09-01-2026, 10:39 AM
Part:03
বেশ অনেকক্ষণ টেবিলে মাথা গুঁজে পড়ে থাকার পর আরিশা যেন নতুন উদ্যমে জেগে উঠল। নিজের গাল দুটো হালকা থাপড়ে সে নিজেকেই শাসন করল,
"নাহ আরিশা! এখন এসব ফালতু চিন্তা করলে চলবে না। কাল আইটেম আছে! খারাপ করলে আঙ্কেল সবার সামনে ঝাড়বে। আগে পড়াশোনা সামলাই, পরে ওই মাইগ্রেনকে সাইজ করার অনেক সময় পাওয়া যাবে।"
আরিশার কথা শেষ হতেই মুহূর্তেই ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে এক গম্ভীর কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনি তুলল—
"হুমম, এটাই ঠিক হবে!"
আরিশা চমকে উঠে সোজা দাঁড়িয়ে পড়ল। আতঙ্কে পেছন ফিরে তাকাতেই তার চোখ চড়কগাছ। ফারিশ! সে পরম নিশ্চিন্তে আরিশার বিছানায় হেলান দিয়ে, পায়ের ওপর পা তুলে শুয়ে আছে। তার তীক্ষ্ণ খয়েরি চোখের দৃষ্টি আরিশার ওপর নিবদ্ধ।আরিশা তোতলাতে তোতলাতে বলল,
"আ-আপনি! আপনি এখানে কীভাবে? মানে... কোত্থেকে ঢুকলেন?"
ফারিশ উঠে বসে বিছানার চাদরটা একটু ঠিক করে নিল। তারপর শান্ত গলায় বলল,
"কল করেছিলাম। গুনে গুনে আঠারো বার। কেন ধরা হয়নি?"
ফারিশের সেই একই পুরোনো জেরার ধরনে আরিশার রাগ উঠে গেল। সে হাত নেড়ে বলল,
"ফোন ধরিনি বলে আপনি এভাবে ডাকাতের মতো মানুষের ঘরে ঢুকে পড়বেন? আল্লাহ, তওবা! কী জামানা এল!"
ফারিশের কপাল কুঁচকে গেল। আরিশার এই ন্যাকামি আর নাটক তাকে রাগানোর জন্য যথেষ্ট। ফারিশকে চুপ থাকতে দেখে আরিশা আরও তেড়ে এল,
"হয়েছে এবার, প্লিজ এখান থেকে যান! আমার কাল পরীক্ষা, আমায় পড়তে হবে।"
ফারিশ নির্বিকার গলায় জবাব দিল,
"তো পড়ো না! আমি কি তোমার মুখ চেপে ধরেছি নাকি হাত বেঁধে রেখেছি?"
"উফফ!"
আরিশা রাগে গজগজ করে উঠল।
"উফফফ!"
ফারিশও ঠিক একই ঢঙে তাকে ভেঙিয়ে বলল।
আরিশা এবার চোখ ছোট ছোট করে ফারিশের দিকে তাকায়।এই আপদকে এত সহজে বিদায় করা যাবে না। ফারিশ হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে পা বাড়াল।
"ফাইন! আমি তবে আন্টির সাথে দেখা করতে গেলাম।অনেক দিন ধরে বলছিল আমার সাথে দেখা করবে।"
ফারিশের এই কথা শুনে আরিশার হার্টবিট মিস হওয়ার উপক্রম হলো। সে এক দৌড়ে ফারিশের সামনে গিয়ে দুই হাত ছড়িয়ে বাধা দিল,
"নো নো নো! কোনোভাবেই না। এখান দিয়ে একদমই না। যেখান দিয়ে এসেছেন, সেখান দিয়েই বিদায় হোন!"
