং সারকাস্টিক রেফারেন্সটা সাথে সাথে ধরে ফেললেন। উনার মুখটা একটু শক্ত হলো। "মজা করবে না রাশেদ। পরিস্থিতি সিরিয়াস।"

"মজার ব্যাপার কী!" আমি এবার আর নিজেকে আটকাতে পারলাম না। আমার ভেতরের সমস্ত ফ্রাস্ট্রেশন আর অপমান একটা গালি হয়ে বেরিয়ে এল। "আমি তো দেখছি আমি সত্যিই বাঞ্চোদ! আক্ষরিক অর্থেই বেহেঞ্চুদ!"

কথাটা খুব আস্তে বললেও, শব্দটা গ্লোরিয়া জিন্সের মতো জায়গায় বসে একজন নারীর মুখের ওপর বলাটা চরম অসভ্যতা। কিন্তু আমার তখন কোনো হুশ ছিল না। আনিকা টেবিলের ওপর দিয়ে উনার হাত বাড়িয়ে আমার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলেন। "চুপ!" উনার গলায় এবার একটা ভয়ংকর কর্তৃত্ব। "আগে শোনো আমি কী বলছি। পুলিশ হয়তো ইনভেস্টিগেশনের জন্য তোমার সাথে যোগাযোগ করতে পারে। তোমাকে থানায় ডাকতে পারে। ভয়ের কিচ্ছু নেই। পুলিশকে তোমার সার্সেই আর জেমি ল্যানিস্টারের ফ্যান্টাসি শোনানোর কোনো দরকার নেই। আমি যা বলেছি, তুমি জাস্ট সেটাই রিপিট করবে। বলবে তুমি প্রুফরিডিংয়ের জন্য ছিলে। আর সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট কথা— পুলিশকে বলবে, বেলাল জানত যে তুমি ওই ফ্ল্যাটে ছিলে। বেলাল আসার পর তুমি চলে এসেছ। আন্ডারস্টুড?"

আমি উনার হাতের মুঠো থেকে আমার হাতটা ছাড়িয়ে নিলাম। আমার মাথার ভেতর তখন একটা সাইরেন বাজছে। আমি একটা নিখোঁজ ব্যক্তির কেসে পুলিশের খাতায় ঢুকে গেছি! আমার জীবনটা এখন একটা সুতোর ওপর ঝুলছে। আমাদের কফি খাওয়া শেষ হলো। আনিকা বিল পেমেন্ট করলেন।

আমরা গ্লোরিয়া জিন্স থেকে বেরিয়ে এলাম। বাইরে কড়া রোদ। আনিকা উনার সানগ্লাসটা চোখে পরলেন। উনার জন্য একটা উবার অপেক্ষা করছিল। উনি গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে ঢোকার আগে আমার দিকে ফিরে দাঁড়ালেন। আমি উনার দিকে তাকিয়ে একটা বিষণ্ণ, তিক্ত হাসি দিয়ে বললাম, "কী ব্যাপার আনিকা? আমার ওই পাগল বাঁড়াটা সুস্থ করবে না? নাকি এখন আমি শুধুই ছোট ভাই?"

আনিকা গাড়ির দরজা ধরে আমার দিকে একটু ঝুঁকলেন। উনার ঠোঁটে সেই পুরোনো, ঘাতক আর মোহনীয় হাসিটা আবার ফিরে এল। উনি উনার সানগ্লাসের ওপর দিয়ে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু, আবেদনময়ী গলায় ফিসফিস করে বললেন— "আর কটা দিন সময় দাও মিস্টার। পরিস্থিতি একটু ঠান্ডা হোক। তোমার ওই পাগলকে আমি এমন সুস্থ করব... যে সে চিরদিনের জন্য পাগল হয়ে যাবে!"

