Thread Rating:
  • 0 Vote(s) - 0 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5

দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin)
#48

৪৮
-
-
-

টেলিফোনে কথা বলা শেষ করে আনিকা ফোনটা নামিয়ে রাখলেন।


উনার মুখের দিকে তাকিয়ে আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, একটু আগে যিনি এক দাপুটে, কর্পোরেট সিইও-র মতো গলা উঁচিয়ে কথা বলছিলেন, উনার সেই আত্মবিশ্বাসের বেলুনটা যেন এক সেকেন্ডে চুপসে গেছে। উনার কাঁধ দুটো ঝুলে পড়েছে, চোখের দৃষ্টিতে একটা শূন্য, হতভম্ব ভাব।

"কী হলো আনিকা? কী বললেন ওসি সাহেব?" আমি সোফা থেকে একটু উনার দিকে ঝুঁকে গিয়ে রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করলাম।

আনিকা একটা ঢোঁক গিললেন। উনার গলা শুকিয়ে গেছে। উনি ফিসফিস করে বললেন, "পুলিশ কেস সলভ করে ফেলেছে রাশেদ। ওরা আসল কালপ্রিটদের ধরেছে।"

আমার বুকের ভেতর থেকে একটা বিশাল পাথর যেন ধপ করে নেমে গেল। যাক! অন্তত পুলিশের খাতায় আমি বা আনিকা আর সাসপেক্ট লিস্টে নেই। কিন্তু সেই স্বস্তির পরপরই একটা অজানা আতঙ্ক এসে ভর করল।

"কালপ্রিট কারা? বেলাল সাহেব কোথায়? উনাকে কি পেয়েছে?" আনিকা মাথা নাড়লেন। "ফোনে কিছু ডিটেইলস বলেননি ওসি সাহেব। 

উনি বললেন, কাল দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে পুলিশ একটা বড় প্রেস ব্রিফিং করবে। তার আগে, কাল সকাল নয়টায় উনি আমাকে থানায় যেতে বলেছেন। উনি আমাকে সামনাসামনি বসে সব বুঝিয়ে বলবেন। আর... আর উনি বললেন, আমি চাইলে কালকের ওই প্রেস ব্রিফিংয়ে উপস্থিত থাকতে পারি।"

"প্রেস ব্রিফিং!" আমি প্রায় আঁতকে উঠলাম।

বাংলাদেশের পুলিশ যখন কোনো চাঞ্চল্যকর মামলার পর প্রেস ব্রিফিং করে, তখন সেখানে কী হয়, তা আমি একজন নিউজ ডেস্কের কর্মী হিসেবে খুব ভালো করেই জানি। ডজন ডজন টিভির ক্যামেরা, বুম হাতে সাংবাদিকরা হামলে পড়ে। একটা বিশাল টেবিলের পেছনে পুলিশ কর্মকর্তারা বসেন, আর সামনে আসামিদের হেলমেট পরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। আর যদি ভিকটিমের পরিবারের কেউ সেখানে থাকে, তবে সাংবাদিকরা এমন সব অবান্তর, ব্যক্তিগত আর নোংরা প্রশ্ন করা শুরু করে যে মানুষটার মান-সম্মান ধুলোয় মিশে যায়।

"আনিকা, একদম না!" আমি খুব শক্ত গলায়, প্রায় ধমক দিয়ে বললাম। 

"তুমি কোনোভাবেই ওই প্রেস ব্রিফিংয়ের সামনে যাবে না। মিডিয়ার সামনে যাওয়া মানে নিজেকে একটা সস্তা তামাশার পাত্র বানানো। কাল সকালের পত্রিকায় আর টিভির স্ক্রলে তোমার মুখ ভাসবে। হেডলাইন হবে— 'নিখোঁজ ইঞ্জিনিয়ারের স্ত্রীর কান্নায় ভারী হলো মিডিয়া সেন্টার'। তুমি কি চাও তোমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে রাস্তার মোড়ে মোড়ে মানুষ চা খেতে খেতে জাজমেন্ট পাস করুক?"

আনিকা অসহায় চোখে আমার দিকে তাকালেন। "তাহলে কী করব?"

