09-01-2026, 10:45 AM
09
বাগানে অন্ধকার ভালোই নেমেছে। মি. নাভান বাগানের দিকে এগিয়ে গেলেন। আজ কেন জানি বাগানটা অস্বাভাবিক অন্ধকার লাগছে। তিনি বিরক্তির সাথে বিড়বিড় করলেন,
"কিরে, আজ বাগানের লাইটগুলো দেওয়া হয়নি?? এত অন্ধকার কেন?"
হঠাৎ মি নাভান শুনতে পেল ভারী বুটের শব্দ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক ঝটকায় তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল কেউ! চোখের পলকে মি. নাভানের মাথায় একটা ভারী বস্তা ঢুকিয়ে সেটা শক্ত করে আটকে দিল আক্রমণকারী। মি. নাভান অন্ধকারে কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না, দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম।ইনায়া তখন উত্তেজনায় কাঁপছে। ওড়নাটা মুখের ওপর শক্ত করে পেঁচিয়ে, কণ্ঠস্বর ভরাট করে ধমক দিল,
"করবি করবি আর বিয়ে! আজ তোর এই বিয়ের শখ চিরতরে মিটিয়েই ছাড়বো!"
বস্তার ভেতর থেকে মি. নাভানের আর্তনাদ ভেসে এল,
"আরে কে ভাই তুই? আরে ছাড়! কী করছিস এসব?"
ইনায়া যেন কোনো কথা কানেই তুলল না। সে এবার বস্তাবন্দি মি. নাভানের পিঠে ধুমধাম কিল-ঘুষি মারতে মারতে বলল,
"নেহি ছাড়ুঙ্গি! বল, আর বিয়ে করবি? শখ কত বড়!"
মি. নাভান তখন ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়ে ভাঙা গলায় চিৎকার করছেন,
"আরে ভাই, আমি আবার কেন বিয়ে করতে যাব? আমি তো অলরেডি ম্যারিড! আমার বউ ঘরে আছে!"
ইনায়ার চোখ তখন চড়কগাছে!
"ওহ মোর আল্লাহ! বিবাহিত হয়েও আবার বিয়ে করার শখ? দাঁড়া, তোর এই শখ আজ পিটিয়ে বের করছি!"
ইনায়া এবার যেন নতুন উদ্যমে বস্তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। মি. নাভানের তখন অবস্থা কাহিল।
"আল্লাহ রে! আজকাল দেখছি বিয়ে করেও শান্তি নেই! কোথা থেকে কোন শয়তান এসে যে আক্রমণ করে বসলো!"
"একে তো বিয়ে করার সাহস করেছে, তার ওপর আবার বড় বড় কথা!"
ইনায়ার গলার স্বর রাগে কাঁপছিল। সে বস্তাটিকে ধরে ঝাকাতে শুরু করল। বস্তার ভেতরে থাকা মি. নাভানের অবস্থা তখন দফারফা।ঠিক তখনই কারোর পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। মি. নাসিরের গম্ভীর কণ্ঠস্বর নিস্তব্ধতাকে চিরে ভেসে এল,
"আরে, এত অন্ধকার কেন? কেউ নেই নাকি এখানে?"
মি. নাসিরের উপস্থিতি টের পেয়েই ইনায়ার হুঁশ ফিরল। সে ভয়ংকর রকমের ভড়কে গেল। তড়িঘড়ি করে বস্তাটি ছেড়ে সে অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে ঝোপের আড়ালে গিয়ে নিজেকে আড়াল করল। মি. নাসির বাগানের বাতিগুলো জ্বালালেন। তীব্র আলোয় চারপাশ ঝলমলিয়ে উঠল। কিন্তু চোখ তুলতেই মি. নাসিরের হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। সামনেই পড়ে আছে একটি বিশাল বস্তা, যা নিজের জায়গা থেকে অদ্ভুতভাবে নড়ছে।
"লা হাওলা ওয়ালা কুয়াতা ইল্লা বিল্লাহ!"