কথাটা বলে আনিকা গাড়িতে উঠে বসলেন। দরজা বন্ধ হয়ে গেল। গাড়িটা আমার চোখের সামনে দিয়ে ধানমন্ডির জ্যামের ভেতর হারিয়ে গেল। আমি ফুটপাতে একা দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার মাথার ওপর ঢাকা শহরের কাঠফাঁটা রোদ। আমার ভেতরে এখন একটা খুনের মামলার আতঙ্ক, আর একই সাথে একটা চরম, বন্য কামনার আগুন জ্বলছে। আমি জানি না বেলাল সাহেবের কী হয়েছে। আমি জানি না আনিকা নাওহার নামের এই ভয়ংকর, সুন্দরী নারীটি আসলে কে।
Reply
#30

৩০



মানুষের শরীরে অ্যাড্রেনালিন হরমোনটা এক অদ্ভুত জাদুকরের মতো কাজ করে। যখন এই হরমোন রক্তে মিশে যায়, তখন মানুষের ভয়ডর, ক্লান্তি, এমনকি ব্যথা বোধও কিছুক্ষণের জন্য পুরোপুরি উধাও হয়ে যায়। তখন একটা ছাপোষা কেরানিও মনে মনে নিজেকে জেমস বন্ড ভাবতে শুরু করে। তখন তার মনে হয়, সে একাই পুরো পৃথিবীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যেতে পারবে।

গ্লোরিয়া জিন্স থেকে বেরিয়ে কারওয়ান বাজারের অফিসে ফেরা পর্যন্ত আমার ধমনিগুলোতে সেই অ্যাড্রেনালিন হরমোনের একটা তীব্র, জ্বলন্ত প্রবাহ ছিল। আনিকার সাথে ওই ফেস-টু-ফেস কনফ্রন্টেশন, উনার সেই বরফশীতল পরিকল্পনা এবং সার্সেই ল্যানিস্টারের মতো ডায়ালগবাজি— সবকিছু মিলিয়ে আমার ভেতরে একটা অদ্ভুত ঘোরের সৃষ্টি হয়েছিল। আমি যেন কোনো হলিউড থ্রিলারের মেইন প্রোটাগনিস্ট হয়ে গেছি, যে এইমাত্র ভিলেনের চোখের দিকে তাকিয়ে এক চরম সত্যের মুখোমুখি হয়ে ফিরে এসেছে। বাসে ওঠার পর কন্ডাক্টর যখন ভাড়া চাইল, আমি এমন একটা ভাব নিয়ে তাকে টাকাটা দিলাম, যেন আমি তাকে বকশিশ দিচ্ছি। আমার চোখের দৃষ্টি তখন তীক্ষ্ণ, চোয়াল শক্ত।

কিন্তু জাদুকরের ম্যাজিক যেমন একসময় শেষ হয়, হরমোনের মেয়াদও ফুরিয়ে আসে। আর সেই হরমোনের প্রভাব যখন রক্ত থেকে নামতে শুরু করে, তখন বাস্তবতার নগ্ন রূপটা এমনভাবে হামলে পড়ে যে, মানুষের তখন নিজের ছায়াকে দেখলেও হার্ট অ্যাটাক হওয়ার উপক্রম হয়।

বাস থেকে কারওয়ান বাজারে নামার সাথে সাথেই আমার সেই জেমস বন্ড ভাবটা কর্পূরের মতো উড়তে শুরু করল। ঢাকা শহরের কড়া রোদ, ধুলোবালি, আর সিএনজির কালো ধোঁয়া আমাকে খুব দ্রুত মনে করিয়ে দিল যে আমি আসলে কে। আমি কোনো হলিউড হিরো নই। আমি রাশেদ আহমেদ। পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের এক সামান্য অনুবাদক, যে একটা চরম ভয়াবহ, নোংরা এবং প্রাণঘাতী ফাঁদে আটকা পড়ে গেছে।

অফিসে ঢুকে নিজের ডেস্কে বসার সাথে সাথেই আমার সেই ঘোরটা দপ করে কেটে গেল। অফিসে ঢুকতেই প্রথম যে ধাক্কাটা খেলাম, সেটা এহসান ভাইয়ের কাছ থেকে। "রাশেদ! তোমার সমস্যাটা কী বলতে পারো?" এহসান ভাই উনার চশমার ফাঁক দিয়ে আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন, যেন আমি ল্যাপটপ চুরি করে পালিয়ে যাচ্ছিলাম। উনার কপালে তিনটে গভীর ভাঁজ, যা শুধু চরম বিরক্তির সময়ই ফুটে ওঠে।

আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। 

"কাউকে কিছু না বলে, কোনো ইনফর্ম না করে তুমি মাঝ-অফিসে গায়েব হয়ে গেলে! আমি তোমাকে আধা ঘণ্টা ধরে খুঁজছি। পুতিনের স্পিচের অনুবাদটা কে করবে? তোমার কি মনে হয় অফিসটা তোমার শ্বশুরবাড়ি? যখন খুশি আসবে, যখন খুশি যাবে?"

‘শ্বশুরবাড়ি!’ শব্দটা শুনে আমার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। এহসান ভাই সাধারণ একটা উপমা দিয়েছেন মাত্র, কিন্তু আমার কাছে শব্দটা একটা জ্বলন্ত চাবুকের মতো শোনাল। আমি তো গত এক মাস আনিকা নাওহারের ফ্ল্যাটে আক্ষরিক অর্থেই ঘরজামাই হয়ে ছিলাম! আমার মনে হলো এহসান ভাই কি কোনোভাবে কিছু জেনে গেছেন? আমি দ্রুত নিজেকে সামলে নিলাম।

"সরি ভাই," আমি আমতা-আমতা করে, চরম অপরাধী মুখে বললাম। "আসলে... আমার মেসের এক ছোট ভাই হঠাৎ করে বাইক অ্যাকসিডেন্ট করে পঙ্গু হাসপাতালে... আমাকে একটু ইমার্জেন্সি ছুটতে হয়েছিল। মাথা এত ব্ল্যাঙ্ক ছিল যে আপনাকে বলে যাওয়ার কথাও মনে ছিল না। এক্সট্রিমলি সরি ভাই। আমি এক্ষুনি নিউজটা নামিয়ে দিচ্ছি।"

বাংলাদেশে বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো ইনভেন্টরি বা রেডিমেড মিথ্যা কথা বলা। মানুষের বিপদে মানুষ যতটা না সহানুভূতি দেখায়, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি সহানুভূতি দেখায় মেডিকেল ইমার্জেন্সিতে। আপনি যদি বলেন আপনার প্রেমিকা পালিয়েছে, বস আপনাকে ঘাড় ধাক্কা দেবে। কিন্তু আপনি যদি বলেন আপনার মামাতো ভাইয়ের অ্যাপেন্ডিসাইটিস ফেটে গেছে, বস সাথে সাথে গলে পানি হয়ে যাবে।

এহসান ভাই 'পঙ্গু হাসপাতাল' শুনে একটু নরম হলেন। উনার কপালের ভাঁজগুলো কিছুটা সমতল হলো। "অ্যাকসিডেন্ট? খুব সিরিয়াস নাকি?"

"জি ভাই, পা ভেঙে দুই টুকরো হয়ে গেছে। রড ঢোকাতে হবে," আমি অবলীলায় আমার কাল্পনিক ছোট ভাইয়ের পা ভেঙে দিলাম।

"আহারে! সাবধানে থাকতে বলবা পোলাপানদের। ঠিক আছে, বসো। আর নেক্সট টাইম এটলিস্ট একটা টেক্সট করে যাবে। দিস ইজ নট এ জোক। আমরা নিউজ ডেস্কে কাজ করি, এখানে প্রতিটা সেকেন্ড ইম্পর্ট্যান্ট," বলে উনি উনার কাজে মন দিলেন।

