Thread Rating:
  • 0 Vote(s) - 0 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5

দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin)
#33

৩৩



আমি খুব সাবধানে, মেপে মেপে বললাম, "ভাই, আমি তো থাকতাম আমার গেস্ট রুমে। সারাদিন ল্যাপটপ নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম। আপু উনার রুমে থাকতেন। উনাদের ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলানোর তো আমার কোনো রাইট ছিল না। তবে যতদূর দেখেছি, আপুকে তো বেশ হাসিখুশিই মনে হতো। ফোনে কথা বলার সময় কখনো চিল্লাচিল্লি বা ঝগড়া করতে শুনিনি। আমার তো মনে হয়েছে উনাদের সম্পর্ক খুব ভালো।"

"আনিকা ম্যাডামের কোনো আচরণে কি আপনার কখনো কিছু সন্দেহজনক মনে হয়েছে? ধরুন, উনি হয়তো খুব গোপনে কারো সাথে কথা বলতেন, বা হঠাৎ করে রাতে বাইরে যেতেন?"

"না ভাই, একদমই না," আমি মাথা নেড়ে বললাম। "আপু তো সারাদিন উনার লেখালেখি আর উনার আইটি ফার্মের রিমোট কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। উনি খুব প্রফেশনাল একজন মানুষ। আমার অন্তত কোনো কিছু সন্দেহজনক মনে হয়নি।"

আমি এত সুন্দর করে, এত নিখুঁতভাবে মিথ্যাগুলো বলে যাচ্ছিলাম যে আমার নিজেরই মাঝে মাঝে অবাক লাগছিল। মানুষের বাঁচার তাগিদ তাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বানিয়ে দিতে পারে। আমার কথাগুলো এসআই তৌহিদ উনার একটা ছোট নোটবুকে টুক করে লিখে নিলেন।

এর মধ্যেই একজন কনস্টেবল দুটো লাল রঙের প্লাস্টিকের কাপে করে চা দিয়ে গেল। "চা খান রাশেদ ভাই। থানার চা, খুব একটা ভালো হবে না, তবে গলা ভেজানো যায়," এসআই তৌহিদ হাসিমুখে নিজের কাপটা হাতে নিলেন। আমি চায়ের কাপে একটা চুমুক দিলাম। চায়ে আদার কড়া একটা ফ্লেভার। আমার স্নায়ুগুলো এখন অনেকটাই রিল্যাক্সড।

চা খেতে খেতে এসআই তৌহিদ হঠাৎ একটু ব্যক্তিগত সুরে জিজ্ঞেস করলেন, "আচ্ছা রাশেদ ভাই, আপনি তো একজন বুদ্ধিমান মানুষ, সাংবাদিক। আপনার সিক্সথ সেন্স কী বলে? আপনার কী মনে হয়, এই বেলাল সাহেব লোকটা কই নিখোঁজ হলো? কীভাবে নিখোঁজ হলো?"

আমি চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে একটু ভাবার ভান করলাম। "ভাই, আমি তো আসলে উনাকে চিনিই না। তবে ঢাকা শহরের যা অবস্থা! হয়তো এয়ারপোর্ট থেকে আসার পথে, বা ওইদিন রাতে বাইরে বের হওয়ার পর কোনো ছিনতাইকারী বা মলম পার্টির পাল্লায় পড়েছেন। উনারা তো এলিট ক্লাসের মানুষ, হাতে দামি ফোন, পকেটে পাউন্ড-ডলার থাকে। সন্দেহ করার মতো কোনো নির্দিষ্ট কাউকে তো আমি দেখছি না।"

এসআই তৌহিদ শুধু মাথা নাড়লেন। কিছু বললেন না। আমি বুঝলাম, এই লোকটা আমাকে জাস্ট একটা রুটিন জিজ্ঞাসাবাদের জন্যই ডেকেছে। আমার ওপর উনার বিন্দুমাত্র কোনো সন্দেহ নেই। আমি এখন পুরোপুরি সেফ জোনে আছি। আর এই সেফ জোনে থাকার কনফিডেন্স থেকেই আমি আমার ট্রাম্প কার্ডটা খেলার সিদ্ধান্ত নিলাম। আশিক ভাই আমাকে যে কার্ডটা দিয়েছিলেন।

"আচ্ছা তৌহিদ ভাই, একটা কথা জিজ্ঞেস করি?" আমি খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বললাম।
"জি, বলুন।"
"আপনাদের থানার ওসি শাহাদাত সাহেবের সাথে কি একটু দেখা করা যাবে? উনি কি আছেন থানায়?"

ওসি শাহাদাত সাহেবের নাম শোনার সাথে সাথেই এসআই তৌহিদের চোখের দৃষ্টিতে একটা সূক্ষ্ম পরিবর্তন এল। উনি কাপ থেকে মুখ তুলে একটু অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালেন। "স্যার তো উনার রুমে আছেন। কিন্তু কেন? উনাকে চিনেন কীভাবে?"

