Thread Rating:
  • 0 Vote(s) - 0 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5

দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin)
#47

৪৭
-
-
-
উদ্দাম, প্রলয়ঙ্করী এবং সমস্ত স্নায়ু-ছিঁড়ে-ফেলা মিলনের পর আমরা দুজনেই বিছানায় কিছুক্ষণ একদম রোবটের মতো বসে থাকলাম।


মানুষের শরীর বড়ই অদ্ভুত এক জৈবিক যন্ত্র। একটু আগে যে শরীরটা কামনার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছিল, যে মস্তিষ্কটা পৃথিবীর সমস্ত লজিক ভুলে গিয়ে কেবল মাংসের ভেতর মাংসের প্রবেশের জন্য হাহাকার করছিল— ঠিক সেই চরম বিন্দুটা বা ক্লাইম্যাক্সটা পার হয়ে যাওয়ার পর, সবকিছু কেমন যেন নিস্তব্ধ, শূন্য আর যান্ত্রিক হয়ে যায়। আমি বিছানার হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে বসে আছি। আমার পাশে আনিকা। দুজনেরই গায়ে এক সুতোও কাপড় নেই। আমাদের দুজনের শরীর থেকে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে, বিছানার সাদা চাদর ভিজে একাকার। আনিকার সেই অপ্সরী রূপ, উনার সেই ভরাট বক্ষদেশ, উনার সেই নিখুঁত জ্যামিতিক কোমর— সবকিছু এখন আমার চোখের সামনেই উন্মুক্ত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, একটু আগের সেই পাগলাটে, বন্য আকর্ষণটা এখন আর নেই।

এই চরম নিস্তব্ধতায় বসে আমার মনে হলো, আমরা মানুষেরা নিজেদেরকে যত বড় আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব বলে দাবি করি না কেন, আসলে আমরা স্রেফ কিছু কেমিক্যাল আর হরমোনের দাস। আমরা সাহিত্য রচনা করি, কবিতা লিখি, রোমান্স আর নান্দনিকতার দোহাই দিই। আমরা বলি— "আমি তোমার আত্মাকে ভালোবাসি", "তোমার চোখের দিকে তাকিলে আমি পৃথিবী ভুলে যাই।" কিন্তু দিন শেষে, এই সমস্ত কাব্যিক বুলির নিচে লুকিয়ে থাকে একটা চরম নগ্ন, আদিম এবং জৈবিক সত্য।

সেক্স বা শারীরিক মিলন শুধু একটা বায়োলজিক্যাল নিড বা জৈবিক চাহিদা ছাড়া আর কিছুই নয়। আপনি যতই ভালোবাসার প্রলেপ মাখান, যতই আদর, সোহাগ আর রোমান্সের চাদরে এটাকে মুড়িয়ে রাখুন না কেন— চরম মুহূর্তে পৌঁছে আপনি বুঝতে পারবেন, এখানে কোনো আত্মা নেই, কোনো কবিতা নেই। এখানে আছে শুধু দুটো মাংসপিণ্ডের ঘর্ষণ। একটা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায়, একটা নির্দিষ্ট ছন্দে দুটো শরীরের ঘর্ষণের ফলে স্নায়ুতন্ত্রে যে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয় এবং শেষে যে তরল স্খলনের মাধ্যমে শরীর শান্ত হয়— এর বাইরে সেক্সের আর কোনো দার্শনিক বা আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা নেই।

আমি আনিকার ঘর্মাক্ত, এলিয়ে থাকা শরীরটার দিকে তাকালাম। আমার মনে হলো, একটু আগে যে নারীটিকে আমি দেবী মনে করে পূজা করছিলাম, এখন সে আমার কাছে শুধুই একটা শরীর। আর আমিও উনার কাছে শুধুই আরেকটা শরীর, যে শরীরটা উনার ভেতরের জৈবিক তৃষ্ণা মেটাতে ব্যবহৃত হয়েছে। ভালোবাসা, রোমান্স, আভিজাত্য— সব কিছু ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেছে। এখন অবশিষ্ট আছে শুধু ঘামের গন্ধ, ব্যবহৃত বিছানার চাদর আর এক চরম জৈবিক রিক্ততা।