আমি আমার ল্যাপটপটা ওপেন করলাম। পুতিনের স্পিচের ভিডিওটা প্লে করলাম। কিন্তু আমার চোখ বা কান— কোনোটিই স্ক্রিনে নেই। স্ক্রিনে পুতিন অত্যন্ত গম্ভীর মুখে নিউক্লিয়ার ওয়ার বা পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকি দিচ্ছেন। পুরো বিশ্ব হয়তো সেই হুমকিতে কাঁপছে, কিন্তু আমার তাতে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। আমার নিজের জীবনের ওপর দিয়ে যে পারমাণবিক বোমাটা ফাটতে যাচ্ছে, তার সামনে পুতিনের হুমকিকে আমার কাছে ছোট বাচ্চাদের পটকা ফোটানো বলে মনে হলো।

অ্যাড্রেনালিন হরমোনটা ততক্ষণে পুরোপুরি আমার শরীর থেকে নেমে গেছে। আর তার শূন্যস্থানটা দখল করে নিয়েছে একটা বরফশীতল, হাড়-কাঁপানো, প্যাথলজিক্যাল আতঙ্ক।

ভয়!

খাঁটি, নির্ভেজাল ভয়।

কী হচ্ছে এসব আমার জীবনে? আমি কোথায় এসে ফেঁসে গেছি? আমার মাথার ভেতরে এখন পুলিশের সাইরেন বাজতে শুরু করেছে। আনিকা থানায় গিয়ে মিসিং রিপোর্ট বা জিডি ফাইল করে এসেছে। আর সেই জিডিতে আমার নাম আছে। আমি নাকি উনার 'ছোট ভাই', 'প্রুফরিডার', এবং 'গেস্ট'!

বাংলাদেশ পুলিশের তদন্ত করার ধরন সম্পর্কে আমার খুব ভালো ধারণা আছে। এই দেশের পুলিশকে যতটা বোকা ভাবা হয়, তারা আসলে ততটা বোকা নয়। তাদের কাছে হয়তো উন্নত বিশ্বের মতো ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা ডিএনএ এনালাইসিসের অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি নেই, কিন্তু তাদের কাছে যেটা আছে, সেটা হলো 'সোর্স' এবং 'জেরা করার ক্ষমতা'।

একটা লোক নিখোঁজ হয়েছে। তার বেডরুমে গত পঁচিশ দিন ধরে একটা অচেনা, ভিনদেশি (মানে মিরপুরের) যুবক ছিল। পুলিশ যখন তদন্ত শুরু করবে, তখন কি তারা শুধু আনিকার মুখের কথার ওপর ভরসা করে বসে থাকবে? কক্ষনোই না। তারা প্রথমেই আমার কল লিস্ট চেক করবে। তারা দেখবে আমি আনিকাকে দিনে কতবার ফোন দিয়েছি, কতক্ষণ কথা বলেছি। তারা আমার হোয়াটসঅ্যাপের মেসেজ রিকভার করবে। তারা ওই ষোলো তলা বিল্ডিংয়ের সিসিটিভি ফুটেজ চেক করবে। বিল্ডিংয়ের মেইন গেটে, লবিতে, লিফটে— সব জায়গায় সিসি ক্যামেরা বসানো। তারা খুব সহজেই দেখতে পাবে আমি কীভাবে প্রতিদিন সন্ধ্যায় আনিকার সাথে ওই ফ্ল্যাটে ঢুকতাম, আর পরদিন সকালে কীভাবে একটা ভেজা বিড়ালের মতো বেরিয়ে আসতাম।

আর বিল্ডিংয়ের দারোয়ান মফিজ? ওই লোকটাকে তো আমি চিনি! ওকে ধরে যখন পুলিশ দুইটা ধমক দেবে, কিংবা হাতে পাঁচশো টাকার একটা কড়কড়ে নোট গুঁজে দেবে, মফিজ তখন গড়গড় করে সব বলে দেবে। "স্যার, এই পোলারে তো ম্যাডাম রোজ রাইতে বাসায় নিয়া ঢুকতো। আমরা তো ভাবছিলাম এরা স্বামী-স্ত্রী! ম্যাডামের জামাই তো বিদেশে থাহে, আর এই পোলা তো ম্যাডামের লগেই আঠার মতো লাইগা থাকতো। এরা তো স্বামী-স্ত্রীর লাহানই আছিল!"