আমি খুব শান্তভাবে, একটু হালকা হাসি দিয়ে বললাম, "না, তেমন কোনো দরকার নেই। আসলে ওসি শাহাদাত সাহেব আমার এক বড় ভাইয়ের খুব ক্লোজ বন্ধু। আমাদের ঢাকা পেপারসের ক্রাইম রিপোর্টার আশিক ভাই। আশিক ভাই বললেন, কলাবাগান থানায় যখন যাচ্ছি, তখন শাহাদাত ভাইকে যেন একটা সালাম দিয়ে আসি।"

আশিক ভাইয়ের নাম আর ওসি সাহেবের বন্ধুত্বের রেফারেন্সটা একটা ম্যাজিকের মতো কাজ করল। এমনিতেই এসআই তৌহিদ আমার সাথে খুব ভদ্র আচরণ করছিলেন, কিন্তু এই কথাটা শোনার পর উনার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এক নিমেষে আরও বেশি নম্র, আরও বেশি বন্ধুসুলভ হয়ে গেল। পুলিশ ডিপার্টমেন্টে উপর মহলের রেফারেন্স বা ক্রাইম রিপোর্টারদের কানেকশন খুব বিশাল একটা ব্যাপার।

"ওহ! আপনি আশিক ভাইয়ের কলিগ! উনি তো আমাদের থানার রেগুলার গেস্ট।"

আমার ভেতরের সাংবাদিক এবং কৌতূহলী সত্তাটা এবার একটু নড়েচড়ে বসল। পরিস্থিতি যখন এতটা আমার অনুকূলে, তখন এই সুযোগে কেসটার আসল আপডেট জেনে নেওয়াটা কি বুদ্ধিমানের কাজ হবে না?

"তৌহিদ ভাই, কিছু মনে না করলে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?" আমি একটু গলা নামিয়ে বললাম।
"জি, সিওর।"
"এই বেলাল সাহেবের মিসিং কেসটা আসলে কতদূর আগাল? মানে, পুলিশ কি কোনো ক্লু পেয়েছে?"

এসআই তৌহিদ একটু ইতস্তত করলেন। উনার পেশাদারি আচরণ উনাকে বাধা দিচ্ছিল। "দেখুন রাশেদ ভাই, কেস রিলেটেড কারও সঙ্গে তথ্য শেয়ার করাটা ঠিক হবে না।  রুলসের বাইরে।"

আমি একটু হাসলাম। "ভাই, আমি তো সাংবাদিক। আপনি না বললেও আমিও জেনে যাব। আমার আসলে জাস্ট কৌতূহল থেকে জানতে চাওয়া। তাছাড়া, বলা তো যায় না, হয়তো আপনাদের ইনভেস্টিগেশনে আমার কোনো কথা বা কোনো ধারণা হেল্পও হতে পারে।"

এসআই তৌহিদ কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটু সামনের দিকে ঝুঁকে এলেন। "মিডিয়াতে যতটুকু ব্রিফ করা যায়, আমি আপনাকে ততটুকুই বলছি। বেলাল সাহেবের নিখোঁজ হওয়ার প্যাটার্নটা খুব অদ্ভুত। আমরা উনার ফোন কল হিস্ট্রি আর লোকেশন ট্র্যাকিং করে দেখেছি। ওইদিন রাতে, মানে যে রাতে উনি নিখোঁজ হন, উনার নাম্বারে একটা আননোন নাম্বার থেকে কল এসেছিল। কথা হয়েছিল মাত্র চল্লিশ সেকেন্ড।"

আমি রুদ্ধশ্বাসে শুনছিলাম।

"সমস্যাটা হলো," এসআই তৌহিদ কপালে ভাঁজ ফেলে বললেন, "যেই নাম্বার থেকে কল এসেছিল, সেই নাম্বারটা ওইদিন রাতেই প্রথম অন হয়েছে। একটা বার্নার বা ফেক সিম। আমরা সিমের বায়োমেট্রিক আর এনআইডি চেক করে দেখেছি। ওই সিমটা যার নামে কেনা হয়েছে, সেই লোক আজ থেকে তিন বছর আগে মারা গেছে! মানে, সম্পূর্ণ ভুয়া ডকুমেন্ট দিয়ে সিমটা তোলা।"

আমার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা হিমশীতল স্রোত নেমে গেল। ভুয়া ডকুমেন্টে তোলা সিম! মৃত মানুষের এনআইডি! এগুলো তো কোনো সাধারণ ছিনতাইকারী বা মলম পার্টির কাজ নয়! এগুলো তো হাই-লেভেলের, প্রি-প্ল্যানড প্রফেশনাল ক্রিমিনালদের কাজ।

"তারপর?" আমি শুকনা গলায় জিজ্ঞেস করলাম।

"তারপর আর কী! ওই চল্লিশ সেকেন্ড কথা বলার পর বেলাল সাহেব সম্ভবত ফ্ল্যাট থেকে নিচে নামেন। আর ফ্ল্যাট থেকে বের হওয়ার ঠিক দশ মিনিটের মাথায় উনার ফোনটা সুইচড অফ হয়ে যায়। চিরতরের জন্য। ওই লাস্ট লোকেশনটা দেখাচ্ছে ধানমন্ডি লেকের কাছাকাছি। তারপর আর কোনো ট্র্যাকিং করা যায়নি। সিমটা কেউ হয়তো খুলে ফেলে দিয়েছে।"

এসআই তৌহিদ একটা হতাশার নিশ্বাস ফেললেন। "আমরা আত্মীয়স্বজন, ওই বিল্ডিংয়ের দারোয়ান, উনার স্ত্রী আনিকা ম্যাডাম, এবং এই যে আপনি— সবার সাথেই কথা বললাম। কিন্তু কেইসটা এক ইঞ্চিও আগায়নি ভাই। কোনো মোটিভ পাচ্ছি না। কোনো মুক্তিপণের দাবিও আসেনি। এদিকে বেলাল সাহেব হলেন একদম এলিট ক্লাসের লোক, ইংল্যান্ডের সিটিজেন। ওপর মহল থেকে প্রচণ্ড প্রেসার আসছে কেইসটা সলভ করার জন্য। আমরা রীতিমতো ঘামছি।"

