09-01-2026, 10:40 AM
04
হাসপাতালের দীর্ঘ, সুনসান করিডোর ধরে হেঁটে যাচ্ছে আরিশা আর ইনায়া। গায়ে সাদা অ্যাপ্রন আর দুজনের মুখেই তখন চিন্তার গভীর ভাঁজ। সেই তখন থেকেই আরিশার কাছে ইনায়া অনবরত নাকে কেঁদে চলেছে। অনেক বুঝিয়ে, মাথায় হাত বুলিয়ে, নানা রকম সান্ত্বনা দিয়ে আরিশা মাত্রই ইনায়াকে কিছুটা শান্ত করেছে।
ইনায়া চোখ মুছে নাক টানতে টানতে ক্ষোভ উগরে দিল,
"ভাই!!! ওই আয়ান শয়তানটাকে যদি এবার উচিত শিক্ষা দিতে না পেরেছি না... কী বলব তোকে! শয়তানটা সারাটা জীবন শুধু আমাকে জ্বালিয়েই গেল..."
ইনায়ার অমন চিৎকার মার্কা আক্ষেপে আরিশা একটা ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নিজের কপালে হাত দিয়ে বলল,
"আয়ান ভাই এটলিস্ট যথেষ্ট ভালো রে। অন্তত ওই ‘মাইগ্রেন’-এর মতো না। তুই মাত্র কয়েকবছরের জ্বালানোর কথা বলছিস!! আর ওই মাইগ্রেন তো ছোটবেলা থেকেই আমায় জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে আসছে!"
আসলে এই চারজনের সম্পর্কের জালটা বেশ পুরনো আর জটিল। ফারিশ আর আরিশার মা-বাবা একে অপরের বহু বছরের পুরনো বন্ধু। পারিবারিক এই গভীর বন্ধুত্বের সুবাদেই আরিশা, ফারিশ আর আয়ানের একসাথে বড় হওয়া। ফারিশ আর আয়ান দুজনেই আরিশার থেকে ঠিক ৬ বছরের বড়। কিন্তু ফারিশ ছোটবেলা থেকেই আয়ানকে আরিশার কাছাকাছি দেখলে রেগে যেত। তার সবসময় মনে হতো, আয়ানের বুঝি আরিশার ওপর একটু আদিখ্যেতা বেশি! ওদিকে বেচারা আয়ানের সারাটা জীবন কেটে গেল ফারিশকে বুক চাপড়ে এটা বোঝাতে যে—সে আরিশাকে নিজের আপন ছোট বোনের চোখেই দেখে, অন্য কোনো চোখে নয়!
এমনই এক পারিবারিক আবহে, আরিশা যখন ক্লাস এইটে পড়ে, তখন তার জীবনে আগমন ঘটে ইনায়ার। ইনায়া আর আরিশার বন্ধুত্বটা যেমন প্রথম দিনেই জমে গিয়েছিল, আয়ান আর ইনায়ার সমীকরণটা হয়েছিল ঠিক উল্টো। তাদের প্রথম সাক্ষাৎটাই হয়েছিল এক তুমুল ঝগড়ার মধ্য দিয়ে, আর সেই যে শুরু—আজ এত বছর পরও তাদের সেই ঝগড়া সমানভাবে চলমান!
আরিশার আক্ষেপ শুনে ইনায়া এবার ফারিশের পক্ষে সাফাই গাইতে শুরু করল,
"শুন আরিশা, ফারিশ ভাই কিন্তু মানুষ হিসেবে যথেষ্ট ভালো!! তুই শুধু শুধু ওনার সাথে ঝগড়া করিস আর ওনাকে খ্যাপাস!"
ইনায়ার মুখে ফারিশের এই গুণগান শুনে আরিশা বিরক্তিতে মুখ বাঁকাল। একদম ভেঙিয়ে উঠে বলল,
"ওহহ, কত ভালো মানুষ রে..."
"ভালো কথা!! তুই তো নাসির স্যারকে বলে এই বিয়েটা আটকাতে পারিস, আরিশা!!স্যার তো তোকে অনেক স্নেহ করেন, স্যার নিশ্চয়ই তোর কথা শুনবে!!"