"তুমি কাল সকালে ঠিক নয়টায় থানায় যাবে। ওসি সাহেবের রুমে বসে উনার কাছ থেকে বিস্তারিত জানবে। কেসটা কী, বেলাল সাহেবের কী হয়েছে, কারা এর পেছনে— সব ইনফরমেশন কালেক্ট করবে। তারপর পুলিশ যখন মিডিয়ার সামনে যাবে, তুমি তার আগেই থানার পেছনের গেট দিয়ে চুপচাপ বেরিয়ে আসবে। এরপর কী করতে হবে, সেটা আমরা ঠান্ডা মাথায় বসে ঠিক করব। কিন্তু ক্যামেরার সামনে এক মুহূর্তের জন্যও না।"

আমার এই কনফিডেন্ট, গোছানো এবং প্রটেক্টিভ কথাগুলো শুনে আনিকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোফায় হেলান দিলেন। উনি শুধু বললেন, "ঠিক আছে। তুমি যা ভালো বোঝো।"

সেই রাতটা আমাদের কাটল এক অদ্ভুত, দমবন্ধ করা মানসিক যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে। মানুষের শরীর আর মন যে কতটা অদ্ভুতভাবে একে অপরের সাথে কানেক্টেড, তা আমি সেই রাতে বুঝতে পারলাম। এই তো গতকাল রাতেও আমরা লঞ্চের কেবিনে একে অপরের শরীরটাকে একটা ক্ষুধার্ত পশুর মতো ছিঁড়েখুঁড়ে খাচ্ছিলাম। আর আজ? আজ এই বিশাল ফ্ল্যাটের নরম বিছানায় আমরা দুজন পাশাপাশি শুয়ে আছি ঠিকই, কিন্তু আমাদের মাঝখানে যেন একটা অদৃশ্য, হিমশীতল দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে।

সেক্স তো বহুদূর, আমাদের মধ্যে সামান্যতম কোনো শারীরিক স্পর্শও হলো না।

আমরা দুজন ছাদের দিকে তাকিয়ে শুয়ে আছি। ঘরের এসি চলছে বাইশ ডিগ্রিতে, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আমি একটা বদ্ধ ওভেনের ভেতর আটকে আছি। আমার মাথার ভেতর শুধু একটাই প্রশ্ন— বেলাল সাহেবের কী হয়েছে? পুলিশ কাকে ধরেছে?

মাঝে মাঝে আনিকা উসখুস করছিলেন। উনিও ঘুমাতে পারছিলেন না। এই চরম টেনশন, ভয়, আর 'কী হয়েছে'— এই সাসপেন্সটা আমাদের দুজনের স্নায়ুকে আক্ষরিক অর্থেই ব্লেন্ডারে দিয়ে ঘুরিয়ে দিচ্ছিল।

ভোর হলো। আমরা কেউই ঘুমাইনি।

সকাল সাতটায় আমরা উঠে পড়লাম। আনিকা একটা খুব সাধারণ, ছাই রঙের সালোয়ার কামিজ পরলেন। চোখে কোনো কাজল বা মেকআপ নেই। নির্ঘুম রাতের কারণে উনার চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে, যা উনাকে সত্যিই একজন শোকাহত স্ত্রীর পারফেক্ট লুক দিচ্ছিল। আমিও একটা সাধারণ শার্ট আর প্যান্ট পরে নিলাম।

সকাল আটটা চল্লিশ মিনিটে আমরা একটা উবার নিয়ে কলাবাগান থানায় পৌঁছালাম। থানায় ঢোকার পর দেখলাম, পরিবেশটা অন্য দিনের চেয়ে একটু ভিন্ন। বেশ কিছু পুলিশ সদস্য দৌড়াদৌড়ি করছে। ডিউটি অফিসার আনিকাকে দেখেই চিনে ফেললেন।

"ম্যাডাম, আপনি আসছেন? ওসি স্যার তো আপনার জইন্যই ওয়েট করতাছে। সোজা দোতলায় চইলা যান," ডিউটি অফিসার বেশ সম্মানের সাথেই বললেন।

আমাকে দেখেও কয়েকজন পুলিশ সদস্য মাথা নাড়ল। আমি যে ঢাকা পেপারসের আশিক ভাইয়ের লোক, সেটা থানার অনেকেই ইতিমধ্যে জেনে গেছে। আমরা দোতলায় উঠে ওসি শাহাদাত সাহেবের রুমের সামনে গেলাম। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম।