আমি এসআই তৌহিদের দিকে তাকিয়ে একটা সমবেদনা জানানোর ভান করলাম। "ভালোই তো গ্যাঞ্জামে পড়েছেন আপনারা ভাই। কেইসটা তো দেখছি বেশ জটিল।"

"আর বইলেন না! দেখি কতদূর কী হয়। আমাদের টেকনিক্যাল টিম কাজ করছে," এসআই তৌহিদ উঠে দাঁড়ালেন।

আমাদের কথাবার্তা শেষ। উনি আমাকে দরজার দিকে এগিয়ে দিতে এলেন। "রাশেদ ভাই, আপনি তাহলে এখন আসতে পারেন। আপনার যদি ওই ফ্ল্যাটের কোনো ঘটনা বা কোনো কথা হঠাৎ মনে পড়ে, যেটা আমাদের হেল্প করতে পারে, তাহলে আমাকে কাইন্ডলি জানাবেন," উনি পকেট থেকে উনার একটা ভিজিটিং কার্ড বের করে আমাকে দিলেন। "এটা আমার পার্সোনাল নাম্বার। যেকোনো সময় কল করতে পারেন।"

আমি কার্ডটা সযত্নে আমার মানিব্যাগে রেখে দিলাম। "অবশ্যই ভাই। আর সাংবাদিক হিসেবে আমি যদি কোনো হেল্প করতে পারি, আমাকে জানাবেন। শুধু এই কেইসই হতে হবে এমন না, যেকোনো ব্যাপারেই। আশিক ভাইয়ের ছোট ভাই হিসেবে আমাকে সবসময় পাশে পাবেন।"

"থ্যাংক ইউ ভাই। ভালো থাকবেন।"

আমি থানা থেকে বেরিয়ে এলাম।

বিকেলের রোদের তেজ কমে এসেছে। কলাবাগানের রাস্তায় তখন জ্যাম শুরু হয়ে গেছে। আমি থানার গেট থেকে বেরিয়ে একটা বুকভরে শ্বাস নিলাম। মনে হলো, আমি যেন একটা জ্বলন্ত চুল্লি থেকে অক্ষত অবস্থায় ফিরে এসেছি। আমি আর এক সেকেন্ডও দেরি করলাম না। পকেট থেকে ফোন বের করে সরাসরি আশিক ভাইকে কল দিলাম।

"হ্যালো, রাশেদ? কী অবস্থা? বাইর হইছস থানা থাইকা?" আশিক ভাইয়ের গলা শুনে মনে হলো উনি জেনেই বসে আছেন আমি সেফলি বের হয়েছি।

"জি ভাই, এইমাত্র বের হলাম। আপনার কথা অক্ষরে অক্ষরে কাজে লেগেছে ভাই। ওসি শাহাদাত সাহেবের নাম বলতেই এসআই তৌহিদ একদম গলে পানি হয়ে গেছে। আমাকে রীতিমতো সম্মান করে বিদায় দিয়েছে।" আমি সব খুলে বললাম।

আশিক ভাই ওপাশ থেকে একটা সন্তুষ্ট হাসি দিলেন। "আমি তো তোমারে আগেই কইছিলাম প্যারা নাই! তুমি স্মার্ট ছেলে, ভালো সামাল দিয়া আসছ। পুলিশরে কখনো বুঝতে দিবা না যে তুমি ভয় পাইতেছ। এখন যাও, আরামে গিয়া মেসে ঘুমাও।"

"থ্যাংক ইউ ভাই। আপনার এই ঋণ আমি জীবনেও শোধ করতে পারব না।"

ফোন রেখে আমি মিরপুরের বাসে উঠলাম।

বাসের জানালার পাশে বসে আমি বাইরের ছুটে চলা ঢাকার রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার ওপর থেকে পুলিশের রিমান্ডের ভয়টা হয়তো কেটে গেছে, কিন্তু আমার মাথার ভেতর একটা ভয়াবহ, কালো মেঘ ঘনীভূত হতে শুরু করেছে। এসআই তৌহিদের বলা কথাগুলো আমার মগজে একটা হাতুড়ির মতো বাড়ি মারছিল। মৃত মানুষের আইডি দিয়ে তোলা ভুয়া সিম! চল্লিশ সেকেন্ডের একটা ফেক কল! ফোন চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়া! এগুলো কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এটা একটা নিখুঁত, প্রি-প্ল্যানড গুমের ছক।

আর আনিকা?

আনিকা নাওহার কি সত্যিই এসবের কিচ্ছু জানেন না? উনি কি সত্যিই একজন সাধারণ, শোকাহত স্ত্রী? নাকি... নাকি এই পুরো মাস্টারপ্ল্যানটা উনারই মস্তিষ্কপ্রসূত? বেলাল সাহেবকে দুনিয়া থেকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য এই ভুয়া সিম, এই ফেক কল— সব কি উনারই সাজানো নাটক?

