09-01-2026, 10:44 AM
08
হাইকোর্টের সামনের চত্বরটি যেন এক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।তীব্র রোদকে উপেক্ষা করে চারিদিকে মানুষের ভিড়। জগু—যাকে ঘিরে গত কয়েক মাস ধরে শহরজুড়ে আতঙ্ক, সে আজ জামিনে মুক্তি পেয়েছে। তার দলবল হাইকোর্টের গেটের সামনেই উল্লাস করছে, সাধারণ পথচারীদের ওপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে। আসিফ এবং ফারিশের বাকি বিশ্বস্ত পুলিশ অফিসাররা অসহায় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। ওপর মহলের চাপে তাদের হাত-পা বাঁধা। করার কিছুই নেই। জগুর উদ্ধত হাসি আর তার সহযোগীদের উল্লাসে এক অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করেছে।ঠিক তখনই একটি কালো গাড়ি এসে তীব্র শব্দে ব্রেক কষল। গাড়ি থেকে নামল ফারিশ নওয়ান। তার পরনে কালো স্যুট, চোখে দামি সানগ্লাস, আর মুখে বরাবরের মতো গম্ভীর এক কঠোর ভাব। তাকে দেখামাত্রই অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের ঝাঁক ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ল।
"ফারিশ সাহেব! জগু তো ছাড়া পেয়ে গেল, আইনের কি তবে পরাজয় হলো?"
"আপনি কি মনে করেন জগুকে আটকানো আর সম্ভব নয়?"
একের পর এক তীক্ষ্ণ প্রশ্নে ফারিশের কপালে বিরক্তির ভাজ পরল। তার মেজাজ এমনিতেই সপ্তমে চড়ে আছে, তার ওপর এই সাংবাদিকদের বিরক্তিকর চিৎকার। সে উত্তর দেওয়ার জন্য ঠোঁট খুলতেই জগুর বিদ্রূপাত্মক কণ্ঠস্বর ভিড় ঠেলে ভেসে এল।
"হ্যালো লয়ার ফারিশ নওয়ান! খবর কী আপনার? বেশ তো বুক ফুলিয়ে বলেছিলেন আমায় জেলে পচাবেন, তা শাস্তিটা কি হলো স্যার? জেলের ভাত তো আমার নসিব হলো না!"
জগু তার দলবল নিয়ে এগিয়ে এল ফারিশের ঠিক সামনে। তার চোখে উপহাসের ঝিলিক। সাংবাদিকরা ক্যামেরা তাক করল এই চরম মুহূর্তে। ফারিশ বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। সে জগুর চোখের দিকে এক পলক তাকাল, তারপর খুব শান্ত অথচ শীতল গলায় বলল,
"শাস্তি এখনো শেষ হয়নি জগু। এটা কেবল একটা ছোট বিরতি।"
কথাটা শেষ করেই মুহূর্তের মধ্যে ফারিশ তার কোমরের পিস্তলটি বের করল। কোনো সতর্কবার্তা ছাড়াই সে সরাসরি জগুর ডান পায়ে লক্ষ্য করে ট্রিগার টিপল। ‘ঠাস!’—এক জোরালো শব্দে হাইকোর্ট প্রাঙ্গণ স্তব্ধ হয়ে গেল। গুলির আঘাতে আর্তনাদ করে জগু মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। তার পায়ের ক্ষত দিয়ে গলগল করে রক্ত ঝরছে। জগুর লোকরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ফারিশ তার বাঁ হাতের ইশারায় আসিফদের সংকেত দিল।আসলে আসার সময় ফারিশের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়ায়নি যে, জগুর সাঙ্গপাঙ্গরা কোমরে আগ্নেয়াস্ত্র লুকিয়ে রেখেছে। ফারিশ আসিফকে আগেই নির্দেশ দিয়েছিল যে, সাংবাদিক ও জনতার ভিড়ের আড়ালে কৌশলে তাদের নিরস্ত্র করতে হবে। ফারিশের বুদ্ধিতে আসিফরা সেই অসাধ্য সাধন করে ফেলেছে—এখন জগুর লোকরা অসহায়, তাদের হাতের বন্দুকগুলো গায়েব।ফারিশ এবার ধীর পায়ে জগুর কাছে এগিয়ে গিয়ে তার কলার চেপে ধরে টেনে তুলল। তার চুল শক্ত করে মুঠোয় বন্দি করে কানের কাছে পিস্তল ঠেকিয়ে ফারিশ গর্জে উঠল,