হয়তো এই রিক্ততা থেকেই বাঁচতে মানুষ মিলনের পর সিগারেট ধরায়, অথবা ঘুমিয়ে পড়ে।

আমরা প্রায় দশ মিনিট এই রোবোটিক স্তব্ধতার মধ্যে বসে রইলাম।

তারপর আনিকা একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানা থেকে নামলেন। উনার হাঁটার মধ্যে আগের সেই লাস্যময়ী বা বন্য ভঙ্গিটা নেই। একটা চরম ক্লান্ত, তৃপ্ত নারীর হাঁটা। "চলো রাশেদ, শাওয়ার নিয়ে নিই। শরীরটা ঘামে চ্যাটচ্যাট করছে," আনিকা বাথরুমের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে বললেন।

আমিও যন্ত্রের মতো উঠে দাঁড়ালাম। আমরা দুজনে বাথরুমের রেইন-শাওয়ারের নিচে দাঁড়ালাম। ঠান্ডা পানির ধারা আমাদের শরীর বেয়ে নামতে শুরু করল। এই গোসলের ভেতর কোনো যৌনতা ছিল না। আমরা কেউ কাউকে ছুঁয়ে দেওয়ার বা আদর করার চেষ্টা করলাম না। পানি দিয়ে আমরা শুধু আমাদের শরীরের ঘাম, লালা আর কামনার চিহ্নগুলোকে ধুয়ে ড্রেনে ভাসিয়ে দিচ্ছিলাম। যেন আমরা আবার আমাদের সেই 'সভ্য' মানুষের মুখোশটা পরার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি।

শাওয়ার শেষে আমরা তোয়ালে দিয়ে গা মুছে ভিআইপি সুইটে ফিরে এলাম। কাপড় পরার পালা।

আনিকা উনার ব্যাগ থেকে সেই কালো রঙের সুতির কামিজ আর সাদা রঙের সালোয়ারটা বের করে পরে নিলেন। চুলগুলো একটা তোয়ালে দিয়ে পেঁচিয়ে মুছে, খুব সাধারণ একটা খোঁপা করে ক্লিপ দিয়ে আটকে নিলেন। চোখে সেই কালো ফ্রেমের চশমাটা আবার পরে নিলেন। মুহূর্তে উনার সেই বন্য, আদিম রূপটা উধাও হয়ে গিয়ে সেখানে আবার সেই ইন্টেলেকচুয়াল, আভিজাত্যে মোড়ানো লন্ডনপ্রবাসী নারীর চেহারা ফিরে এল।

আমিও আমার ক্যাজুয়াল গ্যাবার্ডিন প্যান্ট আর সাধারণ একটা সুতির টি-শার্ট গায়ে চাপালাম। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সন্ধ্যা সাতটা বেজে গেছে।

লঞ্চের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। দিনের আলো পুরোপুরি নিভে গিয়ে চারপাশের নদীতে এখন একটা ঘুটঘুটে, রহস্যময় অন্ধকার নেমে এসেছে। "আর ঘণ্টা দুই-তিনের মধ্যেই হয়তো আমরা ঢাকা পৌঁছে যাব," আমি আমার ভেজা চুল মুছতে মুছতে বললাম।

আনিকা উনার ভ্যানিটি ব্যাগটা গুছিয়ে নিয়ে বললেন, "চলো, বাইরের ডেক থেকে একটু ঘুরে আসি। ভেতরে খুব গুমোট লাগছে। একটু খোলা বাতাস দরকার।" আমরা সুইটের দরজা লক করে লঞ্চের তিন তলার খোলা ডেকে এসে দাঁড়ালাম।

সন্ধ্যার পর নদীর রূপ সম্পূর্ণ বদলে যায়। চারদিক নিকষ কালো। শুধু লঞ্চের নিজস্ব আলো আর দূরে নদীর তীরে টিমটিম করে জ্বলা দু-একটা কুপি বাতির আলো ছাড়া আর কোনো আলো নেই। আমি রেলিং ধরে দাঁড়ালাম। আনিকা আমার ঠিক পাশেই এসে দাঁড়ালেন। উনার কনুইটা আমার হাতের সাথে হালকা ছুঁয়ে আছে। আমি পকেট থেকে বেনসনের প্যাকেট বের করে দুটো সিগারেট ধরালাম। একটা আনিকার হাতে দিলাম।

