Thread Rating:
  • 0 Vote(s) - 0 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5

দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin)
#24

২৪


অফিসের দিকে হাঁটতে হাঁটতে আমি জীবনের একটা খুব পুরোনো কিন্তু জটিল ফিলোসফি নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম।


মানুষ ভাবে এক, আর সৃষ্টিকর্তা করেন আরেক। ইংরেজিতে একটা খুব জনপ্রিয় থিওরি আছে— 'বাটারফ্লাই ইফেক্ট' (Butterfly Effect)। ক্যাওস থিওরির একটা অংশ। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, পৃথিবীর এক প্রান্তে একটা প্রজাপতি যদি তার ডানা ঝাপটায়, তবে সেই ডানা ঝাপটানোর ফলে বাতাসে যে অতি সূক্ষ্ম পরিবর্তন তৈরি হয়, তার চেইন রিঅ্যাকশনে পৃথিবীর আরেক প্রান্তে একটা ভয়াবহ টর্নেডো বা ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হতে পারে। আমার নিজের জীবনের দিকে তাকালেই এই বাটারফ্লাই ইফেক্টের প্রমাণ পাওয়া যায়।

কোথায় চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীর মতিন সাহেব আমাকে দিয়ে আনিকা নাওহারের একটা কবিতার বইয়ের প্রুফরিডিং করালেন। সেই প্রুফরিডিংয়ের সূত্র ধরে আমাকে বইয়ের মোড়ক উন্মোচনে দাওয়াত দেওয়া হলো। আমি সেখানে গিয়ে আনিকা নাওহারের কবিতার শূন্যতা নিয়ে দুটো গালভরা বুলি ছাড়লাম। আনিকা ইমপ্রেসড হয়ে আমাকে উনার উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি দেখার জন্য নাম্বার দিলেন। তারপর বইমেলা, তারপর রবীন্দ্র সরোবর, আর তারপর সোজা এই ধানমন্ডির ফ্ল্যাটের বেডরুম!

মতিন সাহেব যদি আমাকে দিয়ে ওই কবিতার বইয়ের প্রুফ না দেখাতেন, তাহলে আজ আমি কোথায় থাকতাম? সেই মিরপুর দশ নাম্বারের মেসে, সকালবেলা বাথরুমের লাইনে দাঁড়িয়ে তুহিনের আইইএলটিএস-এর স্পিকিং শুনতাম!

কোথাকার কোন প্রজাপতি কোথায় ডানা ঝাপটালো, আর আমার জীবনে এমন একটা সাইক্লোন বয়ে গেল, যার ঘূর্ণিতে আমি আমার সমস্ত অস্তিত্ব, নীতি আর পঁচিশ হাজার টাকার অনুবাদক সত্তাকে হারিয়ে ফেলে এক বিলিয়নিয়ার নারীর শয্যাসঙ্গী হয়ে গেলাম!

২রা এপ্রিল।
অফিসে সারাদিন কাজ করলেও আমার মাথার ভেতর শুধু ঘুরছে, আনিকা আর মাত্র কয়েকদিনের অথিতি, আর কয়েক দিন পরেই আমার এই রাজকীয় জীবনের অবসান। আমাকে আবার সেই পুরোনো রুটিনে ফিরে যেতে হবে। 

রাতে ফ্ল্যাটে ফেরার পরেও আমার ভেতরে সেই বিষণ্ণতার ছায়া যেন লেপটে আছে। হয়তো আনিকাও এই ভেবে কিছুটা বিষণ্ণ। আনিকা খুব চুপচাপ ছিলেন। আমরা একসাথে ডিনার করলাম। তারপর অন্যান্য রাতের মতোই আমরা বেডরুমে গেলাম।

আনিকা চলে যাবেন এই ভেবেই হয়তো আমার মধ্যে এক ধরনের মরিয়া ভাব ছিল। আমরা একে অপরকে এমনভাবে আদর করলাম যেন কাল সকালে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। আমাদের শরীর, আমাদের ঘাম, আমাদের লালা সব একাকার হয়ে গেল। আমরা একে অপরের শরীরে অর্গাজমের এমন বন্যা বইয়ে দিলাম যে, মনে হলো আমাদের শরীরের শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত আমরা নিংড়ে নিয়েছি।

