08-29-2026, 11:01 PM
পর্ব:০৪
সকাল গড়িয়ে দুপুরের দিকে এগোচ্ছে। প্রতিদিনের ন্যায় সময়মতো অফিসে বেরিয়ে গেছে শায়ান। বাড়িটা আজ বরাবরের মতো নিস্তব্ধ। অরুনীমা সকাল সকাল গোসল সেরে বারান্দার কোণে একটা চেয়ার টেনে বসেছে। বেশ ঠান্ডা আবহাওয়া আজ। একটু রোদের দেখা মিলতেই অরুনীমা বারান্দায় চলে গিয়েছিলো। অল্প রোদ এসে পড়েছে তার গালে, চুলে। মুলত, ভেজাগুলো চুল শুকোচ্ছে সে। তার ভঙিমায় বেশ সতেজতা মিশে আছে আজ। আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে সে। নীল বিস্তারে ভাসছে তার অগোছালো ভাবনাগুলো। ভাবনাগুলো… কত রকমের! কিছু অযাচিত, কিছু গভীর, কিছু আবার অদ্ভুত মিষ্টি। তবে অরুনীমার সব ভাবনার মূল বিষয়বস্তু এখন শায়ান। একটু একটু ভালো লাগতে শুরু করেছে তার, মনের অজান্তেই।
গত রাতের পর অরুনীমা একদম নিশ্চিতভাবে এটা বুঝেছে যে শায়ান তাকে ভালোবাসে। সেরকম ভালোবাসাই বাসে, যেমনটা বাসলে ভালোবাসার মানুষটিকে আগলে রাখা যায়, আঁকড়ে ধরে রাখা যায় সারাজীবন। রাগের মাথায়, ঠান্ডা মাথায় সব ভাবেই শায়ানের স্বীকারক্তি পেয়েছে। এবং তা শুধুই অরুনীমার প্রতি ভালোবাসা।
“শুধুই ভালোবাসা?”
নিজেই মনে মনে প্রশ্ন করে সে। তারপর হালকা হেসে ফেলে বিরবির করে বলে,
"উ'হু… গভী'র ভালোবাসা।”
এমন ভাবনার মাঝেই দরজায় টোকার আওয়াজ হয়। অরুনীমা তা শুনতে পেয়ে ভ্রু কুচকায়। এই সময় শায়ান তো ফিরবে না… তাহলে কে? ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যায় সে। দরজা খুলতেই এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায় অরুনীমা।
সামনে তাকিয়ে দেখে তার বাবা অরুনাভ শিকদার। পরনে স্বাভাবিক কোটপ্যান্ট। নিজের বাবাকে প্রায় মাসখানেক পর দেখছে অরুনীমা। বিয়ের পর একটা ফোনকল অব্দি পায় নি সে। অথচ আজ হঠাৎ… সামনে দাঁড়িয়ে।
অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে অরুনীমা। পরক্ষণেই অরুনাভ এগিয়ে এসে মেয়েকে আলতো করে জড়িয়ে ধরেন। আর বললেন,
“আম্মু, কেমন আছো? কতদিন দেখি না তোমায়…”
কথাগুলো শুনেই বুকের ভেতর জমে থাকা অভিমানগুলো এক নিমেষে নরম হয়ে উবে যায়। অরুনীমা মৃদু হেসে বলে,
“ভালো আছি, বাবা… ভেতরে এসো।”
অরুনাভ শিকদার ভেতরে আসলেন। এসেই ঘরের আশেপাশে চোখ বুলালেন তীক্ষ চোখে। ছোট্ট, গুছানো একটা সংসার। ঘরটা তার কাছে ছোটখাটোই মনে হলো। স্পেসটা আরেকটু দরকার ছিলো। তবে মুখে তিনি তা বললেন না। গিয়ে সোফায় বসলেন। অরুনীমাকেও টেনে পাশে বসালেন। তারপর বললেন,
"তুমি আমার ওপর রাগ করে আছো তাইনা? কারণ জোর করে তোমায় শায়ানের সাথে বিয়ে দিয়েছি। কিন্তু বিশ্বাস করো, শায়ানের থেকে উপযুক্ত পাত্র তোমার জন্য কেউ হতোই না।"
অরুনীমা মাথা নাড়ে ধীরে। তারপর বলল,
“না বাবা… রাগ করে নেই। আর করবোই বা কেন? এইযে তুমি তো বললে, শায়ান আমার জন্য উপযুক্ত। সত্যিই তো! তখন রাগ হলেও এখন বুঝতে পারছি… তুমি ভুল বলোনি।”
অরুনাভ মৃদু মাথা দোলালেন। তারপর অরুনীমা অভিযোগ করে বলল,
"আর উপযুক্ত থাকলেও পেটে পেটে শয়তানী আছে। জানো বাবা, শায়ান আমার ওপর প্রতিশোধ নিয়েছে ওকে রিজেক্ট করার। ও আমাকে দিয়ে একগাদা কাপড় ধুয়িয়েছিলো বিয়ের প্রথম দিন। ভাবতে পারছো?"
অরুনাভ ভরকালেন সামান্য। বিস্মিত হয়ে বললেন,
"কিহ? এখন বলো না এই কারণে তুমি মেনে নিয়েছো শায়ানকে?"
অরুনীমা হেসে বলে,
"ধুর নাহ! আমার ইনোসেন্ট ফেস দেখে গলিয়ে ফেলেছি পরদিনই, হাহাহা! অবশ্য শায়ান নিজের কাজ নিজেই করে সব। ওই একদিনই শিক্ষা দিয়েছিলো আমাকে।"
অরুনাভ নিজেও মৃদু হাসলেন এদের খুনসুটির গল্প শুনে। তারপর চারপাশে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন,
“এই বাড়িতে থাকতে তোমার অসুবিধা হচ্ছে না?”