আমরা দুজনেই লঞ্চের রেলিংয়ে কনুই ঠেকিয়ে, হাতে সিগারেট আর লঞ্চের ক্যানটিন থেকে আনানো দুই কাপ গরম চা নিয়ে অন্ধকার নদীর দিকে তাকিয়ে রইলাম। লঞ্চটা দুরন্ত গতিতে নদীর কালো, গভীর জল চিরে ঢাকার দিকে ছুটে যাচ্ছে। বিশাল ইঞ্জিনের সেই একটানা, গম্ভীর 'ভুমমমম' শব্দটা পুরো ডেকে একটা অদ্ভুত কম্পন তৈরি করছে।

আমি নদীর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার অনুবাদক এবং সাহিত্যিক মস্তিষ্কটা আবার জেগে উঠল। একটু আগের সেই রোবোটিক শূন্যতা কেটে গিয়ে সেখানে আবার মেটাফোর বা রূপকের খেলা শুরু হলো।

লঞ্চের এই ছুটে চলাটা আমার কাছে এক নিখুঁত, আদিম যৌনতার রূপক বলে মনে হতে লাগল। এই যে বিশাল, ইস্পাতের তৈরি লঞ্চটার শক্ত, তীক্ষ্ণ অগ্রভাগ— এটা যেন একটা পুরুষালি অহংকার। সে প্রবল শক্তিতে, এক বুনো আক্রোশে নদীর সেই কালো, রহস্যময়, কুমারী বুকটাকে চিরে ভেতরে প্রবেশ করছে। নদীটা যেন এক অসীম, শান্ত নারী। সে লঞ্চের এই শক্ত, তীক্ষ্ণ আঘাতকে কোনো বাধা দিচ্ছে না, বরং দুপাশে সরে গিয়ে তাকে নিজের গভীরে পথ করে দিচ্ছে।

লঞ্চের অগ্রভাগ যখন নদীর পানিকে চিরে সামনে এগোচ্ছে, তখন দুই পাশে প্রবল বেগে সাদা ফেনা ছিটকে উঠছে। ওই সাদা ফেনাগুলো দেখে আমার মনে হলো, চরম ঘর্ষণ আর মিলনের পর শরীর থেকে ছিটকে বের হওয়া সেই কামনার তরলের মতোই ওরা নদীর বুকে আছড়ে পড়ছে। পানির 'ছলাৎ... ছলাৎ...' শব্দটা এই নৈশ নিস্তব্ধতায় ঠিক সেই ভেজা, পিচ্ছিল শব্দের মতো শোনাচ্ছে, যা একটু আগে আমাদের বিছানায় তৈরি হয়েছিল।

আর এই যে লঞ্চের ইঞ্জিনের একটানা, ছন্দময় কম্পন! এই কম্পনটা তো কোনো সাধারণ যান্ত্রিক শব্দ নয়। এটা যেন চরম উত্তেজনার মুহূর্তে একটা পুরুষ এবং নারীর বুকের ভেতর চলা হৃৎপিণ্ডের সেই পাগলাটে ধুকপুকানি। নদীটা লঞ্চটাকে নিজের বুকে ধারণ করে তরঙ্গের পর তরঙ্গ তৈরি করছে, আর লঞ্চটা তার সমস্ত ইঞ্জিন-পাওয়ার দিয়ে নদীর সেই গভীরতায় নিজেকে বারবার আছড়ে ফেলছে।

কী অদ্ভুত এক মিল! প্রকৃতির প্রতিটি সৃষ্টির মাঝেই যেন এই আদিম সঙ্গমের চিত্র লুকিয়ে আছে। শুধু দেখার মতো চোখ থাকতে হয়। "কী ভাবছ এত মন দিয়ে?" আনিকা হঠাৎ সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে আমার দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলেন।

