Thread Rating:
  • 0 Vote(s) - 0 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5

দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin)
#15

১৫

আমরা একটা রিকশা নিলাম। রিকশাটা কারওয়ান বাজার হয়ে শাহবাগের দিকে এগোচ্ছে। রিকশায় আমরা পাশাপাশি বসেছি। আনিকার শরীরটা আবার আমার সাথে লেপ্টে আছে। উনার সেই শ্যানেল পারফিউমের গন্ধ।

রিকশায় বসে আমার প্রচণ্ড, বন্য ইচ্ছে হতে লাগল— আমি এখনই উনাকে জাপটে ধরি। এই রিকশার হুডের নিচেই উনার ওই লাল লিপস্টিক মাখা ঠোঁট, উনার গাল, চিবুক, গলা— সব জায়গায় আমার জিভের স্পর্শ বুলিয়ে দিই। উনি আমাকে একটু আগে যে যন্ত্রণাটা দিয়েছেন, তার শোধ আমি এখনই এই রিকশায় বসে তুলি।

কিন্তু হায় রে! না হলো সাহস, না হলো পাগলামি।

আমি রিকশায় একটা জড় পদার্থের মতো বসে রইলাম। আমার ভয় হতে লাগল, আমি যদি এখন উনার গায়ে হাত দিই, আর উনি যদি রিকশা থেকে লাফিয়ে নামেন? যদি উনি বলেন, "কী অসভ্য লোক আপনি!" তখন আমি কী করব? আমি আমার পশুকে আবার শিকল পরিয়ে রাখলাম। টিএসসিতে পৌঁছালাম। স্বপন মামার টং দোকানে দাঁড়িয়ে আমরা চা খেলাম।

আনিকা উনার পুরোনো স্মৃতির পাতা খুলে বসলেন। "জানেন রাশেদ, ওই যে ওই কোণায়, ওখানে বসে আমি আর বেলাল ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিতাম। বেলাল আমাকে প্রথম প্রপোজ করেছিল ওই হাকিম চত্বরের সামনে। তখন অবশ্য টিএসসি এত জমজমাট ছিল না..." উনি উনার স্বামীর সাথে উনার প্রেমের গল্প বলে যাচ্ছেন, আর আমি চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে ফুটন্ত তেলের মতো সেদ্ধ হচ্ছি।

মহিলাদের সাইকোলজি আসলে কোন বইয়ে লেখা থাকে? একটু আগে সিনেমা হলে যে নারী আমার পুরুষাঙ্গ ধরে নাড়াচাড়া করেছে, সে এখন টিএসসিতে দাঁড়িয়ে তার স্বামীর সাথে প্রেমের নস্টালজিক গল্প শোনাচ্ছে! এটা কি কোনো মানসিক বিকৃতি, নাকি এটা নারীদের একটা স্বাভাবিক পাওয়ার প্লে? আমি চুপচাপ শুনলাম। আমার ভেতরে বিরক্তি বাড়তে লাগল। তীব্র, তিতকুটে একটা বিরক্তি। টিএসসি থেকে আমরা আবার রিকশায় উঠলাম। এবার গন্তব্য আজিজ সুপার মার্কেট।

বিকেল প্রায় চারটা বাজে। আমাদের দুজনেরই পেটে ক্ষুধা। আজিজ সুপার মার্কেটের দোতলায় একটা খুব কাব্যিক টাইপের রেস্টুরেন্ট আছে। বাঁশের চাটাই দিয়ে ঘেরা, ভেতরে রবীন্দ্রসংগীত বাজে। আমরা সেখানে গিয়ে বসলাম। অর্ডার করলাম খাঁটি বাঙালি খাবার। সর্ষে ইলিশ, আলু ভর্তা, বেগুন ভর্তা আর ধোঁয়া ওঠা সাদা ভাত।

খাবার এল। আমরা খেতে শুরু করলাম। আনিকা খুব তৃপ্তি নিয়ে খাচ্ছেন। উনার খাওয়া দেখার মধ্যেও একটা আনন্দ আছে। কিন্তু আমার পেটে খাবার ঢুকছে না। আমার পেট ভরছে না, আর মন তো ভরছেই না। আমার মন, আমার শরীর, আমার প্রতিটি কোষ এখন একটাই জিনিস খেতে চাইছে— আনিকা নাওহারের শরীর। সাদা ভাতের বদলে আমি উনার ফর্সা পেট দেখতে চাইছি, ইলিশ মাছের বদলে আমি উনার ঠোঁটের স্বাদ চাইছি।

খাবার শেষ করে আমরা আজিজ মার্কেটের বইয়ের দোকানগুলো ঘুরতে লাগলাম। হাঁটতে হাঁটতে আমার মাথার ভেতর একটা খুব পরিষ্কার, কিন্তু চরম হতাশাজনক চিন্তা উঁকি দিতে শুরু করল। আমি আস্তে আস্তে বুঝতে পারলাম, আজ রাতে বা কোনো রাতেই আসলে আর কিচ্ছু হবে না।

