Thread Rating:
  • 0 Vote(s) - 0 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5

দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin)
#30

৩০



মানুষের শরীরে অ্যাড্রেনালিন হরমোনটা এক অদ্ভুত জাদুকরের মতো কাজ করে। যখন এই হরমোন রক্তে মিশে যায়, তখন মানুষের ভয়ডর, ক্লান্তি, এমনকি ব্যথা বোধও কিছুক্ষণের জন্য পুরোপুরি উধাও হয়ে যায়। তখন একটা ছাপোষা কেরানিও মনে মনে নিজেকে জেমস বন্ড ভাবতে শুরু করে। তখন তার মনে হয়, সে একাই পুরো পৃথিবীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যেতে পারবে।

গ্লোরিয়া জিন্স থেকে বেরিয়ে কারওয়ান বাজারের অফিসে ফেরা পর্যন্ত আমার ধমনিগুলোতে সেই অ্যাড্রেনালিন হরমোনের একটা তীব্র, জ্বলন্ত প্রবাহ ছিল। আনিকার সাথে ওই ফেস-টু-ফেস কনফ্রন্টেশন, উনার সেই বরফশীতল পরিকল্পনা এবং সার্সেই ল্যানিস্টারের মতো ডায়ালগবাজি— সবকিছু মিলিয়ে আমার ভেতরে একটা অদ্ভুত ঘোরের সৃষ্টি হয়েছিল। আমি যেন কোনো হলিউড থ্রিলারের মেইন প্রোটাগনিস্ট হয়ে গেছি, যে এইমাত্র ভিলেনের চোখের দিকে তাকিয়ে এক চরম সত্যের মুখোমুখি হয়ে ফিরে এসেছে। বাসে ওঠার পর কন্ডাক্টর যখন ভাড়া চাইল, আমি এমন একটা ভাব নিয়ে তাকে টাকাটা দিলাম, যেন আমি তাকে বকশিশ দিচ্ছি। আমার চোখের দৃষ্টি তখন তীক্ষ্ণ, চোয়াল শক্ত।

কিন্তু জাদুকরের ম্যাজিক যেমন একসময় শেষ হয়, হরমোনের মেয়াদও ফুরিয়ে আসে। আর সেই হরমোনের প্রভাব যখন রক্ত থেকে নামতে শুরু করে, তখন বাস্তবতার নগ্ন রূপটা এমনভাবে হামলে পড়ে যে, মানুষের তখন নিজের ছায়াকে দেখলেও হার্ট অ্যাটাক হওয়ার উপক্রম হয়।

বাস থেকে কারওয়ান বাজারে নামার সাথে সাথেই আমার সেই জেমস বন্ড ভাবটা কর্পূরের মতো উড়তে শুরু করল। ঢাকা শহরের কড়া রোদ, ধুলোবালি, আর সিএনজির কালো ধোঁয়া আমাকে খুব দ্রুত মনে করিয়ে দিল যে আমি আসলে কে। আমি কোনো হলিউড হিরো নই। আমি রাশেদ আহমেদ। পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের এক সামান্য অনুবাদক, যে একটা চরম ভয়াবহ, নোংরা এবং প্রাণঘাতী ফাঁদে আটকা পড়ে গেছে।

অফিসে ঢুকে নিজের ডেস্কে বসার সাথে সাথেই আমার সেই ঘোরটা দপ করে কেটে গেল। অফিসে ঢুকতেই প্রথম যে ধাক্কাটা খেলাম, সেটা এহসান ভাইয়ের কাছ থেকে। "রাশেদ! তোমার সমস্যাটা কী বলতে পারো?" এহসান ভাই উনার চশমার ফাঁক দিয়ে আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন, যেন আমি ল্যাপটপ চুরি করে পালিয়ে যাচ্ছিলাম। উনার কপালে তিনটে গভীর ভাঁজ, যা শুধু চরম বিরক্তির সময়ই ফুটে ওঠে।

আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। 

"কাউকে কিছু না বলে, কোনো ইনফর্ম না করে তুমি মাঝ-অফিসে গায়েব হয়ে গেলে! আমি তোমাকে আধা ঘণ্টা ধরে খুঁজছি। পুতিনের স্পিচের অনুবাদটা কে করবে? তোমার কি মনে হয় অফিসটা তোমার শ্বশুরবাড়ি? যখন খুশি আসবে, যখন খুশি যাবে?"

