Thread Rating:
  • 1 Vote(s) - 5 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5

গল্প:অঘোষিত হৃদয়সন্ধি (Writer: Raisa Mehran)
#5

 05

আরিশার সাথে সারাদিন পাগলামি আর বেশ কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরির পর, ফারিশ তার সেই অতীব প্রয়োজনীয় কেসটার কাজে গিয়ে এখন সবেমাত্র বাসায় ফিরল। কোটের বোতামটা খুলতে খুলতে সে যখন ড্রয়িংরুমে পা রাখল, তখনই তার চোখ গেল সামনের সোফাটায়।
সেখানে বেশ আরাম করে বসে মি. নাসির আয়েশ করে চা খাচ্ছেন আর ফোনের স্ক্রিনে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে কী যেন দেখছেন। ফারিশ শান্ত কিন্তু দৃঢ় পায়ে এগিয়ে গিয়ে ঠিক মি নাসিরের মুখোমুখি দাঁড়াল। 

"তোমার সাথে কিছু জরুরি কথা আছে, ড্যাড!!"

ফারিশের সেই গম্ভীর স্বর কানে আসতেই মি. নাসির বিষম খাওয়ার মতো করে আতঙ্কে ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ তুলে তাকালেন। সামনে তাকাতেই দেখলেন—ছেলের চোখে সেই চিরচেনা তীরের মতো সন্দেহ মেশানো তীক্ষ্ণ চাউনি! মি. নাসিরের বুকের ভেতরটা যেন গুরগুর করে উঠল।

"ড্যাড!!"

 ফারিশ পুনরায় ডাকল, এবার গলায় গাম্ভীর্যের মাত্রাটা আরেকটু চড়া।মি. নাসির এবার আর সোফায় বসে থাকার সাহস পেলেন না। হাতের চায়ের কাপটা তড়িঘড়ি করে টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ালেন।

"হ্যাঁ... হ্যাঁ হ্যাঁ, হবে হবে! অবশ্যই কথা হবে রে বাপ। আসলে মাত্রই ওয়াশরুম... থুড়ি! হসপিটাল থেকে এলাম তো। আমি একটু ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে আসি। তুই বোস, তুই একটু রিল্যাক্স কর!!"

মি. নাসিরের কথা শুনে ফারিশ হাত পকেটে ঢুকিয়ে, ভ্রু জোড়া কুঁচকে ওনার দিকে তাকাল। একদম জেরা করার ভঙ্গিতে সন্দেহভরা প্রশ্নে বলল,

 "হসপিটাল থেকে এসে ফ্রেশ না হয়েই সোফায় বসে চা খাচ্ছ, ড্যাড?"

ছেলের এই যুক্তির সামনে মি. নাসির মনে মনে একটা শুকনো ঢোক গিললেন। কপালে সামান্য ঘাম জমল ওনার। আর কোনো অজুহাত খুঁজে না পেয়ে নিজের কপালে হাত দিয়ে বললেন,

 "প্রেসারটা হুট করে বড্ড বেড়েছে রে ! আমি গেলাম!!"

কথাটা শেষ করারও তর সইল না ওনার। ফারিশকে আর কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে মি. নাসির প্রায় এক প্রকার দৌড়েই সেখান থেকে পালালেন।বাবার এমন অদ্ভুত চোরের মতো পলায়ন দেখে ফারিশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে কোটটা খুলে সোফার পাশে রাখল এবং নিজে বেশ আরাম করে সোফাটায় হেলান দিয়ে বসল।
পকেট থেকে ফোনটা বের করে সে লক খুলল। চ্যাট লিস্টের ওপরের দিকে থাকা 'আরু' নামটার ওপর আঙুল ছুঁইয়ে একটা ছোট মেসেজ টাইপ করে সেন্ড করে দিল—

"ইও!! হোয়াটস আপ??"