আনিকা নাওহার আসলে আমাকে নিয়ে একটা খেলা খেলেছেন। জাস্ট একটা মজা নিয়েছেন। উনি দেখতে চেয়েছেন, আমার মতো একজন 'ভদ্র', 'বুদ্ধিজীবী' টাইপ মানুষের কন্ট্রোল উনি কতটা ভাঙতে পারেন। উনি সিনেমা হলে আমাকে ওই চরম পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন, শুধু উনার নিজের ক্ষমতাটা উপভোগ করার জন্য। উনি আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন— "রাশেদ, তুমি যতই ফিলোসফি ঝাড়ো না কেন, তোমার শরীরের নাটাই আমার হাতের মুঠোয়। আমি চাইলে তোমাকে স্বর্গে নিতে পারি, আবার চাইলে নরকে ফেলে রাখতে পারি।"

এটা একটা ক্লাসিক ক্যাট-অ্যান্ড-মাউস গেম। আমি হলাম সেই ইঁদুর, আর উনি হলেন বিড়াল। বিড়াল ইঁদুরকে ধরে সাথে সাথে খায় না। কিছুক্ষণ থাবা দিয়ে মারে, আবার ছেড়ে দেয়, ইঁদুরটা যখন ভাবে সে বেঁচে গেছে, বিড়াল আবার থাবা মারে। এই চরম সত্যটা বুঝতে পারার পর আমার ভেতরের সমস্ত আশা নিভে গেল। আমি বুঝতে পারলাম, এই নারী উনার ফ্ল্যাটের দরজা কোনোদিনই আমার জন্য খুলবেন না। উনি আমাকে ওই সিনেমা হল পর্যন্তই রাখবেন।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে আসছে। আমরা আজিজ মার্কেট থেকে বের হলাম।

"রাশেদ, চলুন এবার ফেরা যাক। বেশ টায়ার্ড লাগছে," আনিকা বললেন। আমরা রিকশায় চেপে বসলাম। এবার গন্তব্য ধানমন্ডি। তবে উনার বাসা নয়, উনি বললেন, "চলুন, রবীন্দ্র সরোবরের ওদিক দিয়ে একটু ঘুরে যাই। সন্ধ্যার বাতাসটা ভালো লাগবে।" রিকশা চলছে। ঢাকা শহরের আকাশ কালচে হয়ে এসেছে। রাস্তার সোডিয়াম বাতিগুলো জ্বলে উঠেছে। রবীন্দ্র সরোবরের দিকের রাস্তাটা একটু নিরিবিলি, দুই পাশে বড় বড় গাছ। অন্ধকারটা বেশ জমাট।

আমি রিকশার এক পাশে বসে আছি। আমার ভেতরের সেই পরাজয়, সেই হতাশা, আর সেই তীব্র কামনার অপূর্ণতা মিলে আমার মাথার ভেতর একটা রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু করে দিল। আমি ভাবলাম, আমি কি সারাজীবন এই 'ভদ্রলোক' হয়েই থাকব? আমি কি শুধু উনার হাতের খেলনা হয়েই থাকব? উনি আমাকে নিয়ে মজা নেবেন, আর আমি বোকার মতো উনার স্বামীর প্রেমের গল্প শুনব?

হঠাৎ করে আমার ভেতরের সেই শিকল পরা পশুটা শিকল ছিঁড়ে ফেলল। সাহস আর পাগলামির যে অদৃশ্য সুতোটা ছিল, আমি সেই সুতোটা এক ঝটকায় কেটে দিলাম। রিকশা তখন রবীন্দ্র সরোবরের একটা বেশ অন্ধকার জায়গা পার হচ্ছে। আমি আর এক সেকেন্ডও চিন্তা করলাম না। কোনো ফিলোসফি না, কোনো লজিক না, কোনো পরিণতি না।

আমি হঠাৎ করে আমার বাম হাতটা বাড়িয়ে আনিকা নাওহারের ব্লাউজের ওপর দিয়ে উনার ডান দিকের স্তনটা সজোরে খামচে ধরলাম। আনিকা কিছু বুঝে ওঠার বা চমকে ওঠার আগেই, আমি আমার ডান হাত দিয়ে উনার ঘাড়ের পেছনটা শক্ত করে ধরলাম এবং উনার মুখের ওপর ঝুঁকে গিয়ে আমার ঠোঁট দুটো উনার সেই লাল লিপস্টিক মাখা ঠোঁটের ওপর প্রবল আক্রোশে, বন্যভাবে চেপে ধরলাম। একটা সরাসরি, দমকা এবং আক্রমণাত্মক চুম্বন।

আমি উনার ঠোঁটটা আমার দাঁত আর জিভ দিয়ে যেন গিলে খেতে চাইলাম। উনার নরম ঠোঁটের স্বাদ, উনার পারফিউমের গন্ধ, আর আমার ভেতরের জমানো ক্ষোভ— সবকিছু আমি ওই একটা চুম্বনের ভেতর ঢেলে দিলাম। আমার বাম হাতের মুঠিটা উনার স্তনের ওপর আরও শক্ত হলো। কিন্তু এই বন্যতা, এই পাগলামি স্থায়ী হলো মাত্র তিন বা চার সেকেন্ড।

চুমুটা দেওয়ার সাথে সাথেই আমার মস্তিষ্কের 'ভয়' নামক অ্যালার্মটা প্রচণ্ড শব্দে বেজে উঠল। রিকশাওয়ালা কি রিকশার লুকিং গ্লাসে আমাদের দেখছে? রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া কেউ কি দেখে ফেলল? আনিকা কি এখন আমাকে সজোরে একটা চড় মারবেন? উনি কি রিকশা থেকে লাফ দিয়ে পড়ে চিৎকার শুরু করবেন— "বাঁচান! এই লোকটা আমাকে রেপ করার চেষ্টা করছে!"?