"ভাবছি, প্রকৃতিও আমাদের মতো," আমি নদীর দিকে ইশারা করে, খুব দার্শনিক একটা হাসি দিয়ে বললাম। "দেখো, লঞ্চটা কীভাবে নদীর বুক চিরে ভেতরে ঢুকছে। আর নদীটা কীভাবে দুপাশে সরে গিয়ে তাকে জায়গা করে দিচ্ছে। ঠিক যেন একটু আগের তুমি আর আমি।"

আনিকা আমার রূপকটা বুঝতে পেরে একটা শব্দহীন, মিষ্টি হাসি হাসলেন। উনার চোখ দুটো অন্ধকারের মধ্যেও চকচক করে উঠল। "তোমার মাথার ভেতর সারাক্ষণ এইসব অদ্ভুত, দুষ্টু ফিলোসফি ঘোরে, তাই না রাশেদ?" আনিকা উনার কাঁধটা আমার কাঁধের সাথে আরেকটু শক্ত করে ঠেকিয়ে বললেন। "তবে হ্যাঁ, তোমার মেটাফোরটা খুব সুন্দর। আসলেই, নদীর এই কালো পানির মতো আমার ভেতরটাও তোমার এই বন্য আঘাতের জন্য তৃষ্ণার্ত হয়ে থাকে।"

আমরা চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছি, আর মাঝে মাঝে টুকটাক কথা বলছি। লন্ডনের কথা, আনিকার উপন্যাসের কথা, আমার অনুবাদের কথা। মাঝে মাঝে নদীর কনকনে ঠান্ডা বাতাস এসে আনিকার খোলা চুলগুলোকে আমার মুখের ওপর আছড়ে দিচ্ছিল। আমি সেই চুলের সুবাসে আবার যেন একটা নতুন নেশায় ডুবে যাচ্ছিলাম।
এভাবেই চা, সিগারেট, আর অলস আড্ডায় কেটে গেল প্রায় আড়াই ঘণ্টা।

রাত যখন ঠিক দশটা বাজে, তখন লঞ্চের সাইরেনটা একটা দীর্ঘ, তীক্ষ্ণ শব্দ করে বেজে উঠল। দূরে ঢাকা শহরের আলোর রোশনাই চোখে পড়তে শুরু করেছে। বুড়িগঙ্গার দূষিত, পচা গন্ধটা নাকে এসে জানান দিল যে, আমরা আমাদের সেই যান্ত্রিক, দমবন্ধ করা পৃথিবীতে আবার ফিরে এসেছি।

লঞ্চ সদরঘাটে এসে ভিড়ল।

ভিড় ঠেলে, মানুষের ধাক্কা খেয়ে আমরা যখন লঞ্চ থেকে নেমে মেইন রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম, তখন রাত সোয়া দশটার কাছাকাছি। আমি পকেট থেকে ফোন বের করে একটা উবার ডাকলাম। গাড়িতে উঠে বসার পর আমি আনিকার দিকে ফিরে বললাম, "উবারের ডেস্টিনেশন তো তোমার ধানমন্ডির ফ্ল্যাটের অ্যাড্রেস দিলাম। আমি তোমাকে তোমার বিল্ডিংয়ের গেটে নামিয়ে দিয়ে, এই গাড়ি নিয়েই সোজা মিরপুরে আমার মেসে চলে যাব। আজ রাতটা আমার নিজের বিছানায় ঘুমানো দরকার।"

কথাটা শোনার সাথে সাথেই আনিকার মুখের সেই শান্ত, তৃপ্ত ভাবটা মুহূর্তের মধ্যে উধাও হয়ে গেল। উনার ভ্রু কুঁচকে গেল, আর চোখের দৃষ্টিতে একটা জেদি, একরোখা ভাব ফুটে উঠল। "মেসে যাবে মানে?" আনিকা খুব তীক্ষ্ণ, কড়া গলায় বললেন। "তুমি আমার ফ্ল্যাটে যাবে। তুমি আমার সাথেই থাকবে।"