মেসেজটা পাঠাতেই ফারিশের সেই  গম্ভীর হয়ে থাকা ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মিষ্টি, বাঁকা হাসি ফুটে উঠল।

তিন ঘণ্টা!! ঠিক তিন-তিনটে ঘণ্টা পার হয়ে গেছে, কিন্তু মি. নাসিরের ওয়াশরুম থেকে বের হওয়ার কোনো নামগন্ধই নেই!এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে ফারিশ আরিশার সাথে বেশ অনেকক্ষণ ফোনে চ্যাট করল, নিজের রুমে গিয়ে ফ্রেশ হলো,  এক মগ কড়া ব্ল্যাক কফি খেল, এমনকি ল্যাপটপে নিজের কিছু জরুরি কেসের কাজও গুছিয়ে ফেলল—কিন্তু মি. নাসিরের দেখা নেই তো নেই-ই! একটা মানুষ তিন ঘণ্টা ধরে ওয়াশরুমে কী করতে পারে, তা ফারিশের মাথাতেও ঢুকছে না।ফারিশের ধৈর্যের বাঁধ এবার সত্যিই ভেঙে গেল। সে কফির মগটা টেবিলের ওপর দড়াম করে নামিয়ে রেখে সোজা মি. নাসিরের বেডরুমে গিয়ে ঢুকল। তারপর ওয়াশরুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে ধাক্কাতে লাগল—

"ড্যাড!!" 

ফারিশের গলায় এবার স্পষ্ট রাগ।ওদিকে ওয়াশরুমের ভেতরে তখন এক এলাহী কাণ্ড চলছে! মি. নাসির ওয়াশরুমের বড় আয়নাটার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে হাত-পা নেড়ে রিহার্সাল করছিলেন যে, ছেলে সামনে এলে ঠিক কী কী বাহানা দেওয়া যায়। তিনি মনে মনে ভাবছিলেন, ‘ছেলে কি আসলেই ধরে ফেলেছে যে ওই কিডন্যাপ নাটকের মূল মাস্টারমাইন্ড আমিই ছিলাম? আরিশাকে ওই বুদ্ধিটা আমিই দিয়েছিলাম?’ ঠিক এমনই এক ভাবনার চরম মুহূর্তে দরজায় ওই বিকট শব্দ আর ফারিশের গগনবিদারী ডাক শুনে মি. নাসির চমকে উঠল!
তিনি ভয়ে প্রায় লাফিয়ে উঠে কাঁপাকাঁপা গলায় বললেন,

 "কে... কে? কে ধাক্কায়?"

ফারিশ দরজায় আরেকটা থাপ্পড় মেরে চরম বিরক্তিতে রেগে বলল,

 "পাশের বাড়ির কুদ্দুসের বউ!! দরজাটা খুলবে ড্যাড?? এতক্ষণ ধরে ওয়াশরুমে বসে বসে তুমি ঠিক কী করছ শুনি??"

ছেলের মুখে এমন ত্যাড়া উত্তর শুনে মি. নাসির একটু সাহস সঞ্চয় করার চেষ্টা করলেন। ভেতরের ভয়টা ঢাকতে একটু নার্ভাস হাসি হেসে বললেন,

 "কী করি মানে?? মানুষ ওয়াশরুমে এসে কী করে?? হিহি... আমার এত বড় লয়ার ছেলে দেখি এটাও জানে না!!"

"ড্যাড!! ফাজলামো বন্ধ করে বের হও!!"

"না!! বের হব না।"

"ড্যাড!!"

মি. নাসির এবার ভেতরে দাঁড়িয়েই একটু চড়া গলায় আক্ষেপ করার ভান করলেন,

 "আরে কী আজব! কী জামানা এলো রে বাবা! এই যুগে দেখছি নিজের বাড়িতে শান্তিতে একটু ওয়াশরুমও ইউজ করা যায় না! প্রাইভেসি বলে কিছু রাখল না এরা!"

ফারিশ আর এক সেকেন্ডও নষ্ট করতে চাইল না। সে দরজার হাতলটা শক্ত করে চেপে ধরে শেষ হুঁশিয়ারি দিল,

 "তুমি নিজের ইচ্ছায় সম্মান নিয়ে বের হবে, নাকি আমি পা দিয়ে লাথি মেরে এই দরজাটা ভাঙব? ডিসাইড করো, ড্যাড!"

ছেলের এই দরজা ভাঙার ডিরেক্ট হুমকিতে মি. নাসিরের সমস্ত রিহার্সাল এক নিমেষে ভেস্তে গেল। মি নাসির খুব ভালো করেই জানে,লয়ার ফারিশ নওয়ান যা মুখে বলে, তা কাজে করে দেখায়। আর কোনো উপায় না দেখে, মি. নাসির অত্যন্ত মলিন আর চোরের মতো একটা মুখভঙ্গি করে আস্তে করে ওয়াশরুমের দরজাটা খুললেন।

"কী আজব!! তোরা বাপ-ছেলে মিলে ঘরের মধ্যে কী শুরু করে রেখেছিস বল তো? আমরা নিচতলা থেকেও তোদের এই চিৎকার-চেঁচামেচি শুনতে পাচ্ছি!!"

দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে কোমর হাত দিয়ে রুখে দাঁড়ালেন ফারিশের মা, মিসেস ফাতেমা। 
ফারিশ দরজার হ্যান্ডেল থেকে হাত সরিয়ে বিরক্ত মুখে মায়ের দিকে তাকাল। তারপর সোজা মি. নাসিরের দিকে আঙুল তুলে বলল, 

"কী শুরু করেছি, সেটা তোমার হাসবেন্ডকে জিজ্ঞাসা করো, মম!! একটা মানুষ এতক্ষণ ধরে ওয়াশরুমে বসে কী করতে পারে? তিন ঘণ্টা ধরে ভেতরে লকড!!এ নাকি ডাক্তার নাসির!!"

ছেলের মুখে এই অদ্ভুত নালিশ শুনে মিসেস ফাতেমা আকাশ থেকে পড়লেন। তিনি চোখ বড় বড় করে মি. নাসিরের দিকে তাকালেন। চরম অবাক হয়ে বললেন,

 "তুমি তিন ঘণ্টা ধরে ওয়াশরুমে বসে আছ?! আর ওদিকে তোমার ভাই সারা বাড়ি জুড়ে তোমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে!!"

মি. নাসির আমতা আমতা করতে লাগল। 
ফারিশ এবার লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে জেরা শুরু করার জন্য যেই না মি. নাসিরের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে মুখ খুলতে যাবে, ঠিক তখনই তার পকেটের ফোনটা বিকট শব্দে কেঁপে উঠল। পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই ফারিশে কুঁচকালো। এটা কোনো সাধারণ কল নয়—একেবারে ‘কোর্ট’ আর তার সেই অতি গোপনীয় বিশেষ কেসটার সাথে জড়িত একটা ভীষণ জরুরি কল! এই কলটা এই মুহূর্তে ইগনোর করার কোনো সুযোগই তার কাছে নেই।ফারিশ ফোনটা হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে মি. নাসিরের দিকে তীরের মতো তীক্ষ্ণ এক চাউনি ছুঁড়ে দিল। দাঁতে দাঁত চেপে অত্যন্ত নিচু কিন্তু ধারালো গলায় বলল—

"তোমাকে আমি পরে দেখে নিচ্ছি, ড্যাড! জাস্ট ওয়েট!!"

কথাটা শেষ করেই সে আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। ফোনটা কানের কাছে চেপে ধরে নিজের রুমের দিকে চলে গেল।ফারিশ চোখের আড়াল হতেই মি. নাসির স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। 

________

"আম গাছে কাঁঠাল ওঠে, কাঁঠাল গাছে জাম,
আমি মি চোর তাই চুরি করিলাম!! ওহ, চুরি করিলাম!!"

নিজের তৈরি এমন চমৎকার ছন্দে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে ড্রয়ারের ভেতরের জিনিসপত্র ওলটপালট করছিল মি. চোর। চুরি করার এমন পরম মুহূর্তে নিজের প্রতিভা দেখে সে নিজেই মনে মনে বেশ পুলকিত।ঠিক তখনই ঘরের স্তব্ধতা ভেঙে পেছন থেকে একটা মিষ্টি কিন্তু মারাত্মক ত্যাড়া কণ্ঠস্বর ভেসে এল—

"বাহ! গানটা বেশ দারুণ তো!!"

"হিহি, ধন্যবাদ! ধন্যবাদ!!"