ওসি শাহাদাত সাহেবের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। উনার চেহারাটা খুব রাশভারী, গোঁফওয়ালা, কিন্তু চোখের দৃষ্টিটা খুব তীক্ষ্ণ। উনি বিশাল একটা টেবিলের ওপাশে বসে ছিলেন। আমাদের দেখে উনি উঠে দাঁড়ালেন।

"আসুন ম্যাডাম। বসুন," ওসি সাহেব সামনের দুটো চেয়ার দেখিয়ে বললেন। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "আপনি রাশেদ সাহেব না? আশিকের কলিগ?"

"জি স্যার," আমি বিনীতভাবে মাথা নেড়ে আনিকার পাশের চেয়ারটায় বসলাম। ওসি শাহাদাত সাহেব ইন্টারকমে কল দিয়ে দু কাপ চা দিতে বললেন। তারপর উনি উনার দুই হাত টেবিলের ওপর জড়ো করে, খুব গভীর একটা নিশ্বাস ফেলে আনিকার দিকে তাকালেন।

"ম্যাডাম," ওসি সাহেব খুব ধীর, গম্ভীর গলায় শুরু করলেন, "আপনাকে সকালে কষ্ট করে আসতে বললাম, কারণ ব্যাপারটা ফোনে বলার মতো ছিল না। আর দুপুর বেলা মিডিয়াকে সব জানানোর আগে, ভিকটিমের স্ত্রী হিসেবে আপনার পুরো সত্যিটা জানার অধিকার আছে।"

আনিকার দুই হাত কোলের ওপর শক্ত হয়ে মুঠি পাকিয়ে আছে। উনার গলা শুকিয়ে কাঠ। উনি কোনোমতে বললেন, "আমার স্বামী কোথায় ওসি সাহেব? ও কি বেঁচে আছে?"

ওসি শাহাদাত সাহেব উনার দৃষ্টিটা টেবিলের একটা ফাইলের ওপর নামিয়ে নিলেন। কয়েক সেকেন্ডের এক নীরবতা, যা পুরো রুমের বাতাসকে ভারী করে দিল।

"আই অ্যাম সরি ম্যাডাম," ওসি সাহেব মুখ তুলে আনিকার চোখের দিকে তাকালেন। "আপনার স্বামী, ইঞ্জিনিয়ার বেলাল সাহেব আর বেঁচে নেই। উনাকে খুব ব্রুটালি, খুব নির্মমভাবে মার্ডার করা হয়েছে।"

কথাটা শোনার সাথে সাথেই আনিকার মুখ থেকে একটা তীক্ষ্ণ, চাপা আর্তনাদ বেরিয়ে এল। উনি দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফেললেন। আমিও সিটের ওপর জমে গেলাম। খুন! বেলাল সাহেবকে খুন করা হয়েছে! আমার মাথার ভেতর আশিক ভাইয়ের সেই কথাগুলো বাজতে লাগল— 'ফিন্যান্সিয়াল বা প্রফেশনাল শত্রুতা হতে পারে।'

"কিন্তু কে মারল উনাকে? কেন মারল? ওর তো কোনো শত্রু ছিল না!" আনিকা ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললেন। ওসি শাহাদাত সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। উনার চোখের দৃষ্টিতে এখন এক অদ্ভুত, তাচ্ছিল্য আর করুণা মেশানো একটা ভাব।

"ম্যাডাম, মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু বাইরের কেউ হয় না। মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো তার নিজের চরিত্র, আর তার অনিয়ন্ত্রিত লোভ," ওসি সাহেব বলতে শুরু করলেন। "আপনাকে একটা তেতো সত্য কথা আজ হজম করতে হবে। আপনার স্বামী লন্ডনে যতই বড় ইঞ্জিনিয়ার হোন না কেন, দেশে উনার একটা খুব অন্ধকার এবং নোংরা জীবন ছিল। আপনার এই ফ্ল্যাটের যে কাজের মেয়েটা, ময়না, তাকে আমরা অ্যারেস্ট করেছি। এবং তাকে জেরা করার পর যে জঘন্য কাহিনিটা বেরিয়ে এসেছে, তা শুনলে আপনি শিউরে উঠবেন।"

আনিকা উনার মুখ থেকে হাত সরালেন। উনার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে, কিন্তু উনি চুপ করে রইলেন। কারণ এই 'তেতো সত্যটা' উনি আগেই জানতেন। কিন্তু আমি তো জানতাম না যে এই সত্যটা বেলাল সাহেবকে মৃত্যুর দিকে টেনে নিয়ে যাবে!

