Thread Rating:
  • 0 Vote(s) - 0 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5

দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin)
#35

৩৫




ফোনে যেদিন আনিকা খুব নরম, ভেজা এবং মায়াবী গলায় বললেন, "রাশেদ, বিশ্বাস করো, আমি সত্যিই কিছু জানি না। বেলালের কী হয়েছে, ও কোথায় গেছে, কে ওকে নিয়ে গেছে— আমার কোনো আইডিয়া নেই। আমি শুধু একটা জিনিসই জানি, আমি তোমাকে ভালোবাসি। সত্যিই ভালোবাসি।"


ব্যাস! এই কয়েকটা জাদুকরী শব্দ, আর গলার ওই অদ্ভুত রেশমি কাঁপুনি। আমার মাথার ভেতর গত কয়েকদিন ধরে যে বিশাল অবিশ্বাসের পাহাড় তৈরি হয়েছিল, যে আতঙ্কের সাইক্লোন বইছিল, তা এক নিমিষেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল।

মানুষ কত বোকা হতে পারে! মিষ্টি কথার ক্ষমতা যে কত ভয়ংকর, সেটা আমি সেদিন বুঝলাম। আমার অনুবাদক মস্তিষ্ক, যার কাজই হলো শব্দের পেছনের আসল অর্থ খুঁজে বের করা, সে আমাকে সমানে সতর্ক করে যাচ্ছিল। আমার লজিক আমাকে বারবার বলছিল, "রাশেদ, তুই একটা গাধা! এই মহিলা তোর সাথে নিখুঁত একটা নাটক করছে। সে একজন জাত অভিনয়শিল্পী। শাহবাগের মোড়ে দাঁড়িয়ে শত শত মানুষের সামনে যে নারী চোখের পানি ফেলার অস্কারজয়ী অভিনয় করতে পারে, তার কাছে ফোনে দুই ফোঁটা মিষ্টি কথা বলা তো কোনো ব্যাপারই না। সে তোকে ফাঁদে ফেলছে, তোকে নিজের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।"

কিন্তু আমার মন? সেই মনটা যেন একটা আজ্ঞাবহ দাসের মতো আনিকার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ল। মন বলল, "না, আনিকা যা বলছে সব সত্য। এত সুন্দর একটা মুখ, এত মায়াবী একটা কণ্ঠস্বর কখনো মিথ্যা বলতে পারে না।"

নারী কী অদ্ভুত এক নেশা!

সৃষ্টিকর্তা যখন নারী তৈরি করেছিলেন, তখন হয়তো তিনি নিজের সৃষ্টির দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসেছিলেন। তিনি জানতেন, এই একটা সৃষ্টির কাছে পৃথিবীর সমস্ত শক্তিশালী পুরুষ, সমস্ত তুখোড় দার্শনিক, সমস্ত ক্ষমতাধর সম্রাট একদিন না একদিন হাঁটু গেড়ে বসবে। পৃথিবীর তাবৎ মদ, গাঁজা, আফিম বা কোকেনের নেশা হয়তো একটা সময় পর কেটে যায়; রিহ্যাবে গেলে মানুষ হয়তো ড্রাগস ছাড়তে পারে। কিন্তু নারীর শরীরের, নারীর কথার আর মায়ার যে নেশা— তার কোনো রিহ্যাব সেন্টার এই পৃথিবীতে তৈরি হয়নি, আর কখনো হবেও না।

নারীর আসল ক্ষমতা কোথায় জানেন? তাদের ক্ষমতা তাদের পেশিতে নয়, তাদের ক্ষমতা তাদের চোখের ওই অদ্ভুত মায়ায়। একটা মেয়ে যখন খুব অসহায় চোখে আপনার দিকে তাকায়, যখন তার চোখের কোণে এক ফোঁটা পানি টলটল করে, তখন পৃথিবীর সবচেয়ে পাষাণ পুরুষটারও মনে হয়— "এই মেয়েটার জন্য আমি আমার জীবন দিয়ে দিতে পারি!" পুরুষকে 'হিরো' বা 'ত্রাণকর্তা' সাজিয়ে দেওয়ার যে অদ্ভুত সাইকোলজিক্যাল খেলা, নারীরা এটা জন্মগতভাবেই জানে। তারা জানে কীভাবে একজন পুরুষকে তার পৌরুষের অহংকারে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে আসলে নিজেদের কাজটা উদ্ধার করে নিতে হয়।