ইনায়ার আইডিয়া শুনে আরিশা খিলখিল করে হেসে উঠল,
"স্যার মানে আঙ্কেল?? হাসাস না ইনায়া! লাস্ট দুইদিন ধরে উনি ফারিশের ভয়ে ঠিকমতো কথাই বলছে না। নিজের ছেলের সামনে কেমন যেন চোরের মতো গুটিসুটি মেরে থাকে। আমি তো এটাই বুঝলাম না, উনি হঠাৎ নিজের ওই লয়ার ছেলেকে কেন এত ভয় পাচ্ছে?? এ নাকি আবার শহরের নামকরা হার্ট স্পেশালিস্ট, ডাক্তার নাসির! ছেলের সামনে এলেই ওনার নিজের হার্টবিট বন্ধ হওয়ার জোগাড় হয়!"
আরিশা হাসতে হাসতে কথাটা বলছিল। কিন্তু সে খেয়াল করেনি, ইনায়া গত কয়েক সেকেন্ড ধরে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, ইনায়া অনেকক্ষণ ধরেই ক্রমাগত নিজের হাত নেড়ে আরিশাকে থামানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। ভয়ে বেচারির মুখটা একেবারে শুকিয়ে গেছে।আরিশা এবার একটু বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
"আরে কী হয়েছে তোর? কথা না বলে পেছনে ওভাবে হাত দিয়ে কীসের ইশারা দিচ্ছিস? পেছনে কি কোনো ভূত এসেছে?"
কথাটা শেষ করতে করতেই আরিশার ঠোঁটের কোণের চওড়া হাসিটা আচমকা স্তব্ধ হয়ে গেল।বুঝতে আর বাকি থাকে না এবারও সে যার নামে বলছে সেই ব্যক্তি তার পিছনে এসে হাজির।
" আ.. আমার ফোনটা বোধহয় ক্লাসে রয়ে গেছে। আমি গেলাম!! "
কথাটা বলেই কোনোরকম পালায় ইনায়া। আরিশা এবার মুখে একটা বেশ বড়সড় কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে ঝট করে পেছনে তাকাল।
"আরে আঙ্কেল যে!! আসসালামু আলাইকুম! কেমন আছেন?"
কিন্তু আরিশার মিষ্টি কথার জাদু এবার আর কাজে দিল না। কথা শেষ হওয়ার আগেই মি. নাসির আরিশার ডান কানটা খপ করে চেপে ধরলেন।
"কেন ভয় পাই, তুই জানিস না? তোর ওই বুদ্ধিতে তোকে হেল্প করতে গিয়ে এখন আতঙ্কে আমার দিন কাটাতে হচ্ছে! ওদিকে ঘরে আমার নিজের ছেলে সারাক্ষণ আমার দিকে কেমন সন্দেহভাজন আর তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে থাকে।"
কানের টানে আরিশার মুখের ওই সাজানো হাসি মুহূর্তেই গায়েব হয়ে গেল। সে এক হাত দিয়ে নিজের কানটা বাঁচানোর চেষ্টা করতে করতে বলে উঠল,
"বুঝেছি! বুঝেছি আঙ্কেল!! নিজের ভুল একদম অক্ষরে অক্ষরে বুঝেছি। এবার তো কানটা ছাড়ো! আমার একটাই না... মানে আমার দুইটাই মাত্র কান, আঙ্কেল! একটা ছিঁড়ে গেলে তখন আমি কি করবো!!ছাড়ো!!"
আরিশার করুণ দশা দেখে মি. নাসির একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অবশেষে তার কানটা ছেড়ে দিল।
কানটা ডলতে ডলতে আরিশা একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। দ্রুত প্রসঙ্গ ঘোরানোর জন্য সে এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলল,
"তা... আঙ্কেল, তোমার সেই গুণধর ছেলে এখন কোথায়?"