পরম তৃপ্তি আর চরম ক্লান্তির পর আমরা দুজন একসাথে বাথরুমে গিয়ে শাওয়ার নিলাম। গরম পানির নিচে দাঁড়িয়ে আনিকা আমাকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদলেন। আমি উনার ভেজা চুলে চুমু খেয়ে উনাকে শান্ত করার চেষ্টা করলাম।

শাওয়ার শেষে আমরা বিছানায় এসে শুয়ে পড়লাম। একে অপরের বাহুডোরে বন্দী হয়ে আমরা কখন যে গভীর, নিশ্ছিদ্র ঘুমে তলিয়ে গেলাম, টেরই পেলাম না।


ঘুম ভাঙল। তবে আমার সেই বিখ্যাত, বেইমান বায়োলজিক্যাল অ্যালার্মের কারণে নয়। আমার ঘুম ভাঙল একটা খুব তীক্ষ্ণ, একটানা এবং কর্কশ শব্দের কারণে।

টিং ডং... টিং ডং... টিং ডং... কলিংবেল বাজছে।

আমি ধড়ফড় করে চোখ মেলে তাকালাম। আমার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। বেডরুমের পর্দা টানা, ঘরটা অন্ধকার। আমি হাতড়ে হাতড়ে বালিশের পাশ থেকে আমার ফোনটা নিলাম।

স্ক্রিন অন করে টাইম চেক করলাম। সকাল ৬টা ৩০ মিনিট!

আমার মস্তিষ্ক দ্রুত কাজ করতে শুরু করল। সকাল সাড়ে ছয়টায় এই ফ্ল্যাটের কলিংবেল বাজানোর মতো কে থাকতে পারে? এই ফ্ল্যাটে যে কাজের মেয়েটা আসে, সে আসে দুপুর বারোটার দিকে। আমি গত পঁচিশ দিন ধরে এই ফ্ল্যাটে আছি, আমি তার রুটিন খুব ভালো করেই জানি। সে এত সকালে জীবনেও আসবে না।

তাহলে কে?

পত্রিকাওয়ালা? পত্রিকাওয়ালা তো পত্রিকা দরজার নিচ দিয়ে গলিয়ে দেয় বা পাপোশের ওপর রেখে যায়। সে তো কলিংবেল চেপে বাড়ির মানুষকে ঘুম থেকে ডেকে তোলে না।

পানি বা গ্যাসের বিল দিতে এসেছে কেউ? এত সকালে বিলওয়ালারা আসে না। আমার মাথার ভেতর একটা বিরক্তি তৈরি হলো। ঢাকা শহরের মানুষগুলোর কমনসেন্স বলে কিছু নেই। সকাল সাড়ে ছয়টায় কারো বাসার কলিংবেল এভাবে একটানা চেপে ধরে রাখাটা কোন ধরনের অভদ্রতা!

আনিকা আমার বুকের ওপর মাথা রেখে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কাল রাতের ধকলের পর উনার এখন কোমাতে থাকার কথা। কলিংবেলের শব্দে উনি শুধু একটু উসখুস করলেন, কিন্তু উনার ঘুম ভাঙল না।

আমি খুব সাবধানে উনার মাথাটা বালিশে নামিয়ে রেখে বিছানা থেকে উঠলাম। আমার পরনে কিছুই নেই। আমি দ্রুত আড়ংয়ের কেনা সেই ট্রাউজারটা গলালাম, আর গায়ে একটা ক্যাজুয়াল টি-শার্ট চাপালাম। চুলটা হাত দিয়ে একটু ঠিক করে নিলাম।

"দাঁড়ান ভাই, আসছি! এত বেল চাপার কী হলো!" আমি বিড়বিড় করে বকতে বকতে ড্রয়িংরুম পেরিয়ে মেইন দরজার কাছে গেলাম।

আমি দরজার লকটা ঘুরিয়ে হাতল টান দিলাম। দরজাটা খুলতেই আমার চোখের সামনে যে দৃশ্যটা উন্মোচিত হলো, তার জন্য আমি, আমার অনুবাদক সত্তা, আমার ফিলোসফি, এমনকি স্বয়ং আইনস্টাইন বা সিগমুন্ড ফ্রয়েডও প্রস্তুত ছিলেন না।