অরুনীমা উঠে দাঁড়িয়ে হেসে বলে,
“একদমই না। বরং খুব পছন্দ হয়েছে। এবার তুমি বলো, কফি না চা?"
অরুনাভ মৃদু হেসে বললেন,
"অবশ্যই চা।"
অরুনীমা সাথে সাথে কিচেনে চলে গিয়ে চা করে আনলো ঝটপট। তারপর বাবার সাথে অনেকদিন পর দীর্ঘক্ষন আলাপচারিতা হলো। অরুনীমাও সব অভিমান ভুলে বলতে লাগে এই বাড়িটা সে কিভাবে কিভাবে সাজিয়েছে, শায়ান কতটা হেল্প করেছে।সব শুনে অরুনাভ খানিকটা অবাক হলেন বটে। মেয়েটা কি এক ঝলকে বোঝদার হয়ে গেলো! তিনি বলেই ফেললেন,
"এত কিছু করেছো তুমি? রান্নাও করতে পারো?"
অরুনীমা হেসে ফেলে,
“অত ভালো না… তবে খাওয়ার মতো। কাল রাতেও আমিই রান্না করেছি। শায়ান তো খুব প্রশংসা করলো!”
অরুনাভের কপাল কুঁচকে যায় হালকা। সন্দেহজনক গলায় জিজ্ঞেস করে,
“শায়ান তোমাকে দিয়ে রেগুলার রান্না করায়?”
অরুনীমা শান্ত গলায় বলল,
"না। রান্নাটা আগে ওই করতো। আমি নিজে থেকেই ভেবেছি রান্না করবো, যেহেতু বাসায় বসেই থাকি। ও বাইরে থেকে এসে ক্লান্ত শরীরে আবার কিভাবে রান্না করবে? এটা কি ঠিক? তাও ও নিজেই জোর করে কিচেনে গেলে আমি বারণ করে দিই।"
অরুনাভ আরও অবাক হলেন মেয়ের এরুপ পরিবর্তনে। কিন্তু ভালোও লাগলো দুটোতে মিলেমিশে আছে দেখে। অরুনাভ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন,
"এভাবে বসে না থেকে তোমার আর্ন করা উচিত, আম্মু। এতে দুজনেই নিজেদের সংসারের হাল ধরতে পারবে।"
অরুনীমা মাথা নাড়ে,
"রুটিন মাফিক চাকরি-বাকরি, অন্যের কর্তৃত্ব আমার পছন্দ না, তুমি তো জানোই বাবা। তাই ওসবে যাচ্ছি না। তবে হ্যাঁ, আমি নিজের মতো করে আর্ন করবো ভেবেছি। একটা প্রাইভেট স্কুলে শায়ান কথা বলেছে। সামনের মাস থেকে আমি সেখানে পড়াবো। যা বেতন তাতে ভালোভাবেই চলে যাবে আমার।"
অরুনাভ মাথা নাড়ালেন আলতো করে। এবার বাবা-মেয়ের আলাপ-আলোচনার শেষ প্রান্তে অরুনাভ কোটের ভেতর থেকে মোটা মোটা দুটো টাকার বান্ডিল বের করেন। তারপর তা অরুনীমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেন,
"এগুলো রাখো। প্রয়োজনে ব্যবহার করবে।"
অরুনীমা বিস্মিত হয়ে তাকালো। সাথে সাথে সেই বান্ডিলগুলো ফেরত দিয়ে বলল,
"এসব কি করছো, বাবা? এগুলো নিতে পারবো না আমি!"
“কেন?”
অরুনীমা মৃদু শ্বাস ফেলে বলল,
"শায়ান এসব জানলে ওর ইগো হার্ট হবে, বাবা। এক কথায় ইনসাল্ট হবে ওর। তাছাড়া, আমাদের এত টাকার দরকার নেই। উই আর ফাইন। হ্যাঁ, এ মাসে ফার্নিচার কিনে বাড়িঘর গোছানোয় একটু টান পড়েছে, বাট উই ওইল ম্যানেজ।"
অরুনাভ উদিগ্ন কন্ঠে বললেন,
"এগুলোকে আমার সাহায্য ভাবছো কেন? ধরে নাও এটা আমার তরফ থেকে উপহার তোমাদের দুজনের জন্য। এখন বাবারা কি ভালোবেসে কিছু দিতেও পারবে না?"
অরুনীমা তার বাবার হাত আগলে ধরে মায়াময় গলায় বলল,
"তুমি শুধু দোয়া করো আমাদের জন্য। আর কিচ্ছু চাই না।"
অরুনাভ বিমুঢ় হয়ে তাকিয়ে রইলেন মেয়ের দিকে। এসব শুনে আর জোর করলেন না। শায়ান কেমন ছেলে তা ভালো করেই জানে অরুনাভ। কিন্তু মেয়ের সুখের জন্য এতটুকু দিতে চেয়েছিলেন। তবে মেয়েটা এই ক'দিনে এত বোঝদার হয়েছে তা বুঝতে বাকি নেই আর। অবশেষে উঠে দাঁড়িয়ে তিনি মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,
"সব সময় দোয়া করি তোমাদের জন্য। আজ আসি।"
অরুনীমা মাথা নাড়ায়। বিদায় নিয়ে চলে যান অরুনাভ। দরজা বন্ধ করে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে অরুনীমা। তারপর এক দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে কিচেনে ঢোকে। গান চালিয়ে দেয় ফোনে। একটু একটু করে রান্না জিনিসটা আয়ত্বে আসছে অরুনীমার। বুঝতে পারছে সে। আর ভালোবাসা মানে শুধুমাত্র অনুভূতি নয়। ভালোবাসা মানে দুজনের দায়িত্ব। একটু একটু করে অবুঝপনা থেকে শেখা। আর দু’জন মিলে নিজেদের একটা সুখময় পৃথিবী গড়ে তোলা।
--------------------------
বিকেলের দিকে অফিস থেকে বাড়ি ফেরে শায়ান। বেশ ক্লান্তি নিয়েই শায়ান বাড়ি ফিরেছে। দরজা পেরিয়ে হাত দুটো উপরে তুলে কসরত ভঙ্গিতে নিজেকে একটু হালকা করে নিলো। তারপর বাইরের কাপড় বদলে, তোয়ালে কাঁধে নিয়ে সরাসরি চলে গেলো ওয়াসরুমে। কিছুক্ষণ পর ফিরে এলো ভেজা চুলে, জলবিন্দু গড়িয়ে পড়ছে কপাল বেয়ে। ঘরে ঢুকেই তার চোখ আটকে গেলো অরুনীমার দিকে।
মেয়েটা ব্যস্ত হাতে খাবার গুছিয়ে রাখছে। অদ্ভুত ব্যস্ততা তার চলাফেরায়। চুল মুছতে মুছতে শায়ান এগিয়ে গিয়ে হালকা গলায় বলল,
"বাড়িতে কে এসেছিলো রে?"