হাজার হাজার বছর ধরে পুরুষরা বোকার মতো এই ফাঁদে পা দিয়ে আসছে। হেলেনের জন্য ট্রয় নগরী ধ্বংস হয়ে গেল। কেন? একটা নারীর জন্য হাজার হাজার পুরুষ নিজেদের রক্তে মাটি ভাসিয়ে দিল। তারা কি জানত না যে এই যুদ্ধের কোনো যৌক্তিক মানে নেই? জানত। কিন্তু ওই যে, নারীর নেশা! একজন পুরুষ যখন একজন নারীর প্রেমে পড়ে, বা তার শরীরের নেশায় মজে যায়, তখন তার হিতাহিত জ্ঞান সম্পূর্ণ লোপ পায়। তার কাছে তখন ওই নারীর মুখের কথাই বেদবাক্য বলে মনে হয়।
নারীর শরীর এবং মন হচ্ছে একটা গোলকধাঁধা। আপনি একবার সেই গোলকধাঁধায় প্রবেশ করলে, আর বের হওয়ার রাস্তা খুঁজে পাবেন না। তাদের গায়ের একটা নিজস্ব ঘ্রাণ থাকে, তাদের গলার স্বরে একটা অদ্ভুত কম্পন থাকে, হাঁটার সময় কোমরের একটা নির্দিষ্ট ছন্দ থাকে— এগুলো সব মিলিয়ে পুরুষের মস্তিষ্ককে পুরোপুরি হিপনোটাইজ করে ফেলে। পুরুষ ভাবে সে নারীকে নিয়ন্ত্রণ করছে, সে রাজা। কিন্তু আসলে সুতোর নাটাই থাকে নারীর হাতে। সে যখন খুশি সুতো ছাড়ে, যখন খুশি টান মারে। পুরুষ স্রেফ একটা ঘুড়ির মতো আকাশে ওড়ে আর ভাবে, "আহা! আমি কত স্বাধীন!"

এই যে আমরা পুরুষরা এত বড় বড় ফিলোসফি কপচাই, চায়ের দোকানে বসে এত লজিক দেখাই, রাজনীতি আর বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে তর্ক করি— এগুলো সব দিনের বেলার ভান। কিন্তু রাতের অন্ধকারে, একটা নরম, উষ্ণ নারীদেহের সান্নিধ্যে আমাদের সমস্ত লজিক যেন বাষ্প হয়ে উড়ে যায়। তখন মনে হয়, এই নারী যদি আমাকে বিষও খাইয়ে দেয়, আমি হাসিমুখে সেই বিষ পান করে নেব। কারণ, ওই ধ্বংসের মধ্যেও একটা অদ্ভুত, আদিম সুখ আছে। নারী হচ্ছে সেই আগুন, আর পুরুষ হচ্ছে সেই বোকা পতঙ্গ, যে খুব ভালো করেই জানে ওই আগুনে ঝাঁপ দিলে সে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে, তবুও সে সেই আগুনের রূপ দেখে মোহিত হয়ে হাসিমুখে সেখানেই ঝাঁপ দেয়।

আনিকা নাওহারের ক্ষেত্রেও আমার ঠিক এই অবস্থাটাই হয়েছে।

এত কিছু ঘটে গেল! উনার স্বামী নিখোঁজ, পুলিশ তদন্ত করছে, উনি আমাকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে নোংরা কথা বলেছেন, উনার অতীতের কত ভয়ংকর রূপ আমার সামনে এসেছে। যেকোনো সুস্থ, স্বাভাবিক এবং লজিক্যাল পুরুষের উচিত ছিল এই মহিলার ছায়া থেকে একশ মাইল দূরে পালানো। নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য দৌড়ে অন্য কোনো শহরে চলে যাওয়া।

কিন্তু আমার কী হলো?