ওসি সাহেব একটা ক্রাইম থ্রিলারের চরম ক্লাইম্যাক্সের মতো করে ঘটনাটা বর্ণনা করতে শুরু করলেন।
"এই ময়না মেয়েটার সাথে আপনার স্বামী গত কয়েক বছর ধরেই দেশে আসলে ফিজিক্যাল রিলেশন করত। টাকার লোভ দেখিয়ে, ব্ল্যাকমেইল করে সে এই গরিব মেয়েটার শরীর ভোগ করত। কিন্তু সমস্যাটা হলো অন্য জায়গায়। এই ময়নার একটা প্রেমিক আছে। নাম কালু। হাজারীবাগ এলাকার একটা লোকাল ছিঁচকে মাস্তান। সরকারি দলের নাম ভাঙিয়ে এলাকায় চাঁদাবাজি করে, টং দোকান থেকে টাকা তোলে। এই কালুর সাথে ময়নার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক।"

আমি রুদ্ধশ্বাসে শুনছি। থানার রুমের এসি চলা সত্ত্বেও আমার কপাল ঘেমে উঠছে।

"তো, মাসখানেক আগে কালু কোনোভাবে সন্দেহ করে ফেলে যে ময়নার কাছে এত টাকা কোত্থেকে আসে। সে একদিন ময়নাকে ধরে কয়েকটা চড়-থাপ্পড় লাগায়। মেয়ে মানুষ, মাইরের চোটে সে সব গরগর করে স্বীকার করে ফেলে। সে কালুকে বলে দেয় যে ধানমন্ডির এক বড়লোক সাহেব দেশে আসলে তার সাথে শুয়ে তাকে অনেকগুলো টাকা দেয়।"

ওসি সাহেব উনার টেবিলের ওপর রাখা একটা কলম নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে বললেন, "এই কথা শোনার পর কালুর মাথা খারাপ হয়ে যায়। নিজের প্রেমিকা অন্য একটা লোকের বিছানায় যাচ্ছে, এটা কোনো পুরুষই সহজে মেনে নিতে পারে না। কিন্তু কালু হলো রাস্তার মাস্তান। তার কাছে ইগোর চেয়ে টাকার দাম বেশি। সে ময়নাকে একটা বুদ্ধি দেয়। সে বলে, 'ওই সাহেব তো অনেক টাকার মালিক। তুই ওকে ব্ল্যাকমেইল কর। বলবি যে তুই পুলিশে গিয়ে রেপ কেস করে দিবি, যদি সে তোকে পাঁচ লাখ টাকা না দেয়।'"

"ব্ল্যাকমেইল!" আমি অজান্তেই ফিসফিস করে উঠলাম।

"হ্যাঁ," ওসি সাহেব আমার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লেন। "ময়না ঠিক তাই করেছিল। বেলাল সাহেব তখন লন্ডনে। ময়না উনাকে ফোন করে এই রেপ কেসের হুমকি দেয়। কিন্তু বেলাল সাহেব তো আর সাধারণ পাবলিক না। উনি উল্টো ময়নাকে ধমক দেন। বলেন, 'তুই জানিস আমি কে? আমি পুলিশের আইজিকে ফোন দিয়ে তোদের মতো বস্তির পোকাদের ক্রসফায়ারে দিয়ে দেব। টাকা তো পাবিই না, জেলের ভাত খাবি।' বেলাল সাহেবের এই ওভার-কনফিডেন্স আর অ্যারোগেন্সটাই উনার কাল হলো।"

রুমের ভেতর একজন কনস্টেবল চা দিয়ে গেল। কিন্তু আমাদের কারো চা খাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই।

"এরপর কী হলো?" আনিকা ভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করলেন।