মফিজের এই একটা কথাই আমাকে সোজা ফাঁসির দড়ির দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। পুলিশ যদি একবার, জাস্ট একবার আনিকার আর আমার আসল সম্পর্কের কথাটা টের পায়, তাহলে আমার কী হবে? আমার চোখের সামনে ভাসতে শুরু করল একটা ভয়াবহ দৃশ্য।

পুলিশ আমাকে আমার মেস থেকে, অথবা এই কারওয়ান বাজারের অফিস থেকেই হাতকড়া পরিয়ে ধরে নিয়ে গেছে। থানার অন্ধকার একটা রুমে আমাকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। সিলিং ফ্যানের সাথে আমাকে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। আমার পরনে শুধু একটা আন্ডারওয়্যার। আমার সারা গায়ে কালশিটে দাগ। একজন ষণ্ডামার্কা, কালো, গোঁফওয়ালা পুলিশ অফিসার হাতে একটা মোটা, তেল মাখানো লাঠি নিয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল।

অফিসারটা লাঠি দিয়ে আমার হাঁটুতে একটা সজোরে বাড়ি মারল। "কইয়া ফ্যাল শুয়োরের বাচ্চা!" অফিসারটা গর্জে উঠবে। "বেলাল সাহেবরে তুই আর ওই মাগি মিইলা কই গুম করছস? লাশ কই পুঁইতা রাখছস? ওই লন্ডনি সাহেবের এত টাকার সম্পত্তি তুই একা খাইতে চাস? কইয়া ফ্যাল, নাইলে আজকে তোর হাড়ের মজ্জা বাইর কইরা দিমু!"

আমি ব্যথায় চিৎকার করতে করতে বলব, "স্যার, আমি কিচ্ছু জানি না! আমি সত্যি বলছি স্যার, আমি শুধু উনার সাথে শুয়েছি, আমি কাউকে খুন করিনি!"

"চুপ কর হারামি! তুই কি ভাবছস আমরা ঘাস খাই? তুই আর ওই আনিকা মিইলা প্ল্যান কইরা জামাইরে দুনিয়া থেইকা সরাইয়া দিছস। এখন সাধু সাজতেছস!"

রিমান্ডের এই কল্পনাটা এতই জীবন্ত আর এতই রিয়েলিস্টিক ছিল যে, অফিসের এসির মধ্যেও আমার কপাল ঘেমে উঠল। আমি আমার হাতের আঙুলগুলোর দিকে তাকালাম। এই আঙুলগুলো দিয়ে আমি ল্যাপটপে টাইপ করি, এই আঙুলগুলো দিয়ে আমি আনিকার শরীর ছুঁয়েছি। আর এই আঙুলগুলোতেই হয়তো পুলিশ প্লাস দিয়ে চেপে ধরে আমার নখ উপড়ে ফেলবে!

আর আনিকা? আনিকার মতো হাই-সোসাইটির বিলিয়নিয়ার নারী কি পুলিশের সামনে আমার হয়ে ঢাল ধরবে? উঁহু। কোনো চান্স নেই। শূন্য পারসেন্ট চান্স। আনিকা নাওহার হচ্ছে সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্টের এক চরম উদাহরণ। উনি নিজের স্বার্থের জন্য, নিজের স্কিন বাঁচানোর জন্য পৃথিবীর যেকোনো কিছু করতে পারেন। পুলিশের জেরার মুখে পড়লে, আনিকা যদি দেখে যে তার নিজের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে, তখন সে এক সেকেন্ডও সময় নেবে না আমাকে বলি দিতে। সে আমাকে একটা ব্যবহৃত টিস্যু পেপারের মতো ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলবে।

আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, কোর্টের কাঠগড়ায় আনিকা দাঁড়িয়ে আছেন। উনার পরনে একটা ধবধবে সাদা শাড়ি। চোখে জল। উনাকে দেখতে একদম স্বর্গের কোনো নিষ্পাপ, দুঃখী পরীর মতো লাগছে। বিচারক থেকে শুরু করে কোর্টের পিয়ন পর্যন্ত সবাই উনার রূপ আর উনার কান্নায় গলে পানি হয়ে যাচ্ছে।