‘শ্বশুরবাড়ি!’ শব্দটা শুনে আমার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। এহসান ভাই সাধারণ একটা উপমা দিয়েছেন মাত্র, কিন্তু আমার কাছে শব্দটা একটা জ্বলন্ত চাবুকের মতো শোনাল। আমি তো গত এক মাস আনিকা নাওহারের ফ্ল্যাটে আক্ষরিক অর্থেই ঘরজামাই হয়ে ছিলাম! আমার মনে হলো এহসান ভাই কি কোনোভাবে কিছু জেনে গেছেন? আমি দ্রুত নিজেকে সামলে নিলাম।

"সরি ভাই," আমি আমতা-আমতা করে, চরম অপরাধী মুখে বললাম। "আসলে... আমার মেসের এক ছোট ভাই হঠাৎ করে বাইক অ্যাকসিডেন্ট করে পঙ্গু হাসপাতালে... আমাকে একটু ইমার্জেন্সি ছুটতে হয়েছিল। মাথা এত ব্ল্যাঙ্ক ছিল যে আপনাকে বলে যাওয়ার কথাও মনে ছিল না। এক্সট্রিমলি সরি ভাই। আমি এক্ষুনি নিউজটা নামিয়ে দিচ্ছি।"

বাংলাদেশে বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো ইনভেন্টরি বা রেডিমেড মিথ্যা কথা বলা। মানুষের বিপদে মানুষ যতটা না সহানুভূতি দেখায়, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি সহানুভূতি দেখায় মেডিকেল ইমার্জেন্সিতে। আপনি যদি বলেন আপনার প্রেমিকা পালিয়েছে, বস আপনাকে ঘাড় ধাক্কা দেবে। কিন্তু আপনি যদি বলেন আপনার মামাতো ভাইয়ের অ্যাপেন্ডিসাইটিস ফেটে গেছে, বস সাথে সাথে গলে পানি হয়ে যাবে।

এহসান ভাই 'পঙ্গু হাসপাতাল' শুনে একটু নরম হলেন। উনার কপালের ভাঁজগুলো কিছুটা সমতল হলো। "অ্যাকসিডেন্ট? খুব সিরিয়াস নাকি?"

"জি ভাই, পা ভেঙে দুই টুকরো হয়ে গেছে। রড ঢোকাতে হবে," আমি অবলীলায় আমার কাল্পনিক ছোট ভাইয়ের পা ভেঙে দিলাম।

"আহারে! সাবধানে থাকতে বলবা পোলাপানদের। ঠিক আছে, বসো। আর নেক্সট টাইম এটলিস্ট একটা টেক্সট করে যাবে। দিস ইজ নট এ জোক। আমরা নিউজ ডেস্কে কাজ করি, এখানে প্রতিটা সেকেন্ড ইম্পর্ট্যান্ট," বলে উনি উনার কাজে মন দিলেন।

আমি আমার ল্যাপটপটা ওপেন করলাম। পুতিনের স্পিচের ভিডিওটা প্লে করলাম। কিন্তু আমার চোখ বা কান— কোনোটিই স্ক্রিনে নেই। স্ক্রিনে পুতিন অত্যন্ত গম্ভীর মুখে নিউক্লিয়ার ওয়ার বা পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকি দিচ্ছেন। পুরো বিশ্ব হয়তো সেই হুমকিতে কাঁপছে, কিন্তু আমার তাতে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। আমার নিজের জীবনের ওপর দিয়ে যে পারমাণবিক বোমাটা ফাটতে যাচ্ছে, তার সামনে পুতিনের হুমকিকে আমার কাছে ছোট বাচ্চাদের পটকা ফোটানো বলে মনে হলো।

অ্যাড্রেনালিন হরমোনটা ততক্ষণে পুরোপুরি আমার শরীর থেকে নেমে গেছে। আর তার শূন্যস্থানটা দখল করে নিয়েছে একটা বরফশীতল, হাড়-কাঁপানো, প্যাথলজিক্যাল আতঙ্ক।

ভয়!