ফোনে উনার ওই "আমি তোমাকে সত্যিই ভালোবাসি" কথাটা শোনার পর আমার সব অভিমান, সব সন্দেহ, সব ভয় এক নিমিষেই জল হয়ে গেল। উনার প্রতি আমার আকর্ষণ বিন্দু পরিমাণও কমল না, বরং যেন আরও হাজার গুণ বেড়ে গেল। আমার মনে হতে লাগল, আনিকা যা বলছেন, সেটাই ধ্রুব সত্য। বেলাল সাহেব কীভাবে গায়েব হলেন, সেটা নিয়ে আমার আর কোনো মাথাব্যথা নেই। আনিকা যদি এখন আমাকে বলেন যে বেলাল সাহেব নিজেই নিজের ইচ্ছেয় ডানা মেলে আকাশে উড়ে গেছেন, আমি হয়তো কোনো তর্ক না করে সেটাই বিশ্বাস করে নেব।

আমার মাথার ভেতরে এখন আর কোনো ক্রাইম থ্রিলার চলছে না, সেখানে এখন শুধুই একটা রোমান্টিক ঘোরের রাজত্ব। উনার ওই ৩৬-২৮-৩৬-এর জ্যামিতিক শরীরটা, উনার ঘাড়ের কাছের সেই শ্যানেল পারফিউমের গন্ধটা, আর উনার সেই বন্য, আদিম আদরের স্মৃতিগুলো আমাকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে, আমি সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করার ক্ষমতাটাই হারিয়ে ফেলেছি।

আমি জানি, আমি একটা পতঙ্গের মতো আগুনের দিকে ছুটে যাচ্ছি। আমি খুব ভালো করেই জানি, এই ভালোবাসার, এই নেশার পরিণতি হতে পারে চরম ধ্বংস, হয়তো জেলখানা বা ফাঁসির দড়ি। কিন্তু আমার আর ফেরার কোনো উপায় নেই। আনিকা নাওহার নামের ওই মায়াবিনী আমার চোখের সামনে এমন একটা রঙিন চশমা পরিয়ে দিয়েছেন, যে চশমার ভেতর দিয়ে এখন আমি কেবল উনাকেই দেখি। উনার সব কথা আমার কাছে ঐশ্বরিক বাণীর মতো মনে হয়।

আমি একজন সামান্য মানুষ। আজ আমি স্বেচ্ছায়, সজ্ঞানে এবং সম্পূর্ণ হাসিমুখে, একজন নারীর পাতা এই মায়াজালে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সমর্পণ করলাম। কারণ, আমি জানি, এই ধ্বংসের পথে হাঁটার যে একটা তীব্র, মাদকতাময় আনন্দ আছে— পৃথিবীর অন্য কোনো শান্তিতে তা নেই।


ভয় জিনিসটা আসলে কী? বিজ্ঞানের ভাষায় ভয় হলো মানুষের মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা (Amygdala) নামক অংশ থেকে নিঃসৃত হওয়া কিছু রাসায়নিক পদার্থের ফলাফল। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত দর্শন বলে ভিন্ন কথা। ভয় হলো আসলে অজ্ঞতার আরেক নাম। আপনি যখন জানেন না আপনার সামনে কী আছে, ঠিক তখনই আপনি ভয় পান। অন্ধকার ঘরে আমরা ভয় পাই কারণ আমরা জানি না সেখানে কোনো ভূত বা সাপ লুকিয়ে আছে কি না। আলো জ্বালিয়ে দেওয়ার পর যখন দেখি ঘর ফাঁকা, তখন আমাদের ভয়টা কর্পূরের মতো উড়ে যায়।
 