মি. নাসির আতঙ্কে কয়েক কদম পিছিয়ে গেলেন। কাঁপাকাঁপা গলায় তিনি বিড়বিড় করলেন,
"বস্তা এভাবে ডান্স করছে কেন? নির্ঘাত... নির্ঘাত কোনো জিন-ভূত এসে আস্তানা গেড়েছে এখানে!"
ভয়ের চেয়েও তখন তাঁর ভেতরে কাজ করছিল তীব্র উত্তেজনা। মাটিতে পড়ে থাকা একটি মজবুত লাঠি হাতে তুলে নিলেন তিনি। আত্মরক্ষার বদলে আক্রমণের ভঙ্গিতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন বস্তাটির ওপর।
"জিন বাবাজি, তুমি এই নাসিরকে এখনো চেনো না!"
মি. নাসির হুংকার দিয়ে উঠলেন,
"আজ তোকে পিটিয়ে ভূত ছাড়িয়ে তবেই ছাড়ব!"
লাঠির প্রতিটি ঘা পড়ছে বস্তার ওপর, আর ভেতর থেকে ভেসে আসছে মি. নাভানের করুণ আর্তনাদ। ইনায়া আড়াল থেকে পুরো দৃশ্যটা দেখছিল। তার রাগের জায়গায় এখন কাজ করছে অদ্ভুত এক আনন্দ। সে আড়াল থেকে বের হয়ে এল এবং উত্তেজনার চোটে মি. নাসিরের সুরের সাথে সুর মিলিয়ে উৎসাহ দিতে লাগল,
"আরো জোরে, আঙ্কেল! হেইশসা! পিটিয়ে একদম সমান করে দিন! আরো জোরে!"
শত যুদ্ধের পর, ধুঁকতে ধুঁকতে মি. নাভান কোনোমতে বস্তার বাঁধন ছিঁড়ে মাথা বের করতে সক্ষম হলেন। কিন্তু বাতির আলোয় যখন মি. নাসির আর ইনায়া দেখল বস্তার ভেতরে বন্দী ব্যক্তিটি আর কেউ নন, স্বয়ং মি. নাভান, তখন তাদের কিডনি ভয়ের চোটে মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসার জোগাড় হলো! মি. নাসিরের হাতের লাঠি থরথর করে কাঁপতে লাগল।দৃশ্যটি ফারিশের বেলকনি থেকে আরিশা দেখছিল। নিচে কী ঘটছে তা ঠিকঠাক বুঝে ওঠার আগেই সে ধরে নিল যে কোনো ভয়াবহ অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। কোনো চিন্তা না করেই হাতের কাছে থাকা এক জগ ঠান্ডা পানি সে নিচে ঢেলে দিল।হঠাৎ মাথায় হিমশীতল পানি পড়তেই মি. নাসির গর্জে উঠলেন,
"কোন শয়তান রে!!"
তৎক্ষণাৎ নিচে তাকিয়ে আরিশা তার ভুল বুঝতে পারল। আতঙ্কে তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। নিজের বিপদ আঁচ করতে পেরে জগটি ফেলে দিয়ে তৎক্ষণাৎ সে সিঁড়ি দিয়ে নিচে দৌড়াতে শুরু করল। আরিশা নিচে নেমেই ইনায়াকে নিজের কাছে টেনে আনল। ইনায়ার তখন চোখের পানি আর নাকের পানি একাকার।
"এই ইনায়া, এখানে এসব কী হচ্ছে বলবি? আর তুই কখন এলি??"
ইনায়া তখন কাঁপছে। ভয়ে আর কান্নায় জড়িয়ে আসা গলায় আরিশার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
"বিরাট সর্বনাশ হয়ে গেছে রে! আমি আসলে রং নাম্বারে ডায়াল করেছিলাম। আয়ানকে শায়েস্তা করতে গিয়ে ভুল করে আঙ্কেলকেই শায়েস্তা করে বসে আছি!"
কথাটা শুনে আরিশার চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। সে নিজের কপালে হাত দিয়ে বিড়বিড় করে উঠল,
"ইয়া মাবুদ!! তুই কি করলি এটা!"