"তুই একটা শয়তান, জগু। তুই জানিস, আমি জানি, এমনকি এই দাঁড়িয়ে থাকা সাংবাদিকরাও জানে তুই খুনি। আমি যখন কোনো কেস হাতে নিই, তখন সেটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি থামি না।"
এর পরেই ফারিশ শুরু করল তার মারধর। মারের চোটে জগু তখন এক বিধ্বস্ত মানুষ। তার দলবল অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে—পিস্তলবিহীন তারা তখন ফারিশের এই অমানবিক রাগ দেখে ভয়ে আড়ষ্ট। ফারিশ যেন আজ আইনের মারপ্যাঁচ নয়, বরং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা করতে ব্যস্ত। জগু তখন যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে ফারিশের পায়ের কাছে গড়াগড়ি খাচ্ছে।তারপরই পুলিশ অফিসারের কাছে গিয়ে বলে,
"ক্ষমা করে দিন স্যার! আমি অপরাধী, আমি খুন করেছি! আমাকে ফাঁসি দিন, যা ইচ্ছা তাই করুন—কিন্তু এই মানুষটার হাত থেকে আমাকে বাঁচান! আর সহ্য হচ্ছে না!"
জগুর এই আর্তনাদ চারপাশের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো। উপস্থিত জনতার মাঝে এক অদ্ভুত স্তব্ধতা, তারপরই শুরু হলো প্রচণ্ড স্লোগান—"লয়ার ফারিশ নওয়ান জিন্দাবাদ!" ফারিশের সম্মানে চারপাশ কেঁপে উঠল।ফারিশ এবার নিজের টি-শার্টের কলারটা একটু ঠিক করে নিয়ে সাংবাদিকের ক্যামেরার দিকে তাকাল। তার চোখের দৃষ্টিতে তখন এক তেজ। সে শান্ত স্বরে বলল,
"দিস ইজ ফর জগুস সো কল্ড হাই-র্যাঙ্কিং বস—সাহস থাকলে এই ফারিশ নওয়ানের সামনাসামনি এসে শয়তানি করো। দেখি তুমি কত বড় শয়তান!"
কথাটা বলেই পিছনে একবারও না তাকিয়ে ফারিশ কোর্ট ভবনের ভেতরে ঢুকে গেল।
হসপিটালের লবি। বড় স্ক্রিনের টিভিটাতে তখন ফারিশ নওয়ানের সেই গর্জন প্রচারিত হচ্ছে। উপস্থিত ডাক্তার, নার্স আর রোগীরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে আছেন ফারিশের সেই দুঃসাহসিক অভিযানের দিকে। পুরো হসপিটালে এক পিনপতন নীরবতা। ঠিক সেই মুহূর্তেই আরিশার খুশির আর্তনাদ সেই নীরবতা খানখান করে দিল।
"জিও লয়ার সাহেব, জিও!! সাবাশ!"
মুহূর্তের মধ্যে চারপাশ থেকে একঝাঁক বিরক্ত দৃষ্টি আরিশার দিকে নিক্ষিপ্ত হলো। সবাই যেভাবে গভীর মনোযোগ দিয়ে টিভি দেখছিল, আরিশার এই আকস্মিক চিৎকারে তারা যেন ঘোর থেকে বাস্তবে ফিরে এল। লজ্জিত আরিশা নিজের ভুল বুঝতে পেরে দুই ঠোঁট চেপে ধরে এক কোণায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে পড়ল। তবে তার চোখেমুখে এখনো সেই হাসি ।মি. নাসির এক কোণায় দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি প্রথমে আরিশার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন, যেন আরিশার এই চঞ্চলতা তিনি বেশ উপভোগ করছেন। পরক্ষণেই তার দৃষ্টি টিভি স্ক্রিনে স্থির হলো। সেখানে ফারিশ তখন দৃঢ় পায়ে কোর্ট ভবনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মি. নাসিরের বুকটা গর্বে ফুলে উঠল। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল তার। ছেলে হিসেবে ফারিশ সবসময়ই এমন—অন্যায়ের সাথে আপস করা তার ধাতে নেই।ঠিক সেই সময়েই করিডোরের অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা লিজা স্ক্রিনে ফারিশের মুখটা দেখামাত্রই বিমোহিত হয়ে পড়ল। তার দুচোখে তখন এক অদ্ভুত আবেশ।
"ব্রো... আমি তো আবারও আমার লয়ারের প্রেমে পড়ে গেলাম!!"