ফারিশ ভ্রু কুঁচকে আরিশার হাতে আলতো ধাক্কা দিয়ে বলল,
"ইউ! সরো বলছি।"
আরিয়া জেদ করে ফারিশের হাত ধরতে যেতেই ফারিশের মুখটা যন্ত্রণায় কিছুটা কুঁচকে গেল। আরিশার মনে পড়ে গেল সেই ক্ষতের কথা। সে তৎক্ষণাৎ হাত ছেড়ে দিয়ে ব্যাকুল হয়ে উঠল,
"সরি সরি! আমি ইচ্ছা করে করিনি। আপনার হাতের কী অবস্থা? ব্যথা কমেনি?"
"আই অ্যাম ফাইন,"
ফারিশের গলার স্বর কিছুটা শীতল।আরিশার মুখটা মলিন হয়ে গেল। সে অনুতপ্ত স্বরে বলল,
"এই কারণেই আপনাদের এই লয়ার পেশাটা আমার দুচোখের বিষ। ভীষণ রিস্কি! সবসময় শত্রু লেগেই থাকে। এর চেয়ে আয়ান ভাইয়ের মতো প্রফেসর হওয়া অনেক ভালো, অন্তত মারামারি তো নেই!"
ফের সেই আয়ান! ফারিশের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। কথায় কথায় শুধু আয়ানের প্রসংশা!!ফারিশ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো।
"আরিশা! একটু দরজাটা খোল তো মা! কতবার মানা করেছি পড়ার সময় দরজা না লাগাতে? খোল বলছি!"
মায়ের গলা শুনে আরিশার কলিজা শুকিয়ে গেল। সে মরিয়া হয়ে ফারিশের দিকে তাকাল,
"প্লিজ, প্লিজ! এখনই এখান থেকে যান।"
ফারিশ এই সুযোগটা হাতছাড়া করল না। সে ঠোঁটের কোণে সেই শয়তানি হাসিটা ঝুলিয়ে বলল,
"কী বললে? আরেকবার বলো তো? ঠিক শুনতে পাইনি তো!"
আরিশা দাঁতে দাঁত চেপে কোনোমতে আদব বজায় রেখে বলল,
"প্লিজ... যান!"
ফারিশ এবার তৃপ্তির হাসি হাসল।
"হুহ, এভাবেই বিনয়ী হয়ে চলবে। আই লাইক ইট!"
কথাটা বলেই ফারিশ চলে যেতে লাগল। আরিশা লম্বা একটা শ্বাস ফেলে বিড়বিড় করল,
"তোকে পরে দেখে নেব শয়তান!"
কথাটা বলেই সে হাসি মুখে দরজা খুলতে এগিয়ে গেল।
ফারিশ নিচে নেমে চলে যেতে গেল কিন্তু ঠিক তখনই পিছন থেকে একটা কন্ঠস্বর ভেসে এল। আরিশার বাবা অর্থাৎ মি দিদারের কন্ঠ।
"কিরে ফারিশ? তুই এই অসময়ে আমাদের বাড়িতে? তাও আবার এই বাগান দিয়ে বের হচ্ছিস যে !"
মি. দিদারের চোখেমুখে একরাশ বিস্ময়।ফারিশ একগাল চওড়া হাসি দিয়ে এগিয়ে গিয়ে মি. দিদারের কাঁধে হাত রাখল। যেন কতদিন পর প্রিয় বন্ধুর সাথে দেখা হয়েছে, এমন ঢঙে বলল,
"কী অবস্থা শ্বশুর আব্বা? শরীরের কী খবর?"
মি. দিদার ফারিশের হাতটা কাঁধ থেকে সরিয়ে দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার চোখেমুখে রাজ্যের আফসোস। তিনি হতাশ স্বরে বলে উঠলেন,
"ছাড় তো তোর ওই ‘শ্বশুর আব্বা’ ডাক! সারাজীবন শুধু শ্বশুর আব্বা, শ্বশুর আব্বা করেই গেলি। কিন্তু যখনই বলি আমার মেয়ে আরিশাকে বিয়ে কর, তখনই তো তোর যত রাজ্যের আপত্তি! এখন এই মাঝরাতে শ্বশুর আব্বা বলে তেল দিয়ে কী হবে?"