অরুনীমা একটু চমকে তাকিয়ে বলল,
"তুই বুঝলি কীভাবে?"
শায়ান ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
"দুটো চায়ের কাপ নিশ্চয়ই তুই একা খাবি না।"
অরুনীমা নরম স্বরে উত্তর দিলো,
"বাবা এসেছিলো।"
"আংকেল এসেছিলো! এত তাড়াতাড়ি যেতে দিলি কেন?"
কিছুটা আক্ষেপ শায়ানের গলায়। আর কিছুক্ষণ থাকলে দেখা করতে পারতো শায়ান। অরুনীমা সংক্ষিপ্ত জবাবে বলে,
"কাজ ছিলো…"
শায়ান জিজ্ঞেস করে,
"খেয়েছিস তুই?"
খাওয়ার প্লেটটা এগিয়ে দিয়ে অরুনীমা বলল,
"হুম, মাত্রই। তারাতাড়ি খেয়ে ছাদে আয়, আমি গেলাম।"
এই বলে অরুনীমা টি-শার্টের উপর গলায় ওরনা পেচিয়ে চলে যায় ছাদে। শায়ান নিজেও খাওয়া শেষ করে ঘরের দরজা লাগিয়ে চলে আসে। অরুনীমা তখন ছাদের কিনারায় রেলিঙ ধরে দাঁড়িয়ে ছিলো। আজকের আবহাওয়া অনুযায়ী দমকা বাতাস বইছে। পাশে দুটো ফুলের গাছ। মেয়েটা ছাদে দুটো ফুলের গাছ লাগিয়েছে। তবে এখনো ফুল ফোটে নি। শায়ান যখন ছাদে উঠলো, তখন সন্ধ্যার হাওয়া জোরে বইছে। আকাশের রঙ বদলাতে শুরু করেছে। শায়ান অরুনীমার পাশে দাঁড়িয়ে গলা খাকারি দিয়ে চলে,
"আজকে স্যালারি পেয়েছি।"
অরুনীমার চোখ খুশিতে জ্বলে উঠলো,
"বাহ! তাহলে আজ ট্রিট! রাতে রান্না নেই!"
শায়ান মুচকি হেসে মাথা নাড়লো,
"ওসব পরে। আমি কিছু এনেছি তোর জন্য!"
অরুনীমা কৌতুহলী হয়ে বলল,
"তাই? কি এনেছিস দে!"
শায়ান সতর্ক করে বলল,
"দিচ্ছি, তার আগে বল তুই হাসবি না?"
অরুনীমা নিজের মাথা চাপড়ে বলল,
"আমি কেন হাসবো? আরে বাবা... দেখা না!"
শায়ান পেছন থেকে একটা বক্স সামনে আনে। অরুনীমা কৌতূহল নিয়ে খুলতেই থমকে গেলো। ভেতরে রঙিন চুড়ির সারি। তা দেখে খানিকটা থমকে সে বলে,
"এগুলো!"
শায়ানের কণ্ঠে ছিলো একরাশ নির্লিপ্ততা,
"আই নো, তুই চুড়ি-টুরি পরিস না, পছন্দ না তোর এগুলো। কিন্তু তোর হাতে এই সবকটা রঙই মানাবে। ফেরার সময় দেখে পছন্দ হলো, তাই কিনে আনলাম এগুলো।"
কিছুক্ষণ শায়ানের দিকে তাকিয়ে থেকে অরুনীমা বলল,
" বক্সটা ধর, এনেছিস যখন পরে দেখি।"
শায়ান বক্সটা ধরলে অরুনীমা নীল রঙের কিছু চুড়ি বের করে পরতে চেষ্টা করে। কিন্তু হাতে ঢুকছে না।কিছুক্ষণ চেষ্টা করে একটু বিরক্ত হয়ে শায়ানকে বলে,
"ছোট সাইজ মনে হচ্ছে!"
শায়ান বক্সটা নিচে রেখে হালকা গলায় বলে,
"হতে পারে। আমাকে দে, আমি ট্রাই করে দেখি একবার।"
অরুনীমা হাত বাড়ালে শায়ান প্রথমবারে খুব সহজেই চুড়িগুলো পরিয়ে দিলো। তারপর বলল,
"গাধা! ঠিক সাইজ'ই এনেছি। আরেকটু বড় হলে খুলে পড়ে যেতো।"
অরুনীমা ঠোঁট উল্টায়। সে কি করে বুঝবে? অরুনীমা ঠোঁট ফুলিয়ে হাতটা উল্টেপাল্টে দেখলো। নাহ, খারাপ না। সত্যিই সুন্দর লাগছে। সে হঠাৎ জিজ্ঞেস করলো,
"কাল কি খাওয়াবি বল?"