দরজার ঠিক ওপাশে একজন অপরিচিত লোক দাঁড়িয়ে আছেন। লোকটার বয়স অনুমানিক আটত্রিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে। বেশ সুঠাম, স্বাস্থ্যবান শরীর। গায়ের রঙ ফর্সা। অত্যন্ত সুদর্শন এবং শার্প ফিচারস। চোখে একটা দামি, রিমলেস চশমা। পরনে একটা খুব সফিস্টিকেটেড ব্র্যান্ডের পোলো শার্ট আর জিন্স।

কিন্তু আমার চোখ লোকটার চেহারার চেয়ে বেশি আটকে গেল তার পাশে রাখা জিনিসটার ওপর। লোকটার ঠিক পাশেই একটা বিশাল, দামি লেদার ট্রলি লাগেজ রাখা। সাথে একটা কেবিন ব্যাগ। লাগেজ!

এই সকাল সাড়ে ছয়টায়, একজন সুদর্শন, অভিজাত চেহারার পুরুষ লাগেজ নিয়ে আনিকা নাওহারের ফ্ল্যাটের দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন! আমার পায়ের নিচ থেকে ধানমন্ডির এই ষোলো তলা বিল্ডিংয়ের ভিত যেন এক সেকেন্ডে সরে গেল। আমার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা হিমশীতল, বরফগলা স্রোত নিচে নেমে গেল।

লোকটার চেহারার সাথে আমি আনিকার বলা একটা বর্ণনার মিল খুঁজতে শুরু করলাম। হ্যাঁ, আনিকা বলেছিল, তার স্বামী বেশ লম্বা, চওড়া এবং ভারিক্কি চেহারার।

লোকটাও আমাকে দেখে কম চমকালেন না। বরং উনার চমকানোর মাত্রাটা আমার চেয়েও বেশি। লোকটার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। উনি উনার চশমার ভেতর দিয়ে আমাকে আপাদমস্তক একবার স্ক্যান করলেন।

"ত্রাহি মধুসূদন!" আমার ভেতরের আত্মাটা ডুকরে কেঁদে উঠল। সর্বনাশ! সর্বনাশ হয়ে গেছে! এটা তো আনিকার হাসব্যান্ড, বেলাল!

আনিকা বলেছিল বেলাল জার্মানিতে একটা কনফারেন্সে গেছে। সেখান থেকে কি লোকটা সোজা ঢাকা চলে এসেছে বউকে সারপ্রাইজ দিতে? শালার সারপ্রাইজ! বউকে সারপ্রাইজ দিতে এসে বেচারা নিজেই এমন এক সারপ্রাইজ খেল যে, এই ধাক্কা সামলাতে উনার বাকি জীবন পার হয়ে যাবে!

আমার হাত-পা কাঁপতে শুরু করেছে। আমি বুঝতে পারছি না আমার এখন কী করা উচিত। যেকোনো সাধারণ চোর বা প্রেমিক এই অবস্থায় পড়লে হয়তো দরজা মুখের ওপর বন্ধ করে দিয়ে ভেতরে গিয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু করত। অথবা জানালা দিয়ে পাইপ বেয়ে নিচে নামার চেষ্টা করত (ষোলো তলা বিল্ডিংয়ে যেটা অসম্ভব)।

কিন্তু আমার মস্তিষ্ক শর্টসার্কিট হয়ে এক অদ্ভুত, পরাবাস্তব রিফ্লেক্স তৈরি করল। আমি একটা চরম গাধার মতো, অত্যন্ত বিনীত এবং ভদ্র গলায় লোকটাকে জিজ্ঞেস করে বসলাম— "আপনি... আপনি কাকে চাচ্ছেন?"

প্রশ্নটা এতটাই ইডিয়টিক ছিল যে, লোকটা কয়েক সেকেন্ড কোনো কথাই বলতে পারলেন না। উনি উনার লাগেজটা এক হাতে ধরে, আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন আমি কোনো ভিনগ্রহের প্রাণী।

"আমি কাকে চাচ্ছি মানে?" লোকটার গলায় একটা কনফিউশন আর রাগ মেশানো স্বর। উনি একবার দরজার ওপরের ফ্ল্যাট নাম্বারের দিকে তাকালেন। "আপনি কে ভাই? এই ফ্ল্যাট কি..."