উনি চোখের পানি মুছতে মুছতে ম্যাজিস্ট্রেটকে বলবেন, "ইয়োর অনার, আমি তো অসহায় একটা মেয়ে। আমার স্বামী বিদেশে থাকত। আমি একা থাকতাম। এই রাশেদ লোকটা একটা সাইকোপ্যাথ। সে আমার প্রুফরিডার ছিল। কিন্তু সে আমার প্রেমে পাগল হয়ে আমার পিছে পিছে ঘুরত। সে আমাকে ব্ল্যাকমেইল করত। আমার স্বামী বেলাল যেদিন দেশে ফেরে, তখন এই রাশেদ ব্যাপারটা মেনে নিতে পারেনি। সে-ই হয়তো আমার স্বামীকে কিছু করেছে! ইয়োর অনার, আমি কিচ্ছু জানি না। আমার স্বামীকে আপনারা ফিরিয়ে দিন!"

ব্যাস! দুই পুরুষের লড়াইয়ে এক অসহায় নারীর করুণ গল্প! বাংলার মিডিয়া আর পাবলিক এই ধরনের গল্প লুফে নেবে। আমাদের দেশের মানুষের সবচেয়ে প্রিয় বিনোদন হলো অন্যের স্ক্যান্ডাল। পরকীয়া, খুন, আর লন্ডনপ্রবাসী নারী— এই তিনটা উপাদান একসাথে পেলে মিডিয়া যা করবে, তা কল্পনা করলেও আমার গা শিউরে উঠছে।

পত্রিকাগুলোর প্রথম পাতায় লাল কালিতে হেডলাইন হবে—

"পরকীয়ার বলি লন্ডনপ্রবাসী ইঞ্জিনিয়ার: ঘাতক অনুবাদক রাশেদ রিমান্ডে!"

"লেখিকা স্ত্রীর গোপন প্রেমিক: কে এই রাশেদ?"

"প্রেমিকের হাতে স্বামী খুন: ধানমন্ডির ফ্ল্যাটে কী ঘটেছিল সেই রাতে?"

আর সোশ্যাল মিডিয়া? ফেসবুক আর ইউটিউবে তো আমাকে নিয়ে রীতিমতো উৎসব শুরু হয়ে যাবে। বড় বড় ইউটিউবাররা আমার ছবি, আনিকার ছবি আর বেলালের ছবি দিয়ে থাম্বনেইল বানাবে। লাল গোল্লা দিয়ে আমার মুখটা মার্ক করে ক্যাপশন দেবে— "দেখুন এই নরপিশাচের আসল চেহারা!" টক শোগুলোতে বড় বড় সমাজবিজ্ঞানীরা আমার চারিত্রিক অবক্ষয় নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বকবক করবেন। আমার মেসের রুমমেট তুহিন আর রাজুকে টিভিতে ইন্টারভিউ দিতে দেখা যাবে। তারা বলবে— "রাশেদ ভাই তো সারাদিন চুপচাপ থাকত। আমরা তো ভাবতেও পারিনি সে এত বড় একটা খুনি আর লুইচ্চা!"

আমার বাবা... নওগাঁর সেই সাধারণ ভুসিমাল ব্যবসায়ী। যিনি গ্রামের দোকানে বসে বুক ফুলিয়ে বলেন তার ছেলে ঢাকা পেপারসে চাকরি করে। তিনি যখন টিভিতে এই খবর দেখবেন, তখন তার কী হবে? আমার মা তো লজ্জায়, অপমানে হয়তো গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করবেন। আমার ছোট ভাই নিহাদকে কেউ আর সম্মান করবে না। আমার পুরো পরিবারটার মুখে চুনকালি মেখে যাবে।