লিজার কণ্ঠে এক ধরনের পাগলামি মেশানো মুগ্ধতা।পাশে থাকা নওরীন আর রুবেল লিজার দিকে তাকাল। লিজার এই অতি-নাটকীয়তায় রুবেল ভ্রু কুঁচকে বলে উঠল,
"প্রতি দুই সেকেন্ড পরপর একই ডাইলোগ দিস না তো! কানে লাগছে।"
"বেশি কথা বলছিস কিন্তু তুই, রুবেল!"
লিজা রুবেলের দিকে রেগে তাকাল।নওরীন পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে এবং ঝামেলা এড়াতে মাঝখানে কথা বলে উঠল,
"আচ্ছা, এখন এসব বাদ দে তো! ক্লাসের সময় হয়ে গেছে। সবাই অলরেডি ক্লাসে ঢোকা শুরু করেছে, চল দেরি হয়ে যাবে।"
নওরীনের কথায় আর তর্ক বাড়াল না লিজা। সে শেষবার টিভি স্ক্রিনের দিকে এক পলক তাকিয়ে, হাঁটা শুরু করল। তার পেছনে রুবেল আর নওরীন।
_________
বাড়ি ফেরা মাত্রই এক উৎসবের আমেজ। ড্রয়িং রুমে পা রাখতেই আয়ানের সেই স্বভাবজাত উচ্ছ্বাস,
"ওয়েলকাম, ওয়েলকাম! আমাদের হিরো লয়ার!"
ফারিশ হাসল। আয়ানকে ফারিশকে কাছে টেনে নিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।বাসার সবার সাথে অনেকক্ষণ কথা বলার পর ফারিশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
"আমি একটু ফ্রেশ হয়ে আসি, প্রচণ্ড টায়ার্ড লাগছে।"
সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতেই মি নাসিরের দুষ্টুমিমাখা কণ্ঠে বাধা পেল ফারিশ,
"হ্যাঁ, এখন টায়ার্ড লাগছে, কিন্তু উপরে গেলে আর টায়ার্ড লাগবে না!"
ফারিশ কথার অর্থ ঠিক বুঝতে পারল না। বাবার দিকে একবার ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে সে উপরে উঠে গেল। কিন্তু নিজের রুমের দরজায় হাত রাখতেই এক অদ্ভুত শিহরণ খেলল তার শরীর দিয়ে।
দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই সেই দৃশ্য! আরিশা তার রুমের ভেতরেই দাঁড়িয়ে, মুখে এক চিলতে মিষ্টি হাসি নিয়ে ফারিশের দিকে তাকিয়ে আছে। ফারিশের হৃৎপিণ্ড যেন ধক করে উঠল, মুহূর্তের জন্য তার শ্বাস-প্রশ্বাস থেমে যাওয়ার উপক্রম! সে কল্পনাও করেনি, এই মুহূর্তে আরিশাকে এখানে দেখতে পাবে।
"ওয়েলকাম, মিস্টার লয়ার!"
আরিশার কণ্ঠে এক অদ্ভুত মোহ।ফারিশের মুখে স্বাভাবিক কোনো কথা এল না। সে যেন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কিছুক্ষণ নীরবতার পর আরিশা নিজেই এগিয়ে এল,
"আজ তো আপনি পুরো ফাটিয়ে দিয়েছেন ফারিশ! ওই জগুটাকে যা ধোলাই দিয়েছেন না, জাস্ট অসাধারণ!"
নিজের প্রতি আরিশার এই মুগ্ধতা দেখে ফারিশের ভেতরে এক অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করল। সে বাঁকা হেসে দুষ্টুমির ছলে বলে উঠল,
"তা এত ভালো কাজের জন্য শুধু ওয়েলকাম? আয়ানের মতো জড়িয়ে ধরেও তো ওয়েলকাম করতে পারতে!"
