Thread Rating:
  • 0 Vote(s) - 0 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5

দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin)
#49

৪৯
-
--
-
মানুষের শোক জিনিসটা বড় অদ্ভুত। মৃত্যু যখন কারো দরজায় এসে হঠাৎ কড়া নাড়ে, তখন প্রথম ধাক্কায় মানুষ চিৎকার করে কাঁদে, বুক চাপড়ায়, কিংবা জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। কিন্তু সেই প্রথম ঝাপটা চলে যাওয়ার পর যখন আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়, যখন পুলিশ, মিডিয়া আর আত্মীয়স্বজনের ভিড় সরে গিয়ে একটা খাঁ খাঁ শূন্যতা ঘরের মেঝেতে এসে জমে বসে— ঠিক তখন শুরু হয় আসল ট্র্যাজেডি। তখন শোক আর কোনো শব্দ করে না। সে একটা বরফশীতল কুয়াশার মতো মানুষের মস্তিষ্কের প্রতিটি নিউরনকে গ্রাস করে ফেলে।


ধানমন্ডির ষোলো তলা বিল্ডিংয়ের সাত তলার এই বিশাল, চার হাজার স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাটে গত আট-দশ দিন ধরে ঠিক সেই বরফশীতল কুয়াশাই রাজত্ব করছে। কলাবাগান থানার সেই রক্ত হিম করা ব্রিফিংয়ের পর থেকে আনিকা নাওহার যেন এই গ্রহের মানুষ নন। উনি বেঁচে আছেন, শ্বাস নিচ্ছেন, কিন্তু উনার আত্মাটা যেন হাজারবাগের ওই পরিত্যক্ত চামড়ার গুদামের পোড়া টায়ারের ছাইয়ের সাথে বুড়িগঙ্গার কালো জলে ভেসে চলে গেছে।

ফ্ল্যাটের সেন্ট্রাল এসি চব্বিশ ঘণ্টা চলছে। পর্দাগুলো সব সময় টানা। দিনের বেলাতেও ঘরের ভেতর এক অদ্ভুত মায়াবী গোধূলি। ড্রয়িংরুমের যে সোফায় বসে একদিন আনিকা উনার রূপের জাদুতে আমাকে পাগল করে তুলেছিলেন, সেই সোফার এক কোণায় উনি এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা নির্জীব পুতুলের মতো বসে থাকেন।

উনার খাওয়া-দাওয়া প্রায় পুরোপুরি বন্ধ। আমি প্রতিদিন সকালে উঠে কিচেনে যাই। ওটস বানাই, ডিম সেদ্ধ করি, কিংবা ডাইনিং টেবিলে এক বাটি গরম স্যুপ এনে উনার সামনে রাখি। খুব নিচু গলায় বলি, "আনিকা, দুটো চামচ মুখে দাও। শরীর ভেঙে পড়বে তো।"

উনি আমার মুখের দিকে তাকান। উনার সেই বাদামি চোখের তারায় এখন কোনো আলো নেই। এককালে যে চোখে আমি বুনো বাঘিনীর হিংস্র সৌন্দর্য দেখেছিলাম, সেখানে এখন শুধু ধূসর ছাইয়ের প্রান্তর। উনি কোনো কথা বলেন না। চামচটা তুলে হয়তো এক ফোঁটা মুখে দেন, তারপর আবার রেখে দেন। পুরো বাটিটা যেমন ছিল, তেমনই পড়ে থাকে।

উনার একমাত্র সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে সিগারেট। যে নারী আগে খুব মেজাজ হলে বা গভীর রাতে রিল্যাক্স করার জন্য একটা সিগারেট টানতেন, তিনি এখন আক্ষরিক অর্থেই চেইন স্মোকার। একটা শেষ হতে না হতেই উনি আরেকটা ধরাচ্ছেন। ছাইদানিটা সারাক্ষণ ফিল্টারের পাহাড়ে ভর্তি হয়ে থাকে। উনার সেই চেনা শ্যানেল পারফিউমের আভিজাত্যময় সুবাসকে ঢেকে দিয়ে পুরো ফ্ল্যাটে এখন শুধু তামাকের পোড়া ঝাঁঝালো গন্ধ আর একটা অচেনা বিষাদের ধোঁয়া ঘুরপাক খাচ্ছে।