ভয়ে আমার পুরো শরীর ঠাণ্ডা হতে লাগল। অফিসের সেন্ট্রাল এসি আজ চলছে চব্বিশ ডিগ্রিতে, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আমি সাইবেরিয়ার কোনো বরফ ঢাকা পাহাড়ে বসে আছি। শীত আর ভয়ের ঠাণ্ডা মিলে আমার গা রীতিমতো কাঁপতে শুরু করল। আমি দুই হাত দিয়ে নিজেকে জড়িয়ে ধরে ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। আমার মনে হচ্ছে, চারপাশের বাতাস ক্রমশ কমে আসছে।

আমি কি সত্যিই কোনো খুনের সাথে জড়িত? না। আমি তো শুধু একটা লোভের বশবর্তী হয়ে একটা মেয়ের পাতা ফাঁদে পা দিয়েছিলাম। আমার অপরাধ তো শুধু কামনার। কিন্তু আইন আর সমাজ তো আমার সেই ফ্যান্টাসিকে বিবেচনা করবে না। তারা দেখবে ফ্যাক্ট। আর ফ্যাক্ট হলো, বেলাল যেদিন নিখোঁজ হয়, সেদিন আমি ওই ফ্ল্যাটে ছিলাম।

আমার মাথার ভেতর আরেকটা অমীমাংসিত প্রশ্ন একটা ড্রিলের মতো ঘুরতে লাগল। সেদিন সকালে, মানে ২রা এপ্রিল, বেলাল সাহেব যখন লাগেজ নিয়ে আনিকার ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমে ঢুকলেন, তখন আসলে কী ঘটেছিল?

আমি তো নিজের প্রাণ বাঁচাতে খালি পায়ে দৌড়ে ইমার্জেন্সি সিঁড়ি দিয়ে পালিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু আনিকা? আনিকা তো তখনো সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় মাস্টার বেডরুমে ঘুমাচ্ছিল। বেলাল সাহেব কি সরাসরি বেডরুমে ঢুকেছিলেন? একজন স্বামী মাসের পর মাস বিদেশে থাকার পর যখন দেশে ফিরে আসে, তখন সে তো সর্বপ্রথম তার স্ত্রীর কাছেই যায়। বেলাল সাহেব নিশ্চয়ই বেডরুমে ঢুকেছিলেন। উনি কি উনার স্ত্রীর ওই এলোমেলো, সদ্য-সঙ্গম-করা শরীর দেখে কিচ্ছু বুঝতে পারেননি?

আমাদের সেই উদ্দাম রাতের পর বিছানার চাদরের যে অবস্থা ছিল, বাতাসে যে তীব্র আদিম গন্ধটা ভাসছিল, সেটা তো যেকোনো সাধারণ মানুষেরও বুঝে ফেলার কথা। তার ওপর আমি ছিলাম। আমি যে একটা পরপুরুষ ওই ফ্ল্যাটে ছিলাম, সেটার চিহ্ন তো সব জায়গায় ছড়ানো ছিল। আমার ফেলে যাওয়া আড়ংয়ের শার্ট, আমার জুতো, আমার ছাইদানিতে ফেলে রাখা সিগারেটের ফিল্টার!

বেলাল সাহেব কি এগুলো কিছুই দেখেননি? নাকি আনিকা জাদুকর? কীভাবে একটা লোক, তার নিজের বেডরুম থেকে একজন অচেনা যুবককে ঘুম থেকে উঠে বেরিয়ে আসতে দেখে, এবং তারপর ড্রয়িংরুমে সেই যুবকের সাথে বসে হাসিমুখে কফি খায়! "কী ব্যাপার, নাশতা আনতে গিয়েছিলেন?"— এটা কি কোনো সুস্থ, স্বাভাবিক, আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন স্বামীর কথা হতে পারে?

এই মহিলা কি কোনো মায়াবিনী? উনার কাছে কি এমন কোনো ব্ল্যাকম্যাজিক বা সম্মোহনবিদ্যা আছে যা দিয়ে উনি উনার স্বামীকে হিপনোটাইজ করে ফেলেছিলেন? নাকি বেলাল সাহেব নিজেই কোনো অদ্ভুত সাইকোলজিক্যাল রোগে ভুগছিলেন? উনি কি ওপেন ম্যারেজ বা কাকোল্ড (Cuckold) ফ্যান্টাসিতে বিশ্বাসী ছিলেন, যেখানে নিজের স্ত্রীকে অন্যের সাথে দেখতে আনন্দ পান?