এই চরম সামাজিক ভয়ের কারণে আমি ঝটকা দিয়ে উনার ঠোঁট থেকে আমার ঠোঁট ছাড়িয়ে নিলাম। আমার হাত উনার শরীর থেকে সরিয়ে নিয়ে আমি একদম রিকশার এক কোণায় গিয়ে সিঁটিয়ে বসে পড়লাম। আমার বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। আমি শ্বাস নিতে পারছি না। আমি জানি, আমার জীবন আজ এখানেই শেষ। আনিকা এখন আমাকে পুলিশে দেবে, অথবা রিকশা থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দেবে। আমি চোখ বন্ধ করে আসন্ন প্রলয়ের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। কিন্তু...

কিন্তু আমার ধারণার সম্পূর্ণ বাইরে গিয়ে, আনিকা নাওহার রিকশা থেকে লাফ দিলেন না। উনি চিৎকার করলেন না। উনি আমাকে কোনো চড়ও মারলেন না। তার বদলে, রিকশার ওই অন্ধকার হুডের নিচে, আনিকা নাওহার হঠাৎ করে হাসতে শুরু করলেন। প্রথমে খুব মৃদু শব্দে। তারপর সেই হাসিটা বাড়তে লাগল। উনি উনার দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে হাসতে লাগলেন। উনার হাসির বেগ এতই তীব্র হতে লাগল যে, উনার পুরো শরীরটা কাঁপতে শুরু করল।

"হা হা হা... ওহ মাই গড! রাশেদ... হা হা হা..."

আনিকা হাসতে হাসতে রীতিমতো দম আটকে যাওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছে গেলেন। উনার চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে আসছে। উনি হাসির চোটে রিকশার সিটে আমার দিকে হেলে পড়লেন। আমি স্তব্ধ, হতবাক এবং একটা চরম গাধার মতো উনার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমি উনাকে জোর করে চুমু খেয়েছি, উনার শরীরে হাত দিয়েছি, আর উনি আমাকে চড় মারার বদলে এমনভাবে হাসছেন যেন আমি উনাকে পৃথিবীর সেরা কোনো জোকস শুনিয়েছি!

এই নারী আসলে কী? ইনি কি কোনো রক্তমাংসের মানুষ, নাকি কোনো ভিনগ্রহের সাইকোপ্যাথ? আজ চরমভাবে উপলব্ধি করলাম— পৃথিবীর সমস্ত ভাষার ডিকশনারি মুখস্থ করলেও, একজন নারীর মনস্তত্ত্ব অনুবাদ করার ক্ষমতা কোনো পুরুষের নেই। আনিকা তখনো হাসছেন। আর রিকশাটা অন্ধকার চিরে রবীন্দ্র সরোবরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। হাসি জিনিসটা বড়ই রহস্যময়।

মানুষ কেন হাসে, এই নিয়ে বড় বড় দার্শনিকরা অনেক তত্ত্ব দিয়ে গেছেন। কেউ হাসেন আনন্দে, কেউ হাসেন দুঃখে, কেউ হাসেন স্নায়বিক চাপে, আবার কেউ হাসেন স্রেফ অন্যকে চরমভাবে অপমান করার জন্য। কিন্তু রিকশার অন্ধকার হুডের নিচে বসে আনিকা নাওহার যেভাবে হাসছিলেন, সেই হাসির কোনো বৈজ্ঞানিক বা দার্শনিক ব্যাখ্যা আমার জানা নেই।

উনার হাসির বেগ কমছেই না। হাসতে হাসতে উনার চোখ দিয়ে রীতিমতো পানি চলে এসেছে। উনি এক হাত দিয়ে পেট চেপে ধরে আরেক হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে হাসছেন। মাঝে মাঝে শ্বাস নেওয়ার জন্য থামছেন, আর পরক্ষণেই আবার হাসিতে ফেটে পড়ছেন।

আর আমি? আমি স্বঘোষিত ইন্টেলেকচুয়াল, রিকশার এক কোণায় এমনভাবে সিঁটিয়ে বসে আছি যেন আমি এইমাত্র কারো পকেট মারতে গিয়ে ধরা পড়েছি। আমার মনে হচ্ছে, রিকশার ফ্লোরটা যদি একটু ফাঁক হতো, তাহলে আমি গলে নিচে পড়ে যেতাম। ঢাকা শহরের ম্যানহোলের ড্রেন দিয়ে সোজা বুড়িগঙ্গায় গিয়ে ভেসে উঠতাম।

আমার অবস্থা একদম লেজেগোবরে।  অবশেষে আনিকার হাসির দমক একটু কমল। উনি ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটা টিস্যু বের করে চোখের পানি মুছলেন। তারপর কয়েকবার গভীর শ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করে আমার দিকে তাকালেন। উনার মুখে তখনো হাসির রেশ লেগে আছে। উনি খুব স্বাভাবিক, অত্যন্ত ক্যাজুয়াল গলায় বললেন, "রাশেদ, আপনি আসলেই খুব মজার লোক আছেন!"