"তোর যা ইচ্ছে।"
তারপর নিঃশব্দে অরুনীমা মাথাটা শায়ানের কাঁধে রাখলো। তারপর আঙুল দিয়ে শায়ানের হাতে পরা ব্রেসলেট ঘোরাতে লাগলো আনমনে। দুজনের চোখজোড়া তখন সামনে নিবিষ্ট। হঠাৎ শায়ান খেয়াল করে বলল,
"এই! তুই আমার টি-শার্ট পরেছিস কেন?আমার ফেবারিট এটা!"
অরুনীমা নির্বিকার,
"আমার ভালো লেগেছে। সমস্যা নেই, শেয়ার করবো।"
"আমরা সিবলিংস না কিন্তু!"
শায়ানের ঠান্ডা গলায় বলে। কিন্তু অরুনীমা একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উত্তর দেয়,
"কিন্তু কাপল তো!"
শায়ান পাশ ফিরে ছোট ছোট চোখে তাকায়।অরুনীমা সেসবে পাত্তা না দিয়ে বলল,
"জানিস আজ একটা মুভি দেখছি। হেব্বি রোমান্টি'ক মুভি!"
শায়ান ভ্রু কুচকে বলে,
"তুই এনাইম ছেড়ে রোমান্টিক মুভি দেখছিস কবে থেকে?"
অরুনীমা বলল,
"এনাইমেও রোমান্টিক সিন আছে, তুই বুঝবি না। আচ্ছা যেটা বলছিলাম শোন। মুভিটাতে নায়িকা নায়কের গালে কি'স করে। তো সেখানেই ব্যাকগ্রাউন্ড মিউসিক বাজে, তারপর গান শুরু হয়। কিন্তু আমার প্রশ্ন একটা সাধারণ চুমুতে নায়কের কি এমন হয়ে গেলো যে নায়িকার সাথে তার নাচতে হবে! এগুলো মানুষ কিভাবে দেখে!"
শায়ান বেশ জোরেই হেসে ফেললো মেয়েটার অদ্ভুতরকম উদ্ভট কথাবার্তা শুনে। অরুনীমা এবার কাঁধ থেকে মাথা তুলে মুখ কুচকে বলল,
"হাসিস না তো! পারলে জবাব দে, ইয়ার! লজিক পেলাম না আমি!"
শায়ান অরুনীমার মাথায় টোকা দিয়ে বলল,
"এসব দেখিস না তুই। পেকে যাবি।"
অরুনীমা হাহুতাশ করতে করতে বলল,
"পাকা উচিত আমার। নাও, আ'ম টুয়েন্টি ফাইভ। আর কবে পাকবো, হু'হ!"
অরুনীমার এবার কি ভেবে যেন বলল,
"শোন, একটু নিচু হ তো!"
"কেন?"
"চু'মু দেবো। এক্সপেরিমেন্ট করবো তোর ওপর।"
শায়ান স্তব্ধ। মেয়েটা কি আবোল-তাবোল বলছে! মাথাটা বিগড়েছে নিশ্চিত। তাই ধমকে বলল,
"পাগল হয়েছিস? কি বলছিস?"
অরুনীমা এবার দুষ্টুমি করে বলল,
"আরে শা/লা নিচু হ! নিজেও তো দিলি কাল। এমনিতে জীবনে সব এক্সপেরিমেন্টের দরকার আছে। আর তাছাড়া তোর সাথে সব লিগ্যাল আমার। নিচু হ এবার কথা না বলে!"
শেষমেশ বাধ্য হয়ে শায়ান নিজের গাল বাড়িয়ে দিলো। অরুনীমা নিজের পায়ে ভর করে সামান্য উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে টু'প করে একখানা চু'মু বসালো শায়ানের খসখসে গালটায়। পরপর দু'বার এমন করলো। শায়ান বিমুঢ় হয়েই রইলো নড়াচড়া বন্ধ করে। এরপর অরুনীমা ভাবুক কন্ঠে বলল,
"তেমন কিছুই তো হলো না। নরমাল'ই লাগলো!"
শায়ান তা শুনে মুচকি হাসে। তারপর মাথাটা ঝুঁকিয়ে নিজেই টু'প করে অরুনীমার গালে ঠোঁট চেপে ধরে বলল,
"আমি ঠিকমতো করলে সেটা নরমাল লাগতো না।"
এইসব শুনে অরুনীমা ত্রস্ত বেগে তাকালো শায়ানের দিকে। কিন্তু শায়ান তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে মিছে হাই তুলছে—যেন কিছুই হয়নি। অরুনীমা বুঝতে পারছে, ছেলেটা দিনদিন লাগাম ছাড়া হচ্ছে, অসভ্য হচ্ছে! তারমধ্যে আজ তো অরুনীমা নিজেই সুযোগ করে দিয়েছে। তাই অরুনীমা রেগেমেগে বেশ জোরেই ঘুষি মারলো শায়ানের বাহুতে। এতে শায়ানের কিছুই হলো না। বরং শায়ান ঠোঁট কাম'ড়ে হেসে হুট করেই লাগামছাড়া হলো সত্যি সত্যি। আচমকা অরুনীমার হাত ধরে টেনে নিজের সাথে চেপে ধরলো। নিজের পুরু ঠোঁট দাবিয়ে আরও তিন-চারটে চু'মু খেলো অরুনীমার নরম গালটায়। এবার অরুনীমা স্তব্ধ, বিস্মিত, বিমুঢ়। নিজেকে ছাড়াতে ভুলে গেলো সে। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো শায়ানের দিকে। অরুনীমা তেঁতে উঠে বলল,
"তুই কেন চু'মু দিলি আমায়?"
শায়ান মুচকি হেসে বলল,
“এভরি অ্যাকশন হ্যাজ আ রিঅ্যাকশ'ন, অরুনীমা ডার্লিং। তুই আমাকে আগে চু'মু দিয়েছিস, আমিও ফেরত দিয়ে দিলাম। ইয়্যু নো না, শায়ান তালুকদার ঋন রাখে না।”
#চলমান.......
(মন্তব্য করেন না কেন? ??)