মি. নাসির হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলেন,
"কোথায় আবার? ওনার কাজে গেছেন! "
___________
" আমি লয়ার ফারিশ নওয়ান। আমায় কিডন্যাপ করবে এই সাহস কারোর এখনও হয়নি!! আর আপনারা নিউজে রটাচ্ছিলেন আমায় কিডন্যাপ করে জোর করে বিয়ে করা হয়েছে? হাউ ফানি!!"
ফারিশের কণ্ঠের সেই গাম্ভীর্য আর ধারালো কথায় উপস্থিত সাংবাদিকদের বুক কেঁপে উঠল।
"এনিওয়ে, আপনাদের এই খবরটা দিল কে? সোর্সটা কী আপনাদের?"
ভিড়ের মধ্য থেকে একজন সিনিয়র সাংবাদিক আমতা আমতা করে বললেন,
"আসলে... আমাদের ফোনে একটা আননোন নাম্বার থেকে মেসেজ এসেছিল, স্যার! সেখানে বলা হয়েছিল লয়ার ফারিশ নওয়ানকে কাজী অফিসে আটকে রাখা হয়েছে।"
"মেসেজ!!"
ফারিশের ভ্রু দুটো কুঁচকে গেল। কে এই কাজ করতে পারে? সে যে কাজী অফিসে ছিল, এই খবর বাইরের একজন মানুষ জানলই বা কী করে? ফারিশ আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে গম্ভীর গলায় আদেশ দিল,
"আমায় নাম্বারটা এখনই শেয়ার করবেন। আর লিসেন,আমার ভাইয়ের নামে যে নিউজটা আপনারা করেছিলেন, তা আগামী দশ মিনিটের মধ্যে ডিলিট করার ব্যবস্থা করুন। নয়তো আপনাদের আমি আস্ত রাখব না! মানহানির এমন মামলা ঠুকব যে কোর্টের চক্কর কাটতে কাটতে জীবন পার হয়ে যাবে।"
ফারিশের এই প্রকাশ্য হুমকিতে সাংবাদিকরা ভয়ে হড়বড় করে সায় দিল। মাথা নাড়তে নাড়তে তারা যে যেভাবে পারল দ্রুত সেখান থেকে পালাল।চারিদিক ফাঁকা হতেই ফারিশ এবার ঘুরে তার পাশে ফাইলপত্র হাতে দাঁড়িয়ে থাকা জুনিয়র সহকারী লয়ার আসিফের দিকে স্থির চোখে তাকাল। কন্ঠস্বর কিছুটা নিচু করে জিজ্ঞেস করল,
"ওনার কী অবস্থা? তোমায় একবার দেখে আসতে বলেছিলাম, গিয়েছিলে?"
ফারিশের এই প্রশ্নে আসিফের মুখেভঙ্গি এক নিমেষে বদলে গেল। সে আতঙ্কে আর অস্বস্তিতে আমতা আমতা করতে লাগল।
"কী বলেন স্যার এসব!! এই কেসটা কত বড় আর কতটা সেনসিটিভ, আপনার কোনো ধারণা আছে? ওইখানে এই মুহূর্তে যাওয়াটা যে কতটা লাইফ রিস্ক, আপনি তো জানেনই!! "
ফারিশ এবার দাঁতে দাঁত চেপে আসিফের দিকে তাকাল। তার মানে এই ভীতু ছেলেটা ভয়ে ওখানে পা-ই রাখেনি! সে তৎক্ষণাৎ নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
"রেডি হও আসিফ, আমরা এখনই সেখানে যাব!"
কথাটা শুনে আসিফ প্রায় কেঁদে ফেলার মতো মুখ করে বলল,
"কিন্তু স্যার! আপনার বিকেলে অন্য একটা বড় কর্পোরেট মার্ডারের কেস নিয়ে বসার কথা আছে... তাছাড়া ক্লায়েন্টরা আপনার জন্য অফিসে অপেক্ষা করছে..."
"আমি বলেছি আমরা এখন ওইখানেই যাব!"