ইনায়া ডুকরে কেঁদে ওঠার ভান করে বলল,
"ভাই, এবারের মতো বাঁচা! যে করেই হোক আমাকে এখান থেকে উদ্ধার কর!"
ঠিক তখনই বাগানে ধীর পায়ে প্রবেশ করল ফারিশ আর আয়ান। বাগান থেকে আসা আর্তনাদ আর হট্টগোল শুনেই তারা পরিস্থিতি বুঝতে বের হয়েছিল। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আরিশা এক মুহূর্ত দেরি করল না। ইনায়ার পিঠ চাপড়ে, তার কানের কাছে ঝটপট কিছু একটা বলে দিল। কথাটি শুনতেই ইনায়ার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল, কিন্তু আরিশার নির্দেশে সে একটা গভীর শ্বাস নিয়ে নিজেকে কিছুটা সামলে নিল।
"হায় আল্লাহ, কোন শয়তান রে আমার এই অবস্থা করলো!! "
মি নাসির ভয়ে ইনায়াকে ইশারা দেয় যাতে তার নাম না বলে। ইনায়াও এমন একটা ভাব ধরে যেন নো টেনশন আঙ্কেল আমি আপনাকে বাঁচাবো!!
" কে আমায় বস্তায় পুরলো রে. ... "
মি নাভানের এই কথায় মি নাসির এবার একটু স্বস্তি পায়। মার দিলেও বস্তায় তো আর সে ভরে নি!! গলার স্বর উচিয়ে বলল,
" হ্যাঁ, হ্যাঁ , কে এই কাজ করল?? "
"আমার মনে হয় আমি কালো শার্ট পরা কারোকে দেখলাম, শ্বশুর আব্বা!!"
ইনায়া বেশ ইনোসেন্ট একটা ফেইস নিয়ে বলে।
মি নাভান এবার তাদের মধ্যে উপস্থিত একমাত্র কালো শার্ট পরিহিত আয়ানের দিকে তাকায়।
"আর আমার গায়ে পানি ফেললো কে!! "
মি নাসিরও এবার রেগে বলে। কথাটা শুনে ইনায়ার মতো আরিশাও বেশ একটা ইনোসেন্ট ফেইস নিয়ে বলে,
"আঙ্কেল ,তুমি তো এখানেই দাঁড়িয়ে ছিলে।বরাবর উপরে তাকালেই বুঝা যাবে!! "
মি নাসির এবার উপরে তাকায়। ফারিশের বেলকনি।
"ভাই, তুই একটা ঝাড়ু নে আর আমি একটা!! "
রেগে বলে উঠে মি নাসির। মি নাভানও ভাইয়ের সাথে সায় দেয়। বাগানের এক কোণে পরে থাকা দুটো ঝাড়ু দুইজনই হাতে নেয়। অপরদিকে ফারিশ আর আয়ান কিছুই বুঝে উঠছে না!!
" এরা এভাবে আমাদের দিকে তাকাচ্ছে কেন?? "
ফারিশের কথায় আয়ানও বেশ চিন্তিত ভঙ্গিতে বলে,
" সেটাই তো বুঝছি না ব্রো!! "
তারা বোঝার আগেই মি নাভান এবার মি নাসিরের উদ্দেশ্যে বলে উঠে,
" বল, বিসমিল্লাহ!!! "
" বিসমিল্লাহ!! "
ব্যাস, ম্যারাথন দৌড় শুরু। ফারিশ আর আয়ান কিছু না বুঝেই দৌড়ে যাচ্ছে আর তাদের পিছনে মি নাসির আর নাভান।
" খবরদার, ড্যাড। আমি নামকরা একজন লয়ার। ঐ ঝাড়ু দূরে রাখো আমার থেকে। "
" আমিও নামকরা প্রফেসর। রেসপেক্ট মি!! "
কিন্তু কে শুনে কার কথা!! আরিশা এবার ইনায়ার কাঁধে হাত রেখে বেশ ভাব ধরে বলে,
" বুঝলি ইনায়া, এটাকে বলে ডেঞ্জার টান্সফার টেকনিক!! শিখে রাখ!! "
" হ, হ, ভাই, তুই বেস্ট!! তুই সেরা!! "