শাহবাগ মোড়ে আনিকার সাথে দেখা হওয়া, কিংবা কলাবাগান থানায় সাব-ইন্সপেক্টর তৌহিদের সেই অমায়িক এবং আড্ডাসুলভ জেরা— ঠিক কী কারণে আমি জানি না, আমার ভেতর থেকে গত কয়েকদিনের সেই হাড়-কাঁপানো, দম-বন্ধ-করা ভয়টা হঠাৎ করেই ম্যাজিকের মতো উধাও হতে শুরু করল।
 
আমি মিরপুরের মেসে নিজের বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে লজিকগুলো মেলাতে লাগলাম। আমি ভয় পাচ্ছি কেন? আমি তো কোনো অপরাধ করিনি! আমি কি বেলাল সাহেবকে খুন করেছি? না। আমি কি উনাকে গুম করেছি? না। আমি কি উনার কাছে মুক্তিপণ দাবি করেছি? না।
 
আমি যা করেছি, সেটা হলো উনার স্ত্রীর সাথে শুয়েছি। হ্যাঁ, এটা সত্যি। কিন্তু আমার তো পূর্ণ বিশ্বাস আছে যে আনিকাও বেলালকে গুম বা খুন করেনি। আনিকা হয়তো একজন চরম কামুক, রহস্যময়ী এবং জটিল নারী, কিন্তু উনি খুনি নন। আমার মন অন্তত এটাই বলে। তাহলে আমি খামোখা রিমান্ড আর ফাঁসির দড়ির স্বপ্ন দেখে নিজের ব্লাড প্রেশার বাড়াচ্ছি কেন?
 
সমাজ আর আইনের মধ্যে একটা খুব সূক্ষ্ম কিন্তু বিশাল পার্থক্য আছে। সমাজ যেটাকে ‘পাপ’ বলে, আইন সেটাকে সব সময় ‘অপরাধ’ বলে না। আমরা সামাজিক নিয়ম ভেঙেছি। পরকীয়া, অবৈধ শারীরিক সম্পর্ক— এগুলো সমাজের চোখে চরম নিষিদ্ধ, নোংরা এবং পাপের কাজ। এলাকার মুরব্বিরা জানলে হয়তো আমাকে জুতাপেটা করে মেস থেকে বের করে দেবেন। কিন্তু বাংলাদেশের দণ্ডবিধিতে, পেনাল কোডে কি বলা আছে যে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ যদি নিজেদের পূর্ণ সম্মতিতে এক বিছানায় যায়, তবে তাদের ফাঁসি হবে?
 
আমরা দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ। আমরা একে অপরের সাথে সেক্স করেছি, নাকি আমরা একে অপরের পেটে, বুকে, ঘাড়ে মুখ ঘষেছি বা একে অপরকে চুষে খেয়েছি— তাতে আইনের বা পুলিশের কী করার আছে? এটা কোনো ক্রিমিনাল অফেন্স নয়। আমি আর আনিকা তো জোর করে কিছু করিনি।

যা হয়েছে, দুজন মানুষের চরম এবং বন্য কামনার সম্মতিতে হয়েছে। এই সোজা, কাটখোট্টা লজিকটা মাথার ভেতর পুরোপুরি সেট হয়ে যাওয়ার পর আমার বুকের ওপর থেকে যেন জগদ্দল পাথর নেমে গেল। আমার মনে হলো, আমি শুধু শুধু নিজের ছায়াকে দেখে ভয় পাচ্ছিলাম।
 
সেই রাতেই, শাহবাগ মোড়ের সেই মানববন্ধনের ঘটনার পর, আমি আনিকাকে ফোন দিলাম। উনার ওই বেনামি বা 'ঘোস্ট' নাম্বারটাতে কল করলাম। কয়েকবার রিং হওয়ার পর উনি ফোনটা ধরলেন।
 
"হ্যালো," আনিকার গলাটা খুব শান্ত এবং ক্লান্ত শোনাল।

"কী করছ?" আমি খুব স্বাভাবিক, নরম গলায় জিজ্ঞেস করলাম।
 
"এই তো, শুয়ে আছি। তুমি মেসে ফিরেছ?"
 
