09-01-2026, 10:38 AM
শহরের ব্যস্ত কাজী অফিসের বাইরে তখন ফ্লাশলাইটের ঝলকানি আর সংবাদকর্মীদের হুড়োহুড়ি। ভেতরের গুমোট পরিবেশে দাঁড়িয়ে আছে দুজন—একজন দেশের নামকরা তরুণ লয়ার ফারিশ নওয়ান, আর অন্যজন মেডিকেল কলেজের দুঃসাহসী ছাত্রী আরিশা।বাইরে তখন গুঞ্জন উঠছে,
"বিখ্যাত লয়ার ফারিশ নওয়ানকে কিডন্যাপ করে বিয়ে করেছে মেডিকেল পড়ুয়া এক ছাত্রী!"
জানালার পর্দাটা একটু সরিয়ে বাইরের দৃশ্যটা দেখেই ফারিশের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সে ধীর পায়ে ঘুরে দাঁড়াল আরিশার দিকে। তার চোখের দৃষ্টিতে তখন আগুন।
"এসবের মানে কী আরিশা? তুমি আমাকে কিডন্যাপ করেছ? এই লয়ার ফারিশ নওয়ানকে?"
ফারিশের কণ্ঠস্বর তখন রাগে কাঁপছে।আরিশা প্রথমে কিছুটা ভড়কে গেলেও পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল। বুক ফুলিয়ে, বেশ একটা বিজয়িনী ভাব ধরে সে সোজা ফারিশের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
"ইয়েস, ইয়েস! আমি আরিশা বলে কথা!"
ফারিশের ধৈর্য এবার বাঁধ ভাঙল। সে দাঁতে দাঁত চেপে আরিশার দিকে এক পা এগোতেই আরিশা ‘বাপরে’ বলে এক দৌড়ে গিয়ে কাজীর চেয়ারের পেছনে লুকাল।
"খবরদার! একদম কাছে আসবেন না বলছি! এসব কী শুরু করেছেন?"
আরিশার কণ্ঠে তখন ভয়ের চেয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা বেশি।ফারিশের রাগ যেন এবার সপ্তমে চড়ল। সে আর্তনাদ করে ওঠার মতো স্বরে বলল,
"আমিও তো জানতে চাই এসবের মানে কী! এই নিউজ যদি একবার পুরোপুরি বাইরে ছড়ায়, তবে আমার রেপুটেশন—সব মাটির নিচে চলে যাবে! কী ভেবে এই কাজ করলে তুমি?"
আরিশা কাজীর পেছনে থেকে মুখটা বের করে আমতা আমতা করে বলল,
"আরে, আমি কি ভেবেছি নিউজটা এমন হুরহুর করে চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে? আসলে দোষটা তো আপনারই! আপনি তো জানেন, আমার ইগোতে হার্ট করলে আমার মাথা ঠিক থাকে না। আপনি কেন বলেছিলেন যে আমার মতো পাগলকে এই দুনিয়ায় কেউ বিয়ে করবে না? কেন? তাই তো রাগের মাথায় আপনাকে তুলে নিয়ে এসেছি! ভেবেছিলাম আপনাকে বিয়ের ভয় দেখিয়ে ছেড়ে দেব। তাতে আমিও একটু মানসিক শান্তি পাবো। কিন্তু—"
ফারিশের মুখের কথা যেন হারিয়ে গেল। সে বড় বড় চোখ করে আরিশার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর অবিশ্বাস্য রকমের নরম স্বরে বলল,
"আসলেই আরিশা, তোমাকে পাগল বলাটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল।"
আরিশা মনে মনে বেশ একটা তৃপ্তির হাসি হাসল। ভাবল, যাক—কিডন্যাপ করাটা তবে সার্থক হয়েছে। মি লয়ার তবে লাইনে এসেছেন! সে একটু হাসি হাসি মুখ করে যেই না কিছু বলতে যাবে, অমনি ফারিশের গলার স্বর বদলে গেল।
"আসলে তুমি তো পাগলেরও ওপরের স্তরের কিছু একটা! মানে পুরোই সংজ্ঞাহীন। একটা পাগলও তোমাকে দেখলে লজ্জা পেয়ে নিজের চিকিৎসা করতে হাসপাতালে ভর্তি হবে! রাগের মাথায় কিডন্যাপ করেছি! বাহ! এবার সামলাও এই রাজকীয় কেলেঙ্কারি!"