উনার শরীরটার দিকে তাকালে আমার বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে। মাত্র দশ দিনের ব্যবধানে একজন মানুষ কতটা শুকিয়ে যেতে পারে! উনার সেই ভরাট, টানটান স্তনযুগল ঢিলেঢালা সুতির ম্যাক্সির নিচে যেন কিছুটা শিথিল হয়ে পড়েছে। উনার ফর্সা গাল দুটো ভেঙে একটু ভেতরে ঢুকে গেছে, আর চোখের নিচে জমেছে গভীর কালচে ছোপ। ঠোঁট দুটো ফ্যাকাশে, শুকনো চামড়া উঠে আছে। চুলগুলো অগোছালো হয়ে পিঠের ওপর ঝুলে থাকে। কোনোদিন উনি গোসল করতে যান, কোনোদিন বাথরুমে ঢুকে শুধু শাওয়ারের পানি ছেড়ে দিয়ে কমোডের ওপর বসে থাকেন।

আর আমি? আমি এই বিশাল নাটকের এক অসহায় দর্শক।

আমি বুঝতে পারছি না, আমি কীভাবে এই নারীকে এই অন্ধকারের গভীর খাদ থেকে টেনে তুলব। আমি তো কোনো ডাক্তার নই, কোনো সাইকিয়াট্রিস্ট নই। আমি একজন সাধারণ অনুবাদক। আমি ভাষার শব্দ অনুবাদ করতে পারি, কিন্তু মানুষের এমন চরম ট্রমা আর মানসিক ধ্বংসস্তূপ কীভাবে অনুবাদ করে সেখানে শান্তির প্রলেপ দেওয়া যায়, তা আমার কোনো ডিকশনারিতে লেখা নেই।

আমার দিনগুলো কাটছে এক চরম দ্বৈত জীবনের মধ্যে। সকালে আমি মেসে যাই না, ফ্ল্যাট থেকেই অফিসের দিকে বের হই। কারওয়ান বাজারে নিউজ ডেস্কে বসে ল্যাপটপে সারাদিন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, আমেরিকার নির্বাচন আর পুতিনের ভাষণ অনুবাদ করি। মামুন আমার পাশে বসে হাসাহাসি করে, এহসান ভাই চিল্লাচিল্লি করেন। আমি মুখে একটা স্বাভাবিক মুখোশ পরে থাকি, যাতে অফিসের কেউ টের না পায় যে আমার পায়ের তলায় কোনো মাটি নেই।

কিন্তু ঘড়িতে বিকেল পাঁচটা বাজার সাথে সাথেই আমার হাত-পা ঠান্ডা হতে শুরু করে। আমি একটা উবার বা সিএনজি নিয়ে যখন কারওয়ান বাজার থেকে ধানমন্ডির উদ্দেশ্যে রওনা দিই, তখন প্রতিটা ট্রাফিক সিগন্যালে আমার বুকের ভেতর একটাই ভয় ড্রামের মতো বাজতে থাকে।

আত্মহত্যা!

হ্যাঁ, আমার সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হলো সুইসাইড। আনিকা যদি কোনোদিন এই নিঃসঙ্গতার ভার আর বেলালের নৃশংস মৃত্যুর বীভৎস ছবি সহ্য করতে না পেরে সাত তলার ব্যালকনি থেকে নিচে ঝাঁপ দেন? উনি যদি বাথরুমের শাওয়ারের রডে উনার ওই দামি শাড়ির ফাঁস লাগিয়ে ঝুলে পড়েন?

এই ভয়ের কারণে আমি অফিস থেকে ফিরে লিফটের সাত তলায় ওঠার সময় রীতিমতো কাঁপতে থাকি। চাবি দিয়ে দরজার লক খোলার সময় আমার হাত অবশ হয়ে আসে। দরজা খুলে যখন দেখি উনি সোফায় বা বারান্দার বেতের চেয়ারে চুপচাপ বসে সিগারেট টানছেন, তখন আমার ফুসফুসে বাতাস ফিরে আসে। আমি স্বস্তির এক ফোঁটা নিশ্বাস ফেলি।