[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। ? ?]
সকাল গড়িয়ে দুপুরের দিকে এগোচ্ছে। প্রতিদিনের ন্যায় সময়মতো অফিসে বেরিয়ে গেছে শায়ান। বাড়িটা আজ বরাবরের মতো নিস্তব্ধ। অরুনীমা সকাল সকাল গোসল সেরে বারান্দার কোণে একটা চেয়ার টেনে বসেছে। বেশ ঠান্ডা আবহাওয়া আজ। একটু রোদের দেখা মিলতেই অরুনীমা বারান্দায় চলে গিয়েছিলো। অল্প রোদ এসে পড়েছে তার গালে, চুলে। মুলত, ভেজাগুলো চুল শুকোচ্ছে সে। তার ভঙিমায় বেশ সতেজতা মিশে আছে আজ। আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে সে। নীল বিস্তারে ভাসছে তার অগোছালো ভাবনাগুলো। ভাবনাগুলো… কত রকমের! কিছু অযাচিত, কিছু গভীর, কিছু আবার অদ্ভুত মিষ্টি। তবে অরুনীমার সব ভাবনার মূল বিষয়বস্তু এখন শায়ান। একটু একটু ভালো লাগতে শুরু করেছে তার, মনের অজান্তেই।
গত রাতের পর অরুনীমা একদম নিশ্চিতভাবে এটা বুঝেছে যে শায়ান তাকে ভালোবাসে। সেরকম ভালোবাসাই বাসে, যেমনটা বাসলে ভালোবাসার মানুষটিকে আগলে রাখা যায়, আঁকড়ে ধরে রাখা যায় সারাজীবন। রাগের মাথায়, ঠান্ডা মাথায় সব ভাবেই শায়ানের স্বীকারক্তি পেয়েছে। এবং তা শুধুই অরুনীমার প্রতি ভালোবাসা।
“শুধুই ভালোবাসা?”
নিজেই মনে মনে প্রশ্ন করে সে। তারপর হালকা হেসে ফেলে বিরবির করে বলে,
"উ'হু… গভী'র ভালোবাসা।”
এমন ভাবনার মাঝেই দরজায় টোকার আওয়াজ হয়। অরুনীমা তা শুনতে পেয়ে ভ্রু কুচকায়। এই সময় শায়ান তো ফিরবে না… তাহলে কে? ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যায় সে। দরজা খুলতেই এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায় অরুনীমা।
সামনে তাকিয়ে দেখে তার বাবা অরুনাভ শিকদার। পরনে স্বাভাবিক কোটপ্যান্ট। নিজের বাবাকে প্রায় মাসখানেক পর দেখছে অরুনীমা। বিয়ের পর একটা ফোনকল অব্দি পায় নি সে। অথচ আজ হঠাৎ… সামনে দাঁড়িয়ে।
অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে অরুনীমা। পরক্ষণেই অরুনাভ এগিয়ে এসে মেয়েকে আলতো করে জড়িয়ে ধরেন। আর বললেন,
“আম্মু, কেমন আছো? কতদিন দেখি না তোমায়…”
কথাগুলো শুনেই বুকের ভেতর জমে থাকা অভিমানগুলো এক নিমেষে নরম হয়ে উবে যায়। অরুনীমা মৃদু হেসে বলে,
“ভালো আছি, বাবা… ভেতরে এসো।”
অরুনাভ শিকদার ভেতরে আসলেন। এসেই ঘরের আশেপাশে চোখ বুলালেন তীক্ষ চোখে। ছোট্ট, গুছানো একটা সংসার। ঘরটা তার কাছে ছোটখাটোই মনে হলো। স্পেসটা আরেকটু দরকার ছিলো। তবে মুখে তিনি তা বললেন না। গিয়ে সোফায় বসলেন। অরুনীমাকেও টেনে পাশে বসালেন। তারপর বললেন,
"তুমি আমার ওপর রাগ করে আছো তাইনা? কারণ জোর করে তোমায় শায়ানের সাথে বিয়ে দিয়েছি। কিন্তু বিশ্বাস করো, শায়ানের থেকে উপযুক্ত পাত্র তোমার জন্য কেউ হতোই না।"
অরুনীমা মাথা নাড়ে ধীরে। তারপর বলল,
“না বাবা… রাগ করে নেই। আর করবোই বা কেন? এইযে তুমি তো বললে, শায়ান আমার জন্য উপযুক্ত। সত্যিই তো! তখন রাগ হলেও এখন বুঝতে পারছি… তুমি ভুল বলোনি।”
অরুনাভ মৃদু মাথা দোলালেন। তারপর অরুনীমা অভিযোগ করে বলল,
"আর উপযুক্ত থাকলেও পেটে পেটে শয়তানী আছে। জানো বাবা, শায়ান আমার ওপর প্রতিশোধ নিয়েছে ওকে রিজেক্ট করার। ও আমাকে দিয়ে একগাদা কাপড় ধুয়িয়েছিলো বিয়ের প্রথম দিন। ভাবতে পারছো?"
অরুনাভ ভরকালেন সামান্য। বিস্মিত হয়ে বললেন,
"কিহ? এখন বলো না এই কারণে তুমি মেনে নিয়েছো শায়ানকে?"
অরুনীমা হেসে বলে,
"ধুর নাহ! আমার ইনোসেন্ট ফেস দেখে গলিয়ে ফেলেছি পরদিনই, হাহাহা! অবশ্য শায়ান নিজের কাজ নিজেই করে সব। ওই একদিনই শিক্ষা দিয়েছিলো আমাকে।"
অরুনাভ নিজেও মৃদু হাসলেন এদের খুনসুটির গল্প শুনে। তারপর চারপাশে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন,
“এই বাড়িতে থাকতে তোমার অসুবিধা হচ্ছে না?”
অরুনীমা উঠে দাঁড়িয়ে হেসে বলে,
“একদমই না। বরং খুব পছন্দ হয়েছে। এবার তুমি বলো, কফি না চা?"