আর যদি তাই হয়, তবে আমি, রাশেদ আহমেদ, একজন পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের বোকা অনুবাদক, কি উনার এই ভয়ংকর, রক্তমাখা দাবা খেলার একটা সাধারণ ঘুঁটি মাত্র? আমার পুরো শরীরটা বাসের সিটের ওপর একটা অজানা আতঙ্কে শিউরে উঠল।

বাস থেকে মিরপুর দশ নাম্বারে নেমে আমি সোজা মেসে ঢুকলাম না।

আমাদের মেসের নিচে একটা টং দোকান আছে। মজিদ মামার চায়ের দোকান। আমি সেখানে গিয়ে একটা কাঠের বেঞ্চে ধপ করে বসে পড়লাম। "মামা, কড়া করে এক কাপ চা দাও তো। আর একটা বেনসন।" সিগারেটটা ধরিয়ে আমি গভীর একটা টান দিলাম। নিকোটিনের ধোঁয়াটা ফুসফুসে গিয়ে ধাক্কা মারতেই মনে হলো, আমার শরীরের অবশ হয়ে যাওয়া স্নায়ুগুলো আবার একটু একটু করে কাজ করতে শুরু করেছে। ঢাকা শহরের এই ধুলোমাখা বিকেলে, রাস্তার পাশের একটা টং দোকানে বসে চা আর সিগারেট খাওয়ার মধ্যে একটা অদ্ভুত দার্শনিক প্রশান্তি আছে। মানুষ যখন মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসে, কিংবা থানা-পুলিশের মতো কোনো ভয়াবহ বিপদ থেকে বেঁচে ফেরে, তখন তার চারপাশের এই অতি সাধারণ, রুটিনমাফিক পৃথিবীটাকেও অনেক বেশি সুন্দর এবং মায়াময় বলে মনে হয়।

রাস্তা দিয়ে রিকশাগুলো টুংটাং বেল বাজিয়ে যাচ্ছে, মানুষ হৈচৈ করছে, বাসের হেলপাররা গলা ফাটিয়ে যাত্রী ডাকছে। আমি এই সাধারণ, কোলাহলময় পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। আমার তো এই সাধারণ পৃথিবীতেই থাকার কথা ছিল! আমি কেন ওই আনিকা নাওহার নামের এক মায়াবিনী, বিলিয়নিয়ার নারীর চক্রব্যূহে নিজেকে জড়াতে গেলাম?

দুটো সিগারেট আর এক কাপ চা শেষ করে আমি মেসের সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠলাম। মেসের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই একটা গুমোট, স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ নাকে এসে লাগল। রাজু আর তুহিন রুমে নেই। হয়তো বাইরে কোথাও গেছে। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। এখন এই মুহূর্তে কারো জেরার মুখে পড়ার মতো মানসিক অবস্থা আমার নেই।

আমি সোজা বাথরুমে ঢুকে গেলাম। মিরপুরের মেসের এই দশ ফুট বাই চার ফুটের বাথরুম। শ্যাওলা ধরা দেয়াল, কল ছাড়লে পানি পড়ার চেয়ে ঘড়ঘড় শব্দটাই বেশি হয়। আমি জামাকাপড় খুলে বালতি থেকে মগে করে ঠান্ডা পানি মাথায় ঢালতে শুরু করলাম। ঠান্ডা পানি গায়ের ওপর পড়তেই আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল ধানমন্ডির সেই ষোলো তলা বিল্ডিংয়ের সাত তলার ফ্ল্যাটের মাস্টার বাথরুমের দৃশ্য।

কোথায় এই বালতির পানি, আর কোথায় সেই রেইন-শাওয়ার! চোখ বন্ধ করতেই আমার কল্পনার ক্যানভাসে আনিকা নাওহারের সেই ভেজা, অনাবৃত শরীরটা জীবন্ত হয়ে উঠল। আমার মনে পড়ল, কীভাবে শাওয়ারের গরম পানির নিচে দাঁড়িয়ে উনি আমাকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরেছিলেন। উনার সেই ফর্সা, মসৃণ পিঠের ওপর দিয়ে কীভাবে পানির ফোঁটাগুলো গড়িয়ে উনার সুডৌল নিতম্বের খাঁজে গিয়ে হারিয়ে যাচ্ছিল। আমি আমার দুই হাত দিয়ে উনার কোমর চেপে ধরেছিলাম। উনার ভেজা ঠোঁটের সেই বন্য, আদিম চুম্বন— যার মধ্যে কোনো ভণিতা ছিল না, ছিল শুধু এক সর্বগ্রাসী ক্ষুধা।

গোসল করতে করতে আমি আনিকার শরীরের প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি স্পর্শ নতুন করে স্মরণ করতে লাগলাম। আমার মনে পড়ল, কীভাবে আমি উনার গলার কাছে মুখ গুঁজে উনার পারফিউম আর ঘামের সেই মাতাল করা গন্ধটা টেনে নিয়েছিলাম। উনার স্তনের সেই উদ্ধত চূড়াগুলো যখন আমার বুকের সাথে ঘষা খাচ্ছিল, তখন উনার গলা দিয়ে বেরিয়ে আসা সেই চাপা, তীক্ষ্ণ দীর্ঘশ্বাসগুলো আমার কানে একটা নেশাধরা সিম্ফনির মতো বাজত। আমি উনার ভেজা চুলের ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে উনার মুখটা আমার দিকে টেনে নিতাম, আর উনি উনার দুই পা দিয়ে আমার কোমরটা এমনভাবে পেঁচিয়ে ধরতেন যেন উনি আমার শরীরের ভেতরেই মিশে যেতে চাইছেন।