"এরপর আপনার স্বামী দেশে এলেন। দেশে এসে উনি নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনলেন," ওসি সাহেবের গলায় এখন পেশাদারি কাঠিন্য। "উনি ময়নাকে ডেকে পাঠান। ময়না যায়। কিন্তু ময়নার সাথে কালুও যায়। কালু বেলাল সাহেবকে চেপে ধরে। কিন্তু বেলাল সাহেব তখনো উনার সেই এলিট ক্লাসের অহংকারে অন্ধ। উনি কালুকে গালিগালাজ করেন, পুলিশের ভয় দেখান, এমনকি কালুকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে চান। কালু একটা পাতি গুন্ডা হতে পারে, কিন্তু তখন তার ইগোতে চরম আঘাত লাগে। সে ডিসাইড করে, এই লোকটাকে সে শিক্ষা দেবে।"

ওসি সাহেব একটু থামলেন। চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে গলাটা ভিজিয়ে নিলেন।

"যে রাতে আপনার স্বামী নিখোঁজ হন, সেদিন সন্ধ্যায় ময়না একটা নতুন, বেনামি সিম থেকে বেলাল সাহেবকে ফোন দেয়। সে বেলাল সাহেবকে সেক্সের লোভ দেখিয়ে হাজারীবাগের পেছনের দিকের একটা বস্তিতে আসতে বলে। বেলাল সাহেবও উনার সেই পুরোনো লোভের বশবর্তী হয়ে, কাউকে কিছু না জানিয়ে একা ওই বস্তিতে চলে যান।"

আমার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা হিমশীতল স্রোত নেমে গেল। এই সেই ৪০ সেকেন্ডের ফোন কল, যার কথা এসআই তৌহিদ আমাকে বলেছিলেন!

"বেলাল সাহেব ওই বস্তির একটা ভাঙাচোরা ঘরে ঢোকার সাথে সাথেই কালু আর তার দুজন সাগরেদ উনাকে ঘিরে ধরে। তাদের হাতে ছিল ধারালো অস্ত্র আর রামদা। তারা বেলাল সাহেবকে জিম্মি করে উনার কাছে থাকা এটিএম কার্ড, পিন নাম্বার আর ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ডিটেইলস চায়। কিন্তু বেলাল সাহেব তখনো উনার জেদ ধরে বসেন। উনি পিন নাম্বার দিতে অস্বীকার করেন এবং চিল্লাচিল্লি করে বস্তির লোক জড়ো করার হুমকি দেন। কালু তখন রাগের মাথায় আর কোনো চিন্তাভাবনা না করেই উনার মাথায় লোহার রড দিয়ে একটা চরম আঘাত করে।"

আনিকা একটা তীক্ষ্ণ শব্দ করে দুই হাতে নিজের মুখটা ঢেকে ফেললেন। উনার শরীরটা ফুলে ফুলে কেঁপে উঠতে লাগল।

"প্রথম আঘাতেই বেলাল সাহেব ফ্লোরে লুটিয়ে পড়েন," ওসি সাহেবের বর্ণনায় কোনো ইমোশন নেই, নিখাদ পুলিশের রিপোর্ট। "এরপর কালু আর তার সাগরেদরা মিলে উনাকে রামদা দিয়ে কুপিয়ে মার্ডার করে। কিন্তু লাশ তো গুম করতে হবে! হাজারীবাগের ওই এলাকায় অনেক পুরোনো ট্যানারির পরিত্যক্ত জায়গা আছে। তারা লাশটাকে বস্তায় ভরে এরকমই একটা পরিত্যক্ত জায়গায় নিয়ে যায়। তারপর লাশের ওপর কয়েক গ্যালন কেরোসিন আর অ্যাসিড ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়।"

আমি দুই হাতে আমার চেয়ারের হাতল শক্ত করে চেপে ধরলাম। অ্যাসিড আর কেরোসিন দিয়ে জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে মারা! আমার পেটের ভেতরটা কেমন যেন গুলিয়ে উঠল।