মজার লোক!

শব্দ দুটো আমার কানের পর্দায় একটা অদ্ভুত ধাক্কা দিল। আমি উনাকে রেপ করার মতো একটা আক্রমণাত্মক মুভ নিলাম, আর উনি আমাকে বলছেন 'মজার লোক'! আমি কি সার্কাসের ক্লাউন যে আমাকে উনার মজার লোক মনে হলো? মহিলাদের সাইকোলজি বোঝার ক্ষমতা আল্লাহ পুরুষদের দেননি, এটা আমি আবারও প্রমাণ পেলাম।

আমি চুপচাপ রিকশায় বসে রইলাম। আমার মুখ দিয়ে একটা শব্দও বের হলো না। আমি এখন আর সেই ‘বন্য পুরুষ’ নেই, আমি এখন একটা ভেজা বিড়াল। রিকশা এসে রবীন্দ্র সরোবরের এক পাশে থামল। "চলুন, নামা যাক," আনিকা রিকশা ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে বললেন।

আমি একটা রোবটের মতো উনার পেছন পেছন নামলাম। রবীন্দ্র সরোবরে তখন বেশ ভিড়। চারদিকে মানুষের কোলাহল, ফুচকা-চটপটির দোকানের হাঁকডাক, আর লেকের দিক থেকে আসা একটা ঠান্ডা বাতাস। আমরা পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করলাম। "আপনি কি ভয় পেয়েছেন রাশেদ?" আনিকা হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন।

আমি কিছু বললাম না। আমার পকেটে এক প্যাকেট বেনসন আর একটা লাইটার ছিল। আমি পকেট থেকে সিগারেটটা বের করে ঠোঁটে গুঁজলাম। লাইটার জ্বালিয়ে একটা দীর্ঘ টান দিলাম। নিকোটিনের ধোঁয়াটা ফুসফুসে গিয়ে ধাক্কা মারতেই আমার অবশ হয়ে যাওয়া স্নায়ুগুলো যেন একটু একটু করে কাজ করতে শুরু করল।

সিগারেট জিনিসটা খুব অদ্ভুত। এটা শুধু তামাক আর কাগজ নয়, এটা পুরুষ মানুষের একটা সাইকোলজিক্যাল প্রপস। যখন আপনি প্রচণ্ড নার্ভাস, যখন আপনি জানেন না আপনার হাত দুটো কোথায় রাখবেন বা কী বলবেন, তখন একটা সিগারেট ধরিয়ে নিলে মনে হয় আপনি পরিস্থিতির ওপর একটু হলেও কন্ট্রোল ফিরে পাচ্ছেন।

ধোঁয়াটা বাতাসে ছাড়তে ছাড়তে আমি আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হতে শুরু করলাম। আমার ভেতরের সেই পরাজয়ের গ্লানিটা একটু কমে এল। "ভয় পাব কেন?" আমি খুব শান্ত গলায় বললাম। "ভয় পাওয়ার তো কিছু নেই।"

"তাহলে একদম চুপ হয়ে গেলেন যে? রিকশার ওই বীরপুরুষটা কোথায় গেল?" আনিকা মিটিমিটি হাসতে হাসতে বললেন। আমি উনার দিকে তাকালাম। উনার চোখের দৃষ্টিতে সেই একই খেলা, সেই একই রহস্য। আমি বুঝতে পারলাম, উনি আমার ওই হঠাৎ আক্রমণটাকে কোনো অফেন্স হিসেবে নেননি, বরং উনি ব্যাপারটাকে এনজয় করেছেন।

"বীরপুরুষের তো কাজ শেষ," আমি একটু তিক্ত গলায় বললাম। "এখন তো ক্লাউনের পালা। মজার লোকের পালা।" আনিকা আবার হেসে উঠলেন। "আহা, রাগ করছেন কেন? চলুন, আপনাকে ফুচকা খাওয়াই। মন ভালো হয়ে যাবে।"