আমি আর লোকটাকে উনার বাক্য শেষ করার সুযোগ দিলাম না। আমার স্নায়ু তখন পুরোপুরি ফেল করেছে। আমি কী বলছি, আমি নিজেই জানি না। আমার মুখ দিয়ে অনর্গল কিছু অদ্ভুত শব্দ বেরিয়ে এল।

"ওহ! আপনি আনিকার কাছে এসেছেন? আনিকা তো ঘুমাচ্ছে। আপনি আসুন, ভেতরে আসুন। বসুন।" কথাটা বলে আমি দরজাটা পুরোটা খুলে দিয়ে, এক পাশে সরে গিয়ে উনাকে ভেতরে ঢোকার রাস্তা করে দিলাম!

বেলাল সাহেব (বা যিনিই হোন) চরম কনফিউজড এবং হতভম্ব হয়ে আমার কথা মতো ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমে পা রাখলেন। উনার এক হাতে লাগেজের হাতল। উনি ড্রয়িংরুমের ভেতর ঢুকে চারদিকে তাকাচ্ছেন।

আর এই সুযোগটাই আমি কাজে লাগালাম। আমি ড্রয়িংরুমে উনাকে দাঁড় করিয়ে রেখে এক দৌড়ে মাস্টার বেডরুমের দিকে গেলাম।

আনিকা তখনো বিছানায় অঘোরে ঘুমাচ্ছে। উনার ফর্সা, নগ্ন পিঠটা কমফোর্টারের বাইরে বেরিয়ে আছে। আমি আনিকাকে ডাকার, বা উনাকে জাগিয়ে পরিস্থিতি বোঝানোর কোনো বিন্দুমাত্র চেষ্টাই করলাম না। আমার তখন নিজের প্রাণ বাঁচানোর তাগিদ। 'চাচা আপন প্রাণ বাঁচা' প্রবাদটার মর্মার্থ আমি জীবনে এত তীব্রভাবে আগে কখনো অনুভব করিনি।

আমি বেডসাইড টেবিল থেকে ছোঁ মেরে আমার মানিব্যাগ আর মোবাইল ফোনটা পকেটে ঢোকালাম। আমার জুতোজোড়া ড্রয়িংরুমের এক কোণায় ছিল।

আমি বেডরুম থেকে বেরিয়ে, ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে থাকা সেই হতভম্ব লোকটার দিকে একবারও না তাকিয়ে, জুতোজোড়া হাতে নিয়ে আক্ষরিক অর্থেই ফ্ল্যাট থেকে দৌড়ে বেরিয়ে গেলাম!

আমি লিফটের জন্য অপেক্ষা করার সাহস পেলাম না। লিফট আসতে যদি এক মিনিটও লাগে, তার মধ্যে যদি লোকটা বুঝে ফেলে ঘটনা কী, তাহলে সে এসে আমাকে এই ষোলো তলা থেকে নিচে ফেলে দেবে।

আমি ইমার্জেন্সি সিঁড়ির দরজা খুলে পাগলের মতো নিচে নামতে শুরু করলাম। সাত তলা থেকে আমি কীভাবে দৌড়ে, লাফিয়ে, হোঁচট খেয়ে নিচে নামলাম, সেটা আমার মনে নেই। আমি যখন বিল্ডিংয়ের মেইন গেট দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে এলাম, তখন আমার বুকটা এমনভাবে ধড়ফড় করছে যেন সেটা বুকের পাঁজর ভেঙে বাইরে বেরিয়ে আসবে। আমার পায়ে তখনো জুতো নেই। আমি মোজা পরা পায়ে জুতো হাতে নিয়ে ধানমন্ডির রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি। 

সকাল ৭টা বাজে। রাস্তায় মানুষজন কম। প্রাতঃভ্রমণে বের হওয়া দুই-একজন লোক আমার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমি কোনোমতে জুতো জোড়া পায়ে গলিয়ে একটা গলির ভেতরে ঢুকে পড়লাম।