এই স্মৃতিগুলো এতই জীবন্ত আর এতই তীব্র ছিল যে, মেসের বাথরুমের কনকনে ঠান্ডা পানির নিচে দাঁড়িয়েও আমার শরীরের ভেতর দিয়ে একটা উষ্ণ, বৈদ্যুতিক স্রোত বয়ে গেল। আমার নিস্তেজ হয়ে থাকা শরীরটা আবার নতুন করে উত্তেজনায় টানটান হয়ে উঠতে শুরু করল। আনিকা নাওহার শুধু আমার শরীরকেই নয়, আমার মন, আমার কল্পনা, আমার পুরো অস্তিত্বটাকেই উনার হাতের মুঠোয় বন্দি করে ফেলেছেন।

গোসল শেষ করে তোয়ালে দিয়ে শরীর মুছে আমি নিজের রুমে এলাম। একটা ক্যাজুয়াল টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরে বিছানায় বসলাম। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলাম। থানা থেকে ফিরে আনিকাকে একটা আপডেট দেওয়া দরকার। কিন্তু সরাসরি ফোন করাটা কি ঠিক হবে? পুলিশ যদি সত্যিই বেলাল সাহেবের কল লিস্ট চেক করে আনিকার ফোন ট্যাপ করে বসে থাকে?

আমি বারান্দায় গিয়ে বসলাম। বিকেলের রোদটা এখন বেশ নরম হয়ে এসেছে। আমি খুব সতর্ক হয়ে হোয়াটসঅ্যাপটা ওপেন করলাম।

অফিসিয়াল, দূরত্ব বজায় রাখা একটা মেসেজ ড্রাফট করলাম: "আপু, একটু কথা ছিল। ফ্রি হয়ে কল দিয়েন।"

'আপু' শব্দটা টাইপ করার সময় আমার নিজেরই হাসি পেল। যে নারীর শরীরের প্রতিটি ইঞ্চি আমি আমার জিভ দিয়ে মুখস্থ করেছি, তাকে আমি 'আপু' বলে মেসেজ দিচ্ছি! কিন্তু এছাড়া আর কোনো উপায় নেই। পুলিশের নজরদারি এড়াতে গেলে এমন ভণ্ডামি করা ছাড়া গতি নেই।
মেসেজটা সেন্ড করার ঠিক এক মিনিটের মাথায় আমার হোয়াটসঅ্যাপটা বেজে উঠল।

আনিকা কল করেছেন!

আমার বুকের ভেতরটা একটু ধক করে উঠল। এত দ্রুত কল দিলেন? আমি একটু ইতস্তত করে, এদিক-ওদিক তাকিয়ে কলটা রিসিভ করলাম। "হ্যালো?" আমি খুব নিচু, সতর্ক গলায় বললাম।

"কী ব্যাপার? হঠাৎ 'আপু' বলে মেসেজ দিলে যে?" ওপাশ থেকে আনিকার সেই পরিচিত, মোহনীয় এবং একটু কৌতুক মেশানো গলা ভেসে এল। আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। কীভাবে বোঝাব উনাকে যে আমি কতটা আতঙ্কের মধ্যে আছি!

"আনিকা... আমি তো ভেবেছিলাম পুলিশ হয়তো তোমার ফোন ট্যাপ করে রেখেছে," আমি ফিসফিস করে বললাম। "আজকে বিকেলে আমাকে কলাবাগান থানায় ডেকেছিল।"

আমার কথা শুনে আনিকা একটুও চমকালেন না। বরং ওপাশ থেকে একটা দমকা হাসির শব্দ এল। "হা হা হা! ও আচ্ছা! তুমি ফোন ট্যাপের ভয় পাচ্ছ? তুমি তো দেখছি হলিউডের জেমস বন্ডের সিনেমা একটু বেশিই দেখো রাশেদ!" আনিকা হাসতে হাসতেই বললেন।

"হাসছ কেন আনিকা? এটা কোনো জোকস না। পুলিশ যদি সত্যিই আমাদের কথা শোনে?"

"আরে বোকা!" আনিকা হাসি থামিয়ে একটু সিরিয়াস, কিন্তু আত্মবিশ্বাসী গলায় বললেন। "এটা সাধারণ লোকাল কল না। এটা হোয়াটসঅ্যাপ কল। হোয়াটসঅ্যাপ এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপ্টেড। বাংলাদেশ সরকার চাইলেই আমার বা তোমার হোয়াটসঅ্যাপের ডেটা বা কল রেকর্ড নিতে পারবে না। এটার জন্য একমাত্র হোয়াটসঅ্যাপ কোম্পানি বা মেটার অনুমতি লাগবে। আর মেটা কোনো থার্ড ওয়ার্ল্ড কান্ট্রির পুলিশকে এত সহজে এসব ডেটা দেয় না।"

আনিকার এই টেকনিক্যাল জ্ঞান আমাকে একটু অবাক করল। উনি বলে চললেন, "আর তাছাড়া, আমার এই হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারটা তো বাংলাদেশের না। এটা আমার ইংল্যান্ডের নাম্বার দিয়ে খোলা। আমার এই অ্যাকাউন্টের কোনো ডেটা বের করতে গেলে বাংলাদেশ পুলিশকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে ইংল্যান্ডের কোর্টের অর্ডার নিয়ে আসতে হবে। একটা সাধারণ নিখোঁজ ডায়েরির জন্য পুলিশ এত কাঠখড় পোড়াবে বলে তোমার মনে হয়?"