মি দিদারের কথা শুনে ফারিশ মনে মনে ভাবল, "শ্বশুর আব্বা, আপনি জানলে হার্ট অ্যাটাক করবেন যে আপনার মেয়ে আমাকে অলরেডি কিডন্যাপ করে বিয়ে করে ফেলেছে! এখন তো শুধু আনুষ্ঠানিকতা বাকি।"কিন্তু মুখে সে বেশ নিরীহ একটা ভাব ফুটিয়ে বলল,
"আরে আঙ্কেল, তুমি তো জানোই তোমার মেয়ে কত বড় ত্যাঁড়া! ওকে সামলানোর ক্ষমতা কি আমার আছে?"
" বিয়ে করনা ভাই, আমার মেয়েটাকে বিয়ে করনা। এতো টেনশন আর নিতে পারছি না!!ঘুমের মধ্যেও আতঙ্কে থাকি!!কখন এই মেয়ের ইগো হার্ট হয় আর নতুন কোনো অদ্ভুত কান্ড ঘটিয়ে বসে!!"
মি. দিদারের কথা শুনে ফারিশের কপাল কুচকায় ফারিশ।
"আচ্ছা বিপদে পড়লাম তো! ওইদিকে বাসায় গেলে তোমার বন্ধু, আই মিন আমার ড্যাডি জ্বালায়—বলে আরিশাকে বিয়ে করে বাসায় আন। আর এখানে আসলে তুমি জ্বালাও। আচ্ছা, আমার বিয়ের পেছনেই কেন লেগে আছো তোমরা সবাই? একটা ব্যাপারই বুঝলাম না, মেয়েকে বিদায় করতে এত তাড়া কিসের শুনি?"
মি. দিদার এবার ফারিশের কাঁধে হাত রেখে দুজন বাগানের পথ ধরে হাঁটতে শুরু করলেন। তিনি বেশ বিজ্ঞের মতো গম্ভীর মুখে বোঝাতে থাকলেন,
"শোন ফারিশ। যখন তোর লাইফে একটা ঘূর্ণিঝড় আসবে, তখন তোর পালানোর রাস্তা আছে। মানে সামনে দিয়ে আসলে তুই পেছন দিয়ে পালাবি, আর পেছন দিয়ে আসলে সামনে দিয়ে পালাবি। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় যদি একসাথে দুটো হয়, তবে পালাবি কোত্থেকে?"
মি. দিদারের এমন দার্শনিক তত্ত্বে ফারিশ কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে গেল। তারপর সে-ও মি. দিদারের কাঁধে হাত রেখে রহস্যময় এক হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
"বাই এনি চান্স, তুমি কি এই 'ঘূর্ণিঝড়' বলতে আন্টি আর আরিশাকে বোঝাচ্ছ?"
মি. দিদার যেন মনের কথাটি বলতে পেরে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। তিনি সশব্দে হেসে বললেন,
"ইয়েস ইয়েস! এই না হলে আমার লয়ার ছেলে! কত তাড়াতাড়ি ধরে ফেলেছিস দেখ!"
ফারিশ এবার পকেট থেকে ফোনটা বের করে মি. দিদারের চোখের সামনে নাচাতে লাগল। তার ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা শয়তানি হাসি।
"গ্রেট! তো আমি যে তোমার এই বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি রেকর্ড করেছি, তা এখনই আন্টি আর আরিশাকে পাঠিয়ে দিই? কী বলো?"