নিজের এমন শৈল্পিক প্রশংসা শুনে আর লোভ সামলাতে পারল না মি. চোর। একদম গদগদ হয়ে হেসে ধন্যবাদ জানাল সে। কিন্তু ধন্যবাদ দেওয়া শেষ হতেই চট করে তার চোরের মাথায় বিদ্যুতের মতো একটা তীব্র ঝিলিক খেলে গেল—‘আরে! আমি তো চুরি করতে এসেছি! আমার প্রশংসা করল কে?!’পরক্ষণেই ঘোর কাটতেই আতঙ্কে ও চরম বিস্ময়ে চমকে পেছন ফিরে তাকাল সে। আর তাকিয়েই তার কলিজা শুকিয়ে কাঠ!সামনে দাঁড়িয়ে আছে আরিশা। এক হাত বুকের ওপর গুঁজে রাখা, আর অন্য হাতে ধরা মেডিকেলের একটা মোটা বই। কপালটা একদম কুঁচকে, চোখ দুটো ছোট ছোট করে সে মি. চোরের দিকে তাকিয়ে আছে। আরিশা তার হাতের ভারী বইটা দিয়ে মি. চোরের দিকে ইশারা করে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, 

"চুরি করার জন্য এই পুরো এলাকায় আর কোনো মানুষ পাওনি তুমি?? আমার ঘরটাই পেয়েছ চুরি করতে!! তাও আবার বুক ফুলিয়ে গান গাওয়া হচ্ছে?!"

মি. চোর এবার দুই হাত জোড় করে, মুখটা একদম কাঁদো কাঁদো বানিয়ে করুণ সুরে বলে উঠল, 

"মাফ করে দিন ম্যাম!! খোদার কসম, যদি আগে থেকে জানতাম আপনারা এখনো জ্যান্ত জেগে আছেন, তবে কি আর এই মাঝরাতে রিস্ক নিয়ে চুরি করতে আসতাম??"

কথাটা বলতে বলতেই চোরের চোখ গেল আরিশার হাতের ওই মোটা বইটার ওপর। সে যেন হঠাৎ কোনো রহস্য ভেদ করে ফেলেছে—এমন ভঙ্গিতে এক আঙুল উঁচিয়ে বলে উঠল, 

"এক মিনিট, এক মিনিট! ওটা মেডিকেলের  বই না?! আপনি মেডিকেলের স্টুডেন্ট?? ধুরর ভাই! আগে বলবেন তো!! শুধু শুধু আজকের পুরো রাতটাই আমার লস গেল!"

আরিশা অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। চোর আবার কপাল চাপড়ে আক্ষেপ করতে করতে বলতে লাগল,

 "আপনারা মেডিকেলের ছাত্র-ছাত্রীরা তো আবার রাতেই ঘুমান না! সারারাত ওই বই নিয়ে জেগে থাকেন। ধুরর, পুরাই কপাল খারাপ! একদম লস প্রজেক্ট!!"

কথাটা শেষ করেই মি. চোর আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করা নিরাপদ মনে করল না। সে কাঁধের ঝোলাটা ঠিকঠাক করে হনহনিয়ে একদম বেলকনির দিকে পা বাড়াল—যেখান দিয়ে সে পাইপ বেয়ে উঠেছিল। ওদিকে আরিশা তো রীতিমতো হা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মনে মনে ভাবল—‘এ তো দেখছি এক্কেবারে হাইলি এডুকেটেড চোর! চুরি করতে এসে মেডিকেলের বইও চিনে ফেলে!’কিন্তু চোরটা বেলকনি দিয়ে লাফ দেওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে আরিশার মাথায় এক দারুণ শয়তানি বুদ্ধি খেলে গেল। সে ঠোঁটের কোণে একটা দুষ্টুমিষ্টি হাসি ফুটিয়ে ডাকল—

"চোর ভাই!! একটা চমৎকার ডিল করবে আমার সাথে??"

মি. চোর অলরেডি বেলকনির রেলিংয়ে এক পা তুলে দিয়েছিল, তখনই কানে কথাটা আসায় সে চট করে পা নামিয়ে কৌতূহলী চোখে ঘুরল। জিজ্ঞেস করল,

 "কীসের ডিল??"

আরিশা হাতের বইটা টেবিলের ওপর রেখে একটু এগিয়ে এল। 

"আমার পাশের রুমে আমার বাবার ঘর। তুমি ওনার ঘরে গিয়ে ওনার আলমারি থেকে যা টাকা সরাতে পারবে, তার ৮০% হবে আমার, আর বাকি ২০% তোমার! আর হ্যাঁ, সাথে বাবার ক্রেডিট কার্ডটাও খুঁজে এনে আমাকে দেবে। আসলে লাস্ট টাইম শপিংয়ে একটু বেশি খরচ করে ফেলেছিলাম তো, তাই বাবা রাগ করে কার্ডটা লক করে নিজের কাছে লুকিয়ে রেখেছে, দিচ্ছেই না! তো... ডিলে তুমি রাজি??"