উনার যুক্তিগুলো বেশ অকাট্য। কিন্তু আমি তো বাঙালি মধ্যবিত্ত পুরুষ। আমার ভয় তো এত সহজে যাওয়ার নয়। "তোমার ডেটা না হয় ইংল্যান্ডের কোর্টের অর্ডারে আটকে থাকবে," আমি একটু খুকখুক করে কেশে বললাম। "কিন্তু আমারটা তো আর ইংল্যান্ডের কোর্ট দেখবে না। আমি তো এই দেশেই থাকি। পুলিশ তো চাইলে আমার ডিভাইস ট্র্যাক করতেই পারে।"

আমার এই পালটা যুক্তিতে আনিকা একটু বিরক্ত হলেন বলে মনে হলো। "রাশেদ, তুমি না বেশি চিন্তা করো। পুলিশ তোমার ডিভাইস ট্র্যাক করে কী পাবে? তুমি আমার প্রুফরিডার, আমি তোমার ক্লায়েন্ট। আমরা কাজ নিয়ে কথা বলি। এর বাইরে তো কিছু প্রমাণ করার নেই। বাদ দাও এসব পুলিশের কথা। থানায় কী হলো, সেটা তো বললে না।"

আমি সংক্ষেপে এসআই তৌহিদের সাথে আমার কনভারসেশনটা জানালাম। আশিক ভাইয়ের রেফারেন্সের কথাটাও বললাম। "গুড। তুমি খুব স্মার্টলি ডিল করেছ। আমি জানতাম তুমি পারবে," আনিকা খুব শান্ত গলায় বললেন।

"আচ্ছা, এসব বাদ দাও," আনিকা হঠাৎ উনার গলার স্বরটা পাল্টে ফেললেন। উনার গলায় এখন একটা অদ্ভুত, কোমল অথচ দাবিদার সুর। "কাল বিকেলে একটু শাহবাগ মোড়ে আসবে?"

শাহবাগ মোড়ে!

কথাটা শোনার সাথে সাথেই আমার বুকের ভেতর একটা আনন্দের ঢেউ খেলে গেল। আমার মনে হলো, থানার এই সব প্যারা, বেলাল সাহেবের নিখোঁজ হওয়ার টেনশন— সব কিছু হয়তো আনিকা আমাকে ভুলিয়ে দিতে চাইছেন। কাল বিকেলে শাহবাগ মোড়ে দেখা করা মানে হয়তো আমরা কোনো নিরিবিলি জায়গায় যাব। হয়তো উনি আমাকে উনার কোনো গোপন ডেরায় নিয়ে যাবেন, যেখানে আমরা আবার আগের মতো একে অপরকে আদরে আদরে ভরিয়ে দিতে পারব।

"শাহবাগ মোড়ে? কটায় আসব?" আমি আমার গলার উচ্ছ্বাসটা লুকানোর চেষ্টা করেও পারলাম না। কিন্তু আমার এই আনন্দকে এক বালতি বরফ-ঠান্ডা পানি দিয়ে নিমেষেই নিভিয়ে দিলেন আনিকা।

"বিকেল চারটার দিকে এসো," আনিকা খুব ক্যাজুয়াল গলায় বললেন। "আসলে কালকে শাহবাগে বেলালের বন্ধু আর পরিচিতরা মিলে একটা মানববন্ধন করবে। তুমিও এসো।"

"কিসের মানববন্ধন?" আমি হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

"আরে, জাস্ট একটা সামাজিকতা। বেলালের ভার্সিটির কিছু বন্ধু আর ওর প্রাক্তন কলিগরা মিলে এই ইভেন্টটা দাঁড় করিয়েছে। ব্যানার নিয়ে দাঁড়াবে— 'ইঞ্জিনিয়ার বেলালের খোঁজ চাই', 'প্রশাসন জবাব দাও'— এই টাইপের কিছু লোকদেখানো ফাঁকা বুলি আরকি। তুমি তো জানোই আমাদের দেশের মানুষ হুজুগে কতটা মাতাল হয়।" আনিকা খুব তাচ্ছিল্যের সুরে কথাগুলো বললেন।

আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। এই নারীটা আসলে কী! নিজের স্বামী নিখোঁজ, তার বন্ধুরা তাকে খোঁজার জন্য মানববন্ধন করছে, আর উনি বলছেন এটা 'লোকদেখানো ফাঁকা বুলি'!

"তাতে আমার যাওয়ার কী দরকার?" আমি বিরক্তি নিয়ে বললাম। "আমি তো বেলাল সাহেবকে চিনিই না।"

"আরে, এই জন্যই তো যেতে বলছি," আনিকা হেসে উঠলেন। "ওইসব বন্ধুরা ওখানে দাঁড়িয়ে মিডিয়ার সামনে বড় বড় নীতিবাক্য আর লোকদেখানো মায়াকান্না কাঁদবে। এরপর মানববন্ধন শেষ হলে, আমার টাকায় শাহবাগের কোনো রেস্টুরেন্টে গিয়ে চা-শিঙাড়া গিলে যে যার বাসায় কেটে পড়বে। এটাই তো রিয়েলিটি। আমি চাই তুমি সেখানে থাকো। তুমি আমার পরিচিত একজন হয়ে আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকলে ব্যাপারটা খুব ন্যাচারাল দেখাবে।"

"কিন্তু এতে লাভ কী আনিকা?"