খাঁটি, নির্ভেজাল ভয়।

কী হচ্ছে এসব আমার জীবনে? আমি কোথায় এসে ফেঁসে গেছি? আমার মাথার ভেতরে এখন পুলিশের সাইরেন বাজতে শুরু করেছে। আনিকা থানায় গিয়ে মিসিং রিপোর্ট বা জিডি ফাইল করে এসেছে। আর সেই জিডিতে আমার নাম আছে। আমি নাকি উনার 'ছোট ভাই', 'প্রুফরিডার', এবং 'গেস্ট'!

বাংলাদেশ পুলিশের তদন্ত করার ধরন সম্পর্কে আমার খুব ভালো ধারণা আছে। এই দেশের পুলিশকে যতটা বোকা ভাবা হয়, তারা আসলে ততটা বোকা নয়। তাদের কাছে হয়তো উন্নত বিশ্বের মতো ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা ডিএনএ এনালাইসিসের অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি নেই, কিন্তু তাদের কাছে যেটা আছে, সেটা হলো 'সোর্স' এবং 'জেরা করার ক্ষমতা'।

একটা লোক নিখোঁজ হয়েছে। তার বেডরুমে গত পঁচিশ দিন ধরে একটা অচেনা, ভিনদেশি (মানে মিরপুরের) যুবক ছিল। পুলিশ যখন তদন্ত শুরু করবে, তখন কি তারা শুধু আনিকার মুখের কথার ওপর ভরসা করে বসে থাকবে? কক্ষনোই না। তারা প্রথমেই আমার কল লিস্ট চেক করবে। তারা দেখবে আমি আনিকাকে দিনে কতবার ফোন দিয়েছি, কতক্ষণ কথা বলেছি। তারা আমার হোয়াটসঅ্যাপের মেসেজ রিকভার করবে। তারা ওই ষোলো তলা বিল্ডিংয়ের সিসিটিভি ফুটেজ চেক করবে। বিল্ডিংয়ের মেইন গেটে, লবিতে, লিফটে— সব জায়গায় সিসি ক্যামেরা বসানো। তারা খুব সহজেই দেখতে পাবে আমি কীভাবে প্রতিদিন সন্ধ্যায় আনিকার সাথে ওই ফ্ল্যাটে ঢুকতাম, আর পরদিন সকালে কীভাবে একটা ভেজা বিড়ালের মতো বেরিয়ে আসতাম।

আর বিল্ডিংয়ের দারোয়ান মফিজ? ওই লোকটাকে তো আমি চিনি! ওকে ধরে যখন পুলিশ দুইটা ধমক দেবে, কিংবা হাতে পাঁচশো টাকার একটা কড়কড়ে নোট গুঁজে দেবে, মফিজ তখন গড়গড় করে সব বলে দেবে। "স্যার, এই পোলারে তো ম্যাডাম রোজ রাইতে বাসায় নিয়া ঢুকতো। আমরা তো ভাবছিলাম এরা স্বামী-স্ত্রী! ম্যাডামের জামাই তো বিদেশে থাহে, আর এই পোলা তো ম্যাডামের লগেই আঠার মতো লাইগা থাকতো। এরা তো স্বামী-স্ত্রীর লাহানই আছিল!"