এই দশ দিনের মাথায় বেলাল সাহেবের বন্ধুরা মিলে ধানমন্ডির একটা মিলনায়তনে একটা ছোটখাটো স্মরণসভা আর শোকসভার আয়োজন করেছিল। মাইনুল ভাই নিজে এসে আনিকাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমি দূর থেকে উনাদের সাথে গিয়েছিলাম। শোকসভার পরিবেশটা ছিল খুবই কৃত্রিম। যারা বেঁচে থাকে, তারা যে কতটা মেকিভাবে মৃত মানুষের জন্য চোখের পানি ফেলে, তা সেই শোকসভায় না গেলে আমি বুঝতাম না। স্টেজে একে একে বেলালের ইউনিভার্সিটির বন্ধুরা দাঁড়িয়ে মাইকে বড় বড় বক্তৃতা দিল। বেলাল কত ভালো ছাত্র ছিল, কত বড় ইঞ্জিনিয়ার ছিল, সমাজ তার মতো একটা রত্নকে হারাল— এই সব বাঁধাধরা ডায়ালগ। তাদের পরনে ইস্ত্রি করা পাঞ্জাবি, চোখে সানগ্লাস। বক্তৃতা শেষে তারা পেছনের টেবিলে গিয়ে পেস্ট্রি আর কফি খাচ্ছিল আর হাসিমুখে নিজেদের ব্যবসার কথা বলছিল।

আর আনিকা?

উনি সামনের সারির একটা সোফায় বসেছিলেন। পরনে একটা সাদা খোলের কালো পাড়ের সুতির শাড়ি। উনার মাথাটা নিচু করা। উনি পুরো দুই ঘণ্টা একবারও মুখ তুলে কারো দিকে তাকালেন না। উনার চোখ দিয়ে নিঃশব্দে অবিরাম পানি গড়িয়ে পড়ছিল। কেউ এসে কাঁধে হাত দিলে উনি কোনো জবাব দিচ্ছিলেন না, শুধু শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ ঢাকছিলেন।

উনার কান্না দেখে আমার মনে হচ্ছিল, এই কান্নাটা কি শুধু বেলালের জন্য? নাকি এই কান্নাটা নিজের জন্য? যে মানুষটার সাথে ছয় বছর এক ছাদের নিচে কাটিয়েছেন, যে মানুষটা উনাকে অবহেলা করেছে, কাজের মেয়ের সাথে শুয়েছে, আবার সেই মানুষটাই শেষ পর্যন্ত দড়ির ফাঁসে শ্বাসরোধ হয়ে পেট্রোলের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে— এই চরম বৈপরীত্য, এই অপরাধবোধ আর এই ট্র্যাজেডি কোনো সাধারণ মানুষের মস্তিষ্ক একা বহন করতে পারে না। আনিকাও পারছেন না।

শোকসভা শেষে আমরা আবার ফ্ল্যাটে ফিরে এলাম। সেই একই শূন্যতা, সেই একই স্তব্ধতা। আমি উনাকে স্পেস দেওয়ার জন্য প্রথম দিন থেকেই একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আমি উনার মাস্টার বেডরুমে শুই না। যে বিছানায় বসে আমরা একসময় বন্য আনন্দে মেতে উঠেছিলাম, সেই বিছানা এখন আমার কাছেও কেমন যেন একটা অভিশপ্ত জায়গা মনে হয়। আমি আমার জিনিসপত্র নিয়ে গেস্ট রুমে থাকি।

কিন্তু গেস্ট রুমের দরজা আমি কখনোই পুরোটা বন্ধ করি না। সব সময় অর্ধেক ফাঁক করে রাখি। রাতে শুয়ে আমি কান খাড়া করে থাকি। মাস্টার বেডরুমে কোনো আওয়াজ হলো কি না, বাথরুমের দরজা খোলার শব্দ হলো কি না, উনি বারান্দায় গিয়ে রেলিংয়ের কাছে দাঁড়ালেন কি না— এই সব দিকে আমার চব্বিশ ঘণ্টার পাহারা চলত। ঘুম আমার হতো না বললেই চলে। আমি যেন উনার এক নিঃশব্দ দারোয়ান হয়ে গেছিলাম।

এভাবেই কাটছিল দিনগুলো। একঘেয়ে, ধীর এবং দমবন্ধ করা এক ট্র্যাজেডির ভেতর দিয়ে।

ঘটনাটা ঘটল গতকাল রাতে। ঘড়িতে তখন রাত আনুমানিক আড়াইটা বাজে।

বাইরে ঢাকা শহর গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ধানমন্ডির রাস্তাগুলো একদম ফাঁকা। আমার গেস্ট রুমের এসিটা খুব মৃদু শব্দে চলছে। আমি বিছানায় শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আনিকার কথা ভাবছিলাম। হঠাৎ করিডোরে খুব হালকা, খালি পায়ের খসখস শব্দ হলো।