আমি একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। এই নারী আবার উনার সেই মালিকানা আর জেদের জায়গায় ফিরে গেছেন। "আনিকা, প্লিজ বোঝার চেষ্টা করো," আমি উনার হাতটা ধরে বোঝানোর চেষ্টা করলাম। "বেলাল সাহেব নিখোঁজ। তুমি গতকাল থানায় গিয়েছিলে। পুলিশ হয়তো তোমার ফ্ল্যাটের আশেপাশে সাদা পোশাকে নজর রাখছে। আজ মানববন্ধনে তুমি ছিলে, মিডিয়ার লোকজন হয়তো তোমার বাসার সামনে ঘুরঘুর করতে পারে। এই অবস্থায় আমি যদি তোমার সাথে তোমার ফ্ল্যাটে রাত কাটাই, আর কেউ যদি দেখে ফেলে— তুমি বুঝতে পারছ কী কেলেঙ্কারি হবে? পুরো ঢাকা শহরে ঢিঢি পড়ে যাবে! আমি চাই না এই নিখোঁজের ঝামেলার মধ্যে আমরা কোনো নতুন স্ক্যান্ডাল তৈরি করি।"

আমার লজিকগুলো ছিল একদম সলিড, প্র্যাকটিক্যাল। যেকোনো সাধারণ মানুষ এই যুক্তি মেনে নিত। কিন্তু আনিকা নাওহার তো সাধারণ মানুষ নন। "চুলায় যাক তোমার পুলিশ! আর চুলায় যাক সমাজের লোকজন!" আনিকা উনার হাতটা আমার হাত থেকে এক ঝটকায় ছাড়িয়ে নিয়ে হিসহিস করে উঠলেন। "আমি কার সাথে আমার ফ্ল্যাটে থাকব, সেটা দেখার অধিকার পুলিশেরও নেই, ওই সস্তা মিডিয়ারও নেই। আমি একজন স্বাধীন নারী। আমার ফ্ল্যাট, আমার জীবন। তুমি আমার ফ্ল্যাটে যাবে, দ্যাটস ইট!"

"কিন্তু আনিকা..."

"কোনো কিন্তু না রাশেদ!" আনিকা আমাকে থামিয়ে দিলেন। উনার গলার স্বর এখন আদেশের মতো। "যতদিন বেলালের এই নিখোঁজের কেসটা সলভ না হচ্ছে, যতদিন এই পুলিশ আর মিডিয়ার ঝামেলা শেষ না হচ্ছে, আমি একা একা বাইরে যেতে পারব না। আমাকে ঘরের ভেতর বন্দি হয়ে থাকতে হবে। আর এই টেনশনের সময়, এই বন্দি জীবনে আমি একা ওই বিশাল ফ্ল্যাটে থাকতে পারব না। তুমি আমার সাথে থাকবে। আমাকে সঙ্গ দেবে। আমি তোমার বুকে মাথা রেখে ঘুমাতে চাই।"

উনার এই জেদ আর অসহায়ত্বের অদ্ভুত সংমিশ্রণ আমাকে আবার দুর্বল করে দিল। আমি জানি, আমি যদি এখন জোর করে মেসে চলে যাই, উনি হয়তো সারা রাত আমাকে ফোন করে পাগল করে দেবেন, অথবা কাল সকালেই উবার নিয়ে মিরপুরের মেসে এসে হাজির হবেন।

আমি আর তর্ক বাড়ালাম না। একজন অনুবাদক হিসেবে আমি জানি, যুক্তির চেয়ে ইমোশন সবসময় শক্তিশালী। আমি উনার জেদের কাছে মাথা নত করলাম। "ঠিক আছে। আমি থাকব," আমি হার-মানা গলায় বললাম।

আনিকার মুখে আবার সেই বিজয়ী, স্নিগ্ধ হাসি ফিরে এল। উনি আমার কাঁধে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করলেন।

রাত এগারোটার দিকে আমাদের উবার এসে ধানমন্ডির সেই ষোলো তলা বিল্ডিংয়ের মেইন গেটে থামল।

আমি আর আনিকা গাড়ি থেকে নামলাম। গেটটা বন্ধ ছিল। পকেট গেট দিয়ে আমাদের ঢুকতে হবে। আমি যখন গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকছি, দেখলাম দারোয়ান মফিজ উনার ডিউটি রুমের সামনে একটা টুল পেতে বসে আছেন। উনার চেহারায় একটা অদ্ভুত, থমথমে ভাব।

আনিকা উনার ব্যাগ থেকে চাবি বের করতে করতে মফিজের দিকে তাকিয়ে খুব ক্যাজুয়াল গলায় বললেন, "কী মফিজ, সব ঠিকঠাক তো? আজকে তো আর পুলিশ-টুলিশ আসেনি?"