ফারিশ আসিফের কথা মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে তার স্বভাবসুলভ ডমিনেটিং গলায় বলল,
"অন্য আর যে কোনো জরুরি কাজই থাকুক না কেন, বর্তমানে আমার কাছে এই কেসটা অনেক বেশি ইম্পোর্ট্যান্ট। নাও, হারি আপ!"
কোর্টের সেই অতীব জরুরি কেসটার উদ্দেশ্যেই নিজের গাড়ি নিয়ে রওনা হয়েছিল ফারিশ। আর আসিফ নিজের বাইক নিয়ে আসছিল ফারিশের গাড়ির ঠিক পেছনে পেছনে। কিন্তু শহরের ব্যস্ততম এক মোড়ে এসে হঠাৎ করেই ফারিশের গাড়ির ব্রেক কষার তীব্র শব্দ হলো। পেছনের বাইকে থাকা আসিফও কোনোমতে ব্রেক চেপে নিজেকে সামলাল। সে অবাক হয়ে ফারিশের গাড়ির দিকে তাকাতেই দেখল, ফারিশ অলরেডি গাড়ি থেকে নেমে পড়েছে। তার চোয়ালটা রাগে শক্ত হয়ে উঠেছে।
রাস্তার ঠিক ওপারেই দাঁড়িয়ে আছে আরিশা আর আয়ান। আয়ান আরিশার সাথে হেসে হেসে কথা বলছে।
"কী হচ্ছে এখানে??"
ফারিশের গম্ভীর কন্ঠস্বর শুনতেই আয়ান আর আরিশা দুজনেই রীতিমতো চমকে উঠল। ভাইয়ের মুখের এই চেনা মুখভঙ্গি দেখে আয়ানের বুঝতে আর বাকি রইল না যে—ভাই আবারও চরম ক্ষেপেছে! আয়ান তাড়াহুড়ো করে দুই হাত নেড়ে ফারিশকে বোঝানোর সুরে বলতে শুরু করল,
"আরে, ফারিশ!! আসলে আজ ভার্সিটির ক্লাসটা একটু তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গিয়েছিল তো, তাই বাড়ি ফিরছিলাম। মাঝরাস্তায় এসে দেখি আরিশা এখানে একা দাঁড়িয়ে আছে। ওর গাড়িটা হুট করে খারাপ হয়ে গিয়েছিল, স্টার্ট নিচ্ছিল না। তাই আমি জাস্ট একটু হেল্প করতে..."
ফারিশ আয়ানের কথার কোনো উত্তর না দিয়ে, জাস্ট একটা তীক্ষ্ণ চাউনি দিল। তারপর কোনো বাক্যব্যয় না করে আয়ানের কাঁধে হাত রেখে, তাকে ঘুরিয়ে তার নিজের গাড়ির দিকে একটা আলতো ধাক্কা দিল। সেই আলতো ধাক্কার বার্তাটা খুব পরিষ্কার ছিল—‘এখান থেকে এখনই বিদায় হ!’আয়ান আর নিজের বিপদ ডেকে আনতে চাইল না। সে আরিশার দিকে একটা ‘আল্লাহ হাফেজ’ মার্কা অসহায় চাউনি দিয়ে আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে নিজের গাড়ির দিকে চলে গেল।ঠিক তখনই আসিফ তার বাইকটা রাস্তার পাশে স্ট্যান্ড করে ফারিশের কাছে হেঁটে এল। সে ফারিশকে ওভাবে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বেশ আতঙ্কিত গলায় বলল,
"স্যার, যাবেন না? সময় পার হয়ে যাচ্ছে তো!"
ফারিশ আসিফের কথার জবাব দেওয়ারও প্রয়োজন বোধ করল না। সে আসিফের সামনে গিয়ে দাঁড়াল এবং কোনো কথা না বলে আসিফের হাত থেকে তার বাইকের চাবিটা এক ঝটকায় কেড়ে নিল। তারপর নিজের পকেট থেকে কার-এর চাবিটা বের করে আসিফকে দিল।
"তুমি গাড়ি নিয়ে যাও, আমি পরে আসছি!"