আমার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে। আমার মাথায় কোনো রক্ত নেই, সব রক্ত মনে হচ্ছে পায়ে নেমে গেছে। আমি গলির মোড়ে একটা টং দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। দোকানটা মাত্র খুলছে। "মামা, এক প্যাকেট বেনসন দেন তো," আমি কাঁপাকাঁপা গলায় বললাম।

দোকানদার আমাকে প্যাকেটটা দিল। আমি লাইটার জ্বালিয়ে একটা সিগারেট ধরালাম। একটা টান। দুইটা টান। তিনটা টান। আমি আক্ষরিক অর্থেই টানা তিন-চারটে সিগারেট এক বসায় শেষ করে ফেললাম।

সকালবেলা খালি পেটে, গত রাতের শারীরিক ধকলের পর, এভাবে টানা নিকোটিন ভেতরে যাওয়ায় আমার শরীরে একটা ভয়াবহ রিঅ্যাকশন হলো।

আমার মাথাটা বোঁ করে ঘুরে উঠল। পেটের ভেতর থেকে একটা তীব্র বমি বমি ভাব গলার কাছে উঠে এল। আমি ড্রেনের কাছে গিয়ে উবু হয়ে বসলাম, কিন্তু বমি হলো না। শুধু কয়েকবার শুকনো ওক তুললাম। আমার চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে আসছে।

"মামা, এক বোতল পানি দেন," আমি হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম। পানিটা নিয়ে আমি ঢকঢক করে কয়েক ঢোঁক খেলাম। একটু ধাতস্থ হওয়ার পর আমি ফুটপাতের একটা ভাঙা ইটের ওপর বসে পড়লাম।

কী করলাম আমি?

আমি আনিকাকে ওই অবস্থার মধ্যে ফেলে রেখে পালিয়ে এলাম? একজন ঘুমন্ত, নগ্ন নারীকে তার স্বামীর সামনে অরক্ষিত অবস্থায় রেখে আমি নিজের প্রাণ বাঁচাতে দৌড় দিলাম? আমি কি মানুষ, নাকি একটা কাপুরুষের চূড়ান্ত রূপ?

কিন্তু আমার তো আর কোনো উপায়ও ছিল না! আমি যদি সেখানে দাঁড়াতাম, লোকটা যদি আমাকে জিজ্ঞেস করত আমি কে, আমি কী উত্তর দিতাম? আমি কি বলতাম, "ভাই, আমি রাশেদ। আমি আপনার বউয়ের একজন কলিগ, গত ২২ দিন ধরে আমি আপনার বিছানায় ঘুমাচ্ছি!" আমার হাত তখনো কাঁপছে। আমি পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলাম।

কী হচ্ছে এখন ওই সাত তলার ফ্ল্যাটে? লোকটা কি আনিকাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলেছে? আনিকাকে ওই অবস্থায় দেখে লোকটার রিঅ্যাকশন কী হয়েছে? লোকটা কি আনিকাকে পেটাচ্ছে? খুন করে ফেলছে না তো?

আমার মাথার ভেতর শত শত ক্রাইম থ্রিলারের দৃশ্য ভাসতে শুরু করল। স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন! ধানমন্ডির বিলাসবহুল ফ্ল্যাট থেকে তরুণীর লাশ উদ্ধার!

আমি আর নিজেকে আটকাতে পারলাম না। আমার আঙুল আনিকার নাম্বারে ডায়াল করে ফেলল। রিং হচ্ছে। একবার, দুইবার, তিনবার।

আমার বুকটা ধড়ফড় করছে। ফোনটা কে ধরবে? আনিকা? নাকি ওই লোকটা? চারবারের মাথায় ফোনটা রিসিভ হলো। "হ্যালো?"

ওপাশ থেকে আনিকার ঘুম-জড়ানো, ভারী, এবং চরম বিরক্তিকর একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এল। "রাশেদ? কী ব্যাপার? তুমি কি অফিসে চলে গেছ এত সকালে? আমাকে না বলেই?"