মি. চোর আরিশার এমন অদ্ভুত আর লোভনীয় অফার শুনে থমকে গেল। নিজের বাপের ঘরে চুরি করানোর জন্য চোরকে পার্টনারশিপ অফার করছে একটা মেয়ে! চোর কিছুক্ষণ হিসাব কষে বলল, 

"উমম... ২০% তো বড্ড কম ম্যাম! ৫০-৫০ করা যায় না? আধাআধি?"

আরিশা এক চুলও নড়ল না। সে শক্তভাবে মাথা নেড়ে কড়া গলায় ‘না’ বলে দিল,

 "নোপ! কোনো ৫০-৫০ হবে না। ডিল একটাই—৮০-২০। রাজি থাকলে বলো, নাহলে এখনই ‘চোর চোর’ বলে চিৎকার দিয়ে পুরো বাড়ি মাথায় তুলব!"

বাঘের ঘরে এসে এমন ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়ে বেচারা চোর আর কী-ই বা করবে! সে মনে মনে ভাবল—আজকের এই অপয়া রাতে খালি হাতে ফিরে যাওয়ার চেয়ে ২০% পাওয়াও তো অনেক বড় লাভ!সে আর দ্বিমত না করে দাঁত বের করে হেসে বলল, 

"আচ্ছা ঠিক আছে ম্যাম, রাজি! কিছু না পাওয়ার চেয়ে কিছু পাওয়া তো ঢের ভালো! চলুন, আপনার বাপের ক্রেডিট কার্ড উদ্ধার অভিযানে নামা যাক!"

বেশ অনেকক্ষণ খোঁজাখুঁজি করার পর, অবশেষে ক্রেডিট কার্ডটা খুঁজে পেল মি. চোর। একদম যুদ্ধ জয়ের খুশি নিয়ে সে পা টিপে টিপে আরিশার বাবা মি. দিদারের রুম থেকে বেরিয়ে এল।নিজের হাতের আঙুলে কার্ডটা নাচাতে নাচাতে ফিসফিস করে বলল,

 "পেয়ে গেছি ম্যাম;!!"

কার্ডটা দেখেই আরিশার চোখ দুটো চকচক করে উঠল। সে চোরের হাত থেকে ওটা এক ঝটকায় ছিনিয়ে নিয়ে বলল,

 "ওহহ, সেরা!! সত্যি বলছি চোর ভাই, আমার ক্ষমতা থাকলে আমি তোমাকে এই বছরের ‘বেস্ট চোর’-এর অ্যাওয়ার্ড দিতাম!!"

নিজের কাজের এমন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়ে মি. চোর তো খুশিতে গদগদ। সে বিনয়ের সাথে মাথা চুলকে বলল, 

"তা ম্যাম, প্রশংসা তো পাইলাম। কিন্তু কার্ডের পাসওয়ার্ডটা কী? টাকাটা তুলতে তো ওটা লাগবে।"

"পাসওয়ার্ড!!" 

আরিশার মুখের চওড়া হাসিটা একটু থমকে গেল। সে কপালে আঙুল ঠেকিয়ে আকাশ-পাতাল ভাবতে ভাবতে বলল, 

"আম্ম... আরে, একটু আগেও তো মনে ছিল! কী যেন পাসওয়ার্ডটা... ধুর!"

মি. চোর এবার চরম বিরক্ত হয়ে হাত উল্টাল,

 "আরে! কেমন মেডিকেল স্টুডেন্ট আপনি?! এত মোটা মোটা বই মুখস্থ করে ফেলেন, আর বাপের কার্ডের পাসওয়ার্ডটুকু আপনার মনে নেই?? আপনার মেমোরি তো দেখি একদম জং ধরা!"

একটা চোরের মুখে নিজের মেমোরি নিয়ে এমন কটূক্তি শুনে আরিশা রেগে ফায়ার হয়ে তার দিকে তাকাল। তখনই মাথায় একটা ক্লিক করতেই সে চেঁচিয়ে উঠল, 

"মনে পড়েছে!!"