আসিফ তো আকাশ থেকে পড়ল। সে চাবিটা হাতে নিয়ে হতভম্ব হয়ে বলল,
"মানে কী স্যার! আপনি না মাত্র কয়েক মিনিট আগে বললেন—এখন ওই কেসটা ব্যতীত অন্য কোনো কাজই আপনার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়! তবে এখন আবার কী হলো? স্যার, আমি ওই ডেঞ্জারাস জায়গায় একা যেতে পারব না!! ওটা মারাত্মক রিস্কি!"
ফারিশ আরিশার দিকে এক পলক তাকিয়ে, চোখ ঘুরিয়ে আসিফের দিকে তাকাল। দাঁতে দাঁত চেপে গম্ভীর ধমকের সুরে ডাকল—
"আসিফ!!!"
আসিফ আর একটা শব্দও উচ্চারণ করার সাহস পেল না। সে শুকনো একটা ঢোক গিলে, চাবিটা পকেটে পুরে বাধ্য ছেলের মতো ফারিশের গাড়ির দিকে পা বাড়াল।
এতক্ষণ ধরে ঘটে যাওয়া পুরো ঘটনাটা এক দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছিল আরিশা। ফারিশ আসিফকে বিদায় করে দিয়ে একবার আরিশার দিকে তাকাল। সে আরিশার দিকে চেয়েই নিজের পকেট থেকে ফোনটা বের করল এবং দ্রুত কাউকে একটা কল দিল। ওপাশ থেকে কল রিসিভ হতেই খুব সংক্ষিপ্ত গলায় কিছু একটা বলল ফারিশ, যা আরিশার কান অব্দি পৌঁছাল না। কথা শেষ হতেই ফোনটা আবার পকেটে রেখে সে পুনরায় আরিশার একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। দুই জনের মাঝখানের দূরত্বটা মাত্র কয়েক ইঞ্চি।
"চলো!!"
কথাটা শুনে আরিশা কপালটা কুঁচকে, চিবুকটা সামান্য উঁচিয়ে বলল,
"কোথায়??"
"বেশি প্রশ্ন না করে বাইকে ওঠো!"
কথাটা বলতে বলতেই ফারিশ বাইকের ওপর উঠে বসল। বাইক স্টার্ট দেওয়ার আগে সে চশমাটা খুলে কোনো অনুমতি না নিয়েই আরিশার বাড়িয়ে রাখা হাতের মুঠোয় গুঁজে দিল। তারপর নিজের হেলমেটটা মাথায় পরে নিল। বাইকের হ্যান্ডেলে ঝুলে থাকা অপর হেলমেটটা টেনে নিয়ে সে আরিশার দিকে ঝুঁকে এল এবং আরিশার কিছু বলার আগেই পরম যত্নে সেটা আরিশার মাথায় পরিয়ে দিল। বাইকের পেছনে আড়ষ্ট হয়ে উঠে বসে আরিশা একটু নড়েচড়ে বসল। মাঝখানের দূরত্বটা বজায় রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে সে কিছুটা চড়া গলায় বলল,
"বাসায় চলুন তাড়াতাড়ি!! মা নিশ্চয়ই এতক্ষণে আমার জন্য টেনশন করছে!"
"আমরা এখন বাসায় যাব না।"
"তবে? কোথায় যাব?"
আরিশা এবার আসলেও বেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।কিন্তু ফারিশের কাছ থেকে কোনো উত্তর পাওয়া গেল না। আরিশা উত্তর না পেয়ে পুনরায় একটু চেঁচিয়ে বলল,
"আরে বলুন না কোথায় যাচ্ছেন? মা তো সত্যিই টেনশন করবে!"