"হ্যাঁ, ফিরেছি অনেকক্ষণ হলো। তুমি খেয়েছ রাতে?"
 
আমাদের কথোপকথনটা এমনভাবে শুরু হলো, যেন আমরা বহু বছরের পরিচিত কোনো দম্পতি বা খুব গভীর কোনো প্রেমিক-প্রেমিকা। গত কয়েকদিন ফোনে আমাদের যে চরম নোংরা, উত্তেজক এবং বন্য সেক্সুয়াল ফ্যান্টাসির কথা হতো— আজ তার ছিটেফোঁটাও নেই। আজ কোনো 'উহু, আহা' নেই, কোনো শরীর নিশপিশ করার গল্প নেই। আজ আমাদের কথার ভেতর দিয়ে কোনো যৌনতা বা অবৈধ সম্পর্কের স্রোত বইছে না। আজ শুধু আছে একটা অদ্ভুত মায়া, একটা বন্ধুত্বের এবং প্রেমের ছোঁয়া।
 
"খেয়েছি। মাইনুল ভাইরা আসার সময় কিছু খাবার পার্সেল করে নিয়ে এসেছিলেন। ওগুলোই একটু মুখে দিলাম। তুমি খেয়েছ?" আনিকা জিজ্ঞেস করলেন।
 
"মেসের ডাল-ভাত গিলেছি আরকি," আমি একটু হেসে বললাম। "আচ্ছা আনিকা, পুলিশের কোনো আপডেট আছে? বেলাল সাহেবের কেসটা নিয়ে পুলিশ কি তোমাকে নতুন কিছু জানিয়েছে?"
 
ওপাশ থেকে আনিকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "পুলিশ তো সন্ধ্যার দিকেও একবার এসেছিল। দুজন অফিসার। ওরা ড্রয়িংরুমে বসে অনেকক্ষণ জেরা করল। বেলালের ব্যবহৃত ল্যাপটপটা তো ও সাথে নিয়ে গিয়েছিল, তাই সেটার খোঁজ করল। ওর ফেলে যাওয়া কিছু ডকুমেন্টস আর ডায়েরি ঘাঁটাঘাঁটি করল। কিন্তু নতুন কোনো আপডেট তারা দিতে পারল না। জাস্ট বলল, 'আমরা দেখছি ম্যাডাম, টেকনিক্যাল টিম কাজ করছে।' এসব বলতে বলতেই তো দিন পার করে দিচ্ছে।"
 
আমি উনার গলার স্বর শুনে বুঝতে পারলাম উনি সত্যিই খুব ক্লান্ত।
 
"তুমি খুব টায়ার্ড হয়ে আছো আনিকা। সারাদিন ওই রোদের মধ্যে শাহবাগে দাঁড়িয়ে ছিলে। এখন একটু ঘুমানোর চেষ্টা করো," আমি খুব দরদ মেশানো গলায় বললাম।
 
"ঘুম কি আসে রাশেদ?" আনিকা ফিসফিস করে বললেন। "এই বিশাল ফ্ল্যাটটায় আমি একা। এই শূন্যতাটা আমাকে মাঝে মাঝে খুব ভয় পাইয়ে দেয়। জানো, আজ শাহবাগে যখন দাঁড়িয়ে ছিলাম, তখন আমার শুধু মনে হচ্ছিল, তুমি যদি আমার হাতটা ধরে রাখতে! যেমন করে বইমেলায় ধরে হাঁটাতে। তোমার হাতটা ধরলে আমি একটা অদ্ভুত সাহস পাই।"
 
কথাগুলো আমার বুকের ভেতর গিয়ে একটা শীতল, মিষ্টি প্রলেপের মতো লাগল। এই নারী, যে কিনা একটু আগে আমাকে উনার শরীরের নেশায় পাগল করে দিচ্ছিল, সে এখন আমার কাছে একটু মানসিক আশ্রয় খুঁজছে।
 