আমি সাথে সাথে বিছানায় উঠে বসলাম। আমার বুকের ভেতর একটা তীব্র শঙ্কা জাগল। আনিকা কি বারান্দার দিকে যাচ্ছেন? আমি খাট থেকে নামতে যাব, ঠিক তখনই আমার গেস্ট রুমের অর্ধেক ভেজানো দরজাটা খুব ধীরে খুলে গেল। দরজার মুখে দাঁড়িয়ে আছেন আনিকা নাওহার। বেডসাইড ল্যাম্পের আবছা আলোয় উনাকে দেখে আমার চোখে শুধু এক বিষণ্ণ মানুষ ছাড়া কিছু মনে হল না। 

উনার পরনে একটা খুব পাতলা, সিল্কের কালো নাইটি। নাইটিটা উনার হাঁটুর ওপরে এসে শেষ হয়েছে, আর গলার দিকটা বেশ ঢিলা। উনার উসকোখুস্কো চুলগুলো পিঠের ওপর ছড়ানো। চোখে মেকআপের লেশমাত্র নেই, কিন্তু উনার চোখের মণিদুটো এই অন্ধকারে এক অদ্ভুত, বুনো এবং উন্মাদ আলোয় জ্বলছে। উনি কোনো কথা বললেন না। উনি ধীর পায়ে, একটা সম্মোহিতের মতো আমার বিছানার দিকে এগিয়ে এলেন। "আনিকা? কী হয়েছে? তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে?" আমি উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করে উঠতে গেলাম।

কিন্তু উনি আমাকে উঠতে দিলেন না। উনি কোনো কথা না বলে, সরাসরি বিছানায় উঠে আমার বুকের ওপর এসে বসলেন। উনার শরীরের ভার, উনার সেই নাইটির ভেতর দিয়ে আসা উষ্ণতা আমার গায়ে এসে আছড়ে পড়ল। কিন্তু এই স্পর্শে আগের মতো কোনো আভিজাত্য বা প্রেম ছিল না; ছিল এক চরম অন্ধ, বেপরোয়া এবং ডেসপারেট আর্তি।

"আনিকা..." আমি কিছু বলতে যাওয়ার আগেই, আনিকা উনার দুই হাত দিয়ে আমার মাথাটা শক্ত করে খামচে ধরলেন এবং উনার ঠোঁট দুটো আমার ঠোঁটের ওপর আছড়ে ফেললেন। উনার এই চুম্বনটা ছিল এক ভয়াবহ রকমের আক্রমণ।

উনার ঠোঁট কাঁপছিল। উনার মুখের ভেতর থেকে সিগারেটের তিতকুটে গন্ধ আর এক চরম যন্ত্রণার উত্তাপ বেরিয়ে আসছিল। উনি পাগলের মতো আমার ঠোঁট, আমার গাল, আমার চিবুকে মুখ ঘষতে লাগলেন। উনার নখগুলো আমার কাঁধের চামড়ায় তীব্র শক্তিতে বসে যাচ্ছিল।

আমি বুঝতে পারলাম, উনি কী করার চেষ্টা করছেন।

মানুষ যখন চরম মানসিক যন্ত্রণায় পড়ে, যখন সে কোনোভাবেই তার ভেতরের দুঃসহ স্মৃতি আর অপরাধবোধ থেকে বাঁচতে পারে না, তখন সে তার শরীরটাকে একটা ব্যথানাশক বা পেইনকিলার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। আনিকা চাইছিলেন উনার শরীরের ভেতরের সেই আদিম স্নায়ুগুলোকে জাগিয়ে তুলে, এই বন্য শারীরিক মিলনের উত্তাপে উনার মনের সমস্ত ট্রমা, পোড়া লাশের গন্ধ আর বেলালের মুখটাকে পুড়িয়ে ছাই করে দিতে। উনি অবচেতনভাবে চেষ্টা করছিলেন সেক্সের মাধ্যমে উনার এই জীবন্ত মৃত্যুর হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে।

উনি এক হাত দিয়ে আমার টি-শার্টের কলার ধরে টেনে ছিঁড়ে ফেলার মতো টান দিলেন। "রাশেদ... আমাকে আদর করো... আমাকে নাও..." আনিকা চুমুর ফাঁকেই একটা ভেজা, ভাঙা এবং গোঙানির সুরে বলতে লাগলেন। উনার নিঃশ্বাস এত দ্রুত পড়ছিল যে উনার বুকটা আমার খালি বুকের সাথে হাপরের মতো আছড়ে পড়ছিল।