আরিশা এবার তেড়ে গিয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই দরজার বাইরে রিপোর্টারদের হাজারো প্রশ্নের আওয়াজ তার কানে এল। ফারিশ এবার হতাশায় নিজের কপালটা আঙুল দিয়ে স্লাইড করতে করতে ঘরের ভেতর পাইচারি করতে লাগল। হঠাৎ ফারিশ থেমে গেল। আরিশার দিকে একটা তীক্ষ্ণ নজর দিয়ে গম্ভীর গলায় নির্দেশ দিল,
"এখানেই থাকবে! খবরদার, এক পা-ও বাইরে যাবে না। যা করার আমাকেই করতে হবে। আমি আসছি!"
আরিশাকে একা রেখে ফারিশ ঝড়ের বেগে বাইরের দিকে পা বাড়াল।আর ওদিকে আরিশা বোকার মতো দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল—সে কি আসলেই একটু বেশি করে ফেলেছে?
বাহিরে যেতেই সব রিপোর্টাররা দৌড়ে এসে ঘিরে ধরে ফারিশকে। ফারিশ যখন মনে মনে একটা যুতসই অজুহাত সাজাতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই তার দৃষ্টি গেল রাস্তার ওপারে।সেখানে দেখা যাচ্ছে এক বিচিত্র দৃশ্য। ফারিশের একমাত্র চাচাতো ভাই প্রফেসর আয়ান আর আরিশার বেস্ট ফ্রেন্ড ইনায়া। তারা দুজন যথারীতি একে অপরের সাথে ঝগড়া করতে করতে হেঁটে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে এই ‘শাপে-নেউলে’ জোড়াকে এখানে দেখে ফারিশের বিস্ময়ের সীমা রইল না। এরা এখানে কেন? কিন্তু পরক্ষণেই লয়ার মস্তিষ্কে বিদ্যুতের মতো একটা দারুণ বুদ্ধি খেলে গেল।ফারিশ মুখে একটা চওড়া আত্মবিশ্বাসী হাসি ফুটিয়ে রিপোর্টারদের উদ্দেশ্যে বলল,
"আপনারা একটু শান্ত হোন। কাজী অফিসে আসার মানেই কি এই যে আমিই বিয়ে করতে এসেছি? এমনও তো হতে পারে আমি কারো বিয়েতে সাক্ষী হতে এসেছি!"
রিপোর্টাররা একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছুটা দমে গেল। ফারিশ সুযোগ বুঝে আয়ানের দিকে আঙুল উঁচিয়ে নাটকীয় স্বরে ঘোষণা করল,
"আমার একমাত্র চাচাতো ভাই, প্রখ্যাত প্রফেসর আয়ান—আপনারা তো চেনেনই ওকে! আর ওর পাশেই দাঁড়িয়ে আছে মেডিকেল কলেজের মেধাবী ছাত্রী মিস ইনায়া। আজ এই জুটিরই বিয়ে!"
নিউজ যেন পলকে মোড় নিল। রিপোর্টাররা নতুন ব্রেকিং নিউজের গন্ধে ফারিশকে ছেড়ে পঙ্গপালের মতো দৌড়ে গেল আয়ান আর ইনায়ার দিকে। ওদিকে কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ নিজেকে মিডিয়ার ক্যামেরার সামনে আবিষ্কার করে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল আয়ান আর ইনায়া।রিপোর্টাররা মাইক্রোফোন বাড়িয়ে দিয়ে চিৎকার শুরু করল,
"প্রফেসর আয়ান, বিখ্যাত লয়ার ফারিশ নওয়ানের একমাত্র চাচাতো ভাইকে কিডন্যাপ করে বিয়ে করেছে মেডিকেল পড়ুয়া এক ছাত্রী!"