মি. দিদারের হাসি মুহূর্তেই হাওয়া হয়ে গেল। তিনি শুকনো মুখে ফ্যাকাশে চোখে কিছুক্ষণ ফারিশের দিকে তাকিয়ে রইলেন। পরক্ষণেই ধ্যান ফিরে পেয়ে হুংকার দিয়ে উঠলেন,
"দাঁড়া শয়তান ছেলে! বাপ-বেটা দুটোই সমান শয়তান! ডিলিট কর বলছি!"
মি. দিদার রেগে তেড়ে আসতেই ফারিশ হাসতে হাসতে এক দৌড়ে গিয়ে নিজের গাড়িতে উঠে পড়ল। গাড়ির স্টার্ট দিয়ে জানালার কাঁচ নামিয়ে সে চিৎকার করে বলল,
"শুভ রাত্রি ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলাকারী শ্বশুর আব্বা!"
ফারিশের গাড়ি যখন স্টার্ট নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, মি. দিদার তখন অন্ধকারে দাঁড়িয়ে গজগজ করে বলতে লাগলেন,
"নাসিরটাকে ফোন করতে হবে, ওর ছেলেটা দিন দিন হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে!"
_________
" ওই আরিশা!! কিছু করনা!! সবাই বলছে আমার আর ঐ শয়তানটার নাকি বিয়ে দিবে!! আরে কোন কেসে ফাসলাম বলতো। আমাদের তো বিয়ে হয়ই নি!! কিছু করনা!! "
ইনায়ার কথায় আরিশা কিছুক্ষণ থুতনিতে হাত দিয়ে ভাবল। তারপর তার ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত শয়তানি হাসিটা ফুটে উঠল। সে ইনায়াকে কাছে টেনে কানে কানে ফিসফিস করে কিছু একটা বলল।ইনায়া চোখ কপালে তুলে অস্ফুট স্বরে বলল,
"তুই সিওর? এটা করলে আসলেই বিয়েটা ক্যানসেল হবে?"
আরিশা আত্মবিশ্বাসের সাথে আঙুল চুটকিয়ে বলল,
"হান্ড্রেড পার্সেন্ট! তুই শুধু শুরু কর, বাকিটা আমি দেখে নেব।"
ড্রয়িং রুমে তখন পিনপতন নীরবতা। একপাশে বসে আছেন মি. নাসির আর তার স্ত্রী, অন্যপাশে মি. নাসিরের ভাই মি. নাভান আর তার স্ত্রী। ইনায়ার মা-বাবাও বেশ গম্ভীর মুখে বসে আছেন। মাঝখানে অপরাধীর মতো বসে আছে আয়ান আর তার পাশে বসা ফারিশ। আরিশা এক কোনায় বসে নখ খুঁটছে, যেন সে কিছুই জানে না। সবাই যখন আলোচনা করছে যে কীভাবে এই মিডিয়া কেলেঙ্কারির হাত থেকে বাঁচতে আয়ান আর ইনায়ার বিয়েটা দিয়ে দেওয়া যায়, ঠিক তখনই ইনায়া ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করল।সে মাথা নিচু করে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। ইনায়ার মা শান্ত গলায় বললেন,
"সবাইকে সালাম কর মা!"
উপস্থিত সবার দৃষ্টি এখন ইনায়ার ওপর। ইনায়া বেশ কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকল, তারপর হুট করে যেন তার ভেতরে কোনো অশুভ আত্মা ভর করল! সে হুংকার দিয়ে সজোরে চিৎকার করে সালাম দিল—
"আসসালামু আলাইকুম!!!"