অরুনাভ মৃদু হেসে বললেন,
"অবশ্যই চা।"
অরুনীমা সাথে সাথে কিচেনে চলে গিয়ে চা করে আনলো ঝটপট। তারপর বাবার সাথে অনেকদিন পর দীর্ঘক্ষন আলাপচারিতা হলো। অরুনীমাও সব অভিমান ভুলে বলতে লাগে এই বাড়িটা সে কিভাবে কিভাবে সাজিয়েছে, শায়ান কতটা হেল্প করেছে।সব শুনে অরুনাভ খানিকটা অবাক হলেন বটে। মেয়েটা কি এক ঝলকে বোঝদার হয়ে গেলো! তিনি বলেই ফেললেন,
"এত কিছু করেছো তুমি? রান্নাও করতে পারো?"
অরুনীমা হেসে ফেলে,
“অত ভালো না… তবে খাওয়ার মতো। কাল রাতেও আমিই রান্না করেছি। শায়ান তো খুব প্রশংসা করলো!”
অরুনাভের কপাল কুঁচকে যায় হালকা। সন্দেহজনক গলায় জিজ্ঞেস করে,
“শায়ান তোমাকে দিয়ে রেগুলার রান্না করায়?”
অরুনীমা শান্ত গলায় বলল,
"না। রান্নাটা আগে ওই করতো। আমি নিজে থেকেই ভেবেছি রান্না করবো, যেহেতু বাসায় বসেই থাকি। ও বাইরে থেকে এসে ক্লান্ত শরীরে আবার কিভাবে রান্না করবে? এটা কি ঠিক? তাও ও নিজেই জোর করে কিচেনে গেলে আমি বারণ করে দিই।"
অরুনাভ আরও অবাক হলেন মেয়ের এরুপ পরিবর্তনে। কিন্তু ভালোও লাগলো দুটোতে মিলেমিশে আছে দেখে। অরুনাভ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন,
"এভাবে বসে না থেকে তোমার আর্ন করা উচিত, আম্মু। এতে দুজনেই নিজেদের সংসারের হাল ধরতে পারবে।"
অরুনীমা মাথা নাড়ে,
"রুটিন মাফিক চাকরি-বাকরি, অন্যের কর্তৃত্ব আমার পছন্দ না, তুমি তো জানোই বাবা। তাই ওসবে যাচ্ছি না। তবে হ্যাঁ, আমি নিজের মতো করে আর্ন করবো ভেবেছি। একটা প্রাইভেট স্কুলে শায়ান কথা বলেছে। সামনের মাস থেকে আমি সেখানে পড়াবো। যা বেতন তাতে ভালোভাবেই চলে যাবে আমার।"
অরুনাভ মাথা নাড়ালেন আলতো করে। এবার বাবা-মেয়ের আলাপ-আলোচনার শেষ প্রান্তে অরুনাভ কোটের ভেতর থেকে মোটা মোটা দুটো টাকার বান্ডিল বের করেন। তারপর তা অরুনীমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেন,
"এগুলো রাখো। প্রয়োজনে ব্যবহার করবে।"
অরুনীমা বিস্মিত হয়ে তাকালো। সাথে সাথে সেই বান্ডিলগুলো ফেরত দিয়ে বলল,
"এসব কি করছো, বাবা? এগুলো নিতে পারবো না আমি!"
“কেন?”
অরুনীমা মৃদু শ্বাস ফেলে বলল,
"শায়ান এসব জানলে ওর ইগো হার্ট হবে, বাবা। এক কথায় ইনসাল্ট হবে ওর। তাছাড়া, আমাদের এত টাকার দরকার নেই। উই আর ফাইন। হ্যাঁ, এ মাসে ফার্নিচার কিনে বাড়িঘর গোছানোয় একটু টান পড়েছে, বাট উই ওইল ম্যানেজ।"
অরুনাভ উদিগ্ন কন্ঠে বললেন,
"এগুলোকে আমার সাহায্য ভাবছো কেন? ধরে নাও এটা আমার তরফ থেকে উপহার তোমাদের দুজনের জন্য। এখন বাবারা কি ভালোবেসে কিছু দিতেও পারবে না?"
অরুনীমা তার বাবার হাত আগলে ধরে মায়াময় গলায় বলল,
"তুমি শুধু দোয়া করো আমাদের জন্য। আর কিচ্ছু চাই না।"
অরুনাভ বিমুঢ় হয়ে তাকিয়ে রইলেন মেয়ের দিকে। এসব শুনে আর জোর করলেন না। শায়ান কেমন ছেলে তা ভালো করেই জানে অরুনাভ। কিন্তু মেয়ের সুখের জন্য এতটুকু দিতে চেয়েছিলেন। তবে মেয়েটা এই ক'দিনে এত বোঝদার হয়েছে তা বুঝতে বাকি নেই আর। অবশেষে উঠে দাঁড়িয়ে তিনি মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,
"সব সময় দোয়া করি তোমাদের জন্য। আজ আসি।"
অরুনীমা মাথা নাড়ায়। বিদায় নিয়ে চলে যান অরুনাভ। দরজা বন্ধ করে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে অরুনীমা। তারপর এক দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে কিচেনে ঢোকে। গান চালিয়ে দেয় ফোনে। একটু একটু করে রান্না জিনিসটা আয়ত্বে আসছে অরুনীমার। বুঝতে পারছে সে। আর ভালোবাসা মানে শুধুমাত্র অনুভূতি নয়। ভালোবাসা মানে দুজনের দায়িত্ব। একটু একটু করে অবুঝপনা থেকে শেখা। আর দু’জন মিলে নিজেদের একটা সুখময় পৃথিবী গড়ে তোলা।
--------------------------
বিকেলের দিকে অফিস থেকে বাড়ি ফেরে শায়ান। বেশ ক্লান্তি নিয়েই শায়ান বাড়ি ফিরেছে। দরজা পেরিয়ে হাত দুটো উপরে তুলে কসরত ভঙ্গিতে নিজেকে একটু হালকা করে নিলো। তারপর বাইরের কাপড় বদলে, তোয়ালে কাঁধে নিয়ে সরাসরি চলে গেলো ওয়াসরুমে। কিছুক্ষণ পর ফিরে এলো ভেজা চুলে, জলবিন্দু গড়িয়ে পড়ছে কপাল বেয়ে। ঘরে ঢুকেই তার চোখ আটকে গেলো অরুনীমার দিকে।
মেয়েটা ব্যস্ত হাতে খাবার গুছিয়ে রাখছে। অদ্ভুত ব্যস্ততা তার চলাফেরায়। চুল মুছতে মুছতে শায়ান এগিয়ে গিয়ে হালকা গলায় বলল,
"বাড়িতে কে এসেছিলো রে?"