আমরা রবীন্দ্র সরোবরের একটা পরিচিত ফুচকার দোকানে গিয়ে বসলাম। আনিকা অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে দুই প্লেট ফুচকা অর্ডার করলেন। টক জল আর ঝাল দিয়ে মাখানো ফুচকা। আমি উনার খাওয়া দেখছিলাম। একজন অভিজাত নারী, যিনি লন্ডনে বসে ফর্ক আর নাইফ দিয়ে খাবার খান, তিনি কীভাবে অবলীলায় রাস্তার পাশের টং দোকানে বসে হাত দিয়ে ফুচকা ভেঙে টক জলে চুবিয়ে মুখে দিচ্ছেন! উনার খাওয়ার ভঙ্গিটাও খুব আকর্ষণীয়। ফুচকা মুখে দেওয়ার সময় উনার ঠোঁটটা একটু গোল হচ্ছে, আর টকের কারণে চোখটা সামান্য কুঁচকে যাচ্ছে।
আমি ফুচকা খাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু আমার মুখে কোনো স্বাদ লাগছে না। আমার মাথার ভেতর তখনো হিসাব-নিকাশ চলছে।

ফুচকা খাওয়া শেষ হলো। আমরা আরও কিছুক্ষণ লেকের পাড় ধরে হাঁটলাম। টুকটাক কথা হলো। সাহিত্য, ঢাকা শহরের পরিবেশ, আর আনিকার নতুন উপন্যাসের প্লট নিয়ে। আমি খুব মেপে মেপে কথা বলছিলাম। হাঁটতে হাঁটতে খেয়াল করলাম, চারপাশটা বেশ অন্ধকার হয়ে এসেছে। আমি ঘড়ি দেখলাম। সন্ধ্যা সাতটার ওপরে বাজে।

আমি থমকে দাঁড়ালাম।

"আনিকা," আমি গলা পরিষ্কার করে বললাম। "অনেকক্ষণ তো হলো। আজ তো ধানমন্ডি পর্যন্ত চলেই এলাম। আপনি বরং এবার বাসায় যান। আমিও মেসের দিকে ফিরে যাই।"

আনিকা হাঁটা থামিয়ে আমার দিকে ঘুরলেন। উনার কপালের ঠিক মাঝখানে একটা সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল। "চলে যেতে চাচ্ছেন?" উনি একটু অবাক গলায় জিজ্ঞেস করলেন। আমি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললাম, "থেকেই বা কী হবে? রাত তো হচ্ছে।"

"থেকে কী হবে মানে?" আনিকা উনার ভ্রু জোড়া ওপরের দিকে তুলে বললেন। "ম্যাচটা শেষ করবেন না?"

আমি আনিকার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম। ম্যাচ! মেটাফোরটা খুব সুন্দর। কিন্তু আমি এখন আর কোনো মেটাফোরের মুডে নেই। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, "ম্যাচ দিয়ে কী হবে আনিকা? হাফ টাইমে প্রতিপক্ষ গোল দিয়ে বসে আছে। আমি এক গোলে পিছিয়ে। আর এদিকে সেকেন্ড হাফের শুরুতেই আমার মূল স্ট্রাইকার রেড কার্ড পেয়ে মাঠের বাইরে। খেলবে কে?" আমার এই নিখুঁত ফুটবল মেটাফোর শুনে আনিকার ঠোঁটের কোণে আবার সেই রহস্যময় হাসিটা ফিরে এল।

উনি আমার দিকে এক কদম এগিয়ে এলেন। "মূল স্ট্রাইকার রেড কার্ড পেয়েছে কে বলল আপনাকে? রেফারি তো এখনো বাঁশি বাজায়নি। সে হয়তো ফাউল করেছে, কিন্তু রেফারি তো তাকে শুধু একটা ওয়ার্নিং দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে।"

"লাভ নেই," আমি মাথা নেড়ে বললাম। "ওই স্ট্রাইকারের আর খেলার মতো মোরাল নেই। সে ডিমোরালাইজড হয়ে গেছে। মাঠের বাইরে বসে থাকাই তার জন্য সেফ।"

"কিন্তু বাকি প্লেয়াররা তো আছে," আনিকা নাছোড়বান্দা। "নব্বই মিনিটের খেলায় যেকোনো কিছু হয়ে যেতে পারে রাশেদ। ফুটবল তো আর অঙ্কের নিয়মে চলে না। একটা লাস্ট মিনিটের কর্নার কিক, একটা পেনাল্টি— পুরো ম্যাচের রেজাল্ট ঘুরিয়ে দিতে পারে। আপনি এত সহজে হাল ছেড়ে দিচ্ছেন কেন? এ গুড ম্যানেজার নেভার গিভস আপ।"

"আমি ম্যানেজার না আনিকা। আমি একজন সাধারণ দর্শক। গ্যালারিতে বসে খেলা দেখতে এসেছিলাম, ভুল করে মাঠে নেমে পড়েছি। এখন বুঝতে পারছি, এই মাঠ আমার জন্য না। এখানকার ঘাস খুব পিচ্ছিল। স্টাডওয়ালা বুট ছাড়া এখানে দৌড়াতে গেলে শুধু আছাড়ই খেতে হবে।"

আমরা দুজন লেকের পাড়ে দাঁড়িয়ে ফুটবল নিয়ে এই অদ্ভুত, ডাবল-মিনিংয়ের আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। আনিকা খুব এনজয় করছিলেন। উনার চোখে একটা ঝিলিক মারছিল। "হুম," আনিকা কিছুক্ষণ চুপ থেকে একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলার ভান করলেন। "ঠিক আছে। আপনি যখন মেনেই নিয়েছেন যে আপনি হেরে গেছেন, তাহলে যান। কী আর করার। হারু পার্টিদের তো আর জোর করে মাঠে নামানো যায় না।"