নিমিষেই সম্পূর্ণ দায়ভার অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে ফারিশ একটা তৃপ্তির শ্বাস ফেলল। বিপদ আপাতত কেটে গেছে দেখে সে বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে শিস বাজাতে বাজাতে কাজী অফিসের ভেতরে ঢুকল।ওদিকে আরিশা ভেতরে দাঁড়িয়ে জানালার আড়াল থেকে সবটাই দেখেছে আর শুনেছে। সে অবাক হয়ে ভাবছিল, মানুষ কতটা ধুরন্ধর হলে চোখের পলকে নিজের বিয়েটাকে অন্যের ঘাড়ে এভাবে চাপিয়ে দিতে পারে! ফারিশ ভেতরে ঢুকতেই আরিশা বাঁকা হাসিতে হাততালি দিয়ে উঠল।
"জিও লয়ার জিও! সাবাস! নিজের বিয়ের কেস অন্যের ঘাড়ে কী সুন্দর পার করে দিলেন! আপনার আইনি বুদ্ধি তো দেখছি ক্রিমিনালদের চেয়েও ধারালো!"
আরিশার বিদ্রুপাত্মক প্রশংসায় ফারিশ মোটেও দমে গেল না। বরং শার্টের কলারটা একটু ঠিক করে, চোখেমুখে একরাশ আভিজাত্য মাখানো ভাব নিয়ে আরিশার দিকে তাকিয়ে বলল,
"ধন্যবাদ! একেই বলে ‘লয়ারস ব্রেইন’। বিপদে ধীরস্থির থাকাই হলো জেতার মূল চাবিকাঠি।"
"আচ্ছা ঠিক আছে, আপনি তাহলে আপনার ব্রেইন নিয়ে থাকুন, আমি গেলাম!! "
আরিশা যেই না গটগট করে চলে যেতে চাইল, ফারিশ বিদ্যুৎগতিতে তার কবজি চেপে ধরল। তার স্পর্শে আরিশা যেন মুহূর্তের জন্য জমে গেল।
"যাচ্ছেন কোথায়? বিয়ে করবেন না? আসুন, বিয়ে করি!"
ফারিশের গলায় তখন রাগের আভাস। আরিশা এবার সত্যি সত্যিই ঘাবড়ে গেল। আমতা আমতা করে বলল,
"মা... মা... মানে...?"
"মানে তুমি এখন আমায় বিয়ে করবে! তোমার বিয়ে করার শখ আমি আজ একেবারে মিটিয়ে ছাড়ব!"
ফারিশের চোখেমুখে তখন এক অদ্ভুত প্রতিশোধের নেশা। আরিশা পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
"না না না, আম্মা! আমি বিয়ে করতাম না। আমি মজা করছিলাম!"
ফারিশ ভ্রু কুঁচকে কড়া গলায় ধমক দিল,
"চুপ! কাজী সাহেব, বিয়ে পড়ানো শুরু করুন!! "
"নো, নেভার, কাভি নেহি!"
আরিশা তখন মরিয়া হয়ে মাথা নাড়ছে।ফারিশ এবার চাল চালল তার মোক্ষম অস্ত্র দিয়ে। সে খুব সাবলীলভাবে আরিশার হাত ছেড়ে দিয়ে পকেটে হাত রাখল। মুখে একরাশ তাচ্ছিল্য ফুটিয়ে বলল,
"অবশ্য ঠিকই তো! আমার মতো হ্যান্ডসাম, ফেমাস আর এলিগ্যান্ট একজন মানুষের সাথে তোমায় ঠিক যায় না। ব্যাপারটা দেরিতে হলেও তুমি বুঝতে পেরেছ দেখে ভালো লাগল।"
ব্যাস! তির একদম ঠিক জায়গায় বিঁধেছে। আরিশার ইগোতে এবার যেন পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটল। রাগে তার কান দিয়ে গরম ধোঁয়া বের হওয়ার উপক্রম। সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে এক লাফে কাজীর সামনে গিয়ে টেবিলের ওপর সজোরে এক বাড়ি দিল। বেচারা কাজী সাহেব তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিলেন কি না কে জানে, বাড়ির শব্দে তিনি আসন ছেড়ে কয়েক ইঞ্চি ওপরে লাফিয়ে উঠলেন।
"কাজী! কবুল বলুন!"