মফিজের এই একটা কথাই আমাকে সোজা ফাঁসির দড়ির দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। পুলিশ যদি একবার, জাস্ট একবার আনিকার আর আমার আসল সম্পর্কের কথাটা টের পায়, তাহলে আমার কী হবে? আমার চোখের সামনে ভাসতে শুরু করল একটা ভয়াবহ দৃশ্য।

পুলিশ আমাকে আমার মেস থেকে, অথবা এই কারওয়ান বাজারের অফিস থেকেই হাতকড়া পরিয়ে ধরে নিয়ে গেছে। থানার অন্ধকার একটা রুমে আমাকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। সিলিং ফ্যানের সাথে আমাকে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। আমার পরনে শুধু একটা আন্ডারওয়্যার। আমার সারা গায়ে কালশিটে দাগ। একজন ষণ্ডামার্কা, কালো, গোঁফওয়ালা পুলিশ অফিসার হাতে একটা মোটা, তেল মাখানো লাঠি নিয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল।

অফিসারটা লাঠি দিয়ে আমার হাঁটুতে একটা সজোরে বাড়ি মারল। "কইয়া ফ্যাল শুয়োরের বাচ্চা!" অফিসারটা গর্জে উঠবে। "বেলাল সাহেবরে তুই আর ওই মাগি মিইলা কই গুম করছস? লাশ কই পুঁইতা রাখছস? ওই লন্ডনি সাহেবের এত টাকার সম্পত্তি তুই একা খাইতে চাস? কইয়া ফ্যাল, নাইলে আজকে তোর হাড়ের মজ্জা বাইর কইরা দিমু!"

আমি ব্যথায় চিৎকার করতে করতে বলব, "স্যার, আমি কিচ্ছু জানি না! আমি সত্যি বলছি স্যার, আমি শুধু উনার সাথে শুয়েছি, আমি কাউকে খুন করিনি!"

"চুপ কর হারামি! তুই কি ভাবছস আমরা ঘাস খাই? তুই আর ওই আনিকা মিইলা প্ল্যান কইরা জামাইরে দুনিয়া থেইকা সরাইয়া দিছস। এখন সাধু সাজতেছস!"

রিমান্ডের এই কল্পনাটা এতই জীবন্ত আর এতই রিয়েলিস্টিক ছিল যে, অফিসের এসির মধ্যেও আমার কপাল ঘেমে উঠল। আমি আমার হাতের আঙুলগুলোর দিকে তাকালাম। এই আঙুলগুলো দিয়ে আমি ল্যাপটপে টাইপ করি, এই আঙুলগুলো দিয়ে আমি আনিকার শরীর ছুঁয়েছি। আর এই আঙুলগুলোতেই হয়তো পুলিশ প্লাস দিয়ে চেপে ধরে আমার নখ উপড়ে ফেলবে!

আর আনিকা? আনিকার মতো হাই-সোসাইটির বিলিয়নিয়ার নারী কি পুলিশের সামনে আমার হয়ে ঢাল ধরবে? উঁহু। কোনো চান্স নেই। শূন্য পারসেন্ট চান্স। আনিকা নাওহার হচ্ছে সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্টের এক চরম উদাহরণ। উনি নিজের স্বার্থের জন্য, নিজের স্কিন বাঁচানোর জন্য পৃথিবীর যেকোনো কিছু করতে পারেন। পুলিশের জেরার মুখে পড়লে, আনিকা যদি দেখে যে তার নিজের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে, তখন সে এক সেকেন্ডও সময় নেবে না আমাকে বলি দিতে। সে আমাকে একটা ব্যবহৃত টিস্যু পেপারের মতো ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলবে।

আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, কোর্টের কাঠগড়ায় আনিকা দাঁড়িয়ে আছেন। উনার পরনে একটা ধবধবে সাদা শাড়ি। চোখে জল। উনাকে দেখতে একদম স্বর্গের কোনো নিষ্পাপ, দুঃখী পরীর মতো লাগছে। বিচারক থেকে শুরু করে কোর্টের পিয়ন পর্যন্ত সবাই উনার রূপ আর উনার কান্নায় গলে পানি হয়ে যাচ্ছে।

উনি চোখের পানি মুছতে মুছতে ম্যাজিস্ট্রেটকে বলবেন, "ইয়োর অনার, আমি তো অসহায় একটা মেয়ে। আমার স্বামী বিদেশে থাকত। আমি একা থাকতাম। এই রাশেদ লোকটা একটা সাইকোপ্যাথ। সে আমার প্রুফরিডার ছিল। কিন্তু সে আমার প্রেমে পাগল হয়ে আমার পিছে পিছে ঘুরত। সে আমাকে ব্ল্যাকমেইল করত। আমার স্বামী বেলাল যেদিন দেশে ফেরে, তখন এই রাশেদ ব্যাপারটা মেনে নিতে পারেনি। সে-ই হয়তো আমার স্বামীকে কিছু করেছে! ইয়োর অনার, আমি কিচ্ছু জানি না। আমার স্বামীকে আপনারা ফিরিয়ে দিন!"