"লাভ আছে। মিডিয়া কভারেজ পেলে পুলিশ প্রশাসন একটু নড়েচড়ে বসবে। তারা বুঝতে পারবে যে বেলালের ফ্যামিলি আর বন্ধুরা চুপ করে বসে নেই। এতে করে পুলিশ কেসটা সিরিয়াসলি নেবে।"

আমি আর নিজেকে আটকাতে পারলাম না। আমার মাথার ভেতর তখন লজিকের একটা ভয়ংকর দ্বন্দ্ব চলছে। "পুলিশ যদি কেসটা সিরিয়াসলি নেয়, তাহলে তো বিপদটা তোমারই বেশি আনিকা!" আমি একটু চড়া গলায় বলে ফেললাম। "পুলিশ যদি একটু বেশি গভীরে গিয়ে তদন্ত করে, আর যদি দেখে যে বেলালের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে তোমারই কোনো..."

আমি বাক্যটা শেষ করতে পারলাম না।

ওপাশ থেকে আনিকার নিশ্বাস নেওয়ার শব্দটা হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য একটা হিমশীতল, পিনপতন নীরবতা। আমি বুঝতে পারলাম, আমি এমন একটা কথা বলে ফেলেছি, যেটা উনার ইগোতে এবং উনার আত্মসম্মানে একটা ভয়ংকর আঘাত করেছে।

"রাশেদ," আনিকার গলাটা এখন আর রেশমি বা মোহনীয় নেই। উনার কণ্ঠস্বরটা এখন একটা ধারালো ব্লেডের মতো হয়ে গেছে। "আমি বেশ কয়েকদিন ধরেই খেয়াল করছি, বেলালের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে তুমি আমাকেই এক প্রকার দায়ী করে ফেলছ। তুমি কোথায় কোথায়, কথায় কথায় ইঙ্গিত করে জিজ্ঞেস করছ, আমি কিছু করেছি কি না। আমি বেলালের সাথে কিছু ঘটিয়েছি কি না!"

"আনিকা, আমি আসলে তা বোঝাতে চাইনি..." আমি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলাম।

"শাট আপ রাশেদ!" আনিকা হিসহিস করে উঠলেন। "আমার প্রতি তোমার এইটুকুও বিশ্বাস নেই? আমি যদি বেলালকে কিছু করতামই, তাহলে কি আমি নিজে গিয়ে থানায় জিডি করে পুলিশকে ডাকতাম? তোমার কি মনে হয় আমি এত বড় একটা বোকা? আর সবচেয়ে বড় কথা— যখন তুমি আমার ফ্ল্যাটে, আমার বিছানায় বসে আমার শরীরটা একটা পশুর মতো খুবলে খাচ্ছিলে, তখন তো তোমার চোখে এই অবিশ্বাস দেখিনি! তখন তো তুমি আমার প্রতিটা ইঞ্চি শরীর ভোগ করার জন্য লালা ঝরিয়েছ। আর এখন, একটু বিপদের গন্ধ পেয়েই তুমি আমাকে খুনি বানাতে চাইছ?"

আনিকার কথাগুলো একটা চাবুকের মতো আমার মুখে এসে লাগল। আমি অপমানে আর অপরাধবোধে একদম কুঁকড়ে গেলাম। "সরি আনিকা... আই অ্যাম রিয়েলি সরি। আমি আসলে টেনশনে উল্টাপাল্টা বকে ফেলেছি," আমি একদম মিনমিন করে বললাম।

আনিকা কয়েকটা গভীর শ্বাস নিলেন। উনার রাগটা কিছুটা কমল বলে মনে হলো। "শোনো রাশেদ," আনিকা এবার খুব ধীর, কিন্তু অত্যন্ত প্র্যাকটিক্যাল এবং রূঢ় একটা গলায় বললেন। "আমি বেলালকে গুম বা খুন— কিছুই করিনি। আর বাংলাদেশে বলে, এই সমাজব্যবস্থার কারণে আমি তোমার আর আমার ব্যাপারটা গোপন রাখছি। আমি খামোখা একটা সস্তা স্ক্যান্ডালের অংশ হতে চাই না।"

উনি একটু থামলেন। তারপর এমন একটা কথা বললেন, যা শুনে আমার শরীরের পশম খাড়া হয়ে গেল। "এটা যদি ইংল্যান্ড হতো, তাহলে বেলাল নিখোঁজ হলো নাকি খুন হলো, তাতে আমার কিচ্ছু যেত আসত না। আমি বুক ফুলিয়ে সবাইকে বলতাম— হ্যাঁ, আমি রাশেদকে আমার বিছানায় জায়গা দিয়েছি। আমার শরীরের প্রত্যেক জাগায় ওর স্পর্শের দাগ আছে। আমার একান্ত ব্যক্তিগত ইচ্ছায় আমি তোমার সাথে উদ্দাম বন্যতায় মেতে উঠেছি! তাতে কার বাপের কী? কিন্তু এটা বাংলাদেশ রাশেদ। এখানে এমন কিছুর ইশারা পেলে মিডিয়া আর সোশ্যাল মিডিয়া আমাকে একদম ন্যাংটো করে রাস্তায় নামাবে। আমি জানি এখানকার পুরুষদের সাইকোলজি। আমার ফ্ল্যাটের ওই দারোয়ান মফিজও তখন আমার দিকে তাকিয়ে জিভের রস ফেলবে। ওর ভাবটা এমন হবে যেন— 'এই মহিলা যখন একটা সাধারণ অনুবাদককে নিজের শরীরে জায়গা দিয়েছে, তাহলে তো সুযোগ পেলে সে আমাকেও ভোগ করতে দেবে!' এই নোংরা সমাজ, এই সস্তা মানসিকতার মানুষদের ঝামেলার কারণেই আমি তোমার ব্যাপারটা কাউকে বলছি না।"