সে জানত, আরিশার কাছে এমন আবদার অবান্তর। আরিশা কখনও এমন করবে না।সে মজা করেই কথাটা বলেছিল। কিন্তু পরক্ষণেই যা ঘটল, তাতে ফারিশের দুনিয়া যেন উল্টে গেল। আরিশা কোনো দ্বিধা না করে, এক পলকে এগিয়ে এসে ফারিশকে জড়িয়ে ধরল।
"আরে, আপনি তো এখন আমার জামাই। জড়িয়ে ধরাই যায়! আচ্ছা, আপনি ফ্রেশ হন, আমি গেলাম!"
বলেই এক ঝটকায় ফারিশকে ছেড়ে দ্রুত পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল আরিশা। ফারিশ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার শরীরের প্রতিটি শিরায় তখন বিদ্যুতের ঝিলিক। ‘জামাই’! শব্দটি তার কানে এখনো বাজছে। আর এই জড়িয়ে ধরাটা—এটা কি শুধুই উদ্দীপনা, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো অনুভূতি?নিজের মুখের ওপর দুহাত চাপা দিল ফারিশ। হৃদপিণ্ডের সেই তীব্র ধুকপুকানি যেন বুকের পাঁজর ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে। সে ধীরগতিতে দেয়ালের গায়ে ভর দিয়ে মেঝের ওপর বসে পড়ল।
"ওই শয়তানের হাড্ডি, আইডিয়া দে বলছি! কাল এনগেজমেন্ট, আর তুই কি না এখন আমার সাথে মশকরা করছিস? কিছু একটা উপায় বের কর, নইলে আমি শেষ!"
আরিশা শান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে হাত দুটো ভাঁজ করে বলল,
"আগে রেসপেক্ট দেও আয়ান ভাই! তারপর বুদ্ধির কথা ভাবা যাবে।"
আয়ান বাধ্য হয়েই দুই হাত জোড় করে এবার বলল,
"ওকে ওকে, আমার বোন, লক্ষ্মী বোন! এবার প্লিজ কিছু একটা কর। সত্যি বলছি, এই বিয়ে করার চেয়ে মরে যাওয়া ঢের ভালো!"
আয়ানের এই "মরে যাওয়ার" কথা শুনে আরিশার চোখের কোণে এক দুষ্টুমির ঝলক খেলে গেল। সে লাফিয়ে উঠে বলল,
"রাইট! রাইট! ঠিক ধরেছো! তুমি মরে যাবে—এটাই তো সেরা সলিউশন!"
আরিশার এই অস্বাভাবিক উত্তেজিত মন্তব্য শুনে আয়ান এক পা পিছিয়ে গেল। তার বুকটা ধক করে উঠল।
"আরে ভাই, আমি তো মজা করছিলাম! তুই এত সিরিয়াসলি কেন নিচ্ছিস?"
আরিশা এবার এক রহস্যময় হাসি হেসে বলল,
"আরে আয়ান ভাই, তুমি কি সত্যিই মরবে নাকি? আমি তোমাকে বলছি সুইসাইড করার নাটক করতে! বিষয়টা ভেবে দেখো— বাসায় কেউ তোমার কথা কানেই তুলছে না। কিন্তু তুমি যদি সুইসাইড করার নাটক করে সবাইকে ব্ল্যাকমেইল করতে পারো, তবে তারা তোমার কথা শুনতে বাধ্য! ভয় পেয়ে সবাই বিয়ে বাতিল করে দেবে।"
আয়ান কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মাথায় বুদ্ধিটা বেশ খেলেছে! সে কিছুটা ইতস্তত করে বলল,
"আসলেই কি কাজ হবে?"