উনার গলা শুনে মনে হলো, উনার পৃথিবীতে এখনো কোনো ভূমিকম্প হয়নি। উনি এখনো বিছানায় শুয়ে আছেন, এবং হয়তো ড্রয়িংরুমে বসা উনার হাসব্যান্ডকে উনি এখনো দেখেননি।

আমি ঢোঁক গিলে, আমার জীবনের সবচেয়ে কাঁপাকাঁপা এবং আতঙ্কিত গলায় বললাম— "অফিস! কিসের অফিস আনিকা! সর্বনাশ হয়ে গেছে! তোমার ফ্ল্যাটের বসার ঘরে তোমার হাসব্যান্ড! উনি লাগেজ নিয়ে এসেছেন। আমি উনাকে ভেতরে ঢুকতে দিয়ে নিচে পালিয়ে এসেছি। কী করব আমি বুঝতে পারছিলাম না আনিকা..."

আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই... খট। লাইনটা কেটে গেল।

আমি হ্যালো হ্যালো করতে থাকলাম, কিন্তু ওপাশে শুধু ডেড টোন। আনিকা ফোনটা সাথে সাথে কেটে দিয়েছেন। আমি ফুটপাতের ওপর বসে পাথরের মতো জমে গেলাম।

কী হচ্ছে এখন ওই ফ্ল্যাটে?

আনিকা কি ফোনটা রেখেই লাফ দিয়ে উঠেছেন? ড্রয়িংরুমে গিয়ে উনার স্বামীর মুখোমুখি হয়েছেন? বেলাল সাহেব কি উনাকে জিজ্ঞেস করেছেন, "এই ছেলেটা কে ছিল, যে আমার দরজা খুলে দিল?" আনিকা কী জবাব দিচ্ছেন?

কী হচ্ছে ওখানে? ঝগড়া? মারামারি? রক্তারক্তি? খুনাখুনি হয়ে যাবে না তো?
ওহ গড! আমি কী করব এখন? আমি কি পুলিশে কল দেব? নাকি দৌড়ে আবার ওই সাত তলায় যাব আনিকাকে বাঁচাতে? কিন্তু আমি যদি যাই, বেলাল সাহেব তো আমাকেই আগে খুন করবে!

আমি, রাশেদ আহমেদ, একজন পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের নিরীহ অনুবাদক, আজ সকালে ধানমন্ডির ফুটপাতে বসে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে ভয়াবহ থ্রিলারের ক্লাইম্যাক্সের মুখোমুখি হয়ে সম্পূর্ণ দিশেহারা হয়ে গেলাম।

আমার চারপাশের পৃথিবীটা মনে হচ্ছে একটা বিশাল ব্ল্যাকহোলের মতো ঘুরছে।

সময় ব্যাপারটা যে কতটা আপেক্ষিক, তা আমি ফুটপাতের ওই ভাঙা ইটটার ওপর বসে হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছিলাম। ঘড়ির কাঁটা বলছে, আমি আনিকার ফ্ল্যাট থেকে দৌড়ে নিচে নেমেছি মাত্র ত্রিশ থেকে চল্লিশ মিনিট আগে। কিন্তু আমার স্নায়ু, আমার হৃৎপিণ্ড আর আমার মাথার ভেতরের সাইকোলজিক্যাল ঘড়ি বলছে— কয়েকটা শতাব্দী, বা কয়েক আলোকবর্ষ পার হয়ে গেছে।

এই চল্লিশ মিনিটে আমি আমার মাথার ভেতর কম করে হলেও একশটা থ্রিলার সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখে ফেলেছি। উপরে এখন কী হচ্ছে? বেলাল সাহেব কি ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে আনিকাকে জেরা করছেন? আনিকা কি কান্নাকাটি করছেন? নাকি বেলাল সাহেব রাগের মাথায় কিচেন থেকে ছুরি এনে আনিকাকে জবাই করে দিয়েছেন?

আর আনিকাই বা কী লজিক দাঁড় করাচ্ছেন? উনি কি বলছেন— "ওহ, ওই ছেলেটা? ওইটা তো আমার বইয়ের প্রুফরিডার। সকাল ছয়টায় ওর হঠাৎ মনে হলো আমার উপন্যাসের তৃতীয় অধ্যায়ের একটা কমা ভুল আছে, তাই সে খালি পায়ে, উসকোখুস্কো চুলে সেটা ঠিক করতে এসেছিল!"