ব্যাস! দুই পুরুষের লড়াইয়ে এক অসহায় নারীর করুণ গল্প! বাংলার মিডিয়া আর পাবলিক এই ধরনের গল্প লুফে নেবে। আমাদের দেশের মানুষের সবচেয়ে প্রিয় বিনোদন হলো অন্যের স্ক্যান্ডাল। পরকীয়া, খুন, আর লন্ডনপ্রবাসী নারী— এই তিনটা উপাদান একসাথে পেলে মিডিয়া যা করবে, তা কল্পনা করলেও আমার গা শিউরে উঠছে।

পত্রিকাগুলোর প্রথম পাতায় লাল কালিতে হেডলাইন হবে—

"পরকীয়ার বলি লন্ডনপ্রবাসী ইঞ্জিনিয়ার: ঘাতক অনুবাদক রাশেদ রিমান্ডে!"

"লেখিকা স্ত্রীর গোপন প্রেমিক: কে এই রাশেদ?"

"প্রেমিকের হাতে স্বামী খুন: ধানমন্ডির ফ্ল্যাটে কী ঘটেছিল সেই রাতে?"

আর সোশ্যাল মিডিয়া? ফেসবুক আর ইউটিউবে তো আমাকে নিয়ে রীতিমতো উৎসব শুরু হয়ে যাবে। বড় বড় ইউটিউবাররা আমার ছবি, আনিকার ছবি আর বেলালের ছবি দিয়ে থাম্বনেইল বানাবে। লাল গোল্লা দিয়ে আমার মুখটা মার্ক করে ক্যাপশন দেবে— "দেখুন এই নরপিশাচের আসল চেহারা!" টক শোগুলোতে বড় বড় সমাজবিজ্ঞানীরা আমার চারিত্রিক অবক্ষয় নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বকবক করবেন। আমার মেসের রুমমেট তুহিন আর রাজুকে টিভিতে ইন্টারভিউ দিতে দেখা যাবে। তারা বলবে— "রাশেদ ভাই তো সারাদিন চুপচাপ থাকত। আমরা তো ভাবতেও পারিনি সে এত বড় একটা খুনি আর লুইচ্চা!"

আমার বাবা... নওগাঁর সেই সাধারণ ভুসিমাল ব্যবসায়ী। যিনি গ্রামের দোকানে বসে বুক ফুলিয়ে বলেন তার ছেলে ঢাকা পেপারসে চাকরি করে। তিনি যখন টিভিতে এই খবর দেখবেন, তখন তার কী হবে? আমার মা তো লজ্জায়, অপমানে হয়তো গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করবেন। আমার ছোট ভাই নিহাদকে কেউ আর সম্মান করবে না। আমার পুরো পরিবারটার মুখে চুনকালি মেখে যাবে।

ভয়ে আমার পুরো শরীর ঠাণ্ডা হতে লাগল। অফিসের সেন্ট্রাল এসি আজ চলছে চব্বিশ ডিগ্রিতে, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আমি সাইবেরিয়ার কোনো বরফ ঢাকা পাহাড়ে বসে আছি। শীত আর ভয়ের ঠাণ্ডা মিলে আমার গা রীতিমতো কাঁপতে শুরু করল। আমি দুই হাত দিয়ে নিজেকে জড়িয়ে ধরে ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। আমার মনে হচ্ছে, চারপাশের বাতাস ক্রমশ কমে আসছে।