উনি উনার নাইটিটা শরীর থেকে খসিয়ে ফেলার চেষ্টা করলেন। উনার সেই ফর্সা, মসৃণ স্তনদুটো আবছা আলোয় উন্মুক্ত হয়ে আমার চোখের সামনে এল। উনার হাত নেমে গেল আমার ট্রাউজারের বেল্টের কাছে। উনি মরিয়া হয়ে আমার শরীরটাকে উনার শরীরের ভেতরে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।

আমি উনার এই চরম অসহায়ত্ব আর বন্যতা দেখে এক মুহূর্তের জন্য বিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম। আমার পুরুষালি শরীর উনার এই স্পর্শে সাড়া দিতে শুরু করেছিল ঠিকই, কিন্তু আমার মন কাঁদছিল। আমি উনার কোমরটা জড়িয়ে ধরলাম। আমি উনার ফর্সা পিঠে হাত বুলিয়ে উনাকে শান্ত করার চেষ্টা করলাম।

আমি উনার ঠোঁটে আলতো করে একটা চুমু দিয়ে উনার স্তনে আমার মুখ নামিয়ে আনলাম। আমি চেয়েছিলাম উনাকে আমার সমস্ত প্রেম দিয়ে একটু আরাম দিতে, উনার এই যন্ত্রণাদায়ক আগুনটাকে একটু ঠান্ডা করতে।

আমার ঠোঁটের স্পর্শ উনার স্তনবৃন্তে লাগতেই আনিকা একটা তীক্ষ্ণ, দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। উনার শরীরটা বিছানার ওপর সামান্য কেঁপে উঠল। উনি উনার দুই হাত দিয়ে আমার মাথাটা উনার বুকের সাথে আরও শক্ত করে চেপে ধরলেন। উনি উনার পা দুটো আমার কোমরের দুই পাশে জড়িয়ে ধরে উনার সেই উষ্ণ, কাঙ্ক্ষিত কেন্দ্রবিন্দুটাকে আমার দিকে এগিয়ে দিলেন।

আমাদের শরীর যখন আর এক সেকেন্ডের দূরত্বে, যখন আমরা চূড়ান্ত মিলনের সেই দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছি— ঠিক তখনই... ঠিক সেই মুহূর্তেই আনিকার ভেতরের সেই টানটান করে রাখা স্প্রিংটা যেন প্রচণ্ড শব্দে ছিঁড়ে গেল।

উনি হঠাৎ করে জমে পাথর হয়ে গেলেন। উনার শরীরের প্রতিটি পেশি, যা একটু আগে কামনায় কাঁপছিল, তা যেন এক সেকেন্ডে অবশ হয়ে গেল। উনার হাত দুটো আমার চুল থেকে খসে নিচে পড়ে গেল। এবং তারপর...

এই নিস্তব্ধ ঘরের ভেতর, এসির মৃদু গুঞ্জনের মাঝে, আনিকা নাওহার একটা বুক-ফাটা, বুক-চেরা এবং চরম হাহাকারে ভেঙে পড়লেন।

"উউউউ... আহহহহহ..."

উনি আমার বুকের ওপর উনার মুখটা গুঁজে দিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। উনার চোখ থেকে অঝোর ধারায় গরম পানি পড়তে শুরু করল। সেই পানির স্রোত আমার খালি বুক, আমার পেট সম্পূর্ণ ভিজিয়ে দিল। উনার পুরো শরীরটা কান্নার তোড়ে একটা বাচ্চার মতো থরথর করে কাঁপতে লাগল।

সেক্স, কামনা, ফ্যান্টাসি— সবকিছু যেন এক নিমেষে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল। ঘরের বাতাসে এখন কেবল জমে রইল এক নারীর সীমাহীন অপরাধবোধ আর আত্মগ্লানির হাহাকার।

উনি আমার ওপর থেকে সরে গেলেন। উনার নাইটিটা টেনে কোনোমতে উনার বুকটা ঢেকে নিয়ে, উনি বিছানার এক কোণায় গিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে পড়লেন। উনি উনার দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন। উনার পিঠের পেশিগুলো কান্নার ধাক্কায় বারবার ফুলে উঠছিল।

"আই অ্যাম সরি... আই অ্যাম সো সরি রাশেদ..." আনিকা কান্নার দমকের মাঝেই ভাঙা গলায় প্রলাপ বকতে লাগলেন। "আমি পারছি না... আমি চোখ বন্ধ করলেই বেলালের মুখটা দেখতে পাচ্ছি... ও জ্বলছে... ও আমাকে ডাকছে... আমি কীভাবে এত বড় একটা পাপ করতে পারি? আমি তো মানুষ, আমি কোনো পশু না... আই অ্যাম সরি রাশেদ... প্লিজ আমাকে ক্ষমা করো..."