"আমি তো তোমার সাথেই আছি আনিকা। যখনই তোমার একা লাগবে, ভয় লাগবে, আমাকে ফোন করবে। আমি অন্তত তোমার কথাগুলো তো শুনতে পারব," আমি বললাম।
 
"হুম। তুমি সত্যিই খুব ভালো একটা মানুষ রাশেদ। আমার জীবনের এই বিশৃঙ্খলার মাঝে তুমি একটা শান্তির মতো এসেছ। আচ্ছা, তুমি এখন ঘুমাও। কাল তোমার অফিস আছে না?"
 
"হ্যাঁ। তুমিও ঘুমাও। গুড নাইট আনিকা।"
 
"গুড নাইট রাশেদ।"
 
ফোনটা রেখে আমি একটা অদ্ভুত প্রশান্তি নিয়ে ঘুমাতে গেলাম। এই একটা ফোন কল আমাদের সম্পর্কটাকে শুধু শরীর থেকে বের করে একটা মানসিক স্তরে নিয়ে গেল।
 
পরদিন সকাল।
 
আমি বাসে করে কারওয়ান বাজারে এসে নেমেছি। অফিসের বিল্ডিংয়ের দিকে এগোচ্ছি, এমন সময় দেখি অফিসের নিচে টং দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আশিক ভাই সিগারেট টানছেন। উনার এক হাতে চায়ের কাপ, চোখে যথারীতি লালচে ভাব, আর কাঁধে সেই পুরনো রেক্সিনের ব্যাগটা ঝুলছে।
 
"আশিক ভাই! আসসালামু আলাইকুম!" আমি কাছে গিয়ে হাসিমুখে বললাম। আশিক ভাই আমাকে দেখে উনার স্বভাবসুলভ বাঁকা হাসিটা দিলেন। "ওয়ালাইকুম আসসালাম রাশেদ সাহেব। কী খবর? কলাবাগান থানা থাইকা জ্যান্ত ফিরা আসছ দেইখা ভালো লাগতাছে।"
 
"সবই আপনার দোয়ায় ভাই। আপনার ওই ওসি শাহাদাত সাহেবের নাম বলাটাই তো আমার লাইফ সেভ করে দিল। আমি তো ভেবেছিলাম আমাকে রিমান্ডে ঝুলিয়ে দেবে," আমি হাসতে হাসতে বললাম।
 
"আরে ভাই, তোমারে তো কইলামই, পুলিশ তো আর খামখা সাধারণ মানুষরে ধরে না। মামা, রাশেদরে এক কাপ কড়া লাল চা দাও তো!" আশিক ভাই চা-ওয়ালাকে অর্ডার দিলেন। আমরা দুজন চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ফুটপাতের একপাশে এসে দাঁড়ালাম।
 
আমি পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরালাম। আশিক ভাই উনার আধখাওয়া সিগারেটটা ফেলে দিয়ে আমার প্যাকেট থেকে আরেকটা নিলেন। "ভাই, ওই কেসটার কোনো খোঁজখবর কি পেলেন?" আমি খুব সাবধানে, একটু নিচু গলায় জিজ্ঞেস করলাম। "মানে, বেলাল সাহেবের নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারটা?"
 
আশিক ভাই চায়ের কাপে একটা শব্দ করে চুমুক দিলেন। উনার চোখদুটো একটু সরু হয়ে এল। ক্রাইম রিপোর্টারদের একটা নিজস্ব বডি ল্যাঙ্গুয়েজ থাকে, যখন তারা কোনো ইনসাইড নিউজ শেয়ার করে, তখন তাদের গলার স্বর আর চোখের ভঙ্গি পুরো থ্রিলার সিনেমার মতো হয়ে যায়।  "রাশেদ, আমিকাল রাতেও শাহাদাত ভাইয়ের সাথে কথা বলার সময় একটু জিজ্ঞেস করছিলাম কেসটা নিয়া," আশিক ভাই গলার স্বর খাদে নামিয়ে বললেন। "পুলিশ কিন্তু কেসটা অলমোস্ট গুছাইয়া আনছে। মানে, জট খুলতে শুরু করছে।"
 
আমার হৃৎপিণ্ডটা একটা লাফ দিল। "গুছিয়ে এনেছে মানে? বেলাল সাহেবকে কি পাওয়া গেছে?"