আমি কি সত্যিই কোনো খুনের সাথে জড়িত? না। আমি তো শুধু একটা লোভের বশবর্তী হয়ে একটা মেয়ের পাতা ফাঁদে পা দিয়েছিলাম। আমার অপরাধ তো শুধু কামনার। কিন্তু আইন আর সমাজ তো আমার সেই ফ্যান্টাসিকে বিবেচনা করবে না। তারা দেখবে ফ্যাক্ট। আর ফ্যাক্ট হলো, বেলাল যেদিন নিখোঁজ হয়, সেদিন আমি ওই ফ্ল্যাটে ছিলাম।

আমার মাথার ভেতর আরেকটা অমীমাংসিত প্রশ্ন একটা ড্রিলের মতো ঘুরতে লাগল। সেদিন সকালে, মানে ২রা এপ্রিল, বেলাল সাহেব যখন লাগেজ নিয়ে আনিকার ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমে ঢুকলেন, তখন আসলে কী ঘটেছিল?

আমি তো নিজের প্রাণ বাঁচাতে খালি পায়ে দৌড়ে ইমার্জেন্সি সিঁড়ি দিয়ে পালিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু আনিকা? আনিকা তো তখনো সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় মাস্টার বেডরুমে ঘুমাচ্ছিল। বেলাল সাহেব কি সরাসরি বেডরুমে ঢুকেছিলেন? একজন স্বামী মাসের পর মাস বিদেশে থাকার পর যখন দেশে ফিরে আসে, তখন সে তো সর্বপ্রথম তার স্ত্রীর কাছেই যায়। বেলাল সাহেব নিশ্চয়ই বেডরুমে ঢুকেছিলেন। উনি কি উনার স্ত্রীর ওই এলোমেলো, সদ্য-সঙ্গম-করা শরীর দেখে কিচ্ছু বুঝতে পারেননি?

আমাদের সেই উদ্দাম রাতের পর বিছানার চাদরের যে অবস্থা ছিল, বাতাসে যে তীব্র আদিম গন্ধটা ভাসছিল, সেটা তো যেকোনো সাধারণ মানুষেরও বুঝে ফেলার কথা। তার ওপর আমি ছিলাম। আমি যে একটা পরপুরুষ ওই ফ্ল্যাটে ছিলাম, সেটার চিহ্ন তো সব জায়গায় ছড়ানো ছিল। আমার ফেলে যাওয়া আড়ংয়ের শার্ট, আমার জুতো, আমার ছাইদানিতে ফেলে রাখা সিগারেটের ফিল্টার!

বেলাল সাহেব কি এগুলো কিছুই দেখেননি? নাকি আনিকা জাদুকর? কীভাবে একটা লোক, তার নিজের বেডরুম থেকে একজন অচেনা যুবককে ঘুম থেকে উঠে বেরিয়ে আসতে দেখে, এবং তারপর ড্রয়িংরুমে সেই যুবকের সাথে বসে হাসিমুখে কফি খায়! "কী ব্যাপার, নাশতা আনতে গিয়েছিলেন?"— এটা কি কোনো সুস্থ, স্বাভাবিক, আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন স্বামীর কথা হতে পারে?

এই মহিলা কি কোনো মায়াবিনী? উনার কাছে কি এমন কোনো ব্ল্যাকম্যাজিক বা সম্মোহনবিদ্যা আছে যা দিয়ে উনি উনার স্বামীকে হিপনোটাইজ করে ফেলেছিলেন? নাকি বেলাল সাহেব নিজেই কোনো অদ্ভুত সাইকোলজিক্যাল রোগে ভুগছিলেন? উনি কি ওপেন ম্যারেজ বা কাকোল্ড (Cuckold) ফ্যান্টাসিতে বিশ্বাসী ছিলেন, যেখানে নিজের স্ত্রীকে অন্যের সাথে দেখতে আনন্দ পান?

না, এটা অসম্ভব। বেলাল সাহেবের চোখের দৃষ্টিতে আমি সেদিন কোনো বিকারগ্রস্ত মানুষের ছায়া দেখিনি। উনি একজন সাধারণ, ভদ্র এবং শিক্ষিত মানুষের মতোই আচরণ করছিলেন। তাহলে আনিকা উনাকে কী বলেছিলেন? কীভাবে উনি পরিস্থিতিটা এত ঠান্ডা মাথায় ম্যানেজ করেছিলেন? এবং সবচেয়ে বড় কথা, বেলাল সাহেব এখন কোথায়?