আমি বিছানায় উঠে বসলাম। আমার নিজের চোখ দুটোও তখন ভিজে উঠেছে। আমি উনার পাশে গিয়ে উনার কাঁধের ওপর আমার হাতটা রাখলাম। উনাকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো ভাষা আমার জানা ছিল না। আমি শুধু খুব আলতো করে উনার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলাম।

"আনিকা... প্লিজ শান্ত হও। তোমার কোনো দোষ নেই। তুমি কোনো পাপ করোনি," আমি খুব নরম গলায় বললাম।
কিন্তু আনিকা আমার কোনো কথা শুনতে পেলেন না। উনি উনার মুখ থেকে হাত সরালেন। উনার চোখ দুটো লাল হয়ে ফুলে গেছে, মুখটা কান্নায় ভিজে একাকার।

উনি খুব দ্রুত বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ালেন। উনার পা কাঁপছিল। উনি উনার নাইটিটা ঠিক করতে করতে একবার আমার চোখের দিকে অপরাধী দৃষ্টিতে তাকালেন। "সরি..." উনি শেষবারের মতো একটা অস্ফুট শব্দ করলেন।

তারপর উনি দৌড়ে গেস্ট রুমের দরজা পেরিয়ে করিডোর দিয়ে উনার মাস্টার বেডরুমের দিকে চলে গেলেন। কয়েক সেকেন্ড পর মাস্টার বেডরুমের দরজাটা ভেতর থেকে সশব্দে বন্ধ হওয়ার শব্দ পেলাম।

আমি গেস্ট রুমের বিছানায় একা বসে রইলাম। আমার খালি বুকে তখনো আনিকার চোখের নোনতা জল আর উনার কান্নার উত্তাপ শুকায়নি। চারপাশটা আবার সেই আগের মতো শ্মশানের নিস্তব্ধতায় ডুবে গেছে।

আমি উঠে গিয়ে বারান্দায় দাঁড়ালাম। একটা সিগারেট ধরালাম। আমার অনুবাদক মন আজ বুঝতে পারল, মানুষের শরীরকে হয়তো খুব সহজেই জয় করা যায়। টাকার জোরে, রূপের মোহে, কিংবা চরম উত্তেজনার খেলায় একটা শরীরকে বিছানায় এনে ফেলাটা কোনো কঠিন কাজ নয়। কিন্তু মানুষের ট্রমা, মানুষের অন্তরের ক্ষতের ওপর কোনো শারীরিক মিলন মলম লাগাতে পারে না। কিছু কিছু ক্ষত এতই গভীর হয় যে, সেখানে শুধু সময়ের নিঃশব্দ মলমটুকুই দরকার হয়।

আমি অনেক চেষ্টা করেছি উনাকে স্বাভাবিক করার। প্রতিদিন উনাকে ভালো রাখার, উনাকে হাসানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু সবকিছু ব্যর্থ হয়ে গেছে। জীবন চলছে তার নিজস্ব একঘেয়ে, বিষণ্ণ ছন্দে। আমি বারান্দার রেলিং ধরে অন্ধকার ঢাকার আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমি জানি না, এই বিষাদের রাত কবে শেষ হবে, আর কবে আনিকা নাওহার উনার এই আত্মগ্লানির নরক থেকে মুক্তি পাবেন।
 

Reply


Messages In This Thread
দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:51 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:52 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:52 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:53 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:54 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:54 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:55 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-21-2026, 05:55 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:26 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:27 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:28 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:55 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:56 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:57 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:58 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Erotic Lovers - 09-24-2026, 04:58 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 08:58 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 08:59 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:00 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:01 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:02 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:03 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:06 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:07 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:08 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:08 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:09 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:10 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:12 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:13 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:14 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:16 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:17 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:17 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:18 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:20 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:22 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:23 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:25 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:25 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 09-27-2026, 09:26 AM
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 4 hours ago
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 4 hours ago
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 4 hours ago
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 4 hours ago
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 4 hours ago
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 4 hours ago
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 4 hours ago
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 4 hours ago
RE: দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস( By:Orbachin) - by Bad Boy - 4 hours ago

Forum Jump:


Users browsing this thread: 1 Guest(s)