সালাম দেওয়ার সাথে সাথে সে কিছুটা নিচু হয়ে মি নাভানের পায়ের কাছে হাত নিয়ে আবার পরক্ষণেই স্প্রিংয়ের মতো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।হঠাৎ এই সালাম বিস্ফোরণ আর ইনায়ার অস্বাভাবিক আচরণে ড্রয়িং রুমে রীতিমতো ভূমিকম্প শুরু হয়ে গেল। মি. নাভান, মি. নাসির আর আয়ান—তিনজনই ভয়ে সোফার ওপর এক হাত লাফিয়ে উঠলেন। আয়ান তো প্রায় সোফার পেছনে লুকানোর উপক্রম! বাকিরা আতঙ্কে বুকে হাত দিয়ে থ হয়ে বসে রইলেন।ফারিশ বড় বড় চোখ করে নিজের ধড়ফড় করতে থাকা বুকে হাত রাখল। তার উকিল মস্তিষ্ক এই পরিস্থিতির কোনো আইনি ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছে না। হঠাৎ তার নজর গেল আরিশার দিকে। আরিশা মুখ চেপে হাসছে! ফারিশের বুঝতে আর বাকি রইল না যে এই সার্কাস-এর মাস্টারমাইন্ড কে।ইনায়ার মা লজ্জায় আর অপমানে লাল হয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,
"কী হচ্ছে এসব ইনায়া? পাগলামি করছ কেন?"
ইনায়া এবার আরিশার শেখানো অনুযায়ী চোখ দুটো উল্টে একটা বিচিত্র মুখভঙ্গি করল। ড্রয়িং রুমের আবহাওয়া মুহূর্তেই বিয়ের আলোচনা থেকে মানসিক হাসপাতাল এর দিকে মোড় নিতে শুরু করল।
ড্রয়িং রুমের পরিবেশটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমথমে হয়ে রইল। ইনায়া হঠাৎ শান্ত হয়ে একদম লক্ষ্মী মেয়ের মতো আরিশার পাশে গিয়ে বসল। বড়রা ভাবলেন, যাক—মেয়েটা বোধহয় এতক্ষণে শান্ত হয়েছে। মি. নাসির চশমাটা ঠিক করে পুনরায় গলা পরিষ্কার করলেন।
"যা বলছিলাম, যেহেতু মিডিয়াতে নিউজ চলে গেছে, তাই দেরি করা ঠিক হবে না। আমাদের মান-সম্মানের কথা ভেবে—"
ঠিক তখনই এক অদ্ভুত শব্দে সবার কথা থেমে গেল। ইনায়া চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে একদম মুখের সামনে ধরে সশব্দে চুমুক দিচ্ছে—
"চুউউউউ... চুউউউউউউ!"
চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার এমন তীব্র শব্দ এর আগে এই ড্রয়িং রুমে কেউ শোনেনি। মি. নাভান বিস্ময়ে কথা হারিয়ে ফেললেন। ইনায়া কাপটা নামিয়ে রেখে আয়েশ করে ঠোঁট চাটল। তারপর বেশ চিন্তিত মুখে বলল,
"আমমম... চা-টা অস্থির হয়েছে, তবে ঝালটা একটু কম হয়েছে!"
"ঝাল! চায়ে ঝাল কম হয়েছে মানে কী?"
মি. নাভান শুকনো ঢোক গিললেন। তিনি মনে মনে ভাবলেন, "হে খোদা! শেষ পর্যন্ত আমার ছেলের কপালে কি এক পাগল জুটল !!"মুরুব্বিরা ইনায়াকে আপাতত ইগনোর করার সিদ্ধান্ত নিলেন। মি. নাসির বেশ গম্ভীর গলায় চূড়ান্ত রায় দিলেন,
"যাই হোক, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আগামী মাসেই খুব ধুমধাম করে তোমাদের বিয়ে দেব!"
সিদ্ধান্তটা শোনা মাত্রই যেন ড্রয়িং রুমে বোমা ফাটল। ইনায়া আর আয়ান—দুজনেই সোফা থেকে স্প্রিংয়ের মতো লাফ দিয়ে একসাথে দাঁড়িয়ে পড়ল।
"অসম্ভব! আমি মরে গেলেও একে বিয়ে করব না!"