আরিশা আত্মবিশ্বাসের সাথে চোখের পলক ফেলে বলল,
"হান্ড্রেড পার্সেন্ট! তুমি শুধু আমার প্ল্যান অনুযায়ী কাজ কর। "
১০মিনিট পর____
" আয়ান ভাই কেউ আসছে, কাজে লেগে পরো!! "
" এই আরিশা, যদি সত্যিই মরে যাই!! "
" আরে দুই একবার মরলে কিছু হবে না। ক্যারি অন!! "
আরিশার কথায় আয়ান এবার চেয়ার থেকে নামে।
" দুই একবার মরলে কিছু হবে না মানে?? এই তোকে খুব একটা সুবিধার লাগছে না!! আমি গেলাম!! "
" আমার ফেন্ডকে বুঝি বিয়ে করার খুব ইচ্ছে?? "
আরিশা শয়তানি হাসি দিয়ে বলে। আয়ান গিয়ে পুনরায় চেয়ারে উঠে দাঁড়ায়।
" ওকে আমি গেলাম। কেউ আসছে!! "
কথাটা বলেই আরিশা চলে যায়। মিসেস ফাতেমা তখন রুমে আসে। সুযোগ বুঝে আয়ানও তখন ওড়নাটা ফ্যানে ঝুলায়।
" মাশআল্লাহ,আয়ান। তুই ফ্যান পরিষ্কার করছিস?? আজ সূর্য কোনদিকে উঠল। আচ্ছা ভালো, ভালো করে পরিষ্কার কর!! "
মিসেস ফাতেমার কথায় আয়ান আকাশ থেকে পরে। কিছু বলার আগেই এবার তার মায়ের রাগি কন্ঠ ভেসে আসে।
" আমার নতুন ওড়নাটা তবে তুই নিয়েছিস শয়তান!! দাঁড়া, এটা দিয়ে ফ্যান পরিষ্কার করা হচ্ছে?? "
আয়ানের মা তেড়ে যেতেই আয়ান চেয়ার থেকে নামে। কিসের সুইসাইড কিসের কি!! ভয়ে এক দৌড়ে ফারিশের রুমে গিয়ে থামে!! সেখানে আরিশাকে দেখেই রেগে উঠে আয়ান,
" শয়তানের শয়তান!! এই তোর আইডিয়া!! তোরে?!! "
আয়ান তেড়ে যেতে গেলেই আরিশা ভয়ে পিছিয়ে যায়। আর তখনই টেবিলের কফির কাপ থেকে কফি ফারিশের ফাইলে পরে।
" আয়ান ভাই, এটা তুমি কি করলে। মাইগ্রেন তো আমাদের আর ছাড়বে না!! "
" আমি করেছি মানে, তুই করেছিস এটা!! "
তাদের কথার মাঝেই ওয়াশরুম এর দরজা খোলার শব্দ পায়।
" যদি, যদি তুমি বলেছো এটা আমি করেছি তবে তোমাকে আমি ইনায়ার দাদীর সাথে বিয়ে দিব। উনি আরও বড় ডাইনি!! আর আঙ্কেল মানে তোমার বাবার হাতে বকা আর ফারিশের হাতে মার খাওয়াবো। আর... "
আরিশার হুমকির চোটে আয়ান শেষ। ফারিশ এবার বের হয়েই কপাল কুচকে আয়ান আর আরিশার দিকে তাকায়। দুটো আবারও একসাথে। সদ্য গোছল করে বের হওয়ার মাথা কিছুটা ঠান্ডা থাকলেও নিজের ফাইলের বারোটা বাজানো দেখে মাথা গরম হয় তার।
" আয়ান ভাইকে কিছু বলবেন না প্লিজ!! "
আরিশা তুতলিয়ে বলে। ফারিশ এবার আরিশার দিকে এগিয়ে এসে বলে,
" একজন লয়ারকে শিখাচ্ছো কে দোষী!! "
আয়ান এবার শুকনো ঢোক গিলে ফারিশের সামনে আসে ।
" আমাকে যা খুশি কর তুই কিন্তু আরিশাকে বকিশ না প্লিজ। "
এমনিতেই মাথা গরম তার উপর আয়ানের আরিশার প্রতি এই আলগা পিরিত দেখে আরও মাথা গরম হয় ফারিশের।সে আয়ানের দিকে এগোতে এগোতে ফিসফিসিয়ে বলে,
" ওর প্রতি তোর এতো দরদ কিসের!! আমার আরুর প্রতি দরদ আমি দেখাব। তোর এতো দরদ কিসের?? "
ফারিশের কথায় ভয় ভুলে আয়ান এবার হাসে।
" আমার আরু!! ব্যাপার কি ব্রো?? কেমন জানি রহস্য রহস্য গন্ধ পাচ্ছি!! "
" কথা ঘুরোনোর চেষ্টা করছিস!! "
কথাটা বলেই ফারিশ এবার আয়ানকে মারতে থাকে। অপরদিকে তাদের কথপোকথন না শুনলেও এই দৃশ্য দেখে আরিশা হেসে উঠে। আরিশার হাসির শব্দে ফারিশ এবার তার দিকে তাকায়। নিজেকে যথেষ্ট শান্ত রাখার চেষ্টা করেও রাগি চোখে আরিশার দিকে তাকিয়ে ধমকিয়ে উঠে,
" আরিশা!! "