ফারিশ হেলমেটের কাঁচটা সামান্য তুলে বাঁকা হেসে আয়না দিয়ে আরিশার দিকে তাকাল। তারপর নির্বিকার গলায় বলল,
"আন্টিকে অলরেডি ফোন করে বলে দিয়েছি যে তুমি আমার সাথে আছো। সো, নো প্রবলেম।"
ফারিশের কথা শুনে আরিশা অবাক হয়।
" মা আপনার কথায় রাজি হলো?? অথচ ইনায়ার সাথে ঘুরতে যেতে চাইলে রাজি হয় না!! "
আরিশার কথায় ফারিশ এবার কিছুটা কপাল কুচকায়।
" ঘুরতে যেতে ইচ্ছে করলে আমায় বলবে, আমি নিয়ে যাব। অন্য কারোর সাথে কেন যাবে, হ্যাঁ?? "
ফারিশের কথায় কোনো উত্তর না দিয়ে বাইক ধরে আরও ভালো করে বসে আরিশা।
" ধরে বসো!! "
" ধরলাম তো!! "
"বাইককে না, আমাকে।"
ফারিশ লুকিং গ্লাসে আরিশার দিকে তাকিয়ে শান্ত চোখে বলল।আরিশা এবার নিজের চিবুকটা আরও উঁচিয়ে জেদি গলায় উত্তর দিল,
"পারব না!!"
ফারিশ খুব ভালো করেই জানে, এই মেয়ে এত সহজে শুনবে না। তাকে বাগে আনার জন্য ফারিশের কাছে দারুণ সব টেকনিক জানা আছে। সে আর এক মুহূর্তও কথা বাড়াল না।বাইক স্টার্ট দিল। পুরো ফুল স্পিড!গতির এই আকস্মিক ধাক্কায় আরিশা নিজের ভারসাম্য ধরে রাখতে পারল না। দুই হাত ছিটকে চলে এল সামনের দিকে। আরিশা একদম না চাইতেও ফারিশকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। নিজের অজান্তেই তার চোখ দুটো ভয়ে বন্ধ হয়ে এল।
বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ ছাপিয়ে আরিশা চিৎকার করে বলল,
"স্পিড কমান প্লিজ! আমার ভীষণ ভয় করছে!!"
হেলমেটের ভেতরে ফারিশের ঠোঁটের কোণে সেই চেনা বাঁকা হাসিটা ফুটে উঠল। আরিশাকে নিজের এত কাছে পেয়ে তার ভেতরের সমস্ত রাগ যেন এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে আর আরিশাকে না জ্বালিয়ে আস্তে আস্তে বাইকের স্পিডটা কমিয়ে নিয়ে এল একদম স্বাভাবিক গতিতে।স্পিড কমতেই আরিশা একটু স্বস্তি পেল, কিন্তু ফারিশের পিঠ থেকে নিজের হাত দুটো সরাল না। সে মুখটা সামান্য বাঁকিয়ে গাল ফুলিয়ে বিড়বিড় করল,
"একটা আস্ত অসভ্য লোকের সাথে আমার বিয়ে হয়েছে! মানি না এই বিয়ে আমি!!"
আরিশার এই কিউট অভিযোগে ফারিশ একদম শব্দ করে হেসে উঠল। মাথাটা সামান্য দুলিয়ে বলল,
"আই নো, আমিও মানি না!"
আরিশা এবার একটু কৌতূহলী হয়ে ফারিশের কাঁধের ওপর দিয়ে উঁকি মেরে জিজ্ঞেস করল,
"আচ্ছা, এবার অন্তত দয়া করে বলবেন যে আমরা যাচ্ছি কোথায়?"
ফারিশ বাইকটা শহরের কোলাহল ছেড়ে একটু ফাঁকা, গাছপালায় ঘেরা সুন্দর রাস্তার দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। সে বেশ রসিকতা করে বলল,
"এতটা বছর সিঙ্গেল লাইফের মহাসুখে ছিলাম। আজ হুট করে সেই সিঙ্গেল লাইফের সমাধি হয়ে গেল, আমরা অফিসিয়ালি মিঙ্গেল হয়ে গেলাম! তাই ভাবলাম ঐতিহাসিক দিনটার উপলক্ষে একটা লং ড্রাইভে যাওয়া যাক, কী বলো ওয়াইফ?"