না, বেলাল সাহেব তো আর গাধা নন। এত বড় ইঞ্জিনিয়ার মানুষ, উনি কি এই গাঁজাখুরি গল্প বিশ্বাস করবেন? নিশ্চয়ই উনি এখন আনিকার ফোন চেক করছেন। একটু পরেই হয়তো পুলিশ কল করবেন। বাংলাদেশের পত্রিকাগুলোর হেডলাইন আমার চোখের সামনে ভাসতে লাগল— "ধানমন্ডিতে পরকীয়ার জেরে প্রুফরিডার খুন! স্যুটকেস থেকে অনুবাদকের লাশ উদ্ধার!"

ভয়ে আমার পেটের ভেতরটা গুলিয়ে উঠল। মধ্যবিত্ত মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো পুলিশ আর পাবলিক স্ক্যান্ডাল। আমি যদি এখন মরেও যাই, আমার বাবা নওগাঁর ভুসিমালের দোকানে বসে যখন শুনবেন তার গুণধর ছেলে অন্যের বউয়ের বিছানায় শুতে গিয়ে খুন হয়েছে, তখন বেচারা স্ট্রোক করে ওখানেই মারা যাবেন।

আমার ভাবনার এই ভয়াবহ সাইক্লোনের মাঝখানেই হঠাৎ আমার প্যান্টের পকেটে মোবাইলটা ভাইব্রেট করে উঠল। আমি চমকে উঠলাম। কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা বের করলাম। হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ এসেছে।

স্ক্রিনে নাম জ্বলজ্বল করছে— 'Anika Nawhar'। মেসেজটা খুব ছোট। মাত্র চারটা শব্দ। "উপরে আসো। সমস্যা নেই।"

আমি মেসেজটার দিকে একদৃষ্টে অন্তত দুই মিনিট তাকিয়ে রইলাম। আমার চোখের তারা বড় হয়ে গেছে। কী করব আমি? উপরে যাব? এই মেসেজ কি সত্যিই আনিকা পাঠিয়েছে? নাকি উনার স্বামী বেলাল সাহেব আনিকার ফোনটা কেড়ে নিয়ে আমাকে ফাঁদে ফেলার জন্য এই মেসেজ টাইপ করেছেন? আমি উপরে গেলেই কি বেলাল সাহেব দরজা আটকে দিয়ে আমাকে রামধোলাই দেওয়া শুরু করবেন?

আমার ভেতরের লজিক বলছে— "রাশেদ, পালাও! যেদিকে দুই চোখ যায় দৌড়াও! কারওয়ান বাজারের অফিসে গিয়ে ল্যাপটপের নিচে লুকিয়ে থাকো। জীবনে আর ধানমন্ডির ছায়াও মাড়াবে না।"

কিন্তু ওই যে, মানুষের একটা অবচেতন কৌতূহল থাকে। তাছাড়া, আমার শার্ট, প্যান্ট, জুতো— সব তো ওই ফ্ল্যাটেই। আমি এই একটা টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরে খালি পায়ে তো আর সারা জীবন ঢাকা শহরে ঘুরতে পারব না। আর তার চেয়েও বড় কথা, আনিকা নামের ওই রহস্যময়ী নারীটির ওপর আমার এক অদ্ভুত, অন্ধ বিশ্বাস জন্মে গেছে। আমার মনে হলো, আনিকা যখন বলেছে 'সমস্যা নেই', তার মানে হয়তো সত্যিই সে কোনো না কোনোভাবে পরিস্থিতি সামলে নিয়েছে।

অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্ব, অনেক দোয়া-দরুদ আর নিজের বোকামিকে গালি দিতে দিতে আমি উঠে দাঁড়ালাম।
Reply


Messages In This Thread
দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:51 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:52 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:52 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:53 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:54 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:54 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:55 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:55 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:26 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:27 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:28 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:55 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:56 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:57 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:58 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:58 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 08:58 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 08:59 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:00 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:01 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:02 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:03 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:06 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:07 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:08 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:08 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:09 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:10 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:12 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:13 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:14 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:16 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:17 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:17 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:18 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:20 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:22 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:23 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:25 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:25 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:26 AM

Forum Jump:


Users browsing this thread: 1 Guest(s)