ব্যাস। ফারিশের ধমক খেয়ে ঠোঁট উল্টে ছলছল চোখে শব্দ করে কান্না শুরু করে আরিশা।
" অ্যা......... অ্যা........ অ্যা.......... "
প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে, কিন্তু আরিশার কান্নার বিরাম নেই।তার কান্নার শব্দ পুরো বাড়ি জুড়ে।ফারিশ কয়েকবার তার কাছে গিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছে, কিন্তু আরিশা বলতে নারাজ। মিসেস ফাতেমা কোনো উপায়ান্তর না দেখে আরিশাকে বুকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, আরিশার কান্নার মাঝেই হঠাৎ হঠাৎ এক চিলতে হাসি ফুটে উঠছে। সে আয়ানের মার খাওয়ার সেই দৃশ্যটা মনে করে হাসছে, আর পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে আবার জোরে কাঁদতে শুরু করছে। এই অদ্ভুত আচরণ দেখে আয়ান নিজেও হতভম্ব হয়ে এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে। ফারিশের অবস্থা তখন বড্ড করুণ। সে প্রচণ্ড অপরাধবোধে ভুগছে।অবশেষে সে আরিশার কাছে যেতে সক্ষম হলো। আরিশা তখনো অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। ফারিশ আলতো করে আরিশাকে নিজের দিকে ঘোরাল। আরিশার ভেজা চোখ হাত দিয়ে মুছিয়ে দিতে দিতে ফারিশের কণ্ঠে এক দারুণ মলিন সুর—
"সরি আরু, রিয়েলি সরি! মাথাটা ঠিক ছিল না, রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। প্লিজ, কান্না থামাও!"
আরিশা চুপচাপ। ফারিশ এবার একটু ঝুঁকে আরিশার চোখের দিকে তাকিয়ে আবারও ফিসফিস করে বলল,
"সরি আরু, প্লিজ!"
আরিশা ধীরলয়ে ফারিশের দিকে তাকাল।ফারিশ এক চিলতে হেসে আরিশার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল।
"তোমার জন্য একটা জিনিস এনেছি, দেখবে না?"
আরিশার চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে মাথা নাড়ল। ফারিশ হেসে বলল,
"তাহলে চলো!"
ফারিশ আরিশার হাত ধরে রুমের বাইরে নিয়ে যেতে শুরু করল। পুরো দৃশ্যটা দেখে আয়ান তো হা করে তাকিয়ে আছে। সে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না—এ কী হলো? ফারিশ নওয়ানের মতো মানুষ নিজে থেকে সরি বলছে?আরে কার সরি বলার কথা ছিল আর কে বলল!
যাবার সময় আরিশা একবার আয়ানের দিকে ঘুরে তাকাল। তার চোখের কোণে তখনো অশ্রু, কিন্তু ঠোঁটের কোণে বিজয়ের হাসি। আয়ানকে ইশারায় সে বুঝিয়ে দিল—"দিস ইজ কল্ড রিভার্স টেকনিক!"আয়ান সত্যিই আবারও আরিশার ফ্যান হলো। নাহ এই মেয়ের সাথে কেউই পারবে না। আয়ান এবার নিচে যাচ্ছিল ঠিক তখনই ইনায়ার কল আসে।
" হ্যালো!! "
" সোজা বাংলায় বলছি সোজা বাংলায় উত্তর দিবেন। এখন আপনি কোথায়!! "
" বাসায়!! "
আয়ান অবাক হয়ে উত্তর দেয়।
" বাসার ঠিক কোন যায়গায়?? "
" বাগানে যাচ্ছি!! "
" গুড!! "
ইনায়া ফোনটা কাটে। সব প্রস্তুতি নিয়ে হেসে বলে,
" আয় না আয়, আজ যাস্ট একবার আয়!! তোর একদিন কি আমার একদিন!! "
অপরদিকে আয়ানকে হঠাৎ উপর থেকে মি নাসির ঢেকে উঠে। আয়ান সোফায় বসা তার বাবার দিকে তাকিয়ে বলে,
" ড্যাড, গার্ডেনে গাড়ির চাবিটা ফেলে এসেছি। একটু আনতে পারবে প্লিজ। আমি আঙ্কেলের কাছে গেলাম!! "
মি নাভান ছেলের কথায় সায় দিয়ে গার্ডেনে যায়।
( কেমন হয়েছে বলো! ??)