আমি একটু আহত হলাম। পুরুষ মানুষের ইগো বড় অদ্ভুত জিনিস। সে নিজে যখন হার স্বীকার করে, তখন তার গায়ে লাগে না; কিন্তু একজন নারী যখন তাকে 'হারু পার্টি' বলে, তখন তার বুকের ভেতর একটা সুপ্ত জেদ জেগে ওঠে।

আনিকা বললেন, আচ্ছা যেতে চান যান। আমি আর জোর করে কীভাবে আটকাব। আমাকে অন্তত বাসায় পৌঁছে দেন। এটুকু দাবি তো আমার আছে নাকি? আমি চুপচাপ রইলাম কিছুক্ষণ। তারপর বললাম, চলেন।

রাত সাড়ে নয়টা।

আমরা আনিকার ফ্ল্যাটের সামনে এসে দাঁড়ালাম। আনিকা উনার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে চাবি বের করে দরজা খুললেন। আমরা ভেতরে ঢুকলাম। ফ্ল্যাটের ভেতরটা গত রাতের মতোই নিস্তব্ধ। সেন্ট্রাল এসির ঠান্ডা বাতাস, স্পটলাইটের মায়াবী আলো, আর সেই বিশাল লেদার সোফা। আনিকা উনার কার্ডিগানটা খুলে সোফার একপাশে রাখলেন। উনার কালো ব্লাউজের উন্মুক্ত পিঠটা আবার আমার চোখে পড়ল। উনি আমার দিকে ঘুরলেন।

"কোনো নাটক করবেন না। আজ রাতে এখানেই থাকবেন। রাতে অনেক কথা আছে।" আনিকা খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন।
"থাকতেই হবে?" আমি একটু নার্ভাস গলায় জিজ্ঞেস করলাম।
"অফকোর্স। আপনি আপনার গেস্টরুমে গিয়ে চেঞ্জ করে আসুন। আমিও চেঞ্জ হই। তারপর আড্ডা হবে।"

"ওহ, বাই দ্য ওয়ে রাশেদ," আনিকা হঠাৎ পেছন থেকে ডাকলেন। আমি থমকে দাঁড়ালাম। ঘাড় ঘুরিয়ে উনার দিকে তাকালাম। আনিকা সোফায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। উনার দুই হাত বুকে ক্রস করা। উনার ঠোঁটে সেই রহস্যময়, আবেদনময়ী হাসি।

"আজকে রাতে আপনার জন্য সারপ্রাইজ আছে," আনিকা খুব ধীর লয়ে বললেন।
"কী সারপ্রাইজ?"
"আমি আসার সময় ইংল্যান্ডের কিছু স্পেশাল ড্রিংকস এনেছিলাম। আজকে আপনাকে খাওয়াব।"

কথাটা শোনার পর আমার মনে হলো, আমার মাথার ওপর একটা বাজ পড়ল। মদ খাব! মানে আমি সিগারেট টানি, সে ঠিক আছে, তাই বলে মদ খাব! আমি হতভম্ব ভাবটা কাটানোর জন্য একটু হাসার চেষ্টা করলাম। আনিকা হাসলেন না। উনার চোখের দৃষ্টি... আমি একটা ঘোরের মধ্যে গেস্টরুমের দিকে এগোতে লাগলাম।


মানুষের জীবনে কিছু কিছু মুহূর্ত আসে, যখন তার ভেতরের সমস্ত যুক্তিবাদ, সমস্ত দর্শন, এবং সমস্ত ভয়ভীতি একটা সুইচ অফ করার মতো বন্ধ হয়ে যায়। ঘড়ির পেন্ডুলাম থেমে যায়। পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ শক্তি যেন তার নিয়ম পাল্টে ফেলে।

আমি গেস্টরুমের বিছানায় একটা জড় পদার্থের মতো বসে আছি। আমার ডান হাতে এখনো সেই শপিং ব্যাগটা ধরা, যেটার ভেতর আনিকা নাওহারের কিনে দেওয়া 'জার্সি' রাখা আছে। আমার চোখ মেঝের দিকে স্থির। কিন্তু আমার কান দুটো খাড়া হয়ে আছে মাস্টার বেডরুমের দিকের করিডোরের দিকে।

পুরো ফ্ল্যাটটা শ্মশানের মতো নিস্তব্ধ। আর সেই নিস্তব্ধতার বুক চিরে খুব স্পষ্ট, খুব একটানা একটা শব্দ আমার কানে এসে আছড়ে পড়ছে।

ঝিরঝির... ঝমঝম...

পানির শব্দ। বাথরুমের শাওয়ার চলার শব্দ। সাধারণত বাথরুমের শাওয়ার চলার শব্দ পৃথিবীর সবচেয়ে ম্যাড়ম্যাড়ে এবং বিরক্তিকর একটা শব্দ। মেসে সকালে যখন আমি বাথরুমের বাইরে তোয়ালে কাঁধে দাঁড়িয়ে থাকি, আর ভেতর থেকে তুহিন বা রাজুর গোসলের পানির শব্দ আসে, তখন আমার মেজাজ চরমে ওঠে। মনে হয়, ব্যাটা ভেতরে কি পুকুর খুঁড়ছে নাকি!