আমি স্তব্ধ হয়ে উনার কথাগুলো শুনছিলাম। এই নারীর মানসিকতা, উনার সাহস আর উনার এই অকাট্য যুক্তি আমাকে পুরোপুরি বোবা করে দিল। "নয়তো তোমাকে নিয়ে আমার কোনো দ্বিধা নেই রাশেদ। তুমি আমার জীবনে আসা অন্যতম সেরা একটা এক্সপেরিয়েন্স," আনিকা উনার গলার স্বরটা আবার একটু নরম করে বললেন।

"আমি বুঝতে পেরেছি আনিকা। আমাকে ক্ষমা করো। আমি আর কখনো তোমাকে সন্দেহ করব না," আমি খুব আন্তরিকভাবেই বললাম।

"ঠিক আছে। কাল শাহবাগে থেকো। বাই," বলে আনিকা কলটা কেটে দিলেন।

আমি মোবাইলটা হাতে নিয়ে বারান্দার ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে রইলাম। আনিকা নাওহার আমাকে এমন একটা ঘোরের মধ্যে ফেলে দিয়েছেন, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো রাস্তা আমার জানা নেই। এই নারীটা একাধারে একটা রহস্যময়ী ধাঁধা, একটা নিষ্ঠুর কর্পোরেট মাইন্ড, আর একটা জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি। আমি বারান্দা থেকে উঠে আবার আমার রুমে এলাম। রুমে ঢুকে আমি সোজা বাথরুমের দিকে পা বাড়ালাম। বাথরুমের ছিটকিনিটা ভেতর থেকে আটকে দিলাম। আমার মাথার ভেতর তখন আনিকার বলা কথাগুলো ইকো হচ্ছে।

"আমার শরীর নিয়ে, আমার একান্ত ব্যক্তিগত ইচ্ছায় আমি তোমার সাথে উদ্দাম বন্যতায় মেতে উঠেছি..."

"তুমি আমার শরীরটাকে একটা পশুর মতো খুবলে খাচ্ছিলে..."

এই কথাগুলো আমার শরীরের ভেতরের নিভে যাওয়া আগুনটাকে আবার দাউদাউ করে জ্বালিয়ে দিল। আমি পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলাম। আমার গ্যালারির একটা হিডেন ফোল্ডার ওপেন করলাম। সেখানে আনিকার দেওয়া সেই গোপন ছবিগুলো সেভ করা আছে। আমি সেই মিরর সেলফিটা ওপেন করলাম, যেটা উনি আমাকে পাঠিয়েছিলেন।

ছবিতে উনার নগ্ন, ফর্সা শরীর। উনার এক হাত উনার সেই ভরাট, সুডৌল স্তনের ওপর রাখা। উনার চোখ দুটো কামনায় আধবোজা। আমি আমার ট্রাউজারটা নিচে নামিয়ে ফেললাম। আমার পুরুষাঙ্গটি তখন চরম উত্তেজনায় পাথরের মতো শক্ত হয়ে আছে। আমি আমার ডান হাত দিয়ে সেটাকে মুঠি করে ধরলাম।

আমি চোখ বন্ধ করলাম। আমার কল্পনায় আমি এখন আর এই স্যাঁতস্যাঁতে মেসের বাথরুমে নেই। আমি এখন আনিকার সেই ধানমন্ডির ফ্ল্যাটের বিশাল বিছানায়। আমি কল্পনায় দেখতে পাচ্ছি, আনিকা আমার নিচে শুয়ে আছেন। উনার সেই ফর্সা পা দুটো আমার কোমর জড়িয়ে আছে। আমি উনার সেই গোলাপের পাপড়ির মতো নরম, রহস্যময় কেন্দ্রের ভেতর নিজেকে সজোরে সঞ্চালিত করছি। আমার হাতের মুঠির গতি বাড়তে লাগল।

আমার শ্বাস-প্রশ্বাস বাথরুমের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছে। আমি আনিকার ছবিটার দিকে তাকাচ্ছি, আর আমার মনে হচ্ছে আমি যেন উনার স্তনদুটো খামচে ধরে আছি। উনার সেই ঘাতক, রেশমি কণ্ঠস্বর আমার কানের কাছে ফিসফিস করছে— "আমি বুক ফুলিয়ে বলতাম, আমি তোমাকে আমার শরীরে জায়গা দিয়েছি..." এই বন্য, আদিম বাক্যগুলো আমাকে চরম উন্মাদনার দিকে ঠেলে দিল।

"আনিকা... আহহহ... আনিকা..." আমি একটা চাপা গোঙানি দিয়ে উঠলাম।
Reply


Messages In This Thread
দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:51 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:52 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:52 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:53 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:54 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:54 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:55 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:55 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:26 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:27 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:28 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:55 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:56 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:57 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:58 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:58 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 08:58 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 08:59 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:00 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:01 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:02 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:03 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:06 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:07 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:08 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:08 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:09 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:10 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:12 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:13 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:14 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:16 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:17 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:17 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:18 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:20 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:22 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:23 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:25 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:25 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:26 AM

Forum Jump:


Users browsing this thread: 1 Guest(s)