"আগুন নিভে যাওয়ার পর," ওসি সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "তারা লাশের যে কয়টা আধপোড়া হাড়গোড় আর ছাই অবশিষ্ট ছিল, সেগুলো একটা বস্তায় ভরে হাজারীবাগের পেছনের একটা খালে ফেলে দেয়। আমরা ময়না, কালু এবং তার দুই সাগরেদ— চারজনকেই গতকাল রাতে অ্যারেস্ট করেছি। তারা রিমান্ডে সব কনফেস করেছে।"

"উনার... উনার ডেডবডি..." আনিকা ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললেন।

"আই অ্যাম সরি ম্যাডাম," ওসি সাহেব মাথা নাড়লেন। "কাল রাত থেকে আমাদের ডাইভিং টিম আর ফায়ার সার্ভিসের টিম ওই খালে তল্লাশি চালিয়েছে। কিন্তু আপনারা তো জানেন ঢাকা শহরের খালের কী অবস্থা! ময়লা, পলিথিন আর স্রোতের কারণে ওই হাড়গোড়গুলো হয়তো ভেসে বুড়িগঙ্গায় চলে গেছে, অথবা কাদার নিচে তলিয়ে গেছে। আমরা কিছুই উদ্ধার করতে পারিনি। তবে আসামিদের কনফেশন আর মার্ডার ওয়েপন (অস্ত্র) আমাদের কাছে আছে। ওদের ফাঁসি কেউ আটকাতে পারবে না।"

ওসি শাহাদাত সাহেব কথা শেষ করে নীরব হলেন।

রুমের ভেতর শুধু আনিকার ফুঁপিয়ে কাঁদার শব্দ শোনা যাচ্ছে।

আমি পাথরের মতো বসে আছি। আমার মাথার ভেতর একটা ব্লেন্ডার চলছে। একজন মানুষ, যিনি লন্ডনের একটা ইউনিভার্সিটির প্রফেসর, যিনি ধানমন্ডির ষোলো তলা বিল্ডিংয়ের মালিক— তার শেষ পরিণতি হলো হাজারীবাগের একটা নোংরা বস্তিতে রামদার কোপ খাওয়া আর অ্যাসিডে পুড়ে ছাই হয়ে ড্রেনের পানিতে ভেসে যাওয়া! মানুষের জীবনের কী কোনো মূল্য আছে? মানুষের অহংকার, আভিজাত্য আর ক্ষমতার শেষ গন্তব্য কি এতটা কদর্য হতে পারে?

আর এই সবকিছুর মূলে কী? সেই একই আদিম, বন্য যৌনতার লোভ। যে লোভের বশবর্তী হয়ে বেলাল সাহেব একজন কাজের মেয়ের কাছে ছুটে গিয়েছিলেন। আর আমি? আমিও তো সেই একই লোভের বশবর্তী হয়ে আনিকা নাওহারের বিছানায় গিয়েছিলাম! আমার আর বেলাল সাহেবের মধ্যে পার্থক্য কী? পার্থক্য শুধু এতটুকুই যে, উনি মারা গেছেন, আর আমি বেঁচে আছি।

"ম্যাডাম, আপনি শক্ত হোন," ওসি সাহেব আনিকাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেন। "আমরা দুপুর বারোটায় মিডিয়াকে সব জানাব। আপনি কি থাকবেন?"

আমি আনিকার দিকে তাকালাম। আনিকা চোখ মুছতে মুছতে মাথা নাড়লেন। "না ওসি সাহেব। আমার শরীরটা খুব খারাপ লাগছে। আমি... আমি এই মুহূর্তে কোনো ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে পারব না। আপনারা আপনাদের মতো করে প্রেস ব্রিফিং করুন। আমি বাসায় যাচ্ছি।"

"ঠিক আছে ম্যাডাম। রাশেদ সাহেব, আপনি উনাকে সাবধানে বাসায় নিয়ে যান। কোনো দরকার হলে আমাকে জানাবেন।"

আমরা থানা থেকে বেরিয়ে এলাম।

বাইরে এপ্রিলের কড়া রোদ। কিন্তু আনিকার শরীরটা থরথর করে কাঁপছে। উনি থানার সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় আমার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলেন। উনার হাতটা বরফের মতো ঠান্ডা। আমরা থানার গেট পার হয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম। আমি একটা সিএনজি বা উবার ডাকার জন্য ফোন বের করব, ঠিক সেই মুহূর্তে...