কিন্তু আজ... এই ধানমন্ডির ষোলো তলা বিল্ডিংয়ের সাত তলার ফ্ল্যাটে, রাত দশটার দিকে, আনিকা নাওহারের বেডরুম থেকে ভেসে আসা এই শাওয়ারের শব্দটা আমার কাছে কোনো সাধারণ শব্দ মনে হচ্ছে না। এটা যেন গ্রিক পুরাণের সেই সাইরেনদের গান। যে গান শুনলে নাবিকরা দিকভ্রান্ত হয়ে জাহাজ নিয়ে পাথরে আছড়ে পড়ত।

আমার মাথার ভেতর একটা ক্যালকুলেটর খুব দ্রুত কিছু হিসাব মেলাতে শুরু করল। আনিকা আমাকে গেস্টরুমে পাঠালেন জার্সি চেঞ্জ করার জন্য। উনি নিজে গেলেন উনার মাস্টার বেডরুমে। এখন আমি উনার বাথরুমের শাওয়ার চলার শব্দ এত স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি কীভাবে?

লজিক খুব সোজা। সেন্ট্রাল এসি চলা এই বিশাল ফ্ল্যাটের দরজাগুলো বেশ ভারী কাঠের তৈরি। দরজা বন্ধ থাকলে শব্দ বাইরে আসার কথা না। তার মানে, আনিকা উনার বেডরুমের দরজা ভেজিয়ে রাখেননি, পুরোপুরি খোলাই রেখেছেন। শুধু বেডরুমের দরজাই নয়, উনার বেডরুমের ভেতরে যে অ্যাটাচড বাথরুম, সেটার দরজাও নিশ্চয়ই খোলা বা অর্ধেক ভেজানো। তা না হলে পানির পতন-শব্দ এত তীক্ষ্ণভাবে আমার কান পর্যন্ত পৌঁছাত না।

একজন নারী, যিনি একা থাকেন, তিনি বাথরুমে শাওয়ার নিচ্ছেন, অথচ তার বেডরুম এবং বাথরুমের দরজা লক করা তো দূরের কথা, খোলাই রেখে গেছেন— এর মানে কী? আমি সারাজীবন মানুষের খবর, মানুষের ভাষা অনুবাদ করে এসেছি। আজ কি আমি একজন নারীর এই নীরব ইশারার ভাষা অনুবাদ করতে পারব না?

কোনো ভুল নয়। কোনো অসতর্কতা নয়। সরাসরি, বন্য এবং আদিম আমন্ত্রণ।

আমার বুকের স্পন্দন ড্রামের মতো বাজতে শুরু করল। হাতের তালু ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। আমি শপিং ব্যাগটা বিছানার ওপর ফেলে দিলাম। আমি একটা গভীর শ্বাস নিলাম। অনেক হয়েছে! অনেক লজিক, অনেক ফিলোসফি, অনেক ভদ্রতার মুখোশ পরে থেকেছি। অনেক ফুটবল আর জার্সির মেটাফোর কপচেছি। আর না।

"যা আছে কপালে!" আমি বিড়বিড় করে উচ্চারণ করলাম।

আমাদের দেশের মানুষের এই একটা বাক্যের ভেতর যে কী পরিমাণ পারমাণবিক শক্তি লুকিয়ে আছে, সেটা বিজ্ঞানীরা এখনো আবিষ্কার করতে পারেননি। মানুষ যখন দেয়ালের পিঠ ঠেকে যায়, যখন সে সমস্ত ভয় আর যুক্তির সীমানা পার হয়ে যায়, তখন সে এই একটা বাক্য উচ্চারণ করে ঝাঁপ দেয়। "যা আছে কপালে!"

আমি বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালাম।

আমার পরনে এখনো সেই সারাদিন অফিস আর মেলায় ঘুরে বেড়ানো ধুলোমাখা প্যান্ট আর শার্ট। আমি কাপড় বদলানোর কোনো প্রয়োজন বোধ করলাম না। খুব ধীর পায়ে, নিঃশব্দে আমি গেস্টরুম থেকে বেরিয়ে করিডোরে এসে দাঁড়ালাম। সামনেই আনিকা নাওহারের মাস্টার বেডরুম। দরজাটা সত্যিই হাঁ করে খোলা।

আমি দরজার ফ্রেমে হাত রেখে উঁকি দিলাম। পুরো বেডরুমটা অন্ধকার। বেডরুমের কোনো লাইট জ্বালানো নেই। কিন্তু ঘরের ঠিক বাঁ কোণায় যে অ্যাটাচড বাথরুমটা, তার দরজাটা অর্ধেক খোলা। আর সেই বাথরুমের ভেতর থেকে একটা মায়াবী, ওয়ার্ম-হোয়াইট (Warm-white) আলো বেরিয়ে এসে অন্ধকার বেডরুমের মেঝেতে একটা সোনালি আলোর পথ তৈরি করেছে।