আরিশার গর্জনে পুরো ঘর থরথর করে কেঁপে উঠল।ফারিশ আর কাজী—দুজনই পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। ফারিশ মনে মনে ভাবল, "সর্বনাশ! মেয়েটা কি রাগের মাথায় আমাকে ছেড়ে এই বুড়ো কাজীকেই কবুল বলে বসবে নাকি?"আরিশা নিজের ভুল বুঝতে পেরে দ্রুত নিজেকে সামলে নিল। পুনরায় চেঁচিয়ে উঠল,
"আই মিন, বিয়ে পড়ুন! না না মানে বিয়ে পড়ানো শুরু করুন। ধুরর!"
কাজী সাহেব আর এক মুহূর্ত দেরি করার সাহস পেলেন না। তিনি চটপট খাতা-কলম বের করে নিজের কাজে লেগে পড়লেন। এই আপদদের তাড়াতাড়ি দূর করা দরকার।
অতীতের সেই স্মৃতিগুলো মনে পড়তেই আরিশার মেজাজ যেন আরও তিরিক্ষি হয়ে উঠল। সে চেয়ারে বসেই বাচ্চাদের মতো হাত-পা নেড়ে কাঁদতে শুরু করল। মনে মনে নিজেকেই গালি দিতে লাগল—কে বলেছিল ওইদিন রাগের মাথায় ওই শয়তানকে পার্মানেন্টলি নিজের লাইফে টেনে আনতে? শখ করে বাঘ বন্দি করতে গিয়ে এখন নিজেই খাঁচায় বন্দি! সে টেবিলে হাত রেখে নিজের কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে বিড়বিড় করল,
"আরিশা, তোর কপালটাই খারাপ!"
ঠিক সেই মুহূর্তে সাইড টেবিলে রাখা ফোনের স্ক্রিনটা আবার জ্বলে উঠল। সেখানে বড় বড় অক্ষরে নাম লেখা— 'মাইগ্রেন'।১৮ বার! গুনে গুনে আঠারো বার কল করেছে ফারিশ। কিন্তু আরিশার জেদ পাহাড় সমান, সে ফোনটা ধরার কোনো নামগন্ধও করল না।
অপরদিকে, আরিশার বেলকনির ঠিক নিচে অন্ধকারে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে ফারিশ। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আরিশার বেলকনির দিকে। খয়েরি চোখের মণি দুটো যেন রাগে আর উদ্বেগে জ্বলছে। আঠারো বার কল করার পরও যখন ওপাশ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া গেল না, তখন ফারিশের ধৈর্যের বাঁধ এক্কেবারে ভেঙে গেল। সে দাঁতে দাঁত চেপে ফোনটা পকেটে ঢোকাল। কোনো কিছু বিচার-বিবেচনা না করেই শার্টের হাতাটা একটু গুটিয়ে নিল সে। তারপর উপরে উঠতে শুরু করল। লয়ার হওয়ার পাশাপাশি যে তার কিছু শরীরচর্চার নেশাও আছে, সেটা আজ কাজে লেগে গেল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই একদম উপরে উঠে বেলকনির মেঝের ওপর নিঃশব্দে পা রাখল ফারিশ। তার পরনের সাদা শার্টটা মৃদু বাতাসে দুলছে। তার মুখে সেই পরিচিত বাঁকা হাসিটা। সে ধীর পায়ে ভিতরের দিকে এগোতে লাগল।