অরুনীমা একটু চমকে তাকিয়ে বলল,
"তুই বুঝলি কীভাবে?"
শায়ান ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
"দুটো চায়ের কাপ নিশ্চয়ই তুই একা খাবি না।"
অরুনীমা নরম স্বরে উত্তর দিলো,
"বাবা এসেছিলো।"
"আংকেল এসেছিলো! এত তাড়াতাড়ি যেতে দিলি কেন?"
কিছুটা আক্ষেপ শায়ানের গলায়। আর কিছুক্ষণ থাকলে দেখা করতে পারতো শায়ান। অরুনীমা সংক্ষিপ্ত জবাবে বলে,
"কাজ ছিলো…"
শায়ান জিজ্ঞেস করে,
"খেয়েছিস তুই?"
খাওয়ার প্লেটটা এগিয়ে দিয়ে অরুনীমা বলল,
"হুম, মাত্রই। তারাতাড়ি খেয়ে ছাদে আয়, আমি গেলাম।"
এই বলে অরুনীমা টি-শার্টের উপর গলায় ওরনা পেচিয়ে চলে যায় ছাদে। শায়ান নিজেও খাওয়া শেষ করে ঘরের দরজা লাগিয়ে চলে আসে। অরুনীমা তখন ছাদের কিনারায় রেলিঙ ধরে দাঁড়িয়ে ছিলো। আজকের আবহাওয়া অনুযায়ী দমকা বাতাস বইছে। পাশে দুটো ফুলের গাছ। মেয়েটা ছাদে দুটো ফুলের গাছ লাগিয়েছে। তবে এখনো ফুল ফোটে নি। শায়ান যখন ছাদে উঠলো, তখন সন্ধ্যার হাওয়া জোরে বইছে। আকাশের রঙ বদলাতে শুরু করেছে। শায়ান অরুনীমার পাশে দাঁড়িয়ে গলা খাকারি দিয়ে চলে,
"আজকে স্যালারি পেয়েছি।"
অরুনীমার চোখ খুশিতে জ্বলে উঠলো,
"বাহ! তাহলে আজ ট্রিট! রাতে রান্না নেই!"
শায়ান মুচকি হেসে মাথা নাড়লো,
"ওসব পরে। আমি কিছু এনেছি তোর জন্য!"
অরুনীমা কৌতুহলী হয়ে বলল,
"তাই? কি এনেছিস দে!"
শায়ান সতর্ক করে বলল,
"দিচ্ছি, তার আগে বল তুই হাসবি না?"
অরুনীমা নিজের মাথা চাপড়ে বলল,
"আমি কেন হাসবো? আরে বাবা... দেখা না!"
শায়ান পেছন থেকে একটা বক্স সামনে আনে। অরুনীমা কৌতূহল নিয়ে খুলতেই থমকে গেলো। ভেতরে রঙিন চুড়ির সারি। তা দেখে খানিকটা থমকে সে বলে,
"এগুলো!"
শায়ানের কণ্ঠে ছিলো একরাশ নির্লিপ্ততা,
"আই নো, তুই চুড়ি-টুরি পরিস না, পছন্দ না তোর এগুলো। কিন্তু তোর হাতে এই সবকটা রঙই মানাবে। ফেরার সময় দেখে পছন্দ হলো, তাই কিনে আনলাম এগুলো।"
কিছুক্ষণ শায়ানের দিকে তাকিয়ে থেকে অরুনীমা বলল,
" বক্সটা ধর, এনেছিস যখন পরে দেখি।"
শায়ান বক্সটা ধরলে অরুনীমা নীল রঙের কিছু চুড়ি বের করে পরতে চেষ্টা করে। কিন্তু হাতে ঢুকছে না।কিছুক্ষণ চেষ্টা করে একটু বিরক্ত হয়ে শায়ানকে বলে,
"ছোট সাইজ মনে হচ্ছে!"
শায়ান বক্সটা নিচে রেখে হালকা গলায় বলে,
"হতে পারে। আমাকে দে, আমি ট্রাই করে দেখি একবার।"
অরুনীমা হাত বাড়ালে শায়ান প্রথমবারে খুব সহজেই চুড়িগুলো পরিয়ে দিলো। তারপর বলল,
"গাধা! ঠিক সাইজ'ই এনেছি। আরেকটু বড় হলে খুলে পড়ে যেতো।"
অরুনীমা ঠোঁট উল্টায়। সে কি করে বুঝবে? অরুনীমা ঠোঁট ফুলিয়ে হাতটা উল্টেপাল্টে দেখলো। নাহ, খারাপ না। সত্যিই সুন্দর লাগছে। সে হঠাৎ জিজ্ঞেস করলো,
"কাল কি খাওয়াবি বল?"