যদি বেলাল সাহেবকে খুন করা হয়ে থাকে, তবে সেটা কে করেছে? আনিকা নিজে? একজন নারী একা একটা সুঠামদেহী পুরুষকে কীভাবে গুম করতে পারে? নাকি আনিকার সাথে আরও কেউ জড়িত আছে? এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। কিন্তু এই প্রশ্নগুলো আমার মগজটাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। আমার মাথার ভেতর একটা ব্লেন্ডার মেশিন চলছে, যেটা আমার সমস্ত লজিক, সমস্ত ভাবনাকে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলছে।

আমি এখন কী করব?

আমার তো এখনই পালানো উচিত। বাংলাদেশ ছেড়ে, বর্ডার ক্রস করে ইন্ডিয়া বা নেপালে পালিয়ে যাওয়া উচিত। কিন্তু আমার পকেটে তো টাকা নেই। আমার পাসপোর্ট নেই। আমি কোথায় পালাব? বিপদে পড়লে মানুষ সাধারণত তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু বা পরিবারের সাথে শেয়ার করে। মানুষ চায় কারো কাঁধে মাথা রেখে একটু কাঁদতে, একটু সান্ত্বনা পেতে। কিন্তু আমার এই বিপদটা এতটাই নোংরা, এতটাই কদর্য এবং এতটাই অবিশ্বাস্য যে, এটা কারো সাথে শেয়ার করার উপায় নেই।

আমি যদি আমার বাবা-মাকে বলি যে আমি অন্যের স্ত্রীর সাথে শুতে গিয়ে এখন গুমের মামলায় ফেঁসে যাচ্ছি, বাবা হার্ট অ্যাটাক করবেন আর মা বিষ খাবেন। মেসের তুহিন বা রাজুকে বললে ওরা আমাকে রাতেই মেস থেকে বের করে দেবে। ওরা তো ভদ্র ফ্যামিলির ছেলে, ওরা তো কোনো মার্ডার সাসপেক্টকে নিজেদের রুমে থাকতে দেবে না।

আমার এমন একজনকে দরকার, যে এই দুনিয়ার অন্ধকার গলিঘুঁজি খুব ভালো করে চেনে। যে পুলিশ, ক্রাইম, আন্ডারওয়ার্ল্ড আর থানা-পুলিশের সাইকোলজি বোঝে। যে বুঝতে পারবে পুলিশ কীভাবে চিন্তা করে, আর ক্রিমিনালরা কীভাবে ফাঁদ পাতে। এবং সবচেয়ে বড় কথা, আমার এমন কাউকে দরকার যে আমার এই ঘটনা শুনে আমাকে জাজ করবে না। যে আমাকে নীতিবাক্য শোনাবে না বা নৈতিকতার লেকচার দেবে না।

আমি শূন্য দৃষ্টিতে নিউজ রুমের দিকে তাকালাম। হঠাৎ করে আমার মাথায় একটা নাম বিদ্যুতের মতো ঝলসে উঠল।

আশিক ভাই!
Reply


Messages In This Thread
দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:51 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:52 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:52 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:53 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:54 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:54 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:55 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:55 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:26 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:27 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:28 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:55 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:56 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:57 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:58 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:58 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 08:58 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 08:59 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:00 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:01 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:02 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:03 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:06 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:07 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:08 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:08 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:09 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:10 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:12 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:13 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:14 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:16 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:17 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:17 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:18 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:20 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:22 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:23 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:25 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:25 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:26 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - Yesterday, 08:52 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - Yesterday, 08:53 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - Yesterday, 08:53 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - Yesterday, 08:54 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - Yesterday, 08:55 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - Yesterday, 08:58 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - Yesterday, 08:59 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - Yesterday, 08:59 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - Yesterday, 09:00 AM

Forum Jump:


Users browsing this thread: 1 Guest(s)