না, এটা অসম্ভব। বেলাল সাহেবের চোখের দৃষ্টিতে আমি সেদিন কোনো বিকারগ্রস্ত মানুষের ছায়া দেখিনি। উনি একজন সাধারণ, ভদ্র এবং শিক্ষিত মানুষের মতোই আচরণ করছিলেন। তাহলে আনিকা উনাকে কী বলেছিলেন? কীভাবে উনি পরিস্থিতিটা এত ঠান্ডা মাথায় ম্যানেজ করেছিলেন? এবং সবচেয়ে বড় কথা, বেলাল সাহেব এখন কোথায়?

যদি বেলাল সাহেবকে খুন করা হয়ে থাকে, তবে সেটা কে করেছে? আনিকা নিজে? একজন নারী একা একটা সুঠামদেহী পুরুষকে কীভাবে গুম করতে পারে? নাকি আনিকার সাথে আরও কেউ জড়িত আছে? এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। কিন্তু এই প্রশ্নগুলো আমার মগজটাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। আমার মাথার ভেতর একটা ব্লেন্ডার মেশিন চলছে, যেটা আমার সমস্ত লজিক, সমস্ত ভাবনাকে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলছে।

আমি এখন কী করব?

আমার তো এখনই পালানো উচিত। বাংলাদেশ ছেড়ে, বর্ডার ক্রস করে ইন্ডিয়া বা নেপালে পালিয়ে যাওয়া উচিত। কিন্তু আমার পকেটে তো টাকা নেই। আমার পাসপোর্ট নেই। আমি কোথায় পালাব? বিপদে পড়লে মানুষ সাধারণত তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু বা পরিবারের সাথে শেয়ার করে। মানুষ চায় কারো কাঁধে মাথা রেখে একটু কাঁদতে, একটু সান্ত্বনা পেতে। কিন্তু আমার এই বিপদটা এতটাই নোংরা, এতটাই কদর্য এবং এতটাই অবিশ্বাস্য যে, এটা কারো সাথে শেয়ার করার উপায় নেই।

আমি যদি আমার বাবা-মাকে বলি যে আমি অন্যের স্ত্রীর সাথে শুতে গিয়ে এখন গুমের মামলায় ফেঁসে যাচ্ছি, বাবা হার্ট অ্যাটাক করবেন আর মা বিষ খাবেন। মেসের তুহিন বা রাজুকে বললে ওরা আমাকে রাতেই মেস থেকে বের করে দেবে। ওরা তো ভদ্র ফ্যামিলির ছেলে, ওরা তো কোনো মার্ডার সাসপেক্টকে নিজেদের রুমে থাকতে দেবে না।

আমার এমন একজনকে দরকার, যে এই দুনিয়ার অন্ধকার গলিঘুঁজি খুব ভালো করে চেনে। যে পুলিশ, ক্রাইম, আন্ডারওয়ার্ল্ড আর থানা-পুলিশের সাইকোলজি বোঝে। যে বুঝতে পারবে পুলিশ কীভাবে চিন্তা করে, আর ক্রিমিনালরা কীভাবে ফাঁদ পাতে। এবং সবচেয়ে বড় কথা, আমার এমন কাউকে দরকার যে আমার এই ঘটনা শুনে আমাকে জাজ করবে না। যে আমাকে নীতিবাক্য শোনাবে না বা নৈতিকতার লেকচার দেবে না।

আমি শূন্য দৃষ্টিতে নিউজ রুমের দিকে তাকালাম। হঠাৎ করে আমার মাথায় একটা নাম বিদ্যুতের মতো ঝলসে উঠল।

আশিক ভাই!
Reply


Forum Jump:


Users browsing this thread: 1 Guest(s)