আনিকা হঠাৎ করে ফুটপাতের একপাশে, একটা ডাস্টবিনের কাছে ছুটে গেলেন। উনি উনার দুই হাত দিয়ে হাঁটুতে ভর দিয়ে নিচু হলেন। এবং পরক্ষণেই উনার পেটের ভেতর থেকে একটা ভয়ংকর, বুক-চেরা ওয়াক তোলার শব্দ বেরিয়ে এল।

উনি বমি করতে শুরু করলেন। আমি দৌড়ে গিয়ে উনার পিঠে হাত রাখলাম। উনার খোলা চুলগুলো এক হাতে ধরে পেছনের দিকে সরিয়ে রাখলাম, যাতে বমিতে মাখামাখি না হয়। আনিকা অনর্গল বমি করছেন। উনার পেটে হয়তো সকাল থেকে কোনো খাবার পড়েনি, তাই শুধু হলুদ রঙের পিত্তি আর টক পানি বেরিয়ে আসছে। উনার পুরো শরীরটা একটা অসুস্থ পাখির মতো কাঁপছে।

খুন হওয়া, অ্যাসিডে পুড়ে যাওয়া আর খালের পানিতে স্বামীর হাড়গোড় ভেসে যাওয়ার এই বীভৎস, নগ্ন বর্ণনা উনার স্নায়ুকে পুরোপুরি বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। উনি যতই প্র্যাকটিক্যাল বা কর্পোরেট নারী হোন না কেন, এই ভয়াবহ রিয়েলিটি নেওয়ার মতো ক্ষমতা উনার ছিল না।

বমি করা শেষ হলে উনি একটা টিস্যু দিয়ে মুখ মুছলেন। আমি পাশের একটা দোকান থেকে এক বোতল মিনারেল ওয়াটার কিনে উনার হাতে দিলাম। উনি পানি দিয়ে কুলকুচি করে মুখ ধুলেন। কয়েক ঢোঁক পানি খেলেন।

উনার চোখের চারপাশ লাল হয়ে আছে, কপালে ঘামের বিন্দু। উনি আমার দিকে তাকালেন। উনার সেই মোহনীয়, শিকারি বা আভিজাত্যময় দৃষ্টির আজ কোনো অস্তিত্ব নেই। সেখানে আজ শুধু এক চরম রিক্ত, বিধ্বস্ত এবং নিঃস্ব একজন নারীর অসহায়ত্ব।

"রাশেদ..." আনিকা অত্যন্ত দুর্বল, কাঁপা গলায় বললেন।

"আমি আছি আনিকা। আমি আছি," আমি উনার হাতটা ধরে বললাম।

"আমাকে... আমাকে বাসায় নিয়ে চলো। আমি আর এক মুহূর্তও এই রাস্তায় দাঁড়াতে পারছি না। আমাকে বাসায় নিয়ে চলো।"

আমি একটা সিএনজি ডাকলাম। আনিকাকে নিয়ে সেই ধানমন্ডির ফ্ল্যাটের দিকে রওনা হলাম। কিন্তু আমার মাথার ভেতর তখন ঘুরছে— এই ঘটনার পর আমাদের এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কী হবে? এই মৃত্যু, এই রক্ত আর এই বীভৎস সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে আমরা কি আর কোনোদিন সেই পুরনো ফ্যান্টাসির জগতে ফিরে যেতে পারব?

আমি জানি না। হয়তো এই উত্তরটা সময়ই বলে দেবে।
Reply


Messages In This Thread
দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:51 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:52 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:52 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:53 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:54 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:54 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:55 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:55 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:26 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:27 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:28 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:55 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:56 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:57 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:58 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:58 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 08:58 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 08:59 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:00 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:01 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:02 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:03 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:06 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:07 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:08 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:08 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:09 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:10 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:12 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:13 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:14 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:16 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:17 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:17 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:18 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:20 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:22 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:23 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:25 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:25 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:26 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 4 hours ago
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 4 hours ago
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 4 hours ago
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 4 hours ago
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 4 hours ago
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 4 hours ago
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 4 hours ago
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 4 hours ago
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 4 hours ago

Forum Jump:


Users browsing this thread: 1 Guest(s)