আমি একটা ঘোরের মধ্যে সেই আলোর পথ ধরে বেডরুমের ভেতর পা রাখলাম। আমার পায়ের নিচে নরম কার্পেট। কোনো শব্দ হচ্ছে না। আমি বাথরুমের দরজার ঠিক বাইরে এসে দাঁড়ালাম। অর্ধেক খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে তাকাতেই আমার শরীরটা যেন এক মুহূর্তের জন্য জমে পাথর হয়ে গেল। আমার চোখের সামনে তখন যে দৃশ্যটা উন্মোচিত হলো, সেটা স্বর্গের কোনো অপ্সরী বা স্বর্গের কোনো জলকেলির দৃশ্যের চেয়েও হাজার গুণ বেশি সুন্দর, বেশি আদিম এবং বেশি নেশাধরা।

বিশাল বাথরুম। একপাশে একটা গ্লাস-পার্টিশন দেওয়া শাওয়ার কিউবিকল। সেই গ্লাসের দরজাটা সামান্য খোলা। আর মাথার ওপরের বিশাল রেইন-শাওয়ার (Rain-shower) থেকে অঝোর ধারায় পানি ঝরছে। সেই পানির নিচে দাঁড়িয়ে আছেন আনিকা নাওহার। উনার শরীরে সুতোর লেশমাত্র নেই। উনি আমার দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।

আমি মুগ্ধ, বাকরুদ্ধ এবং সম্মোহিত হয়ে উনার শরীরের সেই ঐশ্বরিক জ্যামিতি দেখতে লাগলাম। রেইন-শাওয়ারের পানি উনার মাথার ঘন, কালো চুলের ওপর আছড়ে পড়ছে। ভিজে যাওয়া চুলগুলো উনার ফর্সা, মসৃণ পিঠের ওপর সাপের মতো লেপ্টে আছে। পানির ফোঁটাগুলো উনার ঘাড় বেয়ে, পিঠের সেই নিখুঁত মেরুদণ্ডের খাঁজ ধরে আস্তে আস্তে নিচের দিকে নামছে।

উনার পিঠের দুপাশের পেশিগুলো সামান্য নড়াচড়া করছে। পানি গড়িয়ে নামছে উনার সরু কোমরে। এবং তারপর... পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে আকর্ষণীয় দৃশ্যটা আমার চোখের সামনে ধরা দিল। উনার সরু কোমর যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকেই শুরু হয়েছে উনার নিতম্বের সেই অবিশ্বাস্য, মোহনীয় বাঁক। যেন প্রকৃতির নিপুণ হাতে গড়া দুটো নিখুঁত, সুডৌল পাহাড়। পানির ধারা উনার কোমর থেকে গড়িয়ে সেই দুই পাহাড়ের ওপর আছড়ে পড়ছে। তারপর সেই পানি দুই পাহাড়ের মাঝখানের যে গভীর গিরিখাত, সেই গিরিখাত দিয়ে অত্যন্ত ধীর এবং কামনার্ত গতিতে গড়িয়ে নিচের দিকে নামছে।

গিরিখাত বেয়ে সেই পানি নেমে আসছে উনার ফর্সা, মসৃণ উরুর পেছন দিকে। তারপর উরুর মাংসপেশি বেয়ে, হাঁটুর পেছন হয়ে, পায়ের গোড়ালি ছুঁয়ে বাথরুমের ফ্লোরে এসে আছড়ে পড়ছে। আমি শ্বাস নিতে ভুলে গেছি। আমার মনে হচ্ছে, আমি যদি এখন মরেও যাই, আমার কোনো আক্ষেপ থাকবে না। একজন পুরুষ তার জীবনে এর চেয়ে বেশি সুন্দর, এর চেয়ে বেশি উত্তেজক দৃশ্য আর কী দেখতে পারে?

বাথরুমের ভেতর একটা দামি শাওয়ার জেলের সুগন্ধ আর হালকা গরম পানির বাষ্প মিলেমিশে একটা মাতাল করা পরিবেশ তৈরি করেছে। আমি আর নিজেকে আটকাতে পারলাম না। আমার ভেতরের সেই রাশেদ আহমেদ পুরোপুরি মরে গেছে। সেখানে এখন জন্ম নিয়েছে এক বন্য, তৃষ্ণার্ত আদিম মানব।

আমি আমার শার্ট-প্যান্ট পরা অবস্থাতেই, পায়ে জুতো নিয়েই বাথরুমের ফ্লোরে পা রাখলাম।
Reply


Messages In This Thread
দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:51 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:52 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:52 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:53 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:54 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:54 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:55 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:55 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:26 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:27 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:28 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:55 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:56 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:57 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:58 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:58 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 08:58 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 08:59 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:00 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:01 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:02 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:03 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:06 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:07 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:08 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:08 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:09 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:10 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:12 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:13 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:14 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:16 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:17 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:17 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:18 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:20 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:22 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:23 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:25 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:25 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:26 AM

Forum Jump:


Users browsing this thread: 1 Guest(s)