ফারিশের মুখে এই 'সিঙ্গেল লাইফের সমাধি'র কথা শুনে আরিশা নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে খিলখিল করে হেসে উঠে বলল,
"হাহা, এটা অবশ্য আপনি একদম ঠিক বলেছেন!!"
আরিশা এবার এই লং ড্রাইভটা বেশ উপভোগ করতে শুরু করল। বাইকটা তখন অনেকটা পথ পেরিয়ে বেশ মনোরম একটা রাস্তার মোড়ে এসে পৌঁছেছে।হঠাৎ আরিশার চোখ গেল রাস্তার পাশে এক বৃদ্ধ লোকের দিকে, যিনি গোলাপি রঙের হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করছেন। আরিশা বাচ্চাদের মতো উত্তেজিত হয়ে ফারিশের পিঠে কিল মেরে চেঁচিয়ে উঠল,
"এই এই থামুন! থামুন বলছি!!"
ফারিশ হঠাৎ আরিশার এই আকস্মিক চিৎকারে কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে কপাল কুঁচকে বলল,
"কেন? কী হলো?"
"হাওয়াই মিঠাই খাব!! ওই দেখুন আঙ্কেল হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করছে!"
আরিশা এক হাত দিয়ে রাস্তার ওপারটা দেখিয়ে চোখ দুটো চকচক করে বলল। ফারিশ বাইকের স্পিড একদম কমিয়ে নিয়ে এল, কিন্তু মুখে দুষ্টুমি মাখিয়ে বলল,
"উঁহু, দিব না!!"
ফারিশের মুখে এই সরাসরি 'না' শুনে আরিশার মুখের সমস্ত আনন্দ এক সেকেন্ডে উধাও হয়ে গেল। সে বাচ্চাদের মতো ঠোঁট উল্টে, অভিমানী মুখে ফারিশের পিঠ থেকে হাত সরিয়ে আবার বাইকের পেছনের অংশ ধরে বসে রইল। ফারিশ আয়নায় আরিশার ওই গম্ভীর আর গোমড়া মুখটা দেখে মনে মনে হাসতে লাগল।মেয়েটাকে জ্বালাতে তার ভালোই লাগে। পরক্ষণেই আরিশা রেগে ফারিশের দিকে তাকায়। এত তাড়াতাড়ি মেনে যাওয়ার মেয়ে আরিশা নয়।
"শুনুন না, প্লিজ.. একটা ছোট্ট আবদারই তো করলাম!! "
তোমার এই ছোট্ট আবদার পূরণ করতে করতেই আবার জীবন শেষ। পারবো না!! "
"প্লিজ... প্রিটি প্লিজ..... "
" নোপ!!আমি ফারিশ নওয়ান যেহেতু একবার না বলেছি তার মানে না!!"
আরিশা এবার রেগে ফারিশের কাধে কয়েকটা বারি দিয়ে বলে,
"আপনার এসব ভাব অন্যদের সামনে দেখাবেন, সেখানে কাজে দিলেও আমার সামনে তা দুই সেকেন্ডও থাকে না। এবার বলুন আমার কথা শুনবেন কিনা?? "
আরিশার এই কান্ডে ফারিশ সঙ্গে সঙ্গে বাইক থামিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে আরিশার দিকে তাকায়।
"পুরাই জল্লাদ মেয়ে!! বাঁচাও আল্লাহ!!"
ফারিশ এবার গিয়ে আরিশার জন্য হাওয়াই মিঠাই এনে দিয়ে পুনরায় বাইক স্টার্ট দেয়। আরিশা এক হাতে ফারিশকে ধরে অপরহাতে হাওয়াই মিঠাই খেতে থাকে।
" খাবেন?? "
" নাহ, তুমিই খাও!! "
মিররে আরিশাকে একবার দেখে ফারিশ এবার গাইতে শুরু করে,
"এলে নীলচে মাস, আমি সাজাবো ঘাস
তুমি পা ফেলে আনবে বাহার
এলে মেঘলা দিন, আমি খুব রঙিন
হয়ে সামলাবো আকাশ তোমার..."