"না, লোকটারে এখনো ফিজিক্যালি পাওয়া যায় নাই," আশিক ভাই সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে বললেন। "তবে পুলিশ যতটুকু ইনসাইড নিউজ পাইছে, তাতে বুঝা যাইতেছে ঘটনাটা কোনো সাধারণ কিডন্যাপিং বা মুক্তিপণের কেস না। এটা অনেক ডিপ একটা গেম। ওই যে ফেক সিমের কথা তোমারে এসআই তৌহিদ বলছিল না? ওই সিমের কল ট্রেস করে, আর ওই রাতের সিসিটিভি ফুটেজ এনালাইসিস করে পুলিশ একটা বিশাল ক্লু পাইছে। কারা এর পিছে আছে, বা লোকটারে কোথায় নেওয়া হইতে পারে— এই ব্যাপারে ডিবি পুলিশের একটা টিম অলরেডি কাজ শুরু কইরা দিছে।"
 
"কারা আছে ভাই এর পেছনে?" আমি রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করলাম। আশিক ভাই আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। "সেটা তো শাহাদাত ভাই আমারে ভাঙে নাই। 

পুলিশের রুলস আছে তো। যখন একদম কনফার্ম হইয়া অ্যারেস্ট করবে, তখন প্রেস ব্রিফিং করবে। তবে এইটুকু বুঝতে পারছি, কেসটার ভেতরে বিশাল কোনো ফিন্যান্সিয়াল বা প্রফেশনাল শত্রুতার ব্যাপার আছে। আর বেশিদিন লাগব না, দুই-চার দিনের মধ্যেই হয়তো নিউজটা ব্রেকিং হিসেবে পেপারে ছাপানো লাগবে।"
 
আমি একটা ঢোঁক গিললাম। "যাক, আলহামদুলিল্লাহ! পুলিশ অন্তত একটা লাইনে তো এগোচ্ছে।

আপুটা তো অনেক টেনশনে আছেন।"

"হুম, টেনশনে থাকারই কথা। ঠিক আছে রাশেদ, চলো উপরে যাই। আজ আবার ওইদিকে ডিবির একটা প্রেস ব্রিফিংয়ে যাইতে হইব," আশিক ভাই চায়ের বিল মিটিয়ে দিয়ে বললেন।
 
অফিসে ঢুকে আমি আমার ডেস্কে বসলাম। ল্যাপটপ অন করে নিউজ পোর্টালে ঢুকলাম। কিন্তু আমার মাথায় তখন আশিক ভাইয়ের কথাগুলো ঘুরছে। পুলিশ কেস গুছিয়ে এনেছে! ফিন্যান্সিয়াল শত্রুতা! তার মানে কি বেলাল সাহেবের সাথে লন্ডনের কোনো বিজনেস পার্টনারের ঝামেলা ছিল? নাকি দেশের ভেতরের কোনো শত্রু? যাই হোক না কেন, আনিকার অন্তত এর পেছনে কোনো হাত নেই, এটা ভেবেই আমার মনটা শান্তিতে ভরে গেল।
Reply


Messages In This Thread
দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:51 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:52 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:52 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:53 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:54 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:54 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:55 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:55 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:26 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:27 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:28 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:55 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:56 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:57 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:58 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:58 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 08:58 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 08:59 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:00 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:01 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:02 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:03 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:06 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:07 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:08 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:08 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:09 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:10 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:12 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:13 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:14 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:16 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:17 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:17 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:18 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:20 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:22 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:23 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:25 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:25 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:26 AM

Forum Jump:


Users browsing this thread: 1 Guest(s)