মফিজ খুব নার্ভাস ভঙ্গিতে টুল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। উনার চোখদুটো একটু বড় বড় হয়ে গেল। উনি একবার আনিকার দিকে, আরেকবার আমার দিকে আড়চোখে তাকালেন।

"ম্যাডাম... একটা ঝামেলা তো হইয়া গেছে," মফিজ খুব নিচু, ফিসফিস করা গলায়, এদিক-ওদিক তাকিয়ে বললেন।

আনিকা থমকে দাঁড়ালেন। উনার ভ্রু কুঁচকে গেল। "ঝামেলা? কীসের ঝামেলা?"

আমিও সতর্ক হয়ে গেলাম। আমার বুকের ভেতর সেই পুরোনো ভয়টা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।

মফিজ একটু আমতা-আমতা করে, গলাটা আরও খাদে নামিয়ে বলল, "ম্যাডাম, আইজকা বিকেলের দিকে একটা সিভিল গাড়িতে কইরা কা দুই-তিনজন পুলিশ আইছিল। হেরা আইসা সোজা পাঁচ তলার ওই ফ্ল্যাটে গেছে..."

"পাঁচ তলার ফ্ল্যাট? কেন?" আনিকার গলার স্বরটা একটু তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।

"হ ম্যাডাম। ওই যে... ওই যে ময়না আছে না? পাঁচ তলার ভাবির কাজের মাইয়া... পুলিশ আইসা ওই ময়নারে অ্যারেস্ট কইরা নিয়া গেছে!"

কথাটা শোনার সাথে সাথেই আমার মনে হলো, বিল্ডিংয়ের ষোলো তলার ছাদটা যেন ভেঙে আমার মাথার ওপর পড়ল। ময়নাকে অ্যারেস্ট করেছে!

ময়না! সেই কাজের মেয়ে, যার সাথে বেলাল সাহেবের অবৈধ শারীরিক সম্পর্কের কথা আনিকা আমাকে রবীন্দ্র সরোবরের পাড়ে বসে বলেছিলেন। যে মেয়েটা বেলাল সাহেবের নিখোঁজ হওয়ার পেছনের অনেক অন্ধকার রহস্য জানে। সেই ময়নাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে!
আমি ঘাড় ঘুরিয়ে আনিকার দিকে তাকালাম।

আনিকার মুখের রঙ নিমেষের মধ্যে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। উনার চোখের মণি দুটো স্থির। উনি শক্ত করে উনার ভ্যানিটি ব্যাগের চেইনটা খামচে ধরে আছেন। "ময়নাকে ধরে নিয়ে গেছে?" আনিকা কোনোমতে শব্দগুলো উচ্চারণ করলেন।

"জি ম্যাডাম," মফিজ মাথা নাড়ল। "পুলিশ যাওয়ার সময় আমারে বইলা গেছে— 'আনিকা ম্যাডাম ঢাকায় ফিরলেই যেন সাথে সাথে থানায় যোগাযোগ করে। ওসি স্যার উনার লগে কথা কইব।' পুলিশ কিন্তু খুব কড়া ধমক দিয়া গেছে ম্যাডাম।"

আমার হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আসতে শুরু করেছে। পুলিশ ময়নাকে গ্রেপ্তার করেছে মানে, তারা বেলাল সাহেবের সেই অন্ধকার চরিত্রের কথা জেনে গেছে। আর ময়নাকে জেরা করলে তো সে সব গরগর করে উগরে দেবে। সে হয়তো এ-ও বলে দেবে যে আনিকা ম্যাডাম সব জানতেন!

"আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি দেখছি ব্যাপারটা," আনিকা খুব দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে, একটা কৃত্রিম শান্ত গলা তৈরি করে মফিজকে বললেন।

তারপর উনি আমার হাত ধরে প্রায় হ্যাঁচকা টান দিয়ে লিফটের দিকে নিয়ে গেলেন। লিফটে ওঠার পর আমরা কেউ কোনো কথা বললাম না। লিফটের যান্ত্রিক শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই। আমি দেখতে পাচ্ছিলাম, আনিকার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। উনার চোয়াল শক্ত।

সাত তলায় লিফট থামল।

আনিকা চাবি দিয়ে ফ্ল্যাটের দরজা খুলে হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকলেন। আমিও উনার পেছন পেছন ঢুকলাম। দরজাটা বন্ধ করে লক করে দিলাম। ফ্ল্যাটের ভেতরটা নিস্তব্ধ। আনিকা ড্রয়িংরুমের সোফায় উনার ব্যাগটা ছুঁড়ে ফেললেন। তারপর বাথরুমে ঢুকে চোখেমুখে পানি দিয়ে ফ্রেশ হলেন। আমি ড্রয়িংরুমের একটা চেয়ারে বসে পাথরের মূর্তির মতো অপেক্ষা করছি।

মিনিট পাঁচেক পর আনিকা ড্রয়িংরুমে এলেন। উনার মুখটা ভেজা। উনার চোখ দুটো এখন আর ভয় পাওয়া হরিণীর মতো নেই, সেখানে এখন জ্বলছে একটা ঠান্ডা, হিসেবি, কর্পোরেট সিইও-র কাঠিন্য। উনি সোফায় বসে উনার ব্যাগ থেকে মোবাইল ফোনটা বের করলেন।

তারপর আমার চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে, কোনো রকম ভণিতা বা দ্বিধা ছাড়া, উনার কন্টাক্ট লিস্ট থেকে একটা নাম্বার ডায়াল করলেন।
আমি রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে আছি। ফোন রিং হচ্ছে। ওপাশ থেকে কল রিসিভ হলো।

"হ্যালো, ওসি শাহাদাত সাহেব?" আনিকা অত্যন্ত কনফিডেন্ট, স্থির এবং একটু কড়া গলায় বললেন। "আমি আনিকা নাওহার বলছি। হ্যাঁ... আমি মাত্র ঢাকায় ফিরলাম। আমার বিল্ডিংয়ের গার্ড আমাকে বলল যে আপনারা নাকি ময়না নামের একটা মেয়েকে অ্যারেস্ট করেছেন, আর আমাকে যোগাযোগ করতে বলেছেন। হোয়াট ইজ গোয়িং অন ওসি সাহেব? আমার স্বামীর নিখোঁজের সাথে একটা সামান্য কাজের মেয়ের কী সম্পর্ক? আপনারা কি আসল কালপ্রিটদের বাদ দিয়ে এখন কাজের মেয়ে ধরে টানাটানি করছেন?"

আমি চেয়ারে বসে আক্ষরিক অর্থেই বোবা হয়ে গেলাম। কী ভয়ংকর কনফিডেন্স! কী নিখুঁত অভিনয়! পুলিশকে ভয় পাওয়ার বদলে, উনি উল্টো পুলিশকেই আক্রমণ করছেন! আমি আমার চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি, আনিকা নাওহার নামের এই মায়াবিনী নারী কীভাবে আইনের রক্ষকদের সাথে এক চরম মানসিক দাবার চাল চালতে শুরু করেছেন। আর আমি, রাশেদ আহমেদ, সেই দাবার বোর্ডের এক কোণায় বসে আমার নিজের জীবনের ধ্বংস কিংবা মুক্তির প্রহর গুনছি।


Reply


Messages In This Thread
দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:51 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:52 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:52 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:53 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:54 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:54 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:55 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:55 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:26 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:27 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:28 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:55 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:56 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:57 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:58 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:58 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 08:58 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 08:59 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:00 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:01 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:02 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:03 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:06 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:07 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:08 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:08 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:09 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:10 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:12 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:13 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:14 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:16 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:17 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:17 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:18 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:20 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:22 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:23 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:25 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:25 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:26 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 4 hours ago
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 4 hours ago
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 4 hours ago
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 4 hours ago
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 4 hours ago
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 4 hours ago
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 4 hours ago
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 4 hours ago
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 4 hours ago

Forum Jump:


Users browsing this thread: 1 Guest(s)