আরিশার কথা শুনে মি. চোর এবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে খুশি হয়ে হাত বাড়িয়ে বলল,

 "তাহলে ম্যাম, এবার আমার চুক্তি অনুযায়ী ওই ২০% ক্যাশ টাকাটা দিয়ে দেন? আমার আবার তাড়া আছে।"

আরিশা এবার এক হাত কোমরে দিয়ে, অন্য হাতে ক্রেডিট কার্ডটা চেপে ধরে বাঁকা হাসল, 

"কীসের ২০%!! আমি কোনো ২০% চিনি না!! ভাগো এখান থেকে!"

কথাটা বলেই মি. চোরকে কোনো কিছু বোঝার সুযোগ না দিয়ে আরিশা পুরো বাড়ি মাথায় তুলে চিৎকার দিয়ে উঠল—

"চোর!! চোর!!! মা... বাবা... বাঁচাও, ঘরে চোর ঢুকেছে!!!"

মি. চোরের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল! চোখের পলকে সে বুঝতে পারল—একেবারে জ্যান্ত ‘চোরের ওপর বাটপারি’ কাকে বলে! এই মেয়ে তো ডাকাতের চেয়েও ভয়ঙ্কর! সে নিজের ডিফেন্সে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই আরিশার গগনবিদারী চিৎকারে মি. দিদার আর মিসেস নাহারের ঘুম ভেঙে গেল। তারা ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এল এবং কোনো কিছু না ভেবেই বেচারা মি. চোরকে জাপটে ধরে ফেলল।মি. চোর তখন মার খাওয়ার ভয়ে নয়, বরং আরিশার এমন চরম বিশ্বাসঘাতকতায় ডুকরে কেঁদে উঠল। 

 "আল্লাহ রে... কী শয়তান মেয়ে রে বাবা! এই মেয়ে যার কপালে আছে, সে তো নির্ঘাত শেষ!!! আল্লাহ, ওই  বেচারাকে তুমি বাঁচাইয়ো... ওনাকে একটু সহ্য করার ধৈর্য দিও... আমীন!"

আরিশা তখন  এক কোণে দাঁড়িয়ে মি. চোরের ওই করুণ দশা দেখে ঠোঁট টিপে এক শয়তানি হাসি দিল। তারপর নিজের ফোনটা বের করে সরাসরি ফারিশকে কল দিল।
ওদিকে, সারাদিনের তীব্র ধকল শেষে ফারিশ তখন নিজের বিছানায় উপুড় হয়ে, একটা বালিশ শক্ত করে আঁকড়ে ধরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। এসি-র ঠান্ডা বাতাসে মাত্রই তার চোখটা একটু লেগেছিল। এমন সময় ফোনটা কর্কশ শব্দে বেজে উঠতেই তার ঘুমের বারোটা বেজে গেল। চরম বিরক্তিতে চোখ না খুলেই সে ফোনটা হাতরে নিল। কিন্তু লক স্ক্রিনে ‘আরু’ নামটা জ্বলজ্বল করতে দেখেই তার ভেতরের সমস্ত ঘুম আর ক্লান্তি এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল! সে বিছানায় লাফ মেরে ধড়ফড় করে উঠে বসল।

"হ্যালো, আরু!! এনি প্রবলেম?! তুমি ঠিক আছ তো??" 

ফারিশের গলায় অস্থিরতা।

 "আরে, অনেক প্রবলেম ফারিশ, অনেক প্রবলেম! আমার ঘরে চোর ঢুকেছে!!"

"হোয়াট!! চোর? তোমার ঘরে?!" 

ফারিশের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়িয়েই হুঙ্কার দিল,

 "ধরে রাখো ওই শয়তানটাকে! এত বড় সাহস, আমার আর..."

রাগ আর আবেগের মাথায় কথাটি বলতে গিয়েও ঠিক মাঝপথে ব্রেক কষল ফারিশ।

 "আমার আর...? কী থামলেন কেন?"

ফারিশ নিজের গলাটা একটু ঝেড়ে, নিজেকে সামলে নিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

 "আই মিন... আমার আঙ্কেলের বাসায় ঢোকার সাহস পায় কী করে ওই চোর! তুমি একদম ভয় পেও না আরু, আমি এখনই আসছি!!"

ফোনটা কেটেই ফারিশ এক সেকেন্ডও নষ্ট না করে গায়ে শার্ট জড়িয়ে বাইকের চাবি নিয়ে বেরিয়ে পরে।
Reply



Forum Jump:


Users browsing this thread: 1 Guest(s)