"তোর যা ইচ্ছে।"
তারপর নিঃশব্দে অরুনীমা মাথাটা শায়ানের কাঁধে রাখলো। তারপর আঙুল দিয়ে শায়ানের হাতে পরা ব্রেসলেট ঘোরাতে লাগলো আনমনে। দুজনের চোখজোড়া তখন সামনে নিবিষ্ট। হঠাৎ শায়ান খেয়াল করে বলল,
"এই! তুই আমার টি-শার্ট পরেছিস কেন?আমার ফেবারিট এটা!"
অরুনীমা নির্বিকার,
"আমার ভালো লেগেছে। সমস্যা নেই, শেয়ার করবো।"
"আমরা সিবলিংস না কিন্তু!"
শায়ানের ঠান্ডা গলায় বলে। কিন্তু অরুনীমা একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উত্তর দেয়,
"কিন্তু কাপল তো!"
শায়ান পাশ ফিরে ছোট ছোট চোখে তাকায়।অরুনীমা সেসবে পাত্তা না দিয়ে বলল,
"জানিস আজ একটা মুভি দেখছি। হেব্বি রোমান্টি'ক মুভি!"
শায়ান ভ্রু কুচকে বলে,
"তুই এনাইম ছেড়ে রোমান্টিক মুভি দেখছিস কবে থেকে?"
অরুনীমা বলল,
"এনাইমেও রোমান্টিক সিন আছে, তুই বুঝবি না। আচ্ছা যেটা বলছিলাম শোন। মুভিটাতে নায়িকা নায়কের গালে কি'স করে। তো সেখানেই ব্যাকগ্রাউন্ড মিউসিক বাজে, তারপর গান শুরু হয়। কিন্তু আমার প্রশ্ন একটা সাধারণ চুমুতে নায়কের কি এমন হয়ে গেলো যে নায়িকার সাথে তার নাচতে হবে! এগুলো মানুষ কিভাবে দেখে!"
শায়ান বেশ জোরেই হেসে ফেললো মেয়েটার অদ্ভুতরকম উদ্ভট কথাবার্তা শুনে। অরুনীমা এবার কাঁধ থেকে মাথা তুলে মুখ কুচকে বলল,
"হাসিস না তো! পারলে জবাব দে, ইয়ার! লজিক পেলাম না আমি!"
শায়ান অরুনীমার মাথায় টোকা দিয়ে বলল,
"এসব দেখিস না তুই। পেকে যাবি।"
অরুনীমা হাহুতাশ করতে করতে বলল,
"পাকা উচিত আমার। নাও, আ'ম টুয়েন্টি ফাইভ। আর কবে পাকবো, হু'হ!"
অরুনীমার এবার কি ভেবে যেন বলল,
"শোন, একটু নিচু হ তো!"
"কেন?"
"চু'মু দেবো। এক্সপেরিমেন্ট করবো তোর ওপর।"
শায়ান স্তব্ধ। মেয়েটা কি আবোল-তাবোল বলছে! মাথাটা বিগড়েছে নিশ্চিত। তাই ধমকে বলল,
"পাগল হয়েছিস? কি বলছিস?"
অরুনীমা এবার দুষ্টুমি করে বলল,
"আরে শা/লা নিচু হ! নিজেও তো দিলি কাল। এমনিতে জীবনে সব এক্সপেরিমেন্টের দরকার আছে। আর তাছাড়া তোর সাথে সব লিগ্যাল আমার। নিচু হ এবার কথা না বলে!"
শেষমেশ বাধ্য হয়ে শায়ান নিজের গাল বাড়িয়ে দিলো। অরুনীমা নিজের পায়ে ভর করে সামান্য উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে টু'প করে একখানা চু'মু বসালো শায়ানের খসখসে গালটায়। পরপর দু'বার এমন করলো। শায়ান বিমুঢ় হয়েই রইলো নড়াচড়া বন্ধ করে। এরপর অরুনীমা ভাবুক কন্ঠে বলল,
"তেমন কিছুই তো হলো না। নরমাল'ই লাগলো!"
শায়ান তা শুনে মুচকি হাসে। তারপর মাথাটা ঝুঁকিয়ে নিজেই টু'প করে অরুনীমার গালে ঠোঁট চেপে ধরে বলল,
"আমি ঠিকমতো করলে সেটা নরমাল লাগতো না।"
এইসব শুনে অরুনীমা ত্রস্ত বেগে তাকালো শায়ানের দিকে। কিন্তু শায়ান তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে মিছে হাই তুলছে—যেন কিছুই হয়নি। অরুনীমা বুঝতে পারছে, ছেলেটা দিনদিন লাগাম ছাড়া হচ্ছে, অসভ্য হচ্ছে! তারমধ্যে আজ তো অরুনীমা নিজেই সুযোগ করে দিয়েছে। তাই অরুনীমা রেগেমেগে বেশ জোরেই ঘুষি মারলো শায়ানের বাহুতে। এতে শায়ানের কিছুই হলো না। বরং শায়ান ঠোঁট কাম'ড়ে হেসে হুট করেই লাগামছাড়া হলো সত্যি সত্যি। আচমকা অরুনীমার হাত ধরে টেনে নিজের সাথে চেপে ধরলো। নিজের পুরু ঠোঁট দাবিয়ে আরও তিন-চারটে চু'মু খেলো অরুনীমার নরম গালটায়। এবার অরুনীমা স্তব্ধ, বিস্মিত, বিমুঢ়। নিজেকে ছাড়াতে ভুলে গেলো সে। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো শায়ানের দিকে। অরুনীমা তেঁতে উঠে বলল,
"তুই কেন চু'মু দিলি আমায়?"
শায়ান মুচকি হেসে বলল,
“এভরি অ্যাকশন হ্যাজ আ রিঅ্যাকশ'ন, অরুনীমা ডার্লিং। তুই আমাকে আগে চু'মু দিয়েছিস, আমিও ফেরত দিয়ে দিলাম। ইয়্যু নো না, শায়ান তালুকদার ঋন রাখে না।”
#চলমান.......
(মন্তব্য করেন না কেন? ??)
[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। ? ?]