দুজনেই একসাথে চিৎকার করে উঠল।আয়ানের মা এবার বিরক্ত হয়ে বললেন,
"বিয়ে তো অলরেডি করেই ফেলেছ! এখন এত ঢং করছ কেন? সবাই এখন জানে তোমরা জামাই-বউ।"
ইনায়ার মাথার রগ এবার রাগে ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। মনে মনে ভাবল, "কে বলেছিল ওইদিন ওই আয়ান শয়তানটাকে ওই রাস্তা দিয়ে যেতে?"রাগের চোটে ইনায়ার হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে গেল। সে হুট করে আয়ানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আয়ানের চুলগুলো খামচে ধরল। আয়ানও কম যায় না! সে-ও ‘আউচ’ বলে চিৎকার দিয়ে ইনায়ার পরিপাটি করে বাঁধা চুলে হ্যাঁচকা টান দিল।
"ছাড় বলছি ডাইনি! আমার চুলের জেল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে!"
আয়ানের আর্তনাদ।
"আগে তুই ছাড় শয়তান! তোর জন্য আজ আমার এই দশা!"
ইনায়ার পালটা গর্জন।ব্যাস! ড্রয়িংরুম মুহূর্তেই কুস্তি লড়ার রিংয়ে পরিণত হলো। দুই হবু বর-কনের এই হুলস্থুল চুলাচুলি দেখে মি. নাসির আর মি. নাভান সোফা ছেড়ে পালিয়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। ড্রয়িং রুমের অবস্থা এখন আর ড্রয়িং রুমের মতো নেই, যেন রীতিমতো রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে! একদিকে আয়ান আর ইনায়া একে অপরের চুল ধরে কুস্তি লড়ছে, আর অন্যদিকে আরিশা সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে এক মুহূর্ত দেরি করল না।ফারিশ যখন হাঁ করে আয়ান-ইনায়ার চুল টানাটানি দেখছিল, ঠিক তখনই আরিশা ঝড়ের বেগে তার সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর জমে থাকা সব ক্ষোভ আর বিরক্তি নিয়ে ফারিশের হাতে আর পিঠে ধপাধপ কিল-ঘুষি বসাতে শুরু করল।
"সব! সব সব সব আপনার জন্য!"
আরিশার চিৎকারে ফারিশ কয়েক সেকেন্ড ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে শুধু মার খেয়ে গেল।হঠাৎ ধ্যান ফিরতেই ফারিশ আরিশার হাত দুটো খপ করে ধরে ফেলল।সে আরিশার দিকে তেড়ে গিয়ে গর্জে উঠল,
"কিডন্যাপটা কে করেছে শুনি??"
আরিশা এবার পালানোর পথ খুঁজতে শুরু করল। ফারিশ এক পা আগায় তো আরিশা দুই পা পেছায়। শুরু হলো ড্রয়িং রুম জুড়ে ইঁদুর-বেড়াল দৌড়ানি! ফারিশ সোফার ওপর দিয়ে লাফিয়ে আরিশাকে ধরতে যাচ্ছে, আর আরিশা ডাইনিং টেবিলের চারপাশে ঘুরছে।এই নতুন দৃশ্য দেখে আয়ান আর ইনায়া নিজেদের যুদ্ধ থামিয়ে দিল। তারা এখনো একে অপরের চুল মুঠো করে ধরে রেখেই বিস্ময়ে হা হয়ে তাকিয়ে আছে। ড্রয়িং রুমের বাকি বড়রাও অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে। তাদের চোখেমুখে একটাই প্রশ্ন— "এদের হঠাৎ কী হলো?"ইনায়া চুলের মুঠি ধরা অবস্থাতেই ফিসফিস করে আয়ানকে বলল,
"এদের আবার কি হলো ভাই?"
আয়ান নিজের চুলের গোছায় টান খেয়ে মুখ বিকৃত করে উত্তর দিল,
"সেটাই তো!!আমাদের দুঃখে এরা কেন কুস্তি লড়ছে!!"
